| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইসলাম হাউস
তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।
চতুর্থ অধ্যায়:
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াত
এ অধ্যায়ে দুটি পরিচ্ছেদ রয়েছে:
প্রথম পরিচ্ছেদ: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে পূর্ববর্তী নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণী
প্রথম পরিচ্ছেদ:
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের প্রমাণ
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের সত্যতার বড় প্রমাণ কুরআন কারীম। এর অলৌকিকত্ব, ভবিষ্যদ্বাণী, বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি সবই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ। এ ছাড়াও তাঁর জীবনই তাঁর নুবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ। যে কোনো নিরপেক্ষ গবেষক তাঁর মহান জীবন বিশুদ্ধ সূত্র থেকে পাঠ করলে এ গবেষকের সামনে তাঁর নুবুওয়াতের সত্যতা প্রতিভাত হবেই। খৃস্টধর্মীয় পাদরি ও প্রচারকদের অপপ্রচারের প্রেক্ষাপটে আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের সত্যতার পক্ষে বিভিন্ন প্রমাণ পেশ করেছেন। এখানে অল্প কিছু বিষয়ের সার-সংক্ষেপ আলোচনা করা হলো:
৪. ১. ১. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অলৌকিক চিহ্ন-কার্য
পূর্ববর্তী নবীগণের ন্যায় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কেও মহান আল্লাহ অনেক মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন ও চিহ্ন-কার্য প্রদান করেছেন। কুরআন ছাড়া বাকি মুজিযাকে দুভাগে ভাগ করা যায়:
৪. ১. ১. ১. অতীত ও ভবিষ্যতের অজানা সংবাদ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতীত ও ভবিষ্যতের অনেক অজানা বিষয় বলেছেন। অতীত বিষয়াবলির মধ্যে অন্যতম পূর্ববতী নবীগণ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগণ বিষয়ক সংবাদাদি। তিনি কারো নিকট থেকে এগুলি শ্রবণ করেন নি। কোনো গ্রন্থ থেকে তিনি এগুলি পাঠ করেন নি। এ দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘এ সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি, যা এর আগে তুমি জানতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানত না।’’
অতীত নবীগণ ও জাতিগণের বর্ণনায় বাইবেলের বিবরণের সাথে কুরআনের বিবরণের কিছু পার্থক্য রয়েছে। মহান আল্লাহ সত্যের প্রকাশ ও বাইবেলের বিকৃতি উদ্ঘাটনের জন্যই এ বিষয়গুলি প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন: ‘‘ইস্রায়েল-সন্তানগণ যে সকল বিষয়ে মতভেদ করে এ কুরআন তার অধিকাংশ তাদের নিকট বিবৃত করে।’’
ভবিষ্যতের বিষয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সংবাদ প্রদান করেছেন, যেগুলি পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে সংঘটিত হয়ে তার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণিত করেছে। এ সকল ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে রয়েছে:
(১) তিনি সাহাবীগণকে মক্কা, যিরূশালেম, ইয়েমন, সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, নিরাপত্তাহীনতা ও বিশৃঙ্খলা দূরীভূত হয়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে, এমনকি একজন একাকী নারী উত্তর-পূর্ব আরবের হীরা শহর থেকে মক্কা পর্যন্ত দীর্ঘ পথ ভ্রমন করতে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাবে না। খাইবার বিজয়ের আগের দিন তিনি সংবাদ দেন যে, আগামীকাল আলীর (রা) হাতে খাইবারের পতন ঘটবে। তিনি সাহাবীগণকে জানান যে, তারা পারস্য সম্রাট ও রোমান (বাইজান্টাইন) সম্রাটের ধনভান্ডার বণ্টন করবেন এবং পারসীয়দের মেয়েরা তাঁদের খেদমত করবে।
তিনি আরো বলেন, পারস্য সাম্রাজ্য একটি বা দুটি ধাক্কা, এরপর আর পারস্য সাম্রাজ্য থাকবে না। আর রোম অনেক শিঙ বিশিষ্ট, একটি শিঙ ধ্বংস হলে অন্য শিঙ তার স্থান দখল করবে। বহুদূর শেষ যুগ পর্যন্ত তারা পাথর ও সমূদ্রের অধিবাসী। এ হাদীসে পারস্য বলতে সাসানীয় সাম্রাজ্য ও রোম বলতে ইউরোপীয়গণকে বা পূর্ব ও পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যকে (Byzantine Empire & Holy Roman Empire) বুঝানো হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছিলেন তাই ঘটেছে।
(২) তিনি বলেন যে, উমার (রা) যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন অশান্তি-বিশৃঙ্খলা প্রকাশিত হবে না। অবস্থা তাই হয়েছিল। উমারের (রা) জীবদ্দশায় মুসলিম সমাজে অশান্তি প্রকাশিত হয় নি। তিনি অশান্তি-বিশৃঙ্খলার দরজা উন্মোচনের পথে বাঁধা ছিলেন।
(৩) তিনি বলেন, উসমান (রা) কুরআন পাঠরত অবস্থায় নিহত হবেন। আলীর (রা) দাড়িকে তাঁর মাথার রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করবে যে ব্যক্তি- অর্থাৎ আলীকে (রা) যে হত্যা করবে- সেই সবচেয়ে দুর্ভাগা। উসমান (রা) ও আলী (রা) উভয়েই- তিনি যেভাবে বলেছেন সেভাবেই- শহীদ হন।
(৪) তিনি বলেন, সাকীফ গোত্রের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী ও একজন ধ্বংসকারী খুনির আবির্ভাব হবে। মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই মিথ্যাবাদী ব্যক্তি ছিল সাকীফ গোত্রের মুখতার ইবনু আবূ উবাইদ (মৃত্যু ৬৭হি/৬৮৭খৃ), যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে এবং বসরার আমীর মুসআব ইবনু যুবাইর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করেন। আর ধ্বংসকারী খুনি ছিল হাজ্জাজ ইবন ইউসূফ (মৃত্যু ৯৫হি/৭১৪খৃ)।
(৫) ফিলিস্তিন বা যিরূশালেম বিজয়ের পরে মহামারী দেখা দেবে। তিনি যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই তা ঘটে। উমারের (রা) শাসনামলে ফিলিস্তিন বিজয়ের তিন বৎসর পরে যিরুশালেম থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ইমওয়াস শহরে এ মহামারীর আবির্ভাব ঘটে। এখানে মুসলিম বাহিনীর সেনা ক্যাম্প ছিল। এ ছিল ইসলামের আগমনের পরে মুসলিম সমাজের প্রথম মহামারী। এতে তিন দিনের মধ্যে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।
(৬) তিনি মহিলা সাহাবী উম্মু হারাম বিনতু মিলহান (রা)-কে বলেন যে, তিনি একদল মুসলিমের সাথে সমূদ্র পথে যুদ্ধে যাত্রা করবেন। ২৭ হি/৬৪৭ খৃ উসমান (রা)-এর শাসনামলে যখন মু‘আবিয়া সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন, তখন উম্মু হারাম ও তাঁর স্বামী সিরিয়া থেকে মুসলিম যোদ্ধাদের সাথে সাইপ্রাস অভিযানে বের হন। সমূদ্র পার হয়ে সাইপ্রাসের উপকূলে অবতরণের পরে তাঁর বাহন থেকে পড়ে তিনি তথায় নিহত ও সমাধিস্থ হন।
(৭) তিনি ইন্তেকালের আগে জানান যে, তাঁর বংশের মধ্যে সর্বপ্রথম ফাতিমাই (রা) তাঁর কাছে গমন করবেন। কার্যত তাই হয়। তাঁর মৃত্যুর ৬ মাস পরে ১১ হিজরীর রামাদান মাসে ফাতিমা (রা) মৃত্যুবরণ করেন।
(৮) তিনি বলেন যে, আমার এই সন্তান- অর্থাৎ হাসান ইবনু আলী (রা)- একজন মহান নেতা; আল্লাহ তার দ্বারা আমার উম্মতের দুটি বৃহৎ দলের মধ্যে শাস্তি ও সন্ধি স্থাপন করবেন। কার্যত তাই হয়েছিল। ৪০ হিজরীর রামাদান মাসে আলী (রা)-এর শাহাদাতের পরে তিনি খলীফা হিসেবে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ৬ মাস তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মু‘আবিয়া (রা)-এর নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার মুসলিমগণ এবং হাসানের নেতৃত্বাধীন অন্যান্য এলাকার মুসলিমগণের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ঘটার উপক্রম হয়। তিনি মুসলিমদের পারস্পরিক যুদ্ধ অপছন্দ করতেন। এজন্য ৪১ হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে তিনি মুআবিয়া (রা)-এর পক্ষে খিলাফত ত্যাগ করেন। এতে মুসলিম উম্মাহ গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পায়। এ জন্য এ বৎসরকে ‘আমুল জামাআত’ বা ঐক্যের বৎসর বলা হয়।
(৯) তিনি বলেন যে, তাঁর দৌহিত্র হুসাইন ইবনু আলী (রা) তাফ্ফ নামক স্থানে শহীদ হবেন। ফুরাত নদীর তীরে কুফার নিকটবর্তী একটি এলাকার নাম তাফ্ফ। পরবর্তীকালে তা কারবালা নামে খ্যাত। পরবর্তীকালে ৬১ হিজরীতে (৬৮০ খৃস্টাব্দে) হুসাইন তথায় শহীদ হন।
(১০) তিনি সুরাকা ইবনু জাশ‘আমকে (রা) বলেন, তিনি কিসরার বালাগুলি পরিধান করবেন। পারস্য বিজয়ের পরে যখন কিসরার মহামূল্যবান মনিমুক্তখচিত বালাগুলি উমারের (রা) নিকট আনয়ন করা হয় তখন তিনি তা সুরাকাকে পরিধান করান এবং বলেন, প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এগুলিকে কিসরার নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং সুরাকাকে পরিধান করিয়েছেন।
(১১) উত্তর আরবের দাওমাতুল জান্দালের শাসক উকাইদিরের নিকট খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে (রা) প্রেরণ করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদকে বলেন, তুমি যেয়ে দেখতে পাবে যে, সে মরুভূমিতে বন্যগরু শিকারে ব্যস্ত রয়েছে। খালিদ তথায় যেয়ে তাকে সে অবস্থাতেই পান।
(১২) তিনি বলেন যে, ভবিষ্যতে হিজাজ থেকে একটি অগ্নি নির্গত হবে যার আভায় সিরিয়ার বুসরা শহরের উটগুলির ঘাড় আলোকিত হয়ে যাবে। ৬৫৪ হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে (১২৫৬খৃ) মদীনার নিটকবর্তী প্রান্তর থেকে একটি বিশাল আগুন প্রকাশিত হয়।
ক্রমান্বয়ে অগ্নির প্রকম্পন ও আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে। বারংবার ভূকম্পন হয়। লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহর কাছে কাঁদাকাটা করতে থাকে। অগ্নির আন্দোলন অব্যাহত থাকে। মদীনাবাসীগণ নিশ্চিত হন যে, তাদের ধ্বংস সন্নিকটে। আগুনের শিখা উপরে উঠতে উঠতে এমন তীব্রতা ধারণ করে যে, মানুষের দৃষ্টি আবৃত করে ফেলে। মক্কা থেকে এবং সিরিয়ার বুসরা থেকেও এই অগ্নি দৃষ্ট হয়। প্রায় তিনমাস প্রজ্জ্বলিত থাকার পরে রজব মাসের ২৭ তারিখে, মেরাজের রাত্রিতে আগুন নিভে যায়।
ইতিহাসের গ্রন্থগুলিতে এ অগ্নির বিবরণ রয়েছে। এছাড়া এর বিবরণে পৃথক পুস্তক রচনা করা হয়েছে। এ অগ্নি প্রকাশিত হওয়ার ৪০০ বৎসর পূর্বে ইমাম বুখারী তাঁর সংকলিত হাদীসগ্রন্থে হাদীসটি সংকলন করেছেন।
৪. ১. ১. ২. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দ্বারা সম্পাদিত অলৌকিক কর্মসমূহ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক অলৌকিক কর্ম প্রকাশিত হয়েছে। এগুলির সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। এগুলির মধ্যে রয়েছে:
(১) ইসরা ও মি’রাজ: অলৌকিকভাবে রাত্রিভ্রমন ও ঊর্ধ্বগমন
মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন: ‘‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমন করিয়েছেন মসজিদুল হারাম (মক্কার মসজিদ) থেকে মসজিদুল আকসা (যিরূশালেমের মসজিদ) পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য।’’
এ আয়াত এবং বহুসংখ্যক সহীহ হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মিরাজে গমন করেন। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে তা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত। উপরন্তু এই আয়াতটিও তা প্রমাণ করে। কারণ ‘বান্দা’ বলতে কুরআনে সর্বত্র আত্মা ও দেহের সমন্বিত মানুষকেই বুঝানো হয়েছে। এছাড়া আমরা জানি যে, কাফিরগণ ইসরা ও মি’রাজ (নৈশভ্রমন ও ঊর্ধ্বারোহ) অস্বীকার করে এবং একে অসম্ভব বলে দাবি করে। এছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মিরাজের কথা বললেন তখন কতিপয় দুর্বল ঈমান মুসলিম একে অসম্ভব মনে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুয়তের বিষয়ে সন্দীহান হয়ে ইসলাম পরিত্যাগ করে। এ থেকে নিশ্চিতরূপে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত অবস্থায় দৈহিকভাবে মিরাজ সংঘটিত হওয়ার কথাই বলেছিলেন। নইলে কাফিরদের অস্বীকার করার ও দুর্বল ঈমান মুসলিমদের ঈমান হারানোর কোনো কারণই থাকে না। স্বপ্নে এরূপ নৈশভ্রমন বা স্বর্গারোহণ কোনো অসম্ভব বা অবাস্তব বিষয় নয় এবং এরূপ স্বপ্ন দেখার দাবি করলে তাতে অবাক হওয়ার মত কিছু থাকে না। যদি কেউ দাবি করে যে, ঘুমের মধ্যে সে একবার পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তে এবং একবার পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে চলে গিয়েছে, তবে তার দেহ স্বস্থানেই রয়েছে এবং দৈহিক অবস্থার পরিবর্তন হয় নি, তবে কেউ তার এরূপ স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা অস্বীকার করবে না বা এতে অবাকও হবে না।
জ্ঞান, বিবেক বা মানবীয় বুদ্ধির দৃষ্টিতে এবং ধর্মগ্রন্থাবলির নির্দেশনার আলোকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরের এরূপ অলৌকিক নৈশভ্রমন ও ঊর্ধ্বারোহণ অসম্ভব নয়।
জ্ঞান, যুক্তি ও বিবেকের দৃষ্টিতে তা অসম্ভব নয় এজন্য যে, এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা সকল যৌক্তিক ও বিবেকগ্রাহ্য কাজ করতে সক্ষম। অতিদ্রুতগতিতে কোনো প্রাণী বা জড় পদার্থকে স্থানান্তর করা জ্ঞান-বিবেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে স্থানান্তর করা একটি যৌক্তিক ও সম্ভব বিষয় যা আল্লাহ করতে পারেন। শুধু এতটুকু বলা যায় যে, বিষয়টি অসম্ভব নয়, তবে অস্বাভাবিক বা সাধারণ নিয়মের বাইরে। সকল অলৌকিক কর্মই অস্বাভাবিক এবং অস্বাভাবিক বলেই তো অলৌকিক চিহ্ন বলে গণ্য করা হয়।
ধর্মগ্রন্থাদির নির্দেশনার আলোকেও তা অসম্ভব নয়। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ বিশ্বাস করেন যে, মানুষের জন্য সশরীরে বা জড় দেহ সহ ঊর্ধ্বলোকে বা স্বর্গে গমন সম্ভব।
(ক) আদিপুস্তক ৫/২৪: ‘‘হনোক (Enoch) ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন করিতেন। পরে তিনি আর রহিলেন না, কেননা ঈশ্বর তাঁহাকে গ্রহণ করিলেন (And Enoch walked with God: and he was not; for God took him)।’’ এভাবে বাইবেল সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, হনোক ভাববাদী বা ইদরীস আলাইহিস সালাম-কে জীবিত অবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন।
(খ) ২ রাজাবলির ২ অধ্যায়ে রয়েছে: ‘‘১ পরে যখন সদাপ্রভু এলিয়কে (Elijah) ঘূর্ণবায়ুতে স্বর্গে তুলিয়া লইতে উদ্যত হইলেন, তখন এলিয় ও ইলীশায় (Elisha) গিল্গল হইতে যাত্রা করিলেন। ... ১১ পরে এইরূপ ঘটিল; তাঁহারা যাইতে যাইতে কথা কহিতেছেন, ইতিমধ্যে দেখ, অগ্নিময় এক রথ ও অগ্নিময় অশ্বগণ আসিয়া তাঁহাদিগকে পৃথক করিল, এবং এলিয় ঘূর্ণবায়ুতে স্বর্গে উঠিয়া গেলেন।’’ এখানেও বাইবেল সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, এলিয় জীবিত অবস্থায় স্বর্গে উত্থিত হয়েছেন।
এ দুটি বক্তব্য খৃস্টান পাদরীগণের নিকট ঈশ্বরের বাণী ও অভ্রান্ত সত্য হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, যীশু খৃস্ট ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার তিনদিন পরে পুনরুত্থিত হন এবং সশরীরে স্বর্গে গমন করেন এবং তার পিতার দক্ষিণে বসেন। কাজেই জ্ঞান, বিবেক, যুক্তি বা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মি’রাজ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ পাদরিগণের নেই।
(২) চন্দ্র খন্ডিত করা
মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: ‘‘কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোনো নিদর্শন (অলৌকিক চিহ্ন) দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এ তো চিরাচরিত যাদু।’’
বিভিন্ন সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইঙ্গিতে চন্দ্র বিদীর্ণ ও খন্ডিত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ক হাদীসগুলি ‘মুতাওয়াতির’ বা অতি-প্রসিদ্ধ ভাবে বর্ণিত। বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে হাদীসগুলি সংকলিত।
কুরআনে উল্লিখিত ও মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এই অলৌকিক চিহ্ন পাদরিগণ অস্বীকার করতে চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বিভ্রান্তি হলো, চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনাটি সত্যই ঘটতো, তবে পৃথিবীর কারো কাছেই তা অজ্ঞাত থাকত না এবং বিশ্বের ঐতিহাসিকগণ তা উল্লেখ করতেন।
এ বিভ্রান্তির অপনোদনে আমাদের বক্তব্য এই যে, পাদরিগণের এ মহাযুক্তি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণটি ধর্মগ্রন্থাদির নির্দেশনার আলোকে অত্যন্ত দুর্বল এবং জ্ঞান-বিবেক ও যুক্তির আলোকেও অত্যন্ত দুর্বল। নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষ্য করুন:
(ক) বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে নোহের জলপ্লাবন ছিল বিশ্বব্যাপী এবং অত্যন্ত বড় ঘটনা। আদিপুস্তকের ৭ম ও ৮ম অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ভারতী, পারসীয়, কালদীয় (Chaldeans) ও চীনা ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ এ ঘটনা কঠিনভাবে অস্বীকার করেন; কারণ তাদের ইতিহাসগ্রন্থে এর কোনোরূপ উল্লেখ নেই। পাদরিগণের স্বজাতি ইউরোপীয় নাস্তিকগণ এই মহাজলপ্লাবনের কথা অস্বীকার করেন এবং এ বিষয়ক বাইবেলীয় বর্ণনা নিয়ে উপহাস করেন।
খৃস্টান পাদরিগণ কি এসকল দেশের পণ্ডিতদের অস্বীকার বা ইউরোপীয় নাস্তিকদের উপহাসের কারণে নোহের প্লাবনের কথা অস্বীকার করবেন বা একে অবাস্তব ও অসম্ভব বলে মেনে নিতে রাজি হবেন?
