নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

অধ্যয়ন ও জ্ঞানসাধনা ৩

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:২১


পাঁচ. একাধিক দরসের বিষয় হলে মর্যাদার দিক বিবেচনা করে একটিকে আরেকটির আগে রাখা উচিত। সুতরাং প্রথমে তাফসীরুল কুরআন, তারপর হাদীছ, এরপর উসুলে দীন, উসূলে ফিকহ, অতপর ইখতেলাফী বিষয়, নাহব-সরফ ইত্যাদি পাঠদানের ব্যবস্থা করা উচিত। দরসে যেখানে বিরতি দেওয়ার সেখানে বিরতি দেওয়া এবং যেখানে সবক চালিয়ে নেওয়া দরকার সেখানে চালিয়ে নেওয়া ভালো। দীনের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে এমন কিছু দরসে উপস্থাপন করলে তার জবাব দিতে বিলম্ব করা উচিত নয়। হয়ত ওই বিষয় ও তার জবাব একসঙ্গে উল্লেখ করতে হবে নতুবা কোনোটাই উল্লেখ করা যাবে না। আর দরস বিরক্তিকর দীর্ঘ কিংবা বুঝতে অক্ষম সংক্ষিপ্ত করাও অনুচিত। এসব ক্ষেত্রে ছাত্রদের গ্রহণ ক্ষমতার কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
ছয়. দরসে প্রয়োজনের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলা শোভনীয় নয়। আবার বেশি নিচু স্বরেও হওয়া অনুচিত। পাশে অন্য দরস চললে তাদের যেন সমস্যা না হয় সেটা উস্তাদ-ছাত্র সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা নিম্নস্বর পছন্দ এবং উচ্চস্বর অপছন্দ করতেন। বর্ণিত হয়েছে-
إن الله يحب الصوت الخفيض ويبغض الصوت الرفيع
‘আল্লাহ তা‘আলা নিম্নস্বর পছন্দ এবং উচ্চস্বর অপছন্দ করেন।’ [মুসনাদে উমর]
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল এমনভাবে কথা বলা যাতে শ্রোতারা তা উপলব্ধি করতে পারে এবং তিনি কথা শেষ করে কিছুটা বিরতি দিতেন, যাতে কেউ কোনো বিষয়ে না বুঝলে জিজ্ঞেস করতে পারে। আর ছাত্রদের উচিত, উস্তাদের কথা শেষ করতে দেওয়া এবং কোনো কিছু জানার প্রয়োজন হলে তিনি নিজ থেকে কথা থামালে তখন জিজ্ঞেস করা। অন্যথায় আলোচনার বিষয় বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-কে দরসে মধ্যে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন,
نفرغ من هذه المسألة ثم نصير إلى ما تريد
‘আগে আমার কথা শেষ করি তারপর তোমার প্রশ্নের জবাব দেওয়া যাবে।’
দরসে উপস্থিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হক বস্তু জানা। অতএব হক জাহির হয়ে যাওয়ার পর তা সহজে মেনে নিতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা অনেক সময় তা ঝগড়া ও মনমালিন্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই মজমাকে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গলের মাধ্যম বলে মনে করতে হবে। আর স্মরণে থাকবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী-
﴿ لِيُحِقَّ ٱلۡحَقَّ وَيُبۡطِلَ ٱلۡبَٰطِلَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُجۡرِمُونَ ٨ ﴾ [الانفال: ٨]
‘যাতে তিনি সত্যকে সত্য প্রমাণিত করেন এবং বাতিলকে বাতিল করেন, যদিও অপরাধীরা তা অপছন্দ করে।’ {সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৮}
অর্থাৎ হক সাব্যস্ত ও বাতিল প্রকাশিত করার নিয়তে দরস প্রদান ও গ্রহাণ করা।
আট. দরসে কেউ শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ করলে কিংবা হাসি-তামাশা, অন্যের সঙ্গে কথা বলে, অমনোযোগী হয়, বিনা প্রয়োজনে উচ্চবাচ্য করে, সঙ্গীদের কাউকে বিদ্রুপ করে, হক জাহির হয়ে যাওয়ার পরও তা মানতে সংকোচ করে কিংবা দরসের জন্য অশোভনীয় কোনো কাজ করে তবে তাকে শাসানো উস্তাদের একান্ত দায়িত্ব। অবশ্য এরজন্য হেকমত অবলম্বন করা এবং এমন কোনো পন্থা গ্রহণ করা যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
নয়. দরসের আলোচনায় ইনসাফের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। প্রশ্নকর্তার জ্ঞানের পরিধি বিবেচনা করে তার উত্তর দিতে হবে। বুঝতে অক্ষম এমন তাফসিলী জবাব প্রদান করা ঠিক নয়। নিয়ম হচ্ছে প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে তার আকল অনুযায়ী আচরণ করা। আর কোনো ছাত্র যদি নিজের না জানা বিষয়ে প্রশ্ন করে তবে নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া- لا أعلم ‘আমি জানি না।’
বস্তুত এটা আদৌ দোষের কিছু নয়। বরং সৎসাহস ও ইলমী আমানত রক্ষার আলামত। ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
يا أيها الناس من علم شيئاً فليقل به ومن لم يعلم فليقل الله اعلم فإن من العلم أن يقول لما لا يعلم: الله أعلم.
‘হে লোক সকল! যে ব্যক্তি জানে কেবল সেই যেন কথা বলে। আর যে জানে না সে যেন বলে, ‘আল্লাহই ভালো জানেন’। কেননা না জানা বিষয়ে ‘আল্লাহই ভালো জানেন’ বলাও ইলমেরই এক অংশ।’
জনৈক পূর্বসূরী মনীষী বলেছেন-
لا أدري نصف العلم.
‘আমি জানি না বলতে পারা ইলমের অর্ধেক।’
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
إذا أخطأ العالم لا أدري أصيبت مقاتله
‘যে আলেম ‘আমি জানি না’ কথাটি বলতে ভুলে যায় তার কথা ভুলে পতিত হয়।’
শুধু নিজেই নয়, শিক্ষার্থীদেরকেও এ কথাটির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর মনে রাখতে হবে যে, ‘আমি জানি না’ কথাটি বললে সম্মান কমে না বরং বাড়ে। কেননা হাজার হাজার মাসআলা থেকে দুয়েকটি জানার বাইরে থাকা আদৌ দোষের বিষয় নয়। তাই এ কথাটি তার আমানতদারী, সততা, বিশ্বস্ততা, মানসিক স্বচ্ছতা এবং রবকে ভয় করার আলামত।
সালফে সালেহীন বলেন, কথাটি বলতে কেবল তারাই সংকোচ ও লজ্জাবোধ করে, যাদের দীনদারী দুর্বল এবং আল্লাহ তা‘আলাকে যথাযথভাবে ভয় করে না। কেননা, জানি না বলে মানুষের চোখ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে আল্লাহ তা‘আলার চোখ থেকে পড়ে যাচ্ছে। কখনও কখনও না জানা সত্ত্বেও তা বলার কারণে পরে ভুল ধরা পড়ে। ফলে মানুষের চোখে বড় হওয়ার নিয়তে বলতে গিয়ে উল্টো তাদের দৃষ্টিতে ছোট হয়ে যায়। স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাই ওলামায়ে কেরামকে এই শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। খিজির (আ.) ও মূসা (আ.)-এর ঘটনা এর প্রমাণ।
দশ. দূর থেকে আগত তালেবে ইলমের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা চাই। তাদের প্রতি অধিক স্নেহসুলভ আচরণ করা দরকার। যাতে তার একাকীত্ব ঘুচে যায়। আর তার দিকে বারবার অপরিচিতের দৃষ্টিতে তাকানো কাম্য নয়। কারণ এতে তার মানসিক অবস্থা ভেঙে যায়।
এগার. দরস শেষে والله أعلم কথা বলার প্রচলন আছে। তবে উত্তম হলো দরস শেষ করার আগে এমন কোনো কথা বলা যা দরস শেষ হওয়ার আলামত বলে অনুভূত হয়। দরস শেষ হওয়া মাত্রই উস্তাদ মজলিস থেকে উঠবেন না। বরং কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবেন। এতে বিশেষ ফায়েদা রয়েছে। যেমন কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে সে ওই সময়ে তা জিজ্ঞেস করতে পারবে। তাছাড়া ছাত্রদের ভীড়ে পড়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়তে হবে না। মজলিস শেষ করে দাঁড়ানোর মুস্তাহাব দু‘আর কথা ভুলবেন না। যথা-
«سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ »
‘তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি হে আল্লাহ! তোমার প্রশংসার সাথে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নাই। আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমার দিকে তওবা (প্রত্যাবর্তন) করছি।’ [তিরমিযী: ৩৪৩৩]
বারো. যে বিষয়ে জানাশোনা নেই দরসে সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করাই ঠিক নয়:
কেউ এ রকম কথা ওঠালে তা তড়িৎ থামিয়ে দেয়াই উত্তম। কেননা এটা দীন নিয়ে তামাশা করা এবং মানুষের মধ্যে নিজেকে বড় করে তোলার মিথ্যা প্রয়াস। এ ব্যাপারে হাদীছে কঠোর বাণী উচ্চারিত হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُتَشَبِّعُ بِمَا لَمْ يُعْطَ كَلَابِسِ ثَوْبَيْ زُورٍ»
‘যাকে যা দেওয়া হয়নি তার সেটার দাবিদার মিথ্যার পোশাক পরিধানকারীর ন্যায়।’ [বুখারী: ৫২১৯; মুসলিম: ২১২৯]
ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেন,
من طلب الرياسة في غير حينه لم يزل في ذل ما بقي
‘যে সময় আসার আগেই নেতৃত্ব চায়, সে অবশিষ্ট জীবন লাঞ্ছনার মধে কাটায়।’
এছাড়া এর দ্বারা শ্রোতারাও ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং তারা ভুল জিনিসের জ্ঞান নিয়ে পরবর্তী জীবনে সমস্যার সম্মুখীন হয়। আবূ হানীফা (রহ.)-কে বলা হলো-
في المسجد حلقة ينظرون في الفقه فقال الَهُمْ رأس؟ قالوا: لا قال لا يفقه هؤلاء أبداً
‘এক মজলিসে ফিকহের আলোচনা চলছে। তিনি বললেন, তাদের কোনো যিম্মাদার আছে কি? তারা জানালেন, না। তিনি বললেন, এরা কখনই ফিকহ হাসিল করতে পারবে না।’



তৃতীয় পর্ব:
ছাত্রদের সঙ্গে উস্তাদের আচার-আচরণ
এক. তালীম ও শিক্ষাদীক্ষা প্রদানকে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন, ইলমের প্রচার-প্রসার, ইয়াহইয়ে দীন, হক জাহির ও দায়েম রাখা, বাতিল ধ্বংস করা, আলেমের সংখ্যা বাড়িয়ে উম্মতের কল্যাণ বৃদ্ধি করা, এদের সর্বশেষ ব্যক্তি থেকেও সদকায়ে জারিয়ার একটি অংশ এবং তাদের পক্ষ থেকে রহমত প্রাপ্তির দু‘আ লাভ, তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ইলমের সিলসিলায় প্রবিষ্ট করা এবং দীনের বাহক ও ইলমে ওহীর ধারকের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ নেক কাজের অংশ বলে মনে করা চাই। কেননা ইলমে দীন শিক্ষা করা এবং শিক্ষা দেওয়া দীনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
দুই. তালেবে ইলমের ইখলাস নাই- এই অযুহাতে তাকে ইলম থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না। কেননা তার নেক নিয়তের আশা সুদূরপরাহত নয়। অনেক সময় তালেবে ইলমের সহীহ সমঝ না থাকার কারণে প্রথমে নেক নিয়ত থাকে না কিন্তু বুঝ আসার পর নিয়ত ঠিক হয়ে যায়। পূর্বসূরীগণ বলতেন,
طلبنا العلم لغير الله فأبى أن يكون إلا لله،
‘প্রথমে গায়রুল্লাহর জন্য ইলম শিখতাম কিন্তু তা আল্লাহ তা‘আলার জন্য হওয়া বৈ অস্বীকার করেছে।’
কথাটির অর্থ হচ্ছে হয়ত প্রথম প্রথম নিয়ত সহীহ ছিল না বটে, কিন্তু পরবর্তীতে বুঝ আসার পর তা ঠিক হয়ে গেছে। আর উস্তাদের কর্তব্য হচ্ছে ছাত্রদেরকে নিয়ত সহীহ করার জন্য তাগিদ দেয়া। তাদের অন্তরে একথা বদ্ধমূল করতে প্রচেষ্টা চালানো যে, একমাত্র নেক নিয়তের দ্বারাই উচ্চমর্যাদা, ইলম-আমল ও হিকমত লাভ করা সম্ভব।
তিন. আল্লাহ তা‘আলা ওলামায়ে কেরামের মর্যাদার যে ঘোষণা দিয়েছেন ছাত্রদের অধিকহারে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং তাদের কুরআন, হাদীছ, শের-আশআর ও বিভিন্ন প্রবন্ধে ইলমের যে ফযীলতের কথা বলা হয়েছে সে সম্পর্কে তাদের ধারণা ও জ্ঞান দেয়া। যাতে তারা হীনমন্যতায় না ভোগে।
চার. উস্তাদ নিজে যা পছন্দ করবেন ছাত্রদের জন্যও তাই পছন্দ করা উচিত। নিজের সন্তানকে যেভাবে মায়ামমতা প্রদান করা হয় তালেবে ইলমের প্রতিও সেই মায়ামমতা প্রদর্শন করা কর্তব্য। খুব সাধারণ ভাবেই কখনও কখনও তাদের দ্বারা ভুলভ্রান্তি প্রকাশ পাবে। এরজন্য কখনও শাসনও করতে হবে আবার কখনও মাফও করে দিতে হবে। উস্তাদগণ একথা অবশ্যই মনে রাখবেন যে, কঠোরতাই সংশোধনের একমাত্র পথ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে আদেশ উপদেশের দ্বারা কঠোরতার চেয়ে বেশি ফল পাওয়া যায়।
পাঁচ. দরস প্রদানের ক্ষেত্রে ফলপ্রসু পদক্ষেপ গ্রহণ করা চাই। ছাত্রদেরকে নীতিমালা, কায়েদা-কানুন এবং সূক্ষ্ম ও উপকারী বিষয়াদি মুখস্ত করাতে উৎসাহিত করা খুবই জরুরী। আর অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন জ্ঞান- যা ছাত্রদের মস্তিষ্ককে বিচলিত করে- তা থেকে দূরে রাখা একান্ত বিচক্ষণতার লক্ষণ।
ছয়. মাসআলা ও আলোচনা বুঝানোর জন্য গ্রহণযোগ্য ও সরল উপস্থাপনা অবলম্বন একজন আদর্শ উস্তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত হয় এ ধরনের আলোচনা করা যাবে না। উস্তাদ প্রথমে উদাহরণের সাহায্যে মাসআলাটি তুলে ধরবেন। ছাত্রদের মধ্যে যারা ধারণক্ষমতা রাখে না তাদের জন্য শুধু মাসআলার কাঠামো ও উদাহরণ পেশ করেই ক্ষান্ত হবেন। আর যারা সামর্থ্য রাখে তাদের সামনে মাসআলার দলিলের উৎস, হেকমত, ইল্লত এবং অন্যান্য সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। মজলিসে যদি এমন কেউ উপস্থিত থাকে যার সামনে সরাসরি কোনো শব্দ উল্লেখ করা যায় না, তখন কোনো ইঙ্গিতবাহী শব্দ ব্যবহার করা উচিত। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনই করতেন।
সাত. কোনো ব্যাখ্যামূলক দরস শেষ করার পর ছাত্রদের মেধা পরীক্ষার জন্য মাসআলা সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছাত্রদের সামনে পেশ করা যেতে পারে। কেউ জবাব দিতে পারলে তার প্রশংসা করা বাঞ্ছনীয়। আর কেউ না পারলে তাকে হেকমতের সঙ্গে পুনরায় বুঝিয়ে দেবেন।
আট. মাঝেমধ্যে ছাত্রদের পূর্বের মুখস্ত করা বিষয় জানতে চাইবেন। পূর্বে উল্লিখিত জরুরীমাসায়েল, দুর্লভ বিষয়, কায়েদাকেন্দ্রিক শাখাগত মাসআলা ইত্যাদি উল্লেখ করে স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা নেওয়া দরকার। যে ছাত্র জবাব দিতে পারবে অন্যের সামনে তার প্রশংসা করে তার হিম্মত ও অন্যের অনুপ্রেরণা বাড়াবেন। আর কেউ না পারলে অন্যের সামনে তাকে হেয় করবেন না। বরং উৎসাহিত করবেন।
নয়. কোনো ছাত্রকে তার সাধ্যের বাইরে চেষ্টা-মুজাহাদা করতে দেখলে সহজতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। যাতে তিনি উম্মতকে তার সাধ্যের বাইরে কাজ করতে বারণ করেছেন। এক্ষেত্রে তার বাণীটি প্রবাদের মতো সর্বজনবিদিত হয়ে আছে। যথা-
« فَإِنَّ الْمُنْبَتَّ لَا أَرْضًا قَطَعَ وَلَا ظَهْرًا أَبْقَى»
‘দিনরাত চলমান বাহন গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না এবং তার পৃষ্ঠদেশও ঠিক থাকে না।’ [শু‘আবুল ঈমান: ৩৮৮৬, যঈফ]
অন্য হাদীছে ইরশাদ করেন-
اكفلوا من العمل ما تطيقون
‘যতটুকু সাধ্য আছে ততটুকু আমলের বোঝা বহন করো।’
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে সর্বত্র সহজতা দান করেছিলেন। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী সেই সহজতা গ্রহণ না করে নিজের ওপর কঠিন আমল চাপিয়ে নিয়েছিলেন। পরে সেজন্য অনেকে অনুশোচনাও করেছেন। যেমন আমর ইবন আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিজের ওপর দীর্ঘ কিয়াম আবশ্যক করে নিয়ে পরে তাতে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং বলেছিলেন-
ليتنى قبلت رخصة رسول الله
‘ইশ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেওয়া অবকাশই যদি গ্রহণ করতাম!’
