| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নির্জন শিশির
আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, নজরুলের সমাধির সামনে দিয়ে যতবার হেটে যেতাম, প্রতিবার মুগ্ধ বিস্ময়ে নজরুলের নিজের লেখা পংক্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম "তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিবনা কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙ্গিবনা। নিশ্চল-নিশ্চুপ, আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর-ধূপ।" বহুদিন আমি সেই পথে হাটিনা; চাইলেও এখন যখন-তখন সে পথে হাটা সম্ভব নয়। ইদানীং রাত যত গভীর হয়, আমার স্মৃতি তত প্রখর হয়। মনে পড়ে বহু বছর আগে লোটাকম্বল উপন্যাসে পড়া সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা, 'এসেছিস যখন একটা আঁচড় কেটে যা।' কেন যেন আঁচড় কাটতে ইচ্ছে করে।
ফরহাদ বাড়ি যাচ্ছে। সেই কতদিন পর ফেরা! 'বোর্ডিং-পাশ' নিয়ে প্লেনে ওঠার আগ পর্যন্ত এই সময়টা ফরহাদের খুব বিরক্তিকর মনে হয়। আজ যদিও কিছুই টের পাচ্ছেনা সে, কেমন যেন অসাড় মনে হচ্ছে নিজেকে; যেন ঘড়ির কাটাটিও দেখতে ইচ্ছে করছেনা। যেখানেই তাকাচ্ছে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই ভাল লাগছে। মা’র সাথে যখনই কথা হয়, মা বাড়ি ফেরার কথা বলেন। ফরহাদেরও খুব ইচ্ছে করত বাড়ি যাওয়ার। বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেয়ার ঝামেলা অনেক, রিসার্চ পেপার লিখা, অধ্যাপককে তার ক্লাশে, প্রজেক্টে সাহায্য করা এবং তার সাথে নিজের গবেষণা চালিয়ে নেয়া। এসব করতে করতে কখন যে বছর ঘুরে আসে টেরই পাওয়া যায়না। এর আগে যখন রিসার্চ অফিসার ছিল, বছরে একবার করে বাড়ি যেত ফরহাদ, দু’সপ্তাহের জন্য। লেকচারার হিসেবে জয়েন করার পর গত দেড় বছরে একবারও যাওয়া হয়নি। মা বারবার বলত, ‘কবে আসবি বাবা? আগে থেকে বলে রাখিস কিন্তু তোর জন্য কাঁচা আমের মোরব্বা বানিয়ে রাখব; সারা বছর তো আর কাঁচা আম পাওয়া যায়না।’ ফরহাদ এড়িয়ে যেত, খুব চালাকের মত। এটা-সেটা বলে মা’কে ভুলিয়ে রাখত। যে ফরহাদ গবেষণার জন্য নিজে প্রজেক্ট প্রপোজাল লিখেছে আর সেই প্রজেক্টে বহুজাতিক কোম্পানি অর্থায়ন করছে, তার জন্য বোকা মায়ের কথাকে পাশ কাটিয়ে তাঁকে ভুলিয়ে রাখাতো কিছুই নয়। কতবার বলেছে, ‘এইতো মা, এই পেপারটার রিভিউ শেষ হোক, তারপর বেশ কিছুটা সময় হাতে থাকবে, তোমার কাছে যাব; তোমার হাতের আমের মোরব্বা খেয়ে আসবো।’ ফরহাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে মা দোয়া করত। যে মা জীবনে কোন রিসার্চ পেপার পড়েননি, তিনি মনেপ্রাণে দোয়া করতেন যেন ফরহাদের এই পেপারটা তাড়াতাড়ি লিখা হয়ে যায়, সে যেন ফিরতে পারে। ফরহাদেরও আমের মোরব্বা খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সেটা যখন সে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে তখন; অল্প কিছু সময়ের জন্য। সারাদিন লেকচার, মিটিং আর গবেষণার ঝামেলায় ফেলে আসা দিনের কথা ভাবার অবকাশ থাকেনা। মাঝে মধ্যে শুধু গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, খুব পানির তৃষ্ণা পায়। আর ঠিক সেই দিনগুলোতেই কেন যেন শোবার ঘরে খাবার পানি থাকেনা।