নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক ১

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ৯:৫৫

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক
ইসলাম ও খৃস্টধর্মের তুলনামূলক আলোচনায় আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবীর কালজয়ী গ্রন্থ ইযহারুল হক্ক-এর সার-সংক্ষেপ
সংক্ষেপিত ইযহারুল হক্ক ১

ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী
অধ্যাপক, কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ

বঙ্গানুবাদ
ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর
অধ্যাপক, আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

সূচীপত্র
সংক্ষেপকের পূর্বকথন
ভূমিকা: কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য
প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি
প্রথম পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির নাম ও সংখ্যা
১. ১. ১. পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলি
১. ১. ২. নতুন নিয়মের গ্রন্থাবলি
১. ১. ৩. গ্রন্থগুলির সংখ্যায় হেরফেরের ইতিহাস
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির অপ্রামাণ্যতা
১. ২. ১. তোরাহ বা তাওরাতের অবস্থা
১. ২. ২. যিহোশূয়ের পুস্তকের অবস্থা
১. ২. ৩. ইঞ্জিল বা সুসমাচারগুলির সূত্র পর্যালোচনা
১. ২. ৩. ১. মথিলিখিত সুসমাচার
১. ২. ৩. ২. মার্কলিখিত সুসমাচার
১. ২. ৩. ৩. যোহনলিখিত সুসমাচার
১. ২. ৪. পবিত্র বাইবেলের পুস্তকগুলি ঐশী নয়
১. ২. ৫. পবিত্র বাইবেল বিষয়ে মুসলিম বিশ্বাস
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতি
১. ৩. ১. বৈপরীত্য ও পরস্পর বিরোধিতা
১. ৩. ২. ভুলভ্রান্তি
১. ৩. ৩. বাইবেলের বিকৃতির আলোচনা
১. ৩. ৪. বিকৃতি বিষয়ে পাদরিগণের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
১. ৩. ৪. ১. শুধু মুসলিমরাই বিকৃতির কথা বলে
১. ৩. ৪. ২. বিকৃতি বিষয়ে অমুসলিমগণের সাক্ষ্য
১. ৩. ৪. ৩. বাইবেলের বিকৃতির কারণাদি
১. ৩. ৪. ৪. যীশু খৃস্টের সাক্ষ্য
১. ৩. ৪. ৫. যীশুর বক্তব্য বনাম বাইবেলের প্রামাণ্যতা
১. ৩. ৪. ৬. বাইবেলের বিকৃতি কি অসম্ভব ছিল
১. ৩. ৪. ৭. বাইবেলের ইতিহাস ও বিকৃতির প্রেক্ষাপট
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: নতুন ও পুরাতন নিয়মে রহিত বিধান
১. ৪. ১. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণ
১. ৪. ১. ১. নাসখ বা রহিতকরণের অর্থ
১. ৪. ১. ২. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণের ক্ষেত্র
১. ৪. ১. ৩. রহিতকরণ বনাম মত-পাল্টানো
১. ৪. ১. ৪. কাহিনী ও ঐতিহাসিক বিবরণ রহিত হয় না
১. ৪. ১. ৫. যাবূর দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিল দ্বারা যাবূর রহিত হয় নি
১. ৪. ২. বাইবেলের পরিবর্তিত ও অপরিবর্তিত বিধানাদি
১. ৪. ৩. বাইবেলে বিদ্যমান রহিতকরণের প্রকারভেদ
১. ৪. ৩. ১. পরবর্তী ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী ব্যবস্থার রহিতকরণ
১. ৪. ৩. ২. একই ভাববাদীর ব্যবস্থায় রহিতকরণ
দ্বিতীয় অধ্যায়:ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
ভূমিকা: কতিপয় প্রয়োজনীয় মূলনীতি ও তথ্য
প্রথম পরিচ্ছেদ: বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণাদি দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: যীশুর বক্তব্য দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: যীশুর ঈশ্বরত্বের প্রমাণাদির অসারতা
তৃতীয় অধ্যায়: আল-কুরআন ও আল-হাদীস
প্রথম পরিচ্ছেদ: আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব
৩. ১. ১. আল কুরআনের অলৌকিকত্ব
৩. ১. ১. ১. অলৌকিক ভাষাশৈলী
৩. ১. ১. ২. অত্যাশ্চার্য কাব্যিক গদ্য ও বিন্যাস
৩. ১. ১. ৩. ভবিষ্যতের সংবাদ
৩. ১. ১. ৪. অতীতের সংবাদ
৩. ১. ১. ৫. মুনাফিকদের গোপন খবর
৩. ১. ১. ৬. জ্ঞান-বিজ্ঞানের অজানা তথ্য
৩. ১. ১. ৭. বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতা বিমুক্তি
৩. ১. ১. ৮. চিরন্তন অলৌকিকত্ব
৩. ১. ১. ৯. ক্লান্তিহীন প্রেমের স্থায়ী উৎস
৩. ১. ১. ১০. হৃদয়ঙ্গম ও মুখস্ত করা সহজ
৩. ১. ২. কুরআন বিষয়ক তিনটি প্রশ্ন
৩. ১. ২. ১. সাহিত্যিক অলৌকিকত্ব
৩. ১. ২. ২. ক্রমান্বয়ে অবতরণ
৩. ১. ২. ৩. বিষবস্তুর পুনরাবৃত্তি
৩. ১. ৩. কুরআন প্রসঙ্গে পাদরিগণের দুটি আপত্তি
৩. ১. ৩. ১. ভাষার উচ্চাঙ্গতা অলৌকিকত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়
৩. ১. ৩. ২. বাইবেল ও কুরআনের বৈপরীত্য
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: হাদীস বিষয়ে পাদরিগণের আপত্তি পর্যালোচনা
৩. ২. ১. হাদীস বর্ণনাকারীগণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি
৩. ২. ১. ১. হাদীসের বর্ণনাকারীগণ বনাম ইঞ্জিলের বর্ণনাকারীগণ
৩. ২. ১. ২. শিয়াগণের বিভ্রান্তি বনাম খৃস্টীয় বিভ্রান্ত সম্প্রদায়
৩. ২. ১. ৩. সাহাবীগণের বিষয়ে কুরআনের সাক্ষ্য
৩. ২. ১. ৪. সাহাবীগণের বিষয়ে শিয়া ইমামগণের বক্তব্য
৩. ২. ২. হাদীস সংকলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি
৩. ২. ২. ১. ইয়াহূদী ধর্মে হাদীস বা মৌখিক বর্ণনা
৩. ২. ২. ২. খৃস্টধর্মে হাদীস বা মৌখিক বর্ণনা
৩. ২. ২. ৩. ইসলামী শরীয়তে হাদীস
চতুর্থ অধ্যায়: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াত
প্রথম পরিচ্ছেদ: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াতের প্রমাণ
৪. ১. ১. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অলৌকিক চিহ্ন-কার্য
৪. ১. ১. ১. অতীত ও ভবিষ্যতের অজানা সংবাদ
৪. ১. ১. ২. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বারা সম্পাদিত অলৌকিক কর্মসমূহ
৪. ১. ২. ব্যক্তিত্ব, বিধান ও মানবতার প্রয়োজন
৪. ১. ২. ১. তাঁর মহোত্তম চরিত্র ও আচরণ
৪. ১. ২. ২. তাঁর ধর্মব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
৪. ১. ২. ৩. তাঁর আগমন ও বিজয়ের অবস্থা
৪. ১. ২. ৪. মানবতার প্রয়োজনের সময়েই তাঁর আগমন
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: পূর্ববর্তী নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণী
৪. ২. ১. বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর প্রকৃতি
৪. ২. ১. ১. ভবিষ্যদ্বাণীর বিদ্যমানতা
৪. ২. ১. ২. ভবিষ্যদ্বাণীর অস্পষ্টতা
৪. ২. ১. ৩. ভাববাদীর অপেক্ষায় ইস্রায়েলীয় জাতি
৪. ২. ১. ৪. বাইবেলীয় নামসূহের অনুবাদ, সংযোজন ও পরিবর্তন
৪. ২. ২. বাইবেলের চারটি ভবিষ্যদ্বাণী
৪. ২. ২. ১. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী
৪. ২. ২. ২. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী
৪. ২. ২. ৩. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী
৪. ২. ২. ৪. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক চতুর্থ ভবিষ্যদ্বাণী
উপসংহার



সংক্ষেপকের পূর্বকথন
প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত। আর সালাত ও সালাম উম্মী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর এবং তাঁর পরিবার-অনুসারী ও সহচরগণের উপর।
মহান আল্লাহর তাওফীকে আমি আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহ ইবনু খালীলুর রাহমান কিরানবী উসমানী হিন্দী রচিত ‘ইযহারুল হক্ক’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করি। সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমি গ্রন্থকারের নিজের হস্তলিখিত ও তাঁর সামনে পঠিত দুটি সুবর্ণ পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করি। আমার সম্পাদিত ইযহারুল হক্ক গ্রন্থটি চার খণ্ডে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৪১০ হিজরী অব্দে /১৯৮৯ খৃস্টাব্দে। সৌদী সরকারের রিয়াদস্থ ইলমী গবেষণা, ফাতওয়া, দাওয়াত ও ইরশাদ বিষয়ক কেন্দ্রীয় কার্যালয় তা প্রকাশ করে।
অনেক সহকর্মী আমাকে উদ্বুদ্ধ করেন যে, আমি যেন ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ গ্রন্থটিকে সহজবোধ্য সরল ভাষায় সংক্ষেপ করে এক খণ্ডে প্রকাশ করি; যাতে গ্রন্থটি অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা সহজ হয়। বিশ্বব্যাপী খৃস্টান মিশনারি ও প্রচারকগণ ইসলামের বিরুদ্ধে যে সকল অপপ্রচার চালাচ্ছেন তার প্রতিরোধে সংক্ষেপিত গ্রন্থটি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে তারা আশা করেন। কিন্তু আমার কয়েকটি গ্রন্থ মুদ্রণের বিষয়ে আমার ব্যস্ততা তাদের এ অনুরোধ বাস্তবায়নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
এমতাবস্থায় সৌদি সরকারের ইসলামী কর্মকান্ড, ওয়াক্ফ, দাওয়া ও ইরশাদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগের উপ-সচিব ড. আব্দুল্লাহ ইবনু আহমদ আল-যাইদ-এর পরামর্শ ও নির্দেশনা আমার সহকর্মীদের অনুপ্রেরণার সাথে সংযুক্ত হয়ে একে গতিশীল করে। তিনি আমাকে এ কর্মটি দ্রুত সম্পাদনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন। বিশেষত নতুন পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারগণ বিশ্বব্যপী ইসলামের বিরুদ্ধে বৈরিতার প্রকাশ্য ঘোষণা দিচ্ছে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম বিশ্বকে ধর্মান্তরিত করে খৃস্টান বানানোর বিষয়ে তাদের আগ্রহ সগৌরবে প্রকাশ করছে।
এ প্রেক্ষাপটে আমি এ সংক্ষেপিত গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য সক্রিয় হই। যদি কেউ এ গ্রন্থটি অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করতে চান তবে তার জন্য আমার অনুরোধ যে, বাইবেলের নতুন ও পুরাতন নিয়মের যে সকল উদ্ধৃতি এ গ্রন্থে প্রদান করা হয়েছে সেগুলি যেন তিনি তার নিজের মত করে অনুবাদ না করেন; বরং তার ভাষায় প্রচারিত ‘‘বাইবেল’’ থেকে উদ্ধৃত করেন।
এ সংক্ষেপিত গ্রন্থের মধ্যে আমি মূল গ্রন্থের বক্তব্য সুস্পষ্ট করার জন্য অতিরিক্ত কিছু তথ্য সংযোজন করেছি। যেমন, কোনো কোনো ঘটনার সন-তারিখ, কোনো কোনো ব্যক্তির মৃত্যু-সন উল্লেখ করেছি। যদি কোনো নাম দুভাবে লেখার প্রচলন থাকে বা কোনো শহরের প্রাচীন ও আধুনিক দুটি নাম থাকে তাহলে আমি দুটি নামই লিখেছি। যেক্ষেত্রে একই নামে দুটি শহর বিদ্যমান সেক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট শহরকে চিহ্নিত করেছি। কিছু পরিভাষা ব্যাখ্যা করেছি। বিষয়বস্তুর সহজবোধ্যতার জন্য খৃস্টীয় ও ইসলামী ঐতিহাসিক কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে কিছু তথ্য সংযোজন করেছি। অস্পষ্টতা দূর করে বিশুদ্ধ উচ্চারণ নিশ্চিত করতে কিছু শব্দে হরকত বা জের-জবর-পেশ ব্যবহার করেছি। মূল গ্রন্থে লেখকের নাম উল্লেখ না করে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমি এ সকল গ্রন্থের লেখকদের নাম ও তাদের মৃত্যু তারিখ উল্লেখ করেছি। বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের কিছু উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে আমি বিভিন্ন সংস্করণের ভাষ্য উল্লেখ করেছি। এছাড়া মূল গ্রন্থের কিছু তথ্য আমি আগে পিছে করে নতুন করে সাজিয়েছি; যেন পাঠকের জন্য অধিক সহজ ও উপযোগী হয় এবং তার চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত না হয়।
মূল ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ গ্রন্থের প্রথম তিনটি অধ্যায় আমি একটি অধ্যায়ের মধ্যে সন্নিবেশিত করেছি। ফলে অধ্যায়টি ইয়াহূদী-খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থগুলির পরিচয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে তাদের গ্রন্থগুলির নাম, বিকৃতি ও রহিত হওয়া বিষয়ক বর্ণনা রয়েছে। আমার উদ্দেশ্য, যেন এ সংক্ষেপিত গ্রন্থটি মূল গ্রন্থের বিষয়বস্তু অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি পাঠকের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণ বয়ে আনে।
সবশেষে মহান আল্লাহর তাওফীকের উপর নির্ভর করে বলছি, আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহ ইবনু খালীলুর রাহমান কীরানবী তাঁর মহামূল্যবান গ্রন্থ ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ একটি ভূমিকা ও ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। নিম্নে এ গ্রন্থের সার-সংক্ষেপ প্রদত্ত হলো।

ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী
সহকারী অধ্যাপক
কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ
০১/০১/১৪১৫ হি./ ১০/০৬/১৯৯৪ খৃ.

ভূমিকা
কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য
(১) প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণের গ্রন্থ থেকে যে সকল উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে শুধু তাদের কথা দ্বারা তাদের বিভ্রান্তি প্রমাণের জন্য, আমাদের বিশ্বাস প্রকাশের জন্য নয়।
(২) প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণ সর্বদা তাদের লিখিত গ্রন্থগুলি বিষয়বস্তু পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন ইত্যাদির মাধ্যমে পাল্টে ফেলেন। ফলে আগের সংস্করণ ও পরের সংস্করণের মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। পাঠককে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।
(৩) ‘‘বাইবেল’’-এর মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন কাহিনীকে মিথ্যা বা ভুল বলায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এগুলি নবীগণের নামে বানানো জাল ও ভিত্তিহীন গল্প এবং আসমানী কিতাবের বিকৃতির অংশ। এ সকল কাহিনী কোনোটিই আল্লাহর কালাম নয়। আর এ সকল জাল কাহিনীকে মিথ্যা বা ভুল বললে ‘‘আসমানী কিতাবের’’ প্রতি বে-আদবী হয় না। বরং এ সকল আসমানী গ্রন্থে যে সকল বিকৃতি ও মিথ্যার অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেগুলি প্রকাশ করা ও সেগুলির নিন্দা করা মুসলিমের আবশ্যকীয় দায়িত্ব।
(৪) খৃস্টান পণ্ডিতগণের রীতি ও অভ্যাস হলো, তারা মুসলিম আলিমগণের লিখনির মধ্যে বিদ্যমান সামান্য দু-একটি দুর্বল বক্তব্য খুঁজে বের করে তাদের গ্রন্থে সেগুলির উল্লেখ করেন এবং সেগুলির প্রতিবাদ করেন। এভাবে তারা পাঠককে বুঝাতে চান যে, মুসলিম পণ্ডিতদের বইগুলি এরূপ দুর্বল কথায় ভরা। আর প্রকৃত বিষয় হলো, মুসলিম আলিমগণের গ্রন্থের মধ্যে বিদ্যমান অগণিত শক্তিশালী বক্তব্যগুলি তারা এড়িয়ে যান এবং সেগুলির কোনোরূপ উল্লেখ তারা করেন না। যদি কখনো এরূপ কোনো বক্তব্য তারা উল্লেখ করেন তবে পরিপূর্ণ অবিশ্বস্ততার সাথে বাড়িয়ে কমিয়ে বা বিকৃত করে সে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এ তাদের সবচেয়ে নিন্দনীয় অভ্যাসগুলির অন্যতম। জ্ঞানবৃত্তিক বিতর্কের মূলনীতি হলো প্রতিপক্ষের বক্তব্য পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে বিশুদ্ধভাবে উপস্থাপন করা; কিন্তু তারা এ মূলনীতি লঙ্ঘন করেন। পাদরি কার্ল গোটালেব ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) এরূপ করেছেন আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবীর সাথে তার প্রকাশ্য বিতর্কের বিবরণে। ১২৭০ হি,/১৮৫৪ খৃ ভারতের আগ্রায় তাদের মধ্যে এ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মি. ফান্ডার এ বিতর্কের বিবরণ সম্পূর্ণ বিকৃতভাবে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন। এতে তিনি প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ বিকৃত করে উভয়পক্ষের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেন। মি. ফান্ডার তার বিভিন্ন পুস্তকে কুরআন কারীমের বিভিন্ন শ্লোক নিজের মনমর্জি মত অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতেন। এরপর দাবি করতেন যে, তার অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় সঠিক এবং মুসলিম মুফাস্‌সিরগণের ব্যাখ্যা ভুল। অথচ প্রকৃত ও প্রমাণিত বিষয় যে, তিনি আরবী ভাষায় অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। এছাড়া কুরআন বিষয়ক প্রাসঙ্গিক জ্ঞানও তার ছিল না। এরপরও তিনি দাবি করতেন তার ভাষাজ্ঞান-বিহীন অশুদ্ধ অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকে সঠিক বলে মানতে হবে এবং মুসলিম উম্মাহর সকল মুফাস্‌সিরের ব্যাখ্যাকে ভুল বলতে হবে!
হে আল্লাহ, আমাদেরকে সত্যকে সত্যরূপে বুঝার এবং তার অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আর বাতিল ও অসত্যের অসারত্ব আমাদের সামনে প্রতিভাত করুন এবং তা পরিহার করার তাওফীক আমাদেরকে দান করুন।





প্রথম অধ্যায়
বাইবেল পরিচিতি

নতুন ও পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলির বর্ণনা ও
সেগুলির বিকৃতি ও রহিত হওয়ার প্রমাণ


এই অধ্যায়টি চারটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত:

প্রথম পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির নাম ও পরিচয়
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির সনদ-হীনতা
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের অগণিত বৈপরীত্য ও ভুলভ্রান্তি
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: বাইবেলের রহিত হওয়ার প্রমাণ



প্রথম পরিচ্ছেদ:
বাইবেলের পুস্তকগুলির নাম ও সংখ্যা
খৃস্টানগণ তাঁদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলিকে দুভাগে ভাগ করেন। প্রথমভাগের গ্রন্থাবলি সম্পর্কে তারা দাবি করেন যে, যীশুর (ঈসা আ) পূর্বে আগত নবীগণের মাধ্যমে সেগুলি তাদের নিকট পৌঁছেছে। দ্বিতীয় ভাগের গ্রন্থগুলির বিষয়ে তারা দাবি করেন যে, যীশুর (ঈসা আ.) -এর পরে ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা (Divine Inspiration)-এর মাধ্যমে সেগুলি লিখিত হয়েছে। প্রথমভাগের গ্রন্থগুলির সমষ্টিকে ‘পুরাতন নিয়ম’ এবং দ্বিতীয়ভাগের গ্রন্থগুলির সমষ্টিকে ‘নতুন নিয়ম’ বলে অভিহিত করা হয়। উভয় নিয়মের সমষ্টিকে বলা হয় ‘বাইবেল’। এটি একটি গ্রীক শব্দ। এর অর্থ ‘গ্রন্থ’। পুরাতন ও নতুন নিয়ম একত্রে ছাপানো বইটির উপরে লেখা হয়: ‘‘পবিত্র বাইবেল’’।
১. ১. ১. পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলি
প্রটেস্টান্ট খৃস্টানগণের নিকট স্বীকৃত ‘‘প্রটেস্টান্ট বাইবেল’’ বা কিং জেমস ভার্সন অনুসারে পবিত্র বাইবেলের প্রথম অংশ বা পুরাতন নিয়মের মধ্যে বর্তমানে ৩৯টি পুস্তক বিদ্যমান । সেগুলির বিবরণ নিম্নরূপ:
1. আদি পুস্তক (Genesis)
2. যাত্রা পুস্তক (Exodus)
3. লেবীয় পুস্তক (Leviticus)
4. গণনা পুস্তক (Numbers)
5. দ্বিতীয় বিবরণ (Deuteronomy)
এ পাঁচটি গ্রন্থ একত্রে ‘তাওরাহ’ (Torah or Pentateuch) নামে অভিহিত। ‘তাওরাহ’ একটি হিব্রু শব্দ। এর অর্থ ‘শিক্ষা ও বিধিবিধান’। কখনো কখনো রূপকভাবে পুরাতন নিয়মের সকল গ্রন্থের সমষ্টিকে, অর্থাৎ উপর্যুক্ত ৫টি গ্রন্থ ও নিম্নের ৩৪টি গ্রন্থের সমষ্টিকে ‘তাওরাত’ বা ‘তোরাহ’ বলে অভিহিত করা হয়:
6. যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua)
7. বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ (The Book of Judges)
8. রূতের বিবরণ (The Book of Ruth)
9. শমুয়েলের প্রথম পুস্তক (The First Book of Samuel)
10. শমুয়েলের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Samuel)
11. রাজাবলির প্রথম খণ্ড (The First Book of Kings)
12. রাজাবলির দ্বিতীয় খণ্ড (The Second Book of Kings)
13. বংশাবলির প্রথম খণ্ড (The First Book of The Chronicles)
14. বংশাবলির দ্বিতীয় খণ্ড (The Second Book of The Chronicles)
15. ইয্রার পুস্তক (The Book of Ezra)
16. নহিমিয়ের পুস্তক (ইয্রার দ্বিতীয় পুস্তক) (The Book of Nehemiah)
17. ইস্টেরের বিবরণ (The Book of Esther)
18. ইয়োবের বিবরণ (The Book of Job)
19. গীতসংহিতা (যাবূর) (The Book of Psalms)
20. হিতোপদেশ (সুলাইমানের প্রবাদাবলী) (The Proverbs)
21. উপদেশক (Ecclesiastes or, the Preacher)
22. শলোমনের পরমগীত (The Song of Solomon)
23. যিশাইয় ভাববাদীর পুস্তক (The Book of The Prophet Isaiah)
24. যিরমিয় ভাববাদীর পুস্তক (The Book of The Prophet Jeremiah)
25. যিরমিয়ের বিলাপ (The Lamentations of Jeremiah)
26. যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তক (The Book of The Prophet Ezekiel)
27. দানিয়েলের পুস্তক (The Book of Daniel)
28. হোশেয় ভাববাদীর পুস্তক (Hosea)
29. যোয়েল ভাববাদীর পুস্তক (Joel)
30. আমোষ ভাববাদীর পুস্তক (Amos)
31. ওবদিয় ভাববাদীর পুস্তক (Obadiah)
32. যোনা ভাববাদীর পুস্তক (Jonah)
33. মীখা ভাববাদীর পুস্তক (Micah)
34. নহূম ভাববাদীর পুস্তক (Nahum)
35. হবক্কূক ভাববাদীর পুস্তক (Habakkuk)
36. সফনিয় ভাববাদীর পুস্তক (Zephaniah)
37. হগয় ভাববাদীর পুস্তক (Haggai)
38. সখরিয় ভাববাদীর পুস্তক (Zechariah)
39. মালাখি ভাববাদীর পুস্তক (Malachi)
ঈসা-মসীহ আলাইহিস সালাম এর জন্মের প্রায় ২৪০ বৎসর পূর্বে মালাখি নবী হিসেবে ইহুদীদের মধ্যে বিরাজমান ছিলেন।
শমরীয় (Samaritans) ইয়াহূদীগণ এগুলির মধ্য থেকে শুধু প্রথম সাতটি গ্রন্থ বিশুদ্ধ ও পালনীয় বলে স্বীকার করে, মূসা আলাইহিস সালাম এর গ্রন্থ বলে কথিত ৫ টি গ্রন্থ, যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua) ও বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ (The Book of Judges)। শমরীয়দের মধ্যে প্রচলিত ‘তাওরাত’-এর এ ৭টি পুস্তকের বক্তব্য সাধারণ ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত তাওরতের এ ৭টি পুস্তকের বক্তব্য থেকে ভিন্ন। আবার তাওরাতের শমরীয় সংস্করণ ও হিব্রু সংস্করনের সাথে এর গ্রীক সংস্করণের বক্তব্যের অনেক পার্থক্য রয়েছে। তাওরাতের গ্রীক সংস্করণের মধ্যে উপর্যুক্ত ৩৯টি পুস্তক ছাড়াও অতিরিক্ত ৭টি পুস্তক রয়েছে, যেগুলিকে প্রটেস্টান্টগণ জাল বা সন্দেহজনক পুস্তক (Apocrypha) বলে আখ্যায়িত করেন। এ সাতটি গ্রন্থের নাম:
1. বারুখের পুস্তক (The Book of Baruch)
2. তোবিয়াসের পুস্তক (The Book of Tobias/Tobit)
3. যুডিথের পুস্তক (The Book of Judith)
4. উইসডম বা জ্ঞান পুস্তক (The Book of Wisdom/Wisdom of Solomon)
5. যাজকগণ বা Ecclesiasticus (The Wisdom of Jesus the Son of Sirach)
6. মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees)
7. মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Maccabees)
এভাবে আমরা দেখছি যে, গ্রীক তাওরাত বা ক্যাথলিক তাওরাতের পুস্তক সংখ্যা ৪৬।
১. ১. ২. নতুন নিয়মের গ্রন্থাবলি
আমরা বলেছি যে, খৃস্টধর্মের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলের দ্বিতীয় অংশকে ‘‘নতুন নিয়ম’’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বর্তমানে এ অংশের মধ্যে নিম্নের ২৭টি পুস্তক বিদ্যমান:
1. মথি লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. Matthew)
2. মার্ক লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. Mark)
3. লূক লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. Luke)
4. যোহন লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. John)
এই চারটি গ্রন্থকে ‘ইঞ্জিল চতুষ্ঠয়’ বলা হয়। ‘ইঞ্জিল’ শব্দটি এই চারটি গ্রন্থের জন্য শুধু প্রযোজ্য। ইঞ্জিল শব্দটি মূলত গ্রীক ভাষা থেকে আরবীকৃত শব্দ। গ্রীক (eu) অর্থ ভাল (good) এবং (aggelein) অর্থ ঘোষণা (announce), একত্রে (euaggelos) অর্থ সুসংবাদ ঘোষণা (bringing good news)। গ্রীক (euaggelion) শব্দের অর্থ (good news)। এ শব্দটি থেকে আরবী ইঞ্জিল শব্দ এবং ইংরেজী ইভাঞ্জেল (evangel ) শব্দটির উৎপত্তি। আর ইঞ্জিল বা ইভাঞ্জেল (evangel) বলতে এ চারটি পুস্তক বুঝানো হয়। তবে অনেক সময় রূপকভাবে নতুন নিয়মের সকল গ্রন্থকে একত্রে ‘ইঞ্জিল’ বলা হয়। অর্থাৎ এ চারটি পুস্তক ও নিম্নের ২৩টি পুস্তকের সমষ্টিকে রূপকভাবে ইঞ্জিল বলা হয়:
5. প্রেরিতদের কার্য্য-বিবরণ (The Acts of the Apostles)
6. রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Letter of Paul to the Romans/ The Epistle of Paul The Apostle to the Romans)
7. করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র (The First Epistle of Paul The Apostle to the Corinthians)
8. করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle of Paul The Apostle to the Corinthians)
9. গালাতীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Galatians)
10. ইফিযীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Ephesians)
11. ফিলিপীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Philippians)
12. কলসীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Colossians)
13. থিষলনীকীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র (The First Epistle of Paul The Apostle to the Thessalonians)
14. থিষলনীকীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle of Paul The Apostle to the Thessalonians)
15. তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র (The First Epistle of Paul The Apostle to the Timothy)
16. তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত পৌলের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle of Paul The Apostle to Timothy)
17. তীতের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul to Titus)
18. ফিলীমনের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul to Philemon)
19. ইব্রীয়দের প্রতি পৌলের পত্র (The Letter of Paul to the Hebrews) পত্রটি পৌলের লিখিত বলে কথিত।
20. যাকোবের পত্র (The Letter of James/The General Epistle of James)
21. পিতরের প্রথম পত্র (The First Epistle General of Peter)
22. পিতরের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of Peter)
23. যোহনের প্রথম পত্র (The First Epistle General of John)
24. যোহনের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of John)
25. যোহনের তৃতীয় পত্র (The Third Epistle of John)
26. যিহূদার পত্র (The General Epistle of Jude)
27. যোহনের নিকট প্রকাশিত বাক্য (The Revelation of St. John The Divine)
এভাবে আমরা দেখছি যে, পুরাতন নিয়মের হিব্রু সংস্করণ বা প্রটেস্টান্ট বাইবেল (AV: Authorised Version/ KJV: King James Version) অনুসারে পবিত্র বাইবেলের পুস্তক সংখ্যা ৩৯+২৭= ৬৬। আর পুরাতন নিয়মের গ্রীক সংস্করণ বা রোমান ক্যাথলিক বাইবেল (RCV: Roman Catholic Version/ Douay) অনুসারে পবিত্র বাইবেলের পুস্তক সংখ্যা ৪৬+২৭=৭৩।


