| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইসলাম হাউস
তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।
১. ৩. ৪. বিকৃতি বিষয়ে পাদরিগণের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
খৃস্টান প্রচারকগণ বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতির কথা এড়িয়ে বিভিন্ন কথা বলে সাধারণ মুসলিমদেরকে বুঝাতে চান যে, বাইবেলের মধ্যে কোনোরূপ বিকৃতি নেই। তাদের এ জাতীয় কয়েকটি বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার আমরা এখানে আলোচনা করতে চাই।
১. ৩. ৪. ১. শুধু মুসলিমরাই বিকৃতির কথা বলে
প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণের লেখনি বা আলোচনা থেকে অনেক সময় প্রকাশ পায় যে, একমাত্র মুসলিমরাই বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে বলে দাবি করেন। তাদের আগে কেউ এরূপ দাবি করেন নি। সাধারণ মুসলিম, বিশেষত খৃস্টান পণ্ডিতদের বইপুস্তক যারা পাঠ করেন নি তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাঁরা এ সব কথা বলেন। প্রকৃত সত্য কথা হলো, অ-খৃস্টান পণ্ডিতগণ, ভিন্নমতাবলম্বী খৃস্টানগণ এবং ধার্মিক খৃস্টানগণ সকলেই প্রাচীন যুগ থেকে বাইবেলের বিকৃতির কথা বলে আসছেন। নিম্নে আমরা তাদের কিছু মতামত উল্লেখ করছি:
১. ৩. ৪. ২. বিকৃতি বিষয়ে অমুসলিমগণের সাক্ষ্য
প্রথমত: অ-খৃস্টানগণের মতামত
(১) ২য় শতাব্দীর রোমান পণ্ডিত সেলসাসের মত
দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের একজন পৌত্তলিক পণ্ডিত ছিলেন সেলসাস (Celsus Epicurean)। তিনি খৃস্টধর্মের প্রতিবাদে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রসিদ্ধ জার্মান খৃস্টান-পণ্ডিত একহর্ন এ পৌত্তলিক পণ্ডিতের পুস্তক থেকে তাঁর নিম্নের বক্তব্যটি উদ্ধৃত করেছেন: ‘‘খৃস্টানগণ তাদের সুসমাচারগুলি তিনবার বা চারবার বা তারও বেশিবার কঠিনভাবে পরিবর্তন করেছে, এমনকি সেগুলির বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।’’
সম্মানিত পাঠক, তাহলে লক্ষ্য করুন, এই পৌত্তলিক পণ্ডিত জানাচ্ছেন যে, তাঁর যুগেই খৃস্টানগণ চার বারেরও বেশি বিকৃত করেছেন তাঁদের সুসমাচারগুলিকে।
(২) আধুনিক পণ্ডিত পার্কারের মত:
ঊনবিংশ শতকের প্রসিদ্ধ আমেরিকান সংস্কারক ও পাদরী থিয়োডোর পার্কার (Theodore Parker: ১৮৬০)। চার্চ নিয়ন্ত্রিত খৃস্টানদের দৃষ্টিতে তিনি ধর্মদ্রোহী (Heretic)। তিনি বলেন: ‘‘বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান ভুল ও বিকৃতি- যাকে খৃস্টান পণ্ডিতগণ ভুল, পাঠের বিভিন্নতা (erratum, Various readings/Variety of reading) ইত্যাদি বলে অভিহিত করেন- এরূপ ভুলের সংখ্যা মিলের হিসাব অনুযায়ী ত্রিশ হাজার।
(৩) প্রায় একশত জাল ইঞ্জিল
একজন চার্চবিরোধী খৃস্টান পণ্ডিত বাইবেলের নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত পুস্তক ও পত্রাবলি ছাড়াও প্রাচীন খৃস্টান ধর্মগুরুগণ যীশুখৃস্ট, তাঁর মাতা মেরি বা তাঁর প্রেরিত শিষ্যগণ বা তাদের অনুসারিগণের নামে প্রচারিত পুস্তক ও পত্রের নাম উল্লেখ করে তালিকা তৈরি করেন। তাতে তিনি এরূপ ৭৪টি জাল ইঞ্জিল বা পত্রের নাম উল্লেখ করেছেন।
এরপর তিনি বলেন, এভাবে আমরা ‘সুসমাচার’, ‘প্রকাশিত বাক্য’ ও পত্রাবলির এক সুবিশাল ভান্ডার দেখতে পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত অধিকাংশ খৃস্টান মনে করেন যে, এ সকল পুস্তকের অধিকাংশই সত্যিকারেই উল্লিখিত লেখকদের রচনা। তাহলে প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায় যে পুস্তক বা পত্রগুলিকে মেনে নিয়েছেন সেগুলিই যে সত্যিকারের ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ পুস্তক তা আমরা কিভাবে জানব? এছাড়া আমার জানি যে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার আগে এ সকল ‘স্বীকৃত’ পুস্তকও বিকৃতি, পরিবর্তন ও সংযোজনের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এতে সমস্যা আরো ঘনীভুত হয়।
দ্বিতীয়ত: অ-গোঁড়া (heretic) খৃস্টানগণের মতামত
(১). প্রথম শতাব্দী থেকে এবোনাইট খৃস্টানগণের মত
প্রথম যুগের অত্যন্ত প্রসিদ্ধ খৃস্টান সম্প্রদায় এবোনাইট সম্প্রদায় (Ebionites)। তাঁর পৌলের সমসাময়িক ছিলেন এবং পৌলের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁরা বলতেন যে, পৌল ধর্মত্যাগী। এই সম্প্রদায়ের খৃস্টানগণ মথির সুসমাচারটি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাঁদের নিকট সংরক্ষিত মথিলিখিত সুসমাচারটির সাথে বর্তমানে পৌলের অনুসারী খৃস্টানগণের নিকট প্রচলিত ‘মথিলিখিত সুসমাচারের’ অনেক স্থানেই মিল নেই। প্রচলিত ‘মথি’-র প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়দ্বয় তাঁদের ‘মথি’র মধ্যে ছিল না। এবোনাইটদের মতে এ দু অধ্যায় ও অন্যান্য অনেক স্থানে অনেক কথা জাল ও বানোয়াট। তারা যীশুর ঈশ্বরত্বে বিশ্বাস করত না; বরং তাঁকে মানুষ ও রাসূল বলে বিশ্বাস করত।
(২). দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে মারসিওনীয় খৃস্টানগণের মত
দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মবাদী (Gnostic) খৃস্টান সম্প্রদায় ‘মারসিওনীয় সম্প্রদায় ’। তাঁরা পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকই মানতেন না। তাঁরা বলতেন যে, এগুলি কোনোটিই ঐশ্বরিক প্রেরণা-লব্ধ পুস্তক নয়। অনুরূপভাবে তাঁরা নতুন নিয়মের সকল পুস্তক অস্বীকার করতেন। কেবল লূকলিখিত সুসমাচার এবং পৌলের পত্রাবলি থেকে ১০টি পত্র তাঁরা ঐশ্বরিক বলে মানতেন। আর তাঁদের স্বীকৃত এ সুসমাচার ও পত্রাবলিও বর্তমানে প্রচলিত সুসমাচার ও পত্রাবলি থেকে ভিন্ন। লূকের সুসমাচারের প্রথম দুটি অধ্যায়কে তারা জাল বলে গণ্য করত। এছাড়াও এ সুসমাচারের আরো অনেক বিষয় তারা অস্বীকার করত। লার্ডনার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে এরূপ ১৪টি স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। বেল উল্লেখ করেছেন যে, এ খৃস্টান সম্প্রদায় দুটি ঈশ্বরে বিশ্বাস করত: একজন মঙ্গলের ঈশ্বর ও অন্যজন অমঙ্গলের ঈশ্বর। তারা বিশ্বাস করত যে, তাওরাত ও পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক অমঙ্গলের ঈশ্বরের প্রদত্ত; কারণ তা নতুন নিয়মের বিপরীত।
(৩) তৃতীয়-চতুর্থ শতাব্দী থেকে মানিকীয সম্প্রদায়ের মত
তৃতীয় খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ ধর্ম প্রচারক মানী (Manes/Mani) ও তাঁর অনুসারী মানিকীয সম্প্রদায় (Manichees/ Manichaen/ Manichean) নিজেদেরকে খৃস্টের অনুসারী ও খৃস্টান বলে দাবি করতেন। এ সম্প্রদায়ের একজন প্রসিদ্ধ অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস। তিনি চতুর্থ শতাব্দীর মানুষ। তিনি ইঞ্জিলগুলির বিকৃতির বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। লার্ডনার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে চতুর্থ শতকের প্রসিদ্ধতম খৃস্টান পণ্ডিত সেন্ট অগাস্টাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ফাস্টিস বলেন: আপনাদের পিতা ও পিতামহগণ ষড়যন্ত্র করে নতুন নিয়মের পুস্তকাবলির মধ্যে যে সকল বিষয় সংযোজন করেছেন আমি সেগুলির নিন্দা করি ও প্রত্যাখ্যান করি। এরূপ জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁরা নতুন নিয়মের সুন্দর অবস্থাকে দুষিত ও ত্রুটিময় করেছেন এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট করেছেন। আর এ কথা তো সুনিশ্চিত যে, খৃস্ট বা তাঁর প্রেরিত শিষ্যগণের কেউই নতুন নিয়ম রচনা করেন নি বরং একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তা রচনা করে প্রেরিতগণ ও প্রেরিতগণের সঙ্গীদের নামে চালিয়েছে। কারণ এই অজ্ঞাতনামা লেখক ভয় পেয়েছিল যে, সাধারণ মানুষেরা তাঁর লেখা পুস্তক গ্রহণ করবেন না। তারা ভাববেন যে, এ লেখক যীশুর যে সকল বিবরণ লিখেছেন সেগুলি প্রত্যক্ষ করে বা ভালভাবে জেনে লিখে নি। এ ভয়ে সে বইগুলি লিখে প্রেরিতগণ বা তাঁদের শিষ্যগণের নামে চালিয়েছে। এ অপকর্মের মাধ্যমে লোকটি যীশুর অনুসারী ও প্রেমিকগণকে অত্যন্ত কঠিন কষ্ট দিয়েছে। কারণ সে অগণিত ভুল ও বৈপরীত্যে ভরা কিছু বই লিখেছে।
এ হলো নতুন নিয়ম সম্পর্কে এই সম্প্রদায়ের বিশ্বাস। তাঁদের এই পণ্ডিত যে বিষয়গুলি উল্লেখ করেছেন সেগুলির অন্যতম:
(১) ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণ নতুন নিয়মের মধ্যে অনেক কিছু সংযোজন ও জালিয়াতি করেছেন।
(২) এ পুস্তকগুলি প্রেরিতগণ বা তাদের সঙ্গীদের রচিত নয় বরং একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সেগুলি রচনা করেছেন।
(৩) এগুলি অগণিত ভুল ও বৈপরীত্যে পূর্ণ।
লার্ডনার তার বাইবেল-ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন যে, ঐতিহাসিকগণ একমত যে, মানিকীয সম্প্রদায় পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তককেই স্বীকার করত না; উপরন্তু তারা বিশ্বাস করত যে, শয়তান মূসা আলাইহিস সালাম-এর সাথে কথা বলেছিল এবং ইয়াহূদী নবীগণকে প্রবঞ্চনা করেছিল। তারা ইয়াহূদী নবীগণকে চোর ও দস্যু বলে আখ্যায়িত করত।
উপরের দুইটি অনুচ্ছেদ থেকে একথা প্রমাণিত হলো যে, অ-খৃস্টানগণ এবং এবং খৃস্টানগণের মধ্যে অনেক সম্প্রদায়, যাদেরকে গোঁড়া খৃস্টানগণ অ-ধার্মিক বা বিভ্রান্ত বলে মনে করেন তাঁরা সেই প্রথম শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত উচ্চরবে ঘোষণা দিচ্ছেন যে, বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ও জালিয়াতি ঘটেছে।
তৃতীয়ত: প্রসিদ্ধ গোঁড়া খৃস্টানগণের মতামত
তৃতীয় পর্যায়ে আমরা বাইবেলের বিকৃতির বিষয়ে মূলধারার গোঁড়া খৃস্টান সম্প্রদায়ের নিকট গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ বাইবেল ব্যাখ্যাকার ও ঐতিহাসিকদের বক্তব্য উদ্ধৃত করব। বস্তুত বাইবেলের বিকৃতির বিষয়ে প্রায় সকল খৃস্টান গবেষকই একমত। কিন্তু খৃস্টধর্ম প্রচারকগণ এগুলি গোপন করার চেষ্টা করেন। এখানে সামান্য কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করা হচ্ছে:
(ক) আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ৩৬৯ পৃষ্ঠায় বলেন: ‘‘প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত রীতি হলো, অনেকেই মহান ব্যক্তিদের ইতিহাস রচনা করেন। প্রভু যীশুর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা ছিল (অনেকেই তাঁর ইতিহাস রচনা করেছেন।) কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ বর্ণনা ছিল অসত্য। অনেক বিষয় যা কখনোই ঘটেনি সেগুলি নিশ্চিত ঘটেছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। অন্য অনেক ঘটনা ও অবস্থার বর্ণনায় তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করেছেন। এ কথা সুপ্রমাণিত ও সুনিশ্চিত যে, প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দীতে অনেক মিথ্যা সুসমাচার প্রচলিত ছিল। সত্তরেরও বেশি এরূপ মিথ্যা সুসমাচারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সকল সুসমাচারের অনেক অংশ এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। ফ্যাবারিসিয়াস এসকল মিথ্যা সুসমাচার একত্রে সংকলন করে তিন খণ্ডে মুদ্রণ করেছেন।
(খ) পুরাতন নিয়মের প্রথম পাঁচটি পুস্তক মোশির রচিত বলে বর্তমানে প্রসিদ্ধ। এছাড়াও আরো ছয়টি পুস্তক তাঁর রচিত বলে প্রচারিত ও পরিচিত ছিল। পুস্তকগুলির নাম নিম্নরূপ:
1. মোশির নিকট প্রকাশিত বাক্য।
2. ক্ষুদ্র আদিপুস্তক (Genesis Apocryphon)।
3. উর্ধ্বারোহণ পুস্তক (The Assumption of Moses)।
4. রহস্য পুস্তক।
5. প্রতিজ্ঞা বা নিয়ম পুস্তক (Testament)।
6. স্বীকৃতি পুস্তক।
হর্ন বলেন: ‘‘ধারণা করা হয় যে, খৃস্টধর্মের শুরুর দিকে, অর্থাৎ খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এ সকল জাল পুস্তকগুলি রচনা করা হয়েছে।’’
(গ) ঐতিহাসিক মোশিম বলেন: প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের মধ্যে একটি কথা প্রসিদ্ধ ছিল। কথাটি হলো: ‘সত্যের বৃদ্ধির জন্য ও ঈশ্বরের উপাসনার জন্য মিথ্যা এবং প্রবঞ্চনা শুধু বৈধ-ই নয় উপরন্তু তা প্রশংসনীয় বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য।’ খৃস্টের আগমনের পূর্বেই এই কথাটি তাঁদের থেকে প্রথমে মিসরের ইয়াহূদীরা শিক্ষালাভ করে। অনেক প্রাচীন পুস্তক থেকে এ কথা নিশ্চিতরূপে জানা যায়। এরপর এ ঘৃণিত মহামারী খৃস্টানগণের মধ্যে প্রভাব ফেলে। মহান ধর্মগুরুদের নামে জালিয়াতি করে প্রচারিত বিপুল সংখ্যক পুস্তক থেকে এ কথা স্পষ্টরূপে বুঝা যায়।’’
তাহলে আমরা জানতে পারছি যে, খৃস্টের পূর্বেই ইয়াহূদীদের নিকট মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা ধর্মীয়ভাবে প্রসংশনীয় কর্মে পরিণত হয়। এরপর দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীতে খৃস্টানদের নিকটেও এভাবে মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা প্রশংসনীয় ধর্মীয় কাজে পরিণত হয়। অতএব জালিয়াতি, বিকৃতি ও মিথ্যার কোনো সীমারেখা কোথাও ছিল না। তাঁরা যা করার সবই করেছেন।
(ঘ) লার্ডনার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: ‘‘(৬ষ্ঠ শতাব্দীতে) রোমান সম্রাট আনাসতেসিয়াস (Anastasius I:491-518)-এর যুগে, অজ্ঞাতপরিচয় লেখকের রচিত হওয়ার কারণে পবিত্র সুসমাচারগুলিকে অশুদ্ধ বলে সম্রাটের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন এগুলিকে পুনরায় সংশোধন করা হয়।’’
সুসমাচারগুলি যদি প্রকৃতই ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ হতো এবং উক্ত সম্রাটের যুগে বিদ্যমান প্রাচীন খৃস্টান পণ্ডিতগণের নিকট বিশুদ্ধ সুত্রে প্রমাণিত হতো যে পুস্তকগুলি অমুক, অমুক প্রেরিত বা তাঁদের অমুক অনুগামীর রচিত, তবে ‘অজ্ঞাত পরিচয় লেখকের রচনা’ বলে সেগুলিকে অশুদ্ধ ঘোষণা করার কোনো অর্থ থাকতো না। এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, সে যুগের খৃস্টানগণের নিকট সেগুলির লেখকের বিষয়ে কোনো প্রমাণিত তথ্য ছিল না। এ ছাড়া তাঁরা পুস্তকগুলিকে ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ বলেও মনে করতেন না। এজন্য তাঁরা যথাসাধ্য সেগুলির সংশোধন করেছেন এবং ভুলভ্রান্তি ও বৈপরীত্য দূর করেছেন। এভাবে বিকৃতির ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। এখানে বাইবেলের বিকৃতি যেমন প্রমাণিত হলো, তেমনি প্রমাণিত হলো যে, সেগুলির গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রমাণ বা সূত্র পরম্পরা নেই। সকল প্রশংসাই আল্লাহর নিমিত্ত।
(ঙ) চতুর্থ শতকের শ্রেষ্ঠ খৃস্টান পণ্ডিত ও ধর্মগুরু অগাস্টাইন (St. Augustine) এবং অন্যান্য প্রাচীন খৃস্টান ধর্মজ্ঞ পণ্ডিত বলেছেন যে, গ্রীক অনুবাদকে অগ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে ইয়াহূদীরা হিব্রু বাইবেলকে বিকৃত করে। ১৩০ খৃস্টাব্দে ইয়াহূদীরা এ বিকৃতি সাধন করে। হেলয, কেনিকট ও অন্যান্য আধুনিক গবেষক প্রাচীণ ধর্মগুরুগণের সাথে একমত পোষণ করেছেন। কেনিকট অকাট্য প্রমাণাদি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ইয়াহূদীগণ শমরীয়দের সাথে শত্রুতার কারণে তাদের নিজেদের তাওরাতে বিকৃতি সাধন করে; যাতে শমরীয়দের নিকট সংরক্ষিত তাওরাত ভুল বলে প্রমাণিত হয়।
(চ) হার্সলি তাঁর বাইবেল-ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, ‘বাইবেলের পাঠ বিকৃত হয়েছে’ এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিভিন্ন সংস্করণ ও পাণ্ডুলিপির বৈপরীত্য থেকেও এ কথা স্পষ্টত জানা যায়। বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে যে সকল অত্যন্ত আপত্তিকর ও খারাপ কথা বিদ্যমান সেগুলি থেকে বিকৃতির এ বিষয়টি সুদৃঢ় বিশ্বাসের কাছাকাছি চলে যায়। একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, নেবুকাদনেজারের ঘটনার পরে, বরং তার সামান্য কিছু আগে থেকেই মানুষদের নিকট হিব্রু বাইবেলের যে উদ্ধৃতি ও অংশগুলি ছিল তা ছিল বিকৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে।
(ছ) ওয়াটসন বলেন, অনেক যুগ আগেই ওরিগন এ সকল বৈপরীত্যের বিষয়ে অভিযোগ- আপত্তি প্রকাশ করতেন। তাঁর মতে এ সকল বৈপরীত্যের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন লেখকদের অবহেল ও অমনোযোগ, তাঁদের অসততা ও অসদেচ্ছা, তাদের বেপরোয়া ভাব ইত্যাদি। জিরোম (Jerome) বলেন, আমি যখন নতুন নিয়মের অনুবাদ করার ইচ্ছা করলাম, তখন আমি আমার নিকট সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপিটি মিলিয়ে দেখলাম। এতে আমি ভয়ানক বৈপরীত্য দেখতে পেলাম। আদম ক্লার্ক বলেন, ‘‘জিরোমের (Jerome) যুগের (৫ম শতকের) পূর্ব থেকেই বাইবেলের অনেক ল্যাটিন অনুবাদ প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন অনুবাদক এগুলি লিখেছিলেন। কোনো কোনো অনুবাদ ছিল বিকৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে। এগুলির একস্থানের বক্তব্য অন্য স্থানের বিপরীত ছিল। জিরোম এ সকল বিষয় উল্লেখ করেছেন।’’
(জ) খৃস্টান সন্যাসী (monk) ফিলিপস কোয়াডনলস ‘খায়ালাত’ (খেয়ালগুলি) নামে একটি বই লিখেন। ১৬৪৯ খৃস্টাব্দে বইটি (রোমে) মুদ্রিত হয়েছে। এই পুস্তকে তিনি বলেন: ‘‘পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলির বিকৃতির সংখ্যা খুবই বেশি। ইয়াহূদীদের বিকৃতি প্রমাণ করার জন্যই আমরা খৃস্টানগণ এ সকল পুস্তকের সংরক্ষণ করেছি, আমরা তাঁদের জালিয়াতির স্বীকৃতি প্রদান করি না।’’
(ঝ) প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস (James) -এর নিকট এ মর্মে দরখাস্ত পেশ করা হয় যে, ‘‘আমাদের প্রার্থনা গ্রন্থের মধ্যে যাবূরের যে পংক্তিগুলি উদ্ধৃত করা রয়েছে সেগুলির সাথে হিব্রু যাবুরের অনেক পার্থক্য। সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে কমবেশি ২০০ স্থানে এই পার্থক্য করা হয়েছে।’’
(ঞ) ইংরেজ ঐতিহাসিক মি. টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১) বলেন: ‘‘ইংরেজি অনুবাদকগণ বাইবেলের মূল বক্তব্য নষ্ট করেছেন, সত্য গোপন করেছেন, অজ্ঞদেরকে ধোঁকা দিয়েছেন এবং নতুন নিয়মের পুস্তকাবলির সহজ সরল অর্থকে বক্র করেছেন। তাঁদের কাছে আলোর চেয়ে অন্ধকার এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যাই বেশি প্রিয়।’’
(ট) নতুন অনুবাদ কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য মি. প্রোটন বলেন: ইংল্যন্ডে বর্তমানে প্রচলিত অনুবাদটি ভুলভ্রান্তিতে ভরা। তিনি পাদরীদেরকে বলেন: ‘‘আপনাদের প্রসিদ্ধ ইংরেজি অনুবাদটিতে পুরাতন নিয়মের বক্তব্য ৮৪৮ স্থানে বিকৃত করা হয়েছে। এ বিকৃতিগুলিই ছিল অনেক মানুষের বাইবেল অস্বীকারের কারণ।
বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান বৈপরীত্য, ভুল, ও বিকৃতির আলোচনায় আমরা আরো অনেক প্রসিদ্ধ গোঁড়া খৃস্টান পণ্ডিতের এ বিষয়ক আরো অনেক মতামত দেখেছি। বস্তুত বাইবেলের বিকৃতির বিষয়টি সকল গবেষকই স্বীকার করেন। অনেকে গোঁড়ামি করে সাধারণ মূলনীতি হিসেবে বিকৃতির কথা অস্বীকার করলেও বাস্তবে যখন বাইবেলের এ সকল বৈপরীত্য ও ভুল তথ্যের সম্মুখিন হন তখন বিকৃতির বিষয়টি মেনে নেন।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মুসলমানগণ ছাড়াও খৃস্টান ও অখৃস্টান সকলেই বাইবেলের বিকৃতির কথা বলেছেন। এখন আমরা খৃস্টান পণ্ডিতগণ বিকৃতির যে সকল কারণ উল্লেখ করেছেন তা পর্যালোচনা করব।
১. ৩. ৪. ৩. বাইবেলে বিকৃতির কারণাদি
হর্ন তাঁর বাইবেল ব্যাখ্যাগ্রন্থে Various readings বা বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান পাঠের বিভিন্নতার চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন:
প্রথম কারণ: ‘‘লিপিকারের অসতর্কতা ও ভুল’’
বিভিন্ন ভাবে তা ঘটতে পারে।
প্রথমত, লিপিকারকে যিনি বলেছিলেন তিনি এভাবেই বলেছিলেন, অথবা লিপিকার তাঁর কথা ঠিকমত বুঝতে পারেন নি, ফলে ভুল লিখেছেন।
দ্বিতীয়ত, হিব্রু ও গ্রীক বর্ণগুলি অনেকটা একইরূপ ছিল। এজন্য লিপিকার একটির স্থানে আরেকটি লিখেছেন।
তৃতীয়ত, লিপিকার হয়ত ভেবেছেন যে, বিভক্তি-চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন জ্ঞাপক আংশিক বর্ণ ব্যবহারে ভুল হয়েছে, অথবা তিনি মূল বক্তব্য বুঝতে পারেন নি, ফলে তিনি সংশোধন করার উদ্দেশ্যে ভুলের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন।
চতুর্থত, লেখক লিখতে যেয়ে ভুলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গিয়েছেন। যখন বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন তখন আর লিখিত কথাগুলি মুছতে রাজি হন নি বরং যা লেখা হয়ে গিয়েছিল তা ঠিক সেভাবেই রেখে দিয়ে যে স্থান থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল সেই স্থান থেকে লিখতে শুরু করেছেন।
পঞ্চমত, লেখক লিখতে লিখতে কিছু কথা বাদ দিয়ে ফেলেন। এরপর অন্য কিছু লেখার পরে পূর্ববর্তী স্থানে বাদ দেওয়ার বিষয়টি তাঁর কাছে ধরা পড়ে। তখন তিনি পরবর্তী যে কথাগুলি লেখা হয়েছে তার পরে বাদ পড়া কথাগুলি লিখেন। এতে এক স্থানের কথা অন্য স্থানে চলে যায়।
ষষ্ঠত, লেখকের দৃষ্টি এক লাইন থেকে অন্য লাইনে সরে যায়, ফলে কিছু কথা বাদ পড়ে যায়।
সপ্তমত, লেখক সংক্ষেপিত শব্দগুলির অর্থ বুঝতে ভুল করেন, ফলে তিনি তাঁর নিজের বুঝ অনুসারে তা পুরোপুরি লিখেন। এভাবে ভুলের মধ্যে নিপতিত হন।
অষ্টমত, লেখক বা লিপিকারের অজ্ঞতা ও অবহেলা ছিল পাঠের বিভিন্নতা (Various readings) সৃষ্টির অন্যতম বড় কারণ। তাঁরা টীকার বক্তব্য বা ব্যাখ্যাকে মূল পুস্তকের অংশ মনে করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন।
দ্বিতীয় কারণ: ‘‘মূল কপির অসম্পূর্ণতা’’
যে কপি থেকে লিপিকার অনুলিপি করেছেন সেই কপির অসম্পূর্ণতার ফলে বিভিন্নভাবে ‘পাঠের বিভিন্নতা’ ঘটতে পারে বলে বুঝা যায়:
প্রথমত, অক্ষরের বিভক্তি-চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন মুছে যাওয়া।
দ্বিতীয়ত, এক পৃষ্ঠার বিভক্তি-চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন পৃষ্ঠার উল্টো পিঠে ফুটে উঠেছে এবং উল্টো পৃষ্ঠার অক্ষরের সাথে মিশ্রিত হয়ে গিয়েছে। ফলে এই চিহ্নগুলিকে এ পৃষ্ঠার অংশ মনে করা হয়েছে। লিপিকার একে এ পৃষ্ঠার চিহ্ন মনে করে তার বুঝ মত তা লিখেছেন।
তৃতীয়ত, পরিত্যক্ত অনুচ্ছেদটি কোনোরূপ চিহ্ন ছাড়াই টীকায় লেখা ছিল। লেখক বুঝতে পারেন নি যে, অনুচ্ছেদটি কোথায় লিখতে হবে। এতে তিনি ভুল করেছেন।
তৃতীয় কারণ: ‘‘কাল্পনিক সংশোধন ও পরিমার্জন’’
বিভিন্নভাবে এরূপ আন্দাজ-অনুমান ভিত্তিক সংশোধন ঘটেছে:
প্রথমত, একটি বিশুদ্ধ ও সঠিক বক্তব্যকে লিপিকার অসম্পূর্ণ বলে মনে করেছেন অথবা তার অর্থ হৃদয়ঙ্গমে ভুল করেছেন। অথবা তিনি মনে করেছেন যে, বাক্যটি ভুল, অথচ বাক্যটি মূলত ভুল নয়। এজন্য এই লিপিকারের সংশোধনই মূলত ভুলের সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো গবেষক পাণ্ডুলিপি সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করেন নি। তারা ভুল সংশোধনকেই যথেষ্ঠ মনে করেন নি। বরং তাঁরা মূল পাণ্ডুলিপির দুর্বল বাক্য মুছে ফেলে দিয়ে সেখানে সবল ও বিশুদ্ধ বাক্য লিখেছেন। অতিরিক্ত কথাগুলি ফেলে দিয়েছেন। একাধিক সমার্থক শব্দের মধ্যে কোনো পার্থক্য বুঝতে না পারলে অতিরিক্ত শব্দগুলি ফেলে দিয়েছেন।
তৃতীয়ত, পরস্পর সম্পর্কিত বক্তব্যসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন। এক স্থানের বক্তব্যের সাথে অন্য স্থানের বক্তব্যের যেন অমিল না থাকে এজন্য তাঁরা বক্তব্যের কাটছাট করে উভয়ের মধ্যে অর্থগত সমন্বয় সাধন করতেন। পাঠের বিভিন্নতা ঘটার এটিই সবচেয়ে বড় কারণ। নতুন নিয়মের পুস্তকাবলিতে এইরূপ কার্য বেশি সাধিত হয়েছে। এজন্য পৌলের পত্রাবলির মধ্যে পরবর্তী সংযোজন বেশি ঘটেছে। গ্রীক অনুবাদের সাথে পৌলের বক্তব্যের অর্থগত সমন্বয় সৃষ্টির জন্য তাঁরা এইরূপ করেছেন।
চতুর্থত, কোনো কোনো গবেষক পণ্ডিত নতুন নিয়মকে ল্যাটিন অনুবাদের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।
চতুর্থ কারণ: ‘‘ইচ্ছাকৃত বিকৃতি’’
পণ্ডিত হর্ন বলেন, নিজের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাইবেলের বিকৃতি করেছেন, ফলে পাঠের বিভিন্নতা দেখা দিয়েছে। এ সকল ইচ্ছাকৃত বিকৃতিকারীদের অনেকেই ছিলেন বিভ্রান্ত (heretic) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং কেউ ছিলেন মূলধারার ধর্মপ্রাণ গোঁড়া খৃস্টান। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলি নিরসন করতে মূলধারার অনেক গোঁড়া ধর্মপ্রাণ ও সৎ খৃস্টান বাইবেলের মধ্যে কিছু স্থানে ইচ্ছাকৃত বিকৃতি সাধন করেছেন। পরবর্তীকালে অনেকেই এ সকল ধার্মিক খৃস্টানদের ইচ্ছাকৃত বিকৃতিগুলিকে সমর্থন করতেন ও অগ্রাধিকার প্রদান করতেন। কারণ এগুলি দিয়ে কোনো সঠিক বিষয়কে সমর্থন করা হতো অথবা সে বিষয়ক কোনো আপত্তিকে খণ্ডন করা হতো। পণ্ডিত হর্ন ধার্মিক গোঁড়া খৃস্টানদের বিকৃতির অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।
হর্নের সংক্ষেপিত বক্তব্য এখানেই শেষ।
তাঁর কথা থেকে প্রমাণিত হলো যে, লিপিকারদের অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে টীকার বক্তব্য মূল পাঠে প্রবেশ করেছে, প্রমাণিত হলো যে, সংশোধনকারিগণ তাঁদের ধারণামত যে সকল কথা ভুল মনে করেছেন সেগুলি সংশোধন করেছেন, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে ভুল হোক বা নাই হোক, প্রমাণিত হলো যে, তাঁরা দুর্বল বাক্যগুলি বাদ দিয়ে তদস্থলে বিশুদ্ধ বাক্য লিখেছেন এবং সমার্থক ও অতিরিক্ত কথা ফেলে দিয়েছেন, প্রমাণিত হলো যে, বিশেষত নতুন নিয়মের মধ্যে তাঁরা বিভিন্ন স্থানের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য পরিবর্তন করেছেন, আর এজন্যই পৌলের পত্রাবলিতে সংযোজন বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রমাণিত হলো যে, কোনো কোনো গবেষক পণ্ডিত নতুন নিয়মকে ল্যাটিন অনুবাদের সাথে মেলানোর জন্য পরিবর্তন করেছেন, প্রমাণিত হলো যে, বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গণ ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃতি সাধন করেছেন, প্রমাণিত হলো যে, ধার্মিক ও সৎ খৃস্টানগণ বিভিন্ন মত সমর্থন বা আপত্তি খণ্ডনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃতি সাধন করতেন এবং পরবর্তী যুগে তাঁদের এ সকল বিকৃতিকে সমর্থন করা হতো.... এ সব কিছু প্রমাণিত হওয়ার পরে বিকৃতির আর কোনো সুক্ষ্ম পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া কি বাকি থাকল?
