নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফোকলা জীবন

১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৭

দিনটা শুরু হয়েছে খুব ক্লান্তি ভরে।রত্না আজ ঠিক করেছে জীবনের সব অতীত মন থেকে সরাতে না পারলেও এলবামের পাতায় যে ফটোগুলো রয়েছে সেগুলো সরিয়ে ফেলবে।স্মৃতিগুলো টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে দেবে বাস্কেটে। কিন্তু এত এলবাম,এত ছবি,এত স্মৃতি – সরাতে তো অনেক ধৈর্য্য লাগবে। মন থেকে সরানো তো যাবে না কিন্তু ছিঁড়ে ফেলার কাজটা করার ধৈর্য্য পরীক্ষা এবার দিতে হবে।
আর কত ধৈর্য্য পরীক্ষা দেবে সে? দুঃসহ অতীত বহনকরতে করতেই তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারপর আবার এলবামের ছবি। আকদের এলবাম, হলুদের এলবাম, বিয়ের এলবাম, বৌভাতের। তারপর আবার ছোট ননদ অগমণ উপলক্ষে দ্বিতীয় বৌভাতের এলবাম।জীবনটা কি তাহলে এলবাম–ময়?
শুরু তো হয়েছিল সবকিছু খুব সুন্দর করে।আর বিয়ের দিনটা ছিল বেশ অদ্ভুত ধরণের। সেদিনের আগের সপ্তাহে রত্নার বড় আপা এসেছেন বিদেশ থেকে। বহুদিন পরে।তিনিই তাকে শাড়ি পরাবেন।
বিয়ের সন্ধ্যা আসবার অনেক আগেই পার্লারে পৌঁছাল রত্না।বিউটিশিয়ান আর তার আরেক খদ্দেরের মিলিত দুর্ব্যবহার দিয়ে সেদিন বিয়ের আয়োজন শুরু।সে রত্নাকে সাজানোর কাজে হাতই দিতে চায় না। ওদিকে অনুষ্ঠানের সময় হয়ে এসেছে।বিউটিশিয়ান মহিলাটা খুব ব্যস্ততা দেখিয়ে অতঃপর যখন কাজে হাত দিল তখনই পাশে বসা এক ইঁদুরমুখো খদ্দেরনি চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সে বোধহয় রেগুলার কাস্টমার।তাই বেশ দাপুটে।কোন এক সচিবের ছেলের বউ।তার প্রিয়োরিটি বেশী।আর রেগুলার কাস্টমার বলেই পার্লারের বেটিদের কাছে তার খাতি বেশি।রেগুলারদের তো হাতে রাখতেই হবে।তাদের ব্যবসা দিয়েই না পার্লার চলে।খ্যাপ মারার জন্য তো তারাই আসে প্রতি রাতে। সাজগোজ করে কাস্টমার ধরে আর পয়সা আনে পার্লারের জন্য।
রত্নার জীবনে এই প্রথম পার্লারে আসা।রেগুলার তো দূরের কথা সারা জীবনেও পার্লার–মুখী সে নয়। আজ বৌয়ের সাজের জন্যই তার প্রথম আসা।জীবনে প্রথমবার। বিয়ের সন্ধ্যা তো জীবনে একবারই আসে।পার্লারের বিউটিশান মেয়ে –লোকটির তাচ্ছিল্য দিয়ে শুরু হলো সেই অনাকাংখিত অধ্যায়,বিয়ের সাজ –সন্ধ্যা ।
বাজে অভিজ্ঞতা ও একরাশ বিরক্তি নিয়ে রত্না সেখান হতে বাড়ি ফিরে দেখে তার বড় আপা হাজির।শাড়ি পরিয়ে দিলেন খুব যত্ন সহকারে।সবাই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাত্রা শুরু করলো।স্টেজে উঠার আগে বৌয়ের জন্য সাজানো আসনে বসলে, রত্নাকে তার ঘিরে থাকা বান্ধবীদের মাঝে একজন বলে উঠলো,‘রত্না,দেখতো,তোমার পরনের শাড়িটা উল্টা নাকি?’
রত্না বেশ অবাক হয়ে বললো,‘হতেই পারে না।বড় আপা পরিয়েছেন।উলটা হলে তার তো চোখে পড়তো।’
বড় আপা এলেন।উলটা শাড়ি দেখে চমকে উঠলেন।বললেন,‘আমিই তো পরিয়েছি শাড়ি।আমার চোখে একবারও পড়লো না কেন?’
কোন এক অজানা আশঙ্কায় রত্নার মনটা যেন কেমন করে উঠলো।বড় আপা তাকে ড্রেসিং রুমে নিয়ে তার পরিয়ে দেয়া উল্টা শাড়ি দেখে আবারো হতভম্ব হয়ে গেলেন।বললেন,‘কি আশ্চর্য!এমন হয় কিভাবে?’ তারপর শাড়ি ঠিক করে আবার পরিয়ে দিলেন।অনুষ্ঠানের সমাপ্তি পর্বে রুসমত্ আরম্ভ হলো।ওড়নার আঁচলের নীচে বসে বর আর কনের আয়নায় মুখ দেখা।এসময়ে বলা নেই কওয়া নেই কোথা থেকে বরের বাবা এসে পাশে বসে পড়লো।
সে এ সময়ে কেন এখানে? কেনএখন এখানে হাজির হয়েছে?
রুসমতের সময় শ্বশুর থাকে নাকি?
যেন কোথাও থেকে বাজ পাখির মত উড়ে এসেছে তার পুত্রকে গার্ড দিতে।
কিন্তু কেন? গার্ড দিতে হবে কেন?
পুত্র কি কথা বলতে পারে না? বোবা?
নাকি বেসামাল?
