নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম জীবনের আদব-কায়দা ২

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:৫২


“আল্লাহ তা‘আলাকে সম্মান করার অন্যতম একটি উপায় হলো বৃদ্ধ মুসলিম ব্যক্তিকে সম্মান করা।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন: « كَبِّرْ كَبِّرْ » অর্থাৎ বয়োজ্যেষ্ঠকে দিয়ে শুরু কর। হাদিসে প্রসিদ্ধ আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শিশুকে নিয়ে আসা হত তার জন্য বরকতের দো‘য়া করার জন্য, অথবা তার নাম রাখার জন্য; তারপর তিনি তাকে তাঁর কোলে নিতেন, ফলে কখনও কখনও শিশু তাঁর কোলে পেশাব করে দিত। হাদিসে আরও বর্ণিত আছে: তিনি যখন সফর থেকে আগমন করতেন, তখন শিশুরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করত; ফলে তিনি তাদের জন্য থামতেন, তারপর সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিতেন তাদেরকে তাঁর নিকট হাজির করার জন্য; তারপর তিনি তাদের মধ্য থেকে কিছু অংশকে তাঁর সামনে রাখতেন এবং কিছূ অংশকে তাঁর পেছনে রাখতেন; আবার তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিতেন শিশুদের কাউকে কাউকে (তাঁদের কোলে বা কাঁধে) বহন করার জন্য; আর শিশুদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসার কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব করতেন।
১৯. নিজ থেকে তার প্রতি ইনসাফ করা এবং তার সাথে এমন ব্যবহার করা, যে ব্যবহার সে নিজে অন্যের কাছ থেকে আশা করে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لا يَستكمِلُ العبدُ الإيمانَ حتى يكونَ فيه ثَلاثُ خِصَالٍ : الإِنْفَاقُ مِنَ الإِقْتَارِ ، وَالإِنْصَافُ مِنْ نَفْسِهِ ، وَبَذْلُ السَّلامِ » . (رواه البخاري و أحمد).
“বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানকে পরিপূর্ণ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটবে: ১. অভাবগ্রস্ত অবস্থায়ও দান করা, ২. নিজ থেকে ইসনাফ করা, এবং ৩. সালামের প্রচলন করা।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُزَحْزَحَ عَنْ النَّارِ ، وَيُدْخَلَ الْجَنَّةَ فَلْتَأْتِهِ مَنِيَّتُهُ وَهُوَ يَشهَدُ أن لا إله إلا الله وأن محمدًا عَبْدُهُ و رسُولُهُ ، وَلْيَأْتِ إِلَى النَّاسِ الَّذِي يُحِبُّ أنْ يُؤْتَى إِلَيْهِ » . (رواه الخرائطى و الطبرانى).
“যে ব্যক্তি মনে প্রাণে জাহান্নাম থেকে মুক্ত হতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, তার যেন মৃত্যু হয় এমন অবস্থায় যে, সে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং মানুষের সাথে এমন ব্যবহার করে, যে ব্যবহার সে নিজে অন্যের কাছ থেকে আশা করে।”
২০. তার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করা ও অভ্যন্তরীণ বিষয় গোপন রাখা এবং তার গোপন কথা কান পেতে না শুনা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ فَٱعۡفُ عَنۡهُمۡ وَٱصۡفَحۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٣ ﴾ [المائ‍دة: ١٣]
“কাজেই তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালবাসেন।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ فَمَنۡ عُفِيَ لَهُۥ مِنۡ أَخِيهِ شَيۡءٞ فَٱتِّبَاعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيۡهِ بِإِحۡسَٰنٖۗ ﴾ [البقرة: ١٧٨]
“তবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় আদায় করা কর্তব্য।” তিনি আরও বলেন:
﴿ وَلۡيَعۡفُواْ وَلۡيَصۡفَحُوٓاْۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغۡفِرَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ ﴾ [النور: ٢٢]
“তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন?।” তিনি আরও বলেন:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۚ ﴾ [النور: ١٩]
“নিশ্চয় যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« وَمَا زَادَ اللهُ عَبْداً بِعَفْوٍ إِلاَّ عِزّاً » . (رواه مسلم).
“আর আল্লাহ যে বান্দাকে ক্ষমার গুণে সমৃদ্ধ করেন, তাকে অবশ্যই সম্মান দ্বারা ধন্য করেন।” তিনি আরও বলেন:
« وَ أنْ تَعْفُو عَمَّنْ ظَلَمَكَ » . (رواه الحاكم).
“আর তোমার প্রতি যে যুলুম করে, তাকে তুমি ক্ষমা করা।” তিনি আরও বলেন:
« لاَ يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْدًا فِى الدُّنْيَا إِلاَّ سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ » . (رواه مسلم).
“যে কোনো বান্দা দুনিয়াতে অন্য বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।” তিনি আরও বলেন:
« يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ ، وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيمَانُ فِى قَلْبِهِ ! لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ ، وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ ، فَإِنَّهُ مَنْ يَتَّبِعْ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَ مَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ ولَوْ كَانَ فِى جَوْفِ بَيْتِهِ » . (رواه الترمذي و أحمد و أبو داود).
“হে যারা মুখে ঈমান এনেছ, অথচ অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমগণের গীবত করো না এবং তাদের গোপন বিষয়ের অনুসরণ করো না; কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন বিষয় খোঁজাখুঁজি করবে, আল্লাহ তা‘আলাও তার গোপন বিষয়ের পিছনে লাগবেন; আর আল্লাহ যার গোপন বিষয়ের পিছনে লাগবেন, সে তার ঘরের মধ্যে অবস্থান করলেও তিনি তা ফাঁস করে দিবেন।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« وَمَنْ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ ، صُبَّ فِي أُذُنِهِ الْآنُكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ » . (رواه البخاري).
“আর যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কথার দিকে কান লাগাল, অথচ তারা তা অপছন্দ করে, কিয়ামতের দিন তার কানে সীসা ঢেলে দেয়া হবে।”
২১. তার কোনো প্রয়োজনে তাকে সহযোগিতা করা এবং তার কোনো প্রয়োজন পূরণে সম্ভব হলে তার জন্য সুপারিশ করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ ﴾ [المائ‍دة: ٢]
“আর নেককাজ ও তাক্ওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ مَّن يَشۡفَعۡ شَفَٰعَةً حَسَنَةٗ يَكُن لَّهُۥ نَصِيبٞ مِّنۡهَاۖ ﴾ [النساء: ٨٥]
“কেউ কোনো ভাল কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنيَا ، نَفَّسَ الله عَنْهُ كُربَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ القِيَامَةِ ، وَمَنْ يَسَّر عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ الله عَلَيهِ في الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِماً سَتَرَهُ الله في الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ ، والله في عَونِ العَبْدِ مَا كَانَ العَبْدُ في عَونِ أخِيهِ » . (رواه مسلم).
“যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির পার্থিব কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ তা‘আলা তার কিয়ামতের দিনের কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দিবেন; আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর অভাবের কষ্ট লাঘব করে দেয়, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার অভাবের কষ্ট লাঘব করে দিবেন; আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করে রাখবেন; আর বান্দা যতক্ষণ তার মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন।” তিনি আরও বলেন:
« اشْفَعُوا تُؤْجَرُوا ، وَيَقْضِي الله عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِ مَا شَاءَ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ).
“তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে; আর আল্লাহ যা চান, তিনি তাঁর নবীর মুখ দিয়ে তা প্রকাশ করান।”
২২. সে যখন আল্লাহর নামে আশ্রয় চাইবে, তখন তাকে আশ্রয় দেওয়া; যখন তার কাছে আল্লাহর নামে সাহায্য চাইবে, তখন তাকে দান করা; তার ভালো কাজের জন্য তাকে পুরস্কার দেওয়া অথবা তার জন্য দো‘য়া করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ اسْتَعَاذَ بِاللَّهِ فَأَعِيذُوهُ ، وَمَنْ سَأَلَكُمْ بِاللَّهِ فَأَعْطُوهُ ، وَمَنْ دَعَاكُمْ فَأَجِيبُوهُ ، وَمَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ ، فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا مَا تُكَافِئُونَهُ ، فَادْعُوا لَهُ حَتَّى تَرَوْا أَنَّكُمْ قَدْ كَافَأْتُمُوهُ » . (رواه أحمد ، وأبو داود ، والنسائى ، والحاكم ).
“যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে আশ্রয় চাইবে, তোমরা তাকে আশ্রয় দাও; আর যে ব্যক্তি তোমাদের কাছে আল্লাহর নামে সাহায্য চাইবে, তোমরা তাকে দান কর; আর যে ব্যক্তি তোমাদেরকে আহ্বান করবে, তোমরা তার ডাকে সাড়া দাও; আর যে ব্যক্তি তোমাদের উপকার করবে, তোমরা তাকে প্রতিদান দাও; আর যদি তাকে পুরস্কার দেওয়ার মত কিছু না পাও, তাহলে তোমরা তার জন্য এমনভাবে দো‘য়া কর, যাতে তোমাদের মনের তৃপ্তি হয় যে, তোমরা তাদের প্রতিদান দিতে পেরেছ।”
(ছ) কাফিরের সাথে আচরণ:
মুসলিম ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, ইসলাম ছাড়া সকল জাতি, দীন ও ধর্ম বাতিল এবং তার অনুসারীগণ কাফির। আর দীন ইসলাম হলো একমাত্র সত্য দীন এবং তার অনুসারীগণ হলেন মুমিন মুসলিম। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ ﴾ [ال عمران: ١٩]
“নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥ ﴾ [ال عمران: ٨٥]
“আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ﴾ [المائ‍دة: ٣]
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নি‘য়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।”

সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নাযিলকৃত এসব চিরন্তন সত্যবাণীর মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তি জানে যে, ইসলামপূর্ব সকল ধর্ম ইসলামের আগমনে ‘মানসুখ’ বা রহিত হয়ে গেছে; আর ইসলাম হয়ে গেল গোটা মানবজাতির একমাত্র দীন বা জীবনবিধান; সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কারও পক্ষ থেকে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীনকে গ্রহণ করবেন না এবং ইসলাম ছাড়া আর অন্য কোনো শরী‘য়তকে শরী‘য়ত হিসেবে পছন্দ করবেন না; আর সেখান থেকেই মুসলিম ব্যক্তি মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই কাফির, যে ব্যক্তি ইসলামকে আল্লাহ তা‘আলার জন্য দীন হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। আর সে ‘কুফর’ বা কাফিরের সাথে নিম্নোক্ত আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে:
১. কুফরীকে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং তাকে পছন্দ না করা; কারণ, ‘কুফর’কে পছন্দ করা কুফরী।
২. আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাকে ঘৃণা করার কারণে তাকে ঘৃণা করা; কেননা, ভালোবাসা হবে আল্লাহর জন্য এবং ঘৃণা করাটাও হবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে; আর আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করার কারণেই তিনি তাকে ঘৃণা করেন; সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি কাফিরকে ঘৃণা করবে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাকে ঘৃণা করার কারণেই।
৩. তার সাথে বন্ধত্ব ও ভালোবাসা স্থাপন না করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ لَّا يَتَّخِذِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلۡكَٰفِرِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۖ ﴾ [ال عمران: ٢٨]
“মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ لَّا تَجِدُ قَوۡمٗا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ يُوَآدُّونَ مَنۡ حَآدَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَوۡ كَانُوٓاْ ءَابَآءَهُمۡ أَوۡ أَبۡنَآءَهُمۡ أَوۡ إِخۡوَٰنَهُمۡ أَوۡ عَشِيرَتَهُمۡۚ ﴾ [المجادلة: ٢٢]
“আপনি পাবেন না আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমানদার এমন কোন সম্প্রদায়, যারা ভালবাসে তাদেরকে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে- হোক না এ বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই অথবা এদের জ্ঞাতি-গোত্র।”
৪. তার সাথে ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার ও ন্যায় আচরণ করা এবং সে যদি বিদ্রোহী না হয়, তাহলে তাকে কল্যাণকর সুযোগ সুবিধা প্রদান করা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ لَّا يَنۡهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمۡ يُقَٰتِلُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ وَلَمۡ يُخۡرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمۡ أَن تَبَرُّوهُمۡ وَتُقۡسِطُوٓاْ إِلَيۡهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ ٨ ﴾ [الممتحنة: ٨]
“দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিস্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।” সুতরাং এ সুস্পষ্ট আয়াতটি কাফিরদের সাথে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচার-ব্যবাহারকে এবং তাদের উপকার করার বিষয়টিকে বৈধতা দিয়েছে; আর শুধু বিদ্রোহী কাফিরগণ ব্যতীত বাকি সকল কাফিরই এ সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবে; আর যেসব কাফিরের জন্য বিশেষ রাজনৈতিক দর্শন ও নিয়মনীতির ব্যবস্থা থাকবে, তাদেরকে বিদ্রোহী বলে গণ্য করা হবে এবং তাদের ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের বিধান প্রযোজ্য হবে।
৫. তার প্রতি সাধারণ সহানুভূতির সাথে করুণা করা, যেমন— সে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা, তৃষ্ণার্ত হলে তাকে পানি পান করানো, অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিপদ-মুসিবত ও দুর্যোগ থেকে রক্ষা করা এবং কষ্টকর বিষয় থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« ارْحَمْ مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكَ مَنْ فِي السَّمَاءِ » . (رواه الطبراني والحاكم ).
“তুমি পৃথিবীতে যারা আছে, তাদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমার প্রতি দয়া করবেন।” তিনি আরও বলেন:
« فِي كُلِّ ذِي كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ » . (رواه أحمد و ابن ماجه ).
“প্রাণী মাত্রকেই পানি পান করানোর মধ্যে সাওয়াব রয়েছে।”
৬. যদি সে বিদ্রোহী না হয়ে থাকে, তাহলে তার সম্পদ, জীবন বা সম্মানের ব্যাপারে তাকে কষ্ট না দেওয়া; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« يَقُولُ اللهُ تَبَاركَ وتعالى : يَا عِبَادي ! إنِّي حَرَّمْتُ الظُلْمَ عَلَى نَفْسي وَجَعَلْتُهُ بيْنَكم مُحَرَّماً فَلا تَظَالَمُوا » . (رواه مسلم ).
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে আমার বান্দারা! আমি নিজের উপর যুলুমকে হারাম করে রেখেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করেছি; সুতরাং তোমরা পরস্পর যুলুম করো না।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ آذَى ذِمِّياً , فأنَا خَصْمُهُ يومَ القِيَامَةِ» . (رواه الخطيب).
“যে ব্যক্তি কোনো যিম্মীকে (অমুসলিম নাগরিককে) কষ্ট দিবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে দাঁড়াবো।”
৭. তাকে হাদিয়া বা উপহার সামগ্রী প্রদান করা, তার দেয়া উপহার গ্রহণ করা এবং সে যদি কিতাবী তথা ইহুদী বা খ্রিষ্টান হয়, তাহলে তার তৈরি করা খাবার খাওয়া বৈধ; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَطَعَامُ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ حِلّٞ لَّكُمۡ ﴾ [المائ‍دة: ٥]
“আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য হালাল।” তাছাড়া সহীহভাবে বর্ণিত আছে যে, মদীনাতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইহুদীর খাবার গ্রহণের জন্য দাওয়াত করা হয়, তারপর তিনি সে দাওয়াত গ্রহণ করেন এবং তাঁর উদ্দেশ্যে পরিবেশিত তাদের খাবার থেকে তিনি খাবার গ্রহণ করেন।
৮. মুমিন রমনীকে তার নিকট বিয়ে না দেওয়া, যদিও কিতাবী (ইহুদী বা খ্রিষ্টান) রমনীদেরকে বিয়ে করা বৈধ; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা মুমিন রমনীকে কাফিরের সাথে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সাধারণভাবে নিষেধ করে বলেন:
﴿ لَا هُنَّ حِلّٞ لَّهُمۡ وَلَا هُمۡ يَحِلُّونَ لَهُنَّۖ ﴾ [الممتحنة: ١٠]
“মুমিন নারীগণ কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিরগণ মুমিন নারীদের জন্য বৈধ নয়।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَلَا تُنكِحُواْ ٱلۡمُشۡرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤۡمِنُواْۚ ﴾ [البقرة: ٢٢١]
“আর ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে তোমরা বিয়ে দিও না।” তাছাড়া মুসলিম পুরুষ কর্তৃক কিতাবী নারীকে বিয়ে করার বৈধতার ব্যপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَٱلۡمُحۡصَنَٰتُ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ مِن قَبۡلِكُمۡ إِذَآ ءَاتَيۡتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحۡصِنِينَ غَيۡرَ مُسَٰفِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِيٓ أَخۡدَانٖۗ ﴾ [المائ‍دة: ٥]
“আর তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারীদেরকে তোমাদের জন্য বৈধ করা হল যদি তোমরা তাদের মোহর প্রদান কর বিয়ের জন্য, প্রকাশ্য ব্যভিচার বা গোপন প্রণয়িনী গ্রহণকারী হিসেবে নয়।”
৯. যখন সে হাঁচি দিবে এবং ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (الحَمْدُ للهِ) বলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করবে, তখন তার হাঁচির জবাব দেবে এই বলে: " يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ " (আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়েত করুন এবং তোমাদের অবস্থাকে ভালো করে দিন); কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইহুদীর নিকট হাঁচি দিয়েছিলেন এ প্রত্যাশায় যে, সে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলবে: ‘ইয়ারহামুকুমুল্লাহ’ (يَرْحَمُكُمُ اللهُ) [অর্থাৎ আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন]; তারপর তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলবেন: " يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ " (আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়েত করুন এবং তোমাদের অবস্থাকে ভালো করে দিন)।
১০. তাকে আগে সালাম না দেওয়া এবং সে যদি সালাম দেয়, তাহলে« وَعَلَيْكُمْ » (তোমাদের উপরও) বলে তার জবাব দেওয়া; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا سَلَّمَ عَلَيْكُمْ أهْلُ الكِتَابِ فَقُولُوا : وَعَلَيْكُمْ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ) .
“যখন ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা তোমাদেরকে সালাম প্রদান করে, তখন তোমরা বল:« وَعَلَيْكُمْ » (তোমাদের উপরও)।”
১১. তার সাথে রাস্তায় চলার সময় তাকে সবচেয়ে সংকীর্ণ রাস্তায় চলতে বাধ্য করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لاَ تَبْدَأُوا اليَهُودَ وَلاَ النَّصَارَى بالسَّلامِ ، فَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ في طَرِيق فَاضطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِه » . (رواه مسلم و أبو داود و الطبراني) .
“তোমরা ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে আগে আগে সালাম দিয়ো না; আর যখন পথে তাদের কারোর সাথে তোমাদের দেখা হবে, তখন তাকে সংকীর্ণ পথের দিকে যেতে বাধ্য করো।”
১২. তার বিপরীত কাজ করা এবং তাকে অনুকরণ ও অনুসরণ না করা, যেমন— দাড়ি লম্বা করা, যখন সে তা মুণ্ডন করে ফেলে; দাড়িতে রঙ করা, যখন সে তা রঙ করে না; অনুরূপভাবে পোশাক পরিধানের ব্যাপারেও তার বিপরীত করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ » . (أخرجه أحمد و أبو داود).
“যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুসরণ করে, তবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।” তিনি আরও বলেন:
« خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ ، أَحْفُوا الشَّوَارِبَ ، وَأَوْفُوا اللِّحَى » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ).
“তোমরা মুশরিকদের বিপরীত করবে, তোমরা গোঁফ ছোট করবে এবং দাড়ি লম্বা রাখবে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« إِنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى لاَ يَصْبُغُونَ فَخَالِفُوهُمْ » . (أخرجه البخاري و مسلم).
“নিশ্চয়ই ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানগণ (দাড়ি ও চুলে) রঙ বা খেযাব লাগায় না; অতএব, তোমরা (রঙ বা খেযাব লাগিয়ে) তাদের বিপরীত কাজ কর।” অর্থাৎ দাড়ি অথবা মাথার চুলকে হলুদ অথবা লাল রঙ দ্বারা খেযাব করা; কেননা, কালো রঙ দ্বারা খেযাব করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন; ইমাম মুসলিম রহ. কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« غَيِّرُوا هَذَا (الِشَّعرَ الأبْيَضَ ) بِشَىْءٍ ، وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ » .
“তোমরা এই সাদা চুলকে কোনো কিছু দ্বারা পরিবর্তন কর এবং কালো রঙ ব্যবহার করা থেকে দূরে থাক।”
(জ) জীবজন্তুর সাথে আচরণ:
মুসলিম ব্যক্তি অধিকাংশ প্রাণীকেই সম্মানিত সৃষ্টি বলে বিবেচনা করে; সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তার প্রতি করুণা করার কারণে সেও তার প্রতি দয়া বা করুণা করবে এবং তার প্রতি নিম্নোক্ত আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে:
১. যখন তার ক্ষুধা ও পিপাসা হয়, তখন খাবার ও পানীয়’র ব্যবস্থা করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ حَرَّاءَ أَجْرٌ » . (أخرجه أحمد).
“প্রাণী মাত্রকেই পানি পান করানোর মধ্যে সাওয়াব রয়েছে।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ لا يَرْحم لا يُرْحَمْ » . (رواه الطبراني و البخاري بلفط آخر).
“যে ব্যক্তি অনুকম্পা প্রদর্শন করবে না, তার প্রতিও অনুকম্পা প্রদর্শন করা হবে না।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ » . (رواه الترمذي ).
“তোমরা পৃথিবীতে যারা আছে, তাদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।”
২. তার প্রতি দয়াপরবশ ও সহানুভূতিশীল হওয়া; কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদেরকে দেখলেন— তারা একটি জীবন্ত পাখিকে ধরে এনে তাদের তীর নিক্ষেপের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গ্রহণ করে তার প্রতি তীর নিক্ষেপ করছে, তখন তিনি বললেন:
« لعن الله من اتخذ شيئًا فيه روح غرضًا » . (رواه البخارى ومسلم).
“আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির উপর অভিশাপ বর্ষণ করুন, যে জীবন্ত প্রাণীকে (তীর নিক্ষেপের) লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।” তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চতুষ্পদ জন্তুকে হত্যা করার জন্য আটক করে রাখতে নিষেধ করেছেন। আবার কোনো একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন একটি মা পাখি তার বাচ্চাদের খোঁজে বৃত্তাকারে উড়ছে, যে বাচ্চাগুলো সাহাবীগণ তার বাসা থেকে ধরে নিয়ে এসেছে, এমতাবস্থায় তিনি বললেন:
« مَنْ فَجَعَ هَذِهِ بِوَلَدِهَا ؟ رُدُّوا وَلَدَهَا إِلَيْهَا » . (رواه أبو داود ).
“কে এ পাখিটিকে তার সন্তান হারোনোর ব্যদনায় কষ্ট দিচ্ছে? তোমরা তার বাচ্চাকে তার নিকট ফিরিয়ে দাও।”
৩. তাকে যবেহ বা হত্যা করার সময় দয়া প্রদর্শন করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« إنَّ الله كَتَبَ الإحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإذَا قَتَلْتُم فَأحْسِنُوا القِتْلَة ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأحْسِنُوا الذِّبْحَةَ ، وَليُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَه ، وَلْيُرِح ذَبِيحَتَهُ » . (رواه مسلم ).
“আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক বিষয়ে তোমাদের উপর ‘ইহসান’ অত্যাবশ্যক করেছেন; সুতরাং তোমরা যখন কতল করবে, দয়ার্দ্রতার সাথে কতল করবে; আর যখন যবেহ করবে, তখন দয়ার্দ্রতার সাথে যবেহ করবে; আর তোমাদের সকলেই যেন তার ছুরি ধার দিয়ে নেয় এবং তার যবেহকৃত প্রাণীকে কষ্ট না দেয়।”
৪. তাকে কোনো প্রকার শাস্তি না দেওয়া, চাই সে শাস্তি অভুক্ত রাখার মাধ্যমে হউক, অথবা প্রহার করার মাধ্যমে হউক, অথবা সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপানোর মাধ্যমে হউক, অথবা তার অঙ্গহানির মাধ্যমে হউক, অথবা আগুনে পোড়ানোর মাধ্যমে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ في هِرَّةٍ سَجَنَتْها حَتَّى مَاتَتْ ، فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ ، لاَ هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَسَقَتْهَا ، إذْ حَبَسَتْهَا ، وَلاَ هِيَ تَرَكَتْهَا تَأكُلُ مِنْ خَشَاشِ الأَرْضِ » . (رواه البخاري ).
“এক মহিলাকে একটি বিড়ালের কারণে শাস্তি দেয়া হয়েছে— সে বিড়ালটিকে একাধারে বেঁধে রাখায় মারা গিয়েছিল, যার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। যখন সে তাকে আটকিয়ে রেখেছিল, তখন সে তাকে না খাদ্য ও পানীয় দিয়েছে, না তাকে যমীনের পোকা মাকড় খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছে।” তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক পিঁপড়া অধ্যুষিত অঞ্চল দিয়ে পথ চলার সময় দেখতে পেলেন তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন তিনি বলেন:
« مَنْ حَرَّقَ هَذِهِ ؟ ». قُلْنَا : نَحْنُ . قَالَ « إِنَّهُ لاَ يَنْبَغِى أَنْ يُعَذِّبَ بِالنَّارِ إِلاَّ رَبُّ النَّارِ» . (رواه أبو داود ).
“কে এগুলোকে পুড়িয়ে মারছে? আমরা বললাম: আমরা মারছি; তিনি বললেন: আগুনের মালিক (আল্লাহ তা‘আলা) ব্যতীত কারও জন্য আগুন দ্বারা শাস্তি দেয়া সমীচীন নয়।”
৫. ক্ষতিকর প্রাণীকে হত্যা করা বৈধ, যেমন— হিংস্র বা পাগলা কুকুর, বাঘ, সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর ইত্যাদি; কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« خَمْسٌ فَوَاسِقُ يُقْتَلْنَ فِى الْحِلِّ وَالْحَرَمِ : الْحَيَّةُ ، وَالْغُرَابُ الأَبْقَعُ ، وَالْفَارَةُ ، وَالْكَلْبُ الْعَقُورُ ، وَالْحُدَيَّا » . (رواه البخاري و مسلم ).
“পাঁচ প্রকার প্রাণী বেশি অনিষ্টকারী, এদেরকে হারাম শরীফের বাইরে ও ভিতরে হত্যা করা যায়: সাপ, চিত্রা কাক, ইঁদুর, পাগলা কুকুর ও চিল।” অনুরূপভাবে বিচ্ছুকে হত্যা ও লা‘নত করার বিষয়টিও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে।
৬. জনস্বার্থে বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে উট, ছাগল ও গরুর মত চতুষ্পদ জন্তুর কানে দাগ বা চিহ্ন দেওয়া বৈধ; কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর নিজ হাতে যাকাতের উটে চিহ্ন দিতে দেখা গেছে। তবে উট, ছাগল ও গরুর মত চতুষ্পদ জন্তু ব্যতীত অন্যান্য জীবজন্তুর গায়ে দাগ বা চিহ্ন দেওয়া বৈধ নয়; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেহারায় দাগ দেওয়া একটি গাধাকে দেখে বললেন:
« لَعَنَ اللَّهُ الَّذِى وَسَمَ هَذَا فِى وَجْهِهِ » . (رواه مسلم ).
“আল্লাহর অভিশাপ ঐ ব্যক্তির প্রতি, যে এ প্রাণীটির চেহারায় দাগ দিয়েছে।”
৭. এসব জন্তুতে আল্লাহর ‘হক’ সম্পর্কে জানা, যাতে যখন তা যাকাতযোগ্য হয়, তখন তার যাকাত আদায় করা যায়।
৮. আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য বাদ দিয়ে এগুলো নিয়ে ব্যস্ত না থাকা, অথবা এগুলোর কারণে তাঁর স্মরণে উদাসীন না হওয়া; কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُلۡهِكُمۡ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُكُمۡ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِۚ ﴾ [المنافقون: ٩]
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া প্রসঙ্গে বলেছেন:
« الْخَيْلُ ثلاثةٌ : لِرَجُلٍ أَجْرٌ ، وَلِرَجُلٍ سِتْرٌ ، وَعلَى رَجُلٍ وِزْرٌ ، فأمَّا الَّذِي هِيَ لَهُ أَجْرٌ ، فَرَجُلٌ رَبَطَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ، فَأَطَالَ لَهَا فِي مَرْجٍ أوْ رَوْضَةٍ ، فَمَا أَصَابَتْ فِي طِيَلِهَا ذَلِكَ مِنَ الْمَرْجِ وَالرَّوْضَةِ ، كَانَتْ لَهُ حَسَنَاتٌ ، فَلَوْ أَنَّهَا قَطَعَتْ طِيَلَهَا ذَلِكَ ، فَاسْتَنَّتْ شَرَفًا أو شَرَفَيْنِ ، كَانَتْ آثارُهَا وَأَرْوَاثُها حَسَنَاتٍ لَهُ ، وَلَوْ أَنَّهَا مَرَّتْ بِنَهْرٍ ، فَشَرِبَتْ مْنهُ ، وَلَمْ يُرِدْ أَنْ يَسْقِيَ بِهِ كَانَ ذَلِكَ لَهُ حَسَنَاتٍ ، فَهِيَ لِذلِكَ أَجْرٌ . وَرَجُلٌ رَبَطَهَا تَغَنِّيًا وَتَعَفُّفًا ، وَلَمْ يَنْسَ حَقَّ اللَّهِ فِي رِقَابِهَا وَلا ظُهُورِهَا ، فَهِيَ لِذَلِكَ سِتْرٌ . وَرَجُلٌ رَبَطَهَا فَخْرًا وَرِيَاءً وَنِوَاءً لِأَهْلِ الإِسْلامِ ، فَهِيَ عَلَى ذَلِكَ وِزْرٌ » . (رواه البخاري ).
“ঘোড়া তিন প্রকার: (ঘোড়া পালন) একজনের জন্য পুণ্য, আরেক জনের জন্য (দারিদ্র্য ঢেকে রাখার বা আযাব থেকে) আবরণ স্বরূপ এবং অপর আরেক জনের জন্য পাপের কারণ। সে ব্যক্তির জন্য পুণ্য, যে আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদ করার জন্য) ঘোড়াকে সদা প্রস্তুত রাখে এবং সে ব্যক্তি যখন লম্বা দড়ি দিয়ে ঘোড়াটি কোনো চারণভূমি বা বাগানে বেঁধে রাখে, তখন ঐ লম্বা দড়ির মধ্যে চারণভূমি বা বাগানের যে অংশ পড়বে তত পরিমাণ সাওয়াব সে পাবে; যদি ঘোড়াটি দড়ি ছিড়ে ফেলে এবং দুই একটি টিলা পার হয়ে কোথাও চলে যায়, তাহলে তার পদচিহ্ন ও গোবরগুলোও তার জন্য সাওয়াব হিসেবে গণ্য হবে; যদি কোনো নদী-নালায় গিয়ে পানি পান করে, মালিক যদিও পানি পান করানোর ইচ্ছা করে নাই, তাও তার নেক আমল বলে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি নিজের স্বচ্ছলতার জন্য দারিদ্র্যের গ্লানি ও পরমুখাপেক্ষীতা থেকে নিজকে রক্ষা করার জন্য ঘোড়া পালন করে এবং তার গর্দান ও পিঠে আল্লাহর যে হক রয়েছে তা ভুলে না যায় (অর্থাৎ যাকাত আদায় করে) তবে এই ঘোড়া তার জন্য আযাব থেকে রক্ষাকারী আবরণ স্বরূপ। আর যে ব্যক্তি অহঙ্কার, লোক দেখানো ও ইসলামের অনুসারীদের সাথে শত্রুতার জন্য ঘোড়া লালন-পালন করে, তাহলে এ ঘোড়া তার জন্য পাপের বোঝা হবে।”

সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের কারণেই জীবজন্তুর সাথে এ আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে; আর এসব আদব পালন করার দ্বারা নির্দেশ পালন হবে ইসলামী শরী‘য়তের ! পালন হবে দয়া ও করুনার বিধিবিধান ! পালন হবে মানুষ অথবা জীবজন্তুসহ প্রতিটি সৃষ্টির জন্য নির্ধারিত সার্বজনীন কল্যাণকর আইনকানুন !।

* * *



অষ্টম অধ্যায়
দীনী ভাইদের সাথে আদব এবং আল্লাহর জন্য তাদেরকে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা

আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমানের দাবি অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসবে শুধু আল্লাহর জন্য এবং কাউকে ঘৃণা করবে— তাও শুধু আল্লার জন্য; কারণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পছন্দই তার পছন্দ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অপছন্দই তার অপছন্দ; সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার কারণেই সে তাকে ভালোবাসবে এবং তার প্রতি তাঁদের ঘৃণার কারণেই সে তাকে ঘৃণা করবে; আর এ ব্যাপারে তার দলীল হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, তিনি বলেছেন:
« مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ ، وَأَبْغَضَ لِلَّهِ ، وَأَعْطَى لِلَّهِ ، وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الإِيمَانَ » . (رواه أبو داود ).
“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসল, আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করল, আল্লাহর জন্য কাউকে দান করল এবং আল্লাহর জন্য কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকল, সে ব্যক্তি নিজ ঈমানকে পূর্ণতা দান করল।” আর এর উপর ভিত্তি করে মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর সকল সৎবান্দাকে ভালোবাসবে এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে; আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অমান্যকারী আল্লাহর সকল বান্দাকে ঘৃণা করবে এবং তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করবে; তাছাড়া এটা মুসলিম ব্যক্তিকে তার কোনো কোনো ভাইকে আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে বেশি মহব্বত ও আন্তরিকতার কারণে ভাই ও বন্ধু বলে গ্রহণ করতে কোনো মানা নেই; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের ভাই ও বন্ধু গ্রহণ করার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করে বলেন:
« الْمُؤْمِنُ آلِفٌ مَأْلُوفٌ ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ » . (رواه أحمد و الطبراني و الحاكم ).
“মুমিন ঘনিষ্ঠ ও বন্ধত্বপূর্ণ ব্যক্তি; আর সে ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।” তিনি আরও বলেন:
« إنّ حولَ العرشِ مَنابِرُ من نورٍ، عليها قومٌ لباسُهم نورٌ ووجوهُهم نورٌ، ليسوا بأنبياءَ ولا شهداءَ ، يَغْبِطُهُمْ الأنبياءُ والشهداءُ ، فقالوا: يا رسولَ اللّهِ صِفْهُمْ لنا ، فقال: هم المُتَحَابُّونَ في اللّهِ عزّ وجلّ ، والمُتَجالِسُونَ في اللّهِ تعالى ، والمُتَزَاوِرُونَ في اللّهِ تعالى» . (رواه النسائي ).
“আরশের চারিপাশে কতগুলো নূরের মিম্বার রয়েছে, যেগুলোর উপর একদল লোক অবস্থান করবে, যাদের পোশাকে নূর এবং চেহারাতেও নূর, তারা নবী নন এবং শহীদও নন, তাদের প্রতি ঈর্ষা করবে নবী ও শহীদগণ; সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য তাদের একটা বর্ণনা পেশ করুন; তখন তিনি বললেন: তারা হলেন আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে একে অপরকে মহব্বতকারী, পরস্পর আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য বন্ধুত্ব স্থাপনকারী এবং আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে একে অপরের সাথে সাক্ষাৎকারী।” তিনি আরও বলেন:
« إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ : قَدْ حَقَّتْ مَحَبَّتِي لِلَّذِينَ يَتَحَابُّونَ مِنْ أَجْلِي ، وَحَقَّتْ مَحَبَّتِي لِلَّذِينَ يَتَنَاصَرُونَ مِنْ أَجْلِي » . (رواه أحمد و الحاكم ).
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাদের জন্য আমার মহব্বত (ভালোবাসা) নিশ্চিত হয়ে যায়, যারা আমার জন্যই একে অপরকে ভালোবাসে; আবার তাদের জন্যও আমার মহব্বত নিশ্চিত হয়ে যায়, যারা আমার কারণেই একে অপরকে সাহায্য করে।” তিনি আরও বলেন:
« سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ في ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إلاَّ ظِلُّهُ : إمَامٌ عَادِلٌ ، وَشَابٌّ نَشَأ في عِبَادَةِ الله عز وجل ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ بِالمَسْجِدِ إذَا خَرَجَ مِنْهُ حَتَّى يَعُوْدَ إلَيْهِ ، وَرَجُلاَنِ تَحَابّا في اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيهِ وتَفَرَّقَا عَلَيهِ ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ الله خَالِياً فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأةٌ ذَاتُ حَسَبٍ وَجَمَالٍ ، فَقَالَ : إنِّي أخَافُ الله ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ ، فَأخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ » . (متفق عليه ).
“এরূপ সাত ব্যক্তিকে সেদিন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সুশীতল ছায়ায় স্থান দিবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না: ১. ন্যায় বিচারক ইমাম বা নেতা; ২. মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল যুবক; ৩. মাসজিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি— যখন সে মাসজিদ থেকে বের হয় আবার তাতে ফিরে আসা পর্যন্ত মন ব্যকুল থাকে; ৪. এমন দুই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই পরস্পর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়; ৫. এমন ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে দু’চোখের অশ্রু ঝরায়; ৬. এমন লোক, যাকে কোন সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী ব্যভিচারের জন্য আহ্বান করেছে, আর তখন সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে: আমি তো আল্লাহকে ভয় করি; ৭. যে ব্যক্তি এমন গোপনীয়তা রক্ষা করে দান-সাদকা করে যে, তার ডান হাত কী দান করল বাম হাতও তা জানতে পারে না।” তিনি আরও বলেন:
« إن رجلاً زَارَ أخاً له في اللهِ فأرْصَدَ اللهُ لهُ ملكاً ، فقال : أين تُرِيدُ ؟ قَالَ : أرِيْدُ أن أزُوْرُ أخِيْ فُلَاناً ، فَقَالَ : لِحَاجَةٍ لكَ عندَهُ ؟ قَالَ : لَا ، قَالَ : لِقَرَابَةٍ بينكَ وبينهُ ؟ قال : لَا ، قَالَ : فَبِنِعْمَةٍ له عندَكَ ؟ قَالَ : لَا ، قَالَ : فَبِمَ ؟ قَالَ : أحِبُّهُ في اللهِ ، قَالَ : فإن اللهَ أرْسَلَنِيْ إليكَ أخْبِرُكَ بِأنَّهُ يُحِبُّكَ لِحُبِّكَ إيَّاهُ ، وقد أوْجَبَ لَكَ الجنةَ » . (رواه مسلم بلفظ أخصر من هذا ).
“এক ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তার এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য একজন ফেরেশ্তাকে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিলেন; তারপর সে (ফেরেশ্তা) বলল: তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল: আমি আমার অমুক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই; তারপর সে জিজ্ঞাসা করল: তার কাছে কি তোমার কোনো প্রয়োজন আছে? সে বলল: না, সে আবার জিজ্ঞাসা করল: তোমার ও তার মাঝে কোনো আত্মীয়তার বন্ধনের কারণেই কি তুমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছ? সে বলল: না, সে আবার জিজ্ঞাসা করল: তাহলে কি তোমার কাছে তার কোনো দান বা অনুগ্রহের ব্যাপার আছে যার কারণে তুমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছ? সে বলল: না, তারপর সে আবার জিজ্ঞাসা করল: তাহলে কোন্ কারণে তুমি তার সাথে সাক্ষাৎ করবে? জবাবে সে বলল: আমি তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসি; তখন ফেরেশ্তা বলল: আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তোমার নিকট পাঠিয়েছেন তোমাকে এ সংবাদ দেয়ার জন্য যে, তার প্রতি তোমার ভালোবাসার কারণে তিনিও তোমাকে ভালোবাসেন এবং তিনি তোমার জন্য জান্নাত বরাদ্দ করে দিয়েছেন।”
আর এ ভ্রতৃত্বের সম্পর্কের শর্ত হলো— তা একান্তই আল্লাহর উদ্দেশ্যে হতে হবে, যা দুনিয়ার যাবতীয় ভেজাল ও তার বস্তুগত সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হবে এবং তার একমাত্র কারণ বা উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর প্রতি ঈমান, অন্য কিছূ নয়।
সুতরাং তাকে দীনী ভাই হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আদবসমূহ রক্ষা করে চলতে হবে:
১. তাকে বুদ্ধিমান হতে হবে; কারণ, নির্বোধের সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ও সাহচর্যের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই; কেননা, অনেক সময় নির্বোধ মূর্খ ব্যক্তি উপকার করতে গিয়ে ক্ষতি করে বসে।
২. তাকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে; কেননা, দুশ্চিরিত্রবান ব্যক্তি বুদ্ধিমান হলেও অধিকাংশ সময় নিজের খেয়াল-খুশি মত চলে অথবা রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কাজ করে, ফলে সে তার সাথীর সাথে মন্দ আচরণ করে।
৩. তাকে আল্লাহভীরু হতে হবে; কারণ, প্রতিপালকের আনুগত্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাওয়া ফাসিক ব্যক্তি থেকে বন্ধুও নিরাপদ নয়; কেননা, সে কখনও কখনও তার সাথীর বিরুদ্ধে এমন অন্যায়-অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে সে ভ্রাতৃত্ব বা বন্ধুত্ব বা অন্য কোনো সম্পর্কের তোয়াক্কা করে না; কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে না, সে ব্যক্তি কোনো অবস্থাতেই অন্যকে ভয় করে না।
৪. তাকে কুসংস্কার ও বিদ‘আত থেকে দূরে থেকে কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী হতে হবে; কারণ, কখনও কখনও বিদ‘আতপন্থীর বিদ‘আতের পঙ্কিলতা তার বন্ধুকে পেয়ে বসতে পারে; কেননা, বিদ‘আতপন্থী ও আত্মপূজারীকে বর্জন করা ও তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা আবশ্যক; সুতরাং কিভাবে তাদের সাথে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্ব স্থাপন করা সম্ভব হবে, অথচ কোনো এক সৎব্যক্তি বন্ধু বা সাথী নির্বাচনে সংক্ষেপে এ আদবগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন: হে আমার আদরের ছেলে! যখন কোনো ব্যক্তিকে তোমার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন তুমি এমন ব্যক্তিকে বন্ধু বা সাথী হিসেবে গ্রহণ করবে— যখন তুমি তার খিদমত করবে, তখন সে তোমাকে রক্ষণাবেক্ষণ করবে; যদি তুমি তাকে সঙ্গ দাও, তবে সে তোমাকে সুন্দর করবে; যদি তোমার কোনো খাদ্যসংকট দেখা দেয়, তাহলে সে তোমাকে তা সরবরাহ করবে। তুমি তাকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে— যখন তুমি কোনো কল্যাণে তোমার হাত বাড়াবে, তখন সেও তার হাত বাড়াবে; আর যদি সে তোমার পক্ষ থেকে ভালো কিছু দেখে, তাহলে তা ভালো বলে গণ্য করে; আর মন্দ কিছু দেখলে তা থেকে বাধা প্রদান করে। আর তুমি তাকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে— যখন তুমি তার নিকট চাইবে, তখন সে তোমাকে দিবে; আর তুমি চুপ করে থাকলে, সে তোমার সাথে কথার সূচনা করবে; আর যদি তুমি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হও, তাহলে সে তোমাকে সান্ত্বনা দিবে। আর তুমি তাকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে— যখন তুমি তার সাথে কথা বলবে, তখন সে তোমার কথাকে সত্য বলে জানবে; আর তোমরা পরস্পর কোনো কাজের উদ্যোগ নিলে সে তোমাকে দায়িত্ব প্রদান করে; আর যদি তোমরা পরস্পর কোনো বিষয়ে মতবিরোধ কর, তাহলে সে তোমাকে অগ্রাধিকার দেয়।
দীনী ভাইদের অধিকার:
এ ধরনের ভাইদের অধিকারসমূহের কিছু দিক নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. অর্থ-সম্পদ দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করা; সুতরাং প্রয়োজনের সময় তাদের প্রত্যেকেই তার ভাইকে তার অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করবে, এমনিভাবে যে, মনে করবে তাদের উভয়ের দিনার ও দিরহাম এক ও অভিন্ন। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তাঁর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল:
« إنى أريد أن أؤاخيك فى الله . قال : أتدرى ما حق الإخاء ؟ قال : عرِّفنى . قال : لا تكون أحق بدينارك ودرهمك منّى . قال : لم أبلغ هذه المنزلة بعد . قال : فاذهب عنى » .
“আমি তোমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দীনী ভাই হিসেবে গ্রহণ করতে চাই; তখন তিনি বললেন: তুমি কি জান ভ্রাতৃত্বের ‘হক’ কি? তখন সে বলল: আমাকে জানিয়ে দাও। তখন তিনি বললেন: তোমার দিনার ও দিরহামের উপর তোমার অধিকার আমার চেয়ে বেশি হতে পারবে না। তখন সে বলল: পরে আমি এ মানে পৌঁছতে পারলাম না। তখন তিনি বললেন: তাহলে তুমি আমার থেকে দূর হও।”
২. তাদের প্রত্যেকেই প্রয়োজন পূরণের সময় একে অপরের সহযোগী হবে এবং নিজের উপর তার সাথীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিবে; তার প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের মত করে দেখবে, তার নিজের উপর এবং তার পরিবার ও সন্তানাদির উপর তাকে প্রাধান্য দিবে; প্রতি তিন দিন পর তার খোঁজ-খবর নিবে, তারপর সে অসুস্থ হলে তার সেবা করবে, কর্মে ব্যস্ত হলে তাকে সহযোগিতা করবে, কোনো কিছু ভুলে গেলে তাকে তা স্মরণ করিয়ে দিবে, কাছে আসলে তাকে অভিবাদন জানাবে, যখন সে বসবে তখন তার জন্য জায়গা প্রশস্ত করে দিবে এবং যখন সে কথা বলবে, তখন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনবে।
৩. তার শুধু ভালো দিকগুলোই বলবে; সুতরাং তার উপস্থিতিতে অথবা অনুপস্থিতিতে তার কোনো দোষ নিয়ে আলোচনা করবে না এবং তার কোনো গোপন বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ করবে না; আর তার ব্যক্তিগত গোপন বিষয়সমূহের দিকে তাকানোর চেষ্টা করবে না; আর যখন সে পথিমধ্যে তাকে তার কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেখতে পাবে, তখন সে যেন তার সাথে প্রথমে সে প্রয়োজন সম্পর্কে কথা বলা শুরু না করে এবং তার উৎস বা উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে জানার চেষ্টা না করে। তাকে ভালো কাজের আদেশ অথবা মন্দ কাজে নিষেধ করার ব্যাপারে সহৃদয়তার পরিচয় দিবে; কথা বলার সময় তার সাথে তর্ক করবে না এবং কোনো ‘হক’ বা ‘বাতিল’ বিষয় নিয়ে তার সাথে ঝগড়া করবে না। কোনো বিষয়ে তাকে তিরস্কার করবে না এবং অপর কোনো বিষয়ে তাকে নিন্দা করবে না।
৪. তার সাথে তার পছন্দসই ভাষায় কথা বলা; সুতরাং সে তাকে তার সবচেয়ে প্রিয় নামে ডাকবে এবং উপস্থিতিতে ও অনুপস্থিতিতে তার ভালো দিকগুলো আলোচনা করবে, তাকে করা জনগণের প্রশংসা তার নিকট আনন্দ চিত্তে ও খুশি মনে পৌঁছিয়ে দিবে। তাকে অনর্গল উপদেশ দিবে না; কারণ, তাতে সে বিরক্তবোধ করতে পারে; আর তাকে জনসম্মুখে উপদেশ দিবে না, ফলে তা তার সম্মান নষ্ট করবে; যেমনটি ইমাম শাফে‘য়ী রহ. বলেছেন:
« مَنْ وَعَظَ أَخَاهُ سِرًّا فَقَدْ نَصَحَهُ وَزَانَهُ ، وَمَنْ وَعَظَهُ عَلَانِيَةً فَقَدْ فَضَحَهُ وَشَانَهُ » .
“যে ব্যক্তি তার ভাইকে গোপনে উপদেশ দিল, সে ব্যক্তি সত্যিই তাকে উপদেশ দিল এবং তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করল; আর যে ব্যক্তি তাকে প্রকাশ্যে উপদেশ দিল, সে ব্যক্তি তার সম্মান নষ্ট করল এবং তাকে অসম্মান করল।”
৫. তার ভুলকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা, তার অপরাধসমূহ উপেক্ষা করা, তার দোষ-ত্রুটিগুলো গোপন করে রাখা এবং তার ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করা। আর যদি সে গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো অপরাধে জড়িয়ে যায়, তাহলে তার ভালোবাসাকে ছিন্ন করবে না এবং তার বন্ধুত্বকে অবহেলা করবে না, বরং তার তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার অপেক্ষা করবে; আর যদি সে বারবার অপরাধ করতে থাকে, তাহলে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে অথবা বন্ধুত্ব বহাল রাখবে উপদেশ চালিয়ে যাওয়ার শর্তে এ আশায় যে, সে তাওবা করবে এবং আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন। আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« إذَا تَغَيَّرَ أَخُوك وحَالَ عمَّا كَانَ عَليهِ فَلَا تَدَعْهُ لأجلِ ذلكَ ، فَإِنَّ أَخَاك يَعْوَجُّ مَرَّةً وَيَسْتَقِيمُ أخرى » .
“যখন তোমার ভাই বিকৃত হয়ে যায় এবং যে সম্পর্কের উপর সে বিদ্যমান ছিল তা থেকে সরে যায়, তখন এ করণে তুমি তাকে ছেড়ে দিয়ো না; কারণ, তোমার ভাই একবার বাঁকা হবে এবং আরেক বার সোজা হবে।”
৬. তার ভ্রাতৃত্বের হক পূরণ করা; সুতরাং সে ভ্রতৃত্বের সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত রাখবে এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ককে স্থায়ী করবে; কেননা, এ সম্পর্ক ছিন্ন করলে তার জন্য বরাদ্দকৃত প্রতিদান নষ্ট হয়ে যাবে। আর সে মারা গেলে ভ্রাতৃত্বের সংরক্ষণ ও বন্ধুত্বের দাবি পূরণার্থে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা তার সন্তান ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বন্ধু-বান্ধগণের প্রতি স্থানান্তর হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকট আগত এক বৃদ্ধাকে সম্মান প্রদর্শন করলেন; তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
« إنَهَا كَانَتْ تَأتينَا أيّامَ خَدِيجَة ، وإنَّ كَرَمَ الْعَهدِ من الدينِ » . (رواه الحاكم).
“খাদিজা রা. জীবিত থাকাকালীন সময়ে সে আমাদের নিকট আসত; আর বন্ধুত্বের মর্যাদা দান করাটা দীনের অন্তর্ভুক্ত।” আর বন্ধুত্বের দাবি পূরণের অন্যতম একটি দিক হলো তার বন্ধুর শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা; কেননা, ইমাম শাফে‘য়ী রহ. বলেন:
« إذا أطاع صديقك عدوك ، فقد اشتركا في عدواتك » .
“যখন তোমার বন্ধু তোমার শত্রুর অনুসরণ করে, তখন বুঝতে হবে তারা উভয়ে তোমার সাথে শত্রুতার ব্যাপারে একজোট।”
৭. তার উপর কষ্টকর কিছু চাপিয়ে না দেওয়া এবং তার উপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে না দেওয়া, যা পালনে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না; সুতরাং সে তার থেকে সম্মান বা সম্পদ আদায় করার চেষ্টা করবে না, অথবা কোনো কাজ বাস্তবায়নে তাকে বাধ্য করার চেষ্টা করবে না; কেননা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; সুতরাং এ সম্পর্ককে দুনিয়ার কোনো ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না।
৮. তার জন্য ও তার সন্তানদের জন্য দো‘য়া করা; আর যে ব্যক্তি তার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখবে, স্বাভাবিকভাবেই সে তার নিজের জন্য, তার সন্তানদের জন্য এবং যে ব্যক্তি তার সাথে সম্পর্ক করেছে তার জন্য দো‘য়া করবে; কেননা, যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তারা আবদ্ধ হয়েছে, সে ভ্রাতৃত্বের প্রশ্নে তারা একজন অন্যজন থেকে আলাদা কেউ নন; সুতরাং সে তার জন্য দো‘য়া করবে জীবিত ও মৃত অবস্থায় এবং উপস্থিত ও অনুপস্থিত অবস্থায়; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« إذا دعا الرجُلُ لأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ قال له المَلَكُ : ولك مثلُ ذَلِكَ » . (رواه مسلم و أبو داود).
“কোনো ব্যক্তি যখন তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দো‘য়া করে, তখন তাকে উদ্দেশ্য করে ফেরেশ্তা বলে: তোমার জন্যও অনুরূপ।” আর সৎব্যক্তিগণের মধ্য থেকে কোনো একজন বলেন: ভালো ভাইয়ের দৃষ্টান্ত কোথায়? নিশ্চিয়ই কোনো ব্যক্তি যখন মারা যায়, তখন তার পরিবারের লোকজন তার মিরাস বণ্টন করে এবং তার রেখে যাওয়া সম্পদ ভোগ করে, আর ভালো ভাইটি এককভাবে তার জন্য চিন্তা করে এই ভেবে যে, তার ভাই কী নিয়ে বিদায় নিয়েছেন এবং কোন্ পরিণতি লাভ করেছেন! ফলে সে তার জন্য রাতের অন্ধকারে দো‘য়া করে এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, অথচ সে মাটির নীচের অধিবাসী।

* * *


নবম অধ্যায়
বসার ও মাজলিসের আদবসমূহ

মুসলিম ব্যক্তির গোটা জীবনটাই ইসলামী নিয়মনীতির অনুসরণে পরিচালিত হবে, যা জীবনের সকল বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে, এমনকি মুসলিম ব্যক্তির বসা এবং তার বন্ধু-বান্ধবদের সভা-সমাবেশের ধরন-পদ্ধতি সম্পর্কেও ইসলাম সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছে। আর এ জন্য মুসলিম ব্যক্তি বসার ক্ষেত্রে ও মাজলিসের ব্যাপারে নিম্নোক্ত আদবসমূহ পালন করবে:
১. যখন সে বসতে চাইবে, তখন সর্বপ্রথম মাজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে সালাম প্রদান করবে, তারপর মাজলিসে বসা ব্যক্তিদের প্রান্তসীমায় বসে পড়বে এবং মাজলিসের কাউকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বসবে না; আর দুই জনের মাঝখানে বসবে না তাদের অনুমতি ব্যতীত; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لا يُقِيمَنَّ أحَدُكُمْ رَجُلاً مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ يَجْلِسُ فِيهِ ، وَلكِنْ تَوَسَّعُوا وَتَفَسَّحُوا » . (متفق عليه).
“তোমাদের কেউ যেন কোনো ব্যক্তিকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে নিজে সেখানে না বসে; বরং তোমরা জায়গা বিস্তৃত করে দাও এবং ছড়িয়ে বসো।” আর আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র জন্য যদি কোনো ব্যক্তি তার বসার স্থান ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যেতো, তবে তিনি তার ছেড়ে দেয়া জায়গায় বসতেন না। আর জাবির ইবন সামুরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« كُنَّا إِذَا أَتَيْنَا النَّبيَّ صلى الله عليه وسلم ، جلَسَ أحَدُنَا حَيْثُ يَنْتَهِي » . (رواه أَبُو داود والترمذي).
“আমরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাযির হতাম, তখন আমাদের প্রত্যেকে সেখানে বসে পড়তো, যেখানে মাজলিসের লোকজনের বসা শেষ হয়েছে।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« لاَ يَحِلُّ لِرَجُلٍ أنْ يُفَرِّقَ بَيْنَ اثْنَيْنِ إِلاَّ بإذْنِهِمَا » . (رواه أَبُو داود والترمذي).
“কোনো ব্যক্তির জন্য দুই ব্যক্তির মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি করে বসা বৈধ নয়, যতক্ষণ না তাদের থেকে অনুমতি নেয়া হয়।”
২. কোনো ব্যক্তি যখন তার বসার জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর আবার সেখানে ফিরে আসে, তখন সে জায়গায় বসার অধিকার তারই সবচেয়ে বেশি। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ مِنْ مَجْلِسٍ ، ثُمَّ رَجَعَ إِلَيْهِ ، فَهُوَ أَحَقُّ بِهِ » . (رواه مسلم).
“তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যখন তার জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর আবার সেখানে ফিরে আসে, তখন সে জায়গায় বসার অধিকার তারই সবচেয়ে বেশি।”
৩. মাজলিসের মাঝখানে না বসা; কেননা, হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« إنَّ رسول الله صلى الله عليه وسلم لَعَنَ مَنْ جَلَسَ وَسَطَ الحَلْقَةِ » . (رواه أَبُو داود).
“রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে (মাজলিসের) বৃত্তের মাঝখানে গিয়ে বসে পড়ে।”
৪. যখন বসবে, তখন নিম্নোক্ত আদবসমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখবে: ভদ্রতার সাথে শান্তশিষ্ট হয়ে বসা, এক হাতের আঙুলের ফাঁকে অন্য হাতের আঙুলসমূহ প্রবেশ না করানো, দাড়ি বা আংটি নিয়ে খেল-তামাশা না করা, দাঁত খিলাল না করা, নাকের ভিতর আঙুল প্রবেশ না করানো, বেশি বেশি থুতু ও কফ না ফেলা এবং বেশি বেশি হাঁচি ও হাই না দেওয়া; তার বসাটা হবে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীলভাবে; তার কথাগুলো যেন গোছালো হয়; আর যখন কথা বলবে, তখন যেন সঠিকভাবে চিন্তাভাবনা করে কথা বলে; আর যেন বেশি কথা না বলে এবং হাসি-কৌতক করা থেকে বিরত থাকে; আর নিজের পরিবার, সন্তানাদি, অথবা পেশা ও তার পর্থিব ও সাহিত্য জাতীয় সৃষ্টি— কবিতা বা লেখালেখি ও সংকলন নিয়ে আত্মশ্লাঘায় মেতে না ওঠা; আর যখন অন্য কেউ কথা বলবে, তখন মনোযোগ দিয়ে শুনা।

