নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

বম রাজার পুত্র

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫৮

কোন এক মধু পূর্ণিমার দিনে বম রাজার ঘরে তার প্রথম পুত্র সন্তানের আবির্ভাব ঘটে। বহু আকাংখিত পুত্রটির নামকরণ করা হয় পূর্ণ। পূর্ণিমার দিনে জন্ম বিধায় পূর্ণিমা থেকে পূর্ণ। ভাল নাম পূর্ণ বম। একমাত্র সন্তান বলে তার আবদার পূরণের কোন কমতি ছিল না। আদরে আহ্লাদের পূর্ণ বড় হতে থাকলো। পারলে আকাশ ফুঁড়ে স্বর্গও এনে দেবেন রাজা বাহাদুর তার পুত্রের হাতে। কিশোর বয়সে পদার্পণের সাথে সাথে গানের প্রতি তার ঝোঁক বাড়তে থাকলো। সাথে যুক্ত হলো তাকে দেয়া ইশ্বর প্রদত্ত ভরাট কন্ঠস্বর। এর মাঝেই সংগীতে তার দিন দিন দক্ষতা বেড়েই চলছে। যৌবনে পদার্পণ করার সাথে সাথেই গোত্রের রীতি অনুসারে পূর্ণের বিবাহ সম্পন্ন হলো।
আধুনিক শিক্ষা দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেটি দেশের নামকরা ব্যান্ডগ্রুপে নিজেকে সসম্মানে যুক্ত করতে সক্ষম হলো। এক পর্যায়ে সে গ্রুপে কন্ঠ দিতে শুরু করলো। আর এটাই ছিল তার জীবনের ঘুরে দাঁড়াবার প্রথম মোড় বা যাকে বলে টার্নিং পয়েন্ট। তার সংগীত ক্যারিয়ারের শিখর চূড়ায় আরোহনের সিঁড়ি তার ব্যান্ড গ্রুপ। সুরেলা ভরাট কন্ঠ আর হৃদয় ছোঁয়ানো সুরের কাজ এক নিমেষে সকল শ্রোতাদের মন জয় করে নিল। শুরু হলো সেলিব্রিটি জীবনে ভক্তদের আগমন। ভক্তদের ভালবাসায় একাকার এই ছোট্ট জীবনে এরপর মধুকরীদেরও অনুপ্রবেশ ঘটলো। আর তখন দেখা হলো শ্রাবনীর সাথে। শ্রাবণীর কামনায় ভরা দৃষ্টিতে পূর্ণ যেন হারিয়ে গেল কোন একসময়ে।
শ্রাবণী তাকে এক সময়ে তার রাজ্য ত্যাগে বাধ্য করল। গান বাজনা উচ্ছন্নে গেল। স্ত্রী পুত্র পরিবারের মায়া মন থেকে উধাও হয়ে গেল। শ্রাবণীর মোহে অন্ধ হয়ে পূর্ণ তার পরিবার, গোত্র, সমাজ অস্বীকার করে গৃহত্যাগ করলো। রাতের এক অন্ধকারে বিজাতীয় মেয়ে শ্রাবন্তীকে নিয়ে পূর্ণ বম দেশান্তরী হলো।

