নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

অধ্যয়ন ও জ্ঞানসাধনা ২

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:২০


তাই সাধারণ লোকদের মধ্যে কুরআন-হাদীছের শিক্ষা বিস্তার করতে হলে তাদের সঙ্গে মিশতে হবে, তাদেরকে সময় দিতে হবে। হাদীছে এ কথারই সমর্থন রয়েছে। বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُ الَّذِي يُخَالِطُ النَّاسَ، وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ، أَعْظَمُ أَجْرًا مِنَ الْمُؤْمِنِ الَّذِي لَا يُخَالِطُ النَّاسَ، وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ»
‘আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে মুমিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশে এবং তাদের দেওয়া কষ্ট হজম করে সে ওই মুমিন থেকে উত্তম, যে মানুষের সঙ্গে মেশে না এবং তাদের দেওয়া কষ্টও সে হজম করে না।’ [তিরমিযী: ২৫০৭; ইবন মাজাহ: ৪০৩২; সহীহ]
আজ আমাদের মধ্যে এই গুণের বড় অভাব। ওলামায়ে কেরামের অনেকেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে চান না এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা ও চলাফেরা করাকে দোষের কারণ বলে মনে করেন। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষের দীনী অবস্থা অত্যন্ত নাযুক ও শোচনীয় হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে ব্যাপক মেলামেশা ও সম্পর্ক রাখা নিজের দীনী গায়রতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কিন্তু এটাও ভাবতে হবে যে, আলেমগণ যদি তাদেরকে এভাবে ছেড়ে রাখেন তবে শয়তান নামের বাঘ তাদেরকে মরুভূমিতে একাকি পেয়ে ছিঁড়েফেঁড়ে খেয়ে ফেলবে। টিভি, সিনেমা, গান-বাজনার সয়লাবে তাদের অবশিষ্ট ঈমানটুকুও ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই ঈমান ও আমল বাঁচানোর স্বার্থে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশা, সম্পর্ক রাখা এবং তাদের দীনী পরিবেশ চাঙ্গা রাখা অপরিহার্য। অন্তত আলোচ্য হাদীছের বাণী আমাদের জন্য সান্ত্বনা যে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশা দোষের নয় বরং দীনীস্বার্থে হলে তা প্রশংসনীয়।
ছয়. ষষ্ঠ গুণ হচ্ছে ইলমের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা। জাগতিক হীনস্বার্থে ইলমকে ব্যবহার করা থেকে নিজেকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যাকে কুরআন, হিকমত এবং ইলম দান করেছেন তিনি কেন দুনিয়ার লালসা করে এর অবমূল্যায়ন করবেন?
আলেমের শান হলো বাতিলের সঙ্গে আপস না করা। যেমন, ইয্য ইবন আবদুস সালাম (রহ.)-কে বলা হলো, আপনি সুলতানের মাথায় চুম্বন করুন, তিনি আপনাকে মার্জনা করবেন। তখন তিনি হাসলেন এবং বললেন-
مساكين ! أنت في وادٍ و أنا في واد ! أنا ما أرضى أن يقبلَ السلطانُ رأسي فكيف أقبِّل رأسَه ؟ !
‘মিসকিনের দল! তুমি এক উপত্যকায় আর আমি আরেক উপত্যকায়। আমি তো এটাই পছন্দ করি না যে, সুলতান আমার মাথা চুম্বন করুক, সেখানে আমি তার মাথা চুম্বন করব সেটা কী করে সম্ভব?’
আহ্! ইসলামের এই বীরসন্তানরা আজ কোথায়? এঁদের একেকজনের অস্তিত্ব গোটা মানবতার জন্য ছিল মুক্তির কারণ। কিন্তু এঁদের স্থান দখল করেছি আমরা নামধারী কতক অথর্ব মানুষ। যারা নিজেদের গায়রত হারিয়ে সামান্য অর্থকড়ির আশায় বিকিয়ে দিয়েছি নিজেদের স্বকীয়তা ও ধর্মীয় আভিজাত্য। পরিণামে লাঞ্ছিত হচ্ছি অহর্নিশ।
সাইয়েদ কুতুব (রহ.)-কে অন্যায়ভাবে শুধু ইসলামী আন্দোলন ও জিহাদ করার অপরাধে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর সময় বলা হলো, নিজের ওজর পেশ করে শুধু একটি বাক্য লিখে দিন। ফাঁসির দণ্ড থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। জবাবে তিনি বললেন-
إن السبَّابة التي تشهد ألا إله إلا الله ، لا يمكن أن تكتب كلمةَ اعتذارٍ واحدةٍ تقرُّ بها حكمَ طاغية !
‘যে শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দেওয়া হয় সেই শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে এমন কোনো কথা লেখা সম্ভব নয়, যা বাতিল শাসকদের হুকুম বা আইনকে সমর্থন করে।’
সাত. সপ্তম গুণ হচ্ছে হেকমত। অর্থাৎ আলেমকে হেকমত ও প্রজ্ঞার গুণ অর্জন করা চাই। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু وَلَكِن كُونُواْ رَبَّانِيِّينَ আয়াতের তাফসীর করেছেন হাকিম এবং ফকিহ হওয়ার দ্বারা। অর্থাৎ তিনি এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন- أي حكماء فقهاء রব্বানী হওয়ার অর্থ হলো তারা হবেন ফকীহ এবং হাকিম।’
আট. অষ্টম গুণ হচ্ছে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেয়া। অর্থাৎ বিনয়ী হওয়া এবং নিজের সত্তাকে ইলমের জন্য উৎসর্গ করে দেয়া। সুতরাং ইলমের জন্য নিজের সুবিধা ত্যাগ করা এবং কোনো কথা বা কাজে অন্যকে কষ্ট না দেয়া, হক বিষয় অনুধাবন করার পর তা মেনে নিতে সংকোচ না রাখা। মানুষের দোষের পেছনে না পড়া। ইবন দাকীকুল ঈদ (রহ.) জনৈক ব্যক্তিকে ইলম অন্বেষণ করতে দেখে বললেন-
أنت رجلٌ فاضلٌ و السعيد من تموت سيآتُه بموته فلا تهجوَنَّ أحداً
‘আপনি সম্মানিত ব্যক্তি। সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সেই, যার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার গুনাহরও মৃত্যু ঘটে। সুতরাং আপনি কাউকে বদনামী করে হেয়প্রতিপন্ন করবেন না।’
ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব আসলে বিনয়ে, অহংকারে নয়। জনৈক শায়ের বলেন,
تَواضَعْ تَكُن كالنَّجمِ لاحَ لناظِرٍ  عَلَى طَبَقَاتِ الماءِ و هو رَفِيعُ
و لا تَكُ كالدُّخَانِ يعلُو مكانَه  على طَبَقَاتِ الجَوِّ و هو وَضِيعُ
‘বিনয়ী হও, দর্শকের দৃষ্টিতে নক্ষত্রের মর্যাদা লাভ করবে। নক্ষত্র পানির স্তরে যদিও নিচে মনে হয় কিন্তু আসলে তা সমুন্নত। কিন্তু অহংকারী হয়ো না। সেটা ধোঁয়ার মতো শূন্যে উচ্চ অনুমিত হলেও বাস্তবে তা মূল্যহীন, পতিত।’
সাত. সপ্তম গুণ হচ্ছে আমল। আলেমে রব্বানীর যাবতীয় গুণাবলীর ভিত্তি হচ্ছে আমল। আর আমলই হচ্ছে ইলমের ফলাফল। এ কারণেই সালফে সালেহীন আমল এবং ইলম উভয়ের সমষ্টিকে ফিকহ বলে নামকরণ করেছেন। আইউব সুখতিয়ানী (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-
أيهما أكثرُ العلمُ اليومَ أم في الماضي ؟ فقال الكلامُ اليومَ أكثر ،لكنَّ العلمَ فيما تقدَّم أكثر
‘অতীতকাল এবং বর্তমানকাল, কোনকালে ইলম বেশি চর্চিত? তিনি বললেন, বর্তমান বেশি চর্চিত হচ্ছে ‘কথা’। আর অতীতকালে বেশি চর্চিত হতো ইলম।’
কথাটি কি আমাদের সময় আরো বেশিমাত্রায় প্রযোজ্য নয়? আমাদের সময়ে কথাই হচ্ছে বেশি। কিন্তু কলব পর্যন্ত পৌঁছে যে ইলম এবং ইলমের ফলাফল যা, তথা আমল ও সততা, তা আজ ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছে।
মারূফ কারখী (রহ.) বুযুর্গ, মুত্তাকী, দুনিয়াবিমুখ ও বিশ্বখ্যাত একজন আবেদ ছিলেন। তাঁর তাকওয়া-পরহেজগারী এবং ইবাদত-বন্দেগি ছিল প্রবাদতুল্য। অনেক কিতাবে তার বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। একবার আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর মজলিসে উপস্থিতদের একজন বললেন-
معروف قصيرُ العلم
‘মারূফ (কারখীর {রহ.}) তো ইলম কম!’
লোকটির কথায় ইমাম আহমাদ (রহ.) নাখোশ হলেন এবং বললেন-
أَمْسِكْ عافاكَ الله ، و هل يُرادُ من العلمِ إلاَّ ما وَصَل إليه معروف ؟!
‘থামো! আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে মাফ করুন। আরে ইলম দ্বারা তো সেটাই উদ্দেশ্য, যেখানে মারূফ কারখী (রহ.) পৌঁছেছেন।’
অর্থাৎ আমরা তো ইলম দ্বারা এর পরিণাম বা ফলাফল বুঝি তথা আমল। আর এই বিষয়টি মারূফ কারখীর (রহ.) মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। তাই তিনি ইলমে দুর্বল একথা বলার সুযোগ নেই।
আরেকবারের ঘটনা। একবার আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ পিতাকে জিজ্ঞেস করলেন-
يا أبَتِ هل كان معروف معه شيءٌ من العلم ؟
‘সম্মানীত পিতা! মারূফ কারখী (রহ.) কি ইলমের কারণে প্রসিদ্ধ?!
জবাবে আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) বললেন-
يا بني ! معه رأسُ العلمِ خشيةُ الله تعالى
‘বৎস! তাঁর মধ্যে তো ইলমের সর্বোচ্চ চূড়াই বিদ্যমান। আর তা হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার ভয়।’
বস্তুত পুণ্যবান পূর্বসূরীদের এসব কথা হাদীছে নববীরই প্রতিধ্বনি। ইরশাদ হয়েছে-
عَنْ أَبِي مُوسَى، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ مَثَلَ مَا بَعَثَنِيَ اللهُ بِهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الْهُدَى، وَالْعِلْمِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَصَابَ أَرْضًا، فَكَانَتْ مِنْهَا طَائِفَةٌ طَيِّبَةٌ، قَبِلَتِ الْمَاءَ فَأَنْبَتَتِ الْكَلَأَ وَالْعُشْبَ الْكَثِيرَ، وَكَانَ مِنْهَا أَجَادِبُ أَمْسَكَتِ الْمَاءَ، فَنَفَعَ اللهُ بِهَا النَّاسَ، فَشَرِبُوا مِنْهَا وَسَقَوْا وَرَعَوْا، وَأَصَابَ طَائِفَةً مِنْهَا أُخْرَى، إِنَّمَا هِيَ قِيعَانٌ لَا تُمْسِكُ مَاءً، وَلَا تُنْبِتُ كَلَأً، فَذَلِكَ مَثَلُ مَنْ فَقُهَ فِي دِينِ اللهِ، وَنَفَعَهُ بِمَا بَعَثَنِيَ اللهُ بِهِ، فَعَلِمَ وَعَلَّمَ، وَمَثَلُ مَنْ لَمْ يَرْفَعْ بِذَلِكَ رَأْسًا، وَلَمْ يَقْبَلْ هُدَى اللهِ الَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ»
‘আবূ মূসা আশআ’রী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হচ্ছে এমন মুষলধারার বৃষ্টির মতো যা ভূমিতে এসে পড়েছে, ফলে এর কিছু অংশ এমন উর্বর পরিষ্কার ভূমিতে পড়েছে যে ভূমি পানি চুষে নিতে সক্ষম, ফলে তা পানি গ্রহণ করেছে, এবং তা দ্বারা ফসল ও তৃণলতার উৎপত্তি হয়েছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে গর্তওয়ালা ভূমিতে (যা পানি আটকে রাখতে সক্ষম) সুতরাং তা পানি সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে আল্লাহ এর দ্বারা মানুষের উপকার করেছেন তারা তা পান করেছে, ভূমি সিক্ত করিয়েছে এবং ফসলাদি উৎপন্ন করতে পেরেছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে এমন অনুর্বর সমতল ভূমিতে যাতে পানি আটকে থাকে না, ফলে তাতে পানি আটকা পড়েনি, ফসলও হয়নি। ঠিক এটাই হলো ওই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দ্বীনকে বুঝতে পেরেছে এবং আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হতে পেরেছে, ফলে সে নিজে জেনেছে এবং অপরকে জানিয়েছে। (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ভূমি)। এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে এই হিদায়েত এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের দিকে মাথা উঁচু করে তাকায়নি, ফলে আল্লাহ যে হিদায়েত নিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন তা গ্রহণ করেনি। (তৃতীয় শ্রেণর ভূমি) ।’ [সহীহ বুখারী: ৭৯, সহীহ মুসলিম: ২২৮২]
সুতরাং আমলকারী ও ইলম বিস্তারকারী আলেম ওই কার্যকর মাটির মতো, যাতে বৃষ্টির পানি পতিত হয় এবং তাতে মাটি সিক্ত, কোমল ও তরুতাজা হয় এবং সবুজ-শ্যামল ফলমূল ও ফসল উৎপন্ন করে। অতএব ইলমের ফলাফল হচ্ছে আমল, ইবাদাত, দাওয়াত এবং সবর।
হাদীছের ভাষ্যানুযায়ী দ্বিতীয় প্রকার মাটির সঙ্গে তুলনীয় হচ্ছেন ওইসব ব্যক্তি, যাদের কাছে কুরআন-হাদীছের বর্ণনা আছে বটে কিন্তু সে অনুযায়ী আমল নেই। ফলে তারা ওই মাটির মতো যে মাটি পানি ধরে রাখে কিন্তু নিজে এর দ্বারা উপকৃত হয় না। বরং অন্যরা উপকৃত হয়। ঠিক তদ্রূপ এসব লোক ইলম দ্বারা নিজেরা উপকৃত হয় না বরং তাদের দ্বারা অন্য লোকেরা উপকৃত হয়।
আর তৃতীয় প্রকার মাটির সঙ্গে তুলনীয় হচ্ছে ওইসব লোক, যাদের নিজেদের মধ্যে ইলম নেই। ফলে নিজেরাও এর দ্বারা উপকৃত হয় না এবং অন্যরাও উপকৃত হতে পারে না। ফলে তারা ওই সব পাথুরে মাটির মতো, যা পানি ধরে না রাখার কারণে নিজেও উপকৃত হতে পারে না এবং অন্যদেরকেও উপকৃত করতে পারে না।
ইলমহীন তালেবে ইলমের অবস্থা বর্ণনা করে কবি বলেন,
زَوَامِلَ للأسفارِ لا عِلْمَ عندَهُم بجيّدِهَا إلا كعِلْمِ الأباعِرِ
لَعَمْرُكَ ما يدري البعيرُ إذا غَدَا  بأسفارِهِ أو رَاحَ ما في الغَرَائِرِ !
‘কিছু কিতাবাদীর সঙ্গী, যাদের কাছে উত্তম কোনো ইলম নেই, তবে উটের বিষ্টার মতো।
তোমার জীবনের শপথ! কিতাবের বোঝা নিয়ে উট চলাচলের সময় সে জানে না তার থলে বা পিঠে কী আছে।’
আল্লাহ আমলহীন ইলমধারীকে বোঝাবহনকারী গর্দভের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
﴿ مَثَلُ ٱلَّذِينَ حُمِّلُواْ ٱلتَّوۡرَىٰةَ ثُمَّ لَمۡ يَحۡمِلُوهَا كَمَثَلِ ٱلۡحِمَارِ يَحۡمِلُ أَسۡفَارَۢاۚ بِئۡسَ مَثَلُ ٱلۡقَوۡمِ ٱلَّذِينَ كَذَّبُواْ بِ‍َٔايَٰتِ ٱللَّهِۚ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥ ﴾ [الجمعة: ٥]
‘যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছিল তারপর তারা তা বহন করেনি, তারা গাধার মত! যে বহু কিতাবের বোঝা বহন করে। সে সম্প্রদায়ের উপমা কতইনা নিকৃষ্ট, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।’ {সূরা আল-জুমুআ‘, আয়াত: ৫}
যাহোক, ইলম হচ্ছে পথনির্দেশক আর আমল হচ্ছে ফলাফল। এবং উভয়ের সমষ্টিই হচ্ছে ফিকহ। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
«مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ »
‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীনী বিষয়ে প্রাজ্ঞতা দান করেন।’ [বুখারী: ৩১১৬; মুসলিম: ১০৩৭]
মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
وأنت في صلاتك تقول: اهدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ ، و ما الصراط المستقيم إلا العلم و العمل بالهدى و دين الحق .