কারণ হচ্ছে, ধারাবাহিক আমল আল্লাহ তা‘আলার কাছে খুবই প্রিয়। তাই কিছুদিন সাধ্যের বাইরে মেহনত-মুজাহাদায় লিপ্ত থেকে পরে দুর্বল হয়ে সেটা বাদ দেয়ার চেয়ে সার্বক্ষণিক অল্প মুজাহাদাই উত্তম।
দশ. সর্বদা ছাত্রের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাল-চলন, আদব-আখলাস ও স্বভাব-চরিত্রের অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখবেন। তাদের দ্বারা নাজায়েয, মাকরূহ, অশিষ্টাচার, উস্তাদদের প্রতি বেয়াদবি কিংবা অপ্রয়োজনীয় কোনো কিছু প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট ছাত্রের নাম উল্লেখ না করে শাসন করা বেশি কার্যকর। এতে কাজ না হলে তাকে ব্যক্তিগতভাবে বারণ করতে হবে। তাতেও কাজ না হলে তখন প্রকাশ্যে কঠোরভাবে শাসন করা যাবে। যাতে তার শাস্তি দেখে অন্যরাও শিক্ষা পায়। আর তাতেও কাজ না হলে তখন শাস্তিমূলক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।
এগার. ছাত্রদের কল্যাণ সাধন এবং তাদের মন স্থির রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করবেন। দরকার হলে এবং সাধ্য থাকলে আর্থিক সহযোগিতা করবেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা ওই বান্দার সঙ্গে থাকেন যে বান্দা অপরজনের উপকার করে। আর এই বিষয়টি যদি তালেবে ইলমের ক্ষেত্রে হয় তাহলে তো এর ফযীলতের তুলনাই নেই। কোনো ছাত্র নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি অনুপস্থিত থাকলে তার খোঁজখবর নেবেন, প্রয়োজনে চিঠি বা ফোনের মাধ্যমে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবেন। কেউ অসুস্থ হলে তার সেবা-যত্ন করবেন। কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করবেন। পেরেশান হলে তাকে স্বান্তনা দেবে। মনে রাখতে হবে নেককার তালেবে ইলম উস্তাদের জন্য দুনিয়া-আখেরাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য বয়ে আনে এবং সেই তার সবচেয়ে বড় আত্মীয়-আপনজন।
বারো. ছাত্রদের সঙ্গে কোমল আচরণ করবেন, যদি তারা তাদের যাবতীয় দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেন। তার প্রতি কোমলতার ডানা সম্প্রাসারিত করবেন। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করে বলেন,
﴿ وَٱخۡفِضۡ جَنَاحَكَ لِمَنِ ٱتَّبَعَكَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٢١٥ ﴾ [الشعراء: ٢١٥]
‘আপনি মুমিনদের মধ্যে আপনার অনুসারীদের জন্য বিনয়ের ডানা সম্প্রসারিত করুন।’ {সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত ২১৫}
হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا »
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে বিনয়ী হওয়ার আদেশ করেছেন।’ [মুসলিম: ২৮৬৫]
অন্য হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللَّهُ
‘যে ব্যক্তি বিনয়ী হয় আল্লাহ তা‘আলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ [মুসলিম: ২৫৮৮]
এটা তো সাধারণ মানুষের প্রতি বিনয়ী হওয়ার ফায়েদা। আর এটা যদি হয় সন্তানতূল্য তালেবে ইলমের প্রতি তাহলে তার মর্যাদা কত উঁচুতে হতে পারে? হাদীছে আরো বলা হয়েছে-
لينوا لمن تعلمون ولمن تتعلمون منه
‘তোমরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করো।’ [তাখরীজু আহাদীছিল এহইয়া: ৩/২১৮, যঈফ]
ফুজাইল (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে-
إِن الله يحب العالم المتواضع ويبغض الجبار ومن تواضع لله ورثه الله الحكمة
‘আল্লাহ তা‘আলা বিনয়ী আলেমকে পছন্দ করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্য বিনয়ী হয় তিনি তাকে হিকমতের অধিকারী করেন।’
ছাত্রদের সঙ্গে তাদের মর্যাদা বজায় রেখে কথা বলা, সম্বোধন করা এবং সুন্দর নাম ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত-
كان رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم، يكني أصحابه إكراماً لهم.
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে তাদের সম্মান রক্ষার্থে উপনামের সঙ্গে সম্বোধন করতেন।’
সুতরাং ছাত্ররা সাক্ষাত করতে এলে তাদেরকে মারহাবা বলা, হাসিমুখে কথা বলা আলেমের শান হওয়া চাই। আর যাদের মধ্যে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা যায় তাদের প্রতি একটু বেশি যত্ন নেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয়। কারণ, হেকমতকে যথাস্থানে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।




চতুর্থ পর্ব: ছাত্রদের দায়িত্ব ও করণীয়
এক. নিজেকে ধোঁকা-প্রতারণা, হিংসা-বিদ্বেষ, বদ আকীদা, বদমেজাজ ইত্যাদি পাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। যাতে করে নিজের মধ্যে ইলম ও ইলমের সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় প্রবেশ করার পথ খুলে যায়। কেননা বলা হয়ে থাকে-
إن العلم صلاة السر، وعبادة القلب، وقربة الباطن
‘ইলম হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সালাত, কলবের ইবাদত এবং গোপন নৈকট্য।’
সুতরাং সালাত যেমন বাহ্যিক অপবিত্রতামুক্ত হওয়া ছাড়া সহীহ হয় না তেমনিভাবে কলবের সালাত ইলমও সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতার সঙ্গে কবুল হবে না। সালাফে সালেহীন আরো বলেন,
يطيب القلب للعلم كما تطيب الأرض للزرع، فإذا طيب العلم ظهرت بركته
‘ভূমি যেমন শস্য ও ফসলাদি দ্বারা সজীব হয়ে ওঠে তেমনিভাবে অন্তরও ইলম দ্বারা সজীব ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। আর যখন ইলমের সজীবতা সৃষ্টি হয় তখন বাহ্যিকভাবে এর নমুনা প্রকাশ পায়।’
হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
« أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً، إِذَا صَلُحَتْ صَلُحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ، فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ»
‘দেহে একটি গোস্তপিণ্ড আছে। যদি সেই গোস্তপিণ্ড ঠিক হয়ে যায় তবে সারা দেহ ঠিক থাকে। আর যদি সেটা ফাসেদ হয় তবে গোটা দেহ নষ্ট হয়ে যায়। নিঃসন্দেহে সেই গোস্তপিণ্ড হচ্ছে কলব।’ [বুখারী: ৫২; মুসলিম: ১৫৯৯]
সাহল (রহ.) বলেন,
حرام على قلب أن يدخله نوَر وفيه شيء مما يكره الله عز وجل
‘ওই কলবের ভেতর ইলমের নূর প্রবেশ করানো হারাম, যে কলবে আল্লাহ তা‘আলার অপছন্দনীয় কিছু বিদ্যমান থাকে।’
দুই. ইলম হাসিলে নিয়ত সহীহ করে নেবে। আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন, দীন-ইসলামের প্রচার-প্রসার, নিজের ক্বলবকে নূরান্বিত করা, বাতেনকে সুশোভিত করা এবং সর্বোপরি উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে দীনী জাগরণ সৃষ্টি করার নিয়ত করতে হবে। নিয়তকে ঠিক রাখাই আসলে সবচেয়ে কঠিন কাজ। সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) বলেন,
ما عالجت شيئاً أشد من نيتي،
‘আমি নিয়তের পরিচর্যার চেয়ে বেশি কোনো বস্তুর পরিচর্যা করা কঠিন মনে করিনি।’
ইলম অর্জন করার দ্বারা কখনও দুনিয়া কামানোর নিয়ত করবে না। কেননা এটা হবে উত্তম বস্তুর তুলনায় অনুত্তম বস্তু গ্রহণ করা। কারণ ইলম হচ্ছে একটি ইবাদত। তাই এতে এখলাস থাকা অপরিহার্য। তবেই এতে বরকত হয়। পক্ষান্তরে যদি আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কিছুর নিয়ত করা হয় তবে আমল বাতিল হবে এবং সেটা চরম আক্ষেপ ও আফসোসের কারণ হবে।
তিন. যৌবনের মূল্যবান সময়গুলোকে ইলম অর্জনের পেছনে ব্যয় করবে। ইলম বৈ অন্য কোনো কাজে ব্যয় করবে না। এজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা ও মেধা ব্যয় করতে হবে। মনে রাখবে-
العلم لا يعطيك بعضه حتى تعطيه كلك.
‘তুমি তোমার সর্বোচ্চ অংশ না দিলে ইলম তোমাকে কিছুই দান করবে না।’
চার. নিজের আর্থিক সঙ্গতির ওপরেই সন্তুষ্ট থাকবে। মনে রাখবে, অর্থকষ্ট ছাড়া ইলমের প্রশস্ততা হাসিল করা যায় না। যদি অন্তরকে যাবতীয় লোভ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত রাখা যায় তবেই দিলে হেকমতের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন,
لا يطلب أحد هذا العلم بالملك وعز النفس فيفلح ولكن من طلبه بذل النفس وضيق العيش وخدمة العلماء أفلح
‘ইজ্জত ও রাজত্ব দিয়ে ইলম হাসিল করতে গিয়ে কেউ সফল হয়নি। বরং যে নিজের নফসকে বিলিয়ে দিয়ে, সংকীর্ণ জীবিকাতে সন্তুষ্ট হয়ে এবং ওলামায়ে কেরামের খেদমত করে ইলম হাসিল করেছে একমাত্র সেই সফল হয়েছে।’
তিনি আরো বলতেন,
لا يدرك العلم إلا بالصبر على الذل
‘নফসের যিল্লতি ছাড়া ইলম হাসিল করা যায় না।’
যে ব্যক্তি পেশা ও অর্থ উপার্জনের ওপর ইলম অর্জনকে প্রাধান্য দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে এর বদলায় উত্তম ব্যবস্থা করবেন এবং তাকে কল্পনাতীত রিযিক দান করবেন।
পাঁচ. সময়কে ভাগ করে কাজে লাগাবে। হিফজের জন্য সর্বোত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষপ্রহর, গবেষণার জন্য ভোর, লেখালেখির জন্য দিনের মধ্যভাগ এবং মুতালাআ-মুজাকারার জন্য রাত। রাতের বেলায় হিফজ করা দিনের বেলায় হিফজ করার চেয়ে বেশি উপকারী এবং ক্ষুধার্তের সময় পরিতৃপ্তি সময়ের চেয়ে বেশি উপকারী। আর হিফজ করার স্থান হিসেবে মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটায় এধরনের প্রাকৃতিক ও সৌন্দর্যময় স্থান থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। যেমন, সবুজ বাগান, নদীর পাড়, রাস্তার পার্শ্ব, হইচই-চেচামেচির স্থান ইত্যাদি। কেননা এসব স্থান মানুষের কলবের স্থিতি নষ্ট করে।
ছয়. ইলমের সূক্ষ্ম বিষয় চর্চা, সহীহ সমঝ হাসিল এবং ক্লান্তি থেকে বেঁচে থাকার নিরাপদ উপায় হচ্ছে অল্প পরিমাণ হালাল খাদ্য গ্রহণ করা। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন,
ما شبعت منذ ست عشرة سنة
‘আমি ষোল বছর ধরে পেট পূর্ণ করে খানা খাইনি।’
এর কারণ হচ্ছে অধিক আহার অধিক পিপাসার কারণ। আর অধিক পিপাসা ঘুম আনয়ন করে, মেধা দুর্বল করে এবং শারীরিক প্রফুল্লতা খতম করে। এছাড়া শারীরিক রোগ-ব্যাধির ব্যাপার তো আছেই। বলা হয়-
فإن الداء أكثر ما تراه ... يكون من الطعام أو الشراب
‘অধিকাংশ রোগ যা তোমরা দেখ, তা হয়ে থাকে খাদ্য বা পানীয়ের কারণে।’
সুতরাং যে ব্যক্তি অধিক পানাহার সত্ত্বেও ইলম অর্জনে সাফল্য চায় সে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে। তাই খাবার গ্রহণে স্বল্পতা আবশ্যক। এক্ষেত্রে হাদীছের নির্দেশ অনুযায়ী আমল করলে অধিক ফল পাওয়া যাবে। হাদীছে বলা হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اَللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - { مَا مَلَأَ ابْنُ آدَمَ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ حَسْبُ ابْنَ آدَمَ لُقَيْمَاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ فَثُلُثٌ لِطَعَامِهِ وَثُلُثٌ لِشَرَابِهِ وَثُلُثٌ لِنَفَسِهِ
‘মানবসন্তানের পেট পূর্ণ করার চেয়ে অন্য কোনো পাত্র পূর্ণ করা এত নিকৃষ্ট নয়। তার জন্য তো মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য কয়েকটি লোকমাই যথেষ্ট। আর যদি তাতে না হয় তবে কেন সে পেটের একভাগ খাবার, একভাগ পানি এবং একভাগ তার নিজের জন্য বরাদ্দ করে না?’ [মুসনাদ আহমাদ: ১৭১৮৬]