রত্নার খুব বিশ্রী লাগছে ব্যাপারটা।বিশেষ করে রুসমতের এই সময়ে।শ্বশুরের কি কোন কান্ডজ্ঞান নেই? নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে তার? সে কি ভাবছে –এই রুসমত্,তার ছেলের নয়,তার নিজেরই হচ্ছে? উৎসাহের ভীষণ ঠ্যালায় বোধবুদ্ধি হারিয়েই কি ছেলের পাশে এসে বসে পড়েছে? পারলে ওড়নার নীচে সিঁধিয়ে পড়ে।
লোকটি ধপাস্ করে এসে বসলো তো বসলো।এসময়ে লাজুক বরের সামনে আয়না ধরে রত্নার বান্ধবীরা জিজ্ঞাসা করলো,‘কি দেখছেন আয়নায়?’
তৎক্ষণাৎ বরের বাবা তার কানে কানে কিছু বলে দিল আর ছেলেটি তার কথা শুনে সাথে সাথে উত্তর দিল, ‘A sweet face of Ratna.’
বরের ইংরেজীতে উত্তর দেয়াটা স্বাভাবিক। কারণ অনেক বছর যাবৎ সে বিদেশে থাকে।কিন্তু তার উত্তর তার বাবা কেন শিখিয়ে দিচ্ছে? বাবাটাই কি বিয়ে করতে এসেছে,ছেলেকে সামনে রেখে? কি বিশ্রী,বাজে এক অনুভূতি হচ্ছে রত্নার,এই রুসমতে্র আসরে।


কনে সম্প্রদানের পরে শুরু হলো রত্নার শ্বশুর বাড়ি যাত্রা।রত্না আধুনিক কালের পালকিতে চেপে বসলো।মানে গাড়িতে উঠলো।বসলো জানালার পাশে। মাঝে তার বর আর তার পাশে বরের মা।সামনের ড্রাইভারের পাশের সিটে সেই শ্বশুর মহাশয়।রত্নার তিনগুণ বয়স তার। ৭২ বছরের এই লোকটির মধ্যবয়সে তার একমাত্র পুত্রের জন্ম।পুত্র তার ৩০ বছরের, এক অতি সাধাসিধে একটি ছেলে।বাবাটার মত সেয়ানা না। তার ৭২ বছরের বাবার হাব ভাব দেখলে মনে হবে ২৫ বছরের জোওয়ানী চলছে।রত্নাদের তেমন একটা পছন্দ ছিল না এই ছেলেকে। কিন্তু ঘটকের অসম্ভব জোরাজুরিতে রত্নার বিয়েটা এখানেই ঠিক হয়ে গেল। ঘটকী সোসাইটি গার্ল। অনেক মানুষের সাথে তার চেনা জানা।বরের সেয়ানা বাবার কাছ থেকে সেয়ানা ঘটকী অগ্রিম নিয়েছে প্রচুর। বিয়ে না হলে সব টাকা ফেরৎ দিতে হবে তো।সেই ভয়ে,ঘটকী বেশ জোর দিয়েই রিত্নাদের বলল,‘৪২ বছরের চেনাজানা এই পরিবার। নিতান্তই সহজ সরল।বিয়ে দাও এদের সাথে।’
পরে রত্না জেনেছিল ঘটকের সরাসরি কোন চেনা জানা নেই এই পরিবারের সাথে।যে মহিলাকে সে চেনে, তার চেনার চেনা ছেলেদের এই পরিবার।তবে সংখ্যাটা ঠিক আছে। ৪২ বছর।চেনার চেনা মহিলাটি সম্পর্কে ছেলের বাবার ধর্ম বোন।
সেরেছে এবার।
যেহেতু অনিচ্ছায়,অপছন্দে অপরিচিত লোকদের সাথে এই বিয়ে,তাই সবকিছু এখন রত্নার আবিষ্কারের পালা।
রত্নার পালকি অতঃপর শ্বশুর বাড়িতে পদার্পণ করলো।তাদের বাড়ি হতে গাড়িতে দশ মিনিটও না। আলোক সজ্জায় ঝলমল করছে পুরো বাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে প্রথম পদক্ষেপ মাটিতে রাখতেই রত্না অনুভব করলো তার শাড়ির সব কুঁচি কোন এক অলৌকিক শক্তির জোরে কেউ যেন হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলেছে এই পথটুকুতে।গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই সব কুঁচি তার হাতের মুঠোয় এসে পড়লো। কিন্তু কিভাবে এমন সম্ভব? সে তো হেঁটেই গাড়ি পর্যন্ত এসে গাড়িতে উঠে বসেছে।তখন তো কুঁচি ঠিকঠাক ছিল।তারপর তো মিনিট দশেক গাড়িতেই বসে থাকা।বসে থাকা অবস্থায় কুঁচি কিভাবে ভাঁজ গলিয়ে বেরিয়ে আসবে? এমনকি কেউ যদি কুঁচি ধরে টান দেয়, তা হলে তো রত্না সে টান বুঝবে।গাড়ির ভেতর সে তো ঠাঁয় বসেই ছিল।কোন অলৌকিক অশরীরী যদি এ কাজ করেও থাকে, তবুও রত্না টের পেল না?
এ যেন আরেকটা অশনি সংকেত।বার বার বাধা আসছে।কেউ যেন বলছে না আগাতে। সামনে অপেক্ষমান মৃত্যুকূপ।কিন্তু আকদ্ তো হয়েছে সেই সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে। আজ ৩রা নভেম্বরে কনে উঠানোর দিন।রুসমতে্র দিন।বাড়ির সিঁড়িতে বঁধু বরণের জন্য মানুষজন বাড়ির সামনে প্রস্তুত। অথচ বঁধু এক পাও ফেলতে পারছে না খোলা কুঁচির ভারে।বাড়ির মহিলারা জানতেও চাইলো না তার কি অসুবিধা,সে কেন শাড়ি হাতড়াচ্ছে? অত ভারী শাড়ির পাঁচখানা কুঁচি যেন পাঁচ মণ ওজন।বাড়ির মহিলাদের মাঝে ছিল ছেলের মা,মামী,দুই বোন আর আধ্ পাগলা খালাতো বোন। মহিলারা কি উজবুক নাকি? কেউ তো এগিয়ে আসছে না জানতে, ‘রত্না তোমার কি অসুবিধা?’
