নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক ৪

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:০২


তাঁদের ভাষাগত দুর্বলতার একটি নমুনা দেখুন। ভ্যাটিকানের পোপ অষ্টম উর্বানের (Urban) -এর নির্দেশে সিরিয়ার প্রধান বিশপ সার্কিস হারূনী আরবী, গ্রীক, হিব্রু ও অন্যান্য ভাষায় অভিজ্ঞ বহুসংখ্যক পাদরি, সন্যাসী, পণ্ডিত ও ভাষাবিদকে একত্রিত করেন। তিনি তাদেরকে বাইবেলের আরবী অনুবাদটিকে পরিমার্জিত করতে দায়িত্ব দেন; কারণ আরবী অনুবাদটি অগণিত ভুলে ভরা ছিল। পোপের নির্দেশে ও বিশপের তত্ত্বাবধানে এ সকল পণ্ডিত প্রাণপন পরিশ্রম করে ১৬২৫ খৃস্টাব্দে বাইবেলের আরবী অনুবাদটি পরিমার্জন ও সংশোধন করে প্রকাশ করেন। কিন্তু এভাবে পরিপূর্ণ সংশোধন ও পরিমার্জনের পরেও এই অনুবাদের মধ্যে অগণিত ভুলভ্রান্তি থেকে যায়; কারণ ভুলভ্রান্তি খৃস্টীয় প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোত জড়িত।
এজন্য তারা উপর্যুক্ত অনুবাদটির ভূমিকায় এ বিষয়ে ওযরখাহি পেশ করেন। তারা লিখেছেন: ‘‘অতঃপর আপনি এই অনুবাদের মধ্যে কিছু কথা এমন দেখবেন যা ভাষার নিয়মের বাইরে বরং ভাষার নিয়মনীতির উল্টো। কোথাও স্ত্রীলিঙ্গের স্থলে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে, কোথাও বহুবচনের স্থলে একবচন ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোথাও দ্বিবচনের স্থলে রয়েছে বহুবচন। কোথাও ভুল বিভক্তি চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে: ইসমের মধ্যে যের বা যবরের স্থানে এবং ফি'লের মধ্যে জায্মের স্থলে পেশ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও স্বরচিহ্নের স্থলে অতিরিক্ত বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া অনুরূপ অন্যান্য বিষয় দেখবেন। এর কারণ হলো খৃস্টানদের ভাষা সাদাসিদে। এজন্য এরূপ ভুলভ্রান্তি ভরা ভাষা তাদের বৈশিষ্ট্য। এ বিষয়টি শুধু আরবী ভাষার ক্ষেত্রেই নয়, বরং ল্যাটিন, গ্রীক ও হিব্রু ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ সকল ভাষাতেও ভাববাদী ও প্রেরিতগণ এবং পূর্ববর্তী ধর্মগুরুগণ ভাষার নিয়মনীতি বর্জন করতেন। কারণ, পবিত্র আত্মা ঐশ্বরিক শব্দের প্রশস্ততাকে ভাষার ব্যাকরণের সংকীর্ণ সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চান নি। এজন্য ভাষার বিশুদ্ধতা, সাহিত্যমান ও অলঙ্কার ছাড়াই তিনি ঐশ্বরিক রহস্যাবলি আমাদেরকে প্রদান করেছেন।’’
চতুর্থত: পাদরিগণ বলেছেন, ‘‘অনেক সময় বাতিল, অন্যায় ও নিন্দনীয় অর্থও সর্বোচ্চ সাহিত্যিক ও আলঙ্কারিক ভাষায় প্রকাশ করা যায়’’।
তাদের এ কথটি এখানে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। কুরআনের ক্ষেত্রে এরূপ সম্ভাবনার কোনো অবকাশই নেই। কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কল্যাণময় ও প্রশংসনীয় কথায় পরিপূর্ণ। কুরআনের আলোচ্য বিষয়গুলি সবই প্রশংসিত ও কল্যাণময়। যেমন:
(১) আল্লাহর মহান গুণাবলি বর্ণনা করা এবং অক্ষমতা, অজ্ঞতা, অত্যাচার ইত্যাদি সকল ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা।
(২) বিশুদ্ধ একত্ববাদের প্রচার এবং সকল প্রকারের শিরক, বহু উপাস্য উপাসনা নিষেধ করা, এবং বিশেষ করে ত্রিত্ববাদ নিষেধ করা, যা শিরক ও বহু-ইশ্বরবাদিতার একটি প্রকাশ।
(৩) নবীগণের বা ভাববাদীগণের আলোচনা করা এবং মুর্তিপূজা, অবিশ্বাস ও অন্যান্য পাপ-অন্যায় থেকে তাঁদের পবিত্রতা বর্ণনা করা। নবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের প্রশংসা করা। নবীদেরকে যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের নিন্দা করা। সাধারণভাবে সকল নবীকে বিশ্বাস করার এবং বিশেষ করে যীশু খৃস্ট এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর বিশ্বাস করার গুরুত্ব বর্ণনা করা।
(৪) চূড়ান্ত পরিণতিতে বিশ্বাসীগণ অবিশ্বাসীদের উপর বিজয়ী হবেন সে সম্পর্কে ওয়াদা করা।
(৫) পুনরুত্থান, পরকাল, পারলৌকিক জীবন, পুনরুত্থান দিবসে ধার্মিক ও অধার্মিকদের কর্মের ফলাফল প্রদান, জান্নাত- জাহান্নাম বা স্বর্গ ও নরকের কথা উল্লেখ করা। পার্থিব জগতের অস্থায়িত্ব ঘোষণা করা এবং জগৎমুখিতার নিন্দা করা। পারলৌকিক জীবনের প্রশংসা করা ও তার স্থায়িত্ব বর্ণনা করা।
(৬) ধর্মব্যবস্থার বৈধ ও অবৈধ, আদেশ নিষেধ ও পানাহার, ইবাদত-বন্দেগি, ব্যক্তিগত ও অন্যান্য সকল বিধিবিধান বর্ণনা করা।
(৭) আল্লাহর প্রেম ও আল্লাহর প্রিয় মানুষদের প্রেম অর্জনে উৎসাহ প্রদান। পাপী ও অধার্মিকদের সাহচর্য গ্রহণ থেকে নিষেধ করা।
(৮) সকল ক্ষেত্রে অন্তরের বিশুদ্ধতা ও শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দয়া লাভের জন্য কর্ম করার গুরুত্ব বর্ণনা করা। লোক দেখানো বা লোক শোনানো কর্ম বা মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য কর্ম করার নিন্দা।
(৯) উত্তম আচরণ অর্জনের জন্য সাধারণভাবে ও বিস্তারিতভাবে উৎসাহ প্রদান করা, সদাচারণ ও উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির প্রশংসা করা। অসদাচারণ ও অসৎস্বভাবের নিন্দা করা।
(১০) আল্লাহর ভয়, আল্লাহর যিকর-স্মরণ ও ইবাদতের জন্য উৎসাহ ব্যঞ্জক উপদেশ ও আজ্ঞা প্রদান।
নিঃসন্দেহে জ্ঞান, বিবেক, যুক্তি ও সকল ধর্মের ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে এ বিষয়গুলি প্রশংসিত। এ সকল বিষয়ের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য এবং পাঠকের মনের গভীরে তাকে স্থায়ী আসন দেওয়ার জন্য কুরআনে এগুলি বারংবার বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করা হয়েছে। এ সকল বিষয় যদি নিন্দনীয় হয়, তবে প্রশংসনীয় বিষয় কী হবে?
তবে লক্ষণীয় যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলের মধ্যে বহুল আলোচিত ও বারংবার বিভিন্ন আঙ্গিকে পুনরাবৃত্ত নিম্নোক্ত বিষয়গুলি কুরআনের মধ্যে পাওয়া যায় না:
(১) বাইবেলে উল্লেখ রয়েছে যে, ভাববাদী লোট (লূুত আ) মদ পান করে মাতাল হয়ে তার কন্যাদ্বয়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। দেখুন: আদিপুস্তক ১৯/৩০-৩৮।
(২) বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঈশ্বরের প্রথমজাত পুত্র বা বড় ছেলে দায়ূদ উরিয়ের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন এবং উরিয়কে কৌশলে হত্যা করেন। এরপর উক্ত স্ত্রীকে বিবাহ করেন। দেখুন: ২ শমূয়েল ১১/১-২৭।
(৩) বাইবেলে আছে যে, হারোণ গোবৎসের প্রতিমা তৈরি করে তার পুজা করেন। দেখুন: যাত্রাপুস্তক ৩২/১-৬।
(৪) বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুলাইমান আলাইহিস সালাম শেষ জীবনে ধর্মত্যাগ করে মুরতাদ্দ-মুশরিক হয়ে প্রতিমা পূজা করতে শুরু করেন এবং মুর্তিপূজার প্রচার প্রসারের জন্য মন্দিরাদি নির্মাণ করেন। দেখুন: ১ রাজাবলি ১১/১-১৩।
(৫) বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন ভাববাদী একান্তই হিংসাবশত অন্য একজন ভাববাদীকে ঈশ্বরের ভাববানী বা ওহীর নামে মিথ্যা কথা বলে ধোঁকা দেন এবং তার কথা বিশ্বাস করে প্রথম ভাববাদী ঈশ্বরের ক্রোধের মধ্যে নিপতিত হয়ে নিহত হন। দেখুন: ১ রাজাবলি ১৩/১-৩০।
(৬) ইস্রায়েল বা যাকোবকে (ইয়াকূব আ.) বাইবেলে ঈশ্বরের প্রথমজাত (firstborn) পুত্র বা বড় ছেলে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাইবেলের সকল ভাববাদী বা সকল হিব্রু ভাববাদীর মূল পিতা তিনিই। বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঈশ্বরের এ প্রথমজাত পুত্র বা বড় ছেলে ইস্রায়েল (ইয়াকূব আ)-এর পুত্র যিহূদা আপন পুত্রবধু তামর-এর সাথে ব্যভিচার করেন এবং এ ব্যভিচারের ফলে অবৈধ জারজ সন্তান ‘পেরস’ এর জন্ম হয়। দায়ূদ, শলোমন ও যীশু- ঈশ্বরের এ তিন পুত্র সকলেই এ যারজ সন্তানের বংশধর ছিলেন। দেখুন: আদিপুস্তক ৩৮/১২-৩০।
(৭) বাইবেলে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঈশ্বরের এ প্রথমজাত পুত্র বা বড় ছেলে ইস্রায়েলের প্রথমজাত পুত্র বা বড় ছেলে পুত্র রূবেন তার পিতার ‘বিলহা’ নামের উপপত্নীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। ঈশ্বরের প্রথমজাত পুত্র ইস্রায়েল তার প্রথমজাত পুত্রের নিজ বিমাতার সাথে ব্যভিচার এবং চতুর্থ পুত্রের পুত্রবধুর সাথে ব্যভিচারের সংবাদ জানার পরও তাদেরকে ঈশ্বরের বিধান অনুসারে শাস্তি প্রদান করেন নি। উপরন্তু ব্যভিচারী যিহূদাকে পরিপূর্ণ বরকত ও চিরস্থায়ী কল্যাণের জন্য আশীর্বাদ বা দুআ করেন। তিনি তাঁর পুত্রগণের মধ্যে এ যিহূদার জন্য সবচেয়ে বেশি দুআ করেন। যাত্রাপুস্তক ৪/২২-২৩; আদিপুস্তক ৩৫/২২, ৪৯/১-২৮।
(৮) আমরা দেখেছি যে, বাইবেলের বর্ণনানুসারে ঈশ্বরের আরেকজন প্রথমজাত পুত্র বা বড় ছেলে (firstborn) এবং জন্মদেওয়া পুত্র (begotten son) দায়ূদ আলাইহিস সালাম। বাইবেলের বর্ণনানুসারে তিনি নিজেই পরস্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করতেন। এ ছাড়াও বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঈশ্বরের এ বড় ছেলের (দায়ূদের) প্রিয় পুত্র তারই প্রিয় কন্যার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। ঈশ্বরের এ প্রথমজাত পুত্র তার পুত্র ও কন্যার ব্যভিচারের সংবাদ জানতে পারেন। মোশির ব্যবস্থা অনুসারে ব্যভিচারীর যে শাস্তি পাওনা সে শাস্তি তিনি তার পুত্র-কন্যাকে প্রদান করেন নি। দেখুন: গীতসংহিতা ২/৭, ৮৯/২৭, ২ শমূয়েল ১৩/১-৩৯।
(৯) খৃস্টানগণের বিশ্বাস অনুসারে যীশু খৃস্টের ১২ জন প্রেরিতের মর্যাদা মোশি ও অন্য সকল ইস্রায়েলীয় ভাববাদীর চেয়েও বেশি। এ মহান মর্যাদার অধিকারী প্রেরিত শিষ্যদের একজন ছিলেন ঈষ্করিয়োতীয় যিহূদা (Judas Iscariot), যিনি অলৌকিক চিহ্নাদির অধিকারী প্রেরিত রাসূল ছিলেন । এ মহান প্রেরিত একজন চোর ছিলেন। তার কাছে টাকার থলি থাকত এবং তাতে যা রাখা হতো তিনি তা চুরি করতেন। এ মহান প্রেরিত শিষ্য মাত্র ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে তার ধর্ম বিক্রয় করে দেন। এ সামান্য অর্থের জন্য তিনি তার ঈশ্বরকে ইয়াহূদীদের হাতে তুলে দিতে রাযি হয়ে যান। ইয়াহূদীরা তার ঈশ্বরকে ধরে নিয়ে ক্রুশে বিদ্ধ করে।
(১০) ইয়াহূদী মহাযাজক কায়াফা (Caiaphas) ঈশ্বরের একজন ভাববাদী (prophet) বা নবী ছিলেন বলে সুসমাচার লেখক যোহন সাক্ষ্য দিয়েছেন । এ ভাববাদী যীশুকে মিথ্যাবাদী ও অবিশ্বাসী (কাফির) বলে ঘোষণা করেন, তাঁকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাকে হত্যা করার রায় প্রদান করেন। খৃস্টানদের বিশ্বাসানুসারে যীশুই ঈশ্বর (God Incarnate)। তাহলে কায়াফা ছিলেন যীশুরই একজন ভাববাদী। আর এ ভাববাদী স্বয়ং তার ঈশ্বরকে মিথ্যবাদী ও কাফির বলে ঘোষণা করলেন, তাকে লাঞ্ছিত করলেন এবং তাকে হত্যা করার রায় দিলেন!
