নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বোকা মানুষের কথায় কিই বা আসে যায়

বোকা মানুষ বলতে চায়

আমি একজন বোকা মানব, সবাই বলে আমার মাথায় কোন ঘিলু নাই। আমি কিছু বলতে নিলেই সবাই থামিয়ে দিয়ে বলে, এই গাধা চুপ কর! তাই আমি ব্লগের সাহায্যে কিছু বলতে চাই। সামু পরিবারে আমার রোল নাম্বারঃ ১৩৩৩৮১

বোকা মানুষ বলতে চায় › বিস্তারিত পোস্টঃ

ডে ট্রিপ ইন মুম্বাই সিটি - মুম্বাই দর্শন ২০১৬ (তৃতীয় পর্ব)

০২ রা মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৪:৪৮



সেদিন ছিল ভারত ভ্রমণের অফিশিয়ালি শেষ দিন। ঘুম থেকে উঠে যার যার ব্যাগ গুছিয়ে হোটেল হতে চেক আউট করে নিলাম। এরপর হোটেলের রিসিপশন এ কথা বলে তাদের লাগেজ রুমে আমাদের লাগেজগুলো রেখে দিলাম। রাতে “মুম্বাই দর্শন” শেষ করে ফিরে এসে লাগেজ নিয়ে চলে যাব সরাসরি এয়ারপোর্ট। যাই হোক, হোটেল হতে বের হয়ে নাস্তা করলাম মুম্বাইয়ের "দিল্লী দারবার" রেস্টুরেন্টের লাগোয়া পাঞ্জাবী রেস্তোরায়; নেহারী আর কিমা ভুনা সাথে নান রুটি, ইয়াম্মি নাস্তা। নাস্তা শেষ করে বাসে চেপে বসলাম মুম্বাই দর্শন এর উদ্দেশ্যে। আগের রাতে হোটেলের রিসিপশনে বলে রেখেছিলাম, তারাই মুম্বাই দর্শনের বাসের টিকেট কনফার্ম করে রেখেছিল। দশটার কিছু আগে গ্রান্ড রোডস্থ আমাদের হোটেল নিউ শালিমার হতে তুলে নিয়ে যাত্রা শুরু করলো।

আমরা আগের দিন চৌপত্তি, মেরিন ড্রাইভ, ইন্ডিয়া গেট, তাজ হোটেল এগুলো নিজেরা নিজেরা ঘুরে দেখে কাটিয়েছিয়াম বিকেলের শুরু হতে রাত অবধি। আজ মুম্বাই দর্শনের শুরুতেই গাড়ী গুরগাও চৌপত্তি এবং মেরিন ড্রাইভ হয়ে ইন্ডিয়া গেটে এসে যাত্রা বিরতি করল। এখানে গাড়ী থাকবে ঘন্টাখানেক; দর্শনার্থীরা আরব সাগরের বুকে নৌভ্রমণ করার জন্য এই সময় পাবে। আমরা গতকাল বিকেলেই যে পর্ব সেরে ফেলেছিলাম। কি আর করার, ইন্ডিয়াগেটের নিকট বসে আড্ডাবাজি চলল এই সময়টা, এর সাথে আমাদের মুখের চর্বন ক্রিয়া এবং ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক চলেছে কিছুক্ষণ পরপরই। :P


