| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইসলাম হাউস
তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।তাঁর সমকক্ষ কেউ নয়।
মু‘দ্বাল ও মুদাল্লাস হাদিস
وَمَا أَتَى مُدَلَّسًا نَوْعَانِ
وَالْمُعْضَلُ السَّاقِطُ مِنْهُ اثْنَانِ
يَنْقُلَ عَمَّنْ فَوْقَهُ بِعَنْ وَأَنْ
الأَوَّلُ الإسْقَاطُ لِلشَّيْخِ وَأَنْ
أَوْصَافَهُ بِمَا بِهِ لا يَنْعَرِفْ
وَالثَّانِ لا يُسْقِطُهُ لَكِنْ يَصِفْ
“আর যার থেকে দু’জন রাবি পতিত তাই ‘মু‘দ্বাল’। আর মুদাল্লাস হিসেবে যা এসেছে তা দু’প্রকার। প্রথম প্রকার: নিজ শায়খকে ফেলে দেওয়া এবং শায়খের শায়খ থেকে عَنْ বা أنْ শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা। দ্বিতীয় প্রকার: নিজ শায়খকে ফেলে দিবে না, কিন্তু তার এমন বিশেষণ উল্লেখ করা যার দ্বারা সে পরিচিত হবে না”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ঊনবিংশ ও বিংশ প্রকার মু‘দ্বাল ও মুদাল্লাস। হাদিসের এ দু’প্রকারের সম্পর্ক সনদের সাথে।
মু‘দ্বাল হাদিস
معْضَلُ এর আভিধানিক অর্থ মুশকিল ও কঠিন। কঠিন বিষয়কে আরবরা বলে: أَمْرٌ عَضِيلٌ ‘কঠিন বিষয়’। একাধিক রাবি অনুল্লেখ থাকার কারণে মু‘দ্বাল হাদিসও কঠিন হয়। মানুষ তার ভালমন্দ জানে না, তাই তার থেকে উপকৃত হতে পারে না।
‘মু‘দ্বালে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “যে হাদিসের সনদ থেকে দু’জন রাবি পতিত হয় তাই ‘মু‘দ্বাল’। লেখক দু’জন রাবির বাদ পড়াকে ক্রমান্বয়ে শর্তারোপ করেননি, তাই এ সংজ্ঞা মুনকাতি‘ ও মু‘দ্বাল উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে, কারণ সনদ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দু’জন রাবির ইনকিতাকে মুনকাতি‘ বলা হয়, মু‘দ্বাল বলা হয় না। অতএব এ সংজ্ঞা যথাযথ নয়।
উদাহরণত একটি সনদে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ চার জন রাবি রয়েছেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাবি বিলুপ্ত হলে হাদিস মু‘দ্বাল, কারণ ক্রমান্বয়ে দু’জন রাবি বাদ পড়েছেন। অনুরূপ ক্রমান্বয়ে তিন বা তার অধিক রাবি বিলুপ্ত হলেও মু‘দ্বাল। আর দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্তর থেকে রাবি বিলুপ্ত হলে মুনকাতি‘, কারণ ক্রমান্বয়ে দু’জন রাবি বাদ পড়েনি। সনদের শুরু ও শেষ রাবি বাদ পড়লে হাদিস যথাক্রমে মু‘আল্লাক ও মুরসাল। প্রথম রাবি নেই হিসেবে মু‘আল্লাক, শেষ রাবি নেই হিসেবে মুরসাল। প্রথম থেকে দু’জন রাবি বাদ পড়লে মু‘দ্বাল ও মু‘আল্লাক, আর শেষ থেকে দু’জন রাবি বাদ পড়লে মু‘দ্বাল ও মুরসাল। এ সকল প্রকারই দ্বা‘ঈফ, তবে মু‘দ্বাল অধিক দ্বা‘ঈফ। মু‘দ্বালের উদাহরণ :
حَدَّثَنِي مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِلْمَمْلُوكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيقُ»
মালিক রাহিমাহুল্লাহ্ তার মুয়াত্তায় হাদিসটি মু‘দ্বাল বর্ণনা করেছেন, তবে অপর জায়গায় তিনি মুত্তাসিল বর্ণনা করেছেন, যেমন:
عن محمد بن عجلان عن أبيه عن أبي هريرة ... ...
এ সনদে মালিক ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর মধ্যবর্তী মুহাম্মদ ও তার পিতা ‘আজলান রয়েছেন। এ থেকে আমরা নিশ্চিত হলাম যে, উক্ত হাদিস থেকে দু’জন রাবি বাদ পড়েছেন।
মু‘দ্বালের হুকুম:
মু‘দ্বাল শাহেদ ও মুতাবে‘ হওয়ার উপযুক্ত নয়।
মুদাল্লাস হাদিস
مدلس শব্দটি تدليس থেকে গৃহীত, যার ধাতু دُلسة অর্থ অন্ধকার। ‘তাদলিস’ শব্দটি মূলত ব্যবহার হয় কেনাকাটায়। ক্রেতাদের বিভ্রাটে ফেলার জন্য পশু মোটা-তাজা করাকে তাদলিস বলা হয়। অনুরূপ গাভীর স্তনে দুধ জমা করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করাও তাদলিস, কারণ তার দ্বারা ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়া হয়।
তাদলিস দু’প্রকার:
১. তাদলিসুল ইসনাদ ও ২. তাদলিসুস শুয়ুখ। কেউ তাদলিসকে তিনভাগে ভাগ করেছেন, তৃতীয় প্রকার-৩. তাদলিসুত তাসওয়িয়াহ। নিম্নে সংজ্ঞাসহ প্রত্যেক প্রকার প্রদত্ত হল:
১. تدليس الإسناد ‘তাদলিসুল ইসনাদ’ প্রসঙ্গে লেখক বলেন: নিজ শায়খকে বাদ দিয়ে পরবর্তী শায়খ থেকে عن বা أن শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা, যেন সনদ মুত্তাসিল বুঝা যায়, যেমন বলা: حدثنا فلان عن فلان كذا অথবা বলা: حدثنا فلان أنَّ فلانا قال كذا এখানে أنَّ তাশদীদ যুক্ত, লেখক কবিতার অন্ত্যমিলের জন্য أن সাকিন যুক্ত উল্লেখ করেছেন।
‘তাদলিসুল ইসনাদ’ প্রসঙ্গে খতিব, ইব্নুস সালাহ, নববি, ইব্ন কাসির, ইব্নুল মুলাক্কিন ও ইরাকি প্রমুখ বলেন: ‘শায়খ থেকে অশ্রুত হাদিস রাবির এমনভাবে বর্ণনা করা যে, শ্রোতাগণ মনে করেন তিনি এ হাদিসও শায়খ থেকে শ্রবণ করেছেন’। অথবা ‘রাবি সমকালীন কোনো মুহাদ্দিস থেকে এমনভাবে হাদিস বর্ণনা করবেন, যার সাথে তার সাক্ষাত হয়নি, যেন শ্রোতাগণ মনে করেন তিনি তার থেকে হাদিস গ্রহণ করেছেন’।
সুলাইমানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আলেমগণ মুদাল্লিসদের নির্দিষ্ট করে ফেলেছেন, তাই এ নিয়ে অধিক ঘাটাঘাটি করা ফলদায়ক নয়, তবে এখনো কতক মুদাল্লিসকে জানা সম্ভব, যাদেরকে তারা মুদাল্লিসদের কাতারে শামিল করেননি, কারণ তাদের তাদলিস খুব কম। আল্লাহ ভালো জানেন”।
২. تدليس الشيوخ ‘তাদলিসুশ শুয়ুখ’ প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “রাবি নিজ শায়খকে উহ্য করবে না ঠিক, তবে তার অপরিচিত গুণ বর্ণনা করবে, যা তাকে চিহ্নিত করবে না”। অর্থাৎ মুদাল্লিস শায়খকে উল্লেখ না করে তার উপাধি, গুণাগুণ, পদবী বা উপনাম উল্লেখ করবে, যার ফলে মানুষের নিকট সে পরিচিত হবে না, অজ্ঞাতই থাকবে।
এ প্রকার সনদ পূর্বোক্ত তাদলিসুল ইসনাদ অপেক্ষা কম দোষণীয়। যদি রাবি শায়খের দুর্বলতার কারণে এরূপ করে তাহলে খিয়ানত। মুদাল্লিসের শায়খের কারণে কখনো তাদলিসুল ইসনাদ নিকৃষ্টতর, কখনো হয় তাদলিসুস শুয়ুখ, তবে স্বাভাবিক হালতে তাদলিসুল ইসনাদ নিন্দনীয়। কারণ তাদলিসুস শুয়ূখে অনুল্লেখ রাবি জানা অধিকতর সহজ, যা তাদলিসুল ইসনাদে সম্ভব নয়।
৩. تدليس التسوية তাদলিসুত তাসওয়িয়াহ লেখক উল্লেখ করেননি। এ প্রকারের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে হাফেয ইরাকি রহ. বলেন: ‘মুদাল্লিস’ একটি হাদিস বর্ণনার ইচ্ছা করে, যা সে তার সেকাহ শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে, কিন্তু তার সেকাহ শায়খ শ্রবণ করেছে দুর্বল শায়খ থেকে, মুদাল্লিস এখানে শায়খের শায়খ তথা দুর্বল শায়খকে ফেলে অস্পষ্ট শব্দ দ্বারা বর্ণনা করে, যেন বুঝা যায় সনদের সকল রাবি সেকাহ। কখনো বয়স কমের কারণে মুদাল্লিস শায়খের শায়খকে ফেলে দেয়, যদিও সে সেকাহ হয়।
‘আলায়ি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “এ প্রকার তাদলিস সাধারণত রাবির দুর্বলতার কারণে করা হয়। এ তাদলিস নিকৃষ্ট ও সবচেয়ে খারাপ, তবে অন্যান্য প্রকারের তুলনায় তার সংখ্যা কম”। সুলাইমানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “এখানে কম দ্বারা উদ্দেশ্য তাদলিসুল ইসনাদ ও তাদলিসুস শুয়ূখ অপেক্ষা কম, কিন্তু যারা এতে লিপ্ত হয়েছে তাদের সংখ্যা কম নয়। আমার নিকট তাদের সংখ্যা (১৯) পর্যন্ত রয়েছে।
তাদলিস করার কারণ:
তাদলিস করে রাবি কখনো নিজেকে গোপন করতে চান, যেন কেউ না বলে তিনি অমুক শায়খ থেকে হাদিস গ্রহণ করেছেন। কখনো রাজনৈতিক কারণে তাদলিস করা হয়। কখনো শাসক বা কারো থেকে রাবি নিজের উপর ক্ষতির আশঙ্কা করে তাদলিস করেন। কখনো শায়খের স্মরণ শক্তি কম, বা দীনদারী কম বা তার চেয়ে মর্যাদায় ছোট ইত্যাদি করণে রাবি তাদলিস করেন।
শায়খকে উল্লেখ না করার কারণ অনেক, তবে আদিল না হওয়ার কারণে শায়খকে বাদ দেওয়া সবচেয়ে খারাপ। এ জাতীয় তাদলিস হারাম, কারণ হতে পারে হাদিসটি বাদ পড়া রাবির মিথ্যা রচনা। অতএব মুদাল্লিস সেকাহ হলেও তার হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ না সে শায়খ থেকে শোনার কথা স্পষ্ট বলে।
তাদলিসের বিধান:
তাদলিস করা হারাম, কারণ তাদলিস একপ্রকার ধোঁকা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنَّا».
“যে ধোঁকা দিল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়”। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের দোষ গোপনকারীকে বলেছেন, তাহলে হাদিসের সনদের দোষ গোপনকারীর পরিণতি আরো জঘন্য হবে সন্দেহ নেই। তবুও অনেক তাবে‘ঈ ও পরবর্তী মনীষীগণ কিছু কারণে তাদলিস করতেন, যার পশ্চাতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিথ্যা সম্পৃক্ত করার দুঃসাহস কিংবা মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ছিল না, বরং ভালো উদ্দেশ্যে ছিল। এ কারণেও আমরা তাদেরকে দায় মুক্ত বলতে পারি না। আমরা বলব: তারা মুজতাহিদ ছিলেন, তারা তাদের ইজতিহাদের সওয়াব পাবেন, কিন্তু তারা যদি প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করে দিতেন, তাহলে অনেক ভালো ছিল ও সুন্দর হত সন্দেহ নেই।
শায ও মাকলুব হাদিস
فَالشَّاذُ وَالْمَقْلُوْبُ قِسْمَانِ تَلا وَمَا يُخَالِفْ ثِقَةٌ فِيْهِ الْمَلا
وَقَلْبُ إسْنَادٍ لِمَتْنٍ قِسْمُ
إبْدَالُ رَاوٍ مَا بِرَاوٍ قِسْمُ
“আর যেখানে সেকাহ রাবি বৃহৎ সংখ্যক রাবির বিরোধিতা করে তাই শায। আর শাযের অনুগামী মাকলুব দু’প্রকার: সনদের কোনো রাবিকে অপর রাবি দ্বারা পরিবর্তন করা একপ্রকার। আর মতনের জন্য সনদ পরিবর্তন করা আরেক প্রকার”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের একবিংশ ও দ্বাবিংশ প্রকার শায ও মাকলুব। এ প্রকারের সম্পর্ক সনদ ও মতন উভয়ের সাথে।
শায হাদিস
شاذ শব্দটি شذوذ থেকে গৃহীত, যার অর্থ একাকী, বিচ্ছিন্ন, দলছুট ও নীতি মুক্ত। হাদিসে এসেছে:
“আল্লাহ এ উম্মতকে কখনো গোমরাহির উপর একত্র করবেন না, আর জামাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে, অতএব যে দলছুট বা বিচ্ছিন্ন হল, সে জাহান্নামে ছিটকে পড়ল”।
‘শায’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “একাধিক সেকাহ রাবির বিপরীত একজন সেকাহ রাবির বর্ণনাকে শায বলা হয়”। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ সেকার বিপরীত ملأ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ কওমের নেতৃবৃন্দ ও প্রধান ব্যক্তিবর্গ, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
قَالَ ٱلۡمَلَأُ ٱلَّذِينَ ٱسۡتَكۡبَرُواْ مِن قَوۡمِهِۦ لَنُخۡرِجَنَّكَ يَٰشُعَيۡبُ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَعَكَ مِن
“তার কওম থেকে যে নেতৃবৃন্দ অহংকার করেছিল তারা বলল, ‘হে শু‘আইব, আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে অবশ্যই আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে’। সে বলল, ‘যদিও আমরা তা অপছন্দ করি তবুও?”