এ ধরনের আরো অনেক নোংরা ও ঘৃণিত বিষয় বাইবেলের মধ্যে রয়েছে। খৃস্টান ধর্মগুরু, পণ্ডিত ও ধর্মপ্রচারকদের কাছে এগুলি সুপরিচিত। তাঁরা এ সকল কথা সঠিক, নির্ভুল ও ধর্মগ্রন্থের বাণী বলে বিশ্বাস করেন। এ সকল বিষয়কে তারা উচ্চাঙ্গের ভাবসম্পন্ন, সুন্দর, মহান, আত্মার খোরাক ও সুরুচিসম্পন্ন বিষয় বলে গণ্য করেন। সম্ভবত এ সকল ‘‘উচ্চাঙ্গের ভাবসম্পন্ন, সুন্দর ও মহান বিষয় (ব্যভিচার, অনাচার, অগম্য-গমন, মিথ্যা, ঈশ্বর ও ভাববাদীগণের নিন্দাজ্ঞাপক কথা, মূর্তিপূজা, বুদ্ধি বিরোধী কথা ইত্যাদি) যদি কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান থাকত তবে হয়ত খৃস্টান পাদরি ও যাজকগণ কুরআনকে ‘ঈশ্বরের বাণী’ (God's Word) বলে মেনে নিতেন। কিন্তু যেহেতু কুরআনের মধ্যে এ সকল ‘মহান’ বিষয় ও অনুরূপ বিষয়াদি আলোচিত হয় নি, সেহেতু তারা কুরআনকে ঈশ্বরের বাণী বলে মানতে পারছেন না।
৩. ১. ৩. ২. বাইবেল ও কুরআনের বৈপরীত্য
পাদরিগণ উত্থাপিত দ্বিতীয় আপত্তিতে তাঁরা বলেন: ‘‘অনেক স্থানে কুরআনের বক্তব্য পুরাতন ও নতুন নিয়মের বক্তব্যের বিরোধী, কাজেই কুরআন ঈশ্বরের বাণী হতে পারে না।’’
আপত্তির পর্যালোচনা ও বিভ্রান্তির অপনোদন:
(ক) ইতোপূর্বে আমরা নিশ্চিতরূপে জেনেছি যে, পুরাতন ও নতুন নিয়মের এ সকল পুস্তক যে সকল ভাববাদী বা লেখকের নামে প্রচলিত সে সকল ভাববাদী বা লেখক থেকে অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় পুস্তকগুলি বর্ণিত ও প্রচারিত হয় নি। কাজেই এ সকল ভাববাদী বা লেখক যে সত্যিই এগুলি রচনা করেছেন তার কোনো প্রমাণ নেই। এ সকল পুস্তকের মধ্যে অনেক অনেক স্থানে বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতা রয়েছে এবং এগুলি অগণিত ভুলভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। এ কারণে বাইবেল দিয়ে কুরআন যাচাই করার কোনো উপায় নেই। কুরআনে যদি এ সকল পুস্তকের বিপরীত বা অতিরিক্ত কোনো তথ্য থাকে তাতে কুরআনের অগ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হয় না, বরং এতে প্রমাণিত হয় যে বাইবেলের গ্রন্থাদিতে এ বিষয়ে কুরআন বিরোধী যে তথ্য রয়েছে তা মিথ্যা, ভুল বা বিকৃত। বাইবেলের পুস্তকাদিতে উল্লিখিত বা ইয়াহূদী-খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত তথ্য ও বিশ্বাসের বিভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কুরআনে এ সকল তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে আমরা দেখছি যে, কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান বাইবেল বিরোধী তথ্যাদি দেখে কোনোভাবেই কল্পনা করার অবকাশ নেই যে, ভুলক্রমে বুঝি এই তথ্য কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং এ সকল তথ্য কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে বাইবেলের বিভ্রান্তি প্রমাণ করার জন্য।
(খ) পাদরিগণের দাবি অনুসারে কুরআনের সাথে বাইবেলের পুস্তকাদির বৈপরীত্য তিন প্রকারের (১) রহিত বিধানাবলি সম্পর্কিত, (২) এমন কিছু বিষয় যেগুলি কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু বাইবেলের পুরাতন বা নতুন নিয়মের কোনো পুস্তকে নেই এবং (৩) এমন কিছু বিষয় যা কুরআনে ও বাইবেলে রয়েছে, কিন্তু এগুলির বিষয়ে কুরআনের বর্ণনা বাইবেলের বর্ণনার বিপরীত। এ তিন প্রকার বৈপরীত্যই পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান। কাজেই এগুলির কোনোটিকেই কুরআনের ত্রুটি হিসেবে নির্দেশ করার অধিকার পাদরিগণের নেই।
প্রথমত, প্রথম অধ্যায়ের চতুর্থ পরিচ্ছেদে পাঠক দেখেছেন যে, রহিতকরণ শুধু কুরআনের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং বাইবেলের মধ্যেও তা বিদ্যমান। কাজেই কুরআন যদি পূর্ববর্তী ধর্মের কিছু বিধান রহিত করে তাতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। পাঠক দেখেছেন যে, পুরাতন নিয়মের অনেক বিধান নতুন নিয়মে রহিত করা হয়েছে। কাজেই কোনো বুদ্ধিমান খৃস্টান নতুন বা পুরাতন নিয়মের কোনো বিধান রহিত করার কারণে কুরআনকে দোষ দিতে পারেন না। তাহলে তো প্রমাণিত হবে যে, নতুন নিয়মের পুস্তকাবলি ‘ঈশ্বরের বাণী’ নয়; কারণ তা পুরাতন নিয়মের বিধানাবলি রহিত করেছে। ইযহারুল হক্ক গ্রন্থের প্রণেতা আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহর সাথে প্রকাশ্য বিতর্কে পাদরি ড. ফান্ডার স্বীকার করেন যে, তাওরাত ও ইঞ্চিলের মধ্যে নাসখ বা রহিতকরণ বিদ্যমান। কিন্তু বিতর্কের আগে তিনি তাওরাত ও ইঞ্জিলের মধ্যে নাসখ বা রহিতকরণের বিদ্যমানতা কঠিনভাবে অস্বীকার করতেন।
দ্বিতীয়ত, বাইবেলে উল্লেখ করা নেই এরূপ কোনো তথ্য কুরআনে বিদ্যমান থাকলে তা কুরআনের কোনো ত্রুটি বলে গণ্য করা খৃস্টানদের পক্ষে সম্ভব নয়। পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে নেই এরূপ তথ্য পরবর্তী ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ করা যদি পরবর্তী গ্রন্থের ত্রুটি বলে গণ্য করা হয় তবে তাতে নতুন নিয়ম ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হবে; কারণ বাইবেলের পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদিতে উল্লেখ করা নেই এরূপ অনেক তথ্য নতুন নিয়মের পুস্তকাদিতে বিদ্যমান রয়েছে। এখানে সামান্য কয়েকটি নমুনা পেশ করা হচ্ছে:
(১) যিহূদার পত্রের ৯ আয়াতে বলা হয়েছে: ‘‘কিন্তু প্রধান স্বর্গদূত মীখায়েল যখন মোশির দেহের বিষয়ে দিয়াবলের সহিত বাদানুবাদ করিলেন, তখন নিন্দাযুক্ত নিষ্পত্তি করিতে সাহস করিলেন না, কিন্তু কহিলেন, প্রভু তোমাকে ভৎর্সনা করুন।’’
মোশির দেহের বিষয়ে মীখায়েলের সাথে দিয়াবলের এই বাদানুবাদের কথা পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকেই উল্লেখ নেই।
(২) ইব্রীয় ১২/২১ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘এবং সেই দর্শন এমন ভয়ঙ্কর ছিল যে, মোশি কহিলেন, ‘আমি নিতানতই ভীত ও কম্পিত হইতেছি’’।
এখানে পৌল মোশি, তাঁর সিনয় পর্বতে গমন ও তথায় মেঘগর্জন, বিদ্যুৎ ইত্যাদি দর্শনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে যাত্রাপুস্তকের ১৯ অধ্যয়ে । কিন্ত সেখানে বা পুরাতন নিয়মের কোথাও মোশির এ কথা উল্লেখ করা হয় নি। ‘‘মোশি কহিলেন, ‘আমি নিতানতই ভীত ও কম্পিত হইতেছি’’-এ কথা কোথাও নেই।
(৩) ২ তিমথীয় ৩/৮: ‘‘আর যান্নি ও যামিব্র যেমন মোশির প্রতিরোধ করিয়াছিল, তদ্রূপ ইহারা সত্যের প্রতিরোধ করিতেছে।’’
ফরৌণের মন্ত্রবেত্তাগণ কর্তৃক মোশির প্রতিরোধের ঘটনা বিস্তারিত যাত্রাপুস্তকের ৭ম অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এই দুটি নামের উল্লেখ সেখানে নেই। যাত্রা পুস্তকের অন্য কোনো অধ্যায়ে বা পুরাতন নিয়মের অন্য কোনো পুস্তকের কোথাও এই নাম দুটির অস্তিত্ব নেই।
(৪) ১ করিন্থীয় ১৫/৬ শ্লোকে যীশুর কবর থেকে পুনরুত্থানের পরে বিভিন্ন শিষ্যকে সাক্ষাত দানের বিষয়ে বলা হয়েছে: ‘‘তাহার পরে একেবারে পাঁচ শতের অধিক ভ্রাতাকে দেখা দিলেন, তাহাদের অধিকাংশ লোক অদ্যাপি বর্তমান রহিয়াছে, কিন্তু কেহ কেহ নিদ্রাগত হইয়াছে।’’
সুসমাচার চতুষ্ঠয়ে এবং প্রেরিতদের কার্যবিবরণের কোথাও এ পাঁচশতাধিক শিষ্যকে দেখা দেওয়ার বিষয়ের উল্লেখ নেই। এ সকল বিষয় বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করার বিষয়ে লূকের আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ তিনিও এ বিষয়ে কিছুই লিখেন নি।
(৫) নতুন নিয়মের সুসমাচারগুলিতে স্বর্গ, নরক, পুনরুত্থান, বিচার, কর্মের প্রতিদান ইত্যাদির কথা সংক্ষেপে হলেও উল্লেখ করা হয়েছে । কিন্তু মোশির পাঁচটি পুস্তকে (Torah or Pentateuch) এ সকল বিষয়ের কোনোরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং সেগুলিতে শুধু জাগতিক লাভক্ষতির বিষয়ই উল্লেখ করা হয়েছে, পরকাল বা স্বর্গ-নরকের কথা কিছুই নেই। ঈশ্বর সদাপ্রভুর নির্দেশ যারা পালন করবে তাদের পৃথিবীতে কত প্রকারের সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হবে এবং যারা ঈশ্বরের নির্দেশ না মানবে পার্থিব জীবনে তাদের কি কি শাস্তি বা কষ্ট দেওয়া হবে সেগুলিই শুধু উল্লেখ করা হয়েছে।
(৬) মথিলিখিত সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ে যীশু খৃস্টের বংশাবলি পত্রে সরুববাবিলের পরে- সরুববাবিল ও যোষেফ-এর মধ্যে- নয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছ; যাদের কারো কোনোরূপ উল্লেখ পুরাতন নিয়মের কোথাও নেই।
এরূপ আরো অগণিত উদাহরণ বাইবেলের পুস্তকাদিতে রয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে নেই এমন কোনো তথ্য পরবর্তী ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ করা হলে তা কখনোই পরবর্তী গ্রন্থের ঐশ্বরিকত্বের দাবি মিথ্যা বলে প্রমাণ করে না। তাই যদি হয়, তবে প্রমাণিত হবে যে, ইঞ্জিল বা সুসমাচারগুলি মিথ্যা, কারণ এতে অনেক কথা আছে যা তোরাহ বা পুরাতন নিয়মের অন্য কোনো পুস্তকে নেই। বস্তুত, পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে সবকিছুই উল্লেখ থাকা জরুরী নয়।
তৃতীয়ত, কুরআনের মধ্যে বাইবেলের পুস্তকাবলিতে উল্লিখিত তথ্যাদির বিপরীত বা বিরোধী তথ্য উল্লেখ করার কারণে কুরআনের প্রামাণ্যতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ খৃস্টানদের নেই; কারণ এ জাতীয় বৈপরীত্য ও বিরোধিতা বাইবেলের মধ্যেই বিদ্যমান। এরূপ বৈপরীত্য ও বিরোধিতা বিদ্যমান রয়েছে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের এক পুস্তকের সাথে অন্য পুস্তকের, নতুন নিয়মের এক পুস্তকের সাথে অন্য পুস্তকের এবং নতুন নিয়মের সাথে পুরাতন নিয়মের। প্রথম অধ্যায়ে পাঠক কিছু নমুনা দেখেছেন। তোরাহ-এর তিন সংস্করণ বা পাণ্ডুলিপি, অর্থাৎ হিব্রু, গ্রীক ও শমরীয় সংস্করণের মধ্যেও অনুরূপ কঠিন বৈপরীত্য ও বিরোধিতা রয়েছে। অনুরূপভাবে নতুন নিয়মের চার সুসমাচার: মথি, মার্ক, লূক ও যোহনের বর্ণণার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক বৈপরীত্য। সামান্য ছোট্ট ছোট্ট বিষয়ের বর্ণনায় একেকজন একেক রকম বর্ণনা দিয়েছেন, যেগুলি অনেক সময় সাংঘর্ষিক।