হাদীছের ব্যাখ্যায় পূর্বসূরীগণ বলেন,
لَيْسَ لِلْبِطْنَةِ أَنْفَعُ مِنْ جَوْعَةٍ تَتْبَعُهَ
‘পেটের জন্য অব্যাহত ক্ষুধানিপীড়নের চেয়ে উপকারী কোনো বস্তু নেই।’
সাত. যাবতীয় কাজকর্মে তাকওয়া-পরহেজগারী অবলম্বন করবে। পানাহার, লেবাস-পোশাক সর্বত্র হালাল পন্থা অবলম্বনে কঠোর থাকবে। সকল প্রকার সন্দেহজনক বস্তু থেকে দূরে থাকবে।
আট. শরীর ও জেহেন সুস্থ রাখে এই পরিমাণ ঘুমাবে। রাতদিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার বেশি ঘুমাবে না। এটাই হচ্ছে দিনের এক তৃতীয়াংশ। আর যদি এর চেয়ে কম পারা যায় তবে সেটাই করা উচিত। আর মাঝেমধ্যে নফস, কলব, জেহেন এবং দৃষ্টিকে চাঙ্গা করার জন্য বৈধ কৌতুক করা যেতে পারে। তবে এটা করতে গিয়ে সময়, দীন ও আমলের কোনোরূপ ক্ষতি করা যাবে না। আমাদের পূর্বসূরীগণগণের অনেকে তাদের ছাত্রদেরকে বিনোদনের স্থানে জমায়েত করতেন এবং দীনের ক্ষতি হয় না- এমন বিষয় নিয়ে হাসি-কৌতুকও করতেন। তবে অবশ্যই অবৈধ হাসি-কৌতুক, ঠাট্টা-মশকরা, অট্টহাসির আশ্রয় নেওয়া যাবে না। নয়. তালেবে ইলমের অপরিহার্য দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষতিকর বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকা। বিশেষ করে যদি ভিন্ন শ্রেণীর এবং খেলাধূলায় অভ্যস্ত ও নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে গাফেল বন্ধু হয় তবে তো কথাই নেই। সুতরাং তালেবে ইলমের কর্তব্য হচ্ছে এমন ছাত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব রাখা, যে নিজেও উপকৃত হয় এবং অন্যকেও উপকৃত করে।
আলেমের প্রতি মহব্বত লাভের জন্য ইলমের প্রতি মহব্বত থাকা পূর্বশর্ত। সুতরাং মহব্বতের মাপকাঠি হওয়া দরকার ইলম। অতএব যে ব্যক্তি বন্ধু হবে তাকে অবশ্যই ইলমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং সে বন্ধুর ইলম হাসিলে ক্ষতিকর এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না।
যদি ইলমের জন্য ক্ষতিকর কোনো লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েই যায় তবে দ্রুত তা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। বিলম্ব হলে তা দূর করা অসম্ভব হয়ে যেতে পারে। তাই আবার বলি, বন্ধুত্ব করতে চাইলে এমন লোকের সঙ্গেই করতে হবে, যে নেককার, দীনদার, মুত্তাকি, অধিক কল্যাণের আধার, কম খারাপের অধিকারী, সদাচার। যদি ভুলে যায় তবে স্মরণ করিয়ে দেয়, তাকে স্মরণ করালে সহজে মেনে নেয়। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
لا تصحب أخا الجهل ... و إيَّاك وإيَّاه
فكم من جاهل أردى ... حليماً حين آخاه
‘তুমি কখনও জাহেলকে বন্ধু বানিয়ো না। অনেক জাহেল ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করায় নিকৃষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।’
কেউ কেউ বলেন,
إن أخاك الصدق من كان معك ... و من يضر نفسه لينفعك
‘তোমার প্রকৃত বন্ধু সেই, যে নিজের ক্ষতি করে হলেও তোমার উপকার করে।’
দশ. কষ্ট করা ছাড়া ইলম হাসিল করা যায় না- সর্বদা একথা মনে রাখবে। কেননা ইলম অমূল্য সম্পদ। পৃথিবীর কোনো বস্তু দিয়ে এর মূল্য পরিমাপ করা সম্ভব নয়। আর একথা চিরসত্য যে, মূল্যবান বস্তু কষ্ট স্বীকার করেই হাসিল করতে হয়। মূল্যবান বস্তু শ্রম দেওয়া ছাড়া হাসিল হওয়ার কোনো নজির নেই। একারণে আমাদের পূর্বসূরীগণ ইলম হাসিলের জন্য কষ্ট স্বীকার করাকে ইলমের সুন্নাত বলে মনে করতেন। তারা নিজেরাও কষ্ট স্বীকার করতেন এবং অন্যকেও এব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। তারা বলতেন, সুদীর্ঘকাল সম্মানিত হতে হলে সামান্য সময় কষ্ট স্বীকার ও নিজেকে বিলিয়ে দিতেই হবে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন,
يا نَفسُ ما هِيَ إِلّا صَبرُ أَيّامِ ... كَأَنَّ مُدَّتَها أَضغاثُ أَحلامِ
يا نَفسُ جوزي عَنِ الدُنيا مُبادِرَةً ... وَخَلِّ عَنها فَإِنَّ العَيشَ قُدامي
‘হে আত্মা! এ তো সামান্য সময়ের জন্য ধৈর্য ধারণ মাত্র। যেন এর সময়কাল ভ্রান্ত স্বপ্নকালের মতোই সংক্ষিপ্ত। হে আত্মা! দুনিয়া থেকে দ্রুত পৃথক হয়ে যাও। কেননা সুখ-সমৃদ্ধি তো সব সামনে।’


৫ম পর্ব:
উস্তাদ ও শায়খদের সঙ্গে তালেবে ইলমের ব্যবহার
এক. ছাত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কোন মাদরাসায় ও কোন উস্তাদের কাছ থেকে ইলম হাসিল করবে তা ইস্তেখারার মাধ্যমে নির্ধারণ করা। কোথায় তার মেধার বিকাশ ঘটবে, উস্তাদগণের স্নেহপ্রবণতায় নিজের ইলমী যোগ্যতা বিকশিত হবে, তাকওয়া-পরহেজগারী, সততা-দীনদারী অর্জন হবে, লেখাপড়ার মান নিশ্চিত হবে ইত্যাদি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। তবে বেশি ইলম হাসিল করতে গিয়ে কিংবা প্রসিদ্ধি হাসিল করতে গিয়ে দীন, আমল ও শিষ্টাচার বিসর্জন দিতে হয় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা যাবে না। আকাবিরে সলফ বলতেন,
هذا العلم دين فانظروا عمن تأخذون دينكم
‘এটা হচ্ছে দীন। সুতরাং আপনি দেখুন, কার কাছ থেকে ইলম তথা দীন হাসিল করবেন।’
আমলহীন প্রসিদ্ধ লোকদের কাছ থেকে ইলম হাসিল করার চেষ্টা করবে না। ইমাম গাযালী (রহ.) এটাকে অহংকারের মধ্যে শামিল করেছেন। কারণ মূল হচ্ছে ইলম হাসিল করা। বলা হয়-
الحكمة ضالة المؤمن يلتقطها حيث وجدها
‘প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ, যেখানে তা পায় কুড়িয়ে নেয়।’ অতএব এখানে ব্যক্তিত্বের অহংবোধ গৌণ। তাই যেখানেই বিশুদ্ধ ইলম পাওয়া যাবে সেখানেই ছুটে যাবে এবং বাঘ থেকে পলায়ন করার ন্যায় মূর্খতা থেকে পলায়ন করবে। আর বাঘ থেকে পলায়নকারী ব্যক্তি কিন্তু যে-ই তাকে মুক্তির পথ দেখায় তার কথাই মানে। তার ব্যক্তিত্বের খোঁজ-খবর করতে যায় না। আবূ নুআইম হিলয়াগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জয়নুল আবেদীন (রহ.) গোলাম যায়দ ইবন আসলামের কাছে যেতেন এবং তার মজলিসে বসে ইলম হাসিল করতেন। কেউ তাকে বললেন, আপনি সাইয়েদ বংশের লোক হয়ে এই গোলামের কাছে যাচ্ছেন! জবাবে তিনি বললেন-
العلم يُتَبع حيث كان ومن كان
‘ইলম হচ্ছে অনুসরণীয়। চাই যার কাছেই হোক এবং যেখানেই হোক।’
‘তাই মর্যাদায় নিচু হলেও তার কাছ থেকে ইলম হাসিল করাতে দোষ নেই এবং এতে মর্যাদা বাড়বে, ইলমে বরকত হবে। অবশ্য মুত্তাকী, পরহেগার ব্যক্তি হলে তার মাধ্যমে তো আরো বেশি উপকৃত হওয়া যাবে, এত কোনো সন্দেহ নেই। কিতাবের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। যে কিতাব দ্বারা সত্যিকারের ইলমী উপকারিতা হাসিল হয়, আমলের উন্নতি ঘটে তা পাঠ করতে কার্পণ্য করবে না।
তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, উস্তাদ যেন শরীয়তের ইলমের ব্যাপারে দক্ষ হন। তার ব্যাপারে সমকালীন ব্যক্তিগণ আস্থাশীল থাকেন। যে আলেম শুধু কিতাবের পেট থেকে ইলম হাসিল করেছেন তার কাছে ইলম হাসিল করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন,
من تفقه من بطون الكتب ضيع الأحكام،
‘যে ব্যক্তি কিতাবের পেট থেকে ইলম হাসিল করে সে আহকামকে ধ্বংস করে।’
অন্য এক বুযুর্গ বলেন,
من أعظم البلية مشيخة الصحيفة، أي الذين يتعلمون من الصحف
‘কিতাবী শায়খ’ হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ অর্থাৎ যারা শুধু কিতাবের পাতা থেকে ইলম অর্জন করে তারা জাতির জন্য বিপদের কারণ।’
দুই. উস্তাদকে জটিল রোগীর দক্ষ চিকিৎসক মনে করে তার যাবতীয় আদেশ ও পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। তার সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রাখবে এবং খেদমত করার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য হাসিল করার চেষ্টা করবে। আর একথার দৃঢ়বিশ্বাস রাখবে যে, উস্তাদের জন্য নিজের যিল্লতিতে প্রকৃত সম্মান, বিনয়ী হওয়াতে ফখর এবং নম্র হওয়াতে উচ্চমর্যাদা নিহিত। ইবন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের মতো এমন সম্মানী ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশের লোক হওয়া সত্ত্বেও যায়দ ইবন ছাবেতের বাহনের রেকাবি ধরতেন। কারণ তিনি তার কাছ থেকে ইলম হাসিল করেছিলেন। আর তিনি একথা বলতেন,
هكذا أمرنا إن نفعل بعلمائنا
‘আমরা আমাদের উস্তাদ ও আলেমদের সঙ্গে এরূপ ব্যবহার করতেই আদিষ্ট হয়েছি।’ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَعَلَّمُوا الْعِلْمَ، وَتَعَلَّمُوا لِلْعِلْمِ السَّكِينَةَ، وَالْوَقَارَ، وَتَوَاضَعُوا لِمَنْ تَعْلَمُونَ مِنْهُ»
‘ইলম হাসিল করো এবং ইলম হাসিল করার জন্য গাম্ভীর্য শিক্ষা করো। আর যার কাছ থেকে ইলম হাসিল কর, তার প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হও।’ [মু‘জামুল আওসাত: ৬১৮৪, যঈফ]
মনে রাখতে হবে বিনয়ী হওয়া ছাড়া এবং আনুগত্য প্রদর্শন করা ছাড়া ইলম হাসিল করা যায় না। অতএব ইলমী বিষয়ে উস্তাদের যে কোনো পরামর্শ মাথা পেতে মেনে নেবে। নিজের ‘সঠিক বুঝে’র ওপর উস্তাদের ‘ভুল বুঝ’কেই প্রাধান্য দেবে।
তিন. উস্তাদকে সর্বদা মর্যাদা ও সম্মানের চোখে দেখতে হবে। তার মর্যাদায় বিশ্বাস রাখবে। কেননা এটা নিজের উপকারিতার জন্য খুবই ফলদায়ক। জনৈক দার্শনিক বলেন,
حسن الأدب ترجمان العقل
‘শিষ্টাচার ব্যক্তির আকলের মুখপাত্র।’
উস্তাদকে সরাসরি ‘আপনি’, ‘সে’, ‘তিনি’ইত্যাদি শব্দে সম্বোধন করবে না। বরং: يا شيخنا ويا أستاذنا ‘মুহতারাম’, ‘সাইয়েদ’ ইত্যাদি পূর্ণ সম্মানজনক বাক্যে সম্বোধন করবে। ‘উস্তায এ বিষয়ে কী বলেন’, ‘এ ব্যাপারে উস্তাযের রায় কী’ এ ধরনের বাক্য ব্যবহার করবে। আর অনুপস্থিতিতে এমন কোনো শব্দ উল্লেখ করে তাকে স্মরণ করবে না, যাতে তার মর্যাদাহানী হয়। বরং সম্মান ও মর্যাদাজ্ঞাপক শব্দে স্মরণ করবে। যেমন, মুহতারাম শায়খ....বলেছেন, উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা...বলেছেন ইত্যাদি।
চার. উস্তাদের মর্যাদা ও হক রক্ষা করে চলবে। তার মর্যাদাহানী ঘটাবে না। আবূ উমামা বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
من علم عبداً آية من كتاب الله فهو مولاه
‘যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে একটি আয়াত শিক্ষা দিলো তবে তিনি তার মুনিব।’
এসব কারণে উপস্থিত-অনুপস্থিত উভয় অবস্থাতেই উস্তাদের সম্মান করবে। আর যদি একান্তই এসব করতে না পারে তবে ওই মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবে। ছাত্রদের কর্তব্য হচ্ছে, জীবদ্দশায় উস্তাদের জন্য দু‘আ করবে, তার সন্তান-সন্ততি ও নিকটাত্মীয়দের জন্য দু‘আ করবে এবং মৃত্যুর পরও তার হক রক্ষা করবে এবং কবর যিয়ারত ও ইস্তেগফার করবে। তার পক্ষ থেকে কিছু দান-সদকা করবে। উস্তাদের ইক্তেদা ও আদর্শ কখনও পরিত্যাগ করবে না।
পাঁচ. উস্তাদ কর্তৃক কোনো কঠোরতার সম্মুখীন হলে তাতে সবর করবে এবং এর ভালো ব্যাখ্যা দাঁড় করবে। এর জন্য কখনই তার মহব্বত ও বিশ্বাস ত্যাগ করবে না। এতেই ছাত্রদের অফুরন্ত কল্যাণ। এক মনীষী বলেন,
من لم يصبرعلى ذل التعليم بقي عمره في عملية الجهالة، ومن صبر عليه آل أمره إلى عز الدنيا والآخرة.
