| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইসলাম হাউস
তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।
‘হিযবুল্লাহ’ সম্পর্কে কী জানেন?
আলী আস-সাদিক
অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
হিযবুল্লাহ সম্পর্কে কী জানেন?
ভূমিকা:
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি উভয় জগতের প্রতিপালক। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বোত্তম নবী ও রাসূল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পরিবার ও সকল সাথীর উপর। অতঃপর:
বর্তমান শিয়া-রাফেযীরা মুসলিম উম্মার ত্রাতা বনেছে, যাদের ধর্ম আহলে বায়তের কথিত মহব্বতে সীমালঙ্ঘন করা, কুরআনুল কারিমে বিকৃতিতে বিশ্বাস করা, সাহাবিদের অভিসম্পাত করা, উম্মুল মোমেনিন বা সকল মুমিনের মা রাসূলের স্ত্রীদের উপর অপবাদ আরোপ করা, পূর্বপুরুষদের [সাহাবিদের] লানত করা, রাত-দিন তাদের থেকে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেওয়া ও মুসলিম জাতির সাথে প্রতারণা করা। তারা আজও প্রতারণাপূর্ণ নাম ‘হিযবুল্লাহ’ ও তার মিথ্যা শ্লোগানের আড়ালে মুসলিমদের গালমন্দ করে বিশ্বসভাকে জানান দিচ্ছে যে, তারাই মুসলিম উম্মার ত্রাতা ও অভিভাবক। অনেক নাদান মুসলিমকে আমরা জানি, যারা লেবাননি শিয়া সংগঠন ‘হিযবুল্লাহ’র আসল স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ, বরং ধোঁকায় লিপ্ত। তাদের কারো অজ্ঞতা এতো প্রকট যে, তারা ‘হিযবুল্লাহ’র প্রধান হাসান নাসরুল্লাকে হিরো জ্ঞান করে, তাকে বাহবা দিয়ে তার মাথায়-হাতে চুমু খায় ও খেতে বলে। তারা হিযবুল্লাহ, হিযবুল্লাহর উদ্দেশ্য, হিযবুল্লাহর আকিদা ও নিষ্পাপ মানুষের রক্তে রঞ্জিত তার কালো ইতিহাস সম্পর্কে চরম অন্ধকারে কোনো সন্দেহ নেই। ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, তিনি যথাযথ বলেছেন:
“নিশ্চয় ইসলামের বন্ধনগুলো একটি একটি করে খুলে যাবে, যখন ইসলামে এমন লোক প্রবেশ করবে, যে জাহিলিয়াত সম্পর্কে জানে না”।
আমরা যখন হিযবুল্লাহ ও তার প্রধান সম্পর্কে স্তুতি ও গুণগান শ্রবণ করি, তখন মনে পড়ে সে সময়ের কথা, যখন খোমেনি ইরানকে [শিয়াদের ধারণায়] ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’! ঘোষণা করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও বিদ্রোহে অবতীর্ণ হয়েছিল। কতক আহলে সুন্নাহ তার বাগ্মীতাপূর্ণ কথায় ধোঁকা খেয়েছে। একটি [শিয়া] রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দরুন কেউ দূর ইরান সফর করে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তারা মনে করেছিল খোমেনি ইসলামি হুকুমত কায়েম করবে, কিন্তু তাদের মনে করা মিথ্যা প্রমাণিত হল, যখন তারা চাক্ষুষ দেখল, বিশ্বও প্রত্যক্ষ করল তার লক্ষ্য একটি শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করা, তার প্রধান অভিপ্রায় ও চূড়ান্ত প্রস্তুতি ইসলামি বিশ্বে শিয়া মতবাদের বিস্তার ঘটানো।
একটি বিষয় স্পষ্ট না করলেই নয়, ইসরাইল নামক ইয়াহূদী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মুসলিম উম্মার শরীরে একটি বিষ ফোঁড়া বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের শরীর ও সম্পদের বিয়োগ, ধ্বংস ও অনিষ্টের কারণে আমরা খুশি হই ও স্বস্তি বোধ করি, যতটুকুন হোক।
ইয়াহূদীরা নবী-রাসূলদের ঘাতক ও তাদের দুশমন। তাদের কালো ইতিহাসের পাঠকমাত্র জানেন তাদের লাঞ্ছনার জীবন ও মুসলিম উম্মার বিরুদ্ধে যুগে যুগে তাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র, তবে এ পর্যন্ত জেনে বাস্তবতা ভুলে যাওয়া নিরাপদ নয়, অত্র ভূ-খণ্ডে শিয়া ইরানিদের কুমতলব সম্পর্কে জানাও জরুরি। তারা ইসরাইল প্রতিরোধের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও ফিলিস্তিন মুক্ত করার প্রতারণার লেবাসে ইরান থেকে শুরু করে ইরাককে ক্ষতবিক্ষত করে লেবানন পৌঁছেছে।
তাই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে হিযবুল্লাহ নামক মুনাফিকদের সম্পর্কে কতিপয় প্রশ্নের উত্তর লেখার মনস্থ করি, যেন তাদের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায় ও মুসলিম উম্মার সামনে তাদের মুখোশ খসে পড়ে। পুস্তকের শুরুতে সর্বপ্রথম আমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছি, অতঃপর লেবানন সফরে অর্জিত আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন কিতাব ও লেখনী থেকে লব্দ জ্ঞানের উপর নির্ভর করছি।
এ কিতাব লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর নিকট কৈফিয়ত পেশ করা, দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া ও মুসলিম উম্মার জন্য কল্যাণ কামনা করা, কারণ মুসলিম উম্মার অনেক সদস্য হিযবুল্লাহর প্রকৃত স্বরূপ ও তার আসল চেহারা সম্পর্কে অজ্ঞ, বরং ধোঁকায় পতিত।
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি মুসলিমদের অবস্থা শুধরে দিন, দীনের সহি বুঝ দান করুন, কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র থেকে তাদেরকে হিফাজত করুন। আল্লাহ তাদের নেতৃবর্গ ও আলেমদের সকল প্রকার কল্যাণের তৌফিক দিন। আহলে-সুন্নাহ ও সুন্নত অনুসারীদের সাহায্য করুন, বিদ‘আত ও বিদ‘আতিদের ধ্বংস করুন। সত্যকে সত্য হিসেবে বুঝা ও তার অনুসরণ করার তৌফিক দিন এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে বুঝা ও তার থেকে বেচে থাকার তৌফিক দিন। আল্লাহর তৌফিক ব্যতীত আমার কোনো সাধ্য নেই।
সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত ব্যক্তিত্ব, আমাদের নবী ও আদর্শ, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ এবং তার পরিবার ও সকল সাথীর উপর।
আলী আস-সাদিক
[email protected]
শিয়া সংগঠন ‘হিযবুল্লাহ’ লেবাননির প্রতিষ্ঠাকাল
লেবাননের শিয়া সংগঠন ‘হিযবুল্লাহ’র প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৮২-ই. সনে, তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার অনুপ্রবেশ ঘটে ১৯৮৫-ই. সালে। ইরানের মদদপুষ্ট সংগঠন حركة أمل الشيعية اللبنانية [লেবাননি শিয়াদের স্বার্থ বাস্তবায়নকারী আন্দোলন] থেকে ‘হিযবুল্লাহ’র জন্ম। প্রথমে মূল সংগঠনের নামানুসারে হিযবুল্লাহর নামকরণ করা হয় حركة أمل الشيعية [শিয়াদের স্বার্থ বাস্তবায়নকারী আন্দোলন]। অতঃপর বৃহৎ লক্ষ্যে এ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়أمل الإسلامية [ইসলামি স্বার্থ বাস্তবায়নাকরী আন্দোলন], যেন শিয়া সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে সমগ্র মুসলিম উম্মাকে তাতে শামিল করা যায়। কারণ حركة أمل الشيعية এর তৎপরতা লেবাননি শিয়াদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ ছিল, তাকে ব্যাপক করে ‘আমালুল ইসলামিয়াহ’ নামকরণ করা হয়, যেন লেবানন ও অন্যান্য মুসলিম দেশে শিয়া মতবাদ প্রচারে ‘আমালুল ইসলামিয়া’কে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এ জন্য তারা জিহাদি গ্রুপের আকৃতি ধারণ করে, যেন মানুষ বোঝে তাদের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহ থেকে ইয়াহূদী আগ্রাসন প্রতিরোধ করা ও ইসলামের পবিত্র ভূমিসমূহ সংরক্ষণ করা।
তবে অতীতে আহলে সুন্নার উপর حركة أمل الشيعية যে ঘৃণ্য নির্যাতন ও আক্রমণ পরিচালনা করেছে, যার কালো দাগ এখনো মানুষ ভুলেনি, তার থেকে জন্ম নেওয়া ‘আমালুল ইসলামিয়া’ মুসলিম উম্মাহ থেকে বিদেশী [বিশেষ করে ইয়াহূদী] আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে কারো বিশ্বাস হয়নি। এটা নতুন নামে পুরনো কার্য সম্পাদন করার ফন্দি সবাই বুঝে গেছে। এ থেকে সম্পূর্ণ নতুন নামে অপর একটি সংগঠনের জন্ম দেওয়া হল, যা বর্তমান ‘হিযবুল্লাহ’ নামে প্রসিদ্ধ”।
নাম পরিবর্তন করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোককে হিরো বানানো হল। সংবাদ পত্রগুলো কতক কপট বীর বাহাদুর আবিষ্কার করল, যারা গতকালও সুন্নি মুসলিমদের উপর নিধনযজ্ঞ পরিচালনা করেছে। দক্ষিণ বৈরুতে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির “বারাজানাহ ক্যাম্পে” নিরীহ নিরপরাধ নিরস্ত্র সুন্নি মুসলিমদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে। হলুদ সাংবাদিকতার কল্যাণে তারাই আজ বীর মুজাহিদ!
সন্দেহ নেই, হিযবুল্লাহ বিদেশী আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে এরূপ কল্পনা করা দিবাস্বপ্ন বৈ কিছু নয়, কারণ হিযবুল্লাহ মঞ্চে সাজানো শিয়াদের একটি নাটক, যা ব্যক্তি থেকে সমষ্টি পর্যায়ে সকল উম্মতের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য। বিশেষ করে যেসব মুসলিম দীন বোঝে না, সহি আকিদা বোঝে না, ইতিহাস পড়ে না, বরং মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারী পত্র-পত্রিকার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়; বিশুদ্ধ জ্ঞান, বাস্তব ঘটনা ও সঠিক তথ্যের উপর নির্ভর করে না, তারাই হিযবুল্লাহর প্রধান টার্গেট।
এভাবেই ‘হিযবুল্লাহ’র জন্ম, যার উদ্দেশ্য أمل الشيعية থেকে আরো ব্যাপক আকারে মুসলিম উম্মার উপর ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করা, কারণ ‘আমালে শিয়া’র কাজ ছিল রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতার আচ্ছাদনে শিয়া সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করা, কিন্তু হিযবুল্লাহর পরিধি তার চেয়েও বিস্তর। পরবর্তীতে মুসলিম উম্মার উপর হিযবুল্লাহর ক্ষোভ, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ‘হরকতে আমাল’ ও ‘হিযবুল্লাহ’ একই মুদ্রার এপিট ওপিট। তারা ক্ষোভে আহলে সুন্নার উপর দাঁত কিড়মিড় করে।
‘হরকতে আমাল’ ও তার প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচয়
[উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল, ‘হরকতে আমাল’ থেকে হিযবুল্লাহর জন্ম। হরকতে আমালের সদস্যরাই তার প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক। তাই হিযবুল্লাহর আলোচনার পূর্বে ‘হরকতে আমাল’ ও তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে জানা জরুরি।]
‘হরকতে আমালে’র প্রতিষ্ঠাতা ইরানি বংশোদ্ভব মুসা সদর ১৯২৮ই. তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তেহরান ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫৮ই. সালে তিনি লেবানন যান। এক সরকারি অনুষ্ঠানে ফুয়াদ শিহাব তাকে লেবাননের নাগরিকত্ব প্রদান করেন, ফলে সে তার নাগরিকত্ব লাভ করে, যদিও সে ইরানের সন্তান ইরানি।
তিনি ছিলেন খোমেনির ছাত্র। খোমেনির সাথে তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তারা উভয়ে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। মুসা সদরের ভাগ্নির পাণি গ্রহণ করে খোমেনির ছেলে আহমদ। আবার খোমেনির নাতনির পাণি গ্রহণ করে মুসা সদরের ভাগিনা মুরতাজা তাবাতাবায়ি।
‘মুসা সদর’ দক্ষিণ লেবানন, বৈরুত ও বেক্কা প্রদেশে ‘হরকতে আমাল’ নামে একটি সশস্ত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রথমে দেশের জাতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিল।
সিরিয়ার কোনো ‘নুসাইরি ’ প্রতিনিধি লেবাননে আগমন করলে ‘মুসা সদর’ তার ডান হাত হয়ে কাজ করত। সিরিয়ার নুসাইরি সেনাবাহিনী যখন লেবাননে প্রবেশ করে, তখন ‘মুসা সদর’ দেশ প্রেমিক ইসলামি ব্যক্তিত্ব থেকে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ এজেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অতঃপর সে নিম্নের কাজগুলো দ্রুত সম্পাদন করে:
১. মুসা সদর নিজের অনুগত এক সেনা অফিসারকে আদেশ করেন, ফলে সে লেবাননি এরাবিক জাতীয় সেনাবাহিনী থেকে পৃথক হয়ে সিরিয়ার সাথে মিলে নতুন এক বাহিনী গঠন করেন। অনুরূপ অপর সেনা অফিসার আহমদ মিমারি উত্তর লেবাননে লেবাননি এরাবিক সেনাবাহিনী থেকে পৃথক হয়ে সিরিয়ার নুসাইরি সেনাবাহিনীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। ইতোপূর্বে খ্রিস্টান ক্যাথলিক শাখাভুক্ত ‘মুওয়ারানা’ সম্প্রদায়ের আতঙ্কের কারণ ছিল লেবাননি এরাবিক ফোর্স, কিন্তু মুসা সদরের এ কাণ্ডের কারণে তাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, কারণ ইবরাহিম শাহিন ও অন্যান্য শিয়া সেনা অফিসারদের থেকে আভ্যন্তরীণ এ বিপদের আশঙ্কা তারা কখনো করেনি। অতঃপর মুসা সদর ‘হরকতে আমালে’র সদস্যদের নির্দেশ করেন যেন তারা জাতীয় সেনাবাহিনী থেকে পৃথক হয়ে সশস্ত্র যোদ্ধাদের সাথে যোগ দেয়। তারপর থেকে ‘মুসা সদর’ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন ও সংস্থাসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
২. ৫/৮/১৯৭৬ই. সালে ফ্রান্সের এক সংবাদ সংস্থা থেকে জানা যায়, সিরিয়ান নুসাইরি সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণাধীন লেবাননের যেসব এলাকা রয়েছে, তাতে স্থানীয় সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে ‘মুসা সদর’ রোমের অর্থোডক্স, ক্যাথলিক খ্রিস্টান, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের অপর গ্রুপ ‘মুওয়ারানা’ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও লেবাননের বেক্কা প্রদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে রিয়াক এয়ার ফোর্সের হলরুমে এক বৈঠকে বসেন।
তারপর থেকে ‘মুসা সদর’ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোকে দমন করা আরম্ভ করেন, দেখুন ১২/৮/১৯৭৬ই. তারিখের ফ্রান্সের সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোকে সে অপবাদ দেয় যে, তারা এরাবিক গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে, যার প্রথম সারিতে আছে লেবাননের সংবিধান। তার নিকট ইয়াহূদী আগ্রাসন বিরোধী ফিলিস্তিনি মুসলিমরা একটি সমস্যা, যারা ফিলিস্তিন ও লেবাননকে ইসরাইল মুক্ত করতে চায়, সে তার অনুগত শিয়াদের ফিলিস্তিনি সমস্যা মোকাবিলার আহ্বান জানায়।
ফিলিস্তিনিদের উপর মুসা সদরের অত্যাচার ছিল পীড়াদায়ক, স্বাধীনতাকামী একনেতা কায়রোতে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, মুসা সদর খ্রিস্টান মুওয়ারানা গোষ্ঠী ও সিরিয়া সরকারের সাথে মিলে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
মুসা সদর ও তার দল সিরিয়া সরকারকে শুধু সহযোগিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং দাবিও জানিয়েছে যে, ফিলিস্তিনিদের আত্মঘাতী হামলা বন্ধ করা হোক এবং তাদেরকে দক্ষিণ লেবানন থেকে বহিষ্কার করা হোক, এ জন্য দফায় দফায় সংঘর্ষও বাঁধে তার অনুগতদের সাথে। তারা ‘সায়দা’ নগরীতে সর্বাত্মক ধর্মঘট করে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র যোদ্ধাদের (মুজাহিদদের) দক্ষিণ লেবানন থেকে বিতাড়িত করার দাবি জানায়।
ফিলিস্তিনি মুজাহিদদের বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে মুসা সদরই সর্বপ্রথম দক্ষিণ লেবাননে ক্যাম্প তৈরির জন্য সরকারী জরুরি ফোর্স তলব করে, যেন ফিলিস্তিনিরা এতে জড়ো না হতে পারে এবং এখান থেকে ইসরাইল বিরোধী কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা না হয়। মুসা সদরের দাবি হচ্ছে, লেবাননের সাথে ইসরাইলের শান্তি চুক্তি রয়েছে, যা কোনোভাবেই ফিলিস্তিনিরা ভঙ্গ করতে পারে না।
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার এক সেনা অফিসার বলেন: “ইসরাইল ও লেবাননি শিয়াদের মাঝে সাক্ষরিত চুক্তি মোতাবেক নিরাপদ এলাকার শর্ত নেই, যেখানে ফিলিস্তিনিদের উপর হামলা করা যাবে না। আমরা তাদের স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদের সাথে আমাদের একপ্রকার সমঝোতা রয়েছে, যেভাবে হোক ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব নিঃশেষ করতে হবে, যাদের কারণে হামাস ও জিহাদি গ্রুপগুলো এখনো টিকে আছে”।