‘তুমি সালাতে বলো হে আল্লাহ! আমাকে সোজা পথ দেখান। সোজা পথ তো ইলম এবং হেদায়াত ও দীনে হকের ওপর আমল করা ছাড়া আর কিছু নয়।’
দশ. আলেমের দশম গুণ হচ্ছে তালিম বা শিক্ষাপ্রদান। বস্তুত নবী-রাসূলগণের প্রধান কর্তব্যই ছিল তালিমে দীন। আর দীনী ইলম শিক্ষাপ্রদানকারীর প্রতি আল্লাহ তা‘আলার সীমাহীন করুণা রয়েছে। তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা খাস রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য কল্যাণের দু‘আ করেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীনী শিক্ষা বিস্তারের গুরুত্ব প্রদান করে ইরশাদ করেন-
بلغوا عني وَ لَو آيةً
‘তুমি একটি আয়াত জানলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ [সহীহুল জামে: ২৮৩৭]
দীনের প্রচার-প্রসারের কাজে ব্যাপৃত লোকদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের জীবন সুখী-সমৃদ্ধ হওয়ার ঘোষণা এসেছে হাদীছে। ইরশাদ হয়েছে-
«نَضَّرَ اللَّهُ امَرَءًا سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَهُ »
‘আল্লাহ তা‘আলা ওই ব্যক্তির জীবন সুখী-সমৃদ্ধ করুন, যে আমার হাদীছ শ্রবণ করে অতপর তা মুখস্থ করে এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়।’ [সহীহ ইবন হিব্বান: ৬৯, হাসান]

হক্কানী তালেবে ইলমের পরিচয়
তালেবে ইলমের মধ্যে নিম্নোক্ত গুণগুলো থাকা চাই। যথা-
এক. আত্মিক পরিশুদ্ধি। অর্থাৎ যাবতীয় নিকৃষ্ট স্বভাব ও চারিত্রিক নিম্নমুখিতা থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা। কেননা ইলম হচ্ছে কলবের ইবাদত। সালাত যেমন বাহ্যিক পবিত্রতা ছাড়া আদায় হয় না, তেমনি অন্তরের ইবাদত ও পরিচর্যা আত্মিক পবিত্রতা ছাড়া অর্জিত হয় না।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রবাদতুল্য। পড়ার উদ্দেশ্য ছাড়াই কোনো কাগজে শুধু দৃষ্টি পড়লেই তা মুখস্থ হয়ে যেত। একদিন তিনি একটি বিষয় হিফজ করতে গিয়ে বুঝতে পারলেন, তার স্মৃতিশক্তি আজ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, তাকে সঙ্গ দিচ্ছে না। তিনি বিচলিত হলেন এবং এর কারণ উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কারণ উদ্ঘাটন করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত দ্বারস্থ হলেন উস্তাদ ওয়াকী‘ ইবনুল জাররাহ (রহ.)-এর। উস্তাদ বললেন, নিঃসন্দেহে কোনো গুনাহের কাজ সংঘটিত হয়েছে। তিনি আরো বললেন, ‘ইলম হচ্ছে একটি মস্ত বড় নূর। আর আল্লাহ তা‘আলা এই নূর তাঁর নেক বান্দা ছাড়া অন্য কাউকে দান করেন না। আর কোনো নেক বান্দাও যখন গুনাহ করে তখন তার থেকে এই নূর উঠিয়ে নেওয়া হয়।’
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) শের ও কবিতাশাস্ত্রেও অত্যন্ত দক্ষ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। উস্তাদের কথাগুলোকে তিনি কাব্যের ফ্রেমে বেঁধে ফেললেন এভাবে-
شكوت إلى وكيع سوء حفظي ##فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور ##ونور الله لا يعطى لعـــــاصي
‘আমি উস্তাদ ওয়াকী (রহ.)-এর কাছে স্মরণশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপ ছেড়ে দেয়ার আদেশ করলেন এবং বললেন, ইলম হচ্ছে নূর। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নূর কোনো পাপীকে দান করেন না।’
দ্বিতীয়: গুণ হচ্ছে, ইলমকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা।
তৃতীয়: ইলম অন্বেষণ করতে গিয়ে দাম্ভিকতা ও অহংকার পরিহার করা এবং উস্তাযের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে কার্পণ্য না করা। ইমাম বায়হাকী (রহ.) এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যথা-
‘যায়দ ইবন ছাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একবার জানাযার সালাত আদায় করলেন। (সালাত শেষে) সওয়ার হওয়ার জন্য খচ্চর পেশ করা হলো। এটা দেখে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এগিয়ে এলেন এবং রেকাবি ধরলেন। যায়দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, হে রাসূলের চাচার পুত্র! আপনি রেকাবি ছেড়ে দিন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমরা আলেম ও উস্তাদদের সঙ্গে এরূপ ব্যবহার করতেই আদিষ্ট হয়েছি।’
চার. উস্তাদের সঙ্গে পূর্ণ আদব বজায় রেখে চলা। সুতরাং উস্তাদকে দুর্বোধ্য কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করে তাকে বিরক্ত না করা। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন, ‘আলেমের হক হচ্ছে, তাকে বেশি বেশি জিজ্ঞেস না করা। তাকে কষ্টে নিপতিত না করা। ক্লান্তিবোধ করলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত না করা। আর তোমার আবশ্যক দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার ওয়াস্তে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।’
পাঁচ. উপকারী কোনো ইলম ও শাস্ত্র পরিহার না করা। বরং সুযোগ-সুবিধা মতো উপকারী সব শাস্ত্রই আয়ত্ত করা।
ছয়. তলবে ইলমের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি। সুতরাং এর দ্বারা ধন-সম্পদ, মাল-দৌলত, সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের নিয়ত না করা। যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইলম শিখবে আল্লাহ তা‘আলা তার মর্যাদা বুলন্দ করবেন।
সাত. তলবে ইলমের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে অন্যকে সংশোধনের আগে নিজে সংশোধন হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেন-
﴿ ۞أَتَأۡمُرُونَ ٱلنَّاسَ بِٱلۡبِرِّ وَتَنسَوۡنَ أَنفُسَكُمۡ وَأَنتُمۡ تَتۡلُونَ ٱلۡكِتَٰبَۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ٤٤ ﴾ [البقرة: ٤٤]
‘তোমরা কি মানুষকে ভাল কাজের আদেশ দিচ্ছ আর নিজদেরকে ভুলে যাচ্ছ? অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত কর। তোমরা কি বুঝ না?’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪৪}
জনৈক কবি ও সাধক বলেন,
يا أيها الرجل المعلم غيره هلا لنفسك كان ذا التــــــــعليم
تصف الدواء لذي السقامة والضنى كيما يصح به وأنت سقيم
لا تنه عن خلق وتأتي مثله عار عليك إذا فعلت عظيـــــم
ابدأ بنفسك فانهها عن غيها فإذا انتهت عنه فأنت حكيــم
‘হে অন্যকে শিক্ষাদানকারী ব্যক্তি! কেন তুমি অন্যকে বিস্তার করা শিক্ষা তোমার নিজের ভেতর কার্যকর করছ না?
নিরাময়কারী ওষুধ বাতলে দিচ্ছ তুমি, অথচ তুমি নিজেই রোগাক্রান্ত!
মানুষকে সেই কাজে বাধা দিও না, তুমি নিজে যে কাজ করো। কেননা, এটা মানুষের দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয়।
প্রথমে নিজের নফসকে দিয়ে শুরু করো এবং নফসকে ভ্রষ্টতা থেকে হেফাজত করো। যদি তুমি তা করতে পারো তবে তুমিই হাকিম, তুমিই বিজ্ঞ ব্যক্তি।’


২য় পরিচ্ছেদ:
ইলম অন্বেষণের বিভিন্ন ঘটনা
রাখালের ইলম: পৃথিবীর যাবতীয় ইলম ছয়টি বস্তুর মধ্যে!
মাঠে এক রাখালের সঙ্গে ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। তিনি রাখালকে বললেন, হে যুবক! তুমি গোটা জীবন এই পশুচারণের মধ্যে কাটিয়ে দিলে! যদি জীবনকে ইলম অন্বেষণের কাজে ব্যয় করতে হবে কতই না উত্তম হতো! জবাবে রাখাল বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমি ইলম ভাণ্ডার থেকে ছয়টি বস্তু গ্রহণ করেছি এবং সে অনুযায়ী আমল করি। যথা-
এক. ما دام الحلال موجوداً لا آكل حراماً ‘যতক্ষণ হালাল বস্তুর অস্তিত্ব আছে ততক্ষণ পর্যন্ত হারাম ভক্ষণ করি না।’
দুই. ما دام الصدق موجوداً لا أكذب ‘যতক্ষণ সত্য বলার সুযোগ আছে ততক্ষণ মিথ্যার আশ্রয় নিই না।’
তিন. ما دمت أرى عيبي لا أنشغل بعيوب الآخرين ‘যতক্ষণ আমার নিজের মধ্যে দোষ আছে ততক্ষণ অন্যের দোষ তালাশ করি না।’
চার. حيث لم أجد إبليس قد مات لا أئتمن وساوسه ‘যতক্ষণ ইবলিশকে মৃত না দেখব ততক্ষণ পর্যন্ত তার চক্রান্ত ও কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে নিরাপদ ভাবব না।’
পাঁচ. ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর খাজানা খালি না হতে দেখব ততক্ষণ পর্যন্ত মাখলুকের খাজানার প্রতি লালায়িত হবো না। আর এখন পর্যন্ত আল্লাহর খাজানা শূন্য হয়নি। অতএব আমাকে মাখলুকের প্রতিও ধাবিত হতে হয় না।’
ছয়. حيث لم أر رجلي تطئان الجنة لا أؤمن عذاب الله تعالى ‘যতক্ষণ দুই পা জান্নাতে বিচরণ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার আজাবের ব্যাপারে উদাসীন হবো না।’
ঈসা (আ.) এই ব্যক্তির কথা শুনে বললেন-
هذا هو علم الأولين والآخرين الذي قرأته أنت وأخذته
‘এটা হলো পূর্ববতী-পরবর্তী সকলের ইলম, যা তুমি পাঠ করেছ এবং নিজের মধ্যে সঞ্চিত করেছ।’
ইলম অন্বেষণে অবিচলতা
‘মিরাজুস সাআদা’ গ্রন্থের সংকলক মির্জা মাহদী নিরাকী (রহ.) খুব অর্থকষ্টে জীবন যাপন করতেন। এত অর্থকষ্ট ছিল যে, অধ্যয়নের উপকরণাদিই সংগ্রহ করতে পারতেন না। বিভিন্ন সময় মাদরাসার চেরাগের আলোতে মুতালাআ করতেন। কিন্তু কাউকে অর্থকষ্টের কথা বুঝতে দিতেন না। এত অর্থকষ্ট ও দারিদ্রের মাঝেও ইলমের সঙ্গে লেগে থাকতেন। এমনকি বাড়ি থেকে যে চিঠিপত্র আসত তাও কখনও খুলতেন না এই আশঙ্কায় যে, এতে হয়ত এমন কোনো সংবাদ থাকবে যা অধ্যয়ন ভাবনাকে এলোমেলো এবং দরস থেকে বঞ্চিত করবে। ফলে চিঠিগুলো না খুলেই বিছানার নিচে রেখে দিতেন।
এক চিঠিতে পিতা আবূ যর (রহ.)-এর শাহাদাতের সংবাদ এল। কিন্তু চিঠিটি অভ্যাস মোতাবেক আগের মতোই বিছানার নিচে রেখে দিলেন। ফলে বাড়ির লোকজন নিরাশ হয়ে তার উস্তাদের কাছে চিঠি লিখলেন এবং পুরো পরিস্থিতি অবহিত করে তাকে তা জানানোর অনুরোধ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিরাকে (বাড়িতে) পাঠিয়ে দেয়ারও অনুরোধ করলেন, যাতে তিনি বাড়ি এসে পরিত্যক্ত সম্পদের ভাগ-বণ্টন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করেন।
পরের দিন নিরাকী (রহ.) দরসে হাজির হলে উস্তাদ তার হাত ধরলেন। সে সময় তিনি ভীষণ চিন্তিত ও গম্ভীর ছিলেন। উস্তাদের এই অস্বাভাবিক অবয়ব দেখে নিরাকী (রহ.) বললেন, হযরত! আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
জবাবে উস্তাদ বললেন, তোমাকে নিরাক যাওয়া দরকার। তিনি বললেন, কেন? উস্তাদ বললেন, তোমার বাবা অসুস্থ ছিলেন। সেজন্য যাওয়া দরকার। নিরাকী (রহ.) বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সুস্থ করবেন এবং হেফাজত করবেন। অতএব আপনি দরস শুরু করুন!
শাগরেদ ইশারা বুঝতে পারছে না দেখে উস্তাদ আসল ঘটনা খুলে বললেন এবং তৎক্ষণাত তাকে নিরাক যেতে বললেন। উস্তাদের আদেশে তিনি বাড়ি গেলেন বটে কিন্তু মাত্র তিনদিনের মধ্যে যাবতীয় দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে আবার দরসে হাজির হলেন। সুবহানাল্লাহ, আমরা এই পূর্বসূরীদের অনুসারীর দাবিদার!
যে বাসনা মৃত্যুযন্ত্রণাকেও হার মানায়!
কারো কারো বাসনা ও চাওয়ার বস্তু থাকে একেবারেই ভিন্ন। তাদের সেই বাসনা কোনো কিছুতেই দমে না। মৃত্যুর মতো অকাট্য ফয়সালাও যেন ওই বাসনার কাছে হার মানে। এ ধরনেরই এক বাসনা হলো ইলম অন্বেষণের বাসনা। ইতিহাসে এমন সব ব্যক্তি অতিবাহিত হয়েছেন যাদের এই বাসনার কাছে মৃত্যু যন্ত্রণাও হার মানত।
জনৈক ব্যক্তি হন্তদন্ত হয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কাছে আগমন করলেন এবং বললেন, আমি বুঝতে পারছি খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আমার মৃত্যু হবে। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন-
الموت ليس مشكلة كلنا نموت
‘মৃত্যু তো মুশকিল কিছু নয়। আমরা সবাই মৃত্যু বরণ করব।’
লোকটি বললেন, এই সময় আমার করণীয় কী? আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, اطلب العلم ‘ইলম অন্বেষণ কর। কেননা কোনো মাসআলা জানতে জানতে মৃত্যু বরণ করা ওই মাসআলা সম্পর্কে জাহেল থেকে মৃত্যু বরণ করার চেয়ে উত্তম।’
আবূ রায়হান বিরুনী (রহ.) জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন-ফালসাফা, চিকিৎসাশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক অতুলনীয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বি ব্যক্তি ছিলেন। চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তিনি সর্বজন স্বীকৃত বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। সর্বদা ইলম হাসিলের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কোনো সময় দৃষ্টি পাঠ থেকে, অন্তর ভাবনা থেকে, হাত লেখালেখি থেকে, যবান বর্ণনা থেকে মুক্ত থাকত না। কেবল নতুন ফসল উঠানোর সময় ছাড়া।
তিনি যখন ‘আল-কানুনুল মাসউদী’ গ্রন্থটি সংকলন করেন তখন সুলতান খুশি হয়ে তাকে রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণের অনুমতি দেন। কিন্তু সম্পদের প্রতি বিন্দুমাত্র লালসা না থাকায় তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
একবার তার কাছে জনৈক ভক্ত আসলেন। তখন তিনি নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি আগন্তুককে বললেন, মীরাছের সম্পদে দাদীদের অংশের ব্যাপারে তুমি যেন আমাকে কী প্রশ্ন করেছিলে? আগন্তুক বললেন, এই সময়ে মাসআলার আলোচনা? আল-বিরুনী (রহ.) বললেন, অবগত অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া কি অজ্ঞ অবস্থায় বিদায় নেয়ার চেয়ে উত্তম নয়?
আগন্তুক বলেন, তখন আমি মাসআলাটি উল্লেখ করলাম এবং একটু পরে বের হয়ে এলাম। বের হয়ে রাস্তায় নামতেই কান্নার রোল শুনতে পেলাম।
সাক্কাকী (রহ.)-এর ইলমীযাত্রা
ইমাম সাক্কাকী (রহ.) ইসলামী ইতিহাসের একজন বিরল ও অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পুরো নাম ইউসুফ ইবন আবূ বকর ইবন মুহাম্মাদ ইবন আলী আল-খারেযমী এবং উপাধি সিরাজুদ্দিন সাক্কাকী (রহ.)। তিনিই বিখ্যাত ‘মিফতাহুল উলুম’ গ্রন্থের মুসান্নিফ। গ্রন্থটিতে তিনি বারোটি আরবী ইলম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অথচ তিনি নিজে আরবী ছিলেন না!
জীবনের প্রথমযাত্রায় সাধারণ একজন কামার ছিলেন। সুন্দর ও আকর্ষণীয় তৈজসপত্র ও শিল্পসামগ্রী বানাতে পারতেন। একদিন তিনি সুন্দর আকৃতির একটি লোহার সিন্দুক বানালেন। এতে বিস্ময়কর একটি তালা লাগালেন। অথচ সিন্দুকের ওজন ছিল মাত্র এক রিতল এবং তালার ওজন ছিল এক কিরাত!