অবশেষে অনেক কসরৎ করে সে তার শাড়ি ঠিক করলো।কোন রকমে কুঁচি গুঁজে পেটের কাছে তা আগলে আগলে এগুলো।বরের সে সময়ে কোন হুঁশ কাজ করছিল বলে রত্নার মনে হলো না।বৌয়ের কি হয়েছে জানতে তার কোন আগ্রহ দেখা গেল না।
রত্না সামনে এগুলো।

বঁধু বরণশেষে বাসর ঘরে প্রবেশের পর অবাক হবার পালা যেন আবারো অপেক্ষা করছিল ওর জন্য।বাসর ঘর সাজানোর নামে ছাদের দেয়ালে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত পেরেক ঠুকে দড়ি দিয়ে জাল বানানো হয়েছে।দড়িতে পেঁচানো হয়েছে রজনীগন্ধা ফুলের মালা।রত্নার শ্বশুর ব্যাটা নিজের হাতে তাদের বাসর সাজিয়েছেন। তাগড়া শ্বশুর সব কাজ পারেন।রজনীগন্ধা বোধহয় তারই পছন্দ।তাই রজনীগন্ধার দড়িতে সারা ছাদ ঢাকা। দারুণ আইডিয়া বটে! তার এই কান্ড দেখে বহুদিন পর্যন্ত রত্না রজনীগন্ধা দেখলে আঁতকে উঠতো।
বরের তুতো বোন আর বাড়িতে থাকা মেজ বোন রত্নাকে বাসর ঘরে এনে বসালো।বিছানার নরম গদিতে বসতে গিয়ে রত্নার নিজের হাতের চাপে তাকে দেয়া দ্বিগুণ বড় সাইজের কাঁচের চুড়িগুলো সব চুর চুর করে ভেঙে গেল।বোন দুটোও বেশ অবাক হলো।ভাঙ্গা চুড়ি হাতে তুলে বললো,‘এ কি? চুড়ির টুকরা? কোথা থেকে এলো? ওহ্ চাপ লেগে ভেঙ্গে গেছে বোধহয়!’
রত্না কোথায় যেন শুনেছিল,চুড়ি ভাঙ্গা অশুভ লক্ষণ।বিয়ে ভাঙ্গার সমান। বিবাহের সমাপ্তি ঘটা অর্থাৎ যে বিবাহে সম্পর্ক টিকে না অথবা বিবাহিত রমণীর জীবন থেকে স্বামীর প্রস্থান ঘটে থাকে।
আর আজ ?
বাসর রাতেই হাতের চুড়ি ভেঙে যাবে?
শ্বশুর পরে খুব গর্ব করে বলেছিল,‘তোমার বিয়ের সব বাজার আমার করা।শুধু চুড়িগুলো ওদের দিয়েছি কিনতে। কিন্তু কাপড় চোপড় আমার পছন্দে কেনা। ব্রা –ও আমি কিনেছি।ওদেরকে দিলে কি সব জাবরা জুবরা কিনে আনবে।মেজ মেয়েকে বলেছি চুড়ি কিনতে।’ শ্বশুরের, তার জন্য ব্রা –কিনার কিচ্ছা শুনে রত্না অবাক হলো।আবার তার হাসিও পেল এই ভেবে চুড়িগুলো আসলেই সাইজের চেয়ে দ্বিগুণ বড় ছিল। তাই হাতের চাপে সে রাতে ভেঙে গিয়েছিল।ওরা ঠিকমতো কিনতে পারেনি। ঐ একটা আইটেম–ই এই সেয়ানা লোকটার তত্ত্বাবধানে কেনা হয়নি তাহলে।
বাসর ঘরে রত্নাকে রেখে ঘর থেকে তার বোনেরা প্রস্থান গ্রহণের সময় সারসের মত গলা উঁচু করে তুতো বোনটি বললো,দেখ,she is naturally so beautiful. She does not need any make up!
তুতো বোন ইংরেজী বলে দেখি!সেও নাকি বিদেশ থেকে পড়াশুনা করা।এ বাড়ির সবার ইংরেজী চালচলনে বুঝাই যাচ্ছে মহা হাই-ফাই এই পরিবারটি!রত্না যেহেতু বাংলা মিডিয়াম,একটু উঁচু চোখে দেখবে এদেরকে।ঘর থেকে বেরোবার সময় তুতো বোনটি তার বানরমুখো মুখটা রত্নার ঘোমটা ঢাকা মুখের কাছে এনে তার হাতে ছোট্ট একটা পারফিউমের শিশি গুঁজে দিয়ে বললো,‘আমার ভাইটিকে তোমার হাতে দিলাম।’
ওরে বাবা।
তুতো আবার ভাই হয়ে গেছে এখন।
এ বাড়িতে রত্না আসবার আগে সেই কি তার ভাইয়ের দেখভাল করতো?
করতেই পারে।কে জানে?
অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে।কিন্তু বরখানাকে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ছেলেটি গেল কোথায়? রত্না চারিদিকে তাকালো।নাহ্ কোত্থাও নেই ছেলেটি।এই খালি দোতলায় এখন সে একা। হঠাৎ আবিষ্কার করলো,বাসর ঘরের দরজার বাইরে শ্বশুর দাঁড়ানো।ঠাঁয় তাকিয়ে আছে রত্নার দিকে। দেখছে তাকে।যেন বহু সাধ করে আনা বউখানা তার ছেলের জন্য নয়,তার পছন্দের এই বউ তারই জন্য।
এই দোতলাটা তাদের দেয়া হয়েছে।একটা ঘর শুধু তাদের জন্য সাজানো হয়েছে।পাশের ঘরগুলো খাঁ খাঁ করছে।একদম খালি বাসা।তুতো বোনটি এই বাড়ির উপর তলায় এ বাড়ির মেঝ মেয়ের সাথে আজ রাতে থাকবে।মেঝ মেয়ের জামাই এ বাড়িতে ঘর জামাই।এ বাড়িতেই থাকে।তুতো বোনটি স্বামী পরিত্যক্তা।সে খালিই তো ছিল ছেলেটির জন্য।কিন্তু তাও তাদের মিলন হলো না কেন? পরিবারে বিবাহ যোগ্যা কন্যা অনেক। বিয়ের কথা কেউ পেড়েছিল। কিন্তু তুতোরা বিয়ে করলে ছেলেমেয়ে কানা খোড়া হবে,তাই তুতোদের সাথে বিয়ে শাদী দেবে না – একথা বলে দিয়েছিল ছেলেটির ধুরন্ধর বাবা।এভাবেই পরিবারের মধ্যে বিয়ে এড়িয়ে গেছে।পাছে ছেলের লাল্টুপনা ধরা পড়ে পরিবারের কাছে –সেই ভয়ও তো আছে।সাধের তুতো বোনটি তার ভাইটিকে আজ অন্য মেয়ের সাথে বাসর করতে দেখে সারা রাত কন কন করে কাটাবে,একাকী। আর ভাইটি মজা করে বাসর করবে আরেক মেয়ের সাথে।নিজের মানুষকে অন্যের হতে দেখা –এর মতো বড় কোরবানী আর কি হতে পারে?
তাই কত আহ্লাদের আব্দার তার,‘আমার ভাইটিকে তোমার হাতে দিলাম।’
অথচ রত্নার জন্য কি বিশ্রী অনুভূতি।
সারারাত মেয়েটি বুঝি ছট্ফট্ করেছে।রত্নার মনে প্রশ্ন এলো,এই তুতো বোনের সাথে তার বরের কি কাহিনী আছে? কে জানে কি আছে? তাহলে কি চালানো যাবে এই জীবন?
যাহ্! বাসর রাতে এ কি সব চিন্তা?
অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বরের আগমন ঘটলো ঘরে। তার পরনের চুরিদারের মাঝে তার ঠ্যাং দুটো যেন বেশ বাঁকা ভাবে দৃশ্যমান।হবেই বা না কেন। চুরিদার যে। মনে পড়ে গেল রত্নার, সে খেয়াল করেছে এখনকার চল্ থেকে বেশ ঢোলা ট্রাউজার পরে ছেলেটি।।হয়তো বা এতে বাঁকা ঠ্যং ঢেকে রাখা যায় সহজে।তারপর আরো কত কি যে চোখে পড়েছে দিনে দিনে।
পাগল পাগল এই ছেলেকে নিয়ে রত্নার শ্বশুর বাড়ির জীবন রত্নার জন্য এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে তখন।সেই উল্টো শাড়ি –ই কি বলে দিয়েছিল তাহলে,যে রত্নার সবকিছু উল্টো হবে? কিন্তু ততদিনে তো বহু দেরী হয়ে গেছে।এখন জীবনের এই পর্যায়ে এসে রত্না ভাবে বারবার,কেমন জানি হয়ে গেল সবকিছু।


রত্নার শাশুড়ি শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী। মানসিকও কিছুটা। শাশুড়ির জন্ম দেয়া এই ছেলেটি মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী।রত্নার স্বামী সে।জন্ম থেকে তার পা দুটো উল্টো ছিল।
জ্বীন নয় তো?
নিজের জামা কাপড় নোংরা করে ফেলতো নিজের অজান্তে।দশটা প্রশ্ন করলে একটা উত্তর দিত খুব নরম স্বরে।
বিনয়ী নাকি লাজুক?
নাকি সেও প্রতিবন্ধী?
এই বংশে তার মা ছাড়া তার নানীও এমন ছিল।তাহলে কি বংশগত ভাবে প্রতিবন্ধী? ষাঁড়ের মতন চিৎকার করে সারা পাড়া কাঁপিয়ে ছেলের মা যখন চেঁচামেচি করতো আর ধপ্,ধপ্ করে পা ফেলে মাটি কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে হাঁটতো,রত্না তখন ভয়ে কাঠ হয়ে যেত। তারপর মাস ছয়েক যেতে না যেতেই শ্বশুরের বিষ খাওয়ানোর ষড়যন্ত্রে অসুস্থ হয়ে রত্না যখন কোনরকমে প্রাণটা নিয়ে ঐ বাড়ি থেকে কেটে পড়তে পেরেছিল,তখন হাতির মতন শাশুড়ির সে কি মায়া কান্না। সকলের সাথে বিলাপ করে রত্নার জন্য মায়াকান্না দেখিয়ে একাকার।


কনে আসার পর শ্বশুরের প্রথম শর্ত ছিল মেয়ে তার বাপের বাড়ি যেতে পারবে না। তারপরের শর্ত মেয়ে তার বাপের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না।
দ্বিতীয় শর্ত ছেলের বাবার নয়।তাদের আত্মীয়রা দিয়েছে।তাদের আত্মীয়রা রত্নার বাপের সাথে যোগাযোগ –এসব পছন্দ করে না।
বাহ!