গভীর রাতে অন্ধকার অ্যাপার্টমেন্টটিকে তার ফেলে আসা নিজের বাড়ি বলে মনে হয়। প্রায় চার বছর হল সে বাড়ি ছেড়েছে, তবু এখনও আলো-আধারিতে সুযোগ পেলেই তার বাড়ি ফিরে ফিরে আসে। সেই রাতে ফরহাদের আর ঘুম হয়না। বাকি রাতটুকু আধো অন্ধকারে বারান্দায় কফির মগ হাতে নিয়ে কেটে যায়। কত ছন্নছাড়া না বলা কথা মনে পড়ে! মনে পড়ে স্কুলের দপ্তরীর কথা আর তার মুখের বসন্তের দাগ। মনে পড়ে স্কুলের সামনে যে লোকটি সারাদিন আঁচার বিক্রি করত তার হাসিমুখ। সেই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অরুণিমাও বাদ পড়েনা। কেমন যেন অন্ধকারের জোনাকির মত মিটিমিটি জ্বলতে থাকে মুখগুলো। তবু দিনের আলোয় কিছুই মনে আসার অবকাশ থাকেনা; দিনের আলোয় শুধু ছুটে চলা, কখনো স্থির, কখনো অস্থির লক্ষ্যের দিকে নিরন্তর।
গতকাল সন্ধ্যায় ফোনটি এসেছিল। আপা কাঁদছিল। অনেকক্ষণ ধরে যা বলার চেষ্টা করল তা হল মা খুব অসুস্থ, ইনটেনসিভ কেয়ারে আছেন। নিথর হয়ে আসছিল ফরহাদের হাত। মনে হচ্ছিল অত দাম দিয়ে কেনা আইফোনটা বুঝি আর সে ধরে রাখতে পারবেনা। সে শুধু বলেছে ‘আমি আসছি।’ শুধু একটা ই-মেইল করেই গভীর রাতে বাড়ির পথ ধরেছে ফরহাদ, বাংলাদেশের পথে। এরপর দুটো ফোন এসেছে। একই ধরণের গোছানো কথা বলেছেন বাবা। হাতের কাছেই ফোনটি আছে। মাঝে মাঝে ভেতরটা ছিন্নভিন্ন করা একটা ইচ্ছে হচ্ছে, মনে হচ্ছে একবার ফোন করে মা’র কণ্ঠটি শুনতে, মা’কে জানাতে যে তিনি এখন কাঁচা আমের মোরব্বা তৈরি করতে পারেন, সারা বছর যে আম পাওয়া যায়না সে আম দিয়ে। কিন্তু পারছেনা ফরহাদ, স্থবির হয়ে আছে চারপাশ। কিসের যেন একটা আগ্রাসী ভয় তাড়া করে ফিরছে গতরাত থেকে। মনে হচ্ছে মা’র কণ্ঠ শুনতে চাইলে হয়ত, অনেক গুছিয়ে আড়াল করে রাখা কোন নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে হবে, আর সেটা ধারণ করার ক্ষমতা ফরহাদের নেই। নিজেকে এতটাই অসাড় মনে হচ্ছে যে প্রার্থনা করার শক্তিটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে।
বরাবরই কৌতূহলী ফরহাদ। তার অধ্যাপক যেদিন তাকে বলেছিল, ‘তোমার জন্য একটা খবর আছে, বিকেলে বলব’; প্রশ্ন করে করে ফরহাদ তাকে বাধ্য করেছিল প্রজেক্ট ফান্ডিংয়ের খবরটা তখনই বলার জন্য। সেই আজন্মের কৌতূহলী ফরহাদ আজ কোন কৌতূহলই বোধ করছেনা। ভয়ে তার হাত-পা শীতল হয়ে আসছে, এত ভয় কোথা থেকে এসেছে সে জানেনা। মাইক্রোফোনে একঘেয়ে অসুস্থ সূরে কে যেন বলে চলেছে, সারিবদ্ধভাবে প্লেনে উঠতে হবে। ফরহাদের মন টানছেনা। মনে হচ্ছে তার আর কোথাও যাওয়ার নেই। যে জার্নাল পেপারটি গত ছয়মাস ধরে রিভিউতে আটকা পড়ে আছে সেটার প্রকাশ পাওয়া অথবা না-পাওয়ায় তার আর কিছু যায় আসেনা। শুধু ক্লান্তি এসেছে অনেক। বছরের পর বছর জীবনকে জীবন থেকে দূরে রাখার ক্লান্তি। তার শুধু ইচ্ছে করছে মা’র পায়ের উপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে, যেখানে পার্থিব হিসেবময় পৃথিবী অপার্থিব হয়ে ধরা দেয়, ফেলে আসা দিন অথবা জীবন-এর মত করে।
©somewhere in net ltd.