আর মুসলিম ব্যক্তি যখন এ আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে, তখন সে মূলত দু’টি বিষয় বাস্তবায়নের জন্যই তা মেনে চলবে: একটি হলো- সে তার সাথীদেরকে তার আচরণ বা কাজের দ্বারা কষ্ট না দেওয়া; কেননা, মুসলিম ভাইকে কষ্ট দেওয়া হারাম; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ » . (متفق عليه).
“মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাতের অনিষ্ট থেকে অন্যান্য মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।” আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো: বন্ধু-বান্ধবদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা লাভ করা; কেননা, শরী‘য়ত প্রবর্তক মুসলিমগণের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বন্ধন তৈরির নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন।
৫. যখন সে রাস্তার মধ্যে বসতে চাইবে, তখন নিম্নোক্ত আদবসমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখবে:
(ক) দৃষ্টিকে অবনমিত রাখা; সুতরাং পথচলা মুমিন রমনীগণের দিকে, অথবা গেইটে দাঁড়ানো রমনীর দিকে, অথবা বাড়ির ছাদ বা বেলকনিতে অবস্থানরত নারীর দিকে, অথবা নিজ প্রয়োজনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা রমনীর দিকে সে চোখ খুলে তাকাবে না; অনুরূপভাবে সে কারও দিকে হিংসা-বিদ্বেষের নজরে, অথবা বিদ্রূপের দৃষ্টিতে তাকাবে না।
(খ) যে কোনো পথিককে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকবে; সুতরাং সে কাউকে মুখ দ্বারা গালি দিয়ে, অথবা তিরস্কার করে, অথবা দোষ-ত্রুটি বলে কষ্ট দিবে না; আর কাউকে কষ্ট দিবে না হাত দ্বারা প্রহার করে বা ঘুষি মেরে এবং কাউকে কষ্ট দিবে না সম্পদ লুণ্ঠন করার মাধ্যমে; আর পথিকের পথ চলতে বাধা প্রদান করবে না এবং তাদের পথে ডাকাতি করবে না।
(গ) পথিকদের মধ্য থেকে যে কেউ সালাম প্রদান করলে তার জবাব প্রদান করা; কেননা, সালামের জবাব দেয়াটা ওয়াজিব কাজ; কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٖ فَحَيُّواْ بِأَحۡسَنَ مِنۡهَآ أَوۡ رُدُّوهَآۗ ﴾ [النساء: ٨٦]
“আর তোমাদেরকে যখন অভিবাদন করা হয়, তখন তোমরাও তার চেয়ে উত্তম প্রত্যাভিবাদন করবে অথবা সেটারই অনুরূপ করবে।”
(ঘ) সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া, যে সৎকাজ তার সামনে অবহেলার শিকার হচ্ছে এবং তার উপস্থিতিতে যে ভালোকাজের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে; কারণ, এ পরিস্থিতিতে সে কাজের নির্দেশ দেয়ার ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে; কেননা, সৎকাজের নির্দেশ দেয়ার বিষয়টি প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয, তা বাস্তবায়ন করা ছাড়া সে দায়িত্ব থেকে তার অব্যাহতি নেই; যেমন— সালাতের জন্য আহ্বান করা হল, অথচ মাজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিগণ সে আহ্বানে সাড়া দিল না, তখন তার উপর আবশ্যক হয়ে যায় তাদেরকে সালাতের জন্য আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেয়া; কেননা, এটা সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত; সুতরাং যখন এ কাজটি উপেক্ষিত হবে, তখন তার উপর ওয়াজিব হল এ কাজের নির্দেশ প্রদান করা। অপর আরেকটি উদাহরণ হল- রাস্তা দিয়ে কোনো ক্ষুধার্ত বা বস্ত্রহীন ব্যক্তিকে চলতে দেখলে তার উপর আবশ্যকীয় কর্তব্য হল সম্ভব হলে তাকে খাবার অথবা কাপড় প্রদান করা, আর সম্ভব না হলে তাকে খাবার অথবা কাপড় সরবরাহ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা; কারণ, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা এবং বস্ত্রহীনকে কাপড় দেয়া এমন পর্যায়ের সৎকাজ, যখন তা অবহেলার শিকার হবে, তখন তার জন্য নির্দেশ দেয়াটা ওয়াজিব হয়ে পড়বে।
(ঙ) তার সামনে সংঘটিত হতে দেখা প্রতিটি মন্দ কাজে নিষেধ করা; কারণ, অশ্লিল কাজে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সৎকাজের নির্দেশ প্রদানের মতই প্রত্যেক মুসলিমের আবশ্যকীয় কর্তব্য। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ » . (رواه مسلم).
“তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, তখন সে যেন তা হাত দ্বারা (শক্তি প্রয়োগে) বন্ধ করে দেয়।” আর এমন মন্দ কাজের উদাহরণ হল— তার সামনে একজন আরেক জনকে অনুসন্ধান করছে মারার জন্য, অথবা তার অর্থ-সম্পদ লুট করার জন্য, এ অবস্থায় তার উপর ওয়াজিব হল অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা; ফলে এ ধরনের যুলুম ও বাড়াবাড়ির মোকাবিলায় সে তার সর্বশক্তি দিয়ে অবস্থান নিবে।
(চ) পথহারা পথিককে রাস্তা দেখিয়ে দেয়া; সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি তার কাছে কোনো বাড়ির ব্যাপারে জানতে চায়, অথবা কোনো রাস্তার নির্দেশনা চায়, অথবা কোনো মানুষের পরিচয় জানতে চায়, তাহলে তার উপর ওয়াজিব হলো তাকে বাড়ির বিবরণ দিয়ে দেওয়া, অথবা রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া, অথবা যে ব্যক্তির পরিচয় চাচ্ছে তার পরিচয় দিয়ে দেওয়া; উল্লেখিত এসব কাজ রাস্তায় তথা বাড়ি, দোকান, কফিখানার সামনে, অথবা সাধারণ ময়দান, বাগান ও অনুরূপ কোনো স্থানে বসার আদবসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« إيَّاكُمْ وَالجُلُوسَ في الطُّرُقَاتِ ! فقالوا : يَا رَسُول الله ، مَا لنا مِنْ مجالِسِنا بُدٌّ ، نتحدث فِيهَا . فَقَالَ رسولُ الله صلى الله عليه وسلم : فَإذَا أبَيْتُمْ إلاَّ المَجْلِسَ ، فَأَعْطُوا الطَّريقَ حَقَّهُ . قالوا : وما حَقُّ الطَّريقِ ؟ قَالَ : غَضُّ البَصَرِ ، وَكَفُّ الأَذَى ، وَرَدُّ السَّلامِ ، وَالأمْرُ بِالمَعْرُوفِ ، والنَّهيُ عن المُنْكَرِ ، وَ فِي بعضِ الرِوايَاتِ زِيَادةُ : و إرشَادُ الضَّالِّ » . (متفق عليه).
“তোমরা রাস্তার উপর বসা থেকে বিরত থাক! সহাবাগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তায় বসা ছাড়া তো আমাদের উপায় নেই, আমরা সেখানে বসে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা যখন রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকতে অস্বীকার করছ, তাহলে রাস্তার হক আদায় কর; তাঁরা বললেন: রাস্তার হক আবার কী? তিনি বললেন: দৃষ্টি সংযত রাখা, (রাস্তা থেকে) কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করা। আর কোনো কোনো বর্ণনায় অতিরিক্ত আরও একটি হল: পথহারা পথিককে রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া।”


আর বসার অন্যতম একটি আদব হলো মাজলিস থেকে উঠে যাওয়ার সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া, যাতে মাজলিসের মধ্যে হয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটিগুলোর ক্ষমা বা কাফ্ফারা হয়ে যায়; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মাজলিস থেকে উঠে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি বলতেন:
« سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ ، أشْهَدُ أنْ لا إلهَ إِلاَّ أنْتَ ، أسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إلَيْكَ » . (رواه الترمذي).
“(হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র এবং আমি তোমার প্রশংসাই করি; আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই; আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমার কাছে তাওবা করছি)।” আর এ কথাগুলোর ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
« إنَّها كَفَّارَةٌ لِمَا يَكُونُ في المَجْلِسِ » . (رواه أَبُو داود و الحاكم).
“এ কথাগুলো মাজলিসে যা কিছু হয়েছে তার কাফ্ফারা স্বরূপ।”
* * *


দশম অধ্যায়
পানাহারের আদবসমূহ

মুসলিম ব্যক্তি খাদ্য ও পানীয়কে অন্যান্য উপকরণের মতই মনে করে এবং তাকে আসলেই সে (জীবনের) চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য মনে করে না; সুতরাং সে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্যেই খায় ও পান করে, যার দ্বারা সে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে সক্ষম হয়; ঐ ইবাদত তাকে পরকালের সম্মান ও সৌভাগ্য অর্জনের জন্য যোগ্য করে তুলে; সুতরাং সে শুধু খাদ্য ও পানীয়ের মজা উপভোগ করার জন্য পানাহার করে না। তাই সে ক্ষুধার্ত না হলে খায় না এবং পিপাসার্ত না হলে পান করে না। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
« نحن قومٌ لا نأكُلُ حتى نَجُوعَ ، وإذا أكلنَا فلا نَشْبَعَ » .
“আমরা এমন এক জাতি— ক্ষুধা না লাগলে আমরা খাই না; আর যখন আমরা খাই, তখন পেট ভরে খাই না।”
আর সেখান থেকে মুসলিম ব্যক্তি তার খাবার ও পানীয়ের ব্যাপারে কতগুলো শরী‘য়ত সম্মত বিশেষ আদব রক্ষা করাকে নিজ দায়িত্বরূপে গ্রহণ করে; যেমন—
(ক) খাওয়ার পূর্বের আদবসমূহ:
১. হালাল ও পবিত্র জিনিস থোকে তার খাবার ও পানীয়কে পছন্দ করবে, যা হারাম ও সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُلُواْ مِن طَيِّبَٰتِ مَا رَزَقۡنَٰكُمۡ ﴾ [البقرة: ١٧٢]
“হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে আমরা যেসব পবিত্র বস্তু দিয়েছি তা থেকে খাও।” আর পবিত্র মানে হালাল বস্তু, যা ময়লাযুক্ত, দূষিত ও অপবিত্র নয়।
২. খাবার ও পানীয় গ্রহণ করার দ্বারা নিয়ত থাকবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার জন্য শক্তি অর্জন করা; যাতে সে যা খায় বা পান করে, তার জন্য সে সাওয়াব পেতে পারে; কেননা, অনেক সময় ভালো নিয়তের কারণে ‘মুবাহ’ (বৈধ) বিষয় আনুগত্যে পরিণত হয়, ফলে মুসলিম ব্যক্তিকে তার জন্য সাওয়াব দেয়া হয়।
৩. খাওয়ার আগে দুই হাত ধৌত করা, যদি তাতে ময়লা থাকে অথবা হাত দু’টির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়।
৪. যমীনের উপর কোনো পাত্রে খাবার রাখা, টেবিলের উপর নয়; কেননা, এটা বিনয়-নম্রতার একেবারেই কাছাকাছি পন্থা। কারণ, আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« مَا أَكَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى خِوَانٍ ، وَلَا فِي سُكُرُّجَةٍ » . (رواه البخاري).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম টেবিলের উপর খাননি এবং কোনো থালা বা প্লেটে করেও খাননি।”
৫. বিনয়ীভাবে দুই হাঁটু গেড়ে দুই পায়ের পাতার উপরে বসা, অথবা ডান পা দাঁড় করিয়ে দিয়ে বাম পায়ের উপরে বসা, যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসতেন; তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لَا آكُلُ مُتَّكِئًا ، إنما أنا عبدٌ ، آكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ ، وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ » . (رواه البخاري و البيهقي).
“আমি হেলান দিয়ে খাইনা। আমি তো গোলাম; আমি খাই, যেমনিভাবে গোলামে খায়; আর আমি বসি, যেমনিভাবে গোলামে বসে।”
৬. প্রস্তুত করা বিদ্যমান খাদ্যে সন্তুষ্ট থাকা এবং খাদ্যের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা না করা; যদি তার কাছে ভালো লাগে খাবে, আর ভালো না লাগলে বর্জন করবে; কেননা, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:
« مَا عَابَ رسولُ الله صلى الله عليه وسلم طَعَامَاً قَطُّ ، إن اشْتَهَاهُ أكَلَهُ ، وَإنْ كَرِهَهُ تَرَكَهُ » . (رواه أبو داود).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও খাদ্যের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করতেন না; তাঁর রুচিসম্মত হলে খেতেন; আর রুচিসম্মত না হলে খেতেন না।”
৭. একাকি না খেয়ে কোনো মেহমান, অথবা পরিবার, অথবা সন্তান, অথবা খাদেমকে সাথে নিয়ে খাওয়া; কেননা, হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« اجْتَمِعُوا عَلَى طَعَامِكُمْ ، وَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ ، يُبَارَكْ لَكُمْ فِيهِ » . (رواه أبو داود و ابن ماجه).
“তোমরা সম্মিলিতভাবে তোমাদের খাবার খাও এবং আল্লাহর নামে খাও, দেখবে তোমাদের খাদ্যে বরকত হবে।”
(খ) খাওয়ার মধ্যকার সময়ের আদবসমূহ:
১. ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে) বলে খাওয়া শুরু করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا أكَلَ أحَدُكُمْ فَلْيَذْكُرِ اسْمَ اللهِ تَعَالَى ، فإنْ نَسِيَ أنْ يَذْكُرَ اسْمَ اللهِ تَعَالَى في أوَّلِهِ ، فَلْيَقُلْ: بسم اللهِ أوَّلَهُ وَآخِرَهُ » . (رواه أَبُو داود و الترمذي).
“তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে নেয়; আর সে যদি শুরুতে আল্লাহ তা‘আলার নাম নিতে ভুলে যায়, তাহলে যেন বলে: « بسم اللهِ أوَّلَهُ وَآخِرَهُ » (প্রথমে ও শেষে আল্লাহর নামে)।”
২. আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করার মাধ্যমে অর্থাৎ ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলে খাওয়া শেষ করা। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ أكَلَ طَعَامَاً ، فَقال : الحَمْدُ للهِ الَّذِي أطْعَمَنِي هَذَا ، وَرَزَقنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلاَ قُوَّةٍ ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ » . (رواه أَبُو داود و الترمذي).
“যে ব্যক্তি খাবার খেয়ে শেষ করার পর বলবে: « الحَمْدُ للهِ الَّذِي أطْعَمَنِي هَذَا ، وَرَزَقنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلاَ قُوَّةٍ » (অর্থাৎ সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এ খাবার খাওয়ালেন এবং আমাকে রিযিক দিলেন আমার কোনরূপ চেষ্টা ও শক্তি ছাড়াই), তার পেছনের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।”
৩. ডান হাত দ্বারা খাবার গ্রহণ করা, ছোট ছোট লোকমা দেওয়া এবং ভালোভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া; আর পাত্রের মাঝখান থেকে না খেয়ে নিজের সামনে থেকে খাওয়া; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমর ইবন আবি সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
« يَا غُلامُ ، سَمِّ اللهَ تَعَالَى ، وَكُلْ بِيَمينِكَ ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“হে বেটা! আল্লাহ তা‘আলার নাম লও (অর্থাৎ ‘বিসমিল্লাহ’ বল); ডান হাতে খাও এবং নিজের সামনে থেকে খাও।” তিনি আরও বলেন:
« البَرَكَةُ تَنْزِلُ وَسَطَ الطعَامِ ؛ فَكُلُوا مِنْ حَافَتَيْهِ ، وَلاَ تَأكُلُوا مِنْ وَسَطِهِ » . (رواه أَبُو داود و الترمذي).
“বরকত খাবারের মধ্যখানে অবতীর্ণ হয়; কাজেই তোমরা তার পাশ থেকে খাও; তার মাঝখান থেকে খেয়ো না।”
৪. খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া; আর খাবারের পাত্র চেটে খাওয়া এবং রুমাল বা টিসু দিয়ে স্বীয় আঙুলসমূহ মুছে ফেলার পূর্বে বা পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলার পূর্বে সেগুলো চেটে খাওয়া। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا أكَلَ أَحَدُكُمْ طَعَاماً ، فَلاَ يَمْسَحْ أَصَابِعَهُ حَتَّى يَلْعَقَهَا أَوْ يُلْعِقَها » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন তার আঙুলসমূহ মুছে না ফেলে, যতক্ষণ না সে তা চেটে খায় অথবা কাউকে দিয়ে চাটিয়ে নেয়।” তাছাড়া জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« إنَّ رَسُول الله صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِلَعْقِ الأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ ، وقال : إنَّكُمْ لاَ تَدْرُونَ في أيِّ طَعَامِكُمُ البَرَكَةُ » . (رواه مسلم).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙুল ও খাওয়ার পাত্র চেটে খাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি বলেন: ‘তোমাদের জানা নেই, তোমাদের কোন্ খাবারের মধ্যে বরকত রয়েছে।”
৫. খাবার গ্রহণ করার সময় তার থেকে কিছু পড়ে গেলে তার থেকে ময়লা দূর করে তা খেয়ে ফেলবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيَأخُذْهَا ، وَلْيُمِط عنها الأَذى وليَأكُلْها ، وَلاَ يَدَعْها لِلشَّيْطان » . (رواه مسلم).
“যখন তোমাদের কারও লোকমা পড়ে যায়, তখন সে যেন তা তুলে নেয়; আর তার থেকে ময়লা দূর করে নিয়ে যেন তা খেয়ে ফেলে এবং তা যেন শয়তানের জন্য রেখে না দেয়।”
৬. গরম খাবারে (ঠাণ্ডা করার জন্য) ফুঁ না দেওয়া এবং তা ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত না খাওয়া; আর পানি পান করা অবস্থায় পানির মধ্যে ফুঁ না দেওয়া এবং উচিৎ হলো পানপাত্রের বাইরে তিনবার শ্বাস নেয়া; কেননা, আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:
« إنَّ رسول الله صلى الله عليه وسلم كَانَ يَتَنَفَّسُ في الشَّرابِ ثَلاثاً » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি পান করতে তিনবার শ্বাস নিতেন।” আর আবূ সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« إنَّ النَّبيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَن النَّفْخ في الشَّرَاب » . (رواه الترمذي).
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানীয় বস্তুর মধ্যে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন।” তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:
« إنَّ النَّبيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى أن يُتَنَفَّسَ في الإناءِ أَوْ يُنْفَخَ فِيهِ » . (رواه الترمذي).
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানির পাত্রে শ্বাস নিতে অথবা তাতে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন।”
৭. অতি ভোজন থেকে বিরত থাকা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَا مَلأَ آدَمِيٌّ وِعَاء شَرّاً مِنْ بَطْنٍ ، بِحَسْبِ ابنِ آدَمَ لُقَيْمَاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ ، فإنْ لَمْ يَفْعَلْ فثُلُثٌ لِطَعَامِهِ ، وَثُلُثٌ لِشَرابِهِ ، وَثُلُثٌ لِنَفَسه » . (رواه أحمد و ابن ماجه و الترمذي و الحاكم).
“মানুষের ভরা পেটের চেয়ে খারাপ পাত্র আর নেই। আদম সন্তানের কোমর সোজা রাখার জন্য কয়েকটি লোকমাই তো যথেষ্ট; সুতরাং সে যদি তাতে তুষ্ট না হতে পারে, তাহলে (পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে নেবে) এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং অপর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ঠিক করে নেবে।”
৮. অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রথমে খাবার বা পানীয় পরিবেশন করা; অতঃপর ডান দিক থেকে একজন একজন করে খাবার পরিবেশন করতে থাকা; আর খাবার বা পানীয় পরিবেশনকারী হবে কাওমের মাঝে সর্বশেষ খাবার বা পানীয় গ্রহণকারী ব্যক্তি। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: « كَبِّرْ كَبِّرْ » অর্থাৎ উপবিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্য থেকে বয়োজ্যেষ্ঠকে দিয়ে শুরু কর; তাছাড়া “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র কাছে তার বাম পাশে বসা বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে পানীয় পরিবেশনের ব্যাপারে অনুমতি নিয়েছেন, যখন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা ছিলেন তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের) ডানপাশে এবং বয়স্ক ব্যক্তিগণ ছিলেন তাঁর বামপাশে। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তার কাছে অনুমতি চাওয়াই প্রমাণ করে যে, ডানপাশে বসা ব্যক্তিই প্রথমে পানীয় পাওয়ার ব্যাপারে বেশি হকদার।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন: « الأيمن فالأيمن » (অর্থাৎ ডানপাশ থেকে পরপর খাবার প্রদান কর)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« إنَّ سَاقِيَ الْقَوْمِ آخِرُهُمْ شُرْبًا » . (رواه مسلم و أبو داود و ابن ماجه).
“কাওমের মধ্যে যে সাকী (পানীয় সরবরাহকারী) হবে, পান করার দিক থেকে সে সবার শেষে থাকবে।”
৯. যে মাজলিসে বয়সের দিক থেকে বড়, অথবা মর্যাদার দিক থেকে তার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি আছে, সেখানে প্রথমে খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করা। কেননা, তা শিষ্টাচার পরিপন্থি এবং এমন ব্যক্তিকে নিন্দিত লোভী বলে চিত্রিত করা হয়। কেউ কেউ ছন্দাকারে বলেন:
وإنْ مُدَّتِ الأيدي إلى الزادِ لم أكنْ
بِأعجلِهم ، إذْ أَجْشَعُ القومِ أعْجَلُ.
(আর যদি খাবারের দিকে হাতগুলো প্রসারিত হয়েই যায়, তখন হব না আমি
তাদের সকলের অগ্রগামী; কারণ, কাওমের মাঝে সেই সবচেয়ে লোভী, যে তড়িৎ প্রিয় বেশি)।
১০. তার বন্ধু বা মেযবান কর্তৃক যেন তাকে বলতে না হয়: ‘তুমি খাও’ এবং যাতে খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে না হয়, বরং তার জন্য উচিৎ হল কোনো প্রকার লাজ্জাবোধ না করে প্রয়োজন মত খাবার খেয়ে নেওয়া; কেননা, এর মধ্যে তার বন্ধু বা মেযবানের জন্য অসুবিধা আছে, যেমনিভাবে তাতে রয়েছে এক ধরনের লৌকিকতা; আর ইসলামে লৌকিকতা বা প্রদর্শনী করা হারাম।
১১. খাওয়ার ক্ষেত্রে বন্ধুর প্রতি সদয় হওয়া; সুতরাং সে তার থেকে বেশি খাওয়ার চেষ্টা করবে না, বিশেষ করে যখন খাবারের পরিমাণ কম হয়; কেননা, এ ক্ষেত্রে সে অন্যের হক ভক্ষণকারী বলে গণ্য হবে।
১২. খাওয়ার মাঝখানে সাথীদের দিকে না তাকানো এবং তাদেরকে পর্যবেক্ষণ না করা; কেননা, এ রকম করলে তারা লজ্জা পাবে, বরং তার জন্য উচিৎ হলো তার চারি পাশের খাবার গ্রহণকারীদের থেকে তার দৃষ্টিকে অবনমিত করে রাখা এবং তাদেরকে অবলোকন না করা; কেননা, এটা তাদেরকে কষ্ট দিবে; যেমনিভাবে এ কারণে সে কখনও কখনও তাদের কারো কারো ঘৃণার পাত্র হবে; ফলে এ কারণে সে গুনাহগার হবে।
১৩. এমন কাজ না করা, যাকে মানুষ স্বভাবগতভাবে অপছন্দ করে; সুতরাং সে পাত্রের মধ্যে তার হাতকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিবে না এবং খাবার গ্রহণের সময় তার মাথাকে পাত্রের নিকটবর্তী করবে না, যাতে তার মুখ থেকে কোনো কিছু তাতে না পড়ে; যেমন— সে যখন রুটি থেকে তার দাঁত দ্বারা কিছু অংশ গ্রহণ করে, তখন পাত্রের মধ্যে তার বাকি অংশ ডুবিয়ে দিবে না; ঠিক অনুরূপভাবে তার কর্তব্য হল এমন শব্দ চয়নে কথা না বলা, যা ময়লা ও আবর্জজনার কথা মনে করিয়ে দেয়; কারণ, কোনো কোনো সময় এর দ্বারা সাথীদের কেউ কেউ কষ্ট অনুভব করে; আর মুসলিম ভাইকে কষ্ট দেয়া হারাম।
১৪. ফকীরের সাথে তার খাওয়া হবে পরার্থপরতা বা প্রেম-ভালবাসার ভিত্তিতে, ভাই-বন্ধুদের সাথে খাওয়া হবে আনন্দ ও নির্মল রসিকতার ভিত্তিতে এবং পদস্থ ও মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের সাথে খাওয়া হবে আদব-লেহাজ ও শ্রদ্ধার সাথে।
(গ) খাওয়ার পরের আদবসমূহ:
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে পেট ভরে খাওয়ার পূর্বেই সে খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেবে, যাতে সে মারাত্মক ধরনের বদহজমের শিকার না হয় এবং শিকার না হয় মেধা ও বুদ্ধি বিনষ্টকারী অজীর্ণের।
২. হাত চেটে খাওয়া, তারপর তা মুছে ফেলা, অথবা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা; তবে ধুয়ে ফেলাটাই সবচেয়ে ভালো ও সুন্দর।
৩. খাওয়ার মাঝখানে যেসব খাবার পড়ে যায়, তা কুড়িয়ে নেয়া; কেননা, এ ব্যাপারে হাদিসে গুরুত্ব ও উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে; তাছাড়া এটা নি‘য়ামতের এক প্রকার শুকরিয়াও বটে।
৪. মুখ পরিষ্কার করার জন্য দাঁত খিলাল করা এবং ভালোভাবে কুলি করা; কেননা, মুখ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার যিকির করা হয় এবং বন্ধু-বান্ধবগণের সাথে কথা বলতে হয়; তাছাড়া মুখের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দাঁতের সুস্থতাকে বহাল রাখে।
৫. পানাহারের পরে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ (الحمد لله ) বলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা; আর যখন দুধ পান করবে, তখন বলবে:
« اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيمَا رَزَقْتَنَا , و زِدْنا منهُ » .
(অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমাদেরকে তুমি যে রিযিক দান করেছ, তাতে তুমি বরকত দান কর এবং আমাদেরকে তা আরও বাড়িয়ে দাও)। আর যদি কোনো সম্প্রদায়ের নিকট ইফতার করে, তাহলে বলবে:
« أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُونَ ، وَأَكَلَ طَعَامَكُمُ الأَبْرَارُ ، وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلاَئِكَةُ » .
(অর্থাৎ, তোমার কাছে সাওম পালনকারীগণ ইফতার করল, সজ্জনরা তোমার খাবার খেলো, আর ফেরেশ্তাগণ তোমার জন্য ‘ইস্তিগফার’ তথা ক্ষমা প্রার্থনা করল)। আর যদি বলে
« اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِيمَا رَزَقْتَهُمْ ، وَاغْفِرْ لَهُمْ ، وَارْحَمْهُمْ » .
(অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তাদেরকে তুমি যে রিযিক দান করেছ, তাতে তুমি বরকত দান কর; তাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং তাদের প্রতি রহম কর) , তাহলে সে সঠিকভাবে সুন্নাহ পালন করল।
* * *