একদিন মিস্ত্রী এসেছে কাজ করতে।রত্না ডেকেছে।মিস্ত্রীকে ভাগিয়ে দিয়ে শ্বশুর মহাশয় তার রাড়ির কোনার সেই নির্জন কক্ষে রত্নাকে ডেকে নিয়ে তাকে বুঝানোর প্রকল্প শুরু করল। বললো,‘তোমাদের বাড়ি থেকে ডেকে আনা কোন লোক এখানে আসবে না।আমার লোক আসবে।আর তুমি এই বাড়িকে নিজের বাড়ি বলে ভাবতে শেখ।একটু পরপর তোমার বাপের সাথে কথা বলবে না।তার পাঠানো লোক এখানে আসবে না।’ রত্নার মনে আছে, লোকটা মুখের সামনে একটা বই ধরে যখন এই ভাষণ দিচ্ছিল,তখন তার মনোভাব,কথা বলার ভঙ্গিমা যেন সাঁড়াশির মতন পাক খেয়ে খেয়ে তার মুখ থেকে বেরুচ্ছিল।অত অল্প বয়সে সেদিন রত্নার এ ধরণের ঔদ্ধত্য ভরা কথা শুনে খুব খারাপ লেগেছিল।নিজেকে সামলাতে না পেরে কান্নার তোড়ে ছিটকে ফেলেছিল বিছানায়। অনেকক্ষণ কেঁদেছিল শ্বশুর লোকটার রূঢ় আচরণে।
সে কি তেজ তার।
কি ভাষণ।
কি স্পর্ধা।
কি ঔদ্ধত্য।
তার পরপরই শ্বশুরের কড়া আইন আবারো মনে করিয়ে দেয়া হলো।আইন জারি হলো,বাপের বাড়ি যাওয়া একদম বন্ধ।
কেন?
কারণ হিসাবে আবারো ছেলেকে দিয়ে বলে পাঠানো হলো তাদের আত্মীয়রা পছন্দ এসব করে না। অথচ তাদের আত্মীয়দের তো বৌভাতের দিন বৌকে সাহায্য করা বা গুছিয়ে দেবার জন্য বাড়ির চৌহদ্দিতে দেখা যায়নি।এখন তারা বউ আর তার বাপের বাড়ি নিয়ে এতো কনসার্ন্ড? এতো উদ্বিগ্ন?
কেন? তারা যার যার বাড়িতে বসে আদেশ দিচ্ছে,রত্নাকে কিভাবে চলতে হবে।তারা নিয়ন্ত্রণ করছে সে তার বাবার সাথে কথা বলতে পারবে কি পারবে না।
গরু নাকি পাঁঠা এই লোকগুলো?
কেন তাদের মন বড়ই উচাটন? তাদের বৌ বাপের বাড়ি যেয়ে কি না কি ফাঁস করে বসে সেটাই কি কারণ?
তাদের অলরাউন্ডার ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরের এত ভয় কেন?
প্রতিবন্ধী বলে?
নিশ্চয়ই সে ঠিক ঠিক জানে তার ছেলে প্রতিবন্ধী, যাকে সে প্রতারণা করে গছিয়েছে।।
নাহলে সে বার বার তার ছেলেকে কেন জিজ্ঞাসা করে,‘তুমি তোমার বউয়ের সাথে রাতে কি কর? বল আমাকে।আমি কিন্তু তোমার ফ্রেন্ড।আমি ফ্রেন্ড না?’
সরল মনের ছেলেটি এসে তার বাবার সাথে বলা সকল কথা রত্নাকে জানাতো।বলতো,‘আমার বাবা আমার বন্ধু।যেমন তোমার মা তোমার বন্ধু।জানো,বাবা না জানতে চেয়েছে,আমাদের কবে বাচ্চা হবে?’
আরেকদিন এসে ছেলেটি রত্নাকে বললো,‘তোমার কি মাসিক বন্ধ হয়েছে?’
রত্না বললো,‘মাসিক কি?’
সরল সহজ মনে ছেলেটি উত্তর দিতে গিয়ে আমতা আমতা করে আটকে গেল।উশখুশ করে বলে ফেলল,‘কাল বলব।’
তারপর কাল এলো।
ছেলেটি বলল রত্নাকে,‘‘বাবা আমাকে বলেছে,‘তোমার সব কাজিনদেরকে তাদের স্বামীরা প্রেগনেন্ট বানিয়ে ফেলল,আর তুমি তোমার বউকে বানাতে পারলে না?’’
তারপর আবার আব্দারের সুরে রত্নাকে সে জিজ্ঞেস করে,‘আচ্ছা,বল না,আমাদের কবে বাচ্চা হবে?’’
