নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম জীবনের আদব-কায়দা ১

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:৫১

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম জীবনের আদব-কায়দা ১
ড. মো: আমিনুল ইসলাম

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
بسم الله الرحمن الرحيم
ভূমিকা
إنَّ الحمدَ للهِ نحمدُه ونستعينُه ونستغفرُه ، ونعوذُ بالله من شُرور أنفسنا وسيئاتِ أعمالنا ، مَن يهدهِ الله فلا مُضِلَّ له ، ومَن يُضلل فلا هاديَ له ، وأشهدُ ألاَّ إله إلاَّ الله وحده لا شريك له ، وأشهد أنَّ محمَّداً عبدُه ورسولُه .
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য; আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি; আর আমাদের নফসের জন্য ক্ষতিকর এমন সকল খারাপি এবং আমাদের সকল প্রকার মন্দ আমল থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না; আর তিনি যাকে পথহারা করেন, কেউ তাকে পথ দেখাতে পারবে না। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল)।
অতঃপর:
মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব; আল্লাহ মানুষকে সুন্দর গঠনে এবং সম্মান ও মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ لَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ فِيٓ أَحۡسَنِ تَقۡوِيمٖ ٤ ﴾ [التين: ٤]
“অবশ্যই আমরা সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।” তিনি আরও বলেন:
﴿ ۞وَلَقَدۡ كَرَّمۡنَا بَنِيٓ ءَادَمَ وَحَمَلۡنَٰهُمۡ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنَٰهُم مِّنَ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَفَضَّلۡنَٰهُمۡ عَلَىٰ كَثِيرٖ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِيلٗا ٧٠ ﴾ [الاسراء: ٧٠]
“আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে আমি পবিত্র বস্তু থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করেছি এবং আমি অন্য যত কিছুই সৃষ্টি করেছি, তার অধিকাংশের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।”
এ সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার নিমিত্তে আল্লাহ তা‘আলা মানব জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ পরিচালনার জন্য কিছু নিয়ম-কানুন দিয়েছেন, যা যুগে যুগে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক মনোনীত নবী ও রাসূল ‘আলাইহিমুস সালামের মাধ্যমে মানুষ জানতে পেরেছে; তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের মাঝে এসেছে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব ‘আল-কুরআনুল কারীম’ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ, যাতে মানব জীবনের সকল বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, বর্ণিত হয়েছে গোটা মুসলিম জীবনের আদব-কায়দা।
সুতরাং প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি ব্যবহারিক জীবনে কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত আদবসমূহ মেনে চলতে পারলে ব্যক্তিগতভাবে সে দুনিয়ার জীবনে একজন ভদ্র, শালীন ও সভ্য মানুষ হিসেবে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে এবং পরকালীন জীবনে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণের মিছিলে শামিল হতে পারবে; আর সামগ্রিকভাবে সমাজ, রাষ্ট্র ও গোটা দুনিয়া হয়ে উঠবে শিষ্টাচারপূর্ণ, সুসভ্য, সুশৃঙ্খল, সুন্দর ও কল্যাণময়। আদব-কায়দার এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করেই আমরা “কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে মুসলিম জীবনে আদব-কায়দা” শীর্ষক শিরোনামে এ গ্রন্থটি সংকলন শুরু করি, যাতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:
• ভূমিকা
• প্রথম অধ্যায়: আদব-কায়দা’র পরিচয়, গুরুত্ব ও তাৎপর্য
• দ্বিতীয় অধ্যায়: নিয়তের আদবসমূহ
• তৃতীয় অধ্যায়: আল্লাহ তা‘আলার সাথে মুসলিম বান্দার আদব
• চতুর্থ অধ্যায়: আল্লাহর বাণী ‘আল-কুরআনুল কারীম’-এর সাথে বান্দার আদব
• পঞ্চম অধ্যায়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুমিন বান্দার আদব
• ষষ্ঠ অধ্যায়: স্বীয় নাফসের সাথে মুসলিম বান্দার আদবসমূহ
• সপ্তম অধ্যায়: মানুষ তথা সৃষ্টির সাথে আদব
• অষ্টম অধ্যায়: দীনী ভাইদের সাথে আদব এবং আল্লাহর জন্য তাদেরকে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা
• নবম অধ্যায়: বসার ও মাজলিসের আদবসমূহ
• দশম অধ্যায়: পানাহারের আদবসমূহ
• একাদশ অধ্যায়: যিয়াফত তথা আপ্যায়নের আদবসমূহ
• দ্বাদশ অধ্যায়: সফরের আদব
• ত্রয়োদশ অধ্যায়: পোশাক-পরিচ্ছদের আদব
• চতুর্দশ অধ্যায়: স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে আদবসমূহ
• পঞ্চদশ অধ্যায়: ঘুমানোর আদব
• পরিশিষ্ট
• গ্রন্থপঞ্জি
• সূচীপত্র
অবশেষে বলতে হয়, চেষ্টা করা হয়েছে পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে মুসলিম জবীনের প্রয়োজনীয় আদব-কায়দার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার, কিন্তু সকল বিষয় যে তুলে ধরতে পারিনি এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়; তবে বাংলা ভাষাভাষী প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আলেম সমাজ এ বিষয়ে আরও বেশি লেখালেখি করলে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একদিন পূর্ণতা লাভ করবে এমন আশা করতেই পারি। পরিশেষে আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রয়াসটুকু আমাদের ও পাঠক সমাজের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্য মহান রাব্বুল ‘আলামীনের দরবারে নিবেদন করছি; আশা করছি তিনি আমাদের এ আবেদন কবুল করবেন এবং আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাগণের কাতারে শামিল করবেন। আমীন!

ড. মো: আমিনুল ইসলাম,
ডিসেম্বর, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ,
দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া কামিল মাদরাসা,
লাকসাম, কুমিল্লা।


* * *

প্রথম অধ্যায়
আদব-কায়দা’র পরিচয়, গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১. আদব-কায়দা’র পরিচয়:
আদব শব্দটি আরবি " أدب "শব্দ থেকে বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত ও প্রচলিত শব্দ; যার অর্থ হলো: বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সভ্যতা, কৃষ্টি, সুশিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা, শোভনতা, শিষ্টাচার। আবার " أدب "শব্দের অর্থ: নিয়মনীতি, পদ্ধতি ইত্যাদি। আর আদব-কায়দা মানে— ভদ্র সমাজের রীতি-পদ্ধতি; ভদ্র ব্যবহার। অন্যভাবে বলা যায়: আদব-কায়দা মানে কাঙ্খিত শিক্ষা, সভ্যতা ও মার্জিত সংস্কৃতির দ্বারা আত্মগঠনের অনুশীলন করা। ইবনু হাজার ‘আসকালানী রহ. বলেন:
« الأدب: استعمال ما يحمد قولاً وفعلاً » .
“কথায় ও কাজে প্রশংসনীয় ব্যবহারকে আদব বলে।” আবার কেউ বলেন:
« الأخذ بمكارم الأخلاق » .
“উত্তম চরিত্র লালন করাকে আদব বলে।” আবার কেউ কেউ বলেন:
« هو تعظيم من فوقك والرفق بمن دونك » .
“আদব হলো ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে সম্মান করা এবং অধস্তনকে স্নেহ করা।” কেউ কেউ বলেন:
« الأدب هو حسن الأخلاق وفعل المكارم » .
“আদব মানে উত্তম চরিত্র এবং ভালো কাজ।” আর ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন:
« الأدب اجتماع خصال الخير في العبد » .
“বান্দার মধ্যে উত্তম বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটানোকে আদব বলে।” আবার কেউ কেউ বলেন:
« والأدب هو الخصال الحميدة » .
“প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্যসমূহকেই আদব বলে।”
আর আমাদের দেশীয় ভাষায় বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সভ্যতা, কৃষ্টি, সুশিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা, শোভনতা ইত্যাদি গুণাবলী যে ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাকে ‘মুয়াদ্দাব’ (শালীন, ভদ্র ও সুশিক্ষিত) বলে। আর এসব গুণাবলী যার মধ্যে বিদ্যমান নেই, তাকে ‘বেয়াদব’ (অশালীন, অভদ্র, অসভ্য) বলে।
২. আদব-কায়দা’র গুরুত্ব ও তাৎপর্য:
মানবজীবন তথা মুসলিম ব্যক্তির জীবনে আদব-কায়দার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহুল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّ الْهَدْىَ الصَّالِحَ ، وَالسَّمْتَ الصَّالِحَ ، وَالاِقْتِصَادَ جُزْءٌ مِنْ خَمْسَةٍ وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ » . (رواه أبو داود).
“নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্র, ভালো ব্যবহার ও পরিমিত ব্যয় বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা নবুয়্যাতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ সমতুল্য।” আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:
« اُطْلُبْ الْأَدَبَ فَإِنَّهُ زِيَادَةٌ فِي الْعَقْلِ ، وَدَلِيلٌ عَلَى الْمُرُوءَةِ ، مُؤْنِسٌ فِي الْوَحْدَةِ ، وَصَاحِبٌ فِي الْغُرْبَةِ ، وَمَالٌ عِنْدَ الْقِلَّةِ » . (ذَكَرَهُ الْحَاكِمُ فِي تَارِيخِهِ).
“তুমি আদব অন্বেষণ কর; কারণ, আদব হলো বুদ্ধির পরিপুরক, ব্যক্তিত্বের দলীল, নিঃসঙ্গতায় ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রবাসজীবনের সাথী এবং অভাবের সময়ে সম্পদ।”
আর আদব বা শিষ্টাচার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার দ্বারা ব্যক্তির জীবন পরিশুদ্ধ ও পরিপাটি হয়; আর এ আদব হলো দীন ইসলামের সারবস্তু; সুতরাং মুসলিম ব্যক্তির জন্য জরুরি হলো আল্লাহ তা‘আলার সাথে, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এবং সাধরণ মানুষসহ সকল সৃষ্টির সাথে আদব রক্ষা করে চলা; আর এ আদবের মাধ্যমেই একজন মুসলিম জানতে পারবে তার খাবার ও পানীয় গ্রহণের সময় তার অবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ; কিভাবে তার সালাম প্রদান, অনুমতি গ্রহণ, বসা, কথা বলা, আনন্দ ও শোক প্রকাশ করা, হাঁচি দেওয়া ও হাই তোলার মত বিবিধ কাজ সম্পন্ন হবে; আর কেমন ব্যবহার হবে তার পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে। এক কথায় এ আদব-কায়দা রক্ষা করে চলার মাধ্যমেই একজন মুসলিম কাঙ্খিত মানের ভদ্র ও সভ্য মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং নিজেকে অন্যান্য জাতির চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে; ফলে দীন ইসলামের সৌন্দর্য ছড়িয়ে যাবে সমাজ, রাষ্ট্র ও দুনিয়ার দিক দিগন্তে। তাইতো কেউ কেউ শিক্ষার চেয়ে আদব বা শিষ্টাচারের বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন; ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« تَأَدَّبُوا ثُمَّ تَعَلَّمُوا » .
“তোমরা আগে সুসভ্য হও, তারপর জ্ঞান অর্জন কর।” আল-কারাফী তাঁর ‘আল-ফারুক’ গ্রন্থে বলেন:
«وَاعْلَمْ أَنَّ قَلِيلَ الْأَدَبِ خَيْرٌ مِنْ كَثِيرٍ مِنْ الْعَمَلِ » .
“আর জেনে রাখবে, অনেক বেশি কাজের চেয়ে অল্প আদব অনেক বেশি উত্তম।” আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন:
« لَا يَنْبُلُ الرَّجُلُ بِنَوْعٍ مِنْ الْعِلْمِ مَا لَمْ يُزَيِّنْ عِلْمَهُ بِالْأَدَبِ » .
“ব্যক্তি কোনো প্রকার জ্ঞান দ্বারা মহৎ হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার জ্ঞানকে আদব দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে।” তিনি আরও বলেন:
« نَحْنُ إلَى قَلِيلٍ مِنْ الْأَدَبِ أَحْوَجُ مِنَّا إلَى كَثِيرٍ مِنْ الْعِلْمِ » .
“আমরা অনেক বেশি জ্ঞানের চেয়ে কম আদবকে অনেক বেশি জরুরি বা প্রয়োজন মনে করতাম।” কোনো কোনো দার্শনিক বলেন:
« لَا أَدَبَ إلَّا بِعَقْلٍ ، وَلَا عَقْلَ إلَّا بِأَدَبٍ » .
“আকল (বুদ্ধি) ছাড়া আদব হয় না; আবার আদব ছাড়া আকলও হয় না।” অর্থাৎ একটি আরেকটির পূরিপূরক। আর জনৈক সৎব্যক্তি তার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
« اجْعَلْ عَمَلَك مِلْحًا وَأَدَبَك دَقِيقًا » .
“তুমি তোমার আমলকে মনে করবে লবণ, আর তোমার আদবকে মনে করবে ময়দা।” অর্থাৎ তুমি আমলের চেয়ে আদবকে এত বেশি গুরুত্ব দিবে, লবণ ও ময়দার স্বাভাবিক মিশ্রণে উভয়ের অনুপাত যেভাবে কম বেশি হয়।
* * *

দ্বিতীয় অধ্যায়
নিয়তের আদবসমূহ
মুসলিম ব্যক্তি নিয়তের মর্যাদা ও প্রভাবের প্রতি বিশ্বাস করে এবং আরও বিশ্বাস করে তার ধর্মীয় ও জাগতিক জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের জন্য নিয়তের গুরুত্বকে। কারণ, নিয়তের দ্বারাই সকল কাজের অস্তিত্ব লাভ করে এবং নিয়ত অনুযায়ীই তার রূপ-প্রকৃতি তৈরি হয়; ফলে সে অনুসারে তা শক্তিশালী হয়, দুর্বল হয়, শুদ্ধ হয় এবং নষ্ট হয়; আর মুসলিম ব্যক্তি প্রত্যেক কাজে নিয়তের প্রয়োজনীয়তা ও তা বিশুদ্ধকরণের আবশ্যকতার বিষয়টিকেও বিশ্বাস করে। এ ব্যাপারে সে প্রথমত আল্লাহর বাণী থেকে দলীল গ্রহণ করে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ ﴾ [البينة: ٥]
“আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।” আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ قُلۡ إِنِّيٓ أُمِرۡتُ أَنۡ أَعۡبُدَ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ١١ ﴾ [الزمر: ١١]
“বলুন, ‘আমি তো আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি, আল্লাহ‌র আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর ‘ইবাদাত করতে।” আর দ্বিতীয়ত দলীল গ্রহণ করে মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী থেকে, তিনি বলেন:
« إنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى » . (متفق عليه).
“প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত; আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।” তিনি আরও বলেন:
« إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ » . (رواه مسلم).
“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কর্মের দিকে লক্ষ্য করেন।” আর অন্তরের দিকে লক্ষ্য করা মানে নিয়তের দিকে লক্ষ্য করা; কেননা, নিয়ত হলো কাজের উদ্দেশ্য ও প্রতিরক্ষক। অপর এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَةٌ » . (رواه مسلم).
“যে ব্যক্তি ভালোকাজের পরিকল্পনা করল, কিন্তু বাস্তবে সে কাজ করতে পারল না, সে ব্যক্তির জন্য সাওয়াব লেখা হবে।” সুতরাং শুধু ভালোকাজের পরিকল্পনা করার দ্বারাই কাজটি ভালোকাজ হিসেবে গণ্য হয়ে যায়, প্রতিদান সাব্যস্ত হয়, সাওয়াব অর্জন হয়; আর এটা শুধু ভালো নিয়তের ফযীলতের করণেই সম্ভব হয়। অপর এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَثَلُ هَذِهِ الْأُمَّةِ كَمَثَلِ أَرْبَعَةِ نَفَرٍ : رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا وَعِلْمًا ، فَهُوَ يَعْمَلُ بِعِلْمِهِ فِي مَالِهِ يُنْفِقُهُ فِي حَقِّهِ ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ عِلْمًا وَلَمْ يُؤْتِهِ مَالًا ، فَهُوَ يَقُولُ : لَوْ كَانَ لِي مِثْلُ هَذَا عَمِلْتُ فِيهِ مِثْلَ الَّذِي يَعْمَلُ ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : فَهُمَا فِي الْأَجْرِ سَوَاءٌ . وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا وَلَمْ يُؤْتِهِ عِلْمًا ، فَهُوَ يَخْبِطُ فِي مَالِهِ يُنْفِقُهُ فِي غَيْرِ حَقِّهِ ، وَرَجُلٌ لَمْ يُؤْتِهِ اللَّهُ عِلْمًا وَلَا مَالًا ، فَهُوَ يَقُولُ : لَوْ كَانَ لِي مِثْلُ هَذَا عَمِلْتُ فِيهِ مِثْلَ الَّذِي يَعْمَلُ ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : فَهُمَا فِي الْوِزْرِ سَوَاءٌ » . (رواه ابن ماجه).
“এ উম্মতের দৃষ্টান্ত চার ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত: ১. এক ব্যক্তি হলো আল্লাহ তাকে সম্পদ ও ‘ইলম (জ্ঞান) দান করেছেন, অতঃপর সে তার জ্ঞান দ্বারা আমল করে তার সম্পদকে হক পথে খরচ করে; ২. আরেক ব্যক্তি হলো আল্লাহ তাকে ‘ইলম দান করেছেন, কিন্তু তাকে সম্পদ দেননি, অতঃপর সে বলে: আমার যদি এ ব্যক্তির মত সম্পদ থাকত, তাহলে আমি সে ক্ষেত্রে সে ব্যক্তির মতই কাজ করতাম; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: সাওয়াবের ক্ষেত্রে তারা উভয়ে সমান। ৩. অপর আরেক ব্যক্তি হলো আল্লাহ তাকে সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু তাকে ‘ইলম দেননি, অতঃপর সে তার সম্পদের ক্ষেত্রে এলোমেলোভাবে কাজ করে তা অন্যায় পথে খরচ করে; ৪. অপর আরেক ব্যক্তি হলো আল্লাহ তাকে সম্পদ ও ‘ইলম কোনটিই দান করেননি, অতঃপর সে বলে: আমার যদি এ ব্যক্তির মত সম্পদ থাকত, তাহলে আমি সে ক্ষেত্রে সে ব্যক্তির মতই কাজ করতাম; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: গুনাহের ক্ষেত্রে তারা উভয়ে সমান।” সুতরাং ভালো নিয়তকারী ব্যক্তিকে ভালোকাজের সাওয়াব দেওয়া হয়; আর মন্দ নিয়তকারী ব্যক্তিকে মন্দকাজের মন্দ প্রতিদান দেওয়া হয়; আর এর একমাত্র কারণ হল নিয়ত।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধের সময় তাবুকে অবস্থান কালে বলেন:
« لَقَدْ تَرَكْتُمْ بِالْمَدِينَةِ أَقْوَامًا مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا ، وَلاَ أَنْفَقْتُمْ مِنْ نَفَقَةٍ ، وَلاَ قَطَعْتُمْ مِنْ وَادٍ إِلاَّ وَهُمْ مَعَكُمْ فِيهِ ». قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يَكُونُونَ مَعَنَا وَهُمْ بِالْمَدِينَةِ ؟ فَقَالَ : « حَبَسَهُمُ الْعُذْرُ » . (فَشَرَكُوا بِحُسْنِ النيةِ ) » . (رواه أبو داود و البخاري).
“তোমরা মদীনাতে এমন সম্প্রদায়কে রেখে এসেছ, যারা কোনো দূরপথ ভ্রমণ করেনি, কোনো অর্থ-সম্পদ খরচ করেনি এবং কোনো উপত্যকাও অতিক্রম করেনি, তবুও তারা তোমাদের সাথে (সাওয়াবে) শরীক রয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম রা. নিবেদন করলেন: তারা কিভাবে আমাদের সাথে সাওয়াবের অংশীদার হবে, অথচ তারা মদীনাতেই ছিল? তখন তিনি বললেন: ‘ওযর’ তাদেরকে আটকিয়ে রেখেছিল। (তারা ভালো নিয়তের মাধ্যেমে আমাদের সাথে শরীক হয়েছে)।” সুতরাং ভালো নিয়তের কারণে গাযী না হয়েও গাযীর মত সাওয়াবে অংশীদার হবে, আর মুজাহিদ না হয়েও মুজাহিদের মত সাওয়াব পাবে। অপর এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا التَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِى النَّارِ ». فَقِيلَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ! هَذَا الْقَاتِلُ ، فَمَا بَالُ الْمَقْتُولِ ؟ فَقَالَ : « إِنَّهُ قَدْ أَرَادَ قَتْلَ صَاحِبِهِ » . (متفق عليه).
“যখন দু’জন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হবে, তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে যাবে। প্রশ্ন করা হল: হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ হত্যাকারী (তো অপরাধী), কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তখন তিনি বললেন: কারণ, সে তার সঙ্গীকে হত্যা করার ইচ্ছা (নিয়ত) করেছিল।” সুতরাং হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তির মাঝে জাহান্নাম আবশ্যক হওয়ার বিষয়টিকে সমান করে দিল তাদের উভয়ের মন্দ নিয়ত ও খারাপ উদ্দেশ্য। তার নিয়ত যদি খারাপ না হত, তাহলে সে জান্নাতের অধিবাসী হত। অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« من تَزوَّج بصدَاقٍ لا يَنْوِي أداءَهُ فهو زَانٍ , و من أدَانَ دَيْناً و هو لا يَنْوِي قَضَاءَهُ فهو سارقٌ » . (رواه أحمد و ابن ماجه).