হাদিস শাস্ত্রে ملأ বা প্রধান ব্যক্তিবর্গ হলেন অধিক সেকাহ রাবিগণ, যাদের আদালত ও দ্বাবত সবার নিকট স্বীকৃত। তাদের একজনকেও ملأ বলা হয়, কারণ তার আদালত, স্মৃতি শক্তি ও যথাযথ হাদিস সংরক্ষণ করা, তার নিম্নপর্যায়ের একাধিক রাবির আদালত, স্মৃতি শক্তি ও যথাযথ হাদিস সংরক্ষণ করা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর ও অধিক নির্ভুল। এ জন্য একলা ইবরাহিম ‘আলাইহিস সালামকে উম্মত বলা হয়েছে, অথচ উম্মত অর্থ একটি জাতি। ইরশাদ হচ্ছে:
﴿ إِنَّ إِبۡرَٰهِيمَ كَانَ أُمَّةٗ قَانِتٗا لِّلَّهِ حَنِيفٗا وَلَمۡ يَكُ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٢٠ ﴾ [النحل: ١٢٠]
“নিশ্চয় ইবরাহীম ছিলেন এক উম্মত, আল্লাহর একান্ত অনুগত ও একনিষ্ঠ। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না”। অতএব সেকাহ রাবি অপেক্ষাকৃত কম সেকাহ রাবির বিবেচনায় ملأ বা জামাত। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ এখানে একশব্দ দ্বারা শাযের দু’প্রকারকে নির্দেশ করে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সেকাহ রাবি যদি অধিক সেকাহ বা একাধিক সেকাহ রাবির বিরোধিতা করে, তাহলে তার বর্ণিত হাদিস শায।
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ শাযের সংজ্ঞায় বলেন:
"مخالفة المقبول لمن هو أولى منه" (النزهة:صـ98)
“মাকবুল রাবির তার চেয়ে উত্তম রাবির বিরোধিতা করা শায”। এখানে মাকবুল দ্বারা উদ্দেশ্য সহি ও হাসান হাদিসের রাবি, আর উত্তম দ্বারা উদ্দেশ্য এক বা একাধিক সেকাহ রাবি। অর্থাৎ মাকবুল রাবি একাধিক মাকবুল কিংবা অধিক সেকাহ রাবির বিরোধিতা করলে তার হাদিস শায।
বিরোধিতা দ্বারা উদ্দেশ্য:
মানযুমার ব্যাখ্যাকার সুলাইমানি রহ. বলেন: “বিরোধিতার অর্থ শব্দের বৃদ্ধি, যাতে অতিরিক্ত অর্থ রয়েছে। মকবুল রাবির হাদিসে যদি সেকাহ রাবির তুলনায় অতিরিক্ত শব্দ থাকে তাই শায। উভয়ের মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব হোক বা না-হোক। এটা বিজ্ঞ মুহাদ্দিসদের অভিমত।
কেউ বলেন: সেকাহ রাবির হাদিস যদি মকবুল রাবির হাদিসের সাথে পুরোপুরি সাংঘষির্ক হয়, তাহলে মকবুল রাবির হাদিস শায, নচেৎ নয়। এ কথা ঠিক নয়। এ সংজ্ঞা মোতাবেক শাযের উদাহরণ পাওয়া দুষ্কর। ফকিহ ও মুহাদ্দিসদের নিকট এমন শায নেই যার সাথে মাহফুযের সমন্বয় করা সম্ভব নয়। ‘ইলালের উপর লিখিত গ্রন্থসমূহ দেখলে অনুমিত হয় যে, তারা এমন অনেক বৃদ্ধির উপর শাযের বিধান আরোপ করেছেন, যেখানে মূল বর্ণনার সাথে তার কোনো বিরোধ নেই, বরং কতক শায মূল হাদিসের সম্পূরক, তবুও তারা শায বলেছেন, যেমন কুকুরে চাটা পাত্রকে পবিত্র করার হাদিসে فَلْيُرِقْهُ শব্দের বৃদ্ধিকে মুহাদ্দিসগণ শায বলেছেন”। ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
وحَدَّثَنِي عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ السَّعْدِيُّ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُسْهِرٍ، أَخْبَرَنَا الأَعْمَشُ، عَنْ أَبِي رَزِينٍ وَأَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا وَلَغَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ، فَلْيُرِقْهُ، ثُمَّ لِيَغْسِلْهُ سَبْعَ مِرَارٍ » وحَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَّاحِ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيل بْنُ زَكَرِيَّاءَ، عَنِ الأَعْمَشِ، بِهَذَا الإِسْنَادِ مِثْلَهُ، وَلَمْ يَقُلْ: فَلْيُرِقْهُ
এ হাদিসে ইমাম মুসলিমের উস্তাদ আলি ইব্ন হুজর আসসা‘য়েদি; তার উস্তাদ আলি ইব্ন মুসহির; তার উস্তাদ আ‘মাশ; তার উস্তাদ আবু রাযিন ও আবু সালেহ; তার উস্তাদ সাহাবি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِذَا وَلَغَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ، فَلْيُرِقْهُ، ثُمَّ لِيَغْسِلْهُ سَبْعَ مِرَارٍ»
“যখন তোমাদের কারো পাত্র কুকুর চাটে, সে যেন তাতে যা আছে তা ঢেলে ফেলে দেয়, অতঃপর সাতবার তা ধুয়ে নেয়”। এ হাদিসের অপর সনদে মুসলিমের উস্তাদ: মুহাম্মদ ইব্ন সাব্বাহ; তার উস্তাদ ইসমাইল ইব্ন যাকারিয়্যা; তার উস্তাদ আ‘মাশ; অতঃপর সনদ পূর্ববৎ, কিন্তু আ‘মাশ থেকে ইসমাইল ইব্ন যাকারিয়্যা فَلْيُرِقْهُ শব্দ বলেননি।
‘আ‘মাশে’র দু’জন ছাত্র: আলি ইব্ন মুসহির ও ইসমাইল ইব্ন যাকারিয়্যা। তাদের থেকে সনদ দু’ভাগ হয়েছে। মুসলিম বলেন: দু’জনের সনদ ও হাদিস হুবহু এক, তবে ইসমাইল فَلْيُرِقْهُ শব্দ বৃদ্ধি করেননি, যা আলি ইব্ন মুসহির বৃদ্ধি করেছেন। উভয়ের হাদিসে পার্থক্য শুধু এখানেই।
আলি ও ইসমাইল উভয়ে সমপর্যায়ের রাবি, তবে ইসমাইলের অনেক মুতাবে‘ ও অনুসারী হাদিস রয়েছে, যা আলি ইব্ন মুসহিরের পক্ষে নেই, স্বয়ং মুসলিম ইসমাইলের স্বপক্ষে তিনটি মুতাবে‘ উল্লেখ করেছেন, যেগুলোয় فَلْيُرِقْهُ শব্দের বৃদ্ধি নেই, যথা:
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، قَالَ: قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا شَرِبَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ، فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ»
“তোমাদের কারো পাত্রে যখন কুকুর পান করে, সে যেন তা সাতবার ধৌত করে”।
দ্বিতীয় মুতাবি‘:
وحَدَّثَنَا زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيل بْنُ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ هِشَامِ بْنِ حَسَّانَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طَهُورُ إِنَاءِ أَحَدِكُمْ، إِذَا وَلَغَ فِيهِ الْكَلْبُ، أَنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ، أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ»
“তোমাদের কারো পাত্রে যখন কুকুর চাটে, তার পবিত্রতা হচ্ছে পাত্রটিকে সাতবার ধোয়া, প্রথমবার মাটি দ্বারা”।
তৃতীয় মুতাবি‘:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، حَدَّثَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ، قَالَ: هَذَا مَا حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ، عَنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ أَحَادِيثَ مِنْهَا، وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طَهُورُ إِنَاءِ أَحَدِكُمْ، إِذَا وَلَغَ الْكَلْبُ فِيهِ، أَنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ»
“তোমাদের কারো পাত্রের পবিত্রতা, যখন কুকুর তাতে চাটে, পাত্রটিকে সাতবার ধোয়া”।
চতুর্থ মুতাবি‘: ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الْأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا شَرِبَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعًا»
“যখন কুকুর তোমাদের কারো পাত্রে পান করে, সে যেন তা সাতবার ধৌত করে”।
এখানে ইসমাইল ইব্ন যাকারিয়্যার অনুসারী চারটি মুতাবে‘ বা অনুসারী হাদিস দেখলাম, কেউ আলি ইব্ন মুসহিরের ন্যায় فَلْيُرِقْهُ শব্দের বৃদ্ধি করেননি।
হাফেয ইব্ন হাজার বলেন: “ইমাম নাসায়ি বলেন: আমাদের জানা মতে এ হাদিসে فَلْيُرِقْهُ শব্দ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আলি ইব্ন মুসহিরের কোনো মুতাবে‘ বা অনুসারী হাদিস নেই। হামযাহ আল-কিনানি বলেন: ‘আলি ইব্ন মুসহিরের হাদিস মাহফুয নয় [অর্থাৎ শায], ইব্ন আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘আ‘মাশে’র হাফেয ছাত্র শু‘বা ও আবু মু‘আবিয়া এ শব্দ বৃদ্ধি করেননি। ইব্ন মানদাহ বলেন: আলি ইব্ন মুসহির ব্যতীত কোনো সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ শব্দের বৃদ্ধি জানা যায়নি”।
আমরা ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহু থেকে জানলাম যে, মুহাদ্দিসগণ আলি ইব্ন মুসহিরের বৃদ্ধিকে শায বলেছেন, অথচ উভয় বর্ণনায় কোনো বৈপরীত্য নেই। দ্বিতীয়ত কুকুরে চাটা পাত্র পবিত্র করার পূর্বে পানি ফেলে দেওয়া জরুরি, যা فَلْيُرِقْهُ শব্দের অর্থ, কারণ কুকুরে চাটা বস্তু পাত্রে রেখে পবিত্র করা সম্ভব নয়, তবুও فَلْيُرِقْهُ শব্দের বৃদ্ধিকে আলেমগণ শায বলেছেন। অতএব আমাদের নিকট প্রমাণিত হল যে, মাকবুল রাবি যদি একাধিক সেকাহ কিংবা তার চেয়ে উত্তম রাবির বিপরীত কোনো শব্দ বৃদ্ধি করেন, যার অতিরিক্ত অর্থ রয়েছে তাই শায, যেমন এখানে আলি ইব্ন মুসহির বর্ণিত فَلْيُرِقْهُ শব্দ শায।
এ উম্মতের প্রথম যুগের আলেমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ নিঃসৃত বাণীকে হুবহু সংরক্ষণ করার জন্য কি পরিমাণ চেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করেছেন, দেখলে অবাক লাগে। দীনের দুশমন এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর শত্রু ব্যতীত কেউ উম্মতের প্রথম যুগের মনীষীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না।
আজান পরবর্তী দো‘আয় إِنَّكَ لا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ বৃদ্ধি শায:
قال الإمام البخاري -رحمه الله- في صحيحه- حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعَيْبُ بْنُ أَبِي حَمْزَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ، اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
আমরা এ সনদে দেখছি: ইমাম বুখারির উস্তাদ আলি ইব্ন ‘আইয়াশ; তার উস্তাদ শু‘আইব ইব্ন আবু হামযাহ; তার উস্তাদ মুহাম্মদ ইব্ন মুনকাদির; তার উস্তাদ সাহাবি জাবের ইব্ন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে কেউ আযান শ্রবণ করার পর বলল:
«اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ»
কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ তার জন্য অবধারিত হয়ে গেল”।
قال الإمام الترمذي –رحمه الله- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَهْلِ بْنِ عَسْكَرٍ الْبَغْدَادِيُّ، وَإِبْرَاهِيمُ بْنُ يَعْقُوبَ، قَالَا: حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ الْحِمْصِيُّ، حَدَّثَنَا شُعَيْبُ بْنُ أَبِي حَمْزَةَ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ إِلَّا حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ».
এ সনদে দেখছি ইমাম তিরমিযির উস্তাদ দু’জন: মুহাম্মদ ইব্ন সাহাল ইব্ন আসকার বাগদাদি ও ইবরাহিম ইব্ন ইয়া‘কুব; অতঃপর সাহাবি পর্যন্ত ইমাম বুখারি ও তার সনদ পূর্ববৎ। ইমাম তিরমিযি (মৃ.২৫৬হি.) ও ইমাম বুখারি (মৃ.২৫৬হি.) উভয়ে সমবয়সী ও এক যুগের, তবে তিরমিযি ছিলেন ছাত্র ও বুখারি ছিলেন উস্তাদ। এ হাদিস ইমাম তিরমিযি ইমাম বুখারি ব্যতীত অপর দু’উস্তাদ মুহাম্মদ ইব্ন সাহাল ও ইবরাহিম ইব্ন ইয়াকুব থেকে নিয়েছেন।
قال الإمام أبو داود –رحمه الله- حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ حَنْبَلٍ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ، حَدَّثَنَا شُعَيْبُ بْنُ أَبِي حَمْزَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّه، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، إِلَّا حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
এ সনদে দেখছি ইমাম আবু দাউদ (মৃ২৭৫হি.) এর উস্তাদ ইমাম আহমদ ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ্ (মৃ২৪১হি.); তারপর থেকে বুখারি, তিরমিযি ও আবু দাউদের সনদ পূর্ববৎ।
قال الإمام النسائي –رحمه الله- أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ مَنْصُورٍ، قال: حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ، قال: حَدَّثَنَا شُعَيْبٌ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرٍ، قال: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ الْمَقَامَ الْمَحْمُودَ الَّذِي وَعَدْتَهُ، إِلَّا حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
এ সনদে দেখছি ইমাম নাসায়ির উস্তাদ আমর ইব্ন মানসুর; তারপর থেকে বুখারি, তিরমিযি, আবু দাউদ ও নাসায়ির সনদ পূর্ববৎ।
قال الإمام ابن ماجة –رحمه الله- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى، وَالْعَبَّاسُ بْنُ الْوَلِيدِ الدِّمَشْقِيُّ، وَمُحَمَّدُ بْنُ أَبِي الْحُسَيْنِ، قَالُوا: حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ الْأَلْهَانِيُّ، حَدَّثَنَا شُعَيْبُ بْنُ أَبِي حَمْزَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، إِلَّا حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
এ সনদে দেখছি ইব্ন মাজাহ রাহিমাহুল্লাহর উস্তাদ তিনজন: মুহাম্মদ ইব্ন ইয়াহইয়া, আব্বাস ইব্ন ওয়ালিদ দিমাশকি ও মুহাম্মদ ইব্ন আবুল হুসাইন; তারপর থেকে বুখারি, তিরমিযি, আবু দাউদ, নাসায়ি ও ইব্ন মাজার সনদ পূর্ববৎ। সবার সনদে আলি ইব্ন আইয়াশ আছেন। তারা ব্যতীত ইব্ন খুযাইমাহ, ইব্ন হিব্বান ও অনেক মুহাদ্দিস অভিন্নভাবে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
ইমাম বায়হাকি রাহিমাহুল্লাহ্ (মৃ.৪৫৮হি.) সুনানে সাগির গ্রন্থে তাদের সবার বিরোধিতা করে বর্ণনা করেন:
قال الإمام البيهقي –رحمه الله- في السنن الصغير- أَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللَّهِ الْحَافِظُ، وَأَبُو نَصْرٍ أَحْمَدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ أَحْمَدَ الْفَامِيُّ، قَالا: ثنا أَبُو الْعَبَّاسِ مُحَمَّدُ بْنُ يَعْقُوبَ، ثنا مُحَمَّدُ بْنُ عَوْفٍ، ثنا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ، ثنا شُعَيْبُ بْنُ أَبِي حَمْزَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءُ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِحَقِّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ الْمَقَامَ الْمَحْمُودَ الَّذِي وَعَدْتَهُ إِنَّكَ لا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي».