একাদশ অধ্যায়
যিয়াফত তথা আপ্যায়নের আদবসমূহ
যিয়াফত (الضيافة ) শব্দটি আরবি; এর অর্থ আপ্যায়ন করানো, আতিথিয়তা, মেহমানদারি, ভোজ অনুষ্ঠান ইত্যাতি। আর মুসলিম ব্যক্তি মেহমানকে সম্মান করার আবশ্যকতায় বিশ্বাস করে এবং তার সাধ্যানুযায়ী তাকে আদর আপ্যায়ন করবে; আর এটা এ জন্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ جَائِزَتَهُ ، قالوا : وَمَا جَائِزَتُهُ ؟ قَالَ : يَوْمُهُ وَلَيْلَتُهُ ، وَالضِّيَافَةُ ثَلاَثَةُ أيَّامٍ ، فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ عَلَيْهِ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে তার হক আদায় সহকারে সম্মান তথা আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। সহাবীগণ বললেন: তার হক বলতে কী বুঝায়? তিনি বললেন: তাকে একদিন ও একরাত আদর-আপ্যায়ন করা। আর মেহমানদারীর সীমা হল তিনদিন। এর বাইরে অতিরিক্ত কিছু করা সাদকা স্বরূপ।” আর এ জন্য মুসলিম ব্যক্তি যিয়াফত তথা আপ্যায়নের ব্যাপারে নিম্নোক্ত আদবসমূহ মেনে চলবে:
(ক) যিয়াফতের জন্য আমন্ত্রণের আদবসমূহ:
১. যিয়াফতে ফাসিক ও পাপিষ্ঠদেরকে বাদ দিয়ে আল্লাহভীরু লোকদেরকে দাওয়াতের ব্যবস্থা করা; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لا تُصَاحِبْ إلاَّ مُؤْمِناً ، وَلاَ يَأْكُلْ طَعَامَكَ إلاَّ تَقِيٌّ » . (رواه أحمد و أبو داود و الترمذي و ابن حبان و الحاكم).
“মুমিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গী হয়ো না এবং তোমার খাবার মুত্তাকী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ যেন না খায়।”
২. গরীবদেরকে বাদ দিয়ে শুধু ধনীদের জন্য যিয়াফতকে নির্দিষ্ট না করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« شَرُّ الطَّعَامِ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ ، يُدْعَى إِلَيْهَا الأَغْنِيَاءُ وَيُتْرَكُ الْفُقَرَاءُ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“সবচেয়ে নিকৃষ্ট খাবার হল ঐ ওলীমা’র (অনুষ্ঠানের) খাবার, যাতে ধনীদের দাওয়াত করা হয় এবং গরীবদের বাদ দেয়া হয়।”
৩. গর্ব ও অহঙ্কার প্রকাশের উদ্দেশ্যে যিয়াফতের আয়োজন না করা, বরং উদ্দেশ্য হবে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণের সুন্নাহ পালন করা, যেমন— ইবরাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম, যাঁর উপাধি ছিল " أبو الضِّيْفان "বা ‘মেহমানদের পিতা’। অনুরূপভাবে যিয়াফতের আয়োজনের দ্বারা নিয়ত থাকবে মুমিনদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা এবং ভাই ও বন্ধু-বান্ধবের হৃদয়ে আনন্দ ও খুশি ছড়িয়ে দেয়া।
৪. মুমিন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে কষ্ট দেওয়া থেকে দূরে থাকার জন্য এমন কাউকে দাওয়াত না দেওয়া, যার ব্যাপারে সে জানে যে, তার জন্য যিয়াফতে উপস্থিত হওয়া কষ্টকর হবে, অথবা সে উপস্থিত ভাইগণের কারও দ্বারা কষ্টের শিকার হবে।
(খ) দাওয়াত গ্রহণের আদবসমূহ:
১. দাওয়াত গ্রহণ করা এবং কোনো ওযর (যেমন— তার দীন অথবা শরীরের ব্যাপারে ক্ষতির আশঙ্কা করা) ছাড়া দাওয়াত থেকে পিছিয়ে না থাকা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ دُعِىَ فَلْيُجِبْ » . (رواه مسلم).
“যাকে দাওয়াত দেয়া হয়, সে যেন তা গ্রহণ করে।” তিনি আরও বলেন:
« لَوْ دُعِيتُ إِلَى كُراعٍ أَوْ ذِرَاعٍ لأَجَبْتُ ، ولو أُهْدِيَ إِلَيَّ ذراعٌ أَوْ كُراعٌ لَقَبِلْتُ » . (رواه البخاري).
“আমাকে যদি একটি পা বা বাযুর জন্য দাওয়াত করা হয়, তাহলে আমি সেই দাওয়াত গ্রহণ করব; আর আমার নিকট যদি একটি পা বা বাযুও হাদিয়া হিসেবে পাঠানো হয়, তবুও আমি তা গ্রহণ করব।”
২. দাওয়াত গ্রহণের ব্যাপারে ধনী ও গরীবের মাঝে ভেদাভেদ না করা; কেননা, গরীবের দাওয়াত গ্রহণ না করার মধ্যে তার মন ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যাপার রয়েছে, তাছাড়া এর মধ্যে এক প্রকার অহঙ্কার রয়েছে, আর অহঙ্কার একটি ঘৃণিত ও নিন্দিত বিষয়। আর গরীবদের দাওয়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে একটি বর্ণনা হল: “একদা হাসান ইবন আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা কতগুলো মিসকীনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা মাটির উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে খাচ্ছিল, তারপর তারা তাঁকে উদ্দেশ্য বলল: হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যার ছেলে! তুমি কি আমাদের সাথে খেতে আসবে? তখন তিনি বললেন: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আল্লাহ অহঙ্কারীদেরকে ভালবাসেন না, এ কথা বলে তিনি তাঁর খচ্চরের উপর থেকে নেমে গিয়ে তাদের সাথে খেলেন।”
৩. দাওয়াত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রাস্তার দূরত্বের কম-বেশি ভেদাভেদ না করা; যদি তার নিকট দু’টি দাওয়াত আসে, তাহলে প্রথমে আসা দাওয়াতটি গ্রহণ করবে এবং অন্যটির ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করবে।
৪. সাওম (নফল) পালনের কারণে দাওয়াতে অংশগ্রহণ করা থেকে পিছিয়ে থাকবে না, বরং সেখানে উপস্থিত হবে; অতঃপর তার সাথী যদি তার খাওয়াতে খুশি হন, তাহলে সে সাওম ভঙ্গ করে ফেলবে; কেননা, মুমিনের মনে আনন্দ দেওয়াটা নৈকট্যপূর্ণ কাজ; অন্যথায় তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করে দো‘য়া করবে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا دُعِيَ أحَدُكُمْ فَلْيُجِبْ ، فَإنْ كَانَ صَائِماً فَلْيُصَلِّ ، وَإنْ كَانَ مُفْطِراً فَلْيَطْعَمْ » . (رواه مسلم).
“যখন তোমাদের কাউকে দাওয়াত দেয়া হয়, তখন সে যেন তা গ্রহণ করে; অতঃপর সে যদি সাওম পালনকারী হয়, তাহলে সে যেন তার (দাওয়াতকারীর) জন্য দো‘য়া করে দেয়; আর যদি সাওম পালনকারী না হয়, তাহলে যেন সে খেয়ে নেয়।” তিনি আরও বলেন:
« تَكَلَّفَ لك أخوك وصَنَعَ ثم تقول : إنى صائم ؟ ! » . (رواه الدارقطني).
“তোমার ভাই তোমার জন্য কষ্ট করেছে এবং খাবার তৈরি করেছে, অতঃপর তুমি বলবে: আমি সাওম পালনকারী?!”
৫. দাওয়াত গ্রহণ করার মাধ্যমে তার মুসলিম ভাইকে সম্মান করার নিয়ত করা; কেননা হাদিসে এসেছে:
« إنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى » . (متفق عليه).
“প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত; আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।” তাছাড়া ভাল নিয়তের কারণে বৈধ কাজ আনুগত্যে পরিণত হয় এবং তার জন্য মুমিন বান্দাকে সাওয়াব দেয়া হয়।
(গ) দাওয়াতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার আদবসমূহ:
১. উপস্থিতির ক্ষেত্রে তাদেরকে দীর্ঘ অপেক্ষায় না রাখা, যা তাদেরকে বিরক্ত ও অস্থির করে তুলে; আবার প্রস্তুতির পূর্বেই উপস্থিতিকে তরান্বিত না করা, যার ফলে তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে; কেননা, এমন কর্মকাণ্ড তাদের কষ্টের কারণ।
২. যখন প্রবেশ করবে, তখন মাজলিসের সামনে চলাফেরা করবে না, বরং মাজলিসের মধ্যে বিনয়ী হয়ে চলবে; আর যখন কর্তৃপক্ষ কোনো জায়গায় বসার জন্য ইঙ্গিত করবে, তখন সেখানে বসে পড়বে।
৩. মেহমানের জন্য দ্রুত খাবার পরিবেশন করা; কেননা, দ্রুত খাবার পরিবেশন করার মধ্যে মেহমানকে সম্মান করার বিষয়টি নিহিত রয়েছে; আর শরী‘য়ত প্রবর্তক মেহমানকে সম্মান করার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন:
« مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।”
৪. সকলে খাবার গ্রহণ শেষ করার পূর্বেই তাদের সামনে থেকে খাবার উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত না হওয়া।
৫. মেহমানকে সাধ্যানুসারে মেহমানদারি করা; কেননা, তাতে কমতি করাটা ব্যক্তিত্ব হানি করে এবং বেশি করাটা কৃত্রিমতা ও লোক দেখানো; আর দু’টি কাজাই নিন্দিত।
৬. যখন সে মেহমান হিসেবে কারো কাছে অবতরণ করবে, তখন সে যেন তিন দিনের বেশি সেখানে অবস্থান না করে; তবে তার মেযবান বা অতিথি সেবক যদি আরও বেশি দিন থাকার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করে, তাহলে তিন দিনের বেশি থাকাতেও কোনো দোষ নেই। আর যখন সে প্রস্থান করবে, তখন তার প্রস্থানের জন্য মেযবানের কাছে অনুমতি চাইবে।
৭. মেহমানের সাথে বাড়ির বাহির পর্যন্ত গিয়ে তাকে বিদায় জানানো; কেননা, পূর্ববর্তী সৎব্যক্তিগণ এ কাজটি করতেন, তাছাড়া এ কাজটি শরী‘য়ত কর্তৃক নির্দেশিত মেহমানকে সম্মান করার তালিকাভুক্ত একটি কাজ।
৮. মেহমান ভালো মনে বিদায় নিবে, যদিও তার হক আদায়ে কোনো প্রকার ত্রুটি বিচ্যূতি হয়ে থাকে; কেননা, এটা উত্তম চরিত্রের অন্যতম দিক, যার দ্বারা বান্দা সাওম পালনকারী ও নফল সালাত আদায়কারীর মর্যাদা লাভ করবে।
৯. মুসলিম ব্যক্তির ঘরে তিন সেট বিছানা থাকা: একটি সেট তার নিজের জন্য, দ্বিতীয় সেট তার পরিবারের জন্য এবং তৃতীয় সেট মেহমানের জন্য; আর তিনের অধিক সেট বিছানা রাখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
« فِرَاشٌ لِلرَّجُلِ ، وَفِرَاشٌ لاِمْرَأَتِهِ ، وَالثَّالِثُ لِلضَّيْفِ ، وَالرَّابِعُ لِلشَّيْطَانِ » . (رواه مسلم).
“একটি বিছানা পুরুষ ব্যক্তির জন্য; আরেকটি বিছানা তার স্ত্রীর জন্য; তৃতীয় বিছানাটি মেহমানের জন্য এবং চতুর্থটি শয়তানের জন্য।”
* * *