“যে ব্যক্তি এমন পরিমাণ মোহরের বিনিময়ে বিয়ে করেছে, যা সে পরিশোধ করার নিয়ত নেই, সে ব্যক্তি ব্যভিচারী; আর যে ব্যক্তি এমন ঋণ গ্রহণ করেছে, যা তার পরিশোধ করার ইচ্ছা নেই, সে ব্যক্তি চোর।” সুতরাং মন্দ নিয়ত বৈধ জিনিসকে হারামে রূপান্তরিত করল এবং জায়েয বিষয়কে নিষিদ্ধ বস্তুতে পরিণত করল; আর যা সমস্যামুক্ত ছিল, তা সমস্যাযুক্ত হয়ে গেল।
এ সব কিছুই মুসলিম ব্যক্তি যে নিয়তের মর্যাদা ও প্রভাব এবং তার বড় ধরনের গুরুত্বের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও নিবিড় আস্থা পোষণ করে, সে বিষয়টিকে আরও মজবুত করে; ফলে সে বিশুদ্ধ নিয়তের উপর তার সকল কর্মকাণ্ডের ভিত রচনা করে; ঠিক অনুরূপভাবে সে সর্বাত্মক চেষ্টা সাধনা করে যাতে তার একটি কাজও নিয়ত ছাড়া বা বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া সংঘটিত না হয়; কারণ, নিয়ত হলো কর্মের প্রাণ ও ভিত্তি; সুতরাং নিয়ত সঠিক তো কাজও সঠিক, আর নিয়ত শুদ্ধ নয় তো কাজও শুদ্ধ নয়; আর কর্তার বিশুদ্ধ নিয়ত ব্যতীত কাজ হলো মোনাফেকী, কৃত্রিম, নিন্দিত ও ঘৃণিত।
আর অনুরূপভাবে মুসলিম ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, আমলসমূহ বিশুদ্ধ হওয়ার অন্যতম রুকন ও শর্ত হলো নিয়ত; তারপর সে মনে করে যে, নিয়ত শুধু মুখে (হে আল্লাহ! আমি এরূপ নিয়ত করেছি) উচ্চারণ করার নাম নয়, আবার নিয়ত বলতে শুধু মনের ভাবকেই বুঝায় না, বরং নিয়ত হলো সঠিক উদ্দেশ্যে— উপকার হাসিল বা ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য যথাযথ কাজের প্রতি মনের ঝোঁক বা জাগরণ এবং অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অথবা তাঁর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে কাজের প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
আর মুসলিম ব্যক্তি যখন বিশ্বাস করে যে, ভালো নিয়তের কারণে বৈধ কাজ প্রতিদান ও সাওয়াবের উপযুক্ত আনুগত্যে পরিণত হয় এবং বিশুদ্ধ নিয়তের অভাবে সাওয়াবের কাজও গুনাহ্ ও শাস্তির উপযুক্ত অন্যায় ও অবাধ্যতায় পরিণত হয়, তখন সে মনে করে না যে, অন্যায় ও অবাধ্যতার ক্ষেত্রে ভালো নিয়তের ফলে তা সাওয়াবের কাজে পরিণত হয়; সুতরাং যিনি কোনো ব্যক্তির গিবত করবেন অপর কোনো ব্যক্তির মন ভালো করার জন্য, তিনি এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য ও পাপী বলে বিবেচিত হবেন, তার তথা কথিত ভালো নিয়ত এখানে তার কোনো উপকারে আসবে না; আর যে ব্যক্তি হারাম অর্থ দ্বারা মাসজিদ নির্মাণ করবে, তাকে এ কাজের জন্য সাওয়াব দেয়া হবে না; আর যে ব্যক্তি নাচ-গান ও রঙ্গ-তামাশার অনুষ্ঠানে হাজির হয় জিহাদ ও অনুরূপ কোনো কাজে উৎসাহ পাওয়ার জন্য অথবা লটারীর টিকেট ক্রয় করে কল্যাণমূলক কাজে উৎসাহিত করার নিয়তে, সে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য ও পাপী বলে বিবেচিত হবে এবং সাওয়াব পাওয়ার পরিবর্তে গুনাহগার হবে; আর যে ব্যক্তি সৎ ব্যক্তিগণের প্রতি ভালোবাসার নিয়তে তাদের কবরের উপর গম্বুজ তৈরি করবে অথবা তাদের উদ্দেশ্যে পশু যবাই করবে অথবা তাদের জন্য মানত করবে, সে ব্যক্তিও তার এ কাজের জন্য আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য ও পাপী বলে বিবেচিত হবে, যদিও তার ধারণা মতে তার নিয়তটি ভালো হয়ে থাকে; কারণ, অনুমোদিত ‘মুবাহ’ (বৈধ) কাজের ক্ষেত্রে ছাড়া অন্য কোনো কাজই সৎ নিয়তের কারণে সাওয়াবের কাজ বলে গণ্য হবে না; আর হারাম কাজ তো কোনো অবস্থাতেই সাওয়াবের কাজে রূপান্তরিত হবে না।
* * *

তৃতীয় অধ্যায়
আল্লাহ তা‘আলার সাথে মুসলিম বান্দার আদব
মুসলিম ব্যক্তি তার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অগণিত নি‘য়ামতের প্রতি লক্ষ্য করে; আরও লক্ষ্য করে ঐসব নি‘য়ামতের প্রতি, যেসব নি‘য়ামত তার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময় থেকে শুরু করে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ (মৃত্যু) করা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে তাকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। ফলে সে তার নিজ মুখে তাঁর যথাযথ প্রশংসা ও গুণকীর্তন করার দ্বারা এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহকে তাঁর আনুগত্যের অধীনস্থ করে দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করে; আর এটাই হলো তার পক্ষ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাথে আদব; কেননা, নি‘য়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহকে অস্বীকার করা, তাকে এবং তার ইহসান ও অবদানকে অবজ্ঞা করাটা কোনো আদব বা শিষ্টাচরের মধ্যে পড়ে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَا بِكُم مِّن نِّعۡمَةٖ فَمِنَ ٱللَّهِۖ ﴾ [النحل: ٥٣]
“তোমাদের নিকট যেসব নিয়ামত রয়েছে, তা তো আল্লাহর নিকট থেকেই (এসেছে)।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَإِن تَعُدُّواْ نِعۡمَةَ ٱللَّهِ لَا تُحۡصُوهَآۗ ﴾ [النحل: ١٨]
“তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা কর, তবে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ فَٱذۡكُرُونِيٓ أَذۡكُرۡكُمۡ وَٱشۡكُرُواْ لِي وَلَا تَكۡفُرُونِ ١٥٢ ﴾ [البقرة: ١٥٢]
“কাজেই তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।”
আর মুসলিম ব্যক্তি গভীরভাবে লক্ষ্য করে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার সম্পর্কে জানেন এবং তার সকল অবস্থা অবলোকন করেন; ফলে তার হৃদয়-মন তাঁর ভয়ে ও তাঁর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠে; যার কারণে সে তাঁর অবাধ্যতায় লজ্জিত হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণ ও তাঁর আনুগত্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাওয়াটাকে রীতিমত অপমান মনে করে। সুতরাং এটাও তার পক্ষ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাথে আদব; কেননা, গোলাম কর্তৃক তাঁর মালিকের সাথে অবাধ্য আচরণ করা অথবা মন্দ ও ঘৃণ্য কোনো বস্তু বা বিষয় নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হওয়া, অথচ তিনি তা সরাসরি দেখতে পাচ্ছেন— তা কোনো ভাবেই আদব বা শিষ্টাচরের মধ্যে পড়ে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ مَّا لَكُمۡ لَا تَرۡجُونَ لِلَّهِ وَقَارٗا ١٣ وَقَدۡ خَلَقَكُمۡ أَطۡوَارًا ١٤ ﴾ [نوح: ١٣، ١٤]
“তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহ‌র শ্রেষ্ঠত্বের পরওয়া করছ না। অথচ তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَيَعۡلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعۡلِنُونَۚ ﴾ [التغابن: ٤]
“আর তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর এবং তোমরা যা প্রকাশ কর।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَا تَكُونُ فِي شَأۡنٖ وَمَا تَتۡلُواْ مِنۡهُ مِن قُرۡءَانٖ وَلَا تَعۡمَلُونَ مِنۡ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيۡكُمۡ شُهُودًا إِذۡ تُفِيضُونَ فِيهِۚ وَمَا يَعۡزُبُ عَن رَّبِّكَ مِن مِّثۡقَالِ ذَرَّةٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فِي ٱلسَّمَآءِ ﴾ [يونس: ٦١]
“আর আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন এবং আপনি সে সম্পর্কে কুরআন থেকে যা-ই তিলাওয়াত করেন এবং তোমরা যে আমলই কর না কেন, আমরা তোমাদের সাক্ষী থাকি- যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও। আর আসমানসমূহ ও যমীনের অণু পরিমাণও আপনার রবের দৃষ্টির বাইরে নয়।”
আবার মুসলিম ব্যক্তি গভীরভাবে এটাও লক্ষ্য করে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার উপর ক্ষমতাবান, সে তাঁর আয়াত্তাধীন এবং তাঁর দিকে ছাড়া তার পালানোর, মুক্তির ও আশ্রয় নেয়ার আর কোনো জায়গা নেই; সুতরাং সে আল্লাহর দিকে ধাবিত হবে, তাঁর সামনে নিজেকে সমর্পণ করে দেবে, তার বিষয়াদি তাঁর নিকট সোপর্দ করবে এবং তাঁর উপর ভরসা করবে; ফলে এটা তার পক্ষ থেকে তার প্রতিপালক ও সৃষ্টা আল্লাহ তা‘আলার সাথে আদব বলে গণ্য হবে; কেননা, যাঁর থেকে পালিয়ে বেড়ানোর কোনো সুযোগ নেই তাঁর কাছ থেকে পালানো, যার কোনো ক্ষমতা নেই তার উপর নির্ভর করা এবং যার কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই তার উপর ভরসা করা কোনো আদব বা শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ مَّا مِن دَآبَّةٍ إِلَّا هُوَ ءَاخِذُۢ بِنَاصِيَتِهَآۚ ﴾ [هود: ٥٦]
“এমন কোন জীব-জন্তু নেই, যে তাঁর পূর্ণ আয়ত্তাধীন নয়।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ فَفِرُّوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۖ إِنِّي لَكُم مِّنۡهُ نَذِيرٞ مُّبِينٞ ٥٠ ﴾ [الذاريات: ٥٠]
“অতএব তোমরা আল্লাহর দিকে ধাবিত হও, নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক স্পষ্ট সতর্ককারী।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ ٢٣ ﴾ [المائ‍دة: ٢٣]
“এবং আল্লাহর উপরই তোমরা নির্ভর কর, যদি তোমরা মুমিন হও।”
আবার মুসলিম ব্যক্তি এটাও গভীরভাবে লক্ষ্য করে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার সকল বিষয়ে তার প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তার প্রতি ও তাঁর (আল্লাহর) সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া ও করুণা করেন, যার কারণে সে এর চেয়ে আরও বেশি আশা করে; ফলে সে খালেসভাবে তাঁর নিকট অনুনয়, বিনয় ও নিবেদন করে এবং ভালো কথা ও সৎ আমলের অছিলা ধরে তাঁর নিকট প্রার্থনা করে; সুতরাং এটা তার পক্ষ থেকে তার মাওলা আল্লাহ তা‘আলার সাথে আদব বলে গণ্য হবে; কারণ, যে রহমত সকল কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে তার থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়া, যে ইহসান সকল সৃষ্টিকে শামিল করে তার থেকে হতাশ বা নিরাশ হওয়া এবং যে দয়া ও অনুগ্রহ সকল সৃষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করে তার আশা ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে কোনো আদব বা শিষ্টাচার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖۚ ﴾ [الاعراف: ١٥٦]
“আর আমার দয়া তো প্রত্যেক বস্তুকে ঘিরে রয়েছে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ ٱللَّهُ لَطِيفُۢ بِعِبَادِهِۦ ﴾ [الشورا: ١٩]
“আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত কোমল।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَلَا تَاْيۡ‍َٔسُواْ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِۖ ﴾ [يوسف: ٨٧]
“এবং আল্লাহর রহমত হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِۚ ﴾ [الزمر: ٥٣]
“তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না।”
আর মুসলিম ব্যক্তি এটাও গভীরভাবে লক্ষ্য করে যে, তার প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা’র ধরা বড় কঠিন, তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন এবং তিনি খুব দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী; ফলে সে তাঁর আনুগত্য করার মাধ্যমে তাঁকে ভয় করে এবং আত্মরক্ষা করে তাঁর অবাধ্য না হওয়ার মধ্য দিয়ে; ফলে এটাও আল্লাহ তা‘আলার সাথে তার পক্ষ থেকে আদব বলে গণ্য হয়; কারণ, কোনো বুদ্ধিমানের নিকটই এটা আদব বলে গণ্য হবে না যে, একজন দুর্বল আক্ষম বান্দা মহাপরাক্রমশালী প্রবল শক্তিধর মহান ‘রব’ আল্লাহ তা‘আলার মুখোমুখী হবে বা তাঁর বিরোধিতা করবে; অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِذَآ أَرَادَ ٱللَّهُ بِقَوۡمٖ سُوٓءٗا فَلَا مَرَدَّ لَهُۥۚ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَالٍ ١١ ﴾ [الرعد: ١١]
“আর কোনো সম্প্রদায়ের জন্য যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছে করেন, তবে তা রদ হওয়ার নয় এবং তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ إِنَّ بَطۡشَ رَبِّكَ لَشَدِيدٌ ١٢ ﴾ [البروج: ١٢]
“নিশ্চয় আপনার রবের পাকড়াও বড়ই কঠিন।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَٱللَّهُ عَزِيزٞ ذُو ٱنتِقَامٍ ٤ ﴾ [ال عمران: ٤]
“আর আল্লাহ মহা-পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।”
আর মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হওয়ার মুহূর্তে এবং তাঁর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাঁর প্রতি এমনভাবে লক্ষ্য করে যে, মনে হয় যেন আল্লাহর দেওয়া হুমকি তাকে পেয়ে বসেছে, তাঁর আযাব বুঝি তার প্রতি নাযিল হয়ে গেল এবং তাঁর শাস্তি যেন তার আঙ্গিনায় আপতিত হল; অনুরূপভাবে সে তাঁর আনুগত্য করার মুহূর্তে এবং তাঁর শরী‘য়তের অনুসরণ করার সময় তাঁর প্রতি এমনভাবে লক্ষ্য করে যে, মনে হয় যেন তিনি তাঁর দেয়া প্রতিশ্রুতি তার জন্য সত্যে পরিণত করে দিয়েছেন এবং তাঁর সন্তুষ্টির চাদর খুলে তাকে ঢেকে দিয়েছেন; সুতরাং এটা হলো মুসলিম ব্যক্তির পক্ষ থেকে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি সুধারণা বিশেষ; আর আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করাটা আদব বা শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত; কেননা, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক আল্লাহ তা‘আলার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করাটা কোনো ভাবেই আদবের মধ্যে পড়ে না; কারণ, সে তাঁর অবাধ্য হয়ে চলবে এবং তাঁর আনুগত্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে, আর ধারণা করবে যে, তিনি তার ব্যাপারে অবগত নন এবং তিনি তাকে তার পাপের জন্য পাকড়াও করবেন না; অথচ তিনি বলেন:
﴿ وَلَٰكِن ظَنَنتُمۡ أَنَّ ٱللَّهَ لَا يَعۡلَمُ كَثِيرٗا مِّمَّا تَعۡمَلُونَ ٢٢ وَذَٰلِكُمۡ ظَنُّكُمُ ٱلَّذِي ظَنَنتُم بِرَبِّكُمۡ أَرۡدَىٰكُمۡ فَأَصۡبَحۡتُم مِّنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٢٣ ﴾ [فصلت: ٢٢، ٢٣]
“বরং তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা করতে তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না। আর তোমাদের রব সম্বন্ধে তোমাদের এ ধারণাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা হয়েছ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার সাথে এটাও আদব নয় যে, বান্দা তাঁকে ভয় করবে ও তাঁর আনুগত্য করবে এবং ধারণা করবে যে, তিনি তাকে তার ভালো কাজের প্রতিদান দিবেন না এবং তার পক্ষ থেকে তিনি তাঁর আনুগত্য ও ‘ইবাদতকে কবুল করবেন না; অথচ তিনি বলেন:
﴿ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَخۡشَ ٱللَّهَ وَيَتَّقۡهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَآئِزُونَ ٥٢ ﴾ [النور: ٥٢]
“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে তারাই কৃতকার্য।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٩٧ ﴾ [النحل: ٩٧]
“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, তাকে আমি অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ مَن جَآءَ بِٱلۡحَسَنَةِ فَلَهُۥ عَشۡرُ أَمۡثَالِهَاۖ وَمَن جَآءَ بِٱلسَّيِّئَةِ فَلَا يُجۡزَىٰٓ إِلَّا مِثۡلَهَا وَهُمۡ لَا يُظۡلَمُونَ ١٦٠ ﴾ [الانعام: ١٦٠]
“কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে। আর কেউ কোনো অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তার অনুরূপ প্রতিফলই দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।”
আর মূলকথা হলো: মুসলিম ব্যক্তি কর্তৃক তার প্রতিপালকের দেয়া নি‘য়ামতের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা, তাঁর অবাধ্যতার দিকে ধাবিত হওয়ার সময় তাঁকে লজ্জা পাওয়া, তাঁর কাছে সত্যিকার অর্থে তাওবা করা, তাঁর উপর ভরসা করা, তাঁর রহমতের প্রত্যাশা করা, তাঁর শাস্তিকে ভয় করা, তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে এবং তাঁর ইচ্ছা মাফিক তাঁর কোনো বান্দার প্রতি শাস্তিমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাঁর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করাটাই হলো আল্লাহ তা‘আলার সাথে তার আদব রক্ষা করে চলা; আর বান্দা কর্তৃক এ আদবের যতটুকু ধারণ ও রক্ষা করে চলবে, ততটুকু পরিমাণে তার মর্যাদা সমুন্নত হবে, মান উন্নত হবে এবং সম্মান বৃদ্ধি পাবে; ফলে সে আল্লাহর অভিভাবকত্ব ও তা তাঁর তত্ত্ববধানে থাকা ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তাঁর রহমত ও নি‘য়ামত পাওয়ার উপযুক্ত হবে।
আর এটাই মুসলিম ব্যক্তির দীর্ঘ জীবনের একমাত্র চাওয়া এবং চূড়ান্ত প্রত্যাশা। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আপনার অভিভাবকত্ব নসীব করুন, আপনি আমাদেরকে আপনার তত্ত্ববধান থেকে বঞ্চিত করবেন না এবং আমাদেরকে আপনার নিকটতম বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত করুন; হে আল্লাহ! হে জগতসমূহের প্রতিপালক! আমাদের আবেদন কবুল করুন।
* * *

চতুর্থ অধ্যায়
আল্লাহর বাণী ‘আল-কুরআনুল কারীম’-এর সাথে বান্দার আদব
মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার বাণী এবং সকল বাণীর উপর তাঁর বাণীর সম্মান ও মর্যাদায় বিশ্বাস করে। আরও মনে করে, যে ব্যক্তি কুরআন দ্বারা কথা বলে, সে সত্য বলে; আর যে ব্যক্তি তাঁর দ্বারা বিচার ফয়সালা করে, সে ন্যায়বিচার করে; আর তাঁর ধারক-বাহকগণ আল্লাহর পরিবার ও তাঁর নিকটতম বিশেষ ব্যক্তিবর্গ; আর তাঁকে যারা আকড়ে ধরবে, তারা নাজাতপ্রাপ্ত সফলকাম; আর যারা তাঁকে পরিহার করে চলে, তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আর আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের মহত্ব, পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে মুসলিম ব্যক্তির ঈমানে আরও বৃদ্ধি ঘটাবে, যা বর্ণিত হয়েছে ওহী’র ধারক সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ আমাদের নেতা মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে; যেমন— তিনি বলেন:
« اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لأَصْحَابِهِ » . (أخرجه مسلم) .
“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর; কেননা, কিয়ামতের দিন তা তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারীশকারীরূপে উপস্থিত হবে।” তিনি আরও বলেন:
« خَيْركُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآن وَعَلَّمَهُ » . (أخرجه البخاري) .
“তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে আল-কুরআনের শিক্ষা লাভ করে এবং তা অন্যকে শিক্ষা দেয়।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« أَهْلُ الْقُرْآنِ هُمْ أَهْلُ اللَّهِ وَخَاصَّتُهُ » . (رواه النسائي و ابن ماجه و أحمد و الحاكم).
“আল-কুআনের ধারক-বাহকগণ আল্লাহর পরিবার ও তাঁর নিকটতম বিশেষ ব্যক্তিবর্গ।” তিনি আরও বলেন:
« إن القلوبَ تصدأ كما يصدأ الحديدُ ، فقيل : يا رسول الله ! وما جلاؤها ؟ فقال: تلاوةُ القرآن ، وذكرُ الموتِ » . (رواه البيهقي).
“অন্তর মরিচাযুক্ত হয়, যেমনিভাবে লোহতে মরিচা পড়ে; অতঃপর জিজ্ঞাসা করা হল: হে আল্লাহর রাসূল! তা দূর করার উপায় কী? জবাবে তিনি বললেন: কুরআন তিলাওয়াত করা এবং মুত্যুর কথা স্মরণ করা।” আরেক বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চরমভাবে ঝগড়াকারীদের কোনো একজন তাঁর নিকট এসে বলল: হে মুহাম্মাদ! তুমি আমার নিকট কুরআন তিলাওয়াত কর, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করেন:
﴿ ۞إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُ بِٱلۡعَدۡلِ وَٱلۡإِحۡسَٰنِ وَإِيتَآيِٕ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَيَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِ وَٱلۡبَغۡيِۚ يَعِظُكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ ٩٠ ﴾ [النحل: ٩٠]
“আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচারণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালংঘ করতে; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করে শেষ করতে না করতেই প্রচণ্ড ঝগড়াটে ব্যক্তি তাঁর শব্দের মহত্বে ও অর্থের পবিত্রতায় বিস্মিত হয়ে, তার স্পষ্টতায় আক্রান্ত হয়ে এবং প্রভাবিত করার শক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে তা পুনরায় তিলাওয়াত করার আবেদন করল; আর সে দেরি করেনি আল্লাহর বাণীর পবিত্রতা ও মহত্বের ব্যাপারে স্বীকৃতি ও সাক্ষ্য প্রদান করতে; কেননা, সে এক বাক্যে বলে ফেলল:
« والله ، إنَّ لَه لحلاوةً ، وإنّ عَليه لطَلاوَة ، وإنّ أسفَلَه لمورِقٌ ، وإنَّ أعلاَه لمثمِر ، وما يقول هذا بشر ! » .
“আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই তার মধুরতা রয়েছে, রয়েছে তার সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা, তার নীচের অংশ সবুজ-শ্যামল এবং উপরের অংশ ফলদায়ক; আর এটা কোনো মানুষের কথা নয়!।”
আর এ জন্য মুসলিম ব্যক্তি তাঁর প্রতি বিশ্বাস করার পাশাপাশি তার হালাল বিষয়কে হালাল মনে করে, তার হারাম বিষয়কে হারাম মনে করে, তার আদবসমূহ যথাযথভাবে পালন করে এবং তার চারিত্রিক ও নৈতিক বিষয়সমূহকে স্বীয় চরিত্র বলে গ্রহণ করে; সুতরাং সে আল-কুরআন তিলাওয়াত করার সময় নিম্নোক্ত আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে:
১. অবস্থার পরিপূর্ণতা নিশ্চিত করে পবিত্রতাসহ কিবলামুখী হয়ে আদব ও সম্মানের সাথে বসে কুরআন পাঠ করা।
২. ধীরস্থিরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এ ক্ষেত্রে তাড়াহুরা না করা; সুতরাং কমপক্ষে তিন দিনের কমে কুরআন খতম করবে না; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ لَمْ يَفْقَهْهُ » . (رواه أصحاب السنن و أحمد) .
“যে ব্যক্তি তিন দিনের কম সময়ের মধ্যে আল-কুরআন পাঠ করে শেষ করে, সে ব্যক্তি তা বুঝতে পারেনি।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা প্রতি সপ্তাহে কুরআন খতম করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ, উসমান ইবন ‘আফ্ফান ও যায়েদ ইবন সাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম প্রতি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করতেন।
৩. কুরআন তিলাওয়াতের সময় বিনয়ী ও ভীতশ্রদ্ধ হওয়া এবং দুঃখ প্রকাশ করা; আর ক্রন্দন করা, অথবা কাঁদতে না পারলে কাঁদার ভান করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« اتْلُوُا الْقُرْآنَ وَابْكُوْا ، فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا » . (رواه ابن ماجه).
“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর এবং ক্রন্দন করো; আর যদি কাঁদতে না পারো, তাহলে কাঁদার ভান কর।”
৪. মধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ » . (رواه أحمد و ابن ماجه و النسائي و الحاكم).
“তোমরা সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত কর।” তিনি আরও বলেন:
« لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ » . (رواه البخاري) .
“যে ব্যক্তি ভাল আওয়াজে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” তিনি আরও বলেন:
« ما أذِنَ اللهُ لشيءٍ ما أَذِنَ لِنَبيٍّ أنْ يتَغنَّى بالقُرآن » . (متفق عليه) .
“আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কোনো এক নবী থেকে (মধুময় সুরে) যেভাবে কুরআন শ্রবণ করেছেন, সেভাবে আর কিছুই তিনি শুনেননি।”
৫. গোপনে তিলাওয়াত করা, যদি সে তার নিজের ব্যাপারে প্রদর্শনী বা সুখ্যাতি ছড়ানোর আশঙ্কা করে অথবা তার দ্বারা সালাত আদায়কারীর সালাত আদায়ে বিঘ্ন ঘটে; কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« الْجَاهِرُ بِالْقُرْآنِ كَالْجَاهِرِ بِالصَّدَقَةِ » . (رواه أبو داود و الترمذي).