এরপর তিনি সিন্দুকটা ওই যুগের বাদশাকে উপঢৌকন হিসেবে দিলেন। বাদশা ও রাজন্যবর্গ সিন্দুকটি দেখে বিস্মিত হয়ে প্রস্তুতকারীকে উপহার দিলেন এবং তার উপস্থিতিতে তার পরম প্রশংসা করতে লাগলেন। পুরো মজলিসজুড়ে যখন তার কীর্তির প্রশংসা চলছিল ঠিক সে সময় একজন আগন্তুকের আগমন ঘটল। বাদশা আগন্তুকের সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নিজ আসনে তাকে বসতে দিলেন। সাক্কাকী ঘটনাটি দেখে অবাক বলেন এবং জানতে পারলেন, আগন্তুক একজন বিশিষ্ট আলেম। এটা জেনে সাক্কাকী (রহ.) ভাবলেন, তিনিও যদি আলেম হন তবে সিন্দুক বানিয়ে যে বাহবা কুড়িয়েছেন এরচেয়ে ঢের বেশি সম্মান, মর্যাদা ও মূল্য পাবেন। ফলে সিদ্ধান্ত নিয়ে তখনই মাদরাসার দিকে রওয়ানা হলেন।
যখন এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি, তখন তার বয়স ছিল ত্রিশ বছর! তাই মাদরাসার শিক্ষক বললেন, তোমার যে বয়স তাতে সম্ভবত তুমি ইলম হাসিল করতে পারবে না! আর তোমার মেধা ও মনমানসিকতার যে অবস্থা, আমি অনুমান করতে পারছি তাতে তুমি ঠিকভাবে ইলম হাসিল করতে সক্ষম হবে না এবং এই বয়সের ইলম তোমার কাজেও আসবে না। অতএব আগে একটা পরীক্ষা নেওয়া যাক। একথা বলে ওই মুদাররিস তার মাযহাব অনুযায়ী তাকে একটি দরস দিলেন এবং বললেন-
قال الشيخ: جلد الكلب يطهر بالدباغة،
‘শায়খ বলেছেন, কুকুরের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ (দাবাগাত) করলে তা পবিত্র হয়।’
উস্তাদ কথাটা তাকে বারবার আওড়াতে বললেন। পরেরদিন সাক্কাকী (রহ.) দরসে হাযির হলে উস্তাদ গতকালের সবক শুনতে চাইলে সাক্কাকী (রহ.) সবক শোনাতে গিয়ে বললেন-
قال الكلب: جلد الشيخ يطهر بالدباغة
‘কুকুর বলেছে, শায়খের চামড়া দাবাগাত করার দ্বারা তা পবিত্র হয়!’
তার কথায় মজলিসে হাস্যরোলের সৃষ্টি হলো। যাহোক, এরপর উস্তাদ তাকে আরেকটি সবক দিলেন। এভাবে পারা না পারার মধ্য দিয়ে তার অক্লান্ত জ্ঞানসাধনা চলতে থাকল এবং দীর্ঘ দশ বছর এই সাধনার মধ্য দিয়ে কেটে গেল। কিন্তু তবু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে এবং উস্তাদের ভষিদ্বাণী সত্য হতে দেখে পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়লেন সাক্কাকী (রহ.)। গোটাজগত যেন তার কাছে সংকুচিত হয়ে আসে। সেই হতাশার মধ্যে একদিন তিনি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে একটি বিস্ময়কর দৃশ্য দেখতে পেলেন। তিনি দেখলেন, একটা শক্ত পাথরে ওপর থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানিয়ে গড়িয়ে পড়ছে এবং পানি পড়ার স্থানে জায়গায় জায়গায় ছিদ্র হয়ে গেছে। এই দৃশ্য তাকে দারুণভাবে নাড়া দিল। তিনি ভাবলেন এবং মনে মনে বললেন-
ليس قلبك بأقسى من هذه الحجرة ولا خاطرك أصلب منها حتى لا يتأثر بالتحصيل
‘তোমার অন্তর এই পাথরের চেয়ে শক্ত নয় এবং চিন্তাশক্তি এরচেয়ে দুর্ভেদ্য নয় যে, তুমি তালিম দ্বারা প্রভাবিত হবে না।’
একথা বলে তিনি আবার সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে মাদরাসায় ছুটে গেলেন। মজবুতভাবে ইলম হাসিলে লেগে রইলেন। আল্লাহ তা‘আলা এই মুজাহাদা ও ত্যাগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। ফলে ত্যাগের নজরানা পেশ করতে পারায় তিনি তার জন্য ইলম ও মারেফাতের দ্বার খুলে দিলেন। যার ফলে তিনি নিজ যমানার অনেক মনীষীকে ইলম-কামালে ছাড়িয়ে গেলেন। তাই সাক্কাকী (রহ.) আজ ইতিহাসের বিরাট অংশের হকদার। কত কিতাব তিনি সংকলন করলেন, কতভাবে জাতি আজ তার দ্বারা উপকৃত হচ্ছে! কিন্তু তিনি যদি সেদিন দমে যেতেন, পাথর আর পানির দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত না হতেন তবে কি ইতিহাসের কোনো পাতায় সাক্কাকী নামের কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত?
বস্তুত ইলম হাসিল করতে এভাবেই অনুপ্রাণিত হতে হয়, হতাশ ও নিরাশ না হয়ে নিজের প্রতিজ্ঞা পালনে দৃঢ় কদমে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। তবেই পৌঁছা যায় পরম গন্তব্যে, দখল করা যায় ইতিহাসের তাজাপাতা।

ইলম ও মুআল্লিমের প্রতি ইমাম রাযীর (রহ.) সম্মান প্রদর্শনের বিস্ময়কর ঘটনা
ইয়াকুত আল-হামাবী (রহ.) ‘মু‘জামুল উদাবা’ গ্রন্থে আবূ তালেব আজিজুদ্দীন (হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের একজন আরবী আদীব)-এর বরাতে উল্লেখ করেন, তিনি বলেন, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) মারভ এলাকায় আগমন করলেন। এখানে তার সীমাহীন কদর, মর্যাদা, সম্মান ও মূল্যায়ন ছিল। কেউ তার কথা কাটতে সক্ষম হতেন না। উপকৃত হতে আমিও তার মজলিসে উপস্থিত হলাম।
একদিন তিনি আমাকে বললেন, আমি চাই তুমি আমার জন্য ‘সিলসিলাতুত ত্বলিবীন’ (আবূ তালেবের আওলাদদের নাম) সংকলন করবে, যা আমি পাঠ করব। আমি এই ব্যাপারে জাহেল থাকতে চাই না।
আমি বললাম, নসবনামা ‘শাজারা’ (বংশের ধারাবাহিকতা) অনুসারে লিখব নাকি ছন্দাকারে? তিনি বললেন, আমি চাই এভাবে লিখবে, যাতে তা স্থায়ীভাবে আত্মস্থ করা সম্ভব হয়। আর শাজারা আকারে লেখা হলে এই উদ্দেশ্য হাসিলে বিঘ্ন ঘটে।
আমি বললাম, আপনার আদেশ শিরোধার্য। একথা বলে আমি ঘরে চলে গেলাম এবং কিতাবটি লিখে নামকরণ করলাম ‘আলফাখরী’ এবং তা ইমাম রাযী (রহ.)-এর সামনে হাজির করলাম।
আমার হাতে সংকলিত কিতাব দেখে তিনি স্বীয় মসনদ থেকে নেমে পড়লেন এবং চাটাইয়ের ওপর বসে পড়লেন। আর আমাকে বললেন, আপনি এই মসনদের ওপর বসুন!
আমি চিন্তা করলাম, তার উপস্থিতিতে তারই মসনদে উপবেশন করা ধৃষ্টতা প্রদর্শন বৈ কিছু নয়। কিন্তু তিনি অত্যন্ত অলঙ্ঘনীয়ভাবে আমাকে সেখানে বসার আদেশ দিয়ে বললেন-اجلس في المكان الذي أقوله لك
‘আমি যেখানে বসতে বলছি সেখানে বসুন।’
ফলে ভক্তি-ভীতি এবং একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার মসনদে বসলাম। তিনি আমার সামনে মুখোমুখি বসলেন এবং কিতাব পাঠ শুরু করলেন। এসময় তিনি আমাকে অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করলেন। এভাবে একপর্যায়ে পূর্ণ কিতাব পড়া শেষ করলেন। অতপর বললেন-
الآن اجلس أي مكان تريده لأن في هذا الكتاب علماً وأنت في هذا العلم أستاذي وأنا تلميذك
‘এখন থেকে আপনি যেখানে চান বসতে পারেন। কেননা এই কিতাবে ইলম আছে এবং এই ইলমের ব্যাপারে আপনি আমার উস্তাদ এবং আমি আপনার ছাত্র। আমি এখন থেকে আপনার উপস্থিতিতে ছাত্রের বেশ ধারণ করব, যাতে আপনার মাধ্যমে উপকৃত হতে পারি!’
এরপর আমি অনুরোধ করলাম যাতে তিনি তার মসনদে বসেন এবং আমি আমার স্থানে বসি। আমি যাতে স্বাচ্ছন্দে আগের মতো ইলম হাসিল করতে পারি।
আরেকটি ঘটনা:
কাজী আবূ বকর ইবনুল আরাবী (রহ.) আহকামুল কুরআন (১/১৮২-১৮৩) গ্রন্থে এ ধরনের আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবন কাসেম উসমানী (রহ.) আমাকে অনেকবার ঘটনাটি বলেছেন। তিনি বলেন, আমি একবার ফুস্তাত এলাকায় গমন করলাম এবং শায়খ আবূল ফজল জাওহারী (রহ.)-এর দরসের মজলিসে বসলাম। দরসে আরো বহু লোকের সমাগম ছিল। আমি প্রথমবার যে মজলিসে শরীক ছিলাম সেই মজলিসে তিনি দরস প্রদান করতে গিয়ে একটি হাদীছ উল্লেখ করলেন। যথা-
إن النبي صلى الله عليه وسلم طلَّق ، وظاهر ، وآلى الخ
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালাক প্রদান করেছেন এবং জিহার ও ইলাও করেছেন।’
তিনি সেদিন দরস শেষ করে বের হলে আমিও পিছে পিছে তার ঘর পর্যন্ত গেলাম। ঘরেও একদল লোকের ভিড় ছিল। তিনি আমাদেরকে দেহলিজে বসালেন এবং সকলের কথা শুনে ও প্রয়োজন মিটিয়ে আমার দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং আগমনের হেতু জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আমার কিছু কথা আছে। তিনি বুঝতে পারলেন, আমি একাকিত্বে কথাটা বলতে চাচ্ছি। তাই তিনি মজলিস খালি করার আদেশ করলেন। মজলিস খালি হলে আমি বললাম, আমি বরকত লাভের উদ্দেশ্যে আপনার মজলিসে বসেছিলাম। দরসে আপনার বর্ণনা শুনলাম, আপনি বর্ণনা করছেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইলা’ করেছেন ঠিক আছে। তালাক প্রদান করেছেন সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু জিহারের ব্যাপারে যা বলেছেন, তা ঠিক নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেন নি এবং তাঁর দ্বারা তা সংঘটিত হওয়া সম্ভবও নয়। কেননা জিহার হচ্ছে, অবাস্তব কথার নাম। আর তা কোনো নবীর দ্বারা প্রকাশিত হওয়া অসম্ভব।
আমার কথা শুনে তিনি আমাকে তার বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন, মাথায় চুম্বন করলন এবং বললেন-
أنا تائب من ذلك ، جزاك الله عني من معلِّمٍ خيراً
‘আমি আমার ওই বক্তব্যের কারণে তওবা করছি। আল্লাহ তা‘আলা আমার পক্ষ থেকে মুআল্লিমকে নেক প্রতিদান প্রদান করুন।’
এরপর আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম এবং পরের দিন খুব সকালে তার মজলিসে শরীক হলাম। দেখলাম তিনি আমার আগেই পৌঁছেছেন এবং মিম্বারে আরোহণ করেছেন। জামে মসজিদের প্রধান দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই তিনি আমাকে দেখে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, ‘আমার উস্তাদকে স্বাগতম’, ‘আমার উস্তাদের আসার পথ করে দাও’। তার এই ডাক শুনে অসংখ্য লোক আমার দিকে দৃষ্টি দিতে লাগলেন। সকলে অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন এবং তারা আমাকে মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে যেতে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করলেন।
লজ্জায় আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। সংকোচে এতটাই উদ্ভ্রান্ত হয়ে গেলাম, বুঝতেই পারছিলাম না, আমি কোথায় আছি।
এরপর শায়খ উপস্থিত লোকদের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং বললেন, ‘আমি তোমাদের উস্তাদ। আর আমার উস্তাদ এ! কেননা গতকাল আমি তোমাদেরকে যা বলেছিলাম তোমরা তার সব মেনে নিয়েছিলে এবং কোনো বিষয়ে দ্বিমত করনি। কিন্তু ইনি আমার বাড়িতে গেছেন এবং একটি ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। তাই আমি গতকালের সেই ভুলের জন্য তওবা করেছি এবং তার কল্যাণে হকের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছি। সুতরাং গতকালের যারা এখানে উপস্থিত আছো তারা ভুল শুধরে নাও এবং যারা অনুপস্থিত আছে তাদেরকে এই সংবাদ পৌঁছে দাও।’
এরপর তিনি মাহফিলের সকল লোককে নিয়ে আমার জন্য দু‘আ করলেন। লোকেরা সমস্বরে আমীন আমীন বললেন।
বস্তুত প্রকৃত ইলমের মজা ও স্বাদ যারা পান তারা এভাবেই বিনয় ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হন। অন্যথায় সারাদেশ জুড়ে যার এত যশখ্যাতি, তার পক্ষে কী করে সম্ভব হয়েছিল ভরা মজলিসে নিজের দোষ স্বীকার করে একজন ছাত্রকে উস্তাদের আসনে স্থান দেয়া? এই ঘটনা উল্লেখ করার পর ইমাম কুরতুবী (রহ.) নিজের বিস্ময়কর অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন,
فانظروا رحمكم الله إلى هذا الدين المتين ، الاعتراف بالعلم لأهله على رؤوس الملأ: مِن رجلٍ ظهرت رياسته ، واشْتَهرتْ نفاسته ؛ لغريبٍ مجهول العين لا يعرف من؟ ولا من أين؟ فاقتدوا به ترشدوا
‘আল্লাহ তা‘আলা আপনাদের সকলের প্রতি রহম করুন; দেখুন দীন হচ্ছে কত মজবুত ভিত্তির নাম। কীভাবে একজন সম্মানী ব্যক্তি, যার সুনাম-সুখ্যাতি দেশ জুড়ে বিস্তৃত, তিনি ভরা মজলিসে একজন অপরিচিত, অখ্যাত ব্যক্তির সামনে নিজের ইলমের ত্রুটি প্রকাশ করে তাকে সম্মানীত করছেন। অতএব, তাদের আদর্শ অনুসরণ করুন।’
পূর্বসূরী মহান ব্যক্তিত্বদের এমন নিরূপম ঘটনা আমাদেরকে বলতে অনুপ্রাণিত করে-
أولئك أبائي فجئنا بمثلهم * إذا جمعت يا جرير المجامع!
‘এঁরাই আমার পূর্বসূরী,
এদের নিয়ে গর্ব করি;
ওহে জারীর! দেখাও তুমি
বিশ্বসভায় তাদের জুড়ি।”
বড় সতীন
আমাদের পূর্বসূরীগণ ইলম অন্বেষণ, পঠন-পাঠন ও রচনা-সংকলনের কাজে এত বেশি মাত্রায় মগ্ন থাকতেন যে, তাদের স্ত্রীগণের কাছে এগুলো সতীনের চেয়েও ভারি মনে হতো! যেমন, যুবায়র ইবন আবূ বাক্কার (রহ.) বলেন, একবার আমার ভাগ্নি আমার স্ত্রীকে বলল, ‘স্ত্রীর পক্ষে আমার মামাই সবচেয়ে উত্তম। কেননা তিনি দ্বিতীয় কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি এবং দাসীও গ্রহণ করেননি।’ জবাবে আমার স্ত্রী বললেন,
تقولُ المرأةُ (أي زوجته) والله لَهَذه الكتب أشدُّ عليَّ من ثلاثِ ضرائر
‘মহিলা (তার স্ত্রী) বললেন, আল্লাহর কসম, তোমার মামার এই কিতাবগুলো তিনজন সতীনের চেয়েও আমার কাছে বেশি কঠিন!’