এ হাদিসে দো‘আর শেষে إِنَّكَ لا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ অতিরিক্ত রয়েছে। অথচ তার সনদেও আলি ইব্ন আইয়াশ আছেন, যার পর থেকে সবার সনদ পূর্ববৎ।
আলি ইব্ন আইয়াশের ছাত্রগণ:
১. ইমাম বুখারি;
২. মুহাম্মদ ইব্ন সাহাল ইব্ন আসকার বাগদাদি ও ইবরাহিম ইব্ন ইয়াকুব, তাদের ছাত্র ইমাম তিরমিযি;
৩. আহমদ ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন হাম্বল, তার ছাত্র ইমাম আবু দাউদ;
৪. আমর ইব্ন মানসুর, তার ছাত্র ইমাম নাসায়ি;
৫. মুহাম্মদ ইব্ন ইয়াহইয়া, আব্বাস ইব্ন ওয়ালিদ দিমাশকি ও মুহাম্মদ ইব্ন আবুল হুসাইন, তাদের ছাত্র ইমাম ইব্ন মাজাহ;
৬. মুসা ইব্ন সাহাল রামলি, তার ছাত্র ইব্ন খুযাইমাহ;
৭. মুহাম্মদ ইব্ন ইয়াহইয়া, তার ছাত্র ইব্ন খুযাইমাহ, তার ছাত্র ইব্ন হিব্বান। তারা কেউ আযান পরবর্তী দো‘আয় إِنَّكَ لا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ বৃদ্ধি বর্ণনা করেননি।
তাদের সবার বিরোধিতা করে ‘আলি ইব্ন ‘আইয়াশের অপর ছাত্র মুহাম্মদ ইব্ন ‘আউফ إِنَّكَ لا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ বৃদ্ধি করেছেন, যদিও তিনি সেকাহ ও নির্ভরযোগ্য। তার থেকে আবুল আব্বাস মুহাম্মদ ইব্ন ইয়া‘কুব, তার থেকে হাকেম আবু আব্দুল্লাহ ও আবু নাসর আহমদ ইব্ন আলি ইব্ন আহমদ আল-ফামি এবং তাদের থেকে ইমাম বায়হাকি বর্ণনা করেছেন। অতএব বায়হাকির বর্ণনা শায ও গায়রে মাহফুয। এখানে বৃদ্ধি ঘটেছে ‘আলি ইব্ন ‘আইয়াশের ছাত্র মুহাম্মদ ইব্ন ‘আউফ থেকে, কারণ তার দু’জন ছাত্র: আবুল আব্বাস ও হাকেম থেকে বায়হাকি অভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ ভালো জানেন।
আযান পরবর্তী দো‘আয় وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيعَةَ বৃদ্ধি শায:
ইমাম নাসায়ির ছাত্র ইব্নু সুন্নি (মৃ.৩৬৪হি.) তাদের সবার বিরোধিতা করে বর্ণনা করেন:
قال الإمام ابن السني –رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ مَنْصُورٍ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَيَّاشٍ، حَدَّثَنَا شُعَيْبٌ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: «اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيعَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
এ সনদে আযান পরবর্তী দো‘আয় وَالْفَضِيلَةَ শব্দের পর وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيعَةَ বাক্যের বৃদ্ধি ঘটেছে। অথচ এ সনদেও ‘আলি ইব্ন ‘আইয়াশ আছেন, তার থেকে ‘আমর ইব্ন মানসুর, তার থেকে আবু আব্দুর রহমান, তথা ইমাম নাসায়ি। আমরা পূর্বে দেখেছি ইমাম নাসায়ি তার সুনান গ্রন্থে স্বীয় উস্তাদ ‘আমর ইব্ন মানসুর থেকে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু সেখানে وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيعَةَ শব্দের বৃদ্ধি নেই। তাই আমরা নিশ্চিত ‘আলি ইব্ন ‘আইয়াশের ছাত্র ‘আমর ইব্ন মানসুর কিংবা তার ছাত্র ইমাম নাসায়ি থেকে বৃদ্ধি ঘটেনি, খুব সম্ভব ইব্ন সুন্নি থেকে এ বৃদ্ধি ঘটেছে। আল্লাহ ভালো জানেন।
মুদ্দাকথা: ইব্ন সুন্নির বর্ণনা বায়হাকিসহ সকল মুহাদ্দিসের বিপরীত, অনুরূপ বায়হাকির বর্ণনা ইব্ন সুন্নিসহ সকল মুহাদ্দিসের বিপরীত, তাই তাদের বর্ণনা শায, যা একপ্রকার দুর্বল হাদিস; পক্ষান্তরে ইমাম বুখারি প্রমুখদের বর্ণনা মাহফুয ও সহি। অতএব আযানের দো‘আয় এ দু’টি শব্দ বৃদ্ধি করা দুরস্ত নয়।
মুসলিমের হাদিসে لَا يَرْقُونَ শব্দের বৃদ্ধির শায:
قال الإمام مسلم –رحمه الله- حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ، حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، أَخْبَرَنَا حُصَيْنُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، قَالَ: " كُنْتُ عِنْدَ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، فَقَالَ: ... ... وَلَكِنْ حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: « ... ... هُمُ الَّذِينَ لَا يَرْقُونَ، وَلَا يَسْتَرْقُونَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ»
... ... তবে আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমাদেরকে বলেন, তিনি বলেছেন: “তারাই, যারা ঝাড়-ফুঁক করে না, ঝাড়-ফুঁক তলব করে না, কুলক্ষণ গ্রহণ করে না এবং তাদের রবের উপর তারা তাওয়াক্কুল করে”।
قال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنِي إِسْحَاقُ، حَدَّثَنَا رَوْحُ بْنُ عُبَادَةَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ: سَمِعْتُ حُصَيْنَ بْنَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ قَالَ: كُنْتُ قَاعِدًا عِنْدَ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، فَقَالَ: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعُونَ أَلْفًا بِغَيْرِ حِسَابٍ، هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُونَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ»
... ... আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার উম্মত থেকে শত্তুর হাজার বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে; যারা ঝাড়-ফুঁক তলব করে না, কুলক্ষণ গ্রহণ করে না এবং তাদের রবের উপর তারা তাওয়াক্কুল করে”।
আমাদের সামনে ইমাম মুসলিম ও বুখারির দু’টি সনদে একটি হাদিস বিদ্যমান। মুসলিমের সনদে لَا يَرْقُونَ রয়েছে, যা ইমাম বুখারির সনদে নেই। উভয় ইব্ন আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তাই হাদিস এক। ইব্ন আব্বাস (মৃ.৬৮হি.); এর ছাত্র সা‘ঈদ ইব্ন জুবায়ের (মৃ.৯৫হি.); তার ছাত্র হুসাইন ইব্নে আব্দুর রহমান (মৃ.১৩৬হি.); তার ছাত্র দু’জন: শু‘বা (মৃ.১৬০হি.) ও হুশাইম (মৃ.১৮৩হি.) থেকে বুখারি ও মুসলিমের সনদ ভাগ হয়েছে। শু‘বার ছাত্র রাওহু ইব্নু উবাদাহ (মৃ২০৫হি.), তার ছাত্র ইসহাক (মৃ২৫১হি.), তার ছাত্র ইমাম বুখারি (মৃ.২৫৬হি.)। আর হুশাইমের ছাত্র সা‘ঈদ ইব্ন মানসুর (মৃ.২২৭হি.); তার ছাত্র ইমাম মুসলিম (মৃ.২৬১হি.)।
হাদিসটি ইমাম বুখারি নিয়েছেন হুসাইনের ছাত্র শু‘বা থেকে, ইমাম মুসলিম নিয়েছেন হুসাইনের ছাত্র হুশাইম থেকে। হুশাইমের হাদিসে لَا يَرْقُونَ রয়েছে, শু‘বার হাদিসে যা নেই। যদিও উভয়ই সেকাহ , তবে হুশাইম অপেক্ষা শু‘বা অধিক সেকাহ, তাই শু‘বার হাদিস মাহফুয ও হুশাইমের বৃদ্ধি শায। দ্বিতীয়ত শু‘বার স্বপক্ষে শাহেদ ও মুতাবি‘ রয়েছে, যা হুশাইমের পক্ষে নেই। অতএব হুশাইমের لَا يَرْقُونَ বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয়।
শায়খুল ইসলাম ইব্নে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: لَا يَرْقُونَ বৃদ্ধি শায, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম ঝাড়ফুঁক করেছেন, অতএব মতনের এ বাক্য হাদিস হতে পারে না। ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ الْمِنْهَالِ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعَوِّذُ الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنَ، وَيَقُولُ: إِنَّ أَبَاكُمَا كَانَ يُعَوِّذُ بِهَا إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ»
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইনকে ঝাড়-ফুঁক করতেন এবং বলতেন: নিশ্চয় তোমাদের পিতা ইবরাহিম নিম্নের বাক্যগুলো দ্বারা ইসমাইল ও ইসহাককে ঝাঁড়ফুক করতেন:
«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ»
জ্ঞাতব্য: অপরকে ঝাড়-ফুঁক করা ও অপরের নিকট তলব করা এক নয়। কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক ঝাঁড়-ফুককারী অপরকে উপকার করে, যা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়, কিন্তু ঝাড়-ফুঁক তলবকারী অপরের নিকট নিজের প্রয়োজন পেশ করে, যা বৈধ হলেও উঁচু পর্যায়ের তাওয়াক্কুল পরিপন্থী।
এ হাদিসে দু’টি দোষ: একটি সেকাহ রাবির বিরোধিতা অপরটি ইল্লত। হুশাইম لَا يَرْقُونَ শব্দ বৃদ্ধি করে তার চেয়ে অধিক সেকাহ রাবির বিরোধিতা করেছেন তাই তার হাদিস শায; দ্বিতীয়ত এ শব্দ প্রমাণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরীলের কর্ম উঁচু পর্যায়ের তাওয়াক্কুল পরিপন্থী ছিল তাই হাদিসটি মু‘আল্।
এক হাদিস অপর হাদিসের কারণে শায হয়:
শাযের জন্য এক হাদিস হওয়া জরুরি নয়, কখনো ভিন্ন দু’টি হাদিস একটির কারণে অপরটি শায হয়, যেমন:
قال الإمام أبو داود -رحمه الله- حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ: قَدِمَ عَبَّادُ بْنُ كَثِيرٍ الْمَدِينَةَ، فَمَالَ إِلَى مَجْلِسِ الْعَلَاءِ فَأَخَذَ بِيَدِهِ فَأَقَامَهُ، ثُمَّ قَالَ: اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا يُحَدِّثُ عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ، فَلَا تَصُومُوا»
“... ... আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যখন শাবানের অর্ধেক হয়, তোমরা সিয়াম রেখ না”। আবু দাউদসহ অন্যান্য সুনান গ্রন্থকারগণ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। অনেকের নিকট হাদিসটি সহি, তাই তারা শাবানের শেষার্ধে সিয়াম রাখা মাকরুহ বলেন, তবে যার সিয়াম রাখার অভ্যাস আছে তার পক্ষে মাকরুহ নয়।
ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেছেন: “হাদিসটি শায, কারণ অন্যান্য সহি হাদিস তার পরিপন্থী, তাই সিয়াম রাখা মাকরুহ নয়”। তিনি বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْمُبَارَكِ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنِ أَبِي سَلَمَةَ، عَنِ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَقَدَّمُوا شَهْرَ رَمَضَانَ بِصِيَامِ يَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ، إِلَّا رَجُلًا كَانَ يَصُومُ صَوْمًا فَلْيَصُمْهُ»
“তোমরা এক দিন অথবা দু’দিনের সিয়াম দ্বারা রমযানকে এগিয়ে এনো না, তবে যে পূর্ব থেকে সিয়াম রাখত, সে যেন তাতে সিয়াম রাখে”।
এ হাদিস অধিক সহি তাই মাহফুয, যা প্রমাণ করে রমযানের দু’দিন পূর্বে, তথা শাবানের শেষার্ধে সিয়াম রাখা বৈধ। হাদিস দু’টি আলাদা, তবু আহলে ইলম অধিকতর সহি হাদিসের কারণে অপেক্ষাকৃত কম সহি হাদিসকে শায বলেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শাযের জন্য এক হাদিস হওয়া জরুরি নয়।
এ ছাড়া অন্যান্য সহি হাদিসও প্রমাণ করে শাবানের শেষার্ধে সিয়াম রাখা বৈধ, যেমন ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন:
«لَا يَتَقَدَّمَنَّ أَحَدُكُمْ رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ رَجُلٌ كَانَ يَصُومُ صَوْمَهُ فَلْيَصُمْ ذَلِكَ الْيَوْمَ»
“তোমাদের কেউ রমযানকে একদিন বা দু’দিনের সিয়াম দ্বারা এগিয়ে আনবে না, তবে যে নিজের সিয়াম পালন করত, সে যেন ঐ দিন সিয়াম রাখে”।
এ হাদিস প্রমাণ করে সিয়ামে অভ্যস্ত ব্যক্তির জন্য শাবানের শেষার্ধে সিয়াম পালন করা বৈধ, যেমন কোনো ব্যক্তির অভ্যাস সোম ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করা, অথবা একদিন সিয়াম রাখা ও একদিন ইফতার করা, তার জন্য রমযানের এক-দু’ দিন পূর্বে সিয়াম রাখা দোষণীয় নয়, যা يوم الشك বা সন্দেহের দিন নামে পরিচিত। এ দিন ব্যতীত শাবানের শেষার্ধে কারো জন্য সিয়াম রাখা দোষণীয় নয়।
এখানে আমরা শায ও শাযের বিপরীত মাহফুয জানলাম। এ ছাড়া আরো প্রকার রয়েছে, লেখক যা উল্লেখ করেননি, যেমন সেকাহ রাবির বিরোধিতাকারী যদি দুর্বল হয়, তখন তার হাদিসকে মুনকার বলা হয়। মুনকার শাযের চেয়েও খারাপ, কারণ সে দুর্বল হয়েও সবলের বিরোধিতা করেছে। মুনকারের বিপরীত মারূফ। অতএব চার প্রকার হল: শায ও মাহফুয, মুনকার ও মারূফ।
একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর:
প্রশ্ন হতে পারে: ‘শায’ একটি সুপ্ত দোষ বা ইল্লত, যা একাধিক সনদ জমা করা ব্যতীত জানা সম্ভব নয়। অনুরূপ ইদতিরাব, কালব ও ইদরাজ সুপ্ত ইল্লত, যা একাধিক সনদ জমা করা ছাড়া জানা যায় না, তবু কেন মুহাদ্দিসগণ ‘সহি’র জন্য শায না হওয়া র্শত করেছেন, কিন্তু ইদতিরাব, কালব ও ইদরাজ না হওয়া শর্ত করেননি?
উত্তর: মুহাদ্দিসগণ জমহুর ফুকাহার বিপরীত নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, কারণ তারা ‘শায’কে ইল্লত মানেন না, অথচ ইদতিরাব, ইদরাজ ও কালবকে ইল্লত মানেন। তারা সেকাহ রাবির অতিরিক্ত শব্দকে গ্রহণ করেন, যদিও একাধিক সেকাহ রাবির বর্ণিত হাদিস বিরোধী হয়, তবে উভয় বর্ণনা জমা করা অসম্ভব হলে তারাও অতিরিক্ত শব্দ ত্যাগ করেন। মুহাদ্দিসগণ মুত্তাসিল ও মুরসাল বিরোধ হলে অধিক সেকাহ রাবির বর্ণনাকে প্রাধান্য দেন, কিন্তু ফকিহগণ সমন্বয় করার চেষ্টা করেন।
‘শায’ এর হুকুম: শায শাহেদ ও মুতাবে‘ হওয়ার উপযুক্ত নয়।
মাকলুব হাদিস
مقْلوبُ এর আভিধানিক অর্থ উল্টো। কোনো বস্তুর উপরের অংশ নীচে ও নীচের অংশ উপরে হলে ‘মাকলুব’ বলা হয়, যেমন বলা হয়: الثوب المقلوب উল্টো কাপড়। قلب ‘কালব’ ক্রিয়া বিশেষ্য, অর্থ পরিবর্তন। ‘মাকলুব’ কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ উল্টো।
কালব দু’প্রকার: ১. কালবে সনদ, ২. কালবে মতন।
১. কালবে সনদ প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “সনদের কোনো রাবিকে অপর রাবি দ্বারা পরিবর্তন করা”।
কালবে সনদ দু’প্রকার:
ক. আংশিক কালব ও খ. সম্পূর্ণ কালব।
ক. আংশিক কালব বিভিন্ন প্রকার হয়:
এক. কোনো সনদে এক রাবির জায়গায় অপর রাবিকে উল্লেখ করা আংশিক কালব, যেমন:
قال الإمام البيهقي –رحمه الله- أَخْبَرَنَا أَبُو طَاهِرٍ الْفَقِيهُ، أنبأ أَبُو بَكْرٍ مُحَمَّدُ بْنُ الْحُسَيْنِ الْقَطَّانُ، ثنا أَحْمَدُ بْنُ يُوسُفَ السُّلَمِيُّ، ثنا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ: ذَكَرَ سُفْيَانُ، عَنْ سُهَيْلِ بْنِ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا لَقِيتُمُ الْمُشْرِكِينَ فِي الطَّرِيقِ، فَلا تَبْدَءُوهُمْ بِالسَّلامِ، وَاضْطَرُّوهُمْ إِلَى أَضْيَقِهِ»
এ সনদে সর্বশেষ রাবি সাহাবি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু; তার ছাত্র আবু সালেহ; তার ছাত্র সুহাইল ইব্ন আবু সালেহ; তার ছাত্র সুফিয়ান ; মুহাদ্দিসদের নিকট সনদটি এভাবেই প্রসিদ্ধ, তাদের বিপরীত ইমাম তাবরানি বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَمْرٍو الْحَرَّانِيُّ، ثَنَا أَبِي، نا حَمَّادُ بْنُ عَمْرٍو النَّصِيبِيُّ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا لَقِيتُمُ الْمُشْرِكِينَ فِي الطَّرِيقِ فَلا تَبْدَءُوهُمْ بِالسَّلامِ، وَاضْطَرُّوهُمْ إِلَى أَضْيَقِهَا».
এখানে দেখছি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ছাত্র আবু সালেহ, তার ছাত্র আ‘মাশ রাহিমাহুল্লাহ্, তার থেকে হাম্মাদ ইব্নু আমর আন-নাসিবি। হাম্মাদ ইব্ন আমর নাসিবি এ সনদে সুহাইলের জায়গায় আ‘মাশকে উল্লেখ করেছে। ইমাম তাবরানি বলেন: “হাম্মাদ ব্যতীত কেউ আ‘মাশ থেকে এ হাদিস বর্ণনা করেনি”। হাম্মাদ ইব্ন ‘আমর ইচ্ছাকৃতভাবে সুহাইলের জায়গায় আ‘মাশকে উল্লেখ করেছে, হাম্মাদ পরিত্যক্ত রাবি। অতএব তা গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই. রাবি ও রাবির পিতার নাম উলট-পালট করা আংশিক কালব, যেমন: ‘মুররাহ ইব্ন কাব’-কে ‘কাব ইব্ন মুররাহ’ বলা আংশিক কালব বা পরিবর্তন।
তিন. এক তবকার রাবির স্থানে অপর তবকার রাবি উল্লেখ করা আংশিক কালব, যেমন রাবিদের নাম অগ্র-পশ্চাৎ করে উস্তাদকে ছাত্র ও ছাত্রকে উস্তাদ বানানো কিংবা উস্তাদের উস্তাদকে ছাত্রের ছাত্র ও ছাত্রের ছাত্রকে উস্তাদের উস্তাদ বনানো। ইব্নু আবি হাতেম ‘ইলাল’ গ্রন্থে বলেন:
وَسألت أبي عَنْ حديث حَدَّثَنَا بِهِ أَحْمَد بْن عصام الأَنْصَارِيّ، عَنْ أَبِي بَكْر الحنفي، عَنْ سُفْيَانَ ، عَن حكيم بْن سَعْدٍ ، عَنْ عِمْرَانَ بْنِ ظبيان، عَنْ سَلْمَانَ، أَنَّهُ قَالَ: " من وَجَدَ فِي بطنه رزًا من بولٍ أو غائطٍ فلينصرف غير متكلم ولا داعي ".
