| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইসলাম হাউস
তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।
হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি
সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি আমাদেরকে সর্বোত্তম দীনের অনুসারী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূলের উম্মত হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহর উপর, যিনি আমাদেরকে কল্যাণকর সকল পথ বাতলে দিয়েছেন ও সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে সতর্ক করেছেন। আরো সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তার পরিবারবর্গ ও সাথীদের উপর, যারা তার আনীত দীন ও আদর্শকে পরবর্তী উম্মতের নিকট যথাযথ পৌঁছে দিয়েছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরণ করবে সবার উপর। অতঃপর:
ইসলামি ইলমের উৎস কুরআন ও হাদিস থেকে ইলমের একাধিক শাখা বের হয়েছে। কতক ইলম মৌলিক যেমন ‘ইলমে তাফসির’, ‘ইলমে হাদিস’, ‘ইলমে তাওহিদ’ ও ‘ইলমে ফিকহ’। আর কতক সম্পূরক ও সাহায্যকারী ইলম যেমন ‘উসুলে হাদিস’, ‘উসুলে ফিকাহ’ ও ‘উসুলে তাফসির’ ইত্যাদি। ‘উসুলে হাদিস’ হাদিসের সুরক্ষাদানকারী ইলম। যে উসুলে হাদিস জানে না, সে নিজে ভুল করে ও অপরের ভুলের কারণ হয়, হোক সে মুফাসসির, ফকিহ বা ওয়ায়েজ। কতক মুফাসসির হাদিস দ্বারা তাফসির করেন, অথচ তার হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। কতক ফকিহ দুর্বল ও জাল হাদিস থেকে মাসআলা বলেন। কতক নীতিশাস্ত্রবিদ দুর্বল ও জাল হাদিস থেকে নীতি তৈরি করেন। কতক ওয়ায়েজ, যারা স্বীয় ধারণায় মানুষদেরকে হিদায়েতের প্রতি আহ্বান করেন, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা বলেন, যা তিনি বলেননি তাই প্রচার করেন তার নামে। এভাবে তারা নিজেরা গোমরাহ হন ও অপরকে গোমরাহ করেন! আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿فَمَنۡ أَظۡلَمُ مِمَّنِ ٱفۡتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبٗا لِّيُضِلَّ ٱلنَّاسَ بِغَيۡرِ عِلۡمٍۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٤٤ ﴾ [الانعام: ١٤٤]
“সুতরাং তার চেয়ে অধিক জালেম কে, যে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিনা দলিলে আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়? নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়েত করেন না”। নবী সাল্লল্লাহু সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
“নিশ্চয় আমার উপর মিথ্যা বলা, কারো উপর মিথ্যা বলার মত নয়, যে আমার উপর মিথ্যা বলল সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”।
হাদিস শাস্ত্র না-জানার কারণে তারা আল্লাহ্ ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা বলেন। এমন আমলের প্রতি আহ্বান করেন, যার উপর শরীয়ত নাযিল হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ »
“যে এমন আমল করল, যার উপর আমাদের আদর্শ নেই তা পরিত্যক্ত”। অতএব তাদের আমল বাতিল, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ মোতাবেক নয়।
ভারত উপমহাদেশে সঠিকভাবে হাদিস চর্চাকারিগণ জানেন অত্র ভূখণ্ডে হাদিস শাস্ত্রের দুরবস্থা কেমন। এ অবস্থা দশ-বিশ বছর হাদিসের দরস দানকারী কথিত মুহাদ্দিস, শায়খুল হাদিস ও হাদিস বিশারদদের, তাদের ছাত্র বা সাধারণের কথা বলাইবাহুল্য। যে কারণে দীনের নামে বেদীন, সুন্নতের নামে বিদআত, সংস্কারের নামে কুসংস্কার ও তাওহিদের নামে শির্কের ছড়াছড়ি অত্র ভূখণ্ডে। তাই ইমান ও আকিদার সুরক্ষা এবং সুন্নত প্রতিষ্ঠার জন্য উসুলে হাদিস চর্চা ব্যাপক করার বিকল্প নেই। বৈষয়িক বিষয়াদির ন্যায় সবাই তাদের দীনের ব্যাপারে সতর্ক হোক, সহি হাদিসসমূহ গ্রহণ করুক এবং সচেতনভাবে দুর্বল হাদিসগুলো পরিহার করুক, এ মহান উদ্দেশ্যে আমাদের অত্র প্রয়াস।
‘হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি’ বইখানা মৌলিক গ্রন্থ নয়, বাইকুনি রাহিমাহুল্লাহ্ রচিত المنظومة البيقونية এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যা তিনি হাদিসের প্রাথমিক স্তরের ছাত্রদের জন্য রচনা করেছেন। শায়খ ওমর ইব্ন মুহাম্মদ বাইকুনি রাহিমাহুল্লাহ্ হাদিস শাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কতক প্রকার অতি সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জলভাষায় এতে জমা করেছেন, যা চৌত্রিশটি পঙ্ক্তিতে সীমাবদ্ধ। আরব বিশ্বের অধিকাংশ মুহাদ্দিস তাদের ছাত্রদেরকে প্রথমপাঠ হিসেবে বইটি পাঠদান করেন। একাধিক বিখ্যাত মুহাদ্দিস তার ব্যাখ্যা লিখেছেন, যা তার গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
এ কিতাবের প্রথম লক্ষ্য হাদিসের ছাত্রগণ, তবে সাধারণ শিক্ষিত সমাজ যেন বইটি পাঠ করে উপকৃত হন, সে দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়েছে। তাই বইটি আহলে ইলম, হাদিসের ছাত্র ও সাধারণ শিক্ষিত সবার উপযোগী। বইটি পড়লে উসুলে হাদিসের পরিভাষা ও তার সংজ্ঞা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন হবে। আরো জানা যাবে যে, মানুষের কথা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী পৃথক করার জন্য মুহাদ্দিসগণ হাদিসকে নানাভাবে পরখ করেছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে তার উপর গবেষণা পরিচালনা করেছেন এবং প্রত্যেক প্রকার গবেষণার পৃথক নাম দিয়েছেন।
ব্যাখ্যায় অনুসৃত নীতিমালা:
ক. লেখক থেকে সংঘটিত বিচ্যুতিগুলো শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কতক স্থানে তিনি ক্রমবিন্যাস রক্ষা করেননি, বুঝার সুবিধার্থে সেগুলো চিহ্নিত করেছি।
খ. গুরুত্বের দাবি হিসেবে লেখকের বাদ দেওয়া কতক প্রকার যোগ করেছি।
গ. শায়খ আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ লেখকের কতক বিচ্যুতি শুদ্ধ রূপে পাল্টে দিয়েছেন, যথাস্থানে আমরা সেগুলো উল্লেখ করেছি।
ঘ. পরিভাষার যথাযথ অনুবাদ পেশ করা দুরূহ কাজ, বিশেষ করে আরবি থেকে বাংলা করা। তাই পরিভাষার অনুবাদের পরিবর্তে বাংলা উচ্চারণ পেশ করেছি।
ঙ. আরবি শব্দের বাংলা উচ্চারণ পেশ করা আরেকটি কঠিন কাজ, বরং অসম্ভব, যে কারণে বাংলা উচ্চারণ দেখে সঠিক শব্দ উদ্ধার করা যায় না। আগ্রহীদের সঠিক শব্দ জানাও জরুরি, যা আরবি দেখা ব্যতীত সম্ভব নয়। আবার বাংলা শব্দের মাঝে আরবি শব্দের অধিক প্রয়োগ বেমানান, তাই সুবিধে মত স্থানে হুবহু আরবি লিখে অবশিষ্ট স্থানে তার উচ্চারণ পেশ করেছি।
চ. ব্যাখ্যার শুরুতে উসুলে হাদিসের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের উপর নাতিদীর্ঘ ভূমিকা পেশ করেছি, যেন পাঠকবর্গ জানেন আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত হাদিস বিদ্যমান। দীনের সুরক্ষার স্বার্থে আল্লাহ প্রত্যেক যুগে একদল আলেম প্রস্তুত করেন, যারা তার নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস হিফাজত করেন, যাদের প্রচেষ্টার ফলে আমরা সহি হাদিসের ভাণ্ডার লাভ করেছি। আল্লাহ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন এবং আমাদেরকে তাদের কাতারে শামিল করুন। আমীন।
উসুলে হাদিসের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
সার্বজনীন দীন: ইসলাম আল্লাহর একমাত্র দীন। ইসলাম ব্যতীত কোনো দীন তার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ ١٩ ﴾ [ال عمران: ١٩]
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম”। তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ٣﴾ [المائدة: ٣]
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে”। অন্যত্র বলেন:
﴿وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥﴾ [ال عمران: ٨٥]
“আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন চায়, তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”।
আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র বিশ্বের নিকট তার দীন প্রচারের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেন। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ١٥٨ ﴾ [الاعراف: ١٥٧]
“বল, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল’। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٢٨﴾ [سبا: ٢٨]
“আর আমি তো কেবল তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না”। অপর আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّۧنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٗا ٤٠﴾ [الاحزاب : ٤٠]
“মুহাম্মদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী, আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ”। অতএব ইসলাম সার্বজনীন দীন, যা সমগ্র মানবজাতির নিকট পৌঁছানোর দায়িত্ব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ন্যাস্ত।
একটি প্রশ্ন: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির নিকট সর্বশেষ রাসূল, তারপর কোনো নবী ও রাসূল আসবে না, তাহলে তিনি সবার নিকট কিয়ামত পর্যন্ত কিভাবে দীন পৌঁছাবেন, কারণ তিনি একা, তার হায়াত মাত্র তেষট্টি বছর?
তিনটি উত্তর: প্রথমটি অসম্ভব, যেমন তিনি সবার নিকট সশরীরে গিয়ে দীন পৌঁছাবেন। দ্বিতীয়টি অবাস্তব, যেমন সকল মানুষ তার নিকট এসে দীন শিখবে। তৃতীয়টি যৌক্তিক ও বাস্তব, যেমন তিনি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করবেন, যার সাথে তার সাক্ষাত হবে, কিংবা যারা তার নিকট আসবে, তাদেরকে তিনি দীন শিখাবেন। অতঃপর তারা পরবর্তীদের দীন শিখাবে, যারা তার সাক্ষাত পায়নি, কিংবা তার নিকট উপস্থিত হতে পারেনি। এভাবে সমগ্র বিশ্বে সবার নিকট কিয়ামত পর্যন্ত দীন পৌঁছবে। কেউ বলতে পারবে না, আমার নিকট দীন পৌঁছেনি, কিংবা দীন শিখার সুযোগ আমি পাইনি। উসুলে হাদিসের পরিভাষায় এ পদ্ধতির নাম "علم الرواية" অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির নিকট রিসালাত পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতিকে ‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’ বলা হয়।
‘ইলমুর রিওয়াইয়া’র পদ্ধতিতে সবার নিকট দীন পৌঁছবে, কিন্তু দীনের স্বকীয়তা ও অক্ষুণ্নতা বহাল রাখার জন্য এ পর্যন্ত যথেষ্ট নয়। কারণ এ পদ্ধতিতে দীনের বাহন মানুষ, মানুষ ভুলের স্থান। তাদের থেকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ভুল হতে পারে। তাই পৌঁছানো দীন সঠিক কি-না যাচাইয়ের উপায় থাকা জরুরি। তাহলে দীনের অক্ষুণ্নতা বজায় থাকবে ও সঠিকভাবে আল্লাহর ইবাদত আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব হবে। উসুলে হাদিসের পরিভাষায় এ পদ্ধতির নাম "علم الدراية" অর্থাৎ সহি, দ্বা‘ঈফ ও জাল হাদিস চিহ্নিত করার নীতিকে ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’ বলা হয়। আমরা ‘উসুলে হাদিসের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’-এ ‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’ এবং মূলগ্রন্থে ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’ সম্পর্কে আলোচনা করব।
‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইলমুর রিওয়াইয়া’র সূচনা করেন। অতঃপর প্রয়োজনের তাগিদে ধীরে ধীরে তার পরিসর বর্ধিত হয়। এ ইলমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«بَلِّغُوا عَنِّى وَلَوْ آيَة»
“একটি আয়াত হলেও আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও”। অন্যত্র তিনি বলেন:
«لِيُبَلِّغْ الشَّاهِدُ مِنْكُمُ الْغَائِبَ»
“তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে পৌঁছে দেয়”। অন্যত্র তিনি বলেন:
«تَسْمَعُونَ مِنِّى، وَيُسْمَعُ مِنْكُمْ، وَيُسْمَعُ مِمَّنْ يَسْمَعُ مِنْكُمْ»
“তোমরা আমার নিকট শ্রবণ কর, তোমাদের থেকে শ্রবণ করা হবে এবং যারা তোমাদের থেকে শ্রবণ করে তাদের থেকেও শ্রবণ করা হবে”।
সাহাবিগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত কথা, কর্ম, সমর্থন ও তার গুণগান হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত দ্বিতীয় স্তরের রাবি বা বর্ণনাকারীদের নিকট বর্ণনা করবে। অতঃপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পরবর্তী স্তরের রাবিগণ তাদের পরবর্তী রাবিদের নিকট হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত পূর্ববৎ বর্ণনা করবে। দীনকে চলমান ও অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এ ধারা অব্যাহত রাখা জরুরি, অন্যথায় দীন বিকৃত ও মৌলিকত্ব হারাতে বাধ্য। তাই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো বৃদ্ধি থেকে বারণ করেছেন, কখনো হ্রাস থেকে সতর্ক করেছেন, কখনো বিকৃতির উপর কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন, যেমন:
দীনে বৃদ্ধি করা নিষেধ:
দীনে যেন বৃদ্ধি না ঘটে, এ জন্য বক্তা ও শ্রোতা উভয়কে পৃথক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বক্তাকে সত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ ও মিথ্যা থেকে বারণ করা হয়েছে, আর শ্রোতাকে বক্তার সংবাদ যাচাই পূর্বক গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বক্তাকে উদ্দেশ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»
“যে আমার উপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”। মিথ্যাবাদী বক্তার পরিণতি জাহান্নাম। এ কথা তিনি বারবার বলেছেন, প্রায় সত্তুরজন সাহাবি থেকে এ হাদিস বর্ণিত, জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবি যাদের মধ্যে অন্যতম। তাই এ হাদিসকে আহলে ইলম মুতাওয়াতির বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمۡ فَاسِقُۢ بِنَبَإٖ فَتَبَيَّنُوٓاْ ٦﴾ [الحجرات: ٦]
“হে ইমানদারগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও”। এ আয়াতে আল্লাহ শ্রোতাদের সতর্ক করেছেন, যেন তারা বক্তাদের কথা যাচাই ব্যতীত গ্রহণ না করে।
সাহাবিগণ মিথ্যা বলতেন না, তখন আরবের কাফেরদের মধ্যেও মিথ্যা বলার প্রবণতা ছিল না, মিথ্যাকে তারা ঘৃণা করত। জনৈক কাফের সম্পর্কে আছে, সে তার মরুভূমির তৃষ্ণার্ত বোবা উটের সাথেও মিথ্যা বলেনি, সে মিথ্যা না-বলার কারণ সম্পর্কে বলেছিল:
أُرِيدُ أُمَنِّيكِ الشَّرَابَ لِتَهْدَئِي وَلَكِنَّ عَارَ الْكَاذِبِينَ يَحُولُ
‘আমার ইচ্ছা হয় তোমাকে পানীয় বস্তুর আশা দেই, যেন তুমি শান্ত হও, কিন্তু মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অপবাদ প্রতিবন্ধক হয়েছে’। মরুভূমিতে একটি উটকে পানি পান করানোর মিথ্যা আশ্বাস দিতে বিব্রত বোধ করেছেন জনৈক মুশরিক! আবু সুফিয়ানের ঘটনা তো প্রসিদ্ধ। বাদশাহ হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করার প্রাক্কালে তার সাথীদের বলে দেন: “আমি তাকে মুহাম্মদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি, সে যদি আমাকে মিথ্যা বলে তোমরা তাকে মিথ্যা বলবে”। আবু সুফিয়ান বলেন: ‘আল্লাহর শপথ, আমার উপর মিথ্যার অপবাদ আরোপ করা হবে এ লজ্জা যদি না হত, তাহলে অবশ্যই আমি তার সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম’। সে সময় আবু সুফিয়ান নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিপক্ষ ছিল, সে জানত মিথ্যা বললেও তার সাথীরা হিরাক্লিয়াসের সামনে তাকে মিথ্যারোপ করবে না, কারণ তারা সবাই কাফের, তবুও আবু সুফিয়ান অপবাদের ভয়ে মিথ্যা বলেনি।
সাহাবিদের সময় মিথ্যা ছিল না:
সাহাবিরা একে অপরকে বিশ্বাস করতেন, তাদের সময় মিথ্যা ছিল না। উপস্থিত সাহাবি থেকে অনুপস্থিত সাহাবি পূর্ণ আস্থার সাথে দীন গ্রহণ করতেন। বারা ইব্ন আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«لَيْسَ كُلُّنَا كَانَ يَسْمَعُ حَدِيثَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ لَنَا ضَيْعَةٌ (يعني عقاراً وأراضي) وَأَشْغَالٌ، وَلَكِنِ النَّاسُ لَمْ يَكُونُوا يَكْذِبُونَ يَوْمَئِذٍ، فَيُحَدِّثُ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ»
“আমাদের প্রত্যেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস শ্রবণ করত না, আমাদের জায়গা-জমি ও ব্যস্ততা ছিল। তবে তখন মানুষেরা মিথ্যা বলত না, উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট বর্ণনা করত”। আনাস ইব্ন মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«وَاللَّهِ مَا كُلُّ مَا نُحَدِّثُكُمْ بِهِ سَمِعْنَاهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ، وَلَكِنْ كَانَ يُحَدِّثُ بَعْضُنَا بَعْضًا، وَلا يَتَّهِمُ بَعْضُنَا بَعْضًا»
“আল্লাহর শপথ, তোমাদেরকে আমরা যা বলি, তা সব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণ করিনি, তবে আমাদের কতক কতককে বলত, কেউ কাউকে অপবাদ দিত না”।
সাহাবিগণ যেরূপ পরস্পর মিথ্যা বলেনি, অনুরূপ তাবে‘ঈদের সাথেও তারা মিথ্যা বলেনি। ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ নিজ সনদে আব্দুল্লাহ ইব্ন ইয়াযিদ খাতমি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
«حَدَّثَنَا الْبَرَاءُ بْنُ عَازِبٍ وَهُوَ غَيْرُ كَذُوبٍ، قَالَ: كُنَّا نُصَلِّي خَلْفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا قَالَ: " سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، لَمْ يَحْنِ أَحَدٌ مِنَّا ظَهْرَهُ حَتَّى يَضَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَبْهَتَهُ عَلَى الْأَرْضِ»
আমাদেরকে বারা ইব্ন আযেব বলেছেন, আর তিনি মিথ্যাবাদী নয়, তিনি বলেছেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে সালাত আদায় করতাম, যখন তিনি বলতেন: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ আমাদের কেউ স্বীয় পিঠ নিচু করত না, যতক্ষণ না তিনি নিজ কপাল মাটিতে রাখতেন”।
এখানে তাবে‘ঈ আব্দুল্লাহ ইব্ন ইয়াযিদ খাতমি সাহাবি বারা ইব্ন আযেব সম্পর্কে বলেছেন: وَهُوَ غَيْرُ كَذُوبٍ বা ‘তিনি মিথ্যাবাদী নয়’। তার এ কথার অর্থ সন্দেহ দূর করা নয়, বরং হাদিস শক্তিশালী করা ও সাহাবির সত্যায়ন করা উদ্দেশ্য।
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: এ কথার অর্থ রাবিকে অপবাদ দেওয়া নয়, বরং বক্তার কথায় পূর্ণ আস্থা প্রকাশের জন্য আরবরা এরূপ বলে, যেমন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন: سمعت خليلي الصادق المصدوق ‘আমি আমার সত্যবাদী ও সত্যায়িত বন্ধুকে বলতে শুনেছি’। ইব্ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন: حدثني الصادق المصدوق ‘সত্যবাদী ও সত্যায়িত সত্ত্বা আমাকে বলেছেন’। এসব বাক্য দ্বারা সাহাবিগণ যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আস্থা পোষণ করেছেন, একইভাবে তাবী‘ঈগণ সাহাবিদের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেছেন, সন্দেহ দূর করার জন্য তা বলেননি; কারণ তারা সন্দেহ করতেন না।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুসলিম ও অমুসলিম কারো মাঝে মিথ্যার প্রচলন ছিল না, তবুও মিথ্যা হাদিস রচনাকারীকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহান্নামের হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। বক্তার সংবাদ গ্রহণ করার পূর্বে আল্লাহ শ্রোতাদেরকে যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমরা নিশ্চিত সাহাবিদের যুগে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে কোনো প্রকার বৃদ্ধি ঘটেনি।
২. দীনে হ্রাস করা নিষেধ:
দীনের কোনো অংশ যেন হ্রাস না পায়, সে জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন: ১. দীন প্রচারের নির্দেশ ও ২. দীন গোপন করার নিষেধাজ্ঞা। এ মর্মে কয়েকটি হাদিস আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এখানে অপর একটি হাদিস উল্লেখ করছি, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«نَضَّرَ اللهُ امْرَءاً سَمِعَ مِنَّا حَدِيثاً، فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ، فَإِنَّهُ رُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَيْسَ بِفَقِيهٍ، وَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ. ثَلاثُ خِصَالٍ لا يَغِلُّ عَلَيْهِنَّ قَلْبُ مُسْلِمٍ أَبَداً: إِخْلاصُ الْعَمَلِ لِلّهِ، وَمُنَاصَحَةُ وُلاةِ الْأَمْرِ، وَلُزُومُ جَمَاعَةِ الْمُسْلِمِينَ، فَإِنَّ دَعْوَتَهُمْ تُحِيطُ مِنْ وَرَائِهِمْ»
“আল্লাহ সে ব্যক্তিকে শুভ্রোজ্জল করুন, যে আমাদের থেকে কোনো হাদিস শ্রবণ করল এবং অপরকে পৌঁছানো পর্যন্ত তা সংরক্ষণ করল। কারণ অনেক ফিকহধারণকারী ফকিহ হয় না, আবার অনেক ফিকহ ধারণকারী তার চেয়ে বিজ্ঞ ফকিহ এর নিকট ইলম পৌঁছায়। তিনটি স্বভাব যেগুলোতে কোনো মুসলিমের অন্তর খিয়ানত বা বিদ্বেষ থাকতে পারে না (অর্থাৎ মুসলিমের অন্তরে তা থাকাই স্বাভাবিক; অথবা এগুলো থাকলে সে অন্তরে হিংসা, হানাহানি থাকবে না) : আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে আমল করা, দায়িত্বশীলদের সৎ উপদেশ প্রদান করা ও মুসলিমদের জামা‘আত আঁকড়ে ধরা। কারণ মুসলিমদের দাওয়াত তাদের সবাইকে বেষ্টন করে নেয়”।
দীন গোপনকারীকে সতর্ক করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡتُمُونَ مَآ أَنزَلۡنَا مِنَ ٱلۡبَيِّنَٰتِ وَٱلۡهُدَىٰ مِنۢ بَعۡدِ مَا بَيَّنَّٰهُ لِلنَّاسِ فِي ٱلۡكِتَٰبِ أُوْلَٰٓئِكَ يَلۡعَنُهُمُ ٱللَّهُ وَيَلۡعَنُهُمُ ٱللَّٰعِنُونَ ١٥٩ إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ وَأَصۡلَحُواْ وَبَيَّنُواْ فَأُوْلَٰٓئِكَ أَتُوبُ عَلَيۡهِمۡ وَأَنَا ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ ١٦٠﴾ [البقرة: ١٥٩، ١٦٠]
“নিশ্চয় যারা গোপন করে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও হিদায়েত যা আমি নাযিল করেছি, কিতাবে মানুষের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর, তাদেরকে আল্লাহ লানত করেন এবং লানতকারীগণ লানত করে। তারা ছাড়া, যারা তওবা করেছে, শুধরে নিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। অতএব, আমি তাদের তওবা কবুল করব। আর আমি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”। উল্লেখ্য ইলম গোপন করে যে পাপ করে, তার তাওবা হচ্ছে গোপন করা ইলম প্রকাশ করে দেওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
«مَنْ كَتَمَ عِلْما ً تَلَجَّمَ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“যে কোনো ইলম গোপন করল, সে কিয়ামতের দিন আগুনের লাগাম পড়বে”।
এসব আয়াত ও হাদিসের প্রভাব আমরা সাহাবিদের জীবনে দেখতে পাই। তারা দীন প্রচারের দায়িত্ব আঞ্জাম ও দীন গোপন করার পাপ থেকে মুক্তির জন্য জীবন সায়াহ্নেও ইলম প্রচার করেছেন। একদা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে অধিক হাদিসের কারণে দোষারোপ করা হয়, তিনি প্রতিবাদ করে বলেন: “আল্লাহর শপথ, যদি আল্লাহর কিতাবে দু’টি আয়াত না থাকত, আমি তোমাদেরকে কোনো হাদিস বলতাম না”। অতঃপর তিনি সূরা বাকারার উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন”। উসমান ইব্ন আফ্ফান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«والله لأحدثنكم حديثاً، والله لولا آية في كتاب الله ما حدَّثْتُكُمُوه»
“আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদেরকে একটি হাদিস শুনাব, আল্লাহর শপথ যদি আল্লাহর কিতাবে একটি আয়াত না থাকত আমি তোমাদেরকে হাদিস বলতাম না”। তার উদ্দেশ্যও উপরোক্ত আয়াত। এ থেকে আমরা নিশ্চিত হলাম যে, সাহাবিগণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনা কোনো বাণী গোপন করেননি, কিংবা তার কোনো অংশ তারা হ্রাস করেননি।
৩. দীনকে বিকৃতি করা নিষেধ:
দীনের স্বকীয়তা রক্ষার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিকৃতিহীন হাদিস বর্ণনা করা। এ ধাপ অতিক্রম করা খুব কঠিন, কারণ ভুল মানুষের স্বভাব। ভুল ও সন্দেহ থেকে নবী ব্যতীত কেউ নিরাপদ নয়। অতএব প্রত্যেক হাদিসে শব্দ ও অর্থের অক্ষুণ্নতা এবং রাবিদের সন্দেহ ও ভুল থেকে মুক্ত থাকার দাবি করা খুব কঠিন। তাহলে প্রশ্ন হয়, এ ক্ষেত্রে করণীয় কি?
