নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি (৪১ : ৩৩)

ইসলাম হাউস

তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।

ইসলাম হাউস › বিস্তারিত পোস্টঃ

হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি ২

২৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ দুপুর ২:৫৩

মুসনাদ হাদিস

رَاوِيهِ حَتَّى الْمُصْطَفَى وَلَمْ يَبِنْ
وَالْمُسْنَدُ الْمُتَّصِلُ الإسْنادِ مِنْ

“মুসনাদ”: যার সনদ রাবি থেকে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত এবং কোথাও বিচ্ছেদ ঘটেনি”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ষষ্ঠ প্রকার মুসনাদ।
‏مسْنَدُ‏ কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ সম্পৃক্ত ও মিলিত বস্তু। إسناد ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য থেকে উদ্‌গত। إسناد الشيء إلى الشيء অর্থ এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করা। এ থেকে রাবি বা গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত হাদিসকে ‘মুসনাদ’ বলা হয়।
কেউ বলেন: سند ধাতু থেকে مسند উদ্‌গত। سند শব্দের অর্থ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উঁচু ভূমি। রাবি বা গ্রন্থকার যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদকে নিয়ে যান, তখন তিনি সনদকে উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন, তাই তার বর্ণিত হাদিসকে মুসনাদ বলা হয়। রাবিকে বলা হয় مسنِد "بكسر النون" আর গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত রাবিদের দীর্ঘ পরম্পরাকে বলা হয় সনদ।
আরবদের প্রবাদ فلان سنَد ‘অমুক ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য’ থেকেও ‏‏مسْنَدُ‏ উদ্‌গত হতে পারে। এ থেকে সনদের পরম্পরায় বাতলানো মতনকে মুসনাদ বলা হয়। কারণ, মতনের শুদ্ধতার জন্য মুহাদ্দিসগণ সনদের উপর নির্ভর করেন।
‏‏ُمسْنَدُ‏ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “রাবি থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত হাদিস মুসনাদ, যার সনদে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো ছেদ বা ইনকিতা‘ নেই”। এটাই অধিকাংশ আলেমের সংজ্ঞা। এখানে رَاويهِ দ্বারা উদ্দেশ্য হাদিস লিপিবদ্ধকারী গ্রন্থকার, যেমন বুখারি, মুসলিম প্রমুখগণ, সনদের যে কোনো রাবি নয়।
মুসনাদের দু’টি শর্ত:
১. মারফূ‘: মুসনাদ হওয়ার জন্য হাদীসটি মারফূ‘ তথা হাদীসের মূল বক্তব্য (মতন) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হওয়া জরুরি। অতএব মাওকুফ ও মাকতু‘ মুসনাদ নয়। কারণ, ‘মাওকুফে’র শেষ প্রান্ত সাহাবি, মাকতু‘র শেষ প্রান্ত তাবে‘ঈ।
২. মুত্তাসিল: মুসনাদ হওয়ার জন্য সনদ মুত্তাসিল হওয়া জরুরি। অতএব মুরসাল, মুনকাতি‘, মু‘দ্বাল, মু‘আল্লাক ও মুদাল্লাস মুসনাদ নয়। কারণ, এগুলোর সনদ মুত্তাসিল নয়।
মারফূ‘ ও মুত্তাসিলের সমন্বয়ে মুসনাদ হয়। মারফূ‘র সম্পর্ক মতনের সাথে, অর্থাৎ সনদ মুত্তাসিল হোক বা মুনকাতি‘ হোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কর্মকে মারফূ‘ বলা হয়, পক্ষান্তরে মুত্তাসিলের সম্পর্ক সনদের সাথে, মতন মারফূ‘ হোক বা মাওকুফ হোক। অতএব আপনি যখন বললেন: هذا حديث مسند তার অর্থ ‘এ হাদিস মারফূ‘ ও মুত্তাসিল’, এতে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো ইনকিতা‘ নেই। এ বাক্য هذا حديث متصل مرفوع থেকে অধিক শক্তিশালী, কারণ এতে স্পষ্ট ইনকিতা‘ না থাকলেও অস্পষ্ট ইনকিতা‘ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কেউ বলেন: মুসনাদ অর্থ আরো ব্যাপক, তাদের নিকট বক্তার সাথে সম্পৃক্ত হাদিস মুসনাদ। তারা মুসনাদের আভিধানিক অর্থকে প্রাধান্য দেন। আভিধানিক অর্থানুসারে এক বস্তুর সাথে মিলিত অপর বস্তুকে মুসনাদ বলা হয়। এ সংজ্ঞা মতে মারফূ‘, মাওকুফ ও মাকতু‘ মুসনাদের অন্তর্ভুক্ত, সনদ মুত্তাসিল হোক বা মুনকাতি‘ হোক। কারণ, হাদিসের এসব প্রকার হয় মুস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত, বা সাহাবির সাথে সম্পৃক্ত বা তাবে‘ঈ ও তাদের পরবর্তী কোনো মনীষীর সাথে সম্পৃক্ত। আভিধানিক অর্থানুসারে এ সংজ্ঞা অধিক যুক্তিসংগত, তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত হাদিসকে মুসনাদ বলেন।

মুত্তাসিল হাদিস

إسْنادُهُ لِلْمُصْطَفَى فَالْمُتَّصِلْ
وَما بِسَمْعِ كُلِّ راوٍ يَتَّصِلْ

“আর যে হাদিসের সনদ প্রত্যেক রাবির শ্রুতি দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সংযুক্ত তাই মুত্তাসিল”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের সপ্তম প্রকার মুত্তাসিল।
متَّصِلْ‏ এর আভিধানিক অর্থ মিলিত। এক বস্তুর সাথে মিলিত অপর বস্তুকে মুত্তাসিল বলা হয়।
মুত্তাসিলের পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “যে হাদিসের সনদ প্রত্যেক রাবির শ্রুতি দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত তাই মুত্তাসিল। লেখক মুত্তাসিলের দু’টি শর্ত বলেছেন: ১. প্রত্যেক রাবির শ্রবণ করা। ২. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদ সংযুক্ত হওয়া।
১. লেখক রাহিমাহুল্লাহর সংজ্ঞানুসারে মুত্তাসিল হাদিসে প্রত্যেক রাবির স্বীয় শায়খ থেকে শ্রবণ করা জরুরি। অতএব সনদের কোনো স্তরের রাবি যদি তার শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে স্পষ্ট না বলে, বা শ্রবণ করেছে বুঝায় এমন শব্দ প্রয়োগ না করে, তাহলে হাদিস মুত্তাসিল হবে না।
মুত্তাসিলের জন্য নির্দিষ্ট হাদিস শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে প্রমাণিত হওয়া জরুরি নয়, বরং কতক হাদিস শ্রবণ করেছে প্রমাণিত হলে সকল হাদিস মুত্তাসিল হবে। কারো সম্পর্কে যদি জানা যায় যে, তিনি অমুক শায়খ থেকে শুধু একটি হাদিস শ্রবণ করেছেন, অথবা অমুক অমুক হাদিস শ্রবণ করেছেন, সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হাদিস ব্যতীত অন্যান্য হাদিস মুত্তাসিল হবে না।
রাবি ও তার শায়খের মাঝে ইত্তেসাল জানার পদ্ধতি আমরা সহি হাদিসের প্রথম শর্তে আলোচনা করেছি।
২. মুত্তাসিলের দ্বিতীয় শর্ত সনদের পরম্পরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত থাকা। অতএব মাওকুফ ও মাকতু‘ লেখকের নিকট মুত্তাসিল নয়। অনুরূপ মারফূ‘ হাদিসের সনদে বিচ্ছেদ হলে মুত্তাসিল নয়।
জ্ঞাতব্য: লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ মুত্তাসিল হওয়ার জন্য মারফূ‘ হওয়ার শর্তারোপ করেছেন, তাই মাওকুফ ও মাকতু‘র সনদ মুত্তাসিল হলেও মুত্তাসিল হবে না। এ শর্তারোপ করে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ মুসনাদ ও মুত্তাসিল এক করে ফেলেছেন, উভয় সংজ্ঞায় কোনো পার্থক্য করেননি, তাই এতে তার বিচ্যুতি ঘটেছে। শায়খ আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ তার পঙক্তির শুদ্ধরূপ দিয়েছেন এভাবে:
وما بسمع كل راو يتصل = إسناده للمنتهى فالمتصل
“আর যে হাদিসের সনদ প্রত্যেক রাবির শ্রুতি দ্বারা শেষ পর্যন্ত মিলিত তাই মুত্তাসিল”। এ সংজ্ঞা মোতাবেক মাওকুফ ও মাকতু‘ মুত্তাসিল, যদি সনদে ইনকিতা‘ না থাকে। অতএব সকল প্রকার মুনকাতি‘ মুত্তাসিলের সংজ্ঞা থেকে খারিজ হল। সনদের শেষ দ্বারা উদ্দেশ্য মারফূ‘ ও মাওকুফের শেষ প্রান্ত। এ দু’প্রকার মুত্তাসিল হয়, মাকতু‘ মুত্তাসিল হয় না, মুত্তাসিল হলেও আহলে ইলম তাকে মুত্তাসিল বলেন না, তবে একান্ত প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট করে বলেন:"متصل الإسناد إلى الزهري" ‘যুহরি পর্যন্ত সনদ মুত্তাসিল’। কিন্তু নির্দিষ্ট করা ব্যতীত "مقطوع متصل" কেউ বলেন না, কারণ মাকতু‘ অর্থ বিচ্ছিন্ন, মুত্তাসিল অর্থ মিলিত, এক হাদিসকে মাকতু‘ মুত্তাসিল বলা হলে দুই বিপরীত বস্তুকে একস্থানে একত্র করা হয়, যা ভাষাগত দিক থেকে দোষণীয়। এ সম্পর্কে মাকতু‘র স্থানে আলোচনা করেছি।