১. ১. ৩. গ্রন্থগুলির সংখ্যায় হেরফেরের ইতিহাস
৩২৫ খৃস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের পৌত্তলিক সম্রাট কন্সটান্টাইনের (রাজত্ব: ৩২৩-৩৩৭ খৃ) সময়ে নিকীয়া (Nicaea) শহরে খৃস্টান বিশপ-যাজকদের প্রথম সাধারণ মহা-সম্মেলন (ecumenical council) অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল বাইবেলের সন্দেহভাজন গ্রন্থাবলি বা বাইবেল নামে প্রচলিত ‘‘জাল’’ পুস্তকগুলি সম্পর্কে পরামর্শ, মতবিনিময়, গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সম্মেলনে উপস্থিত (তিনশতাধিক) বিশপ ও মহাযাজকগণ এ সকল গ্রন্থের বিষয়ে গবেষণা, আলোচনা ও বিশ্লেষণের পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ‘যুডিথের পুস্তক’ (The Book of Judith) বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আর নিম্নের ১৪টি গ্রন্থ জাল বা সন্দেহজনক (Apocrypha) বলে বিবেচিত হবে, যেগুলিকে বাইবেলের পুস্তক বা ঐশী পুস্তক বলে কোনো অবস্থাতেই গ্রহণ করা যাবে না। এ জাল বা সন্দেহজনক পুস্তকগুলি নিম্নরূপ:
1. ইস্টেরের বিবরণ (The Book of Esther)
2. যাকোবের পত্র (The Letter of Jame)
3. পিতরের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of Peter)
4. যোহনের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of John)
5. যোহনের তৃতীয় পত্র (The Third Epistle of John)
6. যিহূদার পত্র (The General Epistle of Jude)
7. ইব্রীয়দের প্রতি পত্র (The Letter of Paul to the Hebrews)
8. উইসডম বা জ্ঞান পুস্তক (The Book of Wisdom/Wisdom of Solomon)
9. তোবিয়াসের পুস্তক (The Book of Tobias/Tobit)
10. বারুখের পুস্তক (The Book of Baruch)
11. যাজকগণ বা Ecclesiasticus (The Wisdom of Jesus the Son of Sirach)
12. মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees)
13. মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Maccabees)
14. যোহনের নিকট প্রকাশিত বাক্য (The Revelation of St. John The Divine)
‘যুডিথের পুস্তক’ (The Book of Judith)-এর ভূমিকায় সেন্ট জীরোম (St. Jerome: ৩৪২-৪২০ খৃ)-এর বক্তব্য থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি জানা যায়।
এর মাত্র ৩৯ বৎসর পরে ৩৬৪ খৃস্টাব্দে লোডেসিয়ায় আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে উপস্থিত ধর্মগুরুগণ উপর্যুক্ত ১৪টি ‘জাল’ পুস্তকের মধ্যে প্রথম ৭টিকে (১-৭ নং) বিশুদ্ধ বলে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যেগুলিকে নিকীয় মহাসম্মেলনে ‘জাল’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এগুলি জাল নয়, বরং বিশুদ্ধ। অবশিষ্ট ৭টি পুস্তককে (৮-১৪ নং) এ সম্মেলনেও জাল ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়। তারা এ সিদ্ধান্ত একটি সাধারণ পত্রের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন করেন।
এর ৩৩ বৎসর পর ৩৯৭ খৃস্টাব্দে আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন ‘কার্থেজ’ সম্মেলন নামে পরিচিত। উপরের উভয় সম্মেলনে যে ৭টি পুস্তককে (৮-১৪ নং) জাল ও সন্দেহজনক বলে গণ্য করা হয় এ সম্মেলনে উপস্থিত ধর্মগুরুগণ সেগুলিকেও আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেন। এভাবে উপরের ১৪টি জাল পুস্তকের সবগুলিকেই তারা বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ঐশ্বরিক গ্রন্থ এবং খৃস্টানদের জন্য অবশ্য মান্য ও পালনীয় বলে ঘোষণা করেন।
এভাবে এ ১৪টি পুস্তক সহ মোট ৭৩টি গ্রন্থ ‘‘পবিত্র বাইবেলের’’ অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঐশ্বরিক ও অবশ্য পালনীয় ও অবশ্য মান্য ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় সুদীর্ঘ প্রায় ১২০০ বৎসর যাবত।
এরপর খৃস্টীয় ১৬শ শতকের মাঝামাঝি প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। তারা নিম্নের গ্রন্থগুলিকে বাতিল বলে প্রত্যাখ্যান করেন:
1. বারুখের পুস্তক (The Book of Baruch)
2. তোবিয়াসের পুস্তক (The Book of Tobias)
3. যুডিথের পুস্তক (The Book of Judith)
4. উইসডম বা জ্ঞান পুস্তক (The Book of Wisdom)
5. যাজকগণ বা Ecclesiasticus (The Wisdom of Jesus the Son of Sirach)
6. মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees)
7. মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Maccabees)
তারা বলেন যে, এই গ্রন্থগুলি জাল, অগ্রহণযোগ্য এবং বাতিল। এগুলিকে কোনোভাবেই বাইবেলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। এছাড়া তারা ‘ইস্টেরের বিবরণ’ (The Book of Esther)-এর কিছু অংশ বাতিল বলে গণ্য করেন এবং কিছু অংশ গ্রহণ করেন। এই গ্রন্থে ১৬টি অধ্যায় ছিল। তারা বলেন যে, প্রথম ৯ টি অধ্যায় এবং দশম অধ্যায়ের তিনটি শ্লোক সঠিক বলে স্বীকৃত। দশম অধ্যায়ের অবশিষ্ট ১০ শ্লোক ও বাকী ৬টি অধ্যায় বাতিল হিসেবে প্রত্যাখ্যাত। উপরের গ্রন্থগুলি বাতিল ও বানোয়াট বলে গণ্য করার ক্ষেত্রে তারা ৬ প্রকারের যুক্তি পেশ করেন:
1. এই গ্রন্থগুলি মূলত হিব্রু, ক্যালিডিয় ইত্যাদি ভাষায় লেখা ছিল। সেসব ভাষায় লিখিত এ সকল গ্রন্থের মূল উৎসগুলি হারিয়ে গিয়েছে।
2. ইয়াহূদীগণ এ সকল গ্রন্থকে ঐশী বা ঐশ্বরিক বলে মানেন না।
3. সকল খৃস্টান গ্রন্থগুলি মেনে নেন নি।
4. জীরোম (St. Jerome) বলেছেন যে, ধর্মের বিধিবিধান বর্ণনা ও প্রমাণ করার জন্য এই গ্রন্থগুলি যথেষ্ট নয়।
5. ক্লাউস বলেছেন যে, এ গ্রন্থগুলি সর্বত্র পঠিত হয় না।
6. ৩য়-৪র্থ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ খৃস্টান বিশপ ও ঐতিহাসিক ইউসেবিয়াস (Eusebius Pamphilus) তার Ecclesisatical History গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই গ্রন্থগুলি, বিশেষ করে মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছে।
এখানে লক্ষ্য করুন। তারা নিজেরাই নিজেদের ধর্মের পূর্ববর্তী প্রজন্মদের অধার্মিকতার স্বীকৃতি প্রদান করছে। তারা নিজেরাই স্বীকার করছে যে, যে সকল গ্রন্থের মূল উৎস হারিয়ে গিয়েছে এবং শুধু অনুবাদগুলি রয়েছে, যেগুলিকে ইয়াহূদীগণ তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানেন না, যেগুলির ঐশ্বরিক বা প্রেরণালব্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই এবং এ সকল কারণে যে সকল পুস্তককে প্রথম প্রজন্মের খৃস্টানগণ জাল বা সন্দেহজনক বলে ঘোষণা করেছেন, সেগুলিকেই আবার পরবর্তী প্রজন্মের খৃস্টানগণ ঐশী বা আসমানী গ্রন্থ হিসেবে অবশ্য মান্য ও অবশ্য পালনীয় বলে ঘোষণা করেছেন। ক্যাথলিকগণ কার্থেজ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে এখন পর্যন্ত এই গ্রন্থগুলিকে ঐশী ও ঐশ্বরিক হিসেবে মেনে থাকেন; যেগুলির মধ্যে পুরাতন নিয়মের ও নতুন নিয়মের জাল বা সন্দেহজনক পুস্তকগুলি রয়েছে।
যে পুস্তককে পূর্ববর্তীরা জাল বলেছেন তার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে পরবর্তীদের সিদ্ধান্তের কীই বা মূল্য থাকতে পারে? বরং এ সকল সম্মেলনের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থগুলির অশুদ্ধতা ও অনির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে বিরুদ্ধবাদিদের মতামতই সঠিক।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
বাইবেলের পুস্তকগুলির অপ্রামাণ্যতা
পুরাতন এবং নতুন নিয়মের কোনো একটি গ্রন্থেরও অবিচ্ছিন্ন সূত্র (chain of authorities) ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত নেই। আর এ সকল পুস্তক ঐশ্বরিক প্রেরণা বা প্রত্যাদেশ দ্বারা লিখিত হয়েছে বলে দাবি করার কোনো সুযোগ ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নেই।
কোনো গ্রন্থকে ওহী (Divine Inspiration)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ঐশী, ঐশ্বরিক বা আসমানী গ্রন্থ হিসেবে স্বীকার করার পূর্ব শর্ত হলো:
প্রথমত, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে যে, গ্রন্থটি অমুক নবী বা ভাববাদীর মাধ্যমে লিখিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে যে, উক্ত নবী যেভাবে গ্রন্থটি রেখে গিয়েছেন হুবহু সেভাবে কোনোরূপ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি ব্যতীরেকেই ‘অবিচ্ছিন্ন সূত্রে’ গ্রন্থটি আমাদের নিকট পৌঁছেছে।
শুধু ধারণা বা অনুমানের উপর নির্ভর করে কোনো গ্রন্থকে কোনো ওহী বা প্রেরণা (Inspiration)-প্রাপ্ত ব্যক্তির নামে চালানো হলে বা লিখে দিলেই তা সে ব্যক্তির লেখা গ্রন্থ বলে প্রমাণিত বা স্বীকৃত হতে পারে না। অনুরূপভাবে কোনো এক বা একাধিক সম্প্রদায় বা গোষ্ঠি একটি গ্রন্থকে এরূপ কোনো নবী বা ভাববাদীর লেখা গ্রন্থ বলে দাবি করলেই তা তার লেখা বলে প্রমাণিত হয় না।
এরূপ অনেক গ্রন্থই অনেক নবীর নামে প্রচারিত, যেগুলি ইয়াহূদী খৃস্টানগণও সে সকল নবীর গ্রন্থ বলে স্বীকার করেন না। মূসা আলাইহিস সালাম, ইয্রা, যিশাইয়, যিরমিয়, হবক্কুক, সুলাইমান আলাইহিস সালাম প্রমুখ নবীর নামে অনেক পুস্তক পুরাতন নিয়মের অংশ হিসেবে লিখিত ও প্রচলিত হয়েছে যেগুলিকে ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণ এ সকল নবীর লেখা পুস্তক বলে স্বীকার করেন না; কারণ এগুলির কোনো অবিচ্ছিন্ন সনদ নেই এবং কোনোভাবে প্রমাণিত হয় নি যে, এগুলি এ সকল নবীর লেখা। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণই এগুলিকে জাল (Pseudepigrapha) বলে গণ্য করেন।
নতুন নিয়মের উপর্যুক্ত ২৭টি গ্রন্থ ছাড়াও ৭০টির অধিক গ্রন্থ খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, যেগুলি যীশু, মেরি, শিষ্যগণ বা তাদের শিষ্যদের নামে প্রচারিত ও প্রচলিত ছিল। আজকাল সকল খৃস্টান সম্প্রদায় একমত যে, এগুলি সবই বানোয়াট ও জাল (Pseudepigrapha/ Apocrypha)।
পাঠক দেখেছেন যে, ‘সন্দেহজনক’ (Apocrypha) গ্রন্থগুলি ক্যাথলিকদের নিকট অবশ্য মান্য ধর্মগ্রন্থ, কিন্তু ইয়াহূদী ও প্রটেস্টান্টদের নিকট অবশ্য পরিত্যাজ্য জালগ্রন্থ।
অবস্থা যখন এরূপ তখন কোনো একটি গ্রন্থকে কোনো একজন নবী বা শিষ্যের নামে প্রচার করলেই আমরা গ্রন্থটিকে সেই নবী বা শিষ্যের লেখা বা সংকলিত গ্রন্থ বলে মেনে নিতে পারি না। শুধু এইরূপ দাবির ভিত্তিতে কোনো গ্রন্থকে ঐশী বা ঐশ্বরিক বলে স্বীকার করা যায় না।
এজন্য গ্রন্থকার আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহ কিরানবী খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রাজ্ঞ জাঁদরেল পণ্ডিতদের নিকট বারংবার দাবি করেছেন যে, বাইবেলের যে কোনো একটি গ্রন্থের অবিচ্ছিন্ন সনদ বা সূত্র পেশ করুন। তারা সূত্র উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পাদরিগণের কেউ কেউ একথা বলে ওজরখাহি পেশ করেন যে, এ সকল গ্রন্থের সূত্র বা সনদ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। খৃস্টধর্মের শুরু থেকে ৩১৩ বৎসর পর্যন্ত আমাদের উপর যে জুলুম-অত্যাচার হয়েছিল তার ফলে এই গ্রন্থগুলির সনদ বা সূত্র পরম্পরার বিবরণ আমাদের নিকট থেকে হারিয়ে গিয়েছে।
এভাবে প্রমাণিত যে, খৃস্টান পণ্ডিতগণ তাদের ধর্মীয় পুস্তকগুলির সনদ বা উৎস ও সূত্র বিষয়ে যা কিছু বলেন সবই ধারণা ও অনুমান মাত্র। এ ছাড়া তাদের কোনো প্রকার সূত্র (chain of authorities) নেই। এভাবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, তাদের গ্রন্থগুলির কোনো অবিচ্ছিন্ন সনদ তাদের নেই। এখানে তাদের কয়েকটি বইয়ের অবস্থা আলোচনা করছি।
১. ২. ১. তোরাহ বা তাওরাত (Torah or Pentateuch)
মোশি (মূসা আ.)-এর নামে প্রচারিত তাওরাহ বা তোরাহ-এর গ্রন্থগুলি মোশির নিজের লিখিত বা সংকলিত নয়। নিম্নের বিষয়গুলি তা প্রমাণ করে:
প্রথম বিষয়: দাউদ বংশের শাসক যোশিয়া বিন আমোন (Josiah, son of Amon) খৃস্টপূর্ব ৬৪১ সালের কাছাকাছি সময়ে ইয়াহূদী রাজ্যের (যুডাহ প্রদেশের) শাসনভার গ্রহণ করেন। তার রাজত্ব গ্রহণের পূর্বেই তাওরাত বিলীন ও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাওরাতের কোনোরূপ ব্যবহার বা প্রচলন ছিল না। তার রাজত্বের প্রথম ১৭ বৎসরে কেউ মোশির তোরাহ-এর কোনো পাণ্ডুলিপির চিহ্ন দেখেন নি বা এর কোনো কথাও কেউ শুনেন নি। তার সিংহাসনে আরোহণের ১৮ বৎসর পরে তাওরাতের যে কপিটি পাওয়া গিয়েছিল তা মোটেও নির্ভরযোগ্য ছিল না। যোশিয় রাজার রাজত্বের ১৮শ বৎসরে (খৃ. পূ. ৬২০/৬২১ সালে) হিল্কিয় মহাযাজক (Hilki'ah the high priest) দাবি করেন যে, তিনি ‘সদাপ্রভুর গৃহে’, অর্থাৎ যিরূশালেমের ধর্মধাম বা শলোমনের মন্দিরের মধ্যে মোশির তোরাহ বা ব্যবস্থাপুস্তকখানি (the book of the law) পেয়েছেন। এ সকল বিষয় ২ রাজাবলির ২২ অধ্যায়ে এবং ২ বংশাবলির ৩৪ অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
তোরাহ বা ‘ব্যবস্থা পুস্তক’ বলে কথিত এ পাণ্ডুলিপিটির নির্ভরযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতা স্বীকৃত নয়। যাজক হিল্কিয়ের দাবিও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সামগ্রিক বিচারে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, এ পুস্তকটি বা ‘তোরাহ’-এর এই পাণ্ডুলিপিটি পুরোটিই হিল্কিয় মহাযাজকের উদ্ভাবনা ও রচনা ছাড়া কিছুই নয়। এই প্রকৃত সত্যটিকে পাশ কাটিয়ে আমরা যদি ধরে নিই যে, হিল্কিয়ের এ পাণ্ডুলিপিটি সত্যই তাওরাতই ছিল তাহলেও কয়েক বছর পরে খৃস্টপূর্ব ৫৮৮ বা ৫৮৬ অব্দে যখন ব্যবিলন সম্রাট নেবুকাদনেজার (Nebuchadnezzar) বা বখত নসর যেরুযালেম নগরী ও ইয়াহূদী রাজ্য ধ্বংস করে সকল ইয়াহূদীকে বন্দী করে ব্যবিলনে নিয়ে যান তখন এই অনির্ভরযোগ্য ও সূত্রবিহীন কপিটির প্রায় পুরোটুকুই হারিয়ে যায়। নেবুকাদনেজারের এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তোরাহ ও পুরাতন নিয়মের পূর্বেকার সকল গ্রন্থ ভূপৃষ্ঠ থেকে একেবারেই বিলীন হয়ে যায়।
ইয়াহূদীরা দাবি করেন যে, প্রায় এক শতাব্দী পরে ইয্রা পুনরায় পুরাতন নিয়মের এ সকল গ্রন্থ নিজের পক্ষ থেকে লিখেন। প্রায় ৩০০ বৎসর পরে সিরিয়ার গ্রীক শাসক চতুর্থ এন্টিয়ক (Antiochus Epiphanes)-এর আক্রমনের সময় ইয্রার লেখা এ পাণ্ডুলিপিও বিনষ্ট হয়ে যায়।
চতুর্থ এন্টিয়ক খৃ. পূ. ১৭৫-১৬৩ সালের মধ্যে সিরিয়ার শাসক ছিলেন। তিনি ইয়াহূদী ধর্ম সম্পূর্ণ নির্মূল ও উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনে গ্রীক হেলেনীয় ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অর্থের বিনিময়ে ইয়াহূদী ধর্মযাজকদের পদ ক্রয় করে নেন। তিনি প্রায় ৮০ হাজার ইয়াহূদী হত্যা করেন, যেরুজালেম ধর্মালয়ের সকল সম্পদ লুণ্ঠন করেন এবং ইয়াহূদীদের বেদিতে শূকর জবাই করেন। তিনি ২০ হাজার সৈন্যকে যেরুজালেম অবরোধ করতে নির্দেশ দেন। শনিবার ইয়াহূদীরা যখন ধর্মালয়ে প্রার্থনার জন্য জমায়েত হয় তখন তার সৈন্যরা তাদের উপর আক্রমন চালায়, নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকে হত্যা করে, সকল বাড়িঘর ধ্বংস করে অগ্নিসংযোগ করে। পাহাড়ে-গুহায় পলাতক কিছু ইয়াহূদী ছাড়া কেউই এ হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায় না। (এ গ্রন্থের ---- পৃষ্ঠায় (খ) বিষয়টি দেখুন।)
দ্বিতীয় বিষয়: ইয়াহূদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রায় সকলেই বলেন যে, ইয্রা হগয় ভাববাদী ও ইদ্দোর পুত্র সখরিয়, এই দুইজন ভাবাবদীর সহায়তায় ‘বংশাবলির প্রথম খণ্ড’ (The First Book of The Chronicles) ও ‘বংশাবলির দ্বিতীয় খণ্ড’ (The Second Book of The Chronicles) গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। এই গ্রন্থদ্বয় মূলত এ তিন ভাববাদীর লেখা। অথচ এ দুই গ্রন্থের সাথে তোরাহ-এর বিবরণের ব্যাপক বৈপরীত্য রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ একমত যে, ইয্রা তাওরাতের অসম্পূর্ণ ও আংশিক কাগজপত্রের উপর নির্ভর করেছিলেন এজন্য পুত্র ও পৌত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন নি। একথা তো স্পষ্ট যে, এই তিনজন ভাববাদী তাদের নিকট প্রচলিত ‘তোরাহ’ এর বর্ণনা অনুসরণ করে তাদের গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যদি মোশির (মূসা আ. এর) যে তোরাহ-এর উপর তাঁরা নির্ভর করেছিলেন আজকের প্রচলিত তোরাহ যদি সেই মোশির ‘তোরাহ’ই হতো, তাহলে কোনো মতেই এ তিন ভাববাদীর বর্ণনার সাথে তোরাহ-এর বর্ণনার বৈপরীত্য দেখা দিত না বা তারা কোনোভাবেই তোরাহ-এর বিরোধিতা করতেন না। আর যদি ইয্রার সময়ে মোশির তোরাহ-এর কোনো অস্তিত্ব থাকত তাহলে তিনি কখনোই তোরাহ বাদ দিয়ে ‘অসম্পূর্ণ বংশতালিকা’র উপর নির্ভর করতেন না।
ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, ইয্রা ওহী বা ইলহামের (Divine Inspiration) মাধ্যমে তোরাহ নতুন করে লিখেছিলেন। যদি বর্তমান প্রচলিত তোরাহ-ই ইয্রা লিখিত তোরাহ হতো তাহলে কখনোই ইয্রার লিখিত বিবরণের সাথে তোরাহ-এর বিবরণে বৈপরীত্য থাকতো না।
উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, বর্তমানে বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত তোরাহ (পুরাতন নিয়মের প্রথম ৫টি গ্রন্থ) মোশি বা মূসা আলাইহিস সালাম প্রদত্ত তোরাহ নয় এবং তা ইয্রা লিখিত তোরাহ-ও নয়। সত্য কথা হলো, তোরাহ (Torah or Pentateuch) নামে প্রচলিত এই গ্রন্থগুলি তৎকালে প্রচলিত বিভিন্ন গল্প, কাহিনী, বর্ণনা ইত্যাদির সংকলন মাত্র। ইয়াহূদী ধর্মগুরুগণ এ সকল প্রচলিত গল্প কাহিনী ইত্যাদি কোনো রকম বাছবিচার ও বাছাই ছাড়াই সংকলন করেছেন এবং ‘‘পুরাতন নিয়ম’’ নামক পুস্তক সংকলনের মধ্যে তা সংকলন করেছেন। তাওরাত ও পুরাতন নিয়মের বিষয়ে এ মতটি ইউরোপে এবং বিশেষত জার্মান পণ্ডিতদের মধ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ।
তৃতীয় বিষয়: যদি কেউ যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তকের ৪৫শ ও ৪৬শ অধ্যায়দ্বয়ের সাথে গণনা পুস্তকের ২৮শ ও ২৯শ অধ্যায়দ্বয়ের তুলনা করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, উভয়ের মধ্যে ঐশ্বরিক বিধানাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একথা স্পষ্ট যে, যিহিষ্কেল ভাববাদী নিজ গ্রন্থে লিখিত ঐশ্বরিক বিধানাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে তার যুগে প্রচলিত ‘তোরাহ’-এর উপর নির্ভর করেছিলেন। যদি বর্তমান যুগে প্রচলিত তোরাহ-ই তার যুগের তোরাহ হতো তাহলে কখনোই তিনি ঐশ্বরিক বিধানের বর্ণনায় তোরাহ-এর বিরোধিতা করতেন না।
চতুর্থ বিষয়: প্রচলিত ‘তোরাহ’ বা তাওরাতের একটি স্থান থেকেও বুঝা যায় না যে মোশি (মূসা) নিজে এই গ্রন্থের কথাগুলি লিখেছেন। বরং তোরাহ-এর ভাষা ও ভাব স্পষ্টরূপে প্রমাণিত করে যে, ‘অন্য কোনো ব্যক্তি এই গ্রন্থগুলি প্রণয়ন করেছেন। এই ‘অন্যব্যক্তি’ ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন গল্প-কাহিনী ও বর্ণনাগুলি সংকলন করেছেন। সংকলক যে কথাটিকে ‘ঈশ্বরের কথা’ বলে মনে করেছেন সে কথার বিষয়ে বলেছেন ‘ঈশ্বর/ সদাপ্রভু বলেন’। আর যে কথাকে মোশির কথা বলে মনে করেছেন সে কথার বিষয়ে বলেছেন: ‘মোশি বলেন’। সকল ক্ষেত্রে ‘মোশির’ জন্য ‘নাম পুরুষ’ বা ‘তৃতীয় পুরুষ’ ব্যবহার করেছেন। যদি এ সকল গ্রন্থ মোশির নিজের প্রণীত হতো তাহলে তিনি তার নিজের ক্ষেত্রে ‘উত্তম পুরুষ’ ব্যবহার করতেন। কিছু না হলেও অন্তত একটি স্থানে নিজের জন্য ‘উত্তম পুরুষ’ ব্যবহার করতেন। কারণ ‘উত্তম পুরুষ’ ব্যবহার পাঠক বা শ্রোতার অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ করে।
এভাবে তোরাহ-এর গ্রন্থাবলী থেকে এ কথাটিই স্পষ্ট যে, এগুলি মোশি কতৃক সংকলিত বা প্রদত্ত নয়; বরং পরবর্তী যুগের কেউ এগুলি সংকলন করেছেন। এর বিপরীতে কোনো শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত এই কথাটিই স্বীকৃত সত্য বলে গৃহীত হবে। কেউ যদি এর বিপরীত কোনো দাবি করেন তাহলে তাকে তার দাবি প্রমাণ করতে হবে।
পঞ্চম বিষয়: প্রখ্যাত নির্ভরযোগ্য খৃস্টান পণ্ডিত আলেকজান্ডার কীথ নতুন বাইবেলের ভূমিকায় লিখেছেন: ‘‘বিভিন্ন প্রমাণের মাধ্যমে তিনটি বিষয় নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয়েছে:
(ক) প্রচলিত তোরাহ মোশির রচিত নয়।
(খ) তোরাহ-এর গ্রন্থগুলি ইয়াহূদীদের কেনানে (সিরিয়ায়) আগমনের পরে বা যেরুজালেমে আগমণের পরে লেখা হয়েছে। অর্থাৎ মোশির সময়ে, যখন ইস্রাঈল সন্তানগণ মরুভূমিতে অবস্থান করছিলেন তখন লেখা হয়নি।
(গ) প্রচলিত তাওরাত সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর যুগে, অর্থাৎ খৃ. পূ. ১০ শতাব্দীতে, অথবা এর পরে খৃস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দিকে লিখিত হয়েছে। মূল কথা হলো, প্রচলিত তোরাহ-এর গ্রন্থগুলি মোশির মৃত্যুর ৫০০ বৎসরেরও বেশি পরে লেখা হয়েছে।
ষষ্ঠ বিষয়: বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা অবিসংবাদিত সত্য যে, একই ভাষার শব্দভাণ্ডার ও বাচনভঙ্গিতে যুগের আবর্তনে পরিবর্তন ঘটে। ৪০০ বৎসর আগের ইংরেজির সাথে বর্তমান সময়ের ইংরেজির তুলনা করলেই উভয় ইংরেজির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য ধরা পড়বে। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ খৃস্টান পণ্ডিত নর্টন বলেন: ‘‘তোরাহ বা পুরাতন নিয়মের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থের ভাষার ব্যবহার বা বাচনভঙ্গি এবং পুরাতন নিয়মের অবশিষ্ট গ্রন্থগুলি, যেগুলি ইস্রাঈল সন্তানদের ব্যবিলনের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পরে লেখা সেগুলির ভাষার ব্যবহার বা বাচনভঙ্গির মধ্যে কোনো গ্রহণযোগ্য পার্থক্য নেই। অথচ মোশির যুগ এবং মুক্তি পরবর্তী যুগ এই দুই যুগের মধ্যে ৯০০ বৎসরের ব্যবধান। যেহেতু তোরাহ-এর ভাষা ও পরবর্তী গ্রন্থগুলির ভাষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই সেহেতু হিব্রু ভাষায় পরিপূর্ণ বুৎপত্তি সম্পন্ন শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত লিউসডিন মনে করেন যে, এ সকল গ্রন্থ সবই একই যুগে লেখা হয়েছে।
সপ্তম বিষয়: দ্বিতীয় বিবরণের ২৭ অধ্যায়ের ৫, ৮ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘৫ আর সে স্থানে তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে এক যজ্ঞবেদি, প্রস্তরের এক বেদি গাঁথিবে, তাহার উপরে লৌহাস্ত্র তুলিবে না।... ৮ আর সেই প্রস্তরের উপরে এই ব্যবস্থার সমস্ত বাক্য অতি স্পষ্টরূপে লিখিবে।’’
যিহোশূয়ের পুস্তকের অষ্টম অধ্যায়ের ৩০, ৩৩ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, মোশি যেভাবে আদেশ করেছিলেন সেভাবে যিহোশূয় যজ্ঞবেদি নির্মাণ করেন এবং সেই বেদির উপরে তাওরাত লিখে রাখেন: ‘‘তৎকালে যিহোশূয় এবল পর্বতে ইস্রায়েলের ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে এক যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিলেন। সদাপ্রভুর দাস মোশি ইস্রায়েল-সন্তানদেরকে যেমন আজ্ঞা করিয়াছিলেন, তেমনি তাহারা মোশির ব্যবস্থাগ্রন্থে লিখিত আদেশানুসারে অতক্ষিত প্রস্তরে, যাহার উপরে কেহ লৌহ উঠায় নাই, এমন প্রস্তরে ঐ যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিল।...। আর তথায় প্রস্তরগুলির উপরে ইস্রায়েল-সন্তানগণের সম্মুখে তিনি মোশির লিখিত ব্যবস্থার এক অনুলিপি লিখিলেন।’’
উপরের বিবরণ থেকে জানা গেল যে, মোশির উপর অবতীর্ণ বা মোশি লিখিত তাওরাত বা তোরাহ-এর আকৃতি ও পরিমাণ এমন ছিল যে, একটি যজ্ঞবেদির পাথরে তা পুরোপুরি লিখে রাখা যেত। তোরাহ বলতে যদি বর্তমানে প্রচলিত বিশালাকৃতির ৫টি গ্রন্থ বুঝানো হতো তাহলে কোনো অবস্থাতেই তা সম্ভব হতো না।
অষ্টম বিষয়: প্রচলিত তোরাহ-এর মধ্যে অনেক ভুল রয়েছে। আবার তোরাহ-এর পুস্তকগুলির একটির সাথে আরেকটির বর্ণনার বৈপরীত্য রয়েছে। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এগুলি কখনোই মূসা আলাইহিস সালাম-এর তাওরাত নয়। ওহীর মাধ্যমে পাওয়া মোশির (মূসা আ.) কথায় এই ধরনের ভুল থাকতে পারে না।
১. ২. ২. যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua)