‘যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করতে গিয়ে উস্তাদের লাঞ্ছনা বরদাশত করতে পারে না, সারাজীবন তার মূর্খতার মধ্যে কেটে যায়। আর কেউ বরদাশত করলে সেটা তার দুনিয়া-আখেরাতের মর্যাদায় পরিণত হয়।’
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
ذللت طالباً فعززت مطلوباً
‘ছাত্র থাকতে লাঞ্ছনা বরদাশত করেছি। তাই উস্তাদ হয়ে মর্যাদা লাভ করতে পেরেছি।’
জনৈক মনীষী বলেন,
اصبر لدائك إن جفوت طبيبه ... و أصبر لجهلك إن جفوت معلما
‘যদি চিকিৎসকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করো তবে অসুস্থতার ওপর সন্তুষ্ট থাকো এবং যদি উস্তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করো তবে মূর্খতার ওপর ধৈর্যধারণ করো।’
ছয়. উস্তাদের কঠোরতা ও শাসনকে নিজের জন্য একথা ভেবে নেয়ামত বলে মনে করবে যে, তিনি আমার সংশোধন ও ভালোর জন্য আমার প্রতি খেয়াল রাখছেন বলেই শাসন ও কঠোরতা করছেন।
সাত. আম মজলিস ছাড়া অনুমতি ছাড়া উস্তাদের অবস্থানকক্ষে প্রবেশ করবে না। চাই তার সঙ্গে অন্য কেউ থাকুক বা না থাকুক। বার বার অনুমতি তলব করবে না। যদি জানা যায় যে, উস্তাদ তার অনুমতি তলবের বিষয়ে অবগত আছেন তবে তিনবারের বেশি অনুমতি তলব করবে না। যদি দরজায় করাঘাত করতে হয় তবে খুব মৃদভাবে, আঙুলের নখ দিয়ে আঘাত করবে। অতপর আঙুল দিয়ে করবে। শেষে হাতের তালু দিয়ে করবে। অনুমতি লাভ করার পর যদি আম মজলিস লক্ষ্য করা যায় তবে পর্যায়ক্রমে মর্যাদার দিক দিয়ে অগ্রগণ্য ব্যক্তিকে সালাম প্রদান করতে থাকবে। আর উচিত হচ্ছে উস্তাদের কাছে পরিচ্ছন্ন কাপড়-চোপড় গায়ে প্রবেশ করা। হাত-পায়ের নখ কর্তিত এবং চুল পরিপাটি থাকা। উস্তাদের কাছে কেউ থাকলে এবং তারা কথাবার্তায় লিপ্ত থাকলে সেখানে গিয়ে কথা না বলে নিশ্চুপ থাকা। আর উস্তাদ যদি একাকী থাকেন কিংবা সালাত, যিকির, লেখা বা মুতালাআয় নিমগ্ন থাকেন এবং তিনি নিজে থেকে কথা শুরু না করেন তবে সালাম দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যাবে। হ্যাঁ, তিনি অবস্থান করার ইশারা করলে অবস্থান করবে এবং অনুমতি ছাড়া সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করবে না।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও ফারেগ কলব নিয়ে উস্তাদের কাছে হাজির হবে। মানসিক উত্তেজনা, ক্ষুৎপিপাসা, রাগ-ক্রোধ, ঘুম-তন্দ্রাভাব ইত্যাদি অবস্থায় প্রবেশ করবে না। যাতে উস্তাদ থেকে উপকৃত হওয়া যায় এবং তিনি যা বলেন তা যথাযথভাবে ধরে রাখা যায়। উস্তাদের কাছে এমন কোনো সময় পড়া জিজ্ঞেস করবে না, যখন তা তার জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কিংবা যে সময় তার একান্তই অন্য কাজের জন্য নির্দিষ্ট। উস্তাদের কাছে নিজের জন্য কোনো সময় খাস করে নেবে না, যাতে অন্য কেউ শরীক না হতে পারে। কেননা এটা অবাঞ্ছিত বড়ত্ব ও উস্তাদের প্রতি মূর্খদের আচরণের শামিল।
আট. উস্তাদের সামনে ভদ্রভাবে উপবেশন করবে। সে সময় নম্রতা, বিনয় ও নিরবতা পালন করবে। উস্তাদের প্রতি তাকিয়ে থাকবে এবং কর্ণ খাড়া রাখবে। সব কথা মনোযোগের সঙ্গে শ্রবণ করবে যাতে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না হয়। এদিক ওদিক তাকাবে না এবং হাতের আস্তিন গোটাবে না, হাত-পা নিয়ে খেলা করবে না। দাড়ি-গোঁফ ও নাকে হাত দেবে না এবং নাক থেকে কিছু বের করবে না। কেননা এটা খুবই আপত্তিকর এবং ঘৃণিত স্বভাব। মুখ খোলা রাখবে না এবং দাঁত দিয়ে আওয়াজ করবে না। হাতের তালু দিয়ে মাটিতে আঘাত করবে না কিংবা হাতের আঙুল দিয়ে মাটিতে দাগ টানবে না। হাতের আঙুল হাতের মধ্যে প্রবিষ্ট করবে না। উস্তাদের সামনে দেয়াল বা অন্য কিছুর সঙ্গে হেলান দেবে না। উস্তাদের দিকে পিঠ বা পার্শ্ব দিয়ে বসবে না। প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত কথা বলবে না। এমন কোনো কথা বলবে না, যাতে হাসির উদ্রেক হয় কিংবা যাতে অশ্লীল বাক্য মেশানো থাকে অথবা অশিষ্টাচারপূর্ণ সম্বোধন থাকে। বিনা কারণে হাসাহাসি করবে না এমনকি কারণ থাকলেও উস্তাদের সামনে অমার্জিত ভঙ্গিতে হাসবে না। যদি একান্তই হাসির উদ্রেক হয় তবে শব্দ না করে মুচকি হাসি দেবে। প্রয়োজন ছাড়া গলা খাকাড়ি দেবে না। থুথু নিক্ষেপ করবে না। নাক থেকে শ্লেষ্মা বের করবে না। বরং বিনা শব্দে তা রুমাল বা কাপড়ের টুকরায় মুছে ফেলবে। আলোচনা-পর্যালোচনার সময় হাত ও পা সংযত রাখবে।
উস্তাদকে এরূপ বলবে না যে, ‘অমুকে আপনার মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।’ তার সামনে কারো গীবত করবে না এবং যদি তার দ্বারা কোনো ভুলত্রুটি হয়ে যায় তবু তার দোষ তালাশ করবে না। নিঃসন্দেহে একজন আলেম মুমিনের মর্যাদা অনেক। তাদের কেউ মারা গেলে ইসলামে এমন একটি ছিদ্র দেখা দেয়, যা কোনো কিছু দ্বারা ভরাট করা সম্ভব নয়। খতীব বাগদাদী (রহ.) ‘আল-জামে’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
وإن المؤمن العالم لأعظم أجراً من الصائم القائم الغازي في سبيل الله، وإذا مات العالم، انثلمت في الِإسلام ثلمة لا يسدها شيء إلى يو م القيامة.
‘একজন আলেম নিঃসন্দেহে প্রতিদানপ্রাপ্তির বিবেচনায় রোজাদার, নফল সালাতে রাত্রিজাগরণকারী এবং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় মুজাহিদের চেয়ে বড়। আর একজন আলেম মারা গেলে ইসলামে একটি ছিদ্র সৃষ্টি হয়, যা কেয়ামত পর্যন্ত কোনো বস্তু দ্বারা ভরাট করা সম্ভব নয়।’
উস্তাদের আসনে, বিছানায় বা জায়নামাজে বসবে না। উস্তাদ যদি বসতে বলেন তবু না বসার চেষ্টা করবে। আর যদি একান্তই আদেশ করেন এবং তা পালন না করলে তার মনোকষ্ট হয় তখন বসবে এবং পরে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
নয়. উস্তাদ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে কান পেতে তা শ্রবণ করবে এবং এমনভাবে তা শ্রবণ করবে যেন কোনোদিন তা শোনা হয়নি। এটা শ্রোতার শিষ্টাচার। আতা (রহ.) বলেন, ‘আমি অনেক সময় কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে একটি কথা শুনি। সে সম্পর্কে আমি বেশি জানি তবু এমন ভাব করি যাতে মনে হয় তিনি আমার চেয়ে বেশি জানেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক সময় যুবক-তরুণ আমার সামনে কথা বলে আর তা আমি এভাবে শ্রবণ করি যে, মনে হয় আমি কোনোদিন তা শ্রবণ করিনি। অথচ আমি তার বহু আগ থেকেই তা জানি!’
উস্তাদ যদি তার বক্তব্য শুরু করার আগে ছাত্ররা জানে কিনা- জিজ্ঞেস করেন এবং ছাত্রদের তা জানাও থাকে, তবু হ্যাঁ বলবে না। কেননা এটা উস্তাদের ইলমের প্রতি অনীহা বুঝায়। আবার না-ও বলবে না। কেননা তা মিথ্যাকথন হয়ে যায়। বরং বলবে, উস্তাযের মুখে শুনতে চাই অথবা উস্তাযের বর্ণনা আমাদের জানার চেয়ে বেশি শুদ্ধ ইত্যাদি।
দশ. উস্তাদের কথার আগে কথা বলবে না এবং তার বক্তব্যের আগে বক্তব্য শুরু করবে না। উস্তাদের আগ থেকেই উক্ত বিষয় জানার দাবি করবে না এবং উস্তাদ যে ধরনের বিষয়েই কথা বলুন না কেন, সে কথা কাটার চেষ্টা করবে না। বরং তার কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করবে। সাহাবীগণের আমল ছিল এরূপ-
إن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم كان إذا تكلم أطرق جلساؤه، كأن على رؤوسهم الطير، فإذا سكت تكلموا
‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কথা বলতেন, তখন সাহাবীগণ মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখতেন। যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসা রয়েছে। তিনি যখন নীরব হতেন সাহাবীগণ তখন কথা বলা শুরু করতেন।’
এগার. উস্তাদ কোনো কিছু প্রদান করলে ডানহাতে গ্রহণ করবে এবং তাকে দেয়ার সময়েও ডানহাত দিয়ে দেবে। উস্তাদের কোনো বস্তুর ওপর নিজের বস্তু রাখবে না। তার দিকে হাত, চোখ বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ দিয়ে ইশারা করবে না। তাকে লেখার জন্য কলম দেয়ার প্রয়োজন হলে দেয়ার আগে কলমের হেড খুলে দেবে। সামনে দোয়াত রাখলে মুখ খুলে দেবে এবং তড়িৎ লেখার উপযোগী করে পেশ করবে। তার ছুরি ইত্যাদি দিলে ধারালো অংশ আড়ালে রেখে বাড়িয়ে দেবে। আর কখনও উস্তাদের খেদমত করে ক্লান্তি বা লজ্জাবোধ করবে না। বলা হয়ে থাকে-
أربعة لا يأنف الشريف منهم وإن كان أميراً، قيامه من مجلسه لأبيه وخدمته للعالم يتعلم منه والسؤال عما لا يعلمه وخدمته للضيف.
‘চার ক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি লজ্জাবোধ করে না, যদিও তিনি বাদশা হোন না কেন। পিতার কাছে পুত্রের দণ্ডায়মান হওয়া, উস্তাদের খেদমতে তালেবে ইলমের নিয়োজিত হওয়া, না জানা বিষয় জিজ্ঞেস করা এবং মেহমানের খেদমত করা।’
বার. উস্তাদের সঙ্গে রাতে চললে সামনে সামনে এবং দিনে চললে পেছনে পেছনে চলবে। অবশ্য এর বিপরীত কোনো অবস্থা পালন করতে হলে সেটা ভিন্ন কথা। অপরিচিত জায়গায় আগে আগে চলবে। অপরিচিত লোকদের সামনে উস্তাদকে পরিচিত করিয়ে দেবে। উস্তাদ দূরে থাকলে উচ্চস্বরে ডাক দেবে না এবং পিছন থেকেও ডাকবে না। উস্তাদ কোনো বিষয়ে ভুল করে থাকলে সরাসরী সেটাকে ভুল আখ্যায়িত করবে না এবং এরূপ বলবে না যে, আপনার এই কাজটা ভুল বা এটা কোনো মতই নয়। বরং মার্জিতভাবে তাকে স্বীয় ভুল সম্পর্কে অবহিত করবে। যেমন এরূপ বলবে যে, ‘মনে হয় এরূপ করা ভালো হবে।’ কিন্তু ‘আমার মতে এরূপ করা ভালো হবে’ এরকম কথা বলবে না।


৬ষ্ঠ পর্ব: দরসের আদব
এক. প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব দিয়ে শুরু করবে। সুতরাং তা মজবুতভাবে হিফজ করবে এবং এর অর্থ ও তাফসীর আত্মস্থ করতে সচেষ্ট হবে। কেননা এটাই হচ্ছে ইলমের উৎস ও জননী। এরপর অন্যান্য শাস্ত্রের প্রয়োজনীয় বিষয়াদী সংক্ষিপ্ত আকারে মুখস্ত করবে। ফিকহ, উসুলে ফিকহ, হাদীছ, উলুমে হাদীছ, নাহব, সরফ, মানতেক ইত্যাদি শাস্ত্র মজবুতভাবে আয়ত্ব করবে। কিন্তু কুরআন বাদ দিয়ে নয়। আর কুরআন ও অন্যান্য শাস্ত্র নিয়মিত চর্চা করবে। কুরআনের তাফসীর ও ব্যাখ্যা শিখবে এবং তা ধরে রাখবে। শাস্ত্র আত্বস্ত করতে গিয়ে নিছক কিতাবের ওপর নির্ভর করবে না বরং শাস্ত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাহায্য নেবে।
দুই. দরসের সূচনাতেই মাসআলাগত মতভেদের মধ্যে পড়বে না এবং মানতেক-দর্শনশাস্ত্রও না। কেননা এগুলো জেহেনকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। বরং প্রথমে নির্দিষ্ট কোনো শাস্ত্রের একটি কিতাব পাঠ করবে। তবে সমর্থ থাকার শর্তে উস্তাদের সম্মতি ও পরামর্শ সাপেক্ষে একই পদ্ধতিতে একাধিক শাস্ত্রের একাধিক কিতাব পাঠ করা যেতে পারে। যে উস্তাদ মাজহাব ও মতভেদ উল্লেখ করে নির্দিষ্ট কোনো রায় বা সমাধান প্রদান করেন না তার দরসে শরীক হওয়া লাভের চেয়ে ক্ষতিকর। এমনিভাবে সূচনাতে নানান কিসিমের একাধিক শাস্ত্র অধ্যায়ন করাও ক্ষতিকর। এতে সময় ও জেহেন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বরং নিয়ম হলো একটি শাস্ত্র নিয়ে তা পুরোপুরি আত্বস্থ করে অন্য শাস্ত্র ধরা। ইমাম বায়হাকী (রহ.) লেখেন, ‘ইমাম শাফেয়ী (রহ.) জনৈক আদীবের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন, ছাত্রদের ইসলাহ করার আগে নিজের নফস শুদ্ধ করুন। কেননা তাদের দৃষ্টি থাকবে আপনার চোখে নিবদ্ধ। সুতরাং তাদের কাছে তাই সুন্দর, যা আপনার কাছে সুন্দর। আর তা অসুন্দর, যা আপনি পরিহার করেন। তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব শিক্ষা দিন। তবে এর জন্য জোড়াজুড়ি করবেন না। কেননা তাতে বিরক্তি সৃষ্টি হবে। আবার একেবারে ছেড়েও দেবেন না। এতে তারা কুরআন শিক্ষা ছেড়ে দেবে। শিক্ষার্থীকে কবিতার সুন্দর অংশ শিক্ষা দিন। উত্তম কথার বর্ণনা দিন। ইলম ছাড়া তাদেরকে অন্য কিছুতে নিয়ে যাবেন না। কেননা, একসঙ্গে একাধিক বিষয় শ্রবণ ভ্রষ্টতা সৃষ্টি করে।’
আর ছাত্ররা যখন পরিণত হবে তখন সব শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং তাতে পাণ্ডিত্য অর্জন করাতে দোষ নেই। কারণ এটা তার ভবিষ্যত জীবনে কাজে দেবে। নূন্যতম মূর্খতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য আসবে। তবে ইলমের মূল লক্ষ্য আমলের কথা কখনই ভোলা যাবে না!
তিন. উস্তাদের তত্ত্বাবধানে বিশুদ্ধ ইলম হাসিল করার পর তা মুখস্থ করবে। শুদ্ধ করার আগে কোনো বস্তু মুখস্থ করবে না। কেননা তাতে বিকৃতি ঘটে এবং পরে শুদ্ধতায় ফিরে আসা কঠিন হয়। আমরা আগেই বলে এসেছি, কিতাবকে উস্তাদ বানিয়ে ইলম হাসিল করা খুবই বিপদজনক ব্যাপার। একারণে কেউ কেউ দরসের মজলিসে লিখতে বারণ করে থাকেন। কেননা এতে উস্তাদের কথা বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চার. হাদীছ পাঠের ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান হতে হবে। গতানুগতিকভাবে এই দরস শেষ করবে না। কারণ হাদীছ হচ্ছে ইলমের দ্বিতীয় প্রধান বাহু। সুতরাং হাদীছের অর্থ, তাৎপর্য, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, শাব্দিক অর্থ, ইতিহাস, সনদ ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়ন করবে। বর্তমান সময়ে প্রচলিত হাদীছের দরস ব্যবস্থার ওপর আত্মতুষ্টি প্রকাশ করবে না, বরং উচ্চতর গবেষণায় লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা করবে।
পাঁচ. ছাত্রকে ইলম অন্বেষণের ব্যাপারে উচ্চ হিম্মতের অধিকারী হতে হবে। সুতরাং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সামান্য ইলমে সন্তুষ্ট থাকা এবং ইরছে নববীর সামান্য অংশ পেয়েই পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা যাবে না। ইলমী ফায়েদা হাসিল হওয়ার সুযোগ আসলে সেটা হাতছাড়া করা যাবে না। ভবিষ্যতে শেখা যাবে- এরূপ ধারণায় ইলমী ফায়েদা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অবকাশ নেই। কেননা বিলম্ব আর গাফলতিতে বঞ্ছনা ছাড়া কিছু নয়। কেননা আজ একটা শিখলে ভবিষ্যতে আরেকটা শেখা যাবে। কিন্তু আজ না শিখলে তখন কোনটা শিখবে, আজকের ফেলা যাওয়াটা না সেই সময়েরটা? অবসর এবং মুক্ত সময়ের গুরুত্ব দেবে এবং কাজে লাগাবে। সুস্থতা, তারুণ্য, মানসিক প্রফুল্লতা এবং কম ব্যস্ততার সময়ের মূল্যায়ন করবে। মুখস্থ বিষয়গুলো ধরে রাখার চেষ্টা করবে এবং সামনে আরো বেশি নতুন বিষয় শেখার চেষ্টা করবে। মনে রাখবে, কাঁধে দায়িত্ব চেপে বসলে তখন আর ইলম চর্চার সুযোগ পাবে না। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন,
تَفَقَّهُوا قَبْلَ أَنْ تُسَوَّدُو ا
‘দায়িত্ব ও নেতৃত্ব লাভের আগেই ইলম হাসিল করে নাও।’
কেননা একবার নেতৃত্ব কাঁধে আসলে পুনরায় ইলমের মজলিসে বসার সুযোগ নাও হতে পারে। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন রবিআর মজলিসে বসতেন এবং রাজদায়িত্ব গ্রহণ করতেন পরে আর ইলমের মজলিসে ফিরে আসার সুযোগ হতো না। ইমাম ইয়াহইয়া ইবন মাঈন (রহ.) বলেন,
من عاجل الرئاسة فاته علم كثير.