“আল-কুরআনের মাধ্যমে নিজেকে প্রচারকারী ঐ ব্যক্তির মত, যে সাদকা করার মাধ্যমে নিজেকে প্রচার করে বেড়ায়।” উল্লেখ্য যে, গোপনে সাদকা করাই উত্তম, কিন্তু প্রকাশ করার মধ্যে নির্দিষ্ট কেনো ফায়দা থাকলে ভিন্ন কথা, যেমন— মানুষকে সাদকা করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রকাশ্যে সাদকা করা; আর কুরআন তিলাওয়াতের বিষয়টিও অনুরূপ।
৬. তাঁর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও মনোযোগসহ চিন্তা ও গবেষণার সাথে তা তিলাওয়াত করা এবং তাঁর অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করা।
৭. কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাঁর ব্যাপারে অমনোযোগী এবং তাঁর বিরোধী না হওয়া; কারণ, এমনটি করলে নিজেই নিজের অভিশাপের কারণ হবে; কেননা, সে যদি পাঠ করে:
﴿ لَّعۡنَتَ ٱللَّهِ عَلَى ٱلۡكَٰذِبِينَ ٦١ ﴾ [ال عمران: ٦١]
(মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর লা‘নত)। অথবা পাঠ করে:
﴿ أَلَا لَعۡنَةُ ٱللَّهِ عَلَى ٱلظَّٰلِمِينَ ١٨ ﴾ [هود: ١٨]
(সাবধান! আল্লাহর লা‘নত যালিমদের উপর) এবং নিজে যদি মিথ্যাবাদী বা যালিম হয়, তাহলে সে নিজেকে নিজে অভিশাপ বা লা‘নতকারী বলে গণ্য হবে।
আর নিম্নোক্ত বর্ণনাটি আল্লাহর কিতাব থেকে মুখ ফিরেয়ে নেয়া গাফিল ব্যক্তিগণের ভুলের পরিমাণ সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছে; বর্ণিত আছে: “তাওরাত কিতাবে এসেছে যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তুমি কি আমাকে লজ্জা পাও, তোমার কোনো ভাইয়ের নিকট থেকে তোমার কাছে একটি গ্রন্থ আসে এমতাবস্থায় যে, তুমি রাস্তার মধ্যে হাঁটছ, তারপর তুমি সে বইটির কারণে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ছ, তারপর তা পাঠ করছ এবং তা নিয়ে অক্ষরে অক্ষরে গবেষণা করছ, এমনকি তার কোনো কিছুই তোমার কাছ থেকে বাদ যায় না; আর এটা আমার কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, তুমি লক্ষ্য কর তো, তোমার জন্য আমি তাতে কথাগুলো কিভাবে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি, আর তাতে কতবার আমি তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার জন্য তোমাকে তাগিদ দিয়েছি, তারপর তুমি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, সুতরাং আমি তোমার তথাকথিত ভাইদের কারো কারো চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল, তাই না ? হে আমার বান্দা! তোমার কোনো ভাই তোমার নিকট এসে বসে, তারপর তুমি একেবারে তার মুখোমুখি হয়ে বসে যাও এবং তোমার ষোলআনা মন দিয়ে কান পেতে তার কথা শ্রবণ করতে থাক, তারপর কোনো কথক যদি কথা বলে অথবা তার কথা শুনার সময় কেউ তোমাকে বিরক্ত করে, তাহলে তুমি তার দিকে ইশারা করে বলো যে, তুমি থাম বা চুপ কর; আর আমি তোমার কাছে এসে তোমার সাথে কথা বলি, অথচ তুমি মন- দিল দিয়ে সচেতনভাবে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও; সুতরাং তুমি কি তোমার ভাইদের কারো কারো চেয়ে আমাকে তোমার নিকটে সবচেয়ে বেশি দুর্বল বলে ধারণা করেছ?!
৮. আল-কুরআনের ধারক ও বাহকগণ তথা আল্লাহর পরিবার ও তাঁর বিশেষ ব্যক্তিবর্গের গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত হওয়ার এবং তাদের বৈশিষ্ট্যের দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা; যেমনটি আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন:
« ينبغي لقارئ القرآن أن يُعْرَف بليله إذ الناس نائمون , وبنهاره إذ الناس مُفْطِرون , وببكائه إذ الناس يضحكون , وبورعه إذ الناس يخلطون ، وبصمته إذ الناس يخوضون , وبخشوعه إذ الناس يختالون , وبحزنه إذ الناس يفرحون » .
“আল-কুরআনের পাঠককে এমন হতে হবে যে, তাকে রাতের বেলায় চেনা যাবে, যখন জনগণ ঘুমিয়ে থাকবে, আর দিনের বেলায় চেনা যাবে, যখন জনগণ সাওম পালন না করে পানাহার করবে; আর তাকে চেনা যাবে তাঁর ক্রন্দন দ্বারা, যখন জনগণ হাসবে; আর তাকে চেনা যাবে তার ‘তাকওয়া’ এর দ্বারা, যখন জনগণ পরস্পর মিশে যাবে এবং তাকে চেনা যাবে তার মৌনতার দ্বারা, যখন জনগণ কথাবার্তায় নিমগ্ন হবে; আর তাকে চেনা যাবে তার নম্রতা দ্বারা, যখন জনগণ গর্ব-অহঙ্কার করবে এবং তাকে চেনা যাবে তার দুঃখ-কষ্টের দ্বারা, যখন জনগণ আনন্দ প্রকাশ করবে।”
আর মুহাম্মাদ ইবন কা‘ব বলেন: আমরা আল-কুরআনের পাঠককে চিনতাম তার ফেকাশে বর্ণের চেহারার দ্বারা; তিনি এর দ্বারা তার রাত্রি জাগরণ ও দীর্ঘ সময় ধরে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আর ওহাইব ইবনুল ওয়ারদ বলেন: জনৈক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হলো তুমি কি ঘুমাও না? জবাবে সে বলল: আল-কুরআনের বিস্ময়কর দিকগুলো আমার ঘুমকে ঘেরাও করে রেখেছে। আর যূন নূন আল-মিসরী আবৃত্তি করে বলেন:
منع القرآن بوعده ووعيده
مُقَل العيون بليلها لا تهجَعُ
(আল-কুরআন তাঁর প্রতিশ্রুতি ও হুমকির দ্বারা বারণ করে
অক্ষিগোলককে তার রাতের বেলায়— তুমি ঘুমাবে না)।
فهموا عن الملك العظيم كلامه
فهماً تَذِلُّ له الرقابُ وتخضَعُ
(তারা মহান অধিপতির বাণী সম্পর্কে এমনভাবে অনুধাবন করে,
যে অনুধাবনে তাঁর উদ্দেশ্য তাদের ঘাড় বিনীতভাবে অবনত হয়)।
* * *


পঞ্চম অধ্যায়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুমিন বান্দার আদব
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করার আবশ্যকতার বিষয়টি মুসলিম ব্যক্তি তার মনে প্রাণে অনুভব করে; আর এ আবশ্যকতার ব্যাপারটি নিম্নোক্ত কারণে:
১. আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও নারীর উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করে চলার বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُقَدِّمُواْ بَيۡنَ يَدَيِ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۖ ﴾ [الحجرات: ١]
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোনো বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَرۡفَعُوٓاْ أَصۡوَٰتَكُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ ٱلنَّبِيِّ وَلَا تَجۡهَرُواْ لَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ كَجَهۡرِ بَعۡضِكُمۡ لِبَعۡضٍ أَن تَحۡبَطَ أَعۡمَٰلُكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تَشۡعُرُونَ ٢ ﴾ [الحجرات: ٢]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর নিজেদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল, তার সাথে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না; এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সকল কাজ বিনষ্ট হয়ে যাবে, অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصۡوَٰتَهُمۡ عِندَ رَسُولِ ٱللَّهِ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ ٱمۡتَحَنَ ٱللَّهُ قُلُوبَهُمۡ لِلتَّقۡوَىٰۚ لَهُم مَّغۡفِرَةٞ وَأَجۡرٌ عَظِيمٌ ٣ ﴾ [الحجرات: ٣]
“নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কন্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِن وَرَآءِ ٱلۡحُجُرَٰتِ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡقِلُونَ ٤ وَلَوۡ أَنَّهُمۡ صَبَرُواْ حَتَّىٰ تَخۡرُجَ إِلَيۡهِمۡ لَكَانَ خَيۡرٗا لَّهُمۡۚ ﴾ [الحجرات: ٤، ٥]
“নিশ্চয় যারা হুজরাসমূহের পিছন থেকে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই বুঝে না। আর আপনি বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত যদি তারা ধৈর্য ধারণ করত, তবে তা-ই তাদের জন্য উত্তম হত।” তিনি আরও বলেন:
﴿ لَّا تَجۡعَلُواْ دُعَآءَ ٱلرَّسُولِ بَيۡنَكُمۡ كَدُعَآءِ بَعۡضِكُم بَعۡضٗاۚ ﴾ [النور: ٦٣]
“তোমরা রাসূলের আহ‌বানকে তোমাদের একে অপরের আহ্বানের মত গণ্য করো না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَإِذَا كَانُواْ مَعَهُۥ عَلَىٰٓ أَمۡرٖ جَامِعٖ لَّمۡ يَذۡهَبُواْ حَتَّىٰ يَسۡتَ‍ٔۡذِنُوهُۚ ﴾ [النور: ٦٢]
“মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনে এবং রাসূলের সঙ্গে সমষ্টিগত ব্যাপারে একত্র হলে তারা অনুমতি ছাড়া সরে পড়ে না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَسۡتَ‍ٔۡذِنُونَكَ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۚ فَإِذَا ٱسۡتَ‍ٔۡذَنُوكَ لِبَعۡضِ شَأۡنِهِمۡ فَأۡذَن لِّمَن شِئۡتَ مِنۡهُمۡ ﴾ [النور: ٦٢]
“নিশ্চয় যারা আপনার অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের উপর ঈমান রাখে। অতএব তারা তাদের কোনো কাজের জন্য আপনার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছে আপনি অনুমতি দেবেন।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا نَٰجَيۡتُمُ ٱلرَّسُولَ فَقَدِّمُواْ بَيۡنَ يَدَيۡ نَجۡوَىٰكُمۡ صَدَقَةٗۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ لَّكُمۡ وَأَطۡهَرُۚ فَإِن لَّمۡ تَجِدُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٌ ١٢ ﴾ [المجادلة: ١٢]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সাদাকাহ্ পেশ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পরিশোধক; কিন্তু যদি তোমরা অক্ষম হও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
২. আল্লাহ তা‘আলা মুমিনগণের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার বিষয়টিকে ফরয করে দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে তাঁকে মহব্বত করার বিষয়টিকেও তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ ۞يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ ﴾ [محمد: ٣٣]
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।” তিনি আরও বলেন:
﴿ فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٦٣ ﴾ [النور: ٦٣]
“কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ ﴾ [الحشر: ٧]
“আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে, তা থেকে বিরত থাক।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ ﴾ [ال عمران: ٣١]
“বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন।”
৩. আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে ইমাম (নেতা) ও বিচারক বানিয়ে দিয়েছেন; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِتَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ بِمَآ أَرَىٰكَ ٱللَّهُۚ ﴾ [النساء: ١٠٥]
“আমরা তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন, সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করতে পারেন।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَأَنِ ٱحۡكُم بَيۡنَهُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعۡ أَهۡوَآءَهُمۡ ﴾ [المائ‍دة: ٤٩]
“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, আপনি সে অনুযায়ী বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না।” তিনি আরও বলেন:
﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء: ٦٥]
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারের ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” তিনি আরও বলেন:
﴿ لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ ﴾ [الاحزاب: ٢١]
“অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ, তার জন্য যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের।”
আর ইমাম ও বিচারকের সাথে ভদ্রতা ও সভ্যতা বজায় রেখে চলার বিষয়টিকে শরী‘য়তের বিধিবিধানসমূহ ফরয করে দিয়েছে, বিবেক-বুদ্ধি তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সঠিক যুক্তি তাকে মেনে নিয়েছে।
৪. আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মহব্বত করার বিষয়টিকে তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের) ভাষায় ফরয করে দিয়েছেন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ » . (متفق عليه).
“সেই সত্তার কসম করে বলছি, যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান-সন্ততি, তার পিতামাতা ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হব।” আর যাঁকে ভালোবাসা আবশ্যক, তাঁর সাথে আদব রক্ষা করে চলাটাও বাধ্যতামূলক এবং তাঁর সাথে সভ্য আচরণ করা বাঞ্ছনীয়।
৫. যাঁকে তাঁর রব আল্লাহ তা‘আলা শারীরিক গঠনাকৃতি ও নৈতিক চরিত্রের সৌন্দর্যের দ্বারা বিশেষিত করেছেনে এবং যাঁকে আত্মসম্মান ও বৈশিষ্ট্যের পূর্ণতা দান করেছেন, তিনি হলেন সবচেয়ে সুন্দর ও শ্রেষ্ঠতর সৃষ্টি; সুতরাং যাঁর এ অবস্থা, তাঁর সাথে ভদ্র ও সভ্য আচরণ করার বিষয়টি আবশ্যক হবে না কিভাবে!
এসব হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আদব রক্ষা করে চলার কিছু জরুরি বিষয় এবং এগুলো ছাড়া আরও অনেক বিষয় রয়েছে; কিন্তু কিভাবে আদব রক্ষা করা যাবে? আর কিসের দ্বারা সে আদব রক্ষা করা সম্ভব হবে? এ বিষয়টি ভালভাবে জানতে হবে!
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আদব হবে:
১. দীন ও দুনিয়ার সকল নিয়মনীতি ও কর্মপদ্ধতিতে তাঁর আনুগত্য করা, পদাঙ্ক অনুসরণ করা এবং তাঁর পদক্ষেপ অনুযায়ী পরিকল্পনা করা।
২. তাঁর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও মর্যাদার উপর অপর কোনো সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা, অথবা সম্মান, বা মর্যাদাকে অগ্রাধিকার না দেওয়া।
৩. তিনি যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতেন, তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা; তিনি যাকে শত্রু বলে গ্রহণ করতেন, তাকে শত্রুরূপে গ্রহণ করা; তিনি যাতে সন্তুষ্ট থাকতেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা; আর তিনি যার প্রতি রাগান্বিত হতেন, তার প্রতি রাগ করা।
৪. তাঁর নামকে সম্মান করা এবং তাঁর নাম উচ্চারণের সময় শ্রদ্ধা করা; তাঁর প্রতি সালাত (দুরূদ) ও সালাম পেশ করা; তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং তাঁর মহৎ গুণাবলী ও মর্যাদাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা।
৫. দীন ও দুনিয়ার বিষয়ে তিনি যেসব সংবাদ দিয়েছেন এবং দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের ব্যাপারে গায়েবী বিষয়ে যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেসব ব্যাপারে তাঁকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করা।
৬. তাঁর সুন্নাতকে জীবিত করা এবং তাঁর শরী‘য়তকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা; আর তাঁর দা‘ওয়াতকে পৌঁছিয়ে দেওয়া এবং তাঁর অসীয়ত তথা নির্দেশসমূহ বাস্তবায়ন করা ।
৭. আল্লাহ তা‘আলা যাকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর ও মাসজিদে নববী যিয়ারত করার মত সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছেন, তাঁর কবরের নিকট এবং মাসজিদে নববীতে তার কণ্ঠস্বরকে নিম্নগামী করা।
৮. তাঁর ভালোবাসার কারণে সৎব্যক্তিগণকে ভালোবাসা ও বন্ধরূপে গ্রহণ করা; আর তাঁর ঘৃণার কারণে ফাসীকদেরকে ঘৃণা করা এবং তাদের সাথে শত্রুতা করা।
এগুলো হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আদব তথা শিষ্টাচারপূর্ণ ব্যবহারের কিছু বাহ্যিক চিত্র।
সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি সেসব আদব পরিপূর্ণভাবে পালন ও সংরক্ষণের ব্যাপারে সব সময় সচেষ্ট থাকবে; কেননা, এর উপর তার জীবনের পরিপূর্ণতা ও সফলতা নির্ভর করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নিকট আমাদের নিবেদন, তিনি যেন আমাদেরকে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আদব রক্ষা করে চলার তাওফীক দান করেন এবং আমাদেরকে তাঁর অনুসারী, সাহায্যকারী (আনসার) ও তাঁর অনুকরণকারীদের মাঝে আন্তর্ভুক্ত করে নেন; আর তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর আনুগত্য করার সুযোগ করে দেন এবং আমাদেরকে তাঁর শাফা‘আত (সুপারিশ করা) থেকে বঞ্চিত না করেন। ‘আল্লাহুম্মা আমীন’ (হে আল্লাহ! আপনি আমাদের আবেদন কবুল করুন)।
* * *

ষষ্ঠ অধ্যায়
স্বীয় নাফসের সাথে মুসলিম বান্দার আদবসমূহ
মুসলিম ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের সফলতা নির্ভর করে তার ‘নাফস’ তথা স্বীয় মনকে সংশোধন, পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করার পরিধির উপর; যেমনিভাবে তার জীবনের ব্যর্থতা নিশ্চিত হয় তার মনের ভ্রষ্টতা, নিষ্ক্রিয়তা, কলুষতা, অবিত্রতা ও অশুদ্ধতার কারণে; আর এর পিছনে দলীল বা যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ مَن زَكَّىٰهَا ٩ وَقَدۡ خَابَ مَن دَسَّىٰهَا ١٠ ﴾ [الشمس: ٩، ١٠]
“সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পবিত্র করেছে। আর সে-ই ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَذَّبُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا وَٱسۡتَكۡبَرُواْ عَنۡهَا لَا تُفَتَّحُ لَهُمۡ أَبۡوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلۡجَمَلُ فِي سَمِّ ٱلۡخِيَاطِۚ وَكَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُجۡرِمِينَ ٤٠ لَهُم مِّن جَهَنَّمَ مِهَادٞ وَمِن فَوۡقِهِمۡ غَوَاشٖۚ وَكَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلظَّٰلِمِينَ ٤١ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَا نُكَلِّفُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَآ أُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلۡجَنَّةِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٤٢ ﴾ [الاعراف: ٤٠، ٤٢]
“নিশ্চয় যারা আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে এবং তা সম্বন্ধে অহংকার করে, তাদের জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না- যতক্ষণ না সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে। আর এভাবেই আমরা অপরাধীদেরকে প্রতিফল দেব। তাদের শয্যা হবে জাহান্নামের এবং তাদের উপরের আচ্ছাদনও; আর এভাবেই আমরা যালিমদেরকে প্রতিফল দেব। আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে- আমরা কারো উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত ভার চাপিয়ে দেই না- তারাই জান্নাতবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَٱلۡعَصۡرِ ١ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَفِي خُسۡرٍ ٢ إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ ﴾ [العصر: ١، ٣]
“সময়ের শপথ, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মাঝে নিপতিত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« كُلُّ أُمَّتِي يَدخُلُونَ الجَنَّةَ إلاَّ مَنْ أبَى . قَالُوا : وَمَنْ يَأبَى يَا رَسُول الله ؟ قَالَ : مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الجَنَّةَ ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أبَى » . (رواه البخاري).
“আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করে, সে ব্যতীত; তারা প্রশ্ন করল: হে আল্লাহ রাসূল! কে অস্বীকার করবে? জবাবে তিনি বললেন: যে আমার অনুসরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যে আমার অবাধ্য হবে, সেই মূলত অস্বীকারকারী।” তিনি আরও বলেন:
« كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا » . (رواه مسلم).
“প্রত্যেক মানুষ সকালে উঠে নিজেকে বিক্রি করে দেয়; তারপর সে নিজেকে মুক্ত করে অথবা ধ্বংস করে।”
অনুরূপভাবে মুসলিম ব্যক্তি এটাও বিশ্বাস করে যে, যার উপর ভিত্তি করে আত্মা পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হবে, তা হলো ঈমানের সৌন্দর্য ও সৎকাজ; আর যার কারণে আত্মা কলুষিত, অপবিত্র ও ধ্বংস হবে, তা হলো কুফরী ও অবাধ্যতার মত খারাপ কাজ; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ طَرَفَيِ ٱلنَّهَارِ وَزُلَفٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِۚ إِنَّ ٱلۡحَسَنَٰتِ يُذۡهِبۡنَ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِۚ ﴾ [هود: ١١٤]
“আর আপনি সালাত কায়েম করুন দিনের দুই প্রান্তভাগে ও রাতের প্রথমাংশে। নিশ্চয় সৎকাজ অসৎকাজকে মিটিয়ে দেয়।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ بَلۡۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ ١٤ ﴾ [المطففين: ١٤]
“বরং তারা যা অর্জন করেছে, তা-ই তাদের হৃদয়ে জঙ্ ধরিয়েছে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ ذنباً كَانَ نُكْتَةً سَوْدَاءَ فِي قَلْبِهِ ، فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَعْتَبَ ، صُقِلَ قَلْبُهُ ، وَإِنْ زَادَ زَادَتْ حَتَّى تَغْلقَ قَلْبَهُ » . (رواه النسائي و الترمذي و أحمد).
“নিশ্চয় মুমিন বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরের মধ্যে তা একটি কালো দাগ সৃষ্টি করে; তারপর যদি সে তাওবা করে, গুনাহ থেকে দূরে থাকে এবং অনুতপ্ত হয়, তাহলে তার অন্তরকে চকচকে পরিষ্কার করে দেয়া হয়; আর যদি গুনাহর সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে (অন্তরের মধ্যে) কালো দাগের সংখ্যাও বাড়তে থাকবে, এমনকি শেষ পর্যন্ত তা তার অন্তরকে ঢেকে ফেলবে।” আর এটাই হলো অন্তরে মরিচা বা জঙ্ ধরা, যা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ كَلَّاۖ بَلۡۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ ١٤ ﴾ [المطففين: ١٤]
“কখনো নয়; বরং তারা যা অর্জন করেছে তা-ই তাদের হৃদয়ে জঙ্ ধরিয়েছে।” তিনি আরও বলেন:
« اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا ، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ » . (رواه أحمد و الترمذي و الحاكم).
“তুমি যেখানেই থাক, আল্লাহকে ভয় কর; আর অসৎকাজ করলে তার পরপরই সৎকাজ কর, তাহলে তা মন্দ কাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে; আর মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার কর।”
এ জন্য মুসলিম ব্যক্তি সার্বক্ষণিক কাজ করবে তার ‘নাফস’ তথা আত্মার সংশোধন, পরিশুদ্ধকরণ ও পবিত্রকরণে জন্য; কারণ, ঐ ব্যক্তির আত্মাই উত্তম, যে আদব রক্ষা করে চলে; সুতরাং সে তার নাফসের জন্য এমন কতগুলো আদব রক্ষা করবে, যা তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তার ময়লাসমূহকে দূর করে তাকে পবিত্র করবে; অনুরূপভাবে তাকে দূরে রাখবে খারাপ আকিদা-বিশ্বাস এবং মন্দ কথা ও কাজের মত এমন সব বিষয় থেকে, যা তাকে কলুষিত ও নষ্ট করে দেয়; আর সে তার উন্নতির জন্য রাতদিন চেষ্টা-সাধনা করবে এবং প্রতি মুহূর্তে আত্মসমালোচনা করবে; সে তাকে ভালোকাজে পরিচালিত করবে এবং তাকে (আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের) আনুগত্য করতে বাধ্য করবে; ঠিক অনুরূপভাবে সে তাকে দূরে রাখবে যাতীয় খারাপ ও মন্দ থেকে; আর তাকে সংশোধন ও পরিমার্জনের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহের অনুসরণ করবে:
(ক) তাওবা (التوبة ):
তাওবার উদ্দেশ্য হলো সকল প্রকার অপরাধ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা, পূর্বের কৃত প্রত্যেকটি গুনাহ’র জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যৎ জীবনে পুনরায় সেসব গুনাহ না করার ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আর এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمۡ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَيُدۡخِلَكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ ﴾ [التحريم: ٨]
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর- বিশুদ্ধ তাওবা; সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٣١ ﴾ [النور: ٣١]
“আর তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” আর আল্লাহ তা‘আলা শু‘আইব আ. এর বক্তব্য বর্ণনা করে বলেন:
﴿ وَٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ ثُمَّ تُوبُوٓاْ إِلَيۡهِۚ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٞ وَدُودٞ ٩٠ ﴾ [هود: ٩٠]
“আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাঁর দিকে ফিরে আস; আমার রব তো পরম দয়ালু, অতি স্নেণহময় ।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّى أَتُوبُ فِى الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ » . (رواه مسلم ).