উপরের আলোচনা থেকে পাঠক ইস্রায়েলী ধর্মের মূল ভিত্তি তাওরাত (Torah or Pentateuch) -এর অবস্থা জানতে পারলেন। এখন আমরা তাওরাতের পরেই যে গ্রন্থের স্থান সেই ‘যিহোশূয়ের পুস্তক’-এর অবস্থা আলোচনা করব। প্রথমেই যে কথা উল্লেখ করা দরকার তা হলো, এখন পর্যন্ত ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ নিশ্চিতরূপে জানেন না যে, গ্রন্থটির লেখক কে এবং কোন্ যুগে তা লেখা হয়েছে। এই গ্রন্থটির বিষয়ে তাদের পাঁচটি মত রয়েছে:
1. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (মোশির শিষ্য) যিহোশূয়ের লিখিত।
2. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (হারোণের পৌত্র) পীনহস কর্তৃক লিখিত।
3. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (হারোণের পুত্র, পীনহসের পিতা) ইলিয়াসর কর্তৃক প্রণীত।
4. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি শমূয়েল কর্তৃক রচিত।
5. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি যিরমিয় কর্তৃক রচিত।
উল্লেখ্য যে, যিহোশূয় এবং যিরমিয়র মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো কমবেশি প্রায় ৮৫০ বৎসর। তাদের নিজেদের ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থের লেখকের বিষয়ে এ ব্যাপক মতভেদ পূর্ণরূপে প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটির লেখক সম্পর্কে তাদের নিকট কোনো সূত্র নেই। প্রত্যেক গবেষক তার নিজের ধারণা ও অনুমানের উপর নির্ভর করে মতামত প্রকাশ করেছেন। প্রত্যেকে পারিপার্শ্বিক কিছু নির্দেশনার উপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেছেন যে, অমুকই বোধহয় এই গ্রন্থের লেখক। এ আন্দাজই তাদের একমাত্র সনদ বা সূত্র।
যিহোশূয়ের পুস্তকের মধ্যে কিছু শ্লোক ও অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলি কখনোই যিহোশূয়ের বক্তব্য বা তাঁর নিজের লেখা হতে পারে না। অনুরূপভাবে এ পুস্তকের মধ্যে এমন কিছু অনুচ্ছেদ বিদ্যমান যেগুলি দাউদ আলাইহিস সালাম-এর সমসাময়িক কোনো ব্যক্তির লেখা বলে প্রমাণিত। এ সকল অনুচ্ছেদ সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, এ গ্রন্থটি কখনোই যিহোশূয়ের লেখা নয়।
প্রচলিত তাওরাতের কিছু বর্ণনা ও বিধানের সাথে যিহোশূয়ের পুস্তকের কিছু বর্ণনা ও বিধানের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য ও সংঘর্ষ রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টানদের দাবি অনুসারে যদি প্রচলিত তোরাহ মোশির রচিত হতো অথবা যিহোশূয়ের পুস্তকটি তার নিজের রচনা হতো তাহলে কখনোই মোশির শিষ্য যিহোশূয় মোশির তাওরাতের বিরোধিতা করতেন না এবং তার নিজের উপস্থিতিতে মোশি যে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন তা পাল্টে দিতেন না।
উপরের আলোচনা থেকে পাঠক পুরাতন নিয়মের মূল ৬টি গ্রন্থ- তাওরাত ও যিহোশূয়ের পু্স্তকের অবস্থা জানতে পেরেছেন। পুরাতন নিয়মের অবশিষ্ট ৩৩টি বা ৪০টি পুস্তকের অবস্থা এ ছয়টি পুস্তকের চেয়ে মোটেও ভাল নয়। এগুলির লেখকদের নাম, পরিচয় ও সংকলনের সময়কালের বিষয়ে ইয়াহূদী-খৃস্টান গবেষকদের মতভেদ আরো বেশি ব্যাপক। অনেক গবেষক পুরাতন নিয়মের অনেকগুলি পুস্তক পুরাতন নিয়মের অংশ নয় বলে উল্লেখ করেছেন এবং এগুলিকে একেবারেই বাতিল ও কল্পকাহিনী বলে গণ্য করেছেন। তারা দাবি করেছেন যে, প্রাচীন ইয়াহূদীগণ অনেক জাল কাহিনী ও জাল পুস্তক ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সংযুক্ত করেছেন, যেগুলি মূলত বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত।
এগুলি সবই সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট বাইবেলের কোনো গ্রন্থেরই অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা নেই। তারা যা কিছু বলেন সবই আন্দাজ ও কল্পনা মাত্র। আর কোনো গ্রন্থকে কোনো নবী, ভাববাদী বা ইলহামপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামে প্রচার করলেই তা ঐশ্বরিক বা ঐশী গ্রন্থরূপে স্বীকৃত হয় না, বরং গ্রন্থটি সত্যই উক্ত ব্যক্তি লিখেছেন বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়।
১. ২. ৩. ইঞ্জিল বা সুসমাচারগুলির সূত্র পর্যালোচনা
১. ২. ৩. ১. মথিলিখিত সুসমাচার
সকল প্রাচীন খৃস্টান ধর্মবেত্তা পণ্ডিত ও অগণিত আধুনিক খৃস্টান পণ্ডিত একমত যে, মথিলিখিত সুসমাচারটি মূলত হিব্রু ভাষায় লেখা ছিল। খৃস্টান সম্প্রদায়গুলির বিকৃতির কারণে এবং প্রথম তিন শতাব্দীর সমস্যাদির কারণে মূল হিব্রু গ্রন্থটি হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত হিব্রু সংস্করণ গ্রন্থটির গ্রীক অনুবাদের অনুবাদ। বস্তুত সুসমাচারটির গ্রীক অনুবাদই গ্রন্থটির প্রাচীনতম সূত্র হিসেবে বিদ্যমান। এই গ্রীক অনুবাদটিরও কোনো সূত্র পরম্পরা তাদের নিকট নেই। এমনকি, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতরূপে জানা যায়নি যে, এই গ্রীক অনুবাদটির অনুবাদক কে? প্রাচীন খৃস্টান ধর্মবেত্তা পণ্ডিত জীরোম (St. Jerome: ৩৪২-৪২০ খৃ) তা স্বীকার করেছেন। অনুবাদকের নামই যখন জানা যায়নি, তখন অনুবাদকের সততা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি অবস্থা জানার আর সুযোগ কোথায়!?
খৃস্টান ধর্মগুরু পণ্ডিতগণ সম্পূর্ণ আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেন যে, সম্ভবত অমুক বা তমুক হয়ত অনুবাদ করেছিলেন। এরূপ প্রমাণবিহীন আন্দাজ ও অনুমানের উপর নির্ভর করে কোনো পুস্তকের লেখকের নামও নির্ধারণ করা যায় না।
মথির নামে প্রচলিত ইঞ্জিলই প্রথম এবং প্রাচীনতন ইঞ্জিল। এ ইঞ্জিলটির বিষয়ে পঞ্চাশেরও অধিক খৃস্টান গবেষক পণ্ডিত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যীশুর শিষ্য মথি এর লেখক নন। নতুন নিয়মের সকল পুস্তক ও পত্র গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। কেবলমাত্র মথির ইঞ্জিল ও ইব্রীয়দের প্রতি পত্র। অগণিত অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণের আলোকে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে এ দুটি পুস্তক হিব্রু ভাষায় লেখা হয়েছে। সুসমাচার লেখকগণের মধ্যে একমাত্র মথিই তার সুসমাচার হিব্রু ভাষায় লিখেন। ফিলিস্তিনের হিব্রুভাষী ইয়াহূদীদের উদ্দেশ্যে এ সুসমাচারটি লেখা হয়, যারা ইব্রাহীম ও দাউদের বংশের একজন ত্রানকর্তার অপেক্ষা করছিলেন। এরপর বিভিন্ন অনুবাদক প্রত্যেকে নিজ নিজ বুঝ ও সাধ্য অনুসারের সুসমাচারটি অনুবাদ করেন। মথি নিজে তার সুসমাচারটি গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করেন নি। প্রচলিত গ্রীক সুসমাচারটির অনুবাদক কে বা তার পরিচয় কি তা কেউই জানেন না। অন্যান্য সুসমাচার গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। কেউ যদি বলেন যে, মথি তার সুসমাচারটি গ্রীক ভাষায় লিখেছিলেন তাহলে তিনি ভুল ও অসত্য বলবেন।
পণ্ডিত ও গবেষক নর্টন একটি বৃহদাকার পুস্তক রচনা করেছেন। এ পুস্তকে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রচলিত তোরাহ নিঃসন্দেহে ও নিশ্চিতরূপে জাল ও বানোয়াট। এগুলি কখনোই মোশির রচনা নয়। তিনি নতুন নিয়ম বা সুসমাচারের পুস্তকগুলির মূল অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। তবে সেগুলির মধ্যে অনেক বিকৃতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তিনি এ পুস্তকে লিখেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে, মথি তাঁর সুসমাচারটি হিব্রু ভাষায় লিখেছিলেন। কারণ প্রাচীন যে সকল পণ্ডিত বিষয়টি আলোচনা করেছেন তাঁদের সকলেই ঐকমত্যের সাথে এই একই কথা বলেছেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, মথি হিব্রু ভাষায় সুসমাচার লিখেন। কেনো একজন প্রাচীন পণ্ডিতও তাঁদের বিপরীত কিছু বলেন নি। তাঁদের এ সাক্ষ্যের বিপরীতে একটি আপত্তিও পাওয়া যায় নি যে কারণে এ বিষয়ে কোনো গবেষণা বা পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে। এটি অত্যন্ত বড় সাক্ষ্য ও শক্তিশালী প্রমাণ। উপরন্তু প্রাচীন ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সেন্ট জিরোমের যুগ পর্যন্ত (মৃত্যু ৪২০ খৃ) মথির লিখিত হিব্রু সুসমাচারটি ইব্রীয় খৃস্টান বা ইয়াহূদী ধর্ম থেকে আগত খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারটি হারিয়ে যাওয়া মূল হিব্রু সুসমাচারটির অনুবাদ, তবে অনুবাদকের নাম, পরিচয় বা অন্য কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারের বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপনা প্রাচীন পণ্ডিতগণের বক্তব্য প্রমাণ করে। পুস্তকটির উপস্থাপনা ও বর্ণনা পদ্ধতি থেকে বুঝা যায় যে, পুস্তকটি মথির নিজের রচিত নয়। কারণ মথি যীশুর প্রেরিত ১২ শিষ্যের একজন ছিলেন। খৃস্টের অধিকাংশ অবস্থা ও ঘটনা তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি নিজে যদি এই সুসমাচারটি লিখতেন তবে পুস্তকটির কোথাও না কোথাও তাঁর উপস্থাপনা থেকে প্রকাশ পেত যে, তিনি তাঁর নিজে দেখা ঘটনাগুলি লিখছেন। এছাড়া তিনি নিজের কথা বলতে অবশ্যই উত্তম পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করতেন। প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত লেখকগণ এভাবেই লিখেন। এভাবে প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারের ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটি মথির নিজের লেখা নয়।
মানিকীয (Manichees) সম্প্রদায়ের চতুর্থ শতাব্দীর অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস বলেন, মথির নামে প্রচলিত সুসমাচারটি তাঁর রচিত নয়।
মারসিওনের (Marcion) অনুসারিগণ এবং এবোনাইট (Ebionites) সম্প্রদায়ের মতে প্রচলিত গ্রন্থটির প্রথম দুটি অধ্যায় জাল ও সংযোজিত। ইউনিট্যারিয়ান (একত্ববাদী) খৃস্টান সম্প্রদায় এবং পাদ্রী উইলিয়ামসও অধ্যায় দুটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নর্টন এ দুটি অধ্যায় এবং এ সুসমাচারের অধিকাংশ বক্তব্য অনির্ভরযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
১. ২. ৩. ২. মার্কলিখিত সুসমাচার
৪র্থ-৫ম শতাব্দীর প্রসিদ্ধতম খৃস্টান পণ্ডিত সেন্ট জীরোম লিখেছেন যে, কোনো কোনো প্রাচীন ধর্মগুরু পণ্ডিত মার্কলিখিত সুসমাচারের শেষ অধ্যায়ের (১৬ অধ্যায়ের) বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন। কোনো কোনো প্রাচীন পণ্ডিত ধর্মগুরু লূকলিখিত সুসমাচারের ২২ অধ্যায়ের কিছু শ্লোকের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতেন। কতিপয় প্রাচীন ধর্মগুরু পণ্ডিত এই সুসমাচারের প্রথম দুইটি অধ্যায়ের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন। মারসিওনীয় সম্প্রদায়ের খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত বাইবেলে লুকলিখিত সুসমাচারে এই অধ্যায় দুটি নেই।
গবেষক পণ্ডিত নর্টন মার্কলিখিত সুসমাচারের বিষয়ে লিখেছেন যে, এ সুসমাচারের ১৬শ অধ্যায়ের ৯ শ্লোক থেকে শেষ (২০ শ্লোক) পর্যন্ত অংশটুকু জাল ও পরবর্তীকালে সংযোজিত। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, বাইবেল লেখক ও লিপিকারগণ কোনো কথাকে গ্রন্থ থেকে বের করার চেয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিতেই বেশি পারঙ্গম ও অধিক আগ্রহী ছিলেন।
১. ২. ৩. ৩. যোহনলিখিত সুসমাচার
কোনো পূর্ণ সূত্র পরম্পরার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি যে, এই সুসমাচারটি যীশুর শিষ্য যোহন কর্তৃক রচিত। বরং বিভিন্ন বিষয় প্রমাণ করে যে, এ সুসমাচারটি যীশুর শিষ্য যোহনের লেখা নয়:
প্রথম বিষয়: যোহনলিখিত সুসমাচার পাঠ করে মোটেও বুঝা যায় না যে যীশুর শিষ্য যোহন নিজের চোখে দেখে সে সকল বিষয় লিখছেন। বরং বাহ্যত বুঝা যায় যে, পরবর্তী কোনো ব্যক্তি এগুলির বর্ণনা করছেন। উপরন্তু এ সুসমাচারের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে অন্য কেউ, যীশু শিষ্য যোহন নন। যোহনলিখিত সুসমাচারের শেষে, ২১ অধ্যায়ের ২৪ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘সেই শিষ্যই এই সকল বিষয়ে সাক্ষ্য দিতেছেন এবং এই সকল বিষয় লিখিয়াছেন; আর আমরা জানি, তাঁহার সাক্ষ্য সত্য।’’
এখানে আমরা দেখছি যে, সুসমাচারের লেখক শিষ্য যোহনের বিষয়ে বলছেন: ‘সেই শিষ্যই এই সকল বিষয়ে সাক্ষ্য দিতেছেন’, ‘তাঁহার সাক্ষ্য’, ইত্যাদি। এভাবে তিনি যোহনের জন্য নাম পুরুষে সর্বনাম ব্যবহার করছেন। পক্ষান্তরে লেখক তার নিজের জন্য উত্তম পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করে বলছেন: ‘আমরা জানি’ । এথেকে স্পষ্টতই জানা যায় যে, এই সুসমাচারের লেখক যোহন ছাড়া অন্য কেউ।
দ্বিতীয় বিষয়: দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকে অনেকেই এই ‘সুসমাচারটিকে’ অস্বীকার করেন এবং বলেন যে, এটি যোহনের লিখিত নয়। এ সময়ে আরিনূস (১৩০-২০০খৃ) জীবিত ছিলেন। আরিনূস ছিলেন পোলিকার্পের (St. Polycarp, Bishop of Smyrna c. 69-155) শিষ্য। আর পোলিকার্প ছিলেন যীশু-শিষ্য যোহনের শিষ্য। যখন মানুষেরা যোহনের নামে প্রচারিত এই সুসমাচারটি অস্বীকার করছিলেন তখন তিনি একটিবারের জন্যও বলেন নি যে, আমি আমার গুরু পোলিকার্পকে বলতে শুনেছি যে, এই সুসমাচারটি তার গুরু যোহনের রচিত।
একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যীশু শিষ্য যোহন যদি কোনো ‘সুসমাচার’ লিখে থাকতেন তাহলে তার শিষ্য পোলিকার্প তা জানতেন এবং আরিনূসকে বলতেন।
আরিনূস মৌখিক বর্ণনা মুখস্থ করতে অতীব আগ্রহী ছিলেন। তিনি পোলিকার্প থেকে অনেক গুরুত্বহীন বিষয় মুখস্ত ও বর্ণনা করেছেন। একথা কল্পনা করা যায় না যে, আরিনূস তার গুরু পোলিকার্প থেকে বিভিন্ন অতি সাধারণ বিষয় বারংবার শুনবেন এবং উদ্ধৃত করবেন, অথচ সুসমাচার-এর মত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটিবারও শুনবেন না বা শুনলেও তা বলবেন না, এমনকি বিতর্ক ও সংঘাতের মধ্যেও সে বিষয়ে কিছু বলবেন না।
সর্বোপরি আরিনূসই সর্বপ্রথম ২০০ খৃস্টাব্দের দিকে প্রথম তিনটি সুসমাচার: মথি, মার্ক ও লূকের সুসমাচারের কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য থেকেই সর্বপ্রথম এ তিনটি পুস্তকের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু তিনি যোহনের সুসমাচারের কথা উল্লেখ করেন নি। এরপর ২১৬ খৃস্টাব্দে ক্লিমেন্ট ইসকাদ্রিয়ানূস (Clement of Alexandira) এ তিনটি গসপেলের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনিই প্রথম যোহন লিখিত সুসমাচারের কথা উল্লেখ করেন। যারা বিশ্বাস বা দাবি করেন যে, এ গ্রন্থটি যীশু শিষ্য যোহনের লেখা তারা তাদের মতের পক্ষে একটিও প্রমাণ পেশ করতে পারেন নি, এমনকি আরিনূসের বক্তব্যে তাদের মতের সমর্থন পাওয়া যায় নি।
তৃতীয় বিষয়: শুধু মুসলিম পণ্ডিতগণই নয়, প্রাচীনকাল থেকেই অনেক খৃস্টান ও অখৃস্টান পণ্ডিত বলেছেন যে, এ সুসমাচারটি যোহনের লিখিত নয়। কয়েকটি নমুনা দেখুন:
(১) দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের একজন প্রসিদ্ধ পৌত্তলিক পণ্ডিত ছিলেন সেলসাস (Celsus)। তিনি সেই সময়েই চিৎকার করে বলতেন যে, খৃস্টানগণ তাদের ইঞ্জিলগুলি তিনবার বা চারবার বা তারও বেশিবার কঠিনভাবে পরিবর্তন করেছে, এমনকি সেগুলির বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।
(২) ‘মানীকীয’ (Manichees/Manichaeism) সম্প্রদায়ের অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস চতুর্থ শতকে চিৎকার করে ঘোষণা করেছেন: ‘‘একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, নতুন নিয়ম যীশু খৃস্ট লিখেন নি এবং তার শিষ্যগণও লিখেন নি। বরং কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তা লিখেছে এবং সেগুলিকে যীশুর শিষ্যগণ এবং তাদের সহচরদের নামে চালিয়েছে। কারণ সে ভয় পেয়েছিল যে, যেহেতু যীশু সময়কালীন যে সকল ঘটনা সে লিখেছে সেগুলি সে প্রত্যক্ষ করেনি এজন্য মানুষেরা তার লেখা গ্রন্থ গ্রহণ করবে না। এই জালিয়াতি কর্মের মাধ্যমে সে যীশুর অনুসারীদেরকে অত্যন্ত কঠিনভাবে কষ্ট দিয়েছে। কারণ সে অগণিত ভুল ও বৈপরীত্যে ভরা কিছু বই লিখেছে।’’
(৩) ইস্টাডলিন লিখেছেন যে, ‘‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আলেকজেন্দ্রীয় স্কুলের একজন ছাত্র যোহনলিখিত সুসমাচারটি লিখেছে।’’
(৪) পণ্ডিত ব্রিটিশনিডার বলেছেন: ‘‘এই সুসমাচারটির কোনো কিছু এবং যোহনের নামে প্রচলিত পত্রগুলি যোহনের নিজের রচিত নয়; বরং দ্বিতীয় শতকের শুরুতে কোনো একজন তা রচনা করেছে।’’
(৫) প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ক্রোটিস বলেছেন: ‘‘এই সুসমাচারটি ছিল ২০ অধ্যায়। যোহনের মৃত্যুর পরে অফসিস চার্চের পক্ষ থেকে এতে ২১ অধ্যায়টি সংযুক্ত করা হয়।’’
(৬) দ্বিতীয় শতকে বিদ্যমান ‘এ্যলোগিন’ নামক খৃস্টীয় সম্প্রদায় এই সুসমাচারটি এবং যোহনের নামে প্রচালিত পত্রগুলি মানতেন না এবং এগুলিকে বাইবেলের অংশ মনে করতেন না।
বাইবেল বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত হর্ণ-এর বক্তব্য দিয়ে এ আলোচনা শেষ করছি। তিনি তার রচিত বাইবেলের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন যে, প্রাচীন চার্চের বা খৃস্টধর্মের ঐতিহাসিকগণের পক্ষ থেকে সুসমাচারগুলির রচনার সময় ও অবস্থা সম্পর্কে সে সকল তথ্য আমরা পেয়েছি সেগুলি অনির্ধারিত ও অসম্পূর্ণ। এ সকল মতামত ও বক্তব্য আমাদেরকে কোনো একটি নির্ধারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয় না। প্রথম যুগের ধর্মগুরু পণ্ডিতগণ বানোয়াট, বাতুল বা দুর্বল বর্ণনাগুলিকেই সত্য বলে গ্রহণ করেছেন এবং লিখে রেখেছেন। তাদের পরে যারা এসেছেন তারা পূর্ববর্তীদের প্রতি ভক্তির কারণে এসকল বাতুল বিবরণগুলিকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। এ সকল সত্য ও মিথ্যা বিবরণ এক লেখক থেকে অন্য লেখক গ্রহণ করেছেন। এখন বর্তমান যুগে এগুলির মধ্য থেকে সঠিক তথ্য বাছাই করার কোনো সুযোগ আর নেই।
অতঃপর হর্ন উল্লেখ করেছেন যে, সুসমাচারগুলির প্রণয়নের সময়কাল সম্পর্কে নিম্নরূপ মতভেদ উল্লেখ করেছেন:
ক. মথিলিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটি ৩৭ অথবা ৩৮ অথবা ৪১ অথবা ৪৩ অথবা ৪৮ অথবা ৬১ অথবা ৬২ অথবা ৬৩ অথবা ৬৪ খৃস্টাব্দে রচিত হয়েছে।
খ. মার্কলিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটি ৫৬ অথবা তার পরে ৬৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে কোনো সময়ে রচিত হয়েছে। যতদূর মনে হয়, গ্রন্থটি ৬০ খৃস্টাব্দে অথবা ৬৩ খৃস্টাব্দে রচনা করা হয়েছে।
গ. লূকলিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটি ৫৩ অথবা ৬৩ অথবা ৬৪ খৃস্টাব্দে রচিত হয়েছে।
ঘ. যোহনলিখিত সুসমাচার। এটি ৬৮ অথবা ৬৯ অথবা ৭০ অথবা ৯৭ অথবা ৯৮ খৃস্টাব্দে রচিত হয়েছে।
উপরের আলোচনা থেকে পাঠক খৃস্টধর্মের মূল চারটি ‘ইঞ্জিল’ বা সুসমাচারের অবস্থা জানতে পেরেছেন। নতুন নিয়মের অবশিষ্ট পুস্তক বা পত্রগুলির অবস্থার এগুলির চেয়ে মোটেও ভাল নয়।
১. ২. ৪. পবিত্র বাইবেলের পুস্তকগুলি ঐশী নয়
উপরের আলোচনা থেকে জ্ঞানী পাঠকের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, খৃস্টানগণের নিকট বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়মের গ্রন্থগুলির কোনোটিরই কোনো মূল উৎস বা সূত্র পরম্পরা সংরক্ষিত নেই। এজন্য ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের এ কথা দাবি করার সুযোগ নেই যে, ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ নামে প্রচারিত পুস্তকসংকলনের পু্স্তকগুলি আসমানী, ঐশ্বরিক বা ঐশী পুস্তক বা ওহী, ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণার (Divine Inspiration, Revelation) ভিত্তিতে লেখা পুস্তক। যদি কেউ তা দাবি করেন তবে তা ভিত্তিহীন ও বাতিল বলে প্রমাণিত হবে। উপরের আলোচনার পাশাপাশি নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষ্য করুন:
(১) নতুন ও পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলিতে উল্লিখিত তথ্য ও বিবরণের মধ্যে অগণিত অর্থগত বৈপরীত্য রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টান গবেষক, পণ্ডিত ও ভাষ্যকারগণ এ সকল বৈপরীত্যের কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, দুই বা ততোধিক পরস্পর-বিরোধী বিবরণের একটি সত্য ও অন্যটি বা অন্যগুলি মিথ্যা ও জাল। ইচ্ছাকৃত বিকৃতি অথবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে এই মিথ্যা তথ্যটি পরিবেশিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এ সকল বৈপরীত্য ও পরস্পরবিরোধিতা সমন্বয়ের জন্য এমন অবাস্তব ও ফালতু কথা বলেছেন যা কোনো স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন বিবেক গ্রহণ করতে পারে না। ‘ঐশ্বরিক প্রেরণা’ বা প্রত্যাদেশ (Divine Inspiration/ Revelation)-লব্ধ কথায় কখনো এরূপ অর্থগত বৈপরীত্য ও ভুল থাকতে পারে না। ঐশী কথা ভুলের শত যোজন দূরে থাকবে।
বাইবেল ভাষ্যকার হর্ন তার বাইবেলের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন যে, বাইবেলের লেখকগণ বা বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকের রচয়িতাদের প্রক্যেকের নিজ নিজ প্রকৃতি, অভ্যাস ও জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে লিখার অনুমতি ছিল। ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে তারা প্রচলিত জ্ঞানের ন্যায় ব্যবহার করতেন। একথা কল্পনা করা যায় না যে, তারা যে সকল বিষয় লিখেছেন বা যে সকল বিধিবিধান প্রদান করেছেন সেগুলি সবই তারা ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ বা প্রেরণার মাধ্যমে লাভ করেছিলেন।
হেনরী ও স্কট-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ লিখেছেন যে, এ কথা মোটেও জরুরী নয় যে, একজন ভাববাদী (তার পুস্তকে) যা কিছু লিখেছেন তা সবই ঐশী প্রেরণা বা প্রত্যাদেশ হবে বা বাইবেলের (canonical text) অংশ হবে।
‘এনসাইক্লোপীডিয়া ব্রিটানিকা’-য় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনেক খৃস্টান পণ্ডিতই মনে করেন, বাইবেলের পুস্তকাবলির সকল কথা এবং সকল বর্ণনা ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণা (Inspiration)-লব্ধ নয়। যারা বলেন যে, বাইবেলের পুস্তকাবলির মধ্যে উল্লিখিত সকল কথাই ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ, তাদের জন্য এ দাবি প্রমাণ করা সহজ হবে না।
আব্রাহাম রীস (Abraham Rees) অনেক গবেষক পণ্ডিতের সমন্বয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় (১৮০২-১৮২০ সালে) ৪৫ খণ্ডে একটি বিশ্বকোষ প্রকাশ করেন, যা রীস এনসাইক্লোপীডিয়া (New Cyclopaedia; or, Universal Dictionary of Arts and Sciences) নামে পরিচিত। এ বিশ্বকোষে লেখা হয়েছে:
বাইবেলের এ সকল পুস্তকের রচয়িতাদের কর্মে ও কথায় অনেক ভুলভ্রান্তি ও বৈপরীত্য রয়েছে। প্রাচীন খৃস্টানগণ প্রেরিতদেরকে ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে বা ঐশ্বরিক প্রেরণায় ভুলভ্রান্তি থেকে সংরক্ষিত বলে বিশ্বাস করতেন না; কারণ, কখনো কখনো তারা তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।
অনুরূপভাবে মার্ক, লূক ও অনুরূপ ব্যক্তিবর্গ, যারা যীশুর প্রেরিত শিষ্যগণের শিষ্য ছিলেন, তাদের রচিত পু্স্তকগুলির বিষয়েও অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন যে, এগুলি ঐশ্বরিক প্রেরণা বা ইলহাম দ্বারা লিখিত পুস্তক নয়, এগুলি নিতান্তই মানবিক রচনা। এজন্য প্রটেস্ট্যন্ট সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ধর্মগুরুগণ মার্ক ও লূকের লেখা ইঞ্জিল ও লূকের লেখা প্রেরিতগণের কার্যবিবরণকে ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণানির্ভর নয় বরং মানবীয় কর্ম বলে গণ্য করেছেন।
(২) প্রসিদ্ধ বাইবেল বিশারদ ও খৃস্টধর্ম গবেষক খৃস্টান পণ্ডিত মহাত্মা নরটন পণ্ডিত একহার্ন থেকে উদ্ধৃত করেছেন: খৃস্টান ধর্মের প্রথম অবস্থায় যীশুর অবস্থাদি বর্ণনার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা ছিল। একথা বলা যায় যে, এই পুস্তিকাটিই ছিল ‘মূল সুসমাচার’। যে সকল নতুন খৃস্টান খৃস্টের কথাবার্তা নিজের কানে শুনেন নি এবং তাঁর অবস্থাদি স্বচক্ষে দেখেন নি, সম্ভবত তাদের জন্য এই পুস্তিকাটি রচনা করা হয়েছিল। এই সুসমাচারটি একটি অতি সাধারণ সংকলনের আকৃতিতে ছিল। এতে যীশুর ঘটনাবলি সুশৃঙ্খল পরম্পরায় লিখিত ছিল না।