এখন একথা দাবি করা কি অন্যায় ও অযৌক্তিক হবে যে, ক্রুশের পূজারী খৃস্টানগণ যারা ক্রুশের উপাসনা এবং এর মাধ্যমে অর্জিত মর্যাদা ও ক্ষমতা পরিত্যাগ করতে মোটেও রাজি ছিলেন না, তাঁরা ইসলামের আবির্ভাবের পরে ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের স্বপক্ষে যেতে পারে এরূপ আরো কিছু কথা বিকৃত করেছেন? এরপর তাঁদের পরবর্তী যুগে তাঁদের এ সকল বিকৃতি সমর্থন করা হয়েছে এবং অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে, যেমনভাবে বিভিন্ন খৃস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের বিকৃতিকে সমর্থন করা হয়েছে বরং বিভিন্ন খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিরোধের জন্য বিকৃতির চেয়ে ইসলামের প্রতিরোধের জন্য বিকৃতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ছিল অনেক বেশি। কাজেই এই বিকৃতির সমর্থনও অনেক বেশি হওয়াই ছিল স্বাভাবিক।
১. ৩. ৪. ৪. যীশু খৃস্টের সাক্ষ্য
বিকৃতি অপ্রমাণিত করতে ও বাইবেলের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে পাদরিগণের দ্বিতীয় বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এই যে, স্বয়ং যীশু খৃস্ট পুরাতন নিয়মের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেগুলি যদি বিকৃত হতো তবে নিশ্চয় তিনি তা বলতেন বরং সেক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব ছিল ইয়াহূদীদের সামনে বিকৃতি প্রমাণ করে তাদেরকে তা স্বীকারে বাধ্য করা।
নিম্নের বিষয়গুলি এই বিভ্রান্তির অপনোদন করবে:
১. ৩. ৪. ৫. যীশুর বক্তব্য বনাম বাইবেলের প্রামাণ্যতা
(ক) যীশুর সাক্ষ্য মোটেও প্রমাণিত নয়
প্রথম পর্যায়ে আমরা বলব যে, বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়মের কোনো পুস্তকের লেখকের যুগ থেকে সুপ্রসিদ্ধ ও সুপ্রচলিত হওয়ার কথা প্রমাণিত নয়। এগুলির মধ্যে এমন কোনো পুস্তক নেই যে পুস্তকটি লেখকের যুগ থেকে বহুল প্রচার লাভ করেছে, যাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, সত্যিই উক্ত লেখকই এই প্রচলিত বইটি পুরোপুরি লিখেছেন। অনুরূপভাবে কোনো একটি বইয়েরও লেখক পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা সংরক্ষিত নেই। নতুন ও পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তকে সকল প্রকারের বিকৃতি ঘটেছে বলে একটু আগে আমরা জেনেছি। আমরা আরো জেনেছি যে, ধার্মিক, গোঁড়া ও সৎ খৃস্টানগণ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়কে প্রমাণিত করার জন্য বা সে বিষয়ক আপত্তি দূরীকরণের জন্য বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন এ সকল কারণে বাইবেলের পুস্তকগুলির গ্রহণযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতার বিষয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। এ সকল পুস্তকের কোনো কথা আমাদের নিকট কোনো সুদৃঢ় প্রমাণ নয়। এগুলিকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে আমরা দ্বিধান্বিত। কারণ, এমনও তো হতে পারে যে, যীশু খৃস্ট পুরাতন নিয়মের পুস্তকাবলির বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন মর্মে যে শ্লোকটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হচ্ছে, সেই শ্লোকটি পরবর্তীকালে সংযোজন করা হয়েছে। ধার্মিক ও সৎ খৃস্টানগণ দ্বিতীয় শতকের শেষে বা তৃতীয় শতকে এবোনাইট (Ebionites) সম্প্রদায় বা মারসিওনীয় (Marcion) সম্প্রদায় বা মানিকীয (Manichees/ Manichaen/ Manichean) সম্প্রদায়ের বিরোধিতার মানসে শ্লোকটিকে বাইবেলের মধ্যে সংযোজন করেছিলেন। খৃস্টধর্মের একটি গ্রহণযোগ্য ও সঠিক বিষয়কে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে তাঁদের এ বিকৃতি পরবর্তী যুগে সমর্থন করা হয়েছে ও মেনে নেওয়া হয়েছে। এবোনাইট, মারসিওনীয় ও মানিকীয সম্প্রদায় পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক বা অধিকাংশ পুস্তক অস্বীকার করত। এজন্য হয়ত তাদেরকে ঘায়েল করতে এ সকল শ্লোক বা বক্তব্য যীশুর নামে জালিয়াতি করে লেখা হয়েছে। যেরূপভাবে তাঁরা আরিয়ান সম্প্রদায় (Arians) ও ইউটিকিয়ান (Eutychian) সম্প্রদায়ের বিরোধিতার জন্য বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি সাধন করেন এবং তাঁদের বিকৃতি পরবর্তীকালে সমর্থন করা হয়।
(খ) যীশুর সাক্ষ্য প্রচলিত পুস্তকগুলির জন্য প্রমাণিত নয়
দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা বলব যে, যীশু পুরাতন নিয়মের বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন মর্মে যে সকল কথা উল্লেখ করা হয়, সেগুলি পরবর্তীকালে সংযোজিত হোক বা প্রকৃত পক্ষে যীশুর কথাই হোক, কোনো অবস্থাতেই তাঁর এই বক্তব্য দ্বারা পুরাতন নিয়মের প্রচলিত সকল পুস্তকের বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয় না। কারণ এসকল কথার মধ্যে পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলির নাম বা সংখ্যা উল্লেখ করা নেই। তাহলে আমরা কিভাবে বুঝতে পারব যে, যীশু যে পুরাতন নিয়মের বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন সে পুরাতন নিয়মের মধ্যে ৩৯টি পুস্তক ছিল? (প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের মানুষেরা এ পুস্তকগুলি মানেন), না সেই পুরাতন নিয়মের মধ্যে ৪৬টি পুস্তক ছিল? (ক্যাথলিকগণ এ পুস্তকগুলিকে মানেন।)
ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) অত্যন্ত গোঁড়া ইয়াহূদী ছিলেন এবং খৃস্টানগণও তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলে মান্য করেন। তিনি তাঁর ইতিহাসে শুধু নিম্নের কথাটুকু স্বীকার করেছেন: ‘‘আমাদের নিকট পরস্পর বিরোধী হাজার হাজার পুস্তক নেই বরং আমাদের নিকট মাত্র ২২টি পুস্তক রয়েছে। এগুলির মধ্যে পাঁচটি পুস্তক মোশির।’’
জোসেফাস তোরাহ ছাড়া পুরাতন নিয়মের মধ্যে আরও ১৭টি পুস্তক আছে বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমানে প্রচলিত ‘বাইবেলের’ মধ্যে প্রটেস্টান্টদের মতে তোরাহ ছাড়াও ৩৪টি পুস্তক ও ক্যাথলিকদের মতে ৪১টি পুস্তক রয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, জোসেফাস পুস্তকগুলির সংখ্যা বলেছেন, কিন্তু নাম উল্লেখ করেন নি। কাজেই প্রচলিত ৩৪ বা ৪১টি পুস্তকের মধ্যে কোন্ কোন্ পুস্তক ১৭টি পুস্তকের পরে অতিরিক্ত সংযুক্ত তাও জানার উপায় নেই। একথা বলার কোনো উপায় নেই যে, অমুক ১৭টি পুস্তক জোসেফাস উল্লিখিত বিশুদ্ধ পুস্তক।
ইতোপূর্বে পাঠক দেখেছেন যে, পণ্ডিত ক্রীযস্টম (John Chrysostom: 347-407) ও অন্যান্য ক্যাথলিক পণ্ডিত স্বীকার করেছেন যে, ইয়াহূদীগণ তাঁদের অবহেলার কারণে- বরং তাঁদের ধর্মহীনতা ও অসততার কারণে- অনেক ঐশ্বরিক পুস্তক বা ধর্মগ্রন্থ হারিয়ে ফেলেছে। কিছু পুস্তক তাঁরা ছিড়ে ফেলেছে এবং কিছু পুস্তক তারা পুড়িয়ে ফেলেছে। হয়ত জোসেফাস উল্লিখিত এই ১৭টি পুস্তকের মধ্য থেকে কিছু পুস্তকও এই হারানো, ছেড়া ও পুড়িয়ে ফেলা পুস্তকের মধ্যে চলে গিয়েছে। খৃস্টান পণ্ডিতগণ স্বীকার করেছেন যে, বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকের মধ্যে ২০টিরও অধিক ধর্মগ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলির কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। প্রসিদ্ধ ক্যাথলিক পণ্ডিত টমাস এঙ্গেলস বলেন: ‘‘পণ্ডিতগণ একমত যে, বাইবেলের মধ্য থেকে বিনষ্টকৃত বা হারিয়ে যাওয়া পবিত্র পুস্তকাদির সংখ্যা ২০ এর কম নয়।’’
জোসেফাসের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, মোশির পুস্তকের সংখ্যা পাঁচটি। কিন্তু তিনি এ পাঁচটি পুস্তকের নাম উল্লেখ করেন নি। আমরা জানি না যে, এ পাঁচটি পুস্তক বলতে বর্তমানে প্রচলিত ৫টি পুস্তক বুঝিয়েছেন, না অন্য কোনো পুস্তক বুঝিয়েছেন। বাহ্যত বুঝা যায় যে, তিনি এই পাঁচটি পুস্তকের কথা বলেন নি। কারণ তিনি বর্তমানে মোশির নামে প্রচলিত তোরাহ-এর পাঁচটি পুস্তকে প্রদত্ত তথ্যের বিপরীত অনেক কথা বলেছেন। ইতোপূর্বে বৈপরীত্য ও ভুলভ্রান্তির আলোচনায় পাঠক তা দেখেছেন।
(গ) যীশু অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন, বিশুদ্ধতার নয়
তৃতীয় পর্যায়ে আমরা বলব যে, আমরা যদি অনুমানের উপর ধরে নিই যে, বর্তমানে প্রচলিত পুস্তকগুলিই যীশুখৃস্টের যুগে প্রচলিত ছিল এবং তিনি ও তাঁর প্রেরিতগণ এ পুস্তকগুলিই মেনে নিয়েছেন এবং এগুলির পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, তবুও তাঁদের সাক্ষ্য দ্বারা প্রচলিত পুস্তকগুলির বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয় না, শুধু অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়।
এক্ষেত্রে খৃস্ট ও তাঁর প্রেরিতগণের সাক্ষ্য দ্বারা শুধু প্রমাণিত হয় যে, এ পু্স্তকগুলি তাঁদের যুগে ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন। এই পুস্তকগুলি যাদের নামে প্রচলিত সত্যই সেগুলি তাঁদের রচনা কি না, এগুলির মধ্যে উল্লিখিত সকল বিষয়ই সত্য, না সকল বিষয়ই মিথ্যা, না কিছু সত্য ও কিছু মিথ্যা সেগুলি কিছুই তাঁরা নিশ্চিত করেন নি।
খৃস্ট ও প্রেরিতগণ কর্তৃক এ সকল পুস্তকের অস্তিত্ব স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, তাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, এগুলি সত্যই কথিত ভাববাদিগণের রচিত অথবা এগুলির মধ্যে উল্লিখিত সকল বিবরণ সন্দেহাতীভাবে সত্য। উপরন্তু, খৃস্ট বা প্রেরিতগণ যদি এ সকল পুস্তক থেকে কিছু উদ্ধৃত করেন, তবে তাঁদের উদ্ধৃতি দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় না যে, যে পুস্তক থেকে তিনি উদ্ধৃতি প্রদান করছেন সে পুস্তকটি বিশুদ্ধ বা তার সকল কথা বিশুদ্ধ বলে বিনা গবেষণায় মেনে নিতে হবে।
হ্যাঁ, যদি ঈসা আলাইহিস সালাম সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, অমুক পুস্তকের সকল বিষয়, সকল বিধান বা সকল বক্তব্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং তাঁর এ বক্তব্য সরাসরি তাঁর মুখ থেকে শুনে অগণিত মানুষ বর্ণনা করেন এবং সন্দেহাতীত অগণিত মানুষের বর্ণনার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয় তাহলেই নিশ্চিতরূপে আসমানী গ্রন্থ বলে প্রমাণিত হবে। অবশিষ্ট সকল বক্তব্য বা সকল পুস্তকই সন্দেহযুক্ত থাকবে। এগুলির বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের জন্য গবেষণা ও অনুসন্ধান করতে হবে। পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকের বিষয়ে ঈসা আলাইহিস সালাম থেকে এরূপ কোনো সাক্ষ্য প্রমাণিত হয় নি।
প্রটেস্টান্ট গবেষক পণ্ডিত বেলি তাঁর পুস্তকে উল্লেখ বলেন, যীশু বলেছেন যে, তোরাহ ঈশ্বরের পক্ষ থেকে প্রদত্ত। কিন্তু তার কথার অর্থ এ নয় যে, পুরাতন নিয়মের সব কিছু বা প্রতিটি শ্লোক বিশুদ্ধ, অথবা এর সকল পুস্তকই সঠিক অথবা প্রতিটি পুস্তকের লেখকের বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান প্রয়োজনীয়। প্রেরিতগণ ও যীশুর সমসাময়িক ইয়াহূদীগণ এ সকল পুস্তকের উপর নির্ভর করতেন, এগুলি পাঠ করতেন এবং এগুলি সে যুগে প্রসিদ্ধ ও ধর্মগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এগুলি থেকে কিছু কথা নতুন নিয়মে উদ্ধৃত করার অর্থ এ নয় যে, কথাটিকে গবেষণা ছাড়াই সত্য বা সঠিক বলে গ্রহণ করতে হবে।
(ঘ) খৃস্টের পরেও বিকৃতি ঘটেছে
চতুর্থ পর্যায়ে আমরা যদি তর্কের খাতিরে মেনে নিই যে, খৃস্ট ও তাঁর প্রেরিতগণ পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তকের সকল অংশের সকল কথার বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন, তবে এতে বাইবেলের বিকৃতি প্রমাণের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ প্রায় সকল খৃস্টান পণ্ডিত স্বীকার ও দাবি করেছেন যে, খৃস্টের পরের যুগে ১৩০ খৃস্টাব্দে খৃস্টানদের সাথে বিরোধিতা ও শত্রুতার জের হিসেবে ইয়াহূদীগণ পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলিকে বিকৃত করে। কাজেই যীশু যদি সাক্ষ্য দিয়েও থাকেন তাতে তার পরের যুগে পুরাতন নিয়মগুলির বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রহিত হয় না।
১. ৩. ৪. ৬. বাইবেলের বিকৃতি কি অসম্ভব ছিল?