এ ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় বর্তায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর। তিনি সাহাবিদেরকে হাদিস মুখস্থ করাবেন, তারা তার কথা ও কর্মগুলো যথাযথ সংরক্ষণ ও মুখস্থ করবেন। ভুল হলে শুধরানোর ব্যবস্থা করবেন এবং সন্দেহ কিংবা গাফলতি হলে দূর করার পন্থা অবলম্বন করবেন। এটাই এ ক্ষেত্রে করণীয়, এ ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। তাই দেখি হাদিস সংরক্ষণ ও তাতে বিকৃতি ঠেকানোর জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্ভাব্য সকল পন্থা অবলম্বন করেছেন, যেমন:
হাদিস শিক্ষা দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি:
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কথা বারবার বলতেন, কখনো তিনবার, কখনো তার চেয়ে অধিক বলতেন, যেন শ্রোতারা তার কথা বুঝে ও মুখস্থ করতে সক্ষম হয়। ইমাম বুখারি প্রমুখ আনাস ও আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন:
«أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلاَثاً حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ، وَإِذَا أَتَى عَلَى قَوْمٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلاَثًا».
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো বিষয়ে কথা বলতেন, তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যেন তার কথা বুঝা যায়। যখন তিনি কোনো কওমের নিকট আসতেন, তাদেরকে সালাম করতেন, তিনবার সালাম করতেন”।
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শব্দসমূহ পৃথক উচ্চারণ করতেন ও ধীরে কথা বলতেন, যেন শ্রোতারা মুখস্থ ও স্মরণ রাখতে সক্ষম হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলতেন, যদি কোনো গণনাকারী গণনা করতে চাইত অবশ্যই গণনা করতে সক্ষম হত”। অপর বর্ণনায় তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের ন্যায় দ্রুত বলতেন না, তিনি পৃথক পৃথক বাক্য উচ্চারণ করতেন, যে তার কাছে বসত মুখস্থ করতে সক্ষম হত”।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথার সময় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতেন, যেন শ্রোতারা বিরক্ত না হয় এবং তাদের আলস্য না আসে। কখনো কয়েকটি শব্দে কথা শেষ করতেন, যেমন একদা তিনি বলেন: «النَّدَمُ تَوْبَةٌ» ‘লজ্জিত হওয়াই তওবা’। অপর হাদিসে তিনি বলেন:
«الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ، وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ»
“একতা রহমত ও বিচ্ছিন্নতা শাস্তি”।
৪. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপদেশের জন্য উপযুক্ত সময় অন্বেষণ করতেন, যেন শ্রোতারা গভীর আগ্রহে শ্রবণ করে ও মুখস্থের প্রতি যত্নশীল হয়। কখনো দু’টি উপদেশের মাঝে দীর্ঘ বিরতি নিতেন, যেন তাদের উদ্যমতা বৃদ্ধি পায় ও স্মৃতি শক্তি প্রখর হয়। আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَتَخَوَّلُنَا بِالْمَوْعِظَةِ فِي الْأَيَّامِ، كَرَاهَةَ السَّآمَةِ عَلَيْنَا»
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াযের জন্য দিনসমূহে উপযুক্ত সময় অন্বেষণ করতেন, কারণ তিনি আমাদের বিরক্তিকে অপছন্দ করতেন”।
৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো উদাহরণ পেশ করতেন, কারণ উদাহরণ বুঝা সহজ, দ্রুত অন্তরে আছর কাটে এবং অর্থগত বস্তুকে সহজে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে পরিণত করা যায়। বিশেষ করে অলঙ্কার শাস্ত্রবিদদের নিকট উদাহরণের খুব মূল্য। তাই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক উদাহরণ পেশ করতেন, আব্দুল্লাহ ইব্ন আমর ইব্ন আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এক হাজার উদাহরণ মুখস্থ করেছি”।
এ ছাড়া তিনি আরো পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, যে কারণে সাহাবিগণ তার কথা, কর্ম, সমর্থন ও গুণগানগুলো সংরক্ষণ ও পরবর্তীদের নিকট পূর্ণরূপে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন।
শ্রোতা হিসেবে সাহাবিরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আদব ও মনোযোগসহ শ্রবণ করতেন, যেন কোনো বাণী তাদের থেকে বিচ্যুত না হয়, কোনো হাদিসে ভুল কিংবা সন্দেহ প্রবেশ না করে। নিম্নে তার কয়েকটি নমুনা পেশ করছি:
হাদিস স্মরণ রাখার পদ্ধতি:
১. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কথা বলতেন সাহাবিগণ চুপ করে শ্রবণ করতেন, যেন তার কোনো কথা তাদের হাত ছাড়া না হয়। ইমাম আবু দাউদ ও আহমদ রাহিমাহুমাল্লাহ্ উসামাহ ইব্ন শারিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
«أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَإِذَا أَصْحَابُهُ كَأَنَّمَا عَلَى رُءُوسِهِمْ الطَّيْرُ».
“আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করলাম, তখন তার সাথীগণ এমতাবস্থায় ছিল যে, যেন তাদের মাথার উপর পাখিকুল বসে আছে”। ইমাম তাবরানি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, উসামাহ ইব্ন শারিক বলেন:
«كُنَّا جُلُوساً عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَأَنَّمَا عَلَى رُؤُوسِنَا الطَّيْرُ، مَا يَتَكَلَّمُ مِنَّا مُتَكَلِّمٌ».
“আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসে ছিলাম, যেন আমাদের মাথার উপর পাখিকুল রয়েছে। আমাদের কেউ কথা বলত না”।
২. সাহাবিগণ জটিল বিষয় বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, বুঝার আগ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার এ ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি ছিল। ইব্ন আবি মুলাইকা থেকে ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশার অভ্যাস ছিল অজানা বিষয় জিজ্ঞাসা করা, একদা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«َمْن حُوسِبَ عُذِّبَ»
“যার হিসাব নেওয়া হবে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে”। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: আমি বললাম, আল্লাহ কি বলেননি:
﴿ فَسَوۡفَ يُحَاسَبُ حِسَابٗا يَسِيرٗا ٨ ﴾ [الانشقاق: ٨]
“অত্যন্ত সহজভাবেই তার হিসাব-নিকাশ করা হবে”। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
«إِنَّمَا ذَلِكَ الْعَرْضُ، وَلَكِنْ مَنْ نُوقِشَ الْحِسَابَ يَهْلِكْ».
“এটা হচ্ছে শুধু সামনে পেশ করা, কিন্তু যাকে হিসাবের জন্য জবাবদিহি করা হবে সে ধ্বংস হবে”।
৩. সাহাবিগণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পর্যবেক্ষণ করতেন, অযথা প্রশ্ন করে বিরক্ত করতেন না। ইমাম মুসলিম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ ইব্ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «الصَّلَاةُ لِوَقْتِهَا» قَالَ: قُلْتُ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ : «بِرُّ الْوَالِدَيْنِ» قَالَ: قُلْتُ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: «الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ» فَمَا تَرَكْتُ أَسْتَزِيدُهُ إِلَّا إِرْعَاءً عَلَيْهِ. يعني رِفْقاً به صلى الله عليه وسلم.
“আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছি কোন্ আমল সর্বোত্তম? তিনি বললেন: সময়মত সালাত আদায় করা। আমি বললাম: অতঃপর? তিনি বললেন: ‘পিতা-মাতার সদাচরণ’। তিনি বলেন: আমি বললাম: অতঃপর? তিনি বললেন: ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা’। আমি আরো জিজ্ঞাসা করতাম, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থার খাতিরে ত্যাগ করেছি”।
৪. সাহাবিদের মধ্যে যিনি লিখতে জানতেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী লিখে রাখতেন। ইমাম আবু দাউদসহ একাধিক মুহাদ্দিস সহি সনদে বর্ণনা করেন: আব্দুল্লাহ ইব্ন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনে মুখস্থ করার বস্তুগুলো আমি লিখে রাখতাম। কুরাইশরা আমাকে বারণ করল, তারা বলল: তুমি শোনা প্রত্যেক বিষয় লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি সন্তুষ্টি ও গোস্বায় কথা বলেন?! আমি বিরত থাকি, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘটনাটি বলি। তিনি মুখের দিকে আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে বললেন:
«اكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلَّا حَقٌّ».
“তুমি লিখ, ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার নফস, এ মুখ থেকে সত্য ব্যতীত কিছু বের হয় না”।
৫. অধিকন্তু সাহাবিদের পরিষ্কার চিন্তা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি স্মরণ রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল। তাদের মাঝে শিক্ষার ব্যাপকতা না থাকার ফলে বংশ, বিভিন্ন ঘটনা, ওয়াদা ও চুক্তিপত্র তারা মুখস্থ রেখে অভ্যস্থ ছিল, যার ফলে তাদের স্মৃতি শক্তির প্রখরতা বৃদ্ধি পেত। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কর্মগুলো চর্চা করেন। এভাবে তারা আল্লাহর দীনকে হিফাজত করতে সক্ষম হন, শুধু দায়িত্বের খাতিরে নয়, দীন ও দীন প্রচারকের মহব্বতও তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আল্লাহ সকল মুসলিমের পক্ষ থেকে তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
এ ছিল প্রথম উস্তাদ ও প্রথম ছাত্রদের অবস্থা। এ থেকে আমরা জানলাম যে, যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করলে ছাত্রগণ তাদের আদর্শ উস্তাদের সকল শিক্ষা মুখস্থ করতে সক্ষম হন, তার প্রত্যেকটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুসরণ করেছেন। অপর দিকে আদর্শ ছাত্র হিসেবে উস্তাদের পাঠ গ্রহণ করার যাবতীয় কৌশল সাহাবিগণ অবলম্বন করেছেন।
শিক্ষক হিসেবে সাহাবিগণ:
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবিগণ শিক্ষকরূপে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েন। তখন দীন প্রচার ও দীনকে অবিকৃত রাখা উভয় দায়িত্ব বর্তায় তাদের উপর, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে জানার সুযোগ নেই। তাই সাহাবিগণ হাদিসের শুদ্ধতা রক্ষার স্বার্থে কতক নীতির অনুসরণ করেন, যেমন তারা হাদিস বর্ণনা কমিয়ে দেন, বর্ণনার পূর্বে শুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন ও অপরকে শুনিয়ে যাচাই করেন, নিম্নে তার কতক নমুনা পেশ করছি:
১. সাহাবিগণ শুদ্ধতা রক্ষার স্বার্থে হাদিস বর্ণনা কমিয়ে দেন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবিগণ হাদিস বর্ণনার সংখ্যা কমিয়ে দেন, যেন তাতে ভুল ও মিথ্যা প্রবেশ না করে। এক সাহাবি হাদিসের খিদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম হলে অপর সাহাবি চুপ থাকেন। কম বর্ণনা হাদিস স্মরণ রাখার একটি পদ্ধতি। অনেক সাহাবি বার্ধক্য জনিত স্মরণ শক্তি হ্রাস পেয়েছে সন্দেহে হাদিস বর্ণনা বন্ধ রাখেন। মাস ও বছর পার হত, তবু কতক সাহাবি বলতেন না: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন’। ভুল থেকে সুরক্ষার জন্য তারা এরূপ করতেন। কুরআন ত্যাগ করে মানুষ যেন হাদিসের প্রতি বেশী মনোযোগী না হয়, সে জন্যও তারা হাদিস বর্ণনা কম করেন।
ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কোনো দেশে মুজাহিদ বা শিক্ষকরূপে কাউকে প্রেরণ করার সময় বলতেন: “তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কম বর্ণনা কর, এ ক্ষেত্রে আমি তোমাদের অংশীদার”। তার উদ্দেশ্য হাদিস গোপন করা নয়, বরং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো বিষয়কে সম্পৃক্ত করার পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করা। তাই অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবির সংখ্যা খুব কম।
অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিগণ:
হাজারের ঊর্ধ্বে মাত্র সাতজন সাহাবি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যথা: ১. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু, হাদিস সংখ্যা: (৫৩৭৪), ২. আব্দুল্লাহ ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু, হাদিস সংখ্যা: (২৬৩০), ৩. আনাস ইব্ন মালিক রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু, হাদিস সংখ্যা: (২২৮৬), ৪. উম্মুল মুমেনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহা, হাদিস সংখ্যা: (২২১০), ৫. আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু, হাদিস সংখ্যা: (১৬৬০), ৬. জাবের ইব্ন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু, হাদিস সংখ্যা: (১৫৪০), ৭. আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু, হাদিস সংখ্যা: (১১৭০), তাদের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন।
২. সাহাবিগণ হাদিসের শুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন:
হাদিসের শুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে সাহাবিগণ হাদিস বলতেন না। তবু ভুল হয়েছে ভয়ে হাদিস বর্ণনার সময় কেউ আঁতকে উঠতেন, কোথাও সন্দেহ হলে বিনা সংকোচে বলে দিতেন। কেউ একটি হাদিস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বহুদূর পর্যন্ত সফর করেন, যেমন জাবের ইব্ন আব্দুল্লাহ একটি হাদিসের জন্য আব্দুল্লাহ ইব্ন উনাইসের নিকট শামে গিয়েছেন। আবু আইয়ূব আনসারি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একটি হাদিসের জন্য উকবাহ ইব্ন আমের-এর নিকট মিসরে গিয়েছেন।
৩. সাহাবিগণ হুবহু হাদিস বর্ণনার চেষ্টা করেন:
সাহাবিগণ হ্রাস-বৃদ্ধি ব্যতীত হুবহু হাদিস বর্ণনার চেষ্টা করতেন। কখনো হুবহু শব্দ বলা কঠিন হলে ভাবার্থ বলতেন। তারা ভাষা জানতেন, শরীয়তের উদ্দেশ্য বুঝতেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেক্ষাপট দেখেছেন, তাই এতে সাধারণত তাদের ভুল হত না।
৪. সাহাবিগণ হাদিস যাচাই করেন:
সাহাবিগণ কোনো হাদিস প্রসঙ্গে সন্দেহ হলে যাচাই করেন। বিশেষভাবে আবু বকর এরূপ বেশী করেন, অতঃপর তার অনুসরণ করেন ওমর। তারা কখনো রাবির নিকট সাক্ষী তলব করেন, যেমন মুগিরা ইব্ন শু‘বা যখন বলেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাতির পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে দাদিকে এক ষষ্ঠাংশ মিরাস প্রদান করেছেন, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার নিকট সাক্ষী তলব করেন, আর মুহাম্মদ ইব্ন মাসলামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন। অনুরূপ আবু মুসা আশ‘আরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন তিনবার অনুমতি প্রসঙ্গে হাদিস বলেন, ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার হাদিস গ্রহণ করেননি যতক্ষণ না আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার সাথে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আলি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হাদিসের শুদ্ধতার জন্য কখনো রাবি থেকে কসম নিতেন।
তাদের উদ্দেশ্য কখনো হাদিসের পথ সংকীর্ণ কিংবা রুদ্ধ করা ছিল না, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভুল ও মিথ্যার সুযোগ নষ্ট করা, যেন সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো হাদিস সম্পৃক্ত করার পূর্বে সতর্ক হয়।
৫. সাহাবিগণ সনদের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন:
সাহাবিগণ হাদিসের শুদ্ধতা রক্ষার স্বার্থে হাদিসের সনদ তলব করেন, অপরকে গ্রহণযোগ্য রাবি থেকে শ্রবণ করার নির্দেশ দেন। কারণ মানুষ যখন দলেদলে ইসলামে প্রবেশ করছিল, তখন একটি কুচক্রী মহল দীনের প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখে মিথ্যা হাদিস বর্ণনা আরম্ভ করে, তাই হাদিস গ্রহণ করার পূর্বে রাবির অবস্থা জানা আবশ্যক হয়, বিশেষ করে উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর শাহাদাত পরবর্তী সময়ে। তখন মুসলিম সমাজে প্রসিদ্ধ ছিল:
«إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِينٌ، فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ»
“নিশ্চয় এ ইলম দীনের অংশ, অতএব পরখ করে দেখ কার থেকে তোমরা তোমাদের দীন গ্রহণ করছ”। মুহাম্মদ ইব্ন সিরিন রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন:
«لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الإِسْنَادِ، فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ، قَالُوا: سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ، فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ، فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ، وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ، فَلَا يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ».
“তারা সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত না, কিন্তু যখন ফিতনা (উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর শাহাদাত) সংঘটিত হল, তারা বলল: তোমরা আমাদেরকে তোমাদের রাবিদের নাম বল, আহলে সুন্নাহ হলে তাদের হাদিস গ্রহণ করা হবে, আর বিদআতি হলে তাদের হাদিস ত্যাগ করা হবে”।
উকবাহ ইব্ন ‘আমের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার সন্তানদের উপদেশ দিয়ে বলেন: “হে বৎসগণ, আমি তোমাদেরকে তিনটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি, ভালো করে স্মরণ রেখ: নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ব্যতীত কারো থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস গ্রহণ কর না, উলের মোটা কাপড় পরলেই দীনদার হবে না, আর কবিতা লিখে তোমাদের অন্তরকে কুরআন বিমুখ করো না”।
আনাস ইব্ন মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু স্বীয় ছাত্র সাবিত ইব্ন আসলাম আল-বুনানিকে বলেন: “হে সাবিত আমার থেকে গ্রহণ কর, তুমি আমার অপেক্ষা নির্ভরযোগ্য কাউকে পাবে না, কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে গ্রহণ করেছি, তিনি জিবরীল থেকে গ্রহণ করেছেন, আর জিবরীল আল্লাহ তা‘আলা থেকে গ্রহণ করেছেন”।
৬. সাহাবি সাহাবির নিকট হাদিস পেশ করেন:
এক সাহাবি অপর সাহাবির নিকট হাদিস পেশ করে শুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। তাদের বিশ্বাস ছিল কোনো সাহাবি মিথ্যা বলে না, বা সজ্ঞানে বিকৃতি করে না, তবে কারো ভুল হতে পারে, কারো স্মৃতি থেকে কোনো বিষয় হারিয়ে যেতে পারে, তাই ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। অতএব তারা অপরকে শুনিয়ে হাদিস যাচাই করতেন। ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন: ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبَعْضِ بُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ»
“নিশ্চয় মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবারের কতক কান্নায় শাস্তি দেওয়া হয়”। ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর মৃত্যুর পর আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে এ হাদিস বলি। তিনি বললেন: আল্লাহ ওমরের উপর রহম করুন। আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো বলেননি:
«إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبَعْضِ بُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ»
তবে তিনি বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ لَيَزِيدُ الْكَافِرَ عَذَابًا بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ»
“নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরের শাস্তি বৃদ্ধি করেন, তার উপর তার পরিবারের কান্নার কারণে”। অতঃপর তিনি বলেন: (এ ব্যাপারে) তোমাদের জন্য কুরআন যথেষ্ট।
﴿ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ١٨ ﴾ [فاطر: ١٨]
“কোনো বোঝা বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না”।
৭. রাবিদের সমালোচনার সূচনা:
সাহাবিদের যুগ থেকে রাবিদের যাচাই করা আরম্ভ হয়। কারো হাদিস তারা প্রত্যাখ্যান করেন, কারো হাদিস সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন। ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ্ মুজাহিদ ইব্ন জাবর থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নিকট বুশাইর আদাবি এসে বলতে লাগল: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন”, কিন্তু ইব্ন আব্বাস তাকে হাদিস বলার অনুমতি দেননি, তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করেননি। সে বলল: হে ইব্ন আব্বাস, আপনি কেন মনোনিবেশ করছেন না! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস বলছি, আপনি শুনছেন না! ইব্ন আব্বাস বলেন: “আমরা এক সময়ে ছিলাম, যখন কাউকে বলতে শুনতাম: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের চোখ তাকে লুফে নিত, তার দিকে আমরা মনোযোগ দিতাম, কিন্তু লোকেরা যখন কঠিন ও নরম বাহনে আরোহণ করল (হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রশংসিত ও নিন্দনীয় উভয় পন্থা অবলম্বন করল), তখন থেকে পরিচিত বস্তু গ্রহণ করি”। অপর বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যখন মিথ্যা বলা হত না, তখন আমরা হাদিস বলতাম, কিন্তু লোকেরা যখন উঁচু-নিচু উভয় বাহনে আরোহণ করল, আমরা তার থেকে হাদিস বর্ণনা করা ত্যাগ করি”।
এভাবে সাহাবিদের যুগ শেষ না হতেই সনদ তলব করা আরম্ভ হয় এবং علم الجرح والتعديل তথা ‘সমালোচনা শাস্ত্রে’র সূচনা হয়। তারা সহি হাদিস ও সেকাহ রাবি চিহ্নিত করার কতক নীতি তৈরি করেন, যা সবার নিকট প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণে স্বতন্ত্র গ্রন্থে জমা করার প্রয়োজন হয়নি।
একটি সন্দেহ ও তার নিরসন:
সাহাবিগণ ও মুনাফিকরা একসঙ্গে বাস করত, সে সুযোগে হয়তো কোনো মুনাফিক নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করেছে, আর মানুষেরা তাদের বাহ্যিক সাথীত্ব দেখে সেগুলো গ্রহণ করেছে, এ জাতীয় সন্দেহ হতে পারে। কারণ, মুনাফিকরা মিথ্যা বলেছে। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন:
﴿إِذَا جَآءَكَ ٱلۡمُنَٰفِقُونَ قَالُواْ نَشۡهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُۥ وَٱللَّهُ يَشۡهَدُ إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ لَكَٰذِبُونَ ١﴾ [المنافقون: ١]
“যখন তোমার কাছে মুনাফিকরা আসে, তখন বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, অবশ্যই তুমি তার রাসূল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, অবশ্যই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী”। অতএব তাদের মিথ্যা প্রচার করার বাস্তবতা কতটুকু?
কয়েকটি কারণে তারা এরূপ করতে পারেনি:
১. মুনাফিকরা দীনের প্রচার থেকে বিমুখ ছিল। কতক মুনাফিক কুরআন শ্রবণ করত, কিন্তু কুরআনের কোনো অংশ তাদের অন্তরে প্রবেশ করত না, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمِنۡهُم مَّن يَسۡتَمِعُ إِلَيۡكَ حَتَّىٰٓ إِذَا خَرَجُواْ مِنۡ عِندِكَ قَالُواْ لِلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ مَاذَا قَالَ ءَانِفًاۚ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ طَبَعَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمۡ وَٱتَّبَعُوٓاْ أَهۡوَآءَهُمۡ ١٦﴾ [محمد : ١٦]
“আর তাদের মধ্যে এমন কতক রয়েছে, যারা তোমার প্রতি মনোযোগ দিয়ে শুনে। অবশেষে যখন তারা তোমার কাছ থেকে বের হয়ে যায় তখন তারা যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘এই মাত্র সে কী বলল?’ এরাই তারা, যাদের অন্তরসমূহে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে”। তারা যেহেতু ভাল করে শ্রবণ করেনি, তাই তাদের পক্ষে দীন বিকৃত করা সম্ভব হয়নি।
২. মুসলিমরা কোনো বিষয়ে মুনাফিকদের শরণাপন্ন হত না, কারণ কুরআনে বর্ণিত তাদের স্বভাব ও নিদর্শনের কারণে তারা চিহ্নিত ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলে:
﴿ وَلَتَعۡرِفَنَّهُمۡ فِي لَحۡنِ ٱلۡقَوۡلِۚ ٣٠ ﴾ [محمد : ٣٠]
“তবে তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদের চিনতে পারবে”। অতএব তারা চিহ্নিত ছিল, যার নিফাক স্পষ্ট ছিল না সেও সন্দেহের পাত্র ছিল। ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করতে পেরে কা‘ব ইব্ন মালিক আফসোস করে বলেন:
«فَكُنْتُ إِذَا خَرَجْتُ فِي النَّاسِ بَعْدَ خُرُوجِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَطُفْتُ فِيهِمْ أَحْزَنَنِي أَنِّي لَا أَرَى إِلَّا رَجُلًا مَغْمُوصًا عَلَيْهِ النِّفَاقُ، أَوْ رَجُلًا مِمَّنْ عَذَرَ اللَّهُ مِنْ الضُّعَفَاءِ».