এ সুসমাচারটিই ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রচলিত সকল ‘সুসমাচারের’ মূল উৎস। মথি, মার্ক ও লূকের উৎসও ছিল এই সুসমাচারটি। এ তিনটি ছাড়া আরো অনেক সুসমাচার এ সময়ে লেখা হয়। এ সকল সুসমাচার পরবর্তী মানুষদের হাতে পড়ে। তারা এগুলির মধ্যে অপূর্ণতা অনুভব করেন এবং বিভিন্ন সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে অপূর্ণতা পূর্ণ করতে থাকেন। এভাবে সংযোজন ও সংমিশ্রণের ফলে সুসমাচারগুলিতে সত্য এবং মিথ্যা সংমিশ্রিত হয়ে গিয়েছে। অনুরূপভাবে সত্য ঘটনার সাথে দীর্ঘ বানোয়াট কাহিনীগুলি সংমিশ্রিত হয়ে একটি অত্যন্ত কদর্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। এই কাহিনীগুলি যতবারই এক মুখ থেকে অন্য মুখে গিয়েছে, ততবারই তাতে নতুন অপছন্দনীয় সংযোজন যুক্ত হয়েছে। আবর্তনের পরিমাণে অসংলগ্ন সংযোজন বেড়েছে।
একারণে দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে অথবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরুতে খৃস্টীয় চার্চ সত্য সুসমাচার সংরক্ষণের জন্য সচেষ্ট হয়। সে সময়ে প্রচলিত ৭০টিরও অধিক ইঞ্জিল বা সুসমাচারের মধ্য থকে এ চারটি ইঞ্জিল বাছাই করে। খৃস্টীয় চার্চ চায় যে, মানুষেরা অন্য সকল প্রচলিত সুসমাচার বাদ দিয়ে শুধু এই চারটিই মেনে চলে। প্রাচীন প্রচারকদের প্রচারকার্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য যে মূল সুসমাচারটি সংকলন করা হয়েছিল, যদি চার্চ সেই মূল সুসমাচারটি সকল সংযোজন ও বৃদ্ধি থেকে মুক্ত করে প্রকাশ করত তবে পরবর্তী প্রজন্মগুলি তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকতো। কিন্তু এ কাজটি তাদের জন্য কঠিন ছিল। কারণ ইঞ্জিলের পাণ্ডুলিপিগুলির মধ্যে এরূপ সংযোজন ছিল খুবই বেশি এবং একটি পাণ্ডুলিপিও এইরূপ বৃদ্ধি ও সংযোজন থেকে মুক্ত ছিল না। ফলে সংযোজন থেকে মূল বক্তব্য পৃথক করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে যায়।
প্রাচীন যুগের অধিকাংশ ধর্মবেত্তা পণ্ডিতই প্রচলিত এ সুসমাচারগুলির অনেক অংশ সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু তারা তা বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করতে পারেন নি। সে যুগে প্রেস বা মুদ্রণ-যন্ত্র ছিল না। একটি পাণ্ডুলিপি একজন মানুষের মালিকানাধীন। প্রত্যেক মালিক তার পাণ্ডুলিপিটির মধ্যে তার নিজের পক্ষ থেকে ইচ্ছামত কিছু বক্তব্য বা গল্পকাহিনী সংযোজন করতেন বা পুস্তকের মূল পাঠের নীচে বা পার্শ্বে লিখে রাখতেন। এরপর যখন এ পাণ্ডুলিপি থেকে অনেক কপি করা হতো, তখন এ কপিগুলি শুধু মূল লেখকের কথাই কপি করছে, না সংযোজিত বাক্যগুলিও কপি করছে তা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো না। অনেক ধর্মগুরু পণ্ডিত কঠিনভাবে অভিযোগ করেছেন যে, তাদের লেখা বইগুলি কিছুদিনের মধ্যেই লিপিকার ও পাণ্ডুলিপির মালিকেরা বিকৃত করে ফেলেছে। তারা অভিযোগ করতেন যে, শয়তানের শিষ্যরা এগুলির মধ্যে অপবিত্র কথা সংযোজন করেছে, কিছু বিষয় বের করে দিয়েছে এবং তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় সংযোজন করে। এভাবে পবিত্র পুস্তকগুলির মূল রূপও সংরক্ষিত থাকে নি। ফলে এগুলি ‘‘ঐশ্বরিক’’, ‘‘ঐশী’’ বা ঐশ্বরিক প্রেরণাভিত্তিক গ্রন্থ বলে গণ্য হওয়ার যোগ্যতা হারায়।
তৎকালীন মানুষদের মধ্যে এরূপ সংযোজনের অভ্যাসের বড় প্রমাণ যে, সে যুগের খৃস্টান লেখকগণের রীতি ছিল, তাদের লিখনির মধ্যে কেউ যেন কোনো বিকৃতি না করে সে বিষয়ে তারা কঠিন প্রতিজ্ঞা ও অভিশাপের ঘোষণা দিতেন।
যীশুর ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ই ঘটেছে। এ বিকৃতি ও সংযোজন এরূপ প্রসিদ্ধি লাভ করে যে, রোমান পণ্ডিত সিলসূস অভিযোগ করেন, তারা তিনবার বা চারবার বা তার বেশি বার তাদের সুসমাচারগুলিকে পরিবর্তন করেছে।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তৎকালীন মানুষদের গবেষণা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের কোনো আগ্রহ ও মানসিকতা ছিল না। খৃস্টীয় ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষেরা তাদের কাছে সংরক্ষিত ওয়াজ-উপদেশের বাক্যাবলি এবং যীশুর বিভিন্ন ঘটনাবলি নিজেদের জ্ঞানানুসারে পরিবর্তন পরিবর্ধন করতেন। প্রথম প্রজন্মের খৃস্টানগণই এ অভ্যাস চালু করেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মেও তা অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই অভ্যাস অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিল। ফলে খৃস্টধর্মের বিরোধীরাও বিষয়টি অবগত ছিলেন। দ্বিতীয় শতকের শেষে ক্লীমেন্স (Clement of Alexandira) উল্লেখ করেছেন যে, কিছু মানুষের কর্মই ছিল সুসমাচারগুলি বিকৃত করা।
একহার্নের বক্ত্যবের উপর মন্তব্য করে নর্টন বলেন: কেউ যেন মনে না করে যে, এ মতটি একহার্নের একার মত। অনেক সমসাময়িক জার্মান গবেষকই একহার্নের সাথে একমত। এ সাতটি স্থান সংযোজিত ও ঐশ্বরিক প্রেরণা-লব্ধ নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যীশুর অলৌকিক চিহ্নসমূহ উল্লেখ করার ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা সংযোজন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, সত্যকে মিথ্যা থেকে বাছাই করা বর্তমান যুগে খুবই কঠিন।
প্রিয় পাঠক, যে পুস্তকের মধ্যে সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে গিয়েছে তাকে কি ‘ঐশ্বরিক’ বা ইলহাম-প্রাপ্ত পু্স্তক (Divine Scripture) বলা যায়? ইয়াহূদী-খৃস্টান কারো কি এ অধিকার আছে যে, বাইবেলের সকল পুস্তককে ঐশ্বরিক, ইলহাম-প্রাপ্ত বা আসমানী কিতাব বলে দাবি করবেন? অথবা এ সকল পুস্তকের সকল তথ্য ও বর্ণনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বলে দাবি করবেন?
১. ২. ৫. পবিত্র বাইবেল বিষয়ে মুসলিম বিশ্বাস
ক. মূল তাওরাত ও ইঞ্জিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বেই হারিয়ে গিয়েছে।
আমরা মুসলিমগণ বিশ্বাস করি যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ মূল তাওরাত এবং ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ মূল ইঞ্জিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের পূর্বেই হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের নামে প্রচলিত বই দুইটি মূলত কোনো আল্লাহপ্রদত্ত গ্রন্থ নয়। বরং এই বই দুইটি হচ্ছে জীবনী ও ইতিহাসমূলক দুইটি সংকলন, যাতে সত্য ও মিথ্য সকল প্রকার কথা ও কাহিনী সংকলন করা হয়েছে।
আমরা কখনোই বলি না যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে তাওরাত ও ইঞ্জিল সঠিকরূপে বিদ্যমান ছিল এবং তারপরে তা বিকৃত করা হয়েছে। আমরা কখনোই তা বলি না। কোনো একজন মুসলিমও এরূপ কথা বলেন না বা বিশ্বাস করেন না।
খ. পৌল ভাক্ত বা ভন্ড ভাববাদী, তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়
পৌলের বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস যে, খৃস্টান ধর্মের প্রথম প্রজন্মে খৃস্টধর্মকে বিকৃত ও নষ্ট করতে যে সকল মিথ্যাবাদী ভাক্ত ভাববাদীর আবির্ভাব ঘটেছিল, পৌল ছিলেন তাদের অন্যতম। কাজেই নতুন নিয়মে সংকলিত পৌলের পত্রাবলি ও বক্তব্যসমূহ যদি প্রকৃতপক্ষে তার বলে প্রমাণিত হয় তাহলেও আমাদের নিকট সেগুলির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।
গ. প্রেরিতগণ সৎ ও ধার্মিক ছিলেন, ভাববাদী ছিলেন না
যীশুখৃস্টের প্রেরিত শিষ্যগণের সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো যে, তারা যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের পরে সততা ও ধার্মিকতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। তবে আমরা তাদেরকে ভাববাদী বা নবী বলে বিশ্বাস করি না। আমাদের দৃষ্টিতে তাদের বক্তব্য ও মতামত অন্যান্য সাধারণ সৎ ও ধার্মিক ধর্মবিদ পণ্ডিতের মতামতের মতই, ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
যীশু ও তার শিষ্যদের যুগ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত নতুন নিয়মের কোনো পুস্তক বা পত্রের কোনো অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা পাওয়া যায় না। মূল ইঞ্জিলও হারিয়ে গিয়েছে। একারণে নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান যীশুশিষ্য মথি ও যোহনের সুসমাচারদ্বয় এবং অন্যান্য প্রেরিতের পত্রগুলির বক্তব্য আসলেই তাদের কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত জানার কোনো উপায় নেই। সর্বোপরি প্রচলিত নতুন নিয়মের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত যে, প্রেরিতগণ, যীশুর শিষ্যগণ বা প্রথম যুগের খৃস্টানগণ যীশুর কথার মর্মও সঠিকভাবে বুঝতে পারতেন না। অপরদিকে মার্ক ও লূক যীশুর শিষ্য ছিলেন না। তারা ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণাপ্রাপ্ত ছিলেন বলে কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়। উপরন্তু তারা জীবনে একটিবারও যীশুকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন নি।
ঘ. মুসলিম বিশ্বাসে তাওরাত ও ইঞ্জিল
আমাদের বিশ্বাস অনুসারে মূসা আলাইহিস সালাম-কে প্রত্যাদেশ বা ওহীর (Revelation) মাধ্যমে যা প্রদান করা হয়েছে তাই তাওরাত। আর ঈসা আলাইহিস সালাম প্রত্যাদেশের মাধ্যমে যা প্রদান করা হয়েছে তাই হলো ইঞ্জিল। এর মধ্যে যা ছিল সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা প্রত্যাদেশ। এগুলির মধ্যে সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্ত বা সম্পাদনের মাধ্যমে সামান্যতম পরিবর্তন বা বিকৃতিও বৈধ নয়।
সূলা বাকারা-৮৭, সূরা হূদ-১১০, সূরা মুমিনূন-৪৯, সূরা ফুরকান-৩৫, সূরা কাসাস-৪৩, সূরা সাজদা-২৩, সূরা ফুসসিলাত-৪৫ আয়াতে আল্লাহ বলেন: ‘‘এবং আমি মূসাকে গ্রন্থ প্রদান করেছি।’’ সূরা মায়িদার-৪৬ ও সূরা হাদীদ-২৭ আয়াতে ঈসা আ. (যীশু) সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘এবং আমি তাকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি’’। সূরা মরিয়ম-৩০ আয়াতে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জবানীতে বলা হয়েছে: ‘‘আমাকে তিনি গ্রন্থ প্রদান করেছেন।’’ সূরা বাকারা-২৩৬ এবং সূরা আল-এমরান-৮৪ আয়াতে বলা হয়েছে: ‘‘এবং মূসা ও ঈসাকে যা প্রদান করা হয়েছে।’’, অর্থাৎ তাওরাত ও ইঞ্জিল।
কাজেই ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ নামে প্রচারিত পুস্তক সংকলনের মধ্যে নতুন ও পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত এ সকল ঐতিহাসিক পুস্তকাদি এবং পত্রাবলি কুরআনে উল্লিখিত তাওরাত ও ইঞ্জিল নয়। কাজেই এগুলি বিশ্বাস বা মান্য করা জরুরী নয়। এ সকল পুস্তক, পত্রাবলি এবং নতুন ও পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তকের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বাস নিম্নরূপ:
এ সকল পুস্তকের যে সকল কথা ও কাহিনীকে কুরআন সত্য বলেছে সেগুলি সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য। আমরা কোনো দ্বিধা ও আপত্তি ছাড়া সেগুলিকে সত্য বলে গ্রহণ করি। যেগুলিকে কুরআন মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছে সেগুলি নিঃসন্দেহে মিথ্যা ও প্রত্যাখ্যাত। আমরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেগুলিকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করি। আর যেগুলি বিষয়ে কুরআন সত্য ও মিথ্যা কোনো প্রকারের কিছু না বলে চুপ থেকেছে, সেগুলির বিষয়ে আমরাও চুপ থাকি। আমরা সেগুলিকে সত্য বলেও গ্রহণ করি না, আবার সরাসরি মিথ্যাও বলি না।
মহান আল্লাহ সূরা মায়েদার ৪৮ আয়াতে বলেন: ‘‘এবং আপনার উপর সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, তার পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষক-নিয়ন্ত্রক রূপে।’’
আল-কুরআনুল কারীমই পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের নিয়ন্ত্রক, সংরক্ষক বা বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার মাপকাঠি। কুরআন পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলির মধ্যে যা কিছু সত্য রয়েছে তা প্রকাশ ও সমর্থন করে এবং এগুলির মধ্যে বিদ্যমান মিথ্যা প্রকাশ করে দেয় এবং তার প্রতিবাদ করে।
যে সকল মুসলিম আলিম প্রচলিত তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিরুদ্ধে গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এগুলির মধ্যে বিদ্যমান মিথ্যা ও বিকৃতি প্রকাশ করেছেন, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিরুদ্ধে কলম ধরেন নি বা সেগুলিকে উদ্দেশ্য করে গ্রন্থ রচনা করেন নি। বরং তারা ‘‘পবিত্র বাইবেলের’’ পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান এ সকল ঐতিহাসিক ও জীবনীমূলক পুস্তকগুলির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, যেগুলি কয়েক শতাব্দী ধরে লেখা ও সংকলন করা হয়েছে এবং এরপর দাবি করা হয়েছে যে, এগুলি ওহী বা ইলহামের মাধ্যমে বা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত পুস্তক। এগুলির বিষয়েই আল্লাহ সূরা বাকারার ৭৮৯ আয়াতে/ শ্লোকে বলেছেন: ‘‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং এরপর বলে: এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে; যেন তারা এগুলির দ্বারা সামান্য বিনিময়মূল্য লাভ করতে পারে। কাজেই যা তাদের হাতগুলি লিখেছে তার জন্য তাদের দুর্ভোগ এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্যও তাদের দুর্ভোগ।”
মুসলিম উম্মাহর সকলেই একমত যে, আল্লাহর নিকট থেকে ওহীর মাধ্যমে গ্রহণ করে মূসা আলাইহিস সালাম যা মুখে উচ্চারণ করেছিলেন তাই প্রকৃত তাওরাহ। আর আল্লাহর নিকট থেকে ওহীর মাধ্যমে গ্রহণ করে ঈসা আলাইহিস সালাম যা মুখে উচ্চারণ করেছিলেন তাই প্রকৃত ইঞ্জিল। আর ‘‘পবিত্র বাইবেল’’-এর পুরাতন ও নতুন নিয়ম বা ‘‘তাওরাত শরীফ’’, ‘‘ইঞ্জিল শরীফ’’ বা ‘‘যাবূর শরীফ’’ নামে প্রচলিত পুস্তকগুলি কখনোই সেই তাওরাত, ইঞ্জিল বা যাবূর নয়।
ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত তাওরাতের মূল তিনটি সংস্করণ রয়েছে বা তিন প্রকারের ‘‘তাওরাত’’ রয়েছে। আর ‘‘ইঞ্জিল’’ বা সুসমাচার রয়েছে চারটি। এগুলির মধ্যে রয়েছে বৈপরীত্য ও সংঘাত। অথচ মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর একটিই তাওরাত নাযিল হয়েছিল এবং ঈসা আলাইহিস সালাম একটিই ইঞ্জিল পেয়েছিলেন।
কুরআনে উল্লিখিত মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ মূল তাওরাত ও ইঞ্জিল যদি কেউ অস্বীকার করেন তবে তার ঈমান নষ্ট হবে। আর ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ নামে বা তাওরাত বা ইঞ্জিল নামে বর্তমানে প্রচলিত, আল্লাহর বাণী নাম দিয়ে বা নবী-রাসূলগণের লেখা বলে প্রচারিত জাল ও মিথ্যা এ সকল মিথ্যা গল্প, কাহিনী ও বিবরণ অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হওয়া তো দূরের কথা, বরং তাতে ঈমানী দায়িত্ব পালিত হবে। কারণ মহান আল্লাহর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং নবী-রাসূলগণের পবিত্রতা ও নিষ্পাপত্বের সাথে সাংঘর্ষিক এ সকল মিথ্যা ও জাল গল্প, কাহিনী ও বিবরণগুলির মিথ্যাচার ও জালিয়াতি প্রকাশ করা মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।
তাওরাতের প্রচলিত তিনটি সংস্করণ বা ভার্সনের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বৈপরীত্য। এগুলিতে রয়েছে অনেক ভুল ও পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। এতে মূসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু এবং মাওআব অঞ্চলে তার কবর দেওয়ার বিবরণ। আমরা নিশ্চিত যে, এগুলি কখনোই মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ বিশুদ্ধ তাওরাত নয়।
প্রচলিত চারটি ইঞ্জিল বা সুসমাচারের মধ্যেও রয়েছে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। এগুলির মধ্যে অনেক ভুল-ভ্রান্তি, বৈপরীত্য ও পরস্পর সাংঘর্ষিক বক্তব্য রয়েছে। এতে যীশুর ক্রুশারোহণ (খৃস্টানগণের বিশ্বাস অনুসারে), ক্রুশে মৃত্যু, তার কবরস্থ করণ ইত্যাদি বিবরণ রয়েছে। আমরা সুনিশ্চিত যে, এগুলি কখনোই ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ ইঞ্জিল নয়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বাইবেলের বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতি
পবিত্র বাইবেল নামে প্রচলিত এ গ্রন্থ-সংকলনের পুস্তকগুলি অগণিত বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতিতে ভরা। এ পরিচ্ছেদে আমরা তার সামান্য কিছু নমুনা আলোচনা করব।
১. ৩. ১. বৈপরীত্য ও পরস্পর বিরোধিতা
১- বিন্যামীনের সন্তানদের নাম ও সংখ্যায় বৈপরীত্য:
১ বংশাবলির (বংশাবলি ১ম খণ্ড) ৭ম অধ্যায়ের ৬ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘বিন্যামীনের সন্তান- বেলা, বেখর ও যিদীয়েল, তিন জন।’’
পক্ষান্তরে ১ বংশাবলিরই ৮ম অধ্যায়ের ১ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘বিন্যামীনের জ্যেষ্ঠ পুত্র বেলা, দ্বিতীয় অস্বেল, তৃতীয় অহর্হ, চতুর্থ নোহা ও পঞ্চম রাফা।’’
কিন্তু আদিপুস্তক ৪৬ অধ্যায়ের ২১ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘বিন্যামীনের পুত্র বেলা, বেখর, অস্বেল, গেরা, নামন, এহী, রোশ, মুপ্পীম, হুপ্পীম ও অর্দ।’’
তাহলে বিন্যামিনের সন্তান সংখ্যা প্রথম বক্তব্যে তিন জন এবং দ্বিতীয় বক্তব্যে ৫ জন। তাদের নামের বর্ণনাও পরস্পর বিরোধী, শুধু বেলার নামটি উভয় শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে, বাকিদের নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর তৃতীয় শ্লোকে বিন্যামীনের সন্তান সংখ্যা ১০ জন। নামগুলিও আলাদা। তৃতীয় শ্লোকের নামগুলির সাথে প্রথম শ্লোকের সাথে দুজনের নামের এবং দ্বিতীয় শ্লোকের দুজনের নামের মিল আছে। আর তিনটি শ্লোকের মিল আছে একমাত্র ‘‘বেলা’’ নামটি উল্লেখের ক্ষেত্রে।
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোকদ্বয় একই পুস্তকের। উভয় পুস্তকের লেখক ইয্রা ভাববাদী। এভাবে একই লেখকের লেখা একই পুস্তকের দুটি বক্তব্য পরস্পর বিরোধী বলে প্রমাণিত হলো। আবার তাওরাতের আদিপুস্তকের বক্তব্যের সাথে ইয্রার দুটি বক্তব্যের বৈপরীত্য প্রমাণিত হলো।
এ সুস্পষ্ট পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ইয়াহূদী ও খৃস্টান পণ্ডিতগণকে হতবাক করে দিয়েছে। তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ইয্রাই ভুল করেছেন। এ ভুলের কারণ হিসেবে তার উল্লেখ করেন যে, ইয্রা পুত্র ও পৌত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন নি এবং যে বংশতালিকা দেখে তিনি বংশাবলীর এই তালিকা লিখেছিলেন সেই মূল বংশতালিকাটি ছিল অসম্পূর্ণ।
২- ইস্রায়েল ও যিহূদা রাজ্যের সৈনিকদের সংখ্যার বৈপরীত্য
শমূয়েলের দ্বিতীয় পুস্তকের ২৪ অধ্যায়ের ৯ম শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পরে যোয়াব গণিত লোকদের সংখ্যা রাজার কাছে দিলেন; ইস্রায়েলে খড়্গ-ধারী আট লক্ষ বলবান লোক ছিল; আর যিহূদার পাঁচ লক্ষ লোক ছিল।’’
অপর দিকে বংশাবলি প্রথম খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘আর যোয়াব গণিত লোকদের সংখ্যা দায়ূদের কাছে দিলেন। সমস্ত ইস্রায়েলের এগার লক্ষ খড়্গধারী লোক, ও যিহূদার চারি লক্ষ সত্তর সহস্র খড়্গধারী লোক ছিল।’’
তাহলে প্রথম বর্ণনামতে ইস্রায়েলের যোদ্ধাসংখ্যা ৮,০০,০০০ এবং যিহূদার ৫,০০,০০০। আর দ্বিতীয় বর্ণনামতে তাদের সংখ্যা: ১১,০০,০০০ ও ৪,৭০,০০০। উভয় বর্ণনার মধ্যে বৈপরীত্যের পরিমাণ দেখুন! ইস্রায়েলের জনসংখ্যা বর্ণনায় ৩ লক্ষের কমবেশি এবং যিহূদার জনসংখ্যার বর্ণনায় ত্রিশ হাজারের কমবেশি।
বাইবেল ভাষ্যকার আদম ক্লার্ক তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে স্বীকার করেছেন যে, পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের মধ্যে কোনটি সঠিক তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। বস্তুত বাইবেলের ইতিহাস বিষয়ক পুস্তকগুলিতে ব্যাপক বিকৃতি ঘটেছে এবং এবিষয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা অবান্তর। বিকৃতি মেনে নেওয়াই উত্তম; কারণ তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই এবং বাইবেলের বর্ণনাকারী ও লিপিকারগণ ইলহাম-প্রাপ্ত বা ঐশী প্রেরণা প্রাপ্ত ছিলেন না।
৩. গাদ দর্শকের সংবাদের বৈপরীত্য
শমূয়েলের দ্বিতীয় পুস্তকের ২৪ অধ্যায়ের ১৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পরে গাদ দায়ূদের নিকটে আসিয়া তাঁহাকে জ্ঞাত করিলেন, কহিলেন, আপনার দেশে সাত বৎসর ব্যপিয়া কি দুর্ভিক্ষ হইবে? না আপনার বিপক্ষগণ যাবৎ আপনার পশ্চাতে পশ্চাতে তাড়া করে, তাবৎ আপনি তিন মাস পর্যন্ত তাহাদের অগ্রে অগ্রে পলায়ন করিবেন?...’’
অপর দিকে বংশাবলি প্রথম খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ১২ শ্লোক নিম্নরূপ: পরে গাদ দায়ূদের নিকটে আসি তাঁহাকে বলিলেন, সদাপ্রভু এই কথা কহেন, তুমি যেটা ইচ্ছা, গ্রহণ কর: হয় তিন বৎসর দুর্ভিক্ষ, নয় তিন মাস পর্যন্ত শত্রুদের খড়্গ তোমাকে পাইয়া বসিলে তোমার বিপক্ষ লোকদের সম্মুখে সংহার...।’’
উভয় বক্তব্যের মধ্যে দুর্ভিক্ষের সময় বর্ণনায় বৈপরীত্য রয়েছে। প্রথম শ্লোকে ৭ বৎসর ও দ্বিতীয় শ্লোকে ৩ বৎসর! বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ স্বীকার করেছেন যে, প্রথম শ্লোকের তথ্য ভুল। আদম ক্লার্ক বলেন: নিঃসন্দেহে বংশাবলির বক্তব্যই সঠিক, গ্রীক বাইবেলের ভাষ্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪- অহসিয় রাজার রাজ্যগ্রহণকালীন বয়স বর্ণনায় বৈপরীত্য:
রাজাবলি দ্বিতীয় খণ্ডের ৮ম অধ্যায়ের ২৬ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘অহসিয় বাইশ বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করিয়া যিরুশালেমে এক বৎসর রাজত্ব করিলেন।’’
আর বংশাবলি দ্বিতীয় খণ্ডের ২২ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘অহসিয় বেয়াল্লিশ বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন এবং যিরূশালেমে এক বৎসরকাল রাজত্ব করেন।’’
উভয় বর্ণনার মধ্যে মাত্র ২০ বৎসরের বৈপরীত্য! দ্বিতীয় তথ্যটি সন্দেহাতীত-ভাবে ভুল; কারণ, বংশাবলি দ্বিতীয় খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ২০ শ্লোক এবং ২২ অধ্যায়ের ১-২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অহসিয়ের পিতা যিহোরাম ৪০ বৎসর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন এবং তার মৃত্যুর পরপরই অহসিয় রাজ-সিংহাসনে বসেন। এখন যদি দ্বিতীয় তথ্যটি যদি নির্ভুল হয় তাহলে প্রমাণিত হয় যে, অহসিয় তার পিতার চেয়েও দুই বছরের বড় ছিলেন!! আর এ যে অসম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এজন্য আদম ক্লার্ক, হর্ন, হেনরি ও স্কট তাদের ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহে স্বীকার করেছেন যে, বাইবেল লেখকের ভুলের কারণে এ বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে।
৫- যিহোয়াখীনের রাজত্ব গ্রহণকালীন বয়সের বর্ণনায় বৈপরীত্য:
২ রাজাবলীর ২৪ অধ্যায়ের ৮-৯ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৮) যিহোয়াখীন আঠার বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন, এবং যিরূশালেমে তিন মাস রাজত্ব করেন... (৯) সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহাই করিতেন।’’
২ বংশাবলির ৩৬ অধ্যায়ের ৯ম শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘যিহোয়াখীন আট বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন এবং যিরূশালেমে তিন মাস দশ দিন রাজত্ব করেন; সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহাই তিনি করিতেন।’’