মুসা সদর সবচেয়ে বেশী কাজ করে সিরিয়ার নুসাইরি সরকারের সাথে। এক সরকারী প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর লেবাননের নুসাইরি সম্প্রদায় তার কারণে শিয়া ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে, সে তাদের জন্য একজন শিয়া জাফরি মুফতি নিয়োগ দিয়েছে। আবার যখন হাফেয আল-আসাদের পিতার মৃত্যুর সময় হল, সিরিয়ার সরকার মুসা সদরকে ডেকে পাঠালো। সে তার পিতাকে কতক মন্ত্র পাঠ করাল, যা তাদের মৃতদের মুমূর্ষু অবস্থায় পাঠ করানো হয়।
লেবাননি এরাবিক সেনাবাহিনী ও লেবাননে অবস্থিত ফিলিস্তিনি সশস্ত্র যোদ্ধারা যখন কোনো যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, শিয়াদের সামনে তারা নিজেদের পিঠ অরক্ষিত পায়। উদাহরণত যখন তারা বালাবাক্কা ও হারমালের নিকটস্থ এলাকায় নুসাইরিদের সাথে যুদ্ধে মশগুল ছিল, তখন শিয়া জাফরি মুফতি সুলাইমান ইয়াফুঈ গিয়ে নুসাইরিদের সাথে মিলে এবং তাদের নেতৃত্ব দিয়ে অসহায় ও নিরস্ত্র মুসলিমদের মাড়িয়ে বিজয় বেশে বালাবাক্কায় প্রবেশ করে।
মুসা সদর এতেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সে ‘হরকতে আমালে’র নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ করেছে যে, তারা বৈরুতের ‘নাবা’ ও ‘শিয়াহ’ এলাকায় মুওয়ারানা খ্রিস্টানদের প্রতিরোধ করবে না। তার এ কথার অর্থ বৈরুতের শিয়া অধ্যুষিত এলাকা সে মুওয়ারানাদের নিকট লিজ দিয়েছে, সেখান থেকে তারা যেভাবে ইচ্ছা সুন্নি মুসলিমদের হত্যা করবে, বন্দী করবে। সে একসময় বলত: “অস্ত্র পুরুষের সৌন্দর্য, নিশ্চয় আমরা বদলে দেওয়ার দল, আমাদের আন্দোলন কারবালার বালুতে মিশে যায়নি”।
১৪০৫হি. রমদানে أمل الشيعية সংগঠন বৈরুতে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারীদের সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। এতে তারা সবধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে, পূর্ণ মাস তারা নিধনযজ্ঞ অব্যাহত রাখে, যতক্ষণ না শরণার্থীরা দামেস্কের তৎকালীন শাসক হাফেজ আসাদ ও তার বৈরুত প্রতিনিধি ‘নবীহ বারি’র সকল শর্ত মেনে নিয়েছে, তাদের উপর থেকে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ হয়নি।
২০/৫/১৯৮৫হি. সোমবার রমদানের প্রথম রাতে শরণার্থী শিবিরে হামলা শুরু হয়। ‘হরকতে আমালে’র মিলিশিয়ারা ‘সাবরা’ ও ‘শাতিলা’ নামক দু’টি ফিলিস্তিনি শিবিরে হামলা করে। অতঃপর গাজার হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের ধরে ‘আমালে’র স্থানীয় অফিস জালুল-এ নিয়ে আসে। শিয়া যোদ্ধারা কয়েকটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যেমন রেড ক্রিসেন্ট ও রেড ক্রস সংস্থার চিকিৎসার সরঞ্জামাদি বহনকারী এম্বুলেন্সকে শরণার্থী শিবিরে প্রবেশে বাঁধা দেয়, হাসপাতাল থেকে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়।
২০/৫/১৯৮৫ই. সোমবার ভোর পাঁচটায় ‘সাবরা’ শরণার্থী শিবির কামানের গোলা ও বন্দুকের গুলির শিকার হয়। একই দিন সকাল সাতটায় ‘বুরজুল বারাজেনাহ’ শরণার্থী শিবিরেও তার বিস্তার ঘটে। যখন ‘হরকতে আমালে’র নৃশংস হামলা নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে শিকার করছিল, তখন ‘নবীহ বারিহ’ লেবাননের ষষ্ঠ ব্রিগেডকে নির্দেশ করল আহলে সুন্নার বিপক্ষে ‘আমালে’র যোদ্ধাদের সাহায্য কর। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ষষ্ঠ ব্রিগেড এসে চতুর্দিক থেকে ‘বুরজুল বারাজেনাহ’ শিবিরে গোলা বর্ষণ শুরু করল।
উল্লেখ্য যে, ষষ্ঠ ব্রিগেডের সবাই শিয়া। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু শিবিরে তারা কামান ও রকেটের হামলা করে। ষষ্ঠ ব্রিগেডকে ১৯৮৪ই. সালের এপ্রিল থেকে এসব অস্ত্র ও গোলা-বারুদ দিয়ে সজ্জিত করার পর এই প্রথমবার তার প্রয়োগ করল, তাও আহলে সুন্নার বিরুদ্ধে।
১৮/৬/১৯৮৫ই. তারিখে ‘হরকতে আমালে’র আগুনে বিধ্বস্ত শিবির থেকে ফিলিস্তিনিরা মুক্ত হয়। পুরো একমাস ভয়-ভীতি-আতঙ্ক ও ক্ষুধার্ত জীবনে তারা কুকুর ও বিড়াল পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছিল। ৯০% বাড়ি-ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নানা তথ্য থেকে তিন হাজার একশো হতাহতের সংখ্যা জানা যায়। ১৫-হাজার শরণার্থী বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যায়, যা মোট আশ্রয়প্রাপ্তদের প্রায় ৪০%।
শরণার্থী ক্যাম্পে ‘হরকতে আমালে’র নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল খুব বেদনাদায়ক, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নিম্নে তার কয়েকটি গোপন তথ্য উপস্থাপন করছি:
১. ‘ইতালি রিপাবলিকান’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সাবরা ও ‘শাতিলা’র ম্যাসাকার ছিল জঘন্যতম নৃশংসতা, যা ‘হরকতে আমালে’র সদস্যরা সংগঠিত করেছে।
২. ২৬/৫/১৯৮৫ই. তারিখে ‘আমালে’র শিয়ারা একটি শরণার্থী ক্যাম্প গুড়িয়ে দিলে শত শত বৃদ্ধ, শিশু ও নারী হতাহত হয়।
৩. ‘সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার প্রতিবেদক বলেন: বৈরুতের হাসপাতালে অনেক ফিলিস্তিনি মৃতদেহের গলা কাটা ছিল।
৪. আহতদের হত্যা করার দৃশ্য দেখে প্রতিবাদ করায় এক নার্সকেও শিয়ারা হত্যা করে।
৫. দু’জন সাক্ষীর বরাতে ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’ সংস্থা জানায় যে, আট দিনে ‘আমাল মিলিশিয়ারা’ তিনটি শরণার্থী শিবির থেকে কয়েক ডজন আহত ও বেসামরিক লোক ধরে এনে হত্যা করেছে।
৬. দু’জন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, তারা ‘হরকতে আমালে’র যোদ্ধা ও ষষ্ঠ ব্রিগেডের সৈনিকদের দেখেছে, গাজা হাসপাতাল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৪৫ এর অধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে অনেকে আহতও ছিল।
৭. এক ফিলিস্তিনি নারী লাশের দীর্ঘ সারি দেখে চিৎকার করে উঠেন: “ইয়াহূদীরাও তাদের চেয়ে ভালো”। অপর নারী নাক ঢেকে লাশের সারিতে ভাইয়ের লাশ তালাশ করছেন... চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে হটাৎ চিৎকার করে উঠলেন: নিশ্চয় এই তো সে (আমার ভাই), কিন্তু দেখছি পোকায় তার শরীর খাচ্ছে... এরূপ আরো অনেক মৃতদেহ ছিল যাতে মাছি ভনভন করছে।
৮. ‘সাবরা শিবির’ পতনের পর ‘আমালে’র যোদ্ধারা পশ্চিম বৈরুতের রাস্তায় স্বাধীনতা দিবসে মার্চ করার সময় শ্লোগান দেয়: لا إله إلا الله العرب أعداء الله “আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আরব হল আল্লাহর দুশমন”। ‘আমালে’র অপর সদস্য অস্ত্র হাতে বলে: “আমি হত্যা করেই যাব, যত দিন লাগবে লাগুক, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনিরা লেবানন থেকে নিঃশেষ হয়”।
৯. ৪/৬/১৯৮৫ই. তারিখ কুয়েতি সংবাদ সংস্থা ও ৩/৬/১৯৮৫ই. তারিখ ‘আল-ওয়াতান’ ম্যাগাজিন প্রচার করে: “আমালে”র যোদ্ধারা ‘সাবরা’ শরণার্থী শিবিরে পরিবারের সামনে থেকে ২৫-যুবতীকে অপহরণ করে তাদের শ্লিলতাহানির মত জঘন্য অপরাধ করেছে”।
এসব ডকুমেন্ট থেকে আমরা নিশ্চিত ‘হরকতে আমালে’র মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনি সুন্নিদের অস্তিত্বকে নিঃশেষ করা, যে সুন্নি ফিলিস্তিনিরা দখলদার ইয়াহূদীদের থেকে নিজেদের মাতৃভূমি মুক্ত করতে চায়। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে দ্বাদশ ইমামিয়া আকিদা তার অনুসারীদের অন্তরে আহলে সুন্নার প্রতি হিংসা-ক্ষোভ ও প্রতিশোধ স্পৃহা জন্ম দিয়ে থাকে, তাই তাদেরকে তারা কাফের ও ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের সমতুল্য জ্ঞান করে, বরং তাদের চেয়েও বড় কাফের মনে করে।
তাওফিক মাদিনি বলেন: “হরকতে আমালে’র অন্তর্নিহিত কার্যক্রম হচ্ছে সশস্ত্র ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব নিঃশেষ করা, কারণ তারা শিয়া সমাজের নিরাপত্তার অন্তরায়। তাদের কারণে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে হামলার সুযোগ পায়”।
ইসরাইলি সৈন্যরা যখন লেবানন ঢুকে শিয়াদের মদদে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের দমন করে, তখন শিয়ারা দক্ষিণ লেবাননে ইয়াহূদী সৈন্যদের ফুল ও তোরণ দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়!
‘হরকতে আমালে’র এক নেতা (হায়দার দায়েখ) বলেন: “আমরা ইসরাইলের দিকে অস্ত্র তাক করে ছিলাম, কিন্তু ইসরাইল আমাদের জন্য তার হাত প্রসারিত করল ও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো। তারা ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী ওহাবিদেরকে দক্ষিণ লেবানন থেকে হটাতে আমাদের অনেক সাহায্য করেছে”।
লেবাননে হিযবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃবৃন্দের পরিচয়
• লেবাননের খোমেনি খ্যাত মুহাম্মদ হুসাইন ফাদলুল্লাহ, সুবহি তুফাইলি, হাসান নাসরুল্লাহ, ইবরাহিম আমিন, আব্বাস মুসাভি, নায়িম কাসেম, জুহাইর কাঞ্জ, মুহাম্মদ উজবেক ও রাগেব হারব প্রমুখদের দ্বারা ইরান নতুন এ সংগঠনটি তৈরি করে, যার নাম হিযবুল্লাহ। তারা সবাই ‘হরকতে আমালে’র সদস্য ছিল।
‘আমাল’ ও ‘হিযবুল্লাহ’ একত্র কাজ করার কথা থাকলেও কর্তৃত্ব নিয়ে উভয়ের মাঝে অতি দ্রুত মতভেদ দেখা দেয়, উভয়ে শিয়া অধ্যুষিত এলাকাসমূহে নিজ নিজ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মরিয়া হয়ে উঠে। বহু ঘটনা ও হতাহতের পর হিযবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের অধিকাংশ এলাকায় স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সফল হয়, ধীরে ধীরে তার সমর্থন বাড়তে থাকে, কারণ ইরানের অর্থায়নে সে শিয়াদের মাঝে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করার সুযোগ পায়।
হিযবুল্লাহ আজ মুসলিম উম্মার জন্য বড় হুমকি ও কঠিন বাঁধা। তার বাহ্যিক রূপ আল্লাহর দুশমন ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের সাথে যুদ্ধ করা, কিন্তু প্রকৃত রূপ হচ্ছে শিয়া মতবাদের প্রসার ও মুসলিম দেশসমূহে খোমেনির বিপ্লব রপ্তানি করা।
‘হিযবুল্লাহ’ ও ‘আমাল’ উভয় ইরানের নির্দেশে পরিচালিত হয়
বাড়াবাড়ি হবে না যদি আমরা বলি, লেবাননের ভূমিতে হিযবুল্লাহ একটি ইরানি সংগঠন। হিযবুল্লাহর সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে “আমরা কারা এবং আমাদের উদ্দেশ্য কি” শিরোনামে, সেখানে সে নিজের প্রসঙ্গে বলেছে: “আমরা হিযবুল্লাহর সদস্য, যার একাংশকে আল্লাহ ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, ফলে নতুন করে দুনিয়ার বুকে ইসলামি রাষ্ট্রসমূহের গোড়া পত্তন হয়েছে। আমরা হিকমত ও ইনসাফপূর্ণ অভিন্ন নেতৃত্বে বিশ্বাসী, যার ধারক হবেন সকল শর্তের অধিকারী একজন ফকিহ। বর্তমান যুগে সেই ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম আয়াতুল্লাহ উজমা রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি। তিনি মুসলিম জাগরণের পুরোধা ও নতুন ইসলামের পুনর্জীবন দানকারী। ১৯৮৭ই. সালে হিযবুল্লাহর অপর নেতা ইবরাহিম আমিন এ কথাই ব্যক্ত করেন ভিন্নভাবে, তিনি বলেন: “আমরা বলি না যে, আমরা ইরানের একটি অংশ, বরং লেবাননে আমরা ইরান এবং ইরানে আমরা লেবানন”।
হাসান নাসরুল্লাহ ও হিযবুল্লাহর পরিচয় এবং হরকতে আমালের সাথে তার সম্পর্ক
আরবের খোমেনি হাসান আব্দুল করিম নাসরুল্লাহর জন্ম ২১ আগস্ট ১৯৬০ই.। সর্বপ্রথম তাকে ‘বাযুরিয়াহ’ শহরের অন্তর্গত ‘সুওয়ার’ জেলার ‘হরকতে আমালে’র দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ই. সালে শিয়া ইমামিয়ার ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য তিনি নাজাফ যান। ১৯৮২ই. সালে তাকে বেক্কা প্রদেশে ‘আমালে’র রাজনৈতিক প্রধান ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য করা হয়। ইত্যবসরে সে ‘আমাল’ থেকে পৃথক হয়ে হিযবুল্লাহর সাথে যোগ দেয়। ১৯৮৫ই. সালে তাকে হিযবুল্লাহর বৈরুত শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়, অতঃপর ১৯৮৭ই. সালে তাকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়। ১৯৯২ই. সালে সাবেক সেক্রেটারি আব্বাস মুসাভি অপহৃত হলে তাকে সেক্রেটারি করা হয়, অতঃপর ১৯৯৩ই. ও ১৯৯৫ই. দু’ মেয়াদের জন্য তাকে পুনরায় নির্বাচিত করা হয়।
‘হরকতে আমাল’ এর সাথে হাসান নাসরুল্লাহর সম্পর্ক:
‘আমালে’র প্রতিষ্ঠাতা মুসা সদরের সাথে খোমেনির গভীর সম্পর্ক ছিল, যা আমরা পূর্বে প্রমাণ করেছি।
৮/১০/১৯৮৩ই. সালে জাফরি (শিয়া) মুফতি আব্দুল আমির কিবলান ‘শিয়া উচ্চ পরিষদ’ থেকে ঘোষণা করেন: নিশ্চয় ‘হরকতে আমাল’ শিয়াদের জন্য মেরুদণ্ড স্বরূপ। ‘আমাল’ যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আমরা সেটাকে ‘শিয়া উচ্চ পরিষদে’র সিদ্ধান্ত মনে করব। অনুরূপ ‘শিয়া উচ্চ পরিষদ’ যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ‘আমাল’ সেটা আঁকড়ে ধরবে”।
‘আমাল’ শিয়াদের শিরোমণি খোমেনির নিকট বায়‘আত গ্রহণ করে তাকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের নেতা স্বীকার করেছে।
‘হরকতে আমাল’ এর প্রতি এ সাহায্য-সহযোগিতা তখনই আসে যখন ‘আমাল’ থেকে বের হয়ে তা ‘আমালুল ইসলামিয়া’ রূপ লাভ করে, আর তারও পরে সেটা ‘হিযবুল্লাহ’ নামে আত্মপ্রকাশ লাভ করে ও দ্বন্দ্বে ঝড়িয়ে পড়ে।
‘হরকতে আমালে’র সহ-সভাপতি হুসাইন মুসাভি ‘আমাল’ থেকে নিজেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে ‘আমালুল ইসলামিয়া’ গঠন করে, পরবর্তীতে যা হিযবুল্লাহ নাম গ্রহণ করে।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, সশস্ত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও লেবাননে ইরানি এজেন্ডা বাস্তবায়ন থেকে ‘হরকতে আমাল’ বেশী দূরত্বে ছিল না।
এই হচ্ছে ‘হিযবুল্লাহ’; কতক আহলে সুন্নাহ না জেনে হিযবুল্লাহর পক্ষ নিয়ে থাকে। তারা হাসান নাসরুল্লার স্বরূপ ও ফিলিস্তিনে আহলে-সুন্নাহ হত্যায় তার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানে না। কারণ, সে মিথ্যার আড়ালে নিজেকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষাবলম্বনকারী ও তাদের সাহায্যকারী হিসেবে প্রকাশ করেছে।
হাসান নাসরুল্লাহ সম্পর্কে জানার জন্য বেশী তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণার প্রয়োজন নেই, এতটুকুন জানাই যথেষ্ট যে, সে জাফরি শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যাদের নিকট আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উপায় হচ্ছে সাহাবিদের গালমন্দ করা।
শায়খ ইউসুফ কারদাভি এক সাক্ষাতকারে বলেছেন: হাসান নাসরুল্লাহ কট্টর শিয়া।
তাদের দেখে অবাক লাগে, যারা হিযবুল্লাহকে সমর্থন দেয় ও তাকে সাহায্য করে, অথচ সে সাহাবি ও মুমিনদের বড় শত্রু।
সত্যিকার অর্থে যদি হাসান নাসরুল্লাহ ইসরাইলের জন্য হুমকি হত, তাহলে সে কিভাবে লেবাননের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম চষে বেড়ায়, ইসরাইলের বিষোদগার করে বেতার-যন্ত্র ও টেভির পর্দায় সাক্ষাতকার দেয়। বিশাল জনসভায় তাকে হুমকি দেয়, যেসব সভার দিন-তারিখ ও স্থান পূর্ব থেকে নির্ধারিত থাকে, অথচ ইসরাইল তাকে কিছু বলে না, কোনো মিসাইল তার গাড়ি, বাড়ি বা জনসভাকে লক্ষ্য ছুড়ে না, পক্ষান্তরে যার থেকে সুন্নিরা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়?