গিরগাও চৌপাত্তিঃ
মুম্বাই এর গিরগাও এলাকার এই জায়গাটা “চৌপাত্তি” হিসেবেই সুপরিচিত। Bombay City Gazetteer মতে, শব্দটি এসেছে মূলত চো-পাতি থেকে যার অর্থ চারটি চ্যানেল বা পানির ধারা যেখানে এসে মিশেছে। আরেকটি সূত্র বলে, মুম্বাই এর থানে জেলার মাহিম তালুকে “সাতপতি” নামে একটি গ্রাম ছিল, যেখানে এই জায়গাটি বর্তমানে বিদ্যমান; আর সেই সাতপতি কালের পরিক্রমায় বদলে গিয়ে চৌপাতি নাম ধারন করেছে। তো নামকরণের ইতিহাস যাই হোক না কেন, এখানকার সৈকত কিন্তু মুম্বাই এর স্থানীয় এবং পর্যটকদের ভীষণ পছন্দের জায়গা। প্রতি বছর গনেশ বিসর্জনের সময় এই জায়গা খুব জমজমাট থাকে। এই জায়গাটিতেই প্রতি বছর দশদিন ব্যাপী “রামলীলা” যাত্রা অনুষ্ঠিত হয় জাকজমকপূর্ণ ভাবে। এই চৌপত্তি ঘেঁষে একটি রাস্তা চলে গেছে যেখানে রয়েছে “তুকারাম অম্বলে”র ব্রোঞ্জ নির্মিত প্রতিকৃতি। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাই এর তাজ হোটেলে সন্ত্রাসী হামলার সময় এই জায়গাতেই মুম্বাই পুলিশের কনস্টেবল তুকারাম অম্বলে সন্ত্রাসী আজমাল কাসাব’কে গ্রেফতারের সময় গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এই এলাকার সৈকত সংলগ্ন সমুদ্র’র পানি ভীষণরকম দুষিত। শুধু তাই নয়, এই এলাকার সৈকতের বালি দূষণের কারনে দিন দিন কালো হয়ে যাচ্ছে। তারপরও সারা বছর এখানে লোকজনের সমাগম লেগেই থাকে। সন্ধ্যের আগে পরে মানুষ অবসর যাপনের জন্য ভিড় করে এই চওপত্তি’তে। বিখ্যাত মুম্বাই এর স্ট্রিট ফুড পাওভাজি, বারাপাও, ভেলপুরি, রাগদা পেটিস ইত্যাদির সাথে আরব সাগরের নোনা বাতাসে সন্ধ্যের আগের সময়টা উপভোগ্য হয় নিঃসন্দেহে।


মেরিন ড্রাইভঃ
দক্ষিণ মুম্বাই এর এই বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ এর অফিশিয়াল নাম “নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস রোড”। ৩.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেরিন ড্রাইভ যার পুরোটা ইংরেজী বর্ণ 'C' এর আকৃতি নেয়ায় একে রাতের বেলা উঁচু ভবনগুলো থেকে দেখতে অনেকটা নেকলেস এর মত দেখায়। আর এই কারনে মুম্বাই এর মেরিন ড্রাইভকে আদর করে ডাকা হয় “কুইন’স নেকলেস” নামে। ছয় লেন বিশিষ্ট এই রোডের উত্তর প্রান্ত এসে মিশেছে চৌপত্তি বীচে। এই মেরিন ড্রাইভকে ঘিরে নানান অভিজাত স্থাপনা গড়ে উঠেছে মুম্বাই নগরীতে। এগুলোর মধ্যে কাপুর মহল, জাভের মহল, কেভাল মহল নামের তিনটি ভবন (১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সাল নাগাদ নির্মিত) থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা ওবোরয় হোটেল, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সহ অসংখ্য নামীদামী হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মার্কেট, আবাসিক ভবন, স্পোর্টস ক্লাব, বার-জিম গড়ে উঠেছে থরে থরে। এই কুইন’স নেকলেস খ্যাত মেরিন ড্রাইভ মুম্বাইয়ের সিগনেচার সাইট হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।