মুসালসাল হাদিস

مِثْلُ أما وَاللهِ أنْباني الفَتى
مُسَلْسَلٌ قُلْ ما على وَصْفٍ أتى

أوْ بَعْدَ أنْ حَدَّثَني تَبَسَّما
كَذَاكَ قَدْ حَدَّثَنِيهِ قائما

‘মুসালসাল’ বল সে হাদিসকে, যে হাদিস একই বিশেষণে এসেছে, যেমন আল্লাহর শপথ আমাকে শায়খ বলেছেন। অনুরূপ তিনি আমাকে দাঁড়িয়ে বলেছেন, অথবা আমাকে বর্ণনার পর তিনি হেসেছেন’।
অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের অষ্টম প্রকার মুসালসাল। মুসালসালের সম্পর্ক সনদ ও মতন উভয়ের সাথে।
مُسَلْسَلٌ এর আভিধানিক অর্থ পরম্পরাযুক্ত। বলা হয়: فُلَانٌ سَلْسَلَ الأَشْيَاءَ ‘অমুক ব্যক্তি বস্তুসমূহকে একটির সাথে অপরটি সংযুক্ত করেছে বা ক্রমানুসারে শিকলে গেঁথেছে’। এ থেকে একাধিক রাবি হাদিসের সনদ বা মতনে ক্রমান্বয়ে একই পদ্ধতি অনুসরণ করলে মুসালসাল বলা হয়।
‏‏‘মুসালসালে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: ‘যে হাদিসের সনদ বা মতন এক স্তরের সকল রাবি অভিন্ন শব্দ বা অভিন্ন হালতে বর্ণনা করে তাই মুসালসাল’। যেমন কোনো সনদে এক স্তরের সকল রাবি বললেন: أنْبأنِي فُلَانٌ (প্রথম শায়খ), তিনি বললেন: أنْبأنِي فُلَانٌ (দ্বিতীয় শায়খ), এভাবে (তৃতীয় শায়খ) বললেন। এখানে সনদটি أنْبأنِي দ্বারা মুসালসাল হয়েছে।
কখনো রাবিদের অবস্থা মুসালসাল হয়, যেমন সনদের প্রথম রাবি বলল: حدثني فلان قائماً ‘অমুক শায়খ আমাকে দাঁড়িয়ে বলেছে, দ্বিতীয় রাবি বলল: حدثني فلان قائماً এভাবে তৃতীয়, চতুর্থ ও সর্বশেষ রাবি বলল, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বলেছেন।
অথবা প্রত্যেক রাবি বললেন, হাদিস বর্ণনা শেষে আমার শায়খ হেসেছেন। যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে সহবাসকারী ব্যক্তিকে কাফফারা আদায়ের জন্য সদকা দিলেন, অতঃপর লোকটি বলল:
«أَعَلَى أَفْقَرَ مِنِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَوَاللَّهِ مَا بَيْنَ لَابَتَيْهَا يُرِيدُ الْحَرَّتَيْنِ أَهْلُ بَيْتٍ أَفْقَرُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي، فَضَحِكَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ، ثُمَّ قَالَ: أَطْعِمْهُ أَهْلَكَ»
“হে আল্লাহর রাসূল, আমার চেয়ে গরিব কাউকে কাফফারা দিব? আল্লাহর কসম মদিনার দু’প্রান্তের মাঝে আমার চেয়ে গরিব কেউ নেই, ফলে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন যে, তার মাড়ির দাঁত পর্যন্ত বেড়িয়েছিল। অতঃপর তিনি বলেন: তোমার পরিবারকে তা খেতে দাও”। সেই থেকে প্রত্যেক রাবি এ হাদিস বর্ণনা শেষে হাসেন। এটা রাবির অবস্থার মুসালসাল।
লেখক মুসালসালের তিনটি উদাহরণ দিয়েছেন, একটি সনদের মুসালসাল, দু’টি রাবির অবস্থার মুসালসাল। তিনি মতনের মুসালসাল উল্লেখ করেননি। সম্পূরক হিসেবে আমরা মতনের মুসালসাল উল্লেখ করছি। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয ইব্‌ন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলেন:
«يَا مُعَاذُ، وَاللَّهِ إِنِّي لَأُحِبُّكَ، وَاللَّهِ إِنِّي لَأُحِبُّكَ، فَقَالَ: أُوصِيكَ يَا مُعَاذُ لَا تَدَعَنَّ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ تَقُولُ: اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ»
“হে মু‘আয, আল্লাহর শপথ আমি তোমাকে মহব্বত করি, আল্লাহর শপথ আমি তোমাকে মহব্বত করি, অতঃপর তিনি বলেন: হে মু‘আয আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি প্রত্যেক সালাতের পর কখনো বলা ত্যাগ করবে না:
«اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ»
‘হে আল্লাহ তুমি আমাকে সাহায্য কর তোমার যিকিরের উপর [মৌখিক ইবাদত], তোমার শুকুরের উপর [শারীরিক ইবাদত] এবং ইহসানের সাথে তোমার [ফরয] ইবাদত আদায়ের উপর”। মু‘আয স্বীয় ছাত্র সুনাবিহিকে রাসূলের ন্যায় অসিয়ত করেন, তিনি স্বীয় ছাত্র আবু আব্দুর রহমানকে মু‘আযের ন্যায় অসিয়ত করেছেন। এখানে হাদিসের মতনে মুসালসাল হয়েছে, কারণ প্রত্যেক শায়খ স্বীয় ছাত্রকে বলেছেন:وأنا أحبُّك আমিও তোমাকে মহব্বত করি।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, মুসালসাল প্রথমত দু’প্রকার: ১. রাবির অবস্থার মুসালসাল, ও ২. বর্ণনা পদ্ধতির মুসালসাল। বর্ণনা পদ্ধতির মুসালসাল কখনো হয় সনদে, কখনো হয় মতনে।
ইমাম নববি রাহিমাহুল্লাহ্ মুসালসালের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন:
"هو ما تتابع رجال إسناده على صفة أو حالة للرواة تارة، وللرواية تارة أخرى"
“যে হাদিসের সনদের রাবিগণ কোনো বিশেষণ অথবা রাবিদের বিশেষ অবস্থা কিংবা বর্ণনার বিশেষ পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে বজায় রাখেন তাই মুসালসাল”। ইমাম নববির সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট যে, মুসালসাল হাদিসের রাবিগণ বিশেষ বিশেষণ অথবা রাবিদের বিশেষ অবস্থা অথবা বর্ণনার বিশেষ পদ্ধতি সকল স্তরে রক্ষা করবেন, তবে কতক মুসালসাল রয়েছে, যার সকল স্তরে পরম্পরা রক্ষা হয়নি। তাই ইব্‌নু দাকিকিল ‘ঈদ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন:
"وهو ماكان إسناده على صفة واحدة في طبقاته، فتارة يكون في جميعها، كما إذا كان كله بصيغة: سمعت فلانا يقول، إلى آخره، وتارة يكون في أكثره، مثل الحديث المسلسل بقولهم: (وهو أول حديث سمعته منه ..." الاقتراح: (صـ214)
“যে হাদিসের সনদ একাধিক স্তরে বিশেষ পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়, কখনো বিশেষ পদ্ধতি বহাল থাকে সকল স্তরে, যেমন সনদের প্রত্যেক রাবি বলল: سمعت فلانا يقول কখনো বহাল থাকে অধিকাংশ স্তরে, যেমন وهو أول حديث سمعته منه পদ্ধতিতে বর্ণিত হাদিস। ইমাম সুয়ূতি جياد المسلسلات গ্রন্থে বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنِي بِهِ أَبُو هُرَيْرَةَ بْنُ الْمُلَقِّنِ، مِنْ لَفْظِهِ، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا جَدِّي، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الْفَتْح الْمَيْدُومِيُّ، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الْفَرَجِ الْحَرَّانِيُّ، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الْفَرَجِ بْنُ الْجَوْزِيِّ وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو سَعْدٍ إِسْمَاعِيلُ بْنُ أَبِي صَالِحٍ النَّيْسَابُورِيُّ، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنِي وَالِدِي، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو طَاهِرِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ مَحْمِشٍ الزِّيَادِيُّ، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو حَامِدِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ بِلَالٍ البَزَّازُ، وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ بِشْرٍ بن الْحَكَم وَهُوَ أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْهُ. قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، وهو أَوَّلُ حَدِيثٍ سَمِعْتُهُ مِنْ سُفْيَانَ. عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنْ أَبِي قَابُوسٍ، مَوْلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمُكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ».
ইমাম বায়হাকি রাহিমাহুল্লাহর বর্ণনায় এ হাদিস মুসালসাল নয়:
أَخْبَرَنَا أَبُو طَاهِرٍ الْفَقِيهُ، أنبأ أَبُو حَامِدِ بْنُ بِلالٍ، ثنا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ بِشْرِ بْنِ الْحَكَمِ بْنِ حَبِيبِ بْنِ مِهْرَانَ الْعَبْدِيُّ، ثنا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنْ أَبِي قَابُوسَ، مَوْلًى لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ»
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: দয়াশলীদের উপর রহমান দয়া করেন। জমিনে যে আছে তাকে তোমরা রহম কর, আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে রহম করবেন”।
সহি মুসালসালের উপকারিতা:
১. মুসালসাল হাদিস রাবির অধিক দ্বাবত ও স্মৃতি শক্তির প্রমাণ বহন করে, কারণ শায়খের অবস্থা, বর্ণনা পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার সংবাদ দেওয়া প্রমাণ করে রাবি শায়খকে যথাযথ অনুসরণ করেছেন।
২. কতক মুসালসাল প্রমাণ করে সনদে ইনকিতা‘ ও তাদলিস নেই, যা উসুলে হাদিসের প্রধান উদ্দেশ্য, যেমন "حدثني وأخبرني" দ্বারা মুসালসাল সনদ ইনকিতা‘ ও তাদলিসের সম্ভাবনামুক্ত, যদি অন্যান্য দোষ তাতে না থাকে।
৩. হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “হাফেযে হাদিস ও হাদিসের ইমামদের দ্বারা বর্ণিত মুসালসাল অপর হাদিস অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী”।
৪. মুসালসাল হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা ও কথার অনুসরণ থাকে, যা অন্যান্য হাদিসে থাকে না।
জ্ঞাতব্য: মুসালসাল হলে হাদিস সহি হওয়া জরুরি নয়। মুসালসাল সহি, হাসান ও দুর্বল সকল প্রকার হতে পারে, বরং আহলে ইলম বলেছেন অধিকাংশ মুসালসাল দুর্বল। হাফেয যাহাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেছেন: “প্রায় সকল মুসালসাল বানোয়াট, রাবিদের মিথ্যাচারের কারণে অধিকাংশ মুসালসাল বাতিল। তবে সূরা সাফ পাঠ করার মুসালসাল, দামেস্কি রাবিদের মুসালসাল, মিসরি রাবিদের মুসালসাল ও মুহাম্মদ নামক রাবিদের মুসালসাল অধিক শক্তিশালী”।
ইব্‌নুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “দুর্বল অর্থ মুসালসাল হাদিসের মতন দুর্বল নয়, বরং মুসালসাল পদ্ধতি দুর্বল। মতন সহি ও দুর্বল উভয় হতে পারে”।
মুসালসাল হাদিসে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল রাবির পরম্পরা জরুরি নয়, কোনো এক স্তরে একাধিক রাবির পরম্পরাকে মুসালসাল বলা হয়, তবে মুসালসাল হাদিসে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরম্পরা থাকা স্বাভাবিক। ইতোপূর্বে ইব্‌ন তাকিকুল ঈদ রাহিমাহুল্লাহর সংজ্ঞা থেকে জেনেছি, পরম্পরা কখনো হয় সকল স্তরে, কখনো হয় কতক স্তরে।


আযিয ও মাশহূর হাদিস

مَشْهُورُ مَرْوِيْ فَوْقَ ما ثَلاثَهْ
عَزِيزُ مَرْوِيْ اثْنَيْنِ أوْ ثَلاثَهْ

“আযিয”: দুই অথবা তিনজন রাবির বর্ণিত হাদিস। আর “মাশহূর” তিনের অধিক রাবির বর্ণিত হাদিস”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের নবম ও দশম প্রকার আযিয ও মাশহূর।
এখান থেকে লেখক রাবির সংখ্যা অনুসারে হাদিসকে ভাগ করছেন। রাবির সংখ্যা অনুসারে হাদিস দু’প্রকার: মুতাওয়াতির ও আহাদ বা খবরে ওয়াহেদ। খবরে ওয়াহেদ তিন প্রকার: ১. গরিব, ২. আযিয, ৩. মাশহূর বা মুস্তাফিধ। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ এখানেও বর্ণনার ধারাক্রম রক্ষা করেননি। ১৬-পঙক্তির দ্বিতীয়াংশে তিনি গরিব বর্ণনা করেছেন। মুতাওয়াতির হাদিস তিনি বর্ণনা করেননি। আমরা প্রথমে আযিয ও মাশহূর বর্ণনা করব অতঃপর সম্পূরক হিসেবে মুতাওয়াতির বর্ণনা করব।

عزيز শব্দ عز থেকে সংগৃহীত, আভিধানিক অর্থ শক্তিশালী। কেউ শক্তিশালী হলে বলা হয়: عَزَّ فُلانٌ একজন রাবির কোনো সংবাদ দেওয়ার পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় রাবি একই সংবাদ দিলে সংবাদটি ‘আযিয’ বা শক্তিশালী হয়। সংবাদদাতার সংখ্যা বেশী হলে সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এ থেকে দু’জন বা তিনজন রাবির বর্ণিত হাদিসকে ‘আযিয’ বলা হয়।
‘আযিয’-র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘দু’জন অথবা তিনজন রাবির বর্ণিত হাদিস আযিয’। সনদের কোনো স্তরে যদি দু’জন অথবা তিনজন রাবি থাকে, অন্যান্য স্তরে রাবির সংখ্যা দুই বা দু’য়ের অধিক থাকলে হাদিস আযিয। রাবির সংখ্যা দু’জন শর্তারোপের ফলে গরিব থেকে পৃথক হল, কারণ ‘গরিব’-এ সর্বনিম্ন রাবির সংখ্যা একজন।

লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ أوْ ثَلاثهْ বলে আযিযের দ্বিতীয় প্রকার বর্ণনা করেছেন। হাদিসের সনদে কোনো স্তরে রাবির সংখ্যা তিনজন হলে আযিয। কারণ দ্বিতীয় দু’টি সংবাদের ফলে প্রথম সংবাদ শক্তিশালী হয়, তাই আযিয বলা হয়, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে তিনজন রাবির বর্ণিত হাদিস মাশহূর।
লেখক আযিযের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে অধিকাংশ মুহাদ্দিসের খিলাফ করেছেন, তাদের নিকট সনদের কোনো স্তরে সর্বনিম্ন দু’জন রাবি হলে আযিয, আর তিনজন রাবি হলে মাশহূর।
হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ ‘নুখবায়’ বলেন: ‘দু’জন রাবির বর্ণিত হাদিস আযিয, তিনজন বা তার চেয়ে অধিক রাবির বর্ণিত হাদিস মাশহূর ও একজন রাবির বর্ণিত হাদিস গরিব’। এ সংজ্ঞা অধিকাংশ মুহাদ্দিসের নিকট পছন্দনীয়। ‘আযিযে’র উদাহরণ:
قال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ، عَنِ الْأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَن رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ»
وقال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: حَدَّثَنَا ابْنُ عُلَيَّةَ، عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ صُهَيْبٍ، عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وحَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»

ইমাম বুখারি উক্ত হাদিস দু’জন সাহাবি: আবু হুরায়রা ও আনাস ইব্‌ন মালিক থেকে দু’টি সনদে বর্ণনা করেন। তাই এতে সাহাবির স্তরে দু’জন রাবি বিদ্যমান। অতঃপর আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে দু’জন তাবে‘ঈ বর্ণনা করেন: কাতাদাহ ও আব্দুল আযিয ইব্‌ন সুহাইব। অতএব তাবে‘ঈর স্তরে দু’জন রাবি বিদ্যমান। অতঃপর কাতাদাহ থেকে দু’জন রাবি বর্ণনা করেন: শু‘বা ও সায়িদ ইব্‌ন আবি ‘আরুবাহ। আবার আব্দুল আযিয থেকে দু’জন রাবি বর্ণনা করেন: ইসমাইল ইব্‌ন ‘উলাইয়্যাহ ও আব্দুল ওয়ারেস ইব্‌ন সায়িদ। অতঃপর তাদের প্রত্যেকের থেকে একদল রাবি বর্ণনা করেন।
যাকারিয়া আনসারি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘একটি হাদিস একসাথে আযিয ও মাশহূর উভয় হতে পারে, যেমন:
«نَحْنُ الْآخِرُونَ السَّابِقُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“আমরা পরবর্তী কিন্তু কিয়ামতের দিন অগ্রবর্তী”। এ হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’জন সাহাবি: হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন”। অতএব সাহাবিদের স্তরে এ হাদিস আযিয, অবশ্য পরবর্তীতে মাশহূর হয়েছে ।
বাইকুনির ব্যাখ্যাকার আবুল হাসান সুলাইমানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আমার নিকট আযিয হওয়ার জন্য সাহাবির স্তরেও দু’জন থাকা জরুরি। কেউ বলতে পারেন: সকল সাহাবি আদিল, অতএব তাদের ক্ষেত্রে সংখ্যার হিসেবে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর: এ শর্ত হাদিস গ্রহণ কিংবা বর্জন করা হিসেবে নয়, বরং আমাদের নিকট হাদিস পৌঁছার সনদের হিসেবে, কোন সনদে পৌঁছল, রাবির সংখ্যা কত ও কিভাবে পৌঁছল ইত্যাদি। তাই এ প্রকার কখনো সহি ও কখনো দুর্বল হয়। সাহাবিদের পরবর্তী স্তরে রাবিদের সংখ্যা হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য দেখা হয় না, কারণ একটি হাদিস কখনো দু’জন সেকাহ রাবি বর্ণনা করেন, কখনো দু’জন দুর্বল রাবি বর্ণনা করেন, আবার কখনো দু’জন মাতরুক রাবি বর্ণনা করেন। সংখ্যার দৃষ্টিকোন থেকে বর্ণনাকারী দু’জন হলেই আযিয। এটা শুধু পরিভাষা।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ আযিযের জন্য মারফূ‘ হওয়া শর্তারোপ করেননি, শুধু দু’জন রাবি হওয়া শর্তারোপ করেছেন, তাই মারফূ‘, মাওকুফ ও মাকতু‘ সবগুলোতেই আযিয হতে পারে।
কেউ বলেন: সহি হাদিসের জন্য দু’জন রাবি কর্তৃক বর্ণিত তথা আযিয হওয়া জরুরি, কারণ সাক্ষীর ন্যূনতম সংখ্যা দু’জন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী সাক্ষীর চেয়ে কম মর্যাদার নয়, তাই তাতেও দু’জন সাক্ষী প্রয়োজন।
এ কথা সঠিক নয়, কারণ সাক্ষীর সাথে হাদিসের তুলনা খাটে না। হাদিস বলা ও সাক্ষ্য দেওয়া এক নয়। হাদিস দীনি বিষয়, তার জন্য একজন রাবিই যথেষ্ট, যেমন একজন মুয়াজ্জিনের উপর নির্ভর করে মুসলিমগণ ইফতার করে। অতএব দীনি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য একজন রাবি যথেষ্ট। তার প্রমাণ নিয়তের হাদিস:
«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ»
“সকল আমল নিয়তের সাথে গ্রহণযোগ্য, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যা সে নিয়ত করেছে। অতএব যার হিজরত দুনিয়ার প্রতি, যা সে উপার্জন করবে, অথবা নারীর প্রতি, যাকে সে বিয়ে করবে, তাহলে তার হিজরত সে জন্য হবে, যার প্রতি সে হিজরত করেছে”।
সকল আলেম এ হাদিস গ্রহণ করেছেন, অথচ সাহাবি থেকে পরবর্তী তিনস্তর পর্যন্ত একজন করে রাবি, তবে সবাই সেকাহ। অতএব সহি হওয়ার জন্য আযিয হওয়া জরুরি নয়।
আযিযের হুকুম: সহি, হাসান ও দুর্বল সকল প্রকার হতে পারে।