“হে মানবগোষ্ঠী! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর; কারণ, আমি তাঁর কাছে দিনে একশত বার তাওবা করি।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ » . (رواه مسلم).
“যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্বে তাওবা করবে, তার তাওবা আল্লাহ কবুল করবেন।” তিনি আরও বলেন:
« إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِىءُ النَّهَارِ ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِىءُ اللَّيْلِ ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا » . (رواه مسلم ).
“আল্লাহ তা‘আলা পশ্চিম দিকে সূর্যোদয় না হওয়া পর্যন্ত (কিয়ামত পর্যন্ত) প্রত্যেক রাতে তাঁর ক্ষমার হাত প্রসারিত করবেন, যাতে দিনের গুনাহগার তাওবা করে। আবার তিনি দিনের বেলায় ক্ষমার হাত প্রসারিত করবেন, যাতে রাতের গুনাহগার তাওবা করে।” তিনি আরও বলেন:
« لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ مِنْ رَجُلٍ فِى أَرْضٍ دَوِيَّةٍ مَهْلَكَةٍ مَعَهُ رَاحِلَتُهُ عَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ ، فَنَامَ فَاسْتَيْقَظَ وَقَدْ ذَهَبَتْ فَطَلَبَهَا حَتَّى أَدْرَكَهُ الْعَطَشُ ، ثُمَّ قَالَ أَرْجِعُ إِلَى مَكَانِى الَّذِى كُنْتُ فِيهِ ، فَأَنَامُ حَتَّى أَمُوتَ ، فَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى سَاعِدِهِ لِيَمُوتَ فَاسْتَيْقَظَ وَعِنْدَهُ رَاحِلَتُهُ وَعَلَيْهَا زَادُهُ وَطَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَاللَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ الْعَبْدِ الْمُؤْمِنِ مِنْ هَذَا بِرَاحِلَتِهِ وَزَادِهِ » . (رواه مسلم ).
“আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুমিন বান্দার তাওবায় ঐ ব্যক্তির চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে ব্যক্তি খাদ্য ও পানীয় নিয়ে তার বাহন তথা উটসহ মরুভুমিতে অবস্থান করে, অতঃপর ঘুমিয়ে পড়ে, তারপর জেগে উঠে দেখে সেই উটটি চলে গেছে; অতঃপর সে তাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে যায়; অতঃপর সে বলে: আমি যেখানে ছিলাম, সেখানে ফিরে যাব, অতঃপর মৃত্যু পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকব। অতঃপর সে মরে যাওয়ার জন্য তার বাহুর উপর মাথা রাখল; অতঃপর সে জেগে উঠে দেখল, তার নিকটেই খাদ্য ও পানীয়সহ তার উটটি অবস্থান করছে। সুতরাং ঐ ব্যক্তি তার উট ও রসদপত্র ফিরে পেয়ে যেমন আনন্দিত হল, আল্লাহ তা‘আলা মুমিন বান্দার তাওবায় তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত হন।” আরও বর্ণিত আছে যে, ফেরেশ্তাগণ আদম আ. কে তাঁর তাওবার কারণে অভিনন্দন জানিয়েছে, যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওবা কবুল করেছেন। তিনি আরও বলেন:
« يَضْحَكُ اللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى إِلَى رَجُلَيْنِ يقْتلُ أَحَدهُمَا الآخَرَ يَدْخُلانِ الجَنَّةَ ، يُقَاتِلُ هَذَا في سَبيلِ اللهِ فَيُقْتَلُ ، ثُمَّ يتُوبُ اللهُ عَلَى القَاتلِ فَيُسْلِم فَيُسْتَشْهَدُ » . (رواه البخاري).
“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এমন দুই ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে হাসবেন, যাদের একজন অপরজনকে হত্যা করবে এবং উভয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। একজন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শহীদ হবে। তারপর আল্লাহ হত্যাকারীর তাওবা কবুল করবেন এবং সে ইসলাম গ্রহণ করে (জিহাদে) শহীদ হয়ে যাবে।” আরও বর্ণিত আছে যে, ফেরেশ্তাগণ আদম আ. কে তাঁর তাওবার কারণে অভিনন্দন জানিয়েছে, যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওবা কবুল করেছেন।
(খ) মুরাকাবা (المراقبة ):
আর ‘মুরাকাবা’ হচ্ছে মুসলিম ব্যক্তি কর্তৃক তার ‘নাফস’কে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা’র পর্যবেক্ষণে নিয়ে যাওয়া এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাকে সেভাবে নিয়োজিত রাখা, এমনকি তার ব্যাপারে পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা অর্জিত হওয়া এমনভাবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার ব্যাপারে পূর্ণ অবগত, তিনি তার গোপন বিষয়সমূহ জানেন, তার কর্মকাণ্ডসমূহ পর্যবেক্ষণ করেন, তাকে তত্ত্ববধান করেন এবং প্রত্যেকটি ‘নাফস’ যা অর্জন করে তিনি তা নিবিড়ভাবে দেখাশুনা করেন; আর এর দ্বারা তার আত্মা পুরাপুরিভাবে আল্লাহ তা‘আলার পর্যবেক্ষণের আওতায় চলে যাবে, তাঁর স্মরণে সে আনন্দ অনুভব করবে, তাঁর আনুগত্য করতে মজা পাবে, তাঁর সান্নিধ্য পেতে উৎসাহিতবোধ করবে, তাঁর দিকে এগিয়ে যাবে এবং তিনি ভিন্ন অন্যকে পরিহার করবে।
আর এটাই হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে উল্লেখিত নিজেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করার অর্থ; তিনি বলেন:
﴿ وَمَنۡ أَحۡسَنُ دِينٗا مِّمَّنۡ أَسۡلَمَ وَجۡهَهُۥ لِلَّهِ وَهُوَ مُحۡسِنٞ ﴾ [النساء: ١٢٥]
“তার চেয়ে দ্বীনে আর কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ ۞وَمَن يُسۡلِمۡ وَجۡهَهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ وَهُوَ مُحۡسِنٞ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰۗ ﴾ [لقمان: ٢٢]
“আর যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে নিজেকে আল্লাহ কাছে সমর্পণ করে, সে তো দৃঢ়ভাবে ধরলো এক মজবুত হাতল।” আর এটাই হলো ‘মুরাকাবা’-এর আসল বিষয়, যে দিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীর মধ্যে আহ্বান করেছেন, তিনি বলেন:
﴿ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِيٓ أَنفُسِكُمۡ فَٱحۡذَرُوهُۚ ﴾ [البقرة: ٢٣٥]
“আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন। কাজেই তাঁকে ভয় কর।” তিনি আরও বলেন:
﴿ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا ١ ﴾ [النساء: ١]
“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَا تَكُونُ فِي شَأۡنٖ وَمَا تَتۡلُواْ مِنۡهُ مِن قُرۡءَانٖ وَلَا تَعۡمَلُونَ مِنۡ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيۡكُمۡ شُهُودًا إِذۡ تُفِيضُونَ فِيهِۚ ﴾ [يونس: ٦١]
“আর আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন এবং আপনি সে সম্পর্কে কুরআন থেকে যা-ই তিলাওয়াত করেন এবং তোমরা যে আমলই কর না কেন, আমরা তোমাদের সাক্ষী থাকি-- যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ ، فَإِنَّهُ يَرَاكَ » . (متفق عليه).
“তুমি আল্লাহ তা‘আলার ‘ইবাদত করবে এমনভাবে, মনে হয় যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে মনে রাখবে তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।”
আর এটা এমন এক বিষয়, যাতে অভ্যস্ত হয়েছেন এ উম্মতের প্রথম দিকের সৎকর্মশীল বিশেষ ব্যক্তিবর্গ, যাঁরা এ বিষয়টিকে নিজেদের জীবনের ব্রত (লক্ষ্য) হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এমনকি তাঁদের পূর্ণ একীন বা আস্থা অর্জিত হয়েছে এবং তাঁরা আল্লহর নিকটতম বান্দাদের মর্যাদায় উপনীত হয়েছেন; আর এখানে তাঁদের কিছু বিবরণ তুলে ধরা হলো, যা তাঁদের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে:
১. জুনাইদ রহ. কে জিজ্ঞাস করা হলো: দৃষ্টিকে অবনমিত রাখার জন্য কিসের সাহায্য নেয়া যেতে পারে? জবাবে তিনি বললেন: তোমার এ জ্ঞান দ্বারাই তা সম্ভব হবে যে, কোনো বস্তুর দিকে তোমার নজর যওয়ার চেয়ে তোমার দিকে দর্শক আল্লাহর নজর বা দৃষ্টি অনেক বেশি দ্রুতগামী।
২. সুফিয়ান সাওরী রহ. বলেন: তোমার উচিৎ হবে এমন সত্তাকে ভয় করা, যাঁর কাছে তোমার কোনো কিছুই গোপন থাকে না; তোমার কর্তব্য হলো এমন সত্তার নিকট কোনো কিছুর আশা করা, যিনি তা পুরণ করার ক্ষমতা রাখেন এবং তোমার উচিৎ হবে এমন এক সত্তার ব্যাপারে সাবধান হওয়া, যিনি শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখেন।
৩. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. জনৈক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বললেন: হে অমুক! তুমি আল্লাহকে ভয় কর; তখন লোকটি তাঁকে ‘মুরাকাবা’ তথা আল্লার ভয় সম্পকে জিজ্ঞাসা করলেন; জবাবে তিনি তাকে বললেন: তুমি সব সময় এমনভাবে জীবনযাপন করবে, মনে হয় যেন তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাচ্ছো।
৪. আবদুল্লাহ ইবন দিনার বলেন: আমি ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলাম এবং পথিমধ্যে আমরা বিশ্রামের জন্য অবস্থান করলাম, অতঃপর পাহাড় থেকে এক রাখাল আমাদের নিকট নেমে আসল; অতঃপর ওমর রা. তাকে লক্ষ্য করে বললেন: হে রাখাল! এ ছাগলের পাল থেকে একটি ছাগল আমাদের কাছে বিক্রি কর; তখন রাখাল বলল যে, সে গোলাম মাত্র (ছাগলের মালিক নয়); তারপর ওমর রা. তাকে বলল: তুমি তোমার মালিককে বলবে ছাগলটি বাঘে খেয়েছে; তখন গোলাম বলল: আল্লাহ কোথায় থাকবেন? এ কথা শুনে ওমর রা. কেঁদে ফেললেন এবং পরের দিন রাখালটির মালিকের নিকট গেলেন এবং তার কাছ থেকে তাকে (গোলামটিকে) ক্রয় করে নিয়ে মুক্ত করে দিলেন।
৫. কোনো এক সৎব্যক্তি থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদল লোকের নিকট দিয়ে পথ অতিক্রম করেন, যারা মল্লযুদ্ধ বা তীর নিক্ষেপের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, আর একজন তাদের থেকে দূরে বসে তা উপভোগ করছে; তারপর তিনি তার সাথে কথা বলার উদ্দেশ্যে তার দিকে অগ্রসর হলেন এবং তাকে বললেন: আমি (তোমার কাছে) আল্লাহর স্মরণ প্রত্যাশা করি; তখন সে বলল: তুমি কি একা? জবাবে তিনি বললেন: আমার সাথে আমার রব এবং আমার দুই ফেরেশ্তা আছেন; এবার তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: এদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি সবচেয়ে অগ্রগামী? জবাবে সে বলল: যাকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন; এবার সে তাকে জিজ্ঞাসা করল: রাস্তা কোথায়, অর্থাৎ কোথায় যাবেন? জবাবে তিনি আকাশের দিকে ইঙ্গিত করলেন এবং হাঁটতে শুরু করলেন।
৬. বর্ণিত আছে যে, যুলায়খা যখন ইউসূফ আ. কে নির্জনে একাকী পেল, তখন দাঁড়িয়ে গেল এবং তার (ঘরে সংরক্ষিত) মূর্তির চেহারা ঢেকে দিল; তারপর ইউসূফ আ. বললেন: তোমার কী হয়েছে? তুমি কি একটি নিষ্প্রাণ জড়পদার্থের দেখে ফেলবে বলে লজ্জা পাচ্ছো? তাহলে আমি কি মহাপরাক্রমশালী বাদশার পর্যবেক্ষণ বা পরিদর্শনকে লজ্জা পাবো না?
আবার কেউ কেই আবৃত্তি করেন:
إِذَا مَا خَلَوْتَ الدَّهْرَ يَوْمًا فَلا تَقُلْ خَلَوْتُ وَلَكِنْ قُلْ: عَلَيَّ رَقِيبُ
(যখনই তুমি একদিন সময় অতিবাহিত করবে, তখন তুমি বলবে না
আমি সময় অতিবাহিত করে ফেললাম, বরং তুমি বল: আমার উপর রয়েছেন এক পর্যবেক্ষ- প্রহরী)।
وَ لا تَحْسَبَنَّ اللهَ يَغْفَلُ سَاعَةً وَ لا أَنَّ مَا تُخْفي عَلَيْهِ يَغِيبُ
(আর তুমি আল্লাহকে এক মুহূর্তের জন্যও গাফেল বা অসতর্ক মনে করো না,
আর তুমি তাঁর কাছ থেকে যা কিছুই গোপন করবে, তাঁর কাছে তা গোপনও থাকবে না)।
ألم تر أن اليومَ أسرعُ ذاهبٍ و أن غداً للناظرين قريبُ
(তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে, আজকের দিনটি কত দ্রুত চলে যাচ্ছে,
আর আগামী দিনটি দর্শকদের জন্য খুবই নিকটবর্তী) ?
(গ) মুহাসাবা (المحاسبة ):
আর ‘মুহাসাবা’ হলো যখন মুসলিম ব্যক্তি এ জীবনে রাতদিন এমনভাবে আমল করে, যা তাকে পরকালে সৌভাগ্যবান করবে, আখিরাতে সম্মান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে সম্ভব করে তুলবে এবং দুনিয়া হবে তার মৌসুম বা সময়কাল, তখন তার উচিত হলো তার উপর আবশ্যকীয় ফরয ও ওয়াজিব বিষয়গুলোর প্রতি এমনভাবে নজর দেওয়া, যেমনিভাবে একজন ব্যবসায়ী তার মূলধনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে; আর নফল বিষয়গুলোর প্রতি এমনভাবে নজর দেওয়া, যেমনিভাবে একজন ব্যবসায়ী মূলধনের উপর অতিরিক্ত লাভের দিকে দৃষ্টি রাখে; আর অবাধ্যতা ও অপরাধের দিকে দৃষ্টি রাখবে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার মত করে; অতঃপর প্রত্যেক দিনের শেষে নিরিবিলে নির্জনে একটি সময় করে তাতে তার সেদিনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করবে; তারপর সে যদি দেখে ফরযসমূহ পালনে কোনো ঘাটতি বা ত্রুটি হয়েছে, তাহলে সে স্বীয় নাফসকে তিরস্কার করবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা সংশোধন করার জন্য পদক্ষেপ নেবে। সুতরাং তা যদি কাযা আদায় করার মত কোনো বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে কাযা করে নেবে; আর কাযা আদায় করার মত বিষয় না হলে বেশি করে নফল আদায় করার মাধ্যমে তার ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করবে; আর যদি সে নফলের ব্যাপারে ঘাটতি দেখে, তাহলে ঘাটতি পূরণ করে নেবে এবং তা সংশোধন করবে। আর যদি সে নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হওয়ার কারণে কোনো ক্ষতির বিষয় লক্ষ্য করে, তাহলে সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অনুতপ্ত হবে, তাওবা করবে এবং এমন ভালো কাজ করবে, যাকে সে তার অন্যায়ের পরিপূরক মনে করবে।
আর এটাই হলো ‘মুহাসাবা’ তথা আত্মসমালোচনার মূল উদ্দেশ্য; আর আত্মসমালোচনা হলো ‘নাফস’ তথা আত্মাকে সংস্কার, সংশোধন, পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করার অন্যতম একটি পদ্ধতি; আর তার কিছু দলীল ও দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ:
১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَلۡتَنظُرۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٖۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ ١٨ ﴾ [الحشر: ١٨]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।” সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَلۡتَنظُرۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٖۖ ﴾ -এর মধ্যে ব্যক্তিকে প্রতিক্ষিত আগামী দিন তথা পরকালোর জন্য কী আমল করা হয়েছে, সে বিষয়ে আত্মসমালোচনা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
২. আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٣١ ﴾ [النور: ٣١]
“তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِى وَإِنِّى لأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِى الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ » . (رواه مسلم ).
“(কখনও কখনও) আমার অন্তরের উপর পর্দা ফেলা হয়; আর আমি দৈনিক একশতবার আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।”
৪. ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا » .
“তোমরা হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার পূর্বেই তোমাদের নিজেদের হিসাব নিজেরা নিয়ে নাও।” আর যখন রাতের আগমন ঘটত, তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু দোর্রা বা লাঠি দিয়ে তাঁর দু’পায়ে পিটাতেন এবং নিজেকে প্রশ্ন করে বলতেন: তুমি আজকে কী কাজ করেছ?
৫. আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে যখন তাঁর বাগান তাঁর সালাত আদায় করার বিষয়টিকে ভুলিয়ে রাখল, তখন তিনি বাগানের অংশবিশেষ আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে সাদকা করে দিলেন; সুতরাং তিনি এ কাজটি করেছিলেন শুধু তাঁর আত্মসমালোচনার কারণেই এবং নিজকে তিরস্কার স্বরূপ ও আত্ম-সংশোধনের জন্য।
৬. আহনাফ ইবন কায়েস সম্পর্কে বর্ণিত আছে: তিনি চেরাগের নিকট আসতেন, তারপর তিনি তাঁর আঙুল চেরাগের মধ্যে ধরে রাখতেন ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না তিনি আগুনের উত্তাপ অনুভব করতেন; অতঃপর তিনি নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলতেন: হে হুনায়েফ! অমুক দিন তুমি যে কাজ করেছ, তা করতে তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছে? অমুক দিন তুমি যে কাজ করেছ, তা করতে তোমাকে কিসে উত্তেজিত করেছে?
৭. বর্ণিত আছে: জনৈক সৎব্যক্তি যোদ্ধা ছিলেন; এক মহিলা তার উদ্দেশ্যে নগ্ন হয়ে গেল; তারপর তিনি তার দিকে তাকালেন; অতঃপর তিনি তাঁর হাত উঠায়ে তাঁর চোখে থাপ্পর মারলেন এবং তাঁর চোখ উপড়িয়ে ফেললেন; আর বললেন: নিশ্চয়ই তুমি তা দেখতে পাচ্ছ, সে যে ক্ষতি তোমার করেছে!
৮. কোনো এক ভালো মানুষ একটি কক্ষের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি বললেন: এ কক্ষটি কখন বানানো হয়েছে? অতঃপর তিনি আত্মসমালোচনায় মনোযোগ দিলেন এবং বললেন: তুমি আমাকে এমন এক প্রশ্ন করলে, যা তোমার কোনো প্রয়োজন ছিল না; আমি তোমাকে শাস্তি দিব এক বছর সাওম পালন করার মাধ্যমে, তারপর তিনি এক বছর সাওম পালন করলেন।
৯. আরও বর্ণিত আছে: কোনো এক সৎ মানুষ উত্তপ্ত ভূমির দিকে গেলেন, অতঃপর তিনি তাতে গড়াগড়ি দিতে থাকলেন এবং নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন: মজা ভোগ কর, জাহান্নামের আগুন আরও অনেক বেশি উত্তপ্ত; তুমি কি রাতের বেলায় নোংরা বা পঙ্কিল এবং দিনের বেলায় বীর?
১০. আরও বর্ণিত আছে: সৎ ব্যক্তিগণের কোনো একজন একদিন ছাদের দিকে তাঁর মাথা উঠালেন এবং এক নারীকে দেখলেন; তারপর তিনি তার দিকে তাকালেন; অতঃপর তিনি নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি যতদিন জীবনে বেঁচে থাকবেন কোনো দিন আকাশের দিকে তাকাবেন না।
এভাবেই এ উম্মতের সৎকর্মশীল বান্দাগণ নিজেদের অবহেলার ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করতেন, ভুলত্রুটির জন্য নিজেকে নিজে তিরস্কার করতেন, নিজের ‘নাফস’-এর জন্য তাকওয়ার বিষয়টিকে অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য বিষয় বলে ধারণ করতেন এবং তাকে নিজের খেয়াল-খুশি মত চলা থেকে বিরত রাখতেন। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَأَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِۦ وَنَهَى ٱلنَّفۡسَ عَنِ ٱلۡهَوَىٰ ٤٠ فَإِنَّ ٱلۡجَنَّةَ هِيَ ٱلۡمَأۡوَىٰ ٤١ ﴾ [النازعات: ٤٠، ٤١]
“আর যে তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে; জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল।”
(ঘ) মুজাহাদা (المجاهدة ):
আর ‘মুজাহাদা’ হলো মুসলিম ব্যক্তি জেনে রাখবে যে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তার ‘নাফস’, যা স্বভাবতই খারাপ কাজের প্রতি আকৃষ্ট, ভালো কাজ থেকে পলায়নমান এবং মন্দ কাজের উস্কানিদাতা বা নির্দেশদাতা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ ۞وَمَآ أُبَرِّئُ نَفۡسِيٓۚ إِنَّ ٱلنَّفۡسَ لَأَمَّارَةُۢ بِٱلسُّوٓءِ ﴾ [يوسف: ٥٣]
“আর আমি নিজকে নির্দোষ মনে করিনা, কেননা, নিশ্চয় মানুষের নাফস খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়েই থাকে।” আর এ ‘নাফস’ পছন্দ করে শান্তিতে ও স্থায়ীভাবে আরামে থাকেতে, ভালোবাসে অবসর সময় কাটাতে এবং স্বীয় প্রবৃত্তিকে সমূলে তাৎক্ষণিক বা নগদ ভোগবিলাসে আকৃষ্ট করতে, যদিও তাতে তার মরণ ও দুর্ভাগ্য বা দুঃখ-কষ্টের বিষয়টি নিহিত রয়েছে।
সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি যখন এ বিষয়টি বুঝতে পারবে, তখন সে নিজেকে প্রস্তুত করবে তার ‘নাফস’কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা ও সাধনা করার জন্য; ফলে সে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে, অস্ত্রধারণ করবে তার বিপক্ষে এবং সিদ্ধন্ত গ্রহণ করবে তার বুদ্ধিহীনতা বা অস্থিরচিত্ততা এবং লোভ লালসাসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। ফলে তার ‘নাফস’ যখন শান্তি পছন্দ করবে, তখন সে তাকে তার সুযোগ করে দিবে। আর যখন লোভ লালসার প্রতি আগ্রহী হবে, তখন সে তার জন্য তা হারাম করে দিবে; আর যখন কোনো আনুগত্য বা ভালো কাজ করার ক্ষেত্রে ত্রুটি করবে বা বিরত থাকবে, তখন তাকে শাস্তি দিবে এবং তিরস্কার করবে, তারপর যে (ভালো) কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা করতে তাকে বাধ্য করবে এবং যা কাজা বা বর্জন করেছে, তার কাযা আদায় করতে বাধ্য করবে। সে তার জন্য এ পদ্ধতি অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না তার মন প্রশান্তি লাভ করবে ও পবিত্রতা অনুভব করবে; আর এটাই স্বীয় ‘নাফস’-এর জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের চেষ্টা ও সাধনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٦٩ ﴾ [العنكبوت: ٦٩]
“আর যারা আমাদের পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমরা তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের হিদায়াত দিব। আর নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের সঙ্গে আছেন।”
আর মুসলিম ব্যক্তি যখন আল্লাহর জন্য তার ‘নাফস’কে প্রস্তুত করবে, যাতে তা পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও প্রশান্ত হয় এবং হয় আল্লাহ তা‘আলার করুণা ও সন্তুষ্টির অধিকারী, তখন সে বুঝতে পারবে যে, এটাই হলো সৎকর্মশীল ও সত্যিকার মুমিনগণের পথ; ফলে সে তাদের অনুসরণ করে পথ চলবে এবং পরিভ্রমণ করবে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত জেগে নফল সালাত আদায় করতেন, এমনকি তাতে তাঁর দুই কদম মুবারক ফুলে পেটে যেত এবং তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন:
« أَفَلا أُحِبُّ أنْ أكُونَ عَبْداً شَكُوراً » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ).
“আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়াটাকে পছন্দ করব না?” আর আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
« والله ، لقد رأيت أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم وما أرى شيئا يشبههم كانوا يصبحون شعثاً غبراً صُفراً قد باتوا لله سجداً وقياماً ، يتلون كتاب الله يراوحون بين أقدامهم و جباههم ، و كانوا إذا ذُكر الله مادوا كما يميد الشجر فى يوم الريح ، وهملت أعينهم حتى تبل ثيابهم » .
“আল্লাহর কসম! আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহাবীগণকে দেখেছি এবং আমি তাঁদের মত কোনো সৃষ্টিকে দেখিনি— তাঁদের সকাল হতো আউলা কেশে ধূলা মাখানো বেশে ফ্যকাশে চেহারায়, তাঁরা রাতযাপন করেন আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদারত ও দাঁড়ানো অবস্থায়; তাঁরা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করতেন পালাক্রমে তাঁদের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে ও কপাল মাটিতে রেখে সিজদারত অবস্থায়; আর তাঁদের যখন আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, তখন তাঁরা এমনভাবে আন্দোলিত হয়, যেমনিভাবে ঝড়ের দিনে গাছপালা আন্দোলিত হয় এবং তাঁদের চোখের অশ্রুতে ভেসে তাঁদের কাপড়সমূহ ভিজে যেত।”
আর আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: “যদি তিনটি জিনিস না থাকত, তাহলে আমি একদিনও বেঁচে থাকাটাকে পছন্দ করতাম না: ১. প্রচণ্ড তাপের সময় আল্লাহর জন্য তৃষ্ণার্ত থাকা (অর্থাৎ সাওম পালন করা), ২. মধ্য রাতে আল্লাহকে সিজদা করা, এবং ৩. এমন সম্প্রদায়ের সাথে উঠা-বসা করা, যারা এমনভাবে বাছাই করে ভালো ভালো কথা বলে, যেমনিভাবে (খাওয়ার সময়) ভালো ভালো ফলগুলো বাছাই করা হয়।”
আর ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জামায়াতে আসরের সালাত আদায় করতে না পারার কারণে নিজেকে নিজে তিরস্কার করেন এবং এ কারণে তিনি দুই লক্ষ দিরহাম মূল্যের জমি সাদকা করে দেন।
আর আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা যখন কোনো সালাত জামায়াতে আদায় করতে ব্যর্থ হতেন, তখন তিনি ঐ রাতের পুরোটাই জেগে থাকতেন এবং পরের দিন মাগরিবের সালাত আদায় করা পর্যন্ত দিনের বেলায়ও ঘুমাতেন না, এমনকি রাতের আকাশে তারা উদয় হওয়ার পর তিনি দু’টি গোলাম আযাদ করে দিতেন। আর আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন:
« رحم الله أقواما يحسبهم الناس مرضى ، وما هم بمرضى » .
“আল্লাহ ঐসব সম্প্রদায়ের প্রতি রহম করুন, জনগণ যাদেরকে অসুস্থ মনে করে, অথচ তারা অসুস্থ নন।” আর এগুলো হলো স্বীয় নাফসের উন্নয়নে কঠোর সাধনার কিছু নমুনা।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« خَيرُ النَّاسِ مَنْ طَالَ عُمُرهُ ، وَحَسُنَ عَمَلُهُ » . (رواه الترمذي ).
“সেই ব্যক্তি উত্তম, যার বয়স দীর্ঘকাল ব্যাপী এবং কাজ সুন্দর।” আর উয়াইস আল-কারনী রহ. বলতেন:
« هذه ليلة الركوع فيحيى الليل كله في ركعة ، وإذا كانت الليلة الآتية قال : هذه ليلة السجود فيحيى الليل كله في سجدة » .
“এটা হলো রুকূ‘ করার রাত, ফলে তিনি এক রুকূ‘তে গোটা রাত কাটিয়ে দিতেন; আর যখন পরবর্তী রাত আসত, তখন তিনি বলতেন: এটা হলো সিজদা করার রাত, ফলে তিনি এক সিজদাতেই গোটা রাত কাটিয়ে দিতেন।”
আর সাবিত আল-বানানী রহ. বলেন: আমি এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে পেয়েছি, যাদের একজন সালাত আদায় করতেন, অথচ তিনি হামাগুড়ি দেয়া ছাড়া তাঁর নিজ বিছানায় আসতে পারতেন না। আবার তাদের একজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতেন, এমনকি দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তার দুই পা ফুলে যেত এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে তার চেষ্টা-সাধনা এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, যদি তাকে বলা হত: আগামী কাল কিয়ামত, তবুও তিনি অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার চিন্তা করতেন না। আবার তাদের কেউ কেউ যখন শীতকাল আসত, তখন তিনি ঘরের ছাদের উপরে দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে ঠাণ্ডা বাতাসের আঘাতে তার ঘুম না আসে; আবার যখন গরমকাল আসত, তখন তিনি ঘরের ছাদের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে গরমের কারণে তার ঘুম না আসে। আবার কেউ কেউ সিজদারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতেন।
আর মসরূক রহ. এর স্ত্রী বলেন: “সালাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে মাসরূক রহ.কে তাঁর দুই পা ফুলা অবস্থায় দেখা যেত; আল্লাহর কসম! আমি যদি তাঁর সালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় তাঁর পেছনে বসতাম, তাহলে তাঁর প্রতি সহমর্মিতার কারণে আমি কেঁদে ফেলতাম।”
আর তাদের কারো বয়স যখন চল্লিশে উপনিত হত, তখন তিনি তার বিছানা গুটিয়ে ফেলতেন, তারপর তিনি তার উপর আর কখনও ঘুমাতেন না।
আরও বর্ণিত আছে যে, পূর্ববর্তী সৎব্যক্তিগণের মধ্য থেকে কোনো এক পবিত্রা নারী, যাকে অক্ষম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলা হত, তিনি যখন রাতের শেষ ভাগে উপনীত হতেন, তখন তিনি করুণ স্বরে ডাকতেন:
« إليك قطع العابدون دجى الليالى يستبقون إلى رحمتك ، وفضل مغفرتك ، فبك يا إلهى أسألك لا بغيرك أن تجعلنى في أول زمرة السابقين ، وأن ترفعنى لديك في عليين ، في درجة المقربين ، وان تلحقنى بعبادك الصالحين ، فأنت أرحم الرحماء ، وأعظم العظماء ، وأكرم الكرماء ، يا كريم ! » .
“হে আমার প্রভু! রাতের অন্ধকারে বান্দাগণ সবকিছু বয়কট করে তোমার দিকে আসে, তারা তোমার রহমত ও ক্ষমার দিকে দৌড়ায়; আতএব, হে আমার আল্লাহ! আমি তুমি ভিন্ন অন্য কারও কাছে নয়, শুধু তোমার কাছে আবেদন করছি যে, তুমি আমাকে অগ্রগামীদের প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত করে নাও, আমাকে তোমার নিকট-‘ইল্লীনে উঠায়ে নাও, আমাকে তোমার নিকটতম বান্দাগণের মর্যাদায় উন্নীত কর এবং আমাকে তোমার সৎ বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত কর; কেননা, তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান, মহামহীয়ান, সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল, হে মহনুভব!।” অতঃপর সে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং ফযর পর্যন্ত দো‘য়া ও ক্রন্দন করতে থাকে।
* * *


সপ্তম অধ্যায়
মানুষ তথা সৃষ্টির সাথে আদব
(ক) পিতামাতার সাথে আদব:
মুসলিম ব্যক্তি তার উপর পিতামাতার অধিকারের ব্যাপারে বিশ্বাস করে, আরও বিশ্বাস করে তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার, তাঁদের আনুগত্য ও তাঁদের প্রতি ইহসান করার আবশ্যকতার প্রশ্নে; এটা শুধু এ জন্য নয় যে, তাঁরা তার অস্তিত্ব ও জন্মের উপলক্ষ, অথবা তাঁরা তার জন্য এমন সুন্দর সুন্দর ও ভালো ভালো অবদান রেখেছেন, যা তাকে প্রতিদান স্বরূপ তাঁদের সাথে সেরূপ উত্তম আচরণ করতে বাধ্য করে, বরং তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করার আবশ্যকতার অন্যতম কারণ হল- আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের আনুগত্য করাকে ওয়াজিব (আবশ্যক) করে দিয়েছেন এবং সন্তানের উপর পিতামাতার আনুগত্য করা ও তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করার বিষয়টিকে তিনি ফরজ করে দিয়েছেন, এমনকি তিনি বান্দা কর্তৃক একমাত্র তাঁর ইবাদত করার আবশ্যকীয় অধিকারের সাথে এ বিষয়টিকে সংযুক্ত করে দিয়েছেন; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ ۞وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنًاۚ إِمَّا يَبۡلُغَنَّ عِندَكَ ٱلۡكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوۡ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَآ أُفّٖ وَلَا تَنۡهَرۡهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوۡلٗا كَرِيمٗا ٢٣ وَٱخۡفِضۡ لَهُمَا جَنَاحَ ٱلذُّلِّ مِنَ ٱلرَّحۡمَةِ وَقُل رَّبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٣، ٢٤]
“আর তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ‘ইবাদত না করতে এবং পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ্’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; আর তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো। আর মমতাবেশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَوَصَّيۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ بِوَٰلِدَيۡهِ حَمَلَتۡهُ أُمُّهُۥ وَهۡنًا عَلَىٰ وَهۡنٖ وَفِصَٰلُهُۥ فِي عَامَيۡنِ أَنِ ٱشۡكُرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيۡكَ إِلَيَّ ٱلۡمَصِيرُ ١٤ ﴾ [لقمان: ١٤]
“আর আমরা মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে, আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। ফিরে আসা তো আমারই কাছে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক প্রশ্নকারী ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যে প্রশ্নাকারে বলেন:
« مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِى ؟ قَالَ : « أُمُّكَ » . قَالَ : ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أُمُّكَ » . قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أُمُّكَ » . قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أَبُوكَ » . (متفق عليه).
“আমার কাছে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার পিতা।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলে:
« إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوقَ الأُمَّهَاتِ ، وَوَأْدَ الْبَنَاتِ ، وَمَنْعَ وَهَاتِ ، وَكَرِهَ لَكُمْ : قِيلَ وَقَالَ ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ » . (متفق عليه).
“আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া এবং কারও প্রাপ্য আটক করে অন্যায়ভাবে কোন কিছু নেওয়াকে; আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দনীয় করেছেন: অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা ও সম্পদ বিনষ্ট করাকে।” তিনি আরও বলেন:
« أَلا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ؟ قُلْنَا : بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ ، قَالَ : الإِشْرَاكُ بِاَللَّهِ ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ ، وَكَانَ مُتَّكِئاً فَجَلَسَ ، وَقَالَ : أَلا وَقَوْلُ الزُّورِ , وَشَهَادَةُ الزُّورِ ، أَلا وَقَوْلُ الزُّورِ , وَشَهَادَةُ الزُّورِ ، فَمَا زَالَ يَقُولُهَا حَتَّى (قَالَ أبو بَكْرَةَ ) قُلْتُ : لَيْتَهُ سَكَتَ » . (متفق عليه).
“আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? আমরা বললাম: অবশ্যই সতর্ক করবেন, হে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তখন তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতামাতার নাফরমানী করা— একথা বলার সময় তিনি হেলান দিয়ে বসাছিলেন, এরপর (সোজা হয়ে) বসলেন এবং বললেন: মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া; মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং ক্রমাগত তিনি একথাগুলো বলে চললেন, এমনকি (বর্ণনাকারী আবূ বাকরা রা. বললেন) আমি বললাম: তিনি মনে হয় থামবেন না।” তিনি আরও বলেন:
« لا يَجْزِي وَلَدٌ وَالِدًا إِلا أَنْ يَجِدَهُ مَمْلُوكًا ، فَيَشْتَرِيَهُ ، فَيُعْتِقَهُ » . (رواه مسلم).
“কোনো সন্তানই তার পিতার প্রতিদান আদায় করতে সক্ষম নয়; তবে সে যদি তাকে (পিতাকে) দাস অবস্থায় পেয়ে থাকে এবং ক্রয় করার পর আযাদ করে দেয় (তবে কিছুটা প্রতিদান আদায় হবে)।” আর আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إلَى اللَّهِ ؟ قَالَ : « الصَّلاةُ عَلَى وَقْتِهَا » . قُلْتُ : ثُمَّ أَيُّ ؟ قَالَ : « بِرُّ الْوَالِدَيْنِ » , قُلْتُ : ثُمَّ أَيُّ ؟ قَالَ : « الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ » . (متفق عليه) .
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম: আল্লাহ তা‘আলার নিকট কোন আমল সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়? জবাবে তিনি বললেন: সময় মত সালাত আদায় করা। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: পিতা-মাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করা। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।” এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিহাদে অংশগ্রহণের ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করল, তখন তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করে বললেন:
« أَحَىٌّ وَالِدَاكَ ؟ قَالَ : نَعَمْ , قَالَ : « فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ » . (متفق عليه).
“তোমার পিতামাতা জীবিত আছে কি? সে বলল: হ্যাঁ, তিনি বললেন: তুমি তাঁদের নিকট অবস্থান কর এবং সাধ্যমত তাঁদের সেবা কর।” আর আনসারদের মধ্য থেকে একজন এসে বললেন:
« يَا رَسُولَ اللَّهِ ! هَلْ بَقِيَ عَلَيَّ مِنْ بِرِّ أَبَوَيَّ شَيْءٌ بَعْدَ مَوْتِهِمَا أَبَرُّهُمَا بِهِ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، خِصَالٌ أَرْبَعَةٌ : الصَّلَاةُ عَلَيْهِمَا ، وَالِاسْتِغْفَارُ لَهُمَا ، وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا ، وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا ، وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا رَحِمَ لَكَ إِلَّا مِنْ قِبَلِهِمَا ، فَهُوَ الَّذِي بَقِيَ عَلَيْكَ مِنْ بِرِّهِمَا بَعْدَ مَوْتِهِمَا » . (رواه أبو داود و أحمد).
“হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! পিতামাতার মৃত্যুর পরও তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করার দায়িত্ব আমার উপর অবশিষ্ট থাকবে কি এবং তা আমি কিভাবে করব? তিনি বললেন: হ্যাঁ, চারটি কাজ: তাঁদের জন্য দো‘য়া করা, তাঁদের গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাঁদের করা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা এবং তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা; আর তাঁদের এমন সব আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করা, যাদের সাথে তোমার আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু তাদেরই কারণে। সুতরাং এটাই হল তোমার উপর তাদের মৃত্যুর পরে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার অবশিষ্ট দায়িত্ব।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« إِنَّ مِنْ أَبَرِّ الْبِرِّ صِلَةَ الرَّجُلِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ بَعْدَ أَنْ يُوَلِّىَ » . (رواه مسلم).
“কোনো ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সৎকাজ হল পিতার মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার করা।”
আর মুসলিম ব্যক্তি যখন তার পিতামাতার এ অধিকারের স্বীকৃতি দেয় এবং আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য ও নির্দেশের বাস্তবায়ন স্বরূপ তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, তখন তার জন্য তার পিতামাতার ব্যাপারে নিম্নোক্ত আদবসমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখা আবশ্যক:
১. তাঁদের দেয়া প্রতিটি আদেশ অথবা নিষেধের আনুগত্য করা, যদি তার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা ও তাঁর দেয়া শরী‘য়তের বিপরীত কিছু না থাকে; কেননা, সৃষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না; তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِن جَٰهَدَاكَ عَلَىٰٓ أَن تُشۡرِكَ بِي مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٞ فَلَا تُطِعۡهُمَاۖ وَصَاحِبۡهُمَا فِي ٱلدُّنۡيَا مَعۡرُوفٗاۖ ﴾ [لقمان: ١٥]
“আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শির্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِى الْمَعْرُوفِ » . (متفق عليه).
“আনুগত্য চলবে শুধু সৎকাজে।” তিনি আরও বলেন:
« لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيةِ الخَالِقِ » . (رواه أحمد و الحاكم).
“স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।”
২. তাঁদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া এবং মমতাবেশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করা; আর কথা ও কাজের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা; সুতরাং তাঁদেরকে ধমক দিবে না, তাঁদের কথার আওয়াজের উপর স্বীয় আওয়াজকে উঁচু করবে না, তাঁদের সামনে হাঁটবে না, তাঁদের উপর স্ত্রী ও সন্তানকে প্রাধান্য দিবে না, তাঁদেরকে তাঁদের নাম ধরে ডাকবে না, বরং আম্মু আব্বু বলে ডাকবে এবং তাঁদের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া সফরে যাবে না।
৩. তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে, যেখানে তার হাত পৌঁছবে এবং যত রকমের সদ্ব্যবহার ও ইহাসান করার ক্ষমতা তার আছে, যেমন— তাঁদের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা, তাঁদের অসুস্থ জনকে চিকিৎসা করা এবং তাঁদের সর্বপ্রকার কষ্ট দূর করা; আর তাঁদের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেওয়া।
৪. তাঁদের আত্মীয়দের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলা, তাঁদের জন্য দো‘য়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাঁদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা এবং তাঁদের বন্ধু-বান্ধবকে সম্মান করা।
(খ) সন্তানসন্ততির সাথে আদব:
মুসলিম ব্যক্তি স্বীকার করে যে, পিতার উপর তার সন্তানের কতগুলো অধিকার রয়েছে, যা আদায় করা তার উপর ওয়াজিব এবং এমন কতগুলো আদব রয়েছে, যেগুলো তার সন্তানের সাথে রক্ষা করে চলা আবশ্যক; উদাহরণস্বরূপ সেসব অধিকার ও আদব হলো— তার জন্য ভালো মা পছন্দ করা, সুন্দর নাম রাখা, তার জন্মের সপ্তম দিবসে তার পক্ষ থেকে আকীকা করা, খাতনা করা, তাকে স্নেহ করা, তার সাথে কোমল আচরণ করা, তার জন্য ব্যয় করা এবং তাকে উত্তম শিক্ষা দেওয়া; আর তার শিক্ষাদীক্ষা, আদব-কায়দা, ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশাবলী গ্রহণ এবং ইসলামের ফরয, সুন্নাত ও আদবসমূহ পালন ও অনুশীলনের ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান করা; এমনকি যখন বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হবে, তখন তার বিয়ের ব্যবস্থা করা; অতঃপর তাকে এ ব্যাপারে স্বাধীনতা দেওয়া— সে কী তার তত্ত্ববধানে থেকে যাবে, না কী পৃথকভাবে জীবনযাপন করবে এবং নিজ হাতে তার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থন তৈরি করবে। আর তার জন্য এসব অধিকার ও আদবের প্রশ্নে আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র নিম্নোক্ত দলীলসমূহ রয়েছে:
১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ ۞وَٱلۡوَٰلِدَٰتُ يُرۡضِعۡنَ أَوۡلَٰدَهُنَّ حَوۡلَيۡنِ كَامِلَيۡنِۖ لِمَنۡ أَرَادَ أَن يُتِمَّ ٱلرَّضَاعَةَۚ وَعَلَى ٱلۡمَوۡلُودِ لَهُۥ رِزۡقُهُنَّ وَكِسۡوَتُهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ ﴾ [البقرة: ٢٣٣]
“আর জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে, এটা সে ব্যক্তির জন্য, যে স্তন্যপান কাল পূর্ণ করতে চায়। পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের (মাতাদের) ভরণ-পোষণ করা।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦ ﴾ [التحريم: ٦]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোরস্বভাব ফেরেশ্তাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদেশপ্রাপ্ত হয় তা-ই কর।” সুতরাং এ আয়াতের মধ্যে পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে; আর এটা সম্ভব হবে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করার দ্বারা; আর আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করে দেয় কোন্ কোন্ বিষয়ে তাঁর আনুগত্য করা হবে, সে বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া; আর এটা জ্ঞান অর্জন ব্যতীত সম্ভব নয়। আর সন্তান যখন ঐ ব্যক্তির গোটা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একজন সদস্য, তখন উপরিউক্ত আয়াতটি এমন এক দলীল হবে, যা পিতা কর্তৃক তার সন্তানকে শিক্ষা দেওয়া, ভালো পথে পরিচালিত করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা, তাকে কুফর, অবাধ্যতা ও যাবতীয় অন্যায় অনাচার থেকে দূরে রাখার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়টি তার উপর ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত করবে, যাতে তিনি এর দ্বারা তার সন্তানকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেন। যেমনিভাবে প্রথম আয়াত:
﴿ ۞وَٱلۡوَٰلِدَٰتُ يُرۡضِعۡنَ أَوۡلَٰدَهُنَّ حَوۡلَيۡنِ كَامِلَيۡنِۖ ﴾
(আর জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে) -এর মধ্যে দলীল রয়েছে পিতার উপর সন্তানের ব্যয়ভার বহন করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে; কেননা, তার সন্তানকে দুধ পান করানোর কারণেই স্তন্যদায়ীনীর জন্য খরচ বরাদ্দ করাটা আবশ্যক হয়। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُمۡ خَشۡيَةَ إِمۡلَٰقٖۖ ﴾ [الاسراء: ٣١]
“তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না।”
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন মহাপাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি বলেন:
« أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ ، ثُمَّ أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ خَشْيَةَ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ ، ثُمَّ أَنْ تُزَانِيَ بِحَلِيلَةِ جَارِكَ » . (متفق عليه).
“কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তোমার সাথে খাবে, এই ভয়ে তোমার সন্তানকে হত্যা করা; অতঃপর তোমার কর্তৃক তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা।” সুতরাং সন্তানদেরকে হত্যা করা থেকে নিষেধ করার বিষয়টিই আবশ্যক করে দেয় তাদের প্রতি স্নেহ ও মমতার বিষয়টিকে এবং আরও জরুরি করে দেয় তাদের শরীর, বুদ্ধি ও মনকে সংরক্ষণ করার বিষয়টিকে। আর সন্তানের জন্য ‘আকীকার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« الغلامُ مُرتَهَنُ بعَقيِقتِه ، تُذبَحُ عنه يوم السابع ، ويُسمى فيه ، ويُحلَق رأسُه » . (رواه البخاري و أصحاب السنن).
“নবজাতক দায়বদ্ধ তার আকীকার শর্তে, যা তার পক্ষ থেকে যবেহ করা হবে তার জন্মের সপ্তম দিবসে; আর সে দিনে তার নাম রাখা হবে এবং তার মাথা মুণ্ডন করা হবে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« الْفِطْرَةُ خَمْسٌ : الاخْتِتَانُ ، وَالاسْتِحْدَادُ ، وَقَصُّ الشَّارِبِ ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ ، وَنَتْفُ الإِبْطِ » . (رواه البخاري) .
“ফিতরাত (মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব) পাঁচটি: খাতনা করা, (নাভীর নীচে) খুর ব্যবহার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা ও বগলের পশম উপড়ে ফেলা।” তিনি আরও বলেন:
« أكرموا أولادكم وأحسنوا أدبهم » . (رواه ابن ماجه) .
“তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে আদর যত্ন কর এবং তাদের আদব-কায়দাকে সুন্দর কর।” তিনি আরও বলেন:
« سَوُّوا بَيْنَ أَوْلادِكُمْ فِي الْعَطِيَّةِ ، فَلَوْ كُنْتُ مُفَضِّلا لَفَضَّلْتُ النِّسَاءَ » . (رواه البيهقي و الطبراني).
“তোমরা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর; কারণ, আমি যদি কাউকে (এ ক্ষেত্রে) প্রাধান্য দিতাম, তাহলে নারীদেরকে প্রাধান্য দিতাম।” তিনি আরও বলেন:
« مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ , وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ , وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِى الْمَضَاجِعِ » . (رواه أبو داود).
“তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সালাতে জন্য নির্দেশ দাও, যখন তারা সাত বছর বয়সে উপনীত হয়; আর তাদেরকে সালাতের জন্য প্রহার কর, যখন তারা দশ বছর বয়সে উপনীত হয় এবং তাদের শোয়ার স্থান পৃথক করে দাও।” আর ‘আসার’ -এর মধ্যে এসেছে: পিতার উপর সন্তানের অন্যতম অধিকার হলো তার আদব-কায়দাকে সুন্দর করে দেওয়া এবং তার জন্য সুন্দর নাম রাখা। আর ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: পিতার উপর সন্তানের অন্যতম অধিকার হলো তাকে লেখাপড়া ও তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তার জন্য শুধু পবিত্র ও হালাল রিযিকের ব্যবস্থা করা। তিনি আরও বলেন:
« تزوجوا في الحجر الصالح ؛ فإن العرق دساس » .
“তোমরা ভালো বংশে বিয়ে কর; কারণ, বংশের শিরা-উপশিরা গুপ্তচরের মত।” আর এক আরব বেদুইন তার সন্তানদের প্রতি সদয় ইহসান করেছেন তাদের মাকে পছন্দ করার মাধ্যমে; সুতরাং তিনি কবিতার ভাষায় বলেন:
وَأَوَّلُ إحْسَانِي إلَيْكُمْ تَخَيُّرِي
لِمَاجِدَةِ الْأَعْرَاقِ بَادٍ عَفَافُهَا
(আর তোমাদের প্রতি আমার প্রথম ইহসান হলো আমি বাছাই করেছি
তোমাদের মাকে গৌরবময় বংশ থেকে, যার পবিত্রতা বা নিষ্কলুষতা সুস্পষ্ট)।
(গ) ভাই-বোনের সাথে আদব:
মুসলিম ব্যক্তি মনে করে যে, ভাই-বোনের সাথে আদব রক্ষা করা চলার বিষয়টি পিতামাতা ও সন্তানসন্তুতির সাথে আদব রক্ষা করে চলার মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ; সুতরাং ছোট ভাইবোনের উপর আবশ্যক হলো তার বড় ভাইবোনদের সাথে এমনভাবে আদব রক্ষা করে চলা, যেমনিভাবে তাদের উপর ওয়াজিব হলো তাদের পিতামাতার সাথে অধিকার আদায়, দায়িত্ব পালন ও আদব রক্ষা করে চলা; আর এর কারণ হলো হাদিসে বর্ণিত আছে:
« حق كبير الإخوة على صغيرهم كحق الوالد على ولده » . (رواه البيهقي).
“ছোট ভাই-বোনের উপর বড় ভাই-বোনের অধিকার ঠিক তেমন পর্যায়ের, যেমন অধিকার সন্তানের উপর তার পিতামাতার।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« بَرَّ أُمَّكَ و أَبَاكَ , ثُمَّ أختَك و أخَاك , ثم أدنَاك فَأدنَاك » . (رواه الحاكم).
“তুমি তোমার মাতা ও পিতার সাথে উত্তম ব্যবহার কর; অতঃপর উত্তম ব্যবহার কর তোমার বোন ও ভাইয়ের সাথে; অতঃপর উত্তম ব্যবহার কর একে একে তোমার নিকটাত্মীয়ের সাথে।”
(ঘ) স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যকার আদব:
মুসলিম ব্যক্তি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার পরস্পরের জন্য নির্ধারিত আদব তথা অধিকারসমূহকে স্বীকৃতি প্রদান করবে; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَلَهُنَّ مِثۡلُ ٱلَّذِي عَلَيۡهِنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيۡهِنَّ دَرَجَةٞۗ ﴾ [البقرة: ٢٢٨]
“আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; আর নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা আছে।” সুতরাং আল-কুরআনের এ আয়াতটি স্বামী ও স্ত্রীর প্রত্যেকের জন্য একের উপর অন্যের অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং বিশেষ কিছু কারণে স্বামীকে তার স্ত্রীর উপর বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জের ভাষণে বলেন:
« أَلَا إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا , وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا » . (رواه أصحاب السنن).
“জেনে রাখবে, নিশ্চয়ই তোমাদের নারীদের উপর তোমাদের অধিকার রয়েছে, আর তোমাদের উপরও তোমাদের নারীদের অধিকার রয়েছে ।” তবে এসব অধিকারের মধ্য থেকে কিছু অধিকার আছে এমন, যা স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মাঝে যৌথভাবে প্রযোজ্য এবং কিছু অধিকার আছে এমন, যা তাদের প্রত্যেকের জন্য পৃথক পৃথকভাবে নির্দিষ্ট; সুতরাং যেসব অধিকার তাদের উভয়ের জন্য যৌথভাবে প্রযোজ্য, সেগুলো হলো:
১. আমানত তথা বিশ্বস্ততা; কেননা, স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব হলো একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত হওয়া; সুতরাং কম হউক বেশি হউক কোনো অবস্থাতেই তারা একে অন্যের খিয়ানত করবে না; কারণ, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী; অতএব কারণে তাদের বিশেষ ও সাধারণ জীবনের প্রতিটি বিষয় ও ক্ষেত্রে পরস্পরের মাঝে বিশ্বস্ততা, কল্যাণ কামনা, সততা ও নিষ্ঠার মত বিষয়গুলো যথাযথভাবে পালন করা জরুরি।
২. ভালোবাসা ও সম্প্রীতি; তারা দীর্ঘ জীবনে প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণে নির্ভেজাল ভালোবাসা ও অবারিত সহমর্মিতা প্রদর্শন করবে; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦٓ أَنۡ خَلَقَ لَكُم مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ أَزۡوَٰجٗا لِّتَسۡكُنُوٓاْ إِلَيۡهَا وَجَعَلَ بَيۡنَكُم مَّوَدَّةٗ وَرَحۡمَةًۚ ﴾ [الروم: ٢١]
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া; যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ لا يَرْحم لا يُرْحَمْ » . (رواه الطبراني).
“যে ব্যক্তি অনুকম্পা প্রদর্শন করবে না, তার প্রতিও অনুকম্পা প্রদর্শন করা হবে না।”
৩. পরস্পরের মাঝে আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা; অর্থাৎ তাদের প্রত্যেকে একে অপরের ব্যাপারে আস্থাশীল হবে এবং তার জন্য তার সততা, আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতার ব্যাপারে তার মনে ন্যূনতম সন্দেহের অনুপ্রবেশ ঘটবে না; আর এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ إِخۡوَةٞ ﴾ [الحجرات: ١٠]
“মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ » . (رواه الشيخان و غيرهما).
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে।” আর দাম্পত্য বন্ধন উভয়ের মাঝে ঈমানী ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে শক্তিশালী ও মজবুত করে দেয়। আর এ কারণে স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেই অনুভব করে একে অপরের সত্তায় মিশে গিয়ে যেন এক দেহ এক মন; সুতরাং একজন মানুষ কিভাবে তার নিজ সত্তাকে অবিশ্বাস করবে এবং কিভাবে তার নিজের কল্যাণ কামনা করবে না? অথবা কিভাবে সে নিজেকে ধোঁকা দিবে ও প্রতারিত করবে?
৪. সার্বজনীন আদব হলো আচার ব্যাহারে কোমল হওয়া, আনন্দময় অবস্থান, সম্মানজনক কথা বলা এবং শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা; আর এটাই হলো সৎভাবে জীবনযাপন করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীর মধ্যে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তিনি বলেন:
﴿ وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ ﴾ [النساء: ١٩]
“আর তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর।” আর এটাই হলো কল্যাণ কামনা করা, যার নির্দেশ প্রদান করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাণীর মাধ্যমে, তিনি বলেন:
« اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا » . (رواه مسلم).
“তোমরা নারীদের কল্যাণ কামনা কর।” আর এসব হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যৌথ আদব-কায়দা, যেগুলো তারা পরস্পর মেনে চলবে তাদের মধ্যকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন স্বরূপ, যে দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে আল্লাহ তা‘আলার বাণীর মধ্যে, তিনি বলেন:
﴿ وَكَيۡفَ تَأۡخُذُونَهُۥ وَقَدۡ أَفۡضَىٰ بَعۡضُكُمۡ إِلَىٰ بَعۡضٖ وَأَخَذۡنَ مِنكُم مِّيثَٰقًا غَلِيظٗا ٢١ ﴾ [النساء: ٢١]
“আর কিভাবে তোমরা তা গ্রহণ করবে, যখন তোমরা একে অপরের সাথে সংগত হয়েছ এবং তারা তোমাদের কাছ থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়েছে?।” তাছাড়া তারা এগুলো মেনে চলবে আল্লাহর আনুগত্য করার নিমিত্তে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَلَا تَنسَوُاْ ٱلۡفَضۡلَ بَيۡنَكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٌ ٢٣٧ ﴾ [البقرة: ٢٣٧]
“আর তোমরা নিজেদের মধ্যে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তা সবিশেষ প্রত্যক্ষকারী।”
তাছাড়া আরও কিছু বিশেষ অধিকার ও আদব রয়েছে, যেগুলো স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেই এককভাবে একে অপরের সাথে রক্ষা করে চলবে; সে বিশেষ আদাব ও অধিকারসমূহ নিম্নরূপ:
প্রথমত: স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার:
স্বামীর উপর ওয়াজিব হলো তার স্ত্রীর সাথে নিম্নোক্ত আদবসমূহ রক্ষা করে চলা:
১. তার সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করা; কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ ﴾ [النساء: ١٩]
“আর তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর।” সুতরাং সে যখন খাবে, তখন সে তাকেও খাওয়াবে এবং যখন সে পোশাক পরিধান করবে, তখন তাকেও পোশাক পরিধান করাবে; আর যখন সে তার স্ত্রীর অবাধ্যতার আশঙ্কা করবে, তখন আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে নারীদেরকে আদব শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাকে আদব শিক্ষা দিবে; অর্থাৎ তাকে উপদেশ দিবে কোনো প্রকার গালিগালাজ ও মন্দ কথা না বলে, তারপর সে যদি অনুগত হয়ে যায়, তাহলে তো ভালো, নতুবা তার বিছানা আলাদা করে দিবে; অতঃপর সে যদি অনুগত হয়ে যায়, তাহলে তো ভালো কথা, নতুবা তাকে প্রহার করবে চেহারা ব্যতীত অন্য যে কোনো স্থানে, তবে প্রচণ্ডভাবে প্রহার করবে না, রক্তাক্ত করবে না, আহত করবে না, অথবা কোনো অঙ্গকে বিকলাঙ্গ বা নষ্ট করবে না; কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَٱلَّٰتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَٱهۡجُرُوهُنَّ فِي ٱلۡمَضَاجِعِ وَٱضۡرِبُوهُنَّۖ فَإِنۡ أَطَعۡنَكُمۡ فَلَا تَبۡغُواْ عَلَيۡهِنَّ سَبِيلًاۗ ﴾ [النساء: ٣٤]
“আর স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশংকা কর, তাদেরকে সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন কর এবং তাদেরকে প্রহার কর। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অন্বেষণ করো না।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন: আমাদের কারও উপর তার স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তখন তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
« أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ ، وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ ، وَلاَ تَضْرِبِ الْوَجْهَ ، وَلاَ تُقَبِّحْ وَلاَ تَهْجُرْ إِلاَّ فِى الْبَيْتِ » . (رواه أَبُو دَاوُدَ).
“যখন তুমি খাবে, তখন তাকেও খাওয়াবে; যখন তুমি পোশাক পরিধান করবে, তখন তাকেও পোশাক পরিধান করাবে; তার মুখমণ্ডলে প্রহার করবে না এবং তাকে মন্দ বলবে না; আর তার বিছানা আলাদা করতে হলে তা ঘরের মধ্যেই করবে।” তিনি আরও বলেন:
« ألاَ وَحَقُّهُنَّ عَلَيْكُمْ أنْ تُحْسِنُوا إِلَيْهِنَّ في كِسْوَتِهنَّ وَطَعَامِهنَّ » . (رواه الترمذي).
“জেনে রাখবে, তোমাদের উপর তাদের অধিকার হল— তোমরা তাদের ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا ، رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ » . (رواه مسلم).
“কোন মুমিন পুরুষ যেন কোন মুমিন নারীর প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ না করে; কেননা, তার কোন একটি দিক তার কাছে খারাপ লাগলেও অন্য একটি দিক তার পছন্দ হবে।”
২. দীনের জরুরি বিষয়গুলো তাকে শিক্ষা দিবে, যদি এগুলো তার জানা না থাকে, অথবা এগুলো শিখার জন্য তাকে শিক্ষামূলক বৈঠকসমূহে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুমতি প্রদান করবে; কারণ, তার দীনকে সংশোধন ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাটা তাকে আবশ্যকীয়ভাবে সরবরাহ করা খাদ্য ও পানীয়’র প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا ﴾ [التحريم: ٦]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর জাহান্নামের আগুন থেকে।” আর স্ত্রীও পরিবারের একজন; আর তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে হবে ঈমান ও ভালো কাজোর মাধ্যমে; আর শরী‘য়ত যেভাবে চায়, সেভাবে ভালো কাজ সম্পন্ন করতে হলে শরী‘য়তের বিধানাবলী সম্পর্কে জানতে হবে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« ألا وَاسْتَوصُوا بالنِّساءِ خَيْراً ، فَإِنَّمَا هُنَّ عَوَانٌ – أسِيْرَاتٌ - عِنْدَكُمْ » . (رواه الترمذي).
“সাবধান, তোমরা নারীদের মঙ্গল কামনা কর; কারণ, তারা (বন্দীর মত) তোমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।” আর নারীর মঙ্গল কামনা করার অন্যতম একটি দিক হলো তাকে এমনভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করা, যাতে সে তার দ্বারা তার দীনকে মার্জিত করতে পারে এবং তাকে এমনভাবে আদব শিখানোর ব্যবস্থা করা, যা তাকে যথাযথভাবে মর্যাদা রক্ষা করে চলতে সহযোগিতা করবে।
৩. ইসলামের শিক্ষা, নির্দেশ ও আদবসমূহ তাকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া এবং এগুলোর ব্যাপারে তাকে কঠোরভাবে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা; সুতরাং সে তাকে ভ্রমণ করতে অথবা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়াতে নিষেধ করবে এবং মাহরাম পুরুষ ব্যতীত অন্যান্য পুরুষদের মাঝে অবাধে বিচরণ করতে বাধা দিবে। অনুরূপভাবে তার দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সতীত্ব রক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা এবং ভালোভাবে তাকে তত্ত্বাবধান করা; সুতরাং সে তাকে তার চরিত্র বা দীন নষ্ট করার সুযোগ দিবে না এবং তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশসমূহ অমান্য করার বা পাপকাজে লিপ্ত হওয়ার অবকাশ দিবে না; কারণ, সে তার অভিভাবক এবং তাকে তার (স্ত্রীর) ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে; তাছাড়া তাকে তার রক্ষণা-বেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ ﴾ [النساء: ٣٤]
“পুরুষরা নারীদের কর্তা।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ » . (متفق عليه).
“আর পরুষ ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
৪. সে তার মাঝে ও তার সতীনের মাঝে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করবে, যদি তার সতীন থাকে; তাদের মাঝে খাবার, পানীয়, পোশাক, বাসস্থান ও বিছানায় রাত যাপনের ক্ষেত্রে সমান ও ন্যায় আচরণ করবে; এর কোনো একটির ব্যাপারেও যুলুম ও অন্যায় আচরণ করবে না; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ فَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تَعۡدِلُواْ فَوَٰحِدَةً أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡۚ ﴾ [النساء: ٣]
“আর যদি আশঙ্কা কর যে সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই বা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকেই গ্রহণ কর।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের ব্যাপারে উত্তম উপদেশ ও নির্দেশনা প্রদান করেছেন, তিনি বলেন:
« خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ , وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي » . (رواه الطبراني).
“তোমাদের মাঝে সে ব্যক্তিই উত্তম, যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে তার পরিবারের নিকট উত্তম; আর আমি তোমাদের মাঝে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।”
৫. তার কোনো গোপন বিষয় প্রকাশ না করা এবং তার মধ্যকার কোনো দোষোর আলোচনা না করা; কেননা, সে তার বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধায়ক এবং তাকে দেখাশুনা ও রক্ষা করার ব্যাপারে দায়ী ব্যক্তি। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِى إِلَى امْرَأَتِهِ ، وَتُفْضِى إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا » . (رواه مسلم).
“কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মর্যাদার দিক থেকে নিকৃষ্টতম হবে ঐ ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে শয্যা গ্রহণ করে এবং তার স্ত্রীও তার সাথে শয্যা গ্রহণ করে; অতঃপর তাদের পরস্পরের গোপন বিষয় লোকদের নিকট প্রকাশ করে দেয়।”
দ্বিতীয়ত: স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার:
স্ত্রীর উপর ওয়াজিব হলো তার স্বামীর সাথে নিম্নোক্ত অধিকার ও আদবসমূহ রক্ষা করে চলা:
১. আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা নেই এমন সকল ক্ষেত্রে তার আনুগত্য করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ فَإِنۡ أَطَعۡنَكُمۡ فَلَا تَبۡغُواْ عَلَيۡهِنَّ سَبِيلًاۗ ﴾ [النساء: ٣٤]
“যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অন্বেষণ করো না।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَلَمْ تَأْتِهِ ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا ، لَعَنَتْهَا المَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبحَ » . (متفق عليه).
“যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার বিছানায় ডাকে, তারপর সে তার কাছে না আসে এবং স্বামী তার প্রতি অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে ফেরেশ্তাগণ সকাল হওয়া পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।” তিনি আরও বলেন:
« لَوْ كُنْتُ آمِراً أحَداً أنْ يَسْجُدَ لأحَدٍ لأمَرْتُ المَرأةَ أنْ تَسْجُدَ لزَوجِهَا » . (رواه أَبُو دَاوُدَ و الحاكم).
“আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে অপর কোনো ব্যক্তিকে সিদজা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে আমি স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।”
২. স্বামীর মান-সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং তার ধন-সম্পদ, সন্তানসন্ততি ও ঘরের সকল বস্তুর রক্ষণা-বেক্ষণ করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ فَٱلصَّٰلِحَٰتُ قَٰنِتَٰتٌ حَٰفِظَٰتٞ لِّلۡغَيۡبِ بِمَا حَفِظَ ٱللَّهُۚ ﴾ [النساء: ٣٤]
“কাজেই পূণ্যশীলা স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর আড়ালে আল্লাহর হেফাযতে তারা হেফাযত করে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« وَالمَرْأةُ رَاعِيةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجها وَوَلَدهِ » . (متفق عليه).
“আর স্ত্রী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।” তিনি আরও বলেন:
« فَحَقُّكُمْ عَلَيهِنَّ أنْ لا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ مَنْ تَكْرَهُونَ ، وَلا يَأْذَنَّ في بُيُوتِكُمْ لِمَنْ تَكْرَهُونَ » . (رواه الترمذي).
“আর তাদের উপর তোমাদের অধিকার হল: তারা তোমাদের অপছন্দনীয় ব্যক্তিদের দ্বারা তোমাদের বিছানা কলুষিত করবে না; আর তারা তোমাদের অপছন্দনীয় ব্যক্তিকে তোমাদের বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দেবে না।”
৩. তার স্বামীর ঘরে অবস্থান করা; সুতরাং সে তার স্বামী কর্তৃক অনুমতি ও সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমোদন দেয়া ছাড়া তার ঘর থেকে বের হবে না; তার দৃষ্টিকে নিম্নগামী করবে এবং কণ্ঠস্বরকে নীচু রাখবে; খারাপ কিছু থেকে তার হাতকে বিরত রাখবে এবং অশ্লীল ও মন্দ কথা বলা থেকে স্বীয় জবানকে হেফাযত করবে; আর স্বামীর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে, যাদের সাথে তার স্বামী উত্তম আচরণ করে; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ ﴾ [الاحزاب: ٣٣]
“আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলী যুগের প্রদর্শনীর মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ ﴾ [الاحزاب: ٣٢]
“সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ ۞لَّا يُحِبُّ ٱللَّهُ ٱلۡجَهۡرَ بِٱلسُّوٓءِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ ﴾ [النساء: ١٤٨]
“মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ পছন্দ করেন না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَقُل لِّلۡمُؤۡمِنَٰتِ يَغۡضُضۡنَ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِنَّ وَيَحۡفَظۡنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبۡدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَاۖ ﴾ [النور: ٣١]
“আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তবে যা সাধারণত প্রকাশ থাকে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« خيرُ النساءِ التي إذا نظرتَ إليها سرتْك ، وإذا امرتَها أطاعتْك ، وإذا غبتَ عنها حَفِظتْكَ في نفسِها ومالِكَ » . (رواه الطبراني).
“সর্বোত্তম নারী সেই, যার দিকে যখন তুমি তাকাও, তখন সে আনন্দ দেয়; আর যখন তুমি নির্দেশ প্রদান কর, তখন সে তোমার আনুগত্য করে; আর যখন তুমি তার থেকে অনুপস্থিত থাক, তখন সে তার নিজের ব্যাপারে তোমাকে এবং তোমার সম্পদকে হেফাযত করে।” তিনি আরও বলেন:
« لا تَمْنَعُوا إمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ ، إِذَا اسْتَأْذَنَتْ أَحَدَكُمْ امْرَأَتُهُ إِلَى الْمَسْجِدِ فَلَا يَمْنَعْهَا » . (رواه مسلم و أحمد).
“তোমরা আল্লাহর বান্দীদেরকে আল্লাহর মাসজিদসমূহে যাওয়ার ব্যাপারে বাধা প্রদান করো না; যখন তোমাদের কারও স্ত্রী মাসজিদে যেতে অনুমতি প্রার্থনা করে, তখন সে যেন তাকে নিষেধ না করে।” তিনি আরও বলেন:
« ائْذَنُوا لِلنِّسَاءِ بِاللَّيْلِ إِلَى الْمَسَاجِدِ » . (رواه مسلم و أحمد ، وأبو داود ، والترمذى).