রত্নাকে এর আগেই শ্বশুর বলে দিয়েছেন তাদের হানিমুনটা তিনি–ই করিয়ে দেবেন।হানিমুনে কোন এক নির্জন দ্বীপে ঘুরতে যাবে তারা তিনজন।ছেলে থাকবে সাথে কিন্তু সে নিজেও যাবে তাদের সাথে ঘুরতে। বাবা,ছেলে আর বউ।তার যুক্তি,‘ছেলে আমার সহজ সরল।সে তোমাকে দেখেশুনে রাখতে পারবে না।আমিই তোমাদের হানিমুনে নিয়ে যাবো।’ মানে যে করেই হোক সে ও থাকবে ওদের সাথে।
কি সুন্দর যুক্তি।
তা ছাড়া ছেলে আসলেই তো অত শত বুঝে সুঝে না।ডাকাত আক্রমণ করলে সেটা তো ভয়েরই ব্যাপার।তাই তিনি নিজেই সে –ই কাজটা করে দেবে।এই সুযোগে হানিমুনে যেয়ে একটা বাচ্চা পেটে আনিয়ে দিতে পারলে তো কথাই নেই। মেয়ে মানুষ এসব কথা বলে নাকি? একদম চেপে যাবে। উলটা মেয়ে তখন তার হাতের মুঠোয় হবে।তার কথায় তখন সব হবে।
বিকৃত রুচির শ্বশুর,গবেট প্রকৃতির ছেলে আর উদ্ধত বেকুব শাশুড়ির গগণ বিদারী চিৎকার চেঁচামিচি,ধমক গালি গালাজের তোড় আর রত্নাকে এক নাগাড়ে দোষারোপ করে যাওয়া দেখে,সে একদিন মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছিল।
‘তোমার বাপ,তোমার বাপ’ করে শ্বশুর মহাশয় একদিন দুপুরে রত্নার ওপর হামলে পড়েছে যখন, রত্না সেদিন আগাতে দেয়নি তাকে।থামিয়ে দিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জবাবে বলেছিল,‘বাপ না। বলেন আব্বা।আব্বা।’
শ্বশুর মহাশয় থতমত খেয়ে বেসামাল। একটু সময় নিল ধাতস্থ হতে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, তোমার আব্বা…।
রত্না থামিয়ে দিয়ে বললো,‘আর একটা কথা হবে না।’

তৎখনাত রত্নার শাশুড়ি তেড়ে মেরে রত্নার দিকে এগিয়ে এসে বললো,‘সারাদিন কি কাজটা কর? নীচের তলায় দরজা বন্ধ করে তো বসে থাক।’
রত্নার উত্তর,‘ঘর পরিষ্কারের কাজ কে করে? কাপড় কে ধোয়? কাজ করতে করতে হাড় মাংস খুলে পড়ছে,তারপর কত বড় সাহস এভাবে কথা বলার?এতো সাহস হয় কিভাবে এসব বলার?’
- আস্তে কথা বল।
- আস্তে আবার কি? সুরেলা গলায়। গান গাইবো এখন?
তাড়া দিয়ে রত্নাকে নিচে নামিয়ে এনেছে দুজন। নিয়ে যাবে ধরে, রত্নার বাবার কাছে। নালিশ দেবে তাদের কাছে নিয়ে গিয়ে।এতে রত্না একদম সোজা হয়ে যাবে।
পিশাচ কাকে বলে তা তো রত্নার অনভিজ্ঞ জীবন কখনো মোকাবেলা করে নাই। দুনিয়াদারী না দেখা,সেই ২৪ বছরের ঐ মেয়েটি তার শ্বশুর বাড়িতে একদম একা হয়েও তার তিনগুন বয়সে বড় সেই ৭২ বছরের শ্বশুরের সামনে সাহস ভরে নিজে যে দাঁড়াতে পেরেছিল এই তো যথেষ্ট।
কিন্তু শ্বশুর একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে।
নীচে নেমে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ পাতাল একাকার করে চিৎকার করে করে শ্বশুর বললো, ‘এখনি চলো।চল আমার সাথে। তোমাদের বাসায় চল।’ অতঃপর রত্নাকে ঘাড়ে ধরে নালিশ দেবার জন্য নিয়ে এলো রত্নার বাবার কাছে।রত্নার বাবার সাথে তাদের মেয়ের প্রতি শ্বশুর বাড়ির ঔদ্ধত্য আর ধৃষ্টতা সেদিনই এই সম্পর্কের ইতি টেনে দিয়েছিল। ঐ বাড়ির জন্তুগুলোর ঝগড়ার পর একটা টিউনিং হয় দুজনেরই। শ্বশুর তারপর কিছুদিন চুপচাপ থাকে।শাশুড়িও বেশ ঠান্ডা থাকে।
সেদিন নালিশ নিয়ে শালিশ করে শ্বশুর ফেরৎ গেলে, রত্না সেই রাতে ফেরৎ এসেছিল তার ভোলাভালা স্বামীটির সাথে। ছেলেকে তার বাবা বুঝিয়েছিল,‘আজ সকালে একটা misunderstanding হয়ে গেছে।’ ভুল বোঝাবুঝি।
নম্র,ভদ্র,সরল সোজা ছেলে আর কি বলবে তার বাবার কথার ওপর। শুধু বললো,‘ঠিক আছে।ঠিক আছে।আমি আর শুনতে চাই না।’
কিন্তু শ্বশুরের চাল আর কুটবুদ্ধি থেমে থাকে না। হাত তার নিশপিশ করছে। জিহবা হিস্ হিস্ করছে।১৯৭১ –এ এত মানুষ মেরেছে এই লোকটি, আর এই পুঁচকে মেয়েটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে?
কক্ষনো না। বুদ্ধি এঁটে ফেলেছে এবার। কাজের ছেলের সাথে বুদ্ধি এঁটেছে।সেদিন রাতে তৈরী হলো রত্নার জন্য স্পেশাল রান্না।কেউ খেল না।শুধু রত্নার জন্যই সে রান্না।আর তারপরের দিন থেকেই শুরু হলো রত্নার তীব্র অ্যালার্জি।সারা শরীরে ছোট ছোট লালচে দানা উঠেছে।ধীরে ধীরে কিছু দিনের মধ্যেই রত্নার হাতের তালুর চামড়া আলাদা হয়ে পড়ল। এই অবস্থা ছড়িয়ে পড়লো আপাদমস্তক। চুলের গোড়া থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত লালচে দানা।এখন তো সে কাপড় কাচতে পারে না। ঘরের কাজ করতে পারে না।হাত দিয়ে খেতে পারে না।চামচও ধরতে পারতে না।অসুস্থ হয়ে ফিরে এলো তার বাবার বাড়ি।‘বাপের বাড়ি।’
ফিরে এলো নাকি ভাগ্য যথাস্থানে ফেরৎ পাঠালো ঠিক তার জন্মদিনের দিনে,কে জানে!রত্নার বাবার বন্ধু একজন চিকিৎসক।তিনি হাতের তালু দেখে বললেন,‘মনে হচ্ছে আর্সেনিক পয়েজনিং।কেস– স্টাডি করার মতন।’
শুনে রত্নার বাবা রত্নাকে বললেন,‘আর ঐ বাড়িতে নয়।’ হয়তোবা তিনি টের পেয়েছিলেন যে এবার গেলে তারা রত্নাকে শেষ করে দেবে চিরকালের মত।


সব কিছু আজ ছবির মতন মনে পড়ছে।আবছা আবছা।সেই এক দশক আগের কথা।
রত্না এখনো বেঁচে আছে।স্মৃতিগুলো ঝাপসা কিন্তু ছবিগুলো স্পষ্ট।
আজ রত্না ছবিগুলো দেখে দেখে একটা একটা করে কেটে ফেলছে।কাঁচি দিয়ে কচ কচ করে কাগজ কাটা,নাকি জীবনের একটা অংশকে কেটে ফেলা?