মাশহূর হাদিস
‏"مَشْهورٌ‏"‏ এর আভিধানিক অর্থ প্রসিদ্ধ।
‘মাশহূর’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “তিন থেকে অধিক রাবির বর্ণিত হাদিস মাশহূর”। এ সংজ্ঞা অধিকাংশ মুহাদ্দিসের সংজ্ঞার খিলাফ।
অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে ‘তিন বা তার চেয়ে অধিক রাবির বর্ণিত হাদিস মাশহূর, যদি মুতাওয়াতির পর্যায়ে না পৌঁছে’। এ সংজ্ঞা অধিক বিশুদ্ধ, তবে উভয় সংজ্ঞা মোতাবেক মাশহূরের প্রসিদ্ধি মুতাওয়াতির পর্যন্ত না হওয়া জরুরি।
মানুষের শ্রেণীভাগ হিসেবে মাশহূর প্রধানত দু’প্রকার: ক. সাধারণের নিকট মাশহূর ও খ. আলেমদের নিকট মাশহূর।
ক. সাধারণের নিকট হাদিস মাশহূর হওয়ার কোনো মূল্য নেই। তাদের নিকট অনেক জাল হাদিসও মাশহূর, যেমন:
‏«حُبُّ الْوَطَنِ مِنَ الإِيمَانِ»
“দেশ প্রেম ঈমানের অংশ”।
সাধারণ লোকেরা এ হাদিসকে সহি হিসেবে জানে, অথচ সহি নয়। তার অর্থও ভুল, কারণ দেশপ্রেম গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতা। তাই তাদের নিকট মাশহূর হাদিস মূল্যহীন। এ প্রকার হাদিসের উপর অনেক মুহাদ্দিস স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন, যেমন:
‏"‏تمييز الطيب من الخبيث فيما يدور على ألسنة الناس من الحديث"‏‏.
"المقاصد الحسنة في الأحاديث المشتهرة"‏
"كشف الخفا ومزيل الألباس فيما اشتهر من الأحاديث في ألسنة الناس"
খ. আলেমদের শ্রেণীভাগ হিসেবে তাদের নিকট প্রসিদ্ধ হাদিস বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়: মুহাদ্দিসদের নিকট মাশহূর, ফকিহদের নিকট মাশহূর, ভাষাবিদদের নিকট মাশহূর ইত্যাদি।
আলেমদের নিকট মাশহূর হাদিস কেউ দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন, যদিও বিনা সনদে হয়। তারা বলেন: আলেমদের নিকট কোনো হাদিস মাশহূর হওয়া, তার উপর তাদের আমল করা ও তাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা প্রমাণ করে তার শক্তিশালী ভিত্তি অবশ্যই আছে। যেমন,
«لَا يُقَادُ الْوَالِدُ بِالْوَلَدِ»
“সন্তানের কারণে পিতা থেকে কিসাস নেওয়া হবে না”। এ হাদিস আলেমদের নিকট মাশহূর, তাই অনেকে গ্রহণ করেছেন।
কেউ বলেন: আলেমদের নিকট মাশহূর হাদিস গ্রহণীয় নয়।
কেউ ব্যাখ্যা দেন: আলেমদের নিকট মাশহূর হাদিস কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হলে গ্রহণীয়, অন্যথায় পরিত্যাজ্য। এ মত সঠিক। কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী হলে পরিত্যাজ্য, যেমন:
«لَا يُقَادُ الْوَالِدُ بِالْوَلَدِ»
“সন্তানের কারণে পিতা থেকে কিসাস নেয়া হবে না”। এ হাদিস কুরআন বিরোধী। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
﴿ وَكَتَبۡنَا عَلَيۡهِمۡ فِيهَآ أَنَّ ٱلنَّفۡسَ بِٱلنَّفۡسِ وَٱلۡعَيۡنَ بِٱلۡعَيۡنِ وَٱلۡأَنفَ بِٱلۡأَنفِ وَٱلۡأُذُنَ بِٱلۡأُذُنِ وَٱلسِّنَّ بِٱلسِّنِّ وَٱلۡجُرُوحَ قِصَاصٞۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِۦ فَهُوَ كَفَّارَةٞ لَّهُۥۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [المائ‍دة: ٤٥]
“আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি ‎‎যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, ‎নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও ‎‎দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে ‎সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে ‎‎দেবে, তার জন্য তা কাফফারা হবে। আর আল্লাহ ‎যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা ‎করবে না, তারাই যালিম”। এ আয়াতে কিসাস থেকে পিতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلۡقِصَاصُ فِي ٱلۡقَتۡلَىۖ ٱلۡحُرُّ بِٱلۡحُرِّ وَٱلۡعَبۡدُ بِٱلۡعَبۡدِ وَٱلۡأُنثَىٰ بِٱلۡأُنثَىٰۚ فَمَنۡ عُفِيَ لَهُۥ مِنۡ أَخِيهِ شَيۡءٞ فَٱتِّبَاعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيۡهِ بِإِحۡسَٰنٖۗ ذَٰلِكَ تَخۡفِيفٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَرَحۡمَةٞۗ فَمَنِ ٱعۡتَدَىٰ بَعۡدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٞ ١٧٨ ﴾ [البقرة: ١٧٨]
“হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ‎উপর ‘কিসাস’ ফরয করা হয়েছে। স্বাধীনের ‎বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর ‎বদলে নারী। তবে যাকে কিছুটা ক্ষমা করা ‎হবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে, তাহলে ‎সততার অনুসরণ করবে এবং সুন্দরভাবে ‎তাকে আদায় করে দেবে। এটি তোমাদের ‎রবের পক্ষ থেকে হালকাকরণ ও রহমত। ‎সুতরাং এরপর যে সীমালঙ্ঘন করবে, তার ‎জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব”।
এ হাদিস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত অপর সহি হাদিসেরও বিপরীত, যেমন:
«لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: زِنًا بَعْدَ إِحْصَانٍ، أَوِ ارْتِدَادٍ بَعْدَ إِسْلَامٍ، أَوْ قَتْلِ نَفْسٍ بِغَيْرِ حَقٍّ، فَقُتِلَ بِهِ»
“তিনটি অপরাধের কোন একটি ব্যতীত মুসলিমের রক্ত হালাল নয়: বিবাহের পর যেনা করা, অথবা ইসলামের পর মুরতাদ হওয়া, অথবা কাউকে বিনা অপরাধে হত্যা করা, এর বিনিময়ে হত্যা করা হবে”। এখানেও কিসাস থেকে পিতাকে মুক্ত রাখা হয়নি। অতএব মাশহূর হাদিস কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী তাই গ্রহণীয় নয়।

মুতাওয়াতির হাদিস
متواتر শব্দের উৎপত্তি تواتر ধাতু থেকে। আভিধানিক অর্থ تتابع বা লাগাতার, যেমন বলা হয়: تواتر المطر ‘লাগাতার বৃষ্টি হয়েছে’। অনুরূপ বলা হয়: تواتر المصلون إلى المسجد ‘লাগাতার মুসল্লি মসজিদে এসেছে’। এ থেকে লাগাতার অগণিত মানুষের বর্ণিত হাদিসকে মুতাওয়াতির বলা হয়।
متواتر এর পারিভাষিক সংজ্ঞা: “বৃহৎ জনসংখ্যার বর্ণিত হাদিস, মিথ্যার উপর যাদের একাট্টা হওয়া অসম্ভব, সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ সংখ্যা বিদ্যমান থাকলে হাদিসকে মুতাওয়াতির বলা হয়।”
‘মুতাওয়াতির’ হাদিস বর্ণনাকারী অনেক সাহাবি থাকা জরুরি, যাদের একাট্টা হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা রচনা করা অসম্ভব। হাদিসটি যদি বাণী হয়, তাহলে সবাই তাকে বলতে শুনেছেন; কর্ম হলে সবাই তাকে করতে দেখেছেন; অতঃপর একদল সাহাবি থেকে একদল তাবে‘ঈ বর্ণনা করেছেন; অতঃপর তাদের থেকে একদল অনুসারী বর্ণনা করেছেন; এভাবে হাদিসের বর্ণনাধারা গ্রহণযোগ্য কিতাবসমূহে লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত থাকা জরুরি। এ থেকে মুতাওয়াতির হাদিসের চারটি শর্ত পেলাম:
১. অধিক সংখ্যক সাহাবির বর্ণনা করা, যাদের সংখ্যা কোনো অবস্থায় চার থেকে কম নয়। তারা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। অতঃপর তাদের থেকে দ্বিতীয় এক জমাত শ্রবণ করেছে, অতঃপর তাদের থেকে তৃতীয় এক জমাত শ্রবণ করেছে, এভাবে সনদের প্রত্যেক স্তরে রাবির সংখ্যা অধিক থাকা জরুরি, যাদের নির্ভুলতা সম্পর্কে চূড়ান্ত জ্ঞান হাসিল হয়।
২. মুতাওয়াতির হাদিসে প্রত্যেক স্তরে রাবির সংখ্যা এতো পরিমাণ থাকা জরুরি যে, তাদের মিথ্যার উপর একাট্টা হওয়া বিবেক সমর্থন করে না, যেমন তারা সবাই সেকাহ ও তাদের আদালত সবার নিকট প্রসিদ্ধ, অথবা তারা বিভিন্ন দেশের, অথবা তারা বিভিন্ন মাযহাবের। এমন কোনো কারণ নেই, যার ভিত্তিতে তারা সবাই বিশেষ উদ্দেশ্যে একটি সংবাদ রচনা করবে। আবার হঠাৎ করে কিংবা অনিচ্ছায় তাদের সবার মিথ্যার উপর সমবেত হওয়া অসম্ভব ও অকল্পনীয়।
অতএব মুতাওয়াতির হাদিসে সংখ্যা বিবেচ্য নয়, তাদের মিথ্যার উপর একাট্টা সম্ভব নয় এরূপ হওয়া জরুরি। যদি চার ব্যক্তির মাঝে এ শর্ত পাওয়া যায়, তাহলে হাদিস মুতাওয়াতির, নচেৎ এক শো রাবির বর্ণিত সংবাদও মুতাওয়াতির নয়।
৩. মুতাওয়াতির হাদিসের বাহন মানুষ হওয়া জরুরি, যদি হাজারো জ্ঞানী দীর্ঘ গবেষণার পর বলে আল্লাহ এক, তাদের কথা মুতাওয়াতির হবে না, কারণ সেটা সংবাদ নয়।
৪. রাবিদের বর্ণিত হাদিস শ্রোতাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস ও অকাট্য জ্ঞানের জন্ম দিতে হবে, যা নির্দিষ্ট সংখ্যার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং কখনো হাসিল হয় সংখ্যার কারণে, কখনো হাসিল হয় রাবিদের বিশেষ গুণের কারণে, কখনো হাসিল হয় অন্যান্য নিদর্শন দ্বারা, কখনো হাসিল হয় উম্মতের সবার বিনা বাক্যে গ্রহণ করার ফলে।
মুতাওয়াতির দু’প্রকার:
১. শব্দের তাওয়াতুর: যে হাদিস সকল রাবি একই শব্দে বর্ণনা করেন, কতক শব্দ ব্যতিক্রম হলেও অর্থ পরিবর্তন হয় না, তাই শব্দের মুতাওয়াতির, যেমন:
«مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»
“আমার উপর যে মিথ্যা রচনা করল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”।
এ হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শত্তুর থেকে অধিক সাহাবি বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবিও রয়েছেন, তাদের থেকে ক্রমানুসারে বিরাট এক জমাত বর্ণনা করেছে। হাদিসের কোনো কিতাব পাওয়া যাবে না, যেখানে এ হাদিস নেই।
২. অর্থের তাওয়াতুর: অনেক রাবি কর্তৃক বর্ণিত বিভিন্ন বিষয় সম্বলিত প্রচুর হাদিস বিদ্যমান, যাদের মিথ্যার উপর একাট্টা হয়ে এসব হাদিস রচনা করা অসম্ভব, তাদের একটি হাদিসও অন্যান্য হাদিসের সাথে অর্থ ও শব্দের মিল না-থাকার করণে মুতাওয়াতির পর্যায়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তবে একটি বিষয় রয়েছে, যা প্রত্যেক হাদিসে বিদ্যমান, তাই সে বিষয়টি মুতাওয়াতির। যেমন দো‘আর সময় উভয় হাত উত্তোলন করার হাদিস। শতাধিক হাদিসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আর সময় উভয় হাত উত্তোলন করেছেন, প্রত্যেকটি হাদিস খবরে ওয়াহেদ, এক হাদিসে যে ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, অপর হাদিসে তার বর্ণনা নেই, তবে সব হাদিসে রয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আর সময় উভয় হাত উঠিয়েছেন। অতএব দো‘আর সময় উভয় হাত উঠানো মুতাওয়াতির বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। এটা অর্থগত মুতাওয়াতির।

মুতাওয়াতির হাদিসের হুকুম:
মুতাওয়াতির শাব্দিক হোক বা অর্থের দিক থেকে হোক, তার উপর আমল করা ওয়াজিব। মুতাওয়াতির হাদিস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে অকাট্যভাবে বিশ্বাস করা জরুরি। কুরআন অস্বীকার করা যেমন কুফরি, তেমনি যে মুতাওয়াতির হাদিস ও তার হুকুম জানে, তার পক্ষে মুতাওয়াতির হাদিস অস্বীকার করা কুফরি। কারণ, মুতাওয়াতির হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, অতএব যে মুতাওয়াতির প্রত্যাখ্যান করল, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর তার কথাকে নিক্ষেপ করল, অতএব তার কর্ম কুফরি। তবে যে ভুল ব্যাখ্যা করে, অথবা ভুল বুঝে অথবা মুতাওয়াতির হাদিস ও তার হুকুম সম্পর্কে জানে না, তার বিষয়টি ভিন্ন। সে কাফের হবে না, তবে তাকে বুঝানো ও সত্যের দিকে আহ্বান করা জরুরি।

মুতাওয়াতির হাদিসের উপর লিখিত কিতাব:
ক. হাফেয জালালুদ্দিন আবুল ফাদল আব্দুর রহমান ইব্‌ন আবু বকর আস-সুয়ূতি রচিত: ‘আল-ফাওয়ায়িদুল মুতাকাসিরাহ ফিল আখবারিল মুতাওয়াতিরাহ’।
খ. দ্বিতীয়বার তিনি এ কিতাবের সংক্ষেপ লিখেন: ‘আল-আযহারুল মুতানাসিরাহ ফিল আখবারিল মুতাওয়াতিরাহ’ নামে।
গ. অতঃপর তৃতীয়বার তিনি সংক্ষেপেরও সংক্ষেপ লিখেন: ‘কুতুফুল আযহার’ নামে।
২. আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন জাফর ইদরিসি আল-কাত্তানি রচিত: ‘নাযমুল মুতানাসিরাহ মিনাল হাদিসিল মুতাওয়াতিরাহ’।
৩. শায়খ আব্দুল আযিয গুমারি রচিত: "إتحاف ذوي الفضائل المشتهرة بما وقع من الزيادة على الأزهار المتناثرة في الأخبار المتواترة"


