![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইহুদিধর্ম – তিনটি সর্ববৃহৎ একেশ্বরবাদী ধর্মের (যে ধর্মের মানুষ একটামাত্র ঈশ্বরের পূজা করে) পবিত্র এক শহর জেরুজালেম। হাজার বছরের ঐতিহাসিক কাল-পরিক্রমায় শহরটি কখনো জেরুজালেম, কখনো আল-কুদ্স, কখনো ইয়েরুশালায়িম, কখনো অ্যায়েলিয়া প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল যা এর বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে। এটি এমন এক শহর যাকে হযরত সুলাইমান (আঃ) এবং হযরত দাউদ (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম নবী-রাসূল তাদের ভূমি বলে সম্বোধন করেছেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় একরাতের মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং এরপর জেরুজালেম থেকে আসমান পর্যন্ত এক অলৌকিক ভ্রমণ করেছিলেন যা মি’রাজ নামে পরিচিত। যদিও তাঁর জীবদ্দশায় জেরুজালেম কখনো মুসলিমদের অধীনে আসেনি। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) এর সময়।
সিরিয়া
মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রচারিত বাণী দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, দলে দলে মানুষ গ্রহণ করতে থাকে এই বাণী। তখনকার পরাশক্তি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এর দক্ষিণ সীমান্তের দিকে ছড়িয়ে পড়া এই নতুন ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছিল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তাবুক অভিযানে মহানবী (সাঃ) এর নেতৃত্বে প্রায় ৩০,০০০ সৈন্য বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমানা অভিমুখে যাত্রা করে। যদিও কোনো বাইজেন্টাইন সৈন্য যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের মুখোমুখি হয়নি, কিন্তু এই অভিযানটি মুসলিম-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সূচনা হিসেবে পরিচিতি পায় যা পরে কয়েক দশক ধরে অব্যাহত ছিল।
৬৩২ থেকে ৬৩৪ সাল পর্যন্ত খলিফা আবু বকর (রাঃ) এর সময় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোন বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়নি। হযরত উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) এর সময় মুসলিমরা উত্তরদিকে বাইজেন্টাইন অঞ্চলে খিলাফত সম্প্রসারণ শুরু করে। তিনি খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ (রাঃ) এবং আমর ইবন আল-আস (রাঃ) সহ বেশ কয়েকজন বিচক্ষণ মুসলিম সেনাপতিকে বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়ারমূক এ সংঘটিত চূড়ান্ত-নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধে দামেস্কসহ সিরিয়া অঞ্চলের অনেক নগরীর পতন হয়। এটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য বড় একটি আঘাত ছিল।
অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীকে স্থানীয় জনগণ – ইহুদি এবং খ্রিস্টান উভয়ই স্বাগত জানায়। ঐ অঞ্চলের বেশীরভাগ খ্রিস্টানই ছিল একেশ্বরবাদী, যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস মুসলমানদের প্রচার করা ধর্মের অনুরূপ ছিল। বাইজেন্টাইনদের সাথে ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকায় তারা বাইজেন্টাইনদের পরিবর্তে মুসলিম শাসনকে স্বাগত জানায়।
জেরুজালেম বিজয়
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুসলিম সৈন্যরা জেরুজালেমের কাছাকাছি চলে আসে। তখন জেরুজালেমের দায়িত্বে ছিলেন বাইজেন্টাইন সরকারের প্রতিনিধি ও স্থানীয় খ্রিস্টান গীর্জার প্রধানঃ যাজক সোফ্রোনিয়াস। খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ (রাঃ) এবং আমর ইবন আল-আস (রাঃ) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শহর পরিবেষ্টন করা শুরু করে এবং যাজক কে আত্মসমর্পণের আহবান জানান, কিন্তু যাজক সোফ্রোনিয়াস আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