মৃত্যুলগ্নেও ইলম সাধনা
মৃত্যুক্ষণ জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। কোনো ব্যক্তির পক্ষে ওই সময়ের প্রকৃত পরিস্থিতি উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। কেননা এই ঘটনা মানুষের জীবনে একবারই আসে। আর যার কাছে আসে সে চিরদিনের জন্য অপারে চলে যায় এবং ফিরে আসতে পারে না। ফলে কেউ সেই পরিস্থিতির কথা যথাযথভাবে ব্যক্তও করতে পারে না। তবু মা বাবা, ছেলেসন্তান, স্ত্রী-পরিজন, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অচেনা-অজানা দেশে রওয়ানা দেয়ার কষ্ট কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়। জীবিতরা একেবারে সামান্য হলেও সে কথা অনুধাবন করতে পারি। সেই অনুধাবনশক্তি থেকে বলতে পারি, এই সময়টা কেবলই বিহবলতার, ভয়ের, আতঙ্কের। তাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সেই সময়ে ইলম হাসিল, ইলম বর্ধনের চিন্তাই আসার কথা নয়। কিন্তু আমাদের পূর্বসূরীগণ এই নাযুক মুহূর্তেও ইলম বৃদ্ধি এবং দীনের উপকারার্থে ইলম হাসিল করার চেষ্টা করেছেন। তারা আমল করেছেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণীর ওপর। যথা-
عَنْ عَمْرِو بْنِ كَثِيرٍ عَنِ الْحَسَنِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ جَاءَهُ الْمَوْتُ وَهُوَ يَطْلُبُ الْعِلْمَ لِيُحْيِىَ بِهِ الإِسْلاَمَ فَبَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّبِيِّينَ دَرَجَةٌ وَاحِدَةٌ فِى الْجَنَّةِ
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যার কাছে মৃত্যু হাজির হয় আর সে দীন যিন্দা করার জন্য ইলম হাসিল করে তবে তার এবং জান্নাতের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে একটিমাত্র দরজা।’ [সুনানে দারামী: ৩৬২, যঈফ]
দীন যিন্দার এই প্রয়াস অতি প্রশংসনীয় বলেও হাদীছে ইরশাদ হয়েছে। যথা-
«مَنْهُومَانِ لَا يَشْبَعَانِ: طَالِبُ الْعِلْمِ، وَطَالِبُ الدُّنْيَا»
‘দুই শ্রেণীর মানুষ কখনও পরিতৃপ্ত হয় না। এক. ইলমের অন্বেষক এবং দুই. দুনিয়ালোভী।’ [হাকেম, মুস্তাদরাক ‘আলাস-সহীহাইন: ৩১২]
আমাদের পূর্বসূরীগণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পবিত্রবাণীগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে সচেষ্ট ছিলেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-
إلى متى تطلب العلم؟ قال: من المحبرة إلى المقبرة.
‘কতদিন পর্যন্ত মানুষ ইলম হাসিল করবে? জবাবে তিনি বললেন, সিন্দুক থেকে কবর পর্যন্ত।’
নিম্নে হাদীছের ওপর আমলকারী কয়েকজন পূর্বসূরীর ঘটনা তুলে ধরা হলো।
১. ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.)-এর ঘটনা:
কারাশী (রহ.) ‘আল জাওয়াহিরুল মুদিয়্যা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.)-এর শাগরেদ ইবরাহীম ইবন জাররাহ তামিমী বলেন, আমি ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.)-এর মৃত্যুশয্যায় হাজির হলাম। তখন তিনি বেহুঁশ ছিলেন। কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরে এলে আমাকে বললেন, হে ইবরাহীম! রময়ে জিমারের ক্ষেত্রে উত্তম কে, পদব্রজী নাকি সওয়ারী? আমি বললাম, সওয়ারী। তিনি বললেন, তুমি ভুল বলছ। তখন আমি শুধরে বললাম, তাহলে পদব্রজী। তিনি এবারও বললেন, তুমি ভুল বলছ! তখন আমি বাধ্য হয়ে বললাম, আল্লাহ তা‘আলা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হন, আপনিই তাহলে বিষয়টি বলুন। ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) বললেন, যদি দু‘আর জন্য সেখানে অবস্থান করা হয় তবে পদব্রজে কংকর নিক্ষেপ করা উত্তম। আর যেখানে অবস্থান করা যায় না সেখানে সওয়ারী হয়ে কংকর নিক্ষেপ করা উত্তম।
এরপর আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমি তার ঘরের মূল ফটক পর্যন্তও পৌঁছিনি, এমন সময় কান্নার শব্দ পেলাম। তিনি পরম প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক সেকেণ্ড আগেও তার মধ্যে ইলম অন্বেষণের প্রতি ছিল এমন ব্যগ্রতা!
২. আহত আবূ যুরআ রাযীর (রহ.) মৃত্যুর আগে হাদীছ বর্ণনা:
আবূ যুরআ (রহ.) আহত অবস্থায় মারা যান। তার কপাল থেকে আঘাতজনিত কারণে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। সে সময় আবূ হাতেম (রহ.) মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করেন-
ما تحفظ في تلقين الموتى: لا إله إلا الله
‘আপনি মৃতের তালকীন সম্পর্কে কী জানেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ?’
জবাবে মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম বলতে শুরু করলেন, মুআয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত...
তিনি কথাটি শেষও করতে পারলেন না। ইত্যবসরে যখম ও মাথায় পট্টি নিয়েই মুহাম্মাদ ইবন যুরআ মাথা উত্তোলন করে বললেন-
حَدَّثَنَا مَالِكُ بْنُ عَبْدِ الْوَاحِدِ الْمِسْمَعِيُّ، حَدَّثَنَا الضَّحَّاكُ بْنُ مَخْلَدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْحَمِيدِ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنِي صَالِحُ بْنُ أَبِي عَرِيبٍ، عَنْ كَثِيرِ بْنِ مُرَّةَ، عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»
অর্থাৎ তিনি মুআয ইবন জাবালের পূর্বের পূর্ণ সনদ উল্লেখ করে হাদীছ বর্ণনা করলেন যে, যার শেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [আবূ দাউদ: ৩১১৬, সহীহ]
হাদীছটি বর্ণনা করা মাত্রই ঘরে কান্নার রোল উঠল। কারণ হাদীছ বর্ণনা করে হাদীছ অনুযায়ী আমল করেই তিনি দুনিয়াকে সালাম জানালেন।
৩. আবূ জাফর তাবারী (রহ.)-এর মৃত্যুকালীন জ্ঞানসাধনা:
‘আল-জালিসুস সালেহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, জনৈক ব্যক্তি আবূ জাফর তাবারী (রহ.)-এর ইন্তেকালের মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে তার সামনে উপস্থিত হলেন। সে সময় তার সামনে এই দু‘আটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো-
يا سابق الفوت، ويا سامع الصوت، ويا كاسي العظام لحمًا بعد الموت
জবাবে তিনি সহীফা তলব করলেন এবং লিখে দিলেন। তাকে বলা হলো, এই নাযুক সময়েও ইলমচর্চা? উত্তরে তিনি বললেন-
ينبغي للإنسان أن لا يدع اقتباس العلمِ حتى يموت
‘মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, মৃত্যুক্ষণেও ইলম অন্বেষণের কোনো সুযোগ হাতছাড়া না করা।’ [আল-জালিসুস সালেহ: ৩/২২২]
ইয়াকুত আল-হামাবী (রহ.) ইরশাদুল আদীব গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ফকীহ ওয়ালওয়ালেজী (রহ.) বলেন, আমি আবূ রায়হান মুহাম্মদ ইবন আহমাদ খারেজমী (রহ.) এর কাছে গমন করলাম। সে সময় তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন এবং তার বুকের ভেতর থেকে মৃত্যুর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেই নাযুক সময়ে তিনি আমাকে বললেন, আপনি নানীর মীরাছের মাসআলা সম্পর্কে সেদিন কী যেন বলেছিলেন? আমি বললাম, এই নাযুক সময়ে সেই মাসআলার আলোচনা করতে হবে? তিনি জবাবে বললেন-
يا هذا! أُوَدِّعُ الدنيا وأنا عالم بهذه المسألة ألا يكون خيرًا من أن أُخلِّيها وأنا جاهلٌ بها
‘হে ব্যক্তি! একটি মাসআলা সম্পর্কে অবগত হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া ওই মাসআলা সম্পর্কে জাহেল থেকে বিদায় নেয়ার চেয়ে উত্তম নয় কি?’
আমি তার কথার কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না। তাই মাসআলাটি পুনরায় ব্যক্ত করলাম। আর তিনি মুখস্থ করলেন। এরপর আমি তার ঘর থেকে বের হয়ে এলাম এবং রাস্তার মাঝখানে আছি এমন সময় তার পরিবার থেকে মৃত্যুর কান্না শুনতে পেলাম।
বার্ধক্যেও তারুণ্যের উদ্দীপনা
আজ আমরা তারুণ্যের শাণিত খুনেও নিজেকে মেলে ধরতে পারি না। অকর্মন্য, অলসতা, গাফলত আমাদেরকে ভয়ানকভাবে জেঁকে ধরেছে। কিন্তু আমাদের পূর্বসূরীগণ ছিলেন এমন, যাদের ইলম অন্বেষণ ও জ্ঞানসাধনার কাছে বার্ধক্য হার মানতে বাধ্য হতো। বার্ধক্যকে জয় করে চিরতরুণের মতো ইলমী তারাক্কীর জন্য মেহনত করেছেন। বিখ্যাত মনীষী শিহাবুদ্দিন আবূল আব্বাস আহমাদ ইবন আবূ তালেব (রহ.)-এর কথা চিন্তা করুন। তিনি তখন একশত দশবছরের অশীতিপর বৃদ্ধ। কিন্তু মনের তারুণ্য কত বেগবান! এসময় এমনিতেই বয়সের ছাপে নিষ্কর্ম হওয়ার কথা। তারপর যদি মৃত্যুকালীন সময় হয় তবে তো কথাই নেই। কিন্তু বার্ধক্য আর মৃত্যুর যাকান্দানী ভোঁতা প্রমাণিত হলো তার কাছে। এই বয়সে যেদিন মারা গেলেন সেদিনও ছাত্রদেরকে পুরোদস্তুর দরস দিলেন। যেন দরস ছিল প্রাক-বিবাহ প্রস্তুতি আর মৃত্যু ছিল পালকি! মহান আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগের সময়টাকে তাই মিলিত হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করলেন। প্রিয় মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগের সময়টাতে মানুষ কত পুলকবোধ করে! শিহরিত হয়! আনন্দে উদ্বেলিত হয়। তাই মিলনকে স্বার্থক করার জন্য নানা রকমের প্রস্তুতি নেয়। আমাদের পূর্বসূরীগণও সবচেয়ে প্রিয়বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য সবচেয়ে সুন্দর প্রস্তুতিটাই নিতেন। সেটা হতো ইলমের চর্চা। বন্ধুর কাছে যে ইলমের দাম বেশি, অনেক বেশি! ইলমই যে তার কাছে সবচেয়ে দামি সুবাস! তাই যাওয়ার আগে দেহে এই ইলমের সুবাসই মেখে যেতেন তারা!
আমাদের কি এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত নয়? যেখানে আমরা তরুণরাই বার্ধক্যপীড়িতদের চেয়েও বেশি বুড়িয়ে গেছি! ফলে অলসতা, গাফলতি আমাদের নিতসঙ্গী হয়েছে! পূর্বসূরীগণদের অনেকের ব্যাপারে জানা যায়, তারা বার্ধক্যেও তরুণদের চেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত, আগ্রহী ছিলেন। বয়সের ভার তাদেরকে নোয়াতে পারেনি। বার্ধক্য যাদের জ্ঞানসাধনার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি।
আবূল ওয়াফা ইবন আকীল হাম্বলী (রহ.) বলেন,
إني لأجد من حِرْصي على العلم وأنا في عَشْرِ الثماني أشدّ مما كنت أجده وأنا ابنُ عشرين سنة
‘আমি ইলম অন্বেষণে আশি বছর বয়সে বিশ বছর বয়সের চেয়ে বেশি স্বাদ ও উদ্দীপনা পাই।’ [আয-যায়ল আলা তাবাকাতিল হানাবিলা: ১/১৪৬]
আমরা এতক্ষণ পর্যন্ত ইলম ও আলেমের ফযীলত, এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীছ, সাহাবায়ে কেরাম, বুযুর্গানে দীনের বক্তব্য, তাঁদের বিস্ময়কর নানা ঘটনা উল্লেখ করেছি। এ পর্যায়ে আমরা ইলম শিক্ষার কিছু জরুরী আদব ও নিয়ম-কানুন উল্লেখ করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।


ইলম, আলেম, ছাত্র-সহপাঠী, মাদরাসা ও উস্তাদদের সঙ্গে আচার-আচরণ ও ব্যবহারবিধি প্রসঙ্গে:
প্রথম পর্ব:
ইলম অর্জনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
এক. ইলম অর্জনের একমাত্র লক্ষ্য হবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং দুনিয়াবী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনের নিয়ত থেকে বেঁচে থাকা। কেননা ইলম হচ্ছে একটি ইবাদত। যেমন পূর্বসূরীগণ বলেন, طلب العلم عبادة
আর যেহেতু ইলম ইবাদত, তাই এই ইবাদত পালনে সুদৃঢ় ইচ্ছা থাকা চাই। আর সর্বাগ্রে চাই নিয়তের বিশুদ্ধতা। অবশ্য কখনও কখনও এমন অপরিণত বয়সে মাদরাসায় আসা হয় যখন নিয়ত সম্পর্কে তালেবে ইলমের কোনো ধারণাই থাকে না। এরা পরে নিয়ত ঠিক করে নেবে। অনেক সময় শিখতে শিখতেই নিয়ত ঠিক হয়ে যায়। ইবন মুবারক (রহ.) বলতেন,
طلبنا العلم وليس لنا فيه نية
‘আমরা ইলম শিক্ষা করেছি, অথচ আমাদের তখন কোনো নিয়তই ছিল না।’ তবে যখন নিয়ত করার মতো বুঝ হবে তখন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টিরই নিয়ত করতে হবে। পূর্বসূরীগণ বলতেন, ইলমের নিয়ত হচ্ছে অজ্ঞতা দূর করে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত-বন্দেগি যথাযথভাবে পালন করার ইচ্ছা করা। আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) বলতেন,
النية في العلم أن تنوي به رفع الجهل عن نفسك
‘ইলমের নিয়ত হচ্ছে নিজের মধ্যকার জাহালত তথা অজ্ঞতা দূর করা।’
নিজের মধ্যকার কীসের অজ্ঞতা দূরা করা? জাহালত হচ্ছে বড় তিনটি দোষের নাম। যথা, রব সম্পর্কে অজ্ঞতা, দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অজ্ঞতা। প্রতিটি নর-নারীকে কবরে এই তিনটি বিষয়েই প্রশ্ন করা হবে। সুতরাং এই প্রশ্নগুলোর সমাধান থেকে গাফেল থাকার নামই হচ্ছে জাহালত বা অজ্ঞতা। আর ইলমে নাফের মাধ্যমে এই তিনটি বস্তুর অজ্ঞতা দূর করা যায়। রব সম্পর্কে জাহালত দূর করার ফলে বান্দা আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ, একমাত্র তিনিই ইবাদত-বন্দেগীর যোগ্য হওয়া, তাঁর সিফাত ও গুণাবলী, মাহাত্ম্য ও বড়ত্ব ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে সঠিক ইলম হাসিল করতে সক্ষম হবে। আর দীনের বিষয়গুলো দালিলিকভাবে আত্মস্থ করার ফলে দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা দূর হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যথাযথ ইলম হাসিল হওয়ায় তাঁর হক, গুণাবলি, উম্মতের প্রতি তাঁর অবদান, তাঁর সুন্নাতের অনুসারী হওয়ার অপরিহার্যতা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান হাসিল হবে।
সুতরাং ইলম হাসিলে প্রথম নিয়ত থাকতে হবে নিজের মধ্যকার অজ্ঞতা দূর করে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর দীন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান হাসিল করা।
এসব নেক নিয়তেই ইলম হাসিল করবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে ইলম হাসিল করবে না। যেমন, ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, যশ-খ্যাতি, সুনাম-সুখ্যাতি কিংবা অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ইত্যাদি হীন উদ্দেশ্যে ইলম হাসিল করবে না। এমনিভাবে জাগতিক কোনো স্বার্থে প্রয়োগ করে ইলম ও তালিমকে অপদস্ত না করা, যদিও তা হাদিয়ার নামে হয়। সুফিয়ান ইবন উয়ায়না (রহ.) বলতেন,
كنت قد أوتيت فهم القرآن فلما قبلت الصرة من أبي جعفر سلبته نسأل الله المسامحة
‘আমাকে কুরআনের সমঝ দান করা হয়েছিল। কিন্তু যখনই আবূ জাফরের কাছ থেকে হাদিয়ার থলি গ্রহণ করেছি তখন তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করুন।’
যে কোনো ইলমী পদক্ষেপের আগে নিয়ত সহীহ করে নেওয়া একান্ত জরুরী। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন,
وددت أن الخلق تعلموا مني هذا العلمِ على أن لا ينسب إلي حرف منه الله ما ناظرت أحداً قط على الغلبة، ووددت إذا ناظرت أحداً أن يظهر على يديه وقال: ما كلمت أحداً قط إلا وددت أن يوفق ويسدد ويعان ويكون عليه رعاية من الله وحفظ
‘আমি কামনা করি সারা বিশ্বের মানুষ আমার কাছ থেকে ইলম হাসিল করুক কিন্তু কেউ যেন এই ইলমের একটি হরফও আমার দিকে সম্বোধন না করে।’ তিনি আরো বলতেন, ‘আমি কখনই কারো সঙ্গে প্রাধান্য বিস্তার কিংবা বিজয় লাভের জন্য বিতর্ক করিনি। বরং যখন মোনাজারা করেছি তখন মনেপ্রাণে কামনা করেছি যাতে প্রতিপক্ষ হক ও সত্যের এবং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সাহায্য পান।’
ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) বলতেন,
يا قوم أريدوا بعلمكم الله، فإني لم أجلس مجلساً قط أنوي فيه أن أعلوه
‘হে কওম! আমি ইলম শিক্ষা দিয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকেই কামনা করি। কখনও আমি ইলমের মজলিস কায়েম করে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করিনি।’