বাইবেলের বিকৃতি অসম্ভব প্রমাণ করতে খৃস্টান প্রচারকগণ দাবি করেন যে, বাইবেলের অগণিত কপি পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল। কাজেই কারো জন্যই এতে কোনো বিৃকতি সাধন সম্ভব ছিল না।
এ দাবিটি যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা তা পূর্ববর্তী আলোচনা থেকেই সুস্পষ্ট। ইয়াহূদী-খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ সকলেই স্বীকার করছেন যে, বিকৃতি সংঘটিত হয়েছে। কাজেই বিকৃতি ঘটানো সম্ভব ছিল না বলে দাবি করা অর্থহীন প্রলাপ মাত্র। তদুপরি এখানে আমরা বাইবেলে বিকৃতির ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করব, যেন, পাঠক বুঝতে পারেন যে, বাইবেলের বিকৃতি কিভাবে এত সহজ হয়েছিল।
১. ৩. ৪. ৭. বাইবেলের ইতিহাস ও বিকৃতির প্রেক্ষাপট
(ক) মূসা আলাইহিস সালাম থেকে নেবুকাদনেজার পর্যন্ত পুরাতন নিয়ম
মূসা আলাইহিস সালাম-এর সময়কাল সম্পর্কে বাইবেল ব্যাখ্যাকার ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। মোটামুটি বলা চলে যে, খৃস্টপূর্ব ১৩৫০ সালের দিকে মূসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন এবং খৃ. পূর্ব ১২৩০/৩১ সালের দিকে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকাল থেকে খৃস্টপূর্ব ৫৮৭/৫৮৬ সালে নেবুকাদনেজারের হাতে ইয়াহূদী রাষ্ট্রের ধ্বংস পর্যন্ত প্রায় সড়ে ছয় শত বৎসরে ইয়াহূদী জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই আমরা বাইবেলের বিকৃতির পেক্ষাপট অনুধাবন করতে পারব।
মূসা আলাইহিস সালাম তোরাহ লিখে সেই পাণ্ডুলিপিটি ইস্রায়েল সন্তানগণের যাজক ও গোত্রপতিগণের নিকট সমর্পণ করেছিলেন। তিনি তাঁদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, তাঁরা যেন সেই পাণ্ডুলিপিটিকে সংরক্ষণ করেন এবং ‘সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুকের’ মধ্যে তা রেখে দেন। তিনি তাঁদেরকে প্রতি সাত বৎসর পর পর সকল ইস্রায়েলের সামনে তা পাঠ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন: ‘‘সাত সাত বৎসরের পরে, মোচন বৎসরের কালে, কুটীরোৎসব পর্বে, যখন সমস্ত ইস্রায়েল তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর মনোনীত স্থানে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইবে, তৎকালে তুমি সমস্ত ইস্রায়েলের সাক্ষাতে তাহাদের কর্ণগোচরে এই ব্যবস্থা পাঠ করিবে।’’
ইস্রায়েল সন্তানগণের প্রথম প্রজন্ম মোশির এই নির্দেশ মেনে চলেন। এই প্রজন্মের গত হওয়ার পরে ইস্রায়েল সন্তানদের অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে পাপাচারিতা, অবাধ্যতা ও ধর্মদ্রোহিতা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো তাঁরা ধর্মত্যাগ করতেন। আবার কখনো পুনরায় ধর্ম মানতে শুরু করতেন। দায়ূদ-এর রাজত্বের শুরু পর্যন্ত (প্রায় তিনশত বৎসর যাবৎ) তাঁদের অবস্থা এইরূপ ছিল।
দায়ূদের রাজত্বকালে ইস্রায়েল সন্তানগণের ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। দায়ূদের রাজত্বকালে ও শলোমনের রাজত্বের প্রথমাংশে ইস্রায়েল সন্তানগণ ধর্মদ্রোহ পরিত্যাগ করে ধর্মীয় অনুশাসনাদি পালন করে চলেন। কিন্তু বিগত শতাব্দীগুলির ধর্মদ্রোহিতা, অস্থিরতা ও অরাজকতার মধ্যে মোশির প্রদত্ত ‘সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুকে রক্ষিত’ তোরাহটি হারিয়ে যায়। কখন তা হারিয়ে যায় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। এতটুকুই জানা যায় যে, শলোমানের রাজত্বের পূর্বেই তা হারিয়ে যায়। কারণ শলোমনের রাজত্বকালে যখন তিনি ‘সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুক’-টি উন্মোচন করেন তখন তার মধ্যে তোরাহের কোনো অস্তিত্ব পান নি। সিন্দুকটির মধ্যে শুধু দুইটি ‘তোরাহ-বহির্ভূত’ প্রাচীন প্রস্তরফলকই অবশিষ্ট ছিল। ১ রাজাবলির ৮ম অধ্যায়ের ৯ম শ্লোকে এ বিষয়ে বলা হয়েছে: ‘‘সিন্দুকের মধ্যে আর কিছু ছিল না, কেবল সেই দুইখানা প্রস্তরফলক ছিল, যাহা মোশি হোরেবে তাহার মধ্যে রাখিয়াছিলেন; সেই সময়ে, মিসর হইতে ইস্রায়েল-সন্তানগণের বাহির হইয়া আসিবার পর, সদাপ্রভু ইস্রায়েল-সন্তানগণের সহিত নিয়ম করিয়াছিলেন।’’
বাইবেলের বিবরণ অনুসারে শলোমনের রাজত্বের শেষভাগ থেকে ইস্রায়েলীয়গণের মধ্যে জঘন্য বিপর্যয় নেমে আসে। স্বয়ং শলোমন তাঁর শেষ জীবনে ধর্মত্যাগ করেন (নাঊযু বিল্লাহ!)। তিনি তাঁর স্ত্রীগণের পরামর্শে মুর্তিপূজা শুরু করেন মুর্তিপূজার নিমিত্ত মন্দিরাদি নির্মাণ করেন। এভাবে তিনি যখন ধর্মত্যাগী (মুর্তাদ) ও পৌত্তলিকে পরিণত হলেন (নাঊযু বিল্লাহ!!) তখন তোরাহ-এর প্রতি তাঁর আর কোনো আগ্রহ থাকে না।
তাঁর মৃত্যুর পরে আরো কঠিনতর বিপর্যয় শুরু হয়। খৃস্টপূর্ব ৯৩১ সালের দিকে ইস্রায়েল-সন্তানগণ অভ্যন্তরীন কোন্দল ও দলাদলির ফলে দু ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। ইয়াহূদীগণের একটি রাজ্য দুইটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। ইস্রায়েল-সন্তানগণের ১২ গোত্রের মধ্যে ১০টি গোত্র এক পক্ষে এবং বাকি দুইটি বংশ এক পক্ষে থাকেন। নবাটের পুত্র যারবিয়ামের (Jeroboam I) নেতৃত্বে বিদ্রোহী ১০টি গোত্র প্যালেস্টাইনের উত্তর অংশে পৃথক রাজ্য ঘোষণা করেন। তাঁদের রাজ্যের নাম হয় ‘ইস্রায়েল’ (the kingdom of Israel)। ইস্রায়েল রাজ্যকে অনেক সময় শামেরা (Samaria) বা ইফ্রমিয় (Ephraimites) বলা হতো। এর রাজধানী ছিল নাবলুস। অবশিষ্ট দুইটি গোত্র: যিহূদা ও বিন্যামিন বংশের রাজা হন শলোমনের পুত্র রহবিয়াম (Rehoboam)। এই রাজ্যের নাম হয় জুডিয়া বা জুডাই রাজ্য (the Kingdom of Judea, also Judaea or Judah)। এর রাজধানী ছিল যিরূশালেম।
উভয় রাজ্যেই ধর্মদ্রোহিতা, মুর্তিপুজা ও অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরের ইস্রায়েল বা শমরীয় রাজ্যের রাজা যারবিয়াম রাজ্যভার গ্রহণ করার পরপরই মোশির ধর্ম ত্যাগ করেন। তাঁর সাথে ইস্রায়েলীয়দের ১০টি গোত্রের মানুষেরা মোশির ধর্ম ত্যাগ করেন। তাঁরা মুর্তিপুজা শুরু করেন। এদের মধ্যে যাঁরা তোরাহ-এর অনুসারী ছিলেন তাঁরা নিজেদের রাজ্য পরিত্যাগ করে যুডাহ (যিহূদা) রাজ্যে হিজরত করেন।
এভাবে এ রাজ্য বা ইস্রায়েল সন্তানদের মূল অংশ এ সময় থেকে মূসার আলাইহিস সালাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান এবং কুফর, মুর্তিপুজা ও অনাচারের মধ্যে অতিবাহিত করেন। পরবর্তী প্রায় ২০০ বৎসর এ রাজত্বের অস্তিত্ব ছিল। সন-তারিখের বিষয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। আধুনিক গবেষকগণের মতে ইস্রায়েল রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল খৃ. পু. ৯২২ সাল থেকে ৭২২/৭২১ সাল পর্যন্ত কমবেশি ২০০ বৎসর। এ সময়ে ১৯ জন রাজা এই রাজ্যে রাজত্ব করেন। এরপর আল্লাহ তাঁদেরকে ধ্বংস করেন। অশুরীয়দের (the Neo-Assyrian Empire) আক্রমণে তারা পরাজিত হয়। খৃস্টপূর্ব ৭২৪ সালে অ্যসিরিয়ান (অশূরীয়) সম্রাট চতুর্থ শালমানেসার বা শল্মনেষর (Shalmaneser iv) ইস্রায়েল রাজ্য আক্রমন করেন। তার মৃত্যুর পর তার সেনাপতি দ্বিতীয় সার্গন (Sargon II: ruled 722-705 bc) উপাধি ধারণ করে রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে আসিরিয়্যানগণ ইস্রায়েলীয়দেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। বিজয়ী অশুরীয়গণ পরাজিত ইস্রায়েলীয়গণকে বন্দি করে অশুরীয় রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে নির্বাসিত করে। এ এলাকায় অল্পসংখ্যক ইস্রায়েলীয় অবশিষ্ট থাকে।
আশুরীয়গণ ইস্রায়েলীয়দেরকে এ সকল অঞ্চল থেকে নির্বাসিত করার পরে সেখানে অশুরীয় রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে পৌত্তলিকগণকে এনে বসতি স্থাপন করায়। সেখানে অবশিষ্ট অল্প সংখ্যক ইস্রায়েলীয় এ সকল পৌত্তলিকদের সাথে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে ওতপ্রোতভাবে মিশে যায়। তাঁরা পৌত্তলিকগণের পুত্র কন্যাদেরকে বিবাহ করেন এবং তাদের সাথে একত্র পরিবার গঠন করেন। এ সকল ‘ইস্রায়েলীয়’ ইয়াহূদীদেরকে ‘শমরীয়’ (Samaritans) বলা হয়।
এভাবে আমরা দেখছি যে, বাইবেলের বর্ণনা অনুসারেই ইয়াহূদীদের বৃহৎ অংশ বা ১২ বংশের দশ বংশ উত্তর রাজ্যের ইস্রায়েলীয় বা শমরীয় ইয়াহূদীগণ শলোমনের পর থেকেই ধর্মচ্যুত হন এবং শেষে পৌত্তলিকদের মধ্যে বিলীন হয়ে যান। মূসার আলাইহিস সালাম ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের সাথে তাঁদের সম্পর্ক শুধু নামেই অবশিষ্ট থাকে। ফলে এদের মধ্যে মূসা আলাইহিস সালাম-এর ধর্মগ্রন্থ ‘তোরাহ’-এর কোনো পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব ‘আনকা’ (গরুড়) পক্ষীর ন্যায় কাল্পনিক বিষয়ে পরিণত হয়।
অপরদিকে শলোমনের মৃত্যু পর থেকে পরবর্তী ৩৭২ বৎসর যাবৎ শলোমনের বংশের ২০ জন রাজা যিহূদা রাজ্যে রাজত্ব করেন। এ সকল রাজার মধ্যে বিশ্বাসী ও ধর্মপরায়ণ রাজার সংখ্যা ছিল কম। অধিকাংশ রাজাই ছিলেন ধর্মত্যাগী ও মুর্তিপুজক। প্রথম রাজা রহবিয়ামের যুগ থেকেই মুর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটে। প্রতিটি বৃক্ষের নিচে মুর্তি স্থাপন করা হয় এবং পূজা করা হয়। রহবিয়ামের রাজত্বকালেই যুডিয়া রাজ্যের উপর গযব নেমে আসে। তার সময়েই খৃস্ট পূর্ব ৯২৫ অব্দে মিশরের ফিরাউন ১ম শেশাঙ্ক বা শীশক (Shashanq I) যুডাহ রাজ্য আক্রমন করে যিরূশালেম নগর ও ধর্মধাম লুন্ঠন করেন। তিনি ধর্মধামের সকল আসবাবপত্র ও রাজ প্রাসাদের সকল মালামাল লুণ্ঠন করে নিয়ে যান।।
কিছুদিন পরে যিহূদা রাজ্যের তৃতীয় রাজা আসার (Asa) রাজত্বকালে ইস্রায়েল রাজ্যের ধর্মত্যাগী ও মুর্তিপূজক রাজা বাশা (Baasha) যিরূশালেম আক্রমন করে ধর্মধাম ও রাজ প্রাসাদ ব্যাপকভাবে লুণ্ঠন করেন।
যিহূদা বা যুডিয়া রাজ্যের ষষ্ঠ রাজা অহসিয় (Ahaziah)-এর সময়ে বাল-প্রতিমার পূজা ও তার উদ্দেশ্যে পশু-উৎসর্গ করার জন্য যিরূশালেমের অলিতে গলিতে ও সকল স্থানে বেদি স্থাপন করা হয়। শলোমনের মন্দির বা ধর্মধামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
যিহূদা বা যুডিয়া রাজ্যে ধর্মদ্রোহ, মুর্তিপুজা ও অনাচারের ব্যাপকতম প্রসার ও প্রতিষ্ঠা ঘটে রাজা মনঃশি (Manasseh)-এর শাসনামলে (খৃ. পূ ৬৯৩-৬৩৯ অব্দ)। এ সময়ে এই রাজ্যে প্রায় সকল অধিবাসীই মোশির ধর্ম পরিত্যাগ করে মুর্তিপূজা ও পৌত্তলিক ধর্ম গ্রহণ করেন। শলোমনের ধর্মধাম বা সদাপ্রভুর মন্দিরের মধ্যেই মুর্তিপূজা ও প্রতিমার জন্য পশু-উৎসর্গ করার নিমিত্ত বেদি নির্মাণ করা হয়। রাজা মনঃশি যে প্রতিমার পূজা করতেন তিনি সদাপ্রভুর মন্দিরের মধ্যে সেই প্রতিমা স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র আমোন (Amon)-এর শাসনামলেও (খৃ. পূ. ৬৩৯-৬৩৮ অব্দ) ধর্মত্যাগ ও পৌত্তলিকতার অবস্থা একইরূপ থাকে।
আমোনের মৃত্যুর পরে খৃ.পূ. ৬৩৮ সালে তাঁর পুত্র যোশিয় (Josiah) আট বৎসর বয়সে যিহূদা রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। তিনি ধর্মদ্রোহিতা ও অনাচার থেকে বিশুদ্ধভাবে তাওবা করেন। তিনি ও তাঁর রাজ্যের কর্ণধারগণ ধর্মদ্রোহিতা, পৌত্তলিকতা ও অনাচারকে সমূলে বিনাশ করে মোশির ব্যবস্থা বা শরীয়ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন। মহাযাজক হিল্কিয় (Hilki'ah the high priest) ছিলেন তার দীক্ষাগুরু। তিনি সুলাইমানের ধর্মধাম বা মসজিদ সংস্কার ও চালু করার জন্য জনগণ থেকে কর সংগ্রহ করতে ধর্মীয় লিপিকার শাফনকে (Shaphan the scribe)-কে দায়িত্ব দেনে। এ সকল সংস্কার কাজের জন্য ‘‘তাওরাত’’-এর প্রয়োজনীয়তা তারা বিশেষ করে অনুভব করেন। তা সত্ত্বেও তাঁর রাজত্বের ১৭শ বৎসর পর্যন্ত বা খৃস্টপূর্ব ৬২১ সাল পর্যন্ত কেউ মোশির তোরাহ-এর কোনো পাণ্ডুলিপির চিহ্ন দেখেন নি বা এর কোনো কথাও কেউ শুনেন নি।
যোশিয় রাজার রাজত্বের ১৮শ বৎসরে (খৃ. পূ. ৬২০/৬২১ সালে) রাজা যোশিয়ের গুরু মহাযাজক হিল্কিয় (Hilki'ah) দাবি করেন যে, তিনি ‘সদাপ্রভুর গৃহে’, অর্থাৎ যিরূশালেমের ধর্মধাম বা শলোমনের মন্দিরের মধ্যে রৌপ্যের হিসাব করতে যেয়ে মোশির তোরাহ বা সদাপ্রভুর ব্যবস্থাপুস্তকখানি (the book of the law) পেয়েছেন। তিনি পুস্তকটি শাফন লেখককে (Shaphan the scribe) প্রদান করেন। শাফন লেখক রাজা যোশিয়কে পুস্তকটি পাঠ করে শোনান। রাজা এই পুস্তকটির বাক্যাদি শুনে এত বেশি বিমোহিত ও উদ্বেলিত হন যে তিনি নিজের পরিধেয় বস্ত্র ছিড়ে ফেলেন। ইস্রায়েলীয়দের অবাধ্যতার কথা স্মরণ করে তিনি এভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। এ সকল বিষয় ২ রাজাবলির ২২ অধ্যায়ে এবং ২ বংশাবলির ৩৪ অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
তোরাহ বা ব্যবস্থা পুস্তক’ বলে কথিত এই পাণ্ডুলিপিটির নির্ভরযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতা স্বীকৃত নয়। যাজক হিল্কিয়ের দাবিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ রাজা অহসিয়ের পূর্বেই ‘সদাপ্রভুর গৃহ’ বা ধর্মধামটি ইতোপূর্বে দুইবার বিজয়ী শত্রুদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েছে। এরপর এই গৃহটিকে প্রতিমা পূজার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। প্রতিমাপুজারিগণ প্রতিদিন এই গৃহে প্রবেশ করতেন। এভাবে অহসিয় (Ahaziah) রাজার রাজত্বকাল থেকে যেশিয়ের রাজত্বকালের ১৭শ বৎসর পর্যন্ত খৃস্টপূর্ব ৮৪৩ থেকে ৬২১ সাল পর্যন্ত দু শতাব্দীরও অধিক সময় কেউ কোনোভাবে তোরাহ বা ব্যবস্থাপুস্তকের নামও শুনেন নি, চোখে দেখা তো দূরের কথা।
যোশিয়ের রাজত্বের প্রথম ১৭টি বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে রাজা স্বয়ং ও রাজ্যের নেতৃবর্গ ও সাধারণ প্রজাগণ সকলেই মোশির ব্যবস্থার পালন ও পুন-প্রতিষ্ঠায় প্রানান্ত প্রচেষ্টায় নিরত ছিলেন। এত কিছু সত্ত্বেও এ দীর্ঘ সময়ে কেউ ব্যবস্থাপুস্তকের নামটি পর্যন্ত শুনতে পেলেন না। এই দীর্ঘ সময়ে ‘সদাপ্রভুর গৃহের রক্ষক ও যাজকগণ প্রতিদিন এই গৃহের মধ্যে যাতায়াত করতেন। বড় অবাক কথা যে, এ দীর্ঘ সময় পুস্তকটি সদাপ্রভুর গৃহে থাকবে, অথচ এত মানুষ কেউ তার দেখা পাবে না!
প্রকৃত কথা হলো, এই পুস্তকটি বা ‘তোরাহ’-এর এই পাণ্ডুলিপিটি পুরোটিই হিল্কিয় মহাযাজকের উদ্ভাবনা ও রচনা ছাড়া কিছুই নয়। তিনি যখন দেখলেন যে, রাজা যোশিয় এবং তাঁর অমাত্যবর্গ সকলেই মোশির ব্যবস্থার প্রতিপালন ও পুনপ্রতিষ্ঠায় আগ্রহী, তখন তিনি তাঁর যুগে লোকমুখে প্রচলিত সত্য ও মিথ্যা সকল প্রকারের মৌখিক বর্ণনা একত্রিত করে এই পুস্তকটি রচনা করেন। এগুলি সংকলন ও লিপিবদ্ধ করতেই তাঁর এই দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। যখন তা সংকলনের কাজ তিনি সমাপ্ত করেন, তখন তিনি পুস্তকটিকে সরাসরি মোশির নামেই চালিয়ে দেন। পাঠক ইতোপূর্বে জেনেছেন যে, ধার্মিকতার প্রচার প্রসার ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধরনের মিথ্যাচার ও জালিয়াতি শেষ শতাব্দীগুলির ইয়াহূদীগণ এবং প্রথম যুগগুলির খৃস্টানগণের নিকট ধর্মীয় পুণ্যকর্ম বলে গণ্য ছিল।
এ প্রকৃত সত্যটিকে পাশ কাটিয়ে প্রচলিত কাহিনীর ভিত্তিতে আমরা ধরে নিচ্ছি যে, হিল্কিয় তোরাহ-এর পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছিলেন। রাজা যোশিয়ের রাজত্বের ১৮শ বৎসরে পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া যায়। পরবর্তী ১৩ বৎসর, যতদিন রাজা যোশিয় জীবিত ছিলেন, ততদিন যিহূদা বা জুডাহ রাজ্যের ইয়াহূদীগণ এ তোরাহ অনুসারে নিজেদের ধর্মকর্ম পরিচালনা করেন।
যোশিয়ের মৃত্যুর পরে (খৃ. পূ. ৬০৮/৬০৯ সালে) তদীয় পুত্র যিহোয়াহস (Jeho'ahaz) রাজত্ব লাভ করেন। তিনি রাজত্ব লাভ করে মোশির ধর্ম পরিত্যাগ করেন এবং রাজ্যে অবিশ্বাস, ধর্মদ্রোহিতা ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটান। মিশরের সম্রাট ফরৌণ-নখো বা নেকু (Neku) যিহোয়াহসকে বন্দি করে নিয়ে যান এবং তার ভ্রাতা ইলিয়াকীমকে যিহোয়াকীম (Jehoiakim/Joakim) নাম প্রদান পূর্বক সিংহাসনে বসান। যিহোয়াকীমও তার ভাইয়ের মত ধর্মদ্রোহী ও পৌত্তলিক ছিলেন।
যিহোয়াকীমের মৃত্যুর পরে (খৃ. পূ. ৫৯৮/৫৯৭ অব্দে) তার পুত্র যিহোয়াখীন (Jehoiachin/Joachin) রাজত্ব লাভ করেন। তিনিও তাঁর পিতা ও চাচার মতই ধর্মত্যাগী ও পৌত্তলিক ছিলেন। এ সময়ে ব্যাবিলনের সম্রাট বখত নসর বা নেবুকাদনেজার (Nebuchadrezzar II) জুডাহ বা যিহূদা রাজ্য দখল করেন। তিনি যিরূশালেম শহর, রাজ প্রাসাদ, ও ‘সদাপ্রভুর গৃহ’ বা ধর্মধামের সমস্ত ধন-সম্পদ ও দ্রব্যাদি লুণ্ঠন করে নিয়ে যান। তিনি রাজা যিহোয়াখীনকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান এবং তাঁর পরিবর্তে তাঁর চাচা সিদকিয়কে (Zedekiah) রাজত্ব প্রদান করেন। নেবুকাদনেজার বিপুল সংখ্যক ইয়াহূদীকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান।
কাফির পৌত্তলিক রাজা সিদকিয় (Zedekiah) প্রায় ১১ বৎসর নেবুকাদনেজারের অধীনে লাঞ্ছিত অবস্থায় যিহূদা রাজ্যের রাজত্ব করেন। এরপর তিনি বিদ্রোহ করেন। খৃ. পূ. ৫৮৭/৫৮৬ সালে নেবুকাদনেজার দ্বিতীয়বার যিরূশালেম আক্রমন ও দখল করেন। তিনি রাজা সিদকিয়কে বন্দি করে তাঁরই সামনে তাঁর পুত্রগণকে জবাই করেন। এরপর তিনি সিদকিয়ের চক্ষু উৎপাটন করেন এবং তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ব্যাবিলন প্রেরণ করেন। নেবুকাদনেজার-এর বাহিনী এবার যিরূশালেমকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে। তারা যিরূশালেমের ধর্মধাম বা ‘সদাপ্রভুর গৃহ’, রাজ-প্রাসাদসমূহ, যিরূশালেমের সকল বাড়িঘর ও অট্টালিকায় অগ্নিসংযোগ করে ভস্মিভুত করে, যিরূশালেম নগরীর চারিদিকের প্রাচীর ভেঙ্গে দেয় এবং যিহূদা (Judah) রাজ্যে অবস্থানকারী অবশিষ্ট ইস্রায়েল সন্তানকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়। এভাবে তিনি যিহূদা রাজ্য সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করেন।
আমরা দেখেছি যে, ইয়াহূদীদের ১২ গোত্রের দশ গোত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তরের ইস্রায়েল রাজ্য খৃস্টপূর্ব ৭২২ সালে রাজা দ্বিতীয় সার্গন (Sargon II) কর্তৃক চিরতরে বিনষ্ট হয়। এর মাত্র ১৩৫ বৎসর পরে খৃ. পূ. ৫৮৭ সালে ইয়াহূদীদের অবশিষ্ট দুই গোত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণের যুডাই রাজ্যও নেবুকাদনেজার কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়। বিশেষত যিরুশালেম ও ধর্মধাম (মসজিদে আকসা) সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়। স্বভাবতই এ ঘটনায় তোরাহ এবং পুরাতন নিয়মের অন্যান্য সকল পুস্তক যেগুলি এই ঘটনার পূর্বে লিখিত হয়েছিল সবই চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে যায়। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণও একথা একবাক্যে স্বীকার করেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, রাজা যোশিয়ের (রাজত্বকাল খৃস্টপূর্ব ৬৩৮-৬০৮) পূর্বেই তাওরাত-এর ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়। তার সময়ের পূর্বেই তোরাহ-এর প্রচলন ও ব্যবহার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ সময়ে তোরাহ-এর কোনো প্রকারের অস্তিত্বের কথাই জানা যায় না। যোশিয়ের সময়ে যে পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া যায় তা নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষত একটিমাত্র পাণ্ডুলিপির দ্বারা ধারাবাহিক বহুল প্রচলন প্রমাণিত হয় না। তোরাহ-এর এ ‘পূনর্জন্ম’ও ক্ষণস্থায়ী। মাত্র ১৩ বৎসরের (খৃ. পূ ৬২০-৬০৮ সাল) বেশি তা ব্যবহৃত হয় নি। এরপর আর তার কোনো খবর জানা যায় না। বাহ্যত বুঝা যায় যে, যোশিয়ের পুত্র-পৌত্রগণের মধ্যে ধর্মদ্রোহিতা ও পৌত্তলিকতার পুনরাবির্ভাবের কারণে যোশিয়ের মৃত্যুর পরে নেবুকাদনেজারের আক্রমনের পূর্বেই তা বিনষ্ট হয়ে যায়। আর যদি তাদের দ্বারা তা নষ্ট না-ও হয় তাহলে সুনিশ্চিতভাবেই তা নেবুকাদনেজারের আক্রমনের সময়ে বিনষ্ট হয়ে যায়। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ একবাক্যে স্বীকার করেন যে, এ আক্রমনের পূর্বে লেখা ও বিদ্যমান পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক এ সময়ে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। এজন্য তারা দাবি করেন যে, ব্যাবিলন থেকে ফেরার পর ইয্রা সেগুলি নতুন করে লিখেন।
আরবী ভাষায় লিখিত বাইবেল ডিকশনারীতে তারা উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াহূদীদের ধর্মত্যাগ, অবিশ্বাস, অনাচার, মূর্তিপূজা, হানাহানি ও জুলুম-অত্যাচারের সুদীর্ঘ সময়ে, বিশেষত রাজা মনঃশি (Manasseh)-এর শাসনামলের ৫৫ বৎসরে (খৃ. পূ ৬৯৩-৬৩৯ অব্দ) পুরাতন নিয়মের গ্রন্থগুলি নষ্ট করা হয় বা হারিয়ে যায়। রাজা যোশিয়ের সময়ে মহাযাজক হিল্কিয় ব্যবস্থাপুস্তকের যে পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছিলেন ধর্মধামের অবমাননার সময়ে তার মধ্যে বিকৃতি ও জালিয়াতি হওয়ার মতটিকে তারা অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।
(খ) ব্যাবিলন থেকে প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত পুরাতন নিয়ম
নেবুকাদনেজারের এ ঘটনা (খৃ. পূ. ৫৮৭/৫৮৬) থেকে প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দী পর্যন্ত পরবর্তী প্রায় ৬০০ বৎসরের ইতিহাস পূর্ববর্তী অধ্যায়ের চেয়ে মোটেও ভাল নয়। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ধারণা ও দাবি অনুযায়ী নেবুকাদনেজারের এ ঘটনার প্রায় এক শতাব্দী পরে ইয্রা (Ezra) পুনরায় পুরাতন নিয়মের এ সকল গ্রন্থ নিজের পক্ষ থেকে লিখেন। এ পুনর্জন্ম ও পুনর্লিখনের প্রায় তিন শতাব্দী পরে আবার একটি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ও ধ্বংস গ্রাস করে হিব্রু জাতিকে। বাইবেলের ‘সন্দেহজনক পুস্তক’ (Apocrypha) মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees) ও খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর প্রসিদ্ধ ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus)-এর পুস্তকে এ সকল ঘটনা বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