খৃস্টান ধর্মগুরু ও প্রচারকগণ নিজেদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে বিদ্যমান অগণিত ব্যাখ্যাতীত বৈপরীত, অসামঞ্জস্য, ভুলভ্রান্তি দেখেও দেখেন না, কিন্তু সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করতে কুরআন কারীমের বিষয়ে এ আপত্তি উত্থাপন করেন। আর প্রকৃত সত্য হলো, বাইবেলের পুরাতন বা নতুন নিয়মের কোনো তথ্যের সাথে কুরআনের কোনো তথ্যের বৈপরীত্যের কারণে কুরআনের ঐশ্বরিকতব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই; কারণ কুরআন সম্পূর্ণ পৃথক স্বয়ংসম্পূর্ণ আসমানী পুস্তক যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে। উপরন্তু বাইবেলের বিপরীতে কুরআন যে সকল তথ্য প্রদান করেছে তা কুরআনের সত্যতা ও বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান বিকৃতির অন্যতম প্রমাণ।


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:
হাদীস বিষয়ে পাদরিগণের আপত্তি পর্যালোচনা
৩. ২. ১. হাদীস বর্ণনাকারীগণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি
হাদীস বিষয়ে পাদরিগণ যে সকল বিভ্রান্তি ছড়ান সেগুলির অন্যতম হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর মিথ্যাচার।তারা বলেন: হাদীসের বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ, তাঁর আত্মীয়গণ এবং সহচরগণ। তাঁর পক্ষে এদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
আপত্তির পর্যালোচনা ও বিভ্রান্তির অপনোদন:
৩. ২. ১. ১. হাদীসের বর্ণনাকারীগণ বনাম ইঞ্জিলের বর্ণনাকারীগণ
হাদীসের বিরুদ্ধে তাদের এ বক্তব্য সামান্য একটু পরিবর্তন করলেই তাদের বিরুদ্ধেই লাগবে। এক্ষেত্রে আমরা বলব যে, সুসমাচারগুলির মধ্যে যীশুখৃস্টের যে সকল কথা, কর্ম বা অবস্থা সংকলিত হয়েছে সেগুলি বর্ণনা করেছেন তাঁর মাতা, তাঁর কল্পিত পিতা যোষেফ এবং তাঁর শিষ্যগণ। যীশুর পক্ষে এদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়!!
এখানে আরো লক্ষণীয় যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহচরগণ যে বস্তুনিষ্ঠার সাথে তার বাণী ও জীবনী বর্ণনা করেছেন যীশুর সহচরগণ তা করেন নি। তাঁরা অতিকথন ও অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেন। যেমন চতুর্থ সুসমাচারের লেখক যোহন বলেছেন: ‘‘যীশু আরও অনেক কর্ম করিয়াছিলেন; সেই সকল যদি এক এক করিয়া লেখা যায়, তবে আমার বোধ হয়, লিখিতে লিখিতে এত গ্রন্থ হইয়া উঠিত যে, জগতেও তাহা ধরিত না।’’
নিঃসন্দেহে কথাটি একান্তই মিথ্যা এবং আপত্তিকর কাব্যিক অতিরঞ্জন। এরূপ কথা জ্ঞানীকে প্রভাবিত না করলেও সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে।
৩. ২. ১. ২. শিয়াগণের বিভ্রান্তি বনাম খৃস্টীয় বিভ্রান্ত সম্প্রদায়
হাদীসের গ্রহণযোগ্যতায় সন্দেহ সৃষ্টির জন্য পাদরিগণ সাহাবীগণের বিষয়ে দ্বাদশ ইমাম পন্থী শিয়াদের আপত্তিকর কথাবার্তা উদ্ধৃত করে সাধারণ মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেন। এর উত্তরে প্রথমত আমরা বলব যে, শিয়াদের ভিত্তিহীন প্রমাণবিহীন কথাবার্তা যদি সাধারণ মুসলিমদের জন্য মান্য করা বাধ্যতামূলক হয়, তবে খৃস্টান ধর্মের বিভিন্ন বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের কথাবার্তাও সাধারণ খৃস্টানদের মান্য করা বাধ্যতামূলক হবে। আর সেক্ষেত্রে তাঁদের ধর্মের ভিত্তিই বাতিল বলে প্রমাণিত হবে।
প্রথম খৃস্টীয় শতক থেকে খৃস্টানদের মধ্যে অগণিত দল প্রকাশিত হয়েছে যারা এমন সব কথা বলেছেন ও ধর্মবিশ্বাস প্রচার করেছেন যা মূলধারার খৃস্টানগণ কুফরী ও বিভ্রান্তি বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন কোনো কোনো সম্প্রদায় দুজন ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত; একজন কল্যাণের স্রষ্টা এবং অন্যজন অকল্যাণের স্রষ্টা। তারা বিশ্বাস ও প্রচার করত যে, তোরাহ এবং পুরাতন নিয়মের অন্য সকল পুস্তক অকল্যাণের স্রষ্টা দ্বিতীয় ঈশ্বরের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত। মৃত্যুর পরে যীশুখৃস্ট নরকে গমন করেন। তিনি নরক থেকে (ভাতৃহন্তা আদমপুত্র) কয়িনকে এবং (সমকামী) সদোমবাসীদেরকে মুক্ত করেন এবং (নিহত আদমপুত্র) হেবল, নোহ, আবরাহাম ও অন্য সকল প্রাচীন ভাববাদী ও সৎ মানুষকে নরকের মধ্যে রেখে আসেন। মোশিকে যিনি তোরাহ দিয়েছেন এবং অন্যান্য ইস্রায়েলীয় ভাববাদীদের সাথে যিনি কথা বলেছেন তিনি ঈশ্বর নন, বরং তিনি শয়তান বা দিয়াবল। ঈসার পূর্বে যত নবী-রাসূল বা ভাববাদী আগমন করেন তাঁরা সবাই চোর ও দস্যু ছিলেন।
অনুরূপ অনেক সম্প্রদায়ের অনেক প্রকারের বিশ্বাস ছিল। নিঃসন্দেহে খৃস্টানগণ বলবেন যে, এগুলি সবই বাতিল ও কুফরী বিশ্বাস ও ভিত্তিহীন কথা; মূলধারার খৃস্টানদের বিরুদ্ধে এ সকল কথাকে দলীল হিসেবে পেশ করা যায় না। অনুরূপভাবে আমরাও বলব যে, এ সকল খৃস্টান সম্প্রদায়ের কথা যদি আপনাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা না যায় তাহলে মূল ধারার মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত মুসলিম সম্প্রদায়গুলির বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায় না।
বিশেষত সাহাবীদের বিরুদ্ধে তাদের এ সকল কথা কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশাবলির বিরোধী এবং শিয়াদের পবিত্র ইমামগণের বক্তব্যেরও বিরোধী। কুরআন বারংবার সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, সাহবীরা কখনোই ঈমান বা ইসলামের পরিপন্থী কোনো কাজ করেন নি। এখানে আমি এ বিষয়ক কিছু আয়াত উল্লেখ করছি।
৩. ২. ১. ৩. সাহাবীগণের বিষয়ে কুরআনের সাক্ষ্য
(১) সূরা তাওবায় মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। এই মহা-সাফল্য।’’
এখানে আল্লাহ প্রথম অগ্রগামী মুহাজির ও আনসারদের সম্পর্কে তাঁর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। নিঃসন্দেহে আবূ বাক্র সিদ্দীক, উমার ফারূক, উসমান যুন্নুরাইন- রাদিয়াল্লাহু আনহুম সকলেই প্রথম অগ্রগামী মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অনুরূপভাবে আলী (রা)-ও প্রথম অগ্রগামী মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এতে প্রমাণিত হলো যে, তাঁরা চারজনই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত এবং তাদের খিলাফতের বৈধতাও প্রমাণিত হলো। কাজেই চতুর্থজনের বিরুদ্ধে নিন্দা বা আপত্তি যেমন বাতিল, তেমনিভাবে প্রথম তিনজনের বিরুদ্ধে নিন্দা বা আপত্তিকর কথা এ আয়াতের ভিত্তিতে বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত হবে। অনুরূপভাবে অন্যান্য সাহাবীর বিষয়েও আপত্তি বা নিন্দা বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত হবে; কারণ তাঁরা অগ্রগামী মুহাজির-আনসার বা তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারী।
(২) সূরা তাওবার মধ্যে অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন: ‘‘যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারা আল্লাহ নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, আর তারাই সফলকাম। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছেন, স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, যেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী সুখ-শান্তি। সেথায় তারা অনন্তকাল চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহর নিকটেই আছে মহা-পুরস্কার।’’
এখানে আল্লাহ হিজরতকারী এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুমিনদের জন্য চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন: (১) তাদের মর্যাদা অধিকতর, (২) তারা সফলকাম, (৩) তাদের জন্য আল্লাহর দয়া, সন্তোষ ও জান্নাতের সুসংবাদ ও (৪) চিরস্থায়ীভাবে অনন্তকাল তাদের জান্নাতে অবস্থানের সুসংবাদ। এই স্থায়িত্বের বিষয়টির গুরুত্ব বুঝাতে সমার্থক তিনটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে: ‘স্থায়ী সুখ-শান্তি’, ‘চিরস্থায়ী’ ও ‘অনন্তকাল’।
নিঃসন্দেহে প্রথম চার খলীফা হিজরতকারী এবং আল্লাহর রাস্তায় জীবন ও সম্পদ দিয়ে জিহাদকারী মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কাজেই তাদের মর্যাদা, সফলতা, অনন্ত জান্নাতের সুসংবাদ ও তাঁদের খিলাফতের বৈধতা প্রমাণিত হলো। কাজেই তাঁদের বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য মুহাজির মুজাহিদ সাহাবীর বিরুদ্ধে আপত্তি বা নিন্দাচারের কোনো সুযোগ নেই।
(৩) সূরা তাওবার অন্য স্থানে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘কিন্তু রাসূল এবং যারা তার সাথে ঈমান এনেছে তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে; তাদের জন্যই কল্যাণ আছে এবং তারাই সফলকাম। আল্লাহ তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্ন দেশে নদী প্রবাহিত, যেথায় তারা স্থায়ী হবে, এই মহা-সাফল্য।’’
এখানে আল্লাহ মুমিন মুজাহিদ সাহাবীগণ, যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন তাঁদের জন্য কল্যাণ, সফলতা ও অনন্ত জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে চার খলিফা মুমিন মুজাহিদদের অন্যতম ছিলেন। কাজেই তাঁদের জন্য কল্যাণ, সফলতা ও অনন্ত জান্নাত এবং তাদের খিলাফতের বৈধতাও প্রমাণিত হলো। তাঁদের বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য মুমিন মুজাহিদ সাহাবীর বিরুদ্ধে আপত্তি বা নিন্দাচারের কোনো সুযোগ নেই।