(খ) যিহোশূয়ের পুস্তকের ১০ অধ্যায়ের ১২-১৩ শ্লোকে যিহোশূয় (Joshua) ভাববাদীর যুদ্ধ জয়ের জন্য পূর্ণ একদিন সূর্যকে মধ্যগগণে আটকে রাখার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। (আর আকাশের মধ্যস্থানে সূর্য স্থির থাকিল, অস্ত গমন করিতে প্রায় সম্পূর্ণ এক দিবস অপেক্ষা করিল (So the sun stood still in the midst of heaven, and hasted not to go down about a whole day)। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিত ও বাইবেল ব্যাখ্যাকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ণ ২৪ ঘন্টা সূর্য মধ্যগগণে থেমে থাকে। এ ঘটনাটি খুবই বড় ঘটনা। খৃস্টানগণ বিশ্বাস করেন যে, খৃস্টের জন্মের ১,৪৫০ বৎসর পূর্বে এই ঘটনা ঘটে। যদি তা সত্যিই ঘটে থাকত, তবে বিশ্বের সকলের জন্যই তা প্রকাশ পেত। এ কথা তো স্পষ্ট যে, গভীর মেঘ থাকলেও এই ঘটনা কারো অজ্ঞাত থাকে না। আবার দূরত্বের কারণেও তা না জানার কোনো সুযোগ নেই। এ সময়ে যে সকল দেশে রাত ছিল সে সকল দেশের মানুষেরাও বিষয়টি নিশ্চিত জানতেন; কারণ কোথাও যদি ২৪ ঘন্টা রাত দীর্ঘায়িত হয় তবে তা তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে এবং তারা সকলেই তা জানবেন। অথচ এত বড় ঘটনাটি ভারতের হিন্দুদের কোনো গ্রন্থে লিখিত হয় নি। চীন ও পারস্যের মানুষেরাও তা জানতে পারে নি। আমি ভারতীয় হিন্দু পণ্ডিতদেরকে এই বিষয়টি অস্বীকার করতে শুনেছি। তারা বলেন যে, ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ভিত্তিহীন ও বাতুল। পাদরিগণের স্বজাতি ইউরোপীয় নাস্তিকগণ এই ঘটনা অস্বীকার করেন এবং এ নিয়ে উপহাস করেন। তারা এ বিষয়ক বাইবেলীয় বর্ণনার বিষয়ে বিভিন্ন আপত্তি উত্থাপন করেন।
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো ইতিহাসে উল্লেখ না থাকা, বিশ্বের কোনো মানুষের না জানা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতদের এ ঘটনাটি অস্বীকার করা এবং পাশ্চাত্য নাস্তিকদের উপহাস ও আপত্তির কারণে কি এ ঘটনাকে অবাস্তব, মিথ্যা ও বাতুল বলে মানতে খৃস্টান পাদরিগণ রাজি হবেন?
(গ) মথিলিখিত সুসমাচারের ২৭ অধ্যায়ে রয়েছে: ‘‘৫১ আর দেখ, মন্দিরের তিরস্করিণী (veil) উপর হইতে নিচ পর্যনত চিরিয়া দুইখান হইল, ভূমিকম্প হইল, ও শৈল সকল বিদীর্ণ হইল, ৫২ এবং কবর সকল খুলিয়া গেল, আর অনেক নিদ্রাগত পবিত্র লোকের দেহ উত্থাপিত হইল (many bodies of the saints which slept arose), ৫৩ এবং তাঁহার পুনরুত্থানের পর তাঁহারা কবর হইতে বাহির হইয়া পবিত্র নগরে প্রবেশ করিলেন, আর অনেক লোককে দেখা দিলেন (And came out of the graves after his resurrection, and went into the holy city, and appeared unto many) ।
এখানে মন্দিরের গিলাফ বা পর্দা আগাগোড়া ছিড়ে যাওয়া, ভূমিকম্প হওয়া, পাথর বিদীর্ণ হওয়া, কবর খুলে যাওয়া, অনেক মৃত বুজুর্গের কবর থেকে জীবিত উঠে আসা, তাদের যিরূশালেমে প্রবেশ করা ইত্যাদি অনেক মহা আশ্চর্যকর মহান ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে মথির এ বর্ণনা মিথ্যা। তবে আমরা শুধু বলতে চাই যে, এ সকল ঘটনা কিছুই ইয়াহূদীদের ইতিহাসে ও রোমানদের ইতিহাসে উল্লেখ করা হয় নি। যোহনলিখিতি সুসমাচারেও এগুলির কোনো উল্লেখ নেই। মাক ও লূক শুধু পর্দা ছেড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বাকি এত বড় অলৌকিক বিষয় কিছুই উল্লেখ করেন নি। অথচ তারা ক্রুশবিদ্ধ যীশুর কান্নাকাটি ও চিৎকারের কথা ও অনেক গুরুত্বহীন কথা উল্লেখ করেছেন। অথচ মৃতদের দল ধরে কবর থেকে উঠে আসা, যিরুশালেমে যেয়ে জনগণের সাথে দেখাসাক্ষাত করা ইত্যাদি বিষয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর পাথর ফেঁটে যাওয়া, কবর ফেঁটে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় ঘটার পরে তার চিহ্ন থেকে যায়।
অবাক বিষয় যে, এ সকল মৃত সাধু কবর থেকে পুনরুত্থিত হওয়ার পরে কি করলেন তা কিছুই মথি লিখলেন না! এ সকল সাধু বা পবিত্র মানুষ যিরূশালেমের মানুষদেরকে দেখা দেওয়ার পরে কি করলেন তা মথি লিখেন নি। তারা কি পুনরায় তাদের কবরে ফিরে গিয়েছিলেন? না কি তারা জীবিতই রয়ে গিয়েছিলেন? কোনো কোনো রসিক ব্যক্তি বলেন, সম্ভবত মথি একাই এ সকল ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন ঘুমন্ত অবস্থায়!
উল্লেখ্য যে, লূকের বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, মন্দিরের তিরস্করিণী (veil) চিরে গিয়েছিল যীশুর মৃত্যুর পূর্বে। পক্ষান্তরে মথি ও মার্কের বিবরণ এর বিপরীত। এখন প্রশ্ন হলো, পাদরিগণ এ বিষয়গুলির কি উত্তর দিবেন?
(ঘ) মার্ক ১/১০-১১, মথি ৩/১৬-১৭ ও লূক ৩/২১-২২-এর যোহন বাপ্তাইজকের নিকট যীশুর বাপ্তাইজিত হওয়ার বিবরণে নিম্নের কাহিনীটি রয়েছে: ‘‘আর তৎক্ষণাৎ জলের মধ্য হইতে উঠিবার সময়ে দেখিলেন, আকাশ দুইভাগ হইল, এবং আত্মা কপোতের ন্যায় তাঁহার উপরে নামিয়া আসিতেছেন। আর স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, তুমিই আমার প্রিয় পুত্র, তোমাতেই আমি প্রীত।’’ এ মার্কের ভাষা, অন্যদের ভাষাও প্রায় একই।
এভাবে আমরা দেখছি যে, প্রকাশ্য দিবালোকে আকাশ দুভাগ হয়ে গেল! কাজেই বিষয়টি বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজানা থাকার কথা নয়। অনুরূপভাবে কপোতের নেমে আসা প্রত্যক্ষ করা এবং ঊধ্বাকাশ থেকে আগত বাণী বা শব্দ শ্রবণ করাও কারো একক বিষয় নয়। অন্তত উপস্থিত সকলেই তা দেখবেন ও শুনবেন। অথচ সুসমাচার লেখকগণ ছাড়া বিশ্বের আর কেউই এ সকল বিষয়ে কিছই লিখেন নি! আর এজন্যই পাশ্চাত্যের নাস্তিকগণ এ ঘটনা সম্পর্কে উপহাস করে বলেন: মথি আমাদেরকে অত্যন্ত বড় সংবাদ থেকে বঞ্চিত করেছেন। যখন আকাশের দরজা খুলে গেল, তখন কি আকাশের বড় দরজাগুলি খুলেছিল? না মাঝারি দরজাগুলি? না ছোট দরজাগুলি? আর এই দরজাগুলি সূর্যের এদিকে ছিল না ওদিকে? মথির এই ভুলের কারণে আমাদের পাদরিগণ দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মাথা নাড়াতে থাকেন। মথি আমাদের এই কপোতের সংবাদও দিলেন না! কপোতটিকে কি কেউ ধরে খাঁচায় ভরেছিল? নাকি সেটিকে তারা আবার আকাশে ফিরে যেতে &&দখেছিলেন? যদি ফিরে যেতে দেখেন, তবে বুঝতে হবে যে, আকাশের দরজাগুলি এই দীর্ঘ সময় উন্মুক্তই ছিল। তাহলে কি তারা এ সময়ে আকাশের অভ্যন্তরভাগ ভাল করে দেখে নিয়েছিলেন? পাদরিগণ এ সকল প্রশ্নের কি উত্তর দিবেন?
উপরের আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, চন্দ্র বিদীর্ণ করার বিষয়ে পাদরিগণের আপত্তি ভিত্তিহীন ও বাতিল।
(৩) অলৌকিকভাবে পানি বৃদ্ধি করা
বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র আঙুলগুলির মধ্য থেকে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হয়েছে। আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, ‘‘আসরের সালাতের সময় ঘনিয়ে আসল। লোকজন অনুসন্ধান করেও ওযূর জন্য কোনো পানি যোগাড় করতে পারলেন না। তখন আমি দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি পাত্রে অল্প কিছু ওযূর পানি আনয়ন করা হলো। তিনি তার পবিত্র হস্ত সেই পাত্রের মধ্যে রাখেন এবং সকল মানুষকে নির্দেশ দেন সেখান থেকে ওযূ করার। তখন আমি দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আঙ্গুলগুলির মধ্য দিয়ে ঝর্ণার মত পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উপস্থিত মানুষেরা সেই পানি দিয়ে ওযূ করল। এমনকি সর্বশেষ মানুষটিও তা দিয়ে ওযূ করে নিলেন। এই মুজিযাটি সংঘটিত হয়েছিল মদীনার বাজারের নিকট যাওরা নামক স্থানে।
জাবির (রা) বলেন, হুদাইবিয়ার দিনে মানুষজন পিপাসার্ত হয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি ছোট্ট পাত্রে সামান্য কিছু পানি ছিল। তিনি সেই পানি দিয়ে ওযূ করলেন। তখন লোকজন তাঁর নিকট এসে বলেন, আপনার এই পাত্রের পানিটুকু ছাড়া আমাদের নিকট আর কোনো পানি নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হস্ত পাত্রটির মধ্যে রাখেন। এতে তাঁর আঙুলগুলির ফাঁক দিয়ে ঝর্ণার মত পানির ফোয়ারা বেরিয়ে আসতে লাগল। তখন উপস্থিত সকলেই সেই পানি পান করলেন এবং তা দিয়ে ওযূ করলেন। উপস্থিত মানুষদের সংখ্যা ছিল ১৪০০।
জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জাবির, তুমি ওযূর জন্য ঘোষণা দাও। তিনি বলেন শিবিরে কারো কাছে কোনো পানি ছিল না। অনুসন্ধান করে একটি চামড়ার পাত্রে তলানিতে এক ফোঁটা পানি পাওয়া গেল। এক ফোঁটা পানি সহ সেই পাত্রটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনয়ন করা হয়। তিনি পাত্রের উপর হাত রাখলেন এবং কিছু কথা বললেন, যা আমি বুঝতে পারলাম না। এরপর তিনি বললেন, কাফেলার বড় পাত্রটি নিয়ে এস। তখন পাত্রটি এনে তাঁর সামনে রাখা হলো। তিনি তাঁর হাতটি পাত্রটির মধ্যে রাখলেন এবং আঙুলগুলি ফাঁক করলেন। জাবের তাঁর নির্দেশে এক ফোঁটা পানি তাঁর হাতের উপর ঢাললেন। তিনি বললেন, বিসমিল্লাহ। জাবির বলেন, তখন আমি দেখলাম যে, তাঁর আঙুলের মধ্য দিয়ে পানির ফোয়ারা বের হয়ে আসছে। পাত্রটি পানিতে ভরে গেল এবং পানি পাত্রের বাইরে প্রবাহিত হতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষকে নির্দেশ দিলেন পানি পান করতে। তখন সকলেই তৃপ্তির সাথে পানি পান করলেন। যখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, শিবিরে আর কারোরই কোনো পানির প্রয়োজন নেই তখন তিনি পাত্রটির মধ্য থেকে তার হাত উঠিয়ে নিলেন। পাত্রটি তখনও পরিপূর্ণ ছিল। এ মুজিযাটি বুওয়াত যুদ্ধের সময় ঘটেছিল।
তাবূক যুদ্ধের বিবরণে মু‘আয ইবনু জাবাল (রা) বলেন, পানির জন্য তাঁরা তাবূকের একটি স্রোতস্বিনী বা মরুভূমির ছোট্ট ঝর্ণার (spring) নিকট গমন করেন। ঝর্ণাটি মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছিল এবং এর তলায় পায়ের গোড়ালি পরিমাণ সামান্য পানির প্রবাহ ছিল। তখন তাঁরা হাত দিয়ে অল্প অল্প করে কিছু পানি একটি পাত্রে জমা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই পানি দিয়ে তাঁর হাত ও মুখ ধৌত করে আবার তা উক্ত ঝর্ণার মধ্যে ফেরত দেন। তখন ঝর্ণাটি পানিতে ভরে যায়। শিবিরের সকল মানুষ সেই পানি পান করেন। ইবনু ইসহাকের বর্ণনায়, পানির গতি এমন বৃদ্ধি পেল যে, পানির মধ্য থেকে মেঘগর্জনের ন্যায় গর্জন শোনা গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মু‘আয, তোমার আয়ু দীর্ঘ হলে হয়ত তুমি দেখতে পেতে যে, এই স্থানের সব কিছু গাছপালা ও ফল-ফসলের সবুজে ভরে গিয়েছে।
উমার (রা) বলেন, তাবূকের যুদ্ধে যাত্রার সময়ে পথিমধ্যে তাঁরা পানিসঙ্কটে নিপতিত হন। দীর্ঘ কয়েকদিন যাবৎ তাঁরা পানির কোনো সন্ধান না পাওয়াতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, কেউ কেউ তার নিজের উট জবাই করে তার পেটের নাড়ি ও গোবর চিপে তা পান করছিলেন। এই কঠিন বিপদের কথা জানিয়ে আবূ বাক্র (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুরোধ করেন প্রার্থনা করার জন্য। তখন তিনি তাঁর দুহাত তুলে প্রার্থনা করেন। তাঁর হস্তদ্বয় নামানোর পূর্বেই আকাশ মেঘে ভরে গেল। এরপর বৃষ্টি হলো এবং মানুষেরা নিজেদের পাত্রগুলিতে পানি ভরে নিল। এই বৃষ্টি মুসলিম সৈন্যদের শিবির অতিক্রম করে নি।
ইমরান ইবনু হুসাইয়িন (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফরে ছিলেন। তাঁর সঙ্গীগণ পানি সঙ্কটে নিপতিত হন ও পিপাসায় কষ্ট পেতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুজন সাহাবীকে বলেন, তোমরা অমুক স্থানে গমন কর। সেখানে দেখবে যে, একজন মহিলার সাথে একটি উট আছে এবং তার উপর দুটি পানির মশক (চামড়ার পাত্র) রয়েছে। তোমরা তাকে অনুরোধ করে এখানে নিয়ে আসবে। তাঁরা দুজন তথায় গমন করে বর্ণনানুসারে মহিলাকে দেখতে পান। তাঁরা তাকে অনেক অনুরোধ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে আসেন। তিনি তার মশকদ্বয় থেকে কিছু পানি একটি পাত্রে ঢালেন। এরপর আল্লাহর ইচ্ছানুসারে সেই পানিতে কিছু দু‘আ পাঠ করেন। এরপর পানিটুকু পুনরায় মশকে ঢেলে দেন। এরপর মশক থেকে পানি ঢালার মুখ খুলে মানুষদেরকে নির্দেশ দেন যে, যার কাছে যত মশক বা পাত্র আছে সবাই যেন তা ভরে নেয়। মানুষেরা উক্ত মশকদ্বয় থেকে পানি নিয়ে তাদের সকলের মশক ও পাত্র ভরে নিলেন। এমনকি একটি পাত্রও খালি থাকল না। ইমরান ইবনু হুসাইন (রা) বলেন, মানুষেরা যখন তাদের মশক ও পাত্রগুলি উক্ত মশকদ্বয় থেকে পানি নিয়ে ভরছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল যে, উক্ত মশকদ্বয় যেন ক্রমেই পানিতে ভরে উঠছে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে উক্ত মহিলার জন্য উপহার হিসেবে খাদ্য সংগ্রহ করা হলো। এমনকি সংগৃহীত খাদ্যে তার কাপড় ভরে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এখন যেতে পার। আমরা তোমার মশকদ্বয় থেকে এক ফোঁটা পানিও গ্রহণ করি নি, কিন্তু আল্লাহই আমাদেরকে পানি দান করেছেন।’’
(৪) অলৌকিকভাবে খাদ্য বৃদ্ধি করা
অলৌকিকভাবে খাদ্যবৃদ্ধির ঘটনাও তাঁর জীবনে অনেকবার ঘটেছে। কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি। জাবির (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করে খাদ্য প্রার্থনা করে। তিনি তাকে প্রায় অর্ধ ওয়াসাক (প্রায় দেড় মণ) যব প্রদান করেন। লোকটি যব নিয়ে বাড়িতে রাখে এবং নিজের পরিবার ও আত্মীয়-মেহমান-সহ তা ভক্ষণ করতে থাকে। অনেক দিন যাবৎ এভাবে চলার পরে লোকটি হঠাৎ একদিন অবশিষ্ট যব ওজন করে। সে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সংবাদ দেয় (যে, এতদিন খাওয়ার পরেও তার যব আগের মতই রয়েছে।) তিনি তখন বলেন, তুমি যদি তা ওজন না করতে তবে আজীবনই তা থেকে তোমরা আহার করতে পারতে এবং তোমাদের মৃত্যুর পরেও তা থেকে যেত।
অন্য হাদীসে জাবির (রা) বলেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় একটি ছাগল ছানা এবং এক সা (প্রায় আড়াই কেজি) যব দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১,০০০ মানুষকে খাওয়ান। জাবির বলেন, আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা সকলেই পরিতৃপ্তির সাথে খেয়ে তা রেখে চলে গেলেন, অথচ আমাদের হাঁড়ি চুলার উপরেই ছিল এবং রুটি বানানোর জন্য মাখানো আটা তখনো শেষ হয়নি, বরং রুটি বানানোর কাজ চলছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আটা এবং হাঁড়িতে থুতু দিয়েছিলেন এবং বরকতের জন্য দু‘আ করেছিলেন।