এ ঘটনার সার-সংক্ষেপ হলো, খৃ. পূ. ১৬১ সালের দিকে সিরিয়ার গ্রীক শাসক চতুর্থ এন্টিয়ক (Antiochus IV Epiphanes c. 215-164 BC) যিরুশালেম অধিকার করেন এবং ইয়াহূদী ধর্ম চিরতরে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির কপি-পাণ্ডুলিপি যেখানে যা পান তা সবই ছিড়ে টুকরো করার পরে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন যে, কোনো ব্যক্তির নিকট পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকের পাণ্ডুলিপি বা কপি পাওয়া গেলে, অথবা কোনো ব্যক্তি মোশির ব্যবস্থার (শরীয়তের) কোনো বিধান পালন করলে তাকে হত্যা করতে হবে। প্রতি মাসে অনুসন্ধান করা হতো। কারো নিকট পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকের পাণ্ডুলিপি বা কপি পাওয়া গেলে, অথবা কেউ মোশির ব্যবস্থার কোনো বিধান পালন করলে তাকে হত্যা করা হতো। আর সেই পাণ্ডুলিপি বা কপিটি বিনষ্ট করা হতো। সাড়ে তিন বৎসর পর্যন্ত এই নিধন ও বিনাশের কর্ম অব্যাহত থাকে।
এ ঘটনায় অগণিত ইয়াহূদী নিহত হন এবং ইয্রার লেখা তোরাহ বা পুরাতন নিয়ম এবং এর সকল কপি বিনষ্ট হয়।
ক্যাথলিক পণ্ডিত জন মিলনার লিখেন: পণ্ডিতগণ একমত যে, তোরাহ-এর মূল কপি এবং পুরাতন নিয়মের অন্যান্য পুস্তকাবলির কপিগুলি নেবুকাদনেজারের সেনাবাহিনীর হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর ইয্রার মাধ্যমে এ সকল পুস্তকের উদ্ধৃতি প্রকাশ পায়। এন্টিয়ক (Antiochus Epiphanes)-এর ঘটনায় (খৃস্টপূর্ব ১৬৮ অব্দের দিকে) সেগুলিও আবার নিশ্চিহ্ন ও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এর পর আবার ইয়াহূদীরা গ্রীক ও রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে যুডাই রাজ্যে বসবাস করতে থাকেন। তবে তাদের অবাধ্যতা ও অনাচারের ফলে বারংবার তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যে পড়েন। এভাবে তারা আরো অনেক কঠিন বিপদ ও রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন, ইয্রা লিখিত তোরাহ-এর বিকৃত বা অবিকৃতি যা কিছু পাণ্ডুলিপি তাদের নিকট বিদ্যমান ছিল এ সকল ঘটনায় সেগুলি বিনষ্ট হয়ে যায়। এসকল হত্যাযজ্ঞের অন্যতম হলো রোমান যুবরাজ টিটাস (Titus) এর ঘটনা। রোমান সম্রা্ট ভেসপাসিয়ান (Vespasian) তাঁর পুত্র (পরবর্তী সম্রাট) টিটাসকে ইয়াহূদীদের দমনের জন্য প্রেরণ করেন। তিনি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান এবং ‘সদাপ্রভুর গৃহ’ বা ধর্মধাম সম্পূর্ণ গুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেন। এই ঘটনাটি ঘটে খৃস্টের উর্ধ্বারোহণের ৩৭ বৎসর পরে (৭০ খৃস্টাব্দে)। জোসেফাসের ইতিহাসে ও অন্যান্য ইতিহাসে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই ঘটনায় হত্যা, ক্রুশ, অগ্নিসংযোগ ও অনাহারে যিরূশালেম ও তার পার্শবর্তী অঞ্চলের ১১ লক্ষ ইয়াহূদী মৃত্যুবরণ করে। ৯৭ হাজার ইয়াহূদীকে বন্দি করে বিভিন্ন দেশে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় করে দেওয়া হয়। এছাড়া অন্যান্য এলাকাতেও অনেক ইয়াহূদী এই ঘটনার সময়ে নিহত হন বা মৃত্যু বরণ করেন। এ কথা নিশ্চিত যে, এন্টিয়কের ঘটনার পরেও যদি পুরাতন নিয়মের কোনো কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে তাহলে এ সকল ঘটনায় তাও হারিয়ে ও বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। (এ গ্রন্থের ২৪-২৫ পৃষ্ঠায় ‘প্রথম বিষয়’ দেখুন।)
(গ) হিব্রু তাওরাত বনাম গ্রীক অনুবাদ
আমরা আগেই বলেছি যে, ইয়াহূদীদের ধর্মীয় ও জাগতিক ভাষা হিব্রু ভাষা। এ ভাষাতেই পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক রচিত। খৃস্টপূর্ব ৩৩২ সালে আলেকজান্ডার যুডাই রাজ্য দখল করেন এবং তা গ্রীক সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। ইয়াহূদীদের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রীক ভাষার কিছু প্রচলন ক্রমান্বয়ে শুরু হয়। প্রায় এক শতাব্দী পরে, খৃস্টপূর্ব ২৮৫-২৪৫ সালের দিকে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের গ্রীক অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ক্রমান্বয়ে এ অনুবাদই মূল গ্রন্থের স্থান দখল করে।
প্রাচীন খৃস্টানগণ পুরাতন নিয়মের হিব্রু সংস্করণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করতেন না। বরং তাঁরা হিব্রু বাইবেলকে বিকৃত বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা গ্রীক অনুবাদটিকেই নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করতেন। বিশেষত দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত কোনো খৃস্টান হিব্রু বাইবেলের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেন নি। উপরন্তু ১ম খৃস্টীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সকল ইয়াহূদী উপাসনালয়েও গ্রীক অনুবাদই ব্যবহৃত হতো। এ কারণে হিব্রু বাইবেলের পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল খুবই কম। এ সামান্য সংখ্যক পাণ্ডুলিপিও শুধু ইয়াহূদীদের নিকটেই ছিল। ইয়াহূদীরা ৭ম ও ৮ম খৃস্টীয় শতকে লিখিত সকল পাণ্ডুলিপি নষ্ট করে দেন। কারণ তাঁদের নিকট গ্রহণযোগ্য পাণ্ডুলিপির সাথে এগুলির অনেক অমিল ও বৈপরীত্য ছিল। এজন্য এ সময়ে লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপি আধুনিক যুগের বাইবেল-গবেষকগণের নিকট পৌঁছায় নি। এ সকল পাণ্ডুলিপি বিনষ্ট করার পরে তাঁদের পছন্দনীয় পাণ্ডুলিপিগুলিই শুধু অবশিষ্ট থাকে। এভাবে বিকৃতির বিশেষ সুযোগ তাদের সামনে উপস্থিত হয়।
(ঘ) প্রথম তিন শতাব্দীতে খৃস্টানগণ ও নতুন নিয়ম
প্রথম প্রজন্মগুলিতে খৃস্টানদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। ফলে তাঁদের মধ্যে বাইবেলের পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং বিকৃতি-ইচ্ছুকদের জন্য সেগুলির মধ্যে বিকৃতি করার সুযোগ ছিল অনেক। খৃস্টধর্মের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ৩০০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত খৃস্টানগণ কঠিন বিপদাপদ ও রাষ্ট্রীয় অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। তাঁরা দশটি রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের সম্মুখীন হন:
প্রথমবার: রোমান সম্রাট নিরো (Nero)-এর সময়ে ৬৪ খৃস্টাব্দে। এ সময়ে খৃস্টের প্রেরিত শিষ্য পিতর ও তাঁর স্ত্রী নিহত হন। এ সময়ে রাজধানী রোমে ও অন্যান্য সকল প্রদেশে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ৬৮ খৃস্টাব্দে নিরোর মৃত্যু পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে। খৃস্টধর্মের স্বীকৃতিই খৃস্টানগণের জন্য কঠিন অপরাধ বলে গণ্য ছিল।
দ্বিতীয়বার: রোমান সম্রাট ডোমিশিয়ান (Domitian)-এর রাজত্বকালে ৮১ সালে এ হত্যাযজ্ঞের শুরু। এ সম্রাটও নিরোর ন্যায় খৃস্টধর্মের শত্রু ছিলেন। তিনি খৃস্টানদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। ফলে সর্বত্র খৃস্টানদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করা শুরু হয়। এমনকি পৃথিবী থেকে সর্বশেষ খৃস্টানকেও নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়। এ সময়ে প্রেরিত যোহনকে নির্বাসিত করা হয় এবং ফ্লাবিয়াস ক্লিমেন্টকে হত্যা করা হয়। ৯৬ সালে এ সম্রাটের মৃত্যু পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।
তৃতীয়বার: রোমান সম্রাট ট্রাজান (Trajan)-এর রাজত্বকালে। ১০১ খৃস্টাব্দে এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। ১০৮ সালে তা ভয়ঙ্করতম রূপ গ্রহণ করে। এমনকি দায়ূদ বংশের সর্বশেষ ব্যক্তিকে পর্যন্ত হত্যা করার নির্দেশ দেন তিনি। তার নির্দেশে সৈনিকের এরূপ সকলকে পাইকারীভাবে হত্যা করতে থাকে। প্রহার করে, ক্রুশে বিদ্ধ করে, পানিতে ডুবিয়ে ও বিভিন্নভাবে অনেক খৃস্টান পাদরী, বিশপ ও ধর্মগুরুকে হত্যা করা হয়। ১১৭ সালে এ সম্রাটের মৃত্যু পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে।
চতুর্থবার: রোমান সম্রাট মারকাস এন্টোনিয়াস (Marcus Aurelius Antoninus)-এর রাজত্বকালে। তিনি ১৬১ খৃস্টাব্দে রাজত্ব গ্রহণ করেন। এ সম্রাট দার্শনিক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন এবং পৌত্তলিক রোমান ধর্মের গোঁড়া অনুসারী ছিলেন। ১৬১ খৃস্টাব্দে তিনি সর্বাত্মক নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন। ১০ বৎসরেরও বেশি সময় তা অব্যাহত থাকে। পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র একভাবে খৃস্টানদেরকে হত্যা করা হয়। তিনি খৃস্টান পাদরি ও বিশপদেরকে মূর্তিপূজা ও মন্দিরের পুরোহিত হতে বলতেন। যারা অস্বীকার করত তাদেরকে লোহার চেয়ারে বসিয়ে নিচে আগুন জ্বালানো হতো। এরপর লোহার আংটা দিয়ে তার প্রজ্বলিত দেহের মাংস ছিন্নভিন্ন করা হতো।
পঞ্চমবার: রোমান সম্রাট সিভেরাস (Septimius Severus)-এর শাসনামলে (১৯৩-২১১খৃ.)। ২০২ খৃস্টাব্দ থেকে এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এ সময়ে মিসরে, ফ্রান্সে ও কার্থেজে হাজার হাজার খৃস্টানকে হত্যা করা হয়। এই পাইকারী হত্যাযজ্ঞের নির্মমতা ছিল এত ভয়ানক যে, তখনকার খৃস্টানগণ মনে করেন যে, খৃস্টারি (দাজ্জাল) বা পাপ পুরুষ (Antichrist, Man of Sin)-এর যুগ এসে গেছে বা কিয়ামত সন্নিকটে।
ষষ্ঠবার: রোমান সম্রাট ম্যাক্সিমিনের (Maximin) এর সময়ে। ২৩৫ খৃস্টাব্দে তিনি রাজত্ব গ্রহণ করেন। ২৩৭ খৃস্টাব্দে এ হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। তিনি ধর্মগুরু ও পণ্ডিতদের গণহারে হত্যার নির্দেশ দেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল যে, ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণকে হত্যা করলে সাধারণ মানুষেরা অতি সহজেই তাঁর আনুগত্য করবে। এরপর তিনি নির্বিচারে সকল খৃস্টানকে হত্যার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে গণহত্যা চলতে থাকে। অনেক সময় একটি গর্তে ৫০/৬০টি দেহ ফেলা হতো। এরপর তিনি রোমের সকল বাসিন্দাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় ২৩৮ সালে তারই এক সৈনিক তাকে হত্যা করে।
সপ্তমবার: রোমান সম্রাট ডেসিয়াস (Decius)-এর সময়ে। ২৫৩ খৃস্টাব্দে এই পাইকারী হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এ সম্রাট সিদ্ধান্ত নেন যে, সকল খৃস্টানকে হত্যা করে তিনি খৃস্টধর্মকে সমূলে বিনাশ করবেন। এ জন্য তিনি তাঁর রাজ্যের সকল আঞ্চলিক প্রশাসককে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন। এ সময়ে কিছু খৃস্টান ধর্মত্যাগ করেন। মিসর, আফ্রিকা, ইটালি, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া মাইনর ছিল তাঁর এই পাইকারী নিধনযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু।
অষ্টমবার: রোমান সম্রাট ভ্যলেরিয়ান (Valerian/ Valerianus)-এর সময়ে ২৫৭ খৃস্টাব্দে। এ সময়ে হাজার হাজার খৃস্টানকে হত্যা করা হয়। এরপর তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করেন যে, সকল বিশপ ও ধর্মযাজককে হত্যা করতে হবে। সকল সম্মানীয় খৃস্টানকে লাঞ্ছিত করতে হবে এবং তাঁদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এরপরও তাঁরা খৃস্টধর্ম পরিত্যাগ না করলে তাঁদেরকে হত্যা করতে হবে। সম্মানীয় মহিলাদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তাঁদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। এরপর যারা খৃস্টান ছিল তাদের মধ্যে যারা রোমান দেবতা জুপিটারের পূজা করতে অস্বীকার করত তাদেরকে হত্যা করা হতো বা আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো বা হিংস্র পশুর খাদ্য হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হতো। অন্যান্যদের বন্দি করে ক্রীতদাস বানিয়ে পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাষ্ট্রের কাজে ব্যবহার করা হতো।
নবমবার: রোমান সম্রাট আরেলিয়ান (Aurelian /Aurelianus)-এর সময়ে। ২৭৪ খৃস্টাব্দে এই নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। সম্রাট এ মর্মে ফরমান জারি করেন। তবে এবারের নিধনযজ্ঞ বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। কারণ বৎসরখানেক পরে সম্রাট নিজেই নিহত হন।
দশমবার: রোমান সম্রাট ডিওক্লেশিয়ান (Diocletian/ Diocleti-anus)-এর শাসনামলে। তিনি ২৮৪ খৃস্টাব্দে রাজত্ব গ্রহণ করেন। ২৮৬ সাল থেকে তিনি খৃস্টানদের নিপীড়ন শুরু করেন। ৩০২ খৃস্টাব্দে তা মহা-নিধনযজ্ঞে পরিণত হয় এব ৩১৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। রোমান রাজ্যের পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র পাইকারী হারে খৃস্টানদের হত্যা করা হয়। ৩০২ সালে ফ্রিজিয়া শহরকে একবারে এমনভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয় যে, সেখানে একজন খৃস্টানও অবশিষ্ট থাকেন নি।
সম্রাট ডিওক্লেশিয়ান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পৃথিবীর বুক থেকে বাইবেলের অস্তিত্ব মুছে দিবেন। এ জন্য তিনি অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে চেষ্টা করেন। ৩০৩ খৃস্টাব্দে তিনি সকল চার্চ-গীর্জা ভেঙ্গে ফেলার ও সকল ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি খৃস্টানদের উপাসনার জন্য একত্রিত হওয়া নিষিদ্ধ করে দেন। তাঁর নির্দেশানুসারে সকল গীর্জা ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যত প্রকারের ধর্মীয় পুস্তক পাওয়া যায় তা সবই পুড়িয়ে ফেলা হয়। যে ব্যক্তি এই নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায় বা যে ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় পুস্তক গোপন করে রেখেছে বলে সন্দেহ করা হয় তাকে নির্মমভাবে শাস্তি প্রদান করা হয়। খৃস্টানগণ উপাসনার জন্য সমবেত হওয়া বন্ধ করে দেন। ইউসেবিয়াস (Eusebius) লিখেছেন যে, তিনি নিজে স্বচক্ষে গীর্জাগুলি ভেঙ্গে ফেলতে এবং বাইবেল বা পবিত্র পুস্তকগুলিকে বাজারের মধ্যে পুড়িয়ে ফেলতে দেখেছেন।
এ সম্রাট মিসরের শাসককে নির্দেশ দেন মিসরের কপ্টিক খৃস্টানদেরকে রোমান প্রতিমা পূজা করতে বাধ্য করতে। যারা এ আদেশ মানবে না তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশে ৮,০০,০০০ (আট লক্ষ) কপ্টিক খৃস্টানকে হত্যা করা হয়। এজন্য তার যুগকে ‘‘শহীদদের যুগ’’ বলা হয়। তিনি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৮০ জন খৃস্টান হত্যা করতেন। তার হত্যাযজ্ঞ ১০ বৎসর স্থায়ী হয় এবং পুরো রোমান রাজ্যের সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে। এ হত্যাযজ্ঞ পূর্ববর্তী ঘটনাগুলির চেয়ে অধিক হিংস্র ও অধিক সময় স্থায়ী হয়।
খৃস্টানগণ ঘটনাগুলির যেরূপ বিবরণ দিয়েছেন তা যদি আংশিকও সত্য হয় তবে কখনোই কল্পনা করা যায় না যে, এ সময়ে খৃস্টানদের মধ্যে বাইবেলের অনেক কপি বিদ্যমান বা প্রচলিত ছিল। একথাও চিন্তা করা যায় না যে, তাঁরা তাঁদের ধর্মগ্রন্থকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে, বিশুদ্ধ রাখতে ও এ বিষয়ে গবেষণা পর্যালোচনা করতে পেরেছেন। বরং এ সময় ছিল বিকৃতিকারীদের জন্য বাইবেল বিকৃত করার সুবর্ণ সুযোগ। তারা ইচ্ছামত বিকৃতি ও জালিয়াতি করার অনেক সুযোগ পেয়েছিল। পাঠক জেনেছেন যে, খৃস্টীয় প্রথম শতকে খৃস্টানদের মধ্যে বিভ্রান্ত দল উপদলের সংখ্যা ছিল অনেক এবং তারা সকলেই বাইবেল বিকৃত করতেন।
উপরের বিষয়গুলির আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট থেকে তাঁদের ধর্মগ্রন্থগুলির অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা বা বিশুদ্ধতার প্রমাণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। পুরাতন নিয়ম এবং নতুন নিয়মের কোনো একটি পুস্তকেরও লেখক থেকে কেনো অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা তাঁদের নিকট সংরক্ষিত নেই। ইয়াহূদীগণের নিকটেও নেই এবং খৃস্টানগণের নিকটেও নেই। ইযহারুল হক্কের প্রণেতা আল্লামা রাহমাতুল্লাহ তাঁর সাথে প্রকাশ্য বিতর্কের সময় (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে) পাদ্রী মি. ফানডার ও মি. ফ্রেঞ্চ-এর নিকট এরূপ সূত্র দাবি করেন। তাঁরা একথা বলে ওজরখাহি পেশ করেন যে, এ সকল গ্রন্থের সূত্র আমরা হারিয়ে ফেলেছি। খৃস্টধর্মের শুরু থেকে ৩১৩ বৎসর পর্যন্ত আমাদের উপর যে জুলুম-অত্যাচার হয়েছিল তার ফলে এ গ্রন্থগুলির সূত্র পরম্পরার বিবরণ আমাদের নিকট থেকে হারিয়ে গিয়েছে।
এভাবে প্রমাণিত হয় যে, ধারণা ও অনুমান ছাড়া কোনো প্রকার সূত্র (chain of authorities) ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের কাছে নেই। তাদের নিকট অতিপ্রাচীন কোনো পাণ্ডুলিপি নেই। যে সকল পাণ্ডুলিপি তারা ‘‘প্রাচীন’’ বলে দাবি করেন সেগুলি খৃস্টীয় ৪র্থ/৫ম শতকের বা তার পরের বলে তারাই দাবি করেন। আর এসকল প্রাচীন বলে কথিত পাণ্ডুলিপিগুলি প্রকৃতপক্ষে কবে, কখন বা কোথায় লেখা হয়েছে তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
মুসলিম লেখকগণ সাধারণত তাঁদের লেখা বই-পুস্তক বা পাণ্ডুলিপির শেষে লিখেন যে, অমুক সালের অমুক তারিখে পুস্তকটির রচনা বা অনুলিপি করা শেষ হলো। অনুলিপির ক্ষেত্রে অনুলিপিকারের নামও তাঁরা লিখেন। এধরনের কোনো কথা বাইবেলীয় পাণ্ডুলিপির কোথাও লেখা নেই। কে এই অনুলিপি করেছেন, কবে, কখন বা কোথায় তা করেছেন কিছুই তাতে উল্লেখ করা হয় নি। খৃস্টান পণ্ডিতগণ কিছু কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ভিত্তিতে অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে বলেন যে, সম্ভবত অমুক শতকে বা অমুক শতকে তা লেখা হয়েছিল। এই প্রকারের ধারণা ও অনুমান বিতর্কের ক্ষেত্রে বিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায় না।
খৃস্টান প্রচারকগণ বিভ্রান্তিমূলকভাবে প্রচার করেন যে, কুরআনে যেহেতু ইয়াহূদী-খৃস্টানগণকে ‘‘আহল কিতাব’’ বলা হয়েছে এবং তাদের নিকট কিতাব আছে, কিতাবের মধ্যে আল্লাহর বিধান আছে ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে, সেহেতু কুরআন থেকে বুঝা যায় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত বাইবেল বিশুদ্ধ ছিল।
তাদের এ সকল কথা জঘন্য মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়। কুরআনে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ তাদের কিতাব বিকৃত করেছে, নিজে হাতে পুস্তক রচনা করে তা ‘‘আল্লাহর কিতাব’’ বলে চালিয়েছে, তাদের উপর অবতীর্ণ অনেক কিতাব ও বিধান তারা ভুলে গিয়েছে বা হারিয়ে ফেলেছে। এজন্য আমরা মুসলিমগণ বিশ্বাস ও প্রমাণ করি যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার আগেই বাইবেলের পুস্তকগুলি বিকৃত হয়েছে।
আমরা কখনোই দাবি করি না যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ পর্যন্ত বাইবেল অবিকৃত ছিল এবং এরপর তা বিকৃত হয়েছে। বরং কুরআনের নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বেই এ সকল পুস্তক বিকৃত হয়েছে এবং এগুলির সূত্র হারিয়ে গিয়েছে। এছাড়া তাঁর যুগের পরেও এরূপ বিকৃতির ধারা অব্যাহত থেকেছে।
খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, তাদের নিকট ৪র্থ-৫ম শতকে লেখা বাইবেলের কিছু পাণ্ডুলিপি রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, বাইবেল বিকৃত নয়। প্রকৃতপক্ষে এ সকল পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে, বাইবেল বিকৃত। কারণ এ সকল পাণ্ডুলিপির একটির সাথে আরেকটির ব্যাপক অমিল ও বৈপরীত্য রয়েছে। এগুলির মধ্যে জাল ও ভিত্তিহীন পুস্তকাদি রয়েছে বলে তারাই স্বীকার করেন। এ সকল ‘‘প্রাচীন’’ পান্ডলিপি প্রমাণ করে, তাদের পূর্বসূরীরা তাদের ধর্মগ্রন্থগুলিকে কিভাবে বিকৃত করতেন এবং এগুলির মধ্যে জাল ও বানোয়াট পুস্তকাদি ঢুকাতেন।
উপরের আলোচনা থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাইবেলের উভয় নিয়মের পুস্তকগুলিতে ব্যাপক বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও সর্বপ্রকারের বিকৃতি বিদ্যমান। আর এসকল পুস্তকের কোনো সূত্র বা উৎস তাদের নিকট সংরক্ষিত নেই। তাঁরা যা কিছু বলেন সবই আন্দায-অনুমান মাত্র। আর আন্দায-অনুমান দিয়ে সত্যকে পাওয়া যায় না।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ:
নতুন ও পুরাতন নিয়মে রহিত বিধান
মুসলিমদের সাথে ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের বিতর্কের অন্যতম বিষয় রহিতকরণ বিষয়। মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ তার কোনো বিধান ইচ্ছা করলে রহিত করতে পারেন। এ পরিচ্ছেদে বিষয়টি আলোচনা করা হবে। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ অত্যন্ত আপত্তিসহকারে এ বিশ্বাসের প্রতিবাদ করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহর কোনো বিধান কোনোভাবে রহিত হতে পারে না। এ পরিচ্ছেদে পুরাতন ও নতুন নিয়মের আলোকে আল্লাহর বিধানের রহিত হওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা হবে।
১. ৪. ১. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণ
১. ৪. ১. ১. নাসখ বা রহিতকরণের অর্থ
‘নাস্খ’ (نسخ) শব্দের সাধারণ অর্থ রহিত করা, সরিয়ে দেওয়া, বাতিল করা, স্থগিত করা, লোপ করা, পরিবর্তন করা (abrogate, abolish, invalidate, repeal, withdraw, annulment)।
আরবী ভাষায় নাসখ শব্দটি মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়:
১. বাতিল করা বা অপসারিত করা। বলা হয়: সূর্য ছায়া ‘নাসখ’ করেছে এবং ঝড় পদচিহ্ন ‘না্সখ’ করেছে, অর্থাৎ অপসারিত করেছে। এ অর্থে আল্লাহ বলেন: ‘‘আমি যদি কোনো আয়াত নাসখ (অপসারিত) করি বা ভুলিয়ে দিই তবে তা থেকে উত্তম অথবা তারই অনুরূপ আনয়ন করি।’’
অন্যত্র তিনি বলেন: ‘‘শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ তা নাসখ (বাতিল বা অপসারিত) করেন, অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।’’