গেট অফ ইন্ডিয়াঃ
বিখ্যাত এই গেট অফ ইন্ডিয়া নির্মিত হওয়ার ইতিহাস শুরু হয় ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানী মেরী যখন মুম্বাই এর এপোলো বন্দরে নেমেছিলেন “দিল্লী দরবার” এ যাওয়ার প্রাক্কালে। যদিও তখন মূল স্থাপনা নির্মিত হয় নাই; কার্ডবোর্ডের তৈরী একটি মডেল তখন নির্মিত হয়েছিল শুধুমাত্র। পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে স্যার জর্জ সিডেনহাম এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং ১৯১৪ সালে জর্জ উইটেট এর চূড়ান্ত ডিজাইন অনুমোদন করলে এটির নির্মান ১৯১৫ এর শেষের দিকে আরম্ভ হয়ে সমাপ্ত হয় ১৯২৪ সালের দিকে। তারপর হতে ভারতের ভাইসরয় এবং গভর্নরেরা আগমন হত এই গেট দিয়েই। মূলত এই গেট হয়ে ওঠে ভারতের প্রবেশদ্বার। ৮৩ ফুট উঁচু এবং ৪৮ ফুট প্রস্থ’র এই ইন্ডিয়া গেটটি হলুদ ব্যাসল্ট পাথর এবং নিরেট কংক্রিটের তৈরী। চার বুরুজ বিশিষ্ট ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর মিশেলে এই স্থাপনার সাগরাভিমুখে কয়েক ধাপের সিড়ি নেমে গেছে। এই ইন্ডিয়া গেটের সম্মুখেই রয়েছে মারাঠি সাম্রাজ্যের বিখ্যাত বীর ছত্রপ্তি সিভাজি মহারাজ এর একটি প্রতিকৃতি যা ১৯৬১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। এর কাছে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের একটি মুর্তি। এই গেট অফ ইন্ডিয়ার অতি সন্নিকটেই বিখ্যাত এবং আলোচিত তাজ হোটেলটি অবস্থিত। গেট অফ ইন্ডিয়া হতে প্রতিদিন অসংখ্য নৌযান প্রতি ঘন্টায় ছেড়ে যায় এলিফ্যান্ট কেইভ ট্যুর, ডলফিন নোস ট্যুর ইত্যাদির জন্য। প্রতিদিন প্রায় সারাবেলাই লোকে লোকারণ্য থাকে এই জায়গাটি।


তাজ হোটেলঃ
বর্তমানের “দ্যা তাজ মহল প্যালেসে হোটেল” একটি ঐতিহ্যবাহী পাঁচ তারকা লাক্সারি হোটেল যা “তাজ মহল হোটেল” এবং “তাজ প্যালেস হোটেল” নামেও সমাধিক পরিচিত। এই হোটেল নির্মান নিয়ে রয়েছে মজার ইতিহাস। বিংশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকের কথা, মুম্বাইয়ের তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জামশেঠজী টাটা একদিন মুম্বাইয়ের সেই সময়ের বিখ্যাত হোটেল “ওয়াটসন’স হোটেল” এ থাকতে গেলে উনাকে জানানো হয় এটি শুধুমাত্র সাদা চামড়ার সাহেবদের জন্য। অপমানবোধ করে জামশেঠজী টাটা সিদ্ধান্ত নেন এই হোটেল তৈরীর। এবং সত্যি সত্যি তিনি এই হোটেল নির্মান করে ১৯০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর উদ্ভোধন করেন। যদিও এই তথ্য নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানান বিতর্ক রয়েছে। স্থপতি সীতারাম খান্ডেরাও বৈদ্য এবং ডি.এন. মির্যা হলেন এই হোটেলের মূল নকশা প্রণয়নকারী। পরবর্তীতে ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার ডব্লিউ.এ.চ্যাম্বারস এই পুরো পরিকল্পনার বাস্তব রুপদানে অংশ নিয়েছিলেন। খান সাহেব সরাবজি রুত্তনজিও এই হোটেলের কেন্দ্রীয় ভাসমান সিঁড়ির নকশা প্রণয়ন করে এই হোটেল নির্মানের ইতিহাসে সাথে জড়িয়ে আছেন। তৎকালীন প্রায় আড়াই লক্ষ ব্রিটিশ পাউন্ড খরচে এই হোটেলটি নির্মিত হয়েছিল। প্রথমে এই হোটেলের প্রবেশদ্বার ছিল এখন যে দিকটায় সুইমিংপুল রয়েছে সেইদিকে এবং সমুদ্র সৈকত ছিল হোটেলের পেছনভাগে। পরবর্তীতে পরিবর্তন এনে সম্মুখমুখী প্রবেশদ্বার করা হয়। ১৯০৩ সালে চালু হওয়া এই হোটেলই প্রথম হোটেল যেখানে ছিল বিদ্যুৎ সংযোগ, আমেরিকান পাখা, জার্মান এলিভেটর, টার্কিশ বাথরুম এবং ইংরেজ খানসামা সমৃদ্ধ। পরবর্তীতে এই হোটেলেই প্রথম লাইসেন্সড বার, সপ্তাহের প্রতিদিন সারাক্ষণ চালু থাকা রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি সংযুক্ত হয়েছিল। ১৯০৩ সালে এই হোটেলের পাখা এবং এটাচড বাথরুম সংযুক্ত রুমের ভাড়া ছিল ১৩ রুপী আর সকল খাবার সহ ২০ রুপী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই হোটেলটি ৬০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে রুপান্তর করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে এই হোটেলের পরিবৃদ্ধি ঘটে “তাজ মহল টাওয়ার” সংযোজনের মাধ্যমে। বর্তমানে এই হোটেলে ৫৬০টি কক্ষ এবং ৪৪টি স্যুইট রয়েছে যেগুলো দেখভাল করার জন্য ১৬০০ স্টাফ কর্মরত রয়েছে।