নিয়ত বিশুদ্ধ করে ইলম শিক্ষা করতে হবে, মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ বা তাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করা যাবে না। শিক্ষা করতে হবে শুধু ইলম অনুযায়ী আমল করার জন্য। তাফসীরে আলবাহরুল মাদীদ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে-
ولما أراد موسى عليه السلام أن يفارقه، قال له: أوصني، قال: لا تطلب العلم لتحدث به، واطلبه لتعمل به. هـ
‘মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর সেই বিখ্যাত ঘটনার পরিসমাপ্তিতে পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সময় মূসা (আ.) খিজির (আ.)-কে কিছু উপদেশ প্রদানের অনুরোধ করলে তিনি তাঁকে উপদেশ দিয়ে বললেন, বাহাছ করার জন্য কিংবা বয়ান করার নিয়তে ইলম শিক্ষা করবেন না, বরং ইলম শিক্ষা করবেন একমাত্র আমল করার নিয়তে।’ [আল-বাহরুল মাদীদ: ১১/২৭৭]
দুই. প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বদা আল্লাহর মোরাকাবা করা
আলেম ও তালেবে ইলমের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে, যাবতীয় কাজকর্ম, চালচলন এবং কথাবার্তায় আল্লাহকে ভয় করা। কেননা, একজন আলেম তার প্রাপ্ত ইলম ও জ্ঞানবৃদ্ধির আমানতদার। এই আমানতদারী রক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেন-
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَخُونُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓاْ أَمَٰنَٰتِكُمۡ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٢٧ ﴾ [الانفال: ٢٧]
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ-রাসূল এবং তোমাদের স্বীয় আমানতের খেয়ানত করো না।’ {সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৭}
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন, ‘ইলম মুখস্ত বিদ্যার নাম নয়। ইলম হচ্ছে উপকারিতার নাম।’
আর আলেমের কর্তব্য হচ্ছে সর্বদা ভারিত্ব, গাম্ভীর্য, বিনয় ও নম্রতা বজায় রেখে চলা। ইমাম মালেক (রহ.) হারুনুর রশীদকে সম্বোধন করে লিখেছিলেন-
إذا علمت علماً فلْيُرَ عليك أثره، وسكينته وسمته، ووقاره، وحلمه. لقوله صلى الله عليه وعلى آله وسلم: العلماء ورثة الانبياء
‘যখন ইলম হাসিল হবে তখন এর কোনো আছর, ভাবগাম্ভীর্য, সহনশীলতা এবং উচ্চতা আপনার মধ্যে প্রকাশ পাওয়া চাই। কেননা ইলম হচ্ছে নবীগণের উত্তরাধিকার।’
মু‘জামে ত্বাবারানীতে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَعَلَّمُوا الْعِلْمَ، وَتَعَلَّمُوا لِلْعِلْمِ السَّكِينَةَ، وَالْوَقَارَ، وَتَوَاضَعُوا لِمَنْ تَعْلَمُونَ مِنْهُ»
‘ইলম শিক্ষা করো এবং ইলম শিক্ষার জন্য গাম্ভীর্য ও বিনয়ের গুণ অর্জন করো। আর যারা ইলম শিক্ষা করতে আসে তাদের প্রতি বিনয়ী হও।’ [মু‘জামুল আওসাত: ৬১৮৪, যঈফ]
সালফে সালেহীন বলতেন,
حق على العالم أن يتواضع لله في سره وعلانيته ويحترس من نفسه ويقف عما أشكل عليه
‘আলেমের কর্তব্য হচ্ছে প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহ তা‘আলার জন্য বিনয়ী হওয়া। নিজের ব্যাপারে সন্ত্রস্ত থাকা এবং যে কাজ প্রশ্নের সম্মুখীন করে তা থেকে বিরত থাকা।’
তিন. ইলমের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা
আল্লাহ তা‘আল ইলমের যে ইজ্জত ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন পার্থিব কোনো লালসায় পড়ে সেই ইজ্জত ও সম্মান নষ্ট না করা চাই। দুনিয়াদার কোনো লোকের কাছে বিনা কারণে কিংবা অত্যাবশ্যক কারণ ছাড়া আলেমের না যাওয়া উচিত। এমনকি দুনিয়াদার কোনো লোককে ইলম শিক্ষা দেয়ার জন্য তাদের ঘরে না যাওয়া, যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাজা-বাদশা হন না কেন। বরং ইলমের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তাদেরকেই দরসগাহে আসতে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা।
এক্ষেত্রে ইমাম বুখারী (রহ.)-এর ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি জীবনে মোট চারবার বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। চতুর্থ ও সবচেয়ে বড় বিপদটি ছিল ইলমের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে। আর এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল তার জীবনের শেষ বয়সে। শেষ বয়সে তিনি বুখারাতেই বসবাস করছিলেন। সে সময় বুখারার আমীর ছিলেন খালেদ যুহলী। তিনি ইমাম বুখারী (রহ.)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন ঘরে এসে তার সন্তানদেরকে দীনী ইলম শিক্ষা দেন। ইমাম বুখারী (রহ.) বললেন আমীর ও বাদশাদের ঘরে ঘরে গিয়ে শিক্ষা দিয়ে আমি ইলমে হাদীছকে অপমানিত করতে চাই না। কেউ পড়তে চাইলে সে আমার কাছে এসে আমার দরসে শরীক হয়ে পড়ুক। আমি ফেরিওয়ালা নই যে, এই ইলম নিয়ে বাদশাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াবো! এটা ইলমে নববীর মর্যাদার খেলাফ।
তার জবাব পেয়ে আমীর দ্বিতীয় প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি বললেন, তাহলে আপনার দরসে একটা স্বতন্ত্র মজলিস কায়েম করা হোক। সেই মজলিসে কেবল আমার সন্তানেরাই লেখাপড়া করবে, অন্য কেউ তাতে শরীক হতে পারবে না।
ইমাম বুখারী (রহ) এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন, এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আমি অন্যদেরকে ইলম হাসিল করা থেকে বঞ্চিত করলাম কিংবা বাধা দিলাম।
আমীর মনে করেছিলেন অন্যদের সঙ্গে তার সন্তানদের পড়ালেখা তার জন্য অবমাননাকর। তাই তিনি আলাদা একটি মজলিস কায়েমের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু যারা এক সঙ্গে বসে ইলম হাসিল করাকে অবমাননাকর ভাবে তাদের জন্য দরসের আলাদা মজলিস কায়েম করা ইমাম বুখারী (রহ)-এর দৃষ্টিতে চরম আপত্তিকর বলে মনে হলো। ফলে তিনি এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন। কিন্তু আমীর খুব বেশি পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। ফলে বাধ্য হয়ে ইমাম বুখারী (রহ) বললেন, হ্যাঁ, এক কাজ করা যেতে পারে। আপনি যদি এই মর্মে শাহী ফরমান জারি করেন যে, বুখারীর মজলিসে সাধারণ ছাত্ররা বসতে পারবে না তখন আমি অপরাগ বিবেচিত হবো এবং তখন বিষয়টি ভেবে দেখব। হয়ত ওই সময় আপনার সন্তানের জন্য আলাদা দরস কায়েম করা যেতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আম জলসার অনুমতি থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কারও জন্য আলাদা মজলিস কায়েম করতে পারব না।
ইমাম বুখারী (রহ)-এর এই প্রস্তাবে আমীর চরম নাখোশ হলেন এবং এর প্রতিশোধ নিতে তিনি তার বিরদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করলেন। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তার নামে তিনি নানারকম মিথ্যা রটনা করতে থাকেন এবং হাজার রকম অপবাদ দেওয়া শুরু করেন। এভাবে তাকে বুখারা থেকে বের করে দেয়ার জোর তৎপরতা শুরু হয় এবং এসব ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও মিথ্যা অপবাদের সূত্র ধরে একপর্যায়ে তাকে বুখারা থেকে বের করে দেয়ার আদেশও জারি করা হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার এই প্রিয় বান্দার বদদু‘আ কার্যকর হতে সময় লাগে নি। ফলে স্বয়ং আমীর খালেদই সীমাহীন অপদস্থ হন। খলীফা তাকে বরখাস্ত করেন এবং তার আদেশে গভর্নরকে গাধায় চড়িয়ে সারা শহর ঘুরানো হয়।
ইসলামী ইতিহাসে এধরনের আরো অনেক ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায়। একবার খলীফা মাহদী ইমাম মালেক (রহ.)-এর কাছে তার দুই সন্তানকে পড়ানোর জন্য আবেদন করলে তিনি বললেন-
العلم أولى أن يوقر ويؤتى وفي رواية: العلم يزار ولا يزور ويؤتى ولا يأتي وفي رواية: أدركت أهل العلم يؤتون ولا يأتون
‘ইলমের শান হচ্ছে একে সম্মান করা এবং হাসিল করার জন্য ইলমের কাছে আসা। অন্য বর্ণনামতে, ইলম দর্শনার্থ; দর্শনার্থী নয়। একে হাসিল করতে আসতে হয়। এ কারো কাছে যায় না। আমি আহলে ইলমকে পেয়েছি, তারা ইলম বিস্তার করতে কারো কাছে ঘুরে বেড়াতেন না বরং ইলম শিখতে হলে তাদের কাছে আসতে হতো।’
তিনি আরো বলেন, একবার আমি খলীফা হারুনের কাছে গমন করলে তিনি আমাকে বললেন, আপনি বারবার আমাদের কাছে আসবেন। যাতে ঘরের বাচ্চারা আপনার কাছে মুআত্বা পাঠ করতে পারে। ইমাম মালেক (রহ.) বললেন, আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে সম্মানীত করুন। আমি তো দেখছি ইলম আপনাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে!... ইলম কারো কাছে যায় না। ইলমের কাছে যেতে হয়।’
খলীফা বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। এরপর বাচ্চাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা মসজিদে যাও এবং অন্যদের সঙ্গে ইলম শিক্ষা করো।
বর্ণিত আছে, একবার হারুনুর রশীদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার বসবাসের ঘর আছে? জবাবে তিনি বললেন না। তখন খলীফা তাকে তিন হাজার দিনার দিয়ে বললেন, এগুলো দিয়ে ঘর বানাবেন। ইমাম মালেক (রহ.) দিনারগুলো গ্রহণ করলেন বটে কিন্তু খরচ করলেন না। এর কিছুদিন পর খলীফা ইরাক পরিদর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনা করে ইমাম মালেক (রহ.)-কে সঙ্গে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। জবাবে ইমাম মালেক (রহ.) বললেন, আপনার সঙ্গে যাওয়ার পরিকল্পনা আমার নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
«الْمَدِينَةُ خَيْرٌ لَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ »
‘মদীনা তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা অনুধাবন করে।’ [মুসলিম: ১৩৬৩]
অন্য হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمَدِينَةُ تَنْفِي خَبَثَهَا كَمَا ينْفَى الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ»
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মদীনা নগরী পাপ দূর করে যেভাবে হাপড় লোহার মরিচা দূর করে।’ [শারহু মা‘আনিল আছার: ১৮২৬; বুখারী: ৭২০৯ {বুখারীর বর্ণনা কিছুটা ভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে।]
এরপর তিনি বললেন, এই নিন আপনার দেওয়া সেই দিনারসমূহ। এই দিনারের কারণেই আপনি আমাকে মদীনা ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারছেন। আমি ওই সময়েই এই আশঙ্কা করেছিলাম এবং সে কারণেই দিনারগুলো স্বস্থানে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আমি কখনই দীনের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেব না।’
সাধারণ মানুষ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে সম্মান করতে হবে বটে কিন্তু তাদেরকে তোয়াজ ও মাত্রাতিরিক্ত খাতির করা যাবে না। এক্ষেত্রে সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর ঘটনা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, হারুনার রশিদ খলীফা হিসেবে নিযুক্ত হলে দেশের প্রায় সব আলেম তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এলেন। কিন্তু সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) এলেন না। অথচ দুইজনের মধ্যে এর আগে খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। নবনিযুক্ত খলীফা হারুনের কাছে ব্যাপারটি কষ্টদায়ক মনে হলো। তাই তিনি সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর কাছে একটি চিঠি লিখলেন। যার ভাষা ছিল নিম্নরূপ:
আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটি আমীরুল মুমিনীন হারুনের পক্ষ থেকে দীনী ভাই সুফিয়ান ছাওরীর উদ্দেশ্যে লিখিত।
পরসমাচার, হে বন্ধু! আপনি জানেন যে, আল্লাহ তা‘আলা মুমিনীনের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করেছেন। সেই সূত্রেই আমি আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছি। এই বন্ধুত্বের মধ্যে সামান্যতম কৃত্রিমতা আছে বলে আমি মনে করি না। আল্লাহ তা‘আলা যদি আমার ঘাড়ে এই দায়িত্বের বোঝা না চাপাতেন তাহলে অবশ্যই আমি আপনার সমীপে হাজির হতাম এবং তা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও। কেননা আমি আপনার শূন্যতা খুব বেশি অনুভব করছি। আর অন্যান্য পরিচিতজনের সবাই আমার সঙ্গে সাক্ষাত করে গেছেন এবং আমাকে আমার দায়িত্ব গ্রহণের কারণে সাধুবাদ জানিয়েছেন। শুধু আপনি একাই আছেন, যিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাত করেননি। তবে অন্যের তুলনায় আমি আপনার সাক্ষাতকেই বেশি পছন্দ করি।
আমি আমার মালের ভাণ্ডারের মুখ খুলে দিয়েছি। এতে আমি সন্তুষ্ট, আমার চোখ এতে শীতল হয়। এমন এক সুসময়ে আপনার অনুপস্থিতি আমাকে নিদারুণ মর্মাহত করছে। তাই বাধ্য হয়ে আপনার কাছে পত্র লেখা। এতে আমি আমার ভালোবাসা ও প্রবল আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছি। হে আব্দুল্লাহ! আপনি তো জানেন মুসলিমের সঙ্গে মুসলিমের সাক্ষাত ও ভ্রাতৃত্বের ফযীলত কত বেশি! সুতরাং এই চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আসবেন বলে আশা রাখি।’
চিঠিটা লিখে খলীফা হারুন আব্বাদ তালেকানীর হাতে দিলেন এবং এর গুরুত্ব বুঝিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত তা সুফিয়ান ছাওরীর হাতে পৌঁছে দেয়ার আদেশ দিলেন।
আব্বাদ তালেকানী (রহ.) বলেন, আমি চিঠিটা গ্রহণ করে কুফা অভিমুখে রওয়ানা হলাম। সেখানে গিয়ে আমি সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-কে মসজিদে দরস প্রদান করতে দেখলাম। আমি মসজিদের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম কিন্তু তিনি আমার দিকে ভ্রূক্ষেপই করলেন না বরং তীর্যকভাবে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আগন্তুকের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’
আব্বাদ বলেন, এরপর তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। অথচ তখন সালাতের সময় ছিল না। আমি মসজিদে প্রবেশ করে তাঁর ছাত্রদের সালাম দিলাম। কিন্তু ছাত্ররাও কেউ সালামের জবাব দিলেন না, এমনকি মাথা পর্যন্ত উঠালেন না।
আমি অনেকক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠলাম। কেউ আমাকে বসার কথাটুকুও বললেন না। তাদের এই আচরণ আমাকে হতবাক করে দিল। অগত্যা আমি দূর থেকেই সুফিয়ান ছাওরীর (রহ.) উদ্দেশ্যে খলীফা হারুনের লেখা চিঠিটি ছুঁড়ে মারলাম।
তিনি চিঠিটি পেয়ে কেঁপে উঠলেন। যেন তাঁর মেহরাবে ভয়ানক কোনো সাপ কিংবা বিচ্চু ঢুকে পড়েছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় পতিত হলেন এবং সালাম ফিরিয়ে জেবে হাত ঢুকালেন এবং পেছনের একজনকে তা পড়ার ইঙ্গিত করে বললেন, আমি ওই বস্তু স্পর্শ করা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি ও তার কাছে ক্ষমা চাই, যে বস্তু (চিঠি) একজন জালেম তার হাতে স্পর্শ করেছে। কিন্তু ছাত্ররা কেউ তা স্পর্শ করার জন্য হাত বাড়ালেন না। আর তিনিও কাঁপছিলেন, যেন এটা চিঠি নয়- বিষাক্ত সাপ!
অবশেষে একজন ছাত্র চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলেন। তার পড়া শুনে সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) অবাক হয়ে মিটিমিটি করে হাসছিলেন। ছাত্রের পড়া শেষ হলে সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) বললেন, এই চিঠির অপর পিঠেই জালেম বরাবর জবাব লিখে দাও!