“তোমরা রাতের বেলায় নারীদেরকে মাসজিদে যাওয়ার অনুমতি দাও।”
(ঘ) নিকটাত্মীয়দের সাথে আদব:
মুসলিম ব্যক্তি তার নিকটতম আত্মীয়স্বজন ও রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে অবিকল সেসব আদব রক্ষা করে চলবে, যেসব আদব সে তার পিতামাতা, সন্তানসন্ততি ও ভাই-বোনদের সাথে রক্ষা করে চলে; সুতরাং সে তার খালার সাথে তার মায়ের মত ব্যবহার করবে এবং তার ফুফুর সাথে তার বাবার মত ব্যবহার করবে; আর আনুগত্য, সদ্ব্যবহার ও ইহসান করার দিক থেকে মামা ও চাচার সাথে ঠিক তেমনি আচরণ করবে, যেমন আচরণ করবে পিতা ও মাতার সাথে। সুতরাং যার আত্মীয়তার বন্ধনে একই সূত্রে একত্রিত হয়ে গেছে মুমিন ও কাফির, তারা সকলেই তার নিকটতম বা রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয় বলে বিবেচিত হবে, যাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব এবং যাদের প্রতি ইহসান করা আবশ্যকীয় কর্তব্য। আর তাদের সাথে অবিকল সেসব আদব ও অধিকার রক্ষা করে চলবে, যেসব আদব সে তার পিতামাতা ও সন্তানসন্ততির সাথে রক্ষা করে চলে; সুতরাং সে তাদের মধ্যকার বড়কে সম্মান করবে, ছোটকে স্নেহ করবে, তাদের অসুস্থজনকে সেবা করবে, ভাগ্যাহতকে শান্তনা দিবে ও দুর্ঘটানায় আহতকে সমবেদনা জ্ঞাপন করবে। তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে, যদিও তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে; আর তাদের সাথে কোমল আচরণ করবে, যদিও তারা তার সাথে কঠোর আচরণ করে ও তার উপর অত্যাচার করে। আর এর প্রত্যেকটি বিষয়ই আল-কুরআনের আয়াত ও হাদিসে নববী’র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ ٱلَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلۡأَرۡحَامَۚ ﴾ [النساء: ١]
“আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবী কর।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَأُوْلُواْ ٱلۡأَرۡحَامِ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلَىٰ بِبَعۡضٖ فِي كِتَٰبِ ٱللَّهِۚ ﴾ [الانفال: ٧٥]
“আর আত্মীয়রা আল্লাহর বিধানে একে অন্যের জন্য বেশি হকদার।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ ﴾ [محمد: ٢٢]
“সুতরাং অবাধ্য হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে সম্ভবত তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ فَ‍َٔاتِ ذَا ٱلۡقُرۡبَىٰ حَقَّهُۥ وَٱلۡمِسۡكِينَ وَٱبۡنَ ٱلسَّبِيلِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ لِّلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجۡهَ ٱللَّهِۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٣٨ ﴾ [الروم: ٣٨]
“অতএব আত্মীয়কে দাও তার হক এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদের জন্য এটা উত্তম এবং তারাই তো সফলকাম।” আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ ۞إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُ بِٱلۡعَدۡلِ وَٱلۡإِحۡسَٰنِ وَإِيتَآيِٕ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ ﴾ [النحل: ٩٠]
“আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচারণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ ۞وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا وَبِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ وَٱلصَّاحِبِ بِٱلۡجَنۢبِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡۗ ﴾ [النساء: ٣٦]
“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোন কিছুকে তাঁর শরীক করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দুর-প্রতিবেশী, সংগী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَإِذَا حَضَرَ ٱلۡقِسۡمَةَ أُوْلُواْ ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينُ فَٱرۡزُقُوهُم مِّنۡهُ وَقُولُواْ لَهُمۡ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا ٨ ﴾ [النساء: ٨]
“আর সম্পত্তি বন্টনকালে আত্মীয়, ইয়াতীম এবং অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে তাদেরকে তা থেকে কিছু দিবে এবং তাদের সাথে সদালাপ করবে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« يَقُولُ اللَّهُ تعالى : أَنَا الرَّحْمَنُ ، وَهَذِه الرَّحِمُ شَقَقْتُ لَهَا اسْمًا مِنَ اسْمِى ، مَنْ وَصَلَهَا وَصَلْتُهُ ، وَمَنْ قَطَعَهَا قَطَعْتُهُ » . (رواه الحاكم و أبو داود).
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আমি হলাম ‘রাহমান’, আর এটা হলো ‘রাহেম’ (রক্ত-সম্পর্ক বা আত্মীয়তা), তার জন্য আমি আমার নাম থেকে একটি নাম উদ্ভাবন করেছি; যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক রাখব; আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।” অপর এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, কে সবচেয়ে বেশি সদ্ব্যবহার পাওয়ার দাবিদার? তখন তিনি বললেন:
« أمَّك ، ثم أمَّك ، ثم أمَّك ، ثم أبَاكَ ، ثم الأقربَ فالأقربَ » . (رواه أبو داود).
“তোমার মা, অতঃপর তোমার মা, অতঃপর তোমার মা, অতঃপর তোমার পিতা, অতঃপর তোমার নিকটাত্মীয় এবং নিকটাত্মীয়।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল এমন আমল সম্পর্কে, যা জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে; জবাবে তিনি বললেন:
« تَعْبُدَ اللَّهَ ، وَلَا تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا ، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ ، وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ ، وَتَصِلَ الرَّحِمَ » . (متفق عليه).
“তুমি আল্লাহর ‘ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না; সালাত আদায় করবে; যাকাত প্রদান করবে; আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে।” আর তিনি ‘খালা’ সম্পর্কে বলেন:
« الْخَالَةُ بِمْنزِلَةِ الأُم » . (رواه البخاري و أبو داود).
“খালার মর্যাদা তো মায়ের মর্যাদার মতই।” তিনি আরও বলেন:
« الصَّدَقَةُ عَلَى المِسكينِ صَدَقةٌ ، وعَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ : صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ » . (رواه النسائي و ابن ماجه و الترمذي).
“মিসকীনকে দান করলে সাদকার সাওয়াব পাওয়া যাবে; আর আত্মীয়কে দান করলে দু’টি প্রতিদান থাকবে: একটি দান করার, আরেকটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার।” আসমা বিনতে আবি বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আহুমা’র কাছে যখন তাঁর মা মক্কা থেকে মুশরিক অবস্থায় আগমন করলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন: তিনি তাঁর মায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবেন কিনা? তখন তিনি তাঁকে বললেন:
« نعم ، صِلي أمَّك » . (متفق عليه) .
“হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ।”
(ঙ) প্রতিবেশীদের সাথে আদব:
এক প্রতিবেশীর জন্য তার আরেক প্রতিবেশীর উপর যেসব অধিকার পুরাপুরিভাবে আদায় করা এবং একে অপরের সাথে যেসব আদব রক্ষা করে চলা ওয়াজিব, মুসলিম ব্যক্তি সেগুলোর যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করে; আর এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا وَبِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ ﴾ [النساء: ٣٦]
“আর তোমরা ... পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী ও দুর-প্রতিবেশীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ » . (متفق عليه) .
“জিব্রাঈল আ. এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অবিরত উপদেশ দিতে থাকলেন; এমনকি আমার মনে হল, হয়ত তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে দিবেন।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ، فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ » . (متفق عليه) .
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।”
১. তাকে কথায় বা কাজের দ্বারা কষ্ট না দেওয়া; কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بالله وَاليَومِ الآخرِ ، فَلاَ يُؤْذِي جَارَهُ » . (متفق عليه) .
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।” তিনি আরও বলেন:
« واللهِ لاَ يُؤْمِنُ ، وَاللهِ لاَ يُؤْمِنُ ، وَاللهِ لاَ يُؤْمِنُ ! قِيلَ : مَنْ يَا رَسُول الله ؟ قَالَ : الَّذِي لاَ يَأمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ ! » . (رواه البخاري) .
“আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়; আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়; আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়; জিজ্ঞেস করা হল: হে আল্লাহর রাসূল! কে সেই ব্যক্তি? তিনি বললেন: যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।” অপর এক হাদিসে এসেছে, একদল সাহাবী বললেন:
« يا رسولَ اللهِ ! إن فلانةَ تصومُ النهارَ , وتقومُ الليلَ , وتؤذي جيرانها , قال: هي في النار» . (رواه أحمد و الحاكم).
“হে আল্লাহর রাসূল! অমুক ব্যক্তি তো দিনে সাওম পালন করে এবং রাতে সালাত আদায় করে, অথচ তার প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয়! তিনি বললেন: সে জাহান্নামে যাবে।”
২. তার উপকার করা; আর এটা হবে— যখন সে তার কাছ সাহায্য চাইবে, তখন সে তাকে সাহায্য করবে; যখন সহযোগিতা চাইবে সহযোগিতা করবে; যখন সে অসুস্থ হবে, তখন তার সেবা করবে; যখন সে আনন্দিত হবে, তখন তার আনন্দের অংশীদার হবে; আর যখন বিপদগ্রস্ত হবে, তখন তাকে সমবেদনা জ্ঞাপন করবে; যখন সে কোনো কিছুর অভাব অনুভব করবে, তখন তাকে সহযোগিতা করবে; তাকে আগে আগে সালাম প্রদান করবে; তার সাথে কোমল ব্যবহার করবে; তার সন্তানের সাথে কথা বলার সময় মমতা দেখাবে; যে পথে তার দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ হবে, তাকে সে পথ দেখাবে; তার দিকে খেয়াল রাখবে এবং তার সীমানা সংরক্ষণ করবে; তার ভুল-ভ্রান্তি মার্জনা করবে এবং তার গোপন বিষয় জানার চেষ্টা করবে না; তার ভবন বা চলার পথকে সংকীর্ণ করে দেবে না; ছাদের পানি নিষ্কাশনের নল দ্বারা বা ময়লা দ্বারা অথবা তার বাড়ির সামনে আবর্জনা নিক্ষেপ করার দ্বারা তাকে কষ্ট দেবে না; আর এসব কিছুর মানেই হল তার প্রতি ইহসান বা সদ্ব্যবহার করা, যে ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ ﴾ [النساء: ٣٦]
“আর তোমরা ... নিকট প্রতিবেশী ও দুর-প্রতিবেশীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ، فَلْيُحْسِنْ إِلَى جَارِهِ » . (رواه مسلم).
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করে।”
৩. তাকে ভালো ও কল্যাণকর কিছু দেয়ার মাধ্যমে সম্মান করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« يَا نِسَاء المُسْلِمَاتِ ! لاَ تَحْقِرَنَّ جَارةٌ لِجَارَتِهَا وَلَوْ فِرْسِنَ شَاة » . (رواه البخاري).
“হে মুসলিম রমনীগণ! কোনো প্রতিবেশিনী যেন অপর প্রতিবেশিনীকে তুচ্ছজ্ঞান না করে, এমনকি বকরীর একটি ক্ষুর উপঢৌকন পাঠালেও নয়।” তিনি আরও বলেন:
« يَا أَبَا ذَرٍّ ! إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً ، فَأكثِرْ مَاءهَا ، وَتَعَاهَدْ جيرَانَكَ » . (رواه مسلم).
“হে আবূ যর! যখন তুমি তরকারি পাকাও, তখন তাতে একটু বেশি পানি দিয়ে ঝোল বাড়াও এবং তোমার প্রতিবেশিকে পৌঁছাও।” আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন: আমার তো দুইজন প্রতিবেশী আছে, আমি তাদের কার কাছে উপঢৌকন পৌঁছাবো? তখন তিনি বললেন:
« إِلَى أقْرَبِهِمَا مِنكِ بَاباً » . (رواه البخاري).
“উভয়ের মধ্যে যার ঘর তোমার বেশি কাছে হয়, তার কাছে পাঠাও।”
৪. তাকে সম্মান ও কদর করা; সুতরাং সে তাকে খুঁটি গাড়তে নিষেধ করবে না এবং তাকে জিজ্ঞাসা না করে তার সাথে সংযুক্ত বা তার নিকটবর্তী কোনো কিছু বিক্রয় করবে না বা ভাড়া দেবে না; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لاَ يَمْنَعْ أَحَدُكُمْ جَارَهُ أَنْ يَغْرِزَ خَشَبَةً فِى جِدَارِهِ » . (متفق عليه).
“তোমাদের কেউ যেন তার দেয়ালের পাশে তার প্রতিবেশীকে খুঁটি গাড়তে নিষেধ না করে।” তিনি আরও বলেন:
« من كان له جارٌ فى حائط أو شريكٌ فَلَا يَبِعهُ حتى يَعْرِضَه عليهِ » . (رواه الحاكم).
“যে ব্যক্তির বাগানের প্রতিবেশী আছে, অথবা অংশীদার আছে, সে যেন তাকে না জানিয়ে তা বিক্রি না করে।”

দু’টি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণী:
প্রথমত: মুসলিম ব্যক্তি যখন তার প্রতিবেশীদের কাছে ভালো কিংবা মন্দ হবে, তখন সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারবে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে প্রশ্নকারী ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
« إِذَا سَمِعْتَ جِيرَانَكَ يَقُولُونَ : قَدْ أَحْسَنْتَ ، فَقَدْ أَحْسَنْتَ ، وَإِذَا سَمِعْتَهُمْ يَقُولُونَ : قَدْ أَسَأْتَ ، فَقَدْ أَسَأْتَ » . (رواه أحمد).
“যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীদেরকে বলতে শুনবে তুমি ভালো, তখন তুমি ভালো; আর যখন তুমি তাদেরকে বলতে শুনবে তুমি মন্দ, তখন তুমি মন্দ।”
দ্বিতীয়ত: যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর দ্বারা দুর্ভোগের শিকার হবে, তখন সে যেন ধৈর্যধারণ করে; কারণ, তার ধৈর্যধারণ অচিরেই তার থেকে তার মুক্তির কারণ হবে; কেননা, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে তার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
« اصبر ، ثم قال له في الرابعة أو الثالثة : اطْرح متاعَك في الطريقِ ، فَطَرَحَهُ ، فجعل الناس يمرون به ويقولون : ما لك ؟ فيقول : آذاه جاره ، فجعلوا يقولون : لعنهُ الله ، فجاءه جاره ، فقال : رد متاعك ، لا والله لا أوذيك أبدا » . (رواه ابن حبان).
“তুমি ধৈর্যধারণ কর; অতঃপর চতুর্থ অথবা তৃতীয় বারে তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন: তুমি তোমার মালমাত্তা রাস্তার মধ্যে ফেলে দাও, তারপর সে তাই করল; অতঃপর জনগণ তার পাশ দিয়ে পথ চলতে গিয়ে বলতে শুরু করল: তোমার কী হয়েছে? তখন সে বলল: তার প্রতিবেশী তাকে কষ্ট দিয়েছে; তারপর তারা বলতে শুরু করল: আল্লাহ তাকে ‘লানত’ করুন; তারপর তার প্রতিবেশী তার নিকট আসল এবং বলল: তুমি তোমার মাল ফিরিয়ে নাও; আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে আর কখনও কষ্ট দেব না।”
(চ) মুসলিম জাতির পরস্পরের মধ্যকার আদব ও অধিকারসমূহ:
মুসলিম ব্যক্তি তার উপর তার অপর মুসলিম ভাইয়ের অধিকারসমূহ আদায় ও আদবসমূহ মেনে চলার আবশ্যকতার ব্যাপারে বিশ্বাস করে; সুতরাং সে তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে এবং তার অধিকারসমূহ যথাযথভাবে আদায় করে দিবে; আর সে এটাও বিশ্বাস করে যে, এসব আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত এবং এর দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করা যায়; কেননা, এসব অধিকার ও আদব আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম ব্যক্তির উপর বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন, যাতে সে তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে এগুলো মেনে চলে; সুতরাং কোনো সন্দেহ নেই— তার এ কাজ করাটা আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর নৈকট্য অর্জনের উপায় বলে গণ্য হবে।
আর এসব আদব ও অধিকারের অন্যতম কিছু দিক নিম্নরূপ:
১. যখন তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হবে, তখন তার সাথে কথা বলার পূর্বেই তাকে সালাম প্রদান করবে; সুতরাং সে বলবে: " السلام عليكم و رحمة الله "(আপনার উপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক); তারপর সে তার সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করবে এবং সালামের জবাব স্বরূপ বলবে: " و عليكم السلام و رحمة الله و بركاته " (আপনার উপরও শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হউক); আর এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٖ فَحَيُّواْ بِأَحۡسَنَ مِنۡهَآ أَوۡ رُدُّوهَآۗ ﴾ [النساء: ٨٦]
“আর তোমাদেরকে যখন অভিবাদন করা হয়, তখন তোমরাও তার চেয়ে উত্তম প্রত্যাভিবাদন করবে অথবা সেটারই অনুরূপ করবে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى الْمَاشِي ، وَالْمَاشِي عَلَى الْقَاعِدِ ، وَالْقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ » . (متفق عليه).
“বাহনে আরোহণকারী ব্যক্তি পদব্রজে আগমনকারী ব্যক্তিকে, পদব্রজে আগমনকারী ব্যক্তি বসা ব্যক্তিকে এবং কম সংখ্যক লোক বেশি সংখ্যক লোককে সালাম প্রদান করবে।” তিনি আরও বলেন:
« إنَّ الملائكةَ تَعجِبُ من المسلمِ يمُرُّ على المسلمِ ولا يُسَلِّمُ عَليهِ » .
“ফেরেশ্তাগণ ঐ মুসলিম ব্যক্তির ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেন, যে আরেক মুসলিম ব্যক্তির পাশ দিয়ে চলে গেল, অথচ সে তাকে সালাম প্রদান করল না।” তিনি আরও বলেন:
« وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ » . (متفق عليه).
“আর তুমি তোমার পরিচিত ও অপরিচিত সকল (মুসলিম) ব্যক্তিকে সালাম প্রদান করবে।” তিনি আরও বলেন:
« مَا مِنْ مُسْلِمَينِ يَلْتَقِيَانِ فَيَتَصَافَحَانِ إِلاَّ غُفِرَ لَهُمَا قَبْلَ أنْ يَفْتَرِقَا » . (رواه أبو داود و ابن ماجه و الترمذي).
“যখনই দুইজন মুসলিম ব্যক্তি পরস্পর সাক্ষাৎ হওয়ার পর মুসাফাহা করে, তারা পরস্পর থেকে আলাদা হওয়ার আগেই তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ بَدَأَ بِالْكَلامِ قَبْلَ السَّلامِ فَلا تُجِيبُوهُ حتى يَبدأ بِالسَّلامِ » . (رواه الطبراني و أبو نعيم).
“যে ব্যক্তি সালাম দেয়ার পূর্বে কথা বলা আরম্ভ করে, তোমরা তার কথায় সায় দেবে না, যতক্ষণ না সে সালামের মাধ্যমে কথার সূচনা করে।”
২. যখন সে হাঁচি দিবে, তখন তার হাঁচির জবাব দিবে; অর্থাৎ সে যখন হাঁচি দেওয়ার পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (الحَمْدُ للهِ) বলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করবে, তখন সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলবে: ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ (يَرْحَمُكَ اللهُ) [অর্থাৎ আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন]; আর তখন হাঁচিদাতা তার জবাব স্বরূপ আবার বলবে: " يَغْفِرُ اللهُ لِيْ و لَكَ " (আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে ক্ষমা করে দিন) অথবা বলবে: " يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ " (আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়েত করুন এবং তোমাদের অবস্থাকে ভালো করে দিন)। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا عَطَسَ أحَدُكُمْ فَلْيَقُلْ : الحَمْدُ للهِ ، وَلْيَقُلْ لَهُ أخُوهُ أَوْ صَاحِبُهُ : يَرْحَمُكَ الله . فإذَا قَالَ لَهُ : يَرْحَمُكَ اللهُ ، فَليَقُلْ : يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ » . (رواه البخاري).
“যখন তোমাদের কেউ হাঁচি দেয়, তখন সে যেন বলে: ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (الحَمْدُ للهِ) এবং তার ভাই বা সঙ্গী যেন তাকে বলে: " يَرْحَمُكَ اللهُ " (অর্থাৎ আল্লাহ তোমার উপর রহমত বর্ষণ করুন); আর যখন সে তাকে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ (يَرْحَمُكَ اللهُ) বলবে, তখন সে যেন বলে: " يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ " (আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়েত করুন এবং তোমাদের অবস্থাকে ভালো করে দিন)।” আর আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« كَانَ رسول الله صلى الله عليه وسلم إِذَا عَطَسَ وَضَعَ يَدَهُ أَوْ ثَوْبَهُ عَلَى فِيهِ ، وَخَفَضَ أَوْ غَضَّ بِهَا صَوْتَهُ » . (رواه أَبُو داود والترمذي).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাঁচি দিতেন, তখন তিনি তাঁর মুখের উপর হাত বা কাপড় রাখতেন এবং এর দ্বারা হাঁচির আওয়াজ নিম্নগামী করতেন।”
৩. যখন সে অসুস্থ হবে, তখন তার সেবা-যত্ন করা এবং তার জন্য রোগমুক্তির দো‘য়া করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« حَقُّ المُسْلِم عَلَى المُسْلِم خَمْسٌ : رَدُّ السَّلامِ ، وَعِيَادَةُ المَريض ، وَاتِّبَاعُ الجَنَائِزِ ، وَإجَابَةُ الدَّعْوَة ، وتَشْميتُ العَاطِسِ » . (متفق عليه).
“এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের পাঁচটি হক বা অধিকার রয়েছে: সালামের জবাব দেয়া, রোগীর সেবা করা, জানাযার সালাতে অংশ নেয়া, দাওয়াত কবুল করা এবং হাঁচির জবাব দেয়া।” আর তাছাড়া বারা ইবন ‘আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« أمَرَنَارَسُول الله صلى الله عليه وسلم بعيَادَة المَرِيض ، وَاتِّبَاعِ الجَنَازَةِ ، وتَشْمِيتِ العَاطسِ، وَإبْرار المُقْسِم، ونَصْرِ المَظْلُوم ، وَإجَابَةِ الدَّاعِي ، وَإِفْشَاءِ السَّلامِ » . (رواه البخاري).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন রোগীর সেবা করতে, জানাযার অনুসরণ করতে, হাঁচির জবাব দিতে, শপথ বা প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে, মাযলুমকে সাহায্য করতে, দাওয়াত দাতার দাওয়াত কবুল করতে এবং ব্যাপকভাবে সালামের প্রচলন করতে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« عُودُوا المَريضَ ، وَأطْعِمُوا الجَائِعَ ، وَفُكُّوا العَانِي » . (رواه البخاري).
“তোমারা রোগীকে দেখতে যাও বা সেবা কর, অভুক্তকে খাবার দাও এবং বন্দীদেরকে মুক্তি দাও।” আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন:
« أنَّ النَّبيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَعُودُ بَعْضَ أهْلِهِ يَمْسَحُ بِيدِهِ اليُمْنَى ، ويقولُ : « اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ ، أذْهِب البَأسَ ، اشْفِ أنْتَ الشَّافِي لاَ شِفَاءَ إِلاَّ شِفاؤكَ ، شِفَاءً لاَ يُغَادِرُ سَقماً » . (متفق عليه).
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরিবারের কোনো রোগীকে দেখতে গেলে তার উপর ডান হাত বুলাতেন এবং বলতেন: « اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ ، أذْهِب البَأسَ ، اشْفِ أنْتَ الشَّافِي لاَ شِفَاءَ إِلاَّ شِفاؤكَ ، شِفَاءً لاَ يُغَادِرُ سَقماً » (হে আল্লাহ! হে মানুষের প্রভু! রোগ দূর কর, রোগমুক্তি দাও, তুমিই রোগমুক্তি দানকারী, কোনো রোগমুক্তি নেই তোমার রোগমুক্তি ছাড়া— যা কোনো রোগকে ছাড়ে না)।”
৪. সে যখন মারা যাবে, তখন তার জানাযায় হাযির হওয়া; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« حَقُّ المُسْلِم عَلَى المُسْلِم خَمْسٌ : رَدُّ السَّلامِ ، وَعِيَادَةُ المَريض ، وَاتِّبَاعُ الجَنَائِزِ ، وَإجَابَةُ الدَّعْوَة ، وتَشْميتُ العَاطِسِ » . (متفق عليه).
“এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের পাঁচটি হক বা অধিকার রয়েছে: সালামের জবাব দেয়া, রোগীর সেবা করা, জানাযার সালাতে অংশ নেয়া, দাওয়াত কবুল করা এবং হাঁচির জবাব দেয়া।”
৫. তার শপথ পূরণ করা, যখন সে কোন ব্যাপারে শপথ করে বসে এবং তাতে অবৈধ কোন কিছু না থাকে; সুতরাং সে যে কারণে শপথ করেছে, তা পূরণে সহযোগিতামূলক কাজ করবে, যাতে তার শপথ ভঙ্গ করতে না হয়; কারণ, বারা ইবন ‘আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের মধ্যে এসেছে, তিনি বলেন:
« أمَرَنَارَسُول الله صلى الله عليه وسلم بعيَادَة المَرِيض ، وَاتِّبَاعِ الجَنَازَةِ ، وتَشْمِيتِ العَاطسِ، وَإبْرار المُقْسِم، ونَصْرِ المَظْلُوم ، وَإجَابَةِ الدَّاعِي ، وَإِفْشَاءِ السَّلامِ » . (رواه البخاري).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন রোগীর সেবা করতে, জানাযার অনুসরণ করতে, হাঁচির জবাব দিতে, শপথ বা প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে, মাযলুমকে সাহায্য করতে, দা‘ওয়াত দাতার দা‘ওয়াত কবুল করতে এবং ব্যাপকভাবে সালামের প্রচলন করতে।”
৬. তাকে (ভালো) উপদেশ দেওয়া, যখন সে কোনো বিষয় বা ব্যাপারে উপদেশ বা পরামর্শ চায়; অর্থাৎ সে কোনো বিষয় বা ব্যাপারে যা উত্তম ও সঠিক মনে করবে, তা তাকে বলে দেবে; আর এটা এ জন্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« إِذَا اسْتَنْصَحَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيَنْصَحْ لَهُ » . (رواه البخاري).
“যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের কাছে উপদেশ বা পরামর্শ চাইবে, তখন সে যেন তাকে ভালো উপদেশ দেয়।” তিনি আরও বলেন:
« الدِّينُ النَّصِيحَةُ ، قُلْنَا : لِمَنْ ؟ قَالَ : لِلَّهِ ، وَلِكِتَابِهِ ، وَلِرَسُولِهِ ، وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ ، وَعَامَّتِهِمْ » . (رواه مسلم).
“দীন হচ্ছে (জনগণের) কল্যাণ কামনা করা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সমস্ত মুসলিমের জন্য।” আর মুসলিম ব্যক্তি তো তাদের সকলের মধ্য থেকে একজন।
৭. নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার জন্যও তা পছন্দ করা এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করবে, তার জন্যও তা অপছন্দ করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« لا يُؤمِنُ أحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحبُّ لِنَفْسِهِ ، و يكرَهُ لَهُ ما يَكرَهُ لِنَفْسِهِ » . (رواه البخاري و مسلم و أحمد).
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে এবং তার নিজের জন্য যা অপছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যও তা অপছন্দ করবে।” তিনি আরও বলেন:
« مَثَلُ المُؤْمِنينَ في تَوَادِّهِمْ وتَرَاحُمهمْ وَتَعَاطُفِهمْ ، مَثَلُ الجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الجَسَدِ بِالسَّهَرِ والحُمَّى » . (متفق عليه).
“পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মায়া-মমতার দৃষ্টিকোণ থেকে গোটা মুসলিম জাতি একটি দেহের সমতুল্য; যখন তার একটি অঙ্গ ব্যথিত হয়, তখন তার গোটা শরীর তা অনুভব করে— সেটা জাগ্রত অবস্থায়ই হউক, কিংবা জ্বরের অবস্থায়।” তিনি আরও বলেন:
« المُؤْمِنُ للْمُؤْمِنِ كَالبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضَاً » . (متفق عليه).
“এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরস্বরূপ, এর এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।”
৮. যেখানেই তার সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার দরকার, সেখানেই তাকে সাহায্য করা এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন না করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« انْصُرْ أخَاكَ ظَالماً أَوْ مَظْلُوماً ، فَقَالَ رجل : يَا رَسُول اللهِ ، أنْصُرُهُ إِذَا كَانَ مَظْلُوماً ، أرَأيْتَ إنْ كَانَ ظَالِماً كَيْفَ أنْصُرُهُ ؟ قَالَ : تحْجُزُهُ أَوْ تمْنَعُهُ مِنَ الظُلْمِ فَإِنَّ ذلِكَ نَصرُهُ » . (متفق عليه).
“তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে যালেম হউক অথবা মাযলুম; একথা বলার পর এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি মাযলুম হয়, আমি তাকে সাহায্য করব— এটা বুঝতে পারলাম; সে যালিম হলে আমি তাকে কিভাবে সাহায্য করব— সে ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? তখন তিনি বললেন: তাকে যুলুম করা থেকে বিরত রাখ, বাধা দাও; এটাই হল তাকে সাহায্য করা।” তিনি আরও বলেন:
« المُسْلِمُ أخُو المُسْلم : لاَ يَظْلِمُهُ ، وَلاَ يَخْذُلُهُ ، وَلا يَحْقِرُهُ » . (متفق عليه).
“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই; সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে অপমান করবে না এবং তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না।” তিনি আরও বলেন:
« ما من امرئٍ مسلمٍ ينصُرُ مسلماً في موضعٍ يُنْتَهَكُ فيه عرضُهُ ، وتُسْتَحَلُّ فيه حرمتُهُ إلاَّ نصرهُ اللهُ في موطنٍ يُحِبُّ فيه نَصْرَهُ ، وما من امرئٍ مسلمٍ خَذَلَ مسلماً في موطنٍ تُنْتَهَكُ فيه حرمتُهُ إلاَّ خذلهُ اللهُ في موضعٍ يُحِبُّ فيه نَصْرَهُ » . (رواه أحمد).
“যে কোনো মুসলিম ব্যক্তি অপর কোনো মুসলিমকে সাহায্য করবে এমন কোনো স্থানে, যেখানে তার চরিত্রকে কলুষিত করা হয় এবং তার সম্মানকে নষ্ট করা হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে এমন স্থানে সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য পাওয়াটাকে পছন্দ করবে। আর যে কোনো মুসলিম ব্যক্তি অপর কোনো মুসলিমকে অপমান করবে এমন কোনো স্থানে, যেখানে তার সম্মানকে নষ্ট করা হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে এমন স্থানে অপমানিত করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য পাওয়াটাকে কামনা করবে।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ » . (رواه الترمذي).
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান-সম্মান নষ্ট করা থেকে নিজে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।”
৯. তাকে কোনো মন্দ কিছুর দ্বারা আক্রমণ না করা অথবা তাকে কোনো অপছন্দনীয় কিছুতে না জড়ানো; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ » . (رواه مسلم).
“প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান অপর সব মুসলিমের জন্য হারাম।” তিনি আরও বলেন:
« لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يُرَوِّعَ مُسْلِمًا » . (رواه أحمد و أبو داود).
“কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য অপর কোনো মুসলিমকে ভয় দোখানো বৈধ নয়।” তিনি আরও বলেন:
« لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يُشِيرَ إِلَى أَخِيهِ بِنَظْرَةٍ تُؤْذِيهِ » . (رواه أحمد).
“কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার ভাইয়ের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকানো বৈধ নয়, যে দৃষ্টি তাকে কষ্ট দেয়।” তিনি আরও বলেন:
« إِنَّ اللَّهَ يَكْرَهُ أَذَى الْمُؤْمِنِيْنَ » . (رواه أحمد).
“আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের কষ্টকে অপছন্দ করেন।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ » . (متفق عليه).
“মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাতের অনিষ্ট থেকে অন্যান্য মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।” তিনি আরও বলেন:
« الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ المؤمِنُونَ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ » . (رواه أحمد و الترمذي و الحاكم).
“মুমিন সেই ব্যক্তি, যার কাছে অন্যান্য মুমিনগণ তাদের জীবন ও সম্পদের ব্যাপারে নিরাপদে থাকে।”
১০. তার সাথে বিনয়ী হওয়া এবং তার উপর অহঙ্কার প্রদর্শন না করা; আর নিজে বসার জন্য তাকে তার বৈধ বসার জায়গা থেকে উঠিয়ে না দেওয়া; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَلَا تُصَعِّرۡ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمۡشِ فِي ٱلۡأَرۡضِ مَرَحًاۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخۡتَالٖ فَخُورٖ ١٨ ﴾ [لقمان: ١٨]
“আর তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ » . (رواه أبو داود و ابن ماجه).
“আল্লাহ তা‘আলা আমার নিকট অহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যাতে কেউ কারও উপর অহঙ্কার প্রকাশ না করে।” তিনি আরও বলেন:
« ما تَواضعَ أحدٌ لله إلا رفعهُ اللهُ تعالى » . (رواه الترمذي).
“যে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় প্রকাশ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার মর্যাদাকে সমুন্নত করবেন।” তাছাড়া একথা সর্বজন বিদিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক মুসলিমের সাথে বিনয়ী ছিলেন, অথচ তিনি হলেন নবী-রাসূলগণের সর্দার; তাছাড়া তিনি নিঃস্ব ও মিসকীনদের সাথে হাঁটতে এবং তাদের সমস্যা সমাধান করতে উদ্ধতভাব ও অহঙ্কার প্রদর্শন করতেন না, বরং তিনি বলতেন:
« اللَّهُمَّ أَحْيِنِى مِسْكِيناً ، وَأَمِتْنِى مِسْكِيناً ، وَاحْشُرْنِى فِى زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ » . (رواه ابن ماجه و الحاكم).
“হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মিসকীন অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখ, মিসকীন অবস্থায় মৃত্যু দান করিও এবং মিসকীনদের মাঝে আমার হাশরের ব্যবস্থা করিও।” তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« لا يُقِيمَنَّ أحَدُكُمْ رَجُلاً مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ يَجْلِسُ فِيهِ ، وَلكِنْ تَوَسَّعُوا وَتَفَسَّحُوا » . (متفق عليه).
“তোমাদের কেউ যেন কোনো ব্যক্তিকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে নিজে সেখানে না বসে; বরং তোমরা জায়গা বিস্তৃত করে দাও এবং ছড়িয়ে বসো।”
১১. তাকে তিন দিনের বেশি বিচ্ছিন্ন করে না রাখা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« لا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثِ لَيَالٍ : يَلْتَقِيَانِ ، فَيُعْرِضُ هَذَا ، وَيُعْرِضُ هَذَا ، وخَيْرُهُما الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلاَمِ » . (متفق عَلَيْهِ).
“কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার কোনো মুসলিম ভাইকে তিন দিনের বেশি বিচ্ছিন্ন করে রাখা বৈধ নয়; তাদের উভয়ের মাঝে সাক্ষাৎ হয়, তখন একজন এ দিকে এড়িয়ে যায়, আরেকজন ঐ দিকে এড়িয়ে যায়; আর তাদের উভয়ের মধ্যে যে আগে সালাম দিবে, সে-ই উত্তম বলে বিবেচিত হবে।” তিনি আরও বলেন:
« وَلاَ تَدَابَرُوا ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا » . (رواه مسلم).
“আর তোমরা পরস্পর পরস্পরের পিছনে লেগনা; আর তোমরা আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।”
১২. তার গীবত না করা, অথবা তাকে হয়ে প্রতিপন্ন না করা, অথবা তার দোষ বর্ণনা না করা, অথবা তাকে উপহাস না করা, অথবা তাকে বিকৃত নামে না ডাকা, অথবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য তার কোনো কথা ফাঁস না করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱجۡتَنِبُواْ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَ لَا تَجَسَّسُواْ وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمۡ أَن يَأۡكُلَ لَحۡمَ أَخِيهِ مَيۡتٗا فَكَرِهۡتُمُوهُۚ ﴾ [الحجرات: ١٢]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا يَسۡخَرۡ قَوۡمٞ مِّن قَوۡمٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُونُواْ خَيۡرٗا مِّنۡهُمۡ وَلَا نِسَآءٞ مِّن نِّسَآءٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُنَّ خَيۡرٗا مِّنۡهُنَّۖ وَلَا تَلۡمِزُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَلَا تَنَابَزُواْ بِٱلۡأَلۡقَٰبِۖ بِئۡسَ ٱلِٱسۡمُ ٱلۡفُسُوقُ بَعۡدَ ٱلۡإِيمَٰنِۚ وَمَن لَّمۡ يَتُبۡ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ١١ ﴾ [الحجرات: ١١]
“হে ঈমানদারগণ! কোনো মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোনো মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা, যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ ؟ قالوا : اللهُ وَرَسُولُهُ أعْلَمُ ، قَالَ : ذِكْرُكَ أخَاكَ بِما يَكْرَهُ ، قِيلَ : أفَرَأيْتَ إنْ كَانَ في أخِي مَا أقُولُ ؟ قَالَ : إنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ ، فقد اغْتَبْتَهُ ، وإنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ مَا تَقُولُ ، فَقَدْ بَهَتَّهُ » . (رواه مسلم).
“তোমরা কি জান, গীবত কাকে বলে? সাহাবীগণ বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বলেন: তুমি তোমার ভাইয়ের এমন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা কর, যা সে অপছন্দ করে। বলা হল: আপনার কী অভিমত, আমি যা আলোচনা করলাম, তা যদি তার মধ্যে থেকে থাকে? তিনি বললেন: যেসব দোষ তুমি বর্ণনা করেছ তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থেকে থাকে, তবেই তো তুমি তার গীবত করলে; যদি সেসব দোষ তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তো তুমি তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে।” আর তিনি বিদায় হাজ্জের ভাষণে বলেন:
« إنَّ دِماءكُمْ ، وَأمْوَالَكُمْ ، وأعْرَاضَكُمْ ، حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا » . (متفق عَلَيْهِ).
“নিশ্চয়ই তোমার পরস্পরের রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম ও সম্মানের যোগ্য, তোমাদের আজকের এ দিনের সম্মানের মতই।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ » . (رواه مسلم).
“প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান অপর সব মুসলিমের জন্য হারাম।” তিনি আরও বলেন:
« بحَسْب امْرىءٍ مِنَ الشَّرِّ أنْ يَحْقِرَ أخَاهُ المُسْلِم » . (رواه مسلم).
“কোনো ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করে।” তিনি আরও বলেন:
« لا يَدْخُلُ الجَنَّةَ قَتَّاتٌ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ).
“চোগলখোর তথা পরনিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
১৩. অন্যায়ভাবে তাকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় গালি না দেওয়া; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتالُهُ كُفْرٌ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ) .
“মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া পাপ এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফরী।” তিনি আরও বলেন:
« لاَ يَرْمِي رَجُلٌ رَجُلاً بِالفِسْقِ أَوِ الكُفْرِ ، إِلاَّ ارْتَدَّتْ عَلَيْهِ ، إنْ لَمْ يَكُنْ صَاحِبُهُ كذَلِكَ » . (رواه البخاري).
“কোনো ব্যক্তি যেন অপর কোনো ব্যক্তিকে ফাসেক অথবা কাফির না বলে; কারণ, সে ব্যক্তি যদি প্রকৃতই তা না হয়ে থাকে, তাহলে এ অপবাদ তার নিজের ঘাড়ে এসে পড়বে।” তিনি আরও বলেন:
« المُتَسَابَّانِ مَا قَالاَ فَعَلَى البَادِي منهُما حَتَّى يَعْتَدِي المَظْلُومُ » . (رواه مسلم).
“পরস্পরকে গালি প্রদানকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে যে আগে গালি দিয়েছে, সে দোষী বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ না নির্যাতিত ব্যক্তি (অর্থাৎ প্রথম যাকে গালি দেয়া হয়েছে) সীমা অতিক্রম করবে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« لا تَسُبُّوا الأَمْوَاتَ ، فَإنَّهُمْ قَدْ أفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوا » . (رواه البخاري).
“তোমরা মৃতদেরকে গালি দিয়ো না; কারণ, তারা যা কিছু করেছে, তার ফলাফলের কাছে পৌঁছে গেছে।” তিনি আরও বলেন:
« مِنَ الكَبَائِر شَتْمُ الرَّجُل وَالِدَيهِ ! ، قالوا : يَا رَسُول الله ، وَهَلْ يَشْتُمُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ ؟! قَالَ : نَعَمْ ، يَسُبُّ أَبَا الرَّجُلِ ، فَيَسُبُّ أبَاه ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ ، فَيَسُبُّ أُمَّهُ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ) .
“কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার পিতামাতাকে গালি দেয়া কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত! সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন: হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কোনো মানুষ কি তার পিতামাতাকে গালি দিতে পারে?! জবাবে তিনি বললেন: হ্যাঁ, সে অন্য কোনো মানুষের পিতাকে গালি দেয়, তখন ঐ ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্য ব্যক্তির মাকে গালি দেয়, তখন ঐ ব্যক্তি তার মাকে গালি দেয়।”
১৪. তাকে হিংসা না করা, অথবা তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ না করা, অথবা তাকে ঘৃণা না করা, অথবা তার পিছনে গোয়েন্দাগিরি না করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱجۡتَنِبُواْ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَ لَا تَجَسَّسُواْ وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ ﴾ [الحجرات: ١٢]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ لَّوۡلَآ إِذۡ سَمِعۡتُمُوهُ ظَنَّ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بِأَنفُسِهِمۡ خَيۡرٗا ﴾ [النور: ١٢]
“যখন তারা এটা শুনল, তখন মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীগণ তাদের নিজেদের সম্পর্কে কেন ভাল ধারণা করল না।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لا تَحَاسَدُوا ، وَلاَ تَنَاجَشُوا ، وَلاَ تَبَاغَضُوا ، وَلاَ تَدَابَرُوا ، وَلاَ يَبعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْع بَعْض ، وَكُونُوا عِبَادَ الله إخْوَاناً » . (رواه مسلم).
“তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, নকল ক্রেতা সেজে আসল ক্রেতার সামনে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে বলবে না, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা পোষণ করো না এবং পরস্পর পরস্পরের পিছনে লেগনা; আর তোমরা আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।” তিনি আরও বলেন:
« إيَّاكُمْ وَالظَّنَّ ، فَإنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ).
“সাবধান! তোমরা অযথা ধারণা করা থেকে বিরত থাক; কেননা, অযথা ধারণা পোষণ করা সবচেয়ে বড় ধরনের মিথ্যা।”
১৫. তার সাথে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা না করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ وَٱلَّذِينَ يُؤۡذُونَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ بِغَيۡرِ مَا ٱكۡتَسَبُواْ فَقَدِ ٱحۡتَمَلُواْ بُهۡتَٰنٗا وَإِثۡمٗا مُّبِينٗا ٥٨ ﴾ [الاحزاب: ٥٨]
“আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَن يَكۡسِبۡ خَطِيٓ‍َٔةً أَوۡ إِثۡمٗا ثُمَّ يَرۡمِ بِهِۦ بَرِيٓ‍ٔٗا فَقَدِ ٱحۡتَمَلَ بُهۡتَٰنٗا وَإِثۡمٗا مُّبِينٗا ١١٢ ﴾ [النساء: ١١٢]
“আর কেউ কোনো দোষ বা পাপ করে পরে সেটা কোনো নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلاَحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا » . (رواه مسلم).
“যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়; আর যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ بَايَعْتَ ، فَقُلْ : لاَ خِلاَبَةَ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ) .
“তুমি যার সাথে ক্রয়-বিক্রয় কর, তাকে বল: কোনোরূপ ধোঁকাবাজি করবে না।” নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« مَا مِنْ عَبْدٍ يَستَرْعِيهِ اللهُ رَعِيَّةً ، يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ ، إِلاَّ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الجَنَّة » . (رواه مسلم).
“আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দকে প্রজা সাধারণের তত্ত্বাবধায়ক বানাবার পর তাদের সাথে খিয়ানতকারী বা প্রতারণাকারী অবস্থায় যদি সে অবধারিত মৃত্যুর দিন মৃত্যুবরণ করে, তাহলে নিশ্চিতভাবে আল্লাহ তার উপর জান্নাত হারাম করে দেবেন।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ خَبَّبَ زَوْجَةَ امْرِئٍ ، أَوْ مَمْلُوكَهُ ، فَلَيْسَ مِنَّا » . (رواهُ أَبُو داود) .
“যে ব্যক্তি কারও স্ত্রী অথবা দাসীকে ধোঁকা দিয়ে তার চরিত্র নষ্ট করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
১৬. তার সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করা, অথবা তার খিয়ানত না করা, অথবা তার সাথে মিথ্যা কথা না বলা, অথবা তার ঋণ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে টাল-বাহানা না করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَوۡفُواْ بِٱلۡعُقُودِۚ ﴾ [المائ‍دة: ١]
“হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করবে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَٱلۡمُوفُونَ بِعَهۡدِهِمۡ إِذَا عَٰهَدُواْۖ ﴾ [البقرة: ١٧٧]
“আর তারা যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তা পূর্ণ করে।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَأَوۡفُواْ بِٱلۡعَهۡدِۖ إِنَّ ٱلۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٤ ﴾ [الاسراء: ٣٤]
“আর প্রতিশ্রুতি পালন কর; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« أرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ) .
“চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে, সে হবে খাঁটি মুনাফিক। আর যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত মুনাফিকের একটি স্বভাব তার মধ্যে থেকে যাবে; স্বভাবগুলো হল: আমানত রাখলে খিয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, চুক্তি করলে ভঙ্গ করে এবং ঝগড়ায় লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষায় কথা বলে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« قَالَ الله تَعَالَى : ثَلاَثَةٌ أنا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ : رَجُلٌ أعْطَى بي ثُمَّ غَدَرَ ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرَّاً فَأَكَلَ ثَمَنَهُ ، وَرَجُلٌ اسْتَأجَرَ أجيراً ، فَاسْتَوْفَى مِنْهُ ، وَلَمْ يُعْطِهِ أجْرَهُ » . (رواه البخاري).
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন: কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির সাথে ঝগড়া করব: যে ব্যক্তি আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করল; যে ব্যক্তি কোনো আযাদ বা স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল; আর যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করে তার কাছ থেকে পুরোপুরি কাজ আদায় করল, কিন্তু তার মজুরী বা পারশ্রমিক পরিশোধ করল না।” তিনি আরও বলেন:
« مَطْلُ الغَنِيِّ ظُلْمٌ، وَإِذَا أُتْبعَ أَحَدُكُمْ عَلَى مَلِيءٍ فَلْيَتْبَع » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ) .
“পাওনা আদায়ের ব্যাপারে ধনী ব্যক্তির টাল-বাহানা করাটা যুলুম। আর যদি কারোর ঋণকে অন্য (ধনী) ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাহলে (ঋণ দাতা) এ স্থানান্তরকে ঋণ বলে মেনে নেয়া উচিত।”
১৭. তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করবে; সুতরাং তার জন্য ভালো কিছু করবে এবং তাকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকবে; আর তার সাথে সাক্ষ্যাৎ করবে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে— তার ভালো ব্যবহার গ্রহণ করে নিবে এবং মন্দ আচরণ ক্ষমা করে দিবে; আর তার নিকট যা নেই সে বিষয়ে তার উপর চাপ সৃষ্টি করবে না; সুতরাং জাহেলের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করবে না এবং নির্বাক ব্যক্তি থেকে ভাষা শিখবে না। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ خُذِ ٱلۡعَفۡوَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡعُرۡفِ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡجَٰهِلِينَ ١٩٩ ﴾ [الاعراف: ١٩٩]
“মানুষের (চরিত্র ও কর্মের) উৎকৃষ্ট অংশ গ্রহণ করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদেরকে এড়িয়ে চলুন।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا ، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ » . (رواه أحمد و الترمذي و الحاكم).
“তুমি যেখানেই থাক, আল্লাহকে ভয় কর; আর অসৎকাজ করলে তার পরপরই সৎকাজ কর, তাহলে তা মন্দ কাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে; আর মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার কর।”
১৮. বড় হলে তাকে সম্মান করা; আর ছোট হলে তাকে স্নেহ করা; কেননা, মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُوَقِّرْ كَبِيرَنَا ، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا » . (رواه أبو داود و الترمذي).
“যে ব্যক্তি আমাদের বড়কে সম্মান করে না এবং ছোটকে স্নেহ করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” তিনি আরও বলেন:
« إنَّ مِنْ إجْلالِ اللهِ تَعَالَى : إكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ المُسْلِمِ » . (رواه أبو داود).

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.