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রস্থানের পর আমি যখন মানুষের নিকট যেতাম ও তাদের মাঝে ঘুরতাম, আমাকে খুব দুঃখিত করত, কারণ আমি শুধু তাদেরকে দেখতাম যারা নেফাকের দোষে দুষ্ট ছিল, অথবা এমন কাউকে দেখতাম যাদেরকে আল্লাহ অক্ষমতার কারণে ছাড় দিয়েছেন”।
এ থেকে প্রমাণিত হল যে, মুনাফিকরা চিহ্নিত ছিল, তাই কোনো মুসলিম দীনি বিষয়ে তাদের শরণাপন্ন হবে সম্ভব ছিল না।
৩. আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি, সাহাবিগণ নির্দিষ্ট নীতির অধীন হাদিস শ্রবণ করতেন, বলতেন ও যাচাই করতেন এবং বিনা সংকোচে অপরের সমালোচনা করতেন। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো বিষয় সম্পৃক্ত করা হবে, যা তিনি বলেননি, আর তারা চুপ থাকবে, এরূপ সম্ভব ছিল না। আল্লাহ তার নবীকে মুনাফিকদের থেকে পূর্ণরূপে রক্ষা করেছেন।
তাবে‘ঈ ও তাদের পরবর্তী যুগে হাদিস:
হিজরি প্রথম শতাব্দীর অর্ধেক শেষ না-হতেই অধিকাংশ সাহাবি জীবন সংগ্রাম শেষ করে জান্নাতুল ফিরদউসে পাড়ি জমান। ইতোপূর্বে তারা ইসলামের দাওয়াত ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে পূর্ব-পশ্চিম বিচরণ করেন, ফলে বিভিন্ন দেশের তাবে‘ঈগণ তাদের থেকে ইলম হাসিল করার সুযোগ পান, তবে তারা কতক সমস্যার মুখোমুখি হন, যেমন:
১. তারা দেখলেন, নবী যুগ থেকে দূরত্বের সাথে মানুষের স্মৃতি শক্তি লোপ পাচ্ছে, লেখা-লেখির উপর নির্ভরতা বাড়ছে ও আরব-অনারব মিশ্রিত হচ্ছে।
২. ধীরে ধীরে সনদ দীর্ঘ হচ্ছে, সাহাবি থেকে তাবে‘ঈ, কখনো তাবে‘ঈ থেকে তাবে‘ঈ ইলম শিখছেন।
৩. মুসলিমের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে রাবি ও হাদিসের সনদ বাড়ছে।
৪. তাবে‘ঈদের যুগে কয়েকটি বাতিল ফের্কার আত্মপ্রকাশ ঘটে, যেমন শিয়া, খাওয়ারেজ, অতঃপর মুতাযিলা, মুরজিয়াহ ও জাবরিয়া ইত্যাদি। তারা দেখলেন বাতিল ফিরকাগুলো তাদের বিদআতের সমর্থনে মিথ্যা হাদিস রচনায় লিপ্ত।
তাবে‘ঈগণ এসব সমস্যার সমাধানের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা হাদিসের সুরক্ষার স্বার্থে সাহাবিদের থেকে শেখা নীতির সাথে নতুন কতিপয় নীতি তৈরি করেন, যেমন:
তাবে‘ঈদের অনুসৃত নীতি:
১. তাবে‘ঈগণ রাবি ও সনদ যাচাই করেন, যেন মিথ্যাবাদীদের কোনো রচনা হাদিসের স্বীকৃতি না পায়। তারা রাবিদের অবস্থা, নাম, উপাধি, উপনাম, জন্ম ও সফর ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করেন। রাবিদের দেশ সফর, অবস্থান, মৃত্যু এবং প্রত্যেকের ভালো-মন্দ জানেন, তাদের স্মৃতি শক্তি ও হাদিসের উপর দক্ষতা সংরক্ষণ করেন। এভাবে তারা গ্রহণযোগ্য ও পরিত্যক্ত রাবিদের পৃথক করেন।
তারা সনদকে দীনের অংশ মনে করেন, কারণ সহি, দুর্বল ও জাল হাদিস জানার সনদ একটি মাধ্যম। ইমাম মুসলিম সহি মুসলিমের ভূমিকায় আব্দুল্লাহ ইব্ন মুবারক থেকে বর্ণনা করেন:
«الْإِسْنَادُ مِنْ الدِّينِ، وَلَوْلَا الْإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ »، وقَالَ أيضاً: «بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْقَوَائِمُ» يَعْنِي الْإِسْنَادَ».
“সনদ দীনের অংশ, যদি সনদ না থাকত তাহলে যে যা ইচ্ছা তাই বলত”। তিনি অন্যত্র বলেন: “আমাদের ও পূর্ববর্তীদের মাঝে সিঁড়ি [সনদ] রয়েছে”। আবু ইসহাক ইবরাহিম ইব্ন ঈসা তালাকানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: আমি আব্দুল্লাহ ইব্ন মুবারককে বললাম: হে আবু আব্দুর রহমান, এ হাদিসটি কেমন:
«إِنَّ مِنْ الْبِرِّ بَعْدَ الْبِرِّ أَنْ تُصَلِّيَ لِأَبَوَيْكَ مَعَ صَلَاتِكَ وَتَصُومَ لَهُمَا مَعَ صَوْمِكَ»
“নিশ্চয় সদাচরণের সাথে আরো সদাচরণ হচ্ছে যে, তুমি তোমার সালাতের সাথে তোমার পিতা-মাতার জন্য সালাত পড়বে এবং তোমার সিয়ামের সাথে তাদের জন্য সিয়াম রাখবে”। আব্দুল্লাহ বললেন: হে আবু ইসহাক, এ হাদিস কার থেকে বর্ণিত? তিনি বলেন: আমি বললাম: শিহাব ইব্ন খিরাশ থেকে। তিনি বললেন: সে সেকাহ, সে কার থেকে? আমি বললাম: হাজ্জাজ ইব্ন দিনার থেকে। তিনি বললেন: সে সেকাহ, সে কার থেকে? আমি বললাম: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। তিনি বললেন: হে আবু ইসহাক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হাজ্জাজ ইব্ন দিনারের মাঝে অনেক দূরত্ব রয়েছে, যেখানে উটের গর্দান নুইয়ে যায়, তবে সদকার ক্ষেত্রে দ্বিমত নেই। অর্থাৎ হাজ্জাজ ইব্ন দিনার ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে অপর রাবি রয়েছে, যাদেরকে হাজ্জাজ উল্লেখ করেনি, অতএব সনদ মুত্তাসিল নয়, তাই হাদিস সহি নয়।
এ যুগে হাদিসের কতক পরিভাষা সৃষ্টি হয়, যেমন ‘মুদাল্লাস’। মুহাদ্দিসগণ মুদাল্লিসের হাদিস গ্রহণ করতেন না, যতক্ষণ না সে বাদ দেওয়া রাবির নাম বলে দিত। অনুরূপ ‘মুরসাল’, ‘মুত্তাসিল’, ‘মারফূ‘’, ‘মাওকুফ’ ও ‘মাকতু’ ইত্যাদি পরিভাষার সৃষ্টি হয়।
২. তাবে‘ঈগণ রাবিদের গুণাগুণ নির্ণয়ে বিভিন্ন পরিভাষা গ্রহণ করেন, যেমন ‘দ্বা‘ঈফ’, ‘কাযযাব’, ‘সেকাহ’, ‘আদিল’ ও ‘দাবেত’ ইত্যাদি, যেন সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী, দুর্বল ও সবল রাবিদের চিহ্নিত করা যায়।
৩. তাবে‘ঈগণ সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাদিস লিপিবদ্ধ করা আরম্ভ করেন। কতক তাবে‘ঈ হাদিসের কিতাব লিখেন, যেমন হাম্মাম ইব্ন মুনাব্বিহ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো জমা করেন। খলিফা ওমর ইব্ন আব্দুল আযিয রাহিমাহুল্লাহ সরকারি তত্ত্বাবধানে আবু বকর ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন হাযম ও মুহাম্মদ ইব্ন শিহাব যুহরিকে বিভিন্ন দেশ থেকে হাদিস সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন, যেন আলেমদের মৃত্যুর কারণে ইলম বিনষ্ট না হয় ও মিথ্যা হাদিস দীনে প্রবেশ না করে। এ সময়ে লিখিত সবচেয়ে পুরনো কিতাব হিসেবে আমাদের নিকট পৌঁছেছে মা‘মার ইব্ন রাশেদ সান‘আনি (মৃ.১৫৪হি.) রচিত جامع ‘জামে’ ও ইমাম মালিক (মৃ.১৭৯হি.) রচিত ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’ গ্রন্থদ্বয়।
৪. তাবে‘ঈগণ বিভিন্ন দেশ থেকে হাদিসের সনদগুলো জমা করে পরখ করেন ও এক হাদিসের সাথে অপর হাদিস তুলনা করেন। এভাবে হাদিসের শুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
৫. যারা পেশা হিসেবে হাদিস শিক্ষা করেনি বা হাদিস বর্ণনার নীতি জানেনি, তাবে‘ঈগণ তাদের হাদিস ত্যাগ করেন। অর্থাৎ এক শ্রেণীর ইবাদত গোজার ও দুনিয়া ত্যাগীদের হাদিস তারা ত্যাগ করেন, যারা উসুলে হাদিস জানতেন না, তবে মানুষদেরকে ইবাদত ও নেক আমলের প্রতি আহ্বান করতেন। তারা নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ ও খারাপ আমল থেকে সতর্ক করে অনেক হাদিস রচনা করেন। আলেমগণ তাদের হাদিস থেকে সতর্ক করেন। তারা বলেন: কারো হাদিস গ্রহণ করার জন্য রাবির নেককার হওয়া যথেষ্ট নয়, বরং আলেমদের ইলমি মজলিসে বসা ও বর্ণনা নীতি জানা আবশ্যক। ইমাম মালিকের উস্তাদ আবুয যিনাদ আব্দুল্লাহ ইব্ন যাকওয়ান বলেন: “আমি মদিনায় এক শো ব্যক্তিকে পেয়েছি, তারা সবাই বিশ্বস্ত, তবে তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তারা হাদিস বর্ণনার উপযুক্ত নয়”। তারা নেককার, তবে তারা সহি-দ্বা‘ঈফ চিনে না, তাদের থেকে ভুলের সম্ভাবনা বেশী।
৬. নবীন তাবে‘ঈগণ প্রবীণ তাবে‘ঈদের নিকট হাদিস পেশ করতেন, যেমন স্বর্ণকারের নিকট স্বর্ণ পেশ করা হয়। তারা হাদিসের দোষ-ত্রুটি বলে দিতেন। তখনো হাদিস যাচাইয়ের নীতিগুলো স্বতন্ত্র কোনো কিতাবে লিখা হয়নি, কারণ হাদিসের প্রত্যেক ছাত্রের নিকট তা প্রসিদ্ধ ছিল।
হাদিস ও উসুলে হাদিসের স্বর্ণযুগ:
দ্বিতীয় হিজরির শেষার্ধ থেকে চতুর্থ হিজরির প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়কে ইলমে হাদিসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তৃতীয় শতাব্দীতে মুহাদ্দিসগণ হাদিসের কিতাব রচনায় মনোযোগী হন। এ সময় হাদিসের মূল কিতাবগুলো রচনা করা হয়, যেমন:
১. ইমাম আহমদ ইব্ন হাম্বলের মুসনাদ (মৃ.২৪১হি.), সহি বুখারি (মৃ.২৫৬হি.), সহি মুসলিম (মৃ.২৬১হি.), সুনানে আবু দাউদ সিজিসতানি (মৃ.২৭৫হি.), সুনানে তিরমিযি (মৃ.২৭৯হি.), সুনানে নাসায়ি (মৃ.৩০৩হি), সুনানে ইব্ন মাজাহ (মৃ.২৭৫হি.) সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব।
২. অনেক মুহাদ্দিস علم الرجال ‘ইলমুর রিজাল’ বা রাবিদের জীবনীর উপর একাধিক বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন, যেমন: ইমাম বুখারি ক. আত-তারিখুল কাবির, খ. আত-তারিখুল আওসাত, গ. আত-তারিখুস সাগির। ঘ. ‘কিতাবুদ দুয়াফা’; ইয়াহইয়া ইব্ন মায়িন (মৃ.২৩৪হি.) ‘আত-তারিখ’; মুহাম্মদ ইব্ন সা‘দ (মৃ.২৩০হি.) ‘আত-তাবকাতুল কুবরা’; নাসায়ি ‘কিতাবুদ দু‘আফা’; ইব্ন আবি হাতেম (মৃ.৩২৭হি.) ‘আল-জারহু ওয়াততা‘দিল’; ইব্ন হিব্বান (মৃ.৩৫৪হি.) ‘কিতাবুস সিকাত’ ইত্যাদি রচনা করেন। এসব কিতাবে তারা রাবিদের নাম, কে সেকাহ- কে দুর্বল, কে গ্রহণযোগ্য- কে পরিত্যক্ত ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করেন।
৩. কতক মুহাদ্দিস বিশেষ প্রকার হাদিস স্বতন্ত্র কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন, যেমন ইমাম বুখারি ও মুসলিম সহি হাদিস জমা করেন; ইমাম আবু দাউদ মুরসাল হাদিস জমা করেন; ইমাম আহমদ ইব্ন হাম্বল ও আবু দাউদ উভয়ে ‘নাসেখ ও মানসুখে’র উপর স্বতন্ত্র কিতাব লিখেন; ইমাম আহমদ ইব্ন হাম্বল ও আলি ইব্ন মাদিনি (মৃ.২৩৪হি.) ‘ইলাল’ (হাদীসের গোপন দোষ-ত্রুটি)-এর উপর কিতাব লিখেন; অনুরূপ ইমাম তিরমিযি ‘ইলালে’র উপর কিতাব লিখেন; ইমাম শাফে‘ঈ ও ইব্ন কুতাইবাহ (মৃ.২৭৬হি.) প্রমুখগণ জটিল অর্থ সম্পন্ন হাদিসগুলো স্বতন্ত্র কিতাবে জমা করেন। এভাবে হাদিসের বিশেষ প্রকার স্বতন্ত্র কিতাবে জমা করা হয়।
মুহাদ্দিসগণ এসব কিতাবে ‘উসুলে হাদিসে’র পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কেউ তার সংজ্ঞা দেননি। যেমন বুখারি ও মুসলিম ‘সহি’ হাদিসের সংজ্ঞা দেননি, অথবা সহির শর্ত বলেননি। ইমাম আহমদ ‘নাসেখ ও মানসুখে’র উপর কিতাব লিখেছেন, কিন্তু তার সংজ্ঞা দেননি। অনুরূপ ই‘লাল ও মারাসিল হাদিসের গ্রন্থকারগণ ‘ইল্লত’ ও ‘মুরসালে’র সংজ্ঞা দেননি। তাদের কিতাবসমূহ ছিল ‘উসুলে হাদিস’ বা হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষার বাস্তব অনুশীলন, সবাই তার অর্থ জানত, তাই কেউ পরিভাষার সংজ্ঞা দেননি।
সর্বপ্রথম হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা সংক্রান্ত সংজ্ঞা দেন ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ্। তিনি উসুলে ফিকহের উপর লিখিত ‘আর-রিসালাহ’ গ্রন্থে ‘উসুলে হাদিসে’র কতক পরিভাষার সংজ্ঞা দেন, যেমন দলিল যোগ্য হাদিসের শর্ত, খবরে ওয়াহেদের প্রামাণিকতা, রাবির গ্রহণযোগ্যতা ও হাদিসের ভাবার্থ বর্ণনার শর্ত, মুদাল্লিস রাবির হাদিসের হুকুম এবং মুরসাল হাদিসের হুকুম ইত্যাদি বিষয়গুলো তিনি উসুলে ফিকহের অধীন বর্ণনা করেন। অনুরূপ ইমাম মুসলিম সহি মুসলিমের ভূমিকায় এবং ইমাম তিরমিযি ‘ইলালুস সাগির’ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু তখন পর্যন্ত কেউ উসুলে হাদিসের পরিভাষা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেননি।
হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষার উপর স্বতন্ত্রগ্রন্থ রচনা:
চতুর্থ হিজরির মাঝামাঝি সময়ে যখন হাদিসের কিতাব লেখা প্রায় শেষ, তখন আলেমগণ হাদিসের পরিভাষাগুলো স্বতন্ত্র কিতাবে জমা করা আরম্ভ করেন। তারা প্রথমে সনদসহ পরিভাষাগুলো জমা করেন, তার উপর টিকা সংযোজন করেন ও তাদের নীতি থেকে বেশ-কিছু নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করেন।
সর্বপ্রথম এ বিষয়ে কলম ধরেন কাযী আবু মুহাম্মদ হাসান ইব্ন আব্দুর রহমান ইব্ন খাল্লাদ রামাহুরমুযি (মৃ.৩৬০হি.), তিনি "الْمُحَدِّث الفاصل بين الراوي والواعي" নামে উসুলে হাদিসের উপর স্বতন্ত্র কিতাব লিখেন। এতে তিনি হাদিস বর্ণনা করা, শ্রবণ করা, শিক্ষা দেওয়া ও হাদিস সংক্রান্ত মুহাদ্দিসের জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো জমা করেন, কিন্তু পরিপূর্ণ কিতাবের ন্যায় উসুলে হাদিসের বিভিন্ন প্রকারগুলো তিনি উল্লেখ করেননি।
অতঃপর তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ নিসাপুরি (মৃ.৪০৫হি.), যিনি হাকেম নামে প্রসিদ্ধ। তিনি "معرفة علوم الحديث" নামে একখানা কিতাব রচনা করেন। সর্বপ্রথম উসুলে হাদিসের উপর এটা স্বতন্ত্র রচনা। এতে তিনি উসুলে হাদিসের ৫২-টি পরিভাষা উল্লেখ করেন। প্রত্যেক পরিভাষার সংজ্ঞা দেন, যার ভাগ হয় তার ভাগ করেন এবং উদাহরণ দ্বারা স্পষ্ট করে।
অতঃপর উসুলে হাদিসের উপর গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেন আবু বকর আহমদ ইব্ন আলি ইব্ন সাবিত, যিনি খতিবে বাগদাদি (মৃ.৪৬৩হি.) নামে প্রসিদ্ধ। উসুলে হাদিসের উপর তিনি একাধিক কিতাব রচনা করেন, যেমন "الكفاية في علم الرواية" এতে তিনি হাদিস বর্ণনার পদ্ধতি, নীতিমালা ও আলেমদের মতামত জমা করেন। তার দ্বিতীয় কিতাব "الجامع لأخلاق الراوي وآداب السامع" এতে তিনি মুহাদ্দিস, হাদিস অন্বেষণকারী ও তাদের জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো উল্লেখ করেন। তার তৃতীয় কিতাব "الرحلة في طلب الحديث" এতে তিনি হাদিসের জন্য আলেমদের বিভিন্ন দেশ সফর ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জমা করেন। তার চতুর্থ কিতাব "تقييد العلم" এতে তিনি হাদিস লেখা ও তার সাথে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো জমা করেন। তার পঞ্চম কিতাব "المزيد في متصل الأسانيد" এতে তিনি হাদিসের বিভিন্ন প্রকারগুলো উল্লেখ করেন। উসুলে হাদিসের সনদ কিংবা মতনের সাথে সম্পৃক্ত এমন কোনো ইলম নেই যার উপর তিনি স্বতন্ত্র কিতাব কিংবা পুস্তিকা রচনা করেননি। পরবর্তী আলেমদের নিকট তার কিতাবগুলো ব্যাপক সমাদৃত হয়। তার কিতাব থেকে সবাই উপকৃত হন, অনেকে বলেন: “ইনসাফের দৃষ্টিতে সবাই স্বীকার করবে যে, খতিবের পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ তার কিতাবের উপর নির্ভরশীল”।
অতঃপর এ বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাব লিখেন কাযী ইয়াদ ইব্ন মুসা ইয়াহসুবি (মৃ.৫৪৪হি.), তার কিতাবের নাম "الإلماع إلى معرفة أصول الرواية وتقييد السماع" এতে তিনি হাদিস বর্ণনা করা ও শিক্ষা দেওয়ার নীতিমালা জমা করেন। এভাবে উসুলে হাদিসের উপর লিখিত গ্রন্থসমূহের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
‘ইবনে সালাহ’র হাতে উসুলে হাদিসের জাগরণ:
হাদিসের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাফেয আবু আমর উসমান ইব্নুস সালাহ শাহরুযুরি (মৃ.৬৪৩হি.) উসুলে হাদিসের উপর"علوم الحديث" নামে বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন, যা "مقدمة ابن الصلاح" নামে প্রসিদ্ধ। কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের এ কিতাব সবচেয়ে বেশী সমাদৃত:
১. হাদিসের প্রায় সকল প্রকার উল্লেখ করা হয়, যা পূর্বের কিতাবসমূহে বিক্ষিপ্ত ছিল। এতে ৬৫-প্রকার হাদিস রয়েছে। ২. পাঠকদের সুবিধার্থে সনদ উল্লেখ করা হয়নি, পূর্বের কিতাবগুলো যার দ্বারা পূর্ণ ছিল। ৩. সহজ ও সাবলীল ভাষায় হাদিসের নীতিমালা সূক্ষ্মভাবে প্রণয়ন করা হয়। ৪. পূর্বের আলেমদের বাণী ও আমল থেকে বিভিন্ন মাসাআলা বের করা হয়। ৫. সংজ্ঞাসহ প্রত্যেক প্রকার উল্লেখ করা হয়, যার সংজ্ঞা পূর্বে ছিল না তার সংজ্ঞা তৈরি করা হয়। ৬. পূর্ববর্তী আলেমদের নীতি ও অনুসৃত পদ্ধতির সুন্দর সমালোচনা করা হয়। এ জন্য আলেমগণ মনে করেন, এ কিতাব মুহাদ্দিসদের সামনে উসুলে হাদিসের নতুন দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
পরবর্তী আলেমগণ ‘ইবনে সালাহ’র কিতাব যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন, কেউ তার সংক্ষিপ্ত লিখেন, কেউ তার ব্যাখ্যা লিখেন, কেউ সংক্ষিপ্তের ব্যাখ্যা লিখেন, কেউ ব্যাখ্যার সংক্ষিপ্ত লিখেন, কেউ তার কিতাবকে কবিতার আকৃতি দেন, কেউ কবিতার ব্যাখ্যা লিখেন এবং কেউ তার নীতিমালার সমালোচনা করেন। ইব্নুস সালাহ ও তার কিতাব এতটাই গ্রহণযোগ্য যে, উসুলের হাদিসের মূল কিতাব বললে তার কিতাব বুঝানো হয় এবং শায়খ বললে তিনি উদ্দেশ্য হন।
উসুলে হাদিসের অপর দিকপাল ইব্ন হাজার:
উসুলে হাদিসের অপর দিকপাল ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ সহজ ও সাবলীল ভাষায় অতি সংক্ষেপে একখানা কিতাব লিখেন "نُخْبَة الفِكَرِ في مصطلحِ أهلِ الأثر" নামে, যা মাত্র কয়েক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ। অতঃপর তিনি নিজেই তার নাতিদীর্ঘ এক ব্যাখ্যা লিখেন "نُزْهَة النظر شرح نُخْبَةِ الفِكَر" নামে। পরবর্তীতে তার ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা লিখেন শায়খ আলি ইব্ন সুলতান আল-কারি (মৃ.১০১৪হি.), "شرح الشرح" নামে। তার ব্যাখ্যার অপর ব্যাখ্যাকার শায়খ মুহাম্মদ আকরাম নাসরপুরি সিন্ধি, তার কিতাবের নাম "إمعان النظر شرحُ شرحِ نخبة الفكر" ইবন হাজারের হাতে উসুলে হাদিস পরিপক্ব ও সংহত হয়, পরবর্তী আলেমগণ তার কিতাবের উপর অধিক নির্ভরশীল।
আমরা দেখলাম হাদিস প্রচার ও সংরক্ষণ পদ্ধতি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে ধীরেধীরে তার পরিধি বাড়তে থাকে। যখন যতটুকু প্রয়োজন ছিল, তখন ততটুকু অস্তিত্ব লাভ করে। নববী যুগ থেকে মানুষের দূরত্ব বাড়ার সাথে আদর্শের পতন তরান্বিত হয়। কখনো মিথ্যার প্রসার ঘটে, কখনো কুচক্রীরা অনুপ্রবেশ করে, কখনো বাতিল ফির্কার জন্ম হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত কথা, কর্ম, সমর্থন ও তার গুণগান যথাযথ সংরক্ষণ করার জন্য আলেমগণ ঘাম ঝরান। তারা বিভিন্ন নীতিমালা তৈরি করেন ও কঠোর নিয়ম মেনে চলেন। হাদিসের কিতাবগুলো রচনা সম্পন্ন হলে দীন বিপদ মুক্ত হয়। অতঃপর আরম্ভ হয় বিভিন্ন কিতাবে সংগৃহীত হাদিসগুলো পর্যালোচনা করা। কোনো মুহাদ্দিসের শিথিলতা, কারো কঠোরতা এবং কারো মধ্যমপন্থা চিহ্নিত হয়। মুহাদ্দিসগণ সহি, হাসান, দা‘য়িফ ও জাল হাদিসসমূহ নির্ণয় করেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো পরখ করে সহি, দুর্বল ও জাল হাদিস নির্ণয় করার পদ্ধতিকে পরিভাষায় ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’ বলা হয়।
এ পর্যন্ত হাদিস শাস্ত্রের দু’টি পদ্ধতি জানলাম: একটি "علم الرواية" অপরটি "علم الدراية"
‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সমর্থন, চারিত্রিক ও সৃষ্টিগত গুণগান, অনুরূপ সাহাবি ও তাবে‘ঈদের কথা ও কর্মের জ্ঞানার্জন করা, সূক্ষ্মভাবে সংরক্ষণ করা, যথাযথ অপরের নিকট পৌঁছানো ও তার শব্দগুলো পরিপূর্ণ আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার সাথে লিপিবদ্ধ করা।
‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’: এমন কতক বিধান ও নীতিমালা, যার দ্বারা হাদিসের সনদ ও মতনের অবস্থা জানা যায় এবং তার উপর ভিত্তি করে সহি, হাসান, দুর্বল ও তার প্রকারসমূহ নির্ণয় করা সম্ভব হয়। সনদের অবস্থার অর্থ ইত্তেসাল, ইনকেতা ও তাদলিস; উঁচু সনদ ও নিচু সনদ, রাবি দুর্বল না সেকাহ ইত্যাদি। মতনের অবস্থার অর্থ মারফূ‘, মাওকুফ, মাকতু, শায, মু‘আল্লাল, সহি, দ্বা‘ঈফ অথবা মনসুখ ইত্যাদি। হাদিসের ফিকহ তথা অর্থ জানা ও তার থেকে মাসআলা আবিষ্কার করা এ ইলমের অন্তর্ভুক্ত, কারণ হাদিসের অর্থ জানা মতনের একটি বিশেষ গুণ, যার উপর ভিত্তি করে ইল্লত ও মুখালিফাত জানা যায়।
‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’ ও ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’-কে "علم مصطلح الحديث" বা শুধু "مصطلح الحديث" বলা হয়। অর্থাৎ যে শাস্ত্রে ‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’ ও ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, সে শাস্ত্রকে ‘ইলমু মুসতালাহিল হাদিস’ বলা হয়। তবে সাধারণত ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’কে ‘ইলমু মুসতালাহিল হাদিস’ বলা হয়। ‘মুসতালাহুল হাদিসের’ অপর নাম "علم علوم الحديث" ‘ইলমু উলুমিল হাদিস’ বা "علم أصول الحديث" ‘ইলমু উসুলিল হাদিস’ বা শুধু "علم الحديث" ‘ইলমুল হাদিস’।
উসুলে হাদিস উম্মতে মুসলিমার বৈশিষ্ট্য, পূর্বের কোনো জাতির নিকট এ ইলম নেই। অসংখ্য হাফেযে হাদিস গুরুত্বের সাথে এ ইলম গ্রহণ করেন, রাবিদের জীবনী ও তাদের ভাল-মন্দ সংবাদ সংগ্রহ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবি ও তাদের অনুসারী তাবে‘ঈদের সাথে সম্পৃক্ত হাদিসগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধ চিহ্নিত করেন, যা একমাত্র এ উম্মতের গর্বের বস্তু। আল্লাহ এভাবে দীন হিফাজত করেন, যার ওয়াদা তিনি নিম্নের আয়াতে করেছেন:
﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]
“নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই তার হিফাযতকারী”। আল্লাহ তাআলার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কুরআনুল কারিম সংরক্ষিত। আর তার তৌফিকপ্রাপ্ত একদল বান্দার তত্ত্বাবধানে হাদিস সংরক্ষিত।
হাম্দ ও সালাত
محمدٍ خَيْرِ نَبيٍّ أُرْسِلا
أَبْدَأُ بالحمْدِ مُصَلِّياً عَلى