অন্য হাদীসে জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, তাঁর পিতা মৃত্যুর সময় অনেক ঋণ রেখে যান। তাঁদের যে পরিমাণ ফল ও ফসল উৎপন্ন হয় কয়েক বছর ধরে তা প্রদান করলেও তাতে তাদের ঋণ শোধ হয় না। তিনি মূল সম্পতিই পাওনাদারদের দিতে চান, কিন্তু পাওনাদারগণ তাতে রজি হন না। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবগত করালে তিনি তাকে খেজুর বাগানে খেজুর কর্তনের নির্দেশ দেন। এরপর কয়েকটি খেজুরগাছের নিচে সেগুলি জমা করেন। তিনি তথায় গমন করেন এবং দু‘আ করেন। তখন জাবির সেই খেজুর দিয়ে পাওনাদারদের সকল পাওনা পরিশোধ করার পরেও প্রতি বৎসর তারা যে পরিমাণ খেজুর কর্তন করতেন সেই পরিমাণ খেজুরই অবশিষ্ট থাকে।
আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ক্ষুধার্ত দেখে তিনি তার বাড়ি থেকে কয়েকটি যবের রুটি তার বগলের মধ্যে করে এনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খাওয়ার জন্য প্রদান করেন। তিনি সে রুটিগুলি দিয়ে উপস্থিত ৮০ জন সাহাবীকে পরিতৃপ্তির সাথে আহার করান।
অন্য হাদীসে আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, যাইনাব বিনতু জাহশ (রা)-এর সাথে বিবাহের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক মানুষের নাম বলে তাঁদেরকে দাওয়াত করতে তাঁকে নির্দেশ দেন। এত মানুষকে তিনি দাওয়াত দেন যে, নিমন্ত্রিত অতিথিগণ আগমন করলে তার বাড়ি ও বিশ্রামস্থল ভরে যায়। তখন তিনি তাদের সামনে একটি মগ এগিয়ে দেন, যে মগের মধ্যে পনির মিশ্রিত এক মুদ্দ (প্রায় অর্ধ কেজি) পরিমাণ খেজুরের ছাতু ছিল। তিনি মগটি অভ্যাগতদের সামনে রেখে তার মধ্যে নিজের তিনটি আঙুল ডুবিয়ে দেন। এরপর নিমন্ত্রিত অতিথিগণ সেই ছাতু ভক্ষণ করে প্রস্থান করেন। সকলের খাওয়ার পরেও মগের মধ্যে প্রায় আগের মতই ছাতু অবশিষ্ট থাকে।
আবূ আইউব আনসারী (রা) বলেন, (হিজরত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকরের মদীনায় আগমনের পরে) তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রা)-কে দাওয়াত দেন এবং তাঁদের দুজনের পরিমাণ খাদ্য প্রস্তুত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, আপনি আনসারদের নেতৃস্থানীয় (অধ্যক্ষগণ) ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ৩০ জনকে ডেকে আনুন। তিনি নির্দেশ মত ত্রিশজন আনসার নেতাকে ডেকে আনেন। তারা তৃপ্তির সাথে খাদ্য গ্রহণ করে অবশিষ্ট খাদ্য রেখে চলে যান। অতঃপর তিনি বলেন, এবার ৬০ জনকে ডাকুন। তিনি এবার ৬০ জনকে ডেকে অনেন এবং তারাও অনুরূপভাবে খাদ্য গ্রহণ করেন। এরপর তিনি বলেন, এবার ৭০ জনকে ডাকুন। তারাও এভাবে খাদ্য গ্রহণ করেন এবং বাকি খাবার রেখে চলে যান। যারা সেই খাদ্য ভক্ষণ করে চলে যান তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে বেরিয়ে যান। আবূ আইউব আনসারী বলেন, এভাবে আমার সেই খাদ্য ১৮০ ব্যক্তি ভক্ষণ করেন।
সামুরা ইবনু জুনদুব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক বাটি (bowl) মাংস আনয়ন করা হয়। সাহাবীগণ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দলে দলে তা থেকে ভক্ষণ করেন। এক দল উঠলে অন্য দল আহার করতে বসেন।
আব্দুর রাহমান ইবনু আবূ বাক্র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আমরা ১৩০ ব্যক্তি ছিলাম। এমতাবস্থায় তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কারো কাছে কি কোনো খাবার আছে? তখন এক ব্যক্তি প্রায় এক সা’ (প্রায় আড়াই কিলোগ্রাম) যবের আটা নিয়ে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মেশ ক্রয় করে তা রান্নার জন্য প্রস্তুত করেন। আটা দিয়ে রুটি বানানো হয় এবং মেষটিকে সেঁকা (রোস্ট করা) হয়। আল্লাহর কসম, একশত ত্রিশ জনের প্রত্যেককেই সেঁকা মাংস থেকে অংশ প্রদান করা হয়। এরপর অবশিষ্ট খাদ্য দুটি বড় খাঞ্চায় রাখা হয়। আমরা সকলেই সেই খাদ্য ভক্ষণ করি। এরপরও খাঞ্চা দুটিতে খাদ্য অবশিষ্ট থাকে। আমি তা উটের পিঠে করে নিয়ে যাই।
সালামা ইবনুল আকওয়া (রা), আবূ হুরাইরা (রা) এবং উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, এক যুদ্ধের সফরে তাঁরা খাদ্যের সঙ্কটে নিপতিত হন। সকলের খাদ্য নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দেন যার কাছে যা কিছু খাদ্য অবশিষ্ট আছে তা তার নিকট জমা করতে। তখন সবাই একমুষ্টি বা তার চেয়ে সামান্য বেশি খাবার এসে জমা করেন। কেউ কেউ এক সা’ (প্রায় আড়াই কেজি) পরিমান খেজুর জমা দিলেন, যা ছিলো সর্বোচ্চ পরিমাণ। তখন সকল খাদ্য একটি চামড়ার পাটির উপরে রাখা হলো। সালামা ইবনুল আকওয়া বলেন, আমি দেখলাম যে একটি ছাগী মাটিতে শয়ন করলে যে স্থান দখল করে জমাকৃত সকল খাদ্য আনুমানিক সেই পরিমান স্থান দখল করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে সেই খাদ্য থেকে নিজ নিজ পাত্র ভরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। পুরো শিবিরে একটি পাত্রও আর অপূর্ণ থাকল না। এরপরও সেখানে খাদ্য অবশিষ্ট রয়ে গেল।
(৫) বৃক্ষ ও পাথরের আনুগত্য, কথা বলা ও সাক্ষ্য দেওয়া
ইবনু উমার (রা) বলেন, আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। এক বেদুঈন চলার পথে আমাদের কাছে আসে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঈমানের দাওয়াত দেন। বেদুঈন বলে, তুমি যা বলছ তার পক্ষে কে সাক্ষ্য দিবে? তিনি বলেন, মরুভূমির ঐ সবুজ গাছটি আমার কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিবে। গাছটি ছিল নিম্নভূমির অপর প্রান্তে। তখন গাছটি মাটির মধ্য দিয়ে নিজেকে টেনে নিয়ে বেদুঈন লোকটির সামনে এসে দাঁড়ায়। লোকটি তিনবার গাছটিকে প্রশ্ন করে এবং তিনবারই গাছটি সাক্ষ্য প্রদান করে। এরপর গাছটি তার পূর্বস্থানে ফিরে যায়।
জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য বের হন। তিনি ময়দানে আড়াল করার মত কিছুই দেখতে পেলেন না। এমন সময় তিনি লক্ষ্য করলেন যে, নিম্নভূমির প্রান্তে দুটি গাছ রয়েছে। তিনি একটি গাছের নিকট যেয়ে গাছটির একটি ডাল ধরে টান দিয়ে বললেন, আল্লাহর অনুমতিতে আমার অনুগত হও। তখন গাছটি নাকে রশি পরানো উটের ন্যায় তাঁর পিছে পিছে চলে এল। তখন তিনি অন্য বৃক্ষটির কাছে যেয়ে তাকেও অনুরূপভাবে বললেন, আল্লাহর অনুমতিতে আমার অনুগত হও। অতঃপর তিনি বৃক্ষ দুটি কাছাকাছি হওয়ার পরে তাদেরকে বললেন, আল্লাহর অনুমতিতে তোমরা উভয়ে একত্রিত হয়ে আমাকে আড়াল কর। তখন গাছ দুটি একে অপরের সাথে একত্রিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আড়ালে বসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রয়োজন মেটানোর পর গাছ দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজ নিজ স্থানে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে যায়।
ইবনু আববাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন বেদুঈনকে বলেন, তুমি বলত, আমি যদি ঐ খেজুরগাছ থেকে তার কাঁদিটিকে ডেকে নিয়ে আসি, তাহলে কি তুমি বিশ্বাস করবে যে, আমি আল্লাহর রাসূল? লোকটি বলে, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুরের কাঁদিটিকে ডাক দিলেন। কাঁদিটি লাফাতে লাফাতে তাঁর নিকট উপস্থিত হলো। তিনি বললেন, ফিরে যাও। তখন কাঁদিটি আবার তার নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
বুরাইদা ইবনুল হুসাইব (রা) বলেন, একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাঁর নুবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ দাবি করেন। তিনি উক্ত বেদুঈনকে বলেন, ঐ গাছটিকে যেয়ে বল, আল্লাহর রাসূল তোমাকে ডাকছেন। লোকটি গাছটির কাছে যেয়ে এ কথা বলে। তখন গাছটি ডানে ও বামে ঝুকে তার শিকড়গুলি মাটি থেকে তুলে নেয়। এরপর মাটির উপর দিয়ে গুড়ি-শিকড় টেনে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে: আস-সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ। তখন তিনি বেদুঈনকে বলেন, একে বল স্বস্থানে ফিরে যেতে। তখন গাছটি স্বস্থানে ফিরে যায়। বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, আমাকে অনুমতি দিন যে আমি আপনাকে সাজদা করব। তিনি বলেন, না, আল্লাহ ছাড়া কাউকে সাজদা করা বৈধ নয়। তখন বেদুঈন বলেন, আমাকে অনুমতি দিন আমি আপনার হস্তদ্বয় ও পদদ্বয় চুম্বন করব। তখন তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করেন।
প্রায় ২০ জন সাহাবী থেকে পৃথক পৃথক সূত্রে বর্ণিত হাদীসে তাঁরা বলেন, খেজুর গাছের গুড়ি কেটে খুঁটি বানিয়ে তার উপর মসজিদে নববীর ছাউনি দেওয়া ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবা দিতেন তখন এরূপ একটি গুড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন। যখন তাঁর খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বার বানানো হলো এবং তিনি মিম্বারে উঠে খুতবা দিতে শুরু করলেন, তখন আমরা শুনলাম যে, নবজাতক বাচ্চা হারানো উটের মত গুড়িটি কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে গুড়িটি ফেটে যায়। তার ক্রন্দনের আওয়াজে মসজিদ কম্পিত হচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে সমবেত মানুষেরা কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুড়িটির কাছে এসে তার উপরে নিজের হাত রাখেন। এতে গুড়িটি শান্ত হয়ে যায়। তিনি বলেন, এতে হেলান দিয়ে আল্লাহর যিকর করতাম, এ যিকর হারানোর কারণে গুড়িটি ক্রন্দন করে। আল্লাহর শপথ, যদি আমি তাকে স্পর্শ না করতাম তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত সে এভাবেই কাঁদতে থাকত। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে গুড়িটিকে মিম্বারের নিচে দাফন করা হয়।
খেজুরের গুড়ির ক্রন্দনের এই সংবাদ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সংবাদ। সাহাবীদের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল যুগেই তা প্রসিদ্ধ ছিল। অর্থের দিক থেকে তা মুতাওয়াতির বা অতি প্রসিদ্ধ হাদীস।
ইবনু মাসঊদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আহার করতেন তখন তাঁর সাথে আহার্য্য খাদ্যের তাসবীহ পাঠ আমরা শুনতে পেতাম।
(৬) ইঙ্গিতে প্রতিমাসমূহের পতন
ইবনু আববাস (রা) বলেন, কাবা ঘরের চতুর্পার্শ্বে ৩৬০টি প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ সকল পাথরের মুর্তির পাগুলি সীসা দিয়ে পাথুরে মেঝের সাথে আটকানো ছিল। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে হারামে প্রবেশ করেন। তিনি তার হাতের খেজুরের ডালটি দিয়ে এ সকল প্রতিমা স্পর্শ না করে, শুধু সেগুলির দিকে ইশারা করলেন এবং বললেন ‘‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই।’’ তিনি যখনই কোনো প্রতিমার মুখের দিকে ইশারা করলেন তখনই প্রতিমাটি চিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর যখনই তিনি কোনো প্রতিমার পিঠের দিকে ইশারা করলেন, তখনই প্রতিমাটি উপুড় হয়ে পড়ে গেল। এভাবে সকল প্রতিমা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
(৭) তাঁর পবিত্র হস্ত, ফুঁক বা থুথুতে রোগমুক্তি ও সুস্থতা
সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা) বলেন, উহদের যুদ্ধের দিন কাতাদা ইবনু নু’মান (রা) নামক সাহাবীর চোখে আঘাত লেগে চোখটি বেরিয়ে তার কপোলের উপর এসে পড়ে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখটিকে যথাস্থানে ঢুকিয়ে দেন। চোখটি তখনি সুস্থ হয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে তার দু চোখের মধ্যে এটিই অধিক সুস্থ ও ভাল ছিল।
উসমান ইবনু হানীফ (রা) বলেন, এক অন্ধ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, যেন তিনি আমাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেন। তিনি তাকে একটি দুআ শিখিয়ে দেন। অন্ধ ব্যক্তি এভাবে দুআ করলে আল্লাহ তাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেন এবং সে সুস্থ দৃষ্টিশক্তি নিয়ে ফিরে আসে।
মুলায়িবুল আসিন্নার পুত্র বলেন, তিনি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একজন দূত প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু মাটি নিয়ে তাতে থুতু নিক্ষেপ করে তা উক্ত দূতকে প্রদান করেন। সে যখন মাটি নিয়ে মুলায়িবের নিকট পৌঁছায় তখন তিনি মৃত্যুপথযাত্রী। তাকে মাটিটুকু খাওয়ানো হলে আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দেন।
হাবীব ইবনু ফুদাইক বলেন, তার পিতার চক্ষু সাদা হয়ে যায় এবং তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চোখে ফুঁক দেন। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। আমি দেখেছি যে, ৮০ বৎসর বয়সেও তিনি সূচের মধ্যে সূতা ঢুকাতেন।
খাইবার যুদ্ধের সময় আলী (রা) চক্ষুপ্রদাহে আক্রান্ত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলীর (রা) চোখে থুতু দেন। এতে আলী এমনভাবে আরোগ্য লাভ করেন যেন কখনোই তাঁর চোখে কোনো অসুখ হয় নি।
সালামা ইবনুল আকওয়া খাইবারের যুদ্ধে তার ঊরুতে আঘাত পান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত স্থানে থুতু দেন এবং সালামা তৎক্ষনাৎ সুস্থ হয়ে যান।
খাস‘আম গোত্রের একজন মহিলার পুত্র নির্বোধ ও বাকশক্তিহীন ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু পানি নিয়ে পানির মধ্যে কুলি করেন এবং নিজের হস্তদ্বয় ধৌত করেন। এরপর তিনি পানিটুকু উক্ত বালককে প্রদান করে তাকে তা পান করাতে এবং তা দিয়ে তার দেহ মুছে দিতে নির্দেশ দেন। এতে বালকটি সুস্থ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষদের চেয়েও অধিক বুদ্ধির অধিকারী হয়।
ইবনু আববাস (রা) বলেন, এক মহিলা তার এক পাগল পুত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করেন। তিনি ছেলেটির বুকে হাত বুলিয়ে দেন। এতে ছেলেটি বমি করে এবং তার পেট থেকে কাল কুকুর ছানার মত কিছু বের হয়। এরপর ছেলেটি সুস্থ হয়ে যায়।