২. স্থানান্তর ও পরিবর্তন। এ অর্থে বলা হয়: কিতাবটি নাসখ করেছে, অর্থাৎ অনুলিপি তৈরির মাধ্যমে পুস্তকটির বিষয়বস্তু স্থানান্তর করেছে। বলা হয়: মৌমাছি মধু ‘নাসখ’ করেছে, অর্থাৎ এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেছে। এ অর্থে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে:
‘‘তোমরা যা কর্ম করতে আমি তা নাসখ (লিপিবদ্ধ) করতাম।’’
ইসলামী পরিভাষায় ‘নাসখ’ বা ‘রহিতকরণ’ (abrogation) অর্থ হলো ‘সকল শর্ত পূরণ করেছে এমন কোনো কর্ম বিষয়ক বিধানের পালনীয়তার সময়সীমার সমাপ্তি ঘোষণা করা।’
১. ৪. ১. ২. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণের ক্ষেত্র
ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে এই প্রকারের রহিতকরণ বা ‘কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘোষণা’ শুধু ‘কর্ম বিষয়ক বিধানের’ ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে, কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্য, জ্ঞানভিত্তিক তথ্য, গল্প-কাহিনী বা ঘটনার বর্ণনায় এই প্রকারের রহিত করণ ঘটতে পারে না। যেমন, ‘এই বিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন’ এই তথ্যটির সত্যতা ও পালনীয়তা চিরন্তন।
অনুরূপভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো বিষয়কে ‘রহিত’ বা ‘কার্যকরিতা সমাপ্ত’ করা যায় না। যেমন দিনের আলো এবং রাতের অাঁধার। অনুরূপভাবে ‘প্রার্থনা’ বিষয়ক বাক্য রহিত হয় না এবং চিরন্তন সত্যও ‘রহিত’ হয় না। যেমন ‘ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসী হও এবং ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করিও না’। এই প্রকারের চিরন্তন সত্য রহিত হয় না।
যে সকল বিধান প্রদানের সময়েই তা চিরস্থায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে সে সকল বিধানও রহিত বা স্থগিত হয় না। যেমন নিরপরাধ নারীদেরকে মিথ্যা অপবাদ প্রদানকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: ‘‘এবং কখনোই তোমরা তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না।’’ আবার যে সকল বিধান প্রদান করার সময়েই তাকে অস্থায়ী বা সময়িক বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পূর্বে রহিত করা যায় না। অনুরূপভাবে দুআ বা প্রার্থনা রহিত হয় না।
ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণ বা স্থগিতকরণ শুধু সে সকল বিধানের বিষয়ে ঘটতে পারে, যেগুলি কর্ম বিষয়ক, চিরস্থায়ী নয় এবং সাময়িকও নয় এবং যেগুলির বাস্তবায়ন থাকা ও না থাকা উভয়েরই সম্ভাবনা বিরাজমান। এই প্রকারের বিধানগুলিকে ‘উন্মুক্ত বিধান’ বলা হয়।
১. ৪. ১. ৩. রহিতকরণ বনাম মত-পাল্টানো
ইয়াহূদী ধর্মে একটি বিশ্বাস আছে যাকে ‘‘আল-বাদা’’ বলা হয়। এর অর্থ কোনো অপ্রকাশিত বিষয় প্রকাশিত হওয়া। এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, মহান আল্লাহ কোনো একটি বিষয়ের পরিণাম ও পরিণতি না জেনে বা না বুঝেই সে বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ প্রদান করেন। এরপর নতুন একটি মত তার কাছে প্রকাশিত হয়। তখন তিনি পূর্বে বিধান রহিত করে নতুন বিধান প্রদান করেন। এরূপ বিশ্বাসের দ্বারা মহান আল্লাহকে অজ্ঞ বা অপরিণামদর্শী বলে দাবি করা হয়, নাউযূ বিল্লাহ! তিনি এরূপ বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস থেকে অতি পবিত্র ও অনেক ঊর্ধ্বে।
ইসলামী পরিভাষায় ‘রহিতকরণ’ বা ‘স্থগিতকরণ’ এরূপ কিছুই নয়। ইসলামী পরিভাষায় এর অর্থ হলো, মহান আল্লাহ জানতেন যে, এ বিধানটি অমুক সময় পর্যন্ত তাঁর বান্দাদের মধ্যে প্রচলিত থাকবে এবং এরপর তা স্থগিত হবে। যখন তাঁর জানা সেই সময়টি এসে গেল তখন তিনি নতুন বিধান প্রেরণ করলেন। এ নতুন বিধানের মাধ্যমে সে পূর্বতন বিধানটির আংশিক বা সামগ্রিক পরিবর্তন সাধন করতেন। প্রকৃত পক্ষে এ হলো পূর্বতন বিধানের কার্যকরিতার সময়সীমা জানিয়ে দেওয়া। তবে যেহেতু পূর্বতন বিধানটি প্রদানের সময় এর সময়সীমা উল্লেখ করা হয় নি, সেহেতু, নতুন বিধানটির আগমনকে আমরা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে বাহ্যত ‘পরিবর্তন’ বলে মনে করি। এরূপ ‘রহিতকরণ’ যুক্তি বা বিবেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। মহান আল্লাহর ক্ষেত্রেও তা তাঁর মহত্ব বা মর্যাদার পরিপন্থী নয়। এরূপ রহিতকরণের মধ্যে মানব জাতির জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মানুষ অনেক সময় এরূপ পরিবর্তনের কল্যাণ বুঝতে পারে, অনেক সময় তা পারে না। তবে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর সকল নির্দেশ ও বিধানই মানুষের মঙ্গল অর্জনের জন্য অথবা অমঙ্গল বর্জন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।
মহান আল্লাহই শুধু মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ ও মঙ্গল-অমঙ্গলের গোপন বিষয় অবগত আছেন। তিনিই জানেন কখন কোন বিধানের কার্যকরিতা শেষ হওয়া মানুষের জন্য কল্যাণকর। এজন্য একমাত্র তিনিই কোনো বিধান রহিত বা স্থগিত করতে পারেন। পক্ষান্তরে ‘‘প্রকাশ পাওয়া’’, ‘‘মত পাল্টানো’’ বা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে অসম্ভব। কারণ তিনি অনাদি, অনন্ত ও অসীম জ্ঞানের অধিকারী। কখন কি ঘটবে তা সবই তিনি জানেন। ফলাফল দেখে মতপাল্টনো, বা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভব, কারণ মানুষের জ্ঞান অতি সীমিত।
১. ৪. ১. ৪. কাহিনী ও ঐতিহাসিক বিবরণ রহিত হয় না
উপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাঠক বুঝতে পারছেন যে, কোনো গল্প, কাহিনী বা ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ ‘রহিত’ বা ‘স্থগিত’ হয় না। কাজেই বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের কোনো গল্প-কাহিনী আমাদের মতে রহিত নয়। তবে সেগুলির মধ্যে অনেক মিথ্যা কাহিনী আছে। যেমন:
(১) লোট বা লূত আলাইহিস সালাম মদ খেয়ে মাতাল হন এবং তার দুই কন্যার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। তাঁর কন্যাদ্বয় এই ব্যভিচারের মাধ্যমে পিতাকর্তৃক গর্ভধারণ করেন। আদিপুস্তকের ১৯ অধ্যায়ে এই ‘কাহিনী’টি উল্লেখ করা হয়েছে।
(২) য্যাকোব (ইয়াকূব আ)-এর পুত্র যিহূদা তাঁর পুত্রবধু তামর-এর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। ব্যভিচারের ফলে তামর গর্ভবতী হন এবং পেরস ও সেরহ নামে যমজ পুত্রদ্বয় প্রসব করেন। আদিপুস্তকের ৩৮ অধ্যায়ে এই ‘কাহিনী’ উল্লেখ করা হয়েছে। দায়ূদ, শলোমন ও যীশুখৃস্ট সকলেই পেরস নামের এ জারজ সন্তানের বংশধর। মথিলিখিত সুসমাচারের প্রথম অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩) দায়ূদ আলাইহিস সালাম ঊরিয়র স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন এবং এই ব্যভিচারের ফলে স্ত্রীলোকটি গর্ভবতী হন। তখন দায়ূদ সেনাপতিকে পরামর্শ দেন কৌশলে যুদ্ধের মাঠে ঊরিয়াকে বধ করার জন্য। এভাবে ঊরিয়া নিহত হয় এবং দায়ূদ তার স্ত্রীকে ভোগ করেন। ২ শমূয়েলের ১১শ অধ্যায়ে ‘কাহিনীটি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৪) শলোমন (সুলাইমান আ.) শেষ বয়সে ধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান। তিনি মূর্তিপূজা শুরু করেন এবং মূর্তির জন্য উপাসনালয় তৈরি করেন। ১ রাজাবলির ১১ অধ্যায়ে এই ‘কাহিনীটি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৫) হারোণ আলাইহিস সালাম একটি গো-বৎসের মুর্তি তৈরি করেন এবং তার পূজা করেন। উপরন্তু তিনি ইস্রায়েল সন্তানগণকে তা পূজা করতে নির্দেশ দেন। যাত্রাপুস্তকের ৩২ অধ্যায়ে এই ‘কাহিনীটি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
এসকল ‘কাহিনী’ এবং অনুরূপ আরো অনেক কাহিনী আমাদের মতে মিথ্যা ও বাতিল। আমরা বলি না যে, এগুলি রহিত বা স্থগিত।
১. ৪. ১. ৫. যাবূর দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিল দ্বারা যাবূর রহিত হয় নি
চিরন্তন ও স্বতঃসিদ্ধ চিরস্থায়ী সত্য, জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় লব্ধ তথ্যাদি, সর্বজনীন বিধানাদি, চিরস্থায়ী বিধানাদি, সাময়িক বিধানাদির সময়কাল শেষ হওয়ার পূর্বে এবং সাধারণ বা উন্মুক্ত বিধানের স্থান কাল ও পাত্র একই হলে তা রহিত হতে পারে না। কারণ এইরূপ রহিতকরণ আপত্তিকর।
অনুরূপভাবে প্রার্থনার বাক্যাবলিও রহিত হয় না। এজন্য যাবূর বা ‘গীতসংহিতা’ আমাদের দৃষ্টিতে পারভিাষিকভাবে রহিত বা স্থগিত নয়। আমরা কখনোই বলি না যে, গীতসংহিতা বা যাবূরের দ্বারা তোরাহ রহিত হয়েছে এবং ইঞ্জিল বা নতুন নিয়মের আগমনে ‘যাবূর’ রহিত হয়েছে। কারণ যাবূর মূলত প্রার্থনা বা দুআর সমষ্টি, যা রহিত করে না বা রহিত হয় না।
ইসলামে যাবূরসহ পুরাতন ও নতুন নিয়মের পুস্তকাবলি ব্যবহার করতে বা সেগুলির উপর নির্ভর করতে নিষেধ বা আপত্তি করার কারণ এ নয় যে, এগুলিতে বর্ণিত সকল প্রার্থনা, কাহিনী... ইত্যাদি সবকিছু রহিত হয়ে গিয়েছে। বাইবেলের নতুন ও পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদি ব্যবহারে আপত্তির কারণ হলো, এগুলি সত্যই মোশি, দায়ূদ, যীশু প্রমুখ ভাববাদীর প্রদত্ত সঠিক পুস্তক কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ সকল পুস্তকের কোনো অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা সংরক্ষিত নেই এবং এগুলিতে সকল প্রকারের বিকৃতি ঘটেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
১. ৪. ২. বাইবেলের পরিবর্তিত ও অপরিবর্তিত বিধানাদি
উপর্যুক্ত বিষয়গুলি ছাড়া সাধারণ উন্মুক্ত কর্মবিষয়ক বিধানাবলি রহিত হতে পারে। আমরা স্বীকার করি যে, তোরাহ ও ইঞ্জিল বা পুরাতন ও নতুন নিয়মের কিছু কিছু উন্মুক্ত সাধারণ রহিত হওয়ার যোগ্য বিধান ইসলামী শরীয়তে বা ইসলামী ব্যবস্থায় রহিত ও স্থগিত করা হয়েছে। আমরা বলি না যে, পুরাতন ও নতুন নিয়মের সকল বিধানই রহিত হয়েছে। বরং আমরা বলি যে, তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনেক বিধান নিশ্চিতরূপেই অপরিবর্তিত ও কার্যকর রয়েছে। যেমন একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, শিরক, মূর্তিপূজা ইত্যাদি বর্জন করা, মিথ্যা শপথ, হত্যা, ব্যভিচার, সমকামিতা, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, প্রতিবেশির সম্পদ বা সম্মানের ক্ষতি করার বিষয়ে তোরাহ এর নিষেধাজ্ঞা এখনও অপরিবর্তিত ও কার্যকর রয়েছে। পিতামাতার সম্মান ও সেবার আবশ্যকতা, পিতা, পুত্র, মাতা, কন্যা, চাচা, ফুফু, মামা, খালাকে বিবাহ করার নিষেধাজ্ঞা, দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করার নিষেধাজ্ঞা ও অনুরূপ আরো অনেক বিধান অপরিবর্তিত ও কার্যকর রয়েছে।
১. ৪. ৩. বাইবেলে বিদ্যমান রহিতকরণের প্রকারভেদ
রহিতকরণ শুধু ইসলামের বিষয় নয়। পূর্ববর্তী সকল ব্যবস্থায় ও সকল ধর্মেই ‘রহিতকরণের’ অনেক ঘটনা ঘটেছে। রহিতকরণ দুই প্রকারের: প্রথমত, পরবর্তী ভাববাদীর ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী ভাববাদীর কোনো ব্যবস্থা রহিত বা স্থগিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, একই ভাববাদীর ব্যবস্থার মধ্যে একটি বিধান রহিত করে অন্য বিধান দেওয়া হবে। উভয় প্রকারের ‘রহিতকরণ’ই পূর্ববর্তী ভাববাদিগণের ব্যবস্থায় ঘটেছে বলে বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে আমরা দেখতে পাই। যেহেতু ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, ঈশ্বরের বিধান কখনোই রহিত হতে পারে না, সেহেতু এখানে তাদের দাবির অসারতা প্রমাণের জন্য কিছু উদাহরণ পেশ করছি।
১. ৪. ৩. ১. পরবর্তী ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী ব্যবস্থার রহিতকরণ
প্রথমে পরবর্তী নবীর শরীয়ত বা ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী নবীর শরীয়ত বা ব্যবস্থার নাসখ বা রহিতকরণের কিছু উদাহরণ পেশ করছি:
১. ভাই-বোনের বিবাহের বৈধতা রহিত
আদম আলাইহিস সালাম-এর শরীয়তে বা ব্যবস্থায় ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ বৈধ ছিল। তাঁর সন্তানগণ এভাবে বিবাহ-শাদি করতেন। পরে মোশির ব্যবস্থায় ভগ্নিকে বিবাহ করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। আপন ভগ্নি, বৈমাত্রেয় ভগ্নি ও বৈপিত্রেয় ভগ্নি সকল প্রকারের ভগ্নিকে বিবাহ করাই নিষিদ্ধ। এরূপ বিবাহ ব্যভিচার বলে গণ্য এবং এরূপ বিবাহকারী অভিশপ্ত। এরূপ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ স্বামী-স্ত্রী উভয়কে হত্যা করা অত্যাবশ্যক। লেবীয় পুস্তকের ১৮ অধ্যায়ের ৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘তোমার ভগিনী, তোমার পিতৃকন্যা কিম্বা তোমার মাতৃকন্যা, গৃহজাতা হউক কিম্বা অন্যত্র জাতা হউক, তাহাদের আবরণীয় অনাবৃত করিও না।’’
লেবীয় ২০/১৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আর যদি কেহ আপন ভগিনীকে, পিতৃকন্যাকে কিম্বা মাতৃকন্যাকে গ্রহণ করে, ও উভয়ে উভয়ের্ আবরণীয় দেখে, তবে তাহা লজ্জাকর বিষয়; তাহারা আপন জাতির সন্তানদের সাক্ষাতে হত্যাকৃত হইবে; আপন ভগিনীর আবরণীয় অনাবৃত করাতে সে আপন অপরাধ বহন করিবে।’’
দ্বিতীয় বিবরণ ২৭/২২: ‘‘যে কেহ আপন ভগিনীর সহিত, অর্থাৎ পিতৃকন্যার কিম্বা মাতৃকন্যার সহিত শয়ন করে, সে শাপগ্রস্থ।’’
এথেকে প্রমাণিত হলো যে, আদম আলাইহিস সালাম-এর ব্যবস্থায় (শরীয়তে) ভগিনীকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। তা নাহলে প্রমাণিত হবে যে, সকল আদম-সন্তান ‘ব্যভিচার-তুল্য বিবাহের’ জারজ সন্তান এবং আদমের সন্তানগণ যারা এরূপ বিবাহ করেছিলেন তাঁরা সকলেই ব্যভিচারী ছিলেন, হত্যাযোগ্য অপরাধে অপরাধী ছিলেন এবং অভিশপ্ত ছিলেন। সঠিক কথা হলো, এরূপ বিবাহ পূর্বতন ভাববাদিগণের ব্যবস্থায় বৈধ ছিল, এরপর মোশির ব্যবস্থায় এই বৈধতা ‘রহিত’ করা হয়।
২. সকল প্রাণী ভক্ষণের জন্য বৈধ ছিল পরে তা রহিত করা হয়
আদিপুস্তকের ৯ম অধ্যায়ের ৩ শ্লোকে নোহের সন্তানদেরকে উদ্দেশ্য করে ঈশ্বর বলেন: ‘‘প্রত্যেক গমনশীল প্রাণী তোমাদের খাদ্য হইবে (Every moving thing that liveth shall be meat for you); আমি হরিৎ ওষধির (green herb) ন্যায় সে সকল তোমাদিগকে দিলাম।’’
এভাবে আমরা দেখছি যে, নোহ-এর ব্যবস্থায় সকল প্রাণীই সবুজ শাকশব্জি-ফলমুলের মত বৈধ বা হালাল ছিল। পরবর্তীকালে মোশির ব্যবস্থায় অনেক প্রাণীর বৈধতা ‘‘রহিত’’ করে সেগুলি ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লেবীয় পুস্তকের ১১/৪-৮ এবং দ্বিতীয় বিবরণের ১৪/৭-৮-এ যে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এখানে দ্বিতীয় বিবরণের ১৪/৭-৮ উদ্ধৃত করছি: ‘‘(৭) কিন্তু যাহারা জাওর কাট, কিম্বা দ্বিখণ্ড খুরবিশিষ্ট, তাহাদের মধ্যে এইগুলি ভোজন করিবে না: উষ্ট্র, শশক (hare: খরগোশ) ও শাফন (coney: খরগোশ); কেননা তাহারা জাওর কাটে বটে, কিন্তু দ্বিখণ্ড খুরবিশিষ্ট নয়, তাহারা তোমাদের পক্ষে অশুচি; (৮) আর শূকর দ্বিখণ্ড খুরবিশিষ্ট বটে, কিন্তু জাওর কাটে না, সে তোমাদের পক্ষে অশুচি; তোমরা তাহাদের মাংস ভোজন করিবে না, তাহাদের শব স্পর্শও করিবে না।’’
৩. দুবোনকে একত্রে বিবাহ করা বৈধ ছিল পরে রহিত করা হয়
যাকোব (ইয়াকূব আ) লেয়া ও রাহেল নামক দু বোনকে বিবাহ করেন। এ দুইজনই ছিলেন তাঁর মামাতো বোন। আদিপুস্তকের ২৯ অধ্যায়ের ১৫-৩৫ শ্লোকে বিষয়টি স্পষ্ট বলা হয়েছে। মোশির ব্যবস্থায় দু বোনকে একত্রে বিবাহ করার বৈধতা ‘‘রহিত’’ করা হয়। লেবীয় পুস্তকের ১৮/১৮ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘আর স্ত্রীর সপত্নী হইবার জন্য তাহার জীবৎকালে আবরণীয় অনাবৃত করণার্থে তাহার ভগিনীকে বিবাহ করিও না।’’
যদি যাকোবের ব্যবস্থায় দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা বৈধ না হতো তা নাহলে প্রমাণিত হবে যে, যাকোবের এ বিবাহদুইটি অবৈধ ছিল এবং এ দুই স্ত্রীর সন্তানগণ সকলেই ব্যভিচার-জাত জারজ সন্তান, নাঊযু বিল্লাহ! অধিকাংশ ইস্রায়েলীয় ভাববাদীই যাকোবের এ দুই স্ত্রীর সন্তান।
৪. স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ও অন্যত্র বিবাহ
মোশির ব্যবস্থায় বা শরীয়তে যে কোনো কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন বা বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। তালাকপ্রাপ্তা বা পরিত্যক্তা স্ত্রী তালাকদাতা স্বামীর গৃহ থেকে বেরিয়ে গেলে অন্য যে কোনো পুরুষ তাকে বিবাহ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিবরণের ২৪ অধ্যায়ের ১-২ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘(১) কোন পুরুষ কোন স্ত্রীকে গ্রহণকরিয়া বিবাহ করিবার পর যদি তাহাতে কোন প্রকার অনুপযুক্ত ব্যবহার দেখিতে পায়, আর সেই জন্য সে স্ত্রী তাহার দৃষ্টিতে প্রীতিপাত্র না হয়, তবে সেই পুরুষ তাহার জন্য এক ত্যাগপত্র লিখিয়া তাহার হস্তে দিয়া আপন বাটী হইতে তাহাকে বিদায় করিতে পারিবে। (২) আর সে স্ত্রী তাহার বাটী হইতে বাহির হইবার পর গিয়া অন্য পুরুষের ভার্যা হইতে পারে।’’
পক্ষান্তরে যীশুর ব্যবস্থায় একমাত্র ব্যভিচারের অপরাধ ছাড়া কোনো স্বামী তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে না বা পরিত্যাগ করতে পারে না। অনুরূপভাবে অন্য কোনো ব্যক্তি সে পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারবে না। এইরূপ বিবাহ ব্যভিচার বলে গণ্য হবে। মথিলিখিত সুসমাচারের ৫ম অধ্যায়ের ৩১-৩২ শ্লোকে এবং ১৯ অধ্যায়ের ৩-৯ শ্লোকে তা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। মোশির ব্যবস্থার গোঁড়া অনুসারী ফরীশীগণ যীশুর নিকট এ বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করে বলেন যে, মোশি যেখানে ত্যাগপত্র বা তালাকনামা দিয়ে স্ত্রী পরিত্যাগের বিধান দিয়েছেন, সেখানে আপনি তা নিষেধ করছেন কেন? উত্তরে যীশু বলেন: ‘‘তোমাদের অন্তঃকরণ কঠিন বলিয়া মোশি তোমাদিগকে আপন আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন, কিন্তু আদি হইতে এরূপ হয় নাই। আর আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, ব্যভিচার দোষ ব্যতিরেকে যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যাকে বিবাহ করে, সে ব্যভিচার করে; এবং যে ব্যক্তি সেই পরিত্যাক্তা স্ত্রীকে বিবাহ করে, সেও ব্যভিচার করে।’’ (মথি ১৯/৮-৯)
যীশুর এ উত্তর থেকে জানা গেল যে, এ বিধানের ক্ষেত্রে দুবার ‘রহিতকরণ’ ঘটেছে। প্রথম যুগে এইরূপ স্ত্রী-পরিত্যাগ অবৈধ ছিল। মোশির ব্যবস্থায় সেই অবৈধতা রহিত করে তা বৈধ করা হয়। পুনরায় যীশুর ব্যবস্থায় মোশির দেওয়া বৈধতা রহিত করা হয়। মূসার আলাইহিস সালাম শরীয়তে বৈধ বিষয়টি ঈসার আলাইহিস সালাম শরীয়তে ব্যভিচারের মত পাপ বলে গণ্য হয়।
৫. মূসার আলাইহিস সালাম ব্যবস্থার সকল বিধান রহিতকরণ!
ইস্রায়েলীগণের সকল বিধিবিধান তাওরাতের মধ্যে বিদ্যমান। ইস্রায়েল-বংশের সকল নবী বা ভাববাদী এ সকল বিধান পালনের জন্য আদিষ্ট ছিলেন। এ সকল বিধানের মধ্যে রয়েছে বৈধ ও অবৈধ বা শুচি ও অশুচি প্রাণী, খাদ্য ও পানীয়ের বিধান। ঈসা আলাইহিস সালাম ইস্রায়েল বংশের একজন নবী বা ভাববাদী। তিনি মূসার আলাইহিস সালাম শরীয়ত রহিত করেন নি, বরং তিনি তার অনুসারী ছিলেন। মথিলিখিত সুসমাচারের ৫/১৭-১৮ শ্লোকের বর্ণনায় তিনি বলেন: ‘‘(১৭) মনে করিও না যে, আমি ব্যবস্থা কি ভাববাদিগ্রন্থ লোপ করিতে আসিয়াছি; আমি লোপ করিতে আস নাই, কিন্তু পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। (১৮) আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যনত আকাশ ও পৃথিবী লুপ্ত না হইবে, সেই পর্যনত ব্যবস্থার (তাওরাত বা পুরাতন নিয়মের বিধিবিধান) এক মাত্রা কি এক বিন্দুও লুপ্ত হইবে না, সমস্তই সফল হইবে।’’
ড. ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) তার লেখা ‘‘মীযানুল হক্ক’’ (Scale of Truth) গ্রন্থে যীশুর এ বক্তব্যকে ভিত্তি করে বলেছেন যে, তাওরাতের কোনো বিধান নাসখ বা রহিত হতে পারে না। তিনি বলেন যে, যীশু তাওরাতের কোনো বিধান রহিত করেন নি; কারণ তিনি রহিত করতে বা লোপ করতে আগমন করেন নি, বরং পূর্ণ করতে এসেছিলেন।
কিন্তু প্রকৃত সত্য কথা এই যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যবস্থার সকল হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় সাধু পলের (Paul)-এর এক ফতোয়ায় বৈধ ও হালালে পরিণত হয়েছে। সাধু পলের ধর্মে কোনো হারাম বা অবৈধ কিছু নেই। শুধু যারা নিজেরা অপবিত্র তাদের জন্যই হালাল-হারাম বা শুচি-অশুচির ব্যবস্থা। অশুচি বা খারাপ মানুষদের জন্য হালাল বা শুচি ও পবিত্র খাদ্যও অপবিত্র। আর শুচি বা পবিত্র মানুষদের জন্য সকল প্রকার হারাম, অপবিত্র ও অশুচি বিষয়ই হালাল ও পবিত্র। সাধু পলের এ এক মহা-বিস্ময়কর ফতোয়া!
রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের ১৪ অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আমি জানি, এবং প্রভু যীশুতে নিশ্চয় বুঝিয়াছি, কোন বস্তুই স্বভাবত অপবিত্র নয়; কিন্তু যে যাহা অপবিত্র জ্ঞান করে, তাহারই পক্ষে তাহা অপবিত্র।’’ তীতের প্রতি প্রেরিত পত্রের ১ম অধ্যায়ের ১৫ শ্লোকে পৌল লিখেছেন: ‘‘শুচিগণের পক্ষে সকলই শুচি (Unto the pure all things are pure); কিন্তু কলুষিত ও অবিশ্বাসীদের পক্ষে কিছুই শুচি নয়; বরং তাহাদের মন ও সংবেদ (বিবেক) উভয়ই কলুষিত হইয়া পড়িয়াছে।’’
সাধু পলের এ ফতোয়া থেকে প্রমাণিত হয় যে, মূসা আলাইহিস সালাম থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত ইস্রা্য়েল বংশের সকল নবী-ভাববাদী ও স্বয়ং যীশু কেউই পবিত্র ছিলেন না, একারণে তাঁদের ভাগ্যে এইরূপ ঢালাও বৈধতা জোটে নি। পক্ষান্তরে খৃস্টানগণ যেহেতু ‘পবিত্র’ সেহেতু তাঁরা এইরূপ ঢালাও বৈধতা লাভ করলেন। তাঁদের জন্য সব কিছুই বৈধ ও পবিত্র হয়ে গেল। স্বয়ং যীশু খৃস্টও মূসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যবস্থা রহিত করে সব কিছু হালাল করতে পারলেন না; কারণ তিনি ও তার শিষ্যরা তো পবিত্র বা শুচি হতে পারেন নি। যেহেতু সাধু পল ও তার অনুসারীরা শুচিতা অর্জন করেন সেহেতু তাদের জন্য সকল হারাম ও অপবিত্র খাদ্য ও পানীয় বৈধ ও পবিত্র হয়ে গেল। এভাবে মহামতি সাধু পল মোশির ব্যবস্থা পুরোপুরি রহিত করতে সক্ষম হলেন!
খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পল এ ‘ঢালাও বৈধতা’ প্রচারের ক্ষেত্রে খুবই সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সর্বদা প্রাণপনে তাঁর অনুসারীদের বুঝাতে চেষ্টা করতেন যে, মোশির ব্যবস্থা পুরোপুরি রহিত ও বাতিল হয়ে গিয়েছে। এজন্য তিনি তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত প্রথম পত্রের ৪র্থ অধ্যায়ের ১-৭ শ্লোকে লিখেছেন: ‘‘(১) ... উত্তরকালে কতক লোক ভ্রান্তিজনক আত্মাদিগেতে ও শয়তানদের শিক্ষামালায় মন দিয়া (giving heed to seducing spirits, and doctrines of devils) বিশ্বাস হইতে সরিয়া পড়িবে। ... (৩) ... এবং বিভিন্ন খাদ্যের ব্যবহার নিষেধ করে, যাহা ঈশ্বর এই অভিপ্রায়ে সৃষ্টি করিয়াছেন, যেন, যাহারা বিশ্বাসী ও সত্যের তত্ত্ব জানে, তাহারা ধন্যবাদ-পূর্ব ভোজন করে (and commanding to abstain from meats, which God hath created to be received with thanksgiving of them which believe and know the truth)। (৪) বাস্তবিক ঈশ্বরে সৃষ্ট সমস্ত বস্তুই ভাল; ধন্যবাদসহ গ্রহণ করিলে কিছুই অগ্রাহ্য নয়, (৫) কেননা ঈশ্বরের বাক্য ও প্রার্থনা দ্বারা তাহা পবিত্রীকৃত হয়। (৬) এই সকল কথা ভ্রাতৃগণকে মনে করাইয়া দিলে তুমি খৃস্ট যীশুর উত্তম পরিচারক হইবে; যে বিশ্বাসের ও উত্তম শিক্ষার অনুসরণ করিয়া আসিতেছ তাহার বাক্যে পোষিত থাকিবে। (৭) আর ধর্মবিরূপক ও জরাতুর স্ত্রীলোকের যোগ্য গল্পসকল অগ্রাহ্য কর (But refuse profane and old wives' fables)।’’
৬- মূসার আলাইহিস সালাম শরীয়তের সকল পর্ব ও দিবস রহিতকরণ
লেবীয় পুস্তকের ২৩ অধ্যায়ে যে সকল সাপ্তাহিক, মাসিক ও বাৎসরিক পর্ব পালনের বিধিবিধান প্রদান করা হয়েছে, মোশির ব্যবস্থা অনুসারে সেগুলি সবই চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। এই অধ্যায়ের ১৪, ২১, ৩১ ও ৪১ শ্লোকে সুস্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পর্ববিষয়ক বিধানগুলি সর্বত্র ও সর্বদা পালনীয় চিরস্থায়ী বিধান।
শনিবার (the sabbath of the LORD)-কে সম্মান করা এবং এ দিনে সকল প্রকার কাজকর্ম বন্ধ রাখা মোশির ব্যবস্থা অনুসারে একটি অলঙ্ঘনীয় চিরস্থায়ী বিধান। কেউ এ দিনে সামান্যতম কর্মও করতে পারবেন না। কেউ যদি এ দিনে কোনো প্রকারের কর্ম করেন তবে তাকে হত্যা করা অত্যাবশ্যক। পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির বিভিন্ন স্থানে বারংবার এই বিধান বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন: আদিপুস্তক ২/৩; যাত্রাপুস্তক ২০/৮-১১, ২৩/১২ ও ৩৪/২১; লেবীয় ১৯/৩ ও ২৩/৩; দ্বিতীয় বিবরণ ৫/১২-১৫; যিরমিয় ১৭/১৯-২৭; যিশাইয় ৫৬/১-৮ ও ৫৮/১৩-১৪; নহিমিয় ৯/১৪; যিহিষ্কেল ২০/১২-২৪।
এ দিনে সামান্যতম কর্ম করলেই তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাত্রাপুস্তকের ৩১/১২-১৭ ও ৩৫/১-৩ শ্লোকে। মূসার আলাইহিস সালাম সময়ে ইস্রায়েল-সন্তানগণ এক শনিবারে এক ব্যক্তিকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করতে দেখেন। তখন তারা সেই কাষ্ঠসংগ্রহকারীকে আটক করে এবং সদাপ্রভুর নির্দেশে তাকে আবাসিক এলাকার বাইরে নিয়ে পাথর মেরে হত্যা করে। গণনা পুস্তকের ১৫ অধ্যায়ের ৩২-৩৬ শ্লোকে এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাপুরুষ সাধু পল (পৌল) মহাশয় শনিবার-সহ তাওরাতের সকল পর্ব ও দিবস রহিত ও বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এ সকল বিধান সবই ছিল এক প্রকারের ইঙ্গিত ও ছায়া মাত্র। কলসীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৬ শ্লোকে তিনি লিখেছেন: ‘‘অতএব ভোজন কি পান, কি উৎসব, কি অমাবস্যা, কি বিশ্রামবার, এই সকলের সম্মন্ধে কেহ তোমাদের বিচার না করুক।’’
ডাওয়ালি ও রজারমেন্ট (G. D'Oyley and R. Mant)-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে (Notes, Practical and Explanatory to the Holy Bible) কতিপয় খৃস্টান পণ্ডিতের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, ইয়াহূদীদের মধ্যে তিন প্রকারের পর্ব প্রচলিত ছিল: প্রতি বছর বছর পালিত পর্ব, প্রতি মাসে মাসে পালিত পর্ব ও প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে পালিত পর্ব। এ সকল পর্ব সবই রহিত হয়ে গিয়েছে। এমনকি শনিবার সাবাথ বা বিশ্রামদিন পালনও রহিত হয়ে যায়। তদস্থলে খৃস্টানদের সাবাথ (রবিবার) পালনের ব্যবস্থা করা হয়।’’
৭- খাতনা বা ত্বকচ্ছেদ বিধান রহিতকরণ
খতনা বা ত্বক্ছেদ করা (circumcision) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর শরীয়তের একটি অলঙ্ঘনীয় চিরস্থায়ী বিধান। আদিপুস্তকের ১৭ অধ্যায়ের ৯-১৪ শ্লোকে তা স্পষ্টরূপে বলা হয়েছে। কয়েকটি শ্লোক দেখুন: ‘‘(১২) পুরুষানুক্রমে তোমাদের প্রত্যেক পুত্রসন্তানের আট দিন বয়সে ত্বকচ্ছেদ হইবে। (১৩) ... আর তোমাদের মাংসে-বিদ্যমান আমার নিয়ম চিরকালের নিয়ম হইবে (my covenant shall be in your flesh for an everlasting covenant)।’’
এজন্য ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদের মধ্যে এ বিধান প্রচলিত থাকে। মূসা আলাইহিস সালাম-এর শরীয়ত বা ব্যবস্থায়ও এ বিধান কার্যকর থাকে। লেবীয় পুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পরে অষ্টম দিনে বালকটির পুরুষাঙ্গের ত্বক্ছেদ হইবে।’’
যীশুরও ত্বক্ছেদ করা হয়েছিল। লূকলিখিত সুসমাচারের ২ অধ্যায়ের ২১ শ্লোকে তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে: ‘‘আর যখন বালকটির ত্বকচ্ছেদনের জন্য আট দিন পূর্ণ হইল, তখন তাঁহার নাম যীশু রাখা গেল।’’ খৃস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত যীশুর ত্বক্ছেদ দিবস উপলক্ষে নির্ধারিত প্রার্থনা রয়েছে, যা তাঁরা এই দিবসের স্মরণে পালন করেন।
যীশুর ঊর্ধ্বারোহণ পর্যন্ত তক্বচ্ছেদ বা খাতনার এ বিধান কার্যকর ছিল। যীশু এ বিধান রহিত করেন নি। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রেরিতগণের যুগে তাঁরা এই ‘চিরন্তন’ বিধানটি রহিত করেন।
খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পল এ বিধানটি রহিত করার বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তা ও কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। গালাতীয় ২/৩-৫, ৫/১-৬, ৬/১১-১৬; ফিলীপিয় ৩/৩; কলসীয় ২/১১ ইত্যাদি স্থানে তিনি বারংবার খাতনা বা তক্বচ্ছেদ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং খাতনা করলে আর যীশুর অনুগ্রহ পাওয়া যাবে না বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে শুধু গালাতীয় ৫/২ ও ৬ শ্লোক উদ্ধৃত করছি। তিনি বলেন: ‘‘(২) দেখ, আমি পৌল তোমাদিগকে কহিতেছি, যদি তোমরা ত্বক্ছেদ প্রাপ্ত হও, তবে খৃস্ট হইতে তোমাদের কিছুই লাভ হইবে না। ... (৬) কারণ খৃস্ট যীশুতে ত্বক্ছেদের কোন শক্তি নাই, অত্বকচ্ছেদেরও নাই; কিন্তু প্রেম দ্বারা কার্যসাধক বিশ্বাসই শক্তিযুক্ত।’’
খৃস্টানগণ তাদের ধর্মগ্রন্থের এ চিরস্থায়ী বিধান, যা স্বয়ং যীশুও পালন করেছেন এবং নিষেধ বা রহিত করেন নি, সে বিধানকে সাধু পলের নির্দেশে বাতিল করে দেন এবং রহিত বলে গণ্য করেন।
৮- সাধু পলের দৃষ্টিতে তাওরাত বা পুরাতন নিয়মের মূল্য:
সাধু পল বারংবার বলেছেন যে, তাওরাত বা পুরাতন নিয়ম বাতিল, অচল, দুর্বল ও নিষ্ফল। ইব্রীয়দের প্রতি পত্রের ৭ম অধ্যায়েরই ১৮ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘কারণ এক পক্ষে পূর্বকার বিধির দুর্বলতা ও নিষ্ফলতা প্রযুক্ত তাহার লোপ (রহিতকরণ) হইতেছে (For there is verily a disannulling of the commandment going before for the weakness and unprofitanleness thereof)।’’
বাইবেলের আরবী অনুবাদের বিভিন্ন সংস্করণের এখানে disannulling বা লোপ-এর অনুবাদে ‘‘নাসখ’’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৮২৫, ১৮২৬ সালের আরবী বাইবেলে এ শ্লোকের অনুবাদে বলা হয়েছ: ‘‘পূর্ববতী বিধানের (পুরাতন নিয়মের) দুর্বলতা ও নিষ্ফলতার কারণে তা নাসখ বা রহিত করা হয়েছে।’’
১৬৭১, ১৮২৩ ও ১৮৪৪ সালের আরবী বাইবেলে শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পূর্ববর্তী নিয়ম বাতিল ও অচল হয়েছে কারণ তার দুর্বল ও তার মধ্যে কোনো ফায়েদা বা উপকার নেই।’’ ১৮৮২ সালের আরবী সংস্করণে বলা হয়েছে: ‘‘পূর্ববর্তী নিয়ম আমরা প্রত্যাখ্যান করি কারণ তার দুর্বলতা ও তার মধ্যে কোনো ফায়দা বা কল্যাণ না থাকা।’’
ইব্রীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের ৮ম অধ্যায়ের ৭ ও ১৩ শ্লোক: ‘‘(৭) কারণ ঐ প্রথম নিয়ম যদি নির্দোষ হইত, তবে দ্বিতীয় এক নিয়মের জন্য স্থানের চেষ্টা করা যাইত না।... (১৩) ‘নূতন’ বলাতে তিনি প্রথমটি পুরাতন করিয়াছেন; কিন্তু যাহা পুরাতন ও জীর্ণ হইতেছে, তাহা অন্তর্হিত হইতে উদ্যত (ready to vanish away)।’’
ইব্রীয়দের পত্রের ১০ অধ্যায়ের ৯ শ্লোকে সাধু পল বলেন: ‘‘তিনি প্রথম বিষয় লোপ (নাসখ) করিতেছেন, যেন দ্বিতীয় বিষয় স্থির করেন।’’
আরবী বাইবেলের কোনো কোনো সংস্করণে এখানে ‘‘নাসখ’’ (রহিত) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
এ সকল বক্তব্যে সাধু পল বারংবার বলেছেন যে, তাওরাত দুর্বল, নিষ্ফল, কল্যাণবিহীন, অচল, ত্রুটিযুক্ত, পুরাতন, জরাজীর্ণ, প্রস্থান-উদ্যত, বিলুপ্ত-প্রায়, প্রায়-অচল, প্রত্যাখ্যাত এবং রহিত।
ডাওয়ালি ও রজারমেন্ট-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে পাবেল-এর নিম্নলিখিত বক্তব্যটি উদ্ধৃত করা হয়েছে: একথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ঈশ্বর নতুন উত্তম বিধানের মাধ্যমে পুরাতন অসম্পূর্ণ বিধানকে রহিত করতে চান। এজন্যই ইয়াহূদীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিধানাবলি বিলোপ করে সেখানে খৃস্টধর্মকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইয়াহূদীদের যজ্ঞ ও নৈবেদ্য মুক্তি ও ঈশ্বর প্রেমের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এজন্য যীশু নিজে মৃত্যু গ্রহণ করে সেই অপূর্ণতা পূর্ণ করেছেন। তিনি একটি কর্মের মাধ্যমে অপরটি রহিত করেছেন।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি বুঝতে পেরেছি:
১- পরবর্তী ব্যবস্থা বা ধর্মে পূর্ববর্তী ব্যবস্থা বা ধর্মের কিছু বিধিবিধান রহিত হওয়া শুধু মুসলমানদের দাবি নয় বা ইসলামের সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয় বরং পূর্ববর্তী ধর্ম ও ব্যবস্থাগুলিতেও তা দেখতে পাওয়া যায়।
২- তোরাহ বা পুরাতন নিয়মের সকল বিধানই খৃস্টধর্মে রহিত করা হয়েছে। পুরাতন নিয়মে যে সকল বিধান ‘চিরস্থায়ী’ ও ‘চিরন্তন’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলিসহ সকল ফরয দায়িত্ব, ইবাদত, শুচি-অশুচি বা হালাল-হারামের বিধান ইত্যাদি সবই সাধু পল রহিত করেছেন। তার অনুসারিগণের জন্য এ সকল বিধান পালনীয় নয় বলে তিনি ঘোষণা করেছেন।
৩- খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পলের বক্তব্যের মধ্যে তাওরাতের বিধানাবলির ক্ষেত্রে ‘নাসখ’ বা ‘রহিত করা’ বা ‘বিলোপ করা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী খৃস্টান গবেষক ও ধর্মগুরুগণও এক্ষেত্রে এ সকল শব্দ ব্যবহার করেছেন।
৪- সাধু পল দাবি করেছেন যে, পুরাতন ব্যবস্থা দুর্বল, নিষ্ফল, কল্যাণবিহীন, অচল, ত্রুটিযুক্ত, পুরাতন, জরাজীর্ণ, প্রস্থান-উদ্যত, বিলুপ্ত-প্রায়, প্রায়-অচল, প্রত্যাখ্যাত এবং রহিত। এ থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামী শরীয়ত বা ইসলামের ব্যবস্থা দ্বারা ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ব্যবস্থা রহিত ও বিলুপ্ত হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বরং সাধু পলের বক্তব্য অনুসারে এরূপ বিলোপ সাধন জরুরী। কারণ যীশুর ব্যবস্থাটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রাচীন ও জীর্ণ। সর্বোপরি খৃস্টানদের প্রাণপুরুষ পল মহাশয় এবং খৃস্টান ব্যাখ্যাকার পণ্ডিতগণ তাওরাত সম্পর্কে অনেক অশালীন ও অশোভনীয় মন্তব্য করেছেন, যদিও তাঁরা তাকে ঈশ্বরের বাণী বলে বিশ্বাস করেন।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা সুনিশ্চিতরূপে জানতে পারছি যে, কুরআনের বিধান ও ব্যবস্থা দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিলের কিছু বিধান ও ব্যবস্থা রহিত হওয়া কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এরূপ রহিতকরণ, স্থগিতকরণ বা পরিবর্তন পূর্ববর্তী ভাববাদিগণের ব্যবস্থায় ঘটেছে বলে আমরা বাইবেলের আলোকে জানতে পারলাম। কুরআনের বিধান পালনের মাধ্যমে তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিধান রহিতকরণ কার্যকর হয়।
১. ৪. ৩. ২. একই ভাববাদীর ব্যবস্থায় রহিতকরণ
রহিতকরণের দ্বিতীয় প্রকার হলো, একই নবীর ব্যবস্থার মধ্যে একটি বিধান রহিত করে অন্য বিধান দেওয়া। এর কতিপয় উদাহরণ দেখুন:
১. জবাই বা বলিদানের নির্দেশ রহিত করা
আদিপুস্তকের ২২/১-১৪ শ্লোকে বলা হয়েছে, ঈশ্বর অব্রাহামকে নির্দেশ দেন ‘ইসহাক’কে বলিদান করতে। তাঁরা উভয়ে যখন এ নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত হলেন তখন নির্দেশ কার্যকর করার আগেই তিনি তা রহিত করেন।
২. যিহিষ্কেল ভাববাদীকে দেওয়া বিধান রহিত করা:
যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তকের ৪র্থ অধ্যায়ের ১০, ১২, ১৪ ও ১৫ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(১০) তোমার খাদ্য পরিমাণপূর্বক, অর্থাৎ দিন দিন বিংশতি তোলা করিয়া ভোজন করিতে হইবে। তুমি বিশেষ বিশেষ সময়ে তাহা ভোজন করিবে। ... (১২) আর ঐ খাদ্যদ্রব্য যবের পিষ্টকের ন্যায় করিয়া ভোজন করিবে, এবং তাহাদের দৃষ্টিতে মনুষ্যের বিষ্ঠা দিয়া তাহা পাক করিবে। ... (১৪) তখন আমি কহিলাম, আহা, প্রভু সদাপ্রভু, দেখ, আমার প্রাণ অশুচি হয় নাই; আমি বাল্যকাল অবধি অদ্য পর্যন্ত স্বয়ং-মৃত কিম্বা পশু দ্বারা বিদীর্ণ কিছুই খাই নাই, ঘৃণার্হ মাংস কখনও আমার মুখে প্রবিষ্ট হয় নাই। (১৫) তখন তিনি আমাকে কহিলেন, দেখ, আমি মনুষ্যের বিষ্ঠার পরিবর্তে তোমাকে গোময় দিলাম, তুমি তাহা দিয়া আপন রুটি পাক করিবে।’’
এখানে ঈশ্বর প্রথমে মনুষ্যের বিষ্ঠা দিয়ে রুটি পাক করতে আজ্ঞা করেন। যিহিষ্কেল ভাববাদী অপারগতা প্রকাশ করলে পালন করার পূর্বেই তা রহিত করে মনুষ্যের বিষ্ঠার পরিবর্তে গরুর গোবর দিয়ে রুটি পাক করে খেতে নির্দেশ দিলেন।
৩. নির্ধারিত বেদিতে উৎসর্গের নির্দেশ রহিত করা:
লেবীয় পুস্তকের ১৭/১-৬ শ্লোকে মহান আল্লাহ মূসা আলাইহিস সালাম ও ইস্রায়েল-সন্তানদেরকে নির্দেশ দেন যে, সকল প্রকার জবাই-কুরবানী হবে ‘‘সমাগম-তাম্বুর দ্বারে’ নির্ধারিত স্থানে। যে ব্যক্তি অন্য কোনো স্থানে জবাই করবে তাকে উচ্ছিন্ন অর্থাৎ হত্যা করতে হবে।
এরপর দ্বিতীয় বিবরণের এ নির্দেশ রহিত করা হয় এবং তাদেরকে যে কোনো স্থানে জবাই-কুরবানী করার অনুমতি প্রদান করা হয়।
হর্ন তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে উপর্যুক্ত শ্লোকগুলি উদ্ধৃত করার পর বলেন: এ দুই স্থানের মধ্যে বাহ্যত বৈপরীত্য রয়েছে। কিন্তু যদি এ কথা লক্ষ্য করা হয় যে, মোশির ব্যবস্থা অপরীবর্তনীয় ও স্থির ছিল না; বরং ইস্রায়েল সন্তানগণের অবস্থা অনুসারে তার মধ্যে সংযোজন ও বিয়োজন করা হতো, তবে এই বৈপরীত্যের সমাধান দেওয়া খুবই সহজ হবে। মিসর ত্যাগের ৪০তম বৎসরে প্যালেস্টাইনে প্রবেশের পূর্বে মোশি পূর্বোক্ত বিধানটি, অর্থাৎ লেবীয় পুস্তকের বিধানটি সুস্পষ্টরূপে রহিত করেন। তিনি তাঁদেরকে নির্দেশ দেন যে, তাঁরা যেখানে ইচ্ছা গোরু, মেষ ইত্যাদি বধ করতে পারবে এবং ভক্ষণ করতে পারবে।
এভাবে তিনি মূসার আলাইহিস সালাম ব্যবস্থায় নাসখ বা রহিত হওয়ার বিষয়টি বিদ্যমান থাকার কথা স্বীকার করলেন। তিনি আরো স্বীকার করলেন যে, মোশির ব্যবস্থার মধ্যে ইস্রায়েল সন্তানগণের অবস্থা অনুসারে সংযোজন ও বিয়োজন করা হতো। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণের অবস্থা দেখলে বড় অবাক লাগে! এরূপ সংযোজন ও বিয়োজন যদি অন্য কোনো ব্যবস্থা বা ধর্মে ঘটে তবে তাঁরা তা খুব আপত্তিকর বলে মনে করেন এবং দাবি করেন যে, এইরূপ সংযোজন ও বিয়োজন দ্বারা ঈশ্বরের অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। আর প্রকৃত সত্য হলো, মুসলিমগণ যে ‘নাসখ’ বা রহিতকরণে বিশ্বাস করেন তা মহান আল্লাহর একক অধিকার ও তাঁর মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ যে ‘‘প্রকাশ পাওয়া’’ মতবাদে বিশ্বাস করেন তার দ্বারা ঈশ্বরের অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ এবং সাধু পল বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে এরূপ আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘‘প্রকাশ পাওয়া’’, অর্থাৎ প্রথম বিধানের ফলাফল জানার পরে মত পাল্টানোর কথা উল্লেখ করেছেন।
৪- লেবীয়দের সেবাদানের বয়সসীমার পরিবর্তন
গণনাপুস্তকের ৪র্থ অধ্যায়ের ৩, ২৩, ৩০, ৩৫, ৩৯, ৪৩, ও ৪৬ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমাগম তাম্বুর (tabernacle of the congregation) কর্মচারীর বয়স কোনো মতেই ত্রিশের কম এবং পঞ্চাশের বেশি হবে না (ত্রিশ বৎসর বয়স্ক অবধি পঞ্চাশ বৎসর পর্যন্ত)।
পক্ষান্তরে এই পুস্তকেরই ৮ম অধ্যায়ের ২৪ ও ২৫ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, তাদের বয়স ২৫ বৎসরের কম হবে না এবং ৫০ বৎসরের বেশি হবে না ( লেবীয়দের বিষয়ে এই ব্যবস্থা: পঁচিশ বৎসর ও ততোধিক বয়স্ক লেবীয়েরা সমাগম তাবুতে সেবাকর্ম করিবার জন্য শ্রেণীভুক্ত হইবে..)।
একই পুস্তকে দু প্রকারের বিধান। এখানে ইয়াহূদী-খৃস্টানগণকে দুটি বিষয়ের একটি স্বীকার করতেই হবে। হয় একে ভুল ও বৈপরীত্য মেনে নিয়ে স্বীকার করতে হবে যে, বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে। অথবা একে ‘‘নাসখ’’ বা রহিতকরণ বলে মেনে নিয়ে স্বীকার করতে হবে যে, একই ভাববাদীর ব্যবস্থায় বিবর্তন ও রহিতকরণ ঘটতে পারে।
৫- হিষ্কিয়ের বয়স বিষয়ক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ও রহিতকরণ
২ রাজাবলির ২০/১-৬ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ যিশাইয় ভাববাদীকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যিহূদা রাজ্যের রাজা হিষ্কিয়কে তার আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দিবেন, যেন রাজা তার পরিবারকে মৃত্যুকালীন ওসীয়ত করতে পারেন। আয়ু শেষ হওয়ার খবর পেয়ে রাজা হিষ্কিয় অনেক কাঁদাকাটি ও প্রার্থনা করেন। এতে আল্লাহ তার আয়ুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টে তার আয়ু বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন এবং যিশাইয় ভাববাদী ফিরে নগরের মধ্যস্থানে পৌঁছানোর আগেই তাকে নির্দেশ দেন বিষয়টি রাজাকে জানিয়ে দিয়ে তিনি যেন রাজাকে বলেন, আল্লাহ বলেছেন: ‘‘আমি তোমার প্রার্থনা শুনিলাম, আমি তোমার নেত্রজল দেখিলাম; দেখ, আমি তোমাকে সুস্থ করিব; তৃতীয় দিবসে তুমি সদাপ্রভুর গৃহে উঠিবে। আর আমি তোমার আয়ূ পনের বৎসর বৃদ্ধি করিব...।’’
এখানে ঈশ্বর যিশাইয় ভাববাদীর মুখে হিষ্কিয় রাজাকে নির্দেশ দিলেন, তুমি আপন বাটীর ব্যবস্থা কর; কারণ তুমি মারা যাচ্ছ। এরপর যিশাইয় ভাববাদী এই আজ্ঞা যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে তাঁর নিজ বাড়ি পৌঁছানোর আগেই তিনি তাঁর এই আজ্ঞা রহিত করলেন এবং হিষ্কিয়ের আয়ু পনের বৎসর বৃদ্ধি করলেন। রহিত বিধান ও রহিতকারী নতুন বিধান উভয়ই একই ভাববাদীর দ্বারা প্রচার করা হলো।
৬- যীশুর ধর্ম শুধু ইস্রায়েলীদের জন্য না সকলের জন্য
মথিলিখিত সুসমাচারের দশম অধ্যায়ে বলা হয়েছে: ‘‘(৫) এই বারো জনকে যীশু প্রেরণ করিলেন, আর তাঁহাদিগকে এই আদেশ দিলেন- (৬) তোমরা পরজাতিগণের পথে যাইও না, এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না; বরং ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও।’’
মথিলিখিত সুসমাচারের ১৫ অধ্যায়ের ২৪ শ্লোকে যীশু তাঁর নিজের বিষয়ে বলেছেন: ‘‘ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই।’’
এ সকল শ্লোকের নির্দেশনা অনুসারে যীশু খৃস্টের মিশন ছিল শুধু ইস্রায়েল সন্তানদের জন্যই, আর কারো জন্য নয়। কিন্তু মার্কের সুসমাচারের ১৬ অধ্যায়ের ১৫ শ্লোকে যীশুর নিম্নোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে: ‘‘তোমরা সমুদয় জগতে যাও, সমস্ত সৃষ্টির নিকটে সুসমাচার প্রচার কর।’’
এখানে হয় বৈপরীত্য, নয় রহিতকরণ স্বীকার করতে হবে। খৃস্টান প্রচারকগণ দাবি করেন যে, দ্বিতীয় বক্তব্যটি যীশুর ধর্মের সার্বজনীনতা প্রমাণ করে। তাহলে মানতে হবে যে, প্রথম নির্দেশটি ‘নাসখ’ বা রহিত হয়ে গিয়েছে। প্রথমে যীশু তার ধর্মকে শুধু ইস্রায়েল-সন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট করলেন এবং অন্য কাউকে দীক্ষা দিতে নিষেধ করলেন। এরপর এ নির্দেশ রহিত করে সবাইকে দীক্ষা দিতে নির্দেশ দিলেন।