দ্বাদশ অধ্যায়
সফরের আদব প্রসঙ্গে
মুসলিম ব্যক্তি মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, সফর তার জীবনের এক আবশ্যকীয় ও জরুরি অবিচ্ছেদ্য বিষয়; কেননা, হাজ্জ, ওমরা, যুদ্ধ, জ্ঞান অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভাই-বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ— এসব ফরয ও ওয়াজিব বিষয় সফর করা ব্যতীত পালন করা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই শরী‘য়ত প্রবর্তক সফর এবং তার বিধিবিধান ও আদবসমূহের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; আর একজন আদর্শ মুসলিম ব্যক্তির দায়িত্ব হল তা শিখে নেওয়া এবং সে অনুযায়ী আমল করা।
সফরের বিধি-বিধানসমূহ নিম্নরূপ:
১. চার রাকা‘য়াত বিশিষ্ট সালাতকে ‘কসর’ করা; সুতরাং সে শুধু দুই রাকা‘য়াত দুই রাকা‘য়াত করে সালাত আদায় করবে; তবে মাগরিবের সালাত তিন রাকা‘য়াতই আদায় করবে। আর সে যে শহরে বা গ্রামে বাস করে, তা থেকে প্রস্থান করা থেকে ‘কসর’ শুরু করবে এবং সেখানে পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত ‘কসর’ করবে; তবে যে শহরে সে সফর করেছে, সেখানে চার দিন বা তার বেশি অবস্থান করার নিয়ত করলে সে অবস্থায় পূর্ণ সালাত আদায় করবে, ‘কসর’ করবে না; কিন্তু যখন সে নিজ শহরে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবে, তখন আবার ‘কসর’ শুরু করবে এবং বাড়িতে পৌঁছা পর্যন্ত ‘কসর’ চালিয়ে যাবে; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِذَا ضَرَبۡتُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٌ أَن تَقۡصُرُواْ مِنَ ٱلصَّلَوٰةِ ﴾ [النساء: ١٠١]
“তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে, তখন সালাত ‘কসর’ করলে তোমাদের কোনো দোষ নেই।” তাছাড়া আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى مَكَّةَ ، فَكَانَ يُصَلِّى (الرباعية ) رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ حَتَّى رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলাম; আমরা মদীনায় ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি (চার রাকা‘য়াত বিশিষ্ট সালাতকে ‘কসর’ করে) দুই রাকা‘য়াত দুই রাকা‘য়াত করে সালাত আদায় করতেন।”
২. তিনদিন তিনরাত মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ; কেননা, আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« جَعَلَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثَلاثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيَهُنَّ لِلْمُسَافِرِ ، وَلِلْمُقِيمِ يَوْمًا وَلَيْلَةً الْمَسْحَ عَلَى الْخُفَّيْنِ » . (رواه أحمد و مسلم و النسائي و ابن ماجه).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মোজার উপর মাসেহ করার বিধান দিয়েছেন— মুসাফির তথা পর্যটকের জন্য তিনদিন তিনরাত এবং মুকীম তথা নিজ বাসস্থানে বসবাসকারীর জন্য একদিন একরাত।”
৩. তায়াম্মুম করা বৈধ, যদি সে পানি না পায়, অথবা পানি সংগ্রহ করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে যায়, অথবা তার জন্য পানির দাম অনেক বেশি হয়; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِن كُنتُم مَّرۡضَىٰٓ أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوۡ جَآءَ أَحَدٞ مِّنكُم مِّنَ ٱلۡغَآئِطِ أَوۡ لَٰمَسۡتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَلَمۡ تَجِدُواْ مَآءٗ فَتَيَمَّمُواْ صَعِيدٗا طَيِّبٗا فَٱمۡسَحُواْ بِوُجُوهِكُمۡ وَأَيۡدِيكُمۡۗ ﴾ [النساء: ٤٣]
“আর যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ শৌচস্থান থেকে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ কর এবং পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম কর; সুতরাং মাসেহ কর তোমরা তোমাদের চেহারা ও হাত।”
৪. সাওম ভঙ্গ করার সুযোগ বা অবকাশ প্রদান; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٖ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۚ ﴾ [البقرة: ١٨٤]
“অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে।”
৫. বাহনের উপর বসে যে কোনো দিকে ফিরে নফল সালাত আদায় করার বৈধতা; কেননা, আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:
« إنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّى سُبْحَتَهُ (النافلة ) حَيْثُمَا تَوَجَّهَتْ بِهِ نَاقَتُهُ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহনে (নফল) সালাত আদায় করতেন, তাঁর উট তাঁকে নিয়ে যে দিকেই ফিরে থাকুক না কেন।”
৬. যোহর ও আসর, অথবা মাগরিব ও এশা’র সালাতকে একত্র করে আদায় করা বৈধ; সুতরাং সে যোহর ও আসরের সালাতকে একত্র করে যোহরের ওয়াক্তে আদায় করবে এবং মাগরিব ও এশা’র সালাতকে একত্র করে মাগরিবের ওয়াক্তে আদায় করবে; অথবা যোহরের সালাতকে আসরের প্রথম ওয়াক্ত পর্যন্ত বিলম্বিত করে যোহর ও আসরকে এক সাথে আদায় করবে এবং মাগরিবকে এশা’র সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করে এক সাথে আদায় করবে। কেননা, মু‘য়ায রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِى غَزْوَةِ تَبُوكَ ، فَكَانَ يُصَلِّى الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ جَمِيعًا ، وَالْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ جَمِيعًا » . (رواه مسلم).
“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাবুকের যুদ্ধে বের হলাম; তারপর তিনি (আমাদেরকে নিয়ে) যোহর ও আসরের সালাতকে একত্রে আদায় করতেন এবং মাগরিব ও এশার সালাতকে একত্রে আদায় করতেন।”
আর সফরের আদবসমূহ নিম্নরূপ:
১. যুলুম করে দখল করা সম্পদ ও আমানতের অর্থ তার মালিকের নিকট ফেরত দেয়া; কেননা, সফর হল মৃত্যুর আলামত।
২. হালাল দ্রব্য থেকে তার খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করা এবং স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতার মত যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার উপর, তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে যাওয়া বা তাদের জন্য অর্থসম্পদ রেখে যাওয়া।
৩. তার পরিবার-পরিজন, ভাই ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে বিদায় জানানো এবং যাদেরকে বিদায় জানানো হবে, তাদের জন্য এ দো‘য়া পাঠ করা:
« أَسْتَوْدِعُ اللهَ دِينَكُمْ ، وَأمَانَتَكُمْ ، وَخَواتِيمَ أعْمَالِكُمْ » .
(আমি তোমাদের দীন, তোমাদের আমানত ও তোমাদের শেষ আমলকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি)। আর যাদেরকে বিদায় জানানো হয়, তারা তার জন্য দো‘য়া করবে এ বলে:
« زَوَّدَكَ اللَّهُ التَّقْوَى ، وَغَفَرَ ذَنْبَكَ ، وَوَجَّهَكَ إلى الْخَيْرِ حَيثُ تَوَجَّهْتَ » .
(আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ‘তাকওয়া’ দান করুন, তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং তুমি যখন কোনো দিকে রওয়ানা করবে, তখন তিনি যেন তোমাকে কল্যাণের দিকে পরিচালিত করেন)। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إنَّ لُقمانَ قال : إنَّ اللهَ تعالى إذا استُودِعَ شَيْاً حَفِظَهُ » . (رواه النسائي).
“লুকমান আ. বলেন: আল্লাহ তা‘আলার কাছে যখন কোনো কিছু আমানত রাখা হয়, তখন তিনি তা হেফাজত করেন।” আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুসারীকে বলতেন:
« أَسْتَوْدِعُ اللهَ دِينَكَ ، وَأمَانَتَكَ ، وَخَواتِيمَ عَمَلِكَ » . (رواه أَبُو داود و الترمذي).
“আমি তোমার দীন, তোমার আমানত ও তোমার শেষ আমলকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি।”
৪. তার সাথে সফরের জন্য ভালো হবে এমন তিনজন বা চারজন সাথীকে বাছাই করার পর তাদের সাথে সফরের উদ্দেশ্যে বের হওয়া; কেননা, সফরের ব্যাপারে যেমন বলা হয়: " مَخْبَرُ الرجال "(ব্যক্তির পরীক্ষাগার); আর সফরকে (সফর) বলে নামকরণ করার কারণ হল, যেহেতু সফর ব্যক্তির চরিত্রকে উন্মুক্ত করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ ، وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ ، وَالثَّلاَثَةُ رَكْبٌ » . (رواه أَبُو داود و النسائي و الترمذي).
“একজন আরোহী হচ্ছে একটি শয়তান; আর দুইজন আরোহী হল দুইটি শয়তান; আর তিনজন আরোহী হচ্ছে কাফেলা।” তিনি আরও বলেন:
« لَوْ أنَّ النَّاسَ يَعْلَمُونَ مِنَ الوحدَةِ مَا أعْلَمُ، مَا سَارَ رَاكبٌ بِلَيْلٍ وَحْدَهُ !» . (رواه البخاري).
“একাকী সফর করার মধ্যে কি কি ক্ষতি আছে সে সম্পর্কে আমি যা জানি, জনগণ যদি তা জানত, তাহলে কোনো ভ্রমণকারী রাতে একাকী ভ্রমণ করত না।”
৫. ভ্রমণকারীগণ কর্তৃক তাদের মধ্য থেকে এমন একজনকে আমীর বা নেতা বানিয়ে নেওয়া, যিনি তাদের সাথে পরমর্শ করে তাদেরকে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا خَرَجَ ثَلاَثَةٌ في سَفَرٍ فَليُؤَمِّرُوا أحَدَهُمْ » . (رواه أَبُو داود).
“যখন তিনজন কোনো সফরে বের হয়, তখন তারা যেন তাদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নিযুক্ত করে।”
৬. সফরের পূর্বে ‘সালাতুল ইস্তিখারা’ আদায় করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন, এমনকি তিনি বিষয়টি তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দিতেন, যেমনিভাবে তিনি তাদেরকে আল-কুরআনুল কারীমের কোনো সূরা শিক্ষা দিতেন।
৭. সফরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে প্রস্থানের সময় বলবে:
« بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلتُ عَلَى اللهِ ، ولاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ ، اللَّهُمَّ إِنِّي أعُوذُ بِكَ أنْ أضِلَّ أَوْ أُضَلَّ ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ ، أَوْ أظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ ، أَوْ أجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ »
(আল্লাহর নামে বের হচ্ছি এবং তাঁর উপর ভরসা করছি। আর অসৎকাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং সৎকাজ করার কারও ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ছাড়া। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই অথবা আমাকে পথভ্রষ্ট করা না হয়; অথবা আমি যেন দীন থেকে সরে না যাই অথবা আমাকে দীন থেকে সরিয়ে দেয়া না হয়; অথবা আমি যেন কারও উপর যুলুম না করি অথবা আমার উপর যুলুম করা না হয়)। আর যখন যানবাহনে আরোহণ করবে, তখন বলবে:
« بِسْمِ اللهِ و بِاللهِ و اللهُ أكْبَرُ ، تَوَكَّلتُ عَلَى اللهِ ، ولاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ العلِيِّ العَظِيْمِ ، وَمَا شَاءَ اللَّهُ كَانَ وَمَا لَمْ يَشَأْ لَمْ يَكُنْ ، سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ ، وَإنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلبُونَ . اللّهُمَّ إنا نسألكَ في سفرنا هذا البرّ والتَّقوى ، ومنَ العملِ ما ترضى ، اللَّهُمَّ هَوِّن عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا ، وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ . اللَّهُمَّ أنْتَ الصَّاحِبُ في السَّفَرِ ، والخَلِيفَةُ في الأهْلِ وَالْمَالِ . اللَّهُمَّ إنِّي أعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ ، وَكَآبَةِ المَنْظَرِ ، وَسُوءِ المُنْقَلَبِ في المالِ وَالأَهْلِ وَالوَلَدِ »
(আল্লাহর নামে আরোহণ করছি; আর আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাচ্ছি; আল্লাহ সবচেয়ে মহান। আর আল্লাহর উপর ভরসা করছি। আর অসৎকাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং সৎকাজ করার কারও ক্ষমতা নেই মহান আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য ছাড়া। আল্লাহ যা চান, তাই হয়; আর তিনি যা চান না, তা হয় না। পাক পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এটাকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন, অথচ আমাদের পক্ষে তা করার শক্তি ছিল না। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরে আমরা তোমার কাছে নেকী (পুণ্য) ও তাকওয়ার প্রার্থনা করছি এবং সেই আমল চাচ্ছি, যার প্রতি তুমি সন্তুষ্ট। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরকে আমাদের জন্য সহজ করে দাও এবং এর দূরত্বকে আমাদের জন্য সঙ্কুচিত করে দাও। হে আল্লাহ! সফরে তুমিই আমাদের সাথী বা রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং আমাদের পরিবার-পরিজন ও সম্পদের অভিভাবক। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই কষ্ট ও কাঠিন্য থেকে, মর্মান্তিক দৃশ্যের উদ্ভব থেকে এবং নিজেদের ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তুতির মধ্যে খারাপভাবে ফিরে আসা থেকে)।
৮. বৃহস্পতিবারে দিনের প্রথম প্রহরে সফরে বের হওয়া ; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« اللَّهُمَّ باركْ لأُمَّتِي في بُكُورِها ، وكان إذا بعث سَرِيَّة أَو جيشا بعثهم من أوَّل النهار » . (رواه أَبُو داود و الترمذي).
“হে আল্লাহ! তুমি আমার উম্মতকে তার সকাল বেলায় বরকত দান কর; আর তিনি যখন কোনো সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করতেন, তখন তাদেরকে দিনের প্রথম প্রহরে প্রেরণ করতেন।” তাছাড়া হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবারে তাঁর সফরে বের হতেন।
৯. প্রত্যেক উঁচু জায়গায় (উঠার সময়) ‘তাকবীর’ বলা; কেননা, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« إنَّ رجلاً قَالَ : يَا رسول الله ، إنّي أُريدُ أنْ أُسَافِرَ فَأوْصِني ، قَالَ : عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللهِ ، وَالتَّكْبِيرِ عَلَى كلِّ شَرَفٍ » . (رواه الترمذي).
“এক ব্যক্তি আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি সফর করার পরিকল্পনা করেছি, কাজেই আমাকে উপদেশ দিন; তখন তিনি বললেন: তুমি অবশ্যই তাকওয়া তথা আল্লাহকে ভয় করার নীতি অবলম্বন করবে এবং প্রত্যেক উঁচু জায়গায় (উঠার সময়) ‘তাকবীর’ বলবে।”
১০. যখন কোনো মানুষকে ভয় করবে, তখন বলবে:
« اللَّهُمَّ إنَّا نَجْعَلُكَ في نُحُورِهِمْ ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ » .
(অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমরা তাদেরকে তোমার মুখোমুখি করছি এবং তাদের অনিষ্টকারিতা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি); কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দো‘য়া পাঠ করতেন।
১১. সফরে সে আল্লাহ তা‘আলার নিকট দো‘য়া করবে এবং তাঁর নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাইবে; কেননা, সফর অবস্থার দো‘য়া কবুল করা হয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« ثلاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَات لاَ شَكَّ فِيهِنَّ : دَعْوَةُ المَظْلُومِ ، وَدَعْوَةُ المُسَافِرِ ، وَدَعْوَةُ الوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ » . (رواه الترمذي).
“তিনটি দো‘য়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই: মাযলুমের দো‘য়া, মুসাফিরের দো‘য়া এবং পিতামাতা কর্তৃক তার সন্তানের জন্য করা বদদো‘য়া।”
১২. যখন সে কোন স্থানে অবস্থান করার জন্য অবতরণ করে, তখন বলবে:
« أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ » . (رواه مسلم).
“আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাগুলো দ্বারা সে বস্তুর অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন।” আর যখন সফর অবস্থায় রাতের আগমন ঘটবে, তখন বলবে:
« يَا أرْضُ ! رَبِّي وَرَبُّكِ اللهُ ، أعُوذُ بِاللهِ مِنْ شَرِّكِ وَشَرِّ مَا فِيكِ ، وَشَرِّ مَا خُلِقَ فِيكِ ، وَشَرِّ مَا يَدِبُّ عَلَيْكِ ، وَأعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ أسَدٍ وَأسْوَدٍ ، وَمِنَ الحَيَّةِ وَالعَقْرَبِ ، وَمِنْ سَاكِنِي البَلَدِ ، وَمِنْ وَالِدٍ وَمَا وَلَدَ » . (رواه أَبُو داود).
“হে যমীন! আমার ও তোমার রব হলেন আল্লাহ। আমি আশ্রয় চাই তোমার অনিষ্টতা থেকে ও তোমার ভিতরে যা আছে তার অনিষ্টতা থেকে; আর তোমার মধ্যে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার অনিষ্টতা থেকে এবং তোমার উপরে যা কিছু চরে বেড়ায় তার অনিষ্টতা থেকে। আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই বাঘ-সিংহ ও কাল সাপের অনিষ্টতা থেকে এবং সকল প্রকার সাপ ও বিচ্ছুর অনিষ্টতা থেকে; আরও আশ্রয় চাই শহরবাসীদের অনিষ্টতা থেকে এবং জন্মদানকারী ও যা জন্ম লাভ করেছে তার অনিষ্টতা থেকে।”
১৩. যখন নির্জনতা বা বন্য জন্তুর ভয় করবে, তখন বলবে:
« سبحانَ الملكُ القدوسُ ربُّ الملائكةِ والروحِ ، جُلِّلَتِ السمواتُ والأرضُ بالعزةِ والجبروتِ » . (رواه ابن السني الخرائطي).
“আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, তুমি বাদশা, অতিশয় পবিত্র এবং সকল ফেরেশ্তা ও বিশেষ করে জিব্রাঈল আ. এর রব; তোমার শক্তি ও অসীম দাপটে আসমানসমূহ ও যমীন বিস্তৃত হয়ে আছে।”
১৪. যখন সে রাতের প্রথম ভাগে ঘুমাবে, তখন তার বাহু বা হাত যমীনে বিছিয়ে দেবে; আর যদি রাতের শেষ ভাগে ঘুমায়, তাহলে তার বাহু বা হাত দাঁড় করিয়ে দিবে এবং হাতের তালুতে তার মাথা রাখবে, যাতে ভারী ঘুম না হয় এবং ফযরের সালাত কাযা হয়ে না যায়।
১৫. যখন কোনো শহরের প্রতি দৃষ্টি পড়বে, তখন বলবে:
« اللهم اجعل لنا بها قراراً ، وارْزُقنا فيهَا رزقًا حلالًا . اللَّهُمَّ إني أَسأَلُكَ مِنْ خَيرِ هذه المَدينَةِ ، وَخَيرَ مَا فيها ، وَأعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا ، وَشَرِّ ما فيها »
(হে আল্লাহ! আমাদের জন্য তাতে স্থিতি ও প্রশান্তি দান কর এবং সেখানে আমাদের জন্য হালাল রিযিকের ব্যবস্থা কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এ শহরের কল্যাণ ও তার মধ্যকার কল্যাণ প্রার্থনা করছি; আর তোমার কাছে তার অকল্যাণ ও তার মধ্যকার অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাই)। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দো‘য়া পাঠ করতেন।
১৬. যখন তার সফরের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে, তখন দ্রুত নিজ শহর ও পরিবার-পরিজনের নিকট প্রত্যাবর্তন করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« السَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ العَذَابِ ، يَمْنَعُ أحَدَكُمْ طَعَامَهُ وَشَرابَهُ وَنَوْمَهُ ، فَإذَا قَضَى أحَدُكُمْ نَهْمَتَهُ مِنْ سَفَرِهِ ، فَلْيُعَجِّلْ إِلَى أهْلِهِ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“সফর হচ্ছে এক প্রকার আযাব; যা তোমাদের যে কারো পানাহার ও নিদ্রায় বাধা দেয়। সুতরাং যখন তোমাদের কারোর সফরের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায়, তখন সে যেন দ্রুত তার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসে।”
১৭. যখন (সফর থেকে) ফিরে আসবে, তখন তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীর দিবে এবং বলবে:
« آيِبُونَ ، تَائِبُونَ ، عَابِدُونَ ، لِرَبِّنَا حَامِدُونَ » .
(আমরা সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী, ইবাদতকারী এবং আমারা আমাদের প্রভুর প্রশংসাকারী) এবং এই দো‘য়াটি বারবার পাঠ করবে; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজটি করতেন।”
১৮. সফর থেকে রাতের বেলায় পরিবারবর্গের নিকট ফিরে না আসা; বরং তার পূর্বে কাউকে পাঠিয়ে তাদেরকে সুসংবাদ দেয়া, যাতে তার আগমন হঠাৎ করে তাদেরকে হতভম্ব করে না দেয়; কেননা, এটা ছিল নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত।
১৯. নারী তার স্বীয় মাহরাম পুরুষ সাথী ছাড়া একদিন ও একরাতের দূরত্বের পথ সফর করবে না; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لاَ يَحِلُّ لامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَومِ الآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلاَّ مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“যে নারী আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান এনেছে, তার জন্য মাহরাম পুরুষ সাথী ছাড়া একদিন ও একরাতের দূরত্বের পথ সফর করা বৈধ নয়।”
* * *