কিশোর মুহাম্মাদ ইবনু হাতিবের বাহুর উপর একটি গরম হাঁড়ি উল্টে পড়ে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে হাত বুলিয়ে দেন এবং সেখানে থুতু দেন। এতে সে তৎক্ষণাৎ সুস্থ হয়ে যায়।
শুরাহবীল আল-জু’ফীর (রা) হাতের তালুতে একটি আব (tumour) ছিল, যে কারণে তিনি ঘোড়ার লাগাম, তরবারী ইত্যাদি ধরতে পারতেন না। তিনি বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলে তার সহানুভুতি কামনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার টিউমারটি ডলতে থাকেন। এভাবে টিউমারটি মিলিয়ে যায় এবং তার কোনো চিহ্নই তার হাতে আর থাকে না।
(৮) তাঁর দুআর অলৌকিক ফল
আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, আমার মা (উম্মু সুলাইম) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার খাদেম আনাসের জন্য প্রার্থনা করুন। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি তার সম্পদ ও সন্তান বেশি করে দাও এবং তাকে যা কিছু প্রদান কর সব কিছুতে বরকত প্রদান কর।’ আনাস বলেন, আল্লাহর শপথ, আমার সম্পদ অনেক। আর আমার নিজের সন্তান ও সন্তানদের সন্তানগণের সংখ্যা প্রায় এক শত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রতি আহবান জানিয়ে পারস্য-সম্রাট কেসরার (Khosrau) নিকট পত্র লিখেন। পারস্য সম্রাট অত্যন্ত অভদ্রতার সাথে পত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে যেমন আমার পত্র ছিঁড়ে ফেলেছে, আল্লাহ তার সাম্রাজ্য ছিঁড়ে বিনষ্ট করবেন। ফলে অচিরেই পারস্য সাম্রাজ্যের বিনাশ ঘটে। পৃথিবীর কোথাও পারস্য সাম্রাজ্যের বা পারসিক আধিপত্যের কোনো অস্তিত্ব থাকে না।
প্রসিদ্ধ আরবী কবি নাবিগা জা’দী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সামনে কিছু কবিতা পাঠ করেন। তখন তিনি বলেন: আল্লাহ তোমার মুখ বন্ধ না করেন। নাবিগা ১২০ বৎসর আয়ূ লাভ করেন, কিন্তু তাঁর একটি দাঁতও পড়েছিল না এবং অতিবৃদ্ধ বয়সেও তার মুখটি অত্যন্ত সুন্দর ছিল। কথিত আছে যে, বৃদ্ধকালে তার কোনো দাঁত পড়ে গেলে সেখানে নতুন দাঁত উঠত।
আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমুআর দিনে মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় একজন বেদুঈন মসজিদে প্রবেশ করে অনাবৃষ্টির জন্য কষ্ট প্রকাশ করে। তখন তিনি বৃষ্টির জন্য দুআ করেন। ফলে তখনই বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত মদীনার মানুষের সুর্যের মুখ দেখতে পায় নি। পরের জুমুআয় উক্ত বেদুঈন অতিবৃষ্টির জন্য কষ্ট প্রকাশ করে। তখন তিনি আবার দুআ করেন, ফলে মেঘ কেটে যায়।
আবূ লাহাবের পুত্র উতবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালিগালাজ করত এবং অত্যন্ত কষ্টপ্রদান করত। তিনি আল্লাহর কাছে বদ-দুআ করেন, যেন আল্লাহ তাঁর একটি কুকুরকে তার পিছনে লাগিয়ে দেন। উতবা বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করে। কাফিলা রাত্রিতে একস্থানে অবস্থান করে। উতবা বলে, মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বদ-দুআর কারণে আমার ভয় লাগছে। তখন কাফিলার সাথীরা তাদের মালপত্র উতবার চারিদিকে রেখে উৎবাকে ঘিরে পাহারা দিতে থাকে। এমতাবস্থায় একটি সিংহ এসে উতবাকে তার সাথীদের মধ্য থেকে তুলে নিয়ে যায়।
এরূপ আরেক অত্যাচারী অপরাধী মুহাল্লিম ইবনু জুসামাকে তিনি বদ-দুআ করেন। লোকটি মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তার আত্মীয়রা তাকে কবরস্থ করে। কিন্তু লাশটি মাটি থেকে বেরিয়ে আসে। এভাবে যতবারই তারা তাকে কবর দেয় ততবারই লাশটি মাটি থেকে বেরিয়ে আসে। শেষে তারা লাশটি মাটির উপরে ফেলে রেখে চলে আসে।
একব্যক্তি বাম হাত ব্যবহার করে খাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডান হাত দিয়ে খেতে অনুরোধ করেন। লোকটি অহঙ্কার করে বলে, আমি ডান হাতে খেতে পারি না। তিনি বলেন, তুমি না পার! এরপর আর কখনো ঐ ব্যক্তি তার ডান হাত মুখে তুলতে পারত না।
এ বিষয়ক বর্ণনা এখানেই শেষ করছি। এরূপ আরো অগণিত ঘটনা সহীহ সনদে হাদীস গ্রন্থসমূহে সংকলিত হয়েছে। এ সকল মুজিযা বা অলৌকিক চিহ্ন প্রত্যেকটি পৃথকভাবে মুতাওয়াতির রূপে বর্ণিত হয়নি। তবে এ অর্থে শতশত সাহাবী থেকে শতশত পৃথক সনদে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক হাদীস পৃথকভাবে মুতাওয়াতির না হলেও নিঃসন্দেহে সামগ্রিকভাবে তা মুতাওয়াতির। যেমন আলীর (রা) বীরত্ব বা হাতিম তাঈর দানশীলতা বিষয়ক বর্ণনাদি। আর সামগ্রিকভাবে মুতাওয়াতির অর্থই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
৪. ১. ২. ব্যক্তিত্ব, বিধান ও মানবতার প্রয়োজন
৪. ১. ২. ১. তাঁর মহোত্তম চরিত্র ও আচরণ
দ্বিতীয় যে বিষয়টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুয়ত প্রমাণ করে তা তাঁর মহান চরিত্র ও অতুলনীয় সদাচারণ। তাঁর মধ্যে সকল মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলির সমন্বয় ঘটেছিল। জ্ঞান, কর্ম, বংশমর্যাদা, দেশের মর্যাদা, দৈহিক গুণাবলি ও মানসিক গুণাবলির চরম উৎকর্ষতা ও পূর্ণতা তিনি লাভ করেন। তাঁর গুণাবলি বিচার করলে যে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, সকল গুণের এরূপ সমন্বয় একজন নবী বা ভাববাদী ভিন্ন কারো মধ্যে হতে পারে না। কারণ, এ সকল গুণাবলির কোনো একটি দিক হয়ত অন্য মানুষদের মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সকল গুণের এরূপ সমন্বয় নবীগণ ছাড়া অন্যদের মধ্যে সম্ভব নয়। এজন্য এরূপ সকল পূর্ণতার গুণের সমন্বয় তার নবুয়তের অন্যতম প্রমাণ। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরম বিরোধীরাও তাঁর মধ্যে এ সকল গুণের অধিকাংশই বিদ্যমান ছিল বলে স্বীকার করেছেন।
৪. ১. ২. ২. তাঁর ধর্মব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
তৃতীয় যে বিষয়টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুয়ত প্রমান করে তা তাঁর ধর্মব্যবস্থা বা শরীয়তের বৈশিষ্ট্য। বিশ্বাস, ইবাদত-উপাসনা, জাগতিক ও সামাজিক দায়িত্ব ও কর্মকান্ড, রাষ্ট্র, বিচার ও প্রশাসন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক শিষ্টাচার, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ইত্যাদি সকল দিকে ইসলামের যে বৈশিষ্ট্য ও পূর্ণতা রয়েছে তা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাবে যে, এগুলি অবশ্যই আল্লাহর প্রদত্ত ও ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত এবং যিনি এগুলি নিয়ে আগমন করেছেন তিনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নবী বা ভাববাদী। পঞ্চম অধ্যায়ে পাঠক জেনেছেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীয়ত বা কুরআন ও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে পাদরিগণের আপত্তি অত্যন্ত দুর্বল ও ভিত্তিহীন। একান্তই বিদ্বেষ, অযৌক্তিক পক্ষপাত এবং বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার কারণেই তারা এ সকল কথা বলে।
৪. ১. ২. ৩. তাঁর আগমন ও বিজয়ের অবস্থা
চতুর্থ যে বিষয়টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুয়ত প্রমাণ করে, তা তাঁর প্রকাশ ও বিজয়ের অবস্থা। তিনি এমন এক সমাজে নবুয়ত দাবি করেন, যে সমাজের মানুষদের কোনো ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় প্রজ্ঞা ছিল না। তাদের মধ্যে আবির্ভুত হয়ে তিনি ঘোষণা দেন যে, আমি আল্লাহর নিকট থেকে আলোকময় গ্রন্থ ও মহান প্রজ্ঞা নিয়ে আগমন করেছি। আমি সমস্ত বিশ্বকে বিশ্বাস ও সততার আলোকে আলোকিত করব। তিনি ছিলেন সামাজিক শক্তিতে দুর্বল এবং তাঁর সাহায্যকারীগণ ও অনুসারীগণও ছিলেন নগণ্য ও দুর্বল। তা সত্ত্বেও তিনি জগতের সকল মানুষের বিরুদ্ধে সুদৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান হন। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, শক্তিধর রাষ্ট্রপ্রধান, সমাজপতি সকলের বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নেন। তাদের মতামত ভ্রান্ত, তাদের বুদ্ধি অপরিপক্ক ও তাদের ধর্ম বাতিল বলে তিনি ঘোষণা করেন। তিনি তাদের রাষ্ট্রগুলিকে পরাজিত করেন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত তাঁর ধর্ম সকল ধর্মের উপর প্রকাশ ও বিজয় লাভ করে। সময়ের আবর্তনের সাথে সাথে সকল দেশে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
তাঁর শত্রুগণ ছিল সংখ্যায়, অস্ত্রে ও শক্তিতে অনেক বেশি। তাঁর ধর্ম ইসলামের আলো নিভিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাঁর ধর্মের সকল চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য তাদের আগ্রহ, উদ্দীপনা, দৃঢ়তা, গোঁড়ামি, অন্ধ আবেগ ও উন্মাদনা ছিল সীমাহীন ও অপ্রতিরোধ্য। তা সত্ত্বেও তারা সফল হতে পারেন নি। আল্লাহর সাহায্য ও আসমানী সহযোগিতা ছাড়া কি তা সম্ভব ছিল?
ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য তাঁর নুবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করে। গীতসংহিতা ১/৬ নিম্নরূপ: ‘‘কারণ সদাপ্রভু ধার্মিকগণের পথ জানেন, কিনতু দুষ্টের পথ বিনষ্ট হইবে (For the LORD knoweth the way of the righteous: but the way of the ungodly shall perish)।’’
গীতসংহিতা ৫/৬: ‘‘তুমি মিথ্যাবাদীদিগকে বিনষ্ট করিবে, সদাপ্রভু রক্তপাতীকে ও ছলপ্রিয়কে ঘৃণা করেন (Thou shalt destroy them that speak leasing: the LORD will abhor the bloody and deceitful man)।’’
গীতসংহিতা ৩৪/১৬: ‘‘সদাপ্রভুর মুখ দুরাচারদের প্রতিকূল; তিনি ভূতল হইতে তাহাদের স্মরণ উচ্ছেদ করিবেন।’’
গীতসংহিতা ৩৭/১৭ ও ২০: ‘‘(১৭) কারণ দুষ্টদের বাহু ভগ্ন হইবে; কিনতু সদাপ্রভু ধার্মিকদিগকে (the righteous) ধরিয়া রাখেন।... (২০) কিনতু দুষ্টগণ বিনষ্ট হইবে, সদাপ্রভুর শত্রুগণ মাঠের তৃণশোভার সমান হইবে; তাহারা অনতর্হিত, ধূমের ন্যায় অনতর্হিত হইবে।’’
প্রেরিত ৫/৩৫-৩৯ শ্লোকে ইয়াহূদীদের ব্যবস্থা-গুরু গমলীয়েলের (Gamaliel) নিম্নোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে: ‘‘(৩৫) হে ইস্রায়েল-লোকেরা, সেই লোকদের বিষয়ে তোমরা কি করিতে উদ্যত হইয়াছ, তদ্বিষয়ে সাবধান হও। (৩৬) কেননা ইতিপূর্বে থুদা (Theudas) উঠিয়া আপনাকে মহাপুরুষ করিয়া বলিয়াছিল, এবং কমবেশ চারি শত জন তাহার সঙ্গে যোগ দিয়াছিল; সে হত হইল, এবং যত লোক তাহার অনুগত হইয়াছিল সকলে ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়িল, কেহই রহিল না। (৩৭) সেই ব্যক্তির পরে নাম লিখিয়া দিবার সময়ে গালীলীয় যিহূদা (Judas of Galilee) উঠিয়া কতকগুলি লোককে আপনার পশ্চাৎ টানিয়া লইয়াছিল; সেও বিনষ্ট হইল, এবং যত লোক তাহার অনুগত হইয়াছিল, সকলে ছড়াইয়া পড়িল। (৩৮) এক্ষণে আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমরা এই লোকদের হইতে ক্ষানত হও, তাহাদিগকে থাকিতে দেও; কেননা এই মন্ত্রণা কিমবা এই ব্যাপার যদি মনুষ্য হইতে হইয়া থাকে, তবে লোপ পাইবে; (৩৯) কিনতু যদি ঈশ্বর হইতে হইয়া থাকে, তবে তাহাদিগকে লোপ করা তোমাদের সাধ্য নয়, কি জানি, দেখা যাইবে যে, তোমরা ঈশ্বরের সহিত যুদ্ধ করিতেছ (if this counsel or this work be of men, it will come to nought: But if it be of God, ye cannot overthrow it; lest haply ye be found even to fight against God)।’’
উপরের বক্তব্যগুলির আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ধার্মিক (righteous) না হতেন তবে সদাপ্রভু তার পথ বিনষ্ট করতেন, লাঞ্ছিত করতেন এবং ভূতল হইতে তাঁর স্মরণ উচ্ছেদ করতেন, বাহু ভগ্ন করতেন, ধূমের ন্যায় অন্তর্হিত করতেন, তাঁর অনুসারীরা ছড়িয়ে পড়ত, তার কথা ও কর্ম বিনষ্ট করতেন। কিন্তু তিনি সে সব কিছুই করেন নি। এতে প্রমাণিত যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধার্মিক। এতে সন্দেহ নেই, যে সকল ইয়াহূদী-খৃস্টান মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস করেছেন বাইবেলের উপর্যুক্ত বক্তব্যের আলোকে তারা প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের সাথেই যুদ্ধ করছেন। তবে সময় নিকটবর্তী এবং অচিরেই তারা জানতে পারবেন। মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়।’’
তারা কখনোই ইসলামকে মুছে ফেলতে পারবেন না। আল্লাহই তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন: ‘‘তারা আল্লার আলো (Allah's Light) ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর আলো পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেন, যদিও কাফিররা তা অপসন্দ করে।’’
৪. ১. ২. ৪. মানবতার প্রয়োজনের সময়েই তাঁর আগমন
পঞ্চম যে দিকটি প্রমাণিত করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত নবী বা ভাববাদী ছিলেন তা তার আগমনের সময় ও মানবতার প্রয়োজন বিবেচনা করা। তিনি এমন এক সময়ে আবির্ভুত হলেন, যখন বিশ্বের মানব জাতির জন্য একজন পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন ছিল যিনি সঠিক পথের নির্দেশনা দিবেন এবং তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহবান করবেন। আরবগণ ছিল পৌত্তলিকতা ও কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মত ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত। পারস্যবাসীরা ছিল দুই ঈশ্বর-বাদ ও মাতা ও কন্যাকে বিবাহ করার মত ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত। তুর্কী-মঙ্গোল জাতি ছিল জনপদ ধ্বংস ও মানবসভ্যতার বিনাশে লিপ্ত। ভারতের মানুষ ছিল গরু, গাছপালা ও পাথর-মুর্তির পূজা-অর্চনায় লিপ্ত। ইয়াহূদী জাতি ছিল ধর্মের বিকৃতি, ঈশ্বরের প্রতি মানবীয় গুণারোপ, সত্যের অস্বীকার ও মিথ্যার প্রচারে লিপ্ত। খৃস্টান জাতি ছিল ত্রিত্ববাদ, ক্রুশ-পূজা এবং সাধু ও সাধ্বীদের মুর্তির উপাসনায় লিপ্ত। অনুরূপভাবে পৃথিবীর সকল জাতি ও ধর্মের অনুসারীগণ বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারের চোরাবালিতে ডুবে ছিল। সত্যকে ভুলে তারা অসত্য ও অসম্ভবকে নিয়ে মেতে ছিল।
মহান মহিমান্বিত প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কি এমতাবস্থায় তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে পরিত্যাগ করবেন? বিশ্ববাসীর প্রতি করুণার প্রতীক কাউকে তিনি পাঠাবেন না? তা তো হতে পারে না!