আমাদের টুরিস্ট বাসের বাকী সবাই ঘন্টাখানেক পরে বোট ট্রিপ শেষ করে ফিরে এলে আমরা রওনা হয়ে গেলাম মুম্বাই এর বিখ্যাত “ছত্রপতী মিউজিয়াম” দেখতে। অপুর্ব সংগ্রহশালা, সেই সাথে চমৎকার প্রদর্শনী। ইচ্ছে হচ্ছিল সারাদিন এই মিউজিয়ামে কাটিয়ে দেই; আবার কখনো মুম্বাই এলে অতি অবশ্যই একদিন ঘুরে বেড়াবো এই মিউজিয়ামে, সংগে থাকবে অতি অবশ্যই ক্যামেরা। আজ ২০০ রুপী খরচ করে ক্যামেরা না নিয়ে চরম বোকামি করেছি।


ছত্রপতি শিভাজী মহারাজ বাস্তু সংগ্রাহালয়ঃ
১৯০৪ সালে সর্বপ্রথম এই মিউজিয়াম তৈরির পরিকল্পনা গৃহীত হয়। নানান ঘটনা পরিক্রমায় ১৯২২ সালে এই মিউজিয়াম উদ্ভোদন করা হয় যার নাম ছিল "Prince of Wales Museum of Western India"। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে এই মিউজিয়ামের নাম পরিবর্তিত হয়ে Chhatrapati Shivaji Maharaj Vastu Sangrahalaya হয়। ০৩ একর জমির উপর নির্মিত এই মিউজিয়াম এর মূল ভবনের চারিপাশ পাম গাছ এবং ফুলের বাগান দ্বারা বেষ্টিত। এই মিউজিয়ামে প্রায় ৫০,০০০ এর অধিক শিল্পকলা এবং নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। মিউজিয়ামে রয়েছে Art section, Archaeological section, Natural history section
এবং New galleries অংশ। গ্যালারিগুলোর মধ্যে রয়েছে Art, History, Natural History এবং Indian Culture অংশ। এই বিভাগগুলোতে যে সকল গ্যালারি রয়েছে, সেগুলো হলঃ Sculpture gallery, Pre and Proto History gallery, Natural History Section, Indian Miniature Painting gallery, Krishna gallery, Himalayan Art gallery, Decorative Metalware gallery, House of Laxmi- Coin gallery, Karl and Meherbai Khandalavala gallery, Chinese and Japanese Art gallery, Sir Ratan Tata and Sir Dorab Tata gallery of European Paintings, Arms and Armour gallery, Jehangir Nicholson gallery, Premchand Roychand gallery, Key gallery, First Floor Circle gallery, Second Floor Circle gallery, European Decorative Art gallery, Bombay School gallery, Jahangir Sabawala gallery, Textile Gallery, Prints gallery, Curators gallery and Conservation Centre। বিশাল এই সংগ্রহশালা দেখতে দেখতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেল। আসলে এই বিশাল জাদুঘর সম্পূর্ণরূপে দেখতে দুই থেকে তিন দিন কমপক্ষে লাগবে। তাই ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে লম্বা সময়ের জন্য মুম্বাই ভ্রমণে গিয়ে জাদুঘরটি ভালভাবে দেখার।

এখান হতে বের হয়ে আমাদের নিয়ে গাড়ী গেল দুটি মন্দির দেখাতে, একটি ছিল জৈণ মন্দির অন্যটি মহালক্ষ্মী মন্দির। মন্দির দর্শনের ফাঁকে ছিল দুপুরের খাবারের জন্য বিরতি। খাওয়া শেষে আবার গাড়ী ছুটলো মুম্বাইয়ের রাজপথে, গন্তব্য মেরিন ড্রাইভ হয়ে হাজী আলী দরগাহ এবং সেখান থেকে উত্তর মুম্বাই।