(৪) আল্লাহ বলেন: ‘‘তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে ....। আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে, সৎকার্যের নির্দেশ দিবে এবং অসৎকার্যে নিষেধ করবে। সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে।’’
এখানে ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত মুহাজিরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাঁদেরকে প্রতিষ্ঠা প্রদান করলে তারা চারটি কাজ করবেন: সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত প্রদান করা, সৎকার্যে আদেশ করা এবং অসৎকার্যে নিষেধ করা। আল্লাহ খলীফা চতুষ্টয়কে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করেছিলেন এবং তাঁদের সময়ে ইসলাম বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, তাঁরা এই চারটি কর্ম আঞ্জাম দিয়েছেন। আর এতে প্রমাণিত হয়েছে যে, তাঁরা সত্যপন্থী ও সঠিক ছিলেন।
(৫) সূরা নূরে আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেনই, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবেং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য সুদৃঢ় করবেন তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্য নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার কোনো শরীক করবে না, অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা তো সত্যত্যাগী।’’
এখানে ‘তোমাদের মধ্য থেকে’ কথা থেকে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়ে যে সকল মুমিন জীবিত ও বিদ্যমান ছিলেন তাদের মধ্য থেকে কিছু মানুষকে আল্লাহ এই প্রতিশ্রুতি প্রদান করছেন। তাঁরা সবাই নয়, বরং তাদের মধ্য থেকে কিছু মানুষ ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা ‘স্থলাভিষিক্তত্ব’ লাভ করবেন।
এখানে আল্লাহ বললেন, তিনি এদেরকে ‘খলীফা’ অর্থাৎ ‘প্রতিনিধি’ বা ‘স্থলাভিষিক্ত’ বানাবেন। এথেকে জানা যায় যে, এই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে; কারণ তার পরেই তো তাঁর প্রতিনিধি বা স্থলাভিষিক্ত নিয়োগের প্রশ্ন আসে। আর এ কথা তো সুস্পষ্ট যে, তাঁর পরে কোনো নবী আসবেন না, কাজেই তাঁর প্রতিনিধিত্ব বলতে এখানে ‘নবুয়ত’ বুঝানো হয় নি, বরং ‘ইমামত’ বুঝানো হয়েছে। এখানে ‘তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন’ থেকে ... ‘তারা আমার কোনো শরিক করবে না’ পর্যন্ত সবগুলি সর্বনাম বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাঁর নবীর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরে যাদেরকে এভাবে ইমামত বা খিলাফত প্রদান করবেন তারা তিনজনের কম হবেন না; কারণ আরবীতে তিনের কমকে বহুবচন করা হয় না।
আল্লাহ বলেছেন, ‘ তিনি অবশ্যই তাদের জন্য সুদৃঢ় করবেন তাদের দীনকে....’ এখানে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তাদেরকে শক্তি, ক্ষমতা ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব প্রতিপত্তি প্রদান করবেন। এথেকে জানা যায় যে, এ সকল ইমাম বা খলীফা শক্তি, ক্ষমতা ও বিশ্বব্যাপী প্রতিপত্তি অর্জন করবেন।
আল্লাহ বলেছেন, ‘‘তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন’। এ কথা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ সকল ইমামের যুগে যে দীন প্রতিষ্ঠিত ও আচরিত হবে সে দীন আল্লাহর মনোনিত দীন।
আল্লাহ বলেছেন: ‘‘তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্য নিরাপত্তা দান করবেন’’। এ কথা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তাঁদের ইমামত, খিলাফত বা শাসনামলে তাঁরা শাস্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকবেন, তাঁরা কোনো ভয়-ভীতির মধ্যে থাকবেন না এবং ‘তাকিয়্যাহ’ আত্মরক্ষামূলক মিথ্যা কথা বলারও কোনো প্রয়োজন তাঁদের যুগে থাকবে না।
আল্লাহ বলেছেন: ‘‘তারা আমার ইবাদত করবে, আমার কোনো শরীক করবে না’’। এ কথা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাঁদের খিলাফত বা শাসনামলে তাঁরা মুমিন থাকবেন, মুশরিক হবেন না।
এভাবে এই আয়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরের চার খলিফার ইমামত বা প্রতিনিধিত্ব প্রমাণিত হয়। বিশেষভাবে প্রথম তিন খলীফা: আবূ বাক্র সিদ্দীক, উমার ফারূক এবং উসমান যুন্নুরাইন (রাদিয়ল্লাহু আনহুম)-এর ইমামত ও শাসন প্রমাণিত হয়। কেননা এই আয়াতে প্রতিশ্রুত ‘সুদৃঢ় করণ’ তাঁদের সময়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে। বড় বড় বিজয়, পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও প্রতাপ, দীনের বিজয় ও প্রকাশ এবং শান্তি ও নিরাপত্তা তাঁদের যুগে যেভাবে ছিল ৪র্থ খলীফা আলী (রা)-এর যুগে সেভাবে ছিল না। তাঁর পবিত্র যুগে তিনি বিদ্রোহী মুসলিমদের সাথে যুদ্ধবিগ্রহ করতে বাধ্য হন। ফলে বিজয় ও নিরাপত্তার ধারা ব্যাহত হয়।
এভাবে এ আয়াত দ্বারা খলীফা চুতষ্টয়ের ইমামত প্রমাণিত হয়। কাজেই প্রথম তিন খলীফা ও অন্যান্য সাহাবীদের বিরুদ্ধে শিয়াদের ভিত্তিহীন কথাবার্তা এবং শেষ দুই খলীফা উসমান (রা) ও আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে খারিজী সম্প্রদায়ের ভিত্তিহীন কথাবার্তা কুরআনের আলোকে বাতিল বলে প্রমাণিত হলো। তাদের এ সকল ভিত্তিহীন কথা দ্বারা মূলধারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করা যায় না।
(৬) হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যে সকল সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন, তাঁদের বিষয়ে সূরা ফাতহে আল্লাহ বলেন: ‘‘যখন কাফিররা তাদের অন্তরে পোষণ করত গোত্রীয় অহমিকা, অজ্ঞতা যুগের অহমিকা, তখন আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে স্বীয় প্রশান্তি দান করলেন, আর তাদেরকে তাকওয়ার বাক্যে সুদৃঢ়-স্থায়ী করলেন, এবং তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আল্লাহ সমস্ত বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখেন।’’
সূরা ফাতহের মধ্যে অন্যত্র আল্লাহ বলেন: ‘‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সাজদায় অবনত দেখবে। তাদের পরিচিতি চিহ্ন রয়েছে তাদের মুখমন্ডলে সাজদার প্রভাবে।’’
এভাবে আল্লাহ সাহাবীগণের বিষয়ে বললেন যে, তাঁরা মুমিন, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি লাভে তাঁরা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে শরিক, তাকওয়ার বাক্য তাদের সাথে চিরস্থায়ীভাবে সম্পৃক্ত এবং এর জন্য তাঁরা ছিলেন অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আল্লাহ তাঁদের প্রশংসা করেছেন যে, তাঁরা কাফিরদের বিষয়ে কঠোর এবং নিজেরদের মধ্যে সহানুভূতিশীল এবং তাঁরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় রুকু-সাজদায় রত থাকেন।
নিঃসন্দেহে অন্যান্য সাহাবীদের সাথে চার খলিফা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহচর ছিলেন এবং এ সকল বিশেষণ সবই তাঁদের জন্য প্রযোজ্য। তাঁদের বিষয়ে বা কোনো সাহাবীর বিষয়ে কেউ যদি এর বিপরীত কোনো বিশ্বাস পোষণ করে তবে তার বিশ্বাস বাতিল ও কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক।
(৭) সূরা হুজুরাতে আল্লাহ বলেন, ‘‘কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন; কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী।’’
এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, সাহাবীগণ ঈমান ভালবাসতেন এবং কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতা ঘৃণা করতেন এবং তাঁরা সৎপথ অবলম্বনকারী ছিলেন। সাহাবীদের বিষয়ে এর বিপরীত কোনো বিশ্বাস পোষণ করা কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত দ্বারা বিভ্রান্তি বলে প্রমাণিত হলো।
(৮) সূরা হাশরে আল্লাহ বলেন: ‘‘অভাবগ্রস্ত মুহাজিরগণের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে। তারাই তো সত্যপরায়ণ। মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে তারা মুহাজিদরদেকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপরে অগ্রাধিকার দেয়, নিজেরা অভাগগ্রস্ত হলেও; যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম।’’
এই আয়াতে আল্লাহ মুহাজিরদের প্রশংসায় বলেছেন যে, তাঁদের হিজরত বা দেশত্যাগ জাগতিক কোনো স্বার্থে বা উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনাতেই তাঁরা হিজরত করেন, তাঁরা আল্লাহর দীন ও তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহায্যকারী ছিলেন এবং তাঁরা কথা-কর্মে সত্যপরায়ণ ও সত্যবাদী ছিলেন। আর আনসারগণের প্রশংসায় আল্লাহ বলেছেন যে, আনসারগণ মুহাজিরদের ভালবাসতেন; মুহাজিরগণ কোনো কিছু লাভ করলে আনসারগণ খুশি হতেন এবং আনসারগণ নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও মুহাজিরদেরকে নিজেদের চেয়েও অগ্রাধিকার প্রদান করতেন।
নিঃসন্দেহে এ সকল গুণ ঈমানের পূর্ণতার সাক্ষ্য দেয়। এ সকল দরিদ্র মুহাজির আবূ বাক্র (রা)-কে বলতেন, হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা। আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, এ সকল মুহাজির সত্যবাদী ছিলেন। কাজেই আবূ বাকরের এই উপাধিও সত্য হওয়া জরুরী। আর এমতাবস্থায় আবূ বাক্রের ইমামতে সন্দেহ পোষণের কোনো সুযোগ থাকে না। মুহাজির ও আনসারগণের বিষয়ে এর ব্যতিক্রম বা বিপরীত কোনো আকীদা বা ধারণা পোষণকারী নিঃসন্দেহে কুরআন অমান্যকারী।
(৯) সূরা আল-ইমরানে আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎকার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহে বিশ্বাস কর।’’
এখানে আল্লাহ সাহাবীগণের প্রশংসায় বলেছেন যে, তাঁরা শ্রেষ্ঠ উম্মাত, তাঁরা সৎকার্যের নির্দেশ দান করতেন এবং অসৎকার্যে নিষেধ করতেন এবং তাঁরা মুমিন ছিলেন। নিঃসন্দেহে চার খলিফা এ প্রশংসিত উম্মাতের অন্যতম ছিলেন। তাঁদের বিষয়ে এর ব্যতিক্রম ধারণা বা বিশ্বাস কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক ও বাতিল।