হে মুসলিম ভাই, শিয়াদের এ নোংরা কর্মকাণ্ডের দ্বারা প্রতারিত হবেন না, যারা চায় কথার দ্বারা মুসলিমদের অন্তরে জায়গা করে নিতে, অথচ ‘আমাল’ সংস্থার দ্বারা সংঘটিত সে কালো ইতিহাস তা এখনো আমাদের স্মৃতিতে জাগরুক রয়েছে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে শত-শত আহলে সুন্নাহকে হত্যা করেছিল!
‘হরকতে আমাল’ সংস্থাটির এসব অপকর্ম ও লাঞ্ছনাকর কর্মকাণ্ডের পর কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এ সংস্থাটিকে বিশ্বাস করা, কিংবা তার কোনো বিষয় গ্রহণ করা, অথচ এ সংস্থা থেকেই হিযবুল্লাহর জন্ম, অতএব মুসলিম কিভাবে এটিকে বিশ্বাস করবে?!
কিছুকাল পূর্বে যদিও ‘আমাল’ ও ‘হিযবুল্লাহ’ হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছিল কিন্তু এ কারণে তারা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং আদিকাল থেকে বাতিল পরস্পর এভাবেই চলে আসছে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের দোসর ইয়াহূদীদের সম্পর্কে বলেন:
﴿ بَأۡسُهُم بَيۡنَهُمۡ شَدِيدٞۚ تَحۡسَبُهُمۡ جَمِيعٗا وَقُلُوبُهُمۡ شَتَّىٰۚ ١٤ ﴾ [الحشر: ١٤]
“তাদের পরস্পরের মাঝে তাদের ঝগড়া খুব কঠিন ও বীভৎস”। অন্যত্র তিনি বলেন:
﴿ وَأَلۡقَيۡنَا بَيۡنَهُمُ ٱلۡعَدَٰوَةَ وَٱلۡبَغۡضَآءَ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ ٦٤ ﴾ [المائدة: ٦٤]
“আর আমি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা ঢেলে দিয়েছি”। অন্যত্র তিনি তাদের অপর দোসর খ্রিস্টানদের সম্পর্কে বলেন:
﴿ فَأَغۡرَيۡنَا بَيۡنَهُمُ ٱلۡعَدَاوَةَ وَٱلۡبَغۡضَآءَ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ ١٤ ﴾ [المائدة: ١٤]
“ফলে আমি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা উসকে দিয়েছি”।
হিযবুল্লাহ ও তার প্রতিষ্ঠাতাদের আকিদা
হিযবুল্লাহ ও তার প্রতিষ্ঠাতারা শিয়া ইমামিয়া আকিদায় বিশ্বাসী। তারা নিজেদেরকে ‘জাফরি শিয়া’ পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের কতক ভ্রান্ত আকিদা নিম্নরূপ, যেমন:
• ইমামদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি:
শিয়া রাফেযীরা আহলে বাইতের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে, তাদেরকে নিষ্পাপ দাবি করে, এবং তারা অবশ্যই গায়েব জানে বিশ্বাস করে। তাদের দাবি, দ্বাদশ ইমামগণ যখন যা জানতে চান জানতে পারেন, তারা জানেন কখন মারা যাবেন। তারা স্বীয় ইচ্ছা ব্যতীত মারা যান না।
শিয়া ইমামিয়াদের দাবি তাদের ইমামগণ নবীদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, তবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত। মাজলিসি ‘মিরআতুল উকুল’ গ্রন্থে এ কথা স্বীকার করেছেন। তাদের বিশ্বাস ইমামগণ মৃতদের জীবিত করেন। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, আলি ইবনে আবি তালিব কম্পনকারী, তিনি বজ্র, তিনি নদীসমূহ প্রবাহিত করেন, গাছের পাতা বিদীর্ণ করেন, তিনি অন্তর্যামী, তিনি সুন্দর সুন্দর নামের অধিকারী, যার দ্বারা তাকে আহ্বান করা হয়। তাদের এসব আকিদা থেকে আমরা আল্লাহর নিকট পানাহ চাই।
• কুরআনুল কারিমে তাদের আকিদা:
হাসান নসরুল্লাহসহ শিয়াদের বিশ্বাস সাহাবিগণ কুরআনুল কারিম বিকৃত করেছেন। ইমামগণ ব্যতীত কেউ পূর্ণ কুরআন জমা করতে সক্ষম হয়নি। আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত হুবহু কুরআন আলি ইবনে আবি তালিব ও তার পরবর্তী ইমামগণ ব্যতীত কেউ জমা কিংবা হিফজ করতে সক্ষম হয়নি। তাদের দাবি: অসীগণ ব্যতীত কেউ বলতে পারে না আমার নিকট বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল কুরআন রয়েছে। তারা আরো বলে যে, জিবরীল মুহাম্মদের নিকট যে কুরআন নিয়ে এসেছেন, তার আয়াত সংখ্যা সতেরো হাজার। তাদের প্রখ্যাত আলেম নিয়ামাতুল্লাহ জাযায়েরি বলেন, বর্ণিত আছে যে, ইমামগণ সালাত ও অন্যান্য ইবাদতে নিজ অনুসারীদের প্রচলিত কুরআন পড়া ও তার উপর আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন, যে পর্যন্ত আমাদের সাহেবুজ্জামান বের না হন। তিনি আসলে এ কুরআন মানুষের হাত থেকে আসমানে চলে যাবে এবং প্রকৃত কুরআন বের হবে, যা আমিরুল মোমেনিন লিখেছেন, অতঃপর তাই পড়া হবে এবং তার উপর আমল করা হবে।
• ইমামগণ নিষ্পাপ ও নেতৃত্বের হকদার:
রাফেযীরা তাদের দ্বাদশ ইমামকে নিষ্পাপ, নেতৃত্বের হকদার ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত দাবি করে। এ আকিদা যারা পোষণ করে না, তাদের নিকট তারা কাফের, বিশেষ করে প্রথম তিন খলিফা আবু বকর, ওমর ও উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম। কারণ, তাদের বর্ণনা মতে তারা আলি ইবনে আবু তালিব থেকে খিলাফত ছিনিয়ে নিয়ে কাফের ও মুরতাদ হয়ে গেছে, (আল্লাহ তার উপর ও তার সকল সাহাবির উপর সন্তুষ্ট হোন।) তাদের দৃষ্টিতে আমল কবুলের পূর্বশর্ত আলি ইবনে আবি তালিবের খিলাফতে বিশ্বাস করা, অন্যথায় কোনো মুসলিমের আমল গ্রহণযোগ্য নয়, যে কেউ হোক। তাই শিয়া আলেম মাজলিসি স্বীয় কিতাব ‘বিহারুল আনওয়ার’ গ্রন্থে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রচনা করেছেন: ‘বিলায়াত ব্যতীত আমল গ্রহণযোগ্য নয়’ শিরোনামে।
• সাহাবি ও উম্মুল মোমেনিন সম্পর্কে তাদের আকিদা:
শিয়াদের বিশ্বাস আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার সবচেয়ে বড় উপায় তিন খলিফা আবু বকর, ওমর ও উসমানকে লানত করা। তারা আরো লানত করে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা ও হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে। উম্মুল মোমেনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তারা জেনার অপবাদ দেয়। তারা বলে হাফসা ও আয়েশা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। তারা সাত অথবা দশজন সাহাবি ব্যতীত সবাইকে লানত করে ও কাফের বলে। তাদের বিশ্বাস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর সব সাহাবি মুরতাদ হয়ে গেছে। [নাউযুবিল্লাহ]
• অন্যান্য মুসলিমদের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস:
শিয়া রাফেযীরা ঢালাও ভাবে মুসলিমদের সকল জমাতকে কাফের বলে। শিয়া আলেম আব্দুল্লাহ শিব্র ‘হাক্কুল ইয়াকিন ফি মারেফাতি উসুলিদ্দিন’ কিতাবে এ মাসআলায় ইমামিয়াদের ঐকমত বর্ণনা করেছেন। শায়খ ‘মুফিদ’ বলেন: ইমামিয়ারা এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো ইমামের ইমামত অথবা আল্লাহর ফরযকৃত তাদের আনুগত্য অস্বীকারকারী কাফের, গোমরাহ ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী। অপর জায়গায় তিনি বলেন: ইমামিয়ারা এ ব্যাপারে একমত যে, বিদআতিরা সবাই কাফের, আলি ইবনে আবি তালিব তাদের উপর বিজয়ী হবেন, তাদেরকে দাওয়াত দিবেন, তাদের সামনে প্রমাণ পেশ করবেন এবং তাদের থেকে তওবা তলব করবেন, যদি তারা তওবা করে সত্য গ্রহণ করে ভালো, অন্যথায় মুরতাদ হিসেবে তাদের সবাইকে তিনি হত্যা করবেন। এ অবস্থায় মৃত্যু বরণকারী জাহান্নামী।
শিয়া আলেম ইউসুফ বাহরানি বলেন: হকপন্থীদের বিরোধীরা কাফের, অন্যান্য কাফেরদের ন্যায় তাদের হুকুম।
শিয়াদের অপর শায়খ মুহাম্মদ শিরাজি দ্বাদশ ইমামিয়া ব্যতীত সকল শিয়া দল-উপদলকে কাফের বলেছেন এবং খ্রিস্টানদের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন: দ্বাদশ ইমামিয়া ব্যতীত শিয়াদের সকল গ্রুপ কাফির, তার দলিল ‘মুফিদ’ ও ‘বাহরানি’ প্রমুখদের বাণী, যা প্রমাণ করে কোনো এক ইমামকে অস্বীকার করা আল্লাহ তিনজনের একজন বলা সমান। তাদের দৃষ্টিতে অন্যান্য মুসলিমরা কাফির। তাই হাসান নাসরুল্লাহ বলেছে: “ওহাবি আন্দোলনকে আমরা কখনো ইসলামি আন্দোলন কিংবা ইসলামের পুনঃজাগরণ মনে করি না”।
শিয়ারা ‘তাকইয়া’ আকিদায় বিশ্বাসী। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, পুনর্জন্ম সত্য, অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে মৃতরা দুনিয়ায় ফিরে আসে।
হিযবুল্লাহ একটি শিয়া সংগঠন, যার একমাত্র লক্ষ্য খোমেনি বিপ্লব ও তার দর্শন ‘বিলায়াতুল ফকিহ’-কে সম্প্রসারিত করা। মুসলিম বিশ্বে এ থিউরি প্রচার করাই তার একমাত্র পণ। তাই সে রসালো বক্তব্য ও চাকচিক্যপূর্ণ বাণী দ্বারা সরলমনা মুসলিমদের শিকার করে।
‘বিলায়াতুল ফকিহ’ কি?
‘বিলায়াতুল ফকিহ’ শিয়াদের একটি ধর্মীয় আকিদা ও রাজনৈতিক বিদ‘আত, যার প্রবক্তা খোমেনি। এ আকিদার অর্থ হচ্ছে নেতৃত্ব ও সরকার প্রধান হওয়ার বেশী হকদার ধর্মীয় ফকিহ বা বিদ্যান, যার মধ্যে নির্দিষ্ট কতক শর্ত রয়েছে। তিনি অদৃশ্য নিষ্পাপ ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে উম্মতের নেতৃত্ব দিবেন। তাই উম্মত যাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেই ধর্মীয় নেতার পরামর্শ ব্যতীত কোনো নির্দেশ ও কোনো অনুমোদন দেওয়া যাবে না, এভাবে কাঙ্ক্ষিত ইমাম মাহদির প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে।
‘বিলায়াতুল ফকিহ’ প্রবক্তা খোমেনির ছায়ায় হিযবুল্লাহর জন্ম হয়। আমরা পূর্বে বলেছি, সামনেও আসছে যে, হিযবুল্লাহ নিজে বলেছে: ‘হিযবুল্লাহর রক্ত-মাংস ইরানি। হিযবুল্লাহ ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইরানি বিপ্লবের পুরোধা ইমাম খোমেনির অনুসারী। তারপর তার উত্তরসূরি আলি খামেনির অনুসারী।
এখানে আমরা খোমেনি রচিত ‘আল-হুকুমাতুল ইসলামিয়া’ কিতাব থেকে ‘বিলায়াতুল ফকিহ’র ব্যাখ্যা দিচ্ছি:
১. খোমেনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেরূপ উম্মতের জন্য দলিল ছিলেন, বর্তমান যুগের ফকিহগণও উম্মতের জন্য দলিল। তাদের আনুগত্য ত্যাগকারীকে আল্লাহ শাস্তি দিবেন।
২. আল্লাহ তা‘আলা রাসূলকে মুমিনদের অলি বা অভিভাবক বানিয়েছেন, তার পশ্চাতে ইমাম হচ্ছেন অলি। রাসূল ও ইমামের অলি হওয়ার অর্থ শরয়ী ক্ষেত্রে তাদের নির্দেশ সবার জন্য অপরিহার্য। সেই একই বেলায়াত বা অভিভাবকত্ব ও কর্তৃত্ব ফকিহের জন্যও স্বীকৃত; তবে ফকিহ ও অলির মাঝে শুধু একটি পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ ‘ফকিহ’র বিলায়াত অপর ফকিহর উপর প্রযোজ্য নয়, এক ফকিহ অপর ফকিহকে পদে বসাতে কিংবা পদ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। কারণ যোগ্যতার বিচারে উভয়ে সবাই সমান।
৩. যদি জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ কোনো ফকিহ হুকুমত কায়েম করার রূপরেখা নিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেও সমাজের সে পরিমাণ কর্তৃত্বের অধিকারী, যে পরিমাণ অধিকারী তাদের নবী, এবং প্রত্যেক মানুষের উপর ওয়াজিব তার কথা শ্রবণ করা ও তার অনুসরণ করা।
শিয়াদের কেন্দ্রীয় নেতা আয়াতুল্লাহ উজমা সায়্যেদ মুহাম্মদ হুসাইন ফাদলুল্লাহ বলেন: “ফকিহর সিদ্ধান্ত কোনো বিষয়কে বৈধতার হুকুম প্রদান করে, কারণ সে ইমামের স্থলাভিষিক্ত, ইমাম হলেন নবীর স্থলাভিষিক্ত, অতএব নবী যেরূপ মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের থেকেও অতি ঘনিষ্ঠ, ইমামগণও সেরূপ ঘনিষ্ঠ, অনুরূপ ঘনিষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ ফকিহ”। অতএব “প্রত্যেক বস্তুর বৈধতা যেরূপ নবীদের থেকে আসে, তেমনি আসে ফকিহদের থেকেও। ”
হিযবুল্লাহর স্বার্থ কোথায় ও তার অর্থের যোগানদাতা কে?