হাজী আলী দরগাহঃ
আরব সাগরের বুকে সাদা এই দরগাহ মুম্বাই এর অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।
১৪৩১ সালে ধনাঢ্য মুসলিম ব্যবসায়ী সৈয়দ পীর হাজী আলি শাহ বুখারী এর স্মরণে নির্মিত হয় এই স্থাপনাটি যা হাজী আলী দরগাহ নামেই পরিচিত। বুখারী তথা আজকের উজবেকিস্থান হতে পনের শতকের শুরুর দিকে মুম্বাই এ আসেন সৈয়দ হাজী আলী এবং এখানেই ব্যবসাপত্তর সহ বসত স্থাপন করেন। পীর হাজী আলীকে নিয়ে নানান লোকগাথা প্রচলিত পুরো ভারত জুড়েই। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ভারত বর্ষে ইসলাম প্রচারের কাজ করেছিলেন ব্যাপকভাবে। কথিত আছে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার অনুসারীদের উপদেশ দিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর যেন তার লাশ দাফন করা না হয়; তার বদলে যেন সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ফলে সমুদ্রে ভেসে ভেসে লাশ যেদিকে পৌঁছবে সেখানকার মানুষেরা তাকে দাফন করবে। সেই অনুযায়ী তার লাশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হয় এবং যে স্থান হতে তা করা হয়েছিল সেখানকার এক ডুবন্ত শিলারাশির উপরই পরবর্তীতে ভক্তরা এই হাজী আলী দরগাহ নির্মান করেন। প্রতি বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার এই দরগাহ উপচে পড়া ভীর দেখা যায়। শুক্রবার বিভিন্ন সূফী মিউজিশিয়ানরা এখানে কাওয়ালীর আয়োজন করে থাকেন। অনেক বলিউড সিনেমায় এই দরগাহ আপনারা দেখে থাকবেন; তার মধ্যে নব্বই দশকের প্রথমভাগে অভিনেতা সঞ্চয় দত্ত’র “আতিশ” মুভিটিতে এই দরগাহ অন্যতম লোকেশন ছিল। সমুদ্রতট হতে ৫০০ মিটার গভীরে সমুদ্রের বুকে এই দরগাহটি অবস্থিত। ইন্দো ইসলামিক ঘরনার নকশায় নির্মিত এই দরগাহ যাওয়ার জন্য পাথুরে এক পথ চলে গিয়েছে সমুদ্রের বুক চিড়ে। প্রায় সময়ই দরগাহ যাওয়ার এই রাস্তাটি পানিতে ডুবে যায়। সমুদ্রের মাঝ দিয়ে যখন এই দরগাহ এ যাচ্ছিলাম, দুই পাশে শ্বেতশুভ্র বক পাখীর ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছিল, নীল জলের মাঝে সেই রুপ ছিল অপূর্ব। এই দরগাহ নানান সময়ে সংস্কার এবং পুনঃনির্মান হয়েছে; সর্বশেষ ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে এই দরগাহ এর উন্নয়ন এবং সংস্কার করা হয়েছিল। মাজারটি লাল সবুজ চাঁদরে ঢাকা থাকে এবং একে ঘিরে রেখেছে রৌপ্যের একটি ফ্রেম, যার পিলারগুলো মার্বেলের তৈরি। রাজস্থানের মারকানা মার্বেল পাথরে নির্মিত যা রাজস্থান হতে আনা হয়েছিল। এই মার্বেল পাথর এবং তাজমহল নির্মানে ব্যবহৃত মার্বেল পাথর একই ঘরনার। মূল দরগাহ এরিয়ার দেয়ালে মার্বেল পাথরের পিলারের গায়ে রঙিন কাঁচ এর টুকরো দিয়ে ক্যালিগ্রাফে আল্লাহ্‌র প্রশংসাসূচক নিরানব্বইটি নাম অংকিত হয়েছে। মহিলা এবং পুরুষ উভয়ের জন্য রয়েছে পৃথক প্রার্থনা কক্ষ। পূর্ণ জোয়ারের সময় পুরো দরগাহটি মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন হয়ে যায়; তখন তীর হতে নীল জলের মাঝে সাদা দরগাহটি সৃষ্টি করে এক অপার্থিব দৃশ্যের; যা দেখতে প্রচুর পর্যটক ভীড় করে মুম্বাই এর এই এলাকায়।