জীবন চিত্রগুলো এলবাম থেকে সরিয়ে ফেলার এই কাজ যেন জীবনের কিছু সময়কে জীবন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা।কাজটা কি খুব সহজ? স্মৃতি তো মনের ভেতর থেকে যায়।
সারা সন্ধ্যা জুড়ে কাঁচি চালিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।শত শত ছবি।লক্ষ লক্ষ টুকরো।টুকরোগুলো তুলে পাশের ঝুড়িতে ফেলতে গিয়ে একটা টুকরো ছিটকে ঝুড়ির বাইরে পড়ে গেল।রত্না হাতে তুলে নিল টুকরোটি ফেলে দেবার জন্য।এতো ছোট করে কাগজ কেটেও যেন কিভাবে এ ছবিতে কারোর মুখটা বাদ পড়ে গেছে কাঁচির ফাঁক গলে। খেয়াল করে দেখল মুখটা একদম অক্ষত।শাশুড়ির মুখ।মনে হয় সে যেন রত্নারর হাতে ধরা কাঁচির ঘচাং–এ কাটা পড়তে চায় না।
রত্নার প্রতি তার উদ্ধত,রূঢ় আচরণ এখন কি শাশুড়ির মনে পড়ে? রত্না জানে না।
তাকে কিঞ্চিৎ নসিহত করবার জন্য একবার তিনি তার বড় মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন।কথার ছলে যদি ননাস খানা একটু টাইট দিতে পারে রত্নাকে।কিন্তু টাইট দিতে এসে রত্নার কাছ থেকে একগাদা কথা শুনেই তার মোটা মাথা এক্কেবারে ওলোট পালোট হয়ে গেল।রত্না তার ননাসটিকে তার মায়ের প্রতি তার বাবার বিশ্রী ব্যবহারের উদাহরণ টেনে বলেছিল,‘‘আপনার মা তো একজন ভদ্রলোকের কন্যা।জীবনের এই পর্যায়ে তার ৬৪ বছর বয়সে তাকে আপনার বাবা যে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে সেটা কি ভাল দেখায়? আপনার প্রবাসী মামাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তার সামনে আপনার মা কে যখন বলে,‘গন্ডমূর্খ, অশিক্ষিত,বোকা মেয়েলোক,না বুঝে রবীন্দ্রনাথ,না বুঝে নজরুল।করলা দিয়ে ডাল পাকায়।মাটি কাঁপিয়ে থপ্ থপ্ করে হাঁটে,’– এসব কথা আপনার নিরুত্তাপ হাবাগোবা মামাটা গিলে হজম করে ফেলে ঠিকই,কিন্তু তার সামনে বলা কি মানায়? আপনার মামা প্রতিবাদ করে না কারণ সে জানে তার বোনের এখানেই থাকতে হবে। তার বোনের যাবার কোন জায়গা নেই। আপনার মায়ের যাবার কোন জায়গা নেই।’’
ননাস সব শুনে ভেবে সারা।টাইট আর দেবে কি? উল্টো নিজের মায়ের অসম্মানের কথা জেনে চুপ হয়ে যায়। তার মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে রত্নার সব কথা বয়ান করে।সেদিন রত্নার শাশুড়ি জেনেছিল তার অধিকার নিয়ে তার কোন সন্তানেরা একবারও কথা বলেনি,কিন্তু পরের বাড়ির সেই মেয়েটি বলেছে।এই সংসারে প্রতিনিয়ত তাকে লাঞ্ছিত করা যে একটা অন্যায়,তার সম্মান,তার পিতা মাতার সম্মান যে এই সংসারে নেই সেই কথা এই মেয়েটি বলে ফেলেছে। বারবার ভাবে রত্নার সেই কথাগুলো।গভীর ভাবে তার মনে দাগ কাটে রত্নার কথাগুলো –‘আপনাদের মা তো কোন এক পরিবার থেকে এসেছে।তিনি কোন এক পরিবারের সন্তান।তার বাবা মা আছে।তার সাথে এই বয়সে এ কেমন ব্যবহার?