কেউ একজন বললেন, হে আব্দুল্লাহ! হারুন একজন খলীফা, তাকে নতুন একটা কাগজে জবাব দিলে ভালো হয় না? তিনি বললেন, জালেমের কাছে চিঠির উল্টো পিঠেই জবাব লিখে দাও। কেননা, সে যদি হালালভাবে তা উপার্জন করে থাকে, তাহলে এটাই যথেষ্ট। আর যদি হারাম উপার্জন হয় তাহলে সে এই হারামের আগুনে জ্বলবে। আর আমরা জালেমের হাত স্পর্শ করা কোনো হারাম বস্তু এখানে রেখে দিতে চাই না। কেননা, তা আমাদের দীনকে বরবাদ করবে। তাকে বলা হলো; চিঠির জবাবে কী লেখা হবে? তিনি বললেন, লিখ:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, আল্লাহ তা‘আলার বান্দা সুফিয়ানের পক্ষ হতে আশা-আকাঙ্ক্ষায় ধোঁকা খাওয়া-প্রতারিত হারুনের প্রতি- যার ঈমানের স্বাদ ও কুরআন তিলাওয়াতের মজা কেড়ে নেওয়া হয়েছে- পরসমাচার, তোমাকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমি তোমার বন্ধুত্বের রশি ছিন্ন এবং ভালোবাসার বন্ধন কর্তন করে ফেলেছি। তুমি নিজেই চিঠির মাধ্যমে আমাকে অবহিত করেছ যে, তুমি মুসলিমের সম্পদ উন্মুক্ত করে তার অপব্যবহার শুরু করেছ। আল্লাহর বিধানের বাইরে গিয়ে তা খরচ করছ। তুমি শুধু অন্যায় করেই ক্ষান্ত হও নি। বরং আমাকে তোমার পাপের সাক্ষীও বানিয়েছ!
অতএব, আমি এবং আমার সঙ্গে যারা তোমার চিঠি পাঠের সময় উপস্থিত ছিলেন তারা সবাই আগামী দিন ন্যায়পরায়ণ মহান বিচারক আল্লাহর কাছে এর যথাযথ সাক্ষ্য পেশ করবেন। হে হারুন! তুমি মুসলিমের সন্তুষ্টি ছাড়া তাদের সম্পদের কোষাগার খুলে দিয়েছ। তোমার কাজে কি যাকাত উসূলকারী, আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ এবং অভাবীরা সন্তুষ্ট? আহলে ইলম এবং কুরআনের বাহকরা কি তাতে সম্মত? ইয়াতিম বিধবা নারীরাও কি তাতে সন্তুষ্ট? অথবা সন্তুষ্ট তোমার প্রজারা?
হে হারুন! তুমি তোমার কোমরের কাপড় বেঁধে নাও এবং জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দাও। বিপদ প্রতিহত করার জন্য চাদর জড়িয়ে নাও। তুমি জেনে রেখ, অতিসত্ত্বর তোমাকে ন্যায়পরায়ণ বিচারকের সামনে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং তুমি আল্লাহকে ভয় কর। কেননা, তোমার কুরআন তিলাওয়াতের স্বাদ মিটে গেছে, ইলম ও যুহদের মজা নিঃশেষ হয়ে গেছে। নেককার ও সৎ লোকের সান্নিধ্য তোমার অপ্রিয় লাগা শুরু হয়েছে। আর তুমি জালেম ও জালেমের সহায়তাকারী হওয়া পছন্দ করছ!
হে হারুন! তুমি সিংহাসনে আরোহন করা মাত্রই রেশমি পোশাক পরিধান করা শুরু করেছ! তোমার দরজার সামনে পর্দা টাঙিয়ে রাব্বুল আলামীনের শক্তির সাদৃশ্যতা অবলম্বন করেছ! এরপর তুমি এমন জালেম প্রহরীদেরকে পর্দার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছ, যারা নিজেরা জালেম, মানুষের প্রতি ইনসাফ করে না। তারা শরাবপানকারীদেরকে দণ্ড দেয় অথচ নিজেরাই শরাব পান করে! তারা ব্যভিচারিদেরকে বেত্রাঘাত করে অথচ নিজেরাই ব্যভিচারে লিপ্ত হয়! চোরের হাত কাটে আবার গোপনে নিজেরাই চুরি করে! এসব শাস্তি অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার আগে নিজেদের ওপরই কি প্রয়োগ করা উচিত ছিল না?
আগামী দিন কী হবে হে হারুন! যে দিন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে একজন ঘোষক একথার ঘোষণা করবেন যে, জালেম ও জালেমের সহায়তাকারীদেরকে একত্রিত করো। আর সেদিন তুমি ঘাড়ে দুহাত বাঁধা অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার সামনে দণ্ডায়মান হবে?
তোমার ইনসাফ তোমাকে বাঁধন থেকে মুক্তি দেবে নাকি তোমার আশেপাশের জালেমরা তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে? অথবা তুমি তাদের জাহান্নামে টেনে নেবে? যেমন ফেরাউনের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-
﴿ يَقۡدُمُ قَوۡمَهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ فَأَوۡرَدَهُمُ ٱلنَّارَۖ وَبِئۡسَ ٱلۡوِرۡدُ ٱلۡمَوۡرُودُ ٩٨ ﴾ [هود: ٩٨]
‘সে তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে নিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। যেখানে তারা প্রবেশ করবে তা কত নিকৃষ্ট স্থান!’ {সূরা হুদ, আয়াত: ৯৮}
হে হারুন! আমি অনুভব করতে পারছি, তুমি তোমার নেককর্ম দেখতে পাবে অন্যের পাল্লায় আর অন্যের পাপ দেখবে তোমার পাল্লায়। বিপদের ওপর বিপদ এবং অন্ধকারের ওপর অন্ধকার। অতএব, হে হারুন! তুমি তোমার প্রজাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের ব্যাপারে সজাগ থাকো।
তুমি আরো জেনে রেখো, এই রাজত্ব ও খেলাফত তোমার কাছে চিরদিনের জন্য আসেনি। অতিসত্ত্বর তা অন্যের কাছে স্থানান্তরিত হবে। দুনিয়া এভাবেই একের পর আরেকজনকে নিয়ে খেলা করে। তাদের মধ্যে কেউ আছে যে পাথেয় সঞ্চয় করে আর কেউ আছে যে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টিকে বরবাদ করে।
তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, এরপর তুমি কখনও আর আমার কাছে চিঠি লিখবে না। লিখলে আমি তার জবাব দেব না।
-ওয়াসসালাম
এরপর তিনি চিঠিটা ভাঁজ ও দস্তখত করা ছাড়াই আমার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। আমি তা গ্রহণ করলাম এবং কূফার বাজারের দিকে ছুটলাম। সুফিয়ান ছাওরীর প্রতিটি কথা ও আচরণ আমার মধ্যে রূপান্তরের ঝড় বইয়ে দিল। তার উপদেশমালা সমুদ্রের ঊর্মিমালা হয়ে আমার হৃদয়পাড়ে আছড়ে পড়তে লাগল। বাজারে গিয়ে আমি উচ্চস্বরে ঘোষণা দিলাম- ওই ব্যক্তিকে কে ক্রয় করবে, যে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় পলায়ন করতে ইচ্ছুক?
বাজারের লোকজন আমার ঘোষণা শুনে দিনার দিরহাম নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করে বললাম, আমার এসবের প্রয়োজন নেই। বরং একটি পশমের জুব্বা দরকার। এগুলো কে দিতে পারবে?
আমাকে এগুলোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। আমি শাহী লেবাস ছুঁড়ে ফেলে দিলাম এবং ওই মোটা জুব্বা পরিধান করে নগ্নপদে হারুনের দরবারে উপস্থিত হলাম। দরবারের রক্ষী আমাকে এই অবস্থায় দেখে আটকে দিল। আমি পুনরায় অনুমতি চাইলাম। খলীফা আমাকে দেখে ফেললেন এবং আক্ষেপ ও নিজের প্রতি অনুযোগ করে বললেন, ‘প্রেরিত সফল হয়েছে আর প্রেরক ব্যর্থ হয়েছে।’
আমি তার দিকে সেভাবেই চিঠিটি ছুঁড়ে মারলাম যেভাবে সুফিয়ান ছাওরী আমার দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। খলীফা চিঠিটি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করলেন এবং পাঠ করে বিপুল পরিমাণে অশ্রুপাত করলেন।
চিঠির ভাষ্য কতক দরবারী লোককে পীড়া দিল। তাদের একজন প্রস্তাব দিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন! সুফিয়ান ছাওরী আপনার প্রতি চরম দুঃসাহস দেখিয়েছেন। অতএব তাকে পাকড়াও করে কঠোর সাজা দিন। জেলের ঘানি টানার ব্যবস্থা করে দিন। অন্তত অন্যরা এ থেকে শিক্ষা পাবে।
হারুন বললেন, হে দুনিয়ার দাসকুল! সুফিয়ানকে তার অবস্থায় থাকতে দাও। প্রতারিত ও হতভাগা সে, যার সান্নিধ্যে তোমরা আছো। সুফিয়ান তো সুফিয়ানই সুফিয়ানই!
এরপর তিনি আদেশ দিলেন, প্রতিবার দরবার বসার আগে যেন তার এই চিঠিটি পাঠ করে শোনানো হয়। [আল-আহকামুস সুলতানিয়া: ২/১৬১-১৬৩]
আমাদের পূর্বসূরী আলেমগণ ইলমের ইজ্জত-সম্মান রক্ষার ব্যাপারে এরকমই তৎপর ছিলেন। ইলমের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে কখনও তারা রাজন্যবর্গকে প্রশ্রয় দেননি। ইতিহাসে এরকম হাজারও ঘটনা সংরক্ষিত আছে। খতীব বাগদাদী (রহ.) হাম্মাদ ইবন সালামা (রহ.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, একবার আমি হাম্মাদ ইবন সালামা (রহ.)-এর নিকট গমন করলাম। আমি তার সঙ্গে বসা আছি এমন সময় মুহাম্মাদ ইবন সুলায়মানের দূত দরজায় করাঘাত করল। অতপর সে ঘরে প্রবেশ করে সালাম প্রদান করল এবং মুহাম্মাদ ইবন সুলায়মানের প্রেরিত চিঠি পেশ করল। হাম্মাদ বললেন, তুমি পড়ো। চিঠিতে সালাম ও দু‘আর পর উল্লেখ করা হয়েছে, আমার একটি মাসআলাগত সমাধান প্রয়োজন। দয়া করে চিঠিটি পাওয়ার পর আমার কাছে আগমন করবেন। আপনার কাছ থেকে মাসআলার সমাধান জেনে নেব।’
জবাবে হাম্মাদ ইবন সালামা (রহ.) বললেন, চিঠির অপর পৃষ্ঠায় লিখে দাও যে, ‘আমরা আমাদের পূর্বসূরীগণকে পেয়েছি তারা অন্যের কাছে যেতেন না। বরং যার সমস্যা হতো তিনিই সমাধানের জন্য আসতেন। অতএব আপনার যদি কোনো সমস্যা থাকে তবে আপনিই আমার কাছে আসুন। আর আপনি যদি আসেনই তবে একা আসবেন এবং পদব্রজে আসবেন। সঙ্গে কাউকে নিয়ে আসবেন না এবং সওয়ারী হয়েও আসবেন না।’
এর কিছুক্ষণ পর পুনরায় দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। দরজা খোলা হলে দেখা গেল স্বয়ং মুহাম্মাদ ইবন সুলায়মান উপস্থিত! তিনি ঘরে প্রবেশ করে বললেন, কী ব্যাপার! আপনার দিকে তাকিয়ে প্রথমে আমার সারা শরীর ভয়ে কেঁপে উঠল যে! তখন হাম্মাদ (রহ.) বললেন,
سمعت ثابتاً البناني يقول: سمعت انس بن مالك يقول: سمعت رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم يقول: إنَّ العالِمَ إذا أراد بعلمِه وجهَ اللهِ هابه كلُّ شيءٍ , وإن أراد أن يكنِزَ به الكنوزَ هاب من كلِّ شيءٍ .
‘আমি ছাবেত বুনানীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আনাছ ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলতে শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে ইলম হাসিল করে পৃথিবীর সব মাখলুক তাকে সমীহ করে। আর যদি দুনিয়ার কোনো সম্পদ পাওয়ার লোভে ইলম হাসিল করে তবে সে পৃথিবীর সবাইকে ভয় পায় ও সমীহ করে।’ [জামে ছগীর: ৩৮৩; আলবানী, সিলসিলা যয়ীফা: ৩৯২৮, যঈফ]
অবশ্য বিশেষ কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে এবং দীনী কল্যাণের প্রশ্ন হলে সেক্ষেত্রে নিয়ত ঠিক রেখে বিত্তশালী এবং রাজন্যবর্গের কাছে যাওয়াতে দোষ নেই। এমনিভাবে রাজন্যবর্গ যদি ইলমী মাকামের হয় তবে তাদের কাছেও যাতায়াত করাতে দোষ নেই। সালফে সালেহীনের অনেকেই শুধু এসব কারণে কখনও কখনও এরকম লোকদের শরণাপ্নন হয়েছেন এবং তাদের কাছে গেছেন। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য কখনই দুনিয়া কিংবা পার্থিব স্বার্থ ছিল না।
চার. যথাসম্ভব শরীয়ত নির্দেশিত যুহদ, দুনিয়াবিমুখতা, অনাড়ম্বরতার জীবনযাপন করা:
আর আলেমের এ বিষয়ের সর্বনিম্ন অবস্থা হচ্ছে দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন না করা এবং দুনিয়া হারানোকে পাত্তা না দেয়া। কেননা তারাই পার্থিব জীবনের হীনতা, মূল্যহীনতা ও তাচ্ছিল্যতা, দ্রুত হাতবদল হওয়া, ফেতনা ইত্যাদি সম্পর্কে বেশি অবগত।
পাঁচ. সর্বদা নিকৃষ্ট ও নিম্নমানের পন্থায় দুনিয়া উপার্জন থেকে বিরত থাকা:
লোভ-লালসা ও সন্দেহের স্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে নিজের ব্যক্তিত্ব খর্ব ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যদিও তা বাহ্যিকভাবে জায়েযই হোক না কেন। কেননা নিজেকে অপবাদের জায়গা থেকে দূরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে সাধারণ মানুষ অহেতুক সন্দেহে পতিত না হয়। আর কোনো বৈধ কারণে যদি এধরনের কিছুতে অংশগ্রহণ করতেই হয় তবে যে তা প্রত্যক্ষ করেছে তাকে সেই কাজের কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করা। যাতে সে খারাপ ধারণা পোষণ করে গুনাহগার না হয় কিংবা তার ব্যাপারে সন্দেহ করে উপকৃত হওয়ার ধারা ছিন্ন না করে। এ কারণেই একবার রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার সঙ্গে সন্ধ্যার পরে কথা বলা অবস্থায় দু’জন লোক দেখতে পেলে তিনি তাদেরকে দাঁড় করালেন এবং বললেন, এ হচ্ছে আমার স্ত্রী সাফিয়্যা! এর কারণও বর্ণনা করলেন তিনি। তা হচ্ছে শয়তান মানুষের শিরায় শিরায় চলাচল করে ধোঁকা দেয় এবং অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা সৃষ্টি করে। হাদীছটি নিম্নরূপ:
عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ حُيَيٍّ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُعْتَكِفًا فَأَتَيْتُهُ أَزُورُهُ لَيْلًا، فَحَدَّثْتُهُ، ثُمَّ قُمْتُ، فَانْقَلَبْتُ، فَقَامَ لِيَقْلِبَنِي، وَكَانَ مَسْكَنُهَا فِي دَارِ أُسَامَةَ، فَمَرَّ رَجُلَانِ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَلَمَّا رَأَيَا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَسْرَعَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَى رِسْلِكُمَا، إِنَّهَا صَفِيَّةُ بِنْتُ حُيَيٍّ» ، فَقَالَا: سُبْحَانَ اللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: «إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ، وَإِنِّي خَشِيتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا شَرًّا» ، أَوْ قَالَ: «شَيْئًا»
সাফিয়্যাহ বিনতে হুইয়াই থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফে ছিলেন, আমি রাতে তাঁর সাক্ষাতের জন্য আসি। আমি তার সাথে কথা বলি, অতঃপর রওয়ানা দেই ও ঘুরে দাঁড়াই, তিনি আমাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন। তার ঘর ছিল উসামা ইব্‌ন যায়েদের বাড়িতে। ইত্যবসরে দু’জন আনসার অতিক্রম করল, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে দ্রুত চলল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন: থাম, এ হচ্ছে সাফিয়্যাহ বিনতে হুইয়াই। তারা আশ্চর্য হল: সুবহানাল্লাহ হে আল্লাহ রাসূল! তিনি বললেন: নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় বিচরণ করে, আমি আশঙ্কা করছি, সে তোমাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে পারে।’ [বুখারী: ৩২৮১; মুসলিম: ২১৭৫]
ছয়. ইসলামী শিআর-নিদর্শন ও বাহ্যিক বিধানাবলি পালনে যত্নবান হওয়া:
যেমন, মসজিদে জামাতের সঙ্গে সালাত আদায় করা, আম-খাস সকলের মধ্যে সালামের প্রচলন ঘটানো, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে বাধা প্রদান। আর এগুলো করতে গিয়ে প্রভাবশালীদের কষ্ট সহ্য করা এবং এতে আল্লাহ তা‘আলার জন্য নিজেকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। কোনো ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনায় কান না দেয়া। এক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীর কথা সদা অন্তরে জাগরুক রাখা। যথা-
﴿ يَٰبُنَيَّ أَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَٱنۡهَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَآ أَصَابَكَۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ١٧ ﴾ [لقمان: ١٧]
এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য নবীর কষ্টের কথাও মনে করে ইলম প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে বাধা ও কষ্টের বিষয়টি মেনে নেয়া। সুন্নাত প্রতিষ্ঠা এবং বিদআত নির্মূলে সচেষ্ট হওয়া। দীনের যাবতীয় বিধান ও আদর্শ প্রতিষ্ঠাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থীর করা। বিশুদ্ধপন্থায় মুসলিমের কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় তৎপর হওয়া। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে শুধু স্বাভাবিক বৈধ কাজেই সন্তুষ্ট না হয়ে সর্বোচ্চ সুন্দর ও ভালো কাজে অভ্যস্ত হওয়া। কেননা ওলামায়ে কেরাম হলেন মানুষের লক্ষ্যস্থল ও আদর্শগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। তারাই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জন্য দলিল স্বরূপ। তাই যারা জানে না তারা তাদেরকে দেখে অনুস্বরণ করবে, আমল করবে। সুতরাং স্বয়ং আলেমই যদি নিজ ইলম অনুযায়ী আমল না করেন তবে অন্যদের আমল করা তো আরো পরের কথা। এ কারণেই আলেমের পদস্খলনকে অন্য যে কোনো ব্যক্তির পদস্খলনের চেয়ে অনেক ভয়াবহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা তাদের অনুসরণ করে অন্যদেরও পদস্খলন ঘটার ভয় থাকে।