১
শ্রাবণীর সংস্পর্শে পূর্ণ অনুভব করলো প্রেম কাকে বলে। নতুন করে চিনলো নিজেকে। অপার আনন্দে গা ভাসালো। একই সাথে পিছনে ফেলে আসা ঘর সংসার, পরিবার যে নিমেষে ধ্বংস হয়ে গেছে সে খেয়াল থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্যুত হয়ে নতুন জীবনকে আলিঙ্গন করলো।
এভাবেই সব কিছুই ভালো কাটছিল তাদের। শ্রাবণীর বাঁকা গালের হাসি, কামাতুর চাহনীতে পূর্ণ হারিয়ে গেছে নাকি শেষ হয়ে গেছে, সে নিজেই জানে না। কিন্তু জানে যে তার আর কিছুই চাইবার নেই। সে এখন পরিপূর্ণ। তাই কোন এক মধু পূর্ণিমার দিনে শ্রাবণীকে বিয়ে করবার সিদ্ধান্ত নিল।
বিজাতীয় হয়েছে তো কি হয়েছে?
প্রেমের কোন জাতপাত আছে না কি?
কিন্তু বিয়ে করলে প্রেমিকা যে আর প্রেমিকা থাকে না তা কি পূর্ণ জানে?
কিভাবে জানবে? প্রেমে তো এর আগে সে পড়ে নি। সমাজের জন্য কর্তব্য মনে করে স্ত্রী গ্রহন করেছিল পূর্বে। কিন্তু সেই মিলনে তো প্রেম ছিল না। এবার প্রেম এসেছে জীবনে। প্রেমিকা কে আরো স্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ করবার জন্য তাকে স্ত্রী-র মর্যাদা দেবে। শ্রাবণী প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে সংসার নামক যাঁতাকলের যাঁতায় এবার দায়িত্বের বেড়াজালে আটকাবে। পিতা, পিতামহদের রাজকীয় ঠাঁট বাটের মাঝে পূর্ণ-র তেমন কোন দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু এই বিদেশে তার চলবে কি ভাবে? যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। এতে প্রেমে থিতু আসেনি। যদিও প্রেমিকা এখন তার স্ত্রী। সংসারের চাহিদা অনুসারে স্ত্রীরও সন্তান লাভের আকাঙ্খা কম নয়। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হচ্ছে না। বহু চেষ্টা করেও সন্তানের মুখ দেখা হলো না। দিন দিন শ্রাবণীর হতাশা বেড়ে চললো।
শুরু হলো টুকটাক মনোমালিন্য। ছোটখাটো ভাল না লাগা। কথা কাটাকাটি। এক পর্যায়ে অনিচ্ছা আর ভীষণ রকমের বিরক্তবোধ। তাদের আর ইচ্ছেও করে না পরস্পরের মুখ দেখতে। তাহলে সব কিছু তুচ্ছ করে ফেলে আসা কোন এক কালের কোন এক প্রেম কোথায় গেল? রাজবংশের উত্তরাধিকার অস্বীকার করা, সংগীত থেকে বিরত রাখা –এ সবকিছু তো শ্রাবণীর জন্যই। তাহলে পূর্ণ কি পেল জীবনে –এই প্রশ্ন আসে কেন বারবার তার মনে? পূর্ণ-র সব কিছু কি অপূর্ণতায় পর্যবাসিত হয়ে গেল?
শ্রাবণীর শরীরের বাঁকগুলো আর জায়গামতো থাকছে না। কামনা উদ্রেককারী ভাব ভংগীমাগুলো নিমেষেই হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। সবাই বলে মানসিক আবসাদ থেকে এরকম হয়ে গেছে। সাপের আঁকা বাঁকা বাঁকগুলো নষ্ট হয়ে শরীরটা একটা বেঢপ বেজীর আকার ধারণ করেছে।
এতদিন পার করে পূর্ণ কি তাহলে সব হারালো? না আছে শ্রাবণীর সেই মন, না আছে তার কামাতুর শরীরটা। কোথায় যাবে পূর্ণ? কি করবে সে? এই দশমণের বস্তার ভার আর যে সইতে পারছে না সে। তবুও যে, সে সব কিছু সহ্য করে চলছে। কারণ ও এখন বেঢপ আকারের হলেও সে –ই তো তারই মনের নায়িকা। কিন্তু সংবেদনশীলতা কি আছে?
পূর্ণ বমের পাগল হবার দশা।
মনে পড়ে, প্রথম দিকে তার ভক্ত থাকাকালীন শ্রাবণী মডেলিং করতো। টুকটাক দু’একটা নাটকেও কাজ করেছে। শ্রাবণী যখন পর্দায় আসতো দর্শকরা তার কামনায় ভরা চোখের চাহনী আর বাঁকা হাসির জন্য হন্যে হয়ে অপেক্ষা করতো। অভিনয় প্রতিভা আছে, কি নাই তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না। সবাই বলতো শ্রাবনীর বাঁকা গালের হাসি অনন্য । এ হাসি আর কারো নেই। সে যেন সাক্ষাত অপ্সরা। দেশের সব মডেলদের ছাড়িয়ে তার হাসিটুকু যে মদিরা সৃষ্টি করতে পারে তা আর কারো মাঝে নেই।
পূর্ণ –ও তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। আর এই শীর্ষে থাকা দুই তারকার মিলনের নির্দেশ যেন কোন এক মহাজাগতিক নির্দেশে, স্বর্গ থেকেই আদিষ্ট হলো। তাই হয়তো বা তাদের দুজনের সম্মিলিত পথচলা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল দু’জনের অদৃষ্টের সম্মিলিত অধ্যায়।