হিযবুল্লাহর সমুদয় অর্থের যোগান দেয় ইরান। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৯৯০ই. সালে হিযবুল্লাহকে দেওয়া ইরানের অনুদানের পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার; ১৯৯১ই. সালে তার পরিমাণ ছিল পঞ্চাশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; এবং ১৯৯২ই. সালে এক শত বিশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ১৯৯৩ই. সালে ইরান এক শত ষাট মিলিয়ন মার্কিন ডলার হিযবুল্লাহকে অনুদান প্রদান করে।
একাধিক সূত্র থেকে প্রমাণ রাফশানজানির আমলে হিযবুল্লাহকে দেওয়া ইরানি অনুদানের পরিমাণ ছিল ‘দুই শত আশি’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এ বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে হিযবুল্লাহ লেবাননে ইরানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করত, তবে লেবাননের জাতীয় উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবদান রাখত না। এসব অনুদানের ফলে হিযবুল্লাহ স্বীয় যোদ্ধাদের পরিসর বৃদ্ধি ও শিয়াদের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ লাভ করে। হিযবুল্লাহ শিয়াদের প্রয়োজন খরিদ করে দেয় ও তাদের পাশে দাড়ায়, ফলে তারাও তার পক্ষ নেয় ও তার পাশে দাড়ায়। এভাবে সে একটি সমাজের নিকট ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ লাভ করে। একজন হিযবুল্লাহ যোদ্ধাকে ‘পাঁচ হাজার’ লেবাননি লিরা মাসিক বেতন দেওয়া হত। ১৯৮৬ই. সালে একজন লেবাননি যোদ্ধার এটাই সর্বোচ্চ বেতন ছিল। তাই অর্থের লোভে ‘আমাল’ সংগঠনের যোদ্ধারা হিযবুল্লাহতে যোগ দেয় ও তার কাতারে শামিল হয়।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ইরান হিযবুল্লাহর মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিল: “সর্বশেষ ইসরাইলি হামলায় লেবাননের যে ক্ষয়ক্ষতি হবে, ইরান তার ক্ষতিপূরণ করবে, ঘর-বাড়ি ও অন্যান্য জিনিস পত্র তৈরি করে দিবে।
যেরূপ কথা সেরূপ কাজ, প্রথম দিন থেকে শিয়া অঞ্চলসমূহে হিযবুল্লাহ ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য দেওয়া শুরু করে, যেমন বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল ও অন্যান্য শিয়া এলাকা। প্রথম কিস্তি হিসেবে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্তকে ঘর ভাড়া ও আসবাব পত্র খরিদ করার অর্থ দেওয়া হয়, যতক্ষণ না ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরগুলো ঠিক হবে, তাদেরকে অর্থ সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে হিযবুল্লাহর ব্যাপ্তি
উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ এবং আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিন্ন আকিদা, অভিন্ন লক্ষ্য ও অভিন্ন পদ্ধতিতে হিযবুল্লাহ সক্রিয় রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি দেশে তার তৎপরতা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি:
বাহরাইনি হিযবুল্লাহ
ইরানে শিয়া বিপ্লব সফল হওয়ার পর তার তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন দেশে একাধিক সংগঠন তৈরি করা হয়, যেন বিভিন্ন দেশে ইরানি বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়া যায়। তার ধারাবাহিকতায় বাহরাইনকে মুক্ত (!) করার জন্য ‘হাদি মুদাররিসি’র অধীন الجبهة الإسلامية لتحرير البحرين “বাহরাইন মুক্তকারী ইসলামিক ফ্রন্ট” নামে এটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার প্রধান কার্যালয় ছিল তেহরানে। প্রতিষ্ঠার শুরুতেই তার নিম্নরূপ উদ্দেশ্যসমূহ প্রকাশ করা হয়:
১. আলে-খলিফার শাসন নিঃশেষ করা।
২. খোমেনি বিপ্লবের ন্যায় বাহরাইনে শিয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
৩. “উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ” থেকে বাহরাইনকে পৃথক করে ইরানি প্রজাতন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত করা।
‘আল-জাবহাতুল ইসলামিয়াহ’ বা ইসলামিক ফ্রন্ট ইরান থেকে বেশ কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ করে, যেমন «الشعب الثائر» ‘বিপ্লবী জাতি’ ও «الثورة الرسالة» ‘বিপ্লবী পয়গাম’ ইত্যাদি শিরোনামে। এ ফ্রন্টের প্রচার বিভাগের দায়িত্বে ছিল ঈসা মারহুন।
এ ফ্রন্টের অর্থ যোগানদাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হল «الصندوق الحسيني الاجتماعي» ‘হুসাইনি সোশ্যাল ফান্ড’। ১৯৭৯ই. সালে ‘বাহরাইন মুক্তকারী ইসলামিক ফ্রন্টে’র শিয়ারা সৌদি আরবের শিয়াদের সাথে মিলে ‘কাতিফে’ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। তাদেরকে যখন দমন করা হয়, তখন বাহরাইন গোয়েন্দা সংস্থার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ফ্রন্টের লোকেরা অপহরণ করে, ফলে সরকার তাদের উপর কঠোর হয় ও তাদের একাধিক নেতাকে বন্দি করে।
চাপের মুখে তারা সাময়িকভাবে ফ্রন্টের কার্যক্রম বন্ধ করে আগামী আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়, বাহরাইনে অস্ত্র সমাগম করতে থাকে, অতঃপর ১৯৮১ই. সালে মুহাম্মদ তাকি মুদাররিসির নেতৃত্বে তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। তাদের বিদ্রোহ অকৃতকার্য হয়, সরকার তাদের সাথে জড়িত ৭৩-অপরাধীকে আটক করে।
আশির দশকের মাঝামাঝিতে উক্ত ফ্রন্টের সদস্যরা ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার কর্তা ব্যক্তিদের সাথে বৈঠক করে ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ নামে একটি সামরিক শাখা খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
‘বাহরাইন মুক্তকারী! ইসলামিক ফ্রন্টে’র সাধারণ সম্পাদক শায়খ মুহাম্মদ আলি মাহফুজকে ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইনি’র দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি তিন হাজার বাহরাইনি শিয়া যুবকদের সমন্বয়ে ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ গঠন করেন এবং তাদেরকে ইরান ও লেবাননে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। হিযবুল্লাহ বাহরাইনির প্রধান নির্বাচিত হন আব্দুল আমির জামরি, বর্তমান তার স্থানে আছেন আলি সালমান।
‘বাহরাইন মুক্তকারী ইসলামিক ফ্রন্টে’র প্রধান হাদি মুদাররিসিকে হিযবুল্লাহ বাহরাইনির অভিভাবক ও অর্থ যোগানদাতা গণ্য করা হয়। অনুরূপ মুহাম্মদ তাকি মুদাররিসিও তার একজন অর্থ যোগানদাতা ও তাত্ত্বিক অভিভাবক।
‘হিযবুল্লাহ বাহরাইনি’ ত্রাস ও বিপ্লব সৃষ্টি করে বাহরাইনের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানসমূহে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। তার প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমান সরকারকে হটিয়ে ইরানি শিয়া সরকারের আদলে ও তার আদর্শের উপর নতুন সরকার গঠন করা। এ কথার প্রথম প্রমাণ আয়াতুল্লাহ রুহানির ঘোষণা, তিনি বলেছেন: নিশ্চয় বাহরাইন ইরানের অনুগত ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের একটি অংশ।
১৯৯৪ই. সালের বিদ্রোহ, সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তারা বিভিন্ন নামে অপরাধ সংগঠিত করত, যেমন منظمة العمل المباشر ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, حركة أحرار البحرين ‘বাহরাইন স্বাধীনতাকামী আন্দোলন’ ও منظمة الوطن السليب ‘অধিকৃত মাতৃভূমি [রক্ষার] আন্দোলন’ ইত্যাদি, সবগুলো আন্দোলনের গোঁড়ায় ছিল ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’।
পরবর্তীতে এসব দল আলি সালমানের নেতৃত্বেجمعية الوفاق الوطني الإسلامية বা ‘জাতীয়তাবাদী ইসলামি সম্মিলিত জোটে’র অন্তর্ভুক্ত হয়। তারা নিজেদেরকে শিয়া মতবাদ প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত করে। সামরিক শাখা ও বিদ্রোহ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর হাতে।
‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর অপর নাম «حركة أحرار البحرين» এর হেড কোয়ার্টার লন্ডন থেকে «صوت البحرين» ‘বাহরাইন কণ্ঠ’ নামে মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করে। এ ম্যাগাজিনের মাধ্যমে হিযবুল্লাহ বাহরাইন তাদের দাবিসমূহ, তৎপরতা ও খবরাখবর প্রচার করে। সংগঠনটি এমন অনেক বিদেশী দেশ থেকে অনুদান হাসিল করে, ইসলামের প্রতি যাদের রয়েছে প্রচুর বিদ্বেষ। এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় ‘লন্ডন ফোরাম’ [পূর্বনাম ‘মিম্বারুল বাহারিনাহ’] এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তার এক অনুদানের পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার ডলার থেকেও অধিক। ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ তাদের ‘বাহরাইন স্বাধীনতাকামী আন্দোলন’ এর নামে এমনসব রাজনৈতিক সংস্কার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে, যাতে করে তার সামরিক শাখার সদস্যরা সরকার পরিবর্তের ন্যায় অভীষ্ট লক্ষ্য আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়।
‘বাহরাইন স্বাধীনতাকামী আন্দোলনে’র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ হলেন সায়িদ শিহাবী, মাজিদ আলাবি ও মানসুর জামরি।
১৯৯৬ই. সালে বাহরাইন পুনরায় হত্যা ও ধ্বংস যজ্ঞের সম্মুখীন হয়, ইরান যার পরিকল্পনা করেছিল।
১৪-মার্চ ১৯৯৬ই. সালে ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ সাতরাহ ওয়াদিয়ান নামক স্থানে এক হোটেলে অগ্নিসংযোগ করে, যার ফলে এশিয়ার সাতজন লোক মারা যায়, এটাও তাদের হিংসার নগ্ন প্রকাশ।
তারপর ২১মার্চ ১৯৯৬ই. সালে ‘আজ-জিয়ানি’ গ্যারেজে আগুন লাগিয়ে দেয়, ফলে শো-রুমে বিদ্যমান সকল গাড়ি পুড়ে কয়লায় পরিণত হয়।
তাদের হিংসা ও বিদ্বেষ উত্তরোত্তর বর্ধিত হয়, যার ফলে তারা ৬-মার্চ ১৯৯৬ই. সালে বড় বড় নয়টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে ধ্বংস্তুপে পরিণত করে।
এ ছাড়া তারা একাধিক হোটেল ও স্কুল জ্বালিয়ে দেয়, অনুরূপ জ্বালিয়ে দেয় সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, টেলিফোন সংস্থা, যা রাস্তার পাশে অবস্থিত ছিল। অনুরূপ তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে বাহরাইনের ইসলামি ব্যাংক, বাহরাইনের জাতীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র, যা বাহরাইনের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
বছরের শুরু থেকে ইরানি প্রচার মাধ্যমগুলো বাহরাইনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য জনগণকে উসকে দেয়। তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে যেন তারা জাতীয় কর্মকাণ্ডে বাঁধার সৃষ্টি করে ও অফিস আদালতে ধর্মঘটের ডাক দেয় এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে।
১৯৯৬ই. সালের ১৩-ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহে ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি দু’দিনের ধর্মঘট ডাক দেওয়া হয়। শিয়াদের নিয়ন্ত্রিত প্রচার যন্ত্রগুলো সাধারণ মানুষকে আগামী ঈদুল ফিতরে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়!
অনুরূপ ২-মে ১৯৯৬ই. সালে বাহরাইন জনগণকে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আগত ঈদুল আদহা বয়কট করার আহ্বান জানায়।
ইরানি সংবাদ পত্রগুলো শিয়া সম্প্রদায়কে বিভিন্নভাবে উসকে দেয়। ১৯৯৬ই. সালের ২২-মার্চ ইরানি পত্রিকার এক সংবাদে বলা হয়: “নিশ্চয় বাহরাইনি সরকার বাহরাইনি জনগণের সামনে দাড়াতে সক্ষম হবে না”। এ জাতীয় সংবাদ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য শিয়াদের দাবি বাস্তবায়ন করা ও বাহরাইনকে আরেকটি শিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করা।
«الأنباء الكويتية» ম্যাগাজিন ১০-মে ১৯৯৬ই. তারিখে প্রকাশ করে যে, ইরাকি সেনাবাহিনী যেসব অস্ত্র কুয়েতে রেখে গেছে, সেগুলো ‘কুয়েতি হিযবুল্লাহ দল’ ক্রয় ও কব্জা করে বাহরাইনি হিযবুল্লাহর নিকট চালান করেছে।
পত্রিকাটি আরো প্রকাশ করেছে যে, ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর প্রতি ইরানের যেসব নির্দেশ রয়েছে, তন্মধ্যে বাহরাইনে গোপন পথে অস্ত্র প্রেরণ করার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা অন্যতম। অস্ত্র আমদানির পদক্ষেপ খুব গোপনে গ্রহণ করা হয়, যেন বাহরাইনের নিরাপত্তা বাহিনী তার সন্ধান না পায় এবং নিরাপদভাবে বিভিন্ন স্থানে বণ্টন করা সম্ভব হয়।
‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর একজন কেন্দ্রীয় নেতা আলি আহমদ কাজেম মুতাকাওয়ি স্বীকার করেন: ইরানি গোয়েন্দা বিভাগের এক দায়িত্বশীল আহমদ শারিফির সাথে আমরা এক বৈঠকে বসেছি, তাতে তিনি সমুদ্রপথে বাহরাইনে অস্ত্র সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন।
এ ঘোষণার সপক্ষে জাসেম হাসান খাইয়াত বলেন: ইরানি গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা আহমদ শারিফির সাথে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, যে কোনো উপায়ে হোক বাহরাইনে অস্ত্র চালান করতে হবে।
জাসেম খাইয়াত আরো বলেন: মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সরকার পরিবর্তন করা ও ইরানের আদলে বাহরাইনে একটি শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করা। তিনি আরো বলেন, এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে সামরিক প্রশিক্ষণ হাসিলের জন্য ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ রেজা আলে-সাদেক ও মেজর ওহিদির মাধ্যমে প্রথম ব্যাচ উত্তর তেহরানের ‘কারাজ’ ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়েছে।
শিয়া খতিব আব্বাস আলি আহমদ হাবিল জনগণকে নানা খুতবা ও বক্তৃতার মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। সে মানুষকে কঠোর হতে ও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে। ছোট ছোট অনেক জমাত তৈরি করে, যেন পর্যায়ক্রমে তারা ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ দলে যোগ দেয়।
শিয়া আব্দুল ওয়াহহাব হুসাইনও এ সংগঠনে অনেক অবদান রাখে। কিভাবে নিরাপত্তা বাহিনী ও তদন্তকারীদের সাথে আচরণ করতে হবে, কিভাবে বিব্রতকর প্রশ্নসমূহের উত্তর দিতে হবে, কিভাবে সামাজিক চাহিদা পূরণ করতে হবে, কিভাবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট ও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে সে ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’কে দিকনির্দেশনা প্রদান করত।
‘খতিব আব্বাস হাবিল’ আব্দুল ওয়াহহাব ও আব্দুল আমির জামরি থেকে মুহাম্মদ রিয়াশের মাধ্যমে উপরোক্ত আবদুল ওয়াহাব হুসাইন থেকে বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্দেশনা গ্রহণ করত।