এখন তাঁরা যদি আল্লাহর নির্দেশের পরিবর্তন ও রহিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তাহলে আমাদের দাবি প্রমাণিত হলো। আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হলাম যে, তাদের ধর্মগ্রন্থগুলির অনেক বিধান রহিত হয়েছে এবং তাদের ধর্মের বিধান বা ধর্মগ্রন্থের বিধান রহিত হওয়া কোনো অবাস্তব বা অসম্ভব বিষয় নয়। আর তারা যদি ‘‘রহিতকরণ’’ বা পরিবর্তন মানতে রাজি না হন তাহলে তাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে, তাদের ইঞ্জিল বা সুসামাচারগুলির মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে এবং বিকৃতির কারণে বৈপরীত্য বা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য এতে স্থান পেয়েছে। এখানে প্রকৃত সত্যকথা হলো, মার্কের সুসমাচারের এ বক্তব্যটি ঈসা আলাইহিস সালাম-এর নয়।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পেরেছি যে, উভয় প্রকারের ‘রহিতকরণ’ই পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান। এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। ঈশ্বরের ধর্মীয় বিধান বা ব্যবস্থায় কোনোরূপ পরিবর্তন, বিলোপ বা রহিতকরণ সম্ভব নয় বলে ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ যে দাবি করেন তা যে একেবারে ভিত্তিহীন, বাতিল ও অসত্য দাবি তা উপরের আলোচনা থেকে প্রকাশ পেয়েছে।
আর পরিবর্তন বা রহিতকরণ-এর বিদ্যমানতাই তো বিবেক ও যুক্তির দাবি। পরিবর্তন ছাড়া কিভাবে সম্ভব? স্থান ও কাল ও পাত্রে পরিবর্তনের কারণে মানুষের প্রয়োজনের পরিবর্তন হয়। কোনো কোনো বিধান বা আজ্ঞা বিশেষ সময়ে বিশেষ মানুষদের পক্ষে পালন করা সম্ভব এবং অন্য সময়ে অন্য মানুষদের জন্য অসম্ভব হতে পারে। কোনো কোনো আজ্ঞা কিছু মানুষের জন্য পালনযোগ্য ও অন্যদের জন্য পালনের অযোগ্য হতে পারে। মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কিসে তা মানুষ অনেক সময় পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না, বরং মহান আল্লাহই তা ভাল জানেন।
ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ আল্লাহর বিধানের নাসখ, রহিতকরণ বা পরিবর্তন অসম্ভব বলে যে দাবি করেন তা তাদের ধর্মগ্রন্থের আলোকেই ভিত্তিহীন ও সত্যের বিপরীত বলে আমরা সহজেই বুঝতে পারছি।
দ্বিতীয় অধ্যায়:
ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
এ অধ্যায়ে একটি ভূমিকা ও তিনটি পরিচ্ছেদ রয়েছে:
ভূমিকা : কতিপয় প্রয়োজনীয় মূলনীতি ও তথ্য
প্রথম পরিচ্ছেদ : বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : যীশুখৃস্টের বক্তব্য দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
তৃতীয় পরিচ্ছেদ : যীশুর ঈশ্বরত্বের প্রমাণাদি খণ্ডন
ভূমিকা:
কতিপয় প্রয়োজনীয় মূলনীতি ও তথ্য
মানবীয় জ্ঞান, বিবেক ও বাইবেলের আলোকে ত্রিত্ববাদ আলোচনার পূর্বে ভুমিকায় কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছি। এ বিষয়গুলি পাঠককে পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলির আলোচনা হৃদয়ঙ্গম করতে সাহায্য করবে।
১ম বিষয়: পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলি বারংবার ঘোষণা করছে যে, আল্লাহ বা ঈশ্বর এক, একক, অনাদি, অনন্ত, চিরন্তন, স্ত্রী-সন্তানগ্রহণ থেকে পবিত্র, অমরণশীল, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করেন। কোনো কিছুই তাঁর সাথে তুলনীয় নয়, তাঁর সত্ত্বাতেও নয় এবং তাঁর গুণাবলিতেও নয়। তিনি দেহ ও আকৃতি থেকে পবিত্র। এই বিষয়গুলি পুরাতন নিয়মের পুস্তকাবলিতে এত বেশি বলা হয়েছে এবং এত বেশি প্রসিদ্ধ যে এগুলির জন্য উদ্ধৃতি বা সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করা নিষ্প্রয়োজন।
২য় বিষয়: আল্লাহ বা ঈশ্বর ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা বা পূজা করা নিষিদ্ধ। তোরাহ বা পুরাতন নিয়মের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়ে বারংবার বলা হয়েছে। যেমন, যাত্রাপুস্তকের ২০/৩, ৪, ৫, ২৩; ৩৪/১৪, ১৭; দ্বিতীয় বিবরণ ১৩/১-১১, ১৭/২-৭ ইত্যাদি।
তাওরাতে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত, উপাসনা, পূজা বা আরাধনার কথা প্রচার করে বা এরূপ করতে আহবান করে তবে তাকে হত্যা করতে হবে, তিনি যদি মহা মহা অলৌকিক চিহ্ন বা মুজিযার অধিকারী নবীও হন। অনুরূপভাবে তাওরাতে সুস্পষ্টত বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত, উপাসনা বা পূজা করে বা এরূপ করতে কাউকে উদ্বুদ্ধ করে বা অনুপ্রেরণা দেয় তবে তাকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। এরূপ ব্যক্তি নারী হোক আর পুরুষ হোক, আত্মীয় হোক, অনাত্মীয় হোক বা বন্ধু হোক সর্বাবস্থায় তাকে এভাবে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে হবে।
তৃতীয় বিষয়: তোরাহ-এর বিভিন্ন শ্লোক থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর কোনো তুলনীয় নেই এবং তিনি কোনো সৃষ্টির মত নন। দ্বিতীয় বিবরণের ৪র্থ অধ্যায়ের ১২ ও ১৫ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(১২) তখন অগ্নির মধ্য হইতে সদাপ্রভু তোমাদের কাছে কথা কহিলেন; তোমরা বাক্যের রব শুনিতেছিলে, কিন্তু কোনো মুর্তি দেখিতে পাইলে না, কেবল রব হইতেছিল। ... (১৫) যে দিন সদাপ্রভু হোরেবে অগ্নির মধ্য হইতে তোমাদের সহিত কথা কহিতেছিলেন, সেই দিন তোমরা কোন মুর্তি দেখ নাই; অতএব আপন আপন প্রাণের বিষয়ে অতিশয় সাবধান হও।’’
নতুন নিয়মের অনেক স্থানেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, পৃথিবীতে ঈশ্বরকে দেখা যায় না। যোহনলিখিত সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ের ১৮ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘ঈশ্বরকে কেহ কখনো দেখে নাই।’’
তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র ৬/১৬ শ্লোক: ‘‘যাঁহাকে মনুষ্যদের মধ্যে কেহ কখনও দেখিতে পায় নাই, দেখিতে পারেও না।’’
যোহনের প্রথম পত্র ৪/১২: ‘‘ঈশ্বরকে কেহ কখনও দেখে নাই।’’
এ সকল শ্লোক দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ঈশ্বরের কোনো তুলনা বা নমুনা নেই। সৃষ্টির কোনো কিছুই তার সাথে তুলনীয় নয়। তাকে পৃথিবীতে দেখা যায় না। যাকে দেখা যায় তিনি কখনোই ঈশ্বর হতে পারেন না, যদিও ঈশ্বরের বাক্যে, ভাববাদিগণের বাক্যে বা প্রেরিতগণের বাক্যে তাঁর বিষয়ে ‘ঈশ্বর’, ‘প্রভু’ বা অনুরূপ কোনো শব্দ ব্যবহার করা হয়। কাজেই কারো বিষয়ে শুধু ‘ঈশ্বর’ (God), সদাপ্রভু (Lord), উপাস্য (god) বা অনুরূপ কোনো শব্দের প্রয়োগ দেখেই ধোঁকাগ্রস্থ হয়ে তাঁকে ঈশ্বর বলে পূজা করা যায় না। কারণ জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক ও বাইবেলের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক প্রয়োগকে রূপক অর্থে গ্রহণ করা জরুরী।
বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে অগণিত স্থানে ফিরিশতা, ঈশ্বরের দূত, মূসা আলাইহিস সালাম, ভাববাদী, ইস্রায়েল-বংশীয় বিচারকর্তৃগণ, ভাল মানুষ, সাধারণ মানুষ, এমনকি শয়তানকে ‘‘ঈশ্বর’’ বা উপাস্য বলা হয়েছে। ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে যখন ঈশ্বর শব্দের প্রয়োগ করা হয় তখন এরূপ ব্যবহারের পিছনে নির্ধারিত কোনো কারণ বা সূত্র থাকে। মূল বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করলে শ্রোতা বা পাঠক সে সূত্র অনুধাবন করতে পারেন। কাজেই ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে ‘‘ঈশ্বর’’ বা অনুরূপ শব্দের প্রয়োগ দেখে বাইবেলের দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা ও মানবীয় জ্ঞান-বিবেক বিসর্জন দিয়ে তাকে প্রকৃত ঈশ্বর, ঈশ্বরের পুত্র, ঈশ্বরের অংশ বা উপাস্য বলে দাবি করা কোনো বিবেকবান সজ্ঞান মানুষের জন্য সম্ভব নয়।
চতুর্থ বিষয়: কোনো নবী বা ভাববাদী কখনো ‘‘ত্রিত্ববাদ’’ প্রচার করেন নি, ত্রিত্ববাদের পক্ষে কিছু বলেন নি এবং কোনো আসমানী গ্রন্থে এ বিষয়ক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় নি। তাওরাত বা মোশির ব্যবস্থা ও ধর্মবিশ্বাসে এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে যে ত্রিতত্ত্ববাদের অস্তিত্ব নেই তা সকলেই জানেন। এজন্য কোনো পৃথক প্রমাণ পেশের প্রয়োজন নেই। যে কেউ প্রচলিত তোরাহ পাঠ করলেই দেখবেন যে, এর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে, অস্পষ্টভাবে, ইশারা-ইঙ্গিতে বা কোনোভাবে ত্রিত্ববাদের কথা উল্লেখ করা হয় নি। মূসা আলাইহিস সালাম-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ইয়াহূদী আলিম, পণ্ডিত বা ধর্মগুরু ত্রিত্ববাদী বিশ্বাস স্বীকার করতে বা এরূপ বিশ্বাসের কোনো প্রমাণ তাদের ধর্মগ্রন্থে আছে বলে কখনোই স্বীকার করবেন না।
যদি ত্রিত্ববাদ সত্য হতো তাহলে অবশ্যই মূসা আলাইহিস সালাম থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত ইস্রায়েলীয় ভাববাদীগণ সকলেই এ বিষয়টি সুস্পষ্ট ও বোধগম্যভাবে ব্যাখ্যা করতেন এবং ঈশ্বরের এ গুণটি সকলের বোধগম্য করে ব্যাখ্যা করাই তাদের মূল দায়িত্ব হতো। কারণ তাদের দায়িত্ব ছিল মূসার শরীয়তের বা ব্যবস্থার বিশ্বাস ও কর্ম উভয় দিকের সকল নির্দেশ পালন করা।
ত্রিত্ববাদীগণ বিশ্বাস করেন যে, ত্রিত্বে বিশ্বাস করা, অর্থাৎ পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা এ তিনিটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন ও পৃথক তিনটি সত্ত্বার সমন্বয়ে ঈশ্বরের সত্ত্বা গঠিত এবং এ তিনটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, পৃথক ও পরিপূর্ণ ঈশ্বর মিলে এক ঈশ্বর- এ কথা বিশ্বাস করাই মুক্তির একমাত্র পথ। কোনো মানুষ, এমনকি কোনো ভাববাদীও ত্রিত্বে বিশ্বাস না করলে তিনি পরকালে মুক্তি পাবেন না বা ‘‘ঈশ্বরের রাজ্যে’’ প্রবেশ করতে পারবেন না।
বড় অবাক লাগে যে, ঈশ্বরের যে গুণটি বিশ্বাস না করলে ভাববাদী ও অ-ভাববাদী কোনো মানুষেরই মুক্তি নেই, সে গুণটির কথা মোশি থেকে যীশু পর্যন্ত একজন ভাববাদীও স্পষ্টভাবে সকলের জন্য বোধগম্য করে ব্যাখ্যা করলেন না। কেউই বিষয়টির আলোচনা করে এ বিষয়ক সকল সন্দেহ নিরসন করলেন না। খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পলের মতে যে বিষয়গুলি একেবারেই গুরুত্বহীন, দূর্বল ও অপূর্ণ, সেই বিষয়গুলি মোশি ও সকল ভাববাদী কত বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করলেন, একবার বলে আবার বললেন, বারংবার বিভিন্ন ভাবে বুঝালেন, সেগুলি মেনে চলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব দিলেন, সেগুলি অমান্যকারীকে মৃত্যুদন্ড প্রদানের বিধান দিলেন.... অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুক্তির উৎসটির বিষয়ে কিছুই বললেন না!!
এর চেয়েও অবাক বিষয় হলো, স্বয়ং যীশু তাঁর ঊর্ধ্বারোহণ পর্যন্ত কখনোই এই ‘বিশ্বাস’টিকে পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে বললেন না। তিনি কখনোই বললেন না যে, ‘‘ঈশ্বর তিনটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ও সত্তা (three hypostases or three concrete realities): পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। তন্মধ্যে পুত্র সত্তা আমার দেহের সাথে অমুকভাবে সম্পর্কিত ও সম্মিলিত হয়েছে। অথবা পুত্র সত্তাটি আমার দেহের সাথে এমন একভাবে সম্পর্কিত ও সম্মিলিত হয়েছে যার নিগূঢ় তত্ত্ব তোমাদের জ্ঞানের ধারণ ক্ষমতার বাইরে। কাজেই তোমরা জেনে রাখ যে, উক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে আমিই ঈশ্বর।’’ অথবা এই অর্থে এমন কোনো কথা বললেন না যাতে অন্তত এ বিশ্বাসটি স্পষ্টরূপে জানা যেত। ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণ ত্রিত্বের পক্ষের তাঁর কোনো স্পষ্ট বাক্য পেশ করতে পারেন না। শুধু কয়েকটি দ্ব্যর্থবোধক অস্পষ্ট বাক্যই তাঁদের সম্বল।
‘মীযানুল হক্ক’ (Scale of Truth) গ্রন্থের প্রণেতা ড. ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) তাঁর ‘মিফতাহুল আসরার’ (রহস্যের চাবি) নামক পুস্তকে বলেন: ‘‘আপনি যদি বলেন যে, তাহলে কেন যীশু তাঁর ঈশ্বত্বের কথা আরো পরিস্কারভাবে বললেন না? তিনি কেন স্পষ্টভাবে ও এককথায় বললেন না যে, ‘আমিই ঈশ্বর’?’’...
এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: ‘‘কারণ, তাঁর পুনরুত্থান ও ঊর্ধ্বারোহণের পূর্বে কেউ এ সম্পর্ক এবং একত্ববাদ বুঝতে সক্ষম ছিলেন না। তিনি যদি এ কথা বলতেন তবে তাঁরা বুঝতেন যে, তিনি তাঁর মানবীয় দেহ অনুসারে ঈশ্বর। আর এই কথাটি নিশ্চয়ই বাতিল। এই কথাটি হৃদয়ঙ্গম করাও সে সকল বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত যেগুলির বিষয়ে তিনি বলেন: ‘‘তোমাদিগকে বলিবার আমার আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু তোমরা এখন সে সকল সহ্য করিতে পার না। পরন্তু তিনি, সত্যের আত্মা (the Spirit of truth : আল-আমীন, আস-সাদিক) যখন আসিবেন, তখন পথ দেখাইয়া তোমাদিগকে সমস্ত সত্যে লইয়া যাইবেন; কারণ তিনি আপনা হইতে কিছু বলিবেন না, কিন্তু যাহা যাহা শুনেন তাহাই বলিবেন, এবং আগামী ঘটনাও তোমাদিগকে জানাইবেন।’’
এরপর তিনি বলেন: ‘‘ইয়াহূদী ধর্মের নেতৃবৃন্দ অনেকবারই তাঁকে গ্রেফতার করতে ও প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে চেয়েছেন, অথচ তিনি তাঁর ঈশ্বরত্বের কথা তাঁদের সামনে একান্তই ধাঁধার আকারে পেশ করেছিলেন।’’
পাদরী সাহেবের বক্তব্য থেকে জানা গেল যে, দুইটি কারণে যীশু তাঁর ঈশ্বরত্বের কথা স্পষ্ট করে জানান নি:
প্রথমত, তাঁর ঊর্ধ্বারোহণের পূর্বে কেউ তা বুঝতে সক্ষম ছিল না।
দ্বিতীয়ত, ইয়াহূদীদের ভয়।
দুইটি ওজরই অত্যন্ত দুর্বল ও একান্তই অবাস্তব ব্যাখ্যা।
প্রথম বিষয়টি একেবারেই বাতিল। কারণ এক্ষেত্রে তাঁর এতটুকু কথাই যথেষ্ট ছিল যে, ‘‘আমার দেহের সাথে ঈশ্বরের দ্বিতীয় সত্ত্বা (পুত্রের সত্তার) সম্মিলন ও সংমিশ্রণের বিষয়টি বুঝা তোমাদের সাধ্যের বাইরে। কাজেই তোমরা এ বিষয়ে গবেষণা বাদ দেও। তোমরা শুধু বিশ্বাস কর যে, আমি এ মানবীয় দেহের হিসাবে ঈশ্বর নই; বরং উপর্যুক্ত সম্মিলনের ও সংমিশ্রণের ভিত্তিতে আমি ঈশ্বর।’’
এছাড়া তাঁর সাথে ঈশ্বরত্বের সম্পর্ক বুঝার অক্ষমতা তাঁর ঊর্ধ্বারোহণের পরে দূরীভূত হয়েছে বলে যে দাবি তিনি করেছেন তা একেবারেই ভিত্তিহীন। এ বিষয়টি বুঝার অক্ষমতা এর পরেও একইভাবে বিদ্যমান। আজ পর্যন্ত একজন খৃস্টান পণ্ডিতও এ সম্পর্ক ও একত্ববাদের সাথে এর সম্পর্ক সঠিকভাবে বুঝতে পারেন নি। যে যা বলেছেন সবই আন্দাযে ঢিল ছুঁড়েছেন। প্রত্যেকের কথার মধ্যেই কঠিন সমস্যা ও বিভ্রান্তি রয়েছে। সর্বদা তাঁরা একে অপরকে বিভ্রান্ত বলে অভিযোগ করেছেন। এজন্যই প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণ এ সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন। মি. ফান্ডারও তাঁর পুস্তকাদিতে বিভিন্ন স্থানে স্বীকার করেছেন যে, এ বিষয়টি একটি গূঢ় রহস্য যা জ্ঞান দ্বারা বুঝা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় ওযরটিও একইভাবে বাতিল। কেন যীশু খৃস্ট ধাঁধার আকারে তার ঈশ্বরত্বের কথা বলবেন? কেন তিনি ইয়াহূদীদেরকে ভয় পাবেন? খৃস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে তাঁর আগমনের তো একটিই উদ্দেশ্য, তা হলো ক্রুশে চড়ে প্রাণ দিয়ে সৃষ্টির পাপ মোচন। ইয়াহূদীদের হাতে ক্রুশবিদ্ধ হতেই তো তিনি এসেছিলেন। তিনি নিশ্চিতরূপে জানতেন যে, ইয়াহূদীরা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করবে। কখন তাঁরা তাঁকে ক্রশবিদ্ধ করবে তাও তিনি জানতেন। কাজেই তিনি সঠিক বিশ্বাসটি ব্যাখ্যা করতে ভয় পাবেন কেন?
বড় অবাক কান্ড! আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্ঠা, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টদের থেকে ভয় পাচ্ছেন! তাঁর সৃষ্টির মধ্যে একটি দুর্বল জাতিকে তিনি এত ভয় পাচ্ছেন যে, ভয়ের চোটে সেই কথাটিও বলতে পারছেন না, যে কথাটি বিশ্বাস করার উপরে মুক্তি ও পূর্ণতা নির্ভর করছে। অথচ সেই ঈশ্বরেরই সৃষ্ট ভাববাদিগণ, যেমন যিরমিয়, যিশাইয়, যোহন, এরা তাঁদের সামনে সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন না। তাঁদেরকে কঠিন ভাবে যন্ত্রণা ও শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে। কাউকে আবার হত্যাও করা হচ্ছে! কিন্তু তাঁরা সত্য প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন না।
এর চেয়েও অবাক বিষয় হলো, খৃস্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ বিশ্বাসটি সঠিকভাবে বলার ক্ষেত্রে ইয়াহূদীদেরকে ভয় পাচ্ছেন। অথচ সৎকার্যে আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করার বিষয়ে তাঁদেরকে কঠোরতার সাথে সত্য কথা বললেন। এমনকি সে বিষয়ে তাঁদেরকে গালাগালি করলেন। তিনি ইয়াহূদী অধ্যাপক ও ফরীশীগণকে মুখোমুখি সম্বোধন করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাদের গালি দিয়েছেন ও তাদের অনাচার মানুষদের সামনে প্রকাশ করে দেন। এমনকি তাঁদের একজন তাঁকে অভিযোগ করে বলেন যে, ‘‘হে গুরু, এ কথা বলিয়া আপনি আমাদেরও অপমান করিতেছেন।’’ মথি ২৩/১৩-৩৭ ও লূক ১১/৩৭-৫৪-এ সকল বিষয় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরেও কিভাবে মনে করা যায় যে, খৃস্ট ইয়াহূদীদের ভয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এ বিশ্বাসটি স্পষ্ট করে বলেন নি? কখনোই তা তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে না, কখনোই না।
প্রথম পরিচ্ছেদ:
বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণাদি দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
খৃস্টানগণ বিশ্বাস করেন যে, একত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদ উভয়ই প্রকৃত, বাস্তব ও আক্ষরিক সত্য, কোনোটিই রূপক বা আপেক্ষিক নয়। আর মানবীয় বুদ্ধি, বিবেক, যুক্তি ও বিজ্ঞান কখনোই প্রকৃত ‘একত্ব’ ও প্রকৃত ‘বহুত্ব’কে একত্রিত বলে স্বীকার করতে পারে না। কোনো কিছু প্রকৃত ও আক্ষরিক অর্থে ‘‘তিন’’ বলে প্রমাণিত হওয়ার অর্থ তা প্রকৃত ও আক্ষরিকভাবে ‘‘একাধিক’’ বলে প্রমাণিত। আর যা প্রকৃত ‘‘একাধিক’’ তা কখনোই প্রকৃত ‘‘এক’’ হতে পারে না। একই বিষয়ে প্রকৃত ‘একাধিক্য’-এর সাথে প্রকৃত ‘একত্ব’ একত্রিত হওয়ার দাবি করলে ‘দুইটি প্রকৃত সাংঘষিক বিষয়’ একত্রিত হওয়ার দাবি করা হবে। যা একেবারেরই অসম্ভব ও অবান্তর।
কাজেই যিনি ত্রিত্বে বিশ্বাস করেন, অর্থাৎ ঈশ্বরকে প্রকৃত অর্থেই সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ তিনটি ব্যক্তি বা সত্ত্বা (three persons) বলে বিশ্বাস করেন, তিনি কখনোই প্রকৃত একত্বে- অর্থাৎ ঈশ্বর প্রকৃতই এক ব্যক্তি বা সত্ত্বা বলে বিশ্বাস করতে পারেন না।
যা প্রকৃত ‘এক’ তার পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ এক-তৃতীয়াংশ থাকতে পারে না। কিন্তু ‘তিন’-এর একটি পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে, তা হলো ‘এক’। তিন হলো ‘তিনটি এক’-এর সমষ্টি। ‘প্রকৃত এক’ কখনো একাধিক ‘এক’ এর সমষ্টি হতে পারে না।
প্রকৃত ‘এক’ তিন-এর একটি অংশ। যদি একই বস্তু একই সময়ে ‘তিন’ ও ‘এক’ হয় তবে বুঝতে হবে যে, বস্তুটি একই সময়ে নিজেই পূর্ণ এবং নিজেই নিজের অংশ। একত্ব ও ত্রিত্বের একত্রিত হওয়ার অর্থ হলো ‘এক’ নিজেই নিজের এক-তৃতীয়াংশ এবং তিন ‘এক’-এর এক তৃতীয়াংশ। আবার তিন নিজেই নিজের তিনগুণ এবং এক নিজেই নিজের তিনগুণ। মানবীয় বুদ্ধি-বিবেক এরূপ চিন্তাকে পাগলের প্রলাপ বলে গণ্য করবে।
এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে, মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘‘প্রকৃত ত্রিত্ব’’ কখনোই সম্ভব নয়। এজন্য যদি খৃস্টানগণের ধর্মগ্রন্থে আল্লাহর ত্রিত্ববোধক কোনো কথা পাওয়া যায় তাহলে তা এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যেন তা বাইবেলের অন্যান্য বক্তব্য ও মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
জর্জ সেল (George Sale) অষ্টাদশ শতকের একজন খৃস্টান পণ্ডিত। তিনি ইংরেজি ভাষায় কুরআন কারীমের অনুবাদ করেন ১৭৩৪ সালে প্রথম প্রকাশিত এবং ১৮৩৬ খৃস্টাব্দে পুনর্মুদ্রিত হয়। তিনি খৃস্টান প্রচারক ও পাদরিদেরকে মুসলিমদের বিষয়ে কিছু উপদেশ ও পরামর্শ দান করেন। এতে তিনি বলেন: ‘‘আপনারা মুসলমানদেরকে জ্ঞানবুদ্ধি-বিরোধী ধর্মীয় বিষয়গুলি শেখাবেন না। কারণ তারা এমন বোকা নয় যে, এ সকল জ্ঞান বিরোধী বিষয় আমরা তাদেরকে গেলাতে পারব। যেমন মুর্তি বা প্রতিকৃতির উপাসনা , প্রভুর নৈশভোজ (Eucharist/Holy Communion/ Lord's Supper) ইত্যাদি বিষয়। এ সকল বিষয় গ্রহণ করতে তাদের খুবই অসুবিধা হয়। যে সকল চার্চে বা ধর্মমতে এ ধরনের বিষয় রয়েছে সেগুলি কখনো মুসলমানদেরকে আকর্ষণ করতে পারে না।’’
এখানে এ খৃস্টান পণ্ডিত স্বীকার করছেন যে, প্রতিকৃতি উপাসনা এবং প্রভুর নৈশভোজ জাতীয় অনুষ্ঠানগুলি ‘জ্ঞান বিরোধী’। প্রকৃত সত্য কথা হলো, এই সকল বিষয় যারা বিশ্বাস করেন তারা নিঃসন্দেহে একত্ববাদের ছায়া থেকে বঞ্চিত এবং বহু-ঈশ্বরবাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত। মহিমাময় আল্লাহ তাঁদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। প্রকৃত সত্য কথা হলো, পৃথিবীতে এত বেশি অবান্তর, অবাস্তব ও বুদ্ধিবিবেক বিরোধী ধর্ম বিশ্বাস আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁরা ধর্মবিশ্বাস হিসেবে ও তাঁর প্রমাণে যে সকল কথা বলেন এগুলি বুদ্ধিবৃত্তিক অসচ্ছত ও মানবীয় জ্ঞানের সার্থে সাংঘর্ষিকতা যে কোনো বিবেকবান মানুষের কাছে সুস্পষ্ট।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:
যীশুর বক্তব্য দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন
প্রথম বাক্য: যোহনলিখিত সুসমাচারের ১৭ অধ্যায়ের ৩ শ্লোকে যীশুখৃস্ট ঈশ্বরকে সম্বোধন করে বলেছেন: ‘‘আর ইহাই অনন্ত জীবন যে, তাহারা তোমাকে, একমাত্র সত্যময় ঈশ্বরকে, এবং তুমি যাঁহাকে পাঠাইয়াছ, তাঁহাকে, যীশু খ্রীষ্টকে, জানিতে পায়। (And this is life eternal, that they might know thee the only true God, and Jesus Christ, whom thou hast sent.)’’