এখান হতে আমরা চলে গেলাম, নর্থ মুম্বাই, বান্দ্রা হয়ে বলিউড তারকাদের বাড়ীর উঠোন পেড়িয়ে সন্ধ্যের আগে বিখ্যাত জুহু বীচ, সেখানে সুর্যাস্ত দেখতে দেখতে মুম্বাইয়ের প্রসিদ্ধ গোলা আইসক্রিম, কুলফি-ফালুদা-রাবরি খাওয়া হল। সারাটা দিন এই মুম্বাই দর্শন এর গাইডের কৌতুকপূর্ণ বিবরণ এবং চারিপাশে আরও নানান স্থাপনা দেখে দেখে চমৎকার একটি দিন কাটলো; যার মাধ্যমে সেবারের ষোলদিনব্যাপী লম্বা ট্যুর এর একটি চমৎকার সমাপ্তি হয়েছিল। পথিমধ্যে দেখা স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ World Trade Center, Mantralaya, Assembly Hall, Wankhede Stadium, Race Course, Nehru Centre, Nehru Planetarium, Lilavati Hospital। ইচ্ছে আছে, আগামী পর্বে মুম্বাই দর্শন এর গাইড এবং বলিউড তারকাদের আবাসস্থল দর্শনের মজার ঘটনা নিয়ে আরেকটি পর্ব লেখার।

এরপর আর কি? রাত আটটার পরে দিনব্যাপী মুম্বাই দর্শন শেষে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে এয়ারপোর্ট চলে এলাম, ফ্লাইট ভোররাতে, গন্তব্য কলকাতা। সেখানে দশ ঘন্টার ট্রানজিট :'( প্রায় চব্বিশ ঘন্টা পর রাত এগারোটায় ঢাকায় নিজ বাসায় পৌঁছেছিলাম, বিমানবন্দরে এক মহা ঝামেলার মাঝে।

ভ্রমণকালঃ মার্চ, ২০১৬

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ উইকিপিডিয়া
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ উইকিমিডিয়া কমন্স



মুম্বাই সিরিজের আগের পর্বঃ
(১) মুম্বাই বিড়ম্বনা - মুম্বাই দর্শন ২০১৬ (প্রথম পর্ব)
(২) মায়া নগরী "মুম্বাই" এক ঝলক - মুম্বাই দর্শন ২০১৬ (দ্বিতীয় পর্ব)

আগের ভারত ভ্রমণের সিরিজগুলোঃ
কাশ্মীর ভ্রমণ সিরিজ-২০১৫
দিল্লি-সিমলা-মানালি সিরিজ-২০১৫
কেরালা ভ্রমণ সিরিজ-২০১৬
গোয়া ভ্রমণ সিরিজ-২০১৬

কম খরচে ভারত ভ্রমণ সিরিজঃ
(১) দিল্লী-হিল্লি (নিজে নিজে ঘুরে আসুন অল্প খরচে সমগ্র দিল্লী)
(২) কাশ্মীর ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং বাজেট (একটি অপূর্ণাঙ্গ পোস্ট ;) :P )
(৩) এবার চলুন সিমলা (ঘুরে আসি কম খরচে)
(৪) চল যাই মানালি... (কম খরচে ঘোরাঘুরি) :)
(৫) এবার ঘুরে আসা যাক গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (দিল্লী-আজমীর-জয়পুর-আগ্রা) (কম খরচে ঘোরাঘুরি - পর্ব ০৫) :)
(৬) পনেরো হাজার টাকায় গোয়া ভ্রমণ!!! স্বপ্ন নয়, বাস্তব... (কম খরচে ঘোরাঘুরি)
(৭) ৩২,০০০ টাকায় দিল্লী-সিমলা-মানালি-লেহ-শ্রীনগর-পাহেলগাও-গুলমার্গ-সোনমার্গ ভ্রমণ এর বাজেট-প্ল্যান (কম খরচে ভারত ঘোরাঘুরি)
(৮) মাত্র দুই দিন আর ৩,৫৫০ টাকায় ঘুরে আসুন হালের ক্রেজ মেঘালয়ের “সোনাংপেডেং” এবং “ক্রাংসুরি ফলস” - (কম খরচে ভারত ঘোরাঘুরি)