২

আজ দু’দশক হয়ে গেছে শ্রাবণীকে ছেড়ে চলে এসেছে পূর্ণ তার পুরোনো সংসারে। শ্রাবণী নতুন করে জীবন শুরু করেছে। সংসারে মনোযোগ দিয়েছে। সে তার নতুন জীবনে দু’সন্তানের জননী। পূর্ণ তাকে পূর্ণতা দিয়ে তার মাতৃত্বের সাধ মিটাতে পারে নি। পূর্ণ –র নিজের ঘরে তো সন্তান ছিল। বাচ্চাটি এখন বেশ বড়। বাবার সাথে তার দূরত্ব তৈরী হয়েছে। তারপরও তো তারই সন্তান। কিন্তু শ্রাবণীর সাথে সংসারটা কোন ভাবেই হলো না। তারা যতই চেষ্টা করে মন থেকে তাদের এই ব্যর্থ সম্পর্কের সময়টুকু মুছে ফেলতে, পারেনা।

পূর্ণ ঘরে ফিরে নতুন করে চেষ্টা করেছে জীবনকে গুছিয়ে নিতে। নর্থ আমেরিকার যতগুলো বড় বড় শহর আছে সব জায়গায় তাদের কনসার্ট করবার ট্যুর শুরু হয়েছে। চির চেনা সেই দুই দশক আগে হারিয়ে যাওয়া তার দরদী গলার সুর –মূর্ছনা এবার পৌঁছাবে প্রবাসীদের কাছে।
আজ থেকে টানা তিন মাস নর্থ আমেরিকায় ট্যুর শুরু। এয়ারপোর্টের ভেতর ভক্তরা যখনি পাচ্ছে তাকে ঘিরে ধরছে। যাত্রীরা তাকে দেখে মহাখুশী। কেউ কেউ প্লেনের ভেতরে ঘিরে ধরে সেলফি তুলছে।পোশাক আশাকে তার কোন চাকচিক্য নেই। মলিন, রঙচটা ঢোলা একটা ট্রাউজার পরনে। গোল গলার রঙচটা, মলিন একটা মেরুন টি –শার্ট। পায়ে একটা ঢিলা ফিতার পুরানা স্যান্ডেল। প্রৌঢ় অবস্থায় চুলহীন মাথা ঢেকেছে পরচুলা দিয়ে। একদম বুঝা যায় না, কারণ ওদের জাতির চুল সব সময় নাইলনের মতন সুন্দর। লাল, বাদামী রঙের লম্বা চুলের পরচুলা। বেশ মানিয়েছে। প্লেনের ভেতর সিটে বসতে বসতে শুরু হল তার দলবলের হৈ চৈ। কত প্রাণোচ্ছ্বল দলের সকল সদস্য। সেলিব্রেটি বলে স্টুয়ার্ডরা, এয়ার হোস্টেসরা আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফার্স্ট ক্লাশ থেকে স্যুপ, কাটা লেবুর সালাদ, শরবত এনে দিচ্ছে। পূর্ণ দলের সবার সাথে তা ভাগ করে খাচ্ছে আর গল্পে মত্ত হয়ে আছে। দলের বড় ভাই সে। সবাইকে আগলে রাখাই তার কাজ। একবার বেশ উঁচু স্বরে বলে ফেললো একজন এয়ার হোস্টেসকে, ‘ ভাতের সাথে কি কাঁচা মরিচ পাওয়া যাবে?’ আমরা সবাই জানি দেশের খাবার বিদেশে যে স্বপ্নের মতন। আরো কত কথা তার। পুরোনো অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে দেখলো এবার যাত্রার সময়। তার জীবনে আজকের ফ্লাইট সবচেয়ে দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। তাও তারা সবাই খুশী। কারণ একটাই। বহু দিনের প্রতীক্ষিত ঢাকা – নর্থ আমেরিকা সরাসরি ফ্লাইট অবশেষে চালু হয়েছে।
কি ফুরফুরে, লিডারশিপে পূর্ণ তার ব্যক্তিত্ব! সবদিক দিয়ে একজন তারকা সে।
কিন্তু চোখে মুখে তারপরও ধরা পড়ে ক্ষয়ে যাওয়া হৃদয়ের বিরামহীন রক্ত ক্ষরণ। শ্রাবণীর ঝড় জীবনকে ওলোট পালোট করে না দিলে জীবন তো তার গতিতে চলেই যাচ্ছিল। সেবার কলেজ শেষ করতে করতে ঢাকায় এসেছিল গান গাইতে। দেখা হয়েছিল এক সাক্ষাত স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরীর সাথে। এক দেখায় বলে বসেছিল, ‘আমায় বিয়ে করবে?’ সেই সময় আজকের মতন তার মনে তো কোন ক্ষরণ ছিল না। নিখাঁদ একটা মন শুধু স্বপ্ন দিয়ে ভরা ছিল।
আর আজ? সবকিছু ভেঙ্গে চুরে চুরমার।
জীবন কি শুধু কষ্টই দেয়? ষাট বছর তো কিছুই না। অথচ যাত্রীদের সাথে বসে হাসতে হাসতে পূর্ণ বলছিল, ‘আরো যেন বিশ বছর বেশী বাঁচতে পারি।’