ত্রয়োদশ অধ্যায়
পোশাক-পরিচ্ছদের আদব প্রসঙ্গে
মুসলিম ব্যক্তি মনে করে যে, পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তিনি বলেন:
﴿ ۞يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ خُذُواْ زِينَتَكُمۡ عِندَ كُلِّ مَسۡجِدٖ وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ وَلَا تُسۡرِفُوٓاْۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُسۡرِفِينَ ٣١ ﴾ [الاعراف: ٣١]
“হে বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহণ কর। আর খাও এবং পান কর কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।” আর আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা বনী আদমের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তিনি বলেন:
﴿ يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞۚ ﴾ [الاعراف: ٢٦]
“হে বনী আদম! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশ-ভূষার জন্য। আর তাকওয়ার পোশাক; এটাই সর্বোত্তম।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَجَعَلَ لَكُمۡ سَرَٰبِيلَ تَقِيكُمُ ٱلۡحَرَّ وَسَرَٰبِيلَ تَقِيكُم بَأۡسَكُمۡۚ ﴾ [النحل: ٨١]
“আর তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেন পরিধেয় বস্ত্রের, তা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেন তোমাদের জন্য বর্মের, তা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَعَلَّمۡنَٰهُ صَنۡعَةَ لَبُوسٖ لَّكُمۡ لِتُحۡصِنَكُم مِّنۢ بَأۡسِكُمۡۖ فَهَلۡ أَنتُمۡ شَٰكِرُونَ ٨٠ ﴾ [الانبياء: ٨٠]
“আর আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে; কাজেই তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাণীর মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন:
« كُلُوا وَاشْرَبُوا وَالْبَسُوا وَتَصَدَّقُوا فِي غَيْرِ إِسْرَافٍ وَلَا مَخِيلَةٍ » . (رواه البخاري).
“তোমরা খাও, পান কর, পোশাক পরিধান কর এবং দান কর; তবে অপচয় ও অহঙ্কার পরিহার করো।” অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৈধ ও অবৈধ পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন এবং বর্ণনা দিয়েছেন পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় পোশাক-পরিচ্ছদের; সুতরাং এ জন্য মুসলিম ব্যক্তির দায়িত্ব ও কর্তব্য হল— তার পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে নিম্নোক্ত আদবসমূহ পালন করা:
১. সাধারণভাবে রেশমী পোশাক পরিধান না করা, চাই তা কাপড়ের ক্ষেত্রে হউক, অথবা পাগড়ীতে হউক অথবা অন্য যে কোনো পোশাকেই হউক; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لاَ تَلْبَسُوا الحَرِيرَ ؛ فَإنَّهُ مَنْ لَبِسَهُ في الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ في الآخِرَةِ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“তোমরা রেশমী পোশাক পরিধান করো না; কারণ, দুনিয়াতে যে ব্যক্তি তা পরিধান করবে, আখেরাতে সে তা পরিধান করা থেকে বঞ্চিত হবে।” তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান হাতে রেশম ও বাম হাতে স্বর্ণ নিয়ে বলেন:
« إنَّ هذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُور أُمّتي » . (رواه أَبُو داود).
“এই দু’টি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য (ব্যবহার করা) হারাম।” তিনি আরও বলেন:
« حُرِّمَ لِبَاسُ الحَرِير وَالذَّهَبِ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي ، وَأُحِلَّ لإنَاثِهِمْ » . (رواه الترمذي).
“রেশমের পোশাক ও সোনার জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে এবং তাদের নারীদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে।”
২. তার কাপড়, অথবা পাজামা, অথবা কোট, অথবা চাদর এমন লম্বা না হওয়া, যা তার দুই টাকনুর নীচে চলে যায়; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَا أسْفَل مِنَ الكَعْبَيْنِ مِنَ الإزْارِ فَفِي النار » . (رواه البخاري).
“দুই টাকনুর নীচে তহবন্দ যে পরিমাণ স্থান ঢেকে রাখবে, তা জাহান্নামে যাবে।” তিনি আরও বলেন:
« الإسْبَالُ في الإزار ، وَالقَمِيصِ ، وَالعِمَامةِ ، مَنْ جَرَّ شَيْئاً خُيَلاءَ لَمْ ينْظُرِ الله إِلَيْهِ يَوْمَ القِيَامَةِ » . (رواه أَبُو داود والنسائي).
“তহবন্দ বা পাজামা, জামা ও পাগড়ীই সাধারণত ঝুলিয়ে দেয়া হয়; আর যে ব্যক্তি অহঙ্কার বশত এরূপ কিছু ঝুলিয়ে দেবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি তাকাবেন না।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ القِيَامَةِ » . (متفقٌ عَلَيْهِ).
“যে ব্যক্তি অহঙ্কার বশত তার কাপড় ঝুলিয়ে দেবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি তাকাবেন না।”
৩. সাদা পোশাককে অন্যান্য পোশাকের উপর প্রাধান্য দেয়া এবং সকল রঙের পোশাককে বৈধ মনে করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« الْبَسُوا البَيَاضَ ؛ فَإنَّهَا أطْهَرُ وَأطْيَبُ ، وَكَفِّنُوا فِيهَا مَوْتَاكُمْ » . (رواه النسائي والحاكم).
“তোমরা সাদা পোশাক পড়; কারণ, এটাই পবিত্র ও উৎকৃষ্টতর। আর সাদা কাপড়েই তোমরা মৃতদের কাফন দিয়ো।” তাছাড়া বারা ইবন ‘আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« كَانَ رسول الله صلى الله عليه وسلم مَرْبُوعاً ، وَلَقَدْ رَأيْتُهُ في حُلَّةٍ حَمْرَاءَ مَا رَأيْتُ شَيْئاً قَطُّ أحْسَنَ مِنْهُ » . (رواه البخاري).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের গঠনাকৃতি ছিল মধ্যম গোছের। আর আমি তাঁকে লাল চাদর গায়ে জড়ানো অবস্থায় দেখেছি, আমি কখনও তাঁর চাইতে সুন্দর জিনিস দেখিনি।” আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহভাবে বর্ণিত আছে যে, তিনি সবুজ পোশাক পরিধান করেছেন এবং কালো রঙের পাগড়ী পরিধান করেছেন।
৪. মুসলিম রমনী কর্তৃক এমন লম্বা পোশাক পরিধান করা, যা তার দুই পায়ের পাতাকে ঢেকে দেয় এবং তার ওড়নাকে মাথার উপর এমনভাবে ঝুলিয়ে দেয়া, যাতে তা তার ঘাড়, গলা ও বুক ঢেকে দেয়; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ﴾ [الاحزاب: ٥٩]
“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَلۡيَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّۖ وَلَا يُبۡدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوۡ ءَابَآئِهِنَّ ﴾ [النور: ٣١]
“আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা ... ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” তাছাড়া আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন:
« يَرْحَمُ اللَّهُ نِسَاءَ الْمُهَاجِرَاتِ الأُوَلَ لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ : (وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ ) شَقَقْنَ أَكْثَفَ مُرُوطِهِنَّ ، فَاخْتَمَرْنَ بِهَا » . (رواه البخاري).
“আল্লাহ তা‘আলা প্রথম সারির মুহাজির রমনীগণের প্রতি রহম করুন, যখন আল্লাহ নাযিল করলেন: (وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ ) [আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে], তখন তারা নিজের কোমরে বাঁধা কাপড় খুলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ওড়না বানিয়ে ফেলল এবং তা দিয়ে শরীর ঢেকে ফেললো।” আর উম্মু সালমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন:
« لَمَّا نَزَلَتْ : ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ﴾ ، خَرَجَ نِسَاءُ الأَنْصَارِ كَأَنَّ عَلَى رُءُوسِهِنَّ الْغِرْبَانُ مِنَ الأَكْسِيَةِ » . (رواه أبو داود).
“যখন নাযিল হল: ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ﴾ [হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়], তখন আনসার রমনীগণ তাদের মাথা এমনভাবে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে বের হত, মনে হয় যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে।”
৫. স্বর্ণের আংটি পরিধান না করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণ ও রেশমের ব্যাপারে বলেন:
« إنَّ هذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُور أُمّتي » . (رواه أَبُو داود).
“এই দু’টি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য (ব্যবহার করা) হারাম।” তিনি আরও বলেন:
« حُرِّمَ لِبَاسُ الحَرِير وَالذَّهَبِ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي ، وَأُحِلَّ لإنَاثِهِمْ » . (رواه الترمذي).
“রেশমের পোশাক ও সোনার জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে এবং তাদের নারীদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে।” আর আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে:
« إنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَأَى خَاتَمًا مِنْ ذَهَبٍ فِى يَدِ رَجُلٍ ، فَنَزَعَهُ فَطَرَحَهُ ، وَقَالَ : « يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ ، فَيَجْعَلُهَا فِى يَدِهِ ». فَقِيلَ لِلرَّجُلِ بَعْدَ مَا ذَهَبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : خُذْ خَاتَمَكَ انْتَفِعْ بِهِ ، قَالَ : لاَ ، وَاللَّهِ لاَ آخُذُهُ أَبَدًا ، وَقَدْ طَرَحَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم » . (رواه مسلم).
“একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির হাতে একটি সোনার আংটি দেখতে পেলেন; অতঃপর তিনি আংটিটি তার হাত থেকে খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন: ‘তোমাদের কেউ কি ইচ্ছা করে জ্বলন্ত অংগার হাতে রাখবে!’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর লোকটিকে বলা হল: তুমি তোমার আংটিটি উঠিয়ে নিয়ে অন্য কোন কাজে লাগাও। সে বলল: আল্লাহর কসম! যে জিনিসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, তা আমি কখনও নেব না।”
৬. মুসলিম ব্যক্তির জন্য রূপার আংটি পরিধান করতে কোন দোষ নেই, অথবা রূপার আংটির পাথর বা বৃত্তে তার নাম অংকন করা এবং তা স্বীয় চিঠি-পত্র ও লেখালেখিতে সীলমোহর হিসেবে ব্যবহার করাতে অথবা তার দ্বারা চেক ও অনুরূপ কিছুতে স্বাক্ষর দানে কোন দোষ নেই; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ (محمد رسول الله ) খচিত রূপার আংটি ব্যবহার করতেন এবং তিনি তা তাঁর বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলিতে দিয়ে রাখতেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
« كَانَ خَاتِمُ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فِى هَذِهِ . وَأَشَارَ إِلَى الْخِنْصَرِ مِنْ يَدِهِ الْيُسْرَى » . (رواه مسلم).
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আংটি ব্যবহার করতেন এ আঙুলে এবং এ কথা বলে তিনি তাঁর বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলির দিকে ইঙ্গিত করেন।”
৭. এমন পোশাক পরিধান না করা, যা তার শরীরের সাথে আঁটসাঁট হয়ে লেগে থাকে এবং তাতে তার দুই হাত বের করার মত কোনো জায়গা রাখা হয় না; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের পোশাক পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। আর এক পায়ে জুতা পরে না হাঁটা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لاَيَمشِ أحَدُكُمْ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ ، لِيَنْعَلْهُمَا جَمِيعاً ، أو لِيَخْلَعْهُمَا جَمِيعاً » . (رواه مسلم).
“তোমাদের কেউ যেন এক পায়ে জুতা পরে না হাঁটে— সে যেন হয় উভয় পায়ে জুতা পরিধান করে, অথবা উভয় পা খালি রাখে।”
৮. মুসলিম পুরুষ কর্তৃক মুসলিম নারীর পোশাক এবং মুসলিম নারী কর্তৃক মুসলিম পুরুষের পোশাক পরিধান না করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা হারাম করে দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:
« لَعَنَ رسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم المُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ ، وَالمُتَرَجِّلاَتِ مِنَ النِّسَاءِ » . (رواه البخاري).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বেশধারণকারী পুরুষ এবং পুরুষের বেশধারণকারী নারীদের প্রতি লানত করেছেন।” আর আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে:
« لَعَنَ رسُولُ الله صلى الله عليه وسلم الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ المَرْأَةِ ، والمَرْأَةَ تَلْبِسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ كمَا لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم المُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بالنِّسَاءِ ، والمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بالرِّجَالِ » . (رواه أبو داود و البخاري).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর পোশাক পরিধানকারী পুরুষ এবং পুরুষের পোশাক পরিধানকারী নারীদের প্রতি লানত করেছেন। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের অনুকরণকারী পুরুষদের এবং পুরুষদের অনুকরণকারী নারীদের প্রতিও লানত করেছেন”
৯. জুতা পরিধান করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করা এবং খোলার সময় বাম দিক থেকে শুরু করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا انْتَعَلَ أحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِالْيُمْنَى ، وَإِذَا نَزَعَ فَلْيَبْدأْ بِالشِّمَالِ . لِتَكُنْ اليُمْنَى أوَّلَهُمَا تُنْعَلُ ، وَآخِرُهُمَا تُنْزَعُ » . (رواه البخاري و مسلم).
“তোমাদের কেউ যখন জুতা পরিধান করে, তখন সে যেন ডান দিক থেকে শুরু করে; আর যখন সে জুতা খুলতে চায়, তখন যেন সে বাম দিক থেকে শুরু করে। যাতে ডান দিক (জুতা) পরার দিক থেকে প্রথম হয় এবং খোলার দিক থেকে হয় শেষ।”
১০. কাপড় পরিধান করার ক্ষেত্রে ডান দিক থেকে শুরু করা; কেননা, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন:
« كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُحِبُّ التَّيَمُّنَ فِى شَأْنِهِ كُلِّهِ : فِى نَعْلَيْهِ ، وَتَرَجُّلِهِ ، وَطُهُورِهِ » . (رواه مسلم).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সকল কাজে ডান দিকে থেকে শুরু করতে পছন্দ করতেন; যেমন— জুতা পরতে, চুল-দাড়ি আঁচড়ানোতে এবং অযু করতে।”
১১. নতুন কাপড় অথবা পাগড়ী অথবা যে কোনো পোশাক পরিধান করার সময় এ দো‘য়া পাঠ করবে:
« اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أنْتَ كَسَوْتَنِيهِ ، أسْأَلكَ خَيْرَهُ وَخَيْرَ مَا صُنِعَ لَهُ ، وَأَعوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ » .
(হে আল্লাহ! তোমারই জন্য সকল প্রশংসা, তুমিই আমাকে এ কাপড় পরিয়েছ। আমি তোমার কাছে এর মধ্যকার কাল্যাণ চাচ্ছি এবং ঐ কল্যাণও প্রত্যাশা করছি তোমার কাছে, যার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি এ কাপড়ের অনিষ্টতা থেকে এবং ঐ অনিষ্টতা ও অকল্যাণ থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে)। কেননা, এ দো‘য়াটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে।
১২. তার মুসলিম ভাইকে নতুন পোশাক পরিধান করা অবস্থায় দেখলে তার জন্য এ কথা বলে দোয়া করা: " أبل و أخلق " (তুমি এটি পুরান কর ও ছিড়ে ফেল, অর্থাৎ তুমি দীর্ঘজীবী হও); কেননা, যখন উম্মু খালিদ নতুন পোশাক পরিধান করেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ কথা বলে দো‘য়া করেছেন।

* * *

চতুর্দশ অধ্যায়
স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে আদবসমূহ
মুসলিম ব্যক্তিকে প্রকৃত মুসলিমের গুণে ভূষিত হতে হলে তাকে আল্লাহর কিতাব ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ’র শিক্ষা ও দর্শনের ভিত্তিতে জীবন পরিচালিত করতে হবে; সুতরাং সে কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে জীবনযাপন করবে এবং সে অনুযায়ী তার সকল বিষয়কে রূপায়িত করবে। আর এটা করবে আল্লাহ তা‘আলা’র নির্দেশের কারণেই, তিনি বলেন:
﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ ﴾ [الاحزاب: ٣٦]
“আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ ﴾ [الحشر: ٧]
“আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে, তা থেকে বিরত থাক।” তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ » . (رواه النووي).
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশিকে আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুগামী করবে।” তিনি আরও বলেন:
« مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيهِ أمرُنا فَهُوَ رَدٌّ » . (رواه مسلم).
“যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই, সে কাজটি বাতিল বলে গণ্য হবে।” সুতরাং স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তি অবশ্যই নিম্নোক্ত আদবসমূহ রক্ষা করে চলবে, যা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী থেকে সাব্যস্ত হয়েছে, তিনি বলেন:
« الْفِطْرَةُ خَمْسٌ : الاخْتِتَانُ ، وَالاسْتِحْدَادُ ، وَقَصُّ الشَّارِبِ ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ ، وَنَتْفُ الإِبْطِ » . (رواه البخاري) .
“ফিতরাত (মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব) পাঁচটি: খাতনা করা, (নাভীর নীচে) খুর ব্যবহার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা ও বগলের পশম উপড়ে ফেলা।”
আর এসব আদবের বিবরণ নিম্নরূপ:
১. খাৎনা করা: আর খাৎনা হল চামড়ার ঐ অংশ কেটে ফেলা, যা পুরুষাঙ্গের মাথাকে ঢেকে রাখে; আর এ কাজটি শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে সম্পন্ন করা মুস্তাহাব; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমাতুয যাহরা ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র দুই ছেলে হাসান ও হোসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র খাৎনার কাজ তাদের জন্মের সপ্তম দিনে সম্পন্ন করেছেন। আর এ খাৎনার কাজটি বালেগ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিলম্বিত করে সম্পন্ন করলেও দোষণীয় হবে না; কেননা, আল্লাহর নবী ইবরাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম আশি বছর বয়সে খাৎনা করেছেন। আর হাদিসে বর্ণিত আছে, যখন কোনো ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করত, তখন তিনি তাকে বলতেন:
« أَلْقِ عَنْكَ شَعْرَ الْكُفْرِ وَاخْتَتِنْ » . (أخرجه أبو داود).
“তুমি তোমার কাফির অবস্থার চুলগুলো কেটে ফেলো এবং খাৎনা কর।”
২. গোঁফ কাটা: মুসলিম ব্যক্তি তার গোঁফ কেটে ফেলবে, যা তার ঠোটের উপর ঝুলে পড়বে। আর দাড়িকে লম্বা করবে, যতক্ষণ না তার মুখমণ্ডল পূর্ণ হবে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« جُزُّوا الشَّوَارِبَ , وَأَرْخُوا اللِّحَى , خَالِفُوا الْمَجُوسَ » . (أخرجه مسلم).
“তোমরা গোঁফ কেটে ফেল এবং দাড়ি লম্বা কর; আর (এভাবেই) তোমরা অগ্নি পূজকদের বিরুদ্ধাচরণ কর।” তিনি আরও বলেন:
« خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ , أَحْفُوا الشَّوَارِبَ , وَاعْفُوا اللِّحَى » . (متفق عليه).
“তোমরা মুশরিকদের বিপরীত করবে, তোমরা গোঁফ ছোট করবে এবং দাড়ি লম্বা রাখবে।” অর্থাৎ দাড়ি বৃদ্ধি কর; সুতরাং এ কারণে দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম; আর সে মাথার কিছু অংশের চুল মুণ্ডন করে বাকি অংশে চুল রেখে দেয়া থেকে বিরত থাকবে; কেননা, আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:
« نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنِ الْقَزَعِ » . (متفق عليه).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথার চুলের কিছু অংশ মুণ্ডন করে কিছু অংশে চুল রাখতে নিষেধ করেছেন।”
৩. অনুরূপভাবে সে তার দাড়িতে কালো রঙ করা থেকে বিরত থাকবে; কেননা, যখন আবূ বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র পিতাকে মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে আসা হল এবং সে অবস্থায় তার মাথা ছিল ধবধবে সাদা, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« اذْهَبُوا بِهِ إِلَى بَعْضِ نِسَائِهِ فَلْتُغَيِّرْهُ بِشَيْءٍ وَجَنِّبُوهُ السَّوَادَ » . (أخرجه البخاري و مسلم و أحمد).
“তোমরা তাকে কোনো নারীর নিকটে নিয়ে যাও এবং সে যেন কোনো কিছু দিয়ে তার মাথার চুলকে বদলিয়ে দেয়; আর তোমরা কালো রঙ পরিহার কর।” আর মেহেদী ও ‘কাতাম’ নামক উদ্ভিদ দ্বারা খেযাব দেয়া উত্তম।
আর মুসলিম ব্যক্তি যদি তার মাথার চুল লম্বা করে রাখে এবং তা মুণ্ডন না করে, তাহলে তেল দিয়ে ও বিন্যাস করার মাধ্যমে তার যত্ন নিবে; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ كَانَ لَهُ شَعْرٌ فَلْيُكْرِمْهُ » . (أخرجه أبو داود).
“যে ব্যক্তির চুল আছে, সে যেন তার যত্ন করে।”
৪. বগলের পশম উপড়ে ফেলা, সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি তার দুই বগলের পশম উপড়ে ফেলবে; আর যদি বগলের পশম উপড়ানো সম্ভব না হয়, তাহলে তা মুণ্ডন করে ফেলবে অথবা তাতে লোমনাশক ঔষধ বা অনুরূপ কিছু দিয়ে প্রলেপ দিবে, যাতে তা পরিষ্কার হয়ে যায়।
৫. নখ কাটা, সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি তার নখসমূহ কেটে ফেলবে; আর নখ কাটার ক্ষেত্রে তার জন্য মুস্তাহাব হল ডান হাত দিয়ে শুরু করা, তারপর বাম হাত, তারপর ডান পা, তারপর বাম পা। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে ডান দিক থেকে শুরু করতে পছন্দ করতেন।

মুসলিম ব্যক্তি এসব কিছু করবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ করার নিয়তে, যাতে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করার সাওয়াব অর্জন করতে পারে; কারণ, কর্মের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই বরাদ্দ থাকবে, যা সে নিয়ত করে।