‘যে ব্যক্তি একবার ক্ষমতার মসনদে বসে সে অনেক ইলম থেকে বঞ্চিত হয়।’
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন,
تفقه قبل إن ترأس، فإذا ترأست فلا سبيل إلى الفقه
‘নেতা হওয়ার আগে ফিকহ অর্জন করো। কেননা নেতা হওয়ার পর ফিকহ হাসিলের পথ পাবে না।’
আর নিজের চোখে নিজেকে পূর্ণ ভাবার এবং উস্তাদের প্রয়োজনীয়তা শেষ মনে করার ব্যধি থেকে হেফাজতে থাকবে। কেননা এটা স্পষ্ট মূর্খতা। কারণ যে কোনো মানুষের জানার চেয়ে না জানার পরিমাণ বেশি। সাঈদ ইবন জুবায়র (রহ.) বলেন,
لا يزال الرجل عالماً ما تعلم
‘মানুষ ততদিনই আলেম থাকে যতদিন সে শেখে।’
যখন সব শাস্ত্রে পূর্ণ দক্ষতা এবং অধ্যয়নের যোগ্যতা পয়দা হবে তখন লেখালেখি শুরু করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আকাবিরের অনসৃত পথ ধরে চলতে হবে।
ছয়. উস্তাদের দরসে নিয়মিত হাজির থাকবে। কেননা তা কেবল কল্যাণ ও ইলম, আদব ও মর্যাদাই বৃদ্ধি করবে। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
ولا تشبع من طول صحبته، فإنما هو كالنخلة ينتظر متى يسقط عليك منها شيء
‘উস্তাদের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় থাকায় পরিতৃপ্ত হয়ো না। কেননা তিনি একটি খেজুর গাছের মতো, যা থেকে তোমার ওপর সর্বদা কিছু পড়ার আশা করা যায়।’
দরসে উস্তাদ হাজির হওয়ার আগেই নিজেরা হাজির হবে এবং উস্তাদ হাজির হওয়ার পর কোনোভাবেই অনুপস্থিত থাকা যাবে না। জনৈক বুযুর্গ বলেন,
من الأدب مع المدرس إن ينتظره الفقهاء ولا ينتظرهم
‘উস্তাদের প্রতি আদব হচ্ছে তার অপেক্ষায় থাকা, তাকে অপেক্ষায় রাখা নয়।’
আরো আদব হচ্ছে দরসে তন্দ্রা-নিদ্রা, কথাবার্তা, হাসি-তামাশা থেকে বিরত থাকা। উস্তাদ যে বিষয়ে আলোচনা করছেন সে বিষয়ের বাইরে কথা না বলা। তার খেদমতের জন্য সদা তৎপর থাকা। কেননা এটা তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব আনয়নকারী। দরস শেষে জেহেন বিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই পঠিত বিষয়গুলো পুনরায় মুজাকারা করে নেওয়া এবং পরেও মুজাকারা করা। আর মুজাকারার সর্বোত্তম সময় হচ্ছে রাত্রি। আমাদের পূর্বসূরীগণ রাতে মুজাকারা করতেন এবং কখনও কখনও ফজরের আযান শুনে মুজাকারা ছাড়তেন! কোনো ছাত্র যদি মুজাকারার সঙ্গী না পায় তবে নিজে নিজেই মুজাকারা করবে। অন্তরে ওই শব্দের অর্থ বারবার বসাবে। কেননা বারবার অন্তরে অর্থ স্থান দেওয়া জবানে বারবার তাকরার করার মতোই। ওই ব্যক্তি কমই সফল হয়েছে, যে উস্তাদের দরসে শোনা বিষয় পরে আর মুজাকারা করেনি।
সাত. দরসের মজলিস কায়েম হওয়ার পর সকলকে সালাম প্রদান করবে এবং উস্তাদের প্রতি বিশেষ সম্মান ও তাজিম প্রকাশ করবে। উস্তাদের কাছে পৌঁছার জন্য অন্যদের ডিঙিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। বরং যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসে যাবে। হাদীছে এভাবেই আমল করতে বলা হয়েছে। অবশ্য উস্তাদ যদি আদেশ করেন কিংবা তার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থাকে অথবা অন্যরা তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামনে যেতে বলে তবে সেটা ভিন্ন কথা। আর উস্তাদের কাছাকাছি বসার ব্যাপারে অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেবে না। হ্যাঁ, মর্যাদা, সম্মান, বয়স, বুযুর্গী ইত্যাদি কারণ থাকলে সেটা করতে পারে। ছাত্র অধিক হলে উচিত হচ্ছে সবাই উস্তাদ বরাবর সামনে বসা। যাতে উস্তাদের দৃষ্টি সবার দিকে নিবদ্ধ করা সহজ হয়।
আট. উস্তাদের মজলিসে উপস্থিত অন্যদেরকে সম্মান করবে। কেননা এটাও উস্তাদকে সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত। মজলিসের দুইজনের মাঝখানে অনুমতি ছাড়া বসবে না। অনুমতি দিয়ে জায়গা খালি করে দিলে জমে বসে যাবে। আর নিজেও অন্যকে সুযোগ করে দেয়ার চেষ্টা করবে।
মজলিসে উপস্থিত লোকদের আরো কর্তব্য হচ্ছে, আগত ব্যক্তিকে মারহাবা বলা এবং তার জন্য জায়গার ব্যবস্থা করা। দরসের মধ্যে কোনো কথা বলার ইচ্ছা জাগলেও নীরবতার লাগাম দ্বারা তা থামিয়ে রাখা। দরসে কোনো ছাত্র খারাপ ব্যবহার করলে তাকে উস্তাদ বৈ নিজে শাসন না করা।
নয়. যা বুঝে আসেনি সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ না করা। তবে বুঝার জন্য মার্জিত ও ভদ্রভাষায় জিজ্ঞেস করা। বলা হয়ে থাকে-
من رقّ وجهه عند السؤال، ظهر نقصه عند اجتماع الرجال.
‘যে ব্যক্তি কিছু জানার সময় চেহারা সংকুচিত করে জনসমাগমে তার নিচুতা ধরা পড়ে।’
দরসে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রশ্ন করবে না এবং উস্তাদ জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকলে পীড়াপীড়ি করবে না। আর উস্তাদ ভুল জবাব দিলে তখন তা প্রকাশ করবে না। বরং পরে সুযোগমতো একাকী বলবে। ছাত্রদের জন্য যেমন সওয়াল করা দোষের নয়, তেমনিভাবে উস্তাদ জিজ্ঞেস করলে ‘বুঝিনি’ বলাও দোষের নয়। কেননা এতে বর্তমান-ভবিষ্যত উভয় রকমের উপকারিতা রয়েছে। নগদ উপকারিতা হচ্ছে মাসআলা হল হওয়া এবং উস্তাদের আস্থা অর্জন করা। আর ভবিষ্যতের উপকারিতা হচ্ছে মিথ্যা ও কপটতা থেকে হেফাজত থাকা।
দশ. নিজের হকের রেয়ায়াত করবে এবং হকদারের অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ তাতে অগ্রসর হবে না। অবশ্য খতীব বাগদাদী বলেন, অগ্রাধিকার প্রাপকের জন্য অপরিচিতকে সুযোগ দেওয়া মুস্তাহাব। আর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত পেশাব-পায়খানা, অজু ইত্যাদি জরুরতের কারণে বাইরে গেলে এতে তার হক রহিত হবে না।
এগার. কিতাবাদী নিয়ে উস্তাদের সামনে তাজিমের সঙ্গে বসবে এবং তার অনুমতি পাওয়ার পর পাঠ করতে শুরু করবে। পাঠ বা অন্য সময় কিতাবকে অশোভনীয় ও এলোমেলোভাবে কিংবা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখবে না।
বার. যখন নিজের পড়ার পালা আসবে তখন উস্তাদের অনুমতিক্রমে পাঠ করা শুরু করবে এবং প্রথমে আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আল্লাহর প্রশংসা, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করবে। অতপর উস্তাদ, তার মাশায়েখ এবং পিতামাতা, নিজের এবং সকল মুসলিমের জন্য দু‘আ করবে। প্রত্যেক দরস, মুতালাআ. তাকরার এবং মুজাকারার সময় এরূপ আমল করবে। উস্তাদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি উভয় অবস্থায় দু‘আ করবে এবং উস্তাদের জন্য দু‘আয় বলবে-
ورضي الله عنكم وعن شيخنا وإمامنا
‘আল্লাহ আপনাদের ওপর, আমাদের শায়খ ও গুরুর ওপর সন্তুষ্ট হোন।’ ছাত্র যেমন উস্তাদের জন্য দু‘আ করবে উস্তাদও তেমনিভাবে ছাত্রের জন্য দু‘আ করবে। আর ছাত্র যদি উল্লিখিত নিয়মে পাঠ শুরু করতে ভুলে যায় তবে উস্তাদ সুন্দরভাবে তা বুঝিয়ে দেবেন। কেননা এটাই নিয়ম।
তেরো. দরসের অন্য ছাত্রদেরকে উৎসাহিত করবে। তাদের পেরেশানি ও হতাশা-নিরাশা দূর করার চেষ্টা করবে। তার যে ফায়েদা হাসিল হয়েছে অন্যদেরকেও তাতে শরিক করবে। দীনের ব্যাপারে তাদেরকে নসিহত করবে। এর দ্বারা তাদের ক্বলব আলোকিত হবে, আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু কখনই নিজের ইলমের জন্য ফখর কিংবা অন্যকে ছোট ভাববে না। বরং এরজন্য সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে শোকরিয়া জানাবে।


সপ্তম পর্ব:
ইলমের মাধ্যম কিতাবাদীর সঙ্গে আচরণ
এক. ছাত্রদের উচিত হচ্ছে ইলম হাসিলের মাধ্যম জরুরীকিতাবগুলো ক্রয় করে পাঠ করা। তবে শুধু কিতাব সংগ্রহ করাকে ‘ইলম হাসিল হয়ে গেল’ বলে মনে করবে না। জনৈক বুযুর্গ বলেন,
إذا لم تكن حافظاً واعياً، فجمعك للكتب لا ينفع
‘তুমি যদি নিজে সংরক্ষণকারীই না হও, তবে সংগ্রহকৃত কিতাব তোমার উপকারে আসবে না।’
কিতাব কেনা সম্ভব হলে দরসের আলোচ্য বিষয় লিখে নেয়ার দরকার নেই। অপরাগতা ছাড়া সর্বদা এই লিখে নেয়ার চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকা কাম্য নয়। ক্রয় বা ইজারা নেয়ার সুযোগ থাকা অবস্থায় কিতাব ধার নেয়ার চেষ্টা করবে না। কিতাব লিখতে হস্তাক্ষর সুন্দর করার চেষ্টা করবে বটে, তবে সুন্দর হস্তাক্ষরের চেয়ে বিশুদ্ধ করার প্রতি নজর বেশি দেবে।
দুই. ক্ষতি করার আশঙ্কা না থাকলে কাউকে কিতাব ধার দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। কেননা কিতাব ধার দেয়াও ইলমের সহযোগিতা করার শামিল। অথচ সাধারণ বস্তু ধার দেয়াতেই অনেক ফযীলত রয়েছে। জনৈক ব্যক্তি বিখ্যাত মনীষী আবূল আতাহিয়াকে বললেন, ‘আমাকে আপনার কিতাব ধার দিন। জবাবে তিনি বললেন, আমি কিতাব ধার দেওয়া অপছন্দ করি। তখন ওই লোকটি বললেন, আপনি কি জানেন না যে, সম্পর্ক বজায় থাকে অপ্রিয়তার মধ্য দিয়েই? তার কথা শুনে তিনি তাকে কিতাব ধার দিলেন।’
আর ধারগ্রহীতার উচিত হচ্ছে ধারদাতার শোকরিয়া আদায় ও কিতাবের হেফাজত করা। প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় নিজের কাছে ওই কিতাব না রাখা। ধার নেওয়া কিতাবে কোনো কিছু না লেখা। মালিকের অনুমতি ছাড়া তাতে কোনো কিছু সংযোজন না করা এবং তা তৃতীয় কাউকে না দেয়া। তবে কিতাব যদি অনির্দিষ্টভাবে ওয়াকফের হয় তবে সতর্কতার সঙ্গে তাতে কিছু যোগ করা বা যোগ্যতার শর্তে তাতে ভুল থাকলে সংশোধন করার অবকাশ আছে। জনৈক ব্যক্তি বুঝি কিতাব ধার দিয়ে ভোগান্তিতে পড়েই নিম্নোক্ত কবিতাটি বলেছিলেন!
أيها المستعير مني كتاباً ... ارض لي فيه ما لنفسك ترضى
‘হে আমার কিতাবগ্রহীতা! এতে আমার ব্যাপারে তাই পছন্দ করো যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করো!