এমন পরিস্থিতির খবর পেয়ে উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) একাই একটি গাধা এবং এক চাকরকে নিয়ে মদীনা ছেড়ে জেরুজালেমের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তখন জেরুজালেমে যাজক সোফ্রোনিয়াস তাঁকে স্বাগত জানান। মুসলিমদের খলিফা, তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি উমর (রাঃ) ছিলেন খুব সাধারণ বুননের পোষাকে। তাঁকে ও ভৃত্যের মধ্যে কে উমর তা আলাদা করা যাচ্ছিলনা। এ অবস্থা দেখে সোফ্রোনিয়াস খুবই বিস্মিত হন।
mosque of Omar in Jerusalem
উমর (রাঃ) এর মসজিদটি আজও গীর্জা সংলগ্ন রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে
এরপর উমর (রাঃ) কে পবিত্র সমাধির গীর্জাসহ পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখানো হয়। নামাজের সময় হলে সোফ্রোনিয়াস তাঁকে গীর্জার ভেতর নামাজ আদায় করার আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু উমর (রাঃ) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যদি তিনি সেখানে নামাজ আদায় করেন তাহলে পরবর্তীতে মুসলিমরা এই অজুহাত দেখিয়ে গীর্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করবে – যা খ্রিস্টান সমাজকে তাদের একটি পবিত্র স্থান থেকে বঞ্চিত করবে। বরং উমর (রাঃ) গীর্জার বাইরে নামাজ আদায় করেন যেখানে পরবর্তীতে একটি মসজিদ নির্মিত করেন (যা “মসজিদে উমর” নামে পরিচিত)।
উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামা
ইতিপূর্বে জয় করা শহরগুলোর মতো জেরুজালেমেও মুসলিমদের একটি চুক্তিনামা লিখতে হয়। চুক্তিনামাটি ছিল জেরুজালেমের সাধারণ জনগণ এবং মুসলিমদের নাগরিক অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন উমর (রাঃ) ও যাজক সোফ্রোনিয়াস, এবং মুসলিম বাহিনীর কতিপয় সেনাপতি। চুক্তিনামায় লিখিত ছিলঃ
পরম দয়ালু এবং করুণাময় আল্লাহ’র নামে। এতদ্বারা ঘোষণা করা হচ্ছে যে, আল্লাহর বান্দা, ঈমানদারদের সেনাপতি উমর, জেরুজালেমের জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করছে। নিশ্চয়তা দিচ্ছে তাদের জান, মাল, গীর্জা, ক্রুশ, শহরের সুস্থ-অসুস্থ এবং তাদের সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদির। মুসলিমরা তাদের গীর্জা দখল করবেনা এবং ধ্বংসও করবেনা। তাদের জীবন, কিংবা যে ভূমিতে তারা বসবাস করছে, কিংবা তাদের ক্রুশ, কিংবা তাদের সম্পদ – কোনোকিছুই ধ্বংস করা হবে না। তাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হবে না।
জেরুজালেমের অধিবাসীদের অন্যান্য শহরের মানুষের মতই কর (ট্যাক্স) প্রদান করতে হবে এবং অবশ্যই বাইজেন্টাইনদের ও লুটেরাদের বিতাড়িত করতে হবে। জেরুজালেমের যেসব অধিবাসী বাইজেন্টাইনদের সাথে চলে যেতে ইচ্ছুক, গীর্জা ও ক্রুশ ছেড়ে নিজেদের সম্পত্তি নিয়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তাদের আশ্রয়স্থলে পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নিরাপত্তা পাবে। গ্রামের অধিবাসীরা চাইলে শহরে থেকে যেতে পারে, কিন্তু তাদের অবশ্যই শহরের অন্যান্য নাগরিকদের মত কর প্রদান করতে হবে। যে যার ইচ্ছেমতো বাইজেন্টাইনদের সাথে যেতে পারে কিংবা নিজ নিজ পরিবার-পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারে। ফসল কাটার আগে তাদের থেকে কিছুই নেয়া হবেনা।
যদি তারা চুক্তি অনুযায়ী কর প্রদান করে, তাহলে এই চুক্তির অধীনস্ত শর্তসমূহ আল্লাহর নিকট অঙ্গীকারবদ্ধ, তাঁর নবীর উপর অর্পিত দায়িত্বের ন্যায় সকল খলিফা এবং ঈমানদারদের পবিত্র কর্তব্য।
(তারিখ তাবারী এর The Great Arab Conquests থেকে উদ্ধৃত)
সেই সময় পর্যন্ত এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রগতিশীল চুক্তিগুলোর একটি। তুলনা করলে দেখা যায়, এ ঘটনার মাত্র ২৩ বছর আগেই পারসিকরা (পারস্যের অধিবাসী) বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে জেরুজালেম জয় করার পর জেরুজালেমের মানুষদের উপর গণহত্যা চালায়। একইভাবে ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা মুসলিমদের থেকে জেরুজালেম দখল করার পর গণহত্যা চালায়।