মু‘আন‘আন ও মুবহাম হাদিস

وَمُبْهَمٌ ما فِيهِ رَاوٍ لَمْ يُسَمْ
مُعَنْعَنٌ كَعَنْ سَعِيدٍ عَنْ كَرَمْ

‘মু‘আন‘আন’: যেমন সাঈদ বর্ণনা করেন ‘কারাম’ থেকে। আর যার সনদে রাবির নাম উল্লেখ করা হয়নি তাই ‘মুবহাম’। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের একাদশ ও দ্বাদশ প্রকার ‘মু‘আন‘আন’ ও ‘মুবহাম’। হাদিসের এ দু’প্রকারের সম্পর্ক সনদের সাথে।
‏معَنْعَنٌ‏ কর্মবাচক বিশেষ্য, যে বাক্যে অধিকহারে عَنْ শব্দ প্রয়োগ করা হয় ‘তাকে মু‘আন‘আন’ বলা হয়। এ থেকে ‘আন’ বিশিষ্ট্য সনদকে ‘মু‘আন‘আন’ বলা হয়।
‘মু‘আন‘আন’ প্রকারের ক্ষেত্রে লেখক শুধু উদাহরণ পেশ করেছেন, সংজ্ঞা দেননি, তবে সংজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য বস্তুর পরিচয় দেওয়া, যদি উদাহরণ দ্বারা সে উদ্দেশ্য হাসিল হয় সংজ্ঞার প্রয়োজন নেই। যেমন ‘মু‘আন‘আন’: عَن سَعيدٍ عَنْ كَرَمْ এটাই ‘মু‘আন‘আন’ সনদের উদাহরণ।
হাদিসের পরিভাষায় ‘মু‘আন‘আন’ সে সনদকে বলা হয়, যেখানে রাবি নিজ শায়খ থেকে عَنْ শব্দ দ্বারা হাদিস বর্ণনা করেন। সনদে একবার ‘আন’ শব্দ থাকাই ‘মু‘আন‘আন’ হওয়ার জন্য যথেষ্ট, যেমন রাবি حدثني অথবা أخبرني অথবা سمعت ইত্যাদি শব্দের পরিবর্তে বলল: عن نافع عن ابن عمر - رضي الله عنهما এ জাতীয় সনদকে ‘মু‘আন‘আন’ বলা হয়।
এ পরিচ্ছদে উসুলে হাদিসের কিতাবে অপর একপ্রকার উল্লেখ করা হয় مُؤَنَّنْ ‘মুআন্নান’ বা مُؤَنْأَنْ ‘মুআনআন’ কর্মবাচক বিশেষ্য, আভিধানিক অর্থ أنَّ শব্দ যোগে গঠিত বাক্য। ‏مُعَنْعَنٌ ও مؤنأن প্রায় সমোচ্চারিত শব্দ ও উভয় কর্মবাচক বিশেষ্য।
হাদিসের পরিভাষায়: “সনদের এক বা একাধিক জায়গায় ‘আন্না’ শব্দ ব্যবহার করে রাবি যদি তার শায়খ থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তাহলে সে সনদকে ‘মুআন্নান’ বা ‘মুআনআন’ বলা হয়, যেমন রাবি বলল: حدثني فلان أن فلاناً قال‏:‏ إلخ‏.
‘মু‘আন‘আন’ ও ‘মুআন্নান’ হাদিসের হুকুম মুত্তাসিল, তবে রাবির তাদলিস করার অভ্যাস থাকলে ইত্তিসালের বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে মুত্তাসিল বলা যাবে না। কারণ, মুদাল্লিস কখনো সনদ মুত্তাসিল বুঝানোর জন্য নিজ শায়খকে বাদ দিয়ে শায়খের শায়খ থেকে ‘আন’ শব্দ প্রয়োগ করে বর্ণনা করে। মুদাল্লিসের বাদ দেওয়া শায়খকে যেহেতু আমরা জানি না, তাই তার দ্বাবত ও আদালত সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। অতএব অপর সনদ বা তার বর্ণিত অপর হাদিস দ্বারা যতক্ষণ না শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে প্রমাণিত হবে, আমরা ‘মুআনআন’ হাদিসকে মুত্তাসিল বলব না।
‘মু‘আন‘আন’ তিনটি শর্তে মুত্তাসিল হয়:
১. ‘আন’ প্রয়োগকারী রাবির দ্বাবত ও আদালত থাকা জরুরি।
২. রাবির তাদলিসের স্বভাব মুক্ত হওয়া জরুরি।
৩. রাবি ও শায়খের সাক্ষাত প্রমাণিত হওয়া জরুরি।
১-নং ও ২-নং শর্তের ব্যাখ্যা সবার নিকট এক, তবে রাবি ও শায়খের সাক্ষাতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আলেমগণ দ্বিমত পোষণ করেছেন।
কেউ বলেন: সাক্ষাত অর্থ রাবি ও শায়খের সাথে জীবনে অন্তত একবার সাক্ষাত হওয়া। ইমাম বুখারি এ মতের প্রবক্তা।
কেউ বলেন: সাক্ষাত অর্থ রাবি ও শায়খের সাথে সাক্ষাত সম্ভব হওয়া। এ মতের প্রবক্তা ইমাম মুসলিম।
‘বাইকুনিয়া’র ব্যাখ্যাকার সুলাইমানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আমার নিকট ইমাম মুসলিমের মাযহাব গ্রহণ করা উত্তম, যতক্ষণ না কোনো মুহাদ্দিস সনদে ইল্লতের প্রশ্ন তোলেন।

মুবহাম হাদিস
‏مُبهَمٌ‏ এর আভিধানিক অর্থ: অস্পষ্ট।
‘মুবহাম’-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “যে হাদিসের সনদে কোনো একজন রাবিকে উল্লেখ করা হয়নি তাই মুবহাম”। যেমন, حدثني رجل، قال‏:‏ حدثني خالد عن راشد ...
এ হাদিস মুবহাম, কারণ এখানে একজন রাবির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অনুরূপ কোনো রাবি যদি বলে: حدثني الثقة ‘আমাকে জনৈক সেকাহ বলেছে’ তবুও তা মুবহাম। কারণ, ‘সেকাহ’ রাবি পরিচিত নয়। হয়তো তার নিকট সেকাহ, প্রকৃতপক্ষে সেকাহ নয়। অনুরূপ কেউ যদি বলে: حدثني من أثق به ‘এমন ব্যক্তি আমাকে বলেছে, যার উপর আমি আস্থাশীল’, তবু হাদিস মুবহাম, কারণ মুবহাম ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো প্রশংসা গ্রহণীয় নয়। অনুরূপ কেউ যদি বলে: حدثني صاحب هذه الدار ‘আমাকে এ বাড়িওয়ালা বলেছে’, তবু হাদিস মুবহাব, যতক্ষণ না তার পরিচয় জানা যায়।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ مَا فيهِ দ্বারা সনদ বুঝিয়েছেন, তাই খোদ হাদিসে কোনো ব্যক্তি অপরিচিত থাকলে হাদিসের বিশুদ্ধতায় প্রভাব পড়বে না, যদি সনদ ঠিক থাকে, যেমন জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত:
دَخَلَ رَجُلٌ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ، فَقَالَ «أَصَلَّيْتَ؟ قَالَ: لَا، قَالَ: قُمْ فَصَلِّ رَكْعَتَيْنِ»
“জুমার দিন জনৈক ব্যক্তি প্রবেশ করল, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন খুতবা দিচ্ছেন। তিনি বললেন: তুমি কি সালাত পড়েছ? সে বলল: না, তিনি বললেন: দাঁড়াও, দু’রাকাত সালাত আদায় কর”।
এ হাদিসে জনৈক ব্যক্তি অপরিচিত, তবু হাদিস মুবহাম নয়, কারণ সে রাবি নয়, বরং সহি সনদে বর্ণিত হাদিসে তার সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। এ প্রকার হাদিসকে ‘মুবহাম ফিল মতন’ বলা হয়, যা হাদিসের শুদ্ধতা বিনষ্ট করে না।
‘মুবহামে’র কারণ সম্পর্কে সাখাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “সনদ সংক্ষেপ করা অথবা রাবি সম্পর্কে সন্দেহ অথবা অন্য কোনো কারণে এক বা একাধিক স্থানে রাবিকে মুবহাম করা হয়”। এসব কারণে তাদলিসও করা হয়।
সাহাবি মুবহাম হলে দোষণীয় নয়:
সাহাবির অস্পষ্টতা সমস্যা নয়, কারণ আল্লাহ স্বয়ং সকল সাহাবির আদালতের সাক্ষী দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ وَكُلّٗا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡحُسۡنَىٰۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٞ ١٠ ﴾ [الحديد: ١٠]
“আর আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত”। অপর আয়াতে তিনি সাহাবিদের প্রশংসা করে বলেন:
﴿ مُّحَمَّدٞ رَّسُولُ ٱللَّهِۚ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ أَشِدَّآءُ عَلَى ٱلۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيۡنَهُمۡۖ تَرَىٰهُمۡ رُكَّعٗا سُجَّدٗا يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗاۖ سِيمَاهُمۡ فِي وُجُوهِهِم مِّنۡ أَثَرِ ٱلسُّجُودِۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِۚ وَمَثَلُهُمۡ فِي ٱلۡإِنجِيلِ كَزَرۡعٍ أَخۡرَجَ شَطۡ‍َٔهُۥ فَ‍َٔازَرَهُۥ فَٱسۡتَغۡلَظَ فَٱسۡتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِۦ يُعۡجِبُ ٱلزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ ٱلۡكُفَّارَۗ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِنۡهُم مَّغۡفِرَةٗ وَأَجۡرًا عَظِيمَۢا ٢٩ ﴾ [الفتح: ٢٩]
“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা ‎আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; ‎পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে ‎রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে ‎পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি ‎অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, ‎তাদের চেহারায় সিজদার চি‎হ্ন থাকে। এটাই ‎তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইঞ্জীলে ‎তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, ‎‎যে তার কঁচিপাতা উদ্‌গত করেছে ও শক্ত ‎করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় ‎কাণ্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা ‎চাষিকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের ‎দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে ‎পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও ‎সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও ‎মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন”। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٠٠
‏“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ‎প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ ‎করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ‎হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট ‎হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত ‎করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী ‎প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই ‎মহাসাফল্য”। অতএব এক সাহাবি অপর সাহাবিকে মুবহাম করলে, কিংবা কোনো হাদিসে মুবহাম ব্যক্তিটি সাহাবি তা নিশ্চিত জানা গেলে সমস্যা নেই।
মুবহাম হাদিসের হুকুম:
মুবহাম হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ মুবহাম রাবি সেকাহ না গায়রে সেকাহ জানা নেই, তবে তাবে‘ঈ বা তাবে তাবে‘ঈ মুবহাম হলে শাহেদ হওয়ার যোগ্য। কারণ, এ দুই তবকা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন, পরবর্তী যুগে মিথ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।