৩
এই প্রথম টানা ২১ ঘন্টা জার্নি করে শ্রাবণীর শহরে এসে পূর্ণ যখন নামলো তার ভেতরটা কন্ কন্ করে উঠল। ভেতরে যতই পুড়ুক, দলের ছেলেদের সবসময় সে একটা কথা বলে –আনন্দ আর হৈ চৈ করাই জীবন।
যার ভরাট কন্ঠ শুনে শ্রাবণী পাগল হয়েছিল, সেই শ্রাবণী আজ ভীষণ ঠান্ডা। পূর্ণ-র সাথে সময়গুলো মনের মাঝে এলে সে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। অথচ তখন তার মোহের জাল ফেলে দলছাড়া করেছিল, সমাজ ছাড়া করেছিল বম রাজার পুত্র পূর্ণ বম-কে। শ্রাবণীর যাঁতাকলে সেই তখন থেকেই পূর্ণ ভাঙতে শুরু করেছে। অল্প সময়ে মুখে বলি রেখার আঁচড় ভেসে উঠেছে। আঁচড়গুলোকে কোন মেইক –আপ ঢাকতে পারেনি। তার ভক্তকুল এখনো জানে না, তাদের প্রিয় গায়কের মুখের ঐ আঁচড়গুলো শ্রাবণীর আঙ্গুলের বিষাক্ত স্পর্শে হয়েছিল নাকি অসময়ের বয়সের ভারে হয়েছিল। পূর্ণকে দেখলে সবার মনে এখনো এই একটা প্রশ্নই জাগে।

এখন পূর্ণ কেমন আছে?

শ্রাবণীর অভাবে পূর্ণ ভীষণ ভাবে নিঃস্ব। সবসময় এলোমেলো, পাগল পাগল একটা ভাব তার। তার অনুজ্জ্বল ক্ষয়িষ্ণু ত্বকের আবরণে ঢেকে যাওয়া রিক্ত শুষ্ক মুখটা দেখলে শুধু একটি কথাই মনে আসে আর তা হলো তার হৃদয় জুড়ে ছেয়ে থাকা একটা নাম – শ্রাবণী। নামটি তার মাঝে এতো স্পষ্ট ভাবে গেঁথে আছে যেন, তাকে দেখামাত্র সকলের মনে শ্রাবণী নামটি অনুচ্চারিত ভাবে উচ্চারিত হয়। অদৃষ্ট দিয়ে আদিষ্ট এই নামটির মানুষ তার সত্তায় একাকার হয়ে আছে। এখন পূর্ণ –র একটা অংশ সে। এই নামটি এখন পূর্ণ –র একান্ত। এই নামটি পূর্ণ –র সকল অপূর্ণতা।