কুরআনের নির্দেশনা এবং মুহাম্মদ (সাঃ) এর বাণী অনুযায়ী লেখা উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামা জেরুজালেমের খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা এনে দেয়। এ ছিল ইতিহাসে ধর্মীয় স্বাধীনতার সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক নজির। চুক্তিনামায় জেরুজালেম থেকে ইহুদিদের নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত একটি ধারা রয়েছে যার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে। জেরুজালেমে উমর (রাঃ) এর পথপ্রদর্শক ছিলেন কা’ব আল-আহবার নামক জনৈক এক ইহুদি। কিন্তু উমর (রাঃ) ইহুদিদেরকে টেম্পল মাউন্ট এবং ওয়েলিং ওয়াল (ইহুদিদের পবিত্রতম দু’টি স্থান) এ ধর্মচর্চার অনুমতি দেন যখন এর আগে বাইজেন্টাইনরা ইহুদিদের এসব কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। অতএব, চুক্তিনামায় ইহুদিদের সংক্রান্ত ধারাটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা করে এমন একটি প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত চুক্তির তাৎপর্য ছিল অনেক। এই চুক্তিনামা সাবেক বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আমলে মুসলিম-খ্রিস্টান সম্পর্কের একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়েছিল যেখানে সকল পরিস্থিতিতে যুদ্ধের পর অধিকৃত মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখা হয় এবং বাধ্যতামুলক ধর্মান্তরীকরণকে কখনোই অনুমোদন দেয়নি।
শহরের পুনরুজ্জীবন লাভ....
উমর (রাঃ) অবিলম্বে শহরটিকে মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনে পরিণত করায় মনোনিবেশ করেন। তিনি টেম্পল মাউন্ট এর এলাকাটি পরিষ্কার করেন যেখান থেকে মহানবী (সাঃ) আসমানে আরোহণ করেছিলেন। খ্রিস্টানরা ইহুদিদেরকে অসন্তুষ্ট করার জন্য এলাকাটিকে আবর্জনা ফেলার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করত। উমর (রাঃ) এবং মুসলিম বাহিনী (এবং সাথে থাকা কিছু ইহুদি) ব্যক্তিগত উদ্যোগে এলাকাটি পরিষ্কার করে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ।
উমর (রাঃ) এর খিলাফতের বাদবাকী সময়ে এবং এরপর উমাইয়াদের সময় জেরুজালেম ধর্মীয় তীর্থযাত্রা এবং বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠে। মসজিদ আল-আক্সাকে পরিপূর্ণ করে তুলতে ৬৯১ সালে যোগ করা হয় “ডোম অফ রক” (কুব্বাত আস সাখরা)। শীঘ্রই গোটা শহর জুড়ে আরো অনেক মসজিদ ও সরকারী কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে খলিফা উমার (রাঃ) অধীনে মুসলিমদের জেরুজালেম বিজয় স্পষ্টতই শহরটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে। পরবর্তী ৪৬২ বছর পর্যন্ত উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামা অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে মুসলিমরা শহরটির শাসনকার্য পরিচালনা করে। এমনকি ২০১২ সালে এসেও ভবিষ্যতে শহরটির অবস্থানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধাবস্থায় (২০১২ সালে ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধ) অনেক মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ইহুদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামাই আইনী কাঠামো বজায় রাখতে, তাই এটি বর্তমান সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
® Jerusalem and Umar ibn al-Khattab আর্টিকেল থেকে।
২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ভোর ৬:১০
আনিছুর রহমান সুজন বলেছেন: ধন্যবাদ
২| ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ভোর ৬:১০
আনিছুর রহমান সুজন বলেছেন: ধন্যবাদ
©somewhere in net ltd.
১|
১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:৫৮
পদাতিক চৌধুরি বলেছেন: বাহা! ভালো পোস্ট। মুসলিমদের জেরুজালেম বিজয়ের ইতিবৃত্ত জেনে ভালো লাগলো।
শুভেচ্ছা রইল।