এখানে যীশু অনন্ত জীবন কী তা অতি সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, অনন্ত জীবন হলো আল্লাহকে একমাত্র সত্য ঈশ্বর বা উপাস্য বলে জানা এবং যীশুখৃস্টকে তাঁর প্রেরিত (রাসূল) বলে জানা।
তিনি বলেন নি যে, ‘ইহাই অনন্ত জীবন যে, তাহারা জানিবে তোমার সত্ত্বা তিনটি সম্পূর্ণ পৃথক সত্ত্বার সমন্বয় এবং যীশু মনুষ্য ও ঈশ্বর, অথবা যীশু মাংশে প্রকাশিত ঈশ্বর (God manifested in the flesh/ God in the flesh/ God incarnate)।’
যীশুর এ কথা বলেছিলেন ঈশ্বরকে সম্বোধন করে প্রার্থনার মধ্যে। কাজেই ইয়াহূদীদের ভয়ে প্রকৃত সত্য এড়িয়ে গিয়েছিলেন বলে চিন্তা করার কোনো সুযোগ এখানে নেই। যদি সত্যই ‘ঈশ্বরের ত্রিত্বে’ ও ‘যীশুর ঈশ্বরত্বে’ বিশ্বাসের’ উপর অনন্ত জীবনের ভিত্তি হতো তবে নিশ্চয়ই তিনি এখানে তা উল্লেখ করতেন। তিনি তা জানান নি, বরং জানিয়েছেন যে, ‘ঈশ্বরের প্রকৃত (true) একত্বে’ ও ‘যীশুর প্রেরিতত্বে’ বিশ্বাসই অনন্ত জীবন। এথেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, এর বিপরীত কোনো বিশ্বাস পোষণ করা অনন্ত ধ্বংস বা অনন্ত মৃত্যু। কাজেই ঈশ্বরের একত্বের বিপরতীতে ঈশ্বরের ত্রিত্বে বিশ্বাস করা এবং যীশুর প্রেরিতত্বের বিপরীতে যীশুর ঈশ্বরত্বে বিশ্বাস করা অনন্ত ধ্বংস ও অনন্ত মৃত্যু। এখানে যীশু নিজেকে প্রেরিত ও আল্লাহকে প্রেরণকারী বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। যীশুর প্রেরিত হওয়া তাঁর ঈশ্বর হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। প্রেরিত ও প্রেরণকারী কখনোই এক হতে পারেন না; তারা অবশ্যই পৃথক। নইলে এ কথার কোনো অর্থ থাকে না।
দ্বিতীয় বাক্য: মার্কলিখিত সুসমাচারের ১২/২৮-৩৪: ‘‘(২৮) আর অধ্যাপকদের এক জন নিকটে আসিয়া তাঁহাদিগকে তর্ক বিতর্ক করিতে শুনিয়া, এবং যীশু তাঁহাদিগকে বিলক্ষণ উত্তর দিয়াছেন জানিয়া, তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, সকল আজ্ঞার মধ্যে কোন্টি প্রথম? (২৯) যীশু উত্তর করিলেন, প্রথমটি এই, ‘হে ইস্রায়েল, শুন; আমাদের ঈশ্বর প্রভু একই প্রভু; (৩০) আর তুমি তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ, তোমার সমস্ত মন ও তোমার সমস্ত শক্তি দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে। (৩১) দ্বিতীয়টি এই, ‘তোমার প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে। এই দুই আজ্ঞা হইতে বড় আর কোন আজ্ঞা নাই। (৩২) অধ্যাপক তাঁহাকে কহিল, বেশ, গুরু, আপনি সত্য বলিয়াছেন যে, তিনি এক, এবং তিনি ব্যতীত অন্য নাই; (৩৩) আর সমস্ত অন্তঃকরণ, সমস্ত বুদ্ধি ও সমস্ত শক্তি দিয়া তাঁহাকে প্রেম করা এবং প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করা সমস্ত হোম ও বলিদান হইতে শ্রেষ্ঠ। (৩৪) তখন সে বুদ্ধিপূর্বক উত্তর দিয়াছে দেখিয়া যীশু তাহাকে কহিলেন, ঈশ্বরের রাজ্য হইতে তুমি দূরবর্তী নও।’’
মথিলিখিত সুসমাচারের ২২ অধ্যায়ের ৩৪-৪০ শ্লোকেও যীশুর এ বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। এখানে তিনি উপর্যু&ক্ত দুটি আজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বলেন: ‘‘এই দুইটি আজ্ঞাতেই সমস্ত ব্যবস্থা এবং ভাববাদীগ্রন্থও ঝুলিতেছে।’’
এ থেকে একটি বাস্তব মহাসত্য জানা গেল। তা হলো, প্রথম যে আজ্ঞাটি তোরাহ ও সকল ভাববাদীর গ্রন্থেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যা ঈশ্বরের রাজ্যের নৈকট্যের মূল কারণ তা হলো একত্ববাদ, অর্থাৎ একথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহই একমাত্র ঈশ্বর বা উপাস্য এবং তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। যদি ত্রিত্ববাদের উপরে মুক্তি নির্ভর করতো, তবে নিশ্চয়ই তা তোরাহ ও অন্য সকল ভাববাদীর গ্রন্থে প্রথম আজ্ঞা হিসেবে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হতো। আর তাহলে যীশু বলতেন: ‘প্রথম আজ্ঞাটি এই, ‘ঈশ্বর প্রভু এক, যিনি তিনটি প্রকৃত ও সম্পূর্ণ পৃথক সত্তার অধিকারী এবং আমিই দ্বিতীয় ঈশ্বর বা ঈশ্বরের দ্বিতীয় ব্যক্তি ও ঈশ্বরের পুত্র।’
যেহেতু যীশু তা বলেন নি এবং পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকেই তা বলা হয় নি, সেহেতু আমরা সুনিশ্চিতরূপে জানতে পারছি যে, ঈশ্বরের প্রকৃত একত্বে বিশ্বাস করাই মুক্তির পথ। ঈশ্বরের ত্রিত্বে বিশ্বাস ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক, কাজেই তা মুক্তির পথ নয়, বরং ধ্বংসের পথ।
পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলি ঈশ্বরের প্রকৃত একত্বের নির্দেশনায় ভরপুর। নমুনা হিসেবে পাঠক নিম্নের কয়েকটি অনুচ্ছেদ দেখতে পারেন: দ্বিতীয় বিবরণ ৪/৩৫ ও ৩৯; ৬/৪-৫; যিশাইয় ৪৫/৫-৬; ৪৬/৯।
তৃতীয় বাক্য: মার্কলিখিত সুসমাচারের ১৩ অধ্যায়ের ৩২ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘কিনতু সেই দিনের বা সেই দন্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না; স্বর্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’
এ বাক্যটি সন্দেহাতীতভাবে ত্রিত্ববাদের বাতুলতা ঘোষণা করছে। কারণ যীশু এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করছেন যে, কিয়ামত বা বিনাশ দিবসের জ্ঞান একমাত্র ঈশ্বরেই আছে, আর কারো নেই। অন্য সকল সৃষ্টির সাথে তাঁর নিজেকেও তিনি এই জ্ঞান থেকে বঞ্চিত বলে উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনিও অন্য সকল সৃষ্টির সমান বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁকে ঈশ্বর কল্পনা করলে তা কখনোই সম্ভব নয়।
চতুর্থ বাক্য: মথিলিখিত সুসমাচারের ২৭/৪৬ ও ৫০ শ্লোক: ‘‘(৪৬) আর নয় ঘটিকার সময়ে যীশু উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া ডাকিয়া কহিলেন, এলী এলী লামা শবক্তানী, অর্থাৎ ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার, তুমি কেন আমায় পরিত্যাগ করিয়াছ? (৫০) পরে যীশু আবার উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া নিজ আত্মাকে সমর্পণ করিলেন।’’
লূকলিখিত সুসমাচারের ২৩ অধ্যায়ের ৪৬ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘আর যীশু উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া কহিলেন, পিত, তোমার হস্তে আমার আত্মা সমর্পণ করি; আর এই বলিয়া প্রাণত্যাগ করিলেন।’’
খৃস্টানগণের বিশ্বাস অনুসারে এ হলো যীশুর জীবনের সর্বশেষ কথা। আর এ কথাগুলি তাঁর ঈশ্বরত্বের বিষয়ে খৃস্টানদের দাবি সর্বোতভাবে মিথ্যা ও বাতিল বলে প্রমাণ করে। তিনি যদি ঈশ্বরই হতেন তাহলে অন্য কোনো ঈশ্বরের নিকট তিনি ত্রাণ বা সাহায্য প্রার্থনা করতেন না। ঈশ্বর এরূপ অসহায় হতে পারেন না বা ঈশ্বর এভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন না। অবসাদ, দুর্বলতা, অসহায়ত্ব, শ্রান্তি, ক্লান্তি ইত্যাদির দুর্বলতা কখনো ঈশ্বরকে স্পর্শ করতে পারে না। যিশাইয় ৪০/২৮: ‘‘তুমি কি জ্ঞাত হও নাই? তুমি কি শুন নাই? অনাদি অননত ঈশ্বর, সদাপ্রভু, পৃথিবীর প্রান্ত সকলের সৃষ্টিকর্তা ক্লান্ত হন না, শ্রান্ত হন না; তাঁহার বুদ্ধির অনুসন্ধান করা যায় না।’’
এভাবে পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে অগণিত শ্লোক ও অনুচ্ছেদ বিদ্যমান যেগুলিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এরূপ মানবীয় দর্বলতা কখনো ঈশ্বরকে স্পর্শ করতে পারে না। নমুনা হিসেবে পাঠক যিশাইয় ৪৪/৬; যিরমিয় ১০/১০; হবক্কুক ১/১২; তিমথীয় ১/১৭ ইত্যাদি দেখতে পারেন। এ সকল শ্লোকে বারংবার বলা হয়েছে যে, প্রকৃত ঈশ্বর অনাদি, অনন্ত, জীবন্ত, অমর (everlasnting), অক্ষয় ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে (immortal)।
যে ঈশ্বর অনাদি, অনন্ত, যাকে কোনো ক্লান্তি, শ্রান্তি বা দুর্বলতা স্পর্শ করতে পারে না, যিনি জীবন্ত-চিরঞ্জীব, অমর ও অক্ষয় তিনি কিভাবে অসহায় হয়ে ত্রাণপ্রার্থনা করতে করতে মৃত্যুবরণ করবেন? মরণশীল ক্ষয়শীল অসহায় অক্ষম কি ঈশ্বর হতে পারে? কখনোই নয়! কোনোভাবেই নয়!! বরং তাদের ধারণা ও বর্ণনা অনুসারে এই অন্তিম সময়ে যীশু যার কাছে ত্রাণ প্রার্থনা করে চিৎকার করেছিলেন তিনিই হলেন প্রকৃত ও সত্য ঈশ্বর।
এখানে লক্ষণীয় যে, ঈশ্বরকে বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে অমর বা মৃতুহীন বলা হয়েছে। এর মধ্যে হবক্কুক ১/১২। আরবী অনুবাদের প্রাচীন সংস্করণগুলিতে এ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘হে সদাপ্রভু, আমার ঈশ্বর, আমার পবিত্রতম ..... তুমি মরিবে না (لا تموت)।’’ কিন্তু পরবর্তী আরবী সংস্করণগুলিতে লেখা হয়েছে: ‘‘... আমরা মরিব না (لا نموت)।’’
কেরির বঙ্গানুবাদে আয়াতটি নিম্নরূপ: ‘‘ হে সদাপ্রভু, আমার ঈশ্বর, আমার পবিত্রতম, তুমি কি অনাদিকাল হইতে নহ? আমরা মারা পড়িব না; হে আমার সদাপ্রভু, তুমি বিচারার্থে উহাকে নিরূপন করিয়াছ...।’’ ‘আমরা মারা পড়িব না’ কথাটির টীকায় লেখা হয়েছে ‘‘(বা) তুমি মরিবে না।’’
যে কোনো পাঠক এ শ্লোকটি পাঠ করলে বুঝবেন যে, ‘‘আমরা মারা পড়িব না’’ কথাটি এখানে অর্থহীন। এ বাক্য সম্পূর্ণ ঈশ্বরের প্রশংসায় বলা হয়েছে, আগে ও পরে সবই ঈশ্বরকে সম্বোধন করে তার গুণাবলি বর্ণনা করা। এখানে মাঝখানে ‘‘আমরা মরিব না’’ কথাটি অর্থহীন। একথা সুস্পষ্ট যে, ‘‘তুমি মরিবে না’’ কথাটি কোনো ধার্মিক খৃস্টান লিপিকার বিকৃত করে ‘‘আমরা মরিব না’’ বানিয়ে দেন; যেন যীশুর মৃত্যু দাবির বৈধতা পাওয়া যায়। আর আরবী, হিব্রু ইত্যাদি ভাষায় এরূপ বিকৃতি খুবই সহজ, একটি বা দুটি নুকতা পরিবর্তন করলেই হয়।
পঞ্চম বাক্য: যোহন ২০/১৭ শ্লোকে মগ্দলীনী মরিয়মকে সম্বোধন করে যীশু বলেন: ‘‘আমাকে স্পর্শ করিও না, কেননা এখনও আমি ঊর্ধ্বে পিতার নিকটে যাই নাই; কিনতু তুমি আমার ভ্রাতৃগণের কাছে গিয়া তাহাদিগকে বল, যিনি আমার পিতা ও তোমাদের পিতা, এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বর, তাঁহার নিকটে আমি ঊর্ধ্বে যাইতেছি (I ascend unto my Father, and your Father; and to my God, and your God)।’’
এখানে যীশু ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর নিজেকে অন্য সকল মানুষের সমান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন: ‘‘যিনি আমার পিতা ও তোমাদের পিতা, এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বর’’। তাঁর একথা বলার উদ্দেশই হলো, যেন মানুষ মিথ্যা অবপাদ দিয়ে তাঁকে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের পুত্র বলতে না পারে। তিনি সুস্পষ্টভাবে বললেন যে, তার শিষ্যরাও তারই মত ঈশ্বরের পুত্র। অর্থাৎ তারাও যেমন ঈশ্বরের প্রকৃত পুত্র নয়, বরং রূপক অর্থে ‘আল্লাহর বান্দা’ অর্থে ঈশ্বরের পুত্র, তিনিও ঠিক তেমনি রূপক অর্থে ‘আল্লাহর বান্দা’ অর্থে ঈশ্বরের পুত্র, প্রকৃত অর্থে নন। ঈশ্বর যেমন তাদের সকলের ঈশ্বর, ঠিক তেমনিভাবে তিনি তাঁরও ঈশ্বর এবং সকলেই ঈশ্বরের দাস অর্থে ঈশ্বরের পুত্র।
এখানে লক্ষণীয় যে, খৃস্টানদের বর্ণনা অনুসারে যীশু একথা বলেছেন মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থিত হওয়ার পরে স্বর্গারোহণের কিছু আগে। এথেকে প্রমাণিত হয় যে, স্বর্গারোহণের পূর্ব পর্যন্ত আজীবনই তিনি নিজেকে ‘আল্লাহর বান্দা’ বা ‘ঈশ্বরের দাস’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং ‘ঈশ্বরের পুত্র’ পরিভাষাটি এ অর্থেই ব্যবহার করেছেন। এর সাথে কুরআনের বর্ণনা মিলে যায়। সূরা আল-ইমরানের ৫১ আয়াতের বর্ণনায় ঈসা আলাইহিস সালাম বলেন: ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু।’’ সূরা মায়িদার ৭২ ও ১১৭ আয়াতের বর্ণনায় তিনি বলেন: ‘‘তোমরা আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু আল্লাহর ইবাদত কর...।’’ সূরা মরিয়মের ৩৬ আয়াতের বর্ণনায় তিনি বলেন: ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, অতএব তোমরা তার ইবাদত কর।’’ সূরা যুখরুফের ৬৪ আয়াতের বর্ণনায় তিনি বলেন: ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, অতএব তোমরা তার ইবাদত কর।’’
এভাবে আমরা দেখছি যে, যীশু সর্বশেষ যে কথাগুলি বলেছেন এবং তার ঊর্ধ্বারোহণের পূর্বমুহূর্তে শিষ্যদেরকে যে শিক্ষা দিয়েছেন তার সাথে ত্রিত্ববাদ এবং যীশুর ঈশ্বরত্বের দাবি সাংঘর্ষিক। তিনি সেই সর্বশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর শিষ্যদেরকে আল্লাহর একত্ববাদ এবং তিনি নিজেও যে তাঁদেরই মত আল্লাহর বান্দা তা শিক্ষা দিয়েছেন।
ষষ্ঠ বাক্য: সুসমাচারগুলিতে অগণিত স্থানে যীশু বলেছেন যে, তিনি মানুষের সন্তান বা ‘মনুষ্যপুত্র’ (son of man)। তিনি যে মানুষ মাত্র তা বুঝাতেই তিনি তা বলেছেন; কারণ মনুষ্য পুত্র মানুষ ছাড়া আর কিছুই হতে পারেন না। এছাড়া তিনি বারংবার বলেছেন যে, তিনি আচার্য বা শিক্ষক, তিনি প্রেরিত-রাসূল, তিনি নবী বা ভাববাদী। নমুনা হিসেবে পাঠক নিম্নের শ্লোকগুলি দেখতে পারেন: মথি ১০/৪০, ১১/১৯, ১৩/৫৭, ১৫/২৪, ১৭/১২, ২২, ১৯/১৬, ২১/১১, ৪৬, ২৩/৮, ১০, ২৬/১৮; মার্ক ৯/৩৭, ৩৮, ১০/৩৫; লূক ৪/৪৩, ৫/৫, ৭/১৬, ৩৯, ৪০, ৮/২৪, ৪৫, ৯/৩৩, ৩৮, ৫৬, ১০/১৬, ১২/১৩, ১৩/৩৩, ৩৪, ১৭/১৩, ২৩/৪৭, ২৪/১৯; যোহন ১/৩৮, ৪/১৯, ৩১, ৩৪, ৫/২৩, ২৪, ৩৬, ৩৭, ৬/১৪, ২৫, ৭/১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ৫২, ৮/১৬, ১৮, ২৬, ২৮, ২৯, ৪০, ৪২, ৯/১১, ১৫, ১৭, ১১/৪২, ১২/৪৪, ৪৯, ৫০, ১৩/১৩, ১৪, ১৪/২৪, ১৭/৩, ৮, ১৮, ২৫, ২০/১৬, ২১।
এখানে সামান্য কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করছি। মথি ১০/৪০: ‘‘যে তোমাদিগকে গ্রহণ করে, সে আমাকেই গ্রহণ করে; আর যে আমাকে গ্রহণ করে, সে যিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন তাকে (আমার প্রেরণকর্তাকে) গ্রহণ করে (he that receiveth me receiveth him that sent me)।’’
মথি ১৫/২৪: ‘‘তিনি উত্তর করিয়া কহিলেন, ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারো নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই (I am not sent but unto the lost sheep of the house of Israel)।’’
মথি ২১/১১: ‘‘তাহাতে লোকসমূহ কহিল, উনি সেই ভাববাদী, গালীলের নাসরাতীয় যীশু।’’
মথি ২৩/৮ ও ১০: ‘‘তোমাদের গুরু (আচার্য) একজন তিনি খৃস্ট (one is your Master, even Christ)।’’
লূক ৪/৪৩: ‘‘কিন্তু তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, অন্য অন্য নগরেও আমাকে ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করিতে হইবে; কেননা সেই জন্যই আমি প্রেরিত হইয়াছি।’’
লূক ৭/১৬: ‘‘তখন সকলে ভয়গ্রস্ত হইল, এবং ঈশ্বরের গৌরব করিয়া বলিতে লাগিল, ‘আমাদের মধ্যে একজন মহান ভাববাদীর (a great prophet) উদয় হইয়াছে, আর ‘ঈশ্বর আপন প্রজাদের তত্ত্বাবধান করিয়াছেন।’’
লূক ১০/১৬: ‘‘ যে তোমাদিগকে মানে, সে আমাকেই মানে, এবং যে তোমাদিগকে অগ্রাহ্য করে, সে আমাকেই অগ্রাহ্য করে, আর যে আমাকে অগ্রাহ্য করে, সে তাঁহাকেই অগ্রাহ্য করে, যিনি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন।’’
যোহন ৫/৩৬, ৩৭: ‘‘(৩৬) ... যে সকল কার্য আমি করিতেছি, সেই সকল আমার বিষয়ে এই সাক্ষ্য দিতেছে যে, পিতা আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন। (৩৭) আর পিতা যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন, তিনিই আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়াছেন; তাঁহার রব তোমরা কখনও শুন নাই, তাহার আকারও দেখ নাই।’’
যোহন ৬/১৪ শ্লোকে যীশুর অল্প খাদ্য দিয়ে অনেক মানুষকে খাওয়ানোর অলৌকিক চিহ্নের কথা উল্লেখের পরে বলা হয়েছে: ‘‘অতএব সেই লোকের তাঁহার কৃত চিহ্ন-কার্য দেখিয়া বলিতে লাগিল, উনি সত্যই সেই ভাববাদী যিনি জগতে আসিতেছেন (This is of a truth that prophet that should come into the world)।’’
যোহন ৭/১৫-১৭: ‘‘(১৫) তাহাতে যিহূদীরা আশ্চর্য জ্ঞান করিয়া কহিল, এ ব্যক্তি শিক্ষা না করিয়া কি প্রকারে শাস্ত্রজ্ঞ হইয়া উঠিল? (১৬) যীশু তাহাদিগকে উত্তর করিয়া কহিলেন, আমার উপদেশ আমার নহে, কিন্তু যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন, তাহার। (১৭) যদি কেহ তাঁহার ইচ্ছা পালন করিতে ইচ্ছা করে, সে এই উপদেশের বিষয়ে জানিতে পারিবে, ইহা ঈশ্বর ইহতে হইয়াছে, না আমি আপনা হইতে বলি।’’
যোহন ৮/১৮, ২৬, ২৯, ৪০, ৪২: ‘‘(১৮) আর পিতা, যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন, তিনি আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। (২৬) যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন, তিনি সত্য, এবং আমি তাঁহার নিকটে যাহা যাহা শুনিয়াছি, তাহাই জগৎকে বলিতেছি। (২৯) আর যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন, তিনি আমার সঙ্গে সঙ্গে আছেন, তিনি আমাকে একা ছাড়িয়া দেন নাই...। (৪০) কিন্তু ঈশ্বরের কাছে সত্য শুনিয়া তোমাদিগকে জানাইয়াছি যে, আমি, আমাকেই বধ করিতে চেষ্টা করিতেছ...। (৪২) আমি তো আপনা হইতে আসি নাই, কিন্তু তিনিই আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন।’’
যোহন ৯/১০, ১১, ১৭ শ্লোকে জন্মান্ধকে চক্ষু দান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: ‘‘তখন তাহারা তাহাকে (জন্মান্ধকে) বলিল, তবে কি প্রকারে তোমার চক্ষু খুলিয়া গেল? (১১) সে উত্তর করিল, যীশু নামের একজন মানুষ (A man that is called Jesus) কাদা করিয়া আমার চক্ষুতে লেপন করিলেন...। (১৭) পরে তাহারা পুনরায় সেই অন্ধকে কহিল, তুমি তাহার বিষয়ে কি বল? কারণ সে তোমারই চক্ষু খুলিয়া দিয়াছে। সে কহিল তিনি ভাববাদী।’’
যোহন ১৩/১৩: ‘‘তোমরা আমাকে গুরু ও প্রভু বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাক; আর তাহা ভালই বল, কেননা আমি সেই।’’
যোহন ১৪/২৪: ‘‘আর তোমরা যে বাক্য শুনিতে পাইতেছ, তাহা আমার নয়, কিন্তু পিতার, যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন।’’
এ সকল বক্তব্যে এবং অনুরূপ অগণিত বক্তব্যে যীশু অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন যে, তিনি একজন মানুষ, শিক্ষাদাতা গুরু, একজন ভাববাদী ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত (রাসূল), তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বাণী, কথা বা প্রত্যাদেশ বিশ্বস্ততার সাথে শিষ্যদেরকে শিক্ষা দেন, কোনো কিছু গোপন করেন না, তিনি যেভাবে আল্লাহর নিকট থেকে শুনেন সেভাবেই তা শিষ্যদেরকে শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ তাঁর হাতে যে সকল অলৌকিক চিহ্ন-কার্য সম্পন্ন করান তা সবই একজন মানুষ ও প্রেরিত নবী বা ভাববাদী হিসেবে, তিনি এগুলি ঈশ্বর বা ঈশ্বরের প্রকৃত পুত্র হিসেবে এ সকল চিহ্ন-কার্য করেন নি।
সপ্তম বাক্য: মথি ২৬/৩৬-৪৬: ‘‘(৩৬) তখন যীশু তাঁহাদের সহিত গেৎশিমানী নামক এক স্থানে গেলেন, আর আপন শিষ্যদিগকে কহিলেন, আমি যতক্ষণ ঐখানে গিয়া প্রার্থনা করি, ততক্ষণ তোমরা এইখানে বসিয়া থাক। (৩৭) পরে তিনি পিতরকে এবং সিবদিয়ের দুই পুত্রকে সঙ্গে লইয়া গেলেন, আর দুঃখার্ত ও ব্যাকুল হইতে লাগিলেন। (৩৮) তখন তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, আমার প্রাণ মরণ পর্যনত দুঃখার্ত হইয়াছে; তোমরা এখানে থাক, আমার সঙ্গে জাগিয়া থাক। (৩৯) পরে তিনি কিঞ্চিৎ অগ্রে গিয়া উবুড় হইয়া পড়িয়া (fell on his face: সাজদা করিয়া) প্রার্থনা করিয়া কহিলেন, হে আমার পিতঃ, যদি হইতে পারে, তবে এই পানপাত্র আমার নিকট হইতে দূরে যাউক; তথাপি আমার ইচ্ছামত না হউক, তোমার ইচ্ছামত হউক। (৪০) পরে তিনি সেই শিষ্যদের নিকটে আসিয়া দেখিলেন, তাঁহারা ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন, আর তিনি পিতরেক কহিলেন, এ কি? এক ঘন্টাও কি আমার সঙ্গে জাগিয়া থাকিতে তোমাদের শক্তি হইল না? (৪১) জাগিয়া থাক, ও প্রার্থনা কর, যেন পরীক্ষায় না পড়; আত্মা ইচ্ছুক বটে, কিন্তু মাংস দুর্বল। (৪২) পুনরায় তিনি দ্বিতীয় বার গিয়া এই প্রার্থনা করিলেন, হে আমার পিতঃ আমি পান না করিলে যদি ইহা দূরে যাইতে না পারে, তবে তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হউক। (৪৩) পরে তিনি আবার আসিয়া দেখিলেন, তাঁহারা ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন, কেননা তাঁহাদের চক্ষু ভারী হইয়া পড়িয়াছিল। (৪৪) আর তিনি পুনরায় তাহাদিগকে ছাড়িয়া গিয়া তৃতীয় বার পূর্বমত কথা বলিয়া প্রার্থনা করিলেন। (৪৫) তখন তিনি শিষ্যদের কাছে আসিয়া কহিলেন, এখন তোমরা নিদ্রা যাও, বিশ্রাম কর, দেখ, সময় উপস্থিত, মনুষ্যপুত্র পাপীদের হস্তে সমর্পিত হন। (৪৬) উঠ, আমরা যাই; এই দেখ, যে ব্যক্তি আমাকে সমর্পন করিতেছে, সে নিকটে আসিয়াছে।’’
এ বিষয়টি লূকলিখিত সুসমাচারের ২২/৩৯-৪৬ শ্লোকে আলোচনা করা হয়েছে। উপরের উদ্ধৃতিতে বর্ণিত যীশুর অবস্থা ও কথাবার্তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি ঈশ্বর ছিলেন না, বরং ঈশ্বরের দাস ও মানুষ ছিলেন। ঈশ্বর কি কখনো দুঃখার্ত, বেদনার্ত ও আকুল হতে পারেন? ঈশ্বর কি মৃত্যু বরণ করেন এবং অন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন? ঈশ্বর কি অন্য ঈশ্বরের কাছে এভাবে আকুল আবেগ ও কাতরতা নিয়ে প্রার্থনা করেন? কখনোই নয়। 
©somewhere in net ltd.