আমার পিতা আবু হাতেমকে আমি একটি হাদিস সম্পকে জিজ্ঞাসা করেছি, যা আমাদেরকে বলেছে আহমদ ইব্ন ইসাম আল-আনসারি, আবু বকর আল-হানাফি থেকে, তিনি সুফিয়ান থেকে, তিনি হাকিম ইব্ন সাদ থেকে, তিনি ইমরান ইব্ন যাবইয়ান থেকে, তিনি সালমান থেকে, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার পেটে পেশাব অথবা পায়খানার প্রয়োজন অনুভব করে, সে যেন কথা ও ডাকাডাকি ব্যতীত প্রস্থান করে”। আমার পিতা বললেন, এ সনদে কালব হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সনদটি এরূপ:
سُفْيَان، عَنْ عِمْرَانَ بْنِ ظبيان، عَن حكيم بْن سَعْدٍ، عَنْ سَلْمَانَ
খ. সম্পূর্ণ কালব:
এক মতনের পূর্ণ সনদ অপর মতনের সাথে জুড়ে দেওয়া, কিংবা তার বিপরীত করা পূর্ণ কালব। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ দ্বিতীয় পঙক্তিতে এ প্রকারের বর্ণনা দিয়েছেন। এ প্রকার কালবকে কালবে মতনও মানা যায়। কারণ, এক সনদের জায়গায় অপর সনদ জুড়ে দিলে যেরূপ কালবে সনদ হয়, অনুরূপ কালবে মতনও হয়, অর্থাৎ এক মতনের জায়গায় অপর মতন স্থাপি হয়। এ হিসেবে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ কলবে সনদ ও কলবে মতন উভয় উল্লেখ করেছেন। বাগদাদে ইমাম বুখারিকে পরীক্ষা করার ঘটনা সম্পূর্ণ কালবের উদাহরণ। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
বাগদাদবাসীরা যখন জানল যে, ইমাম বুখারি তাদের নিকট আসছেন, তারা ইমাম বুখারিকে পরীক্ষা করার ইচ্ছা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো দশজন প্রখর ধী শক্তিমান ব্যক্তি দশটি হাদিস করে মোট একশো হাদিস সনদ পাল্টে বুখারির নিকট পেশ করব। যখন বুখারি আসলেন, মানুষেরা তার নিকট জমা হল। তারা দশটি করে মোট একশো হাদিস পেশ করল। তারা যখন সনদসহ এক একটি হাদিস পেশ করত, বুখারি তাদের উত্তরে বলতেন: আমি জানি না। এভাবে তারা একশো হাদিস পূর্ণ করল। সাধারণ লোকেরা বলতে লাগল, সে কিছু জানে না, একশো হাদিস পেশ করা হল, প্রত্যেকটির ব্যাপারে সে বলল: আমি জানি না! অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন এবং প্রত্যেক হাদিস সঠিক সনদসহ বলা আরম্ভ করলেন। এভাবে তিনি একশো হাদিস শেষ করলেন। এ থেকে তারা জানল যে, সে আসলে আল্লাহর মহান এক কুদরত। তারা সবাই তার বড়ত্বের স্বীকৃতি দিল ও তার সামনে নত হল।
এ জাতীয় কালব সাধারণত পরীক্ষার জন্য করা হয়। কখনো ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়, যেমন কেউ দুর্বল সনদের কোনো হাদিস সহি সনদে প্রচার করল। এটাও এক জাতীয় তাদলিস, তবে কালব থাকার কারণে মাকলুবও।
খ. কালবে মতন: কালবে মতন বিভিন্নভাবে হয়, যেমন:
قال أبوحاتم ابن حبان –رحمه الله- أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفِيانَ، قَالَ: حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْحَجَّاجِ السَّامِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ الأَنْصَارِيِّ، وَإِسْمَاعِيلُ بْنُ أُمَيَّةَ، وَعُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حِبَّانَ، عَنْ عَمِّهِ وَاسِعِ بْنِ حَبَّانَ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: «رَقِيتُ فَوْقَ بَيْتِ حَفْصَةَ، فَإِذَا أَنَا بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسًا عَلَى مَقْعَدَتِهِ مُسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةِ، مُسْتَدْبِرَ الشَّامِ».
ইব্ন হিব্বানের এ হাদিসে কালব ও পরিবর্তণ হয়েছে। রাবি এখানে الْقِبْلَةِ এর জায়গায় الشَّامِ এবং الشَّامِ এর জায়গায় الْقِبْلَةِ স্থাপন করেছেন। হাদিসের প্রকৃতরূপ ইমাম বুখারি প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, যেমন:
قال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْمُنْذِرِ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ عِيَاضٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ، عَنْ وَاسِعِ بْنِ حَبَّانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ: «ارْتَقَيْتُ فَوْقَ ظَهْرِ بَيْتِ حَفْصَةَ لِبَعْضِ حَاجَتِي، فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْضِي حَاجَتَهُ مُسْتَدْبِرَ الْقِبْلَةِ مُسْتَقْبِلَ الشَّأْمِ».
কালবে মতনের দ্বিতীয় উদাহরণ:
قال الإمام مسلم –رحمه الله- حَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى جميعا، عَنْ يَحْيَى الْقَطَّانِ، قَالَ زُهَيْرٌ: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، أَخْبَرَنِي خُبَيْبُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ حَفْصِ بْنِ عَاصِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ: وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ يَمِينُهُ مَا تُنْفِقُ شِمَالُهُ ... ».
“সাতজনকে আল্লাহ তা‘আলা তার ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যে দিন তার ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না, ... ... আর সে ব্যক্তি যে কোনো সদকা করল এবং সদকাকে সে গোপন করল যে, তার ডান হাত জানেনি তার বাঁ হাত কি খরচ করেছে”।
এখানে ডান হাতের জায়গায় বাঁ হাত ও বাঁ হাতের জায়গায় ডান হাত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতরূপ বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারি:
قال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، قَالَ: حَدَّثَنِي خُبَيْبُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ حَفْصِ بْنِ عَاصِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ تَعَالَى فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ، ... ... وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ... ».
“সাতজনকে আল্লাহ তা‘আলা তার ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যে দিন তার ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না, ... ... আর সে ব্যক্তি যে কোনো সদকা করল এবং সদকাকে সে গোপন করল যে, তার বাঁ হাত জানেনি তার ডান হাত কি খরচ করেছে”।
এ হাদিসে ডান হাতে খরচ করা ও বাঁ হাতের অজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। এটাই হাদিসের প্রকৃতরূপ।
কালবে মতনের তৃতীয় উদাহরণ:
قال الإمام أبوداود –رحمه الله- حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَسَنٍ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الْأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا سَجَدَ أَحَدُكُمْ فَلَا يَبْرُكْ كَمَا يَبْرُكُ الْبَعِيرُ وَلْيَضَعْ يَدَيْهِ قَبْلَ رُكْبَتَيْهِ ».
“যখন তোমাদের কেউ সেজদা করে, সে যেন অবনমিত না হয়, যেরূপ অবনমিত হয় উট, আর সে যেন তার দু’হাত তার দু’হাঁটুর পূর্বে রাখে”।
ইব্ন উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ্ ‘মানযুমাহ বাইকুনিয়াহ’র ব্যাখ্যায় বলেন: ‘এখানে কালব হয়েছে। তার প্রমাণ হাদিসের প্রথমাংশ। হাদিসের প্রথমাংশে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের ন্যায় সেজদা করতে নিষেধ করেছেন। আমরা দেখি উট হাঁটুর পূর্বে প্রথমে হাত রাখে, অর্থাৎ প্রথমে সামনের অংশ নিচু করে, অতঃপর পিছনের অংশ নিচু করে। আপনি যদি আগে হাত ও পরে হাঁটু রাখেন, তাহলে আপনিও উটের ন্যায় সেজদা করলেন, যার থেকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। অতএব যখন আপনি বললেন:"وليضع يديه قبل ركبتيه" হাদিসের প্রথম অংশের খিলাফ করলেন, হাদিসের প্রথম অংশের দাবি:"وليضع ركبتيه قبل يديه" এটাই হাদিসের সঠিকরূপ, যেমন ইমাম তিরমিযি ও ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন:
حَدَّثَنَا سَلَمَةُ بْنُ شَبِيبٍ، وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُنِيرٍ، وَأَحْمَدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الدَّوْرَقِيُّ، وَالْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْحُلْوَانِيُّ، وَغَيْرُ وَاحِدٍ، قَالُوا: حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا شَرِيكٌ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ كُلَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ، قَالَ: «رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سَجَدَ يَضَعُ رُكْبَتَيْهِ قَبْلَ يَدَيْهِ، وَإِذَا نَهَضَ رَفَعَ يَدَيْهِ قَبْلَ رُكْبَتَيْهِ ».
... ... ওয়ায়েল ইব্ন হুজুর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, যখন তিনি সেজদা করতেন দু’হাতের পূর্বে দুই হাঁটু রাখতেন। আর যখন তিনি উঠতেন দুই হাঁটুর পূর্বে দুই হাত উঠাতেন”। হাসান ইব্ন ‘আলি হুলওয়ানি সূত্রে ইমাম আবু দাউদ এভাবেই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
অতএব আমরা নিশ্চিত যে,«فلا يبرك كما يبرك البعير» এর দাবি: প্রথমে হাঁটু ও পরে হাত রাখা, কারণ সেজদার স্বাভাবিক ক্রম প্রথমে হাঁটু রাখা। অতঃপর হাত, অতঃপর কপাল ও নাক রাখা।
জ্ঞাতব্য: কলব-এ মতনকে ইব্ন জাযারি রাহিমাহুল্লাহ্ منقلب বলেছেন। বালকিনি রাহিমাহুল্লাহ্ معكوس বলেছেন। হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ مُبْدَل বলেছেন।
মাকলুবের হুকুম:
মাকলুব একপ্রকার দ্বা‘ঈফ হাদিস। ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যদি কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া স্বেচ্ছায় কালব বা পরিবর্তন করা হয়, তাহলে সেটা মাওদু‘ বা বানোয়াট হাদিসের একপ্রকার। আর যদি অনিচ্ছায় ও ভুলে হয়, তাহলে মাকলুব বা মু‘আল্লাল”। সাখাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘বরং এ জাতীয় হাদিস মাওদুর মতই’। শাহেদ ও মুতাবে‘ হওয়ার উপযুক্ত নয়।
ফার্দ হাদিস
أَوْ جَمْعٍ اوْ قَصْرٍ عَلَى رِوَايَةِ
وَالْفَرْدُ مَا قَيَّدْتَه بِثِقَةِ
“আর ‘ফার্দ’ যা তুমি সংরক্ষণ করেছ একজন সেকাহ থেকে, অথবা বৃহৎ জমাত থেকে অথবা এক সনদ থেকে”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ত্রয়োবিংশ প্রকার ‘ফার্দ’।
فَردُ এর আভিধানিক অর্থ বেজোড়।
‘ফার্দ’ দু’প্রকার:
১. ফার্দে মুতলাক ও ২. ফার্দে নিসবি। প্রত্যেক প্রকারের সংজ্ঞা আলাদা। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ শুধু ফার্দে নিসবি উল্লেখ করেছেন। আমরা সম্পূরক হিসেবে ফার্দে মুতলাক উল্লেখ করব।
২. ফার্দে নিসবি তিন প্রকার:
ক. একজন সেকাহ রাবি থেকে গ্রহণকৃত হাদিস ফার্দ, যদিও তার একাধিক গায়রে সেকাহ বা দুর্বল রাবি রয়েছে। অতএব সেকাহ রাবির বিবেচনায় ফার্দ, সাধারণ রাবির বিবেচনায় ফার্দ নয়। তাই এ প্রকারকে ফার্দে নিসবি বা অপেক্ষাকৃত ফার্দ বলা হয়, যেমন নিম্নে বর্ণিত হাদিস :
قال الإمام مسلم –رحمه الله - وحَدَّثَنَا إسحاق بْنُ إِبْرَاهِيمَ، أَخْبَرَنَا أَبُو عَامِرٍ الْعَقَدِيُّ، حَدَّثَنَا فُلَيْحٌ، عَنْ ضَمْرَةَ بْنِ سَعِيدٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ، عَنْ أَبِي وَاقِدٍ اللَّيْثِيِّ، قَالَ: " سَأَلَنِي عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ عَمَّا قَرَأَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي يَوْمِ الْعِيدِ، فَقُلْتُ: بِـ اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ ".
এ হাদিসের সনদে সাহাবির স্তরে আছেন আবু ওয়াকেদ আল-লাইসি, তার থেকে উবাইদুল্লাহ ইব্ন আব্দুল্লাহ ইব্ন উতবাহ, তার থেকে দামরাহ ইব্ন সায়িদ; বলা হয়: দামরাহ ইব্ন সায়িদ ব্যতীত কোনো সেকাহ রাবি এ হাদিস উবাইদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেনি, তাই এ হাদিস ফার্দ, তবে নিসবি ও অপেক্ষাকৃত ফার্দ, কারণ তার থেকে বর্ণনাকারী একাধিক দুর্বল রাবি রয়েছে।
খ. নির্দিষ্ট দেশ বা নগর বা বংশ থেকে বর্ণিত হাদিস , যেমন:
قال الإمام أبوداود- رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ الطَّيَالِسِيُّ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ: " أُمِرْنَا أَنْ نَقْرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَمَا تَيَسَّرَ ".
ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “এ হাদিস أُمِرْنَا শব্দ যোগে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু বসরার রাবিগণ বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসের সনদে সাহাবির স্তরে আছেন: আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু (মৃ৬৩হি.), তিনি মাদানি; তার থেকে বর্ণনাকারী আবু নাদরাহ (মৃ১০৮হি.), তিনি বসরি; তার থেকে বর্ণনাকারী কাতাদাহ (মৃ১১৭হি.), তিনি বসরি; তার থেকে বর্ণনাকারী হাম্মাম ইব্নু ইয়াহইয়া (মৃ১৬৪হি.), তিনি বসরি; তার থেকে বর্ণনাকারী আবুল ওয়ালিদ আত-তায়ালিসি (মৃ২২৭হি.), তিনি বসরি। অর্থাৎ এ হাদিসের সনদের প্রত্যেক রাবি ইমাম আবু দাউদ পর্যন্ত বসরার বাসিন্দা, একমাত্র সাহাবি ব্যতীত। বসরার সকল রাবি এ হাদিস أُمِرْنَا শব্দসহ বর্ণনা করেছেন। তাই এ হাদিস বসরিদের ফার্দ।
গ. কোনো শায়খ থেকে একজন রাবির একা কোনো হাদিস বর্ণনা করা, সে ব্যতীত ঐ শায়খ থেকে কেউ তা বর্ণনা করেনি, যদিও অন্যান্য শায়খ থেকে তার একাধিক সনদ রয়েছে। শায়খের একজন ছাত্র থেকে হাদিসটি প্রাপ্ত হিসেবে ফার্দ, কারণ তার অন্য কোনো ছাত্র তার থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেনি, তবে নিসবি কারণ অন্যান্য শায়খদের থেকে তাদের ছাত্রগণ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, যাদের বিবেচনায় নিলে হাদিস আযিয বা মাশহূর হতে পারে, যেমন:
قال الإمام أبوداود –رحمه الله- حَدَّثَنَا حَامِدُ بْنُ يَحْيَى، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، حَدَّثَنَا وَائِلُ بْنُ دَاوُدَ، عَنْ ابْنِهِ بَكْرِ بْنِ وَائِلٍ، عَنْ الزَّهْرِيِّ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ: أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " أَوْلَمَ عَلَى صَفِيَّةَ بِسَوِيقٍ وَتَمْرٍ ".