মহিলা তার স্বামীর ঘরে তিনটি কন্যা ছাড়াও বহু কষ্টে সৃষ্টে একটি প্রতিবন্ধী পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে।সেসময় লোকের মুখে এ –ও প্রচলিত ছিল যে,মহিলার স্বামী,যখন পুত্রসন্তান লাভের আশায় তার স্ত্রীর ওপর চড়ে বসেছিল,সেই রাতে মট্মট্ করে তার স্ত্রীর ঠ্যাং দুটো ভেঙ্গে গিয়েছিল।সে যাত্রায় নিশানা ব্যর্থ হওয়াতে যে মৃত সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছিল তা পুত্র না কন্যা তা তারা বুঝতে পারেনি।রত্নার প্রতিবন্ধী স্বামী প্রবরেরই কথা। খুব আফসোস করে ছেলেটি একদিন রত্নাকে এও বলছিল যে,সে জানে না তার আরেকটি ভাই ছিল নাকি আরো একটি বোন ছিল।কিন্তু তার একটা ভাই বা বোন ভূমিষ্ঠ তো হয়েছিল।বাঁচেনি কিন্তু সেই অজানা সহোদরের জন্য আফসোস সব সময় কাজ করতো ছেলেটির।
রত্নার শ্বশুর মহাশয় পুত্র সন্তানের জন্য চেষ্টা করেও সফল হচ্ছিল না কেন? তাদের চার সন্তানের আগেও কোন পুত্র সন্তান বাঁচে নি। স্ত্রীর হাড়গোড় মটমটিয়ে ভেঙে একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে গেছে লোকটি।কিন্তু পুত্র সন্তান এলেই সন্তান বাঁচে না।অনেক বয়সে তারা থিতু হয়েছে তাদের এই প্রতিবন্ধী পুত্রটিকে পেয়ে।জন্মের সময় উল্টো পা নিয়ে জন্মেছিল এই পুত্রটি।প্রতিবন্ধী হলেও এই দফায় সন্তানটি বেঁচে গেছে।মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তানটি মৃগী রোগের স্বীকার।রাতে ভুত দেখে চিৎকার করে রত্নাকে গলা টিপে মারতে উদ্যত হয় কোন এক মানসিক অসুস্থতার কারনে। স্নায়ুগত ত্রুটি তো আছেই।
তা তে কি? জীবিত পুত্র সন্তান লাভ করেছে তারা।এই তো যথেষ্ট। একে ঘিরে বাবা মায়ের হাজারো বানানো কথার ফুলঝুরি।রত্নাদের কাছে ভয়ংকর মিথ্যার আড়ালে ছেলেকে নিঁখুত ভাবে উপস্থাপন করাটাই তো স্বাভাবিক।এই বিয়ের মাধ্যমে একটা সেবিকা পেয়েছে তারা, যার নাম রত্না।পিশাচরূপী এই মানুষগুলো রত্নাকে এবার চিবিয়ে খাবার প্রত্যাশী। এই অভ্যাস রপ্ত করেছিল স্বাধীনতার সময় থেকে। ছেলেটির বাবা তখন হাজারো মানুষ মেরে তাদের রক্তে হোলি উৎসব খেলতো। সুযোগ বুঝে জীবিতদের চিবিয়ে খেত।মানুষ মারার নেশা তো তার আর যায়নি।রয়ে গেছে ভেতরে ভেতরে।মানুষ দেখলেই একটা বিভৎস ইচ্ছা জাগে।ভেতর থেকে একটা টান ওঠে।
লোকটির স্ত্রী তার দাম্পত্য সময় অতিবাহিত করাকালীন সন্তান উৎপাদনের এজেন্ডায় ছয়বারের মাঝে চারবার সফল হয়েছে। জিনগত ত্রুটি কমবেশী সব জীবিত সন্তানদের মাঝেই আছে।তাদের পরবর্তী প্রজন্মেও তা প্রবাহিত হয়েছে।
তা তে কি। জন্ম দিয়ে যাবে।খুঁত ঢাকতে মিথ্যে তো আরোও তো বানানো যাবে।
ছেলে পাগল হয়ে জন্মেছে তো কি হয়েছে? এটা কোন অসুখ নাকি? বেছে বেছে রত্নার মত এমন কত মেয়ে আনবে,যে তাদের প্রতিবন্ধী পুত্রের দেখভাল করবে। সব দায়িত্ব নিতে পারবে।বিয়ের পরের সপ্তাহে তাই রত্নার শ্বশুর হাসি মুখে বলেছিল,‘এবার তোমাকে বাচ্চা পালতে হবে।’
বহু বাছাইয়ের পর রত্নাকে পছন্দ করতে এক মিনিটও সময় লাগেনি তাদের।বাসর ঘরের সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে শ্বশুর মশাইরত্নার দিকে চেয়ে ভেবেছিল,বৌ ছেলের জন্য আনলেও, সেও চেখে দেখবে সুযোগ বুঝে গিলে খাবে।তারপর সুবিধা মতন ধরে একদিন পেট বানিয়ে দিতে পারলে একেবারেই মুখ খুলতে পারবে না। বংশের ঔরস সেই-ই এনে দেবে এ যাত্রায়।ছেলেকে দিয়ে তো কিছুই হবে না।
আফসোস।
৭২ বছরে তার জাওয়ানি তো একটুও কমে নি।সে নিজেই সব কাজ সেরে দেবে।


এখন রত্নার স্মৃতির আস্তরণে অনেক ধূলো জমেছে।কিন্তু টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা কাগজগুলোর মাঝে যখন রত্না দেখল,তার শাশুড়ির অক্ষত মুখটা,সে ভাবলো এই মহিলা যখন টুকরো কাগজের মাঝে নিজেকে অক্ষত রাখতে পেরেছে,সে বোধহয় জানাতে চাইছে, সে নিজেও তার স্বামীর এক বিকৃত শিকার।রত্নার সাথে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেও তার ফোকলা জীবন নিয়ে সে রত্নার কাছে ধরা পড়ে গেছে।নগ্ন ভাবে উন্মোচিত হয়েছে।দোর্দন্ড প্রতাপে,ক্রোধে ফেটে পড়তে গিয়ে নিজের অসহায়ত্বে লজ্জিত বোধ করেছে। রত্নাকে নিয়ে এই মহিলা যতই বানোয়াট অভিযোগ তুলুক না কেন,সে নিজে জানে রত্নার কাছে তার মুখ দেখাবার কোন পথ খোলা নেই।তাই টুকরো করা, কাটা ছবিগুলোর ফাঁক দিয়ে তার মুখটা দেখাবার আপ্রাণ চেষ্টা।জানাবার চেষ্টা –ফোকলা জীবনই তার সম্বল।

০৮/০৭/২০২৬

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.