আর মানবতার এই কঠিন সময়ে একমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কেউই আবির্ভুত হন নি। তিনিই এই মহান ধর্ম ও ব্যবস্থা দিয়ে যান এবং এই সুমহান সৌধ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সকল বিভ্রান্ত আচার-রীতি এবং বাতিল ধর্মবিশ্বাস অপসারিত করেন। একত্ববাদের সূর্য উদিত হয় এবং আল্লাহর পবিত্রতার জ্যোতি উদ্ভাসিত হয়। বহু-ঈশ্বরবাদিতা, দ্বিত্ববাদ, ত্রিত্ববাদ, ঈশ্বরের প্রতি মানবীয় গুণাবলি আরোপ ইত্যাদি সকল বিভ্রান্তির অন্ধকার অপসারিত হয়। তাঁর উপর আল্লাহর অগণিত সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক এবং তিনি লাভ করুণ পরিপূর্ণ মর্যাদা।
এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন: ‘‘হে গ্রন্থানুগামি-ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ, রাসূল প্রেরণে বিরতির পর আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছে, সে তোমাদের নিকট স্পষ্ট ব্যাখ্যা করছে, যাতে তোমরা বলতে না পার, ‘কোনো সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী আমাদের নিকট আসে নি’; এখন তো তোমাদের নিকট একজন সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী এসেছে। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’’
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:
পূর্ববর্তী নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণী
৪. ২. ১. বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর প্রকৃতি
ষষ্ঠ যে বিষয় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করে তা তাঁর আগমনের বিষয়ে পূর্ববর্তী নবীগণ বা ভাববাদীগণের ভবিষ্যদ্বাণী, যা পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থগুলিতে বিদ্যমান। এ বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণীগুলি পর্যালোচনার পূর্বে কয়েকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য:
৪. ২. ১. ১. ভবিষ্যদ্বাণীর বিদ্যমানতা
বাইবেলীয় বা ইস্রায়েলীয় নবী বা ভাববাদিগণ আগামী দিনের অনেক বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাঁরা নবূখদ্নিৎসর (নেবুকাদনেজার, Nebuchadnezzar), কোরস (সাইরাস: Cyrus), আলেকজান্ডার এবং তার উত্তরাধিকারীগণ, ইদোম, মিসর, নীনবী, বাবিল প্রভৃতি দেশ ও অন্যান্য বিষয়ে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। কাজেই তাঁরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করবেন না এরূপ চিন্তা করা অবাস্তব ও অযৌক্তিক।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাঁর প্রকাশের সময়ে ‘একটি সরিষা-দানার তুল্য’, ‘অতি ক্ষুদ্র বীজ’, কিন্তু পরে তিনি এমন বৃক্ষ হয়ে উঠলেন যে, ‘আকাশের পক্ষিগণ আসিয়া তাহার শাখায় বাস করল’। তিনি প্রতাপশালী পরাক্রান্ত ক্ষমতাধর অধিপতি ও সম্রাটদের ক্ষমতা চূর্ণ করেছেন। পূর্ববর্তী ভাববাদীগণের মূল আবাসস্থল সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও যিরূশালেমে তার ধর্ম পরিপূর্ণরূপে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত তা প্রসারিত ও প্রচারিত হয়েছে। সকল ধর্মের উপরে তা প্রাধান্য লাভ করেছে। যুগের পর যুগ তা প্রতিষ্ঠিত থাকল। এ পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে তার আলো প্রসারিত হচ্ছে। এ সকল ঘটনা অন্যান্য ঘটনার চেয়ে অনেক বড় ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ইদোম, নীনবী ও অন্যান্য দেশের ঘটনার চেয়ে পরিমাণে ও গুরুত্বে এগুলি কোনো অংশেই কম নয়। এজন্য সুস্থ জ্ঞান একথা স্বীকার করতে পারে না যে, এ সকল ভাববাদী ক্ষুদ্র ও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করবেন, অথচ সেগুলির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এত বড় বিষয় সম্পর্কে কিছুই বলবেন না।
৪. ২. ১. ২. ভবিষ্যদ্বাণীর অস্পষ্টতা
ভবিষ্যদ্বাণী সাধারণত ইঙ্গিতময় হয়, পূর্ণ ব্যাখ্যাত হয় না। পূর্ববর্তী ভাববাদী পরবর্তী ভাববাদী সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেন, সাধারণত সেই ভবিষ্যদ্বাণী তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন না। সাধারণত ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয় না যে, অমুক সালে, অমুক দেশে, অমুক গোত্রে, অমুক আকৃতি ও প্রকৃতির অধিকারী অমুক নামে একজন ভাববাদী আগমন করবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষদের জন্য ভবিষ্যদ্বাণীগুলি অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য থাকে। তবে বিশেষভাবে জ্ঞানী ও ধর্মপুস্তক সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞ মানুষেরা পারিপার্শ্বিক ইঙ্গিত ও সূত্রাদির মাধ্যমে তা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। অনেক সময় ভবিষ্যদ্বাণী এত অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হয় যে, সর্বোচ্চ জ্ঞানী ও ধর্মজ্ঞ মানুষেরাও তা বুঝতে পারেন না। পরবর্তী ভাববাদী আবির্ভুত হয়ে, নিজে যখন দাবি করেন যে, আমিই সেই ভাববাদী যার বিষয়ে পূর্ববর্তী ভাববাদী অমুক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এবং তার এই দাবি বিভিন্ন অলৌকিক চিহ্নের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তখনই কেবল তারা বুঝতে পারেন যে উক্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে একেই বুঝানো হয়েছিল। এরূপ ভাববাদীর আবির্ভাব, দাবি পেশ ও দাবি প্রমাণের আগে তারা কিছুই বুঝতে পারেন না। এজন্য এ সকল ধর্মজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মানুষদেরকে তিরস্কারও করা হয়।
এ কারণেই যীশু ইয়াহূদী পণ্ডিত ও ধর্মগুরুদেরকে তিরস্কার করেছেন। তিনি তাদেরকে তিরস্কার করে বলেন, ‘‘হা ব্যবস্থাবেত্তারা, ধিক্ তোমাদিগকে, কেননা তোমরা জ্ঞানের চাবি হরণ করিয়া লইয়াছ; আপনারা প্রবেশ করিলে না, এবং যাহারা প্রবেশ করিতেছিল, তাহাদিগকেও বাধা দিলে।’’ লূকের সুসমাচারের ১১/৫২ শ্লোকে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মুসলিম আলিমগণ বলেছেন, সকল আসমানী কিতাবেই কোনো না কোনোভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কিত সংবাদ, পূর্বাভাস বা ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান। কিন্তু এগুলি ইঙ্গিতময়। যদি এগুলি সাধারণদের কাছে সুস্পষ্ট হতো তবে তাদের আলিম-পণ্ডিতগণ এগুলি গোপন করার অভিযোগে অভিযুক্ত হতেন না। এরপর ভাষান্তরের ফলে অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা বৃদ্ধি পায়। হিব্রু থেকে সিরীয় ভাষায়, সিরীয় থেকে আরবী ভাষায়, এভাবে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের সাথে সাথে এ সকল ভবিষ্যদ্বাণী আরো বেশি দুর্বোধ্য হয়ে যায়।
৪. ২. ১. ৩. ভাববাদীর অপেক্ষায় ইস্রায়েলীয় জাতি
বাইবেলই প্রমাণ করে যে, ইস্রায়েলীয় জাতি খৃস্ট ও এলিয় ছাড়াও অন্য একজন ভাববাদীর আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। যোহনের সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ে রয়েছে: ‘‘১৯ আর যোহনের সাক্ষ্য এই, যখন যিহূদিগণ কয়েক জন যাজক ও লেবীয়কে দিয়া যিরূশালেম হইতে তাঁহার কাছে এই কথা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল, আপনি কে? ২০ তখন তিনি স্বীকার করিলেন, অস্বীকার করিলেন না; তিনি স্বীকার করিলেন যে, আমি সেই খ্রীষ্ট (the Christ/the Messiah/the annointed) নই। ২১ তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তবে কি? আপনি কি এলিয় (Elias)? তিনি বলিলেন, আমি নই। আপনি কি সেই ভাববাদী (that prophet)? তিনি উত্তর করিলেন, না। ... ২৫ আর তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি যদি সেই খ্রীষ্ট নহেন, এলিয়ও নহেন, সেই ভাববাদীও নহেন, তবে বাপ্তাইজ করিতেছেন কেন?’’
এখানে ‘‘সেই ভাববাদী’’ বলতে সেই প্রতিশ্রুত ও আকাঙ্খিত ভাববাদীকে বুঝানো হয়েছে, যাব বিষয়ে দ্বিতীয় বিবরণের ১৮ অধ্যায়ে মোশি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ।
এভাবে আমরা দেখছি যে, ইস্রায়েলীয়গণ মাসীহ বা খৃস্ট ছাড়াও অন্য আরেকজন প্রতিশ্রুত নবীর জন্য অপেক্ষা করছিল। তাঁর বিষয়টি তাদের মধ্যে এত প্রসিদ্ধ ও সুপরিজ্ঞাত ছিল যে, তাঁর কোনো নাম-পরিচয় বলার প্রয়োজন হতো না, শুধু ‘সেই ভাববাদী’ বললেই সকলেই বুঝতে পারতেন।
যোহন ৭/৪০-৪১ নিম্নরূপ: ‘‘(৪০) সেই সকল কথা শুনিয়া লোকসমূহের মধ্যে কেহ কেহ বলিল, ইনি সত্যই সেই ভাববাদী। (৪১) আর কেহ কেহ বলিল, ইনি সেই খ্রীষ্ট।’’
এ কথা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়, তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে, খৃস্ট এবং সে ভাববাদী দুজন দু ব্যক্তি হবেন। এজন্যই তারা একজনের বিপরীতে অন্যের কথা বলেছেন। আর এ সকল বক্তব্য থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে উক্ত প্রতিশ্রুত ভাববাদী যীশুখৃস্টের আগে আগমন করেন নি। তাহলে নিশ্চিতভাবেই জানা যাচ্ছে যে, তিনি তাঁর পরে আগমন করবেন। আর আমরা জানি যে, যীশুর পরে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া আর কোনো মহান ভাববাদী আসেন নি। কাজেই আমরা বুঝতে পারি যে, ইস্রায়েলীয়গণ যে প্রতিশ্রুত ভাববাদীর অপেক্ষা করত তিনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
যীশু বিভিন্ন সময়ে ভন্ড ভাববাদীগণ থেকে সতর্ক করেছেন। যেমন মথি ৭/১৫ শ্লোকে যীশুর নিম্নোক্ত বাণী উদ্ধৃত করা হয়েছে: ‘‘ভাক্ত ভাববাদিগণ (false prophets) হইতে সাবধান; তাহারা মেষের বেশে তোমাদের নিকটে আইসে, কিনতু অনতরে গ্রাসকারী কেন্দুয়া (ravening wolves)।’’ এরূপ বক্তব্যকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের সত্যতার বিরুদ্ধে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। কারণ যীশু এখানে ভাক্ত ভাববাদী বা ভন্ড নবী থেকে সাবধান করেছেন, সত্য ভাববাদী থেকে নয়। এজন্য তিনি ‘ভাক্ত’ কথাটি উল্লেখ করেছেন। হ্যাঁ, যদি তিনি বলতেন, ‘আমার পরে যত ভাববাদী আগমন করবে সকলের থেকে সাবধান থাকবে’ তবে সে কথা বাহ্যত তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ হতে পারত। কিন্তু যীশু এরূপ কোনো কথা বললেও, পাদরিগণ সে কথা ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হতেন; কারণ যীশুর পরে অনেক ভাববাদীর ভাববাদিত্ব তারা বিশ্বাস করেন বলে নতুন নিয়মের পুস্তকাদি থেকে প্রমাণিত।
যীশুখৃস্টের ঊর্ধ্বারোহণের পরে প্রথম শতাব্দীতে অনেক ভাক্ত ভাববাদীর আবির্ভাব হয় বলে আমরা নতুন নিয়ম থেকে জানতে পারি। যীশু মূলত এ সকল ভাক্ত ভাববাদী ও ভাক্ত খৃস্ট থেকে সাবধান করেছেন। তিনি সত্য ভাববাদী থেকে সতর্ক করেন নি। আর এজন্যই তিনি উপর্যুক্ত বক্তব্যে ভাক্ত ভাববাদীগণ থেকে সাবধান করার পরে মথি ৭/১৬, ১৭ ও ২০ শ্লোকে তিনি বলেছেন: ‘‘(১৬) তোমরা তাহাদের ফল দ্বারাই তাহাদিগকে চিনিতে পারিবে (Ye shall know them by their fruits)। লোকে কি কাঁটা গাছ হইতে দ্রাক্ষাফল, কিমবা শিয়ালকাঁটা হইতে ডুমুর ফল সংগ্রহ করে? (১৭) সেই প্রকারে প্রত্যেক ভাল গাছে ভাল ফল ধরে, কিন্তু মন্দ গাছে মন্দ ফল ধরে।... (২০) অতএব তোমরা উহাদের ফল দ্বারাই উহাদিগকে চিনিতে পারিবে।’’
নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সত্য ভাববাদী। তাঁর ফলই তা প্রমাণ করে। বিরোধিগণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিষয়ে যে সকল অপবাদ ও বিভ্রান্তি প্রচার করেন, সেগুলি ভিত্তিহীন ও মূল্যহীন। এছাড়া বিরোধীদের অপবাদ নেই কার বিরুদ্ধে? সকলেই জানেন যে, ইয়াহূদীগণ মরিয়মের পুত্র যীশুকে অবিশ্বাস করেন এবং তাকে মিথ্যাবাদী ও ভন্ড বলে বিশ্বাস করেন। তাদের বিশ্বাস অনুসারে বিশ্বের শুরু থেকে তাঁর আবির্ভাব পর্যন্ত তাঁর চেয়ে খারাপ আর কোনো মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি। অনুরূপভাবে পাদরিগণের স্বদেশীয় ইউপোরীয় হাজার হাজার পণ্ডিত, বৈজ্ঞানিক ও গবেষক যীশুর নিন্দা করেন। তারা প্রথমে খৃস্টান ছিলেন। পরে তারা খৃস্টধর্মকে ঘৃণা করে তা পরিত্যাগ করেন। তারা তাঁকে অবিশ্বাস করেন এবং তাঁকে ও তাঁর ধর্মকে নিয়ে উপহাস করেন। তাদের মতামতের পক্ষে তারা অনেক বইপুস্তক রচনা করেছেন। এ সকল বইপুস্তক বিশ্বের সর্বত্র প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ইউরোপে প্রতিদিন এদের সংখ্যা বাড়ছে। যীশুর বিরুদ্ধে ইয়াহূদীদের নিন্দা এবং ইউরোপীয় নাস্তিক পণ্ডিতদের নিন্দা যেমন খৃস্টান পাদরিগণের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে ত্রিত্ববাদী খৃস্টান পাদরি ও পণ্ডিতগণের অপবাদ আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. ২. ১. ৪. বাইবেলীয় নামসূহের অনুবাদ, সংযোজন ও পরিবর্তন
অতীতে ও বর্তমানে সকল যুগে ইয়াহূদী-খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণের অতি পরিচিত একটি অভ্যাস যে, তাঁরা ধর্মগ্রন্থের অনুবাদে অধিকাংশ সময়ে নামগুলির অনুবাদ করেন এবং নামের পরিবর্তে নামের অর্থ উল্লেখ করেন। এ বিষয়টি অত্যন্ত বড় অন্যায় ও বিভ্রান্তিকর। এছাড়া এ সকল পুস্তকের যে বাণীকে তারা ঈশ্বরের বাণী বলে বিশ্বাস করেন সেগুলির সাথে কখনো কখনো নিজেদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা সংযোগ করেন, অথচ মূল ঐশ্বরিক বাক্য ও ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন না। এ দুটি বিষয় তাদের কাছে অত্যন্ত সহজ ও অতি পরিচিত অভ্যস্ত কর্ম।
যদি কেউ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদিত বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণ পাঠ ও তুলনা করেন তবে এ জাতীয় অনেক উদাহরণ দেখতে পারবেন। বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান নামসমূহের অনুবাদ করা, নামের পরিবর্তে অর্থের ভিত্তিতে অন্য শব্দ ব্যবহার করা এবং তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সংযোজন করা অতীত-বর্তমান সকল যুগে বাইবেল লেখক ও অনুবাদকগনের চিরচারিত স্বভাবজাত রীতি। কাজেই তাঁদের পক্ষে মোটেও অস্বাভাবিক নয় যে, তাঁরা বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণীগুলির মধ্যে তাঁর কোনো নাম অনুবাদ করে নামের পরিবর্তে অর্থ লিখবেন, বা এক শব্দের পরিবর্তে অন্য শব্দ লিখবেন, বা ব্যাখ্যা হিসেবে বা ব্যাখ্যা ছাড়াই কোনো কথা সংযোগ করবেন। আর এরূপ পরিবর্তনের ফলে এসকল ভবিষ্যদ্বাণী অর্থ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে এবং বাহ্যত এগুলির সাথে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পৃক্ততা অনুধাবন করা অসুবিধাজনক হয়ে গিয়েছে।