সাত. নফল ও মুস্তাহাব যাবতীয় ভালো কাজ পালনে যত্নবান হওয়া:
শরীয়তপ্রণেতা তথা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা ও আদর্শ বুলন্দের জন্য প্রাণপণ মেহনত করা। তাই কুরআন তিলাওয়াত, যিকর-আযকার, দিনরাতের বিভিন্ন দু‘আ, বিভিন্ন কাজের শুরু-শেষের দু‘আ, নফল সালাত ও রোজা, হজ-ওমরা পালন করা, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা। আর সাধারণ মানুষের মতো কুরআন তিলাওয়াত না করা। বরং তিলাওয়াতের সময় কুরআনের আদেশ-নিষেধ, হেকমত-প্রজ্ঞা, সুসংবাদ-আজাবের ভয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চিন্তা করা। এমনিভাবে কুরআন হিফজ করার পর তা ভুলে যাওয়ার শাস্তির কথাও স্মরণে রাখা। সহজে কুরআন ইয়াদ রাখার পন্থা হচ্ছে অন্তত সাতদিনে একবার মুখস্থ কুরআন তিলাওয়াত করা।
আট. সামাজিক আচার-আচরণে দায়িত্ব ও করণীয়
মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় তাদের সঙ্গে মিলিত হওয়া। তাদেরকে খানা খাওয়ানো। সাধারণ লোকদের কেউ মূর্খতাবশত ভুল-ভ্রান্তি করে থাকলে ক্ষমা করে দেয়া। মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকা। কেউ উপকার করলে তার শোকর আদায় করা। এই গুণটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় বটে, কিন্তু আমাদের মধ্যে এর নিদারুণ অভাব। এটা চরম অসৌজন্যতাও বটে। পশ্চিমা দেশগুলো ইসলাম না মানলেও পরোক্ষভাবে ইসলামের আদর্শগুলো খুব ভালো করে অনুসরণ করে। তাদের মধ্যে সৌজন্যতাবোধের ঘাটতি নেই। আপনি সামান্য উপকার করলেও তারা আপনার প্রতি অসামান্য কৃতজ্ঞ দেখাবে। অথচ গুণটি থাকা দরকার ছিল আমাদের মধ্যে, বিশেষ করে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে। তাই এবিষয়ে সচেতন হওয়া চাই। অভাবীর হাজত পূরণে সচেষ্ট হওয়া। প্রতিবেশি ও নিকটাত্মীয়দের হক আদায় করা। এদের কাউকে সালাত তরক কিংবা পাপকাজে লিপ্ত হতে দেখলে হেকমত ও নম্রতার সঙ্গে শোধরানোর চেষ্টা করা। সৎকাজে আদেশ ও পাপকাজে বাধা প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বদা হেকমত অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদে পেশাব করা সেই বেদুইনের সঙ্গে নম্রতা অবলম্বনের ঘটনা দ্বারা শিক্ষা নিতে পারি।
নয়. ধোঁকা-প্রতারণা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বাঁচা
বিরোধীতা-বিদ্রোহ, আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো কারণে ক্রোধান্বিত হওয়া, অহংকার-লৌকিকতা, আত্মম্ভরিতা, কৃপণতা, কাপুরুষতা, লোভ-লালসা, গর্ব-দাম্ভিকতা, দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলের জন্য কারো সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাগতিক বিষয়ে অহংকার প্রদর্শন, আত্মপ্রশংসা কামনা করা, আত্মচিন্তা, আত্মস্বার্থ, মানুষের দোষ তালাশের পেছনে লেগে থাকা, নিজের দোষ সংশোধনের চেষ্টা না করা, বংশীয় ও গোত্রীয় গোঁড়ামী, গিবত-চোগলখোরি, মিথ্যাচার, মিথ্যা অপবাদ প্রদান, কাজে ও কথায় অশ্লীলতা, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ইত্যাদি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ যাবতীয় নিম্নমানের ও নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা এবং সুন্দর ও পবিত্র স্বভাব দ্বারা নিজেকে ঋদ্ধ করা। বিশেষভাবে নিকৃষ্ট আখলাক থেকে নিজেকে বাঁচানো। কেননা এটাই যাবতীয় অকল্যাণের মূল। বিশেষ করে হিংসা, অহংকার, আত্মম্ভরিতা, লৌকিকতা এবং মানুষকে তাচ্ছিল্য করা- এই চারটি মারাত্মক বদস্বভাব থেকে দূরে থাকা। আর এগুলো থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হচ্ছে; হিংসা থেকে বাঁচার জন্য এই চিন্তা করা যে, এটা হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার হেকমতের বিরুদ্ধে অভিযোগ। তাছাড়া এতে নিছক আমারই কষ্ট, অন্তরকে খামোখা এই কাজে ব্যাপৃত রাখা ইত্যাদি। عجب النفس বা আত্মম্ভরিতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হচ্ছে এই চিন্তা করা যে; ইলম ও প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও হিকমত, মেধা ও সাহিত্যজ্ঞান ইত্যাদি আল্লাহ তা‘আলার দান। তিনি যখন তখন এসব নেয়ামত ফিরিয়ে নিতে পারেন। وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزٍ ‘আল্লাহ তা‘আলার জন্য এটা মোটেও কঠিন ব্যাপার নয়।’
তাই এ নিয়ে আত্মতুষ্টির কিছু নেই। লৌকিকতার ব্যধি দূর করার জন্য এই ফিকির করা যে, কোনো মাখলুক কারো কোনো উপকার করতে পারে না। ক্ষতিও করতে পারে না। অতএব নিজের আমল কাউকে দেখানোতে লাভও নেই ক্ষতিও নেই। প্রতিদান পেতে হলে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকেই পেতে হবে। তিনি অন্তর্যামী। অতএব নিয়তের এই খারাবীর কারণে আমলের প্রতিদান বরবাদ হয়ে যাবে। কেননা হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
عَنْ أَبِي بَكَرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللَّهُ بِهِ»
‘আবূ বাকরা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি শোনানোর জন্য আমল করে তার আমলের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা কেয়ামত দিবসে অন্যদেরকে শুনিয়ে দেবেন যে, এই লোকটি শুধু মানুষকে শোনানোর এবং দেখানোর জন্যই আমল করত। (এভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে কেয়ামতবাসীর সামনে লাঞ্ছিত করবেন)। এবং যে ব্যক্তি দেখানোর জন্য আমল করবে তার সঙ্গেও অনুরূপ আচরণই করা হবে।’ [বুখারী: ৬৪৯৯; মুসলিম: ২৯৮৬]
আর মানুষকে তাচ্ছিল্য করার ব্যাধি দূর করতে অন্তরে সর্বদা এই আয়াত হাজির রাখা। যথা-
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا يَسۡخَرۡ قَوۡمٞ مِّن قَوۡمٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُونُواْ خَيۡرٗا مِّنۡهُمۡ ﴾ [الحجرات: ١١]
‘কোনো লোক যেন অন্য লোককে বিদ্রুপ না করে। হতে পারে যাকে বিদ্রুপ করা হয় সে বিদ্রুপকারীর চেয়ে উত্তম।’ {সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১১}
উত্তম-অনুত্তমের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া। অতএব বাহ্যিক সাফল্য-ব্যর্থতার ভিত্তিতে কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার কোনো সুযোগ নেই। কুরআন বলে-
﴿ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ ﴾ [الحجرات: ١٣]
‘তোমাদের সেই ব্যক্তিই আল্লাহ তা‘আলার নিকট বেশি সম্মানী, যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে।’ {সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩}
অন্য আয়াতে নিজের শূচিতা দাবির নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যথা-
﴿ فَلَا تُزَكُّوٓاْ أَنفُسَكُمۡۖ هُوَ أَعۡلَمُ بِمَنِ ٱتَّقَىٰٓ ٣٢ ﴾ [النجم: ٣٢]
‘সুতরাং তোমরা নিজেদের আত্মার পবিত্রতার দাবি করো না। কারণ তিনিই জানেন, তোমাদের মধ্যে কে বেশি মুত্তাকি।’ {সূরা আল-নাজম, আয়াত: ৩২]
সঙ্গে সঙ্গে একথাও ভাবা যে, না জানি যাকে তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে সে আমার চেয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট কত বেশি উত্তম। অতএব অধম হয়ে উত্তমকে তাচ্ছিল্য করা যায় না।
إِن اللهّ تعالى أخفى ثلاثة في ثلاثة وليه في عباده، ورضاه في طاعته، وغضبه في معصيته
‘আল্লাহ তা‘আলা তিনটি বস্তুকে তিনটি বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন। যথা- নৈকট্য ইবাদতের মধ্যে, সন্তুষ্টি আনুগত্যের মধ্যে এবং ক্রোধ নাফরমানীর মধ্যে।’
মনে রাখতে হবে, আজ দুনিয়ায় নিজেকে অন্যের চেয়ে উচ্চতায় ভাবার পরিণাম কেয়ামত দিবসে ভয়াবহ রকমের বিপদের কারণ হতে পারে। যাদেরকে আজ আমি তুচ্ছ ভাবছি, কেয়ামত দিবসে আমার ঠিকানা হতে পারে তাদের পায়ের নিচে। এবিষয়ে একটি স্মরণীয় ঘটনা উল্লেখ করি।
عَنِ الْحَارِثِ بْنِ مُعَاوِيَةَ الْكِنْدِيِّ أَنَّهُ رَكِبَ إِلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَسْأَلُهُ عَنْ ثَلَاثِ خِلَالٍ قَالَ فَقَدِمَ الْمَدِينَةَ فَسَأَلَهُ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مَا أَقْدَمَكَ قَالَ لِأَسْأَلَكَ عَنْ ثَلَاثِ خِلَالٍ قَالَ وَمَا هُنَّ قَالَ رُبَّمَا كُنْتُ أَنَا وَالْمَرْأَةُ فِي بِنَاءٍ ضَيِّقٍ فَتَحْضُرُ الصَّلَاةُ فَإِنْ صَلَّيْتُ أَنَا وَهِيَ كَانَتْ بِحِذَائِي وَإِنْ صَلَّتْ خَلْفِي خَرَجَتْ مِنْ الْبِنَاءِ فَقَالَ عُمَرُ تَسْتُرُ بَيْنَكَ وَبَيْنَهَا بِثَوْبٍ ثُمَّ تُصَلِّي بِحِذَائِكَ إِنْ شِئْتَ وَعَنْ الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْعَصْرِ فَقَالَ نَهَانِي عَنْهُمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَعَنْ الْقَصَصِ فَإِنَّهُمْ أَرَادُونِي عَلَى الْقَصَصِ فَقَالَ مَا شِئْتَ كَأَنَّهُ كَرِهَ أَنْ يَمْنَعَهُ قَالَ إِنَّمَا أَرَدْتُ أَنْ أَنْتَهِيَ إِلَى قَوْلِكَ قَالَ أَخْشَى عَلَيْكَ أَنْ تَقُصَّ فَتَرْتَفِعَ عَلَيْهِمْ فِي نَفْسِكَ ثُمَّ تَقُصَّ فَتَرْتَفِعَ حَتَّى يُخَيَّلَ إِلَيْكَ أَنَّكَ فَوْقَهُمْ بِمَنْزِلَةِ الثُّرَيَّا فَيَضَعَكَ اللَّهُ تَحْتَ أَقْدَامِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقَدْرِ ذَلِكَ
‘একবার হারেছ ইবন মুআবিয়া কিন্দি উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নিকট মদিনায় আগমন করলেন তিনটি বিষয় জানার জন্য। ...(হাদীছের দীর্ঘ বর্ণনার পর) আরেকটি হলো, কিস্সা বর্ণনা সম্পর্কে। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এই কাজের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে বললেন, ‘তুমি যা চাও।’ হারেছ কিন্দি বললেন, আমি আপনার সুস্পষ্ট বক্তব্য শুনতে চাই। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমার ভয় হয় তুমি মানুষের মধ্যে কিসসা বর্ণনা করে কোনো পর্যায়ে গিয়ে নিজেকে তাদের চেয়ে উচ্চ ভাবতে শুরু করবে। মনে করবে তাদের তুলনায় তোমার স্থান ছুরাইয়া তারকার মতো উঁচুতে। ফলে কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে তোমার ধারণার পরিমাণ অনুযায়ী তাদের পায়ের নিচে স্থান দেবেন।’ [মুসনাদ আহমাদ: ১১১]
সুতরাং আমাদের নিয়তের স্বচ্ছতা, পবিত্রতা ও শুদ্ধতা থাকা দরকার। বিশেষ করে অন্যকে ছোটো ও তাচ্ছিল্য করার হীনপ্রবৃত্তি থেকে বাঁচা একান্ত কর্তব্য।
উত্তম আখলাকের আরেকটি আলামত হচ্ছে, সার্বক্ষণিক তাওবার আমল জারি রাখা, ইখলাসের সঙ্গে আমল করা, ইয়াকিন মজবুত করা, তাকওয়া-পরহেজাগারী, সবর-ধৈর্য, অল্পেতুষ্টি, যুহদ-দুনিয়াবিমুখতা, তাওয়াক্কুল, আত্মসমর্পণ, অভ্যন্তরীণ নিষ্কলুষতা, ক্ষমা-উদারতা, সদ্ব্যবহার, ইহসান-শোকর, মাখলুকের প্রতি সদয় হওয়া, আল্লাহ তা‘আলা ও মানুষের প্রতি লজ্জাশীলতা এবং আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মহব্বত পোষণ করা ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে এই শেষোক্ত গুণ হচ্ছে সমস্ত ভালোগুণের আধার এবং তা হাসিল হয় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণের মধ্য দিয়ে। আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে। যেমন-
﴿ قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١ ﴾ [ال عمران: ٣١]
‘আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ তা‘আলাকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তা‘আলাও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের যাবতীয় গুনাহ মাফ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ {সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩}১
দশ. নিজেকে সর্বদা মুজাহাদা ও চেষ্টা-প্রচেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা:
কেরাত, মুতালা‘আ, যিকির-ফিকির, সংকলন, লেখালেখি ইত্যাদি নেককাজে কাজে ব্যাপৃত থাকা। খাওয়া-দাওয়া, পেশাব-পায়খানা, প্রয়োজনীয় ঘুম-বিশ্রাম, পারিবারিক হক আদায়, জীবিকা উপার্জন এবং সাংসারিক অতি জরুরী কাজ ছাড়া জীবনের মূল্যবান সময় ইলম-আমল ছাড়া অন্য কাজে ব্যয়িত না করা। এসব কাজ ছাড়া মুমিনের অবশিষ্ট জীবনের কোনো মূল্য নেই। যার ভালোমন্দ উভয় দিন সমান সে তো প্রতারিত। ইলম হাসিল করতে গিয়ে সামান্য রোগ-ব্যাধিকে প্রশ্রয় না দেয়া। আমাদের সলফে সালেহীন রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা করতেন ইলমে দীন হাসিল করার মাধ্যমে। কেননা ইলমের দরজা হচ্ছে মিরাছে আম্বিয়া। আর এই মর্যাদা সামান্য রোগ-শোক বরদাশত ও কষ্ট-মেহনত ছাড়া হাসিল হয় না। ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছির (রহ.) বলতেন,
لا يستطاع العلم براحة الجسم
‘শারীরিক সুখ বজায় রেখে ইলম হাসিল করা যায় না।’
হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ»
‘আনাছ ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাত সাজানো হয়েছে কষ্টকর বস্তুর আবরণ দিয়ে। আর জাহান্নাম সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তি দ্বারা।’ [মুসলিম: ২৮২২; বুখারী: ৬৪৮৭]
অর্থাৎ আমলের কষ্ট মাড়াতে পারলেই কেবল জান্নাতের বাধা ডিঙানো যাবে।
কবি বলেন,
تريدين إدراك المعالي رخيصة ... و لا بد دون الشهد من إبر النحل
‘তুমি স্বল্পমূলে উচ্চমর্যাদা হাসিল করতে চাও? মনে রেখো, মধুমক্ষিকার হুল খাওয়া ছাড়া মধু হাসিল হয় না।’
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সম্পর্কে রবী (রহ.) বলেন,
لم أر الشافعي آكلاً بنهار ولا نائماً بليل لاشتغاله بالتصنيف،
‘আমি ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-কে দিনে খানা খেতে এবং রাতে ঘুমাতে দেখিনি। কেননা সর্বদা মুতালাআ‘ জ্ঞানসাধনা এবং সংকলন ও লেখালেখিতেই ব্যস্ত থাকতেন তিনি।’
এগার. ইলম হাসিলে লজ্জাবোধ না থাকা:
যে বিষয়ের ইলম নেই তা হাসিল করার ব্যাপারে কোনোরুপ লজ্জাবোধ করা উচিত নয়। এমনকি যদি বয়স, পেশা, মর্যাদা, সম্মান ও সবদিক দিয়ে নিজের চেয়ে কম অবস্থানের লোকের কাছ থেকেও তা হাসিল করতে হয় তাতেও লজ্জাবোধ করতে নেই। বরং ইলম ও হিকমত হাসিলের ব্যাপারে সর্বদা এই হাদীছের কথা স্মরণে রাখা চাই-
الحكمة ضالة المؤمن يلتقطها حيث وجدها
‘ইলম ও হিকমত হচ্ছে মুমিনের হারানো সম্পদ।’ সুতরাং তা যেখানেই পাওয়া যাবে মুমিন সেখান থেকেই যেন তা সংগ্রহ করে।
কোনো ব্যক্তি কি নিজের হারানো মূল্যবান সম্পদ রিক্সাওয়ালা বা কুলি-মজদুর পেয়ে থাকলে তার কাছ থেকে তা ছাড়িয়ে নিতে লজ্জাবোধ করে? তবে এরচেয়ে হাজারগুণ মূল্যবান সম্পদ ইলম হাসিল করতে ব্যক্তি বিশেষের দোহাই দিয়ে নিজেকে বঞ্চিত করার অর্থ কী?