“আমি আরম্ভ করছি আল্লাহর প্রশংসা ও সর্বোত্তম নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ দ্বারা, যাকে [রাসূল করে] প্রেরণ করা হয়েছে”।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ ‘মানযূমার’ শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা পাঠ করেছেন, কারণ আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারিম আরম্ভ করেছেন তার প্রশংসার মাধ্যমে। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢ ﴾ [الفاتحة: ٢]
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব”। অপর আয়াতে তিনি আসমান-যমিন ও আলো-আধার সৃষ্টি সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার পূর্বে নিজের প্রশংসা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَجَعَلَ ٱلظُّلُمَٰتِ وَٱلنُّورَۖ ثُمَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِرَبِّهِمۡ يَعۡدِلُونَ ١ ﴾ [الانعام: ١]
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন এবং সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো। তারপর কাফিররা তাদের রবের সমতুল্য স্থির করে”।
দ্বিতীয়ত নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ কাজের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা পাঠ করতেন। ইমাম বুখারি ও মুসলিম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন:
«ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْعَشِيِّ، فَأَثْنَى عَلَى اللَّهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ، ثُمَّ قَالَ: مَا بَالُ أُنَاسٍ يَشْتَرِطُونَ شُرُوطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ، مَنِ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ بَاطِلٌ»
“অতঃপর সন্ধ্যায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন, যেরূপ তিনি হকদার। অতঃপর বললেন: লোকদের কি হল, তারা এমন কতক শর্তারোপ করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই। যে এমন শর্তারোপ করল, যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল”।
ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ্ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«كُلُّ خُطْبَةٍ لَيْسَ فِيهَا تَشَهُّدٌ فَهِيَ كَالْيَدِ الْجَذْمَاءِ»
“যেসব খুৎবায় তাশাহহুদ নেই, তা কর্তিত হাতের ন্যায়”। আল্লাহর হাম্দ তথা প্রশংসা ও গুণকীর্তন একপ্রকার তাশহহুদ। অতএব লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ হামদ দ্বারা ‘মানযূমাহ’ আরম্ভ করে কুরআনুল কারিম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নার যথাযথ অনুসরণ করেছেন।
حمد অর্থ মহব্বত ও সম্মানসহ পরিপূর্ণ গুণাবলি ও বিশেষণের কারণে প্রশংসিত সত্তার প্রশংসা করা। যদি মহব্বত ও সম্মান ব্যতীত শুধু ভয় ও শঙ্কা থেকে প্রশংসা করা হয়, তাহলে مدح বলা হয়, হাম্দ বলা হয় না। একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা পরিপূর্ণ গুণাবলি ও বিশেষণের মালিক, তাই পরিপূর্ণ প্রশংসা তিনি ব্যতীত কারো জন্য বৈধ নয়। তিনি সুন্দর নামসমূহ, পরিপূর্ণ গুণাবলি ও যাবতীয় কর্মের মালিক; তিনি একক, সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী ও বে-হিসাব নিয়ামত প্রদানকারী। অতএব তিনি ব্যতীত কেউ সর্বদা ও সকল প্রশংসার যোগ্য নয়।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ এখানে প্রশংসিত সত্তার নাম উল্লেখ করেননি, কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে স্পষ্ট যে, প্রশংসিত সত্তা মহান আল্লাহ তা‘আলা। কারণ তিনি মুসলিম, তিনি কেবল আল্লাহ তা‘আলার হামদ তথা-ভালোবাসা ও সম্মান মিশ্রিত প্রশংসা করবেন এটাই স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করেছেন। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে বলেছেন, যে দরূদ ব্যতীত দো‘আ আরম্ভ করেছিল: "عَجِلَ هَذَا" “সে দ্রুত করে ফেলল”। অতঃপর তিনি তাকে বা অপর কাউকে বলেন:
«إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِتَحْمِيدِ اللَّهِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ، ثُمَّ لَيُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ لَيَدْعُ بَعْدُ بِمَا شَاءَ»
“যখন তোমাদের কেউ সালাত আদায় করে, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা ও তার গুণকীর্তন দ্বারা আরম্ভ করে। অতঃপর সে যেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত আদায় করে। অতঃপর যা ইচ্ছা তাই যেন দো‘আ করে”। দ্বিতীয়ত আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
﴿ إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا ٥٦ ﴾ [الاحزاب : ٥٦]
“নিশ্চয় আল্লাহ এবং তার মালায়েকাগণ নবীর উপর দরূদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ তোমরাও নবীর উপর দরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও”।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ দ্বিতীয় পর্যায়ে দরূপ পাঠ করে কুরআনুল কারিম ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার উপর আমল করেছেন।
صلاة শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আল্লাহর ‘সালাত’ পাঠ করার অর্থ রহমত প্রেরণ করা। মানুষ ও মালায়েকার সালাত পাঠ করার অর্থ তার জন্য মাগফেরাত তলব করা। অধিকাংশ আলেমের নিকট এ অর্থ প্রসিদ্ধ, কিন্তু বিজ্ঞ আলেমদের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আল্লাহর সালাত পাঠ করার অর্থ ঊর্ধ্ব জগতে তার প্রশংসা করা। ইমাম বুখারি, আবুল আলিয়া থেকে এ অর্থ নিয়েছেন। অতএব যখন আপনি বললেন:صلى الله على محمد তার অর্থ: اللهم اثن على محمد في الملأ الأعلى ثناءً حسناً. “হে আল্লাহ ঊর্ধ্ব জগতে আপনি মুহাম্মদের উপর সুন্দর প্রশংসা করুন”। এ অর্থের প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
“তাদের উপর রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে অনেক প্রশংসা ও রহমত এবং তারাই হিদায়েত প্রাপ্ত”। এ আয়াতে সালাত অর্থ রহমত মানলে অর্থ হয়: ‘তাদের উপর তাদের রবের পক্ষ থেকে অনেক রহমত ও রহমত’। এ অর্থ সুন্দর ও যথাযথ নয়, কারণ অলঙ্কার শাস্ত্রের নিয়মানুযায়ী বাক্যে ব্যবহৃত দু’টি শব্দ থেকে একার্থ নেয়ার চেয়ে ভিন্নার্থ নেয়া অধিক শ্রেয়। কারণ صلوات শব্দের অর্থ রহমত হলে একার্থ বিশিষ্ট দু’টি শব্দ একটির সাথে অপরটি যোগ বা আত্ফ করা হয়, যা বিনা প্রয়োজনে শুদ্ধ নয়, তাই ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ পেশ করা অর্থ অধিক বিশুদ্ধ। এভাবে তাকিদের পরিবর্তে তাসিস তথা নতুন অর্থ হাসিল হয়। অতএব আমরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পাঠ করি, তার অর্থ আমরা তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা তলব করি। যখন স্বয়ং আল্লাহ তার উপর সালাত পাঠ করেন, তার অর্থ ঊর্ধ্ব জগতে মালায়েকার মাঝে তিনি তার প্রশংসা করেন।
শায়খ আব্দুল হামিদ ইব্ন বাদিস রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক আলেম সালাতের বিভিন্ন অর্থ করেছেন: রহমত, মাগফেরাত, মালায়েকার মাঝে প্রশংসা করা, আল্লাহর ইহসান, অনুগ্রহ ও তার সম্মান ইত্যাদি। মূলত এসব ব্যাখ্যায় কোন বৈপরীত্য নেই, কারণ মাগফেরাত একপ্রকার রহমত, প্রশংসা একপ্রকার রহমত, ইহসান ও অনুগ্রহ একপ্রকার রহমত, সম্মান দেওয়া একপ্রকার রহমত। তবে সালাতের প্রকৃত অর্থ রহমত, অন্যান্য অর্থ আনুষঙ্গিক”।
محمد নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম, তিনি বলেছেন:
«أَنَا مُحَمَّدٌ، وَأَنَا أَحْمَدُ، وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يُمْحَى بِيَ الْكُفْرُ، وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِي يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى عَقِبِي، وَأَنَا الْعَاقِبُ، وَالْعَاقِبُ الَّذِي لَيْسَ بَعْدَهُ نَبِيٌّ»
“আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ; আমি ধ্বংসকারী, যার দ্বারা কুফর ধ্বংস করা হয়; আমি হাশের, মানুষদেরকে আমার পশ্চাতে জমা করা হবে; এবং আমি আকেব, যার পরবর্তী কোনো নবী নেই সে আকেব”।
কুরআনুল কারিমে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’টি নাম রয়েছে: আহমদ ও মুহাম্মদ। ঈসা ‘আলাইহিস সালাম স্বীয় কওম বনি ইসরাইলের নিকট আহমদ নামে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয় পেশ করেছেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ নামের অহি তথা প্রত্যাদেশ পেয়েছেন, কিংবা বনি ইসরাইলের মাঝে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এ নাম নির্বাচন করেছেন। কারণ আহমদ অর্থ ‘সবচেয়ে বেশী প্রশংসাকারী’, যে সবচেয়ে বেশী প্রশংসাকারী তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এ কথা বনি ইসরাইল জানত। অতএব আহমদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ।
محمد কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ প্রশংসিত সত্ত্বা। أحمد অগ্রাধিকার সূচক বিশেষণ, অর্থ সবচেয়ে বেশী প্রশংসাকারী। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে আল্লাহর বেশী প্রশংসাকারী, অতএব তিনি বেশী প্রশংসার হকদার। তাই তার নাম মুহাম্মদ ও আহমদ যথাযথ হয়েছে।
ইমাম নববি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “ইব্ন ফারেস প্রমুখগণ বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারকে ইলহাম করেছেন, যার ফলে তারা মুহাম্মদ ও আহমদ নামের তৌফিক লাভ করেছেন”।
خير نبي أرسلا লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ নবুওয়ত ও রিসালাত উভয় জমা করেছেন। نبي কর্তাবাচক বিশেষ্য, فعيلٌ এর ওজনে نبأ ধাতু থেকে উৎপত্তি, অর্থ সংবাদদাতা, অথবাنبا ينبوا ক্রিয়ার ধাতু نبوة থেকে উৎপত্তি, অর্থ উঁচু হওয়া। প্রথম অর্থ হিসেবে তিনি আল্লাহর সংবাদবাহক। দ্বিতীয় অর্থ হিসেবে তিনি উঁচু মর্যাদার অধিকারী। তার উঁচু মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
﴿تِلۡكَ ٱلرُّسُلُ فَضَّلۡنَا بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۘ مِّنۡهُم مَّن كَلَّمَ ٱللَّهُۖ وَرَفَعَ بَعۡضَهُمۡ دَرَجَٰتٖۚ ٢٥٣﴾ [البقرة: ٢٥٣]
“ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের মধ্যে কারো সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং কারো কারো মর্যাদা উঁচু করেছেন”। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
﴿ٱنظُرۡ كَيۡفَ فَضَّلۡنَا بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ وَلَلۡأٓخِرَةُ أَكۡبَرُ دَرَجَٰتٖ وَأَكۡبَرُ تَفۡضِيلٗا ٢١﴾ [الاسراء: ٢١]
“ভেবে দেখ, আমি তাদের কতককে কতকের উপর কিভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। আর আখিরাত নিশ্চয় মর্যাদায় মহান এবং শ্রেষ্ঠত্বে বৃহত্তর”। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
﴿ وَلَقَدۡ فَضَّلۡنَا بَعۡضَ ٱلنَّبِيِّۧنَ ٥٥ ﴾ [الاسراء: ٥٥]
“আর আমি তো কতক নবীকে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি”। তার আরেকটি বিশেষ মর্যাদা হচ্ছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে ‘মাকামে মাহমুদ’ তথা প্রশংসিত স্থান দান করবেন। তিনি বলেন:
“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর তোমার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন”। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
«أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“আমি কিয়ামতের দিন মানুষের সরদার”। অতএব তিনি যেরূপ সংবাদদাতা, সেরূপ উঁচু মর্যাদার অধিকারী। তাই উভয় অর্থ হিসেবে ‘নবী’ নাম তার জন্য যথাযথ হয়েছে।
পাঁচজন শ্রেষ্ঠ রাসূল:
আল্লাহ তা‘আলা নবীদের মর্যাদায় তারতম্য করেছেন। কেউ কারো থেকে শ্রেষ্ঠ। শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল। শ্রেষ্ঠত্বের বিবেচনায় দ্বিতীয় ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
«فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى، قَدِ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا، كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا».
“নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যেমন তিনি খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন ইবরাহীমকে”। অতঃপর মর্যাদার বিবেচনায় তৃতীয় স্থানে আছেন মূসা ‘আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
﴿ وَكَلَّمَ ٱللَّهُ مُوسَىٰ تَكۡلِيمٗا ١٦٤ ﴾ [النساء : ١٦٤]
“আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন”। দ্বিতীয় দলিল তার উম্মতের সংখ্যা অধিক হবে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
.
“আমি বিরাট একদল দেখলাম, যা দিগন্ত আড়াল করে রেখেছে। আমি আশা করেছি দলটি আমার উম্মত হোক, আমাকে বলা হল: এ হচ্ছে মূসা ও তার কওম”। অপর হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا تُخَيِّرُونِي عَلَى مُوسَى، فَإِنَّ النَّاسَ يَصْعَقُونَ، فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يُفِيقُ، فَإِذَا مُوسَى بَاطِشٌ بِجَانِبِ الْعَرْشِ، فَلَا أَدْرِي، أَكَانَ فِيمَنْ صَعِقَ، فَأَفَاقَ قَبْلِي، أَمْ كَانَ مِمَّنْ اسْتَثْنَى اللَّهُ ؟».
“তোমরা আমাকে মূসার উপর প্রাধান্য দিয়ো না, কারণ মানুষেরা সংজ্ঞাহীন হবে, আমি সর্বপ্রথম সংজ্ঞা ফিরে পাব, তখন দেখব মূসা আরশের পার্শ্ব ধরে আছেন। আমি জানি না, তিনি সংজ্ঞাহীনদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আমার পূর্বে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন, না আল্লাহ যাদেরকে সংজ্ঞামুক্ত রেখেছেন তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন”? ইসরা ও মেরাজের হাদিসে তার মর্তবা ষষ্ঠ আসমানে বিধৃত হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় মর্যাদার বিবেচনায় মূসা ‘আলাইহিস সালাম তৃতীয় স্থানে।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে আছেন ঈসা ও নূহ ‘আলাইহিমুস সালাম। তাদের দু’জনের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে আলেমগণ দ্বিমত করেছেন। কেউ বলেন ঈসা ‘আলাইহিস সালাম শ্রেষ্ঠ, কেউ বলেন নূহ ‘আলাইহিস সালাম শ্রেষ্ঠ। কেউ তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে নীরবতা অবলম্বন করেন। উল্লেখিত পাঁচজন সবাই শ্রেষ্ঠ রাসূল। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
﴿فَٱصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ أُوْلُواْ ٱلۡعَزۡمِ مِنَ ٱلرُّسُلِ ٣٥﴾ [الاحقاف: ٣٥]
“অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর, যেমন ধৈর্যধারণ করেছিল সুদৃঢ় সংকল্পের রাসূলগণ”। অন্যত্র ইরশাদ করেন:
﴿وَإِذۡ أَخَذۡنَا مِنَ ٱلنَّبِيِّۧنَ مِيثَٰقَهُمۡ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٖ وَإِبۡرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَۖ وَأَخَذۡنَا مِنۡهُم مِّيثَٰقًا غَلِيظٗا ٧﴾ [الاحزاب : ٧]
“আর স্মরণ কর, যখন আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম নবীদের থেকে এবং তোমার থেকে, নূহ, ইবরাহিম, মূসা ও মারইয়াম পুত্র ঈসা থেকে। আর আমি তাদের কাছ থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম”।
এখানে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বাগ্রে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ لَخَاتَمُ النَّبِيِّينَ، وَإِنَّ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَام لَمُنْجَدِلٌ فِي طِينَتِهِ».
“আমি আল্লাহর বান্দা, নিশ্চয় সর্বশেষ নবী, তখন আদম ‘আলাইহিস সালাম ছিল মাটিতে মিশ্রিত”।
একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর:
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে অন্যান্য নবীর উপর তাকে প্রাধান্য দিতে নিষেধ করেছেন। কোথাও তিনি বলেছেন:
«لَا تُخَيِّرُوا بَيْنَ الْأَنْبِيَاءِ».
“নবীদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ কর না”। অথচ উপরের আলোচনা থেকে জানলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ এবং নবীদের মাঝে মর্যাদার তারতম্য রয়েছে। ইব্ন কাসির রাহিমাহুল্লাহ্ সূরা বাকারার (২৫৩)নং আয়াতের ব্যাখ্যায় এ প্রশ্নের কয়েকটি উত্তর দিয়েছেন:
১. মর্যাদার তারতম্য জানার পূর্বে তিনি নিষেধ করেছেন।
২. বিনয়ী ও নম্রতার খাতিরে তিনি নিষেধ করেছেন।
৩. তর্কের সময় অহংকার করে প্রাধান্য দিতে নিষেধ করেছেন।
৪. সাম্প্রদায়িকতার জন্য প্রাধান্য দিতে নিষেধ করেছেন।
৫. তার নিষেধ করার অর্থ মর্যাদার বিষয়টি তোমাদের উপর ন্যস্ত নয়, আল্লাহর উপর ন্যস্ত। তোমাদের দায়িত্ব শুধু আনুগত্য করা।
নবী ও রাসূল উভয় বলা উত্তম:
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ خير نبي أرسلا বলে নবী ও রাসূল উভয় বিশেষণ উল্লেখ করেছেন, যদিও শুধু রাসূল দ্বারা নবী বুঝা যেত, কারণ প্রত্যেক রাসূল নবী, তবে তা হত প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রাসঙ্গিকতা ত্যাগ করে নবী ও রাসূল দু’টি বিশেষণ স্পষ্ট বলেছেন। এভাবে বলাই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা। বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি বারা ইব্ন আযেবকে বলেন: “যখন তুমি বিছানায় আস সালাতের ন্যায় অজু কর। অতঃপর ডান পার্শ্বে শয়ন কর এবং বল:
«اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ»
যদি এ রাতে মারা যাও, তবে স্বভাবের উপর মারা যাবে। তুমি এ বাক্যগুলোকে তোমার সর্বশেষ বাক্য বানাও”। তিনি বলেন: আমি দো‘আটি পড়ে শুনাই: اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ শেষে বলি: وَبِرَسُولِكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ তিনি বললেন: না, وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ বল, [যেভাবে আমি তোমাকে বলেছি]। ‘বারা’ ইব্ন আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু وَبِرَسُولِكَ বলতে চাইলেন, কিন্তু তিনি وَبِنَبِيِّكَ বলতে বললেন, অথচ রাসূল শব্দে প্রাসঙ্গিকভাবে নবীর উল্লেখ ছিল।
দ্বিতীয়ত লেখক নবী ও রাসূল বলে উভয়ের মাঝে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। কারও কারও মতে, নতুন শরীয়ত নিয়ে আগমনকারীকে রাসূল বলা হয়, আর পূর্বের রাসূলের শরীয়ত প্রচারকারীকে বলা হয় নবী। প্রত্যেক রাসূল নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নয়।
বাইকুনি বিসমিল্লাহ লিখেননি:
আমাদের সামনে বিদ্যমান ‘মানযুমায়’ বিসমিল্লাহ নেই। আব্দুল্লাহ امع للمتون العلمية গ্রন্থেও বিসমিল্লাহ নেই। মানযূমার প্রথম লাইন থেকে অনুমেয় লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ শুরুতে বিসমিল্লাহ লিখেননি, তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ দ্বারা ‘বিসমিল্লাহ’ লিখার অজিফা আঞ্জাম দিয়েছেন।
বিসমিল্লাহর প্রতি গুরুত্বারোপকরী হাদিসগুলো দুর্বল:
প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলার প্রতি গুরুত্ব প্রদানকারী যেসব হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, তার সবক’টি দুর্বল। সেগুলো ত্যাগ করে কুরআনুল কারিম এবং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুক্তি ও চিঠি-পত্রের আদর্শকে বিসমিল্লাহ বলার স্বপক্ষে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা উত্তম ।
ভুল প্রথা: আমাদের সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক নানা অনুষ্ঠানের শুরুতে কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে কতিপয় হাম্দ ও না‘ত আবৃতি করা হয়। আলেম সমাজেও যার রেওয়াজ রয়েছে, কিন্তু সুন্নায় তার কোনো প্রমাণ নেই। তাই এ নীতিকে বাধ্যতামূলক মনে করা পরিহার করা উত্তম। প্রত্যেকের উচিত আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করে স্বীয় খুৎবা আরম্ভ করা। যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিগণ খুৎবা প্রদান করতেন।
হাদিসের অর্থ
وَكُلُّ واحدٍ أَتَى وَحَدَّهْ
وَذِي مِنَ اقْسامِ الحدِيثِ عِدَّهْ
“এ হলো হাদিসের কয়েকটি প্রকার, [এ কবিতায়] প্রত্যেক প্রকার তার সংজ্ঞাসহ এসেছে”।
"ذي" ইঙ্গিত বাহক বিশেষ্য বা ইসমে ইশারাহ। এর মাধ্যমে তিনি মানযুমায় বর্ণিত হাদিসের প্রকারগুলোর দিকে ইশারা করেছেন। হাদিসের প্রকার দ্বারা মৌলিক ও আনুষঙ্গিক উভয় উদ্দেশ্য। হাদিসের মৌলিক প্রকার তিনটি: সহি, হাসান ও দ্বা‘ঈফ। লেখক প্রথম ছয়টি পঙক্তিতে মৌলিক প্রকার ও অবশিষ্ট পঙক্তিতে আনুষঙ্গিক প্রকারসমূহ উল্লেখ করেছেন।
حديث এর আভিধানিক অর্থ নতুন। আল্লাহর কালাম ‘কাদিম’ বা অনাদির বিপরীত নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীকে হাদিস বলা হয়, কারণ তার বাণী অপেক্ষাকৃত নতুন। সংবাদকে হাদিস বলা হয়, কারণ সংবাদ অপেক্ষাকৃত নতুন। মুখের কথাও হাদিস, কারণ এগুলো নতুন নতুন অস্তিত্ব লাভ করে। এ হিসেবে কুরআনুল কারিমকে হাদিস বলা হয়। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ فَبِأَيِّ حَدِيثِۢ بَعۡدَ ٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ يُؤۡمِنُونَ ٦ ﴾ [الجاثية : ٦]
“অতএব তারা আল্লাহ ও তার আয়াতের পর আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে”?