উভয় তথ্যের মধ্যে দশ বৎসরের বৈপরীত্য। ইয়াহূদী-খৃস্টান ভাষ্যকারগণ স্বীকার করেছেন যে, দ্বিতীয় শ্লোকটি নিঃসন্দেহে ভুল। কারণ বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে যিহোয়াখীন মাত্র তিন মাস রাজত্ব করেন। এরপর ব্যাবিলনে বন্দিরূপে নীত হন। বন্দিত্বের সময়ে তার সাথে তার স্ত্রীগণও ছিলেন। স্বভাবতই ৮ বা ৯ বৎসরের কোনো মানুষের অনেকগুলি স্ত্রী থাকে না। আর এরূপ ৮ বা ৯ বৎসরের একজন শিশুর ক্ষেত্রে একথাও বলা হয় না যে, সে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে যা মন্দ ও পাপ তা করেছিল। এজন্য বাইবেল বিশেষজ্ঞ আদম ক্লার্ক বলেন, এ পুস্তকের এ স্থানটি বিকৃত।
৬- দায়ূদ আলাইহিস সালামের যোদ্ধা কর্তৃক নিহতগণের সংখ্যায় বৈপরীত্য:
২ শমূয়েল ২৩ অধ্যায়ের ৮ শ্লোকে দায়ূদের বীর যোদ্ধাগণের বর্ণনায় বলা হয়েছে: ‘‘তিনি আটশতের বিরুদ্ধে তার বর্শা উঠান, যাদেরকে তিনি এককালে বধ করিয়াছিলেন (he lift up his spear against eight hundred, whom he slew at one time)
কিন্তু ১ বংশাবলি ১১ অধ্যায়ের ১১ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘তিনি তিনশতের বিরুদ্ধে তার বর্শা উঠান, যাদেরকে তিনি এককালে বধ করিয়াছিলেন (he lifted up his spear against three hundred slain by him at one time)।
উভয় বক্তব্যের মধ্যে তিন শতের বৈপরীত্য! আদম ক্লার্ক ও ড. কেনিকট (Benjamin Kennicott) উল্লেখ করেছেন যে, এ শ্লোকটিতে তিনটি মারাত্মক বিকৃতি রয়েছে।
৭- নূহের আলাইহিস সালাম নৌকায় উঠানো প্রাণীদের বর্ণনায় বৈপরীত্য:
আদিপুস্তকের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ১৯-২০ পঙ্ক্তি নিম্নরূপ: (১৯) আর মাংসবিশিষ্ট সমস্ত জীব-জন্তুর স্ত্রীপুরুষ জোড়া জোড়া লইয়া তাহাদের প্রাণরক্ষার্থে আপনার সহিত সেই জাহাজে প্রবেশ করাইবে; (২০) সর্বজাতীয় পক্ষী ও সর্বজাতীয় পশু ও সর্বজাতীয় ভূচর সরীসৃপ জোড়া জোড়া প্রাণরক্ষার্থে তোমার নিকটে প্রবেশ করিবে।’’
এ পুস্তকের ৭ম অধ্যায়ের ৮-৯ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘(৮) নোহের প্রতি ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে শুচি অশুচি পশুর, এবং পক্ষীর ও ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবের (৯) স্ত্রীপুরুষ জোড়া জোড়া জাহাজে নোহের নিকট প্রবেশ করিল।’’
এ পুস্তকেরই ৭ম অধ্যায়ের ২-৩ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘তুমি শুচি (পবিত্র) পশুর স্ত্রীপুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া এবং অশুচি (অপবিত্র) পশুর স্ত্রীপুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির এক এক জোড়া এবং আকাশের পক্ষীদিগেরও স্ত্রীপুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া সমস্ত ভূমন্ডলে তাহাদের বংশ রক্ষার্থে আপনার সঙ্গে রাখ।’’
এগুলি একই পুস্তকের তিনটি বক্তব্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ নূহকে নির্দেশ দেন, সর্বজাতীয় পশু, সর্বজাতীয় পক্ষী ও সর্বজাতীয় ভূচর সরীসৃপ স্ত্রীপুরুষ জোড়া জোড়া সাথে নিতে এবং নূহ এ নির্দেশ এভাবে পালন করেছিলেন।
কিন্তু তৃতীয় বক্তব্য থেকে জানা যায়, তিনি তাকে সকল পবিত্র পশু এবং সকল পাখি সাত জোড়া করে সাথে নিতে নির্দেশ দেন। আর অপবিত্র পশু জোড়া জোড়া করে সাথে নিতে নির্দেশ দেন। প্রথম দুই বক্তব্যে ‘‘সাত জোড়ার’’ কোনোরূপ উল্লেখ নেই; বরং পবিত্র ও অপবিত্র সকল পশু ও পাখী এক জোড়া করে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। পক্ষান্তরে তৃতীয় বক্তব্যে শুধু অপবিত্র পশু এক জোড়া করে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে এখানে উভয় বক্তব্যের মধ্যে বড় রকমের বৈপরীত্য বিদ্যমান।
৮- দায়ূদ আলাইহিস সালাম-এর বন্দীদের সংখ্যা বর্ণনায় বৈপরীত্য
২ শমূয়েলের ৮ অধ্যায়ের ৪ পঙ্ক্তি নিম্নরূপ: ‘‘দায়ূদ তাঁহার নিকট হইতে সতের শত অশ্বারোহী ও বিশ সহস্র পদাতিক সৈন্য হস্তগত করিলেন।’’
একই ঘটনার বর্ণনায় ১ বংশাবলির ১৮ অধ্যায়ের ৪ পঙক্তিতে বলা হয়েছে: ‘‘দায়ূদ তাহার নিকট হইতে এক সহস্র রথ, সাত সহস্র অশ্বারোহী ও বিশ সহস্র পদাতিক সৈন্য হস্তগত করিলেন।’’
এখানে একই ঘটনার বর্ণনায় উভয় বক্তব্যের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। দ্বিতীয় শ্লোকে ১,০০০ রথ এবং ৫,৩০০ পদাতিক সৈন্যের কথা বেশি বলা হয়েছে।
৯- দায়ূদ কর্তৃক নিহত অরামীয় সৈন্যদের সংখ্যা বর্ণনায় বৈপরীত্য:
২ শমূয়েল ১০ অধ্যায়ের ১৮ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘আর দায়ূদ অরামীয়দের সাত শত রথারোহী ও চল্লিশ সহস্র অশ্বারোহী সৈন্য বধ করিলেন।’’
পক্ষান্তরে ১ বংশাবলি ১৯ অধ্যায়ের ১৮ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘আর দায়ূদ অরামীয়দের সাত সহস্র রথারোহী ও চল্লিশ সহস্র পদাতিক সৈন্য বধ করিলেন।’’
এখানে রথারোহীদের বর্ণনায় ৬,৩০০ জনের পার্থক্য। অবশিষ্ট ৪০ হাজার নিহত সৈন্য পদাতিক না অশ্বারোহী সে বিষয়েও বৈপরীত্য রয়েছে।
১০- সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর অশ্বশালার সংখ্যা বর্ণনায় বৈপরীত্য:
১ রাজাবলির ৪র্থ অধ্যায়ের ২৬ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘শলোমনের রথের নিমিত্ত চল্লিশ সহস্র অশ্বশালা ও বারো সহস্র অশ্বারোহী ছিল। (And Solomon had forty thousand stalls of horses for his chariots, and twelve thousand horsemen)’’
২ বংশাবলির ৯ম অধ্যায়ের ২৫ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘শলোমনের চারি সহস্র অশ্বশালা ও দ্বাদশ সহস্র অশ্বারোহী ছিল। (And Solomon had four thousand stalls for horses and chariots, and twelve thousand horsemen)’’
এখানে উভয় বক্তব্যের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। প্রথম শ্লোকে দ্বিতীয় শ্লোকের চেয়ে ৩৬,০০০ বেশি অশ্বশালার কথা বলা হয়েছে।
বাইবেল ভাষ্যকার আদম ক্লার্ক বলেন: সংখ্যাটির উল্লেখের ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটেছে বলে স্বীকার করে নেওয়াই আমাদের জন্য উত্তম।
১১- যীশুর বংশাবলি বর্ণনায় বৈপরীত্য:
যদি কেউ মথিলিখিত সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ের ১-১৭ পঙক্তিতে প্রদত্ত যীশুখৃস্টের বংশতালিকা বা বংশাবলি-পত্রের সাথে লূকলিখিত সুসমাচারের ৩য় অধ্যায়ের ২৩-৩৮ পঙক্তিতে উল্লিখিত যীশু খৃস্টের বংশাবলি-পত্রের তুলনা করেন তাহলে উভয়ের মধ্যে নিম্নরূপ ৬টি মারাত্মক বৈপরীত্য দেখতে পাবেন:
1. মথি থেকে জানা যায় যে, মরিয়মের স্বামী যোশেফ-এর পিতার নাম ‘যাকোব’। আর লূক থেকে জানা যায় যে, যোশেফ-এর পিতা এলি।
2. মথি থেকে জানা যায় যে, যীশু দায়ূদের পুত্র শলোমনের বংশধর। লূক থেকে জানা যায় যে, যীশু দায়ূদের পুত্র নাথন-এর বংশধর।
3. মথি থেকে জানা যায় যে, দায়ূদ থেকে ব্যবিলনের নির্বাসন পর্যন্ত যীশুর পূর্বপুরুষগণ সকলেই সুপ্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। লূক থেকে জানা যায় যে, দায়ূদ ও নাথন বাদে যীশুর পুর্বপুরুষগণের মধ্যে কেউই রাজা ছিলেন না বা কোনো প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন না।
4. মথি থেকে জানা যায় যে, শল্টীয়েল-এর পিতার নাম যিকিনিয়। আর লূক থেকে জানা যায় যে, শল্টীয়েলের পিতার নাম নেরি।
5. মথি থেকে জানা যায় যে, সরুববাবিলের পুত্রের নাম অবীহূদ। আর লূক থেকে জানা যায় যে, সরুববাবিলের পুত্রের নাম রীষা। মজার কথা হলো, ১ বংশাবলির ৩য় অধ্যায়ে সরুববাবিলের সন্তানগণের নাম লেখা আছে, সেখানে অবীহূদ বা রীষা কোনো নামই লেখা নেই। এজন্য প্রকৃত সত্য কথা হলো মথি ও লূক উভয়ের বর্ণনায় ভুল।
6. মথির বিবরণ অনুযায়ী দায়ূদ থেকে যীশু পর্যন্ত উভয়ের মাঝে ২৬ প্রজন্ম। আর লূকের বর্ণনা অনুযায়ী উভয়ের মাঝে ৪১ প্রজন্ম। দায়ূদ ও যীশুর মধ্যে ১০০০ বৎসরের ব্যবধান। এতে প্রত্যেক প্রজন্মের সময়কাল মথির বিবরণ অনুসারে ৪০ বৎসর এবং লূকের বর্ণনা অনুসারে ২৫ বৎসর।
তৃতীয় শতাব্দীতে সুসমাচার দুটির প্রসিদ্ধি লাভের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সকল যুগের খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ এ মারাত্মক বৈপরীত্য ও সাংঘর্ষিক বর্ণনার কারণে বিব্রত ও বিমূঢ় হয়েছেন। বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে এর সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন যা সবই ব্যর্থ চেষ্টা। তারা আশা করেছেন, যুগের আবর্তনে এ বৈপরীত্যের সমাধান প্রকাশিত হবে, কিন্তু তাদের আশা নিরাশায় পর্যবসিত হয়েছে। এ দুই বংশতালিকার বৈপরীত্য অতীতের মত একই ভাবে বর্তমান যুগের পণ্ডিতদেরকে হতবাক করছে।
১২- যীশু কর্তৃক আরোগ্যকৃতদের বর্ণনায় বৈপরীত্য:
মথির সুসমাচারের ২০ অধ্যায়ের ২৯-৩৪ শ্লোকে দুই অন্ধ ব্যক্তির কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে: ‘‘(২৯) পরে যিরীহো হইতে তাঁহাদের বাহির হইবার সময়ে বিস্তর লোক তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিল। (৩০) আর দেখ, দুই জন অন্ধ পথের পাশে বসিয়াছিল। .... (৩৪) তখন যীশু করুণাবিষ্ট হইয়া তাহাদের চক্ষু স্পর্শ করিলেন, আর তখনই তাহারা দেখিতে পাইল ও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল।’’
মথির সুসমাচারের ৮ অধ্যায়ের ২৮-৩৪ শ্লোকে দুজন ভুত-গ্রস্ত লোকের গল্প বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে: ‘‘পরে তিনি পরপারে গাদারীয়দের দেশে গেলে দুই জন ভূতগ্রস্ত লোক কবরস্থান হইতে বাহির হইয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল; তাহারা এত বড় দুর্দান্ত ছিল যে, ঐ পথ দিয়া কেহই যাইতে পরিত না।...’’
দুটি ঘটনাই মার্ক উল্লেখ করেছেন। প্রথম ঘটনা মার্কের সুসমাচারের ১০ অধ্যায়ের ৪৬-৫২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিরীহো হতে বের হওয়ার পরে যীশু পথে ‘তিময়ের পুত্র বরতিময়’ নামক একজন অন্ধকে দেখতে পান এবং তাকে সুস্থ করেন। অর্থাৎ মার্কের বর্ণনানুসারে যীশু মাত্র একজন অন্ধকে দেখতে পান ও সুস্থ করেন। আর মথির বর্ণনানুসারে তিনি দুজন অন্ধকে দেখেন ও সুস্থ করেন।
দ্বিতীয় ঘটনা মার্কের ৫ অধ্যায়ের ১-২০ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে মাত্র একজন ভূতগ্রস্তের কথা বলা হয়েছে। তাহলে মথির বর্ণনা অনুসারে যীশু দুজন পাগলকে দেখেন ও সুস্থ করেন। আর মার্কের বর্ণনা অনুসারে তিনি মাত্র একজন পাগলকে দেখেন ও সুস্থ করেন।
১৩- প্রেরিতদের প্রতি যীশুর আজ্ঞায় লাঠির উল্লেখে বৈপরীত্য:
যীশু তাঁর ১২ জন শিষ্যকে প্রেরণ করার সময় যে আজ্ঞা প্রদান করেন তা মথি, মার্ক ও লূক উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাদের বর্ণনার মধ্যে কিছু কিছু বৈপরীত্য রয়েছে। সেগুলির মধ্যে একটি প্রেরিতদের সাথে যষ্ঠি বা লাঠি রাখার বিষয়। মথির ১০ অধ্যায়ের ৯-১০ পঙক্তিতে প্রেরিতদেরকে সাথে লাঠি রাখতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন: ‘‘(৯) তোমাদের গেঁজিয়ায় স্বর্ণ কি রৌপ্য কি পিত্তল, (১০) এবং যাত্রার জন্য থলি কি দুইটি আঙ্রাখা কি পাদুকা কি যষ্ঠি, এ সকলের আয়োজন করিও না।’’
লূকের বর্ণনাতেও দেখা যায় যে, যীশু লাঠি সাথে রাখতে নিষেধ করেছেন। লূকের ৯ অধ্যায়ের ৩ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, পথের জন্য কিছুই লইও না, যষ্ঠিও না...।’’
কিন্তু মার্কের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি প্রেরিতদেরকে লাঠি সাথে রাখার নির্দেশ দেন। মার্কলিখিত সুসমাচারের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ৮-৯ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘(৮) আর আজ্ঞা করিলেন, তোমরা যাত্রার জন্য এক এক যষ্ঠি ব্যতিরেকে আর কিছু লইও না।, রুটীও না, ঝুলিও না, গেঁজিয়ায় পয়সাও না; (৯) কিন্তু পায়ে পাদুকা দেও, আর দুইটা আঙরাখা পরিও না।’’
এভাবে আমরা দেখছি যে, যীশুর আজ্ঞা বর্ণনায় সুসমাচারত্রয়ের বর্ণনার মধ্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য বিদ্যমান। প্রথম বক্তব্যদ্বয় অনুসারে যীশু প্রেরিতদেরকে লাঠি নিতে নিষেধ করেন। কিন্তু তৃতীয় বক্তব্য অনুসারে তিনি তাদেরকে লাঠি নিতে আদেশ করেন।
১৪- নিজের বিষয়ে যীশুর সাক্ষ্যের সত্যতার বিষয়ে বৈপরীত্য:
যোহনলিখিত সুসমাচারের ৫ম অধ্যায়ের ৩১ শ্লোকে যীশু বলেন: ‘‘আমি যদি আপনার বিষয়ে আপনি (নিজের বিষয়ে নিজে) সাক্ষ্য দিই তবে আমার সাক্ষ্য সত্য নয়।’’
আর এ পুস্তকেরই ৮ম অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকে যীশু বলেন: ‘‘যদিও আমি আপনার বিষয়ে আপনি (নিজের বিষয়ে নিজে) সাক্ষ্য দিই তথাপি আমার সাক্ষ্য সত্য।’’
প্রথম বক্তব্য অনুসারে যীশুর নিজের বিষয়ে প্রদত্ত তার নিজের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্য অনুসারে তা গ্রহণযোগ্য।
১৫- বধ্যভূমিতে যীশুর ক্রুশবহনকারীর বর্ণনায় বৈপরীত্য
ক্রুশে চড়ানোর জন্য যীশুকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনায় মথি ২৭/৩২ এর বক্তব্য: ‘‘আর বাহির হইয়া তাহারা শিমোন নামে এক জন কুরীণীয় লোকের দেখা পাইল; তাহাকেই তাঁহার ক্রুশ বহন করিবার জন্য বেগার ধরিল (তাকে যীশুর ক্রুশটি বহন করতে বাধ্য করল: him they compelled to bear his cross)।’’
লূকলিখিত সুসমাচারের ২৩ অধ্যায়ের ২৬ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘পরে তাহারা তাঁহাকে লইয়া যাইতেছে, ইতিমধ্যে শিমোন নামে এক জন কুরীণীয় লোক পল্লীগ্রাম হইতে আসিতেছিল, তাহারা তাহাকে ধরিয়া তাহার স্কন্ধে ক্রুশ রখিল, যেন সে যীশুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ তাহা বহন করে।’’
পক্ষান্তরে এ বিষয়ে যোহনলিখিত সুসমাচারের ১৯ অধ্যায়ের ১৭ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘তখন তাহারা যীশুকে লইল; এবং তিনি আপনি ক্রুশ বহন করিতে করিতে বাহির হইয়া মাথার খুলির স্থান নামক স্থানে গেলেন।’’
এখানে একই ঘটনার বর্ণনায় সুসমাচারত্রয়ের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। মথি ও লূকের বর্ণনা অনুসারে যীশুর ক্রুশটি বহন করেন শিমোন নামের এ কুরীণীয় লোক। আর যোহনের বর্ণনা অনুসারে ক্রুশটি বহন করেন যীশু নিজেই।
১৬- যীশু আগমন শান্তি না অশান্তির জন্য?
মথি ৫/৯ নিম্নরূপ: ‘‘ধন্য যাহারা মিলন করিয়া দেয় (Blessed are the peacemakers), কারণ তাহারা ঈশ্বরের পুত্র বলিয়া আখ্যাত হইবে।’’
লূক ৯/৫৬ নিম্নরূপ: ‘‘কারণ মনুষ্যপুত্র মনুষ্যদের প্রাণনাশ করিতে আইসেন নাই; কিন্তু রক্ষা করিতে আসিয়াছেন।’’
মথি ১০/৩৪ নিম্নরূপ: ‘‘মনে করিও না যে, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে আসিয়াছি; শান্তি দিতে আসি নাই, কিন্তু খড়গ দিতে আসিয়াছি।’’
লূক ১২/৪৯ ও ৫১ নিম্নরূপ: ‘‘(৪৯) আমি পৃথিবীতে অগ্নি নিক্ষেপ করিতে আসিয়াছি; আর এখন যদি তাহা প্রজ্বলিত হইয়া থাকে, তবে আর চাই কি? ... (৫১) তোমরা কি মনে করিতেছ, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে আসিয়াছি? তোমাদিগকে বলিতেছি, তাহা নয়, বরং বিভেদ।’’
উপরের বক্তব্যগুলির মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। প্রথম দুটি বক্তব্যে শান্তি, ঐক্য ও মিলন সৃষ্টিকারীদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যীশু নিজেও ধ্বংস নয়, বরং রক্ষা করতে আগমন করেন। কিন্তু শেষ দুটি বক্তব্যে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, তিনি খড়্গ, হানাহানি, ধ্বংস ও বিভেদ সৃষ্টির জন্য আগমন করেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, তিনি মুক্তি, শান্তি, মিলন ও রক্ষার জন্য আগমন করেন নি; কাজেই যাদেরকে ধন্য বলা হবে এবং ঈশ্বরের পুত্র বলা হবে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন।
১. ৩. ২. ভুলভ্রান্তি
পূর্বোক্ত বৈপরীত্য ও অনুরূপ অগণিত বৈপরীত্য ছাড়াও বাইবেলের পুস্তকগুলির মধ্যে রয়েছে অগণিত ভুলভ্রান্তি। বৈপরীত্য ও ভুলভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য হলো, বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তক, পাণ্ডুলিপি বা সংস্করণের মধ্যে তুলনা করে বৈপরীত্য জানা যায়। আর ভুল জানা যায় জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, মানবীয় রীতি, ঐতিহাসিক তথ্য, গণিত বিদ্যা বা অন্য কোনো জ্ঞানের আলোকে বাইবেলের তথ্য বিচার করার মাধ্যমে। গবেষক পণ্ডিতগণ বাইবেলের মধ্যে এরূপ অনেক ভুলভ্রান্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে অল্প কয়েকটি দেখুন:
১- ইস্রায়েল সন্তানদের মিসরে অবস্থানকার সম্পর্কে ভুল তথ্য:
যাত্রাপুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৪০ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ইস্রায়েল-সন্তানেরা চারি শত ত্রিশ বৎসর কাল মিসরে প্রবাস করিয়াছিল।’
এ তথ্যটি ভুল। ইস্রায়েল-সন্তানগণ ৪৩০ বৎসর নয়, বরং ২১৫ বৎসরকাল মিশরে অবস্থান করেছিল। তবে কনান দেশে ও মিসরে উভয় স্থানে ইস্রায়েল সন্তানগণের পূর্বপুরুষ ও তাদের মোট অবস্থানকাল ছিল ৪৩০ বৎসর। কারণ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কনান দেশে প্রবেশ থেকে তাঁর পুত্র ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত ২৫ বৎসর। ইসহাকের জন্ম থেকে ইয়াকূব আলাইহিস সালাম বা ইস্রায়েল-এর জন্ম পর্যন্ত ৬০ বৎসর। ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর অপর নাম বা প্রসিদ্ধ উপাধি ‘‘ইস্রায়েল’’ এবং তাঁর বংশধররাই বনী ইসরাঈল বা ইস্রায়েল সন্তানগণ বলে পরিচিত।
ইয়াকূব বা ইস্রায়েল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর বংশধরদের নিয়ে মিসরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩০ বৎসর। এভাবে আমরা দেখছি যে, ইব্রাহীমের আলাইহিস সালাম মিসরে প্রবেশ থেকে তাঁর পৌত্র ইয়াকূব (ইস্রায়েল)-এর মিসরে প্রবেশ পর্যন্ত সময়কাল (২৫+৬০+১৩০=) ২১৫।
ইস্রায়েল আলাইহিস সালাম-এর মিসরে প্রবেশ থেকে মূসা আলাইহিস সালাম-এর সাথে তাঁর বংশধরদের মিসর ত্যাগ পর্যন্ত সময়কাল ২১৫ বৎসর। এভাবে কানানে ও মিসরে তাদের মোট অবস্থানকাল (২১৫+২১৫=) ৪৩০ বৎসর।
ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, হিব্রু বাইবেলের এ তথ্যটি ভুল। তারা বলেন: শমরীয় তাওরাতে এখানে উভয় স্থানের অবস্থান একত্রে বলা হয়েছে এবং এখানে শমরীয় তাওরাতের বক্তব্যই সঠিক।
শমরীয় তাওরাত বা তাওরাতের শমরীয় সংস্করণ অনুসারে যাত্রাপুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৪০ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘ইস্রায়েল-সন্তানেরা ও তাদের পিতৃগণ কনান দেশে ও মিসরে চারি শত ত্রিশ বৎসর কাল অবস্থান করিয়াছিল।’
এখানে গ্রীক তাওরাত বা তাওরাতে গ্রীক সংস্করণের ভাষ্য নিম্নরূপ: ‘‘কনান দেশে ও মিসরে ইস্রায়েল-সন্তানগণ ও তাদের পিতা-পিতামহগণের মোট অবস্থানকাল চারি শত ত্রিশ বৎসর।’’
খৃস্টান গবেষক ও পণ্ডিতগণের নিকট নির্ভরযোগ্য পুস্তক ‘‘মুরশিদুত তালিবীন ইলাল কিতাবিল মুকাদ্দাসিস সামীন’’ (মহামূল্য পবিত্র বাইবেলের ছাত্রগণের পথ নির্দেশক) নামক গ্রন্থে এভাবেই ইস্রায়েল সন্তানগণের ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে। এ গ্রন্থের লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর মিসরে আগমন থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল ১৭০৬ বৎসর। আর ইস্রায়েল সন্তানদের মিসর পরিত্যাগ ও ফিরাউনের সলিল সমাধি থেকে ইসা আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল ১৪৯১ বৎসর। ১৭০৬ থেকে ১৪০৯ বাদ দিলে ২১৫ বৎসর থাকে, এটিই হলো ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর মিসর আগমন থেকে ইস্রায়েল সন্তানদের মিসর পরিত্যাগ পর্যন্ত সময়।
এখানে অন্য একটি বিষয় এ সময়কাল নিশ্চিত করে। মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন ইয়াকূব (ইস্রায়েল আ.)-এর অধস্তন ৪র্থ পুরুষ। ইয়াকূবের পুত্র লেবি, তার পুত্র কহাৎ, তার পুত্র অম্রাম (Amram: ইমরান), তার পুত্র মূসা আলাইহিস সালাম। এতে বুঝা যায় যে, মিসরে ইস্রায়েল সন্তানগণের অবস্থান ২১৫ বৎসরের বেশি হওয়া অসম্ভব। আর ইয়াহূদী-খৃস্টান ঐতিহাসিক, ব্যাখ্যাকার ও গবেষকগণ একমত পোষণ করেছেন যে, ইস্রায়েলীয়গণ ২১৫ বৎসর মিসরে অবস্থান করেন। তাদের মিসরে ৪৩০ বৎসর অবস্থানের যে তথ্য বাইবেলের হিব্রু সংস্করণে দেওয়া হয়েছে তা ভুল বলে তারা একমত হয়েছেন। এজন্য আদম ক্লার্ক বলেন, ‘‘সকলেই একমত যে, হিব্রু সংস্করণে যা বলা হয়েছে তার অর্থ অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল। আর মূসা আলাইহিস সালাম-এর পাঁচ পুস্তক বা তোরাহ-এর বিষয়ে শমরীয় সংস্করণ অন্যান্য সংস্করণ থেকে অধিকতর বিশুদ্ধ। আর ইতিহাস শমরীয় তাওরাতের বক্তব্য সঠিক বলে প্রমাণ করে।
হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন: শমরীয় তোরাহ-এর এই বক্তব্যই সত্য। এর দ্বারা হিব্রু তোরাহ-এর পাঠে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা দূরীভুত হয়।
এ থেকে জানা গেল যে, হিব্রু বাইবেলে যাত্রাপুস্তকের ১২/৪০-এ যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা ভুল বলে স্বীকার করা ছাড়া ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতদের কোনো উপায় নেই।
২- মিসর পরিত্যাগের সময় ইস্রায়েলীয়দের সংখ্যা বর্ণনায় ভুল:
গণনাপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের ৪৪-৪৭ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘‘(৪৪) এই সকল লোক মোশি ও হারোণ ... কর্তৃক গণিত হইল। (৪৫) স্ব স্ব পিতৃকুলানুসারে ইস্রায়েল-সন্তানগণ, অর্থাৎ বিংশতি বৎসর ও ততোধিক বয়স্ক ইস্রায়েলের মধ্যে যুদ্ধে গমনযোগ্য (৪৬) সমস্ত পুরুষ গণিত হইলে গণিত লোকদের সংখ্যা ছয় লক্ষ তিন সহস্র পাঁচ শত পঞ্চাশ হইল। (৪৭) আর লেবীয়েরা আপন পিতৃবংশানুসারে তাহাদিগের মধ্যে গণিত হইল না।’’
এ শ্লোকগুলি থেকে জানা যায় যে, ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন মোশির সাথে মিশর ত্যাগ করে তখন তাদের ২০ বৎসরের অধিক বয়সের যুদ্ধেসক্ষম পুরুষদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষের অধিক (৬,০৩,৫৫০)। লেবীর বংশের সকল নারী, লেবীয় বংশের সকল পুরুষ, অন্যান্য সকল বংশের সকল নারী এবং সকল বংশের ২০ বৎসরের কম বয়স্ক সকল যুবক ও কিশোর পুরুষ বাদ দিয়েই ছিল এই সংখ্যা।
চার শ্রেণীর মানুষ এই গণনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে: ১. লেবীর বংশের সকল নারী, ২. লেবীয় বংশের সকল পুরুষ, ৩. অন্যান্য সকল বংশের সকল নারী এবং ৪. সকল বংশের ২০ বৎসরের কম বয়স্ক সকল যুবক ও কিশোর পুরুষ বাদ দিয়েই ছিল এই সংখ্যা।
তাহলে যদি এই চার প্রকারের নারী, পুরুষ ও যুবক-কিশোরদের গণনায় ধরা হয় তাহলে মিশর ত্যাগকালে তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে কমপক্ষে ২৫ লক্ষ। আর এই তথ্য কেনোমতেই সঠিক হতে পারে না। কারণ:
প্রথমত, আদিপুস্তক ৪৬/২৭, যাত্রাপুস্তক ১/৫, দ্বিতীয় বিবরণ ১০/২২ -এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন মিশরে প্রবেশ করে তখন তাদের সংখ্যা ছিল ৭০ জন।
দ্বিতীয়ত, ইস্রা্য়েল-সন্তানগণ মিশরে অবস্থান করেছিলেন সর্বমোট ২১৫ বৎসর। এর বেশি তারা অবস্থান করেন নি।
তৃতীয়ত, যাত্রাপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের ১৫-২২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের মিশর ত্যাগের ৮০ বৎসর পূর্ব থেকে তাদের সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করা হত থাকে এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখা হত।
এ তিনটি বিষয়ের আলোকে যে কোনো সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ নিশ্চিত হবেন যে, মিসর ত্যাগের সময় ইস্রায়েল সন্তানদের যে সংখ্যা (৬,০৩,৫৫০) উল্লেখ করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভুল।