তখনকার বাহরাইনের তথ্যমন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীপরিষদ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন: “‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ ইরানের বিপ্লবী গার্ডের একটি ক্যাম্প উত্তর তেহরানের ‘কারাজ’ ক্যাম্পে একাধিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে”। পরবর্তীতে যখন ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর কর্মকাণ্ডের সাথে ইরানের সম্পৃক্ততা প্রকাশ পেল, ইরান চাপের মাথায় ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর ব্যাচগুলোকে হিযবুল্লাহ লেবাননের ক্যাম্পে স্থানান্তর করে।
‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এসব ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যেমন অস্ত্র, বোমা, আত্মরক্ষার কৌশল, তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা ও প্রতারণার শিল্প ইত্যাদি।
১৯৯৬ই. সালের ঘটনার সাথে জড়িত হিযবুল্লাহর কতক ব্যক্তিবর্গ নিম্নরূপ: ক. আলি আহমদ কাজেম মুতকাওয়ি, ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর ফাইন্যান্স কিমিটির সদস্য ও ইরানি গোয়েন্দা বিভাগের সাথে সমন্বয়কারী। খ. আদেল শালাহ, সামরিক শাখার সদস্য। গ. খলিল সুলতান, প্রচার সম্পাদক। ঘ. জাসেম হাসান মানসুর আল-খাইয়াত, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির সদস্য। ঙ. কুয়েত প্রবাসী শায়খ মুহাম্মদ হাবিব, হুসাইন আহমদ মুদাইফি, হুসাইন ইউসুফ আলি, খলিল ইবরাহিম ঈসা আল-হায়েকি।
তাদের সন্ত্রাস ও বিদ্রোহের ফলে সে বছর বাহরাইনের ক্ষতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৬৫৮,২২৪,১৫ ডলার।
এ সব ঘটনার পর, বাহরাইন সরকার কর্তৃক শিয়াদের প্রতি প্রচুর ছাড় দেওয়া এবং শিয়া হুসাইনি ডেরাসমূহের খতিব, কালো পাগড়িধারী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর কর্মকর্তা যেমন শিয়া আলি সুলাইমান, আব্দুল আমির জামরি ও মুহাম্মদ সনদ প্রমুখ নেতৃবর্গের প্রতি বাহরাইন সরকারের ক্ষমাসূলভ আচরণ ও তাদের কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা দেওয়া সত্বেও তারা এখনও তাদের নিজেদেরকে বিভিন্ন প্রকার ধ্বংসযজ্ঞ ও সন্ত্রাসের সাথে সংশ্লিষ্ট রেখেছে। তাদের সর্বশেষ জঘন্য ঘটনা ২০০৬ই. সালে বাহরাইনের সরকারের নিকট প্রকাশ পায়, যা ছিল একটি ইরানি ষড়যন্ত্রের নীলনকশা, যেমন বাহরাইনের বিভিন্ন জায়গায় শিয়াদের নামে জমি ক্রয় করে সেখানে তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা, ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর সদস্যদেরকে বাহরাইনের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থাকে সহযোগিতা করা, যাদের সম্পর্ক ইরানের সাথে রয়েছে।
বাহরাইনের নিরাপত্তা বাহিনীর রিপোর্টে প্রকাশ যে, হিযবুল্লাহ বাহরাইনকে পুনরায় সংগঠিত ও নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে এবং তার সদস্যদেরকে তেহরানের নিকটবর্তী “ইমাম আলি ব্যারাকে” একাধিক ব্যাচে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর একাধিক প্রতিনিধি ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ এর একাধিক শীর্ষ নেতার সাথে বৈঠকে বসেন, যেমন ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ এর ইকরাম বারাকাত ও ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর সামরিক শাখার নেতৃবর্গ। তাদের বৈঠক প্রথমে দামেস্ক ও পরবর্তীতে বৈরুতে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিয়াদের আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়, যেমন কিভাবে শিয়াদের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে ও ইরানি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে ইত্যাদি। এতে ‘হাসান নাসরুল্লাহ’ বাহরাইনি শিয়া যোদ্ধাদেরকে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
তাদের স্বীকারোক্তি থেকে প্রমাণিত যে, তাদের আলোচনার কতক বিষয় ছিল বাহরাইনি শিয়াদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা, উভয় পক্ষের সাহায্য ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাহরাইনের অর্থনীতিতে শিয়া ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, মৌলিক কতিপয় পণ্যের উপর তাদের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করা, যেন চাপ প্রয়োগ করে সরকার থেকে স্বার্থ আদায় করা সম্ভব হয়।
অনুরূপ ইরানি গোয়েন্দা বিভাগ বাহরাইনের সংসদ নির্বাচনে শিয়াদের ইতিবাচক অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে ও তাদেরকে সমর্থন জানায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের জন্য শিয়াদের সর্বাত্মক সাহায্য করে, যেন তারা নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইন পাসে সক্ষম হয়। ইরান এভাবেই তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে, কারণ তারা সবাই উপসাগর ও আরব ভূমিতে ইরানের স্বার্থ ও তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছে।
হিজাযী হিযবুল্লাহ (মক্কা-মদীনায় হিযবুল্লাহ্)
১৯৭৯ই. সালে ইরানে খোমেনি বিপ্লব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ইরানি সরকার সৌদি আরবে তার অনুসারীদের সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, যার সূত্র ধরে ১৪০০হি. কাতিফে শিয়া বিদ্রোহ দেখা দেয়, যার শ্লোগান ছিল:
১. ‘আমাদের আদর্শ হুসাইনি, আমাদের নেতা খোমেনি’। ২. ‘সৌদি সরকারের পতন ঘটবে’। ৩. ‘পতন ঘটবে ফাহাদ ও খালেদের’, ইত্যাদি।
ইরানে খোমেনি বিপ্লবের পর ইরান-সৌদি আরবের শিয়াদের মাঝে যখন গভীর সম্পর্ক কায়েম হয়, তখন ইরানের পক্ষ থেকে হাসান সাফফারের নেতৃত্বে সৌদি আরবে একটি শিয়া সংগঠন তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যার নাম হবে: منظمة الثورة الإسلامية لتحرير الجزيرة العربية ‘জাজিরাতুল আরবের স্বাধীনতাকামী ইসলামি বিপ্লবী সংগঠন’। পরবর্তীতে তার নাম নির্ধারণ করা হয়: منظّمة الثورة الإسلامية في الجزيرة العربية ‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক ইসলামি বিপ্লবী সংগঠন’। এ সংগঠনের লক্ষ্য ছিল নিম্নরূপ:
১. ইরানি বিপ্লবকে রক্ষা করা এবং ইসলামি বিশ্বে তা রপ্তানি করণের কাজ সুগম করা।
২. ইসলামি সুন্নি সরকার থেকে জাজিরাতুল আরব-সৌদিকে মুক্ত করা এবং তাতে ইরানের আদলে শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করা।
অতএব তাদের দৃষ্টিতে সৌদি সরকার ও উপসাগরীয় অন্যান্য সরকারগুলো তাগুতি কুফরি। এ সংগঠন নিজেকে খোমেনি বিপ্লবের একটি অংশ জ্ঞান করে। সংগঠনের মুরব্বি ও অভিভাবক শায়খ হাসান সাফফার বলেন: “আমরা ইরান থেকে দিক-নির্দেশনার মত অনেক কিছু প্রত্যাশা ও দাবি করি, যা ইসলামি বিপ্লব জন্ম দিতে সক্ষম”।
এ সংগঠন মনে করে, ইসলামি বিপ্লব বাস্তবায়ন করার জন্য তিনটি শর্ত পুরো করা জরুরি:
১. নেতৃবৃন্দের হিজরত করা ও বহির্বিশ্ব থেকে তার দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া, কারণ প্রবাসে বসে অধিক স্বাধীনতা অর্জন করা যায়। এ ছাড়া একাধিক অনারব সংগঠন ও সংস্থার প্রয়োজন, যারা অত্র সংস্থাকে বৈষয়িক ও তাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ করবে।
২. অস্ত্র ব্যতীত শিয়া বিপ্লবে সফলতা আসবে না।
৩. এ সংগঠনের সহযোগী একাধিক সংগঠন তৈরি করা জরুরি।
‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক ইসলামি বিপ্লবী সংগঠনে’র প্রথম কার্যালয় ছিল ইরানে, তারপর দামেস্কে এবং সর্বশেষ লন্ডনে স্থায়ী কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সংগঠন থেকে ১৯৮০ই. দশকে «الثورة الإسلامية» ‘ইসলামি বিপ্লব’ নামে একটি পত্রিকা বের করা হয়।
সংগঠন ও তার থেকে প্রকাশিত পত্রিকার স্পর্শকাতর নাম থেকে তাদের অভিজ্ঞতা হল, এ নাম তাদের স্বার্থের উপযোগী নয়, এভাবে জনগণের মাঝে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে না। অতএব কৌশলগত কারণে ১৯৯০ই. সালের শেষে ও ১৯৯১ই. সালের প্রথম দিকে «منظمة الثورة الإسلامية في الجزيرة العربية» নাম পরিবর্তন করে «الحركة الإصلاحية [الشيعية] في الجزيرة العربية» ‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক [শিয়া] সংস্কার আন্দোলন’ রাখা হয়। আর «الثورة الإسلامية» ম্যাগাজিনের নাম পরিবর্তন করে «مجلة الجزيرة العربية» রাখা হয়।
অনুরূপ এ সংস্থাটি «دار الصفا» ‘দারুস সাফা’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করে তার মাধ্যমে সৌদি সমাজের বিরুদ্ধে অপবাদ ও উসকানি প্রচার করতে থাকে। তার আরেকটি কাজ ছিল সংগঠনের অর্থ সাহায্য সংগ্রহের নিমিত্তে নানা তথ্য সংগ্রহ ও রিপোর্ট তৈরি করে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইয়াহূদী সংস্থাসমূহে সরবরাহ করা। উল্লেখ্য এ সংস্থার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক সাংসদদের সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল।
১৯৯১ই. সাল থেকে ১৯৯৩ই. সাল পর্যন্ত «مجلة الجزيرة العربية» এর প্রায় ত্রিশটি সংখ্যা বের হয়। এ সময়ে পত্রিকাটি বহির্বিশ্ব থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ সাহায্য লাভ করে, তার উদ্দেশ্য ইসলামি সরকার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা এবং সৌদি আরবে বিশৃঙ্খলা, ফেতনা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি করা। পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিল হামজাহ হাসান এবং তার নির্বাহী সম্পাদক ছিল আব্দুল আমির মুসা।
তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যেহেতু একাধিক সংস্থা তৈরির পরিকল্পনা ছিল, তাই তারা «منظمة الثورة الإسلامية في الجزيرة العربية» এর অধীন لجنة حقوق الإنسان ‘মানবাধিকার সংস্থা’ তৈরি করে। এ সংস্থাকে তারা নিজেদের থেকে দূরে রাখে, তবে আমেরিকান সরকারের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে বলে, যেন তার সাথে আমেরিকান ও ইয়াহূদী অনেক সংস্থার গভীর সম্পর্ক কায়েম হয়। তাছাড়া তারা এর কিছু শাখা সংগঠনও তৈরী করে।
তারা «اللجنة الدولية لحقوق الإنسان في الخليج والجزيرة العربية» ‘উপসাগর ও আরব উপদ্বীপে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা’ নামে সংস্থা তৈরি করে। এ সংস্থা "Arabia moniter" নামে একটি ম্যাগাজিন বের করে ইংরেজি ভাষায়, তার অধিকাংশ প্রবন্ধ ছিল বাড়াবাড়ি, অপবাদ ও মিথ্যায় ভরপুর, বিপ্লবী আন্দোলন ও তার চিন্তাধারা তো তাতে ছিলই।
এ সংগঠনের ওয়াশিংটন অফিসের কর্মকর্তা ছিল জাফর শায়েব, লন্ডন অফিসের কর্মকর্তা ছিল বু খামিস, আর সাদেক জাবরান কেন্দ্রীয় অফিসে তাদের সহযোগী ছিল। এ সংগঠনের অপর সক্রিয় কর্মী হচ্ছে তাওফিক সাইফ, যে ইতোপূর্বেالحركة الإصلاحية الشيعية في الجزيرة العربية এর সেক্রেটারি জেনারেল ছিল।
‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক [শিয়া] সংস্কার আন্দোলনে’র সক্রিয় কতক কর্মকর্তা [যারা ইতঃপূর্বে ‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক ইসলামি বিপ্লবী সংগঠনে’ কর্মরত ছিল] নিম্নরূপ:
১. হাসান আস-সাফফার, প্রতিষ্ঠাতা, পরামর্শদাতা ও অভিভাবক।
২. তাওফিক সাইফ, সাধারণ সম্পাদক।
৩. হামজা আল হাসান, «الجزيرة العربية» ম্যাগাজিনের চীফ এডিটর।
৪. মির্জা খুওয়াইলিদি, প্রকাশনা বিভাগের ম্যানেজার।
এ ছাড়াও আছেন আদেল সুলাইমান, হাবিব ইবরাহিম, ফুওয়াদ ইবরাহিম, মুহাম্মদ হুসাইন, যাকি মিলাদি, ঈসা মায‘আল, জাফর শায়েব, সাদেক জাবরান ও ফাউজি প্রমুখগণ।
১৯৯৩ই. ও ১৯৯৪ই. সালে ‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক [শিয়া] সংস্কার আন্দোলন’ ও সৌদি সরকার এক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যাতে উভয়ে এ বিষয়ে একমত হয় যে, বহির্বিশ্বে শিয়া সংস্থার সকল অফিস বন্ধ করা হবে, সেখান থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিনের প্রকাশনা বন্ধ করা হবে, বহির্বিশ্বে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হবে, ইয়াহূদী ও অন্যান্য সংস্থার সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে এবং সামাজিক ও সরকারী সংস্থার সাথে তারা কাজ করবে।
ইরানি খোমেনি বিপ্লবের হাকিকত যখন প্রকাশ পেল; মানুষ জেনে গেল যে, এটা শুধু সাম্প্রদায়িক বিপ্লব, যার উদ্দেশ্য অত্র অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা; মানুষ আরো জানল যে, তারা দীন ও রাজনৈতিক ব্যাপারে ‘তাকইয়া’ (প্রকাশ্যে কিছু বলে মানুষকে ধোকা দেওয়া) নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে; তখন এসব বিষয় চিন্তা করে তাদের কেউ দেশের অভ্যন্তরে কাজ করার নিমিত্তে সৌদিতে ফিরে আসে। কেউ দেশের বাইরে থেকে যায়, ভাইদের শুরু করা কাজ সমাপ্ত করা ও তাদের কর্ম অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে।
যদিও চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তবুও তাদের অনেকে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হয়নি।
তারা ২০০৬ই. সালের অক্টোবর মাসে সৌদি আরবের কাতিফ জেলায় সর্বশেষ বিদ্রোহ করে। এক শিয়া মাহফিলে হাসান সাফফার ঘোষণা করেন, যদি সৌদি সরকার শিয়াদের দাবি না শুনে, তাহলে শিয়া অঞ্চলে ইরানি বিপ্লব ঘটিয়ে দেব, যেমন ঘটিয়েছিলাম ১৪০০হি. সালে এবং মক্কায় ১৪০৭হি.।
(হিযবুল্লাহ হিজায এর) সামরিক উইং
১৯৮৭ই. সালে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়েمنظّمة الثورة الإسلامية في الجزيرة العربية এর অধীন একটি সামরিক শাখা তৈরি করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় حزب الله الحجاز‘হিজাযী হিযবুল্লাহ’। এ গ্রুপটি ইরানের শিয়া সরকার ও তার সেনা সদস্যের সাথে সমন্বয় করে হজ ও অন্যান্য মৌসুমে সৌদি আরবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
ইরানি প্রজাতন্ত্রের চৌকস সেনাবাহিনীর পরামর্শে এ দলটি গঠন করা হয়। তার নেতৃত্বে ছিল ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা আহমদ শারিফি, পরিকল্পনা মোতাবেক কতক সৌদি শিয়াকে ইরানের ‘কুম’ নগরীতে পড়া-শুনার জন্য প্রেরণ করা হয়। সৌদি আরবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে যখন ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ ও ‘জাজিরাতুল আরব ভিত্তিক ইসলামি বিপ্লবী আন্দোলনে’র মাঝে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ দেখা দিল, ইরান আহমদ শারিফির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ এর উপর সামরিক কর্মকাণ্ড ন্যস্ত করে উভয়কে পৃথক করে দেয়।