হাদিসের পারিভাষিক অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সম্মতি, চারিত্রিক গুণগান ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যকে হাদিস বলা হয়।
হাদিসের প্রকার দ্বারা উদ্দেশ্য:
‘উসুলে হাদিসের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’-এ আমরা জেনেছি হাদিস শাস্ত্রের দু’টি অংশ: ‘ইলমুর রিওয়াইয়াহ’ ও ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’। সাধারণত ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’-কে উসুলে হাদিস বলা হয়। এখানে হাদিসের প্রকার দ্বারা ‘ইলমুদ দিরাইয়াহ’-র প্রকারসমূহ উদ্দেশ্য।
عدَّة দ্বারা উদ্দেশ্য ‘ইলমুদ দিরায়াহ’র কতক প্রকার, কারণ তিনি সকল প্রকার বর্ণনা করেননি, মাত্র ৩২-টি প্রকার সংজ্ঞাসহ বর্ণনা করেছেন, যা মৌলিক ও অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ।
حدّ বলা হয় কোনো বস্তুর এমন সংজ্ঞাকে, যার থেকে তার কোনো প্রকার বাদ পড়ে না, আবার অপর বস্তুর কোনো প্রকার তাতে প্রবেশ করে না।
সহি হাদিস
إسْنادُه ولمْ يَشُذَّ أو يُعَلْ
أَوَّلُها الصَّحِيحُ وَهْوَ ما اتَّصَلْ
مُعْتَمَدٌ في ضَبْطِهِ ونَقْلِهِ
يَرْوِيهِ عَدْلٌ ضابِطٌ عَنْ مِثْلِهِ
“তার প্রথম প্রকার ‘সহি’, আর তা হচ্ছে যার সনদ মুত্তাসিল এবং যা ‘শায’ বা ‘মুয়াল’ নয়। যে হাদিস আদিল ও দাবেত রাবি তার ন্যায় রাবি থেকে বর্ণনা করে, যিনি স্বীয় দ্বাবত ও বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য”। লেখকের বর্ণনাক্রম অনুসারে হাদিসের প্রথম প্রকার সহি। এ প্রকারের সম্পর্ক সনদ ও মতন উভয়ের সাথে।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ সর্বপ্রথম ‘সহি’ উল্লেখ করেছেন। কারণ ‘সহি’ সর্বোত্তম প্রকার। দ্বিতীয়ত হাদিস শাস্ত্র পঠন ও পাঠন দ্বারা উদ্দেশ্য সহি হাদিস জানা ও তার উপর আমল করা। সহি দু’প্রকার: ১. সহি লি-যাতিহি, অর্থাৎ নিজ সত্তাগুণে সহি, ২. সহি লি-গায়রিহি, অর্থাৎ অপর হাদিস থেকে শক্তি অর্জন করে সহি। দ্বিতীয় প্রকার সহি মূলত হাসান, তবে অপর হাদিসের কারণে সহির মানে উন্নীত হয়েছে। লেখক ‘সহি লি-যাতিহি’র সংজ্ঞা পেশ করেছেন।
أوَّلُها শব্দের সর্বনাম দ্বারা উদ্দেশ্য উসুলে হাদিসের প্রথম প্রকার।
صحيح এর আভিধানিক অর্থ সুস্থ। সাধারণত মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য ‘সহি’ ব্যবহৃত হয়, যেমন হাদিসে এসেছে: " وَأَنْتَ صَحِيحٌ " ‘তুমি সুস্থাবস্থায়’ এ থেকে সনদ ও মতন দোষমুক্ত হলে হাদিসকে সহি বলা হয়।
‘সহি’-র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “যে হাদিসের সনদ মুত্তাসিল, যা শায ও মু‘আল্ নয় এবং যার রাবি আদিল ও দাবেত, তার ন্যায় আদিল ও দাবেত রাবি থেকে বর্ণনা করে, যার দ্বাবত ও আদালত গ্রহণযোগ্য”।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ ‘সহি’-র পাঁচটি শর্ত উল্লেখ করেছেন: ১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া। ২. শায না হওয়া। ৩. মু‘আল্ না হওয়া। ৪. রাবির আদিল হওয়া। ৫. রাবির দ্বাবিত হওয়া। প্রথম, চতুর্থ ও পঞ্চম তিনটি শর্ত সনদের সাথে সম্পৃক্ত, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত দু’টি সনদ ও মতন উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ সহি হাদিসের শর্ত বর্ণনার ক্ষেত্রে পরম্পরা রক্ষা করেননি। আমরা পরম্পরা রক্ষা করে সনদের সাথে সম্পৃক্ত তিনটি শর্ত প্রথম বর্ণনা করব, অতঃপর শায ও মু‘আল্ না হওয়া দু’টি শর্ত স্ব-স্ব স্থানে বর্ণনা করব। ইনশাআল্লাহ।
প্রথম শর্ত: সনদ মুত্তাসিল হওয়া:
সনদ মুত্তাসিল হওয়ার অর্থ, সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক রাবি (বর্ণনাকারী) তার শায়খ (শিক্ষক) থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ করেছেন প্রমাণিত হওয়া। যেমন গ্রন্থকার মুহাদ্দিস বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (প্রথম উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (দ্বিতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (তৃতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (চতুর্থ উস্তাদ)। এভাবে প্রত্যেক রাবি স্বীয় শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে নিশ্চিত করলে সনদ মুত্তাসিল। শায়খের অনুমতি গ্রহণ করা, শায়খকে হাদিস শুনিয়ে সম্মতি নেওয়াকে সরাসরি শ্রবণ করা বলা হয়।
সনদ, মতন, রাবি, শায়খ ও মুহাদ্দিস পরিচিতি:
হাদিসের ছাত্র হিসেবে সনদ, মতন ইত্যাদি শব্দসমূহের অর্থ জানা জরুরি। তাই একটি উদাহরণ দ্বারা প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ ও ব্যবহার স্পষ্ট করছি, যেন পাঠকবর্গ সহজে বুঝতে পারেন।
قال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ: أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الْأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلَاةٍ»
এ হাদিস ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন। এখানে দেখছি বুখারির (১৯৪-২৫৬হি.) উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ (২১৮হি.), তার উস্তাদ মালিক (৮৯-১৭৯হি.), তার উস্তাদ আবুয যিনাদ (৬৫-১৩১হি.), তার উস্তাদ আ‘রাজ (১১৭হি.), তার উস্তাদ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু (৫৭হি.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যদি আমার উম্মতের উপর কষ্ট না হত, অথবা [বলেছেন] মানুষের উপর, তাহলে আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের সাথে মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম”।
সনদ ও মতন: হাদিসের দু’টি প্রধান অংশ: একটি সনদ, অপরটি মতন। এ হাদিসে ইমাম বুখারির উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ থেকে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু পর্যন্ত অংশকে سَنَد ‘সনদ’ বলা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিসের অবশিষ্ট অংশকে مَتْن ‘মতন’ বলা হয়। হাদিসের মতন ও সনদ একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোত জড়িত। সনদ ব্যতীত মতন হয় না, মতন থাকলে অবশ্যই তার সনদ আছে। তবে একটি ‘সহি’ হলে অপরটি ‘সহি’ হওয়া জরুরি নয়। কখনো সনদ সহি হয়, কারণ সহির সকল শর্ত তাতে বিদ্যমান, যেমন সনদ মুত্তাসিল, রাবিগণ আদিল ও দ্বাবিত, তবে মতন শায বা ‘ইল্লতের কারণে সহি নয়। কখনো মতন সহি হয়, তবে রাবির দুর্বলতা বা ইনকিতা‘ (বর্ণনাপরম্পরা কাটা পড়া) এর কারণে সনদ সহি হয় না। সনদ ও মতন উভয় সহি হলে হাদিস সহি। এরূপ হাদিস সম্পর্কে আমরা দৃঢ়ভাবে বলব: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। গ্রন্থকারের উস্তাদকে সনদের শুরু এবং সাহাবিকে সনদের শেষ বলা হয়।
রাবি: ‘রাবি’ আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ বর্ণনাকারী ও উদ্ধৃতকারী। হাদিসের পরিভাষায় সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক ব্যক্তিকে رَاوِيْ বলা হয়। সাহাবি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তাবে‘ঈ সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, এভাবে গ্রন্থকার পর্যন্ত সবাই বর্ণনা করেন, তাই সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক ব্যক্তি রাবি। উদাহরণে পেশ করা মিসওয়াকের হাদিসে পাঁচজন রাবি রয়েছে। ১-‘রাবি’ সাহাবি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, ২-‘রাবি’ তাবে‘ঈ আ‘রাজ, ৩-‘রাবি’ তাবে‘ঈ আবুয যিনাদ, ৪-‘রাবি’ মালিক (ইমাম), ৫-‘রাবি’ আব্দুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ। তিনি ইমাম বুখারির উস্তাদ।
শায়খ ও শায়খুল হাদিস: ‘শায়খ’ আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ বৃদ্ধ ও বয়স্ক। সাধারণত পঞ্চাশ ঊর্দ্ধ বয়স হলে شَيْخ বলা হয়। আরবরা বয়স্ক ও সম্মানিত ব্যক্তিকে শায়খ বলেন, অনুরূপ উস্তাদকেও তারা শায়খ বলেন। হাদিসের ছাত্ররা তাদের হাদিসবিশারদ উস্তাদকে শায়খ বলেন। আমরা শায়খ দ্বারা হাদিসের উস্তাদ ও রাবি দ্বারা শায়খের ছাত্রকে বুঝিয়েছি। শায়খ ও রাবি আপেক্ষিক শব্দ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন হিসেবে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাবি, তাবে‘ঈ আ‘রাজ হিসেবে তিনি শায়খ। হাদিস শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী, দীর্ঘ দিন হাদিসের পঠন ও পাঠনে নিরত শায়খকে কেউ ‘শায়খুল হাদিস’ বলেন। ভারত উপমহাদেশে বুখারি শরীফের পাঠদানকারীকে ‘শায়খুল হাদিস’ বলা হয়। হাদিসে তার দক্ষতা থাক বা না-থাক। আবার হাদিসে পারঙ্গম হওয়া সত্ত্বেও যদি বুখারির দরস না দেন, তাহলে তিনি শায়খুল হাদিস নন। এ পরিভাষা ঠিক নয়। তাই আমাদের সমাজে ‘শায়খুল হাদিস’ একটি পদের নাম, যোগ্যতার পরিচায়ক উপাধি নয়।
মুহাদ্দিস: ‘মুহাদ্দিস’ আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ বর্ণনাকারী বা বক্তা। হাদিসের পঠন-পাঠনকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন, তাদেরকে পরিভাষায় مُحَدِّث ‘মুহাদ্দিস’ বলা হয়। ‘মুহাদ্দিস’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, এ শব্দের আদেশসূচক ক্রিয়া দ্বারা আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَأَمَّا بِنِعۡمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثۡ ١١ ﴾ [الضحى: ١١]
“আর আপনার রবের অনুগ্রহ আপনি বর্ণনা করুন”। অর্থাৎ রিসালাত ও নবুওয়ত সবচেয়ে বড় নিয়ামত, অতএব যে রিসালাত দিয়ে আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন, আর যে নবুওয়ত আপনাকে দেওয়া হয়েছে তা বর্ণনা করুন।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মুহাদ্দিস’, কারণ তিনি কুরআন ও হাদিস বর্ণনা করে রিসালাত ও নবুওয়তের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। পরবর্তীতে শুধু হাদিস বর্ণনাকারীদের মুহাদ্দিস বলা হয়। এ পরিভাষা সাহাবিদের যুগেও ছিল, আব্দুল্লাহ ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলেন:
وَقَدْ بَلَغَنِي أَنَّكَ مُحَدِّثٌ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ.
“আমার নিকট পৌঁছেছে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অমুক বিষয়ে বর্ণনা করেন”? অতএব সনদে বিদ্যমান সকল রাবি মুহাদ্দিস। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সমর্থন ও গুণগানকে যথাযথ সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেন। ভারত উপমহাদেশে বুখারি শরীফ ব্যতীত হাদিসের অন্যান্য কিতাব পাঠদানকারীকে মুহাদ্দিস বলা হয়। এ পরিভাষা সঠিক নয়।
ইত্তিসালের অনুশীলন: উক্ত হাদিসের সনদ মুত্তাসিল ও অবিচ্ছিন্ন। এতে কোথাও ছেদ বা ইনকিতা‘ নেই। সাহাবি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে আ‘রাজ, তার থেকে আবুয যিনাদ, তার থেকে মালিক, তার থেকে আব্দুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ এবং তার থেকে ইমাম বুখারি হাদিস শ্রবণ করেছেন। প্রত্যেক শায়খের সাথে তার রাবির সাক্ষাত প্রমাণিত। শায়খ ও রাবির জন্ম-মৃত্যু তারিখ, অবস্থান ও ভ্রমণ, পাঠগ্রহণ ও পাঠদান তাদের সাক্ষাত প্রমাণ করে। সনদে উল্লেখিত কোনো শায়খ ও রাবির সাক্ষাত সম্পর্কে কোনো ইমাম আপত্তি করেননি। দ্বিতীয়ত ইত্তেসালের বিপরীত ত্রুটিগুলো এখানে নেই, যেমন সনদ মুরসাল নয়, কারণ সাহাবির উল্লেখ আছে; সনদ থেকে এক বা একাধিক রাবি বাদ পড়েনি, তাই মুনকাতি‘ ও মু‘দ্বাল নয়; আবার ইমাম বুখারির উস্তাদ উল্লেখ আছে তাই মু‘আল্লাক নয়। অতএব সনদ মুত্তাসিল, সহি হাদিসের প্রথমশর্ত এতে বিদ্যমান।
ইত্তেসালের শর্তারোপের কারণে ইনকেতা‘ এর সকল প্রকার ‘সহি’ হাদিস থেকে বাদ পড়ল, যেমন মুনকাতি‘, মু‘আল্লাক, মুরসাল, মু‘দ্বাল, তাদলিস ও ইরসালে খফি। অতএব ইনকিতা‘ এর কোনো প্রকার সহি নয়।
দ্বিতীয় শর্ত: রাবির ‘আদল:
সহি হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত রাবির ‘আদল’ হওয়া। عدل ‘আদ্ল’ শব্দের অর্থ সোজা ও বক্রতাহীন রাস্তা, যেমন বলা হয় طريق عدل ‘সোজা রাস্তা’। পাপ পরিহারকারী ও সুস্থরুচি সম্পন্ন ব্যক্তি ন্যায় ও সোজা রাস্তার অনুসরণ করে, তাই তাকে ‘আদ্ল’ বা ‘আদিল’ বলা হয়। عادل কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। হাদিসের পরিভাষায় দীনদারী ও সুস্থরুচিকে عدالة বলা হয়।
‘আদিল’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুসলিম, বিবেকী, সাবালক, দীন বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত ও সুস্থ রুচির অধিকারী ব্যক্তিকে উসুলে হাদিসের পরিভাষায় ‘আদিল’ বলা হয়। নিম্নে প্রত্যেকটি শর্ত প্রসঙ্গে আলোকপাত করছি:
মুসলিম: রাবির ‘আদিল হওয়ার জন্য মুসলিম হওয়া জরুরি। অতএব কাফের ‘আদিল’ নয়, তার হাদিস সহি নয়। কাফের কুফরি অবস্থায় হাদিস শ্রবণ করে যদি মুসলিম হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য। কারণ সে সংবাদ দেওয়ার সময় আদিল, যদিও গ্রহণ করার সময় আদিল ছিল না। যেমন জুবাইর ইব্ন মুতয়িম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِالطُّورِ»
“আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা তূর পড়তে শুনেছি”। তিনি শুনেছেন কাফের অবস্থায়, আর বর্ণনা করেছেন মুসলিম অবস্থায়।
সাবালিগ: রাবির আদিল হওয়ার জন্য সাবালিগ হওয়া জরুরি। কেউ শৈশবে হাদিস শ্রবণ করে যদি সাবালিগ হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য, সাবালিগ হওয়ার পূর্বে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কতক সাহাবির ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য নয়, যেমন ইব্ন আব্বাস, ইব্ন যুবায়ের ও নুমান ইব্ন বাশির প্রমুখ, তাদের হাদিস শৈশাবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে।
বিবেকী: রাবির আদিল হওয়ার জন্য বিবেক সম্পন্ন হওয়া জরুরি। বিবেকহীন ও পাগল ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। পাগল দু’প্রকার: স্থায়ী পাগল ও অস্থায়ী পাগল। স্থায়ী পাগলের হাদিস কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। অস্থায়ী পাগলের মধ্যে যদি সুস্থাবস্থায় সহির অন্যান্য শর্ত বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য, তবে শ্রবণ করা ও বর্ণনা করা উভয় অবস্থায় সুস্থ থাকা জরুরি।
দীনদারী: রাবির ‘আদিল হওয়ার জন্য দীনদার হওয়া জরুরি, তাই পাপের উপর অটল ব্যক্তি আদিল নয়। পাপ হলেই ‘আদল বিনষ্ট হবে না, কারণ মুসলিম নিষ্পাপ নয়, তবে বারবার পাপ করা কিংবা কবিরা গুনায় লিপ্ত থাকা ‘আদল পরিপন্থী। দীনের অপব্যাখ্যাকারী, তাতে সন্দেহ পোষণকারী ও বিদ‘আতির হাদিস গ্রহণ করা সম্পর্কে আহলে ইলমগণ বিভিন্ন শর্তারোপ করেছেন।
সুস্থ রুচিবোধ: রাবির ‘আদল হওয়ার জন্য সুস্থ রুচিবোধ সম্পন্ন হওয়া জরুরি। সুস্থ রুচিবোধের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। প্রত্যেক সমাজের নির্দিষ্ট প্রথা, সে সমাজের জন্য মাপকাঠি, যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নানা প্রকার হয়। সাধারণত সৌন্দর্য বিকাশ ও আভিজাত্য প্রকাশকারী কর্মসমূহ সম্পাদন করা এবং তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্নকারী কর্মসমূহ পরিত্যাগ করাকে সুস্থ রুচিবোধের পরিচায়ক বলা হয়।
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ ‘আদল’ এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন: ‘আদল’ ব্যক্তির মধ্যে এমন যোগ্যতা, যা তাকে তাকওয়া ও রুচিবোধ আঁকড়ে থাকতে বাধ্য করে”।
অতএব ফাসেক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ‘আদিল’ নয়, যদিও সে সত্যবাদী। জামাত ত্যাগকারী ‘আদিল’ নয়, যদিও সে সত্যবাদী, সুতরাং তাদের বর্ণনাকৃত হাদিস সহি নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمۡ فَاسِقُۢ بِنَبَإٖ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوۡمَۢا بِجَهَٰلَةٖ فَتُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلۡتُمۡ نَٰدِمِينَ ٦﴾ [الحجرات: ٦]
“হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে”। ফাসেক ব্যক্তির সংবাদ যাচাই ব্যতীত গ্রহণ করা যাবে না, পক্ষান্তরে আদিল ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ বলেন:
﴿ وَأَشۡهِدُواْ ذَوَيۡ عَدۡلٖ مِّنكُمۡ وَأَقِيمُواْ ٱلشَّهَٰدَةَ لِلَّهِۚ ٢ ﴾ [الطلاق : ٢]
“আর তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দু’জন সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে।”। এ আয়াতে আল্লাহ ‘আদিল’ ব্যক্তিদের সাক্ষীরূপে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সারাংশ: ‘আদিল’ ব্যক্তির মধ্যে দু’টি গুণ থাকা জরুরি: দীনদারী ও সঠিক রুচিবোধ। এ দু’টি গুণকে ‘আদালত’ বলা হয়। কখনো ‘আদিল’ ব্যক্তির জন্য ক্রিয়াবিশেষ্য ‘আদ্ল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন লেখক বলেছেন: يرويه عدل এখানে ‘আদ্ল’ অর্থ ‘আদিল’। অত্র গ্রন্থে আমরা আদিল, আদালত ও আদ্ল শব্দগুলো অধিক ব্যবহার করব, তাই পাঠকবর্গ ভালো করে স্মরণ রাখুন।
বিতর্কিত রাবি: রাবির আদালত বর্ণনার ক্ষেত্রে কেউ কড়াকড়ি করেন, কেউ শিথিলতা করেন। যিনি কড়াকড়ি করেন তার আদালতের স্বীকৃতি অধিক গ্রহণযোগ্য, যদিও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই উত্তম, কারণ কড়াকড়ির ফলে যেরূপ সহি হাদিস পরিত্যাজ্য হতে পারে, অনুরূপ শিথিলতার কারণে দুর্বল হাদিস সহি বলে ধরা হয়ে যেতে পারে। কতক সময় দেখা যায় কারো আদালত সম্পর্কে আলেমগণ দ্বিমত পোষণ করেন, যেমন কেউ বলেন: তার কোনো সমস্যা নেই। কেউ বলেন: তিনি নির্ভরযোগ্য। কেউ বলেন: তার হাদিস আমি ছুড়ে ফেলি, সে কোনো বিষয় নয় ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে অধিক গ্রহণযোগ্য মতটি গ্রহণ করব। এ বিষয়ে আরো জানার জন্য বড় কিতাব দেখুন।
রাবির আদালতের অনুশীলন: উদাহরণে পেশ করা মিসওয়াকের হাদিসে ইমাম বুখারির উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ, তার উস্তাদ মালিক, তার উস্তাদ আবুয যিনাদ এবং তার উস্তাদ আ‘রাজ সবাই আদিল। একাধিক মুহাদ্দিস তাদের আদালত সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। অতএব সনদে বিদ্যমান সকল রাবির মধ্যে দ্বিতীয় শর্ত বিদ্যমান। উল্লেখ্য, সকল সাহাবি আদিল, কারণ তাদের আদালত প্রসঙ্গে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষী দিয়েছেন, তাদের সাক্ষীর পর কারো সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।
তৃতীয় শর্ত: রাবির ‘দ্বাবত’: সহি হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত রাবির ‘দাবত’। ضبط ক্রিয়াবিশেষ্য, আভিধানিক অর্থ নিয়ন্ত্রণ। এ থেকে যিনি শায়খ থেকে হাদিস শ্রবণ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন, তাকে ضابط বলা হয়। ‘দ্বাবিত’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণকারী।
দ্বাবত এর পারিভাষিক অর্থ: শায়খ থেকে শ্রবণ করা হাদিস হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত অপরের নিকট পৌঁছে দেওয়াই দ্বাবত।
দ্বাবত দুই অবস্থায় থাকা জরুরি: শ্রবণ করার সময় ও বর্ণনা করার সময়। শ্রবণ করার সময় দ্বাবত যেমন, শায়খের হাদিস মনোযোগসহ শ্রবণ করা ও তার মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ যথাযথ সংরক্ষণ করা। এ প্রকার দ্বাবতকে ضبط عند التحمل বলা হয়, অর্থাৎ হাদিস গ্রহণ করার সময় দ্বাবত। বর্ণনা করার সময় দ্বাবত যেমন, শায়খ থেকে শ্রবণকৃত হাদিস রাবির নিকট কোনো প্রকার হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত বর্ণনা করা, ভুল হলেও কম। এ প্রকার দ্বাবতকে ضبط عند الأداء বলা হয়, তথা বর্ণনা করার সময় দ্বাবত। এ দুই অবস্থায় দ্বাবত সম্পন্ন রাবিকে দ্বাবিত বলা হয়।
অতএব শায়খের দরসে উদাসীন থাকা রাবি, কিংবা বর্ণনা করার সময় অধিক ভুলকারী রাবি দ্বাবিত নয়, তাই তাদের হাদিস সহি নয়। দ্বাবিত রাবির কখনো ভুল হবে না জরুরি নয়, কারণ এরূপ শর্তারোপ করা হলে এক দশমাংশ সহি হাদিস গ্রহণ করাও মুশকিল হবে।
দ্বাবত দু’প্রকার: স্মৃতি শক্তির দ্বাবত ও খাতায় লিখে দ্বাবত। সাহাবি ও প্রথম যুগের তাবে‘ঈগণ স্মৃতি শক্তির উপর নির্ভর করতেন, পরবর্তীতে লেখার ব্যাপক প্রচলন হয়। তখন থেকে স্মৃতি শক্তি অপেক্ষা লেখার উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, তবে লিখিত পাণ্ডুলিপি নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণ করা জরুরি। লিখে রাখার ফলে ভুল ও বিকৃতি থেকে নিষ্কৃতি মিলে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ ٱلۡإِنسَٰنَ مِنۡ عَلَقٍ ٢ ٱقۡرَأۡ وَرَبُّكَ ٱلۡأَكۡرَمُ ٣ ٱلَّذِي عَلَّمَ بِٱلۡقَلَمِ ٤ ﴾ [العلق: ١، ٤]
“পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়, আর তোমার রব মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন”।
আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে প্রথম বলেছেন পড়, অতঃপর বলেছেন: “যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন”। অর্থাৎ তোমরা স্মৃতি শক্তি থেকে পড়, যদি স্মৃতি শক্তিতে না থাকে, তাহলে তোমার লিখনি থেকে পড়।
এ আলোচনা থেকে আমরা ‘দ্বাবত’ ও ‘দ্বাবিত’ দু’টি শব্দ জানলাম। দ্বাবত অর্থ সংরক্ষণ করা; আর যিনি সংরক্ষণ করেন তাকে বলা হয় দ্বাবিত, অর্থাৎ সংরক্ষণকারী। দ্বাবত ও দ্বাবিত শব্দ দু’টি আমরা অধিকহারে প্রয়োগ করব, তাই পাঠককুল খুব স্মরণ রাখুন।