।..।..। .।

সন্ধ্য ৮;১৫
০১/০৯/২০২৬

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:০৩

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




বেশ মনযোগ দিয়ে পড়লাম ।পাঠান্তে মনে হল এটা বম রাজার পুত্র প্রেম, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার এক মর্মস্পর্শী আখ্যান।

‘বম রাজার পুত্র’ পড়তে পড়তে একজন পাঠক হিসেবে প্রথম যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, তা হলো এটি শুধু একজন
সংগীতশিল্পীর প্রেমকাহিনি নয়; বরং প্রেমের মোহ, আত্মবিসর্জন, পারিবারিক বিচ্ছেদ, দাম্পত্যের বাস্তবতা এবং
দীর্ঘদিনের অপূর্ণতার মধ্য দিয়ে একজন মানুষের ভেতরে ভেঙে পড়ার গল্প।

পূর্ণ বম চরিত্রটির মধ্যে একই সঙ্গে রাজপুত্রের আদর, শিল্পীর সংবেদনশীলতা, প্রেমিকের আবেগ এবং একজন
মানুষের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে যে মানুষটি নিজের পরিবার, গোত্র, সমাজ এমনকি সংগীতজীবন পর্যন্ত
বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে অজানার পথে পাড়ি জমায়, পরবর্তী জীবনে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি
তাকে কীভাবে তাড়িয়ে বেড়ায় লেখাটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাগুলোর একটি এটি।

আপনার লেখাটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রেমিকা ও স্ত্রী র সম্পর্কের পার্থক্যকে সামনে আনা। প্রেমের
সময়ে যে মানুষটিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে সম্পূর্ণ মনে হয়, সংসারের বাস্তবতায় সেই সম্পর্কই কীভাবে দায়িত্ব,
প্রত্যাশা, অভিমান ও অপূর্ণতার ভারে ক্লান্ত হয়ে উঠতে পারে আপনি তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে ‘পূর্ণ’
নামের মধ্যেই যে পূর্ণতার ইঙ্গিত, গল্পের শেষে সেটিই যেন গভীর ব্যঙ্গাত্মক অর্থ বহন করে। জীবনের এত কিছু
পেয়েও মানুষটি শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে অপূর্ণ।

দুই দশক পর পূর্ণের ফিরে আসা অংশটি পাঠক হিসাবে মনে বিশেষ দাগ কাটে। বাইরে থেকে সে তখনও তারকা
ভক্ত আছে, কনসার্ট আছে, নেতৃত্ব আছে, জনপ্রিয়তা আছে; কিন্তু অন্তরে বহন করছে এক পুরোনো ক্ষত। এই
বৈপরীত্যটিই গল্পের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি। একজন মানুষের বাহ্যিক সাফল্য আর ভেতরের
নিঃস্বতার মধ্যে যে বিপুল দূরত্ব থাকতে পারে, পূর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লেখার ভাষা খুবই আবেগপ্রবণ এবং দৃশ্যধর্মী। বিশেষ করে বিমানযাত্রার দৃশ্য, দলের সদস্যদের সঙ্গে পূর্ণের আচরণ,
বিদেশের মাটিতে থেকেও ভাতের সঙ্গে কাঁচা মরিচ চাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চরিত্রটিকে পাঠক হিসাবে
আমাদের কাছে জীবন্ত করে তোলে। এসব জায়গায় াআপনি গল্পের বৃহৎ আবেগের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সহজ
বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে মিলিয়েছেন।

তবে পাঠক হিসেবে মনে হল কিছু জায়গায় ভাষার পুনরাবৃত্তি এবং অতিরিক্ত আবেগঘন বর্ণনা কিছুটা কমানো গেলে
গল্পের অভিঘাত আরও গভীর হতে পারত। বিশেষ করে শ্রাবণীর শারীরিক পরিবর্তন বর্ণনার পরিবর্তে তার মানসিক
পরিবর্তন, সম্পর্কের ভাঙন এবং পূর্ণের অন্তর্দ্বন্দ্বকে আরও বিস্তৃত করা হলে চরিত্র দুটির জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে
উঠত বলে মনে হয়। কারণ গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নটি আসলে পূর্ণ কি শ্রাবণীকে ভালোবেসেছিল, নাকি
শ্রাবণীর প্রতি নিজের মোহকেই ভালোবাসা ভেবেছিল? এই প্রশ্নটি পাঠক হসাবে আমাদের মনে দীর্ঘসময় থেকে যায়।

