| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ছোটবেলায় এক চাচা আমাদের সহপাঠি কয়েকজনকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বলতো মানুষের সবচেয়ে মজার খাদ্য কি, যা জীবন ভরে খেলেও পেট ভরে না এবং খাওয়ার ইচ্ছাও কখনো কমে না বা অরুচী হয় না? আমরা বহু চেষ্টা করেও তার সঠিক উত্তর সেদিন দিতে পারি নাই। পরে অবশ্য উনিই উত্তরে বললেন ‘ঘুষ’। পরবর্তিতে পদে পদে বুঝেছি যে উনার উত্তরটি কতই না সঠিক ছিল।
হাতের তালুর মত একটি জায়গা, ১৬ কোটির উপরে মানুষ। তার উপর আবার শিল্পকারখানা-ব্যবসা বানিজ্য গড়ে না ওঠায় কর্মসংস্থান যেখানে সোনার হরিন, সেখানে একটি সরকারী চাকুরী বিশেষকরে ঘুষেলা (রোদ থাকলে রোদেলা, ঘুষ থাকলে ঘুষেলা) চাকুরী তো ডায়মন্ডের হরিন বা তার চেয়েও দামী কিছু হবে তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, আমরা আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আধ মরারে ঘা মেরে তুই বাঁচা’ ফর্মূলায় চলছি। অর্থাৎ যে লোকের চাকুরী নাই, ব্যবসা নাই, বেকারত্বের যন্ত্রনায় নাভিশ্বাস উঠছে তাকে পুলিশের সিপাহী পদে একটি চাকুরী দেওয়ার বদলে তার কাছ থেকে নিতে হবে কমপক্ষে ৪ লক্ষ টাকা।
এভাবে চাকুরী পাওয়া থেকে শুরু করে প্রোমশন, ট্রান্সফার-পোস্টিং এবং চাকুরী শেষে পেনশন পাশ করা পর্যন্ত সকল ধাপে ধাপে শুধু ঘুষ আর ঘুষ। প্রতি বছর সরকারী চাকুরীর ঐ সকল ধাপ সমূহ থেকে চলে শত শত কোটি টাকার ঘুষ বানিজ্য। আজ যে কোন সরকারী, এমনকি আধা সরকারী বা শায়ত্বশাসিত প্রাতিষ্ঠানের চাকুরীতেও ঘুষ লাগবে এ কথায় কোন মানুষ আর আশ্চর্য হয় না। ঘুষ আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ part and parcel. একদিন একটি সরকারী দপ্তরে তাদের মসজিদের ইমাম নিয়োগের সময় হাজির থেকে দেখলাম ইমাম সাহেবরা ঘুষের দরবার করছেন। এটা পাপ কিনা জানতে চাইলে কাতর স্বরে এক ইমাম সাহেব বললেন ভাইরে চাকুরীটা খুবই জরুরী। আর ঘুষ ছাড়া চাকুরী হবে না তা আপনিও জানেন আমিও জানি।
হ্যা, বিষয়টি আপনিও জানেন আমিও জানি, আর জানে সর্বলোক।আর ৭-৮ থেকে শুরু করে ১২-১৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে যে মানুষ বন বিভাগ, কাস্টমস বা পুলিশ অফিসারের চাকুরী নেন, তার কি ঘুষ না খেয়ে উপায় আছে? কোন উপায় নেই। আর একজন পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে ঘুষ খেয়ে গেল হয়ত দু-চার জন মানুষ কিন্তু ঐ পুলিশ ঐ টাকা উঠাবে হয়ত হাজার বা লক্ষ মানুষ পিটিয়ে। ভুক্তভোগি কারা হচ্ছে? সেই আমজনতা যারা আবার টাকার অভাবে আম নামক ফলটি চোখে দেখেই না। ঘুষ লেনদেনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশ ও জাতি। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মেধাবী মানুষের মূল্যায়ন না হওয়ায় যে কত বড় সর্বনাশ আমাদের হচ্ছে তা আমরা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে পারছি। কিন্তু তারপরও আমাদের কি নিরব হয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে?