এছাড়া পাঠক ইতোপূর্বে দেখেছেন যে, তাঁদের অভ্যন্তরীণ দল-উপদলের পক্ষের প্রমাণ বিকৃত বা বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে বাইবেলে বিকৃতি করার ক্ষেত্রে তাঁরা কখনোই কোনো দুর্বলতা বা অবসাদ প্রদর্শন করেন নি। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ে প্রযোজ্য হতে পারে এমন সকল ভবিষ্যদ্বাণীকে এভাবে পরিবর্তন করার বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ ছিল খুবই বেশি। তাঁদের অভ্যন্তরীণ দল উপদলের মতামতের পক্ষের প্রমাণ বিকৃত করার যে আগ্রহ তাঁদের ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ ছিল মুসলিমদের পক্ষের প্রমাণ বিকৃত করার। কাজেই তারা যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণীগুলিতে অনুবাদ, ব্যাখ্যা, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতি সাধন করে থাকেন বা তা অস্পষ্ট ও অবোধগম্য করে থাকেন তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
একারণেই আমরা দেখি যে, মুসলিম উম্মাহর পূর্ববর্তী লেখকগণ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে বাইবেল থেকে যে সকল উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন, সেগুলির সাথে বর্তমান যুগে প্রচলিত অনুবাদগুলির অনেক স্থানে মিল পাওয়া যায় না। বাহ্যত এর কারণ এরূপ পরিবর্তন ও বিকৃতি। এ সকল মুসলিম আলিম তাঁদের যুগে প্রচলিত আরবী অনুবাদ থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। পরবর্তী যুগে অনুবাদের মধ্যে পরিবর্তন ও সংশোধনের ধারা অব্যাহত থেকেছে। অনুবাদের পার্থক্যের কারণেও এরূপ হতে পারে। তবে পরিবর্তনের বিষয়টিই অন্যতম কারণ; কারণ আমরা দেখছি যে, খৃস্টান ধর্মগুরুগণের লেখনি ও অনুবাদের মধ্যে পরিবর্তন, সংযোজন ও সংশোধনের এই অভ্যাস এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
উপরের বিষয়গুলি অনুধাবন করার পরে আমরা বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক সুসমাচার ও ভবিষ্যদ্বাণীগুলির মধ্য থেকে সামান্য কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী আলোচনা করব। বাইবেলের পুস্তকগুলিতে বহুবিধ বিকৃতি সাধিত হওয়ার পরেও বাইবেলের পুস্তকসমূহের মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক অনেক সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান রয়েছে।
৪. ২. ২. বাইবেলের চারটি ভবিষ্যদ্বাণী
আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী মূল গ্রন্থে বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিষয়ক ১৮টি সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী আলোচনা করেছেন। এখানে মাত্র ৪টি ভবিষ্যদ্বাণী আলোচনা করা হলো:
৪. ২. ২. ১. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী
দ্বিতীয় বিবরণ ১৮/১৭-২২: ‘‘(১৭) তখন সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, উহারা ভালই বলিয়াছে। (১৮) আমি উহাদের জন্য উহাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে তোমার সদৃশ এক ভাববাদী (a Prophet from among their brethren, like unto thee) উৎপন্ন করিব, ও তাঁহার মুখে আমার বাক্য দিব; আর আমি তাঁহাকে যাহা যাহা আজ্ঞা করিব, তাহা তিনি উহাদিগকে বলিবেন। (১৯) আর আমার নামে তিনি আমার যে সকল বাক্য বলিবেন, তাহাতে যে কেহ কর্ণপাত না করিবে, তাহার কাছে আমি প্রতিশোধ লইব। (২০) কিন্তু আমি যে বাক্য বলিতে আজ্ঞা করি নাই, আমার নামে যে কোন ভাববাদী দুঃসাহসপূর্বক তাহা বলে, কিমবা অন্য দেবতাদের নামে যে কেহ কথা বলে, সেই ভাববাদীকে নিহত হইতে হইবে। (২১) আর তুমি যদি মনে মনে বল, সদাপ্রভু যে বাক্য বলেন নাই, তাহা আমরা কি প্রকারে জানিব? ২২ [তবে শুন,] কোন ভাববাদী সদাপ্রভুর নামে কথা কহিলে যদি সেই বাক্য পরে সিদ্ধ না হয়, ও তাহার ফল উপস্থিত না হয়, তবে সেই বাক্য সদাপ্রভু বলেন নাই; ঐ ভাববাদী দুঃসাহসপূর্বক তাহা বলিয়াছে, তুমি তাহা হইতে উদ্বিগ্ন হইও না।’’
ইয়াহূদীগণ দাবি করেন যে, এই ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদটি যিহোশূয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে। আর খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, কথাটি যীশুর বিষয়ে বলা হয়েছে। উভয় দাবিই ভিত্তিহীন। নিঃসন্দেহে এ কথাগুলি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন বিষয়ক সুসংবাদ ছাড়া কিছুই নয়। নিম্নোক্ত বিষয়গুলি তা প্রমাণ করে:
(১) বাইবেলের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে নিশ্চিত জানা যায় যে, যীশুর সমসাময়িক ইয়াহূদীগণ এ ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে প্রতিশ্রুত একজন ভাববাদীর আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন এবং তারা নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিশ্রুত এই ভাববাদী মসীহ বা খৃস্ট নন, বরং অন্য একজন হবেন। কাজেই এখানে যে ভাববাদীর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে তিনি কখনোই যিহোশূয় হতে পারেন না বা যীশুও হতে পারেন না।
(২) এ ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে ‘‘তোমার সদৃশ (like unto thee)’’। যিহোশূয় ও যীশু কেউই মোশির সদৃশ বা মোশির তুল্য হতে পারেন না।
কারণ যিহোশূয় ও যীশু উভয়েই ইস্রায়েল সন্তানগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর ইস্রায়েল সন্তানগণের মধ্যে কেউ মোশির তুল্য বা সদৃশ হতে পারেন না। দ্বিতীয় বিবরণ ৩৪/১০-এ বলা হয়েছে: ‘‘মোশির তুল্য কোন ভাববাদী ইস্রায়েলের মধ্যে আর উৎপন্ন হয় নাই (there arose not a prophet since in Israel like unto Moses)।’’
এছাড়া মোশির সাথে যিহোশূয় ও যীশুর কোনো সাদৃশ্য নেই। কারণ মোশি ছিলেন ঐশ্বরিক গ্রন্থ ও বিধিনিষেধময় নতুন ব্যবস্থা প্রাপ্ত একজন ভাববাদী। পক্ষান্তরে যিহোশূয় ও যীশু এরূপ কিছুই লাভ করেন নি। বরং তাঁরা মোশির ব্যবস্থার অনুসারী ছিলেন। এছাড়া মোশির ব্যবস্থায় শাস্তি, দন্ড, গোসলের বিধান, পবিত্রতা ও শুচিতার বিধান, শুচি ও অশুচি খাদ্য ও পানীয় ইত্যাদির বিধান রয়েছে। প্রচলিত নতুন নিয়ম থেকে প্রমাণিত হয় যে, যীশুর ব্যবস্থায় এ সব কিছুই নেই। মোশি তার জাতির মানুষের কাছে সম্মানিত মর্যাদাময় নেতা ছিলেন, সকলেই যার আনুগত্য করত এবং তার আদেশ ও নিষেধ কার্যকর করা হতো। যীশু এরূপ ছিলেন না। এছাড়া খৃস্টানগণের বিশ্বাস অনুসারে যীশু ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন তার অনুসারীদের পাপমুক্তির জন্য। মোশি তার অনুসারীদের পাপমুক্তির জন্য ক্রুশে আরোহণ করেন নি।
(৩) এ ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে: ‘‘উহাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে (from among their brethren)’’। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, ইস্রায়েল সন্তানদের দ্বাদশ বংশ সকলেই তখন মোশির নিকট উপস্থিত ছিলেন। যদি এ ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্য হতো যে, এ প্রতিশ্রুত ভাববাদী ইস্রায়েলের দ্বাদশ বংশের কোনো বংশে জন্মগ্রহন করবেন, তবে এখানে ঈশ্বর ‘‘উহাদের মধ্য হইতে’’ বলতেন, ‘‘উহাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে’’ বলতেন না। ‘ভ্রাতৃগণ’ কথাটি থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, প্রতিশ্রুত ভাববাদী ইস্রায়েলীদের দ্বাদশ বংশের কোনো বংশের অন্তর্ভুক্ত হবেন না, বরং দ্বাদশ বংশের সকলের ‘ভ্রাতৃগণের’ মধ্যে তিনি জন্মগ্রহণ করবেন। যেহেতু যিহোশূয় ও ঈসা আলাইহিস সালাম উভয়েই ইয়াকূব আলাইহিস সালাম বা ইস্রায়েলের সন্তান, সেহেতু তাঁরা উভয়েই ইস্রায়েল-সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, কাজেই তাঁরা এ ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্য হতে পারেন না।
প্রকৃত সত্য হলো, এখানে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বুঝানো হয়েছে, কারণ তিনি ইস্রায়েলের দ্বাদশ বংশের ভ্রাতৃগণ অর্থাৎ ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর বংশধর ছিলেন। আর বাইবেলে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে ইস্রায়েল-সন্তানদের ইসমাঈল ও তাঁর বংশধরের ‘‘ভ্রাতৃগণ’’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ হাগার (Hagar) বা হাজেরাকে তাঁর পুত্র ইসমাঈলের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সে প্রতিশ্রুতিতে ‘ভ্রাতৃগণ (brethren) শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আদিপুস্তক ১৬/১২ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘সে তাহার ভ্রাতৃগণের সম্মুখে (সকল ভ্রাতার সম্মুখে) বসতি স্থাপন করিবে।’’ (he shall dwell in the presence of all his brethren)।’’
অনুরূপভাবে আদিপুস্তক ২৫/১৮ শ্লোকে ইসমাঈলের বিষয়ে ‘ভ্রাতৃগণ’ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে। ‘‘তিনি তাহার সকল ভ্রাতার (all his brethren) সম্মুখে বসতিস্থান পাইলেন।’’
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইস্রায়েল-সন্তানগণের ভ্রাতৃগণ ইসমায়েল সন্তানগণের বংশধর, এজন্য এ ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে প্রযোজ্য।
(৪) উপর্যুক্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে যে, ‘আমি উৎপন্ন করিব (আরবী বাইবেলের ভাষ্য অনুসারে: আগামীতে উৎপন্ন করিব)’। আর এ কথা বলার সময় যিহোশূয় ইস্রায়েল সন্তানগণের সাথে মোশির নিকট উপস্থিত ছিলেন এবং মোশির স্থলাভিষিক্ত ভাববাদী তিনি। কাজেই এই ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর ক্ষেত্রে কিভাবে প্রযোজ্য হবে?
(৫) এ ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে: ‘‘ তাঁহার মুখে আমার বাক্য দিব’’। একথা থেকে বুঝা যায় যে, এই ভাববাদীর উপর পৃথক ‘আসমানী কিতাব’ অবতীর্ণ হবে এবং নিরক্ষর হওয়ার কারণে তিনি তা লিখিতভাবে পাঠ করতে পারবেন না, বরং মুখস্থ রেখে মুখে পাঠ করবেন। এ দুটি বিষয়ের কোনোটিই যিহোশূয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাঁর উপর কোনো পৃথক ‘‘বাক্য’’ নাযিল হয় নি, এবং তিনিও মুখের বাক্য নয়, বরং লিখিত তাওরাত থেকে পাঠ করতেন।
(৬) এ ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে: ‘‘ আর আমার নামে তিনি আমার যে সকল বাক্য বলিবেন, তাহাতে যে কেহ কর্ণপাত না করিবে, তাহার কাছে আমি প্রতিশোধ লইব’’। এ ভাববাদীর বৈশিষ্ট্য বুঝানোর জন্য একথা বলা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, এই প্রতিশোধ বিশেষ ধরনের শাস্তি, যা সাধারণ ভাববাদীগণের কথা অমান্য করলে প্রযোজ্য নয়। কজেই এ প্রতিশোধ বলতে শুধু পারলৌকিক জাহান্নামের শাস্তি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শাস্তি হতে পারে না। কারণ যে কোনো ভাববাদীর কথায় কর্ণপাত না করলেই এরূপ প্রতিশোধ বা শাস্তি আল্লাহ প্রদান করেন। এভাবে বুঝা যায় যে, এখানে প্রতিশোধ বলতে ‘ব্যবস্থা’ নির্ধারিত প্রতিশোধ বুঝানো হয়েছে। এ ভাববাদী আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হবেন তাঁর কথায় কর্ণপাত না করলে তাকে শাস্তি প্রদানের। এ বিষয়টি যীশুর ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রয়োজ্য নয়; কারণ তাঁর ব্যবস্থায় তাঁর কথায় কর্ণপাত না করলে বা ব্যবস্থা পালন না করলে কোনো শাস্তি, দন্ড বা যুদ্ধের বিধান নেই। এজন্য এ বিষয়টি শুধু মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাঁর মাধ্যমে প্রদত্ত আল্লাহর বিধান অমান্য করলে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে শত্রুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা জিহাদের ব্যবস্থা মহান আল্লাহ তাঁকেই দিয়েছিলেন।
(৭) উপর্যুক্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে, ঈশ্বর যে কথা বলেন নি, সে কথা যদি কোনো ভাববাদী ঈশ্বরের নামে বলে তবে তাকে নিহত হতে হবে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি সত্য ভাববাদী না হতেন তবে তিনি অবশ্যই নিহত হতেন। পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ এ বিষয়ে বলেছেন: ‘‘সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, আমি অবশ্যই তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, এবং কেটে দিতাম তার জীবন-ধমনী।’’
কিন্তু তিনি নিহত হন নি বা বিনষ্ট হন নি। তাঁকে হত্যার বা গুপ্ত হত্যার জন্য কাফিরদের প্রানান্ত প্রচেষ্টা ছাড়াও তিনি নিজে বহুবার যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করেছেন, একাকী যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, কিন্তু তাঁর শত্রুরা তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হয় নি। তাঁর বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘আল্লাহ তোমাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন।’’ আর আল্লাহ তাঁর এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। কেউ তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হয় নি। স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে তিনি সর্বোচ্চ সঙ্গীর সাথে মিলিত হয়েছেন। পক্ষান্তরে খৃস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে যীশু নিহত হয়েছেন এবং ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন। এজন্য যদি কেউ দাবি করেন যে, এই ভবিষ্যদ্বাণীটি যীশুর বিষয়ে কথিত, তবে তাতে প্রমাণিত হবে যে, তিনি মিথ্যাবাদী ভাববাদী ছিলেন বা ঈশ্বরের নামে তিনি মিথ্যা বলেছিলেন। ইয়াহূদীরা তাঁর বিষয়ে এরূপ বিশ্বাসই পোষণ করে। নাঊযু বিল্লাহ!