এ হাদিসের সনদে দেখছি: সাহাবির স্তরে আনাস ইব্ন মালিক, তার থেকে যুহরি, তার থেকে বকর ইব্ন ওয়ায়েল, তার থেকে পিতা ওয়ায়েল ইব্ন দাউদ, তার থেকে সুফিয়ান, তার থেকে হামেদ ইব্ন ইয়াহইয়া, তার থেকে ইমাম আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ্ ।
ইব্ন তাহের বলেন: এ হাদিস বকর থেকে একমাত্র ওয়ায়েল বর্ণনা করেছেন, তার থেকে শুধু সুফিয়ান। ছেলে বকর থেকে একমাত্র পিতা ওয়ায়েল বর্ণনা করেছেন, তাই এ হাদিস ফার্দে নিসবির তৃতীয় নাম্বার। এ প্রকার আবার গরিবও।
সাহাবিদের যুগে ফার্দের সংখ্যা বেশী, অনুরূপ তাবে‘ঈদের যুগেও বেশী, তবে সাহাবিদের অপেক্ষা কম। কারণ তাদের সংখ্যা অধিক, তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিলেন। অনুরূপ তাদের অনুসারীদের যুগেও ফার্দের সংখ্যা অনেক, কিন্তু তাবে‘ঈদের তুলনায় অনেক কম। এ থেকে প্রমাণিত হয় ফার্দ দুর্বল হাদিসের একপ্রকার।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ ফার্দের ভাগ করে বুঝিয়েছেন যে, ফার্দ কখনো অপেক্ষাকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়, কখনো ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন ১. সাহাবি, তাবে‘ঈ বা তাদের অনুসারীদের স্তরে ফার্দ; ২. নির্দিষ্ট দেশ, শহর বা বংশের বিবেচনায় ফার্দ; ৩. শায়খ ও ছাত্রের বিবেচনায় ফার্দ। ৪. সেকাহ ও দুর্বল রাবির বিবেচনায় ফার্দ।
প্রথম প্রকার মুতলাক বা সাধারণ ফার্দ, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রকার নিসবি বা অপেক্ষাকৃত ফার্দ। প্রথম প্রকার ফার্দ সাধারণত দুর্বল হয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকার ফার্দ সহির নিকটবর্তী। কারণ দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকার হাদিস তাদের বিবেচনায় ফার্দ, কিন্তু অন্যদের বিবেচনায় আযিয ও মাশহূর হতে পারে, তাই সহির নিকটবর্তী।
১. ফার্দে মুতলাক:
ফার্দে মুতলাক বা সাধারণ ফার্দ: সনদের মূল তথা সাহাবির স্তরে যদি একজন রাবি থাকে তাহলে ফার্দে মুতলাক, আর সাহাবির স্তরে ফার্দ হবে যদি এক বা একাধিক সাহাবি থেকে একজন তাবে‘ঈ বর্ণনা করেন। সাহাবির সংখ্যা অধিক হলেও ফার্দ, কারণ তাবে‘ঈ একজন। তাবে‘ঈ সন্দেহের স্থান, সাহাবি সন্দেহের স্থান নয়, তাই তার স্তরে ফার্দ সন্দিহান। এ ফার্দ কখনো দূর হবে না, পরবর্তী রাবি পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে ফার্দে মুতলাক। ফার্দের এ প্রকারও গরিব।
একজন সাহাবি থেকে একাধিক তাবে‘ঈ রাবি হলে ফার্দে নিসবি, একাধিক তাবে‘ঈ থেকে একজন রাবি হলে ফার্দে নিসবিই থাকবে। অর্থাৎ একজন সাহাবি থেকে একাধিক তাবে‘ঈ রাবি হলে ফার্দে নিসবি, তথা সাহাবির বিবেচনায় ফার্দ, আবার একাধিক তাবে‘ঈ থেকে যদি তৃতীয় স্তরে একজন রাবি হয় তবুও ফার্দ। এ প্রকার ফার্দের ওজুদ সম্পর্কে জানা নেই, কারণ তাবে‘ঈর যুগে কোনো হাদিস প্রসিদ্ধি লাভ করে পরবর্তী যুগে ফার্দ হওয়া অসম্ভব না হলেও ওজুদ নেই। তাবে‘ঈর স্তরে একজন হলে ফার্দে মুতলাক, সাহাবির স্তরে একজন হলে ফার্দে নিসবি। সাহাবি ও তাবে‘ঈ উভয় স্তরে ফার্দ হলে ফার্দে মুতলাক। এটাই পরিভাষা, অন্যথায় সাহাবি একজন হলে ফার্দ মুতলাক হত, কিন্তু সাহাবির ফার্দ যেহেতু দোষণীয় নয়, তাই উসুলে হাদিসের পরিভাষায় ফার্দ বলা হয় না। কারণ, ফার্দ একপ্রকার দুর্বল হাদিস, সাহাবি একজন হলে হাদিস দুর্বল হয় না, অপেক্ষাকৃত ফার্দ বলা হয়।
ফার্দে মুতলাক দু’প্রকার:
ক. সাহাবি, তাবে‘ঈ ও তাদের পরবর্তী এক বা একাধিক রাবির ক্রমান্বয়ে একলা বর্ণিত হাদিস ফার্দ, যেমন নিয়তের হাদিস :
قال الإمام البخاري – رحمه الله- حَدَّثَنَا الْحُمَيْدِيُّ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ، قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ الْأَنْصَارِيُّ، قَالَ: أَخْبَرَنِي مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيُّ، أَنَّهُ سَمِعَ عَلْقَمَةَ بْنَ وَقَّاصٍ اللَّيْثِيَّ، يَقُولُ: سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَلَى الْمِنْبَرِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: " إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ ".
এ হাদিসে সাহাবির স্তরে ওমর ইব্নুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, তিনি ব্যতীত কোনো সাহাবি এ হাদিস বর্ণনা করেনি; তার ছাত্র আলকামা ইব্নু ওয়াক্কাস আল-লাইসি, তিনি ব্যতীত ওমর ইব্নুল খাত্তাব থেকে কেউ এ হাদিস বর্ণনা করেনি; তার ছাত্র মুহাম্মদ ইব্নু ইবরাহিম আত-তাইমি, তিনি ব্যতীত আলকামা থেকে কেউ এ হাদিস বর্ণনা করেনি; তার ছাত্র ইয়াহইয়া ইব্নু সায়িদ আল-আনসারি, তিনি ব্যতীত মুহাম্মদ থেকে কেউ এ হাদিস বর্ণনা করেনি। ইয়াহইয়ার ছাত্র অনেক, তার পর থেকে হাদিস প্রসিদ্ধি লাভ করে।
এ হাদিস ফার্দে মুতলাক এবং গরিব, কারণ সাহাবি ও তাবে‘ঈর স্তরে একজন রাবি। এ হাদিস ফার্দে নিসবির প্রথম প্রকার, কারণ একজন সেকাহ রাবি বর্ণনা করেছে, দুর্বল কোনো রাবি বর্ণনা করুক বা না-করুক। এ হাদিস ফার্দে নিসবির তৃতীয় প্রকার, অর্থাৎ ওমর ইব্নুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে ইয়াহইয়া পর্যন্ত ফার্দ, তাই সনদের প্রথমাংশের বিবেচনায় ফার্দ, সাধারণত এ প্রকারকে গরিব বলা হয়, যদিও শেষাংশের বিবেচনায় মাশহূর।
খ. কোনো গ্রাম, বংশ বা নগরবাসীর বর্ণিত হাদিস ফার্দে মুতলাকের দ্বিতীয় প্রকার। কোনো সম্প্রদায় যদি একটি হাদিস বর্ণনা করে, অপর কোনো গ্রাম, নগর বা দেশবাসীর নিকট সে হাদিস না-থাকে তাহলে মুতলাক। সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল রাবি এক জায়গার তাই ফার্দে মুতলাক বলা হয়, এ প্রকার আবার ফার্দে নিসবির দ্বিতীয় প্রকারও বটে।
জ্ঞাতব্য: ফার্দের কতক প্রকার কতক প্রকারে অনুপ্রবেশ করে, যেমন ফার্দে নিসবির দ্বিতীয় প্রকার ও ফার্দে মুতলাকের দ্বিতীয় প্রকারের সংজ্ঞা ও উদাহরণ এক। আবার ফার্দে নিসবির দ্বিতীয় প্রকার ও ফার্দে মুতলাকের প্রথম প্রকার এক, যদি হাদিসটি সেকাহ রাবি ব্যতীত দ্বিতীয় কেউ বর্ণনা না করে। ফার্দে মুতলাকের প্রথম প্রকার ও ফার্দে নিসবির তৃতীয় প্রকারকে গরিব বলা হয়। ভালো করে স্মরণ রাখুন।
মু‘আল্লাল হাদিস
مُعَلَّلٌ عِنْدَهُمُ قَدْ عُرِفَا
وَمَا بِعِلَّةٍ غُمُوضٍ أَوْ خَفَا
“আর যে হাদিসে সূক্ষ্ম ও উহ্য দোষ রয়েছে তাই মুহাদ্দিসদের নিকট মু‘আল্লাল হিসেবে প্রসিদ্ধ”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের চতুর্বিংশ প্রকার মু‘আল্লাল। এ প্রকার হাদিসকে মু‘আল্লাল, মু‘আল্ ও মা‘লুল ইত্যাদি নামে অবহিত করা হয়, তবে অভিধানের বিচারে ‘মুয়াল্’ শব্দটি অধিক বিশুদ্ধ।
علة এর আভিধানিক অর্থ রোগ,عَلَّ يَعِلُّ থেকেمُعلَّلٌ অর্থ অসুস্থ ব্যক্তি। এ থেকে দোষণীয় ইল্লতযুক্ত হাদিসকে মু‘আল্লাল বলা হয়, কারণ মু‘আল্লাল হাদিসও অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায় অক্ষম, সহি হাদিসের ন্যায় দলিল হতে পারে না।
ইল্লত প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদিসের সনদ বা মতনে সূক্ষ্ম ও উহ্য দোষ রয়েছে তাই মুহাদ্দিসদের নিকট মু‘আল্লাল হিসেবে প্রসিদ্ধ”।
ইমাম সাখাবি রাহিমাহুল্লাহ্ মু‘আল্লালের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন:
"والمعلول: خبر ظاهر السلامة، اطُّلِعَ فيه بعد التفتيش على قادح".
“মু‘আল্লাল: বাহ্যত দোষমুক্ত হাদিস, অনেক অনুসন্ধানের পর তাতে দোষ সম্পর্কে জানা গেছে”।
ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ্ মু‘আল্লালের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন:
"وإنما يعلل الحديث من أوجه ليس للجرح فيها مدخل، فإن حديث المجروح ساقط واه، وعلة الحديث تكثر في أحاديث الثقات، أن يحدثوا بحديث له علة، فتخفى عليهم علته، فيصير الحديث معلولا".
“এমন কতক কারণে হাদিসকে মু‘আল্লাল ঘোষণা করা হয়, যে কারণে দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, দোষী ব্যক্তিদের হাদিস পরিত্যক্ত। আর সেকাহ রাবিদের হাদিসে ইল্লত অধিক হয়, তারা কোনো হাদিস বর্ণনা করেন, যার ইল্লত রয়েছে, কিন্তু তার ইল্লত তাদের নিকট অজ্ঞাত থাকে, ফলে হাদিসটি মু‘আল্লাল হয়”।
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ হাকেমের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন: “এ হিসেবে মুনকাতি‘ হাদিসকে মু‘আল্লাল বলা যাবে না এবং যে হাদিসের রাবি অজ্ঞাত কিংবা দুর্বল তাকেও মু‘আল্লাল বলা যাবে না। হাদিসকে তখনি মু‘আল্লাল হবে, যখন তার ইল্লত খুব সূক্ষ্ম হয়, বাহ্যত যার থেকে মুক্ত মনে হয়। এ থেকে তাদের কথার বাতুলতা প্রমাণ হল, যারা বলেন: প্রত্যেক অগ্রহণীয় হাদিস মু‘আল্লাল”।
যারা বলেন: এ হাদিসে ইল্লত রয়েছে, অতঃপর مجالد بن سعيد কিংবা ابن لهيعة রাবিদের ন্যায় দুর্বল রাবি পেশ করেন, তাদের ইল্লতের প্রয়োগ যথাযথ নয়। কারণ, এ জাতীয় রাবির দুর্বলতা সবার নিকট স্পষ্ট। আর আমাদের আলোচনার বস্তু হচ্ছে সূক্ষ্ম ও সুপ্ত ইল্লত। যেমন কোনো মুহাদ্দিস বলেন: “ইল্লত এমন এক বস্তু, যা মুহাদ্দিসের অন্তরে খতের সৃষ্টি করে”। উদাহরণত কোনো বিজ্ঞ মুহাদ্দিস কারো নিকট ‘আ‘মাশে’র হাদিস শ্রবণ করে বললেন: এ হাদিস ‘আ‘মাশে’র হাদিসের মত নয়; কিংবা বললেন: এ হাদিস ইমাম যুহরির হাদিস নয়। তাদের এ কথা হাদিসের ইল্লত প্রমাণ করে। কারণ, তারা হাদিসের সনদ জানেন, ইতিহাস জানেন, রাবিদের অবস্থা জানেন, তারা হাদিস দেখে ইল্লত বলতে পারেন, যেমন স্বর্ণকার স্বর্ণ দেখে খাঁটি-ভেজাল বলতে পারেন, কিন্তু ইল্লত বা কারণ উল্লেখ করেন না। তারা বলেন: ‘এ হাদিস দ্বা‘ঈফ’, কিন্তু যখন তাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হল, এটা কিভাবে জানব? তখন সে উত্তর দিল: আমি তোমাকে বলেছি এতে ইল্লত আছে। তুমি ইব্ন মাহদিকে জ্ঞিজ্ঞাসা কর, সেও বলবে এতে ইল্লত আছে। তুমি আহমদকে জিজ্ঞাসা কর, সেও বলবে এতে ইল্লত আছে। তুমি ইয়াহইয়া ইব্ন সায়িদ আল-কাত্তানকে জিজ্ঞাসা কর, সেও বলবে এতে ইল্লত আছে। এভাবে সকল বিজ্ঞ মুহাদ্দিসের কথা ইল্লতের ব্যাপারে এক হয়ে যায়, হাদিসের উপর যারা অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন, আল্লাহ তাদের অন্তরে এ বিষয়গুলো ঢেলে দেন।
কোনো মারফূ‘ হাদিসের মুত্তাসিল সনদ সবার নিকট পরিচিত, অতঃপর একজন হাফেযে হাদিস বলেন, এতে একটি দোষণীয় ইল্লত রয়েছে, অর্থাৎ অমুক সেকাহ রাবি থেকে হাদিসটি মুনকাতি‘ বর্ণিত। আমরা তার মন্তব্য থেকে হাদিসে দ্বা‘ঈফের একটি ইল্লত পেলাম ইনকিতা‘ বা সনদের বিচ্ছেদ, অথচ হাদিসটি সবার নিকট মুত্তাসিল ছিল।
ইব্ন হাজার বুলুগুল মারাম গ্রন্থে এরূপ অনেক বলেন: হাদিসটি ইরসালের কারণে মু‘আল্, বা ওয়াকফের কারণে মু‘আল্ ইত্যাদি। তিনি যখন এ জাতীয় মন্তব্য করেন, আপনি তার রাবিদের খোঁজ নিয়ে দেখেন।
মুদ্দাকথা: মু‘আল্ হাদিসের বাহ্যিক দেখে সহি মনে হয়, কারণ তাতে সহির সকল শর্ত বিদ্যমান, কিন্তু ব্যাপক গবেষণার পর স্পষ্ট হয় যে, হাদিসটি দোষণীয় ইল্লতের কারণে মু‘আল্।
ইল্লত দু’প্রকার:
১. দোষণীয় ইল্লত ও ২. দোষহীন ইল্লত।
দোষহীন ইল্লতের কারণে হাদিসের বিশুদ্ধতা বিনষ্ট হয় না। এ ইল্লত মতন ও সনদ উভয় স্থানে হতে পারে। সনদে দোষহীন ইল্লত যেমন,
قال الإمام الترمذي –رحمه الله- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، وَشُعْبَةُ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ ابْنِ عُمَرَ، " أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ بَيْعِ الْوَلَاءِ وَهِبَتِهِ ".
ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম [গোলামকে] ‘অলা’ বিক্রি ও দান করতে নিষেধ করেছেন”।
এ হাদিস ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ছাত্র عبد الله بن دينار সূত্রে বর্ণিত, কোনো রাবি যদি তার পরিবর্তে عمرو بن دينار বলে তাহলে ইল্লত হবে, তবে দোষণীয় নয়, কারণ আব্দুল্লাহ ইব্ন দিনার ও আমর ইব্ন দিনার উভয়ে সেকাহ।
মতনে দোষহীন ইল্লত যেমন:
قال الإمام مسلم-رحمه الله- حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا لَيْثٌ، عَنْ أَبِي شُجَاعٍ سَعِيدِ بْنِ يَزِيدَ، عَنْ خَالِدِ بْنِ أَبِي عِمْرَانَ، عَنْ حَنَشٍ الصَّنْعَانِيِّ، عَنْ فَضَالَةَ بْنِ عُبَيْدٍ قَالَ: " اشْتَرَيْتُ يَوْمَ خَيْبَرَ قِلَادَةً بِاثْنَيْ عَشَرَ دِينَارًا فِيهَا ذَهَبٌ وَخَرَزٌ، فَفَصَّلْتُهَا، فَوَجَدْتُ فِيهَا أَكْثَرَ مِنَ اثْنَيْ عَشَرَ دِينَارًا، فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: لَا تُبَاعُ حَتَّى تُفَصَّلَ "
... ... ফুদালা ইব্ন উবাইদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমি খায়বরের দিন বারো দিনার দিয়ে একটি হার ক্রয় করেছি, যাতে স্বর্ণ ও পূতি ছিল। দু’টি বস্তু [স্বর্ণ ও পূতি] পৃথক করে তাতে বারো দিনারের অধিক পেলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিষয়টি অবহিত করি, তিনি বললেন: দু’টি বস্তু পৃথক করা ব্যতীত বিক্রি করা যাবে না”।
এ হাদিসের রাবিগণ হারের মূল্য নির্ধারণে দ্বিমত পোষণ করেছেন। কেউ বলেছেন: বারো দিনার। কেউ বলেছেন: নয় দিনার। কেউ বলেছেন: দশ দিনার, ইত্যাদি।
এসব দোষের কারণে হাদিসে ইল্লত হয় ঠিক, তবে এ জাতীয় ইল্লত হাদিসের শুদ্ধতা বিনষ্ট করে না, কারণ সব বর্ণনায় হাদিসের মূল বিষয় এক। এ হাদিস প্রমাণ করে কোনো বস্তুর সাথে মিশ্রিত স্বর্ণ পৃথক করা ব্যতীত স্বর্ণের বিনিময়ে বিক্রি করা যাবে না। স্বর্ণ পৃথক করে সমপরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে বিক্রি করতে হবে, আর অপর বস্তু যত দামে ইচ্ছা বিক্রি করবে। এটা হাদিসের মূল বক্তব্য। হারের মূল্য যতই বলি এতে প্রভাব পড়ে না, তাই হারের মূল্যের ইখতিলাফ দোষণীয় ইল্লত নয়।
দোষণীয় ইল্লত:
قال الإمام الترمذي -رحمه الله- حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ السَّلَامِ بْنُ حَرْبٍ الْمُلَائِيُّ، عَنْ الْأَعْمَشِ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " إِذَا أَرَادَ الْحَاجَةَ لَمْ يَرْفَعْ ثَوْبَهُ حَتَّى يَدْنُوَ مِنَ الْأَرْضِ ".