সহির বিভিন্ন মান: সকল রাবির দ্বাবত ও আদালত সমান নয়, তাই সকল সহি হাদিসের মান সমান নয়। দ্বাবত ও আদালতের তফাতের কারণে সহি হাদিস সাত ভাগে ভাগ হয়: ১. বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিস। ২. শুধু বুখারিতে বর্ণিত হাদিস। ৩. শুধু মুসলিমে বর্ণিত হাদিস। ৪. বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদিস। ৫. শুধু বুখারির শর্ত মোতাবেক হাদিস। ৬. শুধু মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদিস। ৭. অন্যান্য মুহাদ্দিসের শর্ত মোতাবেক সহি। উল্লেখ্য, সহি ইব্ন খুযাইমাহ সহি ইব্ন হিব্বান অপেক্ষা অধিক বিশুদ্ধ।
يَرْوِيهِ عَدْلٌ ضابِطٌ عَنْ مِثْلِهِ অর্থ আদিল ও দ্বাবিত রাবি তার ন্যায় আদিল ও দ্বাবিত রাবি থেকে বর্ণনা করবে। সহি হাদিসের জন্য গ্রন্থকার থেকে সাহাবি পর্যন্ত সকল রাবির মধ্যে দ্বাবত ও আদালত থাকা জরুরি। অতএব ফাসেক রাবি থেকে আদিল রাবির বর্ণিত হাদিস সহি নয়। অনুরূপ দুর্বল স্মৃতি শক্তি সম্পন্ন রাবি কিংবা অধিক ভুলকারী রাবি থেকে প্রখর স্মৃতি শক্তি সম্পন্ন রাবির বর্ণিত হাদিস সহি নয়, কারণ আদালত ও দ্বাবত সম্পন্ন রাবি তার ন্যায় আদালত ও দ্বাবত সম্পন্ন রাবি থেকে বর্ণনা করেনি।
‘শায’-এর অনুশীলন: ২১-নং পঙক্তির অধীন শায সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসছে, যার সারাংশ: ‘মাকবুল বা সেকাহ রাবি যদি তাদের চেয়ে উত্তম বা অধিক সেকাহ রাবিদের বিপরীত বর্ণনা করে, তাহলে তাদের বর্ণনাকে শায বলা হয়’। মকবুল অর্থ গ্রহণযোগ্য রাবি, যার একা বর্ণিত হাদিস ন্যূনতম পক্ষে ‘হাসানে’-র মর্যাদা রাখে। মকবুলের চেয়ে উত্তম রাবিকে সেকাহ বলা হয়, যার একা বর্ণিত হাদিস ‘সহি’-র মর্যাদা রাখে। উদাহরণে পেশকৃত মিসওয়াকের হাদিসে সকল রাবি সেকাহ। তাদের বিরোধিতা করে তাদের চেয়ে অধিক সেকাহ রাবি কোনো হাদিস বর্ণনা করেনি। তাই হাদিসটি শায নয়। অতএব মিসওয়াকের হাদিসে ‘সহি’র চতুর্থ শর্ত বিদ্যমান।
‘মু‘আল’-এর অনুশীলন: ২৪-নং পঙক্তির অধীন ‘মু‘আল’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসছে। তার সারাংশ: ‘দোষণীয় ইল্লতযুক্ত হাদিসকে মু‘আল্ বলা হয়’। সনদ ও মতন উভয় স্থানে দোষণীয় ইল্লত হতে পারে। ইল্লত দ্বারা উদ্দেশ্য সুপ্ত ও গোপন ইল্লত, বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ব্যতীত যা কেউ বলতে পারে না। উদাহরণে পেশকৃত মিসওয়াকের হাদিস দোষণীয় ইল্লতমুক্ত। অর্থাৎ হাদিসটি কুরআনুল কারিমের কোনো আয়াত বিরোধী নয়। হাদিসটি মারফূ‘, কোনো বিচক্ষণ মুহাদ্দিস তা মাওকুফ বলেননি; অথবা হাদিসটি মুত্তাসিল, কোনো বিচক্ষণ মুহাদ্দিস তা মুরসাল বলেননি; অথবা হাদিস থেকে প্রমাণিত বিধান অকাট্য বিধানের বিপরীত নয়, তাই হাদিস সহি। হাদিস সহি হওয়ার পঞ্চম শর্তও তাতে বিদ্যমান। এ জন্য বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে তার স্থান হয়েছে। বুখারি ও মুসলিমের উদ্ধৃতি পর কোনো উদ্ধৃতির প্রয়োজন নেই।
এ ছাড়া উক্ত হাদিসের অনেক মুতাবে‘ ও শাহেদ রয়েছে। মুতাবে‘ ও শাহিদের বলে ‘হাসান হাদিস’ সহি লি গায়রিহি ও ‘দ্বা‘ঈফ হাদিস’ হাসান লি গায়রিহির মর্যাদায় উন্নীত হয়। ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ্ উক্ত হাদিস বর্ণনা শেষে বলেন: “মিসওয়াক অধ্যায়ে আবু বকর সিদ্দিক, ‘আলি, ‘আয়েশা, ইব্ন আব্বাস, হুযাইফা, যায়েদ ইব্ন খালেদ আল-জুহানি, আনাস, আব্দুল্লাহ ইব্ন আমর, ইব্ন ওমর, উম্মে হাবিবা, আবু উমামাহ, আবু আইয়ূব, তাম্মাম ইব্ন আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইব্ন হানযালা, উম্মে সালামাহ, ওয়াসেলা ইব্ন আসকা ও আবু মুসা প্রমুখ সাহাবি থেকে বিভিন্ন সনদে হাদিস রয়েছে”। আমরা শুধু ইমাম বুখারি বর্ণিত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের উপর আলোচনা করেছি।
প্রিয়পাঠক, আমরা দেখলাম একটি হাদিস মুহাদ্দিসগণ কি পরিমাণ সতর্কতাসহ লিপিবদ্ধ করেছেন। এক মুহাদ্দিস অপর মুহাদ্দিসকে কিভাবে পরখ ও যাচাই করেছেন। আল্লাহর দীনের স্বার্থে তারা কারো সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি, অনুরূপ অপরের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিতে সামান্য কুণ্ঠাবোধ করেননি। আরো দেখলাম ‘সহি’র মর্যাদায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য একটি হাদিসকে কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। তাই আমরা নিশ্চিত আল্লাহর অনুগ্রহে কোনো জাল হাদিস ‘সহি’র মর্যাদা পায়নি, হাদিসের ক্ষেত্রে কোনো কুচক্রীর ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। মিথ্যা হাদিস রচনাকারী কেউ নেই, যাকে আল্লাহ জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় লাঞ্ছিত করেননি। জাল ও দুর্বল হাদিস প্রচারকারী মূর্খ মুহাদ্দিসরা সাবধান, আপনারা মিথ্যাবাদী মুহাদ্দিস, কারণ মিথ্যা হাদিস প্রচার করাও মিথ্যা বলার অন্তর্ভুক্ত। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ حَدَّثَ عَنِّى، بِحَدِيثٍ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ»
“যে আমার পক্ষ থেকে কোন হাদিস বর্ণনা করল, যে হাদিস মিথ্যা মনে হচ্ছে, সেও একজন মিথ্যাবাদী”।
সকল মুসলিম স্বীয় দীন গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন হলে, মূর্খরা জাল হাদিস প্রচার করার সুযোগ পাবে না। ইনশাআল্লাহ। উম্মতে মুসলিমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের থেকে একটি জামাত তৈরি করেছেন, যারা দীনকে হিফাজত করার স্বার্থে সাধ্যের সবটুকু সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, যেন কোনো মিথ্যাবাদীর মিথ্যারচনা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত না হয়। তাদের এরূপ করা সম্ভব হয়েছে সনদের কারণে, তাই মুসলিম উম্মাহর নিকট সনদের গুরুত্ব অপরিসীম।
সনদের গুরুত্ব: ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ্ সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে কতক বিখ্যাত মনীষীর বাণী উদ্ধৃত করেছেন: ১. সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ্ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “মালায়েকাগণ আসমানের পাহারাদার, আর আসহাবে হাদিসগণ জমিনের পাহারাদার”। ২. আব্দুল্লাহ ইব্নুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “সনদ দীনের একটি অংশ, যদি সনদ না থাকত তাহলে যে যা চাইত তা-ই বলত”। ৩. ইব্ন সিরিন রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “নিশ্চয় সনদের ইলম দীনের অংশ, অতএব পরখ করে দেখ কার থেকে তোমাদের দীন গ্রহণ করছ”। ৪. তিনি আরো বলেন: “মানুষ সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত না, কিংবা সনদ দেখত না, অবশেষে যখন ফেতনার সূচনা হল, তারা বলল: তোমাদের শায়খদের নাম বল, বিদ‘আতি হলে তাদের হাদিস গ্রহণ করব না। আহলে সুন্নাহ হলে তাদের হাদিস গ্রহণ করব”। ৫. ইব্নুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “সনদ ব্যতীত দীনি ইলম অন্বেষণকারী সিঁড়ি ব্যতীত ছাদে আরোহণকারী ব্যক্তির ন্যায়”।
সহি হাদিসের হুকুম: সহি হাদিসের উপর আমল করা ওয়াজিব।
হাসান হাদিস
رِجَالُهُ لا كَالصَّحِيحِ اشْتَهَرَتْ
والحَسَنُ الْمَعْرُوفُ طُرْقاً وَغَدَتْ
“আর ‘হাসান’, যার সনদগুলো পরিচিত এবং রাবিগণ প্রসিদ্ধ, তবে সহি হাদিসের রাবিদের ন্যায় প্রসিদ্ধ নয়”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাসান দ্বিতীয় প্রকার। হাদিসের এ প্রকার সনদ ও মতন উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ সহি হাদিসের সংজ্ঞা শেষে ‘হাসান’ হাদিসের সংজ্ঞা পেশ করছেন, কারণ ‘সহি’র পর হাসান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
حسَنُ এর আভিধানিক অর্থ সুন্দর।
‘হাসান’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদিসের সনদগুলো প্রসিদ্ধ, তবে সহি হাদিসের রাবিদের ন্যায় প্রসিদ্ধ নয়, তাই হাসান”।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বাহ্যত হাসান হাদিসের দু’টি শর্ত উল্লেখ করেছেন: ১. রাবিদের প্রসিদ্ধ হওয়া। ২. সহি হাদিসের রাবিদের অপেক্ষা কম প্রসিদ্ধ হওয়া। সনদ মুত্তাসিল হওয়া, শায ও মু‘আল্ না হওয়া যদিও তিনি উল্লেখ করেননি, তবে সহির সাথে হাসানের তুলনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হাসান হাদিসেও সহির শর্তসমূহ প্রযোজ্য। দ্বিতীয়ত সনদ মুত্তাসিল না হলে যেসব প্রকারগুলো সৃষ্টি হয়, সেগুলো তিনি দ্বা‘ঈফের প্রকারে উল্লেখ করেছেন, যেমন মু‘দ্বাল, মুনকাতি‘, মুরসাল, শায ও মু‘আল্। তাই স্বাভাবিকভাবে বুঝে আসে সনদ মুত্তাসিল হওয়া এবং শায ও মু‘আল্ না হওয়া হাসান হাদিসেও জরুরি।
একটি বিচ্যুতি: লেখক বলেছেন: وغَدَتْ رِجَالُهُ لا كالصّحيحِ اشْتَهَرَتْ তার এ কথার অর্থ ‘হাসান’ হাদিসের রাবিগণ আদালত ও দ্বাবতের বিবেচনায় সহি হাদিসের রাবিদের অপেক্ষা কম প্রসিদ্ধ। এ কথা যথাযথ নয়, কারণ অধিকাংশ মুহাদ্দিসের নিকট ‘সহি’ ও ‘হাসান’ হাদিসের রাবিদের আদালতের প্রসিদ্ধি সমান, পার্থক্য শুধু দ্বাবতের ক্ষেত্রে। ‘হাসান’ হাদিসের রাবির দ্বাবত ‘সহি’ হাদিসের রাবি অপেক্ষা দুর্বল, অন্যান্য শর্ত উভয় প্রকার রাবির জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। লেখকের এ ভুল শুধরে ড. আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ পঙক্তিটি নিম্নরূপে পাল্টে দিয়েছেন:
والحسن الخفيف ضبطا إذ عدت = رجاله لاكالصحيح اشتهرت
“আর হাসান: যার রাবিগণ দ্বাবতের বিচারে দুর্বল, সহি হাদিস অপেক্ষা তার রাবিগণ কম প্রসিদ্ধ”। অর্থাৎ হাসান হাদিসের রাবিগণ শুধু স্মৃতি শক্তি ও মেধার বিচারে কম প্রসিদ্ধ, তবে আদালতের বিচারে সহি হাদিসের রাবিদের সমকক্ষ। লেখক আধিক্যের বিবেচনায় رجال শব্দ ব্যবহার করেছেন, অন্যথায় নারী রাবিগণও তার অন্তর্ভুক্ত ।
লেখকের সংজ্ঞায় কয়েকটি প্রশ্ন:
১. লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ طُرْقاً শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ সনদসমূহ। الَمعْرُوفُ طُرْقاً অর্থ সনদের বিবেচনায় প্রসিদ্ধ, আর সনদের বিবেচনায় তখনি প্রসিদ্ধ হবে, যখন এক হাদিসের একাধিক সনদ হবে। এ থেকে অনুমেয় যে, হাসান হাদিসের একাধিক সনদ থাকা জরুরি, অথচ বাস্তবে তা নয়। এরূপ শর্ত দ্বিতীয় প্রকার হাসান তথা হাসান লি-গায়রিহির জন্য প্রযোজ্য, যা মূলত একপ্রকার দ্বা‘ঈফ হাদিস, একাধিক সনদের কারণে হাসানের মর্যাদায় উন্নীত হয়। হাসান লি যাতিহির জন্য এ শর্ত প্রযোজ্য নয়, লেখক যার সংজ্ঞা পেশ করেছেন।
২. লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ হাসানের সংজ্ঞায় সনদ মুত্তাসিল হওয়া ও রাবিদের আদালত শর্ত করেননি, অনুরূপ তিনি শায ও ইল্লত থেকে মুক্ত হওয়ার কথাও বলেননি, অথচ হাসান হাদিসে এসব শর্ত জরুরি।
৩. লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ দ্বিতীয় শর্ত বলেছেন: “সহি হাদিসের রাবিদের অপেক্ষা কম প্রসিদ্ধ”। এ থেকে স্পষ্ট যে, সনদের প্রত্যেক রাবির ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য, বস্তুত তা নয়, বরং একজন রাবি এরূপ হলে হাদিস হাসান হবে। কারণ হাদিসের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরুর উপর প্রভাব বিস্তারকারী, আর খারাপ ভালোর উপর কর্তৃত্বকারী। উদাহরণত কোনো সনদে ক্রমানুসারে পাঁচজন রাবি রয়েছে, যদি একজন রাবি দুর্বল হয়, তাহলে সনদ ও হাদিস দুর্বল। একজন রাবি মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট হলে হাদিস মাওদু‘ ও জাল, অথচ চারজন রাবি সেকাহ। এতে সংখ্যালঘু একজন রাবি সবার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। আবার সনদে যদি ভালো ও খারাপ উভয় প্রকার রাবি থাকে, তাহলে খারাপ রাবি সবার উপর কর্তৃত্ব করবে, তার বিবেচনায় হাদিসের মান নির্ণয় হবে।
হাফেয ইব্ন হাজার আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ্ হাসানের সবচেয়ে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
وخبر الآحاد بنقل عدل تام الضبط، متصل السند، غير معلل ولاشاذ، هو الصحيح لذاته. ثم قال: فإن خف الضبط فالحسن لذاته. النزهة: (صـ91)
“আদিল ও পরিপূর্ণ দ্বাবত সম্পন্ন রাবির মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত, ইল্লত ও শায থেকে মুক্ত খবরে ওয়াহেদকে সহি লি-যাতিহি বলা হয়। অতঃপর তিনি বলেন: যদি দ্বাবত দুর্বল হয়, তাহলে হাসান লি-যাতিহি”।
এ সংজ্ঞা মতে হাসান হাদিসে সহি হাদিসের শর্তগুলো থাকা জরুরি, তবে পঞ্চম শর্ত ব্যতিক্রম, যথা: ১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া। ২. শায না হওয়া। ৩. দোষণীয় ইল্লত থেকে মুক্ত হওয়া। ৪. রাবিদের আদিল হওয়া। ৫. সহি হাদিস অপেক্ষা হাসান হাদিসের রাবির দ্বাবত দুর্বল হওয়া। পঞ্চম শর্তের ভিত্তিতে সহি ও হাসান একটি অপরটি থেকে পৃথক হয়, অন্যথায় হাসানের রাবিগণ তাকওয়া, ইবাদত ও অন্যান্য দীনি বিষয়ে সহি হাদিসের রাবি থেকে উঁচুমানের হতে পারে।
মুদ্দাকথা: যে হাদিস দুর্বল নয়, কিন্তু সহির মর্তবায় উন্নীত হতে পারেনি তাই হাসান লি-যাতিহি। অথবা বলা যায় দ্বা‘ঈফ রাবি থেকে মুক্ত হাদিস হাসান লি-যাতিহি। এ হিসেবে হাসান হাদীস সহি হাদীসের একটি প্রকার। সহি বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়, হাসান সর্বনিম্ন প্রকার।
তিরমিযি শরীফে হাসান: তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ্ ‘হাসানে’র সর্বাধিক ব্যবহার করেছেন। শায়খুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদিস দু’সনদে বর্ণিত, যার সনদে মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট কোনো রাবি নেই এবং যা সহি হাদিসের বিপরীত শায নয়, তিরমিযির পরিভাষায় তাই হাসান। হাসানের ক্ষেত্রে তিরমিযি এ শর্তগুলো আরোপ করেন।
কতক লোক বলেন: এর বাইরেও তিরমিযি হাসান বলেন, যেমন তিনি যে হাদিস সম্পর্কে বলেন: حسن غريب তার সনদ শুধু একটি, কারণ এক সনদে বর্ণিত হাদিসকে গরিব বলা হয়। আবার এ হাদিসকে তিনি হাসানও বলেন, যার দাবি তার অপর সনদ আছে। এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়: একটি হাদিস একজন তাবে‘ঈ থেকে বর্ণিত কারণে গরিব বলা হয়, কিন্তু তার থেকে দু’সনদে বর্ণিত হিসেবে হাসান বলা হয়, হাদিসটি মূলত গরিব। অনুরূপ একটি হাদিস একসাথে صحيح حسن غريب হয়, কারণ হাদিসটি সহি ও গরিব সনদে বর্ণিত তাই সহি ও গরিব। অতঃপর হাদিসটি মূল রাবি থেকে সহি সনদ ও অপর সনদে বর্ণিত তাই হাসান, যদিও হাদিসটি সহি ও গরিব। কারণ হাসান বলা হয় যার একাধিক সনদ রয়েছে এবং তার কোনো রাবি মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট নয়। যদি উভয় সনদ সহি হয়, তাহলে সহি লি-যাতিহি, যদি একটি সনদের বিশুদ্ধতা জানা না যায় তাহলে হাসান। এ হাদিস সনদের বিবেচনায় গরিব, কারণ অন্য কোনোভাবে এ সনদ জানা যায়নি, তবে মতন হাসান, কারণ মতন দু’ভাবে বর্ণিত। তাই তিনি বলেন: “এ অধ্যায়ে অমুক ও অমুক থেকে হাদিস রয়েছে”, তার অর্থ: এ মতনের অর্থধারক একাধিক শাহেদ রয়েছে, যা প্রমাণ করে মতনটি হাসান, যদিও সনদ গরিব। যখন তার সাথে তিনি বলেন: হাদিসটি ‘সহি’, তখন তার অর্থ হাদিসটি একটি সহি সনদ ও অপর একটি হাসান সনদে বর্ণিত। এভাবে একটি হাদিস সহি ও হাসান হয়। কখনো একই বিবেচনায় গরিব বলা হয়, কারণ সনদটি এ ছাড়া কোনোভাবে জানা যায়নি, যদি সনদ সহি হয়, তাহলে হাদিস সহি ও গরিব। এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই, তবে অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয় হাসান ও গরিব জমা হলে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, একটি হাদিস গরিব ও সহি হয়, অতঃপর হাসান হয়। আবার কখনো হাসান ও গরিব হয়, যার অর্থ পূর্বে বলা হয়েছে”।
দুর্বল হাদিস
فَهْوَ الضَّعيفُ وَهْوَ أقْساماً كَثُرْ
وَكُلُّ ما عَنْ رُتْبَةِ الحُسْنِ قَصُرْ
“আর যেসব হাদিস হাসানের স্তর থেকে নিচু মানের, তাই দুর্বল, তার অনেক প্রকার রয়েছে”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে দ্বা‘ঈফ তৃতীয় প্রকার। হাদিসের এ প্রকার সনদ ও মতন উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত।
ضعيف এর আভিধানিক অর্থ দুর্বল।
‘দ্বা‘ঈফ’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যেসব হাদিস হাসান হাদিসের স্তর থেকে নিচু তাই দ্বা‘ঈফ বা দুর্বল হাদিস, তার অনেক প্রকার রয়েছে”। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ এখানে দ্বা‘ঈফের সংজ্ঞা দিয়েছেন ও তার বিভিন্ন প্রকারের দিকে ইশারা করেছেন, কিন্তু কোনো প্রকার উল্লেখ করেননি, তবে পরবর্তীতে অনেক প্রকার উল্লেখ করেছেন। তিনি দ্বা‘ঈফের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার পরিবর্তে ‘হাসানের স্তর থেকে নিচু হলে দ্বা‘ঈফ’ বলেছেন। দ্বা‘ঈফ যদি হাসান থেকে নিচু মানের হয়, তাহলে সহি থেকে নিচু মানের বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা পূর্বে জেনেছি যে, সহি ও হাসান হাদিসে পার্থক্য শুধু একটি। সহি হাদিসের রাবি পরিপূর্ণ দ্বাবতের অধিকারী, হাসান হাদিসের রাবি দুর্বল দ্বাবতের অধিকারী, অন্যান্য শর্তের ক্ষেত্রে সহি ও হাসান উভয় সমান। সহি হাদিসের এক বা একাধিক শর্ত কোনো হাদিসে অনুপস্থিত থাকলে হাদিস দুর্বল।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ এ সংজ্ঞায় দ্বা‘ঈফের সকল প্রকার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। শায, মুনকার, মাতরুক ও মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট রাবির হাদিস এ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। সেসব হাসান হাদিসও অন্তর্ভুক্ত, যা অপর দ্বা‘ঈফ হাদিসের ফলে হাসানের মর্যাদায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এ সংজ্ঞায় দ্বা‘ঈফ ও হাসান লি-গায়রিহি উভয় শামিল। অতএব লেখক রাহিমাহুল্লাহ দ্বা‘ঈফের যথাযথ সংজ্ঞা পেশ করেননি। তাই অনেকে তার সমালোচনা করেছেন।
লেখক এ পর্যন্ত হাদিসের মৌলিক তিন প্রকার উল্লেখ করেছেন: ১. সহি, ২. হাসান ও ৩. দ্বা‘ঈফ বা দুর্বল।
এ তিন প্রকার পাঁচভাগে ভাগ হয়, যেমন ইব্ন হাজার ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ করেছেন: ১. সহি লি-যাতিহি, ২. সহি লি-গায়রিহি, ৩. হাসান লি-যাতিহি, ৪. হাসান লি-গায়রিহি, ৫. দ্বা‘ঈফ বা দুর্বল।
১. সহি লি-যাতিহি: পূর্বে সহির যে সংজ্ঞা পেশ করা হয়েছে তাই সহি লি-যাতিহির সংজ্ঞা।
২. সহি লি-গায়রিহি: এ প্রকার হাদিস মূলত হাসান, তবে একাধিক সনদের বলে সহির মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। যেহেতু একাধিক সনদের কারণে সহির পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, তাই এ প্রকার হাদিসকে সহি লি-গায়রিহি বলা হয়।
৩. হাসান লি-যাতিহি: পূর্বে হাসানের যে সংজ্ঞা পেশ করা হয়েছে তাই হাসান লি-যাতিহির সংজ্ঞা।
৪. হাসান লি-গায়রিহি: “যে হাদিসে সামান্য দুর্বলতা রয়েছে, যা অনুরূপ দুর্বলতা সম্পন্ন হাদিস দ্বারা দূরীভূত হয়, তাই হাসান লি-গায়রিহি”। দুর্বলতা দ্বারা উদ্দেশ্য আদালত, দ্বাবত ও ইত্তেসালের দুর্বলতা। এ তিনটি দোষের কারণে দুর্বল হাদিস অনুরূপ দুর্বল হাদিস দ্বারা হাসান লি-গায়রিহি প্রকারে উন্নীত হয়। তবে দুর্বল হাদিসে দুর্বলতা দূরকারী শক্তি থাকা জরুরি, শায ও ইল্লতের কারণে দুর্বল হাদিস অপর হাদিসের দুর্বলতা দূর করার ক্ষমতা রাখে না। আবার কঠিন দুর্বল হাদিস অনুরূপ কঠিন দুর্বল হাদিস দ্বারা হাসান লি-গায়রিহি মর্যাদায় উন্নীত হয় না।
জ্ঞাতব্য, দুর্বল হাদিসের দুর্বলতা দূরীকরণে অনুরূপ দুর্বল হাদিস হওয়া জরুরি, যদি মকবুল হাদিসের দুর্বলতা দূর হয়, তাহলে সে হাদিস সহি কিংবা হাসান, হাসান লি-গায়রিহি নয়।
৫. দ্বা‘ঈফ: সহি ও হাসানের বাইরে হাদিসের সকল প্রকার দ্বা‘ঈফ। দ্বা‘ঈফ বা দুর্বল হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব দ্বা‘ঈফ প্রচার করা, শিক্ষা দেওয়া ও তার উপর আমল করা দুরস্ত নয়। তবে প্রয়োজন হলে দুর্বলতা প্রকাশ করে দ্বা‘ঈফ বলা বৈধ, কারণ দুর্বলতা প্রকাশ করা ব্যতীত দ্বা‘ঈফ বলা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যারোপ করার শামিল। মুসলিম সহি গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ حَدَّثَ عَنِّى، بِحَدِيثٍ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ»
“যে আমার থেকে কোন হাদিস বর্ণনা করল, অথচ দেখা যাচ্ছে তা মিথ্যা, তাহলে সেও মিথ্যাবাদীদের একজন”। অপর হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন:
«وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»
“আর আমার উপর যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”।
দ্বা‘ঈফ বর্ণনার পদ্ধতি: ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হয়’, অথবা ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়’। দৃঢ়ভাবে বলা যাবে না ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন’।
কতক আলেম বলেন: ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ও জাহান্নাম থেকে সতর্ক করার নিমিত্তে চারটি শর্তে দ্বা‘ঈফ হাদিস বলা বৈধ: ১. দ্বা‘ঈফ হাদিস ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ও পাপ থেকে সতর্ককারী সম্পর্কিত হওয়া। ২. কঠিন দ্বা‘ঈফ না হওয়া। ৩. দ্বা‘ঈফ হাদিসের মূল বিষয় কুরআন বা সুন্নায় মওজুদ থাকা। ৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দ্বা‘ঈফ হাদিসের ক্ষেত্রে বিশ্বাস না করা। এ চারটি শর্তে দ্বা‘ঈফ হাদিসের উপর আমল করা বৈধ।