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিহত হন নি, বরং স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, কাজেই উপর্যুক্ত ভবিষ্যদ্বাণীটি তাঁর ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে প্রযোজ্য। এ বিষয়টি অনুধাবন করার পর খৃস্টান ধর্মগুরুগণ তাদের বাইবেল পরিবর্তন করেন। প্রাচীন আরবী অনুবাদগুলিতে দ্বিতীয় বিবরণ ১৮/২০ শ্লোক নিম্নরূপ ছিল: ‘‘কিন্তু আমি যে বাক্য বলিতে আজ্ঞা করি নাই, আমার নামে যে কোন ভাববাদী দুঃসাহসপূর্বক তাহা বলে, কিমবা অন্য দেবতাদের নামে যে কেহ কথা বলে, সেই ভাববাদীকে নিহত হইতে হইবে।’’ কিন্তু খৃস্টানধর্মগুরুগণ একে পরিবর্তন করে ১৮৬৫ খৃস্টাব্দের অনুবাদে লিখেছেন: ‘‘.... সেই ভাববাদীকে মরিতে হইবে।’’ এভাবে তারা নিহত হওয়ার পরিবর্তে মরার কথা লিখলেন। তাদের উদ্দেশ্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াতের সত্যতা অস্বীকার করার পথ তৈরি করা। নিহত হওয়া ও মরার মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। সত্য ও ভন্ড উভয় প্রকারের ভাববাদীই মৃত্যুবরণ করবে, এতে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার সুযোগ থাকে না। তবে এ বিকৃতির মাধ্যমে তার সত্য পুরোপুরি গোপন করতে পারেন নি। নিম্নের বিষয় লক্ষ্য করুন:
(৮) উপরের ভবিষ্যদ্বাণীর ২২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি কোনো ভাববাদী সদাপ্রভুর নামে মনগড়া কিছু বলেন, তবে তিনি তা কখনো সিদ্ধ হতে দেন না, বরং তার ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। প্রথম অনুচ্ছেদে পাঠক দেখেছেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এবং এ সকল ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি সত্য নবী ছিলেন।
(৯) ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ স্বীকার করেছেন যে, তোরাহ-এ যে ভাববাদী আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সেই প্রতিশ্রুত ভাববাদী। তবে তাদের কেউ তার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছেন, যেমন মুখাইরিক, আব্দুল্লাহ ইবনু সাল্লাম, কা’ব আল-আহবার। অন্য অনেক ইয়াহূদী তাঁকে প্রতিশ্রুত ভাববাদী বুঝতে পেরেও অবিশ্বাসের মধ্যেই থেকেছেন, যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু সূরবা, হুয়াই ইবনু আখতাব, তার ভাই আবূ ইয়াসির ইবনু আখতাব। আর এরূপ অবিশ্বাস তো খুবই স্বাভাবিক। বাইবেল থেকে জানা যায় যে, যীশুর সমসাময়িক অনেক ইয়াহূদী পণ্ডিত তাঁর নুবুওয়াত ও মুজিযা সঠিক বলে স্বীকার করেন, কিন্তু তারা ঈমান গ্রহণ করেন নি। সুসমাচার লেখক যোহনের সাক্ষ্য অনুসারে মহাযাজক কায়াফা (Caiaphas) একজন ভাববাদী ছিলেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, যীশুই প্রতিশ্রুত মসীহ বা খৃস্ট। কিন্তু তিনি তাঁর প্রতি ঈমান আনেন নি। বরং তাঁকে ‘ঈশ্বর-নিন্দা’র (blasphemy) অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদানের নির্দেশ দেন। যোহনলিখিত সুসমাচারের ১১ ও ১৮ অধ্যায়ে তা বলা হয়েছে।
প্রথম আপত্তি: এখানে কেউ বলতে পারেন যে, ‘ইস্রায়েল সন্তানগণের ভ্রাতৃগণ’ বলতে শুধু ইসমাঈল সন্তানগণকেই বুঝানো হবে এমন তো নয়। বরং ইসমাঈল সন্তানগণ ছাড়াও এষৌ -এর বংশধর এবং অব্রাহামের অন্য স্ত্রী কটুরার পুত্রদের বংশধরগণও ‘ইস্রায়েল সন্তানগণের ভ্রাতৃগণ’ বলে গণ্য। (কাজেই এই প্রতিশ্রুত ভাববাদী তো এদের মধ্য থেকেও আসতে পারেন।)
এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য যে, হ্যাঁ, তারাও ইস্রায়েল সন্তানগণের ভ্রাতৃগণ’ বলে গণ্য। তবে তাদের মধ্য থেকে এ সকল বৈশিষ্ট্য সহ কোনো ভাববাদী আবির্ভুত হন নি। এছাড়া ইশ্মায়েলের বংশধরদের জন্য আল্লাহ যেভাবে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের জন্য সেরূপ কোনো প্রতিশ্রুতি দেন নি। পক্ষান্তরে ইশ্মায়েলের বংশধরদেরকে মহা মর্যাদা দানের বিষয়ে হাগার (Hagar) এবং অবরাহামকে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এ ছাড়া ইসহাক যাকোবকে যে আশীর্বাদ করেন এবং এরপর এষৌকে যে আশীর্বাদ করেন তা থেকে জানা যায় যে, এষৌ-এর বংশধরদের মধ্যে এই প্রতিশ্রুত ভাববাদীর আগমন সম্ভব নয়। আদিপুস্তকের ২৭ অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় আপত্তি: দ্বিতীয় বিবরণের ১৮ অধ্যায়ের ১৫ শ্লোকে মোশি বলেছেন: ‘‘তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার মধ্য হইতে, তোমার ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে, তোমার জন্য আমার সদৃশ এক ভাববাদী (a Prophet from the midst of thee, of thy brethren) উৎপন্ন করিবেন...।’’ এখানে ‘‘তোমার মধ্য হইতে’’ কথাটি দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, এই প্রতিশ্রুত ভাববাদী ইস্রায়েল সন্তানগণের মধ্য থেকে আবির্ভুত হবেন, ইশ্মায়েল সন্তানগণের মধ্য থেকে নয়।
এ আপত্তির বিষয়ে আমাদের বক্তব্য এই যে, আরবী ও হিব্রু ব্যাকরণ অনুসারে (তোমার ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে) কথাটি (তোমার মধ্য হইতে) কথাটির ‘‘বদল’’, অর্থাৎ আংশিক বা সংশোধন মূলক প্রতিকল্প বাক্যাংশ। আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় তা ‘বদল ইশতিমাল’ বা ‘আংশিক পরিবর্তন’ অথবা ‘বদল ইদরাব’ বা ‘সংশোধনমূলক পরিবর্তন’ বলে গণ্য। আর উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম শব্দ বা বাক্যাংশটি বক্তার উদ্দেশ্য বহির্ভুত বলে গণ্য। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় বাক্যাংশই মূল উদ্দেশ্য, প্রথম বাক্যাংশ সংশ্লিষ্ট মাত্র। আর সকল অবস্থায় এ বক্তব্য মূলত আমাদের বক্তব্যের বিরোধী নয়। কারণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করেন এবং সেখানেই তাঁর প্রতিশ্রুত অবস্থা পূর্ণতা লাভ করে। মদীনার মধ্যে ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইয়াহূদীগণ বসবাস করতেন। খাইবার, বনূ কাইনূকা, বনূ নাযীর ও অন্যান্য ইয়াহূদী গোত্র তথায় বসবাস করতেন। তাদের অভ্যন্তরে বা তাদের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত হন। এভাবে তিনি একদিকে ইস্রায়েল সন্তানদের মধ্যে আবির্ভুত হলেন এবং অন্যদিকে ইস্রায়েল সন্তানদের ভ্রাতৃগণের মধ্য থেকে আবির্ভুত হলেন। এছাড়া ভ্রাতৃগণের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অর্থই নিজেদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।
বাইবেলের উপর্যুক্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে প্রতিশ্রুত নবী ‘‘মূসা আলাইহিস সালাম-এর সদৃশ বা তার অনুরূপ হবেন বলে বলা হয়েছে। নিম্নে মূসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্যের কয়েকটি দিক দেখুন:
(১) মোশির মত তিনিও আল্লাহর বান্দা ও রাসূল (দাস ও ভাববাদী)।
(২) পিতা ও মাতার সন্তান।
(৩) বিবাহিত ও সন্তান-সন্ততির পিতা।
(৪) উভয়কেই জিহাদ বা যুদ্ধ করার ও অবিশ্বাসী ও পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
(৫) উভয়ের ব্যবস্থায় ব্যভিচার ও অন্যান্য অপরাধের শাস্তি ও দন্ড প্রদানের নির্দেশ রয়েছে।
(৬) উভয়েই ব্যবস্থা নির্ধারিত শাস্তি প্রদান ও প্রয়োগে সক্ষম ছিলেন।
(৭) উভয়েই নিজ জাতির মধ্যে সম্মানিত নেতা ছিলেন, যাকে সকলেই মান্য করেছেন এবং তাঁর আদেশ ও নিষেধ পালন করেছেন।
(৮) উভয়ের শরীয়ত বা ব্যবস্থায় প্রার্থনা বা ইবাদতের সময় দেহ ও পরিচ্ছদের পবিত্রতা অর্জনের বিধান রয়েছে, অপবিত্রতা, মহিলাদের মাসিক বা প্রসবোত্তর অপবিত্রতা থেকে গোসল করার নির্দেশ রয়েছে।
(৯) উভয় শরীয়তে মৃত প্রাণী, জবাই না করা প্রাণী ও প্রতিমার জন্য উৎসর্গীত প্রাণী অবৈধ করা হয়েছে।
(১০) উভয় ব্যবস্থায় অপরাধ-আইন ও বিভিন্ন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
(১১) উভয় ব্যবস্থায় সুদ নিষিদ্ধ।
(১২) উভয়েই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন এবং স্বাভাবিকভাবে কবরস্থ হয়েছেন।
এরূপ আরো অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলি দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মূসা আলাইহিস সালাম-এর সদৃশ বা তুল্য (like unto thee/Moses) ছিলেন। এজন্যই মহান আল্লাহ বলেছেন: ‘‘আমি তোমাদের নিকট পাঠিয়েছি এক রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ, যেরূপ রাসূল পাঠিয়েছিলাম ফিরাউনের নিকট।’’
৪. ২. ২. ২. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী
দ্বিতীয় বিবরণের ৩৩/১-২: ‘‘(১) আর ঈশ্বরের লোক মোশি মৃত্যুর পূর্বে ইস্রায়েল-সন্তানগণকে যে আশীর্বাদে আশীর্বাদ করিলেন তাহা এই। (২) তিনি কহিলেন: সদাপ্রভু সীনয় হইতে আসিলেন, সেয়ীর হইতে তাহাদের প্রতি উদিত হইলেন; পারণ পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করিলেন, দশ সহস্র (অযুত অযুত) পবিত্রের সহিত (নিকট হইতে) আসিলেন; তাহাদের জন্য তাঁহার দক্ষিণ হস্তে অগ্নিময় ব্যবস্থা ছিল। (The LORD came from Sinai, and rose up from Seir unto them; he shined forth from mount Paran, and he came with ten thousands of saints: from his right hand went a fiery law for them)
এখানে ‘সীনয় হইতে সদাপ্রভুর আগমনের’ অর্থ মোশিকে তোরাহ প্রদান করা এবং ‘সেয়ীর হইতে উদিত হওয়ার’ অর্থ যীশুকে ইনজীল প্রদান করা। আর পারণ পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করার অর্থ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর কুরআন অবতীর্ণ করা। কারণ ‘পারণ পর্বত’ মক্কার একটি পর্বত। আদিপুস্তক ২১/২০-২১ শ্লোকে ইশ্মায়েলের বর্ণনায় বলা হয়েছে: ‘‘(২০) পরে ঈশ্বর বালকটির সহবর্তী হইলেন, আর সে বড় হইয়া উঠিল, এবং প্রানতরে থাকিয়া ধনুর্ধর হইল। (২১) সে পারণ প্রানতরে বসতি করিল (he dwelt in the wilderness of Paran)। আর তাহার মাতা তাহার বিবাহার্থে মিসর দেশ হইতে এক কন্যা আনিল।’’
নিঃসন্দেহে ইশ্মায়েলের অবস্থান মক্কায় ছিল। যদ্বারা জানা যায় যে, পারণ প্রান্তর বলতে মক্কাকেই বুঝানো হয়েছে এবং পারণ মক্কার একটি পর্বতের নাম। উপরন্তু শমরীয় তাওরাতে সুস্পষ্টত পারানকে হিজাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৮৫১ সালে মুদ্রিত শমরীয় তাওরাতে ইশ্মায়েলের বর্ণনায় আদিপুস্তকের ২১/২১ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘সে হিজাজে অবস্থিত পারণ প্রানতরে বসতি করিল।’’
এ পারণ প্রান্তরে বা হিজাজে ও মক্কায় ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর বংশে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া অন্য কোনো নবী-ভাববাদীর আবির্ভাব ঘটে নি। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ‘পারণ পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করার’ অর্থ মক্কায় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর কুরআন অবতীর্ণ করা। কারণ কোনো স্থানে আল্লাহর ওহী বা প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হলে বা ‘ঐশ্বরিক প্রতাপ’ প্রকাশ পেলেই বলা চলে যে, আল্লাহ অমুক স্থান থেকে আগমন করলেন, অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশনা বা বিধান সেখান থেকে আগমন করল।
ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ স্বীকার করেন যে, সিনাই-এ তাওরাত অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে সেয়ীর বা ফিলিস্তিনে ইঞ্জিল বা সুসমাচারের আগমন ঘটেছিল। কাজেই পারণ থেকে তেজ প্রকাশের অর্থ মক্কায় কুরআন কারীম অবতীর্ণ হওয়া। আর কুরআনের প্রথম অবতরণ শুরু হয়েছিল পারণ পর্বতের সর্বোচ্চ অংশে, হেরা পাহাড়ের গুহায়।
এখানে আরো লক্ষণীয় যে, দশ সহস্র পবিত্র ব্যক্তিসহ (with ten thousands of saints) আগমন এবং দক্ষিণ হস্তে অগ্নিময় ব্যবস্থা (from his right hand went a fiery law for them) মোশি বা যীশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অযুত অযুত বা দশ সহস্র পবিত্র ব্যক্তি বলতে সাহাবীগণকে বুঝানো হয়েছে যারা তাঁর সহযোগিতায় রত ছিলেন, তাঁর অনুসরণ করে ও তাঁর সাথে শত্রুদের মুকাবিলা করে দীনকে বিজয়ী করেন।
বস্তুত যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সাথে যদি যাচাই করেন যে পারণ পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশকারী, অযুত অযুত পবিত্রের সাথে আগমন কারী, দক্ষিণ হস্তে অগ্নিময় বিধান-সহ আগমনকারী নবী কে? তাহলে তিনি সুনিশ্চিত বুঝতে পারবেন যে, তিনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া কেউ নন।
যেহেতু এ ভবিষ্যদ্বাণীটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াত প্রমাণ করে, এজন্য খৃস্টান ধর্মগুরুগণ বাইবেলের কোনো কোনো আধুনিক অনুবাদে ‘‘দশ সহস্র (অযুত অযুত) পবিত্রের সহিত আসিলেন (he came with ten thousands of saints)’’ এবং ‘‘তাহাদের জন্য তাঁহার দক্ষিণ হস্তে অগ্নিময় ব্যবস্থা ছিল (from his right hand went a fiery law for them)’’-এ দুটি বাক্য উল্লেখ করছেন না বা পরিবর্তন করছেন।
বাইবেলের এ বাণীটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তিনজন নবীর- মূসা আলাইহিস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের এবং তাঁদের উপর তিনটি আসমানী গ্রন্থ অবতীর্ণ হওয়ার স্থান ঘোষণা করছে। বাইবেলের এ বক্তব্যটি কুরআনের সূরা তীন-এর ১-৩ আয়াতের বক্তব্যের সাথ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ আয়াতগুলিতে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘(১) শপথ তীন ও যাইতুন-এর (২) শপথ সিনাই পর্বতের (৩) এবং শপথ এই নিরাপদ নগরীর।’’
এ তিন আয়াতে উপর্যুক্ত তিনজন নবীর প্রেরণের স্থানের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমে ‘‘তীন ও যায়তূন’’ বলে ফিলিস্তিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সেখানেই এ দুটি ফলের উৎপাদন ব্যাপক। এরপর সিনাই পর্বত ও মক্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কুরআন ও বাইবেলের বর্ণনার পার্থক্য হলো, কুরআনে গুরুত্বের পর্যায়ক্রমিকতায় ক্রমবৃদ্ধি এবং বাইবেলে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা হয়েছে। গুরুত্বের দিক থেকে সিনাই পর্বতে প্রাপ্ত মূসা আলাইহিস সালাম-এর প্রত্যাদেশ ফিলিস্তিনে (সেয়ীরে) প্রাপ্ত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর প্রত্যাদেশের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রাপ্ত প্রত্যাদেশ তাঁদের উভয়ের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অনুরূপভাবে মক্কা ফিলিস্তিন ও সিনাই থেকে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন।
পক্ষান্তরে বাইবেলের বক্তব্যে ঐতিহাসিক ক্রম ও ধারাবাহিকতা বর্ণনা উদ্দেশ্য। এজন্য প্রথমে সিনাই, এরপর ফিলিস্তিন এবং সবশেষে মক্কা বা পারণ পর্বতের কথা বলা হয়েছে। এখানে মূসা আলাইহিস সালাম-এর নুবুওয়াতকে প্রভাতের আগমনের সাথে তুলনা করা হয়েছে, ঈসা আলাইহিস সালাম-এর নুবুওয়াতকে সূর্যোদয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতকে দিবসের সর্বগ্রাসী প্রকাশ ও শক্তিময় আলোর বিকীরণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। স্বভাবতই তৃতীয় পর্যায়টি প্রথম দুটি পর্যায়ের চেয়ে অধিক শক্তিশালী ও ব্যাপকতর। এ সময়েই সূর্য তার পরিপূর্ণ তেজ প্রকাশ করে এবং সকল সৃষ্টি আলো, তাপ ও শক্তি লাভ করে। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ দীন ও গ্রন্থ যেভাবে আপন তেজে শিরক, কুফর, মুর্তিপূজা, পাপ ও অনাচারের অন্ধকার অপসারণ করেছে পৃথিবীর বুকে আর কোনো ধর্মই সেভাবে তেজ প্রকাশ করে নি।
৪. ২. ২. ৩. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী
আদিপুস্তকের ১৭ অধ্যায়ের ২০ আয়াতে ঈশ্বর অবরাহামকে ইশ্মায়েলের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন: ‘‘আর ইশ্মায়েলের বিষয়েও তোমার প্রার্থনা শুনিলাম; দেখ, আমি তাহাকে আশীর্বাদ করিলাম, এবং তাহাকে ফলবান করিয়া তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব; তাহা হইতে দ্বাদশ রাজা উৎপন্ন হইবে, ও আমি তাহাকে বড় জাতি করিব (And as for Ishmael, I have heard thee: Behold, I have blessed him, and will make him fruitful, and will multiply him exceedingly; twelve princes shall he beget, and I will make him a great nation)
‘‘আমি তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব (multiply him exceedingly) কথাটি কোনো কোনো প্রাচীন আরবী অনুবাদে নিম্নরূপ: ‘‘আমরা তাহাকে বৃদ্ধি করিব মাদমাদ দ্বারা।’’
৫ম হিজরী শতকের (খৃস্টীয় দ্বাদশ শতকের) প্রসিদ্ধ আলিম কাযী ইয়ায (৫৪৪ হি/১১৪৯খৃ) তার ‘আশ-শিফা’ গ্রন্থে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে ‘মাদমাদ’ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি নাম। এখানে ‘‘আমি তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব’’ এবং ‘‘আমি তাহাকে বড় জাতি করিব’’ বাক্যদ্বয় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াতের ভবিষ্যদ্বাণী। কারণ ইশ্মায়েলের বংশে তিনি ছাড়া আর কোনো ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেনি যিনি এ জাতিকে বড় জাতি (great nation) করেছেন। ইশ্মায়েল বংশে তিনিই একমাত্র নবী যাঁর আগমনের মধ্য দিয়েই ইশ্মায়েল বংশ বড় জাতিতে পরিণত হয়। মহান আল্লাহ কুরআনে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর প্রার্থনা উদ্ধৃত করেছেন। কুরআনের ভাষায় তাঁরা বলেন: ‘‘হে আমাদের প্রতিপালক, তাদের মধ্য হতে তাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ করো, যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে, তাদেরকে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আহমদ কুরতুবী (১২৭৩ খৃ) তার ‘আল-ই’লাম বিমা ফী দীনিন নাসারা মিনাল ফাসাদি ওয়াল আওহাম’ (খৃস্টধর্মের অন্তর্ভুক্ত বিভ্রান্তি ও কল্পকাহিনীর বিবরণ) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হিব্রু পাঠে এখানে দু স্থানে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামের সাংখ্যিক মান দেওয়া হয়েছে। ইয়াহূদীদের মধ্যে সংখ্যার একটি হিসাব প্রচলিত। প্রত্যেক বর্ণের একটি সাংখ্যিক মান রয়েছে এবং শব্দের মধ্যে ব্যবহৃত অক্ষরগুলির সাংখ্যিক মান হিসাব করে তারা বিভিন্ন অর্থ গ্রহণ করেন। এ হিসাব অনুসারে এ শ্লোকে সংখ্যার ভাষায় দুইবার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমবার: ‘অতিশয়’ বা ‘অনেক অনেক’ (exceedingly)। হিব্রু ভাষায় শব্দটি ‘বিমাদমাদ’। হিব্রু ও আরবী বর্ণমালার সংখ্যাতত্ত্ব অনুসারে এ শব্দটির সংখ্যা ৯২: বা=২, মীম=৪০, আলিফ=১, দাল=৪, দ্বিতীয় মীম=৪০, আলিফ=১, দাল=৪, মোট ৯২। মুহাম্মাদ শব্দের অক্ষরগুলির গণনাফলও ৯২: মীম=৪০, হা=৮, মীম=৪০, দাল=৪।
দ্বিতীয়বার: ‘বড় জাতি’ (great nation)। হিব্রু ভাষায় এখানে বলা হয়েছে: ‘‘লুগাই গাদূল’’। হিব্রু ভাষায় জীম ও সাদ নেই। এজন্য হিব্রু ভাষায় গাইনই জীমের স্থলাভিষিক্ত। হিব্রু ভাষায় লাম=৩০ ও গাইন=৩, ওয়াও=৬, ইয়া=১০, গাইন=৩, দাল=৪, ওয়াও=৬, লাম=৩০। এখানেও মোট ৯২।
আব্দুস সালাম ছিলেন দশম হিজরী শতাব্দী বা ১৬শ খৃস্টীয় শতকের একজন ইয়াহূদী ধর্মগুরু ও পণ্ডিত। তিনি ইসলাম গ্রহণের পরে ‘আর-রিসালা আল-হাদীয়া’ (পথনির্দেশক পুস্তিকা) নামে একটি ছোট্ট পুস্তিকা রচনা করেন। এই পুস্তিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াহূদী ধর্মগুরুদের অধিকাংশ দলিলপ্রমাণের ভিত্তি বর্ণমালার বর্ণগুলির সংখ্যাতাত্ত্বিক মানের উপর। এ শ্লোকে বিদ্যমান ‘‘বিমাদমাদ’’ শব্দকে ‘‘মুহাম্মাদ’’ শব্দের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে ইয়াহূদী পণ্ডিতদের আপত্তি তিনি বিভিন্ন ইয়াহূদী ব্যবহারের ভিত্তিতে খণ্ডন করেছেন।
উপরের বিষয়টি বাদ দিলেও আক্ষরিকভাবেই বাইবেলের উপর্যুক্ত বক্তব্য মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আগমনের সুসংবাদ। কারণ এখানে ইসমাঈলের আলাইহিস সালাম প্রশংসা ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়ে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাকে অতিশয় বৃদ্ধি করবেন এবং বড় জাতি করবেন। এদ্বারা কখনোই স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি বুঝানো হয় নি। কারণ স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধিতে কোনো মর্যাদা নেই। কারণ সকল মানুষেরই বংশবৃদ্ধি হয়। নিঃসন্দেহে এখানে বিশেষ মর্যাদাময় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর উত্তরপুরুষ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আগে ইসমাঈলের বংশধর ইতিহাসে বা মানব সভ্যতায় কোনো বিশেষ বৃদ্ধি বা ‘‘বড় জাতি’’ হিসেবে প্রকাশ লাভ করেন নি। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমেই এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই ইসমাঈলের আলাইহিস সালাম বংশ ও বংশের অনুসারী ‘‘অতিশয় বৃদ্ধি’’ পেয়েছে এবং বিশ্ব সভ্যতায় ‘‘বড় জাতি’’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যদি কেউ তা অস্বীকার করেন তাহলে তাকে বলতে হবে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া কখন ও কিভাবে ইসমাঈলকে আলাইহিস সালাম বড় জাতিতে পরিণত করার এ প্রতিশ্রুতি আল্লাহ পুরণ করেছেন?