সর্বোপরি বম রাজার পুত্র এমন একটি গল্প, যেখানে প্রেমের শুরু যতটা উজ্জ্বল, তার পরিণতি ততটাই বিষণ্ণ।
পূর্ণের জীবনে শ্রাবণী একসময় প্রেমের প্রতীক, পরে অনুশোচনার প্রতীক এবং শেষ পর্যন্ত তার অপূর্ণতারই আরেক
নাম হয়ে ওঠে। তাই গল্পের শেষ বাক্য এই নামটি পূর্ণ-র সকল অপূর্ণতা শুধু একজন নারীর নামকে নির্দেশ করে
না এটি যেন পূর্ণের সমগ্র জীবনের এক করুণ সারাংশ।

গল্পটির পাঠ শেষ করার পর মনে হয় মানুষ জীবনে অনেক কিছু ফিরে পেতে পারে, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু সম্পর্ক
এবং কিছু হারানো সময় কখনোই আগের জায়গায় ফিরে আসে না। আর সেই না-ফেরার বেদনাই বম রাজার পুত্র
এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতি।

শুভেচ্ছা রইল

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০২

হুমায়রা হারুন বলেছেন: পূর্ণ চরিত্রটিকে আপনি যেভাবে দেখেছেন, আমিও সেভাবে তাকে উপলব্ধি করি।
রাজপুত্রের আদর, শিল্পীর সংবেদনশীলতা, প্রেমিকের আবেগ এবং মানুষের দুর্বলতা—এই বিপরীত সত্তাগুলো নিয়েই পূর্ণ।
সে যখন পরিবার, গোত্র, সমাজ, এমনকি নিজের সংগীতজীবনও পেছনে ফেলে শ্রাবণীর হাত ধরে অজানার পথে পা বাড়ায়, তখন হয়তো সে জানত না—একটি সিদ্ধান্ত শুধু ভবিষ্যৎ তৈরি করে না, কখনো কখনো সারাজীবন মানুষকে অনুসরণও করে।
পূর্ণের ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই—ভালোবাসার জন্য যে মূল্য সে স্বেচ্ছায় দিয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেই মূল্যের হিসাব থেকে আর পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
বিধ্বস্ত একজন মানুষ সে। কিন্তু তারপরও এই প্রশ্ন আসে মনে যে, সে কেন থাকতে পারলো না শ্রাবণীর সাথে?।

পূর্ণ কি সত্যিই শ্রাবণীকে ভালোবাসে নি, নাকি শ্রাবণীর প্রতি নিজের মোহকেই ভালোবাসা বলে ভেবেছিল —আসলে এটিই গল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তঃস্রোত। তবে শ্রাবণীর শারীরিক পরিবর্তনের বর্ণনাগুলোও ইচ্ছাকৃত; কারণ পূর্ণের দৃষ্টিতে তার শরীর আর মেস্মেরাইজিং বাঁকা গালের হাসি ওকে সম্মোহিত করে ফেলেছিল।সম্মোহন তাকে পথভ্রষ্ট করেছে।
কোথাও ভাষার পুনরাবৃত্তি বা আবেগের আধিক্য গল্পের অভিঘাতকে দুর্বল করেছে কি না—আপনার মন্তব্যের পর সেই জায়গাগুলো কথা মনে পড়ছে যেখানে, বর্ণণায় আমি simple sentence লিখে যাচ্ছিলাম। কোন ভাবেই compound sentence সৃষ্টি করতে পারছিলাম না। কেন পারিনি আমি জানি না। বোধহয়য় পূর্ণ-র হাল দেখে ইমোশান এত বেশী ছিল যে, কথাগুলো শুধু বর্ণনা করাই যেন সে সময়ের প্রধান দাবী হয়ে উঠেছিল।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.