১৪০৭হি. হজের মৌসুমে ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ ইরানি বিপ্লবী গার্ডের সমন্বয়ে বড় বিক্ষোভের আয়োজন করে, যার উদ্দেশ্য ছিল হাজিদের হত্যা করা, জনগণের সম্পদ বিনষ্ট করা এবং মসজিদে হারাম ও অন্যান্য পবিত্র স্থানসমুহে ফেতনার সৃষ্টি করা।
অনুরূপ তারা কুয়েতি হিযবুল্লাহর সাথে মিশে মক্কার সুড়ঙ্গ পথে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করেছিল, যে কারণে শত শত হাজি মারা যায় ও আহত হয়।
৯/২/১৪১৭হি. মোতাবেক ২৫/৬/১৯৯৬ই. সালে ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ ‘খুবার’ শহরে এক আবাসিক হোটেলে বিরাট গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। তারা গাড়িটি জনবহুল এলাকায় দাঁড় করিয়ে অপর গাড়ি করে দ্রুত পালিয়ে যায়, যার চার মিনিট পরেই বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এ কাজে অংশ গ্রহণকারী শিয়া সম্প্রদায়ের কতক ব্যক্তিবর্গ হচ্ছে: হানি সায়েগ, মোস্তফা কাসসাব, জাফর শাবিখাত, ইবরাহিম ইয়াকুব, আলি হাজুরি, আব্দুল কারিম নাসির, আহমদ মুগতাসাল, যাকে ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ এর সামরিক কর্মকর্তা ও খুবার শহরে বোমা বিস্ফোরণে প্রত্যক্ষ নেতৃত্বদানকারী গণ্য করা হয়। আরো কতিপয় যেমন হুসাইন আলে মুগিস, আব্দুর রহমান জারাশ, শায়খ সায়িদ আল-বিহার, শায়খ আব্দুল জলিল সামিন প্রমুখগণ।
খুবার নগরে আবাসিক হোটেলে বোমা বিস্ফোরণের পর কানাডায় হানি সায়েগকে গ্রেফতার করা হয়, অতঃপর আমেরিকার মাধ্যমে তাকে সৌদি হস্তান্তর করে। আর আব্দুল কারিম, আহমদ মাগলাস, ইবরাহিম ইয়াকুব ও আলি হুরি ইরান পলায়ন করে। ‘শাবিখাত’কে সিরিয়ায় আটক করার একদিন পর সেখানকার কোনো এক জেলখানায় আত্মহত্যার নাটক করে তাকে হত্যা করা হয়, অতঃপর তাকে সিরিয়া থেকে ফেরারি ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, ইরানের পরামর্শে গোয়েন্দাদের দ্বারা তাকে হত্যা করা হয়, যেন খুবার আবাসিক হোটেলে বোমা বিস্ফোরণের মূল তথ্য ফাঁস না হয়।
‘হিযবুল্লাহ হিজায’ এর অপর গুরুত্বপূর্ণ নেতা হচ্ছে, আব্দুল কারিম হুসাইন নাসের।
তাছাড়া আরও রয়েছে, ফাদেল আল উলবী, আলী মারহূন, মুস্তফা আল-মু‘আল্লিম, সালেহ রমদান, যাদেরকে বোমা বিস্ফোরণের পূর্বেই এ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সময় গ্রেফতার করা হয়। ফলে আহমদ মাগসাল এ বিস্ফোরণের দায়িত্ব অন্য শাখাকে প্রদান করে।
‘হিযবুল্লাহ হিজায’ এর অপর নেতৃবৃন্দ হলেন: শায়খ জাফর আলি মুবারেক, আব্দুল কারিম কাজেম আল-হাবিল ও হাশেম সাখস, তারা সবাই ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ এর পৃষ্ঠপোষক ও তার অর্থ যোগানদাতা।
এ ছাড়া আরো অনেক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ রয়েছে, যাদের সমন্বয়ে ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠনরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারা ইরান ও লেবাননে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সৌদি ইসলামি হুকুমতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যেন সৌদি সরকারকে উৎখাত করে ইরানের আদলে একটি শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করা সম্ভব হয়।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে ‘হিযবুল্লাহ হিজায’ এর একাধিক সদস্যকে গ্রেফতার হয়, অনেকে «منظمة الثورة الإسلامية في الجزيرة العربية» সংগঠন থেকে অব্যাহতি নেয়, আবার অনেকে প্রবাস জীবনে গিয়ে রাজনীতি ও শিয়া মতবাদ প্রচারে আত্মনিয়োগ করে। বর্তমানেও তারা সৌদি সরকার থেকে আরব ভূমিকে মুক্ত করার ষড়যন্ত্র, সরকারের বিরোধিতা করা ও তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। অনুরূপ বিভিন্ন দেশে রয়েছে তাদের নানা ওয়েব সাইট, যেখানে সৌদি সরকারের কুৎসা রটনা ও ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পক্ষে প্রতিনিয়ত প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সংবাদ প্রচার করা হয়।
কুয়েতি হিযবুল্লাহ
‘হিযবুল্লাহ লেবানন’র পর আশির দশকে হিযবুল্লাহ কুয়েতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শুরুতে সংগঠনটি নতুন নতুন নাম গ্রহণ করে, যেমন: «طلائع تغيير النظام للجمهورية الكويتية» ‘প্রজাতন্ত্র কুয়েতি সরকার পরিবর্তনকারী বাহিনী’। কখনো নাম ধারণ করে«صوت الشعب الكويتي الحر» ‘স্বাধীন কুয়েতি জাতির কণ্ঠ’। কখনো নাম ধারণ করে منظمة الجهاد الإسلامي ‘ইসলামি জিহাদের সংগঠন’। কখনো নাম ধারণ করে «قوات المنظمة الثورية في الكويت» ‘কুয়েত ভিত্তিক বিপ্লবী সংস্থার বাহিনী’ সবক’টি সংগঠনের পশ্চাতে রয়েছে ‘হিযবুল্লাহ কুয়েত’।
ইরানের ধর্মীয় মারকাজ ‘কুম’-এ পড়ুয়া ছাত্ররা এসব শাখা-প্রশাখা তৈরি করেছে, যার অধিকাংশ সদস্যের সম্পর্ক প্রজাতন্ত্র ইরানি বিপ্লবী গার্ডের সাথে, তারা সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে।
তেহরানে অবস্থিত المركز الكويتي للإعلام الإسلامي! في طهران ‘ইসলাম প্রচারের জন্য তেহরানে অবস্থিত কুয়েতি মারকাজ’ থেকে «النصر» নামে একটি ম্যাগাজিন বের হত, যা হিযবুল্লাহ কুয়েতির চিন্তা ও আদর্শের মুখপাত্র ছিল।
ম্যাগাজিনটি কুয়েতি হিযবুল্লাহকে উসকে দেয়, যেন তারা শিয়াদের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে, সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ও ইরানের আদলে একটি বন্ধু রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য প্রাণ-পণ চেষ্টা করে।
‘হিযবুল্লাহ কুয়েত’ও তাদের প্ররোচনায় দেশের অভ্যন্তরে ফেতনা সৃষ্টি, বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ ও গুমের ন্যায় জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়, দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ইরানি আদলে আরেকটি শিয়া রাষ্ট্র গঠন করার উদ্দেশ্যে।
“হিযবুল্লাহ কুয়েত’কে ইরানি শিয়া বিপ্লবের একটি অঙ্গ-সংঘটন জ্ঞান করা হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী। তারা বিশ্বাস করে, আলে-সাবার কুয়েতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই”।
‘হিযবুল্লাহ কুয়েত’ বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লিপ্ত হয়, যেমন: ২৫-৫-১৯৮৫ই. সালে «حزب الدعوة» ‘হিযবুদ দাওয়াহ’ নামে একটি শিয়া সংগঠন ন্যক্কারজনক যে কাণ্ড করে তারা সেটাকে সমর্থন জানায়। ঘটনাটি ছিল এই যে, যখন আমিরের গাড়ি বহর ‘দাসমান’ মহল থেকে বের হয়ে ‘সাইফ’ মহলে যাচ্ছিল। আমিরের গাড়িবহর দেখে ট্রাফিক সকল রাস্তার সিগন্যাল বন্ধ করে দু’পাশের রাস্তাগুলো খোলা রেখে দেয়, যেন গাড়িবহর থেকে কোনো গাড়ি ডানে-বামে যেতে চাইলে যেতে পারে। এ মুহূর্তে হটাৎ পার্শ্ব থেকে একটি গাড়ি গাড়িবহরের সামনে চলে এলো, সিকিউরিটি গার্ড তাকে থামাতে চেষ্টা করল, কিন্তু গাড়িটি সেখানেই বিকট আওয়াজে বিস্ফোরিত হল, ফলে সিকিউরিটির প্রথম গাড়িটি যাত্রীসহ পুড়ে গেল, যাত্রীদের মধ্যে ছিল মুহাম্মদ আনাজি ও হাদি শামরি। বিস্ফোরণটি সিকিউরিটি গার্ডের দ্বিতীয় গাড়িকেও জোড়ে ধাক্কা দিল, ফলে বাম-পাশ থেকে আমিরের গাড়িকে আঘাত করে ফুটপাতে গিয়ে আছড়ে পড়ে, কিছুক্ষণের মধ্যে তাতেও আগুন ধরে।
1২-জুলাই ১৯৮৫ই. সালে কুয়েত সিটিতে দু’টি কফির দোকানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যার কারণে অনেকের প্রাণহানি ঘটে ও অনেকে জখম হয়।
২৯-এপ্রিল ১৯৮৬ই. সালে কুয়েতের নিরাপত্তা বাহিনী ঘোষণা করে যে, ১২-জন সন্ত্রাসী কুয়েতি এয়ার লাইনের ৭৪৭-বোয়িং বিমান অপহরণ করে পূর্ব এশিয়ার কোনো অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তারা নস্যাৎ করে দিয়েছে। এটাও কুয়েতি হিযবুল্লাহর কর্ম ছিল।
১৯৮৮ই. সালের ৫-এপ্রিল আলি আকবর মুহতাশেমী ‘হিযবুল্লাহ’ কুয়েতির নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দেয় যে, তারা ইমাদ লেবাননির নেতৃত্বে ব্যাংকক থেকে আগত কুয়েতি এয়ার লাইনের ‘আল-জাবেরিয়া’ বিমান অপহরণ করে ইরানের ‘মাশহাদ’ নামক স্থানে পৌঁছে দিবে; আর তা ছিল লিবাননের হিযবুল্লাহ কমাণ্ডার ইমাদ মাগনিয়া’ এর নেতৃত্বে। বর্তমানে এ ইমাদ মাগনিয়াই লেবাননের হিযবুল্লাহর সশস্ত্র চীফ কমাণ্ডার ।
তারা বিমানটি অপহরণ করতে সক্ষম হয়, বৈরুতে অবতরণ করার অনুমতি চাইলে কর্তৃপক্ষ নিষেধ করে দেয়। অতঃপর সাইপ্রাসের লারনাকা বিমান বন্দরের দিকে রওয়ানা করে, ইতোমধ্যে তারা আবদুল্লাহ আল-খালেদী ও খালেদ আইয়ূব নামীয় দু’জন কুয়েতি নাগরিককে গুলি করে হত্যার পর বিমানের বাইরে ফেলে দেয়। সর্বশেষ বিমানটি আলজেরিয়ায় গিয়ে অবতরণ করে, সেখান থেকে অপহরণকারীদের ছেড়ে দেয়া হয়।
এ ঘটনার মাধ্যমে হিযবুল্লাহ কুয়েত সরকারের নিকট দাবি জানায় যে, তাদের কয়েদিদের ছেড়ে দেওয়া হোক, যাদেরকে ১৯৮৩ই. সালে «الجهاد الإسلامي» সংগঠনের নামে বোমাবাজির কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে। উল্লেখ্য তারা একই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল কেন্দ্র, কুয়েত ইন্টারন্যাশনাল এয়ার পোর্ট, আমেরিকান ও ফ্রান্সের দূতাবাস, পেট্রোল শোধনাগার এবং আবাসিক এলাকাসমূহে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যে কারণে অনেক মানুষ হতাহত হয়। নিহতে সংখ্যা ৭ এবং আহতের সংখ্যা প্রায় ৬২। তারা সবাই সাধারণ নাগরিক ছিল, কেউ পেট্রোল শোধনাগারের ইঞ্জিনিয়ার এবং কেউ আবাসিক প্রকল্পের শ্রমিক।
অনুরূপ তারা ১৯৮৩ই. সালের প্রথমার্ধে একটি কুয়েতি এয়ার লাইন্স অপহরণ করে, যাতে প্রায় ৫০০ যাত্রী ছিল, যা নিয়ে তারা ইরানের মাশহাদ নামক এয়ার পোর্টে অবতরণ করে।
কুয়েতি হিযবুল্লাহর সাথে উপসাগরীয় হিযবুল্লাহর সকল গ্রুপের সম্পর্ক ছিল। কুয়েতি হিযবুল্লাহ ইরাকি সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া অস্ত্র ও গোলা-বারুদ হস্তগত করে ১৯৯৬ই. সালে বাহরাইনি হিযবুল্লাহর নিকট হস্তান্তর করে, যেন তারা হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করতে পারে।
১০-জনু ১৯৯৬ই. সালে «الأنباء الكويتية» পত্রিকা প্রকাশ করে যে, ‘হিযবুল্লাহ কুয়েত’ ইরাকি সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া অস্ত্র ‘হিযবুল্লাহ বাহরাইন’ এর নিকট চালান করেছে ।
‘হিযবুল্লাহ কুয়েত’ রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় থেকে কতক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নব্বইয়ের দশকে আরেকটি কাণ্ড করে, তারা পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে তাকইয়া (তথা মিথ্যাচারের) আড়ালে রাজনৈতিক চুক্তি ও সমঝোতা করে এবং الائتلاف الإسلامي الوطني ‘জাতীয়তাবাদী ইসলামি জোট’ নামে একটি দল গঠন করে, যেন তাদের লক্ষ্য ও কৌশলগত পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
এ জোটের কতক প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃবৃন্দ নিম্নরূপ: মুহাম্মদ বাকের মাহরি, আব্বাস ইবনে নাখি, আদনান ইবনে আব্দুস সামাদ, ড. নাসের সারখুহ ও ড. আব্দুল মুহসিন জামাল।
ইরানের শিয়া সরকার নতুনভাবে এ দলের সাথে কর্মকাণ্ড আরম্ভ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর রিপোর্টে প্রকাশ , দক্ষিণ ইরাকে শিয়ারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সেটাকে বিপ্লবী বর্ডার গার্ড ও ইরানী গোয়েন্দাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য কুয়েতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানো এবং একটি শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করা। রিপোর্ট থেকে আরো জানা যায় যে, তারা কুয়েতি শিয়াদের নিকট বিভিন্নভাবে অস্ত্র পাচার করছে, যাদের সম্পর্ক ইরানের সাথে।
আল্লাহ তা‘আলা কুয়েত ও অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে শিয়াদের ষড়যন্ত্র থেকে হিফাজত করুন।
হিযবুল্লাহ ইয়ামেন (ইয়ামেনের মাটিতে হিযবুল্লাহ)
‘হিযবুল্লাহ ইয়ামান’ নামে ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ এর একটি শাখা ছিল , কিন্তু ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ ও তার অঙ্গ-সংগঠনের হত্যা, গুম ও অপহরণের ন্যায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে ইয়ামানি জনগোষ্ঠী এ জাতীয় সংগঠন ও তার শাখা-প্রশাখা প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তারা দ্বাদশ ইমামিয়া শিয়াদের দীনি আকিদা ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে ইয়ামেন সমাজকে করায়ত্ব করতে চেয়েছিল। তাই ইয়ামানি শিয়ারা এ নামের পরিবর্তে الشباب المؤمن নাম গ্রহণ করে। এটা খ্রিস্টীয় নব্বই দশকের ঘটনা। ফলে বেশ কিছু যাইদিয়া শিয়া এতে যোগ দেয়, যারা ইতিপূর্বে শিয়া ‘দ্বাদশ ইমামিয়া’ গ্রুপে যোগ দিয়েছিল। আবার কতিপয় যাইদিয়া যারা ‘দ্বাদশ ইমামিয়া’ হয়নি, তাদেরকেও প্রতারণা করে এ সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেন ইয়ামানে ইরানি শিয়াদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাদেরকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো যায়।
‘হিযবুল্লাহ ইয়ামেন’ এর প্রধান হচ্ছে হুসাইন বদরুদ্দিন হাউসি তার পিতার নাম বদরুদ্দিন হাউসি। তারা প্রথমে শিয়া ‘যাইদিয়া’ সম্প্রদায়ের শাখা জারুদিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল, হাউসি অল্প বয়সেই ‘জারুদিয়া’ ফেরকা থেকে শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়া ফেরকায় যোগ দেয়। অতঃপর সে ইরান গিয়ে খোমেনির আদর্শ গ্রহণ করে নিজেকে পাক্কা দ্বাদশ ইমামিয়া প্রমাণ করে।
তার অনুসারী কয়েকজন বলেছেন, ১৯৯৭ই. সালে সে জারুদিয়া ফেরকা থেকে ‘জাফরি শিয়া’ মতবাদ গ্রহণ করে, যার অপর নাম ‘শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়া’।
দ্বাদশ ইমামিয়া মতবাদ গ্রহণ করার ফলে ইয়ামানের যাইদিয়া আলেমগণ হাউসি ও তার আন্দোলন থেকে নিজেদের বিমুক্ত ঘোষণা করেন, তারা بيان من علماء الزيدية শিরোনামে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। এতে তারা হাউসির দাবিসমূহ প্রত্যাখ্যান করে মানুষদের সতর্ক করেন যে, আহলে বায়ত কিংবা যাইদী মতবাদের সাথে হাউসির কোনো সম্পর্ক নেই।
‘শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়া’দের ধারণা তাদের মাহদি বের হওয়ার পূর্বে অনেক বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সংগঠিত হবে। ইরানি গবেষক আলি কোরানি জোর দিয়ে বলেন: এ বিপ্লবের নেতা হবে যায়েদ ইবনে আলির বংশধর থেকে। বিভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে যে, তার নাম হাসান অথবা হুসাইন হবে এবং সে বের হবে ইয়ামানের এক গ্রাম থেকে, যার নাম হবে ‘কার‘আহ’। কোরানির মতে এটা ‘সা‘দাহ’ অঞ্চলের নিকটবর্তী।
এভাবে সে হাউসির বিপ্লব ও বিজয়ের প্রতি ইংগিত করেছে, যা তাদের মাহদির বিপ্লবের পূর্বাভাস!