তিন. পাঠ বা লেখার সময় কিতাব ভূমিতে ছড়িয়ে রাখবে না। বরং বেঞ্চ বা কিতাব রাখার সাধারণ স্থানে রাখবে। যাতে কিতাব হেফাজতে থাকে এবং মলাট দ্রুত খুলে না যায়। ভূমি থেকে উঁচু ও শুষ্কস্থানে কিতাব রাখবে, যাতে তা ভিজে না যায়। তাকের ওপর কিতাব রাখার সময় মর্যাদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে রাখবে। অতএব কুরআন মাজীদ হলে তা সবার ওপরে রাখবে। আর উচিত হচ্ছে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন তাকে কুরআন মাজীদ রাখা। অতপর ধারাবাহিকভাবে নিরেট হাদীছ, তাফসীর, উসুলে দীন, উসুলে ফিকহ, ফিকহ, নাহব, সরফ, আরবী শের ইত্যাদি কিতাব রাখা। যদি দুটি কিতাব শাস্ত্রীয় মর্যাদায় সমান হয় তবে যাতে কুরআনের আয়াত বা হাদীছ বেশি সেটা ওপরে রাখা। যদি তাতেও সমান হয় তবে মুসান্নিফের মর্যাদা অনুসারে ওপরে-নিচে রাখা। যদি এতেও দুইজন সমান সমান হন তবে সংকলনে যিনি অগ্রগামী এবং মানুষের হাতে যার কিতাব বেশি সেটা ওপরে রাখা। কিতাবের নাম শেষ পৃষ্ঠায় নিচে লিখবে, যাতে অনেকগুলোর মধ্যে থেকে তা বের করা সহজ হয়। সাবধান! কিতাবকে কখনও পাখার কাজে ব্যবহার করবে না, এর সঙ্গে হেলান দেবে না এবং এর দ্বারা মশা, মাছি মারবে না বা তাড়াবে না কিংবা এর ওপর মশা বসলে সেখানেই মশা মেরে ফেলবে না।
চার. কারো কাছ থেকে কিতাব ধার নিলে যথাযথ অবস্থায় ফেরত দেবে। ভাজ করা, দাগ কাটা, অপ্রাসাঙ্গিক কিছু লেখা ইত্যাদি কাজ থেকে বিরত থাকবে।
পাঁচ. শরঈ ইলমের কোনো কিতাব লিখলে শরীর, কাপড় ও মনের পবিত্রতা নিয়ে কিবলামুখী হয়ে বসবে। যে কোনো কিতাব - بسم الله الرحمن الرحيم দ্বারা শুরু করবে। কিতাবের ভূমিকা হলে এর সঙ্গে আল্লাহ তা‘আলার হামদ এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদও যুক্ত করবে। এরপর কিতাবের মূল বিষয় লিখবে। লিখনীর মধ্যে যতবার আল্লাহ তা‘আলার নাম আসবে ততবার তাজিমসূচক কোনো শব্দ যুক্ত করবে। যেমন, তা‘আলা, সুবহানাহু, আয্যা ওয়া জাল্লা, তাকাদ্দাসা ইত্যাদি। আর যতবার রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম আসবে ততবার সালাত ও সালাম পাঠ করবে।
বুযুর্গানে কেরাম সালাত ও সালাম উভয়টি পাঠ করতেন এবং এর সঙ্গে তাঁর পরিবার-পরিজনকেও শামিল করে এভাবে বলতেন,
صلى الله عليه وعلى آله وسلم
যদি বারবারও লেখার প্রয়োজন পড়ে তবু দরূদের কোনো বাক্য সংক্ষিপ্ত করবে না। যেমন, (সা.), (দ.) (আ.) কিংবা আরবীতে লিখলে, صلع، أو صلم، أو صلم،
এসব সংকীর্ণতা ও কৃপণতা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান সত্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সাহাবায়ে কেরামের নাম আসলে রাদিয়াল্লাহ তা‘আলা আনহু, পুণ্যবান পুর্বসুরী ও নেককার ব্যক্তিত্বগণের নাম আসলে রাহিমাহুল্লাহ তা‘আলা লিখবে।
ছয়. অতি সূক্ষ্ম এবং অস্পষ্ট হস্তাক্ষরে কোনো কিছু লিখবে না। বুযুর্গানে কেরাম বলেন, তুমি সেটাই লিখ, প্রয়োজনের সময় যা তোমার কাজে দেয়। তা লিখ না, প্রয়োজনের সময় যা তোমাকে কাজে দেয় না। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শেষ বয়স ও বার্ধক্যকাল। অনেকে নানা কারণে সংক্ষেপ ও ক্ষুদ্রাক্ষরে লেখে। কিন্তু মনে রাখা উচিত, বার্ধক্যের সময় ক্ষুদ্রলেখা পাঠ করতে সমস্যা হবে।
সাত. নিজের লেখা বা কিতাবের কোনো বিষয় উস্তাদ বা অন্য কোনো কিতাবের সাহায্যে সহীহ-শুদ্ধ করে নেয়ার সময় হরকত দিয়ে আলামতযুক্ত করে রাখবে। ভুলের স্থানও চিহ্নিত করে রাখবে। শুদ্ধ ও সংস্কার করে নেয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করার রীতি আছে সেগুলো ব্যবহার করবে।
আট. লেখার শিরোনাম, উপশিরোনাম, অধ্যায়, পর্ব, ভূমিকা, উপসংহার ইত্যাদি লাল বা মোটা হরফে লেখাতে দোষ নেই। কেননা এভাবে পাঠোদ্ধার সহজ হয়। এমনিভাবে মাযহাব, ইমামের নাম, তাদের বক্তব্য, অভিধান, সংখ্যা ইত্যাদি ভিন্ন কালিতে লেখা যেতে পারে। কিতাবে কোনো বিষয় নতুন যুক্ত করলে কিংবা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করলে শুরুতে পাঠককে সে ব্যাপারে অভিহিত করবে। যাতে প্রকৃত মর্ম উদ্ধার করা সহজ হয়।
নয়. কোনো কিছু মুছে ফেলার দরকার হলে লেখার ওপরে দাগ টেনে দেবে। খুটিয়ে ওঠানোর চেষ্টা করবে না। বলা হয়ে থাকে- الضرب أولى من الحك
লেখাপড়া, আমল-আখলাক, চাল-চলন, কাজকর্ম সবকিছুতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আহলে বায়ত, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, ফকীহ, মুহাদ্দিসীন, মুসান্নিফ, মুআল্লিফ, রাহবার, শায়খ-উস্তাদ প্রত্যেককে তার প্রাপ্য সম্মান প্রদান করবে। তাদের আন্তরিক দোয়াকে নিজের জীবনের সফলতা লাভের সিঁড়ি বলে মনে করবে।
শিশুদের প্রতি অবশ্যই সহমর্মী ও কোমল হতে হবে
মানুষের স্বভাব কোমলতাপ্রিয়। শিশু ও কিশোর বয়সে স্বভাব তো আরো বেশি কোমল থাকে। এই সময় শিশু ও কিশোররা প্রতিটি বস্তু কোমলভাবে পেতে চায়। আর এটাই বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতা দিয়েই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের স্বভাব গড়েছেন। তাই উস্তাদগণকে সর্বদা এই ফিতরী স্বভাবের প্রতি খেয়াল করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলাও তো বান্দার ওপর কঠিন কোনো কাজ চাপিয়ে দেননি। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ ﴾ [البقرة: ٢٨٦]
‘আল্লাহ বান্দার জন্য দুঃসাধ্য কোনো কিছু আরোপ করেন নি।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬}
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
﴿ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ ﴾ [البقرة: ١٨٥]
‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠোরতা চান না।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫}
সুতরাং শিশু-কিশোরদের প্রতি কঠোরতা করা বাঞ্ছনীয় নয়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুর প্রতি সীমাহীন করুণাকামী ও কোমল ছিলেন। তিনি ইরশাদ করেন-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَلَمْ يَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا »
‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের অধিকার সম্পর্কে জানে না, সে আমাদের দলের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ [মু‘জামুল কাবীর: ৮১৫৪]
সুতরাং শিশুদের মনে ক্লান্তি সৃষ্টি করে এধরনের কিছু চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তাদেরকে স্নেহশীলতার মাধ্যমে শিক্ষা দেয়ার বিষয়টি সর্বদা মাথায় রাখা চাই।



পরিশিষ্ট: বিবিধ প্রসঙ্গ
আলেমগণের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সামর্থ থাকার প্রয়োজনীয়তা
আলেমগণ হালাল-হারাম সম্পর্কে সম্যক অবগত। তাই হালাল-হারাম মেনে চলার দায়িত্বও তাদের বেশি। হালাল-হারামের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় জীবিকার ক্ষেত্রে। তাই জীবিকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হালালপন্থা অবলম্বন করা এবং হারাম ও সন্দেহজনকপন্থা থেকে দূরে রাখা পবিত্র দায়িত্ব। কোনো কোনো হাদীছে হালাল উপার্জনকে অন্যতম ফরয বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য হাদীছে ব্যবসা এবং হাতের কামাইকে সর্বোত্তম উপার্জন আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন-
أفضلُ الكَسْبِ بَيْعٌ مَبْرُورٌ وَعَمَلُ الرَّجُلِ بِيَدِهِ
‘মানুষের সর্বোত্তম উপার্জন হলো বৈধ ব্যবসা এবং হাতের কাজের উপার্জন।’ [ছহীহুল জামে‘: ১১২৬, সহীহ]
শেষ জমানায় হারামের ছড়াছড়ি এবং হালাল উপার্জনের ঘাটতি দেখা দেবে বলে হাদীছে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং গোটা উম্মতের এই ক্রান্তিলগ্নে অন্তত আলেমকে যে কোনো মূল্যে হারাম থেকে বাঁচা এবং হালালপন্থা আকড়ে ধরে রাখা একান্ত কর্তব্য। শেষ জমানায় দীন সাপের গুহায় প্রবেশের ন্যায় মদীনার দিকে বিদায় নিতে থাকবে। ওই দুর্যোগের সময়েও আলেমগণ সহীহ দীন ধরে রাখবেন এটাই একান্ত কাম্য। আর এই প্রচেষ্টা নবীদেরই পবিত্র আখলাকের অন্যতম অংশ। যেমন, হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
أُمِرَتِ الرُّسُلُ أنْ لا تَأْكُلَ إلاَّ طَيِّباً ولا تَعْمَلَ إلاَّ صالِحاً
‘রাসূলগণকে একমাত্র হালাল ভক্ষণ এবং একমাত্র নেক কাজের আদেশ করা হয়েছে।’ [ছহীহুল জামে‘: ১৩৬৭, হাসান]
আল্লাহ তা‘আলা অলস লোক পছন্দ করেন না। বস্তুত হালাল উপার্জনে সাধারণ পেশা অবলম্বন করা আদৌ দোষের বিষয় নয়। স্বয়ং নবী-রাসূলগণও সাধারণ পেশা অবলম্বন করতে লজ্জাবোধ করতেন না। আল্লাহর নবী মূসা (আ.) কায়িক শ্রম করেছেন। আমাদের নবী ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামও শারীরিক পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন।
আর বিশেষ করে আলেমদের জন্য হালাল রুজির স্বল্পতায় বিচলিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি তার নির্দিষ্ট রিজিক পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না।
অবৈধ বা সন্দেহজনকপন্থা পরিহার করে হালাল রুজির পন্থা অবলম্বন করাই একজন আলেমের বড় শান। হাদীছে এ ধরনের সাহসী লোকদের প্রশংসা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
التَّاجِرُ الجَبانُ مَحْرُومٌ والتَّاجِرُ الجَسُورُ مَرْزُوقٌ
‘ভীরু ব্যবসায়ী বঞ্চিত এবং সাহসী ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয়।’ [জামে ছগীর: ৩৩৯৫, হাসান]
দীনী খেদমতের পাশাপাশি যদি বৈধ কোনো ব্যবসার সুযোগ এসে যায়, তবে তা হাতছাড়া করা ঠিক নয়। অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাও অপছন্দ করেন। অন্যের কাছে হাত পাতার চেয়ে নিজে যে কোনো হালাল পন্থায় উপার্জন করা উচিত। হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: «الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى، وَالْيَدُ الْعُلْيَا الْمُنْفِقَةُ، وَالسُّفْلَى السَّائِلَةُ»
‘ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উচু হাত নিচু হাত থেকে উত্তম। খরচকারী হাত হলো উচু হাত আর নিচু হাত হলো প্রার্থনাকারী হাত।’ [মুসলিম: ১০৩৩]
সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) বলেন,
المال سلاح المؤمن في هذا الزمان
‘এই যুগে মুমিনের সম্পদ আত্মরক্ষাকারী অস্ত্রের মতো অপরিহার্য।’
পুত্রকে খালেদ ইবন সাফওয়ানের উপদেশ-
يا بني أوصيك باثنتين لن تزال بخير ما تمسكت بهما درهمك لمعاشك ودينك لمعادك
‘হে বৎস! আমি তোমাকে দুটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। যতক্ষণ পর্যন্ত তা ধারণ ও লালন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে। যথা, দিরহাম রাখবে দুনিয়ার জন্য আর দীনকে রাখবে আখেরাতের জন্য।’
বিদ্বানগণ বলেন,
لا خير فيمن لا يجمع المال يصونُ به عرضَه، ويحمي به مروءتَه ويصل به رحِمَه
‘ওই ব্যক্তির মধ্যে কল্যাণ নেই, যে নিজের সম্ভ্রম ও আভিজাত্য রক্ষা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখার জন্য মাল-সম্পদ সঞ্চয় করে না।’
সর্বোপরি শক্তিশালী মুমিনকে হাদীছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে শ্রেয় বলে অভিহিত করা হয়েছে। সহীহ হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلا تَعْجَزْ
‘শক্তিশালী মুমিন উত্তম ও আল্লাহর কাছে প্রিয়, দুর্বল মুমিনের চেয়ে। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ এবং যা তোমার জন্য কল্যাণকর তা হাসিল করো, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ হয়ো না।’ [মুসলিম: ২৬৬৪]


ছাত্রদের পরীক্ষার সময় করণীয়
পরীক্ষা ছাত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। সারাবছরের শ্রম ও মেহনতের ফসল তোলা হয় পরীক্ষার বোঝা বহন করে। তাই পরীক্ষা ছাত্রজীবনের যেমন গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ তেমনিভাবে সফলতা লাভেরও দ্বার। এজন্যই বলা হয়-
عند الامتحان يكرم الرجل أو يهان
‘পরীক্ষার সময় কেউ সম্মানীত এবং কেউ লাঞ্ছিত হয়।’
তবে পরীক্ষায় সাফল্য লাভের জন্য বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে। সেগুলো অবলম্বন করলে আশা করা যায় আশাতীত সাফল্য লাভ করা যাবে। নিম্নে সেসব বিষয় তুলে ধরা হলো।
পরীক্ষায় সাফল্য লাভে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে-পরে অব্যাহতভাবে দু‘আ করা এবং আল্লাহ তা‘আলার দিকে মনোনিবেশ। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছু হয় না। তাই পরীক্ষার সাফল্য লাভে তারই দিকে মনোনিবেশ করা। আর দু‘আ যে কোনো শরঈ শব্দ দ্বারা হতে পারে। যেমন-
﴿ رَبِّ ٱشۡرَحۡ لِي صَدۡرِي ٢٥ وَيَسِّرۡ لِيٓ أَمۡرِي ٢٦ وَٱحۡلُلۡ عُقۡدَةٗ مِّن لِّسَانِي ٢٧ يَفۡقَهُواْ قَوۡلِي ٢٨ ﴾ [طه: ٢٥، ٢٨]
‘হে আমার রব, আমার বুক প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আর আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন।যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’ {সূরা ত-হা, আয়াত: ২৫-২৮}
পরীক্ষার দিনের করণীয় হচ্ছে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা এবং নির্দিষ্ট সময় পরীক্ষার হলে যাওয়া। হলে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় যাবতীয় বস্তু সঙ্গে রাখবে। যেমন, কলম, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্স, ঘড়ি এবং প্রয়োজনীয় ও পরীক্ষা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য আসবাবপত্র। কেননা উত্তম প্রস্তুতি উত্তম জবাব প্রদানে সহায়ক। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বের হওয়ার দু‘আর কথা তো বলাই বাহুল্য। যথা-
عن أنس رضي الله عنه، قَالَ: قَالَ رَسُول الله ﷺ: «مَنْ قَالَ - يَعْني: إِذَا خَرَجَ مِنْ بَيتِهِ -: بِسمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ، وَلا حَولَ وَلا قُوَّةَ إلاَّ باللهِ، يُقالُ لَهُ: هُدِيتَ وَكُفِيتَ وَوُقِيتَ، وَتَنَحَّى عَنْهُ الشَّيطَانُ»رواه أبو داود والترمذي والنسائي وغيرهم . وَقالَ الترمذي: «حديث حسن»، زاد أبو داود: «فَيَقُولُ - يَعنِي: اَلشَّيْطَانُ لِشَيْطَانٍ آخَر: كَيفَ لَكَ بِرجلٍ قَدْ هُدِيَ وَكُفِيَ وَوُقِيَ ؟»
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি নিজ গৃহ থেকে বের হওয়ার সময় বলে, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, অলা হাওলা অলা ক্বুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। (অর্থাৎ আল্লাহর উপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ থেকে ফিরা এবং পুণ্য করা সম্ভব নয়।) তাকে বলা হয়, তোমাকে সঠিক পথ দেওয়া হল, তোমাকে যথেষ্টতা দান করা হল এবং তোমাকে বাঁচিয়ে নেওয়া হল। আর শয়তান তার নিকট থেকে দূরে সরে যায়। [আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ প্রমুখ]
তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। আবু দাউদ এই শব্দগুলি বাড়তি বর্ণনা করেছেন, ফলে শয়তান অন্য শয়তানকে বলে যে, ওই ব্যক্তির ওপর তোমার কিরূপে কর্তৃত্ব চলবে, যাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করা হয়েছে, যাকে যথেষ্টতা দান করা হয়েছে এবং যাকে (সকল অমঙ্গল) থেকে বাঁচানো হয়েছে? [তিরমিযী: ৩৪২৬; আবূ দাউদ: ৫০৯৫]
পরীক্ষা শুরু করার আগে অবশ্যই বিসমিল্লাহ বলবে। কেননা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে বিসমিল্লাহ বলা জরুরীএবং তা বরকত লাভের মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য পাওয়ার উপায় এবং তাওফীক প্রাপ্তির মহা নিয়ামক।
পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে এবং পরীক্ষার পড়াশোনার সময় সাথী-সঙ্গীর ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করবে। তাদেরকে আশান্বিত করবে এবং তাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত ও হতাশাগ্রস্থ করবে না। বরং তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে। পরীক্ষায় সাফল্য লাভের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করবে ও বিভিন্নভাবে শুভ লক্ষণ বুঝাবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন সময়ে অনুপ্রাণিত করতেন এবং শুভ লক্ষণ দিতেন। যেমন, সুহাইল নামের শুভ লক্ষণ নিতেন ‘সব কাজ সহজ হয়ে যাওয়া বলে।’ আর তিনি ঘর হতে বের হওয়ার সময়-
يا راشد يا نجيح
‘হে রাশেদ, হে সফলকাম।’ এ ধরনের বাক্য শুনতে পছন্দ করতেন। কেননা রাশেদ শব্দের অর্থ হচ্ছে পথপ্রাপ্ত আর নাজিহ শব্দের অর্থ মুক্তিপ্রাপ্ত।
অতএব, ছাত্ররা নিজে এবং অন্যদের জন্য শুভলক্ষণ নেবে এবং সঙ্গীদেরকে বলবে, ‘অবশ্যই তুমি পরীক্ষায় সফল ও কামিয়াব হবে।’
আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ পেরেশানি দূর করার অব্যর্থ ওষুধ। সুতরাং যখনই কোনো পেরেশানিতে পড়বে কিংবা কোনো প্রশ্নের জবাবের ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়বে তখনই দুয়েকবার আল্লাহ তা‘আলার নাম স্মরণ করবে এবং তাঁর কাছে দু‘আ করবে, যাতে তিনি উপস্থিত সমস্যার সমাধান করে দেন।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (রহ.) কোনো বিষয়ে অবোধগম্যতার সম্মুখীন হলে এবং কোনো বিষয় সহজে বুঝে না আসলে এরূপ দু‘আ করতেন,
يا معلّم ابراهيم علمني ويا مفهّم سليمان فهمني .