আমরা যদি পুত্র সন্তান হত্যার বিষয়টি একেবারে বাদ দিই এবং মনে করি যে, ইস্রায়েল সন্তানগণ মিশরে অবস্থানকালে তাদের জনসংখ্যা এত বেশি বৃদ্ধি পেত যে, প্রতি ২৫ বৎসরে তাদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যেত, তাহলেও তাদের সর্বমোট জনসংখ্যা ২১৫ বৎসরে ৭০ থেকে ৩৬০০০ (ছত্রিশ হাজার)-ও হতে পারে না। তাহলে সর্বমোট জনসংখ্যা ২৫ লক্ষ হওয়া বা লেবীয়গণ বাদে মোট পুরুষ যোদ্ধার সংখ্যা ছয় লক্ষ হওয়া কিভাবে সম্ভব! এর সাথে যদি শেষ ৮০ বছরের পুরুষ সন্তান হত্যার বিষয় যোগ করা হয় তাহলে বিষয়টি আরো অসম্ভব ও অযৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়।
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনু খলদূন (৮০৮ হি/১৪০৫খৃ) তার ইতিহাসের ভূমিকায় বাইবেলে উল্লেখিত এ সংখ্যা অবাস্তব বলে মতপ্রকাশ করেছেন। কারণ মূসা ও ইস্রায়েল (ইয়াকূব)-এর মধ্যে মাত্র তিনটি স্তর বা চারটি প্রজন্ম। যাত্রাপুস্তক ৬/১৬-২০, গণনাপুস্তক ৩/১৭-১৯ ও ১ বংশাবলী ৬/১৮-এর বর্ণনা অনুসারে: মোশির পিতা অম্রাম (ইমরান), তার পিতা কহাৎ, তার পিতা লেবি, তার পিতা যাকোব। যাকোব ও মোশির মধ্যে তিন পুরুষ মাত্র। আর মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেক কখনোই মানতে পারে না যে, মাত্র চার পুরুষে ৭০ জনের বংশধর ২০-২৫ লক্ষ হতে পারে।
নিম্নের বিষয়দুটি এ ভুলকে আরো নিশ্চিত করে:
(১) যাত্রাপুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৩৮-৪২ শ্লোক থেকে জানা যায় যে, ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন মিশর পরিত্যাগ করে তখন তাদের সাথে ছিল গৃহপালিত পশুর বিশাল বাহিনী। সকল মানুষ ও পশু একরাতের মধ্যে সমূদ্র পার হয়েছিলেন। তারা প্রতিদিন পথ চলতেন এবং তাদের যাত্রার জন্য মোশির নিজের মুখের সরাসরি নির্দেশই যথেষ্ট ছিল। তারা সমূদ্র অতিক্রম করার পরে সিনাই পর্বতের পার্শে ১২টি ঝর্ণার পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। যদি ইস্রায়েল সন্তানগণের সংখ্যা এ সময়ে ২০/২৫ লক্ষই হতো তাহলে কখনোই একরাতে তারা সকল মানুষ ও পশুর বিশাল বাহিনী সমূদ্র অতিক্রম করতে পারতেন না, প্রতিদিন পথ চলতে পারতেন না, মূসা আলাইহিস সালাম-এর মুখের কথা শুনেই সকলে যাত্রা শুরু করতে পারতেন না এবং সিনাই প্রান্তরের সীমিত স্থানে মাত্র ১২টি ঝর্ণায় তাদের এত মানুষ ও পশুর বিশাল বাহিনীর স্থান সংকুলান হতো না।
(২) যাত্রাপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের ১৫-২২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইস্রায়েল সন্তানদের মধ্যে মাত্র দুজন ধাত্রী ছিল: একজনের নাম শিফ্রা ও অন্যজনের নাম পূয়া। মিশরের রাজা ফরৌণ এ দুই ইব্রীয়া ধাত্রীকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, তোমরা ইব্রীয় (ইস্রায়েলী) মহিলাদের সন্তান প্রসব করানোর সময় তাদের পুত্র সন্তান হলে হত্যা করবে এবং কন্যা সন্তান হলে তাকে জীবিত রাখবে। যদি ইস্রায়েলীগণের সংখ্যা এত বেশি হতো তাহলে কোনো অবস্থাতেই মাত্র দুইজন ধাত্রী তাদের সকলের জন্য ধাত্রীকর্ম করতে পারতো না। বরং তাদের মধ্যে শতশত ধাত্রী থাকতো।
উপরের আলোচনা থেকে এথা স্পষ্ট যে, মিশর ত্যাগের সময় ইস্রায়েল-সন্তানদের সংখ্যা ছিল, ৭০ জন থেকে স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ২১৫ বৎসরে যেমন হতে পরে, যাদের মহিলাদের ধাত্রী-কর্ম করার জন্য দুইজন ধাত্রীই যথেষ্ট ছিল, একটি রাতই যাদের সমূদ্র পারাপারের জন্য যথেষ্ট ছিল, একদিনে মৌখিক আদেশ প্রদান করেই মোশি যাদেরকে নিয়ে সমূদ্র পার হতে পেরেছেন, সিনাই পর্বতের পাদদেশে এবং ইলমের সংকীর্ণ স্থানে সাথের গৃহপালিত পশু সহ যাদের স্থান সংকুলান হয়েছিল। সামান্যতম সন্দেহ ছাড়াই আমরা সুনিশ্চিত যে মিসর ত্যাগের সময় ইস্রায়েলীয়দের সংখ্যার বিষয়ে যাত্রাপুস্তকের ১/৪৪-৪৭-এর বর্ণনা ভুল ও অসত্য।
৩- যে ভুলের জন্য দায়ূদ আলাইহিস সালামের নুবুওয়াত বাতিল হয়!
দ্বিতীয় বিববরণ ২৩/২: ‘‘জারজ ব্যক্তি সদাপ্রভুর সমাজে প্রবেশ করিবে না; তাহার দশম পুরুষ পর্যন্তও সদাপ্রভুর সমাজে প্রবেশ করিতে পারিবে না।’’ এ বক্তব্যটি ভুল। কারণ এটি সত্য হলে দায়ূদ আলাইহিস সালাম সদাপ্রভুর সমাজে প্রবেশ করতে পারবেন না; নবী বা ভাববাদী হওয়া তো দূরের কথা। কারণ দায়ূদের দশম পূর্বপুরুষ পেরস তারা দাদা যিহূদার জারজ সন্তান ছিলেন। যিহূদা তার পুত্রবধু -মৃতপুত্রের স্ত্রী- তামরের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন এবং এ ব্যভিচারের ফলে পেরসের জন্ম হয়। আদিপুস্তকের ৩৮/১২-৩০ শ্লোকে তা সুস্পষ্টত বর্ণিত হয়েছে।
পেরস থেকে শুরু করলে দায়ূদ দশম পুরুষ হন। মথিলিখিত সুসমাচারের ১/১-৬ এবং লূকলিখিত সুসমাচারের ৩/৩১-৩৩-এ বর্ণিত দায়ূদের বংশতালিকা নিম্নরূপ: (১) দায়ূদ বিন (২) যিশয় বিন (৩) ওবেদ বিন (৪) বোয়স বিন (৫) সল্মোন বিন (৬) নহশোন বিন (৭) অম্মীনাদব বিন (৮) রাম বিন (৯) হিষ্রোন বিন (১০) পেরস। মথি ১/৩-৬: ‘‘যিহূদার পুত্র পেরস... পেরসের পুত্র হিয্রোন, হিয্রোণের পুত্র রাম, রামের পুত্র অম্মীনাদব, অম্মীনাদবের পুত্র সলমোন, সলমোনের পুত্র বোয়স ... বোয়সের পুত্র ওবেদ ... ওবেদের পুত্র যিশয়, যিশয়ের পুত্র দায়ূদ।’’
দ্বিতীয় বিবরণের ৩২ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোক সঠিক হলে দায়ূদ কখনোই নবী হতে পারেন না। অথচ দায়ূদ আলাইহিস সালাম- সদাপ্রভুর সমাজের নেতা ও গৌরব। তারই পরিচয়ে যীশুখৃস্টের পরিচয়।
গীতসংহিতার ৮৯ গীতের ২৬-২৭ শ্লোকের বর্ণনা অনুসারে তিনি সদাপ্রভুর প্রথমজাত (firstborn) সন্তান বা জ্যৈষ্ঠ পুত্র এবং সকল রাজার সেরা ও সর্বোচ্চ রাজা। কাজেই দ্বিতীয় বিবরণের এ শ্লোকটি নিঃসন্দেহে ভুল ও অসত্য।
এখানে একটি জালিয়াতির অবস্থা দেখুন। লন্ডনে ১৮২৫ সালে মুদ্রিত রজার্ড ওয়াটস-এর বাইবেলে এবং ১৮২৬ সালে কলকাতায় মুদ্রিত বাইবেলে (উইলিয়াম কেরির বঙ্গানুবাদ বাইবেলে) লূকলিখিত সুসমাচারের তৃতীয় অধ্যায়ে যীশুর বংশতালিকায় দায়ূদের অষ্টম পূর্বপুরুষ ‘‘রাম’’ ও নবম পূর্বপুরুষ ‘‘হিয্রোন’’-এর মধ্যে ‘‘অর্নি’’ নামটি সংযোজন করে বলা হয়েছে ‘‘রাম বিন অর্ণি বিন হিয্রোন বিন পেরস’’ (কেরির বাংলা বাইবেলে: ইনি অদমানের পুত্র, ইনি অর্নির পুত্র, ইনি হিয্রোনের পুত্র, ইনি পেরসের পুত্র)।
এ সংযোজনের উদ্দেশ্য দায়ূদকে বাঁচানো, যেন তিনি পেরসের দশম পুরুষ না হয়ে একাদশ পুরুষ হন। কিন্তু বিকৃতিকারীগণ এখানে সংযোজনের সময় মথির লেখা বংশতালিকায় ‘‘অর্নি’’ নামটি সংযোজন করতে ভুলে গিয়েছেন। ফলে উক্ত দুটি সংস্করণেই মথির বংশতালিকা অনুসারে দায়ূদ পেরসের দশম পুরুষই রয়ে গিয়েছেন। ফলে তাদের সংস্করণেই মথির বক্তব্যের সাথে লূকের বক্তব্যের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে এবং তাদের জালিয়াতি ধরা পড়ে গিয়েছে। আর সর্বাবস্থায় দায়ূদের জারজ সন্তানের দশম পুরুষ হওয়ার বিষয়টি থেকেই যাচ্ছে।
অনুরূপভাবে ১৮৪৪ সালের সংস্করণে ও ১৮৬৫ সালের সংস্করণেও ‘‘অর্নি’’ নামটি সংযোজন করা হয় নি, মথিতেও না, লূকেও না, বরং উভয় সুসমাচারেই ‘‘রাম বিন হিষ্রোন’’ লেখা হয়েছে।
প্রকৃত সত্য কথা হলো, আদিপুস্তকের ৩৮ অধ্যায়ের ১২-৩০ শ্লোকে পুত্রবধু তামরের সাথে যিহূদার ব্যভিচারের যে ঘৃণ্য কাহিনী লেখা হয়েছে তা সম্পূর্ণ জাল ও বানোয়াট কাহিনী। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিবরণের ২৩ অধ্যায়ের ২ শ্লোকটি (জারজ সন্তানের দশম পুরুষ পর্যন্ত জান্নাতে যাবে না) ভুল। কারণ এরূপ বিধান কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে না। মূসা আলাইহিস সালাম কখনো এরূপ কথা লিখতে পারেন না। কারণ একের পাপের ভার অন্যে বহন করবে তা হতে পারে না। এজন্য বাইবেল ভাষ্যকার হার্সলি বলেন: ‘‘(দশম পরুষ পর্যন্ত সদাপ্রভুর সমাজে {জান্নাতে} প্রবেশ করতে পারবে না) কথাটি সংযোজিত (জাল ও বানোয়াট)।’’
৪- বৈত-শেমস গ্রামের নিহতদের সংখ্যা বর্ণনায় ভুল
১ শমূয়েল-এর ৬ অধ্যায়ের ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘পঞ্চাশ সহস্র জনকে’’ । এই কথাটি নির্ভেজাল ভুল ও অসত্য। দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় আলোচ্যে পাঠক তা বিস্তারিত জানতে পারবেন।
শমূয়েল ভাববাদীর ১ম পুস্তকের ৪-৬ অধ্যায়ে ইস্রায়েল সন্তানদের নিয়ম-সিন্দুক বা ঈশ্বরীয় সিন্দুক পলেষ্টীয়দের হস্তগত হওয়া ও তা পুনরুদ্ধারের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সদাপ্রভুর-সিন্দুক ফেরত আনার সময়ে বৈৎ-শেমশ গ্রামের বাসিন্দারা মাঠে গম কাটছিল। তাঁরা চোখ তুলে সিন্দুকটি দেখতে পান এবং আনন্দিত হন। এজন্য সদাপ্রভু ঈশ্বর তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন। শাস্তির বিবরণে ১ শমূয়েলের ৬ অধ্যায়ের ১৩ ও ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘(১৩) ঐ সময়ে বৈৎ-শেমন নিবাসীরা তলভূমিতে গোম কাটিতেছিল; তাহারা চুক্ষু তুলিয়া সিন্দুকটা দেখিল, দেখিয়া আহ্লাদিত হইল। ... (১৯) পরে তিনি বৈৎ-শেমশের লোকদের মধ্যে কাহাকে কাহাকে আঘাত করিলেন, কারণ তাহারা সদাপ্রভুর সিন্দুকে দৃষ্টিপাত করিয়াছিল, ফলত তিনি লোকদের মধ্যে সত্তর জনকে এবং পঞ্চাশ সহস্র জনকে আঘাত করিলেন (he smote of the people fifty thousand and threescore and ten men)। তাহাতে লোকের বিলাপ করিল, কেননা সদাপ্রভু মহা আঘাতে লোকদিগকে আঘাত করিয়াছেন।’’
এ কথাটি নিঃসন্দেহে ভুল ও বিকৃত। আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যখ্যাগ্রন্থের এ কথাগুলির ত্রুটি বর্ণনা করার পরে বলেন: বাহ্যত বুঝা যায় যে, হিব্রু পাঠ এখানে বিকৃত। সম্ভবত এখানে মূল পাঠ থেকে কিছু শব্দ ছুটে গিয়েছে, অথবা অজ্ঞতার কারণে বা ইচ্ছাকৃতভাবে এর মধ্যে কিছু শব্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারণ, একথা জ্ঞানত অসম্ভব যে, সেই ছোট্ট একটি গ্রামে এত পরিমাণ মানুষ বসবাস করবে অথবা এত অধিক সংখ্যক মানুষ একত্রে মাঠের মধ্যে গম কাটায় রত থাকবে। সবচেয়ে অসম্ভব বিষয় হলো, যে উটের পিঠে রাখা একটি ছোট্ট সিন্দকের দিকে বা মধ্যে পঞ্চাশ হাজার সত্তর জন মানুষ একত্রে বা একসাথে দৃষ্টিপাত করবেন বা দেখতে পাবেন।
অতঃপর তিনি বলেন: ‘‘ল্যাটিন অনুবাদে রয়েছে: ‘সত্তর জন নেতা ও ৫০ হাজার সাধারণ মানুষ’, সিরীয় অনুবাদে রয়েছে: ‘পাঁচ হাজার ৭০ জন মানুষ’, অনুরূপভাবে প্রাচীন আরবী অনুবাদে রয়েছে: ‘পাঁচ হাজার ৭০ জন মানুষ’। ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) শুধু ‘৭০ জন মানুষ’ লিখেছেন। ইয়াহূদী পণ্ডিত শলোমন গার্গি ও অন্যান্য রাব্বি বিভিন্ন সংখ্যা লিখেছেন। এ সকল পরস্পরবিরোধী তথ্য এবং বাইবেলের পাঠে উল্লিখিত সংখ্যার অবাস্তবতার ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত যে, নিঃসন্দেহে এ স্থানে বিকৃতি সাধিত হয়েছে। হয়তবা কিছু কথা বৃদ্ধি করা হয়েছে অথবা কিছু কথা পড়ে গিয়েছে।’’
হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলা হয়েছে: মূল হিব্রু বাইবেলে নিহতদের সংখ্যা (৫০,০৭০) বলা হয়েছে উল্টাভাবে (৭০ ও ৫০ হাজার)। এ ছাড়াও একটি ছোট্ট গ্রামের মধ্যে এত অধিক সংখ্যক মানুষের পাপে লিপ্ত হওয়া ও নিহত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য। কাজেই এই ঘটনার সত্যতার বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। জোসেফাস নিহতদের সংখ্যা শুধু ‘৭০’ লিখেছেন।
তাহলে দেখুন, কিভাবে এ সকল পণ্ডিত এ ঘটনা অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিলেন, এ বর্ণনাকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং এখানে ইচ্ছাকৃত বিকৃতি ঘটেছে বলে স্বীকার করলেন।
৫- সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর বারান্ডার উচ্চতা বর্ণনায় ভুল
২ বংশাবলির ৩য় অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকে সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর মসজিদ বা আল-মাসজিদুল আকসার (বাইবেলের ভাষায়: শলোমনের মন্দিরের) বর্ণনায় বলা হয়েছে: ‘‘আর গৃহের সম্মুখস্থ বারান্ডা গৃহের প্রস্থানুসারে বিংশতি হস্ত দীর্ঘ ও এক শত বিংশতি হস্ত উচ্চ হইল।’’
‘‘১২০ হাত উচ্চ’’ কথাটি নিখাদ ভুল। ১ রাজাবলির ৬ অধ্যায়ের ২ শ্লোকে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, শলোমনের নির্মিত মন্দিরটির উচ্চতা ছিল ত্রিশ হস্ত। তাহলে বারান্ডা কিভাবে ১২০ হাত উচু হবে?
আদম ক্লার্ক তার ভাষ্যগ্রন্থে ২ বংশাবলির ৩য় অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকের ভুল স্বীকার করেছেন। এজন্য সিরিয় (সুরিয়ানী) ভাষায় ও আরবী ভাষায় অনুবাদে অনুবাদকগণ ১২০ সংখ্যাকে বিকৃত করেছেন। তারা ‘‘এক শত’’ কথাটি ফেলে দিয়ে বলেছেন: ‘‘বিশ হাত উচ্চ’’।
১৮৪৪ সালের আরবী অনুবাদে মূল হিব্রু বাইবেলের এ ভুল ‘‘সংশোধন’’ (!) করে লেখা হয়েছে: ‘‘আর গৃহের সম্মুখস্থ বারান্ডা গৃহের প্রস্থানুসারে বিংশতি হস্ত দীর্ঘ ও বিংশতি হস্ত উচ্চ হইল।’’
৬- অবিয় ও যারবিয়ামের সৈন্যসংখ্যা বর্ণনায় ভুল
২ বংশাবলির ১৩ অধ্যায়ে ৩ ও ১৭ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘(৩) অবিয় চারি লক্ষ মনোনিত যুদ্ধবীরের সহিত যুদ্ধে গমন করিলেন, এবং যারবিয়াম আট লক্ষ মনোনীত বলবান বীরের সহিত তাঁহার বিরুদ্ধে সৈন্য রচনা করিলেন। ... (১৭) আর অবিয় ও তাঁহার লোকেরা মহাসংহারে উহাদিগকে সংহার করিলেন; বস্তুত ইস্রায়েলের পাঁচ লক্ষ মনোনীত লোক মারা পড়িল।’’
উপরের শ্লোকদ্বয়ে উল্লিখিত সংখ্যাগুলি সবই ভুল। বাইবেল ব্যাখাকারগণ তা স্বীকার করেছেন। সে যুগের ছোট্ট দুটি ‘গোত্র রাজ্য’ যিহূদা ও ইস্রায়েরের জন্য উপরের সংখ্যাগুলি অস্বাভাবিক ও অবাস্তব। এ কারণে ল্যাটিন অনুবাদের অধিকাংশ কপিতে ‘লক্ষ’-কে হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম স্থানে ‘চারি লক্ষ’ পাল্টিয়ে ‘চল্লিশ হাজার’, দ্বিতীয় স্থানে ‘আট লক্ষ’ পাল্টিয়ে ‘আশি হাজার’ ও তৃতীয় স্থানে ‘পাঁচ লক্ষ’ পাল্টিয়ে ‘৫০ হাজার’ করা হয়েছে। বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ এই বিকৃতি ও পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছেন। হর্ন ও আদম ক্লার্ক এ ‘‘সংশোধন’’ (!) সমর্থন করেছেন। আদম ক্লার্ক অনেক স্থানেই বারংবার সুস্পষ্টত উল্লেখ করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, বাইবেলের ইতিহাস বিষয়ক পুস্তগুলিতে বিকৃতি সাধিত হয়েছে।
৭- ফল ভোজন ও মানুষের আয়ু বিষয়ক ভুল
আদিপুস্তকের ২য় অধ্যায়ের ১৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘কিন্তু সদসদ্-জ্ঞানদায়ক যে বৃক্ষ, তাহার ফল ভোজন করিও না, কেননা যে দিন তাহার ফল খাইবে, সেই দিন মরিবেই মরিবে (for in the day that thou eatest thereof thou shalt surely die)।’’
এ কথাটি ভুল। কারণ আদম আলাইহিস সালাম এই বৃক্ষের ফল ভোজন করেছেন এবং যে দিন এই বৃক্ষের ফল ভোজন করেছেন, সে দিন তিনি মরেন নি। বরং এর পরেও ৯০০ বৎসরেরও বেশি সময় তিনি জীবিত ছিলেন।
আদিপুস্তকের ৬ অধ্যায়ের ৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘তাহাতে সদাপ্রভু কহিলেন, আমার আত্মা মানুষের মধ্যে সর্বদা অবস্থান করিবে না; কারণ সেও তো মাংসমাত্র; পরন্তু তার সময় এক শত বিংশতি বৎসর হইবে।’’
‘‘মানুষের আয়ু ১২০ বৎসর হবে’’ এই কথাটি ভুল। কারণ পূর্ববর্তী যুগের মানুষদের বয়স আরো অনেক দীর্ঘ ছিল। আদিপুস্তকের ৫ অধ্যায়ের ১-৩১ শ্লোকের বর্ণনা অনুসারে আদম ৯৩০ বৎসর জীবিত ছিলেন। অনুরূপভাবে শিস (শেথ) ৯১২ বৎসর, ইনোশ ৯০৫ বৎসর, কৈনন ৯১০ বৎসর, মহললেল ৮৯৫ বৎসর, যেরদ ৯৬২, হানোক (ইদরীস আ.) ৩৬৫ বৎসর, মথূশেলহ ৯৬৯ বৎসর, লেমক ৭৭৭ বৎসর পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন। নোহ (নূহ) ৯৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন। শেম (সাম) ৬০০ বৎসর জীবিত ছিলেন। অর্ফক্ষদ ৩৩৮ বৎসর আয়ু লাভ করেন। এভাবে অন্যান্যরা দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। আর বর্তমান যুগে ৭০ বা ৮০ বৎসর আয়ু পাওয়ার ঘটনাও কম ঘটে। এভাবে প্রমাণিত যে, মানুষের আয়ু ১২০ বৎসর বলে নির্ধারণ করা ভুল।
৮- যীশুর বংশতালিকায় পুরুষ গণনায় ভুল
মথিলিখিত সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ের ১-১৭ শ্লোকে যীশুর বংশতালিকা বর্ণনা করা হয়েছে। ১৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘এইরূপে আব্রাহাম অবধি দায়ূদ পর্যন্ত সর্বশুদ্ধ চৌদ্দ পুরুষ; দায়ূদ অবধি বাবিলে নির্বাসন পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ; এবং বাবিলে নির্বাসন অবধি খ্রীষ্ট পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ।’’
এখানে স্পষ্টত বলা হয়েছে যে, যীশুর বংশতালিকা তিন অংশে বিভক্ত, প্রত্যেক অংশে ১৪ পুরুষ রয়েছে এবং যীশু থেকে আব্রাহাম পর্যন্ত ৪২ পুরুষ। এ কথাটি সুস্পষ্ট ভুল। মথির ১/১-১৭-র বংশ তালিকায় যীশু থেকে আবরাহাম পর্যন্ত ৪২ পুরুষ নয়, বরং ৪১ পুরুষের উল্লেখ রয়েছে। প্রথম অংশ: ইবরাহীম আলাইহিস সালাম থেকে দায়ূদ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত ১৪ পুরুষ, দ্বিতীয় অংশ সুলাইমান আলাইহিস সালাম থেকে যিকনিয় পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ এবং তৃতীয় অংশ শল্টীয়েল থেকে এবং যীশু পর্যন্ত মাত্র ১৩ পুরুষ রয়েছেন।
তৃতীয় খৃস্টীয় শতকে বোরফেরী এই বিষয়টি সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করেন, কিন্তু এর কোনো সঠিক সমাধান কেউ দিতে পারেন নি।
৯- দায়ূদ কর্তৃক মহাযাজকের রুটি খাওয়ার বর্ণনায় ভুল
মথিলিখিত সুসমাচারের ১২ অধ্যায়ের ৩-৪ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৩) তিনি (যীশু) তাহাদিগকে (ইয়াহূদী ফরীশীগণকে) কহিলেন, দায়ূদ ও তাঁহার সঙ্গীরা ক্ষধিত হইলে তিনি যাহা করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা পাঠ কর নাই? (৪) তিনি ত ঈশ্বরে গৃহে প্রবেশ করিলেন, এবং তাঁহার দর্শন-রুটী ভোজন করিলেন, যাহা তাঁহার ও তাঁহার সঙ্গীদের ভোজন করা বিধেয় ছিল না, কেবল যাজকবর্গেরই বিধেয় ছিল।’’
মার্কলিখিত সুসমাচারের ২ অধ্যায়ের ২৫-২৬ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(২৫) তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, দায়ূদ ও তাঁহার সঙ্গীরা খাদ্যের অভাবে ক্ষুধিত হইলে তিনি যাহা করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা কখনো পাঠ কর নাই? (২৬) তিনি ত অবিয়াথর মহাযাজকের সময়ে ঈশ্বরের গৃহে প্রবেশ করিয়া, যে দর্শন-রুটী যাজকবর্গ ব্যতিরেকে আর কাহারও ভোজন করা বিধেয় নয়, তাহাই ভোজন করিয়াছিলেন, এবং সঙ্গিগণকেও দিয়াছিলেন।’’
এখানে ‘ও তাঁহার সঙ্গীরা’, ‘তাঁহার সঙ্গীদের’ এবং ‘‘সঙ্গীদেরকেও দিয়াছিলেন’’ কথাগুলি সবই ভুল। কারণ ‘দর্শন-রুটী’ ভোজন করার সময় দায়ূদ ‘একা’ ছিলেন, তাঁর সাথে অন্য কেউ ছিল না।
এছাড়া ‘তিনি ত অবিয়াথর মহাযাজকের সময়ে ঈশ্বরের গৃহে প্রবেশ করিয়া’ কথাগুলিও ভুল। কারণ এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট মহাযাজকের নাম ছিল ‘অহীমেলক’। ‘অবিয়াথর’ এ সময়ে যাজক ছিলেন না। অবিয়াথর ছিলেন অহীমেলকের পুত্র। এ কথাগুলি যে ভুল তা ১ শমূয়েল-এর ২১ অধ্যায়ের ১-৯ শ্লোক ও ২২ অধ্যায়ের ৯-২৩ শ্লোকে মূল ঘটনা পাঠ করলেই জানা যায়। মি. জুয়েল তার গ্রন্থে লিখেছেন যে, এ কথাগুলি ভুল। অন্যান্য অনেক পণ্ডিত তা স্বীকার করেছেন। তাদের মতে এ কথাগুলি পরবর্তীকালে সংযোজন করা হয়েছে, যা ইচ্ছাকৃত বিকৃতির প্রমাণ।
১০- ক্রুশের ঘটনার বর্ণনায় ভুল
মথিলিখিত সুসমাচারের ২৭ অধ্যায়ের ৫০-৫৩ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৫০) পরে যীশু উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া নিজ আত্মা সমর্পন করিলেন। (৫১) আর দেখ, মন্দিরের তিরস্করিণী (veil) উপর হইতে নীচ পর্যন্ত চিরিয়া দুইখান হইল, ভূমিকম্প হইল, ও শৈল সকল বিদীর্ণ হইল, (৫২) এবং কবর সকল খুলিয়া গেল, আর অনেক নিদ্রাগত পবিত্র লোকের দেহ উত্থাপিত হইল; (৫৩) এবং তাঁহার পুনরুত্থানের পর তাঁহারা কবর হইতে বাহির হইয়া পবিত্র নগরে প্রবেশ করিলেন, আর অনেক লোককে দেখা দিলেন।’’
মন্দিরের তিরস্করিণী (পর্দা) বিদীর্ণ হওয়ার কথা মার্কের ১৫/৩৮ ও লূকের ২৩/৪৫-এ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাকি বিষয়গুলি, অর্থাৎ পাথরগুলি ফেটে যাওয়া, কবরগুলি খুলে যাওয়া, মৃত লাশগুলির বেরিয়ে আসা, যেরুশালেমে প্রবেশ করা, তথাকার অধিবাসীদের সাথে মৃতলাশগুলির দেখা-সাক্ষাত হওয়া ইত্যাদি বিষয় তারা উল্লেখ করেন নি।
এগুলি অত্যন্ত বড় বিষয়। মথির দাবি অনুসারে এ বিষয়গুলি প্রকাশ্যে সকলেই অবলোকন করেছিলেন। অথচ একমাত্র মথি ছাড়া সে সময়ের অন্য কোনো ঐতিহাসিক এই ঘটনাগুলি লিখলেন না! এমনকি এর পরের যুগের কোনো ঐতিহাসিকও এ বিষয়ে কিছু লিখেন নি। তারা ভুলে গিয়েছিলেন বলে দবি করার কোনো সুযোগ নেই; কারণ মানুষ সব কিছু ভুললেও এরূপ অস্বাভাবিক অত্যাশ্চর্য ঘটনা কখনো ভুলতে পারে না। বিশেষত লূক ছিলেন আশ্চর্য ও অলৌকিক ঘটনাবলির সংকলনে অত্যন্ত আগ্রহী। এ কথা কিভাবে কল্পনা করা যায় যে, সুসমাচার লেখকগণ সকলেই অথবা অধিকাংশই সাধারণ লৌকিক ঘটনা ও অবস্থাদি লিখবেন, অথচ মথি ছাড়া কেউই এই অসাধারণ অলৌকিক ঘটনাগুলি লিখবেন না?
এ কাহিনীটি মিথ্যা। পণ্ডিত নর্টন পবিত্র বাইবেলের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য সদা সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু তিনিও তার পুস্তকে এ কাহিনীটি মিথ্যা বলে বিভিন্ন প্রমাণ পেশ করেছেন। এরপর তিনি বলেন, এই কাহিনীটি মিথ্যা। সম্ভবত যিরূশালেমের ধ্বংসের পর থেকে এই ধরনের কিছু গল্প-কাহিনী ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। সম্ভবত কেউ একজন মথিলিখিত সুসমাচারের হিব্রু পাণ্ডুলিপির টীকায় তা লিখেছিলেন এবং অনুলিপি লেখক (copier) লেখার সময় তা মূল পাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এরপর সেই কপিটিই অনুবাদকের হাতে পড়ে এবং সেভাবেই তিনি অনুবাদ করেন।
পণ্ডিত নর্টনের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, মথির সুসমাচারের (মূল হিব্রু থেকে প্রথম গ্রীক) অনুবাদক ছিলেন ‘রাতের আঁধারে কাঠ-সংগ্রহকারীর মত’ বিবেচনা ও বিচার শক্তিবিহীন। শুখনো ও ভিজের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা তার ছিল না। এ গ্রন্থের মধ্যে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যা কিছু পেয়েছেন সবই অনুবাদ করেছেন। এইরূপ একজনের অনুবাদ ও সম্পাদনার উপরে কি নির্ভর করা যায়? কখনোই না।
১১- শেলহের পিতার নাম বর্ণনায় ভুল:
লূক তার সুসমাচারের ৩য় অধ্যায়ে লিখেছেন: ‘‘ইনি শেলহের পুত্র, ইনি কৈননের পুত্র, ইনি অর্ফকষদের পুত্র’’
এ কথাটি ভুল। কারণ, শেলহ নিজেই অর্ফকষদের পুত্র ছিলেন, তিনি অর্ফকষদের পৌত্র ছিলেন না। আদিপুস্তক ১০/২৪ নিম্নরূপ: ‘‘আর অর্ফক্ষদ শেলহের জন্ম দিলেন।’’ আদিপুস্তক ১/১২-১৩ নিম্নরূপ: ‘‘অর্ফক্ষদ পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সে শেলহের জন্ম দিলেন। শেলহের জন্ম দিলে পর অর্ফক্ষদ চারি শত তিন বৎসর জীবৎ থাকিয়া আরও পুত্রকন্যার জন্ম দিলেন।’’ হিব্রু তাওরাত ও শমরীয় তাওরাত উভয়ই সুস্পষ্টভাবে এ সকল স্থানে উল্লেখ করেছে যে, অর্ফক্ষদ শেলহের পিতা এবং শেলহ অর্ফক্ষদের ঔরষজাত সন্তান। ১ বংশাবলি ১/১৮-তেও এ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও অর্ফকষদ ও শেলহের মধ্যে কৈননের নাম উল্লেখ করা হয় নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, লূকের সুসমাচারের উপর্যু&ক্ত কথাটি ভুল। এখানে উল্লেখ্য যে তাওরাতের গ্রীক অনুবাদের (the Septuagint: LXX) শেলহের পিতা হিসেবে ‘‘কৈননের’’ নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাহ্যত খৃস্টানগণ নিজেদের সুসমাচারের বর্ণনাকে সঠিক বলে প্রমাণ করার জন্য অনুবাদের মধ্যে বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন।
১. ৩. ৩. বাইবেলের বিকৃতির আলোচনা
এ অনুচ্ছেদে আমরা শব্দ বা বাক্যের পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে বাইবেলে মধ্যে যে সকল বিকৃতি সাধন করা হয়েছে তার সামান্য কিছু নমুনা আলোচনা করতে চাই।
১- প্লাবন পূর্ব মহাপুরুষদের বয়স বর্ণনায় বিকৃতি:
আদিপুস্তকের ৫ম অধ্যায়ের ১-৩২ শ্লোকে আদমের আলাইহিস সালাম সৃষ্টি থেকে নূহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন পর্যন্ত সময়কাল বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে আদম আলাইহিস সালাম থেকে নূহ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত মহাপুরুষদের বয়সকালও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাইবেলের তিন সংস্করণে এ সময়কার তিন প্রকার লেখা হয়েছে।
শমরীয় সংস্করণ অনুসারে আদম থেকে প্লাবন পর্যন্ত সময়কাল এক হাজার তিনশত সাত (১৩০৭) বৎসর। হিব্রু সংস্করণে এ সময় এক হাজার ছয়শত ছাপ্পান্ন (১৬৫৬) বছর। গ্রীক সংস্করণ অনুসারে এ সময় দুই হাজার দুই শত বাষট্টি (২২৬২) বছর। এভাবে আমরা দেখছি যে, তিনটি সংস্করণের মধ্যে সময়ের বিবরণে বিরাট পার্থক্য ও বিশ্রী বৈপরীত্য রয়েছে। এ বৈপরীত্য ও পার্থক্য সমন্বয় করা সম্ভব নয়। (নিঃসন্দেহে দুটি বা সবগুলি সংস্করণে পরিবর্তনের মাধ্যমে বিকৃতি সাধন করা হয়েছে।)
তিনটি সংস্করণই একমত যে, আদম আলাইহিস সালামের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৯৩০ বৎসর (আদিপুস্তক ৫/৫) এবং তিন সংস্করণই একমত যে, প্লাবনের সময় নূহ আলাইহিস সালাম-এর বয়স ছিল ৬০০ বৎসর (আদিপুস্তক ৭/৬)।
এতে শমরীয় সংস্করণের বর্ণনা অনুসারে প্লাবনের মাত্র ৩৭৭ বৎসর পূর্বে (১৩০৭-৯৩০) আদমের মৃত্যু হয়। আর যেহেতু প্লাবনের ৬০০ বৎসর পূর্বে নূহ আলাইহিস সালামের জন্ম, সেহেতু আদমের মৃত্যুর সময় নোহের বয়স ছিল ২২৩ বৎসর (৬০০-৩৭৭)। ঐতিহাসিকগণ একমত যে বিষয়টি বাতিল। হিব্রু ও গ্রীক বাইবেল তা মিথ্যা প্রমাণ করে। আদমের বয়স ও প্লাবনের সময় নূহের বয়সের সমষ্টি (৯৩০+৬০০=) ১৫৩০ বৎসর। হিব্রু বাইবেলের তথ্য অনুযায়ী (১৬৫৬-১৫৩০) আদমের মৃত্যুর ১২৬ বৎসর পরে নোহের জন্ম। আর গ্রীক বাইবেলের তথ্য অনুসারে (২২৬২-১৫৩০) আদমের মৃত্যুর ৭৩২ বৎসর পরে নোহের জন্ম।
প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দীর প্রসিদ্ধতম ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) খৃস্টানদের নিকটও নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য। এই বিশ্রী বৈপরীত্য ও পার্থক্যের কারণে তিনি ‘পুরাতন নিয়মের’ এই তিন সংস্করণের কোনোটির বিবরণই গ্রহণ করেন নি। তিনি লিখেছেন যে, আদমের সৃষ্টি থেকে নোহের প্লাবন পর্যন্ত সময়কাল ছিল দুই হাজার দুইশত ছাপ্পান্ন (২২৫৬) বৎসর।
২- প্লাবন পরবর্তী মহাপুরুষদের বয়স বর্ণনায় বিকৃতি:
আদিপুস্তকের ১১ অধ্যায়ের ১০-২৬ শ্লোকে নূহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সময়কাল বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে নূহ আলাইহিস সালাম থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত মহাপুরুষদের বয়সকালও উল্লেখ করা হয়েছে। বাইবেলের তিন সংস্করণে এ সময়কার তিন প্রকার লেখা হয়েছে।
নূহের প্লাবন থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল হিব্রু সংস্করণ অনুসারে দুইশত বিরানববই (২৯২) বৎসর, শমরীয় সংস্করণ অনুসারে নয়শত বিয়াল্লিশ (৯৪২) বৎসর এবং গ্রীক সংস্করণ অনুসারে একহাজার বাহাত্তর (১০৭২) বৎসর। এখানেও তিন সংস্করণের মধ্যে বিশ্রী রকমের বৈপরীত্য রয়েছে, যার মধ্যে সমন্বয় সম্ভব নয়। যা সবগুলি বা দুটি সংস্করণে পরিবর্তন ও বিকৃতি প্রমাণ করে।
তিন সংস্করণই একমত যে, প্লাবনের পরে নূহ আলাইহিস সালাম ৩৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন (আদিপুস্তক ৯/২৮)। ৩৫০ থেকে ২৯২ বৎসর বাদ দিলে ৫৮ বৎসর থাকে। এতে হিব্রু বাইবেল অনুসারে প্রমাণিত হয় যে, নোহের মৃত্যুর সময় অবরাহামের বয়স ছিল ৫৮ বৎসর। ঐতিহাসিকগণ একমত যে কথাটি বাতিল। গ্রীক ও শমরীয় সংস্করণও তা মিথ্যা প্রমাণ করে। শমরীয় সংস্করণের ভাষ্য অনুযায়ী ইবরাহীমের আলাইহিস সালাম জন্ম নূহের আলাইহিস সালাম মৃত্যুর পাঁচশত বিরানববই (৫৯২) বৎসর পরে (৯৪২-৩৫০=৫৯২)। আর গ্রীক সংস্করণের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম নূহের আলাইহিস সালাম মৃত্যুর সাতশত বাইশ (৭২২) বৎসর পরে (১০৭২-৩৫০=৭২২)।
বাইবেলের তিন সংস্করণের মধ্যকার এই বিরাট ও বিশ্রী বৈপরীত্যের কারণে খৃস্টানগণ নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছেন। ঐতিহাসিকগণ এই তিন বিবরণই বাতিল করে দিয়ে বলেছেন, নূহ আলাইহিস সালাম থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময় হলো তিনশত বাহান্ন (৩৫২) বৎসর।
১ম খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) এ সকল বিবরণের কোনোটিই গ্রহণ করেন নি; বরং তিনি বলেছেন: এই সময়কাল ছিল নয়শত তিরানববই (৯৯৩) বৎসর। হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে জোসেফাসের মতটি উদ্ধৃত করা হয়েছে।
হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে তারা চতুর্থ শতকের শ্রেষ্ঠ খৃস্টান পণ্ডিত ও ধর্মগুরু (যাজক) সেন্ট অগাস্টিন (St. Augustine, Bishop of Hippo: 354–430)-এর মতামত উল্লেখ করেছেন যে, প্লাবনের আগের ও পরের যুগের মানুষদের বর্ণনার ক্ষেত্রে ইয়াহূদীরা হিব্রু সংস্করণ বিকৃত করেছে। গ্রীক সংস্করণ যাতে অনির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত হয় সেজন্য এবং খৃস্টধর্মের বিরোধিতার জন্য তারা এই বিকৃতি করেছে। ১৩০ খৃস্টাব্দে ইয়াহূদীরা এই বিকৃতি সাধন করে। হর্ন তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেছেন, গবেষক হেলস শক্তিশালী প্রমাণাদির দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা তাদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করেছিল। প্রসিদ্ধ পণ্ডিত কেনিকটও প্রমাণ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা ইচ্ছাকৃতভাবে পুরাতন নিয়মের হিব্রু সংস্করণ বিকৃত করে।
বিবেকবান পাঠক নিশ্চয় লক্ষ্য করছেন যে, এ সকল খৃস্টান গবেষক পণ্ডিত ও ব্যাখ্যাকারগণের শেষ গতি বিকৃতির কথা স্বীকার করা। তারা স্বীকার করছেন যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কমবেশি করে তাদের ঐতিহাসিক বিবরণগুলি বিকৃত করেছেন।
৩-প্রস্তর স্থাপনের জন্য নির্ধারিত পর্বতের নামে বিকৃতি:
দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকের ২৭ অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আর আমি অদ্য যে প্রস্তরগুলির বিষয়ে তোমাদিগকে আদেশ করিলাম, তোমরা যর্দন পার হইলে পর এবল পর্বতে সেই সকল প্রস্তর স্থাপন করিবে, ও তাহা চুন দিয়া লেপন করিবে।’’
এ শ্লোকটি শমরীয় সংস্করণে নিম্নরূপ: ‘‘আর আমি অদ্য যে প্রস্তরগুলির বিষয়ে তোমাদিগকে আদেশ করিলাম.... গরিষীম পর্বতে সেই সকল প্রস্তর স্থাপন করিবে, ও তাহা চুন দিয়া লেপন করিবে।’’
দ্বিতীয় বিবরণের ২৭/১২-১৩ এবং এ পুস্তকের ১১/২৯ শ্লোক থেকে জানা যায় যে, এবল ও গরিষীম(Mount Ebal & Mount Ger'izim) ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত দুটি পাশাপাশি পাহাড়। দ্বিতীয় বিবরণ ১১/২৯ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আর তুমি যে দেশ অধিকার করিতে যাইতেছ, সেই দেশে তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু যখন তোমাকে প্রবেশ করাইবেন, তখন তুমি গরিষীম পর্বতে ঐ আশীর্বাদ, এবং এবল পর্বতে ঐ অভিশাপ স্থাপন করিবে।’’
হিব্রু সংস্করণ থেকে জানা যায় যে, মোশি এবল পাহাড়ে ধর্মধাম বা মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। আর শমরীয় সংস্করণ থেকে জানা যায় যে, মোশি গরিষীম পাহাড়ে ধর্মধাম নির্মাণের নির্দেশ দেন। প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত ইয়াহূদী ও শমরীয়দের মধ্যে এ বিষয়ে বির্তক খুবই প্রসিদ্ধ। প্রত্যেক সম্প্রদায় দাবি করেন যে, অন্য সম্প্রদায় এস্থলে তোরাহের বক্তব্য বিকৃত করেছে। প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ হিব্রু সংস্করণের বিশুদ্ধতা দাবি করেছেন এবং কেউ শমরীয় সংস্করণের বিশুদ্ধতা দাবি করেছেন। প্রসিদ্ধ বাইবেল ব্যাখ্যাকার আদম ক্লার্ক, প্রসিদ্ধ গবেষক কেনিকট (Benjamin Kennicott) ও অন্যান্য পণ্ডিত শমরীয় সংস্করণের বিশুদ্ধতার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তারা প্রমাণ করেন যে, শমরীয়দের সাথে শত্রুতার কারণে ইয়াহূদীরা এখানে তোরাহ-এর বক্তব্য বিকৃত করেছে। আর একথা তো সকলেই জানেন যে, গরিষীম পাহাড়টি অনেক ঝর্ণা, বাগিচা, বৃক্ষলতায় পরিপূর্ণ। পক্ষান্তরে এবল একটি শুষ্ক পাহাড়। তাতে এসব কিছুই নেই। এমতাবস্থায় স্বভাবতই প্রথম পাহাড়টি দোয়া ও বরকতের জন্য এবং দ্বিতীয় পাহাড়টি অভিশাপ প্রদানের জন্য শোভনীয়।
এভাবে আমরা দেখছি যে, খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ পণ্ডিতগণ এখানে হিব্রু বাইবেলের বিকৃতির কথা স্বীকার করছেন।
৪- রাজ্যের নামে বিকৃতি:
হিব্রু বাইবেলে ২ বংশাবলির ২৮ অধ্যায়ের ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘কেননা ইস্রায়েল রাজ আহসের জন্য সদাপ্রভু যিহূদাকে নত করিলেন...।’’
এখানে ‘ইস্রায়েল’ কথাটি নিশ্চিতরূপে বিকৃত ও ভুল; কারণ আহস কখনোই ‘ইস্রায়েল’ রাজ্যের রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘যিহূদা’ রাজ্যের রাজা। গ্রীক ও ল্যাটিন অনুবাদে ‘যিহূদা’ শব্দ রয়েছে। কাজেই বিকৃতিটি ঘটেছে হিব্রু সংস্করণের মধ্যে।
৫- না বনাম হ্যাঁ:
গীতসংহিতার ১০৫ নং গীতের ২৮ শ্লোকে হিব্রু সংস্করণে বলা হয়েছে: ‘‘তাঁহারা তাঁহার বাক্যের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন না।’’ এখানে গ্রীক সংস্করণে বলা হয়েছে: ‘‘তাঁহারা তাঁহার বাক্যের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন।’’
হিব্রু বাইবেলে বাক্যটি না-বাচক কিন্তু গ্রীক বাইবেলে বাক্যটি হাঁ-বাচক। দুটি বাক্যের একটি নিঃসন্দেহে বিকৃত ও ভুল।
এখানেও খৃস্টান পণ্ডিতগণ দ্বিধাগ্রস্থ হয়েছেন। হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলা হয়েছে, এ দুই সংস্করণের মধ্যে বিরাজমান এ পার্থক্যের কারণে অনেক দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। বাহ্যত কোনো একটি সংস্করণে ‘না’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়েছে, অথবা বাড়ানো হয়েছে। এভাবে তারা এখানে বিকৃতির কথা স্বীকার করলেন, কিন্তু তারা কোন সংস্করণে বিকৃতিটি ঘটেছে তা নির্ধারণ করতে পারলেন না।
৬. প্রচলিত তাওরাত মূসা আলাইহিস সালাম-এর পরে লেখা হয়েছে:
আদিপুস্তক ৩৬/৩১ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘ইস্রায়েল-সন্তানদের উপরে কোন রাজা রাজত্ব করিবার পূর্বে ইঁহারা ইদোম দেশের রাজা ছিলেন।’’ এরপর পরবর্তী শ্লোকগুলিতে ইস্রায়েল-সন্তানদের প্রথম রাজা তালূত (শৌল)-এর রাজত্ব লাভের পূর্ব পর্যন্ত ইদোমের রাজাদের নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তালূতের পরে ইস্রায়েলীয়দের রাজা হন দায়ূদ আলাইহিস সালাম। তাঁদের পূর্বে ইস্রায়েলীয়গণ বিচারকগণ কর্তৃক শাসিত ও পরিচালিত হতেন।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, আদিপুস্তকের ৩৬ অধ্যায়ের ৩১-৩৯ শ্লোকগুলি অবিকল ১ বংশাবলির ১ম অধ্যায়ের ৪৩-৫০ শ্লোক। রাজাবলির মধ্যে এ বিষয়গুলি আলোচিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক; এ শ্লোকগুলি নিশ্চিত প্রমাণ করে যে, এগুলির লেখক মূসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যুর ৩৫৬ বৎসর পরে তালূত (শৌল)-এর রাজ্যভার গ্রহণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে বণী ইস্রায়েল বা ইস্রায়েল-সন্তানদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরের যুগের মানুষ। আর বংশাবলি তালূদের যুগের অনেক পরে লেখা সে বিষয়ে মতভেদ নেই।
তবে ‘আদিপুস্তক’-এ কথাগুলির থাকার কোনোরূপ কোনো ব্যাখ্যা নেই। যে পুস্তক তালুতের যুগের সাড়ে তিন শত বৎসর পূর্বে মূসা আলাইহিস সালাম-এর লেখা তাওরাতের প্রথম পুস্তক তার মধ্যে এ কথা কিভাবে লেখা হলো?
আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন, আমার দৃঢ় ধারণা হলো এ শ্লোকগুলি কখনোই মোশি লিখেন নি। বরং এগুলি সম্ভবত আদিপুস্তকের কোনো পাণ্ডুলিপির টীকায় লেখা ছিল। অনুলিপিকার একে মূল পাঠের অংশ মনে করে মূল পাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন।
এভাবে এ ব্যাখ্যাকার বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ও সংযোজনের কথা স্বীকার করলেন। তাঁর স্বীকারোক্তি থেকে বুঝা যায় যে, তাঁদের ধর্মগ্রন্থগুলি বিকৃতি যোগ্য ও বিকৃতির উর্ধ্বে নয়। কারণ এ নয়টি শ্লোক তোরাহ-এর অংশ না হওয়া সত্ত্বেও তা তোরাহের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং এরপর সকল পাণ্ডুলিপিতে তা প্রচারিত হয়েছে।
৭- ‘‘অদ্য পর্যন্ত’’ সংযোজনের বিকৃতি:
দ্বিতীয় বিবরণের তৃতীয় অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘মনঃশির সন্তান যায়ীর গশূরীয়দের ও মাখাথীয়দের সীমা পর্যন্ত অর্গোবের সমস্ত অঞ্চল লইয়া আপন নামানুসারে বাশন দেশের সেই সকল স্থানের নাম হবেবাৎ-যায়ীর রাখিল; অদ্য পর্যন্ত (সেই নাম চলিত আছে)।’’
মূসা আলাইহিস সালাম-এর লিখিত বলে প্রচারিত তাওরাতের ৫ম পুস্তক ‘দ্বিতীয় বিবরণের’-এর এ কথাটি কখনোই মোশির কথা হতে পারে না (যদিও তা মোশির বক্তব্যের মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে)। উপরের শ্লোকটিতে ‘অদ্য পর্যন্ত’ কথাটি থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট যে, এ কথাটি যিনি বলেছেন বা লিখেছেন তিনি অবশ্যই মনঃশির সন্তান যায়ীরের যুগের অনেক পরের মানুষ। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ বিস্তারিত গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, অনেক পরের মানুষেরা ছাড়া কেউ এই প্রকারের শব্দাবলি ব্যবহার করে না।
৬ নং বিকৃতি ও ৭ নং বিকৃতির বিষয়ে প্রসিদ্ধ গবেষক পণ্ডিত হর্ন তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: এ দুইটি বক্তব্য বা অনুচ্ছেদ কোনো প্রকারেই মোশির কথা হতে পারে না। কারণ প্রথম বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এ পুস্তকের লেখক ইস্রায়েল-সন্তানগণের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পরের যুগের মানুষ ছিলেন। আর দ্বিতীয় বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এ পুস্তকের লেখক ইয়াহূদীদের প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপনের পরের যুগের মানুষ ছিলেন। এ দুটি অনুচ্ছেদ শুধু অর্থহীনই নয়; বরং মুল পাঠের মধ্যে বিরক্তিকর সংযোজন বলে গণ্য। বিশেষত দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি। কারণ এটি মোশিই লিখুন আর অন্য যেই লিখুন তিনি ‘অদ্য পর্যন্ত’ কথাটি বলবেন না। এজন্য যতদূর মনে হয়, এ কথাটি ছিল নিম্নরূপ: ‘‘মনঃশির সন্তান যায়ীর গশূরীয়দের ও মাখাথীয়দের সীমা পর্যন্ত অর্গোবের সমস্ত অঞ্চল লইয়া আপন নামানুসারে বাশন দেশের সেই সকল স্থানের নাম হবেবাৎ-যায়ীর রাখিল।’’ এরপর অনেক শতাব্দী পরে ‘অদ্য পর্যন্ত’ কথাটি পাদটীকায় লেখা হয়, যেন জানা যায় যে যায়ীর যে নাম রেখেছিলেন তা অদ্যাবধি চালু রয়েছে। এরপর এই কথাটি পরবর্তী কপিগুলিতে পাদটীকা থেকে মূল বক্তব্যের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। যদি কারো এ বিষয়ে সন্দেহ হয় তবে গ্রীক কপিগুলি দেখতে পারেন। তিনি দেখবেন যে, কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে কিছু কথা মূল পাঠের মধ্যে সংযোজিত রয়েছে; আর কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে তা পাদটীকায় রয়েছে।
তাঁর এ কথা প্রমাণ করে যে, এ পবিত্র ও ঐশ্বরিক পুস্তকগুলি লিখিত হওয়ার শত শত বৎসর পরেও এগুলিতে সংযোজন, বিয়োজন বা বিকৃতির সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল। কারণ তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, পুস্তকটি লিখিত হওয়ার অনেক শতাব্দী পরে এ কথাটিকে সংযোজন করা হয়েছে। এত পরে সংযোজিত কথাটিও পবিত্র পুস্তকের অংশে পরিণত হয়েছে এবং পরবর্তী সকল কপি ও সংস্করণে প্রচারিত হয়েছে!
উপরের শ্লোকটির মতই আরেকটি শ্লোক গণনাপুস্তকের ৩২ অধ্যায়ের ৪১ শ্লোক (কোনো কোনো মুদ্রণে ৪০ শ্লোক) নিম্নরূপ: ‘‘আর মনঃশির সন্তান যায়ীর গিয়া তথাকার গ্রাম সকল হস্তগত করিল, এবং তাহাদের নাম হবেবাৎ-যায়ীর (যায়ীরের গ্রামসমূহ) রাখিল।’’
এখানে আরো একটি ভুল রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, ‘মনঃশির সন্তান যায়ীর’। কথাটি ভুল। যায়ীরের পিতার নাম ‘সগূব’। ১ বংশাবলির ২য় অধ্যায়ের ২২ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘সগুবের পুত্র যায়ীর, গিলিয়দ দেশে তাঁহার তেইশটি নগর ছিল।’’
এভাবে আমরা দেখছি যে, দ্বিতীয় বিবরণ ও গণনা পুস্তকের মধ্যে পরবর্তী যুগের সংযোজন প্রমাণিত হয়েছে এবং ভুল তথ্য সংযোজনও প্রমাণিত হয়েছে। আর বংশাবলির মধ্যেও পিতার নাম ভুল লেখা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
‘বাইবেল ডিক্সনারী’ গ্রন্থটি আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড ও ভারতে মুদ্রিত হয়েছে। এ গ্রন্থের লেখকগণ বলেন: মোশির পুস্তকে এমন কিছু কথা পাওয়া যায় যা স্পষ্টত প্রমাণ করে যে, তা মোশির কথা নয়। অনুরূপভাবে কিছু কিছু বক্তব্য থেকে দেখা যায় যে, সেগুলি মোশির বাচনভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোন্ ব্যক্তি এই সকল বাক্য ও অনুচ্ছেদ সংযোজন করেছেন তা আমরা নিশ্চিতরূপে বলতে পারি না।
হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন: ‘অদ্যাপি’, ‘অদ্য পর্যন্ত’ (unto this day) জাতীয় বাক্যাংশ পুরাতন নিয়মের অধিকাংশ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। যতদূর বুঝা যায়, এগুলি পরবর্তীকালে সংযোজিত। তাঁদের স্বীকৃতি অনুসারে শুধু ‘যিহোশূয়ের পুস্তকের’ মধ্যেই আরো ৮টি স্থানে পরবর্তী যুগে এইরূপ বাক্যাদি সংযোজনের মাধ্যমে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। যদি পুরাতন নিয়মের অন্যান্য স্থানে এইরূপ সংযোজন ও বিকৃতির কথা উল্লেখ করি তাহলে তালিকা অত্যন্ত লম্বা হয়ে যাবে।
৮- বিভিন্ন পুস্তকে ভূমিকা ও অধ্যায় সংযোজন:
দ্বিতীয় বিবরণের প্রথম অধ্যায়ের ১-৫ শ্লোক পাঠ করলে পাঠক নিশ্চিত হবেন যে, এগুলি কখনোই মূসা আলাইহিস সালাম-এর কথা নয়। এখানে লেখক মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নাম পুরুষ (3rd person) ব্যবহার করে বলেছেন: ‘‘(১) যর্দনের পুর্বপারস্থিত প্রান্তরে .... মোশি সমস্ত ইস্রায়েলকে এই সকল কথা কহিলেন। ... (৩) সদাপ্রভু যে যে কথা ইস্রায়েল-সন্তানগণকে বলিতে মোশিকে আজ্ঞা দিয়াছিলেন, তদনুসারে মোশি চল্লিশ বৎসরের একাদশ মাসে, মাসের প্রথম দিনে তাহাদিগকে কহিতে লাগিলেন। .... (৫) যর্দনের পূর্বপারে মোয়াব দেশে মোশি এই ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন...।’’
বাইবেল ভাষ্যকার আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে দ্বিতীয় বিবরণের প্রথম অধ্যায়ের ব্যাখ্যার শুরুতে বলেন: এ অধ্যায়ের শুরুতে প্রথম ৫টি শ্লোক এ পুস্তকের ভূমিকাস্বরূপ। এই শ্লোকগুলি মোশির কথা নয়। তিনি আরো বলেন যে, এ পুস্তকের (দ্বিতীয় বিবরণের) ৩৪ অধ্যায়টিও মোশির কথা নয়। মোশির বক্তব্য পূর্ববর্তী (৩৩) অধ্যায়ের সমাপ্তির সাথে সাথে শেষ হয়েছে। এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, মোশি ঈশ্বরের অনুপ্রেরণা লাভ করে এই অধ্যায়টিও লিখেছেন। কারণ এ সম্ভাবনা সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা থেকে অনেক দূরে। আদম ক্লার্ক দাবি করেছেন যে, এ অধ্যায়টি যিহোশূয়ের পুস্তকের প্রথম অধ্যায় ছিল। পক্ষান্তরে অনেক ব্যাখ্যাকার দাবি করেছেন যে, মোশির মৃত্যুর অনেক পরে ‘৭০ গোত্রপতি’ এই ৩৪ অধ্যায়টি রচনা করেন। তখন এ অধ্যায়টি যিহোশূয়ের পুস্তকের প্রথম অধ্যায় ছিল। কিন্তু তা স্থানান্তরিত হয়ে এ স্থানে চলে এসেছে।
এভাবে তারা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করছেন যে, মূসার তাওরাতের এ সকল কথা মূসার কথা নয়। এরপর দাবি করলেন যে, ৭০ গোত্রপতি তা রচনা করেছেন। তাদের এ দাবি একেবারেই প্রমাণবিহীন আন্দায দাবি। এর বড় প্রমাণ হলো, এ বিষয়ে তাদের নানামুনির নানা মত। হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন, মোশির কথা পূর্ববর্তী অধ্যায়েই শেষ হয়েছে। এ অধ্যায়টি পরবর্তীকালে সংযোজিত। সংযোজনকারী সম্ভবত যিহোশূয় অথবা শমূয়েল অথবা ইয্রা অথবা তাঁদের পরের যুগের অন্য কোনো ভাববাদী (নবী)। এ বিষয়ে নিশ্চিতরূপে কিছুই জানা যায় না। শেষ শ্লোকগুলি সম্ভবত ইস্রায়েল-সন্তানদের ব্যাবিলনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে সংযোজন করা হয়েছে।’’
পাঠক এখানে এ সকল পণ্ডিতের কথাগুলি একটু চিন্তা করুন! তাঁরা বললেন: ‘‘সংযোজনকারী সম্ভবত যিহোশূয়, অথবা ... অথবা ... অথবা ... অথবা তাঁদের পরের যুগের অন্য কোনো ভাববদী। সবই ভিত্তিহীন প্রমাণবিহীন কাল্পনিক দাবি মাত্র।
এখানে দ্বিতীয় বিবরণের ৩৪ অধ্যায়ের কয়েকটি শ্লোক উল্লেখ করছি, যেন পাঠক অবস্থা ভালভাবে অনুধাবন করতে পারেন:
‘‘(১) পরে মোশি মোয়াবের তলভূমি হইতে নবো পর্বতে.. উঠিলেন। আর সদাপ্রভু তাঁহাকে সমস্ত দেশ, দান পর্যন্ত গিলিয়দ... দেখাইলেন (৪) আর সদাপ্রভু তাঁহাকে কাহিলেন.... (৫) তখন সদাপ্রভুর দাস মোসি সদাপ্রভুর বাক্যানুসারে সেই স্থানে মোয়াব দেশে মরিলেন। (৬) আর তিনি মোয়াব দেশে বৈৎপিয়োরের সম্মুখস্থ উপত্যাকাতে তাঁহাকে কবর দিলেন; কিন্তু তাঁহার কবরস্থান অদ্যাপি কেহ জানে না। (৭) মরণকালে মোশির বয়স এক শত বিংশতি বৎসর হইয়াছিল....। (৮) পরে ইস্রায়েল সন্তানগণ মোশির নিমিত্ত মোয়াবের তলভূমিতে ত্রিশ দিন রোদন করিল। ... (১০) মোশির তুল্য কোন ভাববাদী ইস্রায়েলের মধ্যে আর উৎপন্ন হয় নাই।’’
মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবর্তীর্ণ কিতাবে কি মূসার মৃত্যু, শেষকৃত্য, কবর, অনুসারীদের কান্নাকাটি, তার কবর নিশ্চিহ্ন হওয়া, তাঁর পরে তাঁর মত আর কোনো নবীর আবির্ভাব না হওয়া ইত্যাদি বিষয় বর্ণিত থাকবে?
আমরা মুসলিমগণ নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করি যে, মূসার তাওরাত বলে কাথিত ৫ পুস্তকের সর্বশেষ অধ্যায়, দ্বিতীয় বিবরণের ৩৪ অধ্যায়টি মূসা আলাইহিস সালাম-এর রচিত নয়। শুধু তাই নয়, আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর নামে প্রচলিত এ পাঁচটি পুস্তক কখনোই তাঁর লেখা নয়। এগুলিকে তার লেখা বা তার প্রদত্ত তাওরাত বলে দাবি করা বৈধ নয়। এগুলির মধ্যে বিদ্যমান অগণিত বিকৃতি, সংযোজন, ভুলভ্রান্তি আমাদের এ বিশ্বাসের অকাট্য প্রমাণ। কোনো নবীর উপরে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ কোনো আসমানী গ্রন্থে এরূপ কোনো ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে না। এরূপ ভুলভ্রান্তিময় একটি গ্রন্থকে কোনো নবীর নামে চালানোর অর্থ উক্ত নবীকে অপবাদ দেওয়া। অনেক ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতও অবিকল মুসলিমদের মতই এ সকল প্রমাণাদির ভিত্তিতে দাবি করেছেন যে, এ সকল পুস্তকের কোনোটিই মোশির লেখা বা মোশির দেওয়া তাওরাত নয়।
৯- ত্রিত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ইঞ্জিলের বিকৃতি:
যোহনের প্রথম পত্রের ৫ম অধ্যায়ের ৭-৮ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৭) কারণ স্বর্গে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন: পিতা, বাক্য ও পবিত্র আত্মা; এবং তাঁহারা তিন একই। ৮. এবং পৃথিবীতে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহার সাক্ষ্য প্রদান করেন: আত্মা, জল ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই। (For there are three that bear record in heaven, the Father, the Word, and the Holy Ghost; and the three are one. 8. And there are three that bear witness in earth, the spirit, and the water, and the blood: and these three agree in one.) ’’