হাউসি যে চিন্তা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে আহ্বান করে তার নির্যাস হচ্ছে শিয়াদের ইমামত ও ওসিয়ত এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। তাদের ঈমান হচ্ছে সাহাবিদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা, বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশেদিন; কারণ তাদের নিকট তারাই সকল সমস্যার মূল কারণ। তার দাওয়াতের অপর বিষয় হচ্ছে শরীয়ত ত্যাগ কর, শরীয়ত সাহাবিদের মাধ্যমে প্রাপ্ত।
বদরুদ্দিন হাউসি বলেন: “আমি নিজে সাহাবিদের কুফরিতে বিশ্বাসী, কারণ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করেছে”। বদরুদ্দিন হাউসি ‘খুমুস’ আদায় করে তার নিকট জমা করার নির্দেশ দিয়েছে। এ বিধান সে শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়াদের থেকে গ্রহণ করেছে।
হাউসি নিজেকে শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়া প্রমাণ করার জন্য ‘কারবালার মাটি’ সংগ্রহ করে তার উপর সেজদা করে।
হাউসি ও তার পরিবার ইতোপূর্বে যাইদিয়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সংগঠন ‘হিজবুল হক’ এর সদস্য ছিল। তার থেকে আলাদা হয়ে হাউসি الشباب المؤمن ‘মুমিন যুবক’ নামে নতুন দল গঠন করে। উত্তর ইয়ামানের ‘সা‘দা’ নামক স্থানে এ সংগঠনটি সন্ত্রাসী ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড করে।
ইরান হাউসিকে অর্থনৈতিক, তাত্ত্বিক ও সামরিক যোগান দেয়, যেন সে ইয়ামানে খোমেনি বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়।
ইতোপূর্বে হিযবুল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য হাউসি লেবানন গিয়েছিল, যেমন নব্বইয়ের দশকে সে ইরান গিয়েছিল। ১৯৯৭ই. সালের মধ্যবর্তী সে ইরান থেকে ইয়ামান ফেরত আসে।
‘সান‘আ’য় অবস্থিত ইরানি দূতাবাস দ্বারা ইরান ‘হাউসি আন্দোলন’ ও ‘শাবাবুল মুমিন’ সংগঠনদ্বয়কে বিভিন্ন অনুদান প্রদান করে। এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ইরান উত্তর ইয়ামানের ‘সা‘দায়’ আন্দোলনরত হাউসিকে প্রত্যক্ষ ও তার অঙ্গ-সংগঠনকে পরোক্ষভাবে ‘সান‘আ’য় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের মাধ্যমে ৪২-মিলিয়ন ইয়ামানি রিয়াল প্রদান করে।
এ অনুদান ব্যতীত অন্যান্য শিয়া সংগঠন থেকেও প্রচুর অর্থ হাউসি ও তার সমর্থকরা লাভ করে, যেমন ইরানের কুম নগরীতে অবস্থিত مؤسسة أنصارين ‘মুয়াসসাসাতু আনসারিন’, লন্ডনে অবস্থিত مؤسسة الخوئي ‘মুয়াসসাসাতুল খুঈ’, কুয়েতে অবস্থিত مؤسسة الثقلين ‘মুয়াসসাসাতুস সাকলাইন’ ও লেবাননের হিযবুল্লাহ থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ সাহায্য লাভ করে। এ ছাড়া আরো অনেক শিয়া সংগঠন ও সংস্থা তাদেরকে অনুদান দেয়।
ইয়ামানি সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সংস্থা বলেছে যে, ইয়ামানে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সময় ও পূর্বে সৌদি শিয়ারা তাদেরকে অর্থ সাহায্য প্রেরণ করেছে।
তাই ইয়ামানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ এক ভাষণে শিয়া ও ইরানি সম্পৃক্ততার প্রতি ইংগিত করে হাউসির বৃহৎ অর্থ ভাণ্ডার সম্পর্কে বলেন, এ অনুদান, অর্থ সাহায্য ও সামরিক প্রস্তুতি কখনো হাউসির পক্ষে ইয়ামান থেকে সংগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
সামরিক সহায়তা সম্পর্কে খবরে প্রকাশ যে, হাউসিকে সামরিক সাহায্য, অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার জন্যে ইরাকি শিয়া ও ইরানি বিপ্লবী গার্ড ইয়ামানে গিয়েছিল।
‘আখবারুল ইয়াউম’ পত্রিকার কোনো এক সংখ্যায় প্রকাশ করেছে যে, বিদ্রোহের সময় আত্মসমর্পণকারী হাউসির একাধিক সদস্য স্বীকার করেছে, তারা ইরানি বিপ্লবী গার্ড ও ইরাকি ফিলাক বদরের সদস্যদের নিকট সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে।
ইয়ামানি বিচার বিভাগ ইয়াহইয়া হুসাইন মুসা দায়লামিকে ইরান ও হাউসির মাঝে গোয়েন্দাগিরির অপরাধে ফাঁসির নির্দেশ প্রদান করে। এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, ইয়ামানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য দায়ী ইরান, তার উসকানিতে হাউসিরা এসব কাণ্ড ঘটিয়েছে। অতএব কোনো সন্দেহ নেই উত্তর ইয়ামানের ‘সা‘দা’য় হাউসিদের ফেতনা সৃষ্টির মূল হোতা হচ্ছে ইরান।
তাছাড়া হাউসি ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তাদের প্রশংসা করে, তাদেরকে আদর্শ জ্ঞান করে, এক পর্যায়ে হাউসি স্বীয় অধিকৃত কয়েকটি এলাকায় ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ এর পতাকা উত্তোলন করে ও বিক্ষোভ মিছিলে তা প্রদর্শন করে।
ইরানের কুম ও ইরাকের নাজাফ গবেষণাগার থেকে দু’টি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে হাউসিদের পক্ষাবলম্বন ও তাদের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান জানানো হয়। হাউসিদের দমন ও প্রতিহত করার কারণে ইয়ামানি সরকারের সমালোচনা করা হয়। ইয়ামানে শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়াদের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের দাবি জানানো হয়। এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে কুম ও নজফস্থ শিয়া ইলমী গবেষণাগার (হাউযা ইলমিয়্যা) ও হাউসি আন্দোলনের মাঝে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। অথচ ইরাকে আহলে-সুন্নাহ নির্মূল করার লক্ষ্যে ‘জায়শে মাহদি’ ও ‘ফায়লাক বদর’ যে হত্যা, গুম ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, সেসব বন্ধ করার জন্য ইরান কোনো ইশতিহার প্রকাশ করেনি।
‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ এর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উদ্দেশ্য
হিযবুল্লাহর প্রকাশ্য উদ্দেশ্য:
‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ মুসলিমদেরকে ধোঁকায় ফেলে তাদের গোপন পরিকল্পনা থেকে গাফেল রাখে। তারা মুসলিমদের অন্তরকে তাদের দিকে ধাবিত ও তাদের সমর্থন হাসিলের জন্য প্রকাশ্যভাবে “ইসরাইলি দখলদারের বিরুদ্ধে লেবাননি ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন” ও “ফিলিস্তিনি পবিত্র ভূমিসমূহ মুক্ত করার আন্দোলন” নাম গ্রহণ করেছে। তাছাড়া ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ ইরান থেকে অর্থ সাহায্য নিয়ে লেবাননে মানবিক ও সামাজিক সেবা প্রদান করে জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়।
হিযবুল্লাহর গোপন উদ্দেশ্য: লেবাননে শিয়া মতবাদের প্রসার ঘটানো, তাদের স্থায়ী অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুগুলো করায়ত্ব গ্রহণ করা ও ইরানের জন্য লেবাননি জমিকে প্রস্তুত করা, যেন যখন ইচ্ছা ইরান লেবানন থেকে তার পার্থিব স্বার্থ, ধর্মীয় লক্ষ্য ও সাম্প্রদায়িক ইচ্ছা পূরণে সক্ষম হয়।
আবার লেবাননের ভূগর্ভস্থ অভ্যন্তরিণ কাঠামোতে আঘাত করে তাকে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়াও তার একটি লক্ষ্য, যেন লেবাননের উপর তারা আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সফল হয়। এভাবে ইসলামি বিশ্বে ইরানি বিপ্লব ব্যাপক করে খোমেনির আদলে শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্র অবশ্যই নস্যাৎ করবেন।
‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ ও খোমেনি এবং তাদের আকিদা
শরীরের সাথে যেরূপ রূহের সম্পর্ক তেমনি খোমেনির সাথে হিযবুল্লাহর সম্পর্ক। ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ ইসলামি বিশ্বে শিয়া মতবাদ প্রচার ও তার বাস্তবায়নে খোমেনিকে আদর্শ জ্ঞান করে ও তার দেখানো পথে হাঁটে।
‘হিযবুল্লাহ লেবানন’-এর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক গুরু হলেন খোমেনি। হিযবুল্লাহকে দিক-নির্দেশনা দেওয়া, তার প্রতি খোমেনির আদেশ ও উপদেশ প্রেরণ করা ও তাদের মাঝে যোগাযোগ রক্ষার জন্য ইরানি সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলকে খোমেনি কর্তৃক দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তাছাড়া হিযবুল্লাহর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও খোমেনি কর্তৃক নির্ধারিত হয়।
ইরানি ধর্ম মন্ত্রণালয় নিজস্ব ওয়েব সাইটে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে হাসান নাসরুল্লাকে লেবাননে ইমাম খোমেনির প্রতিনিধির স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইরানি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান হাসান রিদায়ি পরিচালিত ‘বাজতাব’ «بازتاب» ওয়েব সাইটে প্রকাশ করে, খোমেনি ১৯৮১ই. সালে উত্তর তেহরানের জমারান হুসাইনিয়াতে ‘হরকতে আমালের’ নেতাদের সাথে হাসান নাসরুল্লাহকে অভ্যর্থনা প্রদান করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২১-বছর।
ওয়েব সাইটে আরো প্রকাশ যে, হাসান নাসরুল্লাহ ও তার সাথীদের ইমাম খোমেনি বলেছেন: আপনারা অতিসত্বর লেবাননের সরকারকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবেন।
এ সভায় হাসান নাসরুল্লাহকে ইমাম খোমেনি খুমুস-যাকাত ও কাফফারা উসুল করে সেগুলোকে কল্যাণকর কাজ ও দীনি খাতে খরচ করার অনুমিত প্রদান করেন, খোমেনি এ দায়িত্ব সাধারণত শিয়া কোনো আলেমকে প্রদান করতেন না, এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ‘হাসান নাসরুল্লাহ’ ইরানের খোমেনির খুব বিশ্বস্ত ছিল।
আমাদের এ কিতাবের পরিশিষ্টতে “খোমেনি কর্তৃক হাসান নাসরুল্লাহকে অনুমতি প্রদান ও তাকে প্রতিনিধি স্বীকৃতি দেওয়ার আরবি পত্রের দলিল রয়েছে”। ইমাম খোমেনি হাসান নাসরুল্লাহকে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম আলহাজ্ব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ বলে সম্বোধন করেছেন’। এ জাতীয় উপাধি প্রমাণ করে হাসান নাসরুল্লাহ তাদের নিকট উঁচু মর্যাদা ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী।
খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের অভিভাবক নির্ধারিত হন আলি খামেনি, তিনি শিয়াদের অভিভাবক ও ফকিহ, ‘হিযবুল্লাহ লেবানন’ দীনি ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে তার শরণাপন্ন হয়।
ইরানি বিপ্লবের বর্তমান অভিভাবক আলি খামেনি লেবাননে তার দু’জন প্রতিনিধি নির্ধারণ করেছেন: শায়খ মুহাম্মদ ইয়াজবেক (হিযবুল্লাহর সদস্য) এবং সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ। তারা উভয়ে আলি খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে লেবাননের শিয়া জনগণ থেকে শরয়ী পাওনা উসুল করে সেগুলো শিয়াদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করে। তাদের প্রয়োজন হলে তারাও কাউকে প্রতিনিধি করতে পারবে।
‘বিলায়াতুল ফকিহ’ থিউরি খোমেনি র উদ্ভাবিত। এ থিউরি মতে ইমামের অনুপস্থিতিতে জিহাদে আকবর ব্যতীত ফকিহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড আঞ্জাম দিবে। উল্লেখ্য শিয়াদের মৌলিক কিতাবে এ থিউরির কোনো অস্তিত্ব নেই।
রাফেযী খোমেনির দৃষ্টিতে দ্বাদশ ইমামগণ নবী ও রাসূলদের চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী। খোমেনি বলেন: “নিশ্চয় ইমামের জন্য একটি মাকামে মাহমুদ, উঁচু মর্যাদা ও পার্থিব জগতে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা রয়েছে, তার বিলায়াত ও কর্তৃত্বের সামনে পৃথিবীর প্রতিটি অণু বশ্যতা স্বীকার করে। আমাদের মাযহাবের মৌলিক একটি আকিদা হচ্ছে: ইমামদের একটি মাকাম রয়েছে, সে পর্যন্ত নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো মালায়েকা ও প্রেরিত কোনো নবী পৌঁছতে পারে না”।
খোমেনি ওয়াহদাতুল ওজুদের মত কুফরি ও শির্কী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তিনি বলেন: “আমাদের জন্য আল্লাহর সাথে বিশেষ কিছু অবস্থা রয়েছে, যেখানে আমরাও আল্লাহ বনে যাই এবং তিনি আমরা হয়ে যান। তিনি তিনিই, আর আমরা আমরাই”।
খোমেনি আল্লাহর তকদীরের উপর আপত্তি করেন, তকদীরের ব্যাপার নিয়ে তার রবের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেন, কারণ তকদীরের দাবির প্রেক্ষিতে উসমান, মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদ শাসন করার সুযোগ লাভ করেছে। যে আল্লাহ এরূপ তকদীর নির্ধারণ করেন, সে আল্লাহকে খোমেনি চান না, তার থেকে তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেন। [তার কথা থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই]। তিনি বলেন: “আমরা এমন এক ইলাহের ইবাদত করি, যার সম্পর্কে আমাদের ধারণা যে, তার কাজগুলো বিবেক সমর্থিত, তিনি এমন কাজ করেন না, যা বিবেক সমর্থন করে না। আমরা এমন আল্লাহর ইবাদত করি না, যিনি প্রভুত্ব, ইনসাফ ও দীনের অট্টালিকা নির্মাণ করে, অতঃপর নিজ হাতে তা ধ্বংস করেন এবং ইয়াজিদ, মুয়াবিয়া, উসমান ও তাদের ন্যায় ব্যক্তিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আবার নবীর পরবর্তীতে মানুষের করণীয়ও ঠিক করে দেন না; যেন তারা কিয়ামত পর্যন্ত জুলম ও অত্যাচারের পক্ষে অবস্থান না করে।
খোমেনির বিশ্বাস, মানুষের আমলনামা শিয়াদের মাহদির নিকট পেশ করা হয়, তিনি বলেন: “বর্ণনা মতে আমাদের আমলগুলো সপ্তাহে দু’বার ইমাম সাহেবুজ্জামানের নিকট প্রেরণ করা হয়”।
খোমেনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অপবাদ দেয় যে, “তিনি দাওয়াতি ক্ষেত্রে তাওফিক প্রাপ্ত ছিলেন না”। সে বলে: প্রত্যেক নবীই ইনসাফ কায়েম করার জন্য এসেছেন, তাদের ইচ্ছা ছিল দুনিয়ার বুকে তার বাস্তবায়ন করা, কিন্তু তারা সফল হননি, শেষ নবীও সফল হননি, যদিও তিনি এসেছেন মানুষের সংশোধন ও পরিশুদ্ধ করা এবং তাদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। প্রকৃতপক্ষে যিনি সর্বতোভাবে সফল হবেন ও দুনিয়ার বুকে ইনসাফ কায়েম করবেন, তিনি হলেন মাহদি মুনতাযার”।
খোমেনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলিফাদের অপবাদ দিয়ে বলে, আবু বকর ও ওমর কুরআনের বিরোধিতা করেছে, আর মানুষেরা তাই তাদের থেকে গ্রহণ করেছে। মূলত তার নিকট সকল সাহাবি কাফের ও গোমরাহ, কারণ খোমেনি যে বিকৃতির কথা বলে, সেগুলো সকল সাহাবি গ্রহণ করেছে, তবে খোমেনি হয়তো ভুলে গেছে যে, সকল সাহাবির মধ্যে আহলে বাইতও আছেন।
খোমেনি আহলে সুন্নাহকে অপবাদ দেয়, তাদেরকে ‘নাওয়াসিব’ ও ‘নাপাক’ বলে এবং তাদের সম্পদ হালাল ফতোয়া দেয়। একদা সে বলে: “গ্রহণযোগ্য মতে নাসেবিদের থেকে যে সম্পদ তোমরা গ্রহণ কর সেগুলো হারবি-কাফেরদের ন্যায় তোমাদের জন্য হালাল, তার উপর খুমুসের বিধান প্রযোজ্য হবে। তাদের সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ যেখানে পাওয়া যাক, যেভাবে হোক এবং তার খুমুস বের করা ওয়াজিব”। সে আরো বলে: “নাসিব ও খারিজিদের উপর আল্লাহর লানত, তারা উভয়ে বিনা দ্বিধায় কাফের”।
খোমেনির সমস্যা আরো অনেক, অধিক জানার জন্য দেখুন, ড. যায়েদ আল-‘ঈস রচিত (الخميني والوجه الآخر) অথবা http://www.khomainy.com ওয়েব সাইট ব্রাউজ করুন, এ ছাড়া অন্যান্য কিতাবও দেখুন।
ইরান ও হিযবুল্লাহ
ইরান হিযবুল্লাহর ধমনী, সঞ্জীবনী শক্তি ও মূল কেন্দ্র। ইরান থেকে হিযবুল্লাহ পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা লাভ করে। আর “ইরান ও লেবাননে তার শক্তিসমূহের সাথে এ যোগাযোগের মূলসূত্র হচ্ছে, হাসান নাসরুল্লাহ। ”
৫/৩/১৯৮৭ই. সালের এক সভায় হিযবুল্লাহর মুখপাত্র ইবরাহিম আমিন বলেন: “আমরা বলি না যে, আমরা ইরানের একটি অংশ, বরং আমরা ইরানে লেবানন এবং লেবাননে ইরান”। হিযবুল্লাহর সেক্রেটারি জেনারেল হাসান নাসরুল্লাহ বলেন: “আমরা ইরানকেই এমন এক রাষ্ট্র দেখি, যে ইসলাম দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং মুসলিম ও আরবদের সাহায্য করে। ইরানের সাথে আমাদের সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সম্পর্ক। ইরানের নেতৃবৃন্দের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব, আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক রাখি। অনুরূপ সেখানকার ধর্মীয় কেন্দ্রসমূহ আমাদের যোদ্ধাদের দীনি ও শরয়ী সকল প্রয়োজন পূরণ করে”।
ইমাম মাহদি মসজিদের ইমাম শায়খ হাসান তিরাদ বলেন: “নিশ্চয় ইরান ও লেবানন এক জাতি ও এক দেশ। আমাদের কোনো আলেম বলেছেন: “নিশ্চয় আমরা যেরূপ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠনকে সাহায্য করব, অনুরূপ সাহায্য করব লেবাননকে”।
ইবরাহিম আমিন বলেন: “আমরা ইমামের অবর্তমানে বাস করছি, এ যুগে ইমামের নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি হচ্ছে ন্যায়পরায়ণ ফকিহদের নেতৃত্ব।”
“এ হচ্ছে হিযবুল্লাহর বৈশিষ্ট্য, তারা লেবাননি জনগণকে ন্যায়পরায়ণ ‘ফকিহ’র সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে হিযবুল্লাহ ন্যায়পরায়ণ ‘ফকিহ’র নির্দেশের ভিত্তিতে স্বীয় আন্দোলন ও সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে”।
‘হিযবুল্লাহ লেবানন’-এর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল নু‘আইম কাসেম বলেন: “হিযবুল্লাহ ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক হিযবুল্লাহই তৈরি করেছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ইরানি বিপ্লব থেকে উপকৃত হওয়া ও ইসরাইলি দখলদারিত্বের মোকাবেলায় তার সাহায্য হাসিলের উদ্দেশ্যে। এ সম্পর্ক খুব দ্রুত উন্নত হয় এবং প্রথম ধাপেই তার ফলাফল ভোগ করেছি, কয়েকটি কারণে:
১. হিযবুল্লাহ ও ইরান উভয় বিলায়াতুল ‘ফকিহ’র আদর্শে বিশ্বাসী এবং খোমেনি হচ্ছে তাদের নেতা। অতএব তারা উভয় বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় এক নেতার নেতৃত্বে বিশ্বাসী।
২. ইরান রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গ্রহণ করেছে, তার মৌলিক বিষয়ের সাথে হিযবুল্লাহ একমত, তবে এলাকার ভিন্নতার কারণে আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে।
৩. উভয়ের রাজনৈতিক আদর্শে মিল, কারণ ইরানের মূল উদ্দেশ্য উপনিবেশকে ত্যাগ করে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা, স্বাধীনতা আন্দোলনকারী সংগঠনসমূহকে অর্থ সাহায্য প্রদান করা এবং ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিপরীত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। হুবহু এসব আকিদাই পোষণ করে হিযবুল্লাহ, তার প্রথম লক্ষ্য ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও তার আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
ইরান যেরূপ ইসলাম বাস্তবায়নে জীবন্ত অভিজ্ঞতার অধিকারী[!!], যা বাস্তবায়ন করার স্বপ্ন দেখে প্রত্যেক দ্বীনদার মুসলিম... অনুরূপ হিযবুল্লাহ আধিপত্য রোধে বিরাট অভিজ্ঞতার মালিক, সে ইরান ও তার জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন সক্ষম হয়েছে...