উঁচু ও নিচু সনদ

وَضِدُّهُ ذاكَ الذي قَدْ نَزَلا
وَكُلُّ مَا قَلَّتْ رِجالُهُ عَلا

“আর যেসব হাদিসের রাবি কম তাই উঁচু সনদ। আর তার বিপরীত ঐ সনদ, যা নিচে নেমেছে”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ধারাক্রমে হাদিসের ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ প্রকার ‘আলি ও নাযিল। হাদিসের এ দু’প্রকার সনদের সাথে সম্পৃক্ত।
عالي শব্দের আভিধানিক অর্থ উঁচু। সনদে রাবির সংখ্যা কম হলে লেখক থেকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত হাদিসের দূরত্ব কম হয়, ফলে সনদ উঁচু হয়। তাই কম রাবি বিশিষ্ট সনদকে ‘আলি’ বা উঁচু বলা হয়।
‘আলি’ সনদের পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদিসের সনদে রাবির সংখ্যা কম তাই উঁচু সনদ”।
মুহাদ্দিসগণ উঁচু সনদের জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা করতেন, কারণ এতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য হাসিল হয় এবং দ্রুত ও কম মাধ্যমে হাদিস শিখা যায়। তাই উঁচু সনদের জন্য প্রতিযোগিতা করা মুসলিম উম্মাহর অগ্রবর্তীদের সুন্নত। আমরা ‘মুয়াত্তা’ ইমাম মালিক-এ দেখি, ইমাম মালিক বলেন:
عن نافع، عن ابن عمر، عن النبي صلى الله عليه وسلم.
নাফে থেকে, তিনি ইব্‌ন ওমর থেকে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। এটা উঁচু সনদ। পক্ষান্তরে আমরা যদি ইব্‌ন আসাকের, অথবা ইমাম হাকেম, অথবা বায়হাকি প্রমুখদের সনদ দেখি, তাহলে রীতিমত ক্লান্ত হতে হয়। তাদের অনেক রাবির জীবনী পর্যন্ত জানা যায়নি, কারণ রাবির স্তর যত নিম্নে নেমেছে তাদের প্রতি মানুষের গুরুত্ব তত হ্রাস পেয়েছে। ইব্‌ন মা‘য়িন রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ‘কোন বস্তু আপনার নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বলেন: উঁচু সনদ ও নির্জন ঘর’।
‘আলি সনদ প্রধানত দু’প্রকার:
১. সংখ্যার বিবেচনায় উঁচু। ২. বিশেষণের বিবেচনায় উঁচু।
১. সংখ্যার বিবেচনায় উঁচু সনদ দু’প্রকার:
ক. সাধারণ উঁচু সনদ, খ. অপেক্ষাকৃত উঁচু সনদ।
ক. সাধারণ উঁচু সনদ: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও গ্রন্থকারের মধ্যবর্তী রাবির সংখ্যা কম হলে সংখ্যার বিবেচনায় সাধারণ উঁচু সনদ বলা হয়। এ সনদ সহি হলে প্রকৃতপক্ষে এটাই উঁচু সনদ। এ সনদ দুর্বল হলেও উঁচু, যদি মাওদু‘ বা বানোয়াট না হয়, কারণ মাওদু‘ ও বানোয়াট হাদিস থাকা না-থাকা উভয় সমান।
খ. অপেক্ষাকৃত উঁচু সনদ দু’প্রকার:
খ-১. কোনো ইমামের বিবেচনায় উঁচু, অর্থাৎ রাবি থেকে ইমামের দূরত্ব কম, যেমন শু‘বা অথবা মালিক অথবা সাওরি অথবা শাফে‘ঈ প্রমুখ ইমামগণ। এ ক্ষেত্রে বলা হয়: ইমাম যুহরি থেকে বুখারির সনদ উঁচু, ইমাম মালেক থেকে আহমদ ইব্‌ন হাম্বলের সনদ উঁচু ইত্যাদি। এতে সনদের শুরু থেকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত রাবির সংখ্যা কম বা বেশী দেখা হয় না, বরং ইমাম থেকে রাবির দূরত্ব দেখা হয়, ইমাম থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূরত্ব কম হোক বা বেশী হোক বিবেচ্য নয়। এতে উপরের ইমাম ও নিম্নের রাবি বা গ্রন্থকারের মধ্যবর্তী দূরত্বকে অনুরূপ অপর সনদের সাথে তুলনা করা হয়, অতঃপর অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যা বিশিষ্ট সনদকে ‘আলি বা উঁচু বলা হয়।
খ-২. লিখিত কোনো কিতাবে বর্ণিত হাদিসের বিবেচনায় উঁচু, যেমন ইমাম বুখারি ও মুসলিমের সহি; আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইব্‌ন মাজার সুনান এবং ইমাম আহমদ প্রমুখদের মুসনাদসমূহ। এখানে গ্রন্থকার থেকে পরবর্তী মুহাদ্দিসের দূরত্ব দেখা হয়, যেমন ইমাম বুখারি ও বায়হাকি। ইমাম বায়হাকি পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস হয়ে কখনো বুখারির সমপর্যায়ের, কখনো তার উস্তাদের সমপর্যায়ের হয় হিসেবে কয়েক প্রকার উঁচু সনদ হয়। এগুলোকে সংখ্যার বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত উঁচু সনদের দ্বিতীয় প্রকার বলা হয়।
২. বিশেষণের বিবেচনায় উঁচু সনদ দু’প্রকার:
ক. মৃত্যুর বিবেচনায় উঁচু, যদিও উভয়ের সনদে রাবির সংখ্যা সমান। যেমন একজন রাবি দু’জন শায়খ থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, প্রথম শায়খের মৃত্যু (১৫০হি.), দ্বিতীয় শায়খের মৃত্যু (১৯০হি.), এখানে প্রথম শায়খের সনদ উঁচু ও দ্বিতীয় শায়খের সনদ নিচু। অনুরূপ দু’জন রাবি যদি দু’জন শায়খ থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তাহলে যে শায়খের মৃত্যু আগে তার ছাত্রের সনদ উঁচু এবং যে শায়খের মৃত্যু পরে তার ছাত্রের সনদ নিচু।
খ. শ্রবণ করার বিবেচনায় উঁচু, যেমন সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ্ থেকে দু’জন রাবি হাদিস শ্রবণ করেছে, একজন শ্রবণ করেছে (১২০হি.) ও অপরজন শ্রবণ করেছে (১৫০হি.), এতে প্রথম রাবির সনদ উঁচু, কারণ তিনি আগে শ্রবণ করেছেন। দ্বিতীয় রাবির সনদ নিচু, কারণ তিনি পরে শ্রবণ করেছেন।
বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ বিশেষণের কারণে উঁচু সনদ দু’প্রকার:
১. বাহ্যিক বিশেষণের কারণে উঁচু সনদ, যেমন রাবি ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে রাবির সংখ্যা কম। সাধারণত উঁচু সনদ বলে এ প্রকারকে বুঝানো হয়। এ প্রকারের আলোচনা আমরা উপরে করেছি।
২. আভ্যন্তরীণ বিশেষণের কারণে উঁচু সনদ, যেমন রাবির আদালত ও দ্বাবতের সাথে সনদ মুত্তাসিল হলে সনদের মান বৃদ্ধি পায়। এ জাতীয় সনদ অভ্যন্তরীণ বিশেষণের কারণে উঁচু, যদিও এতে রাবির সংখ্যা বেশী। আদালত ও দ্বাবতের সাথে রাবির মধ্যে অন্যান্য বিশেষণ যেমন ফিকহ ইত্যাদি থাকলে সনদের মান আরো বৃদ্ধি পায় ও সনদ উঁচু হয়। এটাই শ্রেষ্ঠ ও উত্তম সনদ।
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “ছোট সনদ উঁচু নয়, বরং শ্রেষ্ঠ সনদই উঁচু”। অর্থাৎ সেকাহ রাবিদের নিচু সনদ, দুর্বল রাবিদের উঁচু সনদ থেকে উত্তম।
আবু তাহের সিলাফি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আলেমদের থেকে হাদিস গ্রহণ করাই নিয়ম। আলেমদের নিচু সনদ জাহেলদের উঁচু সনদ থেকে উত্তম”।
ইব্‌নুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “মুহাদ্দিসদের নিকট উঁচু সনদ প্রকৃত অর্থে উঁচু সনদ নয়, বরং বিশেষণের দিক থেকে উঁচু সনদ প্রকৃত অর্থে উঁচু”।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ এখানে শুধু সংখ্যার বিবেচনায় ‘আলি ও নিচু সনদ উল্লেখ করেছেন। কারণ গ্রন্থকার ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত রাবির সংখ্যা কম হলে ভুলের স্থান কম হয়। আর সংখ্যা বাড়লে ভুলের স্থান বৃদ্ধি পায়। উদাহরণত একটি ঘটনা যায়েদ থেকে আমর, তার থেকে খালেদ বর্ণনা করল। এখানে ভুলের স্থান তিনটি অর্থাৎ যায়েদ, আমর ও খালেদ। তাদের কারো থেকে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই ঘটনা যায়েদ থেকে আমর, তার থেকে খালেদ, তার থেকে নাসির বর্ণনা করল। এখানে ভুলের স্থান চারটি অর্থাৎ যায়েদ, আমর, খালেদ ও নাসির। অনুরূপভাবে কোনো সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুহাদ্দিসের মধ্যবর্তী রাবির সংখ্যা তিন হলে ভুলের স্থান তিনটি, রাবির সংখ্যা চার হলে ভুলের স্থান চারটি। এ হিসেবে প্রথমটি ‘আলি বা উঁচু সনদ, কারণ এখানে ভুলের সম্ভাবনা কম। দ্বিতীয়টি নাযিল বা নিচু সনদ, কারণ এখানে ভুলের সম্ভাবনা বেশী।
সংখ্যার বিবেচনায় সনদ ‘আলি হলে হাদিস সহি হওয়া জরুরি নয়, কারণ কম রাবির মধ্যে কেউ দুর্বল থাকতে পারে, আবার রাবির সংখ্যা অধিক হলে দ্বা‘ঈফ হওয়া জরুরি নয়, কারণ তাদের সবাই সেকাহ হতে পারে। অতএব রাবির সংখ্যা মূল বিষয় নয়, বরং রাবিদের গুণাগুণ মূল বিষয়।
উঁচু সনদ হাসিল করা সুন্নত:
ইমাম হাকেম প্রমুখ বলেছেন: “উঁচু সনদ হাসিল করা মোস্তাহাব। তিনি দলিল হিসেবে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে দিমাম ইব্‌ন সা‘লাবাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ঘটনা সম্বলিত হাদিস পেশ করেছেন। দিমাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলেছিল: আপনার দূত আমাদের বলেছে, আল্লাহ আমাদের উপর দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন, আল্লাহ কি আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ’। এ হাদিস প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসগণ বলেন: যদি উঁচু সনদ তলব করা মোস্তাহাব না হত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই দিমামের প্রশ্ন করা অপছন্দ করতেন এবং তাদেরকে প্রেরিত দূতের সংবাদে সন্তুষ্ট থাকার নির্দেশ দিতেন”।
সাহাবি তামিম নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি ঘটনা বলেছিল, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে দাঁড়িয়ে তা বলছিলেন, দেখেন তামিম মসজিদের কর্নারে বসে আছে, তিনি বললেন:
«يا تميم، حدث الناس بما حدثتني...»
“হে তামিম, তুমি আমাকে যা বলেছ, মানুষদের তা বল”। সাখাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: তামিমকে সরাসরি ঘটনা বর্ণনার নির্দেশ দেওয়া উঁচু সনদ মোস্তাহাবের পক্ষে একটি দলিল। এ থেকে প্রমাণ হয়, বিনা মাধ্যম কিংবা কম মাধ্যমে হাদিস শ্রবণ করা উত্তম।
হাকেম রাহিমাহুল্লাহ্ উচু সনদ মোস্তাহাবের পক্ষে সাহাবি ও তাবে‘ঈদের সফরকে পেশ করেছেন, যেমন আবু আইয়ুব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একটি হাদিসের জন্য ‘উকবা ইব্‌ন ‘আমের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নিকট মিসরে যান, যে হাদিস ‘উকবা ও তিনি ব্যতীত নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি শ্রবণকারী কেউ অবশিষ্ট ছিল না। তিনি ‘উকবাকে বলেন: “তুমি একটি হাদিস শ্রবণ করেছ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সে হাদিস শ্রবণকারী কেউ বেচে নেই, অতঃপর তিনি তাকে হাদিসটি শুনান”। এ হাদিস উদ্ধৃত করে ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আবু আইয়ূব আনসারি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীর্ঘ সাথীত্ব ও তার থেকে অধিক হাদিস শ্রবণ করা সত্যেও সমবয়সী এক সাথীর নিকট হাদিস শ্রবণ করার জন্য দীর্ঘ সফর করেছেন, অথচ তিনি সফর না করে তার কোনো ছাত্র থেকে শ্রবণ করে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল। অনুরূপ সায়িদ ইব্‌ন মুসাইয়্যেব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমি একটি হাদিসের জন্য কয়েক দিন ও কয়েক রাত সফর করি”।
মুদ্দাকথা: পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল ইমামের নিকট উঁচু সনদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত। ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “উঁচু সনদ তলব করা পূর্ববর্তীদের সুন্নত, কারণ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদের সাথীগণ কুফা থেকে মদিনায় গিয়ে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে শিখতেন ও তার থেকে হাদিস শুনতেন”। মুহাম্মদ ইব্‌ন আসলাম আত-তুসী বলেন: “সনদের নৈকট্য আল্লাহর নৈকট্য”। ইব্‌ন মাদিনি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “সনদের দূরত্ব অশুভ লক্ষণ”। ইয়াহইয়া ইব্‌ন মা‘য়িন বলেন: “নিচু সনদ চেহারায় খতের ন্যায়”।
জ্ঞাতব্য: সর্বাবস্থায় উঁচু সনদ অন্বেষণ করা প্রশংসনীয় নয়, উঁচু সনদ সহি হলে প্রশংসনীয়, নচেৎ দুর্বল ও মিথ্যাবাদী রাবির উঁচু সনদ অপেক্ষা সেকাহ রাবির নিচু সনদ অধিক উত্তম। ইমাম যাহাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যখন দেখ কোনো মুহাদ্দিস এ জাতীয় [দুর্বল] রাবিদের উঁচু সনদের কারণে খুশি হয়, মনে রেখ সে তখনো মূর্খ”। ইমাম আহমদ ইব্‌ন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ্ দুর্বলতা সত্যেও উঁচু সনদের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদেরকে তিরস্কার করেছেন। ইয়াহইয়া ইব্‌ন মা‘য়িন রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “দুর্বল রাবির উঁচু সনদ অপেক্ষা সেকাহ রাবির নিচু সনদ অধিক উত্তম”। শু‘বা ও মি‘সআর বলেন: “নিশ্চয় [দুর্বল রাবির উঁচু সনদ বিশিষ্ট] এসব হাদিস তোমাদেরকে আল্লাহর যিকির ও সালাত থেকে বিরত রাখে, তবুও তোমরা বিরত হবে না”।
তাদের এসব বাণীর অর্থ মূর্খ মুহাদ্দিসদের নিন্দা করা, যারা দুর্বল রাবিদের উঁচু সনদ অন্বেষণ করে। দুর্বল সনদের জন্য দীর্ঘপথের সফর মূলত ব্যক্তিকে আল্লাহর যিকির ও সালাত থেকে বঞ্চিত করে, কারণ সফর শাস্তির একটি অংশ। সফরে অনেক নফল ছুটে যায়, সফরের কারণে কখনো অধীনদের হক বিনষ্ট হয়, কখনো অনুত্তম বস্তুর জন্য উত্তম বস্তু হাত ছাড়া হয়। তাই নিচু সনদ হলেই দোষণীয় নয়, বরং সেকাহ রাবির নিচু সনদ দুর্বল রাবির উঁচু সনদ অপেক্ষা উত্তম।

নিচু সনদ
نازل এর আভিধানিক অর্থ নিম্নগামী ও অবতরণকারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে রাবির দূরত্ব অধিক হলে নিম্নগামী হয়, তাই এ প্রকার হাদিসকে ‘নাযিল’ বলা হয়।
‘নাযিল’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আর ‘আলি সনদের বিপরীত ঐ সনদ যা নিম্নগামী”।
নিচু সনদের প্রতি মুহাদ্দিসদের অনীহা সর্বদা, তবে উঁচু সনদ অপেক্ষা ‘নিচু সনদে আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকলে নিচু সনদই উঁচু। উঁচু সনদে দুর্বল রাবি থাকলে তার কোনো ফায়দা নেই। এমতাবস্থায় মূর্খ ব্যতীত কেউ নিচু সনদে অনীহা প্রকাশ করে না।
নাযেলের প্রকারসমূহ: আমরা উপরে আলি সনদের যে প্রকারগুলো উল্লেখ করেছি, তার বিপরীত সবগুলো প্রকার নাযেল। তাই পৃথকভাবে তার আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।
জ্ঞাতব্য: আমরা এখানে ‘আলি ও নাযিল সম্পর্কে নাতি-দীর্ঘ আলোচনা করেছি, যার উদ্দেশ্য পাঠকদের এ বিষয়ে পরিপক্ব করে তোলা, যেন তারা বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখিত উসুলে হাদিসের পরিভাষাগুলো সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে সক্ষম হন। অন্যথায় এ যুগে ‘আলি সনদের তেমন গুরুত্ব নেই। কেউ তার প্রতি গুরুত্বারোপ করলেও তার সাথে সহি ও দ্বা‘ঈফের কোনো সম্পর্ক নেই। অধিকন্তু উঁচু সনদের কতক প্রকার বহু পূর্বে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
উঁচু ও নিচু আপেক্ষিক বিষয়। যদি বলা হয় এ সনদ উঁচু, তার অর্থ নিচু সনদ অপেক্ষা উঁচু; যদি বলা হয় এ সনদ নিচু, তার অর্থ উঁচু সনদ অপেক্ষা নিচু। এ ছাড়া সনদ উঁচু কিংবা নিচু হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। কখনো যুগের বিবেচনায় সনদ উঁচু বা নিচু হয়। এক যুগের বিবেচনায় এক সনদ উঁচু, কিন্তু অপর যুগের বিবেচনায় নিচু। হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ যদি দশজন রাবির পরম্পরায় একটি হাদিস বর্ণনা করেন, তার বিবেচনায় তা উঁচু সনদ। এ হাদিস ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ যদি সাত অথবা আটজন রাবির পরম্পরায় বর্ণনা করেন, তার বিবেচনায় তা নাযিল।

মাওকুফ হাদিস
قَوْلٍ وَفِعْلٍ فَهْوَ مَوْقُوفٌ زُكِنْ
وَمَا أَضَفْتَهُ إلىٰ الأَصْحابِ مِنْ