মনে রাখতে হবে চেষ্টা ও মুজাহাদা ছাড়া কোনো কিছুই অর্জিত হয় না। এ সম্পর্কে একটি হাদীছ উল্লেখ করা যেতে পারে:
عَنِ الأَحْنَفِ بْنِ قَيْسٍ ، عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ، قَالَ: إن داود عَلَيْهِ السَّلاَمُ قَالَ: يَا رَبِ إنَّ بَنِي إسْرَائِيلَ يَسْأَلُونَك بِإِبْرَاهِيمَ ، وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ، فَاجْعَلْنِي يَا رَبِّ لَهُمْ رَابِعًا ، قَالَ: فَأَوْحَى اللَّهُ إلَيْهِ: يَا دَاوُد ، إنَّ إبْرَاهِيمَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ فِي سببي فَصَبَرَ فِيَّ وَتِلْكَ بَلِيَّةٌ لَمْ تَنَلْك ، وَإِنَّ إِسْحَاقَ بَذَلَ مهجة دمه في سببي فَصَبَرَ , وََتِلْكَ بَلِيَّةٌ لَمْ تَنَلْك ، وَإِنَّ يَعْقُوبَ أَخَذَتُ حَبِيبُهُ حَتَّى ابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ فَصَبَرَ ، وَتِلْكَ بَلِيَّةٌ لَمْ تَنَلْك
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, একবার নবী দাউদ (আ.) আল্লাহ তা‘আলার কাছে আবেদন জানিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! বনী ইসরাঈলের লোকেরা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের নামের উসিলায় আপনার কাছে প্রার্থনা করে। আমাকে আপনি তাদের চতুর্থজন বানিয়ে দিন। জবাবে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করলেন, হে দাউদ! নবী ইবরাহীম আমার জন্য অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো, অথচ তুমি সেই কষ্ট-মুজাহাদার সম্মুখীন হওনি। নবী ইসহাক আমার কারণে নিজের দেহের রক্ত প্রবাহিত করেছিল অতপর আমার রেজামন্দির জন্য ছবর করেছিল। অথচ তুমি সেরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হওনি। আর ইয়াকুবের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু (তথা সন্তান) ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল আর সে তার অপেক্ষায় দুই চোখ সাদা করা সত্ত্বেও আমার জন্য সবর করেছিল। অথচ তুমি সেই কষ্ট-মুজাহাদা করো নি।’ [মুসান্নাফ ইবন আবি শায়বা: ৩৫৪০৩]
আলোচ্য হাদীছে একথার শিক্ষা পাই যে, কষ্ট-মুজাহাদা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া উঁচু মাকাম হাসিল করা যায় না। সাঈদ ইবন জুবায়ের (রহ.) বলেন,
لا يزال الرجل عالماً ما تعلم فإذا ترك التعلم وظن أنه قد استغنى واكتفى بما عنده فهو أجهل ما يكون
‘একজন ব্যক্তি কখনই আলেম হতে পারবে না, যদি না সে অবিরাম ইলম হাসিল করতে থাকে। আর যখন সে ইলম অন্বেষণ ছেড়ে দেবে এবং একথা ভাববে যে, সে যথেষ্ট পরিমাণ ইলম শিখে ফেলেছে এবং তার কাছে যা আছে তা তার জন্য যথেষ্ট, তবে সে যা শিখেছে তার চেয়ে বেশি অজ্ঞ ও জাহেল।’
জনৈক কবি বলেন,
وليس العمى طول السؤال وإنما ... تمام العمى طول السكوت على الجهل
‘বারবার প্রশ্ন করা মূর্খতার আলামত নয়। বরং মূর্খতার আলামত হচ্ছে না জানা সত্ত্বেও প্রশ্ন না করা।’
আমাদের পূর্বসূরীগণ না জানা বিষয় স্বীয় ছাত্রদের কাছ থেকে শিখতেও লজ্জাবোধ করতেন না। শাফেয়ী (রহ.)-এর ছাত্র হুমায়দী (রহ.) বলেন,
صحبت الشافعي من مكة إلى مصر فكنت أستفيد منه المسائل وكان يستفيد مني الحديث
‘আমি ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর সঙ্গে মক্কা থেকে মিসর পর্যন্ত সফর করেছি। সফরের পুরো সময় আমি তার কাছ থেকে শিখতাম বিভিন্ন মাসআলা। আর তিনি আমার কাছে শিখতেন হাদীছ।’
সাহাবাগণ তাবেঈগণ থেকে ইলম শিক্ষা করতে লজ্জাবোধ করতেন না। আর এরচেয়ে বড় দলিল কী হতে পারে যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ শাগরেদ উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করতেন?
বারো. যোগ্যতার ভিত্তিতে লেখালেখির মাধ্যমে ইলমের প্রসার ঘটানো:
ইলমচর্চার ধারাবাহিকতা সাদাকায়ে জারিয়ায় পরিণত করতে যোগ্যতার শর্তে সংকলন ও তাসনীফ-তালীফের কাজ করা উচিত। সংকলন ও তাসনীফ-তালীফের গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে খতীব বাগদাদী (রহ.) বলেন,
يثبت الحفظ، ويذكي القلب، ويشحذ الطبع، ويجيد البيان، وبكسب جميل الذكر وجزيل الأجر، ويخلده إلى الابد
‘(লেখিলেখি) এর দ্বারা হেফজ শক্তিশালী, অন্তর ধারালো, তবিয়ত সুচারু এবং বর্ণনা তীক্ষ্ন হয়। যুগ যুগ ধরে প্রশংসা জারি থাকে এবং ছাওয়াব হাসিল হয় এবং এটা তাকে শেষদিন পর্যন্ত অমর করে রাখে।’ যেমন বলা হয়-
يموَت قوَم فيحيى العلم ذكرهم ... و الجهل يلحق أمواتاً بأموات
‘জাতি মরে যায় কিন্তু ইলম তাদের স্মরণ জীবিত রাখে। আর জাহেলরা মরার পর মৃতদের সঙ্গে মিলিত হয়।’
আরেকজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন,
علم الإنسان ولده المخلد
‘মানুষের ইলম হচ্ছে তার অমর সন্তান।’
আবূল ফাতহ আলী ইবন মুহাম্মাদ আলবুস্তী বলেন,
يقولون ذكر المرء يبقى بنسله ... و ليس له ذكر إذا لم يكن نسل
فقلت لهم نسلي بدائع حكمتي ... فمن سره نسل فإنا بذا نسلو
‘মানুষ বলে, বংশ দ্বারা মানুষ স্মরণীয় হয়, এর দ্বারা তার নাম বাকি থাকে। তাই যদি বংশ না থাকে তবে কেউ তাকে স্মরণ করে না। আমি তাদেরকে বলব, আমার বংশ হচ্ছে আমার ইলম ও হেকমতের দুষ্প্রাপ্যতা। সুতরাং কেউ যদি স্মরণকারী বংশ চায় তবে সে যেন এই পথই বেছে নেয়।’
আর সংকলনের ক্ষেত্রে মানুষের হাতে নেই এমন বিষয় বেছে নেওয়া কিংবা পুরান বিষয় হলে তাতে নতুনত্ব আনতে আলোচনার আঙ্গিক পরিবর্তন করে সংকলনের কাজ সম্পন্ন করা প্রশংসনীয়। সংকলনের ক্ষেত্রে অতি বিস্তারিত আলোচনা কিংবা বুঝতে অক্ষম সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উভয়টি পরিহার করা উচিত। বারবার পাঠ ও অসংখ্যবার নজর দেওয়া ছাড়া পাণ্ডুলিপি না ছাড়া। সংশোধন ও পরিমার্জন করার পরই কেবল পাণ্ডুলিপি ছাড়া। তবে যোগ্যতা অর্জন করা ছাড়া এসব কাজে হাত না দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা এটা নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট এবং পাঠককে ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া আর কিছু নয়।

দ্বিতীয় পর্ব: দরস বিষয়ে উস্তাদের করণীয়
এক. দরসের মজলিসে বসার পূর্বে সকল প্রকার নাপাকি থেকে দেহ ও কাপড় পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করা এবং সম্ভব হলে সুগন্ধি ব্যবহার করা। কাপড় পরিধানের ক্ষেত্রে যমানার নেককার লোকদের অনুসরণ করা, যাতে ইলম ও শরীয়তের মর্যাদা বুলন্দ হয়। ইমাম মালেক (রহ.) হাদীছের দরসে বসার আগে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, নতুন কাপড় পরিধান করতেন এবং মাথার ওপর চাদর ঝুলিয়ে দিতেন। অতপর দরসের মসনদে উপবেশন করতেন। আর দরস শেষ না হওয়া পর্যন্ত মজলিসে সুগন্ধিযুক্ত কাঠি জ্বালিয়ে রাখতেন। তিনি বলতেন,
أحب أن أعظم حديث رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم
‘আমি এভাবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে ভালোবাসি।’
বস্তুত সাধ্য থাকা অবস্থায় কাপড়-চোপড়ে শান-শওকত অবলম্বন করা মন্দ বা নিন্দনীয় নয়। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
أجد الثياب إذا اكتسيت فإنها ... زين الرجال بها تعز وتكرم
دع التواضع في الثياب تحرياً ... فالله يعلم ما تجن وتكتم
فرثاث ثوبك لا يزيدك زلفة ... عند الإله وأنت عبد مجرم
و بهاء ثوبك لا يضرك بعد أن ... تخشى الإله وتتقي ما يحرم
‘কাপড় নতুন ও পরিচ্ছন্ন রাখো। কেননা তা পুরুষের সৌন্দর্য এবং এর দ্বারা তুমি সম্মান ও মর্যাদা লাভ করবে। কাপড়ের ক্ষেত্রে বিনয় পরিহার করো। কেননা তুমি মনে যা গোপন করো আল্লাহ তা‘আলা তা জানেন। জীর্ণশীর্ণ বস্ত্র তোমাকে রবের নিকটবর্তী করে না; যদি তুমি অপরাধী হও। পক্ষান্তরে বস্ত্রের চাকচিক্য তোমার কোনো ক্ষতি করবে না, যদি তুমি প্রভুকে ভয় করো।’
দরসে যাওয়ার আগে দুই রাকাত ইস্তেখারা সালাত আদায় করা উচিত (যদি মাকরূহ সময় না হয়)। অবশ্য প্রত্যেক ব্যক্তির দিনে অন্তত একবার এই সালাত আদায় করা দরকার। জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের সব কাজ শুরু করার আগে استقسام بالأزلام তথা ভাগ্য গণনার শর দ্বারা শুরু করত। ইসলাম এর বিরুদ্ধে এমন এক পন্থা বাতলে দিয়েছে যাতে তাওহীদ ও একত্ববাদ, আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মুখাপেক্ষিতা ও নিজের সবকিছু তার ওপর হাওয়ালা করার অনুশীলনী রয়েছে। অতপর নশরে ইলম, তাবলীগে দীন, শরঈ বিধানের প্রচার-প্রসার, রবের হুকুম-আহকাম মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ইলম বৃদ্ধির নিয়তে দরসে গমন করবেন। দরস শুরু করার আগে সলফে সালেহীনের জন্য দু‘আ করবেন। দরসের উদ্দেশ্যে কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে এই দু‘আ পাঠ করা উচিত-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ أَوْ أُضَلَّ أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ أَوْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ أَوْ أَجْهَلَ أَوْ يجْهَلَ عَلَيَّ
সেই সঙ্গে নিম্নোক্ত দু‘আটিও পাঠ করা চাই-
بسم الله توكلت على الله لا حول ولا قوة إلا بالله
দরসের মজলিসে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার জিকির জারি রাখা উচিত। মজলিসে পৌঁছার পর সর্বপ্রথম উপস্থিত সকলকে সালাম প্রদান করা চাই। অতপর আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওফীক ও সাহায্য কামনা করে উস্তাদ দরস শুরু করবেন। চেষ্টা করবেন কেবলামুখী হয়ে দরসের মজলিসে উপবেশন করতে। কেননা হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم: أَكْرَمُ الْمَجَالِسِ مَا اسْتُقْبِلَ بِهِ الْقِبْلَةُ
‘ওই মজলিস সর্বোত্তম যা কিবলামুখি হয়।’ [মু‘জামুল আওসাত: ৮৩৬১]
অত্যন্ত বিনয়, নম্রতা, গাম্ভীর্যতার সঙ্গে চারজানু অথবা মাকরূহ নয় এমন যে কোনো পন্থায় উপবেশন করবেন। কিন্তু এক পা উঠিয়ে, পা ছড়িয়ে দিয়ে, ডানদিক কিংবা বামদিক অথবা পেছনের দিকে কোনো বস্তুর সঙ্গে হেলান দিয়ে উপবেশন করা উচিত নয়। দরসের মজলিসে অহেতুক হাসি-মশকরা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। কেননা এর দ্বারা নিজের ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্য হ্রাস পায়। যেমন বলা হয়-
من مزح استخف به، ومن أكثر من شيء عرف به
‘যে অহেতুক হাসি-মশকরা করে সে এর দ্বারা হালকা হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি যে কাজ বেশি করে সে সেই কাজ দ্বারা পরিচিত হয়।’
ক্ষুধা, পিপাসা, দুশ্চিন্তা, রাগ-ক্রোধ, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, অতিরিক্ত ঠাণ্ডা কিংবা অতিরিক্ত গরমের সময় এবং মানসিক পেরেশানির অবস্থায় দরস দেওয়া উচিত না। কেননা এসব পরিস্থিতিতে দরস দিলে অনেক সময় ভুল উত্তর কিংবা ভুল ফাতাওয়া দেয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিন. মজলিসে একটু উঁচু স্থানে উপবেশন করা বাঞ্ছনীয়। উপস্থিত লোকদের মধ্যে ইলম ও বয়সের দিক দিয়ে জৈষ্ঠকে বিশেষ সম্মান করা কাম্য। আর অবশিষ্টদের সঙ্গেও কোমল ব্যবহার করা চাই। দরসে শরীক সকলকে সালামের মাধ্যমে সম্মান জানানো, হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথাবার্তা বলা শোভনীয়। উপস্থিত ছাত্রদের প্রতি প্রয়োজনের সময় পূর্ণদৃষ্টি দিয়ে তাকানো এবং বক্রভাবে না তাকানো। কেউ যে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কিংবা দরস বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তার সঙ্গে বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে কথা বলা এবং উত্তর প্রদান করা একজন আদর্শ উস্তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। প্রশ্নকর্তাকে দুর্বল ভেবে তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা অহংকারের লক্ষণ। এটা উস্তাদের জন্য কখনই মানানসই নয়।
চার. যে কোনো বিষয়ের দরস শুরু করার আগে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে নেওয়া উত্তম। কেরাত পাঠ সমাপ্ত হওয়ার পর নিজের জন্য, ছাত্রদের জন্য এবং সকল মুসলিমের জন্য দু‘আ করা যেতে পারে। অতপর আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পাঠ এবং হামদ-ছানা ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করবেন। এরপর সম্ভব হলে ইমাম, মুজতাহিদ, স্বীয় উস্তাদ-মাশায়েখে কেরাম ও মা-বাবার জন্য বিশেষ দু‘আ করে তারপর দরস শুরু করবেন।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.