এ হাদিসের সনদ বাহ্যত সহি এবং সকল রাবি সেকাহ। ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “বলা হয় আ‘মাশ আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বা কোনো সাহাবি থেকে শ্রবণ করেনি। তিনি শুধু আনাসকে দেখেছেন। আ‘মাশ বলেন: আমি তাকে সালাত আদায় করতে দেখেছি। অতঃপর সালাত সম্পর্কে তার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন”। ইমাম তিরমিযির মন্তব্য থেকে ‘আ‘মাশ’ ও ‘আনাসে’র মাঝে ইনকেতা‘ প্রমাণিত হয়। এটাই ইল্লত।
ইল্লত জানার গুরুত্ব:
ইব্ন মাহদি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেছেন: ‘আমার নিকট একটি হাদিসের ইল্লত জানা নতুন বিশটি হাদিস শেখার চেয়ে অধিক উত্তম’।
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ নুখবার ব্যাখ্যায় বলেন: “হাদিস শাস্ত্রের এ প্রকার সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও দুর্বোধ্য। আল্লাহ যাকে অন্তর্দৃষ্টি, ব্যাপক স্মৃতিশক্তি, রাবিদের স্তর এবং সনদ ও মতন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দান করেছেন সেই এ দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারেন। তাই দেখি এ বিষয়ে খুব কম লোক মুখ খুলেছেন, যেমন: আলি ইব্নু মাদিনি, আহমদ ইব্নু হাম্বল, বুখারি, ইয়াকুব ইব্নু শাইবাহ, আবু হাতেম, আবু যুরআহ ও দারাকুতনি প্রমুখ। মুহাদ্দিস কতক সময় ইল্লতের কারণ দর্শাতে পারেন না, যেমন মুদ্রা ব্যবসায়ী খাঁটি দিনার ও দিরহামের পক্ষে দলিল দিতে পারেন না, কিন্তু খাঁটি মুদ্রা তিনি ঠিকই চিনেন”।
‘ইলালের উপর লিখিত কিতাব:
‘ইলালের উপর লিখিত কিতাবসমূহের মধ্যে ‘ফাতহুল বারি’ অন্যতম, এতে ফিকাহ, হাদিস ও ইল্লতের উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। অতঃপর ‘নাসবুর রায়াহ’, ‘তালখিসুল হাবির’, ইব্ন আব্দুল হাদি রচিত ‘আল-মুহাররার’ ইত্যাদি গ্রন্থে ইল্লতের উপর আলোচনা রয়েছে। ‘সুবুলুস সালাম’ গ্রন্থেও ইলালের উপর যথেষ্ট আলোচনা রয়েছে। অনুরূপ এ বিষয়ে আরেকটি সুন্দর কিতাব: ‘আল-কুবরা’ লিল বায়হাকি।
মুদতারিব হাদিস
مُضْطَرِبٌ عِنْدَ أُهَيْلِ الْفَنِّ
وَذُو اخْتِلافِ سَنَدٍ أَوْ مَتْنِ
“আর বৈপরীত্যশীল সনদ বা মতন বিশিষ্ট হাদিস এ শাস্ত্রে অভিজ্ঞদের নিকট মুদতারিব”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের পঞ্চবিংশ প্রকার মুদতারিব। হাদিসের এ প্রকারের সম্পর্ক সনদ ও মতন উভয়ের সাথে।
اضطراب এর আভিধানিক অর্থ অমিল ও ইখতিলাফ। ইদতিরাবের মূল ব্যবহার হয় নদী বা সমুদ্রের ঢেউয়ের ক্ষেত্রে, যখন অধিক তরঙ্গ দেখা দেয় ও ঢেউয়ের উপর ঢেউ আছড়ে পড়ে, তখন বলা হয়: اضطربت الأمواج ‘সমুদ্র অশান্ত হয়ে উঠছে বা ঢেউয়ের উপর ঢেউ আছড়ে পড়ছে’। এ থেকে এক সনদের সাথে অপর সনদ ও এক মতনের সাথে অপর মতনের অমিল ও বিরোধ হলে ইদতিরাব বলা হয়।
‘ইদতিরাবে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “সমান শক্তিশালী একাধিক সনদ অথবা মতনের বৈপরীত্য বা অমিলকে হাদিসের পরিভাষায় ইদতিরাব বলা হয়, যেগুলোর মাঝে সমন্বয় করা কিংবা কোনো একটিকে প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব নয়”। চারটি শর্তে ইদতিরাব হয়:
১. একাধিক সনদ, ২. পরস্পরের মাঝে অমিল, ৩. সব সনদের সমান শক্তিশালী হওয়া, ৪. উসুলে হাদিসের নীতিতে সমন্বয় করা সম্ভব না হওয়া।
অতএব ইদতিরাব সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে সব ক’টি সনদের মান ও শুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। মুত্তাসিল ও মুনকাতি‘ এবং মারফূ‘ ও মাওকুফের মাঝে ইদতিরাব হয় না। অনুরূপ একাধিক সনদের মাঝে সমন্বয় কিংবা কোনো একটিকে প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব হলে ইদতিরাব বলা হয় না।
সমন্বয়ের ফলে ইদতিরাব নেই:
আমাদের শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ ‘মানযুমাহ বাইকুনিয়া’র ব্যাখ্যায় বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হজের বর্ণনা সম্বলিত হাদিসে ইদতিরাব পরীলক্ষিত হয়, কেউ বলেন: তিনি কিরান হজ করেছেন। কেউ বলেন: ইফরাদ হজ করেছেন। কেউ বলেন: তামাত্তু হজ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এতে কোনো ইদতিরাব নেই, কারণ সমন্বয় করা সম্ভব। সমন্বয় করার দু’টি পদ্ধতি:
প্রথম পদ্ধতি: যারা বলেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফরাদ হজ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য ইফরাদ আমল, যেমন তিনি মক্কায় পৌঁছে প্রথমে তওয়াফে কুদুম ও হজের সায়ি করেন। অতঃপর ঈদের দিন শুধু তওয়াফে ইফাদা করেন। অতঃপর মক্কা ত্যাগ করার সময় তওয়াফে বিদা করে প্রস্থান করেন।
যারা বলেন তিনি তামাত্তু হজ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য হজ ও ওমরা এক সফরে সম্পাদন করা। হজ ও ওমরা দু’টি ইবাদত, দু’সফরে সম্পাদন করাই স্বাভাবিক, তবে তিনি এক সফরে উভয় সম্পাদন করে ফায়দা তথা তামাত্তু হাসিল করেছেন। ওমরার পৃথক সফর ও অর্থব্যয় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তামাত্তু অর্থ ফায়দা হাসিল করা।
যারা বলেন তিনি কিরান হজ করেছেন, তারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত হজের বর্ণনা দিয়েছেন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুরুতে হজের ইহরাম বাঁধেন, অতঃপর তার সাথে ওমরা সংযুক্ত করেন। ইহরামের প্রথম অবস্থার ভিত্তিতে তিনি মুফরিদ, দ্বিতীয় অবস্থার ভিত্তিতে তিনি কারিন। হজ ও ওমরা এক সফরে আদায় করেছেন হিসেবে তামাত্তুকারী।
শায়খুল ইসলাম ইব্নে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ প্রথম পদ্ধতি সমর্থন করে বলেন: “যিনি ইফরাদ বলেছেন, তার উদ্দেশ্য হজের আমল। যিনি তামাত্তু বলেছেন, তার উদ্দেশ্য এক সফরে হজ ও ওমরা সম্পন্ন করে তামাত্তু হাসিল করা। যিনি কিরান বলেছেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত হজ বর্ণনা করেছেন”।
হজ তিন প্রকার:
১. ইফরাদ। ২. তামাত্তু। ৩. কিরান।
১- ইফরাদ: মিকাত থেকে শুধু হজের ইহরাম বেঁধে মুখে لبيك اللهم حجًّا বলা, অতঃপর মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম ও হজের সায়ি সম্পন্ন করে হজের শেষ পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকা। ঈদের দিন তাওয়াফে ইফাদা করে বাড়ি ফিরার সময় তাওয়াফে বিদা করা।
২- কিরান: একসাথে হজ ও ওমরার ইহরাম বেঁধে মুখে لبيك اللهم عمرة وحجًّا বলা, অতঃপর মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম ও হজ-ওমরার সায়ি করা। অতঃপর ইহরাম অবস্থায় থেকে ঈদের দিন শুধু তাওয়াফে ইফাদা করা। বাড়ি ফেরার সময় তাওয়াফে বিদা করা। কিরানের কর্মগুলো ইফরাদের ন্যায়, পার্থক্য শুধু নিয়তে ও হাদই প্রদানে।
৩- তামাত্তু: মিকাত থেকে ওমরার ইহরাম বেঁধে মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ, সায়ি ও চুল ছোট করে ওমরা সম্পন্ন করা। অতঃপর জিল হজের অষ্টম দিন ইহরাম বেঁধে ঈদের দিন তাওয়াফে ইফাদা ও হজের সায়ি করা। বাড়ি ফেরার সময় শুধু তাওয়াফে বিদা করা।
পাধান্য দেওয়ার ফলে ইদতিরাব নেই:
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা যখন বারিরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে মুক্ত করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ বহাল রাখা কিংবা ভেঙ্গে ফেলার স্বাধীনতা দেন। তখন ‘বারিরাহ’র স্বামী মুগিস গোলাম না স্বাধীন ছিল ইখতিলাফ রয়েছে, যা দূর করা সম্ভব নয়, তাই প্রাধান্য দেওয়ার নীতি অনুসরণ করব। মুহাদ্দিসদের নিকট মুগিস গোলাম ছিল বর্ণনা অধিক বিশুদ্ধ। ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন:
“হাকাম বলেছে: তার স্বামী ছিল স্বাধীন, হাকামের কথা মুরসাল। ইব্ন আব্বাস বলেছেন: আমি তাকে গোলাম দেখেছি”। বুখারি অন্যত্র বলেন:
قَالَ الْأَسْوَدُ: وَكَانَ زَوْجُهَا حُرًّا ". قَوْلُ الْأَسْوَدِ: مُنْقَطِعٌ، وَقَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ: رَأَيْتُهُ عَبْدًا: أَصَحُّ.
“আসওয়াদ বলেছে: তার স্বামী ছিল স্বাধীন, আর আসওয়াদের কথা: মুনকাতি‘। ইব্ন আব্বাসের বাণী: ‘আমি তাকে গোলাম দেখেছি’ অধিক বিশুদ্ধ”। ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন:
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: " كَانَ زَوْجُ بَرِيرَةَ عَبْدًا "
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আর তার স্বামী ছিল গোলাম”। অতএব এতে কোনো ইদতিরাব নেই, কারণ বারিরার স্বামী গোলাম ছিল বর্ণনাগুলো অধিক বিশুদ্ধ।
ইব্ন দাকিকুল ঈদ বলেন: “মাখরাজ এক না হলে ইদতিরাব হবে না”। অর্থাৎ মুদতারিব হাদিসের সব ক’টি সনদ একজন রাবির উপর নির্ভরশীল হতে হবে। সাহাবি দু’জন হলে ইদতিরাব হবে না।
ইব্ন রজব রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “... জেনে রাখ, এক হাদিসের সনদে ইখতিলাফ হলে ইদতিরাব হয়, একাধিক হাদিসের সনদের মাঝে ইদতিরাব হয় না। অতএব এক সনদের কারণে অপর সনদ ভুল বলা যাবে না।”।
শায়খ সুলাইমানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “ইদতিরাবের শর্তগুলো খুব সূক্ষ্ম, কোন হাদিসের সকল সনদ জমা করে ইদতিরাবের শর্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মুদতারিব ফায়সালা করা কঠিন কাজ। কারণ কেউ একটি হাদিস মুদতারিব বলল, অতঃপর তার চেয়ে বিজ্ঞ কেউ তাতে প্রাধান্য দিল, অথবা উভয়ের মাঝে সমন্বয় করল, তখন ইদতিরাব থাকবে না। ‘শায’ ফয়সালা করা অপেক্ষাকৃত সহজ, ইদতিরাব ফয়সালা করা কঠিন, বিশেষ করে মতনের ইদতিরাব”। ইদতিরাব সনদ ও মতন উভয় জায়গায় হয়, বেশী হয় সনদে।
সুলাইমানি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আলেমগণ সনদের কারণে একাধিক হাদিসে ইদতিরাবের বিধান আরোপ করেছেন, কিন্তু মতনের কারণে মাত্র কয়েকটি হাদিস মুদতারিব বলেছেন। সাখাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘ইদতিরাবের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ পাওয়া খুব মুশকিল’। অর্থাৎ এমন হাদিস পাওয়া দুষ্কর যা শুধু ইদতিরাবের কারণে দুর্বল, ইদতিরাব না হলে হাদিসটি সহি হত”।
জ্ঞাতব্য: ইদতিরাব সেকাহ রাবিদের হাদিসে হয়, দুর্বল রাবিদের হাদিসে ইদতিরাব হয় না। কারণ, তাদের হাদিস ইদতিরাব ছাড়াই দুর্বল। আর ইদতিরাব সম্পন্ন হাদিস, ইদতিরাব থেকে মুক্ত হলে সহি হয়। তাই এ প্রকার সেকাহ রাবিদের হাদিসের সাথে খাস।
মুদতারিব হাদিসের হুকুম:
মুদতারিব হাদিস দ্বা‘ঈফ, কারণ রাবিদের ইখতিলাফ প্রমাণ করে কেউ হাদিসটি ভালো করে সংরক্ষণ করতে পারেনি।
মুদরাজ হাদিস
مِنْ بَعْضِ أَلْفَاظِ الرُّواةِ اتَّصَلَتْ
وَالْمُدْرَجَاتُ في الْحَدِيْثِ مَا أَتَتْ
“হাদিসে বিদ্যমান সেসব শব্দ মুদরাজ, যা কতক রাবির শব্দ থেকে [তার সাথে] সংযুক্ত হয়েছে”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ষড়বিংশ প্রকার মুদরাজ। এ প্রকারের সম্পর্ক সনদ ও মতন উভয়ের সাথে।
مدْرَج কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ প্রবেশকৃত বস্তু। এক বস্তুকে অপর বস্তুর মাঝে প্রবেশ করানো হলে বলা হয়: أدرجت الشيء في الشيء ‘আমি এক বস্তুকে অপর বস্তুর মাঝে প্রবেশ করিয়েছি’। ইদরাজ ক্রিয়া বিশেষ্য, অর্থ প্রবেশ করানো।
‘মুদরাজে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “হাদিসের সনদ বা মতনে বিনা পার্থক্যে রাবির পক্ষ থেকে বৃদ্ধিকে মুদরাজ বলা হয়”। লেখক এক প্রকার মুদরাজ উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ মতনের মুদরাজ। এ জাতীয় মুদরাজ সবচেয়ে বেশী হয়। হাদিস দ্বারা যদি তিনি সনদ ও মতন উভয় উদ্দেশ্য করেন, তাহলে মুদরাজের উভয় প্রকার তিনি উল্লেখ করেছেন।
জ্ঞাতব্য: হাদিস দ্বারা মারফূ‘ ও মাওকুফ উভয় উদ্দেশ্য। ইচ্ছায় বৃদ্ধি করা হোক বা অনিচ্ছায় বৃদ্ধি করা হোক বর্ধিত অংশকে মুদরাজ বলা হয়, তবে বর্ধিত অংশ হাদিস থেকে পৃথক হলে মুদরাজ নয়। রাবিগণ ব্যাখ্যা ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে ইদরাজ করেন। ইদরাজ কখনো হয় হাদিসের শুরুতে, কখনো মাঝে ও কখনো শেষে হয়।
হাদিসের শুরুতে ইদরাজ:
খতিবে বাগদাদি রাহিমাহুল্লাহ্ ‘আল-ফাসলু লিল ওয়াসলি আল-মুদরাজু ফিন নাকলি’ গ্রন্থে মুদরাজের উদাহরণ দিয়েছেন:
أنا الْحَسَنُ بْنُ أَبِي بَكْرٍ، أنا دَعْلَجُ بْنُ أَحْمَدَ، نا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ الأَزْدِيُّ، نا الْحَسَنُ بْنُ مُحَمَّدٍ هُوَ الزَّعْفَرَانِيُّ، نا أَبُو قَطَنٍ، نا شُعْبَةُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ زِيَادٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَسْبِغُوا الْوُضُوءَ وَيْلٌ لِلأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ "
قَرَأْتُ عَلَى أَبِي بَكْرٍ الْبَرْقَانِيِّ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ عُمَرَ الْحَافِظِ، أنا أَبَا بَكْرٍ النَّيْسَابُورِيَّ حَدَّثَهُمْ، قَالَ: نا الْحَسَنُ بْنُ مُحَمَّدٍ، نا شَبَابَةُ، نا شُعْبَةُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ زِيَادٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَسْبِغُوا الْوُضُوءَ وَيْلٌ لِلأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ "
এখানে দু’টি সনদে একটি হাদিস রয়েছে। শু‘বার দু’জন ছাত্র: আবু কাতান ও শাবাবাহ থেকে সনদ ভাগ হয়েছে। শু‘বার শায়খ মুহাম্মদ ইব্ন যিয়াদ, তার শায়খ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা অজু পূর্ণ কর, টাখনুর জন্য জাহান্নামের আগুন”।
এ সনদে হাদিসের পুরো অংশ মারফূ‘ হিসেবে বর্ণিত, অথচ পুরো অংশ মারফূ‘ নয়, প্রথমাংশ মাওকুফ ও শেষাংশ মারফূ‘। এতে ইদরাজ হয়েছে হাদিসের শুরুতে। মারফূ‘ অংশ«ويل للأعقاب من النار» ‘টাখনুর জন্য জাহান্নামের আগুন’। মাওকুফ অংশ«أسبغوا الوضوء» ‘তোমরা অজু পূর্ণ কর’। এ অংশ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বাণী। মারফূ‘ ও মাওকুফ অংশ পৃথক করা হয়নি বিধায় মুদরাজ। এ জাতীয় ইদরাজ খুব কম, অনেক মুহাদ্দিস বলেছেন: শুরুতে ইদরাজের উদাহরণ শুধু এ হাদিসই।
খতিবে বাগদাদি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “এখানে ভুল হয়েছে ‘শু‘বা’র ছাত্র আবু কাতান ইব্ন হায়সাম ও শাবাবাহ ইব্ন ফাজারি থেকে। এ ছাড়া শু‘বার অন্যান্য ছাত্র, যেমন আবু দাউদ তায়ালিসি, ওহাব ইব্ন জারির ইব্ন হাযেম, আদম ইব্ন আবি আয়াস, আসেম ইব্ন ‘আলি, আলি ইব্ন জা‘দ, মুহাম্মদ ইব্ন জা‘ফর গুনদার, হুশাইম ইব্ন বাশির, ইয়াযিদ ইব্ন যুরাই‘, নাদর ইব্ন শুমাইল, ওকি‘ ইব্ন জাররাহ, ঈসা ইব্ন ইউনুস, মু‘আয ইব্ন মু‘আয সবাই শু‘বা থেকে মারফূ‘ ও মাওকুফ অংশ পৃথক করে বর্ণনা করেছেন”। যেমন শুবার ছাত্র আদম থেকে ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ্ বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا آدَمُ بْنُ أَبِي إِيَاسٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ زِيَادٍ، قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، وَكَانَ يَمُرُّ بِنَا وَالنَّاسُ يَتَوَضَّئُونَ مِنَ الْمِطْهَرَةِ، قَالَ: أَسْبِغُوا الْوُضُوءَ، فَإِنَّ أَبَا الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " وَيْلٌ لِلْأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ ".