* * *

পঞ্চদশ অধ্যায়
ঘুমানোর আদব প্রসঙ্গে

মুসলিম ব্যক্তি মনে করে— ঘুম অন্যতম নিয়ামত, যার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দগণের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمِن رَّحۡمَتِهِۦ جَعَلَ لَكُمُ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ لِتَسۡكُنُواْ فِيهِ وَلِتَبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِهِۦ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ ٧٣ ﴾ [القصص: ٧٣]
“তিনিই তাঁর দয়ায় তোমাদের জন্য করেছেন রাত ও দিন, যেন তাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার। আরও যেন তোমরা কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করতে পার।” আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَجَعَلۡنَا نَوۡمَكُمۡ سُبَاتٗا ٩ ﴾ [النبا: ٩]
“আর তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্রাম।” কারণ, দিনের কর্মব্যস্ততার পর রাতের বেলায় বান্দার বিশ্রাম তার শারীরিক প্রাণচাঞ্চল্যতা, প্রবৃদ্ধি ও উদ্যমের জন্য সহায়তা করে, যাতে সে তার কর্তব্য পালন করতে পারে, যার জন্য তাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং এ নি‘য়ামতের কৃতজ্ঞতার বিষয়টি মুসলিম ব্যক্তির কাছে জরুরি ভিত্তিতে দাবি করে, সে যাতে তার ঘুমানোর ব্যাপারে নিম্নোক্ত আদবসমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখে:
১. ‘ইলমী আলোচনা, অথবা মেহমানের সৌজন্যে কথপোকথন, অথবা পরিবারের দেখাশুনার মত কোন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এশার সালাতের পর তার ঘুমকে বিলম্বিত না করা; কেননা, আবূ বারযা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হাদিস বর্ণনা করেন:
« إنَّ رسولَ الله صلى الله عليه وسلم كان يكرهُ النَّومَ قَبْلَ العِشَاءِ والحَديثَ بَعْدَهَا » . (متفق عليه).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার সালাতের পূর্বে ঘুমানো এবং তার (এশার সালাতের) পরে কথা বলা অপছন্দ করতেন।”
২. অযু করা ছাড়া না ঘুমানোর চেষ্টা করা; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারা ইবন ‘আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
« إِذَا أَتَيْتَ مَضْجِعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءكَ للصَّلاةِ » . (متفق عليه).
“যখন তুমি ঘুমাতে যাবে, তখন অযু করে নাও, যেমনিভাবে তুমি সালাত আদায়ের জন্য অযু করে থাক।”
৩. ঘুমানোর শুরুতে তার ডান কাতে শুয়ে পড়া এবং তার ডানপাশকে বালিশরূপে ব্যবহার করা; আর পরবর্তীতে (ডান কাত থেকে) নিজেকে বাম কাতে পরিবর্তন করাতে কোন দোষ নেই। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারা ইবন ‘আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
« إِذَا أَتَيْتَ مَضْجِعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءكَ للصَّلاةِ ، ثُمَّ اضْطَجعْ عَلَى شِقِّكَ الأَيمَنِ » . (متفق عليه).
“যখন তুমি ঘুমাতে যাবে, তখন অযু করে নাও, যেমনিভাবে তুমি সালাত আদায়ের জন্য অযু করে থাক। অতঃপর ডান কাতে শুয়ে পড়ো।” তিনি আরও বলেন:
« إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ وَأَنْتَ طَاهِرٌ فَتَوَسَّدْ يَمِينَكَ » . (رواه أبو داود).
“তুমি যখন পবিত্র অবস্থায় তোমার বিছানা গ্রহণ করবে, তখন তুমি তোমার ডানপাশকে বালিশরূপে গ্রহণ কর।”
৪. রাতে অথবা দিনে ঘুমানোর সময় উপুড় হয়ে না শোয়া; কেননা, হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِنَّهَا ضِجْعَةُ أَهْلِ النَّارِ » . (رواه ابن ماجه).
“এটা জাহান্নামীদের শোয়া।” তিনি আরও বলেন:
« إِنَّهَا ضِجْعَةُ لَا يُحِبُّهَا اللَّهُ عزَّ وجلَّ » . (رواه أحمد ، والترمذى ، والحاكم).
“এটা এমন শোয়া, যা আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না।”
৫. হাদিসে বর্ণিত যিকির বা দে‘য়াসমূহ পাঠ করা; যেমন—
(ক) তেত্রিশ বার « سُبْحَانَ اللهِ ؛ وَالحَمْدُ للهِ ؛ وَاللهُ أكْبَرُ » (আল্লাহ পবিত্র, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান) বলবে; অতঃপর বলবে: « لا إلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ ؛ وَلَهُ الحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ » (আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং সকল প্রশংসাও তাঁর; আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান)। কেননা, ফাতেমা ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাদেরকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করার জন্য একজন খাদেমের আবদেন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
« أَلاَ أُعَلِّمُكُمَا خَيْرًا مِمَّا سَأَلْتُمَا ؟ إِذَا أَخَذْتُمَا مَضَاجِعَكُمَا أَنْ تُكَبِّرَا اللَّهَ أَرْبَعًا وَثَلاَثِينَ ، وَتُسَبِّحَاهُ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ ، وَتَحْمَدَاهُ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ ، فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ » . (رواه مسلم).
“তোমরা যা আবেদন করেছ, আমি কি তোমাদেরকে তার চেয়ে উত্তম কিছু শিখিয়ে দিব না? তোমরা যখন শোয়ার জন্য বিছানা গ্রহণ করবে, তখন চৌত্রিশ বার ‘আল্লাহু আকবার’ (اللهُ أكْبَرُ) বলবে, তেত্রিশ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ (سُبْحَانَ اللهِ) বলবে এবং তেত্রিশ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (الحَمْدُ للهِ) বলবে; কারণ, এটা তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।”
(খ) সূরা আল-ফাতিহা, সূরা আল-বাকারার প্রথম আয়াত থেকে " المفلحون "পর্যন্ত, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা আল-বাকারার শেষ অংশ— " لله ما في السموات "থেকে সূরার শেষ পর্যন্ত। কারণ, এ ব্যাপারে উৎসাহিত করে হাদিস বর্ণিত আছে।
(গ) শোয়ার সময় সর্বশেষ এ দে‘য়াটি পাঠ করবে, যা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত:
« بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ وَضَعْتُ جَنْبِي ، وَ بِاسْمِكَ أَرْفَعُهُ ، اللَّهُمَّ إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَاغْفِرْ لَهَا ، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ . اللَّهُمَّ إنِّي أَسْلَمْت نَفْسِي إلَيْك ، وَفَوَّضْت أَمْرِي إلَيْك ، وَأَلْجَأْت ظَهْرِي إلَيْك ، أَسْتَغْفِرُك وَأَتُوبُ إلَيْك آمَنْت بِكِتَابِك الَّذِي أَنْزَلْت ، وَبِنبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْت فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ ، وَمَا أَخَّرْتُ ، وَمَا أَسْرَرْتُ ، وَمَا أَعْلَنْتُ ، و مَا أَنْتَ أعْلَمُ به مِنِّيْ ، أنْتَ المُقدِّمُ وَ أنتَ المُؤخِّرُ ، لَا إلَهَ إلَّا أَنْتَ ، رَبِّ قِنِي عَذَابَك يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَك » .
“হে আল্লাহ! তোমার নামে আমি পার্শ্বদেশ বিছানায় রাখলাম এবং তোমার নামেই তাকে উঠাবো। হে আল্লাহ! যদি তুমি আমার প্রাণ নিয়ে নাও, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দিও; আর যদি তাকে ছেড়ে দাও, তাহলে তুমি তাকে হেফাযত কর সেই জিনিস থেকে, যা থেকে তুমি তোমার নেক বান্দাদেরকে হেফাযত করে থাক। হে আল্লাহ! আমার প্রাণ তোমার নিকট সঁপে দিয়েছি, আমার কাজ তোমার কাছে সোপর্দ করেছি এবং আমার পিঠকে তোমার আশ্রয়ে দিয়েছি; আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমার নিকট তাওবা করছি; আমি তোমার ঐ কিতাবের প্রতি ঈমান এনেছি, যা তুমি নাযিল করেছ এবং তোমার সেই নবীর প্রতি ঈমান এনেছি, যাঁকে তুমি প্রেরণ করেছ; সুতরাং তুমি আমাকে সেসব বিষয়ে ক্ষমা করে দাও, যা আমি আগে ও পরে করেছি এবং যা আমি গোপনে ও প্রকাশ্যে করেছি এবং যে বিষয়ে তুমি আমার চেয়ে বেশি ভাল জান; তুমি প্রথম ও তুমি শেষ, তুমি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই; হে আমার রব! তুমি আমাকে তোমার সে দিনের আযাব থেকে রক্ষা কর, যে দিন তুমি তোমার বান্দাদেরকে পুনরায় জীবিত করবে।”
(ঘ) ঘুমের মাঝখানে যখন সে জেগে উঠবে, তখন বলবে:
« لا إلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ ؛ وَلَهُ الحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . سُبْحَانَ اللهِ ؛ وَالحَمْدُ للهِ ؛ وَلاَ إلهَ إِلاَّ اللهُ ، وَاللهُ أكْبَرُ و لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ » .
(আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং সকল প্রশংসাও তাঁর; আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ পবিত্র, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান; আর অসৎকাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং সৎকাজ করার কারও ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ছাড়া )। আর সে যেন তার ইচ্ছামতো দো‘য়া করে; ফলে তার দো‘য়া কবুল করা হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ تَعَارَّ مِنَ اللَّيْلِ فَقَالَ حِينَ يَسْتَيْقِظُ : لا إلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ ؛ وَلَهُ الحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . سُبْحَانَ اللهِ ، وَالحَمْدُ للهِ ، وَلاَ إلهَ إِلاَّ اللهُ ، وَاللهُ أكْبَرُ و لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ ، ثُمَّ دَعَا اسْتُجِيبَ لَهُ ، فَإِنْ قَامَ فَتَوَضَّأَ ، ثُمَّ صَلَّى قُبِلَتْ صَلاَتُهُ » . (رواه البخاري و أبو داود).
“যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়, সেই ব্যক্তি জেগে উঠার সময় বলবে:
« لا إلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ ؛ وَلَهُ الحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . سُبْحَانَ اللهِ ؛ وَالحَمْدُ للهِ ؛ وَلاَ إلهَ إِلاَّ اللهُ ، وَاللهُ أكْبَرُ و لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ » .
(অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং সকল প্রশংসাও তাঁর; আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ পবিত্র, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান; আর অসৎকাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং সৎকাজ করার কারও ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ছাড়া); অতঃপর দো‘য়া করবে, তার দো‘য়া কবুল করা হবে। আর যদি সে রাত জাগে, তাহলে অযু করবে, তারপর সালাত আদায় করবে, তবে তার সালাত কবুল করা হবে।” অথবা সে (রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হলে) বলবে:
« لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ ، أَسْتَغْفِرُكَ لِذَنْبِى ، وَأَسْأَلُكَ رَحْمَتَكَ ، اللَّهُمَّ زِدْنِى عِلْمًا ، وَلاَ تُزِغْ قَلْبِى بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنِى ، وَهَبْ لِى مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ، إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ » . (رواه أبو داود).
“তুমি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই; হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র; আমি তোমার কাছে আমার গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমার নিকট তোমার রহমত চাই; হে আল্লাহ! তুমি আমার জ্ঞানকে বৃদ্ধি করে দাও; আর তুমি আমাকে হেদায়াত দান করার পর আমার অন্তরকে বক্র করে দিয়ো না; আর তোমার নিকট থেকে আমাকে রহমত দান কর; নিশ্চয়ই তুমি দানশীল।”
৬. ঘুমন্ত ব্যক্তি যখন সকাল বেলায় উপনীত হবে, তখন নিম্নোক্ত যিকির বা দো‘য়াসমুহ পাঠ করবে:
(ক) ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে বিছানা থেকে উঠার পূর্বে বলবে:
« الْحَمْدُ للهِ الَّذِي أحْيَانَا بَعْدَمَا أمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُشُورُ » .
“সকল প্রশংসা সে আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে মৃত্যু দান করার পর পুনরায় জীবন দান করেছেন; আর তাঁরই নিকট (আমাদেরকে) ফিরে যেতে হবে।”
(খ) যখন সে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করার জন্য ঘুম থেকে উঠবে, তখন সে আকাশের দিকে তাকাবে এবং " إن في خلق السموات و الأرض "থেকে সূরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করবে; কেননা, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন:
« لَمَّا بِتُّ عِنْدَ خَالتِيْ مَيْمُونَةَ زَوْجِ الرَّسُوْلِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى إِذَا انْتَصَفَ اللَّيْلُ أَوْ قَبْلَهُ بِقَلِيلٍ ، أَوْ بَعْدَهُ بِقَلِيلٍ ، اسْتَيْقَظَ ، فَجَعَلَ يَمْسَحُ النَّوْمَ عَنْ وَجْهِهِ بِيَدَيْهِ ، ثُمَّ قَرَأَ الْعَشْرَ الآيَاتِ الخَوَاتِمَ مِنْ سُورَةِ آلِ عِمْرَانَ ، ثُمَّ قَامَ إِلَى شَنٍّ مُعَلَّقَةٍ ، فَتَوَضَّأَ مِنْهَا ، فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ ، ثُمَّ قَامَ يُصَلِّي » .
“যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আমার খালা মাইমুনা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার নিকট রাত্রি যাপন করি, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্ধরাত্রি কিংবা এর সামন্য পূর্ব অথবা সামান্য পর পর্যন্ত ঘুমালেন। তারপর তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন এবং দুই হাত দিয়ে মুখ থেকে ঘুমের আবেশ মুছতে লাগলেন; অতঃপর সূরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করলেন। তারপর ঝুলন্ত একটি পুরাতন মশকের কাছে গেলেন এবং তা থেকে সুন্দরভাবে অযু করলেন। এরপর সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন।”
(গ) চারবার এ দো‘য়া পাঠ করবে:
« اللهمَّ إني أصبَحتُ بِحَمْدكَ أُشْهِدكَ وأُشْهِدُ حَمَلَةَ عَرْشِكَ ، وَمَلائِكَتَكَ ، وَجَمِيعَ خَلْقِكَ أَنَّكَ أَنْتَ اللهُ لا إِله إلا أنتَ ، وأَنَّ مُحمَّدا عَبْدُكَ ورَسولُكَ » .
(হে আল্লাহ! আমি তোমার প্রশংসাসহ সকাল বেলায় উপনীত হয়েছে, আমি সাক্ষী বানিয়েছি তোমাকে, তোমার আরশ বহনকারী ফেরেশ্তাদেরকে, তোমার সকল ফেরেশ্তাকে এবং তোমার সকল সৃষ্টিকে; নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহ, তুমি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই; আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার বান্দা ও রাসূল)। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« مَنْ قالها مَرَّةً أَعتَقَ اللهُ رُبُعَهُ مِنَ النارِ ، ومن قالها مَرَّتَين أَعتَقَ اللهُ نِصْفَه مِنَ النَّارِ ، فَمن قالها ثلاثا أَعْتَقَ اللهُ ثلاثةَ أربِاعِهِ مِنَ النَّارِ ، فَإِنْ قَالَهَا أَرْبَعًا أَعْتَقَهُ اللَّهُ مِنَ النَّارِ » . (رواه أبو داود).
“যে ব্যক্তি তা (উপরিউক্ত দো‘য়াটি) একবার পাঠ করবে, আল্লাহ তার এক-চতুর্থাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিবেন; আর যে ব্যক্তি তা তিনবার পাঠ করবে, আল্লাহ তার তিন-চতুর্থাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিবেন; আর যে ব্যক্তি তা চারবার পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে পুরাপুরিভাবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দিবেন।”
(ঘ) ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য যখন সে দরজার চৌকাঠে পা রাখবে, তখন বলবে:
« بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلتُ عَلَى اللهِ ، لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ » .
(আল্লাহর নামে বের হচ্ছি এবং তাঁর উপর ভরসা করছি। আর অসৎকাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং সৎকাজ করার কারও ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ছাড়া)। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إِذَا قَالَ العَبْدُ هذَا ، قِيْلَ لَهُ : هُدِيتَ وَكُفِيتَ » . (رواه الترمذي).
“যখন কোনো বান্দা (উপরিউক্ত) এই দো‘য়াটি পাঠ করবে, তখন তাকে বলা হবে: ‘তোমাকে হেদায়াত দেয়া হয়েছে এবং তোমাকে যথেষ্ট দেয়া হয়েছে।”
(ঙ) যখন দরজার চৌকাঠ ছেড়ে যাবে, তখন বলবে:
« اللَّهُمَّ إِنِّي أعُوذُ بِكَ أنْ أضِلَّ أَوْ أُضَلَّ ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ ، أَوْ أظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ ، أَوْ أجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ »
(হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই অথবা আমাকে পথভ্রষ্ট করা না হয়; অথবা আমি যেন দীন থেকে সরে না যাই অথবা আমাকে দীন থেকে সরিয়ে দেয়া না হয়; অথবা আমি যেন কারও উপর যুলুম না করি অথবা আমার উপর যুলুম করা না হয়)। কারণ, উম্মু সালমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন:
« مَا خَرَجَ رسولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ بَيْتِى قَطُّ إِلاَّ رَفَعَ طَرْفَهُ إِلَى السَّمَاءِ وَ قَالَ : « اللَّهُمَّ إِنِّي أعُوذُ بِكَ أنْ أضِلَّ أَوْ أُضَلَّ ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ ، أَوْ أظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ ، أَوْ أجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ » . (رواه أبو داود).
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই আমার ঘর থেকে বের হতেন, তখন তিনি আকাশের দিকে তাকাতেন এবং বলতেন:
« اللَّهُمَّ إِنِّي أعُوذُ بِكَ أنْ أضِلَّ أَوْ أُضَلَّ ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ ، أَوْ أظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ ، أَوْ أجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ »
(অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই অথবা আমাকে পথভ্রষ্ট করা না হয়; অথবা আমি যেন দীন থেকে সরে না যাই অথবা আমাকে দীন থেকে সরিয়ে দেয়া না হয়; অথবা আমি যেন কারও উপর যুলুম না করি অথবা আমার উপর যুলুম করা না হয়)।”
* * *

পরিশিষ্ট
আল-হামদুলিল্লাহ, যাঁর অসীম অনুগ্রহে আমরা মুসলিম জীবনের আদব-কায়দা’র নানা দিক নিয়ে পনেরটি অধ্যায়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছি। আসলে আদব-কায়দা হলো মুসলিম জীবনের অলংকার; সুতরাং যে ব্যক্তি তার জীবনে যত বেশি ইসলামী আদব তথা শিষ্টাচারের সমাবেশ ঘটাতে পারবে, তার জীবন তত বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে এবং পরকালীন জীবনে তার নিশ্চিত সফলতা তো থাকছেই।
এ গ্রন্থে আলোচিত কিছু আদব আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট; এসব আদব যথাযথভাবে রক্ষা করে চলা মুসলিম ব্যক্তির ঈমানী দায়িত্ব এবং তার ব্যতিক্রম করলে তার ঈমানের ব্যাপারে প্রশ্ন উঠবে! তাছাড়া আরও যেসব আদব বিভিন্ন অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে, সেগুলো একজন মুসলিম ব্যক্তি যথাযথভাবে পালন করতে পারলে সে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে শরী‘য়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ অনেক কর্মকাণ্ড থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং পাশাপাশি শরী‘য়ত প্রবর্তক কর্তৃক নির্দেশিত অনেক আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হবে; আর এ সুবাদে একদিকে সে দুনিয়ার জীবনে একজন ভদ্র ও সভ্য মানুষ হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অপরদিকে পরকালীন জীবনে আল্লাহ তা‘আলার গ্রহণযোগ্য ও প্রিয় বান্দার কাতারে শামিল হয়ে চূড়ান্ত সফলতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর দেখানো পথে চলার তাওফীক দিন। আমীন! ছুম্মা আমীন!!
যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা গ্রন্থটি লিপিবদ্ধ করাটাকে সহজ করে দিয়েছেন, তাঁর জন্য প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকল প্রশংসা নিবেদিত। আর তার জন্য রয়েছে সার্বক্ষণিক প্রশংসা।
و سبحانك اللهم و بحمدك نشهد أن لا إله إلا أنت نستغفرك و نتوب إليك .
(হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র, তোমার জন্য প্রশংসা; আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তোমরা নিকট তাওবা করি)।
* * *
গ্রন্থপঞ্জি
১. আল-কুরআনুল কারীম
২. আন-নাসায়ী, আস-সুনান
৩. আল-বুখারী, আল-জামে আস-সহীহ
৪. আল-হাকেম, আল-মুস্তাদরাক
৫. আল-গাযালী, এহইয়াউ ‘উলুমিদ দীন [আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ]।
৬. আবূ দাউদ, আস-সুনান
৭. আবূ বকর আল-জাযায়েরী, মিনহাজুল মুসলিম
৮. ইবন মাজাহ, আস-সুনান
৯. ইমাম আহামদ, আল-মুসনাদ
১০. ইমাম নবুবী, রিয়াদুস্ সালেহীন
১১. ইমাম নববী, আল-আরবা‘উন
১২. ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান
১৩. ইমাম মালিক, আল-মুয়াত্তা
১৪. ইবন হিব্বান, আস-সহীহ
১৫. মুসলিম ইবন হাজ্জাজ, আস-সহীহ
১৬. ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, আল মুনীর আরবী-বাংলা অভিধান
১৭. সম্পাদনা পরিষদ, বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান
১৮. সম্পাদনা পরিষদ, আল-মু‘জাম আল-ওসীত
১৯. — আখলাকু আহলিল কুরআন [আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ]।
২০. বিবিধ গ্রন্থ, [আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ]।
* * *
সূচীপত্র

ভূমিকা
প্রথম অধ্যায়: আদব-কায়দা’র পরিচয়, গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১. আদব-কায়দা’র পরিচয়
২. আদব-কায়দা’র গুরুত্ব ও তাৎপর্য
দ্বিতীয় অধ্যায়: নিয়তের আদবসমূহ
তৃতীয় অধ্যায়: আল্লাহ তা‘আলার সাথে মুসলিম বান্দার আদব
চতুর্থ অধ্যায়: আল্লাহর বাণী ‘আল-কুরআনুল কারীম’-এর সাথে বান্দার আদব
পঞ্চম অধ্যায়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুমিন বান্দার আদব
ষষ্ঠ অধ্যায়: স্বীয় নাফসের সাথে মুসলিম বান্দার আদবসমূহ
(ক) তাওবা (التوبة )
(খ) মুরাকাবা (المراقبة )
(গ) মুহাসাবা (المحاسبة )
(ঘ) মুজাহাদা (المجاهدة )
সপ্তম অধ্যায়: মানুষ তথা সৃষ্টির সাথে আদব
(ক) পিতামাতার সাথে আদব
(খ) সন্তানসন্ততির সাথে আদব
(গ) ভাই-বোনের সাথে আদব
(ঘ) স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যকার আদব
প্রথমত: স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার
দ্বিতীয়ত: স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার
(ঘ) নিকটাত্মীয়দের সাথে আদব
(ঙ) প্রতিবেশীদের সাথে আদব
(চ) মুসলিম জাতির পরস্পরের মধ্যকার আদব ও অধিকারসমূহ
(ছ) কাফিরের সাথে আচরণ
(জ) জীবজন্তুর সাথে আচরণ
অষ্টম অধ্যায়: দীনী ভাইদের সাথে আদব এবং আল্লাহর জন্য তাদেরকে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা
নবম অধ্যায়: বসার ও মাজলিসের আদবসমূহ
দশম অধ্যায়: পানাহারের আদবসমূহ
(ক) খাওয়ার পূর্বের আদবসমূহ
(খ) খাওয়ার মধ্যকার সময়ের আদবসমূহ
(গ) খাওয়ার পরের আদবসমূহ
একাদশ অধ্যায়: যিয়াফত তথা আপ্যায়নের আদবসমূহ
(ক) যিয়াফতের জন্য আমন্ত্রণের আদবসমূহ
(খ) দাওয়াত গ্রহণের আদবসমূহ
(গ) দাওয়াতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার আদবসমূহ
দ্বাদশ অধ্যায়: সফরের আদব প্রসঙ্গে
তৃয়োদশ অধ্যায়: পোশাক-পরিচ্ছদের আদব প্রসঙ্গে
চতুর্দশ অধ্যায়: স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে আদবসমূহ
পঞ্চদশ অধ্যায়: ঘুমানোর আদব প্রসঙ্গে
পরিশিষ্ট
গ্রন্থপঞ্জি
সূচীপত্র
* * *

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.