৪. ২. ২. ৪. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক চতুর্থ ভবিষ্যদ্বাণী
দ্বিতীয় বিবরণের ৩২ অধ্যায়ের ২১ আয়াতে ইস্রায়েল-সন্তানদের অবিশ্বাস, মুর্তিপূজা, অনাচার ইত্যাদির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: ‘‘উহারা অনীশ্বর দ্বারা (with that which is not God) আমার অনতর্জ্বালা জন্মাইল, স্ব স্ব অসার বস্তু (অসার উপাস্য: idols) দ্বারা আমাকে অসন্তুষ্ট করিল; আমিও নজাতি দ্বারা (with those which are not a people) উহাদের অনতজ^র্ালা জন্মাইব, মূঢ় জাতি (a foolish nation) দ্বারা উহাদিগকে অসন্তুষ্ট করিব।’’
এ ভবিষ্যদ্বাণীর মর্ম আরো সুস্পষ্ট হয় যিশাইয় ৬৫/১-৬ শ্লোক দ্বারা: ‘‘(১) যাহারা জিজ্ঞাসা করে নাই, আমি তাহাদিগকে আমার অনুসন্ধান করিতে দিয়াছি; যাহারা আমার অন্বেষণ করে নাই, আমি তাহাদিগকে আমার উদ্দেশ পাইতে দিয়াছি; যে জাতি আমার নামে আখ্যাত হয় নাই, তাহাকে আমি কহিলাম, ‘দেখ, এই আমি, দেখ এই আমি।’। (২) আমি সমস্ত দিন বিদ্রোহী প্রজাবৃন্দের প্রতি আপন অঞ্জলি বিস্তার করিয়া আছি; তাহারা আপন আপন কল্পনার অনুসরণ করিয়া কুপথে গমন করে। (৩) সেই প্রজারা আমার সাক্ষাতে নিত্য নিত্য আমাকে অসন্তুষ্ট করে, উদ্যানের মধ্যে বলিদান করে, ইষ্টকের উপরে সুগন্ধিদ্রব্য জ্বালায়। ৪ তাহারা কবর-স্থানে বসে, গুপ্তস্থানে রাত্রি যাপন করে (Which remain among the graves, and lodge in the monuments); {মুর্তি-প্রতিমার মন্দিরে রাত্রিযাপন করে} তাহারা শূকরের মাংস ভোজন করে, ও তাহাদের পাত্রে ঘৃণার্হ মাংসের ঝোল থাকে; ৫ তাহারা বলে, স্বস্থানে থাক, আমার নিকটে আসিও না, কেননা তোমা অপেক্ষা আমি পবিত্র। ইহারা আমার নাসিকার ধূম, সমস্ত দিন প্রজ্বলিত অগ্নি। ৬ দেখ, আমার সম্মুখে ইহা লিখিত আছে; আমি নীরব থাকিব না, প্রতিফল দিব; ইহাদের কোলেই প্রতিফল দিব।’’
এখানে মূঢ় (আরবী বাইবেলে: জাহিল) জাতি বলতে আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারণ তারা ছিল মূঢ়তা, মুর্খতা, ও বিভ্রান্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে। তাদের নিকট কোনো জ্ঞান-বিজ্ঞান ছিল না। ধর্মীয় জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন-বিজ্ঞান কিছুই তাদের ছিল না। তারা মুর্তি বা জড়-পূজা ছাড়া কিছুই জানত না। ‘যাহারা জিজ্ঞাসা করে নাই’ এবং ‘ যাহারা আমার অন্বেষণ করে নাই’ বলতেও আরবদেরকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর সত্ত্বা, গুণাবলি ও ব্যবস্থা সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। তারা আল্লাহর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত না এবং অনুসন্ধানও করত না। এ বিষয়ে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে: ‘‘আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্য অনুগ্রহ করেছেন, তাদের নিজেদের মধ্য হতে তাদের জন্য রাসূল প্রেরণ করে, সে তাঁর আয়াত তাদের নিকট আবৃত্তি করে, তাদেরকে পরিশোধন করে এবং কিতাব (গ্রন্থ) ও হিকমাহ (প্রজ্ঞা) শিক্ষা দেয়, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল।’’
অন্যত্র আল্লাহ বলেন: ‘‘তিনিই প্রেরণ করেছেন অজ্ঞ-নিরক্ষরদের মধ্যে একজন রাসূল তাদের মধ্য থেকে, যিনি তাদেরকে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনান, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দান করেন, যদি তারা এর আগে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল।’’
দাসী হাগারের (হাজেরার) পুত্র ইশ্মাইলের বংশধর হওয়ার কারণে এবং ধর্মবিষয়ক অজ্ঞতার কারণে ইয়াহূদীগণ তাদেরকে ঘৃণা করত। ইয়াহূদীরা ইবরাহীমের স্বাধীন স্ত্রীর সন্তান, আল্লাহর আশীর্বাদ-প্রাপ্ত, নবীগণের বংশধর, আসমানী কিতাব ও ব্যবস্থার অনুসারী হিসেবে নিজেদেরকে উন্নত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জাতি বলে মনে করত।
কিন্তু তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। অনিশ্বর বা মুতি-প্রতিমার পূজা, বিভিন্ন অনাচার ও পাপ তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। উপরের বক্তব্যদ্বয়ে তাদের এ সকল অনাচারের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এ সকল কারণে মহান প্রতিপালক এ বিদ্রোহী জাতিকে পরিত্যাগ করে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে বেছে নিয়েছেন।
তাহলে এ আয়াতের অর্থ, ইস্রায়েলীয়গণ তাদের স্ব স্ব অসার দেবদেবীর পূজা-অর্চনা করে আমাকে অসন্তুষ্ট করে। এজন্য তাদেরই নিকট ঘৃণিত একটি মুর্খ ও মূঢ় জাতির দ্বারা আমি তাদেরকে অসন্তুষ্ট করব। তিনি তাঁর এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। তিনি ইয়াহূদীগণ কর্তৃক ঘৃণিত এই মূঢ় জাতির মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করেন। তাঁর মাধ্যমে তিনি তাদেরকে সত্য পথের নির্দেশনা দান করেন। ইয়াহূদীরা যে জাতিকে অত্যন্ত ঘৃণা করত সে জাতির মধ্যে শেষ নবীকে প্রেরণ করে, তাকে কিতাব ও হিকমাত প্রদান করে এবং তাঁর মাধ্যমে তাদেরকে সুপথে পরিচালিত করে ইস্রায়েল-সন্তানদেরকে চূড়ান্তভাবে অসন্তুষ্ট করেছেন ও তাদের অন্তর্জ্বালা জন্মিয়েছেন।
ইয়াহূদীদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াত পাওয়ার পরে আরব ও মুসলিম জাতি ইয়াহূদীদেরকে যেভাবে অসন্তুষ্ট করেছে এবং অন্তর্জ্বালা দিয়েছে আর কোনো জাতি সেভাবে ইয়াহূদীদেরকে অসন্তুষ্ট করতে বা অন্তর্জ্বালা দিতে পারে নি। যদিও পারসিকগণ এবং রোমানগণ একাধিকবার ফিলিস্তিনে ইয়াহূদীদের রাজ্য বিনষ্ট করেছে এবং তাদেরকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মূসা আলাইহিস সালাম-এর নুবুওয়াত ও গ্রন্থের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ইয়াহূদীদের স্থায়ী অন্তর্জ্বালা ও অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করার মত কোনো নবী বা আসমানী গ্রন্থ তাদের মধ্যে প্রকাশ পায় নি। কিন্তু মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মাত ইয়াহূদীদেরকে সামরিক ভাবে পরাজিত করেছে তো বটেই, উপরন্তু ইয়াহূদীদের মধ্যে নুবুওয়াতের ধারা থেমে যাওয়ার পরে মহান আল্লাহ তাঁর নুবুওয়াত ও কিতাব এ উম্মাতকে প্রদান করেন। ফলে ইয়াহূদীরা আরবদের সাথে কপটতা ও চাটুকারিতার আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তাদেরকে ভয় পেতে থাকে। নিঃসন্দেহে ইয়াহূদীদের জন্য অন্তর্জ্বালা ও অসন্তুষ্টির এ হলো চূড়ান্ত পর্যায়।
যদি কেউ বলেন যে, এ ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘‘নজাতি (which are not a people)’’, ‘‘মূঢ় জাতি (a foolish nation)’’ বলতে বা ‘যাহারা জিজ্ঞাসা করে নাই (that asked not for me)’, ‘যাহারা আমার অন্বেষণ করে নাই (that sought me not)’, ‘যে জাতি আমার নামে আখ্যাত হয় নাই (a nation that was not called by my name)’ বলতে যীশু খৃস্টের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তাহলে তা একান্তই ভিত্তিহীন, অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বলে গণ্য হবে। কারণ, যীশুখৃস্ট তো ইস্রায়েল জাতির সদস্য ও ইস্রায়েল জাতির মধ্যে ও তাঁদেরই জন্য (unto the lost sheep of the house of Israel) প্রেরিত হয়েছিলেন। সামান্য বুদ্ধি-বিবেকের অধিকারী কোনো ব্যক্তিও দাবি করতে পারেন না যে, কোনো জাতির মানুষ সে জাতির মধ্যে একজন মহান ভাববাদীর আবির্ভাব বা প্রসিদ্ধিলাভে মনোকষ্ট ও অন্তর্জ্বালা লাভ করবে। বরং অন্য কোনো জাতি বা ‘‘পরজাতি (the Gentiles)’’-দের মধ্যে, বিশেষ করে ইয়াহূদীরা যাদেরকে ‘‘বাঁদীর সন্তান’’ ও মুর্খ জাতি হিসেবে অত্যন্ত ঘৃণা করত তাদের মধ্যে ভাববাদীর আবির্ভাবে ও তাদের উন্নতি ও প্রসিদ্ধিতেই তাদের অন্তর্জ্বালা ও মনোকষ্ট হতে পারে।
এছাড়া খৃস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত আরবগণ ছাড়া অন্য কোনো জাতি আরবদের মত মূঢ় বা মুর্খ জাতি বলে প্রসিদ্ধি লাভ করে নি। আরব জাতি ছাড়া অন্যান্য জাতির মধ্যে, বিশেষত গ্রীক, রোমান ও পারসিক জাতির মধ্যে সাধারণভাবে লেখাপড়া ও বিশেষভাবে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শনের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা বিদ্যমান ছিল। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, এ ভবিষ্যদ্বাণীটি আক্ষরিকভাবে আরব জাতির মধ্যে এক মহান নবীর- মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর- আবির্ভাবের কথা বলেছে, যার আবির্ভাব পৌত্তলিকতা, প্রতিমাপূজা, শূকরের মাংস ভক্ষণ ও অন্যান্য অনাচার-পাপাচারে লিপ্ত ইয়াহূদী জাতির স্থায়ী মনোকষ্ট ও অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করবে।
বস্তুত ইয়াহূদী-খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আবির্ভাব বিষয়ক অনেক ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান। কোথাও তাঁর কথা, কোথাও তাঁর উম্মাতের কথা, কোথাও তাঁর উপর অবতীর্ণ ওহীর কথা, কোথাও তাঁর জিহাদের কথা, কোথাও তাঁর আযান ও তাসবীহের কথা, কোথাও মক্কা মুকার্রামার কথা, কোথাও ইসলামের ব্যাপক প্রসারতার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য স্থানে যীশুখৃস্ট উদাহরণ ও নমুনার মাধ্যমে তাঁর ও তাঁর উম্মাতের কথা বলেছেন, যেগুলি সুসমাচারগুলিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
উপসংহার:
আমি মহান আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি, যিনি আমাকে এ সংক্ষেপিত গ্রন্থটি সমাপ্ত করার তাওফীক প্রদান করেছেন। আমার অনেক ভাই ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ গ্রন্থের সংক্ষেপ প্রকাশের মহান দায়িত্ব পালনের জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। আমি মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থন করছি, এ গ্রন্থের মাধ্যমে তারা যে আশা করেছিলেন তা যেন মহান আল্লাহ পূরণ করেন। আমি মহান আল্লাহর দরবারে আরো প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন গ্রন্থটির দ্বারা সত্য-সন্ধানী পাঠককে উপকৃত করেন।
সম্মানিত পাঠক, এ গ্রন্থ থেকে আপনি ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ বা ‘‘কিতাবুল মুকাদ্দাস’’-এর পুরাতন ও নতুন নিয়মের গ্রন্থগুলির প্রকৃত অবস্থা জানতে পেরেছেন। এ গ্রন্থ প্রমাণ করেছে যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট পুরাতন ও নতুন নিয়মের কোনো একটি পুস্তকেরও কোনো অবিচ্ছিন্ন বর্ণনা-সূত্র নেই। আসমানী কিতাব বা ওহীলব্ধ গ্রন্থ হওয়ার কোনো বৈশিষ্ট্য এ গ্রন্থগুলির মধ্যে নেই। উপরন্তু গ্রন্থগুলির বৈপরীত্য, পরস্পর বিরোধী সাংঘর্ষিক বক্তব্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতিতে পরিপূর্ণ।
এছাড়া এ গ্রন্থ প্রমাণ করেছে যে, ত্রিত্ববাদ এবং যীশুখৃস্টের ঈশ্বরত্বের মতবাদ বাতিল ও ভিত্তিহীন। এ গ্রন্থ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে, যীশুখৃস্ট আল্লাহর সৃষ্ট একজন মানুষ ছিলেন এবং তিনি আল্লাহর দাস (বান্দা) ও প্রেরিত (রাসূল) ছিলেন।
খৃস্টান মিশনারি, প্রচারক ও প্রাচ্যবিদগণ কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফের বিরুদ্ধে যে সকল অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি উত্থাপন ও প্রচার করেন সেগুলি এ গ্রন্থে জ্ঞানবৃত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে বাতিল ও ভিত্তিহীন প্রমাণ করা হয়েছে। অসংখ্য অকাট্য দলিল প্রমাণ করে যে, কুরআন কারীম মহান আল্লাহর বাণী, যা তিনি তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ করেন।
আমরা দেখেছি যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ধর্মগ্রন্থগুলি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। এ সকল গ্রন্থের বিকৃতি সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত অনেক ভবিষ্যদ্বাণী এগুলির মধ্যে বিদ্যমান, সেগুলির সত্যতা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুবুওয়াত ছাড়া অন্য কোনোভাবে বাস্তবায়িত হয় না। ‘‘বাইবেলের’’ অনেক বক্তব্যই অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সত্য নবী ছিলেন এবং তিনি জগৎসমূহের জন্য প্রেরিত রাসূল ছিলেন।
সুপ্রিয় বিজ্ঞ পাঠক, আসুন আমরা হটকারিতা, জিদ ও গোঁড়ামি পরিত্যাগ করে নিজেদের মুক্তির জন্য সেই দ্বীনকে বাছাই করি, যা মহান আল্লাহ সকল মানুষের জন্য পছন্দ করেছেন। তিনি বলেছেন: ‘‘নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট মনোনীত দ্বীন।’’
হে আল্লাহ, আমাদেরকে বিভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে রক্ষা করুন। আর আমাদের শেষ বক্তব্য এই যে, সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর নিমিত্ত।
©somewhere in net ltd.