৩. ২. ১. ৪. সাহাবীগণের বিষয়ে শিয়া ইমামগণের বক্তব্য
শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা আলী (রা) ও তাঁর বংশের যে সকল মহান ব্যক্তিকে ইমাম বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা সকলেই সাহাবীগণের সততা ও ধার্মিকতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। এখন আমি -শিয়াদের ‘পাঁচ-পবিত্র’-র সংখ্যানুসারে শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামগণ থেকে ৫টি বক্তব্য উদ্ধৃত করব।
(১) ‘নাহজুল বালাগা’ নামক গ্রন্থটি শিয়া সম্প্রদায়ের নিকট নির্ভরযোগ্য পুস্তক। এ পুস্তকে আলীর (রা) নিম্নোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে: ‘‘আল্লাহ পুরস্কৃত করুন ‘অমুককে’। তিনি (১) বক্রতাকে সোজা করেছেন, (২) মনের রোগব্যাধির চিকিৎসা করেছেন, (৩) সুন্নাত (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশুদ্ধ রীতি) প্রতিষ্ঠা করেছেন, (৪) বিদ‘আত (ইসলামের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিভ্রান্তিকর মত বা কর্ম) পশ্চাতে রেখেছেন, (৫) পরিচ্ছন্ন পোশাকে প্রস্থান করেছেন, (৬) অতি অল্প ভুলত্রুটিতে আক্রান্ত হয়েছেন, (৭) কল্যাণ অর্জন করেছেন, (৮) অকল্যাণ থেকে বিমুক্ত থেকেছেন, (৯) আল্লাহর আনুগত্য আদায় করেছেন, (১০) সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ভয় করেছেন এবং তিনি প্রস্থান করেছেন জাতিকে বহুমুখি পথের সামনে রেখে, যেখানে বিভ্রান্ত পথ পায় না কিন্তু সুপথপ্রাপ্ত নিশ্চিত হতে পারে।’’
প্রসিদ্ধ শিয়া পণ্ডিত ও ‘নাহজুল বালাগা’ গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার মাইসাম ইবনু আলী আল-বাহরানী (৬৮১হি/১২৮২খৃ) এবং ‘নাহজুল বালাগা’ গ্রন্থের অন্যান্য অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারের মতে এখানে ‘অমুক’ বলতে আবূ বাক্র (রা)-কে বুঝানো হয়েছে। আর কোনো কোনো ব্যাখ্যাকার মনে করেন যে, ‘অমুক’ বলতে এখানে ‘উমার’ (রা)-কে বুঝানো হয়েছে। এখানে আলী (রা) আবূ বাক্র (রা) বা উমারের (রা) ১০টি গুণ উল্লেখ করেছেন। এগুলি অবশ্যই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আবূ বাক্র (রা) বা উমারের (রা) মৃত্যুর পরেই আলী (রা) এ সকল গুণের কথা বলেছেন। এথেকে প্রমাণিত হয় যে, মৃত্যু পর্যন্ত তাঁরা এরূপই ছিলেন এবং আলীর স্বীকৃতি অনুসারে তাঁরা সন্দেহাতীতভাবে সত্যপরায়ণ ও সঠিক ইমাম ও খলীফা ছিলেন।
‘নাহজুল বালাগা’ গ্রন্থের ব্যাখ্যাকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, আলী (রা) এক পত্রে আবূ বাকর (রা) ও উমার (রা) সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘আল্লাহর শপথ, ইসলামে তাঁদের দুজনের মর্যাদা অত্যন্ত মহান। তাদের সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলা ইসলামের জন্য বড় কঠিন আঘাত। আল্লাহ তাঁদের উভয়কে তাঁদের মহান কর্মগুলির জন্য পুরস্কার প্রদান করুন।’’
(২) আলী ইবনু ঈসা আল-আরদাবীলী (৬৯২হি/১২৯৩খৃ) একজন প্রসিদ্ধ দ্বাদশইমাম-পন্থী শিয়া ধর্মগুরু ও পণ্ডিত ছিলেন। দ্বাদশ-ইমামপন্থী শিয়াগণ তাকে একজন নির্ভরযোগ্য পণ্ডিত বলে গণ্য করেন। তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থ ‘‘কাশফুল গুম্মাহ ফী মা’রিফাতিল আইম্মাহ’’ (ইমামদের পরিচয়ে অন্ধকারের অপসারণ)। এ পুস্তকে তিনি উল্লেখ করেছেন: ‘‘ইমাম আবূ জা’ফর মুহাম্মাদ আল-বাকির -কে তরবারীতে কারুকার্য করা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, হ্যাঁ, তা করা যায়; কারণ আবূ বাকর সিদ্দীক নিজের তরবারী কারুকার্য করাতেন। তখন বর্ণনাকারী বলেন, আপনি এভাবে আবূ বাকরকে ‘সিদ্দীক’ (মহা-সত্যপরায়ণ ও সর্বোচ্চ ধার্মিক) উপাধিতে ভূষিত করছেন? তখন ইমাম বাকির নিজ আসন থেকে উঠে দাঁড়ান এবং বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি সিদ্দীক, অবশ্যই তিনি সিদ্দীক, অবশ্যই তিনি সিদ্দীক। যে ব্যক্তি তাঁকে সিদ্দীক বলবে না আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কোনো কথাই সত্য বলে গ্রহণ করবেন না।’’
মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-হুর্র আল-আমিলী (১১০৪হি/১৬৯৩খৃ) হিজরী একাদশ শতকের প্রসিদ্ধতম দ্বাদশ-ইমাম পন্থী শিয়া পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘‘আল-ফুসূল আল-মুহিম্মাহ ফী উসূলিল আইম্মাহ’’ (ইমামগণের মূলনীতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়সমূহ)। এ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (১১৪হি) কিছু মানুষকে দেখতে পান যে, তারা আবূ বাকর উমার ও উসমানের () সমালোচনা করছেন। তিনি তাদেরকে বলেন, (কুরআনে মুমিনদেরকে তিন দলে বিভক্ত করা হয়েছে, মুহাজির, আনসার ও পরবর্তী মুমিন যারা মুহাজির ও আনসারদের জন্য দু‘আ করেন ও তাঁদের ভালবাসেন) তোমরা (এ তিন দলের) কোন্ দলের তা আমাকে বল। তোমরা কি মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত যাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘মুহাজিরগণ যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে’’ ? তারা বলেন: না, আমরা তা নই।
তখন তিনি বলেন, তাহলে তোমরা কি আনসারদের অন্তর্ভুক্ত যাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে তারা মুহাজিদরদেকে ভালবাসে’’ ? তারা বলে, না আমার তাও নই।
তখন তিনি বলেন, তোমরা নিজেরাই সাক্ষ্য দিলে যে, কুরআনে উল্লিখিত এই দুই দলের সাথে তোমাদের কোনোরূপ সম্পর্ক নেই। আর আমি তোমাদের বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, কুরআনে উল্লিখিত তৃতীয় দলের সাথেও তোমাদের সম্পর্ক নেই, যাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং ঈমানের ক্ষেত্রে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন। আর আপনি আমাদের অন্তরে মুমিনগণের বিরুদ্ধে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ বা অমঙ্গল ইচ্ছা রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় আপনি পরম দয়ার্দ্র ও মহা করুণাময়।’’

এখানে ইমাম মুহাম্মাদ বাকিরের সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা) সত্যিকার ‘সিদ্দীক’ বা মহা-সত্যপরায়ণ ও সর্বোচ্চ ধার্মিক ছিলেন। যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করবে সে দুনিয়াতে ও আখিরাতে মিথ্যাবাদী। যে ব্যক্তি আবূ বাকর সিদ্দীক (রা), উমার ফারূক (রা) বা উসমান যুন্নুরাইন (রা)-এর বিষয়ে সমালোচনা বা আপত্তিকর কথা বলবে সে কুরআন প্রশংসিত তিন দলের বহির্ভুত বিভ্রান্ত বলে গণ্য হবে।
আল্লাহ আমাদেরকে সাহাবীগণের () বিষয়ে কুধারণা পোষণ থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁদের প্রতি ভালবাসার উপর আমাদের মৃত্যু দান করুন।
৩. ২. ২. হাদীস সংকলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি
পাদরিগণ বলেন: হাদীসের সংকলকগণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা ও অলৌকিক কার্যাবলি স্বচক্ষে দেখেন নি এবং তাঁর কথাবার্তাও সরাসরি শুনেন নি। বরং মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর ১০০ বা ২০০ বৎসর পরে বহুমুখে লোকপরম্পরায় বর্ণিত এ সকল কথা শ্রবণ করেছেন এবং সংকলন করেছেন এবং তারা এরূপ বর্ণনার অর্ধেকই অগ্রহণযোগ্যতার কারণে বাতিল করে দিয়েছেন।
আপত্তির পর্যালোচনা ও বিভ্রান্তির অপনোদন
এ আপত্তির পর্যালোচনায় আমরা প্রথমে ইয়াহূদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভরতার বিষয় আলোচনা করব। এরপর হাদীস সংকলনে মুসলিম উম্মাহর মূলনীতি আলোচনা করব। অতীতকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সকল যুগে প্রায় সকল ইয়াহূদী ও খৃস্টান লিখিত ধর্মগ্রন্থের (বাইবেলের) মতই অলিখিত মৌখিক বর্ণনার (tradition) উপর নির্ভর করেছেন। উপরন্তু ইয়াহূদীরা লিখিত ধর্মগ্রন্থ বা বাইবেলের চেয়েও অধিকতর নির্ভর করেন অলিখিত মৌখিক বর্ণনার উপর। ক্যাথলিক খৃস্টানগণ লিখিত ধর্মগ্রন্থ বা বাইবেল ও অলিখিত মৌখিক বর্ণনা উভয়কেই সমান গ্রহণযোগ্য বলে বিশ্বাস করেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, উভয় প্রকারের বর্ণনাই সমানভাবে গ্রহণ করতে হবে এবং ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে উভয়ের উপরেই সমানভাবে নির্ভর করতে হবে।
৩. ২. ২. ১. ইয়াহূদী ধর্মে হাদীস বা মৌখিক বর্ণনা
ইয়াহূদীগণ তাদের ধর্মীয় বিধান বা শরীয়ত (Law) দুই ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম ভাগ লিখিত শরীয়ত (scriptural laws), যাকে তারা তোরাহ বলত এবং দ্বিতীয় ভাগ মৌখিক শরীয়ত (oral laws), যেগুলি ধর্মগুরু ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের (elders) মাধ্যমে যুগ পরম্পরায় তাদের নিকট পৌঁছেছে। তারা দাবি করেন যে, সদাপ্রভু ঈশ্বর মোশিকে সিনাই পর্বতে এ দু প্রকার বিধানই প্রদান করেন। আমাদের নিকট এক প্রকারের বিধান লিখিতভাবে পৌঁছেছে এবং দ্বিতীয় প্রকারের বিধান ধর্মগুরুদের মাধ্যমে মৌখিকভাবে পৌঁছেছে। এজন্য তারা বিশ্বাস করেন যে, উভয় প্রকারের বিধানই সমান গুরুত্বপূর্ণ, উভয়ই ঈশ্বরের পক্ষ থেকে এবং উভয়কেই গ্রহণ করতে হবে। বরং তারা দ্বিতীয় প্রকার বিধান বা অলিখিত মৌখিকভাবে বর্ণিত বিধানকেই অধিকতর গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রদান করেন। তারা বলেন, লিখিত বিধান (scriptural laws) অনেক স্থানেই অসম্পূর্ণ ও অবোধগম্য। কাজেই মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভর না করে কেবলমাত্র লিখিত বিধান পরিপূর্ণভাবে ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে না। মৌখিক বর্ণনাগুলি সুস্পষ্ট ও পূর্ণতর। সেগুলি লিখিত বিধানের ব্যাখ্যা করে এবং পূর্ণতা প্রদান করে। একারণে লিখিত বিধানের বা তাওরাতের কোনো অর্থ মৌখিক বিধান, অর্থাৎ tradition বা হাদীসের বিপরীত হলে ইয়াহূদীগণ তা প্রত্যাখ্যান করেন।
ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ যে, ইয়াহূদীদের থেকে ঈশ্বর যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছেন, তা লিখিত বিধান পালনের জন্য নয়, বরং এ সকল মৌখিক লোখমুখে প্রচারিত বিধিবিধানের জন্য। এভাবে তারা প্রকৃতপক্ষে লিখিত বিধান বা তোরাহকে বাতিল বলে পরিত্যাগ করেন এবং অলিখিত বা মৌখিকভাবে প্রচলিত বিধানগুলিকেই তাদের ধর্মের ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। এ সকল মৌখিক বর্ণনার ভিত্তিতেই ইয়াহূদীগণ ঈশ্বরের বাণীর ব্যাখ্যা করেন, যদিও অনেক স্থানেই এ সকল মৌখিক বর্ণনার অর্থ লিখিত কিতাব বা তাওরাতের সাথে সাংঘর্ষিক।
যীশু খৃস্টের সময়ে এ বিষয়ে তাদের অবস্থা সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ে পৌঁছায়। এ সময়ে তারা লিখিত তাওরাতের চেয়ে মৌখিক বর্ণনা ও জনশ্রুতিকে অনেক বেশি মর্যাদা দিতেন। যীশু তাদেরকে মৌখিক বর্ণনার ভিত্তিতে ঈশ্বরের বাণী বাতিল করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। যীশুর যুগের পরে তারা মৌখিক বর্ণনার বিষয়ে আরো বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে থাকেন। ইয়াহূদীদের গ্রন্থাবলিতে তারা উল্লেখ করেন যে, মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে প্রাপ্ত ধর্মগুরুগণের বা আলিমগণের বাণী তোরাহ-এর বাণীর চেয়েও বেশি প্রিয়। তোরাহ-এর বাণী কোনোটি সুন্দর ও কোনোটি অসুন্দর। আর পণ্ডিতগণ বা ধর্মগুরুদের বাণী সবই সুন্দর। ধর্মগুরুগণের বাণী ভাববাদীগণের বাণীর চেয়েও সুন্দরতর।
এরূপ আরো অনেক কথা তাদের পুস্তকাদিতে রয়েছে, যেগুলি থেকে জানা যায় যে, তারা লিখিত তোরাহ-এর চেয়ে অলিখিত মৌখিক বর্ণনাগুলিকে বেশি মর্যাদা প্রদান করেন। এ সকল মৌখিক বর্ণনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে, তারা সেভাবেই ঈশ্বরের বাণীর ব্যাখ্যা করেন। এভাবে মনে হয় যে, তাদের বিশ্বাসে লিখিত তোরাহ প্রাণহীন দেহের মত, আর মৌখিক বর্ণনাসমূহ আত্মার মত, যদ্বারা তোরাহ প্রাণলাভ করে।
ইয়াহূদীরা বলেন, সদাপ্রভু ঈশ্বর যখন মোশিকে তোরাহ প্রদান করেন, তখন তোরাহ-এর অর্থও তাঁকে প্রদান করেন। তিনি প্রথমটিকে লিখে রাখতে নির্দেশ দেন। আর দ্বিতীয়টির বিষয়ে নির্দেশ দেন যে, তা মুখস্থ রাখতে হবে এবং একমাত্র মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমেই তা সবাইকে জানাতে হবে।
মোশি উভয় প্রকারের বিধান নিয়ে পর্বত থেকে ফিরে আসেন। ইস্রায়েল সন্তানগণকে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি পর্বত থেকে ফিরে এসে হারোণ ও তার পুত্রদ্বয় ইলীয়াসর (Eleazar) ও ঈথামর (Ithamar) ও ৭০ জন ধর্মগুরু বা গোত্রপতিকে উভয় প্রকারের বিধান শিক্ষা দেন। তারা সকল ইস্রায়েল সন্তানকে এ বিষয়ে জানান। এভাবে তারা লিখিত বিধানকে লিখিতভাবে ও মৌখিক বিধানকে মৌখিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দেন। এভাবে পরবর্তী প্রায় দেড় হাজার বৎসর যাবৎ তা মৌখিকভাবে প্রচারিত হয়। অবশেষে ১৫০ খৃস্টাব্দের দিকে পবিত্র যিহূদা বা যিহূদা হা-কাদোশ (Judah ha-Nasi/ Judah ha-qadosh: 135-220AD) এ সকল মৌখিক বর্ণনা গ্রন্থাকারে সংকলন করতে শুরু করেন। প্রায় ৪০ বৎসর যাবৎ অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি এগুলি গ্রন্থাকারে সংকলন করেন এবং গ্রন্থের নামকরণ করেন ‘মিশনা’ (Mishna)।’’ মূসা আলাইহিস সালাম থেকে প্রায় ১৭০০ বৎসর যাবৎ শুধুমাত্র লোকমুখে প্রচলিত ও প্রচারিত এ সকল মৌখিক বর্ণনার সমষ্টি এ মিশনা (Mishna) গ্রন্থ।
এই পুস্তকটি ‘মিশনা’ রচিত হওয়ার পর থেকে ইয়াহূদীদের মধ্যে তা অত্যন্ত প্রসিদ্ধি ও প্রচলন লাভ করে। তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তা শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান করতে থাকেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, এর মধ্যে যা কিছু আছে সবই লিখিত তাওরাতের মতই আল্লাহর নিকট থেকে পাওয়া এবং তা মান্য করা অত্যাবশ্যক।
বড় বড় ইয়াহূদী পণ্ডিত এই পুস্তকটির দুটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন। একটি তৃতীয় খৃস্টীয় শতকে (অন্য মতে পঞ্চম শতকে) যিরূশালেমে রচিত। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থটি খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাবিলনে রচিত হয়। প্রত্যেক ব্যাখ্যাগ্রন্থকেই ‘জেমারা’ (Gemara)। জেমারার আভিধানিক অর্থ ‘পূর্ণতা’। তাদের ধারণায় এই দুই ব্যাখ্যার মাধ্যমে ‘মিশনা’ গ্রন্থটির অর্থ পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়। এজন্য এগুলিকে ‘জেমারা’ বলা হয়। মিশনার মূল পাঠ ও ব্যাখ্যাকে একত্রে ‘তালমূদ’ (study or learning) বলা হয়। উভয় ব্যাখ্যাকে পৃথক করার জন্য প্রথমটিকে বলা হয় ‘যিরূশালেমীয় তালমূদ’ বা ‘ফিলিস্থিনী তালমূদ’ (Palestinian Talmud/Talmud Yerushalmi) এবং দ্বিতীয়টিকে বলা হয় ‘ব্যাবিলনীয় তালমূদ (Babylonian Talmud/Talmud Bavli)।
মিশনার ব্যাখ্যা জেমারাগুলি অবাস্তব ভিত্তিহীন কাহিনীতে পরিপূর্ণ। তবে ইয়াহূদীদের নিকট তা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও পবিত্র। এগুলির পঠন ও পাঠন তাদের মধ্যে অতি প্রচলিত। সকল সমস্যায় তারা এগুলির স্মরণাপন্ন হন। তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই পুস্তকই তাদের পথের দিশারী।
বর্তমানে ইয়াহূদীদের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মাচারের ভিত্তি মূলত এ দুই তালমূদের উপরে, যেগুলি তাওরাত ও পুরাতন নিয়মের অন্যান্য পুস্তক থেকে অনেক দূরবর্তী। তারা যিরুশালেমের তালমূদের চেয়ে ব্যাবেলনীয় তালমূদকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, ইয়াহূদীগণ ১৭০০ বৎসর যাবৎ শুধুমাত্র মৌখিকভাবে প্রচলিত ও প্রচারিত বর্ণনার উপরে নির্ভর করেন এবং লিখিত তাওরাত ও পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলির চেয়ে এগুলিকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিশ্বাস করেন। আমরা দেখেছি যে, এ ১৭০০ বৎসরের মধ্যে তারা অনেকবার ভয়ঙ্কর ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা, গণবন্দীদশা ও গণবিতাড়ণের শিকার হন। যে সকল ঘটনায় তাদের লিখিত ধর্মগ্রন্থই বিলুপ্ত হয়ে যায়, কাজেই মৌখিক বর্ণনার সূত্র আর থাকে কোথায়? আর এরূপ মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভরকরিগণ কিভাবে মুসলিমদের মৌখিক বর্ণনার বিষয়ে আপত্তি করেন? মুসলিমরা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের মাত্র দুই শতাব্দীর মধ্যে মৌখিক বর্ণনাগুলি সংকলন করেছেন। এ দুশ বৎসরও তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলি লিখে রেখেছেন, এগুলির সূত্র রক্ষা করেছেন এবং এগুলির বিশুদ্ধতা বিচারে বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করেছেন।
৩. ২. ২. ২. খৃস্টধর্মে হাদীস বা মৌখিক বর্ণনা
অলিখিত মৌখিক বর্ণনা বা শ্রুতির উপরে নির্ভর করার ক্ষেত্রে ইয়াহূদীদের অবস্থা আমরা জানতে পারলাম। এবার আসুন এ বিষয়ে প্রাচীন খৃস্টানদের অবস্থা পর্যালোচনা করি। খৃস্টীয় তৃতীয়-চতুর্থ শতকের প্রসিদ্ধতম খৃস্টান ধর্মযাজক ও ঐতিহাসিক ইউসিবিয়াস প্যাম্ফিলাস (Eusebius Pamphilus) (২৬৩-৩৩৯খৃ)। তাঁর রচিত ‘যাজকীয় ইতিহাস’ (Ecclesisatical History) প্রথম তিন শতকের খৃস্টান ধর্মের ইতিহাস জানার জন্য একটি মৌলিক গ্রন্থ। ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাই পুস্তকটিকে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত বলে গ্রহণ করেছেন। ইউসিবিস তার এ গ্রন্থে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রথম তিন শতাব্দীর খৃস্টান ধর্মগুরুগণ মূলত মৌখিক বর্ণনার উপরেই নির্ভর করতেন। তাঁরা খৃস্টীয় ধর্ম বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা ও নসীহতের ক্ষেত্রে লিখিত গ্রন্থ, সুসমাচার, পত্র ইত্যাদির চেয়ে মৌখিক বর্ণনা বা শ্রুতির উপরেই বেশি নির্ভর করতেন। এ বিষয়ে তিনি অনেক উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। এখানে সামান্য কয়েকটি উল্লেখ করছি।
তৃতীয় শতকের প্রসিদ্ধতম ধর্মগুর ক্লিমেন্টের (Clement of Alexadria) আলোচনা প্রসঙ্গে ইউসিবিস বলেন, যীশুর প্রেরিত শিষ্য যাকোব (James)-এর বর্ণনায় ক্লিমেন্ট পিতা-পিতামহদের বা পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত মৌখিক বর্ণনা (tradition)-এর নির্ভর করে অনেক তথ্য লিখেছেন। তিনি বলেছেন যে, তিনি এ সকল তথ্য যাদের থেকে শিখেছেন তাদের একজন ছিলেন সিরিয়, যিনি গ্রীসে বসবাস করতেন। আরেকজন ছিলেন আসিরিয়। আরেকজন ছিলেন ফিলিস্তিনে বসবাসরত হিব্রু পণ্ডিত। তবে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন তিনি একজন গুরুর উপর যিনি মিসরে আত্মগোপন করে ছিলেন। তিনিই ছিলেন তার শিক্ষকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর পরে তিনি আর কোনো শিক্ষক সন্ধান করেন নি। পিতর (Peter), যাকোব (James), যোহন (John) এবং পৌল (Paul) থেকে যে সকল শিক্ষা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে তাদের নিকট পৌঁছেছে, সে সকল বর্ণনা তাঁরা মুখস্থ করেছেন।
দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত খৃস্টান ধর্মগুরু আরিনাউস (Irenaeus) থেকে ইউসিবিস উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি মূলত মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভর করতেন। তিনি তার মৌখিক বর্ণনা পোলিকার্পের (St. Polycarp, Bishop of Smyrna c. 69-155) ও অন্যান্যদের মুখ থেকে সংগ্রহ করেন। আরিয়ানুস গৌরব করে বলতেন যে, কোনো কিছু কাগজে লিখে রাখার বদ-অভ্যাস তার ছিল না। প্রথম থেকেই তার অভ্যাস ছিল সব কিছু শুনে হৃদয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এন্টিয়কের দ্বিতীয় বিশপ ইগনাটিয়াস (Ignatius) এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন চার্চমন্ডলীকে উজ্জীবিত করেন এবং তাদেরকে মৌখিক বর্ণনাগুলি অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে গ্রহণ করতে ও সেগুলির উপর নির্ভর করতে উপদেশ দেন।
ইউসিবিস লিখেছেন যে, প্যাপিয়াস (Papias) তার পুস্তকের ভূমিকায় লিখেছেন যে, পূর্ববর্তী গুরুগণ (elders) থেকে তার নিকট যা কিছু পৌঁছেছে তা সবকিছু তিনি মুখস্থ ও সংকলন করেছেন। তিনি আরো লিখেছেন যে, মানুষদের মুখ থেকে শ্রুত বা মৌখিক বর্ণনা থেকে তিনি যে কল্যাণ লাভ করেছেন সেরূপ কল্যাণ লিখিত পুস্তক (সুসমাচারগুলি) থেকে লাভ করতে পারেন নি।
ইউসিবিস আরো লিখেছেন যে, হেজিসিপাস (Hegesippus) চার্চের ইতিহাস রচনায় একজন প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ছিলেন। তার রচনাবলি থেকে অনেক তথ্যই পরবর্তীরা গ্রহণ করেছেন। তিনি এগুলি মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন। মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে প্রেরিতগণের যে সকল নীতিমালা (Apostolic Doctrine) তিনি পেয়েছিলেন, সেগুলিকে সহজ ভাষায় তিনি পাঁচটি পুস্তকে সংকলিত করেছেন।
অন্যত্র তিনি লিখেছেন যে, বিভিন্ন চার্চের বিশপগণ সকলেই নিস্তারপর্ব (Passover) বিষয়ে বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে প্রাপ্ত মৌখিক বর্ণনার উপরেই নির্ভর করেছেন। আলেকজেন্ড্রীয় ক্লিমেন্ট (Clement of Alexadria), যিনি ছিলেন প্রেতিগণের শিষ্যদের শিষ্য, তিনি নিস্তারপর্ব (Passover) বিষয়ে যে পুস্তিকা রচনা করেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর বন্ধুগণ তাঁকে অনুরোধ করেন যে, তিনি মৌখিক যে সকল বর্ণনা পাদরি ও বিশপগণ থেকে শ্রবণ করেছেন সেগুলি লিপিবদ্ধ করতে, যেন পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা তা থেকে উপকৃত হতে পারে।
ক্যাথলিক জন মিলনার ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত তার পুস্তকের ১০ম পত্রে- যে পত্রটি তিনি জেমস ব্রাউনের কাছে লিখেছিলেন- সেই পত্রে বলেন যে, ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাস শুধু ঈশ্বরের লিখিত বাণী (Scripture)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আরো প্রশস্ত। লিখিত ও অলিখিত সকল বাণী, অর্থাৎ বাইবেলের পুস্তকাদি এবং মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে প্রাপ্ত বাণীগুলিকে ক্যাথলিক চার্চ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছে সেগুলি ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি। আরিনাউস লিখেছেন যে, সত্যের সন্ধানীদের জন্য এর চেয়ে সহজতর কোনো বিষয় আর নেই যে, তারা সকল চার্চে মৌখিক বর্ণনাগুলির অনুসন্ধান করবেন, বিভিন্ন জাতির ভাষা যদিও ভিন্ন, তবে অলিখিত মৌখিক বর্ণনা ও রীতি সকল স্থানেই একইরূপ। কারণ প্রেরিতগণ এগুলি মানুষদের শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং মানুষেরা এগুলিকে ক্যাথলিক চার্চকে প্রদান করে।
জন মিলনার উক্ত পত্রে আরো বলেন, টার্টুলিয়ান (Tertullian) লিখেছেন যে, ধর্মের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিভ্রান্তি (heresy) সৃষ্টিকারী বিভ্রান্তদের (heretics) অভ্যাসই যে, তারা পবিত্র পুস্তক বাইবেল আঁকড়ে ধরে এবং বাইবেল থেকে প্রমাণাদি পেশ করে। তারা বলে, পবিত্র পুস্তক বা বাইবেল ছাড়া অন্য কোনো কিছুকেই ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না বা তার ভিত্তিতে কিছু বলা যাবে না। এভাবে তারা শক্তিমানদেরকে দুর্বল বানিয়ে ফেলে, দুর্বলদেরকে তাদের জালের মধ্যে আটকে ফেলে এবং মধ্যবর্তীদের অন্তরের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করে। এজন্য আমরা বলছি যে, এদেরকে বাইবেল দিয়ে বিতর্ক করতে সুযোগ দিবেন না। কারণ, মগজ ও পেট ব্যাথা করা ছাড়া বাইবেল দিয়ে বিতর্ক করে কোনো ফায়দা হবে না। এজন্য পবিত্র পুস্তক বা বাইবেলের উপর নির্ভর করার পন্থা ভুল; কারণ বাইবেলের পুস্তকাদি থেকে কিছু বের করা যায় না। যদি কিছু পাওয়া যায়ও তবে তা অসম্পূর্ণ। বস্তুত, খৃস্টধর্মের বিধিবিধান, ধর্মবিশ্বাস, যেগুলির ভিত্তিতে আমরা খৃস্টান হয়েছি এবং খৃস্টান ধর্মের সকল বিবরণ কেবলমাত্র মৌখিক বর্ণনার মধ্যেই পাওয়া যায়।
মিলনার আরো বলেন, ওরিগেন (Origen) বলেছেন, যারা বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দেয় এ সকল মানুষকে গ্রহণ করা বা মূল্যায়ন করা আমাদের উচিত নয় এবং ঈশ্বরের চার্চমন্ডলীগুলি যুগ-পরম্পরার বর্ণনাধারার মাধ্যমে আমাদেরকে যে বর্ণনা প্রদান করেছেন তার বাইরে কোনো কিছু বিশ্বাস করা আমাদের উচিত নয়। আর ব্যাসিলাস লিখেছেন যে, চার্চের মধ্যে অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলি আলোচনা-উপদেশে ব্যবহার করা হয়। এগুলির কিছু পবিত্র বাইবেল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আর কিছু মৌখিক বর্ণনা থেকে নেওয়া হয়েছে। ধর্মের মধ্যে উভয় বিষয়ের গুরুত্ব ও শক্তি সমান। বিভ্রান্তদের (heretics) বিরুদ্ধে এপিফান্স যে পুস্তক রচনা করেন তার মধ্যে তিনি বলেন, আমাদেরকে অবশ্যই মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভর করতে হবে; কারণ বাইবেলের মধ্যে সব কিছু পাওয়া যায় না।
মিলনার বলেন, ক্রীযাস্টম (John Chrysostom) বলেছেন, প্রেরিতগণ সব কিছু লিখিতভাবে প্রচার করেন নি। বরং অনেক বিষয় তারা অলিখিতভাবে বা শুধু মৌখিকভাবে প্রচার করেছেন। লিখিত ও অলিখিত উভয় প্রকারের শিক্ষাই সমান গ্রহণযোগ্য। এজন্য আমাদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, চার্চের বর্ণনাই ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি। কোনো বিষয় যদি মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তবে সে বিষয়ে আমরা আর কিছু দাবি করি না। আর অগাস্টাইন (St. Augustine) লিখেছেন, অনেক ধর্মীয় বিষয়ের লিখিত কোনো প্রমাণ নেই, এ সকল বিষয়ে কেবল মৌখিক বর্ণনার উপরেই নির্ভর করতে হয়। সাধারণ চার্চ অনেক বিষয়ে স্বীকৃতি দিয়েছে যে, সেগুলি প্রেরিতগণের শিক্ষা, যদিও তা লিখিত নয়।
ইয়াহূদী পণ্ডিত রাববী মোশি কোদসী অনেক প্রমাণ উল্লেখ করেছেন যে, মৌখিক বর্ণনার সহযোগিতা গ্রহণ ছাড়া বাইবেলের বক্তব্য বুঝা সম্ভব নয়। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের গুরুগণ সর্বদা এ নীতি অনুসরণ করেছেন।
বস্তুত খৃস্টধর্মের মৌলিক ধর্মবিশ্বাসের অধিকাংশ বিষয়ই সুসমাচার থেকে পাওয়া যায় না, বরং একান্তভাবেই মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভর করে এ সকল বিশ্বাস পোষণ করা হয়। যেমন, সারবস্তু ও মূলে (Substance and essence) পুত্র (যীশুখৃস্ট) পিতার (ঈশ্বরের) সমান, পবিত্র আত্মা পিতা ও পুত্র উভয়ের থেকে নির্গত, খৃস্টের একটি অস্তিত্ব এবং দুটি প্রকৃতি, খৃস্টের দুটি ইচ্ছা ছিল: মানবীয় ও ঐশ্বরিক, খৃস্ট মৃত্যুর পরে নরকে প্রবেশ করেন ইত্যাদি। অনুরূপ অনেক কাল্পনিক ‘ধর্মবিশ্বাস’ তাদের রয়েছে। এ সকল বিশ্বাস এরূপ বাক্যে বা শব্দে স্পষ্টত নতুন নিয়মের কোথাও নেই। মৌখিক বিবরণ বা চার্চীয় প্রচলনই এ সকল বিশ্বাসের একমাত্র ভিত্তি।
ড. ব্রেট বলেন, মুক্তির জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা সবকিছু লিখিত হয় নি। বরং প্রেরিতগণ কিছু বিষয় লিখিত প্রচার করেছেন এবং কিছু বিষয় মৌখিক প্রচার করেছেন। যারা উভয় প্রকারের বাণী সংরক্ষণ না করে তারা দুর্ভাগা। ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে মৌখিক বর্ণনাও লিখিত বাণীর মত প্রামাণ্য। বিশপ মোনেক বলেন: প্রেরিতগণের মৌখিক বক্তব্য তাদের লিখিত বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গ্লিন্ক ভিরতে বলেন, কোন্ সুসমাচার গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য সে বিষয়ক বিতর্ক একমাত্র মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হয়। মৌখিক বর্ণনাই সকল বিতর্কে সমাধানের ভিত্তি।
বিশপ মানিসিক সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, ঈশ্বর ধর্মের মধ্যে ৬০০ বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং চার্চগুলিতে তা পালিত হয়। এগুলির একটি বিষয়েও বাইবেলের কোথাও কোনো বর্ণনা বা শিক্ষা নেই বলে স্বীকার করতে হবে। এগুলির বিষয়ে কেবলমাত্র মৌখিক বর্ণনার উপরই নির্ভর করা হয়েছে।
উইলিয়াম মূর বলেছেন: প্রাচীন খৃস্টানদের নিকট ধর্মবিশ্বাসের মূলনীতিসমূহের কোনো লিখিতরূপ ছিল না। মুক্তির জন্য যে বিশ্বাসের প্রয়োজন তার কোনো লিখিতরূপ ছিল না। শিশুদেরকে এবং যারা খৃস্টান ধর্মে দিক্ষিত হতেন তাদেরকে মৌখিকভাবে এগুলি শিক্ষা দেওয়া হতো।
৩. ২. ২. ৩. ইসলামী শরীয়তে হাদীস
উপরের আলোচনায় আমরা ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের হাদীস নির্ভরতা বা মৌখিক বর্ণনার (tradition) উপর নির্ভরতার বিষয়ে জানতে পারলাম। এখন পাঠক চিন্তা করুন! যারা ১৭০০ বৎসর যাবৎ মৌখিকভাবে প্রচারিত বিষয়কে লিখিত তাওরাতের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করেন এবং যারা তিন-চার শত বৎসর যাবৎ মুখে মুখে প্রচারিত ও বর্ণিত বিষয়াবলিকে লিখিত ইঞ্জিলের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করেন এবং যারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল ভিত্তি এরূপ বর্ণনার উপর স্থাপন করেন তাদের পক্ষে কি মুসলিমদের হাদীসের বিষয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপন করা চলে?