... মুহাম্মদ ইব্ন যিয়াদ বলেন: আমি আবু হুরায়রাকে শুনেছি, তখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, মানুষেরা লোটা থেকে অজু করতে ছিল, তিনি বললেন: তোমরা অজু পূর্ণ কর, কারণ আবুল কাসেম বলেছেন: “টাখনুর জন্য জাহান্নামের আগুনের ধ্বংস”। এতে মাওকুফ ও মারফূ‘ অংশ পৃথক করা হয়েছে, এ থেকে জানা যায়, পূর্বের হাদিসে ইদরাজ হয়েছে, কারণ এ হাদিস অধিক বিশুদ্ধ।
হাদিসের মাঝে ইদরাজ:
قال الإمام البخاري –رحمه الله- [في صحيحه برقم:4] حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ، أَنَّهَا، قَالَتْ: " أَوَّلُ مَا بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْوَحْيِ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ فِي النَّوْمِ، فَكَانَ لَا يَرَى رُؤْيَا إِلَّا جَاءَتْ مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ، ثُمَّ حُبِّبَ إِلَيْهِ الْخَلَاءُ وَكَانَ يَخْلُو بِغَارِ حِرَاءٍ، فَيَتَحَنَّثُ فِيهِ وَهُوَ التَّعَبُّدُ اللَّيَالِيَ ذَوَاتِ الْعَدَدِ قَبْلَ أَنْ يَنْزِعَ إِلَى أَهْلِهِ وَيَتَزَوَّدُ لِذَلِكَ، ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى خَدِيجَةَ فَيَتَزَوَّدُ لِمِثْلِهَا حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ وَهُوَ فِي غَارِ حِرَاءٍ، فَجَاءَهُ الْمَلَكُ.
এ হাদিস পাঠকারী মনে করবে যে, وَهُوَ التَّعَبُّدُ اللَّيَالِيَ ذَوَاتِ الْعَدَدِ অংশ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেছেন, অথচ তিনি বলেননি, বরং ইব্নে শিহাব বলেছেন। তিনি فَيَتَحَنَّثُ শব্দের ব্যাখ্যার জন্য ইদরাজ করেছেন, যার প্রয়োজন ছিল, কারণ حِنثِ অর্থ পাপ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَكَانُواْ يُصِرُّونَ عَلَى ٱلۡحِنثِ ٱلۡعَظِيمِ ٤٦ ﴾ [الواقعة: ٤٦]
“আর তারা জঘন্য পাপে লেগে থাকত”। তিনি ব্যাখ্যা না দিলে কেউ ভুল বুঝত: ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে পাপ করতেন’, অথচ তিনি ইবাদত করতেন। ইবাদত حنث দূর করে, অর্থাৎ পাপ দূর করে, তাই ‘হিন্স’ বলে তার বিপরীত অর্থ নেওয়া হয়েছে। এটাও অলঙ্কার শাস্ত্রের একটি নীতি।
দ্বিতীয় উদাহরণ:
قال الإمام الدار قطني –رحمه الله- حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدٍ الْوَكِيلُ، نا عَلِيُّ بْنُ مُسْلِمٍ، ثنا مُحَمَّدُ بْنُ بَكْرٍ، نا عَبْدُ الْحَمِيدِ بْنُ جَعْفَرٍ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ بُسْرَةَ بِنْتِ صَفْوَانَ، قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: " مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ أَوْ أُنْثَيَيْهِ أَوْ رُفْغَيْهِ فَلْيَتَوَضَّأْ ".
এ হাদিস পাঠকারী পুরো অংশ মারফূ‘ মনে করবে, অথচ পুরো অংশ মারফূ‘ নয়, মারফূ‘ শুধু " مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ فَلْيَتَوَضَّأْ " অবশিষ্টাংশ উরওয়া থেকে বর্ধিত। ইমাম দারাকুতনি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন:أَوْ أُنْثَيَيْهِ أَوْ رُفْغَيْهِ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী নয়, বরং উরওয়ার বাণী। প্রকৃত হাদিস নিম্নরূপ:
قال الإمام أبوداود –رحمه الله- حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ عُرْوَةَ يَقُولُ: دَخَلْتُ عَلَى مَرْوَانَ بْنِ الْحَكَمِ فَذَكَرْنَا مَا يَكُونُ مِنْهُ الْوُضُوءُ، فَقَالَ مَرْوَانُ: وَمِنْ مَسِّ الذَّكَرِ؟، فَقَالَ عُرْوَةُ: مَا عَلِمْتُ ذَلِكَ. فَقَالَ مَرْوَانُ: أَخْبَرَتْنِي بُسْرَةُ بِنْتُ صَفْوَانَ، أَنَّهَا سَمِعَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: " مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ فَلْيَتَوَضَّأْ "
এখানে দেখছি: উরওয়া বলছেন, আমি মারওয়ান ইব্নুল হাকামের নিকট গেলাম, তার নিকট অজুর কারণসমূহ নিয়ে আলোচনা করলাম। তখন মারওয়ান বললেন: পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে? উরওয়া বললেন: আমি তা জানি না। মারওয়ান বললেন: আমাকে বুসরা বিনতে সাফওয়ান বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন: “যে তার পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করল, সে যেন অজু করে”। এ থেকে প্রমাণ হল যে, বর্ধিত অংশ উরওয়ার ইজতিহাদ।
হাদিসের শেষে ইদরাজ:
قال الإمام البخاري –رحمه الله- حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ خَالِدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي هِلَالٍ، عَنْ نُعَيْمٍ الْمُجْمِرِ، قَالَ: رَقِيتُ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ عَلَى ظَهْرِ الْمَسْجِدِ فَتَوَضَّأَ، فَقَالَ: إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: " إِنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الْوُضُوءِ، فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ "
হাদিস পাঠকারী মনে করবে পুরো অংশ মারফূ‘, অথচ পুরোটা মারফূ‘ নয়, "فمن استطاع منكم أن يطيل غرته فليفعل" আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বাণী। হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “আবু হুরায়রা ব্যতীত আরো দশজন সাহাবি এ হাদিস বর্ণনা করেছেন, কেউ এ অংশ বর্ণনা করেনি। অধিকন্তু নু‘আইম ব্যতীত আবু হুরায়রার কোনো ছাত্রও তা বলেনি। আল্লাহ ভালো জানেন”।
মুদরাজ চিনার উপায়:
১. কতক সময় হাদিসের বাক্য থেকে ইদরাজ বুঝা যায়, যেমন:
قال الإمام البخاري –رحمه الله- [في صحيحه برقم:2548] حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ مُحَمَّدٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا يُونُسُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، سَمِعْتُ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيِّبِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الصَّالِحِ أَجْرَانِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَبِرُّ أُمِّي، لَأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوتَ وَأَنَا مَمْلُوكٌ ".
এ হাদিসের শেষাংশে وَأَنَا مَمْلُوكٌ শব্দ প্রমাণ করে এ অংশ মারফূ‘ নয়, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষে দাসত্বের তামান্না করা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত তার মা ছিল না, যার প্রতি তিনি দয়া করবেন। তাই নিশ্চিত এ অংশ আবু হুরায়রার বাণী। এখানে মূল হাদিস শুধু لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الصَّالِحِ أَجْرَانِ “নেককার গোলামের জন্য দ্বিগুন সাওয়াব”।
২- কখনো সাহাবি বা কোনো রাবি ইদরাজ বলে দেন, যেমন:
قال الإمام البخاري -رحمه الله- [في صحيحه برقم:4497] حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، عَنْ أَبِي حَمْزَةَ، عَنْ الْأَعْمَشِ، عَنْ شَقِيقٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلِمَةً، وَقُلْتُ أُخْرَى، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " مَنْ مَاتَ وَهْوَ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ "، وَقُلْتُ أَنَا: مَنْ مَاتَ وَهْوَ لَا يَدْعُو لِلَّهِ نِدًّا دَخَلَ الْجَنَّةَ
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ এতে ইদরাজ স্পষ্ট করেছেন।
৩. কখনো অপর সনদ থেকে ইদরাজ জানা যায়, যেমন:
قال الإمام البخاري- رحمه الله- [في صحيحه برقم:2548] حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ مُحَمَّدٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا يُونُسُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، سَمِعْتُ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيِّبِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الصَّالِحِ أَجْرَانِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَبِرُّ أُمِّي، لَأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوتَ وَأَنَا مَمْلُوكٌ ".
এতে মারফূ‘ ও মাওকুফ স্পষ্ট নয়, তবে এ হাদিসের অপর সনদ থেকে মারফূ‘ ও মাওকুফ স্পষ্ট হয়, যেমন:
قال الإمام مسلم –رحمه الله- [في صحيحه برقم:3152] حَدَّثَنِي أَبُو الطَّاهِرِ، وَحَرْمَلَةُ بْنُ يَحْيَى، قَالَا: أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، أَخْبَرَنِي يُونُسُ، عَنْ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ: سَمِعْتُ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيِّبِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الْمُصْلِحِ أَجْرَانِ "، وَالَّذِي نَفْسُ أَبِي هُرَيْرَةَ بِيَدِهِ لَوْلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَبِرُّ أُمِّي، لَأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوتَ وَأَنَا مَمْلُوكٌ، قَالَ: وَبَلَغَنَا أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ لَمْ يَكُنْ يَحُجُّ حَتَّى مَاتَتْ أُمُّهُ لِصُحْبَتِهَا
... ... নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: নেককার গোলামের জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব। তার শপথ করে বলছি, যার হাতে আবু হুরায়রার নফস: যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হজ ও আমার মার প্রতি সদাচরণ না থাকত, তাহলে আমি অবশ্যই পছন্দ করতাম যে, আমি গোলাম অবস্থায় মৃত্যু বরণ করি”। আমাদের নিকট পৌঁছেছে যে, আবু হুরায়রা তার মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হজ করতে পারেননি, তাকে সঙ্গ দেওয়ার কারণে”।
৪. কোনো হাফেযে হাদিস থেকেও ইদরাজ জানা যায়।
সনদে ইদরাজ:
এ প্রকার বুঝার জন্য মনে রাখতে হবে, সনদে ইদরাজ অর্থ সনদ বর্ধিত করা নয়, বরং এক হাদিস বা তার অংশ বিশেষ অপর হাদিসের সাথে জুড়ে দেওয়া। যখন এক হাদিস বা তার অংশ বিশেষ অপর হাদিসের সাথে জুড়ে দেওয়া হল, তখন এক হাদিসের সনদও অপর হাদিসের সনদে অনুপ্রবেশ ঘটানো হল, এটাই সনদে ইদরাজ, কারণ সনদ ব্যতীত হাদিস হয় না। তাই দুই হাদিস একত্র করা হলে, দু’টি সনদও একত্র করা হয়।
ইদরাজের হুকুম:
শব্দের ব্যাখ্যার জন্য ইদরাজ করা বৈধ, তবে হাদিসের অর্থ পাল্টে গেলে ইদরাজ করা হারাম। ইদরাজকে দলিল হিসেবে পেশ করা যায় না, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী নয়।
মুদাব্বাজ হাদিস
مُدَبَّجٌ فَاعْرِفْهُ حَقًّا وَانْتَخِهْ
وَما رَوَى كُلُّ قَرِينٍ عَنْ أَخِهْ
“আর যে হাদিস প্রত্যেক সাথী তার ভাই থেকে বর্ণনা করেছে, তাই ‘মুদাব্বাজ’, অতএব ভালো করে তা জেনে রেখ ও নিজেকে ধন্য মনে কর”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের সপ্তবিংশ প্রকার মুদাব্বাজ। মুদাব্বাজ হাদিস শাস্ত্রের শিল্পের অন্তর্ভুক্ত, তার সাথে সহি, হাসান ও দ্বা‘ঈফের সম্পর্ক নেই।
قَرِين অর্থ সাথী, সমবয়সী কিংবা এক উস্তাদের ছাত্র ইত্যাদি। যখন বলা হয়: فلان قرينٌ لفلان তার অর্থ: অমুক অমুকের সাথী, সমবয়সী কিংবা তারা উভয়ে এক উস্তাদের ছাত্র ইত্যাদি। ‘কারিন’ এর বহুবচন أقران যাদের বয়স ও সনদ বরাবর তারা একে অপরের কারিন, উভয়ে আকরান।
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যদি বর্ণনাকারী ও যার থেকে বর্ণনা করা হয়েছে উভয়ে হাদিস সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে সমান হয়, যেমন উভয়ের বয়স সমান, উভয়ে নির্দিষ্ট শায়খের ছাত্র, তাহলে তাদের একজন থেকে অপরের বর্ণনাকে رواية الأقران ‘রিওয়াইয়াতুল আকরান’ বলা হয়”।
مُدَبَّجٌ কর্মবাচক বিশেষ্য, ديباجة শব্দ থেকে উদ্গত, অর্থ রেশমী বস্ত্র, চেহারা ও ভূমিকা ইত্যাদি। ‘মুদাব্বাজ’ শব্দটি ديباجة الوجه থেকে গৃহীত, অর্থ চেহারার পার্শ্ব। দুই সাথী যখন পরস্পর হাদিস আদান-প্রদান করে, তখন তারা উভয়ে চেহারার পার্শ্ব ঘুরে পরস্পরের দিকে তাকায়, তাই এ প্রকারকে ‘মুদাব্বাজ’ বলা হয়।