“আর সাহাবির সাথে কথা ও কর্ম যাই সম্পৃক্ত কর, তাই মাওকুফ মনে রেখ”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের পঞ্চদশ প্রকার মাওকুফ। এ প্রকারের সম্পর্ক মতনের সাথে। আমরা পূর্বে বলেছি, লেখক যদি মারফূ‘ ও মাকতুর মধ্যবর্তী মাওকুফ উল্লেখ করতেন, তাহলে ধারাক্রম ঠিক থাকত, তিনি তা করেননি।
সাহাবির সংজ্ঞা: ঈমান অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত লাভ করে ঈমানের উপর মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তি সাহাবি। সাক্ষাত ক্ষণিকের জন্য হলেও সাহাবি। এটা শুধু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য, এ ছাড়া কারো সাথী হওয়ার জন্য দীর্ঘ সহচার্য জরুরি, কোথাও কিছু সময়ের সাক্ষাত সাথী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। সাহাবি হওয়ার জন্য চোখে দেখা জরুরি নয়, সাক্ষাত যথেষ্ট, যেমন অন্ধ সাহাবি ইব্‌ন মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাক্ষাত। কেউ যদি ঈমান অবস্থায় সাক্ষাত করে মুরতাদ হয়, অতঃপর ইমান গ্রহণ করে মারা যায়, সে সাহাবি।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মৃত অবস্থায় দর্শনকারী সাহাবি নয়, কারণ তিনি সাক্ষাত লাভ করেননি। অনুরূপ স্বপ্নে দর্শনকারী কিংবা কাফের অবস্থায় দেখে পরবর্তীতে ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তি সাহাবি নয়। কারণ সে ঈমান অবস্থায় সাক্ষাত করেনি।
موقوف এর আভিধানিক অর্থ: ক্ষান্ত, স্থগিত, আবদ্ধ ও উৎসর্গিত বস্তু। রাবি মাওকুফ হাদিসের সনদ যেহেতু সাহাবি পর্যন্ত নিয়ে ক্ষান্ত হন ও স্থগিত করেন, তাই এ প্রকার হাদিসকে মাওকুফ বলা হয়। অনুরূপ আল্লাহর রাস্তায় আবদ্ধ ও উৎসর্গিত সম্পদকে বলা হয় المال الموقوف বা ওয়াকফ্‌কৃত সম্পদ। (এ হিসেবে মারফূ‘ ও মাকতু‘কেও মাওকুফ বলা যায়, কারণ মারফূ‘র সনদ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট স্থগিত হয়, মাকতু‘র সনদ তাবে‘ঈ বা তাদের পরবর্তী কোনো মনীষীর নিকট স্থগিত হয়।)
‘মাওকুফে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “সাহাবির কথা ও কর্মকে মাওকুফ বলা হয়”। যেমন আব্দুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ فَوَجَدَ قَلْبَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ، فَاصْطَفَاهُ لِنَفْسِهِ فَابْتَعَثَهُ بِرِسَالَتِهِ، ثُمَّ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ بَعْدَ قَلْبِ مُحَمَّدٍ، فَوَجَدَ قُلُوبَ أَصْحَابِهِ خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ فَجَعَلَهُمْ وُزَرَاءَ نَبِيِّهِ يُقَاتِلُونَ عَلَى دِينِهِ، فَمَا رَأَى الْمُسْلِمُونَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ حَسَنٌ، وَمَا رَأَوْا سَيِّئًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ سَيِّئٌ».
“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের অন্তরসমূহে দৃষ্টি দেন, এতে তিনি মুহাম্মদের অন্তরকে বান্দাদের অন্তরে সর্বোত্তম পান। ফলে তিনি তাকে নিজের জন্য মনোনীত করেন ও তার রিসালাত দিয়ে প্রেরণ করেন। মুহাম্মদের অন্তরের পর বান্দাদের অন্তরে দৃষ্টি দেন। এতে তিনি তার সাহাবিদের অন্তরকে বান্দাদের অন্তরে সর্বোত্তম পান। ফলে তিনি তাদেরকে তার নবীর সাহায্যকারী মনোনীত করেন, যারা তার দীনের খাতিরে জিহাদ করে। অতএব মুসলিমরা যা ভালো মনে করে আল্লাহর নিকট তাই ভালো। তারা যা খারাপ মনে করে আল্লাহর নিকট তাই খারাপ”।
মাওকুফ কর্মের উদাহরণ:
عن عبد الله بن بريدة أن سلمان (الفارسي) كان يعمل بيديه فإذا أصاب شيئاً اشترى به لحماً أو سمكاً ثم يدعو الْمُجْذَمين (أي الذين ابتلوا بمرض الجُذام) فيأكلون معه.
“আব্দুল্লাহ ইব্‌ন বুরাইদাহ রাহিমাহুল্লাহ্ থেকে বর্ণিত, সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিজ হাতে কাজ করতেন, যখন কিছু উপার্জন করতেন, তার দ্বারা গোস্ত অথবা মাছ খরিদ করতেন, অতঃপর তিনি কুষ্ঠরোগীদের দাওয়াত করতেন, তারা তার সাথে খেত”।
হুকমান মারফূ‘:
সাহাবির কথা বা কর্ম যদি গবেষণা লব্দ ও ইজতিহাদি না হয়, তাহলে হুকমান মারফূ‘। যেমন বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ، وَابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ يَقْصُرَانِ وَيُفْطِرَانِ فِي أَرْبَعَةِ بُرُدٍ وَهِيَ سِتَّةَ عَشَرَ فَرْسَخًا
“ইব্‌ন ওমর ও ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু চার বুরদ অর্থাৎ ষোল ফারসাখ দূরত্বে কসর ও ইফতার করতেন”। এক ফারসাখ= তিন মাইল, এক মাইল= চার হাজার হাত। অর্থাৎ ইব্‌ন ওমর ও ইব্‌ন আব্বাস হাশেমিদের মাইল অনুসারে মক্কার রাস্তায় আট চল্লিশ মাইল দূরত্বে চার রাকাত সালাতকে দু’রাকাত কসর করতেন ও রমযানের সময় ইফতার করতেন। এ জাতীয় আমল ইজতিহাদ বা গবেষণার ফল নয়, তাই এগুলো হুকমান মারফূ‘। হুকমান মারফূ‘ সম্পর্কে মারফূ‘ হাদিসের আলোচনায় বিস্তারিত বলেছি।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ সাহাবির সমর্থন উল্লেখ করেননি। সাহাবির সমর্থন মাওকুফ কি-না মতভেদ আছে। খুব সম্ভব তার নিকট সাহাবির সমর্থন মাওকুফ নয়। কারণ কোনো কাজের প্রতি সাহাবির সমর্থন বা চুপ থাকা তার বৈধতা প্রমাণ করে না এবং সে কাজকে তার সাথে সম্পৃক্ত করা সঠিক নয়, তাই দলিল হিসেবে গ্রাহ্য নয়। কারণ সাহাবি একাধিক কারণে চুপ থাকতে পারে, যেমন:
ক. সাহাবি অন্যমনস্ক হতে পারেন, তাই তার সামনে কৃতকর্ম দলিল নয়।
খ. নিষেধ করার ক্ষমতা না থাকার কারণে কখনো সাহাবি চুপ থাকেন, যেমন হাজ্জাজ জুমার সালাতে বিলম্ব করলে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু চুপ থাকেন, পরে তিনি বাতলে দেন।
গ. কোনো কর্মের হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সাহাবি কখনো চুপ থাকেন, অতএব তার চুপ থাকা দলিল নয়।
ঘ. কখনো অধিকতর ফিতনার আশঙ্কায় সাহাবি চুপ থাকেন, যেমন উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হজের সময় মিনায় যখন চার রাকাত সালাত আদায় করেন, ইব্‌ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু চুপ থাকেন এবং বলেন: ‘ইখতিলাফ খারাপ জিনিস’।
ঙ. কখনো ইজতিহাদি বিষয় হওয়ার কারণে সাহাবি চুপ থাকেন, অথবা অপর কেউ নিষেধ করবেন হিসেবে চুপ থাকেন, অতএব তার চুপ থাকা সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়।
এসব সম্ভাবনার কারণে সাহাবির সামনে সম্পাদিত কথা বা কর্মকে তার সাথে সম্পৃক্ত করা সমীচীন নয়। যদি জানা যায় তিনি চুপ থেকে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন, তাহলে তার সাথে তা সম্পৃক্ত করায় সমস্যা নেই। হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “... যদি নিষেধ না করার ওযর কিংবা চুপ থাকার কারণ না থাকে, তাহলে তার সামনে কৃতকর্ম মাওকুফের হুকুম রাখে”।

মাওকুফের উপকারিতা:
১. মাওকুফ হাদিসের সকল সনদ জমা করে মারফূ‘ হাদিসের ইল্লত জানা যায়।
২. মাওকুফ হাদিস কখনো হুকমান মারফূ‘ হয়।
৩. মাওকুফ শাহেদ হাদিসের ফলে দ্বা‘ঈফ মারফূ‘ হাদিস শক্তিশালী হয়। এ ক্ষেত্রে উভয়ের সনদ পৃথক হওয়া জরুরি।
৪. সাহাবিগণ আমাদের আদর্শ, তাদের কথা ও কর্ম অনুসরণ করে আমরা কুরআন ও সুন্নাহ বুঝি। কোনো বিষয়ে তাদের ইখতিলাফ জানা থাকলে অধিক বিশুদ্ধ মত গ্রহণ করব, ঐক্যমত্য থাকলে আমরা সেখান থেকে বের হব না। খতিব রাহিমাহুল্লাহ্ তাবে‘ঈদের সম্পর্কেও এরূপ মন্তব্য করেছেন, অতএব সাহাবিদের প্রসঙ্গে এ কথা অধিক যুক্তিযুক্ত।
৫. সাহাবির কথা আয়াত বা অপর সাহাবির কথা বিরোধী না হলে দলিল হিসেবে গণ্য। সালেহ ইব্‌ন কায়সান বলেন: “আমি ও যুহরি ইলম অন্বেষণের জন্য পরস্পর সাথী হয়েছি। শুরুতে আমরা শুধু হাদিস লিখতাম, তাই আমরা কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত বিষয় সংগ্রহ করি। তিনি বলেন: অতঃপর যুহরি বলেন: আমরা সাহাবিদের থেকে বর্ণিত বিষয়ও লিখব, কারণ সেগুলো সুন্নত। তিনি বলেন: আমি বললাম না, সেগুলো সুন্নত নয়, সেগুলো লিখব না। তিনি বলেন: সে লিখেছে আমি লিখি নাই, তাই সে ধন্য হয়েছে, আর আমি বিস্মৃত হয়েছি”।

জ্ঞাতব্য: সাহাবির কথা ও কাজ ব্যতীত কারো কথা ও কাজকে মাওকুফ বলা হয় না, তবে নির্দিষ্ট করে নিম্নরূপে বলা হয়:

অমুকে এ হাদিসকে যুহরি অথবা শা‘বির উপর ওয়াক্‌ফ করেছেন, অথবা হাদিসটি যুহরির উপর মাওকুফ ইত্যাদি।
মাওকুফ হাদিসের হুকুম:
কেউ বলেছেন: মাওকুফ কুরআন-সুন্নাহ কিংবা অপর সাহাবির কথা বিরোধী না হলে হুজ্জত ও দলিল। যদি মাওকুফের বিপক্ষে দলিল থাকে, তাহলে দলিল গ্রহণ করা হবে। যদি এক সাহাবির কথা অপর সাহাবির কথা বিরোধী হয়, তাহলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাধান্য দিব।

কেউ বলেছেন: সাহাবির কথা দলিল নয়, কারণ সাহাবি মানুষ হিসেবে ইজতিহাদ ও গবেষণা করেন। ইজতিহাদ ভুল ও সঠিক উভয় হতে পারে।
কেউ বলেছেন: সাহাবিদের থেকে আবু বকর ও ওমরের কথা দলিল, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
" اقْتَدُوا بِالَّذَيْنِ مِنْ بَعْدِي أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ "
“তোমরা আমার পরে আবু বকর ও ওমরের অনুসরণ কর”। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
فَإِنْ يُطِيعُوا أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ يَرْشُدُوا
“যদি তারা আবু বকর ও ওমরের অনুসরণ করে, তাহলে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে”। অতএব তাদের ব্যতীত অপর সাহাবিদের কথা দলিল নয়।
শায়খ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আমার নিকট স্পষ্ট যে, সাহাবি যদি আহলে ইলম ও আহলে ফিকহ হয়, তাহলে তার কথা দলিল, নচেৎ নয়। কারণ কতক সাহাবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শরীয়তের কিছু বিধান শিখে প্রস্থান করেন, তারা ফকিহ নন এবং আলেমও নন, তাই তাদের কথা দলিল নয়”।


মুরসাল ও গরিব হাদিস
وَقُلْ غَرِيبٌ مَا رَوَى رَاوٍ فَقَطْ
وَمُرْسَلٌ مِنْهُ الصَّحَابِيُّ سَقَطْ