ঘুষ সম্পর্কে রচনা লিখতে দিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনের বেঞ্চের ছাত্রটিও হয়ত পাঁচ দশ পৃষ্ঠা লিখতে অপারগ হবে না। তাই এ বিষয়ে আর বেশি কচলাকচলি না করে পরিসমাপ্তির দিকে যাই একটি প্রশ্ন রেখে তা হল, এ দুর্ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার কোন উপায় কি আমাদের সামনে নেই? নিশ্চয়ই আছে। যেখানে মুশকিল সেখানেই আসান। তবে ক্ষমতা যাদের হাতে তাদের এসব দমনের ইচ্ছাটা হতে হবে অথবা দেশের জনগন মিলে তাদেরকে বাধ্য করতে হবে। এর যে কোন একটি করলেই ফল পাওয়া যাবে। আর কর্তা ব্যক্তিরা যদি প্রশ্ন করেন যে, তাঁরা কিভাবে করবেন, তাহলে আমরা তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে ফর্মূলা খুজতে সাহায্য করতে পারি।
ঘুষের সবচেয়ে বড় বানিজ্যটি হয় চাকুরীর নিয়োগের সময়। নিয়োগের আগে একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। আর সবচেয়ে বড় দুর্নীতিটা হয় সেখানে। বেকার তরুন তরুনীরা কষ্ট করে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেয় এবং ফলাফরের জন্য অরেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন নিয়ে কোন তুঘলকি কান্ড ঘটছে কি না তা জানার সুযোগ তাদের থাকে না। নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া দেশের আর কেউই জানে না ওখানে কি ঘটছে। এই সুযোগে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামত ফলাফল তৈরী ও প্রকাশ করে যেখানে যারা তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারে দেখা যায় তাদের খাতায় কিছু থাকুক বা না থাকুক তারা ভাল রেজাল্ট করে এবং চাকুরীটিও পেয়ে যায়। অর্থাৎ সবচেয়ে বড় শুভঙ্করের ফাকি রয়েছে পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে।
তবে আমি মনে করি, এখন সরকার চাইলেই পরীক্ষা পদ্ধতিকে নিশ্ছিদ্র করতে পারে। মাননীয় ম্যাজিষ্ট্রেট মহদয় এবং ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার সামনে বসে অনলাইনে পরীক্ষা দিবেন প্রার্থীরা। অনলাইনের জন্য প্রশ্ন তৈরী করা হবে ১০০ সেট বা ৫০০ সেট। ১০০টি প্রশ্নের উত্তরের জন্য ৫০ বা ১০০ মিনিট সময়। ভোটার আইডির নাম্বার ও ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে তৈরী ক্রমিক নম্বর দিয়ে লগ ইন করা মাত্রই কম্পউটারের পর্দায় প্রশ্ন ভেসে ওঠা শুরু হবে। একের পর এক এমসিকিউ উত্তর দিতে থাকবেন প্রার্থীরা।কার ভাগ্যে কোন সেট প্রশ্ন পড়বে তা কেউ আগে থেকে অনুমান করতে পারবে না। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে রেজাল্ট। নিজ চোখে রেজাল্ট দেখেই কেন্দ্র ছাড়বে পরীক্ষার্থীরা।
পরীক্ষায় যাবা ভাল করবে তারা এগিয়ে যাবে চাকুরীর দিকে। কিছু কম্পউটারের এবং সেষ্টেম ডেভেলপের প্রয়োজন। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, জাতীয় চরিত্র রক্ষা, জাতির মেধার মূল্যায়ন ও সর্বপরি জাতীয় অগ্রগতির জন্য কিছু টাকা ইচ্ছা করলে জোগাড় করা নিশ্চয়ই যাবে। নির্বাচন কমিশনের কাজ কি ঠেকেছিল? না, ইচ্ছাটাই এখানে মূখ্য বিষয়। চাকুরীরত অবস্থায় পদন্নতিও হতে হবে এধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে। আর ট্রান্সফার-পোস্টং ও করা যায় কম্পউটার ভিত্তিক লটারীর মাধ্যমে। কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা থাকলে সব জালিয়াতি নির্মূল নিশ্চয়ই করা যায়। তাছাড়া, তাৎক্ষনিকভাবে আমি যে উপায়ের কথাগুলি বললাম সেগুলিই যে একমাত্র উপায় তা তো নয়। এর চেয়ে অনেক ভাল ভাল উপায় এদেশের মানুষের মাথায় নিশ্চয়ই আছে। আমাদের সমস্যার সমাধানের জন্য ইউরোপীয়ান বা আমেরিকান কন্সাল্ট্যান্টের কোন প্রয়োজন নেই। শুধু চেয়ে দেখুন। কিন্তু কোনদিন কেউ চাইলই তো না।
বিঃদ্রঃ দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির কোন প্রচেষ্টাই পুরোপুরি সফল হবে না।
©somewhere in net ltd.