কতক আলেম বলেন: দ্বা‘ঈফ হাদিসের উপর কোনো অবস্থায় আমল করা বৈধ নয়, কারণ:
১. দ্বা‘ঈফ হাদিসের উপর আমল করার অর্থ সন্দেহ বা ধারণার উপর আমল করা, যা নিন্দনীয়।
২. দ্বা‘ঈফ হাদিস দ্বারা মোস্তাহাব বা মাকরুহ প্রমাণিত হয় না, অতএব তার দ্বারা কিভাবে ফযিলত প্রমাণিত হয়।
৩. সমাজে দ্বা‘ঈফ হাদিসের কু-প্রভাব বন্ধের নিমিত্তে তার উপর আমল নিষিদ্ধ করা জরুরি। ফযিলত অধ্যায়ে দুর্বল হাদিস বলার অজুহাতে অনেক খতিব ও বক্তা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জাল হাদিস পর্যন্ত বর্ণনা করেন, যা পরিহার করা জরুরি।
৪. দ্বা‘ঈফ হাদিসের উপর আমল করা হলে সহি হাদিস সুরক্ষায় মুহাদ্দিসদের প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা করা হয়।
৫. প্রত্যেক প্রকার সহি ও হাসানের উপর আমল করতে পারিনি, তবু কেন দুর্বল হাদিসের উপর আমল করব।
শায়খ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আমার নিকট দুর্বলতা প্রকাশ করা ব্যতীত দুর্বল হাদিস বলা বৈধ নয়, বিশেষ করে জনগণের সামনে। কারণ তাদের সামনে যখন হাদিস বলা হয়, তারা সেটাকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে। তারা মনে করেন খতিব যা বলেন তাই ঠিক। বিশেষ করে আগ্রহ সৃষ্টি ও সতর্ককারী হাদিসগুলো। কুরআন ও সহি সুন্নায় যা রয়েছে, দুর্বল হাদিস অপেক্ষা তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
কতক লোক সুন্নতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য হাদিস রচনা করে। তারা বলে: আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিপক্ষে মিথ্যা রচনা করি না, বরং তার স্বার্থে মিথ্যা রচনা করি। তারা হাদিসের অপব্যাখ্যা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»
“আর যে আমার উপর মিথ্যা রচনা করল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”। আপনি যখন কোনো কথা বললেন, যা তিনি বলেননি, আপনি তার উপর মিথ্যা রচনা করলেন”।
মারফূ‘ ও মাকতু হাদিস
وَما لِتابِعٍ هُوَ الْمَقْطُوعُ
وَما أُضِيفَ لِلنَّبِيْ الْمَرْفُوعُ
“আর যে হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে তা-ই মারফূ‘। আর যা তাবে‘ঈর সাথে সম্পৃক্ত করা হয় তাই মাকতু‘”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের চতুর্থ ও পঞ্চম প্রকার মারফূ‘ ও মাকতু‘। হাদিসের এ দু’প্রকারের সম্পর্ক মতনের সাথে।
এখান থেকে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বক্তার বিবেচনায় হাদিসের প্রকারসমূহ উল্লেখ করেছেন। বক্তার বিবেচনায় হাদিস চার প্রকার: ১. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সমর্থন ও শারীরিক গুণগান। ২. সাহাবিদের কথা ও কর্ম। ৩. তাবে‘ঈদের কথা। ৪. আল্লাহ তা‘আলার বাণী।
লেখক চতুর্থ প্রকার উল্লেখ করেননি, আমরা সম্পূরক হিসেবে তার আলোচনা করব। মওকুফ বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি। তাই অনেকে তার সমালোচনা করেছেন।
মারফূ‘ হাদিস
َمرْفوعُ এর আভিধানিক অর্থ উঁচু, উত্তোলিত বস্তু ও উচ্চ শিখরে উন্নীত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত হাদিস সনদের সর্বশেষ ও উচ্চ শিখরে উন্নীত হয়, তাই এ প্রকার হাদিসকে মারফূ‘ বলা হয়।
‘মারফূ‘’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত কথা, অথবা কর্ম, অথবা সমর্থন, অথবা তার চারিত্রিক ও শারীরিক গঠনের বর্ণনা; হোক স্পষ্ট মারফূ‘ কিংবা হুকমান মারফূ‘। সাহাবি তার সাথে সম্পৃক্ত করুক কিংবা তাবে‘ঈ কিংবা তাদের পরবর্তী কেউ, সকল প্রকার মারফূ‘র অন্তর্ভুক্ত”। অতএব মারফূ‘র সংজ্ঞায় মুত্তাসিল, মুরসাল, মুনকাতি‘, মু‘দ্বাল ও মু‘আল্লাক অন্তর্ভুক্ত, তবে মাওকুফ ও মাকতু‘ অন্তর্ভুক্ত নয়।
মারফূ‘ দু’প্রকার: ১. স্পষ্ট মারফূ‘ ও ২. হুকমান মারফূ‘।
১. স্পষ্ট মারফূ‘: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, কাজ, সমর্থন ও গুণগান ইত্যাদিকে تصريحا مرفوع বা স্পষ্ট মারফূ‘ বলা হয়। স্পষ্ট মারফূ‘ কয়েকভাগে বিভক্ত: ক. মারফূ‘ কাওলি বা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। খ. মারফূ‘ ফে‘লি বা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম। গ. মারফূ‘ তাকরিরি বা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমর্থন। ঘ. মারফূ‘ সিফাতি বা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক গঠনের বর্ণনা।
ক. মারফূ‘ কাওলি: যেমন, ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ»
“নিশ্চয় সকল আমল নিয়তের সাথে গ্রহণযোগ্য হয়, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই যা সে নিয়ত করেছে। অতএব যার হিজরত দুনিয়ার জন্য যা সে উপার্জন করবে, অথবা নারীর জন্য যাকে সে বিয়ে করবে, তাহলে সে যে জন্য হিজরত করেছে তার হিজরত সে জন্য গণ্য হবে।
খ. মারফূ‘ ফে‘লি: মুগিরা ইব্ন শু‘বা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«وَضَّأْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَصَلَّى»
“আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওজু করিয়েছি, তিনি তার মোজার উপর মাসেহ করেছেন ও সালাত পড়েছেন”।
গ. মারফূ‘ তাকরিরি: যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক দাসীকে বলেন:
«أَيْنَ اللَّهُ ؟ قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ، قَالَ: مَنْ أَنَا؟ قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ، قَالَ: أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ»
“আল্লাহ কোথায়? সে বলল: আসমানে। তিনি বলেন: আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বলেন: তাকে মুক্ত কর, কারণ সে মুমিন”। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাঁদির কথা প্রত্যাখ্যান না করে সমর্থন করেছেন, তাই বাদীর কথা তার কথা হিসেবে গণ্য। এটা তার তাকরির বা সমর্থন।
ঘ. মারফূ‘ সিফাতি: চারিত্রিক ও শারীরিক উভয় বিশেষণ উদ্দেশ্য। চারিত্রিক বিশেষণ যেমন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন:
«كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِي تَنَعُّلِهِ وَتَرَجُّلِهِ وَطُهُورِهِ وَفِي شَأْنِهِ كُلِّهِ»
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডান দিক আনন্দিত করত, তার জুতা পরিধান করায়, তার মাথার চুল আঁচড়ানোতে ও তার পবিত্রতা অর্জন করায় এবং তার প্রত্যেক অবস্থায়”।
শারীরিক বিশেষণ যেমন, বারা ইব্ন আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«مَا رَأَيْتُ مِنْ ذِي لِمَّةٍ فِي حُلَّةٍ حَمْرَاءَ أَحْسَنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَهُ شَعْرٌ يَضْرِبُ مَنْكِبَيْهِ بَعِيدُ مَا بَيْنَ الْمَنْكِبَيْنِ، لَمْ يَكُنْ بِالْقَصِيرِ وَلَا بِالطَّوِيلِ».
“লাল পোশাকে কোঁকড়ানো কেশগুচ্ছ বিশিষ্ট নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সুন্দর কাউকে আমি দেখিনি। তার চুল উভয় কাঁধকে স্পর্শ করত। উভয় কাঁধের মধ্যে তফাৎ ছিল, তিনি বেটে বা লম্বা ছিলেন না”।
জ্ঞাতব্য: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমর্থনও কর্ম, তবে অধিক স্পষ্ট করার জন্য সমর্থন পৃথক করা হয়েছে, নচেৎ কারো ধারণা হত সমর্থন তার কর্ম নয়, তাই পৃথক করা যথাযথ হয়েছে। সাহাবি কিংবা তাদের পরবর্তী কারো সমর্থন বা চুপ থাকা দলিল নয়, এ জন্যও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমর্থনকে পৃথক করা জরুরি ছিল। অনুরূপ তার কথাও কর্ম, তবে স্পষ্ট করার জন্য পৃথক করা হয়েছে।
২. হুকমান মারফূ‘: এ প্রকার হাদিস প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত নয়, তাই মওকুফ অথবা মাকতু, তবে অন্যান্য নিদর্শন প্রমাণ করে এগুলো তার থেকে প্রকাশিত, তাই হুকমান মারফূ‘ বলা হয়, যেমন:
এক. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের সাথে সম্পৃক্ত করে কোনো সাহাবির এটা বলা যে, আমরা এরূপ বলতাম, অথবা এরূপ করতাম, অথবা এরূপ দেখতাম, তাহলে এ জাতীয় কর্ম হুকমান মারফূ‘, তথা সরাসরি মারফূ‘ নয়, তবে মারফূ‘র হুকুম রাখে। কারণ, সাহাবিদের এরূপ বলা প্রমাণ করে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কর্ম জানতেন এবং তিনি তাদেরকে এসব কর্মের উপর স্থির রেখেছেন। দ্বিতীয়ত তাদের যুগ ছিল অহির যুগ, তাদের কর্মের উপর নীরবতা অবলম্বন অহির সমর্থন প্রমাণ করে। সমর্থন একপ্রকার মারফূ‘, তবে সরাসরি নয় তাই হুকমান মারফূ‘। যেমন, ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
عن ابن عمر رضي الله عنهم قال: «كُنَّا فِي زَمَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم لاَ نَعْدِلُ بِأَبِي بَكْرٍ أَحَداً، ثُمَّ عُمَرَ، ثُمَّ عُثْمَانَ، ثُمَّ نَتْرُكُ أَصْحَابَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم لاَ نُفَاضِلُ بَيْنَهُمْ.
“ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আবু বকরের সাথে কাউকে তুলনা করতাম না, অতঃপর ওমর অতঃপর উসমান। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য সাহাবি সম্পর্কে মন্তব্য থেকে বিরত থাকতাম, তাদের কারো মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করতাম না”।
অনুরূপ সাহাবির বলা যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এ জাতীয় কর্ম আমরা দোষণীয় মনে করিনি। অথবা তার যুগে সাহাবিগণ এরূপ করত কিংবা এরূপ বলত কিংবা এতে কোনো সমস্যা মনে করা হত না ইত্যাদি হুকমান মারফূ‘, যেমন জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন:
" كُنَّا نَعْزِلُ وَالْقُرْآنُ يَنْزِلُ "
“আমরা আযল করতাম, আর কুরআন নাযিল হত”। তারা কুরআন নাযিলের যুগে আযল করত, কুরআন তাদেরকে আযল থেকে নিষেধ করেনি, হারাম হলে অবশ্যই কুরআন তাদেরকে নিষেধ করত, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করা হত, কারণ আল্লাহ হারামের উপর নীরবতা অবলম্বন করেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿يَسۡتَخۡفُونَ مِنَ ٱلنَّاسِ وَلَا يَسۡتَخۡفُونَ مِنَ ٱللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمۡ إِذۡ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرۡضَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡلِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِمَا يَعۡمَلُونَ مُحِيطًا ١٠٨﴾ [النساء : ١٠٨]
“তারা মানুষের কাছ থেকে লুকাতে চায়, আর আল্লাহর কাছ থেকে লুকাতে চায় না। অথচ তিনি তাদের সাথেই থাকেন যখন তারা রাতে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পছন্দ করেন না। আর তারা যা করে আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন”।
আয়াতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রাতের আধারে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পরামর্শ করেছে, যা কেউ জানত না, তবে তাদের কর্ম ছিল আল্লাহর অপছন্দনীয়, তাই তিনি তাদের নিন্দাজ্ঞাপন করেছেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে নবী যুগের আমল, যার উপর আল্লাহ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি বৈধ, তবে সরাসরি মারফূ‘ নয়, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোচরে হয়নি।
কতক আলেম বলেন: এরূপ হাদিস হুকমান মারফূ‘ নয়, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবগতিতে হয়নি, তবে দলিল হিসেবে গণ্য, কারণ আল্লাহ তাদের সমর্থন করেছেন।
দুই. কোনো সাহাবির বলা যে, “এরূপ করা সুন্নত”, অথবা “এরূপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে”, অথবা “এ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে”, অথবা “অমুককে এরূপ আদেশ করা হয়েছে”, অথবা “আমাদের জন্য এটা হালাল ও ওটা হারাম করা হয়েছে” ইত্যাদি হুকমান মারফূ‘। কারণ, নির্দেশ দাতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হালাল ও হারামকারী তিনি, সুন্নত দ্বারা তার সুন্নতই উদ্দেশ্য। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
" مِنَ السُّنَّةِ: إِذَا تَزَوَّجَ الرَّجُلُ الْبِكْرَ عَلَى الثَّيِّبِ أَقَامَ عِنْدَهَا سَبْعًا، وَقَسَمَ وَإِذَا تَزَوَّجَ الثَّيِّبَ عَلَى الْبِكْرِ أَقَامَ عِنْدَهَا ثَلَاثًا، ثُمَّ قَسَمَ ".
“সুন্নত হচ্ছে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি যদি কুমারী নারী বিয়ে করে, তাহলে তার নিকট সাত দিন অবস্থান করবে। অতঃপর বারি বণ্টন করবে। আর যখন কুমারী নারীর উপর বিধবা নারীকে বিয়ে করে, তাহলে তার নিকট তিন দিন অবস্থান করবে, অতঃপর বারি বণ্টন করবে”। এখানে সুন্নত অর্থ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। অনুরূপ ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেন:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ رضي الله عنه قَالَ: أُمِرْنَا أَنْ نَقْرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَمَا تَيَسَّرَ.
আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদেরকে নির্দেশ করা হয়েছে, আমরা যেন সূরা ফাতেহা এবং যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করি”। এখানে নির্দেশদাতা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তিন. সাহাবি যদি এমন বিষয়ে সংবাদ দেয়, যাতে ইজতিহাদ ও নিজস্ব মত প্রকাশের সুযোগ নেই, যা দেখে ধারণা হয় তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনে বলেছেন, তাহলে সাহাবির এ জাতীয় সংবাদ হুকমান মারফূ‘, যদি কিতাবি তথা ইয়াহূদী ও নাসারাদের থেকে সংবাদ গ্রহণ করার অভ্যাস তার না থাকে। উদাহরণত কোনো সাহাবি সৃষ্টির সূচনা, অথবা নবী ও পূর্ববর্তী উম্মত সম্পর্কে সংবাদ দিল, অথবা যুদ্ধ-বিগ্রহ, ফেতনা, কিয়ামতের আলামত ও কিয়ামতের অবস্থা সম্পর্কে ভবিষ্যৎ সংবাদ দিল, অথবা কোনো আমলের নির্দিষ্ট সওয়াব অথবা নির্দিষ্ট শাস্তির বর্ণনা দিল, যেখানে গবেষণার সুযোগ নেই, অথবা কঠিন শব্দের ব্যাখ্যা দিল অথবা অপরিচিত শব্দের বিশ্লেষণ করল, যা সাধারণ অর্থের বিপরীত ইত্যাদি হুকমান মারফূ‘। যেমন ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন:
“আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: প্রতি জুমায় [সপ্তাহে] বান্দার আমল দু’বার পেশ করা হয়: সোমবার ও বৃহস্পতিবার। অতঃপর প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে ক্ষমা করা হয়, তবে সে বান্দা ব্যতীত যার মাঝে ও তার ভাইয়ের মাঝে বিদ্বেষ রয়েছে। বলা হয়: তাদেরকে ত্যাগ কর, যতক্ষণ না তারা সংশোধন করে নেয়”। অন্যত্র ইমাম মালিক বর্ণনা করেন:
أن أَبَا هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ: إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِي بِهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَرْفَعُهُ اللَّهُ بِهَا فِي الْجَنَّةِ.
“আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন: নিশ্চয় ব্যক্তি কতক শব্দ উচ্চারণ করে, যার কোনো পরোয়া সে করে না, অথচ তার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। আর ব্যক্তি কতক বাক্য উচ্চারণ করে, যার কোনো পরোয়া সে করে না, অথচ তার কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাতে উন্নীত করেন”। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّهُ قَالَ: (في وصف جهنم): أَتُرَوْنَهَا حَمْرَاءَ كَنَارِكُمْ هَذِهِ؟ لَهِيَ أَسْوَدُ مِنْ الْقَارِ.
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি [জাহান্নামের বর্ণনা সম্পর্কে] বলেন: “তোমরা কি জাহান্নামের আগুনকে তোমাদের এ আগুনের ন্যায় লাল মনে করছ? অথচ তা আলকাতরার চেয়ে কালো”।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর এসব বর্ণনা হুকমান মারফূ‘, কারণ এসব বিষয়ে গবেষণার কোনো সুযোগ নেই। অধিকন্তু ইমাম মুসলিম প্রথম হাদিস এবং ইমাম বুখারি দ্বিতীয় হাদিস স্পষ্ট মারফূ‘ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তৃতীয় হাদিস সম্পর্কে বাজি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: আবু হুরায়রার এ সংবাদ অহির উপর নির্ভরশীল, কারণ তার সর্ম্পক গায়েব ও অদৃশ্যের সাথে, তাই হুকমান মারফূ‘।
চার. হাদিস বর্ণনাকারী রাবি যদি সাহাবি সম্পর্কে বলেন:
يرفعه أو يَنْمِيه، أو يبلغ به النبي صلى الله عليه وسلم أو رواية.
তাহলে হুকমান মারফূ‘, যেমন ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন:
عن أنس رضي الله عنه يرفعه: «أَنَّ اللهَ يَقُولُ لِأَهْوَنِ أَهْلِ النَّارِ عَذَاباً: لَوْ أَنَّ لَكَ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ كُنْتَ تَفْتَدِي بِهِ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: فَقَدْ سَأَلْتُكَ مَا هُوَ أَهْوَنُ مِنْ هَذَا وَأَنْتَ فِي صُلْبِ آدَمَ ؛ أَنْ لاَ تُشْرِكَ بِي، فَأَبَيْتَ إِلاَّ الشِّرْكَ».
আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি মারফূ‘ বর্ণনা করেন: “আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের সবচেয়ে কম শাস্তি ভোগকারীকে বলবেন: যদি তোমার দুনিয়া ভর্তি সম্পদ হয়, তুমি কি সেগুলো ফিদিয়া [মুক্তিপণ] হিসেবে প্রদান করবে? সে বলবে: হ্যাঁ, তিনি বলবেন: আমি তোমার নিকট এর চেয়ে নগন্য বস্তু চেয়েছিলাম, যখন তুমি আদমের পৃষ্ঠদেশে ছিলে, যে আমার সাথে শরীক কর না। কিন্তু তুমি শির্ক ব্যতীত ক্ষান্ত হওনি”। এতে يرفعه শব্দ হুকমান মারফূ‘র নিদর্শন। ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
عن أبي هريرة رضي الله عنه رواية: «الْفِطْرَةُ خَمْسٌ أَوْ خَمْسٌ مِنَ الْفِطْرَةِ: الْخِتَانُ، وَالاسْتِحْدَادُ، وَنَتْفُ الْإِبْطِ، وَتَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ».
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: “স্বভাব পাঁচটি, অথবা পাঁচটি স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত: খৎনা করানো, নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা ও মোচ ছোট করা”। এতে رواية শব্দ হুকমান মারফূ‘র নির্দশন।
পাঁচ. শানে নুযূল সংক্রান্ত সাহাবির সংবাদ হুকমান মারফূ‘। কারণ, অহি ও কুরআন নাযিল প্রত্যক্ষকারী সাহাবি কোনো আয়াত সম্পর্কে যখন বলেন, এ আয়াত অমুক ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, তখন তিনি ঘটনাটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের সাথে সম্পৃক্ত করলেন, অতএব হুকমান মারফূ‘। অনুরূপ সাহাবি যদি কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করেন, যাতে ইজতেহাদের সুযোগ নেই, অথবা যার সাথে শব্দের অর্থ সম্পৃক্ত নয়, তাহলে তা হুকমান মারফূ‘। এ তাফসির তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণ করেছেন, যেমন ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন:
عن ابن عباس رضي الله عنهم قال: كَانَ أَهْلُ الْيَمَنِ يَحُجُّونَ وَلاَ يَتَزَوَّدُونَ وَيَقُولُونَ: نَحْنُ الْمُتَوَكِّلُونَ، فَإِذَا قَدِمُوا مَكَّةَ سَأَلُوا النَّاسَ، فَأَنْزَلَ اللهُ تَعَالَى: (وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى).
ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “ইয়ামান বাসীরা হজ করত কিন্তু খাদ্য-সামগ্রী বহন করে আনত না, তারা বলত: আমরা ভরসাকারী। অতঃপর মক্কায় পৌঁছে মানুষের নিকট ভিক্ষা করত, তাই আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন:
﴿ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيۡرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقۡوَىٰۖ ١٩٧ ﴾ [البقرة: ١٩٧]
“তোমরা সামগ্রী বহন কর, কারণ তাকওয়া সর্বোত্তম সামগ্রী”। অপর জায়গায় বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ আবু ইসহাক শায়বানি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “আমি ‘যির’কে আল্লাহর বাণী :
﴿فَكَانَ قَابَ قَوۡسَيۡنِ أَوۡ أَدۡنَىٰ ٩ فَأَوۡحَىٰٓ إِلَىٰ عَبۡدِهِۦ مَآ أَوۡحَىٰ ١٠﴾ [النجم:٩، ١٠]
সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি বলেন: আমাদেরকে ইব্ন মাসউদ বলেছেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আলাইহিস সালামকে দেখেছেন, তার ছয়শ পাখা রয়েছে”। ইব্ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ব্যাখ্যা আরবির কোনো নিয়মে পড়ে না, তাতে গবেষণারও সুযোগ নেই, অতএব তিনি এ তাফসির নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছেন, তাই হুকমান মারফূ‘।
ছয়. নির্দিষ্ট কোনো কর্ম সম্পর্কে সাহাবি যদি বলেন, “এতে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য রয়েছে”, অথবা বলেন “এ কাজ আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানি”, তাহলে হুকমান মারফূ‘। কারণ, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরূপ শুনেছেন। উদাহরণত ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
عن أبي هريرة رضي الله عنه أنه كان يقول: «شَرُّ الطَّعَامِ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ، يُدْعَى لَهَا الْأَغْنِيَاءُ وَيُتْرَكُ الْفُقَرَاءُ، وَمَنْ تَرَكَ الدَّعْوَةَ فَقَدْ عَصَى اللهَ تَعَالَى وَرَسُولَهُ صلى الله عليه وسلم».