“আর মুরসাল: যার থেকে সাহাবি বাদ পড়েছে। আর বল গরিব: যা শুধু একজন রাবি বর্ণনা করেছে”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ষোড়শ ও সপ্তদশ প্রকার মুরসাল ও গরিব।
‏مُرْسلٌ‏ এর আভিধানিক অর্থ মুক্ত করা ও ছেড়ে দেওয়া, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ أَلَمۡ تَرَ أَنَّآ أَرۡسَلۡنَا ٱلشَّيَٰطِينَ عَلَى ٱلۡكَٰفِرِينَ تَؤُزُّهُمۡ أَزّٗا ٨٣ ﴾ [مريم: ٨٣]
“তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আমি কাফেরদের জন্য শয়তানদের ছেড়ে দিয়েছি; ওরা তাদেরকে বিশেষভাবে প্ররোচিত করে”?
‘মুরসাল’ হাদিস বর্ণনাকারী সনদকে মুক্ত ছেড়ে দেন, নির্দিষ্ট কোনো সাহাবির সাথে সম্পৃক্ত করেন না, তাই এ প্রকারকে মুরসাল বলা হয়।
‘মুরসালে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে সনদে সাহাবির উল্লেখ নেই তাই মুরসাল”। এ সংজ্ঞা সঠিক নয়, কারণ সাহাবির বাদ পড়া নিশ্চিত জানা গেলে কোনো সমস্যা নয়, যেহেতু সকল সাহাবি ‘আদিল ও বিশ্বস্ত। তাই সাহাবির বাদ পড়া সমস্যা নয়, বরং সাহাবির সাথে কোনো তাবে‘ঈর বাদ পড়া সমস্যা। কারণ তাবে‘ঈ কখনো এক বা একাধিক তাবে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বা যারা সাহাবি থেকে শ্রবণ করেছেন। তাই তাবে‘ঈর বর্ণিত হাদিসে সাহাবি উল্লেখ না থাকার অর্থ সাহাবি বাদ পড়েছেন নিশ্চিত নয়, দুর্বল তাবে‘ঈ বাদ পড়তে পারেন।
দ্বিতীয়ত লেখকের সংজ্ঞা প্রমাণ করে, সাহাবি ইরসাল করলে মুরসাল নয়, অথচ বিজ্ঞ আলেমগণ তাকেও মুরসাল বলেন। তাই শায়খ আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ লেখকের সংজ্ঞা সংশোধন করে বলেন:
ومرسل من فوق تابع سقط = وقل غريب ما روى راو فقط
“আর মুরসাল: তাবে‘ঈর উপর থেকে যার রাবি বাদ পড়েছে। আর বল গরিব: যা শুধু একজন রাবি বর্ণনা করেছে”। এ সংজ্ঞানুসারে কোনো প্রশ্ন থাকে না, সাহাবির সাথে তাবে‘ঈ বাদ পড়ুক কিংবা সাহাবির সনদ থেকে সাহাবি বাদ পড়ুক, সকল প্রকার তার অন্তর্ভুক্ত।
অতএব নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি তাবে‘ঈর বর্ণিত হাদিস মুরসাল। হোক তা বাণী, কিংবা কর্ম কিংবা সমর্থন কিংবা কোনো বিশেষণ।
সাহাবির মুরসাল:
কোনো সাহাবি যদি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে না শুনে সরাসরি বর্ণনা করেন, কেউ বলেছেন তার হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়, তবে সাহাবির কারণে নয়, হতে পারে তিনি কোনো তাবে‘ঈ থেকে শ্রবণ করেছেন, যিনি অপর সাহাবি থেকে শ্রবণ করেছেন, যদিও তার দৃষ্টান্ত খুব কম।
হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “এ জাতীয় হাদিসগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে যে, কোনো সাহাবি আহকাম সংক্রান্ত কোনো হাদিস দুর্বল তাবে‘ঈ থেকে গ্রহণ করেননি”।
কেউ বলেছেন: সাহাবির মুরসাল গ্রহণযোগ্য, কারণ সাহাবির ইরসাল অপর সাহাবি থেকে হওয়াই স্বাভাবিক, তাবে‘ঈ থেকে তাদের ইরসাল করা সচরাচর নয়। তাই নির্দিষ্ট আলামত ব্যতীত বলা যাবে না সাহাবি কোনো তাবে‘ঈ থেকে ইরসাল করেছেন। বিশেষ করে ইব্‌ন হাজার যখন বলেছেন: আহকাম অধ্যায়ে দুর্বল তাবে‘ঈ থেকে কোনো সাহাবি হাদিস গ্রহণ করেননি।
জ্ঞাতব্য: যারা বুঝের বয়সে উপনীত হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণ করেছেন, তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য। যারা শুধু তাকে দেখার সৌভাগ্যে সাহাবি, কিন্তু তাকে দেখার সময় ভালমন্দ জ্ঞানের অধিকারী ছিল না, অথবা তিনি যেসব শিশুদের দেখেছেন, তাদের বর্ণনা তাবে‘ঈদের মুরসাল হিসেবে গণ্য।
মুরসাল বর্ণনার কয়েকটি কারণ:
১. কখনো রাবি একাধিক মুহাদ্দিস থেকে হাদিস শ্রবণ করেন, যাদের আদালত ও দ্বাবত সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত, এরূপ অবস্থায় তিনি শায়খদের উপর নির্ভর করে মুরসাল বর্ণনা করেন। যেমন ইবরাহিম নাখ‘ঈ রহ. ইব্‌ন মাসউদ রা. থেকে এভাবে বর্ণনা করতেন।
২. কখনো রাবি নিজ শায়খের নাম ভুলে যান, কিন্তু হাদিস স্মরণ থাকে, ফলে তিনি মুরসাল বর্ণনা করেন।
৩. কখনো রাবি উপদেশ হিসেবে, বা বিতর্কের সময় বা ফতোয়ার ক্ষেত্রে বা ওয়াজের মজলিসে হাদিস বর্ণনা করেন, তাই সনদের প্রতি বিশেষ নজর দেন না, মতন স্পষ্ট বলেন, বিশেষ করে শ্রোতাদের সামনে বক্তার শায়খ নির্দিষ্ট থাকলে এরূপ করা হয়।
৪. কখনো দুর্বল রাবির কারণে মুরসাল বর্ণনা করা হয়।
৫. ক্ষতির আশঙ্কা কিংবা হাদিস গ্রহণ করা হবে না ভেবে মুরসাল বর্ণনা করা হয়।
৬. কখনো রাবির সন্দেহ হয় যে, হাদিসটি মুসনাদ না মুরসাল, এমতাবস্থায় মুসনাদ হলেও তিনি মুরসাল বলেন, যেমন ইমাম মালিক প্রমুখ থেকে এরূপ শ্রুতি রয়েছে।
৭. ইমাম মুসলিম বলেন: কখনো রাবি নিজের মধ্যে আগ্রহের অভাবে সনদবিহীন মতন উল্লেখ করেন, আবার যখন উদ্যমতা ফিরে পান শায়খকে স্পষ্ট বলে দেন।
মুরসাল হাদিসের হুকুম:
ইমাম মুসলিম রহ. বলেন: “আমাদের ও আহলে ইলমদের দৃষ্টিতে মুরসাল দলিল নয়”।
ইমাম শাফেয়ী রহ. কয়েকটি শর্তে মুরসাল গ্রহণ করেছেন, তন্মধ্যে কতক রাবি ও কতক মতনের সাথে সম্পৃক্ত। রাবির সাথে সম্পৃক্ত তিনটি শর্ত:
১. ইরসালকারী রাবির সেকাহ হওয়া।
২. রাবির বড় তাবে‘ঈ থেকে বর্ণনা করা।
৩. ইরসালকারী রাবির সেকাহ শায়খ থেকে গ্রহণ করা।
মতনের সাথে সম্পৃক্ত চারটি শর্ত:
১. মুরসাল মতন অপর কোনো সহি সনদে বর্ণিত হওয়া।
২. মুরসাল মতন অপর তাবে‘ঈ থেকে মুরসাল বর্ণিত হওয়া।
৩. মুরসাল মতনের স্বপক্ষে কোনো সাহাবির বাণী থাকা।
৪. সাধারণ আলেমের ফতোয়া মুরসাল মোতাবেক হওয়া।

গরিব হাদিস
লেখক এখানেও ধারাক্রম রক্ষা করেননি। গরিব খবরে ওয়াহেদের একপ্রকার, তাই খবরে ওয়াহেদের অপর দু’প্রকার আযিয ও মাশহূরের সাথে এ প্রকার উল্লেখ করা শ্রেয় ছিল, যেমন অন্যান্য মুহাদ্দিস করেছেন। এ প্রকারের সম্পর্ক সনদ ও মতন উভয়ের সাথে।
غَريبٌ আরবি غربة শব্দ থেকে গৃহীত, অর্থ অপরিচিত, আগন্তুক ও বিদেশী। পরিবার ও স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অপর দেশে অপরিচিত ব্যক্তিকে গরিব বলা হয়। অপরিচিত হওয়াকে গুরবত, আর ব্যক্তিকে গরিব বলা হয়।
‘গরিবে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদিস শুধু একজন রাবি বর্ণনা করেন তাই গরিব”
সনদে গুরবতের স্থান:
সনদের তিন জায়গায় গুরবত হয়। শেষে অর্থাৎ সাহাবির স্তরে, মাঝখানে ও শুরুতে। সনদের শেষে একজন রাবি হলে হাদিস গরিব, যেমন সাহাবি থেকে কোনো হাদিসের রাবি মাত্র একজন, যদিও তার থেকে রাবির সংখ্যা অনেক। এ হাদিস পরবর্তী স্তরে মুতাওয়াতির হলেও গুরবত দূর হবে না। যেমন «إنما الأعمال بالنيات‏.‏‏.‏‏.‏» হাদিস। সাহাবি ও তাবে‘ঈর স্তরে গরিব, কিন্তু পরবর্তী স্তরে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে।
গুরবত কখনো হয় সনদের মাঝে, যেমন একাধিক রাবি থেকে বর্ণনাকারী একজন, তার থেকে বর্ণনাকারী একাধিক। গুরবত কখনো হয় সনদের শুরুতে, যেমন একাধিক রাবি থেকে একজন রাবি বর্ণনা করেন।
ইব্‌নুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ্ গরিবের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন:
"بأنه الحديث الذي يتفرد به بعض الرواة، يوصف بالغريب، وكذلك الحديث الذي يتفرد فيه بعضهم بأمر لا يذكره فيه غيره، إما في متنه، وإما في إسناده" (مقدمة ابن الصلاح).
“গরিব সে হাদিসকে বলা হয়, কতক রাবি একলা যা বর্ণনা করেন, অনুরূপ কোনো রাবি যদি হাদিসের কোনো অংশ একলা বর্ণনা করেন যা কেউ বর্ণনা করেনি, হোক সনদের অংশ কিংবা মতনের অংশ সেটাও গরিব”। এ থেকে স্পষ্ট যে, গরিব কখনো হাদিসের অংশ বিশেষ, কখনো সনদের অংশ বিশেষ হয়।
ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ গরিবের সংজ্ঞায় বলেন:
"وهو: ما يتفرد بروايته شخص واحد، في أي موضع وقع التفرد به من السند"
“যে হাদিস একজন রাবি বর্ণনা করেন তাই গরিব, সনদের যে কোনো জায়গায় একজন রাবি থাকাই যথেষ্ট”।
গরিব সাধারণত তিন প্রকার:
১. সনদ ও মতন উভয় গরিব, যেমন কোনো রাবির একলা বর্ণিত মতন।
২. সনদ গরিব কিন্তু মতন গরিব নয়, যেমন কোনো রাবি স্বীয় সনদে কোনো মতন বর্ণনা করলেন, তার সাথীদের কেউ যা বর্ণনা করেনি, তবে অপর সনদে তা বর্ণিত আছে। এখানে সনদ গবির, কিন্তু মতন গরিব নয়।
৩. মতন গরিব কিন্তু সনদ গরিব নয়, এরূপ হতে পারে না। কেউ এরূপ কল্পনা করেছেন, যা সঠিক নয়, যেমন তারা নিয়তের হাদিসের সনদকে দু’ভাগ করেন: গরিব ও মাশহূর। কারণ ১-ওমর ইব্‌নুল খাত্তাব, ২-আলকামাহ, ৩-মুহাম্মদ ইব্‌ন ইবরাহিম, ৪-ইয়াহইয়া ইব্‌ন সায়িদ পর্যন্ত সনদ গরিব, ইয়াহইয়াহ ইব্‌ন সায়িদ থেকে সনদ ও মতন উভয় মাশহূর। সনদের দ্বিতীয়াংশ ইয়াহইয়া ইব্‌ন সায়িদ থেকে গ্রন্থকার পর্যন্ত মাশহূর। তারা সনদের প্রথমাংশের বিবেচনায় মতন গরিব ও সনদের দ্বিতীয়াংশের বিবেচনায় সনদ মাশহূর বলেন। এরূপ বলা যথাযথ নয়, কারণ মতন যখন গরিব ছিল, সনদও তখন গরিব ছিল; মতন যখন প্রসিদ্ধ সনদও তখন প্রসিদ্ধ।
গরিব হাদিসের হুকুম:
১. সহি, ২. হাসান ও ৩. দ্বা‘ঈফ সবপ্রকার হতে পারে।
দুর্বল হওয়া গরিব হাদিসের প্রকৃতি। তাই মুহাদ্দিসগণ গরিব হাদিসের প্রতি তেমন ভ্রুক্ষেপ করেন না। ইমাম মালিক গরিব সম্পর্কে বলেন: “সবচেয়ে খারাপ ইলম গরিব, আর সবচেয়ে উত্তম ইলম প্রকাশ্য ইলম, যা একাধিক রাবি বর্ণনা করে”। আব্দুর রায্‌যাক বলেন: আমরা মনে করতাম গরিব ইলম ভালো, কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হল নিরেট খারাপ”। ইমাম আহমদ ইব্‌ন হাম্বল বলেন: “তোমরা এসব গরিব লিপিবদ্ধ কর না, কারণ এগুলো মুনকার, তার অধিকাংশ দুর্বল রাবিদের থেকে বর্ণিত”। তিনি আরো বলেন: “সবচেয়ে খারাপ ইলম গরিব, তার উপর আমল ও ভরসা করা যায় না”।
গরিব ও ফার্‌দের পার্থক্য:
হাফেয ইব্‌ন হাজার বলেন: “গরিব ও ফার্‌দ আভিধানিক ও পারিভাষিক দিক থেকে একে অপরের সামর্থবোধক, তবে অধিক ব্যবহার ও কম ব্যবহারের বিবেচনায় পার্থক্য রয়েছে। ফার্‌দের ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফার্‌দে মুতলাকের উপর হয়। আর গুরবতের ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফার্‌দে নিসবির উপর হয়, তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটির জায়গায় অপরটি ব্যবহার হয়”।
হাদিসুল গরিব ও গরিবুল হাদিস:
হাদিস শাস্ত্রের দু’টি পরিভাষা: ‘আল-হাদিসুল গারিব” ও ‘গারিবুল হাদিস’।الحديث الغريب যার আলোচনা আমরা এ যাবৎ করলাম। আর غريب الحديث অর্থ হাদিসের মতনে বিদ্যমান দুর্বোধ্য শব্দ। গরিবের ন্যায় অপরিচিত হওয়ার কারণে অভিধান ব্যতীত যার অর্থ জানা যায় না। ‘গারিবুল হাদিসে’র উপর লিখিত কয়েকটি গ্রন্থ:
১. গারিবুল হাদিস, লিল হারাওয়ী।
২. গারিবুল হাদিস, লিল-হারবি।
৩. নিহায়াহ, লি ইব্‌ন আসির।

মুনকাতি‘ হাদিস
إسْنَادُهُ مُنْقَطِعُ الأوْصَالِ
وَكُلُّ مَا لَمْ يَتَّصِلْ بِحَالِ