মন্তব্য ১৪ টি রেটিং +৬/-০

মন্তব্য (১৪) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা মার্চ, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৪০

রাজীব নুর বলেছেন: এ বছর যাওয়ার ইচ্ছা আছে।

০২ রা মার্চ, ২০১৯ রাত ১০:১৭

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: খুব শীঘ্রই মুম্বাই ভ্রমণের উপর দিকনির্দেশক একটা পোস্ট দিব, কম খরচে ভারত ভ্রমণের উপর; আশা করি কাজে দিবে।

২| ০২ রা মার্চ, ২০১৯ রাত ৮:১০

মাহমুদুর রহমান বলেছেন: ভালো অভিজ্ঞতা।

০২ রা মার্চ, ২০১৯ রাত ১১:১৮

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ধন্যবাদ।

৩| ০৩ রা মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৪:৩২

নয়া পাঠক বলেছেন: ভালো লাগল সুন্দর সাবলীল বর্ণনা ও ছবি। তবে ছবিআরও বেশি হলে আরও একটু বেশি ভালো লাগত। ধন্যবাদ পোষ্টের জন্য।

০৩ রা মার্চ, ২০১৯ রাত ১০:৫৩

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ধন্যবাদ নয়া পাঠক। আগের পর্বে ছবি ছিল, বর্ণনা কম। ছবিগুলো সেই পর্বে দেয়া আছে।

০৩ রা মার্চ, ২০১৯ রাত ১০:৫৬

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ছবিময় সেই পোস্ট: মায়া নগরী "মুম্বাই" এক ঝলক - মুম্বাই দর্শন ২০১৬ (দ্বিতীয় পর্ব)

৪| ০৩ রা মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৫:৪১

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: শুধু নিজেই ঘোরেন না, আমাদেরও ঘোরান :)

তাই অণ্তহীন শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা

আপনার চোখে আমাদেরও দেখা হয়ে গেল সব! :)

+++++

০৪ ঠা মার্চ, ২০১৯ রাত ৮:১৫

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ধন্যবাদ বিদ্রোহী ভ্রাতা। বরাবরের মত পাশে থেকে উৎসাহিত করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানবেন।

৫| ০৩ রা মার্চ, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:১৯

মনিরা সুলতানা বলেছেন: ইশ প্রায় প্রতিটি যায়গায় ভীষণ পছন্দের; চমৎকার সব স্মৃতি রয়ে গেছে মুম্বাইতে।

০৪ ঠা মার্চ, ২০১৯ রাত ৯:০৭

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আপনি কত ভাগ্যবতী, এই সব জায়গা একটা লম্বা সময় কাটিয়েছেন। হিংসে, হিংসে আর হিংসে। :)

৬| ০৪ ঠা মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৫:২৪

শায়মা বলেছেন: ভাইয়া এত বেড়াও কি করে?

কোথায় জব করো তুমি?

০৪ ঠা মার্চ, ২০১৯ রাত ১১:২৩

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: সে এক বিরাট ইতিহাস। পেশায় আমি একজন কেরানী, হিসাবরক্ষণ বিভাগের। যেহেতু বেসরকারি চাকুরী, সেহেতু কিছুদিন পরপর চাকুরী হতে ইস্তফা দিয়ে দেই। :P টাকায় আর পেটে টান পড়লে আবার চাকুরীর খোঁজে উঠেপড়ে লেগে যাই.... =p~ শখ জীবনে একটাই, ভ্রমণ। আর তাই যা আয়, তাই ব্যয় হয় ভ্রমণের পেছনে... :-B হাজার হলেও বোকা মানুষের জীবন বলে কথা!!!

৭| ০৫ ই জুন, ২০১৯ সকাল ৯:২৫

নজসু বলেছেন:

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.