যখন হিযবুল্লাহ দক্ষিণ লেবানন ও পূর্ব বেক্কা নগরী ইরানের সাহায্যে মুক্ত করে, তখন সে তার উদ্দেশ্য হাসিল করে, যার ঘোষণা সে দিয়েছিল এবং যার জন্য সে ত্যাগ স্বীকার করেছে। অনুরূপ ইরানও আধিপত্যবাদ প্রতিরোধ ও মুজাহিদদের সাহায্য করে সফল অর্জন করেছে। এটা হিযবুল্লাহর অর্জন, লেবাননের অর্জন এবং ইরানের অর্জন”।
এখানে আমরা ইরানের মুখোশ উন্মোচন করতে চাই, ইয়াহূদীদের সাথে তাদের শত্রুতার দাবী মূলত প্রতারণা, ইসরাইলি রাষ্ট্রের উপর হামলার হুমকি মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার নামান্তর, দেখুন ইয়াহূদী সাংবাদিক ‘ইউসি মালিমান’ কি বলে:
“এটা কোনোভাবে সম্ভব নয় যে, ইসরাইল ইরানের পারমানবিক স্থাপনাসমূহে হামলা করবে, উপরস্থ একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছে যে, ইরান যদিও কথার মাধ্যমে ইসরাইলের উপর হামলা করে, যা থেকে তার সাথে ইরানের শত্রুতা বুঝা যায়, প্রকৃতপক্ষে ইরানি পারমানবিক বোমাগুলো আরব রাষ্ট্রসমূহের দিকে তাক করা”।
উল্লেখিত ইয়াহূদীর কথার সত্যতা ড. গাসসানের মন্তব্য থেকেও হয়, তিনি বলেন: হিযবুল্লাহর প্রয়োজন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তামূলক স্পষ্ট উদ্দেশ্য, যা হবে ইরানি দৃষ্টি কোন্ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং এরাবিক ও ইসলামিক বৈশিষ্ট্যের ধারক। হিযবুল্লাহর আরো প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতা, যার মধ্যে থাকবে ইতিহাস ও দেশীয় কালচার। তার আরো প্রয়োজন একটি স্পষ্ট সংগঠন, যার মধ্যে থাকবে প্রচলিত সবধরনের অস্ত্র, যেন সে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়।
হিযবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ইরান তাতে সর্বাত্মকভাবে অংশ গ্রহণ করে। ‘আমাল’ সংগঠনের সাবেক পরিচালক ও হিযবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতা সায়্যেদ হুসাইন মুসাভি বলেন: ‘আমাল’ সংগঠনের বর্তমান প্রধানের ‘লেবানন উদ্ধার আন্দোলনে’ যোগ দেওয়া ইসলাম সমর্থিত নয়। তিনি বলেন: ইসলামি ও অনৈসলামি বলার অধিকার মূলত ইরানের, কারণ ইসলামি বিপ্লব ঠিক করবে কোনটি ইসলামি ও কোনটি ইসলামি নয়। ‘আমাল’ সংগঠনের ১৯৮২ই. সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ৪-র্থ সম্মেলনে আমরা সবাই এ শপথ গ্রহণ করেছি যে, আমরা ইসলামি বিপ্লব ইরানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ”।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ১৮/৩/১৯৯৬ই. সালে جريدة الوسط ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাতকারে হাসান নাসরুল্লাহ সত্যের অপলাপ করেছেন। তিনি তাতে বলেন: “হিযবুল্লাহর ভিত্তি লেবাননি, তার সিদ্ধান্ত লেবাননি এবং তার ইচ্ছাও লেবাননি। ইরান বা সিরিয়ান সমর্থন বা সাহায্য এসেছে পরবর্তীতে”।
হিযবুল্লাহ ইরানের সন্তান, এ কথার সত্যতা হিযবুল্লাহর সাবেক প্রধান ‘সুবহি তুফাইলি’র সাক্ষাতকার থেকেও প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন: “আমি ইরানি প্রজাতন্ত্র দেখতে গিয়েছিলাম, তখন লেবাননে একটি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে ঐকমত্য হই। তারপর থেকে হিযবুল্লাহ তার কার্যক্রম আরম্ভ করে, হাজার হাজার ইরানি এসে তাকে অনুদান দেয় ও তার সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে”।
ইরান হিযবুল্লাহ প্রতিষ্ঠায় সরাসরি অংশ গ্রহণ করে, তাদেরকে প্রশিক্ষণ দান ও অর্থ সাহায্যের জন্যে নিজস্ব বিপ্লবী গার্ডকে লেবাননে প্রেরণ করে। লেবাননে আগত ইরানি বিপ্লবী গার্ডের সংখ্যা ২০০০-সদস্য। ইরানের বিপ্লবী গার্ড লেবাননে এসে আরো কিছু কাজ করে, যেমন লেবাননের বেক্কা প্রদেশ ও হিযবুল্লাহর কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলে শিয়া আকিদা প্রচার করে, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
তাছাড়া তেহরানে হিযবুল্লাহর একটি বিশেষ অফিস রয়েছে, সেখান থেকে প্রচারপত্র ও বিভিন্ন বই-পুস্তক প্রকাশ করা হয়, তাতে হিযবুল্লাহর পরিচয়, তার কর্ম ও বৈশিষ্ট্যসমূহের উল্লেখ থাকে। অনুরূপ ইরান থেকে যেসব সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ বের হয়, সেগুলো লেবাননে পৌঁছানোর দায়িত্বও সে অফিসের।
হিযবুল্লাহ তাদের গ্রন্থসমূহে স্বীকৃতি দিয়ে লিখে থাকে যে, “কেন্দ্রীয় ফকিহ [ইরানি ধর্মীয় সর্বোচ্চ নেতা] একমাত্র যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কিংবা আপোষ করার ক্ষমতা রাখে”।
কেননা স্থানীয় ফকিহর এমন কর্তৃত্ব নেই, যা “বিশ্বের সকল শিয়াদের উপর প্রযোজ্য হয়”। তাই “ইমাম খোমেনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, বিশ্বের সকল জায়গায় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শিয়া মুসলিমদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন ও তাদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। ”
তার এ কথা আমাদেরকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, বিশ্বের শিয়ারা ইরানি বিপ্লবের অনুসারী, ইরানের সাথে তারা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত, ইরানের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকরী। বিশেষভাবে সরাসরি ইরানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সংস্থাসমূহ, যেমন হিযবুল্লাহ, হিযবুল্লাহর অঙ্গ-সংগঠন ও অন্যান্য সংস্থাসমূহ ইরানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে কি লেবাননী হিযবুল্লাহ ইরানের সাথে যোগ দিয়েছিল? আওয়াযে সুন্নী ছাত্রদের অসন্তোষ দমনেও কি তারা অংশ নিয়েছিল?
ইরাক-ইরান যুদ্ধ ও ইরানের ‘আহওয়ায’ নগরীতে সুন্নি ছাত্রদের আন্দোলন দমনে হিযবুল্লাহ অংশ গ্রহণ করেছিল।
১৯৯৯ই. সালে ইরানের খোযিস্তান প্রদেশের রাজধানী আহওয়ায নগরীর ছাত্র-বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাথে সৃষ্ট রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও তার পরবর্তী ঘটনাসমূহে ইরানি সরকারের পক্ষে অংশ নেয় হিযবুল্লাহ। ছাত্র-বিদ্রোহে অংশ নেওয়া নেতাদের ব্যতীত একাধিক সূত্র ও এরাবিক গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, শতশত আরব যোদ্ধা (হিযবুল্লাহর সদস্য) নিরাপত্তা বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ হয়ে ছাত্রদের দমন করে ও তাদের (আরব ইরানি) বিদ্রোহ নিঃশেষ করে দেয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে একটি বিষয় নিশ্চিত প্রমাণিত যে, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের ইউনিটে অংশ গ্রহণকারী যোদ্ধারা ‘ইরাকি ইসলামি [শিয়া] বিপ্লবের সর্বোচ্চ পরিষদে’র অনুগত ‘ফিলাক বদর’ এর সামরিক শাখার সদস্য।
তবে নিরাপত্তা বাহিনীর কতক লোকের ভাষা ছিল লেবাননি ও সিরিয়ানদের ন্যায়, যা থেকে তাদের জাতীয়তা সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক করেছে! তার প্রমাণ মিলেছে কিছু দিন পূর্বে দেওয়া আলি আকবর মুহতাশিমি বুর-এর ভাষণে, তাকে হিযবুল্লাহর ধর্মীয় পিতা জ্ঞান করা হয়। ইতোপূর্বে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে সিরিয়ায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ইরানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সভার সেক্রেটারিও ছিলেন তিনি। ১৯৮২ই. সালে তিনিই ‘হরকতে আমাল’ থেকে হিযবুল্লাহর জন্ম দেন। তিনি বলেছেন: ইরান-ইরাক যুদ্ধে বিপ্লবী গার্ডের পাশাপাশি হিযবুল্লাহর যোদ্ধারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল।
গত বুধবার ‘আলি মুহতাশিমি বুর’ ইরানি সংবাদ «شرق» ‘শারক’কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে হিযবুল্লাহ ও লেবাননের সর্বশেষ ঘটনা সম্পর্কে বলেন, (উল্লেখ্য যে, তিনি ইমাম খোমেনির ছাত্র ও হুজ্জাতুল ইসলাম খেতাব প্রাপ্ত) “হিযবুল্লাহর অভিজ্ঞতার একাংশ যুদ্ধের ময়দান থেকে শেখা, আর দ্বিতীয় অংশ শিখেছে প্রশিক্ষণ থেকে, সন্দেহ নেই ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে হিযবুল্লাহ অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কারণ হিযবুল্লাহর সদস্যরা আমাদের বাহিনীর পাশা-পাশি অথবা সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করত”।
‘মুহতাশিমি বুর’ হিযবুল্লাহর শক্তি সম্পর্কে আরো বলেন: “শেষের বছরগুলোতে লেবানন ও তার অঞ্চলসমূহে হিযবুল্লাহ রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছে, তার যোদ্ধাদের সামরিক অভিজ্ঞতা ও সামরিক ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণের বিষয়টি বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ আমরা দেখছি যে, বৈরুত, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও বেক্কা প্রদেশের দূরদূরান্ত যেখানে হিযবুল্লাহর সদস্যরা থাকত ও তাদের মিসাইলের ঘাঁটি ছিল, যা ইসরাইলের বিমানগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে, এত কিছু সত্যেও হিযবুল্লাহ এখন লাগাতার ইসরাইলের দিকে মিসাইল নিক্ষেপ করার শক্তি অর্জন করেছে, যে কারণে ইসরাইল বাধ্য হয়েই ধীরেধীরে তার পদাতিক বাহিনী লেবাননে দাখিল করছে, তবে বিনতে জাবিল, মারুনুর রাস ও আইতারুনের তিন রাস্তা মোড়ে তাদেরকে কঠিন বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে”।
মুহতাশিমির বর্ণনা মোতাবেক, লেবাননে হিযবুল্লাহর জন্ম থেকে ১০০-হাজারের অধিক শিয়া যুবক যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে, প্রত্যেক প্রশিক্ষণে ৩০০-যোদ্ধা অংশ গ্রহণ করে, এখনও লেবানন ও ইরানে বহু প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে।
হিযবুল্লাহর বয়ান ও রাজনীতিতে তাকিইয়া (আসল কথার বিপরীতে প্রকাশ্যে অন্য কথা বলে ধোকা দেওয়া) -এর ব্যবহার
আহলে-সুন্নার সাথে সবচেয়ে বেশী তাকিয়্যাহ নীতি ব্যবহার করে হিযবুল্লাহ। «الإمام المهدي ومفهوم الانتظار» গ্রন্থের ২৪০-নং পৃষ্ঠায় কাজেম মিসবাহ বলেন: “তাকিয়্যাহ নীতির আশ্রয় গ্রহণকারী বড় মুজাহিদ, সে সচেতন ও সতর্ক অবস্থায় জিহাদ করে, সে সম্ভাব্য সকল পন্থায় জিহাদ করে, সে হাত-পা বেঁধে বসে নেই, সে দীনি বিষয় ও দায়িত্ব থেকে গাফিল নয়, যেমন সরলমনা মানুষেরা মনে করে। তাকিয়্যাহ শুধু গোপন আমল নয় যে, শিয়াদের নির্দিষ্ট একটি গ্রুপ তার উপর আমল করবে, অথবা রাজনৈতিক কোনো দল তাকে লক্ষ্য হিসেবে নিবে, বরং এটা আমলের এক পদ্ধতি, যা যথাযথভাবে হিযবুল্লাহ বাস্তবায়ন করছে। তাকিয়্যাহ রাজনীতির দুর্দিন ও সুদিন সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য...” পরবর্তী পৃষ্ঠায় তিনি বলেন: “তবে কতক সময় খতিব ও মুবাল্লিগ বাধ্য হয়ে কথা গোপন করেন, স্পষ্টতা ত্যাগ করেন ও শব্দের নোকতা পরিহার করেন, কারণ এরূপ না করলে ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা থাকে”।
কাজেম মিসবাহের কথায় যে চিন্তা করবে, তার বুঝতে দেরি হবে না যে, হিযবুল্লাহ স্বীয় ভাষণে তাকিয়্যাহর ব্যবহার করে। হিযবুল্লাহর ঘরের লোক হাঁটে হাড়ি ভেঙ্গে দিল। এ জন্য আমরা বারবার বলি: হিযবুল্লাহকে বিশ্বাস কর না, হাসান নাসরুল্লাহর কথা সত্য জেনো না, সে মিথ্যাবাদী। তাদের ধর্ম বাতেনি। তারা মুখে এক কথা বলে, কিন্তু অন্তরে তাদের আরেক উদ্দেশ্য থাকে। যেমন তাদের গুরু কাজেম মিসবাহ প্রকাশ করে দিয়েছেন। কখনো তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলেন, হাসান নাসরুল্লাহ এ পদ্ধতি বেশী ব্যবহার করে। কখনো তারা কোনো বিষয় একেবারে এড়িয়ে যায়, যেন নিজের উপর কিংবা দলের উপর কোনো অপবাদ আরোপ না হয়।
পাঠকবর্গ, এতে অবাক হবেন না, কারণ দ্বাদশ ইমামিয়াদের ধর্ম তাকিয়্যাহর আড়ালে মিথ্যা বলার অনুমতি দেয়, বরং তাকিয়্যাহর পদ্ধতিতে আল্লাহর নামেও মিথ্যা বলার অনুমতি প্রদান করে। «وسائل الشيعة» গ্রন্থের লেখক আবু আব্দুল্লাহ থেকে শ্রবণ করে বলেন: “কেউ যদি তাকিয়্যাহর আশ্রয় গ্রহণ করে মিথ্যা কসম করে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই, যদি সে বাধ্য ও অপারগ হয়”। ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেন: “আমি রাফেযীদের চেয়ে কাউকে অধিক মিথ্যা কসমকারী পাইনি”।

©somewhere in net ltd.