বিশেষত সাহাবীগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহ হাদীস বর্ণনা, মুখস্থকরণ, লিপিবদ্ধকরণ ও সংরক্ষণে বিশেষ সতর্কতা ও বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা অবলম্বন করেছেন। এ বিষয়ে মুসলিমগণ অত্যন্ত কড়াকড়ি আরোপ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘‘তোমরা আমার হাদীস বর্ণনা করা থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকবে, শুধুমাত্র যা তোমরা নিশ্চিতরূপে জান তা ছাড়া কিছু বলবে না। কারণ, যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।’’
এই হাদীসটি ইসলামী পরিভাষায় ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের। যে হাদীস বহুসংখ্যক সাহাবী থেকে বহুসংখ্যক তাবিয়ী বর্ণনা করেছেন এবং এভাবে অগণিত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে তাকে ‘মুতাওয়াতির’ বলা হয়। এই হাদীসটি ৬২ জন সাহাবী থেকে বর্ণিত। এদের মধ্যে ১০ জন প্রসিদ্ধ সাহাবী রয়েছেন যাঁদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের বিশেষ সুসংবাদ প্রদান করেছেন।
এ কারণে প্রথম প্রজন্ম থেকেই ‘হাদীস’ বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ও শিক্ষা গ্রহণ ও মুখস্থ করার বিষয়ে মুসলিমগণ অত্যন্ত আগ্রহ ও সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। সকল যুগেই কুরআনের বিষয়ে মুসলিমদের আগ্রহ-উদ্দীপনা যেমন বাইবেলের বিষয়ে খৃস্টানদের আগ্রহ-উদ্দীপনা চেয়ে অনেক বেশি, ঠিক তেমনি সকল যুগেই হাদীসের বিষয়েও মুসলিমদের আগ্রহ-উদ্দীপনা খৃস্টধর্মীয় হাদীসের বিষয়ে খৃস্টানদের আগ্রহ-উদ্দীপনার চেয়ে অনেক বেশি।
সাহাবীগণ বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহচরগণ তাঁর মৌখিক নির্দেশাবলি, শিক্ষা, আচরণ ও উপদেশাবলি বিশুদ্ধভাবে মুখস্থ করেছেন ও প্রচার করেছেন, কেউ কেউ কিছু বিষয় লিখেও রেখেছেন, তবে তাঁরা তাঁদের যুগে সেগুলি গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন নি। এর অন্যতম কারণ ছিল কুরআনের বিশুদ্ধ সংরক্ষণ; যেন লিখিত কোনো হাদীসকে কেউ ভুলক্রমে কুরআনের অংশ মনে করে বিভ্রান্ত না হয়।
তাবিয়ীগণ, অর্থাৎ সাহাবীগণের শিষ্যগণ বা দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিমগণ হাদীসসমূহ গ্রন্থাকারে সংকলন শুরু করেন। তাঁরা প্রাথমিকভাবে তথ্যসূত্র ও বর্ণনাকারীর পরিচয়সহ তাঁদের সমসাময়িক সাহাবীগণ ও দ্বিতীয় প্রজন্মের তাবিয়ীগণ থেকে ‘হাদীস’ সংগ্রহ ও সংকলন করেন। কিন্তু তারা সংকলিত হাদীস কোনোরূপ বিষয় বিন্যাস করে সাজান নি। তৃতীয় প্রজন্মের মানুষেরা এ সকল হাদীস বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসের মাধ্যমে সংকলন করেন।
হাদীস সংকলন, যাচাই ও বিশুদ্ধতা নির্ণয়ে মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন। ‘আসমাউর রিজাল’ বা বর্ণনাকারীগণের নাম-পরিচয়’ নামে হাদীস-বিজ্ঞানের পৃথক শাখায় (প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রন্থে) তারা সকল বর্ণনাকারীর পরিচয়, তার ধার্মিকতা, হাদীস বর্ণনায় তার নির্ভুলতার অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে সকল তথ্য সংকলন করেছেন। ‘সহীহ’ হাদীসের সংকলনগণ প্রত্যেকটি হাদীস সনদ বা বর্ণনাকারীদের নামধাম-সহ সংকলন করেছেন। গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত কতজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে তিনি হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। বুখারী সংকলিত হাদীস গ্রন্থের অনেক হাদীসই ‘তিনব্যক্তির বর্ণিত’, অর্থাৎ ইমাম বুখারী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে মাত্র তিন ব্যক্তি রয়েছেন।
বিশুদ্ধ বা সহীহ হাদীস তিন প্রকারের: (১) মুতাওয়াতির (অতি প্রসিদ্ধ), (২) মাশহূর (প্রসিদ্ধ) ও (৩) খাবারুল ওয়াহিদ (একক বর্ণনা)।
পাদরিগণ বলেন: ‘‘হাদীস সংকলকগণ এরূপ বর্ণনার অর্ধেকই অগ্রহণযোগ্যতার কারণে বাতিল করে দিয়েছেন।’’
তাদের এ কথা ভুল। কারণ হাদীস সংকলক বা মুহাদ্দিসগণ কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীস বাতিল করেন নি। তবে তারা সূত্র বিহীন দুর্বল বা অনির্ভরযোগ্য হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর ‘দুর্বল’ বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখছি যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিশুদ্ধ সনদে সংরক্ষিত সহীহ হাদীসের বিষয়ে যে আপত্তি পাদরিগণ উত্থাপন করেন তা একেবারেই ভিত্তিহীন অপপ্রচার মাত্র।
খৃস্টান সম্প্রদায়ের অবস্থা ব্যাখ্যায় এখানে প্রসঙ্গত আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। জন মিলনার ১৮৩৮ খৃস্টাব্দে মুদ্রিত তার পুস্তকে লিখেছেন: ‘‘বর্তমান সময়ের কিছু দিন আগে, জোয়ানা সুয়াতকূট নামক এক মহিলা দাবি করেন যে, আমিই সেই নারী যার বিষয়ে আদিপুস্তকের ৩য় অধ্যায়ের ১৫ আয়াতে ঈশ্বর বলেছেন: ‘‘সে তোমার মস্তক চূর্ণ করিবে (it shall bruise thy head)’’, আমার বিষয়েই প্রকাশিত বাক্যের ১২ অধ্যায়ে বলা হয়েছে: ‘‘১ আর স্বর্গমধ্যে এক মহৎ চি‎হ্ন দেখা গেল। এক জন স্ত্রীলোক ছিল, সূর্য তাহার পরিচ্ছদ, ও চন্দ্র তাহার পদতলে, এবং তাহার মস্তকের উপরে দ্বাদশ তারার এক মুকুট। ২ সে গর্ভবতী, আর ব্যথিত হইয়া চেঁচাইতেছে, সনতান প্রসবের জন্য ব্যথা খাইতেছে’’, এবং আমি স্বয়ং যীশুর দ্বারা গর্ভবতী হয়েছি। অনেক খৃস্টান এই মহিলার অনুগামী হন। উক্ত নারীর যীশুকর্তৃক গর্ভবতী হওয়ার কারণে তাঁর অনুগামী খৃস্টানগণ অত্যন্ত আনন্দিত ও উল্লসিত হন। এ স্বর্গীয় শিশুকে অভ্যর্থনা করতে তারা স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার ও উপহারাদি তৈরি করেন।
আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী এ ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, জন মিলনারের বর্ণনা থেকে আমরা কিছু বিষয় জানতে পারলাম না। উক্ত পবিত্র মহাসৌভাগ্যবান পুত্রও কি পিতার মত ঈশ্বরত্বের মর্যাদা লাভ করেছিলেন কি না? যদি তা করে থাকেন, তবে এতে তার অনুসারীদের ধর্ম বিশ্বাস কি ‘ত্রিত্ব’ থেকে ‘চারত্বে’ রূপান্তরিত হয়েছিল কি না? এছাড়া ‘পিতা ঈশ্বর’ (God the Father) এর উপাধি পরিবর্তন করে ‘দাদা ঈশ্বর’ করা হয়েছিল কি না?
তাহলে পাদরি মহোদয়দের সমগোত্রীয় ও স্ব-সম্প্রদায়ের মানুষদের কুসংস্কারের মাত্রা দেখুন! যাদের জ্ঞান-বুদ্ধির এ অবস্থা তাদের কি অধিকার আছে ইসলাম, ইসলামের পবিত্র-পুস্তক ও ইসলামের মহান রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিরুদ্ধে কটুক্তি করার?
হে আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে ঈমান ও সুপথে পরিচালিত করুন এবং বিভ্রান্তি ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করুন।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.