‘হে ইবরাহীমের শিক্ষক আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন এবং হে সুলায়মানকে বুঝিয়েদাতা আমাকে বুঝিয়ে দিন।’
আপনিও পরীক্ষার হলে কিংবা মুতা‘আলার সময় এরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে উল্লিখিত দু‘আটি পাঠ করতে পারেন। আশা করা যায় ভালো ফল পাওয়া যাবে।
পড়াশোনার জন্য ভালো স্থান নির্বাচন করুন এবং পরীক্ষার হলেও মাদরাসার পক্ষ থেকে সিট নির্দিষ্ট না করা হলে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও নিরিবিলি স্থানে আপনার বসার স্থান নির্ধারণ করুন। আর নির্দিষ্ট করা থাকলে সেখানে সুন্দরভাবে, সুন্নাত তরিকায় উপবেশন করুন।
প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত পূর্ণ সময়কে আপনি ভাগ করে ফেলুন এবং মোট সময়ের অন্তত দশ ভাগ সময় গভীরভাবে ও মনোযোগসহকারে প্রশ্ন পাঠের জন্য নির্ধারণ করুন। এরপর প্রশ্নের পরিস্থিতি অনুযায়ী আবশ্যকীয় জবাব লেখার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করুন এবং প্রতিটি জবাব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
প্রশ্ন পাঠ করে প্রতিটি প্রশ্নের চাওয়া জবাবের মূল অংশ কোনটি- সেটা চি‎‎হ্নিত করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, প্রতিটি প্রশ্নে চাওয়ার একটা মূল জায়গা থাকে। সেই অংশটুকু যদি সুন্দর করে লেখা যায় তবে ওই প্রশ্নের অন্য আনুষঙ্গিক অংশে ঘাটতি থাকলেও তাতে তেমন প্রভাব ফেলে না। পক্ষান্তরে প্রশ্নে চাওয়া বিষয়ের বাইরে গিয়ে অনেক কিছু লিখলেও নাম্বার পাওয়ার ক্ষেত্রে তা তেমন কাজে দেয় না।
লেখা শুরু করার আগে অপেক্ষাকৃত সহজগুলো দাগ দিয়ে চি‎‎হ্নিত করুন এবং সেগুলোই আগে লেখা শুরু করুন। জবাব শুরু করার আগে কোন্ প্রশ্নে মৌলিকভাবে কী বিষয় উপস্থাপন করতে হবে পারলে তাও চি‎হ্নিত করে নিন।
এরপর যে জবাব সবচেয়ে বেশি ভালো জানা আছে, আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে সেই জবাব আগে শুরু করুন এবং ধারাবাহিকভাবে এই নিয়মই বজায় রাখুন এবং সর্বশেষে লেখার তালিকায় রাখুন সেই জবাব, যে ব্যাপারে আপনার জানাশোনা তুলনামূলক কম এবং সে ব্যাপারে আপনি সন্দিহান।
জবাব লেখার সময় সাবলীলতার সঙ্গে ধীর-স্থীরতা অবলম্বন করুন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কাজে এমন পন্থাই অবলম্বন করতেন। তিনি ইরশাদ করেন-
«التَّأَنِّي مِنَ اللَّهِ وَالْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ»
‘ধীরস্থীরতা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এবং তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।’ [বাইহাকী: ৪০৫৮; হাসান, আলবানী, সিলসিলা সহীহা: ১৭৯৫]
সঠিক উত্তর নির্ণয়ের যে প্রশ্ন থাকে (যেমন, বলা থাকে, সঠিক উত্তরের পাশে (টিক) চি‎হ্ন দাও) সেসব প্রশ্নের উত্তর নির্ণয়ের জন্য বারবার ফিকির করতে হবে এবং ফিকির করার পর সহীহ জবাবের ব্যাপারে দৃঢ়বিশ্বাস সৃষ্টি হলে ওয়াসওয়া ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব মন থেকে তাড়িয়ে দেবে। আর কোনো বিষয়ে দৃঢ়তা পয়দা না হলে সম্ভাব্য জবাবগুলোর মধ্য থেকে সহীহ জবাব খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা করবে এবং প্রবল ধারণা অনুযায়ী যেটাকে সহীহ জবাব বলে মনে হবে সেটাকে চি‎হ্নিত করবে।
আর কোনো জবাবকে সহীহ বলে চি‎‎হ্নিত করার পর শুধু দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে সেটাকে কেটে দেবে না। হ্যাঁ, যদি অন্যটা সহীহ হওয়ার ব্যাপারে প্রবল ধারণা এবং আগেরটা ভুল হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ধারণা হয় তবে সেটা ভিন্ন কথা।
লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে জবাব লেখা শুরুর আগে জেহেনকে স্থীর ও মনোযোগী করে নেবে। সম্ভব হলে কিছু হরফ দিয়ে ইশারা করে রাখবে, যাতে জবাবের কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত থাকবে। জবাবের প্রধান ও মূল অংশ শুরুতে লিপিবদ্ধ করবে। এর দ্বারা পরীক্ষকের আস্থা তৈরি হয় এবং ছাত্রটি জবাবের গভীরে পৌঁছতে পেরেছে বলে উস্তাদ বিশ্বাস করেন। ফলে এতে যথাযথ নাম্বার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
প্রশ্নপত্রে নজরে ছানী বা পুনরায় দেখার জন্য অবশ্যই কিছু সময় নির্দিষ্ট করবে এবং তা শতকরা হারেও হতে পারে। আর নজরে ছানী অবশ্যই ধীরেসুস্থে হতে হবে এবং এখানে কোনোক্রমেই তাড়াহুড়া করা যাবে না। বিশেষ করে যদি অংক পরীক্ষা কিংবা হিসাব জাতীয় পরীক্ষা হয়। যেমন, মিরাছের সিরাজী কিংবা এধরনের কোনো পরীক্ষা।
প্রশ্নপত্র জমা দেয়ার ব্যাপারে কখনই তাড়াহুড়ো করবে না এবং যারা তাড়াহুড়ো করে খাতা দিয়ে হল থেকে বের হয়ে যায় তাদের দ্বারা উৎসাহিত হবে না। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষার হলে একদল ছাত্র এমন থাকবেই, যারা দ্রুত হল থেকে বের হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। সুতরাং কখনই তাদের অনুসরণ করার চেষ্টা করবে না।
পরীক্ষার পর কোনো উত্তরপত্রে ভুল ধরা পড়লে তাতে বিমর্ষ না হয়ে পরবর্তী পরীক্ষা ভালো করার জন্য মনোযোগী হবে এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে তাড়াপ্রবণ না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করবে। সর্বোপরী আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালার ওপর তুষ্ট থাকবে এবং এই বিশ্বাস নেবে যে, তার ইশারা ছাড়া কলম নড়ে না। অতএব ভুল যা হওয়ার তা এড়ানো সম্ভব ছিল না। তাই সামনে যাতে ভুল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে আরো ভালো প্রস্তুতি নেবে। আরো মনে রাখবে যে, ভুলের জন্য হা-পিত্যেস করলে কেবল কষ্টই বাড়বে, কোনো ফল হবে না। এক্ষেত্রে হাদীছের কথা স্মরণ করবে। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ»
‘কোনো কাজ সংঘটিত হয়ে গেলে এমন বলো না, ‘যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো’। বরং এরূপ বলো, যা হওয়ার তা আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালায় হয়েছে। কেননা, ‘যদি’ বলা শয়তানের পথ খুলে দেয়।’ [সহীহ মুসলিম: ২৬৬৪]
মনে রাখবে ধোঁকাবাজি সর্বাবস্থায় হারাম। চাই তা যে ভাষারই হোক না কেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
«مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنَّا»
‘যে ধোঁকা দেয় সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ [মুসলিম: ১০২; তিরমিযী: ১৩১৫]
সুতরাং পরীক্ষার হলে অবৈধ উপায়ে নাম্বার লাভ করা এবং এর ভিত্তিতে সনদ কিংবা ক্লাসের মর্যাদা লাভ করা জুলুম এবং হারামপন্থা বলে বিবেচিত হবে। ধোঁকাবাজীর সংজ্ঞার ব্যাপারে সবাই একমত যে, এটা হচ্ছে পাপ ও অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করা। অতএব হারাম থেকে বেঁচে থাকবে। তবে আল্লাহ তা‘আলা নিজের পক্ষ থেকে রহম ও অনুগ্রহের ফয়সালা করবেন। তাই অবৈধ যাবতীয় পন্থা পরিহার করে চলবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য কোনো বস্তু তরক করে আল্লাহ তা‘আলা তাকে এরচেয়ে উত্তম বস্তু দান করেন। শুধু নিজেই অন্যায় ও অবৈধ উপায় অবলম্বন করা থেকে বিরত থাকবে না বরং কাউকে এরূপ করতে দেখলে তা রোধ করার চেষ্টা করবে এবং উস্তাদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। এটা গীবত কিংবা চোগলখোরির অন্তর্ভুক্ত হবে না, বরং মন্দকাজে বাধা দেয়ার মহৎ কাজ বলে বিবেচিত হবে। সুতরাং কেউ ইন্টারনেট কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে চাইলে তাকে বাধা দেবে এবং এই কাজের পাপের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। আজকাল শিক্ষার্থীরা অবৈধ উপায় অবলম্বন করতে গিয়ে যে পরিমাণ সময় ও অর্থ ব্যয় করে সেই পরিমাণ সময় ও অর্থ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যয় করলে অনেক ভালো ও ফলদায়ক হতো এবং এভাবে নিন্দনীয় পথে গিয়ে লাঞ্ছিত হওয়ার প্রয়োজন হতো না।
আর দুনিয়ার পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতের পরীক্ষা এবং আখেরাতে মুমিনদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা যা প্রস্তুত করে রেখেছেন সে কথা মনে রাখবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন।


যোগ্যতা অর্জন করা ছাড়া দরস কায়েম না করা
ইলমের সূত্র গভীরে প্রোথিত। বাহ্যিক কিছু হরফ বা অক্ষরজ্ঞানকে অন্য যে পরিভাষাতে হোক অন্তত ওলামায়ে কেরামের পরিভাষায় ইলম বলা যায় না। ইলমে দীনের সঙ্গে রূহানীয়াতের সম্পর্ক গভীরে। এই রূহানীয়াতের অন্যতম দিক হলো ‘সিনা ব সিনা’ তথা উস্তাদ পরম্পরায় এবং উস্তাদের নেক দু‘আ ও পরামর্শ নিয়ে ইলমী খেদমতে নিয়োজিত হওয়া। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন পদক্ষেপ নিলে উস্তাদের দু‘আ ও পরামর্ম সাপেক্ষে তা করা। উস্তাদ ও রূহানী মুরুব্বীর পরামর্শ ছাড়া বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে অনেক সময় ব্যর্থতা সঙ্গী হয় এবং গৃহীত পদক্ষেপ মুখ থুবড়ে পড়ে। একারণে শফীক উস্তাদের পরামর্শ ও দু‘আ নিয়ে যে কোনো শুরু করা দরকার। এসম্পর্কে আমরা ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.)-এর বিখ্যাত সেই ঘটনাটি উল্লেখ করতে পারি। ঘটনা মানাকেবে কারদারিতে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) একবার মারাত্মক রোগাক্রান্ত হলেন। স্নেহের এই শিষ্যকে দেখতে স্বয়ং তার ঘরে আসলেন ইমাম আজম আবূ হানীফা (রহ.)। বিভিন্ন কথাবার্তার পর তিনি তাকে উদ্দেশ করে বললেন, আমি আমার পর তোমাকে মুসলিম জাতির দায়িত্ব প্রদান করে যাবো। আর এখন যদি তোমার কিছু হয়ে যায় তবে ইলমের বিরাট অংশের মৃত্যু ঘটবে।
এরপর ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) সুস্থ হয়ে উঠলেন এবং আত্মতুষ্টিতে নিজেই স্বতন্ত্র একটি দরসগাহ কায়েম করলেন। কথাটা ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) অন্যের মাধ্যমে জানতে পারলেন। স্নেহের শিষ্যকে হাতে-কলমে ভুল ধরিয়ে দেয়ার জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। একজন আলেমকে ছয়টি মাসআলা শিখিয়ে তার কাছে পাঠালেন।
ওই ছাত্র উস্তাদের কৌশল অনুযায়ী ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.)-কে প্রশ্নগুলো করতে থাকলেন। কিন্তু সেটার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পেরে তিনি লজ্জিত হলেন এবং দৌড়ে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর কাছে ছুটে এলেন। আবূ হানীফা (রহ.) তাকে দেখে বললেন, বুঝতে পারছি ওই মাসআলাগুলোই আমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে। এরপর তিনি তার ব্যাপারে একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করলেন-
تزببت قبل أن تحصرم
‘ফল চয়ন করার আগেই কিসমিসে পরিণত হয়েছো!’ অর্থাৎ যোগ্যতা অর্জন করার আগেই দরস কায়েম করেছো!