“আর প্রত্যেক হাদিস, যার সনদ কোনো অবস্থায় মুত্তাসিল হয় না, তাই মুনকাতি‘”। এ কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের অষ্টাদশ প্রকার মুনকাতি‘। হাদিসের এ প্রকারের সম্পর্ক সনদের সাথে।
‏مُنْقَطِعُ‏‏ এর আভিধানিক অর্থ: কর্তিত ও বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ, যেমন বলা হয়: العضو المنقطع عن الجسد ‘শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অঙ্গ’। ইনকিতা‘র কারণে সনদের দু’প্রান্তে ছেদ ঘটে, এক অংশ থেকে অপর অংশ বিচ্ছিন্ন হয়, তাই ইনকিতা‘ বিশিষ্ট সনদকে মুনকাতি‘ বলা হয়।
‘মুনকাতি‘’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: ‘আর যে সকল হাদিসের সনদ কোনো অবস্থাতে মুত্তাসিল হয় না তাই মুনকাতি‘’।
সনদে বিভিন্ন প্রকার ছেদ বা ইনকেতা ঘটে, তবে বিশেষ প্রকার ছেদকে পরিভাষায় ইনকিতা‘ বলা হয়, অন্যান্য ইনকিতার বিভিন্ন নাম রয়েছে। একটি হাদিসকে সামনে রেখে আমরা বিভিন্ন প্রকার ‘ইনকিতা’র অনুশীলন করি:
قال الإمام البخاري- رحمه الله- حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْحَارِثِ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي بُكَيْرٍ، حَدَّثَنَا زُهَيْرُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْجُعْفِيُّ، حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ الْحَارِثِ، خَتَنِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخِي جُوَيْرِيَةَ بِنْتِ الْحَارِثِ، قَالَ: «مَا تَرَكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدَ مَوْتِهِ دِرْهَمًا، وَلَا دِينَارًا، وَلَا عَبْدًا، وَلَا أَمَةً، وَلَا شَيْئًا إِلَّا بَغْلَتَهُ الْبَيْضَاءَ، وَسِلَاحَهُ، وَأَرْضًا جَعَلَهَا صَدَقَةً»
ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আমাদেরকে বলেছেন ইবরাহিম ইব্‌নুল হারেস, [তিনি বলেন:] আমাদেরকে বলেছেন: ইয়াহইয়া ইব্‌ন আবু বুকাইর, [তিনি বলেন:] আমাদেরকে বলেছেন: যুহাইর ইব্‌ন মুয়াবিয়াহ আল-জু‘ফি, [তিনি বলেন:] আমাদেরকে বলেছেন: আবু ইসহাক, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্যালক উম্মুল মুমিনিন জুওয়াইরিয়াহ বিনতে হারেসের ভাই আমর ইব্‌নুল হারেস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সময় দিরহাম, দিনার, গোলাম, বাঁদি ও কোনো বস্তু রেখে যাননি, তবে তার সাদা খচ্চর, হাতিয়ার ও একটুকরো জমি, যা তিনি সদকা করে গেছেন’।
এ হাদিসে ইমাম ‘বুখারি’র উস্তাদ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পাঁচজন রাবি আছেন। এ সনদের শুরু ইবরাহিম ইব্‌নুল হারিস এবং শেষ সাহাবি আমর ইব্‌নুল হারেস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু।
সনদের শুরুতে যদি ইনকিতা‘ হয়, অর্থাৎ গ্রন্থকার যদি স্বীয় উস্তাদকে বাদ দেন তাহলে মু‘আল্লাক। বায়কুনি এ প্রকার উল্লেখ করেননি। আমরা সম্পূরক হিসেবে ইনকিতার পর মু‘আল্লাক উল্লেখ করব, ইনশাআল্লাহ।
সনদের শেষে যদি ইনকিতা‘ হয়, অর্থাৎ তাবে‘ঈ যদি সাহাবিকে বাদ দিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তাহলে মুরসাল। এ সনদে আমর ইব্‌নুল হারেস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু উল্লেখ না থাকলে হাদিস মুরসাল হত। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ মানযুমার ষোড়শ পঙক্তির প্রথমাংশে মুরসালের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে আমরা সবিস্তার আলোচনা করেছি।
সনদের মাঝে ইনকিতা‘ হলে দু’অবস্থা: একজন রাবির ইনকিতা‘ অথবা দু’জন রাবির ইনকিতা‘। একজন রাবির ইনকিতা‘ হলে মুনকাতি‘। দু’জন রাবির ইনকিতা‘ হলে দু’অবস্থা: লাগাতার দু’জন রাবির ইনকিতা‘ অথবা বিচ্ছিন্নভাবে দু’জন রাবির ইনকিতা‘। লাগাতার দু’জন রাবির ইনকিতা‘ হলে মু‘দ্বাল। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ (১৮)নং পঙক্তিতে মু‘দ্বালের বর্ণনা দিয়েছেন। বিচ্ছিন্নভাবে দু’জন রাবির ইনকিতা‘ হলে মুনকাতি‘। লেখক এ পঙক্তিতে তার সংজ্ঞা দিয়েছেন।
সারাংশ: ইনকিতা‘ চার প্রকার: ১. সনদের শুরুতে ইনকিতা‘ হলে মু‘আল্লাক। ২. সনদের শেষে ইনকিতা‘ হলে মুরসাল। ৩. সনদের মাঝ থেকে ক্রমান্বয়ে দু’জন বা অধিক রাবির ইনকিতা‘ হলে মু‘দ্বাল। ৪. সনদের মাঝে একজন বা একাধিক রাবির বিচ্ছিন্নভাবে ইনকিতা‘ হলে মুনকাতি‘।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ মুনকাতি‘ হাদিসের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে ইনকিতার সবক’টি প্রকার দাখিল হয়। হোক সে ইনকিতা‘ শুরুতে, কিংবা শেষে কিংবা মাঝে। একজনের মাধ্যমে হোক কিংবা দু’জনের মাধ্যমে। ক্রমান্বয়ে হোক কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে, অর্থাৎ মুরসাল, মু‘দ্বাল ও মু‘আল্লাক সকল প্রকার মুনকাতি‘ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয়, তাই লেখকের সংজ্ঞা যথাযথ হয়নি।
মুনকাতি‘র বিশুদ্ধ সংজ্ঞা: ‘যে সনদের মধ্য ভাগ থেকে একজন রাবি বা বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক রাবি বাদ পড়ে তাই মুনকাতি‘’। ‘সনদের মধ্যভাগ থেকে’ বলার কারণে মু‘আল্লাক ও মুরসাল বাদ পড়ল, ‘বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক রাবি’ বলার কারণে মু‘দ্বাল বাদ পড়ল। এক হাদিসে কখনো একাধিক ইনকিতা‘ জমা হয়।
একজন রাবির ইনকিতা‘র উদাহরণ:‌
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ الْمَهْرِيُّ، أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، عَنْ يُونُسَ بْنِ يَزِيدَ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَر: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ الرَّأْيَ إِنَّمَا كَانَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُصِيبًا لِأَنَّ اللَّهَ كَانَ يُرِيهِ وَإِنَّمَا هُوَ مِنَّا الظَّنُّ وَالتَّكَلُّفُ»
“... ... ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মিম্বারে দণ্ডায়মান অবস্থায় বলেন: হে লোক সকল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, কারণ আল্লাহ তাকে বাতলে দিতেন। আর আমাদের সিদ্ধান্ত ধারণা ও চেষ্টা করা”।
ইমাম মুনযিরি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “এ হাদিস মুনকাতি‘, কারণ ইব্‌ন শিহাব যুহরি রহ. ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাক্ষাত পাননি, তাই সনদ মুত্তাসিল নয়”।
দু’জন রাবির ইনকিতা‘র উদাহরণ:
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ، حَدَّثَنَا مُعَمَّرُ بْنُ سُلَيْمَانَ الرَّقِّيُّ، عَنْ الْحَجَّاجِ بْنِ أَرْطَاةَ، عَنْ عَبْدِ الْجَبَّارِ بْنِ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: «اسْتُكْرِهَتِ امْرَأَةٌ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَرَأَ عَنْهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْحَدَّ، وَأَقَامَهُ عَلَى الَّذِي أَصَابَهَا، وَلَمْ يُذْكَرْ أَنَّهُ جَعَلَ لَهَا مَهْرًا»
“... ... রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক (ব্যভিচারে) বাধ্য করা হয়েছিল, ফলে তিনি তার থেকে শাস্তি অপসারণ করেন। আর যে তাকে স্পর্শ করেছিল তার উপর তিনি হদ/শাস্তি কায়েম করেন। তিনি তার জন্য মোহর ধার্য করে ছিলেন এটা উল্লেখ করা হয়নি”। ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ইমাম বুখারি বলেছেন: হাজ্জাজ ইব্‌ন আরত্বাত আব্দুল জাব্বার ইব্‌ন ওয়ায়েল থেকে শ্রবণ করেননি। আব্দুল জাব্বার তার পিতা থেকে শ্রবণ করেনি, তার পিতার মৃত্যুর পর সে জন্ম গ্রহণ করেছে।
মুনকাতি‘ হাদিসের হুকুম:
ইমাম যুহলি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “মুত্তাসিল হাদিস ব্যতীত মুনকাতি‘ দ্বারা দলিল দেওয়া বৈধ নয়”। ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আমাদের ও আহলে ইলমের নিকট মুরসাল দলিল নয়”। এখানে মুরসাল দ্বারা উদ্দেশ্য ছেদ বিশিষ্ট সনদের হাদিস, পারিভাষিক অর্থে মুরসাল উদ্দেশ্য নয়। ইমাম বায়হাকি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “মুনকাতি‘ হাদিস কোনো দলিল নয়”। কারণ অনুল্লেখ ব্যক্তির হালত অজ্ঞাত।
মুরসাল ও মুনকাতি‘র পার্থক্য:
১. ইনকিতা‘র বিবেচনায় মুরসাল ও মুনকাতি‘ উভয় সমান, তবে ইনকিতা‘ সনদের শেষে হলে মুরসাল, আর মাঝে হলে মুনকাতি‘।
২. একদল আলেম মুরসালকে দলিল মানেন, পক্ষান্তরে মুনকাতি‘ কারো নিকট দলিল নয়।
৩. সকল মুনকাতি‘কে শাহেদ হিসেবে পেশ করা যায় না, তবে মুরসালকে শাহেদ হিসেবে পেশ করা যায়।
৪. একসময় মুরসাল হাদিসের প্রচলন ছিল, মুহাদ্দিসগণ সেকাহ রাবিও বাদ দিতেন। পক্ষান্তরে কাউকে উল্লেখ করে কাউকে ত্যাগ করা অনুল্লেখ রাবির দুর্বলতা প্রমাণ করে, তাই মুনকাতি‘ হাদিসের প্রচলন কখনো ঘটেনি।
৫. মুনকাতি‘ মুরসাল থেকে অধিক দুর্বল, আর আহলে ইলম মুরসালকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেননি। দ্বিতীয়ত মুনকাতি‘ হাদিসে অনুল্লেখ রাবির মিথ্যা বলার সম্ভাবনা অধিক, কারণ সে উত্তম যুগের নয়। পক্ষান্তরে মুরসাল হাদিসে অনুল্লেখ রাবি উত্তম যুগের, যখন মিথ্যার প্রসার ঘটেনি, তাই তার মিথ্যা বলার সম্ভাবনা কম।

মু‘আল্লাক হাদিস
معلق এর আভিধানিক অর্থ ঝুলন্ত। কোনো বস্তু উপর থেকে ঝুলে নিচ থেকে মাটি স্পর্শ না করলে ‘মু‘আল্লাক’ বলা হয়।
মু‘আল্লাকের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে হাফেয ইব্‌ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “সনদের শুরু থেকে এক বা একাধিক রাবিকে অনুল্লেখ করা হলে মু‘আল্লাক বলা হয়, সকল রাবি অনুল্লেখ থাকলেও মু‘আল্লাক”।
অতএব লেখকের দিক থেকে যদি একজন রাবিকে অনুল্লেখ করা হয়, যিনি লেখকের শায়খ, অথবা দু’জন রাবি যেমন শায়খ ও শায়খের শায়খ, অথবা তিনজন অথবা সকল রাবিকে অনুল্লেখ করে বলা হয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হয়, তবুও মু‘আল্লাক। শায়খকে অনুল্লেখ করার উদাহরণ: ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন :
قَالَ مَالِكٌ: أَخْبَرَنِي زَيْدُ بْنُ أَسْلَمَ، أَنَّ عَطَاءَ بْنَ يَسَارٍ أَخْبَرَهُ، أَنَّ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ أَخْبَرَهُ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ يُكَفِّرُ اللَّهُ عَنْهُ كُلَّ سَيِّئَةٍ كَانَ زَلَفَهَا، وَكَانَ بَعْدَ ذَلِكَ الْقِصَاصُ الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ وَالسَّيِّئَةُ بِمِثْلِهَا، إِلَّا أَنْ يَتَجَاوَزَ اللَّهُ عَنْهَا»
ইমাম বুখারি এ সনদে স্বীয় শায়খকে উল্লেখ করেননি, বরং শায়খের শায়খ ইমাম মালিককে উল্লেখ করেছেন।
সনদহীন ‘মু‘আল্লাক’ যেমন ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন :
بَاب مَا جَاءَ فِي غَسْلِ الْبَوْلِ، وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِصَاحِب الْقَبْرِ: «كَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَلَمْ يَذْكُرْ سِوَى بَوْلِ النَّاسِ».
এখানে ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ পূর্ণসনদ ত্যাগ করে শুধু হাদিস উল্লেখ করেছেন।
মু‘আল্লাকের হুকুম: মু‘আল্লাক একপ্রকার দুর্বল হাদিস।
বুখারি ও মুসলিমের মু‘আল্লাকের হুকুম: বুখারির মু‘আল্লাক দু’প্রকার:
১. ইমাম বুখারি কতক হাদিস এক স্থানে মু‘আল্লাক উল্লেখ করে অপর স্থানে মুত্তাসিল উল্লেখ করেছেন, এরূপ হাদিস সহি।
২. কতক হাদিস তিনি মু‘আল্লাক উল্লেখ করেছেন, কোথাও মুত্তাসিল করেননি। এ জাতীয় হাদিস দু’ভাগে বিভক্ত:
ক. দৃঢ়তাজ্ঞাপক কর্তবাচ্যের ক্রিয়ার মু‘আল্লাক, যা প্রমাণ করে ‘মু‘আল্লাক’টি তার নিকট সহি, কিন্তু যারা তার এ জাতীয় ‘মু‘আল্লাকে’র সনদ উল্লেখ করেছেন, তাদের থেকে জানা যায়, কতক তার শর্ত মোতাবেক সহি ও কতক তার শর্ত মোতাবেক সহি না হলেও অন্যদের শর্ত মোতাবেক সহি। কতক মু‘আল্লাক হাসান। আরও কতেক হাদীস রাবির কারণে দ্বা‘ঈফ না হলেও ইনকিতার কারণে দ্বা‘ঈফ। কারণ সেগুলো কোথাও সনদসহ বর্ণিত হয় নি।
খ. অদৃঢ়তাজ্ঞাপক কর্মবাচ্যের ক্রিয়ার মু‘আল্লাক, যার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা স্পষ্ট নয়, তবে তাতে সহি ও গায়রে সহি উভয় আছে।
সহি মুসলিমের মু‘আল্লাক:
সহি মুসলিমে ‘মু‘আল্লাক’ হাদিসের সংখ্যা খুব কম। ইব্‌নুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ্ "صيانة صحيح مسلم من الإخلال والغلط" গ্রন্থে হাফেয আবু আলি গাসসানি রাহিমাহুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন, সহি মুসলিমে মাত্র ১৪-টি মুনকাতি‘ রয়েছে, মুনকাতি‘ অর্থ মু‘আল্লাক। পরবর্তীতে মুসলিম নিজে সেগুলো মুত্তাসিল বর্ণনা করেছেন, একটি হাদিস ব্যতীত। অতএব মুসলিমের মুকাদ্দামাহ ব্যতীত কোথাও মু‘আল্লাক নেই।

সমাপ্ত

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.