খৃস্টান পণ্ডিতগণ উল্লেখ করেছেন যে, উপরের শ্লোকদ্বয়ের এতসব কথার মধ্যে মূল বাক্যগুলি ছিল নিম্নরূপ: ‘‘বস্তুত তিনে সাক্ষ্য দিতেছেন, আত্মা, ও জল, ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই।’’
এরপর ত্রিত্বে বিশ্বাসিগণ মূল পাঠের মধ্যে অতিরিক্ত সংযোজন করেন: ‘‘স্বর্গে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন: পিতা, বাক্য ও পবিত্র আত্মা; এবং তাঁহারা তিন একই। ৮. এবং পৃথিবীতে তিন জন রহিয়াছেন...।’’ ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের ত্রিত্ববাদ প্রমাণের জন্য একথাগুলিই মূল দলিল। আর এগুলি যে জাল ও অতিরিক্ত সংযোজন সে বিষয়ে কোনোরূপ সন্দেহ নেই। ত্রিত্ববাদী গোঁড়া খৃস্টান পণ্ডিতগণও স্বীকার করেছেন যে, এ বাক্যগুলি অতিরিক্ত সংযোজন এবং এগুলিকে মুছে দেওয়া আবশ্যক। হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ হর্নের এই কথাকে সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন। আদম ক্লার্কও এই বাক্যগুলিকে সংযোজিত বলে গণ্য করার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন। ক্রীসবাখ ও শোলয্, হর্ন, আদম ক্লাক, হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ ও আরো অনেকেই এ বাক্যগুলিকে জাল বলে এগুলি বাইবেল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেছেন।
চতুর্থ-পঞ্চম খৃস্টীয় শতাব্দীর ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন সেন্ট অগাস্টাইন (St. Augustine)। এখন পর্যন্ত ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণ তাঁর মতের উপরেই নির্ভর করেন। তিনি যোহনের এ পত্রটির আলোচনায় দশটি পত্র লিখেছেন। এ দশটি পত্রের একটি পত্রেও তিনি এ বাক্যগুলির কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি ছিলেন ত্রিত্বে বিশ্বাসী। আলেকজেন্দ্রিয়ার প্রসিদ্ধ খৃস্টান ধর্মগুরু আরিয়াসের (Arius) অনুসারিগণ যাঁরা ত্রিত্বে বিশ্বাস করতেন না বা একেশ্বরবাদী ছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে অগাস্টাইন বিতর্ক করতেন। তাঁর সময়ে যদি উপরের এই শ্লোকদ্বয় এভাবে যোহনের পত্রের মধ্যে থাকত তবে নিশ্চয় ত্রিত্ববাদ (trinity) প্রমাণ করার জন্য তিনি সেগুলির উদ্ধৃতি দিতেন ও সেগুলিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করতেন।
শুধু তাই নয়, অগাস্টাইন ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করার জন্য উপরে উল্লিখিত ৮ম শ্লোকটি: ‘‘বস্তুতঃ তিনে সাক্ষ্য দিতেছেন, আত্মা, ও জল, ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই’’ এই কথাটির অদ্ভুত একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: এখানে জল দ্বারা পিতাকে বুঝানো হয়েছে, রক্ত দ্বারা পুত্রকে বুঝানো হয়েছে এবং আত্মা দ্বারা পবিত্র-আত্মাকে বুঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি খুবই দুর্বল ও অবাস্তব ব্যাখ্যা। একথা স্পষ্ট যে, উপরে উল্লিখিত ৭ম শ্লোকটি যদি যোহনের পত্রে সত্যিই থাকত তাহলে তিনি এইরূপ অবাস্তব ও দুর্বল ব্যাখ্যার স্মরণাপন্ন হতেন না। আমার মনে হয়, যখন ত্রিত্ববাদীরা দেখলেন যে, এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত দুর্বল- যা দিয়ে ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করা কঠিন- তখন তারা উপরের বাক্যগুলি তৈরি করে সেগুলিকে এই পত্রের মধ্যে সংযোজন করে দেন, যাতে সেগুলি দিয়ে তাঁদের ত্রিত্ব প্রমাণ করা সহজ হয়।
১২৭০ হিজরী সালে (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে) ইযহারুল হক্কের প্রণেতা আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহর সাথে ড. ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) ও তার সহযোগী পাদ্রী মি. ফ্রেঞ্চ (T. V. French)-এর যে প্রকাশ্য বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়, সে বিতর্কের সময় উপস্থিত সকল মানুষের সামনে পাদ্রীদ্বয় স্বীকার করেন যে, এই বাক্যগুলি বিকৃত। তাঁরা আরো স্বীকার করেন যে, বাইবেলের মধ্যে ৭/৮ স্থানে বিকৃতি ঘটেছে।
এই বাক্যটির আলোচনায় পণ্ডিত হর্ন ১২ পৃষ্ঠা লিখেছেন। হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলক হর্নের সার-সংক্ষেপকে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন। আমি এখানে তাঁদের সার-সংক্ষেপের সার-সংক্ষেপ উদ্ধৃত করছি। হেনরি ও স্কটের পুস্তকের সংকলকগণ বলেন:
‘‘হর্ন উভয় পক্ষের দলিল প্রমাণাদি আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি পুনরায় তার আলোচনার সার-সংক্ষেপ উল্লেখ করেছেন। তার আলোচনার সার-সংক্ষেপ থেকে জানা যায় যে, যারা এই বাক্যগুলিকে মিথ্যা ও জাল বলে প্রমাণ করেন তাঁরা নিম্নের বিষয়গুলির উপর নির্ভর করেন:
(১) ১৬শ শতাব্দীর পূর্বে লিখিত কোনো গ্রীক পাণ্ডুলিপিতে এই বাক্যগুলির অস্তিত্ব নেই।
(২) প্রথম যুগে পরিপূর্ণ যত্ন ও গবেষণা সহকারে যে সকল বাইবেল মুদ্রণ করা হয়েছে সেগুলিতেও এই বাক্যগুলির অস্তিত্ব নেই।
(৩) একমাত্র ল্যাটিন অনুবাদ ছাড়া অন্য কোনো প্রাচীন অনুবাদে এই বাক্যগুলির অস্তিত্ব নেই।
(৪) অধিকাংশ প্রাচীন ল্যাটিন পাণ্ডুলিপিতেও এই কথাগুলি নেই।
(৫) কোনো প্রাচীন খৃস্টান পণ্ডিত বা চার্চের ঐতিহাসিক এই কথাগুলিকে প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করেন নি।
(৭) প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের নেতাগণ ও ধর্মের সংস্কারকগণ এই কথাগুলিকে ফেলে দিয়েছেন অথবা তার উপরে সন্দেহের চিহ্ন দিয়ে রেখেছেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, খৃস্টানগণ যখনই প্রয়োজন মনে করতেন তখনই তাদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সংযোজন-বিয়োজন করে বিকৃতি সাধন করতেন। মুদ্রণ-যন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে বাইবেলের মধ্যে বিকৃতির দরজা ছিল উন্মুক্ত। লিপিকারগণ ও বিভিন্ন দল-উপদলের খৃস্টানগণ অতি সহজেই সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন করতে পারতেন। মজার কথা হলো মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার পরেও এ বিকৃতির ধারা থামে নি।
প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের প্রথম গুরু ও খৃস্টধর্ম সংস্কারের মূল নেতা মি. লুথার যখন এ ধর্মের সংস্কারের জন্য প্রচেষ্টা শুরু করলেন, তখন তিনি জার্মান ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করেন যেন তাঁর অনুসারিগণ তা থেকে উপকৃত হতে পারেন। তিনি তাঁর অনূদিত বাইবেলের মধ্যে যোহনের পত্রের এ বাক্যগুলি উল্লেখ করেন নি। তাঁর জীবদ্দশাতেই কয়েকবার তাঁর অনুবাদ মুদ্রিত হয়। যখন তিনি বৃদ্ধ হলেন এবং বুঝতে পারলেন যে তাঁর আয়ূ শেষ হয়ে আসছে, তখন তিনি ১৫৪৬ সালে পুনরায় অনুবাদটির মুদ্রণ শুরু করেন। ধর্মগ্রন্থের বিকৃতির বিষয়ে ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের অভ্যাস, বিশেষত খৃস্টানগণের অভ্যাসের সাথে তিনি পরিচিত ছিলেন। এজন্য তিনি এই অনুবাদের ভূমিকায় তাঁর অন্তিম নির্দেশনা প্রদান করেন: ‘‘কেউ যেন আমার এই অনুবাদটি বিকৃত না করেন।’’
কিন্তু এ অন্তিম নির্দেশনাটি ছিল খৃস্টান সম্প্রদায়ের চিরাচরিত অভ্যাসের বিপরীত, এজন্য তাঁরা তা রক্ষা করেন নি; বরং লুথারের মৃত্যুর পরে ত্রিশ বৎসর পার না হতেই তাঁরা এই জাল ও বানোয়াট বাক্যটিকে তাঁর অনুবাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। লূথারের অনুবাদের এই বিকৃতি সর্বপ্রথম সাধিত হয় ফ্রাঙ্কফুর্টবাসীদের দ্বারা। ১৫৭৪ সালে যখন তাঁরা এই অনুবাদটি মুদ্রণ করেন তখন তাঁরা এই জাল বাক্যটিকে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। কিন্তু এরপর তাঁরা আবার মানুষের নিন্দার ভয়ে পরবর্তী মুদ্রণগুলিতে এ বাক্যগুলি ফেলে দেন।
ত্রিত্ববাদীরের জন্য এই বাক্যগুলি বাদ দেওয়া খুবই কঠিন ছিল। এজন্য ওটিনবুর্গের বাসিন্দারা ১৫৯৬ ও ১৫৯৯ সালে মুদ্রিত লুথারের এই অনুবাদের মধ্যে এই বাক্যগুলি ঢুকিয়ে দেন। অনুরূপভাবে হামবুর্গবাসিগণ ১৫৯৬ সালে একই কাজ করেন। এরপর ওটিনবুর্গবাসিগণ ফ্রাঙ্কফুর্টবাসিগণের মত মানুষের নিন্দার ভয় পান। ফলে পরবর্তী মুদ্রণের সময় বাক্যগুলি ফেলে দেন।
লূথারের অনুসারী ত্রিত্ববাদী প্রটেস্টান্ট খৃস্টানগণের জন্য এই বাক্যটিকে বাদ দেওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তখন লূথারের নিজের অন্তিম নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর অনুবাদের মধ্যে এ বাক্যটি উল্লেখ করা হয়।
এ যদি হয় আধুনিক যুগের অবস্থা, তাহলে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে, যখন বাইবেলের কপি ও পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল খুবই কম , তখন তাঁরা কি করেছেন তা সহজেই অনুমেয়।
প্রসিদ্ধ দার্শনিক আইজ্যাক নিউটন ৫০ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা লিখেছেন। এই পুস্তিকাতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, যোহনের পত্রের উপরের বাক্যগুলি বিকৃত ও সংযোজিত।
এখানে উল্লেখ্য যে, আধুনিক অনেক সংস্করণে উপর্যুক্ত জাল বাক্যগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলা বাইবেলগুলিতেও এ বাক্যগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে। বা টীকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
১০- যীশুকে ঈশ্বরের পুত্র বানানোর জন্য বিকৃতি:
প্রেরিতগণের কার্যবিবরণের ৮ম অধ্যায়ের ৩৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘ফিলিপ কহিলেন, সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত যদি বিশ্বাস করেন, তবে হইতে পারেন। তাহাতে তিনি উত্তর করিয়া কহিলেন, যীশু খৃস্ট যে ঈশ্বরের পুত্র ইহা আমি বিশ্বাস করিতেছি (I believe that Jesus Christ is the Son of God)।’’
এ বাক্যগুলি পরবর্তীকালে সংযোজিত। কোনো একজন ত্রিত্ববাদী ‘যীশু খৃস্ট যে ঈশ্বরের পুত্র ইহা আমি বিশ্বাস করিতেছি’ এ কথার দ্বারা খৃস্টের ঈশ্বরত্ব প্রমাণ করার জন্য এই বাক্যটি বাইবেলের মধ্যে সংযোজন করেছেন। ক্রীসবাখ ও শোলয একমত যে, বাক্যটি পরবর্তী সংযোজন। লক্ষণীয় যে, ইংরেজি রিভাইয্ড স্টান্ডার্ড ভার্সন (Revised Standard Version: RVS)-এ এ শ্লোকটি মূল পাঠ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং টীকায় মন্তব্য করা হয়েছে। উইলিয়াম কেরি অনূদিত বাংলা বাইবেলেও এভাবে ৩৭ শ্লোকটি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং টীকায় বলা হয়েছে: ‘‘কোনো কোনো প্রাচীন অনুলিপিতে এখানে এই কথাগুলি পাওয়া যায়’’ ... এ কথা বলে উপরের জাল শ্লোকটি উল্লেখ করা হয়েছে।
১১-যাকোবের পুত্র রুবেনের ব্যভিচারের কাহিনীতে বিকৃতি:
আদিপুস্তকের ৩৫ অধ্যায়ের ২২ শ্লোকটি হিব্রু সংস্করণে নিম্নরূপ: ‘‘সেই দেশে ইস্রায়েলের (যাকোবের) অবস্থিতি কালে রূবেন (যাকোবের প্রথম পুত্র) গিয়া আপন পিতার বিল্হা নাম্মী উপপত্নীর সহিত শয়ন করিল, এবং ইস্রায়েল (যাকোব) তাহা শুনিতে পাইলেন।’’
এখানে কিছু কথা বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতি সাধান করা হয়েছে। হেনরি ও স্কটের ভাষ্যগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন: ইয়াহূদীগণ স্বীকার করেন যে, এ শ্লোক থেকে কিছু কথা বাদ পড়ে গিয়েছে। গ্রীক অনুবাদে এ অপূর্ণতা নিম্নরূপে পুরণ করা হয়েছে: ‘‘এবং তাঁহার দৃষ্টিতে তা অন্যায় হইল।’’
তাহলে ইয়াহূদীরাও স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, কিছু কথা বাদ পড়েছে। হিব্রু তোরাহ থেকে একটি পুর্ণ বাক্য বাদ পড়ে যাওয়া বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াও ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। তাহলে দুই একটি শব্দের বিষয়ে আর কি কথা থাকতে পারে। আর যেহেতু ‘‘ঈশ্বরের গ্রন্থের মধ্যে’’ এরূপ রদবদল তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক কাজেই কেন তারা এখানে এরূপ বিয়োজন করলেন তা প্রশ্ন করে আর কী লাভ?
১২- ইউসূফ-ভাতৃগণের চুরির ঘটনা বর্ণনায় বিয়োজন:
ইউসূফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইয়ের ছালার মধ্যে তাঁর বাটি রাখা ও পরে তা বের করা ঘটনার বর্ণনায় আদিপুস্তকের ৪৪ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘আমার প্রভু যাহাতে পান করেন ও যদ্বারা গণনা করেন, এ কি সেই বাটি নয়? এ কর্ম করায় তোমরা দোষ করিয়াছ।’’
এখানে কিছু কথা বিয়োজন করা হয়েছে বা বাদ পড়ে গিয়েছে। বাইবেল ব্যাখ্যাকার হার্সলি বলেন: ‘‘এ শ্লোকের শুরুতে নিম্নের বাক্যটি সংযোজিত করতে হবে: ‘‘তোমরা কেন আমার বাটি চুরি করিলে?’’ গ্রীক অনুবাদ থেকে এই বাক্যটি নিয়ে হিব্রু পাঠে যোগ করতে হবে।’’
১৩- মূসা আলাইহিস সালাম-এর মাতা ও ভগ্নির নাম-পরিচয় বিকৃতি:
যাত্রাপুস্তকের ৬ অধ্যায়ের ২০ শ্লোকে রয়েছে: ‘‘অম্রম (Amram) আপন পিসি যোকেবদকে বিবাহ করিলেন, আর ইনি তাঁহার জন্য হারোণকে ও মোশিকে প্রসব করিলেন।’’
নিঃসন্দেহে এখানে বিয়োজন-জনিত বিকৃতি ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে পুরাতন নিয়মের নিয়ম সকল সন্তানের নাম উল্লেখ করা। এ শ্লোক থেকে বুঝা যায় যে, অম্রমের মাত্র দুটি পুত্রসন্তানই ছিল; অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের একজন কন্যাসন্তানও ছিল। শমরীয় সংস্করণ থেকে এ বিকৃতি বুঝা যায়। শমরীয় সংস্করণে এবং গ্রীক অনুবাদে রয়েছে: ‘‘আর ইনি তাঁহার জন্য হারোণকে, মোশিকে ও তাঁহাদের ভগিনী মরিয়মকে প্রসব করিলেন।’’
তাহলে ‘‘ও তাঁহাদের ভগিনী মরিয়মকে’’ কথাগুলি হিব্রু তোরাহ থেকে বাদ পড়ে গিয়েছে। আদম ক্লার্ক শমরীয় ও গ্রীক সংস্করণ থেকে উপর্যুক্ত কথাগুলি উদ্ধৃত করার পরে বলেন: ‘‘কোনো কোনো শীর্ষস্থানীয় গবেষক পণ্ডিত মনে করেন যে, হিব্রু পাঠেও এই কথাগুলি ছিল।’’
এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, ইয়াহূদীগণ একান্তই ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে তাদের তাওরাত থেকে কয়েকটি শব্দ বাদ দিয়েছেন। শমরীয়দের তাওরাতের বিকৃতি প্রমাণ করতে অথবা খৃস্টানদের গ্রীক অনুবাদের বিকৃতি প্রমাণ করতে তারা এরূপ করেছেন।
এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। এ শ্লোক থেকে নিশ্চিত জানা যায় যে, মূসা আলাইহিস সালামের পিতা আপন ফুফুকে বিবাহ করেছিলেন। মূসার পিতা অম্রম (ইমরান)। অম্রমের পিতা কহাৎ। কহাতের পিতা লেবী। আর মূসার পিতা অম্রম বিবাহ করেন তার পিতা কহাতের ভগ্নি যোকাবেদ বিনত লেবীকে। উপরের শ্লোকে তা সুস্পষ্টত বলা হয়েছে। এ শ্লোকের ইংরেজি, আরবী, ফারসী, উর্দু, বাংলা বিভিন্ন ভাষার অনুবাদেও স্পষ্টত তা উল্লেখ করা হয়েছে।
মূসা আলাইহিস সালাম-এর শরীয়ত বা ব্যবস্থা মতে ফুফুকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ। লেবীয় পুস্তকের ১৮/১২ ও ২০/১৯ শ্লোকে তা বলা হয়েছে। এজন্য খৃস্টানগণ এ পরিচয় গোপন করতে বিকৃতির আশ্রয় নেন। ভ্যাটিকানের পোপ অষ্টম উর্বান (Urban) -এর সময়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে বাইবেলের যে আরবী সংস্করণটির অনুবাদ ও সম্পাদনা করা হয় এবং ১৬২৫ খৃস্টাব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় সে সংস্করণে এ শ্লোকটি নিম্নরূপ লেখা হয়েছে: ‘‘অম্রম আপন পিসির কন্যা যোকেবদকে বিবাহ করিলেন।’’
এখানে ‘‘পিসি’’ বা ‘‘ফুফু’’ শব্দটিকে বিকৃত করে ‘‘পিসির কন্যা’’ (ফুফাতো বোন) বানানো হয়েছে। পরবর্তী বিভিন্ন আরবী সংস্করণে এরূপ পিসির বদলে পিসির কন্যা লেখা হয়েছে। এভাবে তারা নিজেদের মনমর্জি মত কিছু রদবদল বা পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো কোনো সংস্করণ বিকৃত করেছেন।
১৪- গীতসংহিতায় বিয়োজন বা সংযোজন করে বিকৃতি:
গীতসংহিতার ১৪ গীতের ৩য় শ্লোকের পরে- ৩ ও ৪ শ্লোকের মাঝখানে- ল্যাটিন, ইথিওপিয়, আরবী অনুবাদে এবং গ্রীক অনুবাদের ভ্যাটিকানের পাণ্ডুলিপিতে নিম্নের বাক্যগুলি রয়েছে: ‘‘তাহাদের কণ্ঠ অনাবৃত কবরস্বরূপ; তাহারা জিহবাতে ছলনা করিতেছে; তাহাদের ওষ্ঠাধরের নিম্নে কালসর্পেব বিষ থাকে; তাহাদের মুখ অভিশাপ ও কটুকাটব্যে পূর্ণ; তাহাদের চরণ রক্তপাতের জন্য ত্বরান্বিত। তাহাদের পথে পথে ধ্বংস ও বিনাশ; এবং শান্তির পথ তাহারা জানে নাই; ঈশ্বর-ভয় তাহাদের চক্ষুর অগোচর।’’
এ বাক্যগুলি হিব্রু বাইবেলে নেই। কিন্তু এ কথাগুলি রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের ৩/১৩-১৮ শ্লোকে রয়েছে। পৌল পুরাতন নিয়মের বক্তব্য হিসেবে এ কথাগুলিকে উদ্ধৃত করেছেন। এখানে দুটি বিষয়ের একটি অবশ্যই ঘটেছে। হয়তবা ইয়াহূদীরা মূল হিব্রু বাইবেল থেকে এ শ্লোকগুলি ফেলে দিয়েছেন। নতুবা খৃস্টানগণ তাঁদের মহাপুরুষ পৌলের বক্তব্যকে প্রমাণিত করার জন্য তাঁদের অনুবাদের মধ্যে এই কথাগুলি সংযোজন করেছেন। প্রথম সম্ভাবনা স্বীকার করলে বাইবেলে বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতি প্রমাণিত হয়। আর দ্বিতীয় সম্ভাবনা স্বীকার করলে বাইবেলে সংযোজন ও বৃদ্ধির মাধ্যমে জালিয়াতি প্রমাণিত হয়। সর্বাবস্থায় এখানে দু প্রকারের জালিয়াতির এক প্রকার মানতেই হবে।
১৫- লূকলিখিত সুসমাচারে বিয়োজন-জনিত বিকৃতি
যীশু খৃস্ট তার শিষ্যদেরকে কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের আগমন সম্পর্কে ও সেজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পর্কে কিছু উপদেশ প্রদান করেন বলে মথি, মার্ক ও লূক উল্লেখ করেছেন। লূকের বর্ণনায় কিছু কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। লূকলিখিত সুসমাচারের ২১/৩২-৩৪ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৩২) আমি তোমাদেরকে সত্য বলিতেছি, যে পর্যন্ত সমস্ত সিদ্ধ না হইবে সেই পর্যন্ত এই কালের লোকদের লোপ হইবে না। (৩৩) আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনও হইবে না। (৩৪) কিন্তু আপনাদের বিষয়ে সাবধান থাকিও, পাছে ভোগপীড়ায় ও মত্ততায় এবং জীবিকার চিন্তায় তোমাদের হৃদয় ভারগ্রস্ত হয়, আর সেই দিন হঠাৎ ফাঁদের ন্যায় তোমাদের উপর আসিয় পড়ে।’’
হর্ন তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: ‘‘লূকলিখিত সুসমচারের ২১ অধ্যায়ের ৩৩ ও ৩৪ শ্লোকের মাঝখানে একটি পূর্ণ শ্লোক পড়ে গিয়েছে। মথিলিখিত সুসমাচারের ২৪ অধ্যায়ের ৩৬ শ্লোক অথবা মার্ক লিখিত সুসমাচারের ১৩ অধ্যায়ের ৩২ শ্লোক থেকে কথাটি নিয়ে লূকের সুসমাচরের উপর্যুক্ত শ্লোকদ্বয়ের মাঝে সংযোজন করতে হবে।’’
এরপর টীকায় বলেন: ‘‘এখানে যে বড় রকমের বিয়োজন ও বিকৃতি ঘটেছে সে বিষয়টি সকল গবেষক ও ব্যাখ্যাকার এড়িয়ে গিয়েছেন। সর্বপ্রথম হেলস-ই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।’’
এ ঘটনা বর্ণনায় মথির বিবরণ (মথি ২৪/৩৪-৩৬) নিম্নরূপ: ‘‘(৩৪) আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, এই কালের লোকদের লোপ হইবে না, যে পর্যন্ত না এ সমস্ত সিদ্ধ হয়। (৩৫) আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনও হইব না। (৩৬) কিন্তু সেই দিনের ও সেই দন্ডের কথা কেহই জানে না, স্বর্গের দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’
একই ঘটনা বর্ণনায় মার্ক বলেন (মার্ক ১৩/৩০-৩২): ‘‘(৩০) আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যন্ত এ সমস্ত সিদ্ধ না হইবে, সে পর্যন্ত এ কালের লোকদের লোপ হইবে না। (৩১) আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনও হইবে না। (৩২) কিন্তু সেই দিনের বা সেই দন্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না, স্বর্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’
তাহলে হর্ন-এর স্বীকৃতি অনুযায়ী লূকের সুসমাচার থেকে একটি পূর্ণ শ্লোক বাদ পড়ে গিয়েছে, যে শ্লোকটি পুনঃসংযোজন অত্যাবশ্যক। আর সে শ্লোকটি হলো: ‘‘কিন্তু সেই দিনের বা সেই দন্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না, স্বর্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’
১৬- ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের বিদ্বেষপ্রসূত বিকৃতি:
মথিলিখিত সুসমাচারের ২য় অধ্যায়ের ২৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘এবং নাসরৎ নামক নগরে গিয়া বসতি করিলেন; যেন ভাববদিগণের দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হয় যে, তিনি নসরতীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন।’’
‘‘যেন ভাববাদিগণের দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হয় যে, তিনি নসরতীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন’’- এই কথাগুলি মথির সুসমাচারের অন্যতম ভুল। কারণ ভাববাদিগণের নামে প্রচলিত ও পরিচিত পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকেই এ কথাটি নেই। এখানে দুটি বিষয়ের একটি স্বীকার করতেই হবে। হয় খৃস্টানগণ ইয়াহূদীদের প্রতি বিরোধিতা ও বিদ্বেষের কারণে এ বাক্যগুলি তাদের সুসমাচারের মধ্যে সংযোজন করেছেন ইয়াহূদীদের বিকৃতি প্রমাণ করতে। তাহলে তা সংযোজনজনিত বিকৃতি বলে গণ্য হবে। অথবা ইয়াহূদীগণ তাদের ভাববাদিগণের পুস্তক থেকে এ কথাগুলি মুছে দিয়েছেন খৃস্টানদেরকে বিভ্রান্ত প্রমাণ করতে। এক্ষেত্রে তা বিয়োজন জনিত বিকৃতি বলে গণ্য হবে।
এখানে প্রাচীন খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিত ‘‘ক্রীযস্টম (John Chrysostom: 347–407) ও অন্যান্য খৃস্টান পণ্ডিতগণ দাবি করেছেন যে, মথির উদ্ধৃত এ কথাটি যে সকল পুস্তকে বিদ্যমান ছিল সে সকল পুস্তক সব বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। ভাববাদিগণের অনেক পুস্তক হারিয়ে ও বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। কারণ, ইয়াহূদীগণ তাঁদের অবহেলার কারণে- বরং তাঁদের ধর্মহীনতা ও অসততার কারণে- অনেক পুস্তক হারিয়ে ফেলেছে। কিছু পুস্তক তাঁরা ছিড়ে ফেলেছে এবং কিছু পুস্তক তাঁরা পুড়িয়ে ফেলেছে। তাঁরা যখন দেখলেন যে, যীশুর প্রেরিত শিষ্যগণ এ সকল পুস্তকের কথা দিয়ে খৃস্টধর্মের বিভিন্ন বিষয় প্রমাণ করছেন, তখন তাঁরা যীশুর পক্ষের প্রমাণ বিনষ্ট করতে এ কাজ করেন। এ থেকে জানা যায় যে, মথি যে সকল পুস্তক থেকে এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন ইয়াহূদীরা সে পুস্তকগুলি বিনষ্ট করে ফেলেছে।
‘‘এজন্য ট্রিফোনের (Tryphon) সাথে বিতর্কের সময় জাস্টিন (Justin) বলেন: ‘ইয়াহূদীরা পুরাতন নিয়ম থেকে অনেক পুস্তক বাদ দিয়েছে, যেন প্রকাশ পায় যে, নতুন নিয়মের কথাবার্তা পুরাতন নিয়মের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
খৃস্টান গবেষকগণের এ সকল বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, এরূপ বিকৃতি সেযুগে খুবই সহজ ছিল। শুধু ধর্মীয় শত্রুতা ও মতপার্থক্যের কারণে কিভাবে ইয়াহূদীরা এ সকল ধর্মগ্রন্থ ছিড়ে, পুড়িয়ে বা নষ্ট করে ফেলল এবং পুস্তকগুলিকে বিনষ্ট করার ফলে কিভাবে সেগুলি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল! বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতির এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় তাঁদের প্রবৃত্তির তাড়নায় অথবা অন্য একটি ধর্মের বিরোধিতার জন্য ঈশ্বরের বাণী ও ঐশ্বরিক প্রেরণা-লব্ধ কিছু পুস্তক একেবারে গুম করে দিলেন! এত বড় বিকৃতি কি আর হতে পারে?
ইয়াহূদীরা যদি খৃস্টধর্মের অসারতা প্রমাণের জন্য নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃতি করতে বা গুম করে দিতে পারে এবং খৃস্টানরা যদি ইয়াহূদীদের বিরোধিতার জন্য নিজেদের ধর্মগ্রন্থে বিকৃতি করতে পারে তাহলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াত বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণীগুলি বিনষ্ট বা বিকৃত করা কি তাদের জন্য অসম্ভব বিষয়? বরং ইসলাম, মুসলিম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতায় তাদের যে উগ্রতা তাতে আমরা জোর দিয়েই দাবি করতে পারি যে, মুসলিমদের পক্ষে যে সকল পুস্তক বা কথাবার্তা ছিল সেগুলিও তাঁরা এভাবে বিনষ্ট বা বিকৃত করেছেন। কোনো যুক্তি, বিবেক বা লিখিত প্রমাণ কি এ দাবির বিরোধিতায় পেশ করা যাবে??

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.