রাত্রিজাগরণের সহায়ক ১০৩ উপায়
রাত্রিজাগরণ তলবে ইলমের শান। পূর্বসূরীগণগণের শিআর এবং আল্লাহ তা‘আলাকে পাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায়। কিন্তু অলসতা, গাফলতি ও আখেরাতের ব্যাপারে উদাসীনতার কারণে আমরা ক্রমশ: রাত্রিজাগরণের এই গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ফলে বঞ্চিত হচ্ছি অমূল্য রত্নভাণ্ডার থেকে। রহমত থেকে এবং আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ থেকে। অবশ্য আমরা মনেপ্রাণে প্রত্যেকেই চাই রাত্রিজাগরণ করতে। নিস্তব্ধ শেষরজনীতে জেগে প্রভুর দরবারে বিনম্রশ্রদ্ধায় দু‘আর হাত উত্তোলন করতে। কিন্তু সব স্বপ্ন, রাত্রিজাগরণের পবিত্র আশা নিষ্ফল হয়ে যায় অলসতা এবং শয়তানের ধোঁকার কাছে। তবে কিছু পন্থা ও উপায় আছে যা অবলম্বন করতে পারলে তলবে ইলম ও আখেরাতপ্রত্যাশীদের জন্য রাত্রিজাগরণ করা সহজ হয়। নিম্নে এরূপ কয়েকটি উপায় উল্লেখ করা হলো।
১. রাত্রিজাগরণের ব্যাপারে পূর্ণ নিষ্ঠাবান হওয়া এবং সে অনুযায়ী যত্মবান হওয়া।
২. মনে একথার অনুভূতি সঞ্চারণ করা যে, আল্লাহ তা‘আলা রাত্রে আমাকে আহ্বান করেন।
৩. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রিজাগরণের জন্য আহ্বান করেছেন ও গুরুত্বারোপ করেছেন।
৪. পূর্বসূরীগণ রাত্রিজাগরণের মধ্যে ইবাদতের স্বাদ লাভ করেছেন- একথা স্মরণ করা।
৫. ডানপাশে শোয়া।
৬. এ কথার বিশ্বাস স্থাপন করা যে, রাত্রিজাগরণ অন্তর থেকে গাফলতি দূর করে।
৭. আল্লাহ তা‘আলা আমার রাতের সালাত বিশেষভাবে দেখেন- অন্তরে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করা।
৮. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রিজাগরণের জন্য কীরূপ কষ্ট করেছেন- তা মনের মধ্যে সজা জাগরুক রাখা।
৯. রাত্রিজাগরণকারীদের গুণাবলী অর্জনের তীব্র বাসনা থাকা।
১০. আল্লাহ তা‘আলা যেন রাত্রিজাগরণ সহজ করে দেন- সেটার জন্য দু‘আ করা।
১১. পবিত্র অবস্থায় রাত্রিযাপন করতে যাওয়া।
১২. রাত্রিজাগরণকারীদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট ও খুশি হন তা স্মরণে রাখা।
১৩. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচণ্ড অসুস্থতার সময়েও তাহাজ্জুদ সালাত ত্যাগ করেননি- সে কথা সর্বদা মনে হাজির রাখা।
১৪. রাত্রিজাগরণে সাহাবায়ে কেরামের সাধনার কথা মনে রাখা।
১৫. ইশার পর দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া।
১৬. তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করার দ্বারা হুরে ঈন লাভ করা যায়- সে কথা মনে রাখা।
১৭. রাতে জাগার নিয়তে ঘুমাতে যাওয়া।
১৮. রাত্রিজাগরণ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে নিয়ে ফেরেস্তাদের সঙ্গে গর্ব করেন- একথা মনে রাখা।
১৯. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের ময়দানেও তাহাজ্জুদ ছাড়েননি- সে কথা মনে রাখা।
২০. গুনাহ ও পাপ থেকে বেঁচে থাকা।
২১. ঘুমের আগে সুন্নাত দু‘আ-ওজিফাগুলো আদায় করা।
২২. রাত্রিজাগরণ করার ফযীলতগুলো স্মরণে রাখা।
২৩. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরেও তাহাজ্জুদ ছাড়তেন না- তা মনে রাখা।
২৪. নারী সাহাবীগণ রাত্রিজাগরণে খুব তৎপর ছিলেন তা মনে রাখা।
২৫. দিনের কিছু সময় কায়লূলা করা।
২৬. রাত্রিজাগরণ কলবের সৌভাগ্য এবং অন্তর খুলে যাওয়ার মাধ্যম তা অনুধাবন করা।
২৭. বেশি খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত থাকা।
২৮. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীগণকে রাত্রিজাগরণে সদা সজাগ ছিলেন- তা মনে রাখা।
২৯. পূর্ববর্তী খলীফা ও আমীরগণ তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ে তৎপর ছিলেন- তা জানা।
৩০. শয়তান তাহাজ্জুদ সালাত থেকে মানুষকে বিরত রাখতে চায়- তা স্মরণ করা।
৩১. তাহাজ্জুদ সালাত জিহাদের ময়দানে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য লাভে সহায়ক- একথা মনে রাখা।
৩২. কোনো কারণে রাতে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতে না পারলে দিনে তার কাজা করে নেয়ার প্রতিজ্ঞা রাখা।
৩৩. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাগণকে কীভাবে রাত্রিজাগরণে সচেষ্ট ছিলেন তা স্মরণে রাখা।
৩৪. রাত্রিজাগরণকারী আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে কথোকপথনকারী- একথা মনে রেখে ঘুমাতে যাওয়া।
৩৫. রাত্রিজাগরণ জাহান্নামের আগুনের প্রতিবন্ধক- তা মনে রাখা।
৩৬. মাত্রাতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাস পরিহার করা।
৩৭. রাত্রিজাগরণের প্রতি পূর্বসূরীগণগণের ওসিয়তের কথা স্মরণ করা।
৩৮. আত্মার পরিশুদ্ধি ও মুহাসাবার জন্য ঘুম তরক করার ব্যাপারে নিজেকে প্রস্তুত করা।
৩৯. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে রাত্রিজাগরণের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত করেছেন সে কথা মনে রাখা।
৪০. তাহাজ্জুদ সালাত জান্নাত লাভের উপায়, এই বিশ্বাস নিয়ে বিছানায় যাওয়া।
৪১. ঘুম কমিয়ে নফসের সঙ্গে মুজাহাদা করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
৪২. ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর মাছনূন দু‘আগুলো আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া।
৪৩. রাত্রিজাগরণ কিয়ামত দিবসে হিসেব সহজ হওয়ার মাধ্যম- একথা মনে রাখা।
৪৪. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে তাহাজ্জুদ সালাতে উপস্থিত দেখতে চাইতেন এবং তাদেরকে রাত্রিজাগরণে উদ্বুদ্ধ করতেন, সে কথা জানা।
৪৫. পূর্বসূরীগণ কোনোদিন তাহাজ্জুদ আদায় করতে না পারলে কীরূপ কষ্ট পেতেন এবং অনুশোচনায় কান্নাকাটি করতেন সে সব ঘটনাবলি জানা এবং নিজেদেরকে সেভাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হওয়া।
৪৬. তাহাজ্জুদ গুনাহ মাফের কারণ। তাই তাহাজ্জুদের মাধ্যমে গুনাহ মাফের ব্যবস্থা করা।
৪৭. হালাল রিজিক গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া।
৪৮. পরস্পরে তাহাজ্জুদ সালাতের ব্যাপারে আলোচনা-পর্যালোচনা করা।
৪৯. পূর্বসূরীগণ নিজেদেরকে এবং অন্যদেরকে রাত্রিজাগরণে কীরূপ পন্থা অবলম্বন করতেন তা জানা এবং নিজেরাও সেরূপ আমল করতে সচেষ্ট হওয়া।
৫০. রাত্রিজাগরণই একজন মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য এবং এতেই তার শ্রেষ্ঠত্ব সে কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং এই গুণ নিয়ে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করা।
৫১. তাহাজ্জুদ সালাতের প্রতি ওলামায়ে কেরামের আগ্রহ ও বাসনার অভিজ্ঞতা জানা এবং নিজেরাও সেরূপ আমল করা।
৫২. উচ্চমর্যাদা লাভের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ লাভ করা।
৫৩. এই বিশ্বাস রাখা যে, তাহাজ্জুদ সালাত আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী।
৫৪. জান্নাতের নেয়ামতের কথা স্মরণ করা।
৫৫. রাত্রিজাগরণ করার উদ্দেশ্যে ঘুম ছেড়ে ওঠার মুহূর্তে মুখমণ্ডলে পানি ছিঁটিয়ে দেয়া।
৫৬. তাহাজ্জুদ সালাত শেষ পরিণতি উত্তম হওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। শেষ পরিণতি সুন্দর হওয়ার বাসনায় তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হতে সচেষ্ট হওয়া।
৫৭. ওলী-বুযুর্গগণ স্ত্রী-সন্তানদের সান্নিধ্যের চেয়ে তাহাজ্জুদ সালাতে বেশি মজা ও স্বাদ লাভ করতেন। নিজেদের মধ্যেও সেই মজা ও স্বাদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়া।
৫৮. রাত্রিজাগরণে কসুর করায় নফসকে ভর্ৎসনা করা।
৫৯. জাহান্নামের আগুন, শাস্তি ও এর ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে ঘুমের তীব্রতা দূর করা এবং এভাবে তাহাজ্জুদ আদায়ে সহায়তা লাভ করা।
৬০. রাত্রিতে ওঠার পর মেসওয়াক করা।
৬১. তাহাজ্জুদ সালাতের পর দু‘আ কবুল হয়। দু‘আর মাধ্যমে নিজের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য তাহাজ্জুদ সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া।
৬২. নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করলে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। তাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মহৎ উদ্দেশ্যে নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৬৩. আগের যুগের নেককার নারীগণ তাদের স্বামীদেরকে বিভিন্ন কৌশলে তাহাজ্জুদের জন্য জাগ্রত করতেন। তাদের সে সব কাহিনী ঈমানী চেতনা জাগরুক এবং শিক্ষণীয়। সেসব ঘটনা পাঠ করে নিজেরা শিক্ষা লাভ করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা।
৬৪. কৃপ্রবৃত্তি দমন করা মুমিনের অন্যতম গুরুদায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে তাহাজ্জুদের ভূমিকা অনেক। তাই এই উদ্দেশ্যে তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৬৫. তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করার দ্বারা দীনের ওপর অবিচল থাকা যায়। তাই দীনের ওপর অবিচল থাকার দৃঢ়প্রত্যয়ে নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৬৬. তাহাজ্জুদ সালাতের বদৌলতে দুনিয়াবিমুখতার গুণ হাসিল হয়। আর এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় গুণ। সুতরাং এই গুণ হাসিলের জন্য নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৬৭. মাঝেমধ্যে ডাকাডাকি ছাড়া জামাতের সঙ্গে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৬৮. তাহাজ্জুদ সালাতের দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা লাভ হয়। আর জগতে এরচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর কী হতে পারে? তাই এই সম্পদ লাভের জন্য তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৬৯. অধিক হাসাহাসি ও অনর্থক কাজকর্ম থেকে দূরে থাকা।
৭০. সালফে সালেহীন তাহাজ্জুদ সালাতে এত স্বাদ ও মজা পেতেন যে, কেবল এই স্বাদের জন্যই তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দীর্ঘ হায়াত কামনা করতেন।
৭১. আখিরাতের জীবনের প্রতি ধাবিত হওয়া।
৭২. তাহাজ্জুদ সালাতের বাহ্যিক ফায়েদা হচ্ছে; এর দ্বারা চেহারার ঔজ্জ্বল্য ও কমনীয়তা বৃদ্ধি পায়। তাই এই নেয়ামত লাভের স্বার্থে নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৭৩. জাগতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা সংক্ষিপ্ত করা এবং মৃত্যুর কথা বেশি বেশি মনে করা। এই গুণও তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়ার সহায়ক।
৭৪. তাহাজ্জুদ সালাত নিঃসন্দে কঠিন এক ইবাদত। কিন্তু এতে অভ্যস্ত হলে আল্লাহ তা‘আলার অন্যান্য ইবাদত করাও সহজ হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তা‘আলার যাবতীয় বিধান সহজে পালনের সুবিধার্থে তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৭৫. স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যদেরকেও তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য জাগ্রত করা।
৭৬. তাহাজ্জুদ নামাযী কেয়ামত দিবসে তার সঙ্গীর জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা ও অধিকার লাভ করবে। এই সুবিধা লাভের জন্য তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৭৭. বুযুর্গানে কেরামও মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করার সময়েও তাহাজ্জুদের পাবন্দি করতেন। তাই তাদের অনুকরণে আমাদেরকেও অন্তত সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় তাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৭৮. আল্লাহ তা‘আলা ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি প্রতিযোগিতার অভ্যস্ত গড়ে তোলা এবং তাহাজ্জুদের মাধ্যমে সেই প্রতিযোগিতার অনুশীলন করা।
৭৯. রাত্রিজাগরণ সাধারণের মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে। তাই মানুষের মধ্যে দীনী প্রভাব বিস্তার করার স্বার্থে তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৮০. কবরজগত এবং এর ভয়াবহতার কথা ফিকির করা।
৮১. তাহাজ্জুদ সালাত ও রাত্রিজাগরণ আল্লাহ তা‘আলার রহমত আনয়ন করে। তাই আল্লাহ তা‘আলার রহমতপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৮২. রাতে জাগিয়ে দেয়ার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো লোককে নির্দিষ্ট করা।
৮৩. বুযুর্গানে কেরাম তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারলে আনন্দিত হতেন এবং ছুটে গেলে মারাত্মক ব্যথিত হতেন। আমাদের মধ্যেও এই অভ্যাস গড়ে তোলা।
৮৪. নিয়মিত ও দায়েমীভাবে রাতজাগরণের চেষ্টা করা।
৮৫. কেয়ামত দিবস এবং এই দিনের ভয়াবহতার কথা স্মরণে রাখা।
৮৬. প্রথমে সংক্ষিপ্ত দুই রাকাতের মাধ্যমে সালাত শুরু করা।
৮৭. রাতের শেষভাগের সময়গুলোর মূল্য ও মর্যাদা অনুধাবন করার চেষ্টা করা।
৮৮. তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করলে শারীরিক বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। তাই শারীরিক সুস্থতার নেয়ামত লাভের জন্য তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া।
৮৯. ক্রমান্বয়ে রাকাতের সংখ্যা এবং দীর্ঘ কিয়ামের দিকে অগ্রসর হওয়া।
৯০. পূর্বসূরী পুণ্যবানরা অসুস্থ অবস্থাতেও তাহাজ্জুদ ছাড়তেন না। এসব ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা হাসিল করা।
৯১. রাতের নামাযীদের কেরাত, দু‘আ, দরূদ ইত্যাদি ফেরেশতারা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন। তাই নিজেও এই সৌভাগ্যের অংশীদার হওয়া।
৯২. তাহাজ্জুদ সালাত মূলত ইখলাস ও আল্লাহভক্তির প্রশিক্ষণ। তাই এই দুটি গুণ হাসিলের স্বার্থে নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৯৩. নেককারগণ তাদের স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য খুবই অনুপ্রাণিত করতেন। সে সব ঘটনা থেকেও দীক্ষা নেয়া।
৯৪. তাহাজ্জুদ সালাত এত গুরুত্বপূর্ণ সালাত যে, পূর্ববতী উম্মতের মধ্যেও এই আমলের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাই পূর্ববতী উম্মতের আমলের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক অধিকহারে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৯৫. সালাত অবস্থায় এমন পন্থা অবলম্বন করা, যাতে তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও ঘুমের ভাব দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৯৬. সালফে সালেহীনগণ কীভাবে নিজেদের আদরের ও প্রিয় সন্তানদেরকে রাতে জাগিয়ে তুলে তাহাজ্জুদের জায়সালাতে দাঁড় করিয়ে দিতেন, সেসব ইতিহাস পাঠ করে সে অনুযায়ী তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করার মাধ্যমে নিজেদেরকেও সেভাবে গড়ে তোলা।
৯৭. শেষ রাতে প্রাণীকুল আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করে থাকে। সে সময় আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে নির্লজ্জতা প্রদর্শনী না করে তাদের সঙ্গে নিজেও আল্লাহ তা‘আলার জিকির তথা তাহাজ্জুদ সালাতে লিপ্ত হওয়া।
৯৮. তাহাজ্জুদ সালাত আত্মিকব্যাধি ও অন্যান্য বিপদ দূর করে। আর নিঃসন্দেহ বস্তু দুটি অতি মূল্যবান। তাই এই নেয়ামত লাভ করার নেক নিয়তে নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
৯৯. পূর্বসূরীগণ মেহমানদেরকেও তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য জাগ্রত করতেন! নিজেদের মধ্যেও এই মহৎগুণাবলী অর্জন করা।
১০০. সালাতের রুকু ও বসার মধ্যে সুষ্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা।
১০১. রাত্রিজাগরণ উচ্চমর্যাদা লাভের ক্ষেত্রে আত্মাকে প্রশিক্ষিত করার বড় একটা মাধ্যম।
১০২. পূর্বসূরীগণ তাদের শিষ্যদেরকে তাহাজ্জুদ সালাত ও রাত্রিজাগরণের ব্যাপারে খুব তাগিদ করতেন। তাদের অনুসরণ করত নিজেকেও তাহাজ্জুদের জন্য প্রস্তুত করা এবং নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতে থাকা।
১০৩. দিনের নফল সালাতের চাইতে রাতের সালাতের ফযীলত বেশি। তাই বেশি ফযীলতের সালাতের জন্য তাহাজ্জুদ আদায় ও রাত্রিজাগরণ করা।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.