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন: “সবচেয়ে খারাপ খানা ওলীমার খানা, যেখানে ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় কিন্তু গরিবদের দাওয়াত দেওয়া হয় না। আর যে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল, সে আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানী করল”।
জান্নাত, জাহান্নাম, অতীত, ভবিষ্যৎ ও ইজতিহাদ চলে না বিষয়ে সংবাদদাতা সাহাবি যদি বনু ইসরাইল থেকে জ্ঞানার্জন করে প্রসিদ্ধ হন, তাহলে তার সংবাদ হুকমান মারফূ‘ হবে না। কারণ, হয়তো তিনি সংবাদটি তাদের থেকে গ্রহণ করেছেন, যেমন ইয়ারমুকের যুদ্ধে রূমী ও অন্যান্য কিতাবিদের রেখে যাওয়া অনেক কিতাব আব্দুল্লাহ ইব্ন আমর ইব্নুল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সংগ্রহ করেছেন, তখন এর অনুমতি ছিল।
কোনো তাবে‘ঈর বলা: ‘এটা সুন্নত’:
কেউ বলেছেন: কোনো তাবে‘ঈ যদি বলেন: ‘এটা সুন্নত’ তাহলে মাওকুফ গণ্য হবে, মারফূ‘ নয়। কারণ, তাবে‘ঈ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ পাননি, তাই তার সুন্নত বলার অর্থ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত নয়, বরং সাহাবিদের সুন্নত, অতএব মাওকুফ।
কেউ বলেছেন: কোনো তাবে‘ঈ যদি বলেন: ‘এটা সুন্নত’ তাহলে হুকমান মারফূ‘ হবে। তাদের সুন্নত বলার অর্থ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত, তবে তাদের এ কথা এক হিসেবে মুরসাল ও অপর হিসেবে মুনকাতি‘, কারণ সনদে সাহাবির উল্লেখ নেই।
মোদ্দাকথা: কোনো তাবে‘ঈর ‘এটা সুন্নত’ বলা যদি হুকমান মারফূ‘ মানি তাহলে মুরসাল, যা একপ্রকার দুর্বল হাদিস, কারণ সনদ মুত্তাসিল নয়, তাই তার সাথে মুরসাল হাদিসের ব্যাবহার করা হবে। আর তাবে‘ঈর ‘এটা সুন্নত’ বলা যদি মাওকুফ মানি তাহলে সাহাবির কথা বা কর্ম হয়। সাহাবির কথা বা কর্মের হুকুম ‘মাওকুফে’র বর্ণনায় আসছে।
হাদিসে কুদসি
যেসব হাদিস আল্লাহ তা‘আলার সাথে সম্পৃক্ত করা হয় তাই হাদিসে কুদসি। হাদিসে কুদসিকে হাদিসে ইলাহি, অথবা হাদিসুর রাব্বানি ইত্যাদি বলা হয়। কারণ, এসব হাদিসের সর্বশেষ স্তর আল্লাহ তা‘আলা। লেখক এ প্রকার বর্ণনা করেননি, সম্পূরক হিসেবে আমরা তার আলোচনা করছি।
قُدُس শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্র। تقديس শব্দের অর্থ আল্লাহর পবিত্রতা। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَنَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَۖ ٣٠ ﴾ [البقرة: ٣٠]
“আমরা আপনার প্রশংসার তসবিহ পাঠ করি ও আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি”। আল্লাহর এক নামقُدُّوس অর্থ পবিত্র অথবা বরকতময় অথবা তিনি পবিত্র বৈপরীত্য, সমকক্ষ ও সৃষ্টিজীবের সাদৃশ্য থেকে। البيت المقدَّس অর্থ ‘শির্ক থেকে পবিত্র ঘর’। হাদিসে কুদসি যেহেতু মহান আল্লাহর পবিত্র সত্ত্বার সাথে সম্পৃক্ত, তাই এ প্রকার হাদিসকে الحـديث القُـــدُسي বলা হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনুল কারিম ব্যতীত যে হাদিস তার রবের পক্ষ থেকে সরাসরি বর্ণনা করেন, অথবা জিবরীলের মাধ্যমে তার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন তাই হাদিসে কুদসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু সংবাদ দিচ্ছেন, তাই এ প্রকারকে হাদিস বলা হয়। আল্লাহ তা‘আলার সাথে সম্পৃক্ত করা হয় হিসেবে কুদসি বলা হয়।
হাদিসে কুদসির ভাবার্থ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এতে কারো দ্বিমত নেই, তবে তার শব্দ প্রসঙ্গে ইখতিলাফ রয়েছে:
একদল আলেম বলেন: আল্লাহ তা‘আলা ইলহাম অথবা ঘুম অথবা জিবরীল ‘আলাইহিস সালামের মাধ্যমে হাদিসে কুদসির ভাবার্থ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অহি করেন, তবে তার শব্দ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে। শুধু কুরআনুল কারিম শব্দসহ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে, যার তিলাওয়াত করে আমরা তার ইবাদত আঞ্জাম দেই।
অপরদল আলেম বলেন, হাদীসে কুদসির ভাবার্থ ও শব্দ সবই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কুরআন ব্যতীতও কথা বলেন। তবে এটি মু‘জিয বা অপারগকারী হিসেবে আল্লাহ নাযিল করেন নি, কিংবা এর মত আনার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জও দেন নি। তাছাড়া এর তেলাওয়াতের মাধ্যমে সালাত আদায়ের বিষয়টিও নেই। এ অভিমতই বিশুদ্ধ।
কুরআনুল কারিম ও হাদিসে কুদসির পার্থক্য:
১. কুরআনুল কারিমের শব্দ ও অর্থ জিবরীলের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে জাগ্রত অবস্থায় নাযিল করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِنَّهُۥ لَتَنزِيلُ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٩٢ نَزَلَ بِهِ ٱلرُّوحُ ٱلۡأَمِينُ ١٩٣ عَلَىٰ قَلۡبِكَ لِتَكُونَ مِنَ ٱلۡمُنذِرِينَ ١٩٤ بِلِسَانٍ عَرَبِيّٖ مُّبِينٖ ١٩٥ ﴾ [الشعراء : ١٩٢، ١٩٥]
“আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়”। তাই কুরআনুল কারিমের ভাবার্থ বর্ণনা করা বৈধ নয়, তার শব্দ মুজিযা, হ্রাস ও বৃদ্ধি থেকে সুরক্ষিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]
“নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হিফাজতকারী”। অন্যত্র ইরশাদ করেন:
﴿ قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨ ﴾ [الاسراء: ٨٨]
“বল, ‘যদি মানুষ ও জিন এ কুরআনের অনুরূপ হাযির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাযির করতে পারবে না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়’। হাদিসে কুদসির এসব বৈশিষ্ট্য নেই, হাদিসে কুদসির ভাবার্থ বর্ণনা করা বৈধ।
২. সালাতে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা ফরয, সক্ষম ব্যক্তির কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত ব্যতীত সালাত শুদ্ধ হবে না। পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসি সালাতে পড়া নিষেধ, কুরআনের পরিবর্তে তার দ্বারা সালাত শুদ্ধ হবে না।
৩. কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা ইবাদত। প্রত্যেক শব্দের দশগুণ সাওয়াব। জমহুর আলেমের নিকট নাপাক ব্যক্তির জন্য কুরআন স্পর্শ করা বৈধ নয়, যেমন তিলাওয়াত বৈধ নয়। পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসি তিলাওয়াত করে ইবাদত আঞ্জাম দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, তার সাওয়াব কুরআনের সমপরিমাণ নয় এবং নাপাক ব্যক্তির পক্ষে হাদিসে কুদসি স্পর্শ করা কিংবা তিলাওয়াত করা হারাম নয়।
৪. কুরআনুল কারিমের শব্দ, বাক্য ও ক্রম বিন্যাস আমাদের নিকট মুতাওয়াতির পদ্ধতিতে পৌঁছেছে। কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং সূরা ফাতেহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত দুই মলাটের মাঝে সংরক্ষিত। কুরআন অস্বীকারকারী কাফের, তার তিলাওয়াত ও শিক্ষার জন্য সনদ প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসি আমাদের নিকট পৌঁছেছে কখনও একক সংবাদের ভিত্তিতে আবার কখনও মুতাওয়াতির হিসেবে। মুতাওয়াতির না হলে প্রমাণিত নয় মনে করার কারণে তার অস্বীকারকারীকে কাফের বলা যায় না। তার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার জন্য সনদ দেখা প্রয়োজন। তবে হাদীসে কুদসির বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে সেটা অস্বীকারকারীও কাফের হয়ে যাবে।
৫. আল্লাহ ব্যতীত কারো সাথে কুরআন সম্পৃক্ত করা বৈধ নয়। কুরআনের একটি বাক্য কিংবা বাক্যাংশকে আয়াত বলা হয়। কয়েকটি আয়াতের সমষ্টিকে সূরা বলা হয়, যা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্ধারিত। পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসি এরূপ নয়, বরং হাদিসে কুদসিকে: হাদিসে কুদসি, হাদিসে ইলাহি ও হাদিসে রাব্বানি বলা হয়। হাদিসে কুদসিকে কখনো নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, কারণ তিনি স্বীয় রবের পক্ষ থেকে তা বলেছেন, তাই মুহাদ্দিসগণ হাদিসে কুদসিকে হাদিসে নববির অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
হাদিসে কুদসি ও হাদিসে নববির পার্থক্য:
১. হাদিসে কুদসি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট অহি: স্পষ্ট অহি, যেমন জিবরীলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদিস; অস্পষ্ট অহি, যেমন ঘুম বা প্রত্যাদেশ যোগে প্রাপ্ত হাদিস। পক্ষান্তরে হাদিসে নববি কতক অহি ও কতক নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজতিহাদ, তার ইজতিহাদ অহি। কারণ, তার ইজতিহাদ ভুল হলে আল্লাহ সংশোধন করে দেন, ভুলের উপর তাকে স্থির রাখেন না।
২. হাদিসে কুদসি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে বলেন, কিন্তু হাদিসে নববি তিনি নিজের পক্ষ থেকে সরাসরি বলেন।
৩. হাদিসে কুদসিতে সাধারণত আল্লাহ তা‘আলার পবিত্রতা, গুণগান, কুদরত, রহমত, মাগফেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও পাপ থেকে সতর্ককারী বিষয়ের আধিক্য থাকে। পক্ষান্তরে হাদিসে নববিতে অধিকহারে মুসলিমের দীনি ও দুনিয়াবি বিষয়ের বর্ণনা থাকে।
হাদিসে কুদসির কতক নিদর্শন:
১. রাবি বর্ণনা করার সময় বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যেমন ইমাম আহমদ ও নাসায়ি সহি সনদে বর্ণনা করেন:
عَنْ ابْنِ عُمَرَ رضي الله عنهم عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِيمَا يَحْكِيهِ عَنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ: «أَيُّمَا عَبْدٍ مِنْ عِبَادِي خَرَجَ مُجَاهِدًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي ضَمِنْتُ لَهُ أَنْ أَرْجِعَهُ إِنْ أَرْجَعْتُهُ بِمَا أَصَابَ مِنْ أَجْرٍ أَوْ غَنِيمَةٍ، وَإِنْ قَبَضْتُهُ غَفَرْتُ لَهُ وَرَحِمْتُهُ».
ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন , আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আমার বান্দাদের থেকে যে আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ হিসেবে বের হয়, আমি তার জিম্মাদার। যদি আমি তাকে ফিরিয়ে দেই, প্রতিদান অথবা গণিমতসহ ফিরিয়ে দেব। আর আমি যদি তাকে গ্রহণ করি, তাকে ক্ষমা করে দিব ও তার উপর রহম করব”।
২. রাবি বর্ণনা করার সময় বলবেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ..., অথবা রাবি বলবেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমাদের রব বলেছেন: ..., যেমন ইমাম বুখারি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে বর্ণনা করেন:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «قَالَ اللَّهُ: إِذَا أَحَبَّ عَبْدِي لِقَائِي أَحْبَبْتُ لِقَاءَهُ، وَإِذَا كَرِهَ لِقَائِي كَرِهْتُ لِقَاءَهُ».
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: আমার বান্দা যখন আমার সাক্ষাত পছন্দ করে আমি তার সাক্ষাত পছন্দ করি। আর যখন সে আমার সাক্ষাত অপছন্দ করে আমি তার সাক্ষাত অপছন্দ করি”।
৩. কখনো রাবি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন’, অতঃপর হাদিসে কুদসি উল্লেখ করেন, কিন্তু আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করেন না, যেমন বুখারি বর্ণনা করেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : «لَا يَأْتِ ابْنَ آدَمَ النَّذْرُ بِشَيْءٍ لَمْ يَكُنْ قَدْ قَدَّرْتُهُ، وَلَكِنْ يُلْقِيهِ الْقَدَرُ وَقَدْ قَدَّرْتُهُ لَهُ، أَسْتَخْرِجُ بِهِ مِنْ الْبَخِيلِ».
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: “বনু আদমের নিকট মান্নত এমন কিছু নিয়ে আসে না যা আমি তার জন্য নির্ধারণ করিনি। বস্তুত আমি তার জন্য তা নির্ধারণ করে রেখেছি, আর তকদীর তার সাথে সাক্ষাত করে। আমি মান্নত দ্বারা কৃপণ থেকে বের করি”।
৪. কখনো কখনো হাদিসে কুদসিকে হাদিসে নববির অংশ হিসেবে বর্ণিত হয়, যদিও হাদিসে কুদসির অংশ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথক করেন না, তবে অগ্র-পশ্চাৎ থেকে আল্লাহর কথা স্পষ্ট হয়, যেমন ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তাকে দ্রুত প্রতিদান প্রদান করেন, যে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছে, যাকে আমার প্রতি ঈমান ও আমার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস ব্যতীত কোন বস্তু বের করেনি। আমি অবশ্যই তাকে প্রত্যাবর্তন করাব তার প্রাপ্ত সাওয়াব অথবা গণিমতসহ, অথবা আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাব। যদি এমন না হত যে, আমি আমার উম্মতের উপর কঠিন করে ফেলব, কোনো যুদ্ধ থেকে আমি পশ্চাতে থাকতাম না। আমি অবশ্যই চাই যে, আমি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হই, অতঃপর আমাকে জীবিত করা হোক, অতঃপর আমি শহীদ হই, অতঃপর আমাকে জীবিত করা হোক, অতঃপর আমি শহীদ হই”। এ হাদিসে:
«لَا يُخْرِجُهُ إِلَّا إِيمَانٌ بِي وَتَصْدِيقٌ بِرُسُلِي أَنْ أُرْجِعَهُ بِمَا نَالَ مِنْ أَجْرٍ أَوْ غَنِيمَةٍ أَوْ أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ»
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী নয়, বরং আল্লাহ তা‘আলার বাণী। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও পৃথক করে বলেননি, তবে অর্থ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট।
মোদ্দাকথা: একটি হাদিস কখনো সম্পূর্ণ রূপে হাদিসে কুদসি হয়, কখনো আংশিক হাদিসে কুদসি হয়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো হাদিসে কুদসি স্পষ্ট বলেন, কখনো স্পষ্ট বলেন না, বরং বাক্য থেকে বুঝা যায়।
হাদিসে কুদসির হুকুম: হাদিসে কুদসি হাদিসে নববির ন্যায় সহি, হাসান ও দুর্বল বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়। অতএব হাদিসে কুদসি বলা কিংবা তার উপর আমল করার পূর্বে শুদ্ধাশুদ্ধ যাচাই করা জরুরি।
হাদিসে কুদসির উপর লিখিত গ্রন্থসমূহ:
হাদিস রচনার স্বর্ণযুগে স্বতন্ত্রভাবে কেউ হাদিসে কুদসি লিপিবদ্ধ করেননি। তারা হাদিসের উপর লিখিত গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন অধ্যায়ের অধীন হাদিসে কুদসি লিপিবদ্ধ করেছেন। পরবর্তী যুগে কতক আলেম হাদিসে কুদসি স্বতন্ত্র কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন, যেমন:
১. আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্ন আলি ইব্ন আল-আরাবি আত-ত্বায়ি (মৃ.৬৩৮হি.), তার রচিত গ্রন্থের নাম: مشكاة الأنوار فيما روي عن الله سبحانه من الأخبار
২. আল্লামা নুরুদ্দিন আলি ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন সুলতান (মৃ.১০১৪হি.), যিনি ‘মোল্লা আলি আল-কারি’ নামে প্রসিদ্ধ, তিনি হাদিসের ছয় কিতাব থেকে চল্লিশটি হাদিসে কুদসি একসাথে জমা করেছেন এবং প্রত্যেক হাদিসের সূত্র উল্লেখ করেছেন। তার রচিত কিতাবের নাম: الأحاديث القدسية الأربعينية
৩. শায়খ মুহাম্মদ ইব্ন সালেহ আল-মাদানি (মৃ.১২০০হি.) হাদিসে কুদসির উপর সর্ববৃহৎ কিতাব লিখেন, তার কিতাবের নাম: الإتحافات السنية في الأحاديث القدسية
এতে তিনি (৮৬৪)টি হাদিসে কুদসি জমা করেন, যার অধিকাংশ তিনি ইমাম সূয়ূতি রচিত جمع الجوامع গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৪. لجنة القرآن الكريم والحديث بالمجلس الأعلى للشؤون الإسلامية بمصر
কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে একদল লেখক হাদিসের ছয় কিতাব ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক থেকে (৪০০)টি হাদিসে কুদসি বাছাই করেন, তাতে টিকা সংযোজন করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা যুক্ত করেন, তাদের রচিত কিতাবের নাম: الأحاديث القدسية
৫. শায়খ মুস্তফা আদাবি (১৮৫)টি সহি ও হাসান হাদিসে কুদসি জমা
মাকতু‘ হাদিস
লেখক হাদিসের প্রকার উল্লেখ করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি। মারফূ‘র পর দ্বিতীয় পর্যায়ে মাওকুফের আলোচনা করা যথাযথ ছিল, কারণ মাকতু‘র সম্পর্ক তাবে‘ঈর সাথে, মাওকুফের সম্পর্ক সাহাবির সাথে। তাই এ প্রকার পড়ার পূর্বে ১৫-নং পঙক্তি থেকে মাওকুফ পড়ে নেওয়া উত্তম।
مقْطوعُ এর আভিধানিক অর্থ কর্তিত, বলা হয়, العضو المقطوع ‘কর্তিত বা বিচ্ছিন্ন অঙ্গ’। এ থেকে তাবে‘ঈদের কথা ও কর্মকে মাকতু‘ বলা হয়, কারণ তাদের বাণী ও কর্ম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের কথা ও কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন।
‘মাকতু’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “তাবে‘ঈর সাথে সম্পৃক্ত কথা ও কর্মকে মাকতু‘ বলা হয়”। তাবে‘ঈর কথা ও কর্মে যদি মারফূ‘ বা মাওকুফের আলামত থাকে, তাহলে হুকমান মারফূ‘ বা মাওকুফ হবে, যেমন তাবে‘ঈ বললেন: من السنة كذا ‘এটা সুন্নত’। এ প্রসঙ্গে হুকমান মারফূ‘র অধীনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
লেখক রাহিমাহুল্লাহর নিকট তাবে‘ঈর সমর্থন মাকতু‘ কিনা স্পষ্ট নয়, প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত কারো সমর্থন বা নীরবতা দলিল নয়, বিশেষ করে তাবে‘ঈর সমর্থন বা নীরবতা, তাই সেগুলো মাকতু‘ নয়। উসুলে হাদিসের গ্রন্থসমূহে তাবে‘ঈর কথা বা কর্মকে মাকতু‘ বলা হয়, তবে বারদীজী, শাফে‘ঈ, তাবরানি, হুমাইদি ও দারাকুতনি প্রমুখ ইমামগণ মাকতু‘কে মুনকাতি‘ বলেছেন।
তাবে‘ঈর সংজ্ঞা: সাহাবির সাক্ষাত লাভকারী তাবে‘ঈ, যদিও তার সাহচর্য গ্রহণ না করেন। অধিকাংশ ইমাম এ মত গ্রহণ করেছেন। কারো নিকট তাবে‘ঈর জন্য সাহাবির সাক্ষাত ও সাহচর্য গ্রহণ করা জরুরি। সাহাবির সাক্ষাত লাভের সময় তাবে‘ঈর ঈমান শর্ত নয়, কাফের অবস্থায় সাহাবিকে দেখে ঈমান গ্রহণ করলে তাবে‘ঈ হবে। অনুরূপ তাবে‘ঈর জন্য সাহাবি থেকে শ্রবণ করা কিংবা তাকে দেখার সময় সাবালক হওয়া জরুরি নয়, সাক্ষাতের সময় তার মধ্যে ভালো-মন্দের জ্ঞান থাকা যথেষ্ট। শিশুর সাক্ষাত তাবে‘ঈ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, তবে সাহাবি হওয়ার জন্য যথেষ্ট, যদিও তাদের বর্ণনা মুরসাল।
মাকতু‘ ও মুনকাতি‘ এর মধ্যে পার্থক্য:
১. তাবে‘ঈর কথা ও কর্মকে মাকতু‘ বলা হয়, আর সনদ থেকে একজন রাবি বা বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক রাবি বাদ পড়লে মুনকাতি‘ বলা হয়।
২. ‘মাকতু’র সম্পর্ক মতনের সাথে, ‘মুনকাতি‘’র সম্পর্ক সনদের সাথে। অতএব উভয় এক নয়।
৩. মুনকাতি‘ এর সম্পর্ক করা হয় রাসূলের সাথে, পক্ষান্তরে মাকতূ‘ এর সম্পর্ক করা হয় তাবে‘ঈ এর সাথে।
৪. সনদ তাবে‘ঈ পর্যন্ত মিলিত থাকলেও সেটি মাকতু‘, পক্ষান্তেরে মুনকাতে‘ অর্থই হচ্ছে সনদ কর্তিত বা মিলিত নয়।
জ্ঞাতব্য: মাকতু‘ মুত্তাসিল হলেও অধিকাংশ মুহাদ্দিস মাকতু‘ মুত্তাসিল বলতে বারণ করেন। কারণ, মাকতু অর্থ কর্তিত আর মুত্তাসিল অর্থ মিলিত, এক হাদিসকে মাকতু‘ ও মুত্তাসিল বলা মানে দুই বিপরীত বস্তুকে এক জায়গায় জমা করা, যা ভাষাগত দিক থেকে শ্রুতিকটু ও বেমানান, তাই এ জাতীয় ব্যবহার পরিহার করা শ্রেয়, তবে নির্দিষ্টভাবে কারো সাথে সম্পৃক্ত করে বলা যায়, যেমন: "هذا متصل إلى سعيد بن المسيب" এ মাকতু‘ সায়িদ ইব্ন মুসাইয়্যেব পর্যন্ত মুত্তাসিল।
মাকতু সংরক্ষণ করার উপকারিতা:
১- কখনো তাবে‘ঈর কথা বা কর্ম দ্বারা মারফূ‘ হাদিসের ইল্লত জানা যায়, যেমন কোনো হাদিস এক সনদে মারফূ‘ ও অপর সনদে মাকতু‘ বর্ণিত, তবে মারফূ‘ অপেক্ষা মাকতুর সনদ অধিক বিশুদ্ধ, তখন মাকতু‘র কারণে মারফূ‘ মু‘আল্ হবে।
২- তাবে‘ঈর বাণী কখনো হুকমান মারফূ‘ হয়, যেমন কোনো তাবে‘ঈ বলল: “এরূপ করা সুন্নত”; অথবা বললেন: “আমাদেরকে এরূপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে”, অথবা কোনো গায়েবি বিষয়ে সংবাদ দিলেন, যেখানে গবেষণার সুযোগ নেই। তাদের এ জাতীয় সংবাদ মারফূ‘ মুরসাল, যা ‘শাহিদ’ দ্বারা শক্তিশালী হয়ে মাকবুল পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়। কেউ তাবে‘ঈর এ জাতীয় সংবাদকে মাওকুফ বলেন; মাওকুফ কখনো দলিল হয়, সামনে তার বর্ণনা আসছে।
৩- সাহাবিদের ন্যায় তাবে‘ঈগণ আমাদের আদর্শ পুরুষ, আমরা তাদের অনুসরণ করে কুরআন ও সুন্নাহ বুঝি। অতএব কারো কথা ও ইজতিহাদ কোনো তাবে‘ঈর কথা ও ইজতিহাদের ন্যায় হলে ইজতিহাদ মজবুত হয় যে, অমুক তাবে‘ঈ তার মত বলেছেন। যার কথা ও ইজতিহাদ আদর্শ পুরুষদের কথা ও ইজতিহাদের মত নয়, আমরা সেগুলো প্রত্যাখ্যান করব।
৪- তাবে‘ঈদের বাণী ও কর্ম সংরক্ষণ করার ফলে তাদের ইখতিলাফ তথা মতপার্থক্য ও ইত্তিফাক তথা মতৈক্য জানা যায়। আমরা তাদের ইত্তিফাক থেকে বের হব না, আর তাদের ইখতিলাফের ক্ষেত্রে দলিল ও উসুলের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ অভিমত গ্রহণ করব। নতুন কোনো মত সৃষ্টি করব না এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হব না।
৫- তাবে‘ঈদের ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) থেকে মুজতাহিদ সঠিক মত গ্রহণ করতে সক্ষম হন। কোনো মুজতাহিদ কোনো তাবে‘ঈর মত গ্রহণ করে জমহুর বা একাধিক আলেমের বিপরীত অবস্থান নিলে তাকে কাফের, ফাসেক বা গোমরাহ বলা যাবে না, কারণ তার স্বপক্ষে তাবে‘ঈ রয়েছে এবং বিষয়টি ইজতিহাদ ও গবেষণাধর্মী। শায়খুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ এ জাতীয় অনেক ইখতিলাফ করেছেন।
৬- কখনো মাকতু দ্বারা মারফূ‘র অর্থ জানা যায়।
জ্ঞাতব্য: ইমাম যারকাশি রাহিমাহুল্লাহ্ মাকতু‘কে হাদিসের প্রকার বলার ব্যাপারে আপত্তি করেছেন। তিনি বলেন: মাকতু‘কে হাদিস বলা ভুল, কারণ তাবে‘ঈর বাণী ও মাযহাব হাদিস নয়।
তার আপত্তির উত্তর: একটি হাদিস মারফূ‘ ও মাকতু উভয় সনদে বর্ণিত হলে শক্তিশালী সনদের ভিত্তিতে ফয়সালা করা হয়, যদি মাকতু‘কে হাদিসের প্রকার হিসেবে সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে এটা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত তাবে‘ঈর কতক বাণী মারফূ‘র হুকুম রাখে, এ হিসেবে মাকতু‘কে হাদিসের প্রকার গণ্য করা যথাযথ। এ বিষয়টি যারকাশি নিজেও স্বীকার করেছেন। তৃতীয়ত অনেক মুহাদ্দিস এ প্রকারকে হাদিস বলেছেন, তাই তাকে হাদিস গণ্য করা যথাযথ”।

©somewhere in net ltd.