مُدَبَّجٌ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা সম্পর্কে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “প্রত্যেক সাথী যদি তার ভাই থেকে হাদিস বর্ণনা করে তাহলে মুদাব্বাজ”। মুদাব্বাজের জন্য উভয়ের সাথী হওয়া ও একে অপর থেকে বর্ণনা করা জরুরী। যেমন মালিক ইব্ন আনাস (মৃ১৭৯হি.) ও সুফিয়ান ইব্নু ‘উয়াইনাহ (মৃ১৯৮হি.), তাদের পরস্পর থেকে পরস্পরের বর্ণনা মুদাব্বাজ।
সাহাবিদের তবকায় মুদাব্বাজ:
যদি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তাহলে আয়েশা থেকে আবু হুরায়রার হাদিস ও আবু হুরায়রা থেকে আয়েশার হাদিস মুদাব্বাজ। অনুরূপ ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু (মৃ.৬৮হি.) যদি যায়েদ ইব্ন সাবিত (মৃ.৪৫হি.) থেকে এবং যায়েদ ইব্ন সাবিত যদি ইব্ন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তাহলে তাদের উভয়ের হাদিস মুদাব্বাজ। অনুরূপ ওমর থেকে যদি ইব্ন ওমর এবং ইব্ন ওমর থেকে যদি ওমর বর্ণনা করেন, তবুও মুদাব্বাজ; তবে মুহাদ্দিসগণ এ প্রকার হাদিসকে رواية الآباء عن الأبناء বলেন, অর্থাৎ সন্তানদের থেকে পিতাদের বর্ণনা।
তাবে‘ঈদের মুদাব্বাজ:
যুহরি যদি ওমর ইব্ন আব্দুল আযিয থেকে ও ওমর ইব্ন আব্দুল আযিয যদি যুহরি থেকে বর্ণনা করেন, তাহলে মুদাব্বাজ।
তাবে তাবে‘ঈদের মুদাব্বাজ:
যদি ইমাম মালিক আওযায়ি থেকে ও আওযায়ি ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তাহলে মুদাব্বাজ।
সারাংশ: কোনো তবকার একাধিক রাবি যদি যৌথভাবে কোনো শায়খ থেকে হাদিস শ্রবণ করেন, অতঃপর তাদের থেকে দু’জন সাথী যদি পরস্পর হাদিস আদান-প্রদান করেন, তাহলে তাদের দু’জনের হাদিসকে মুদাব্বাজ বলা হয়। তারা উভয়ে যদি পিতা-পুত্র হয়, তাহলে ‘রিওয়াইয়াতুল আবা আনিল আবনা’ বলা হয়। তারা উভয়ে যদি উস্তাদ-ছাত্র হয়, তাহলে رواية الأكابر عن الأصاغر বলা হয়। এ প্রকার যদিও মুদাব্বাজ, তবে মুহাদ্দিসগণ তার পৃথক নামকরণ করেছেন: ‘রিওয়াইয়াতুল আকাবির আনিল আসাগির’।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ ‘কারিন’ বলে ‘রিওয়ায়াতুল আবা আনিল আবনা’ ও ‘রিওয়ায়াতুল আকাবির আনিল আসাগির’ থেকে মুদাব্বাজকে পৃথক করেছেন। আর ‘কুল্লুন’ বলে ‘রিওয়ায়াতুল আকরান’ থেকে মুদাব্বাজকে পৃথক করেছেন।
এক সাথী একটি হাদিস তার সাথীকে বর্ণনা করল এক সনদে, অপর সাথী একই হাদিস তাকে বর্ণনা করল ভিন্ন সনদে, তাহলে এটাও মুদাব্বাজ।
জ্ঞাতব্য: মুদাব্বিজ সাধারণত বিনা মাধ্যমে হয়, তবে কখনো মাধ্যম দ্বারাও হয়, তবে তার সংখ্যা খুব কম, যেমন: ‘ইয়াযিদ ইব্ন হাদি’র মাধ্যমে ইমাম মালিক লাইস থেকে ও ইমাম লাইস মালিক থেকে হাদিস বর্ণনা করেন। এখানে লাইস ও মালিক উভয়ে সাথী, কিন্তু একে অপর থেকে বর্ণনা করেছেন হাদির মধ্যস্থায়।
মুত্তাফিক ও মুফতারিক হাদিস
وَضِدُّهُ فِيْمَا ذَكَرْنَا الْمُفْتَرِقْ
مُتَّفِقٌ لَفْظًا وَخَطّاً مُتَّفِقْ
“লিখায় ও উচ্চারণে অভিন্ন নাম মুত্তাফিক, আর আমরা যা উল্লেখ করেছি তার বিপরীত মুখতালিফ।” অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের অষ্টাবিংশ প্রকার মুত্তাফিক ও মুফতারিক। লেখকের বর্ণনা পদ্ধতি থেকে মুত্তাফিক ও মুফতারিক দু’প্রকার বুঝে আসে, বস্তুত ‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’ এক প্রকার। এ প্রকারের সম্পর্ক সনদের সাথে।
‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’ আভিধানিকভাবে এমন দু’টি বস্তুকে বলা হয়, যাদের মাঝে কোনো বিষয়ে মিল ও কোনো বিষয়ে অমিল রয়েছে, যেমন বলা হয়: قوم متفق ومفترق অর্থ ‘এমন জাতি, যাদের দীন এক, তবে মত বিভিন্ন’। দীন এক হওয়ার কারণে তারা মুত্তাফিক, মতামত বিভিন্ন কারণে তারা মুফতারিক।
متفق ومفترق এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: ‘যে রাবিদের নাম লেখায় ও উচ্চারণ এক কিন্তু তাদের ব্যক্তি সত্ত্বা ভিন্ন তাই ‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’।
রাবিদের নামেই লিখায় ও উচ্চারণে মিল সীমাবদ্ধ থাকে না, কখনো তার পরিধি আরো বর্ধিত হয়, যেমন রাবিদের নাম ও তাদের পিতার নাম এক। কখনো রাবিদের নাম, পিতার নাম ও দাদার নাম পর্যন্ত এক হয়, তাদের বংশ এক হলে মিলের পরিসর আরো বর্ধিত হয়। রাবিদের নাম, কিংবা উপনাম, কিংবা বংশ এক হলে শব্দের বিচারে ‘মুত্তাফিক’ বলা হয়, ব্যক্তি সত্ত্বার বিচারে ‘মুফতারিক’ বলা হয়। উদাহরণত সনদে কোনো রাবির নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ নামে সেকাহ ও গায়রে সেকাহ একস্তরে দু’জন রাবি রয়েছে। তাদের দু’জন থেকে খালিদ নামক রাবি হাদিস শ্রবণ করেছেন। খালিদ যখন বললেন: আমাকে আব্দুল্লাহ বলেছেন। আমরা তার হাদিস সম্পর্কে সহি বা দ্বা‘ঈফ ফয়সালা করব না, যতক্ষণ না আমাদের নিকট স্পষ্ট হয় তার উস্তাদ কোন্ আব্দুল্লাহ? সেকাহ আব্দুল্লাহ হলে হাদিস সহি, দুর্বল আব্দুল্লাহ হলে হাদিস দ্বা‘ঈফ। তারা উভয়ে সেকাহ হলে যাচাই ব্যতীত সহি বলা যেত। এ প্রকার হাদিস মুত্তাফিক ও মুফতারিক নামে পরিচিত।
‘ইত্তিফাক ও ইফতিরাক’ কখনো শুধু রাবির নামে হয়; কখনো রাবি ও তার পিতার নামে হয়; কখনো রাবি, রাবির পিতা ও দাদার নামে হয়। ‘ইত্তিফাক ও ইফতিরাক’কে উসুলে হাদিসের কিতাবে আট প্রকারে ভাগ করা হয়েছে:
১. একাধিক রাবির নাম ও পিতার নাম এক, যেমন: খলিল ইব্ন আহমদ নামে ছয়জন ব্যক্তি রয়েছে, যথা:
ক. আবু আব্দুর রহমান খলিল ইব্ন আহমদ নাহবি। তিনি আরবি ভাষাবিদ ‘সিবওয়েহ’-এর উস্তাদ। মুসলিম উম্মায় তাদের নবীর নামানুসারে খলিলের পিতার নাম সর্বপ্রথম আহমদ রাখা হয়।
খ. আবু বশির খলিল ইব্ন আহমদ মুযানি।
গ. খলিল ইব্ন আহমদ ইস্পাহানী।
ঘ. আবু সায়িদ খলিল ইব্ন আহমদ সাজাজি, হানাফি।
ঙ. আবু সায়িদ খলিল ইব্ন আহমদ বুসতি।
চ. আবু সায়িদ খলিল ইব্ন আহমদ বুসতি, শাফেয়ি।
২. রাবিদের নাম, পিতার নাম ও দাদার নাম এক, যেমন: আহমদ ইব্ন জাফর ইব্ন হামদান নামে একস্তরে চারজন রাবি আছেন, তাদের সবার শায়খ আব্দুল্লাহ।
ক. আবু বকর আহমদ ইব্ন জাফর ইব্ন হামদান ইব্ন মালিক ইব্ন শাবিব ইব্ন আব্দুল্লাহ আল-কাতিয়ি।
খ. আবু বকর আহমদ ইব্ন জাফর ইব্ন হামদান সাকতি।
গ. আহমদ ইব্ন জাফর ইব্ন হামদান দিনুরি।
ঘ. আহমদ ইব্ন জাফর ইব্ন হামদান তারতুসি।
৩. রাবিদের বংশ ও উপনাম এক, যেমন আবু ইমরান আল-জুনি নামে দু’জন রাবি রয়েছে:
ক. আবু ইমরান আব্দুল মালিক আল-জুনি তাবে‘ঈ,
খ. আবু ইমরান মুসা ইব্ন সাহাল আল-বুসাইরি আল-জুনি।
৪. রাবির নাম, পিতার নাম ও বংশ মুত্তাফিক। কাছাকাছি তবকার এরূপ দু’জন রাবি আছেন, দু’জনই আনসারি, যেমন: মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ আল-আনসারি।
ক. কাদি আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ ইব্নুল মুসান্না ইব্ন আব্দুল্লাহ ইব্ন আনাস ইব্ন মালিক আল-আনসারি আল-বসরি।
খ. আবু সালামাহ মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ ইব্ন যিয়াদ আল-আনসারি আল-বসরি।
তাদের উভয়ের উস্তাদ: ১. হুমাইদ আত-তাওয়িল, ২. সুলাইমান আত-তাইমি, ৩. মালিক ইব্ন দিনার, ও ৪. কুররাহ ইব্ন খালিদ।
৫. উপনাম ও পিতার নাম মুত্তাফিক, যেমন আবু বকর ইব্ন ‘আইয়াশ, এরূপ তিনজন রাবি রয়েছেন।
ক. আবু বকর ইব্ন ‘আইয়াশ সালেম আল-আসাদি আল-কুফি, তিনি কারি ‘আসেম’ এর কিরাতের রাবি।
খ. আবু বকর ইব্ন ‘আইয়াশ হিমসি।
গ. আবু বকর ইব্ন ‘আইয়াশ সুলামি।
৬. রাবির নাম ও পিতার উপনাম মুত্তাফিক। এ প্রকার পঞ্চম প্রকারের বিপরীত, যেমন সালেহ ইব্ন আবু সালেহ নামে চারজন আছেন।
ক. সালেহ ইব্ন আবু সালেহ আল-মাদানি। তিনি আবু হুরায়রা, ইব্ন আব্বাস প্রমুখ সাহাবিদের থেকে বর্ণনা করেন।
খ. সালেহ ইব্ন আবু সালেহ যাকওয়ান আস-সুমান, তিনি আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন।
৭. রাবির নাম, অথবা উপনাম, অথবা বংশ মুত্তাফিক, যেমন হাম্মাদ নামে দু’জন ও আব্দুল্লাহ নামে একাধিক রাবি আছেন।
ক. হাম্মাদ ইব্ন যায়েদ,
খ. হাম্মাদ ইব্ন সালামাহ।
আব্দুল্লাহ নামে অনেক রাবি আছেন। সালামাহ ইব্ন সুলাইমান বলেছেন: যদি মক্কায় আব্দুল্লাহ বলা হয়, তার অর্থ আব্দুল্লাহ ইব্ন জুবাইর; যদি মদিনায় আব্দুল্লাহ বলা হয়, তার অর্থ আব্দুল্লাহ ইব্ন ওমর; যদি কুফায় আব্দুল্লাহ বলা হয়, তার অর্থ আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ; যদি বসরায় আব্দুল্লাহ বলা হয়, তার অর্থ আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস; যদি খোরাসানে আব্দুল্লাহ বলা হয়, তার অর্থ আব্দুল্লাহ ইব্নুল মুবারক; যদি শামে আব্দুল্লাহ বলা হয়, তার অর্থ আব্দুল্লাহ ইব্ন আমর ইব্নুল আস। তারা সবাই সত্ত্বার বিবেচনায় মুফতারিক, তবে নামের বিবেচনায় মুত্তাফিক।
৮. রাবিদের বংশের নাম মুত্তাফিক, তবে বাস্তবের বিবেচনায় মুফতারিক, যেমন হানাফি দ্বারা বনু হানাফিয়া ও মাযহাবে হানাফি উভয় বুঝায়। বনু হানিফা বংশের রাবি:
ক. আবু বকর আব্দুল কাবির ইব্ন আব্দুল মাজিদ আল-হানাফি এবং তার ভাই উবাইদুল্লাহ হানাফি থেকে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম হাদিস বর্ণনা করেছেন।
জ্ঞাতব্য: ‘মুত্তাফিক ও মুফতারিকে’র জন্য দুই বা ততোধিক রাবির এক যুগের মুহাদ্দিস, কিংবা এক উস্তাদের ছাত্র, কিংবা উভয় থেকে কোনো রাবি বর্ণনা করেছেন এরূপ হওয়া জরুরি, যেন তাদের নির্ণয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়, তাহলে মুত্তাফিক ও মুফতারিক হবে। যদি তাদের নির্ণয়ে জটিলতা সৃষ্টি না হয়, তাহলে ‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’ হবে না, যেমন তাদের যুগ এক নয়, কিংবা তাদের উস্তাদ এক নয়, কিংবা তাদের ছাত্র এক নয়, তাই এসব ক্ষেত্রে ‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’ হবে না।
মুহমাল:
দু’জন রাবির নাম এক, কিন্তু কাউকে পৃথক করে বর্ণনা করা হয়নি, ফলে তাদের চিহ্নিত করা দুষ্কর। এরূপ রাবিদের মুহমাল বলা হয়, যেমন বুখারিতে আহমদ নামে একজন রাবি আছেন, তার ছাত্র ইব্ন ওহাব নির্দিষ্ট করে বলেননি আহমদকে: আহমদ ইব্ন সালেহ, না আহমদ ইব্ন ঈসা। তাই আহমদ মুহমাল।
‘মুতালিফ ও মুখতালিফ’ হাদিস
وَضِدُّهُ مُخْتَلِفٌ فَاخْشَ الْغَلَطْ
مُؤْتَلِفٌ مُتَّفِقُ الْخَطِّ فَقَطْ
‘মু’তালিফ’: যা শুধু লিখায় সাদৃশ্যপূর্ণ, আর তার বিপরীত মুখতালিফ, অতএব ভুল থেকে সাবধান থেকো”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ঊনবিংশ প্রকার মু’তালিফ ও মুখতালিফ। পূর্বে বর্ণিত প্রকার ও এ প্রকার খুব কাছাকাছি। এ প্রকারের সম্পর্কও সনদের সাথে।
مُؤْتَلِفٌ ‘মু’তালিফ’ অর্থ মিলপূর্ণ, এখানে অর্থ লিখায় সাদৃশ্যপূর্ণ। مُختَلِفٌ অর্থ পৃথক, এখানে অর্থ রাবিগণ ও তাদের নামের উচ্চারণ পৃথক। এক বস্তুর যদি অপর বস্তুর সাথে কতক বিষয়ে মিল ও কতক বিষয়ে অমিল থাকে, তাহলে ‘মুতালিফ ও মুখতালিফ’ বলা হয়।
‘মুতালিফ ও মুখতালিফে’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “একাধিক রাবির নাম লিখায় সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উচ্চারণ পৃথক হলে ‘মু’তালিফ ও মুখতালিফ’ বলা হয়। আভিধানিকভাবে এ প্রকারকে মু’তালিফ ও মুফতারিক বলা যায়, কারণ মুখতালিফ ও মুফতারিক অর্থ এক।
লেখকের বর্ণনা রীতি থেকে ‘মু’তালিফ ও মুখতালিফ’ দু’প্রকার বুঝে আসে, বিশেষ করে وضِدُّهُ শব্দ এ ধারণাকে শক্তিশালী করে, অথচ উভয় একপ্রকর।
লেখক فَاخْشَ الغَلَطْ বলে ‘ভুল থেকে সতর্ক করেছেন’। কারণ, এ অধ্যায়ে ভুল হওয়া স্বাভাবিক, এতে কিয়াস ও গবেষণার কোনো দখল নেই, যার উপর ভিত্তি করে শুদ্ধ উচ্চারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়। তাই মুহাদ্দিসগণ এ অধ্যায়কে গুরুত্বসহ গ্রহণ করেছেন। উদাহরণত سلام ও سلاَّمদু’টি শব্দ, প্রথম শব্দের উচ্চারণ সালাম, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ সাল্লাম, লিখায় পার্থক্য নেই, উচ্চারণে শুধু তাশদীদের পার্থক্য। অনুরূপعُمارة ও عِمارةদু’টি শব্দ, প্রথম শব্দের উচ্চারণ উমারাহ, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ ইমারাহ, লিখায় পার্থক্য নেই, উচ্চারণে শুধু কাসরা ও দাম্মার পার্থক্য। অনুরূপحزام ও حرام দু’টি শব্দ, প্রথম শব্দের উচ্চারণ হিযাম, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ হারাম, লিখায় শুধু একটি নোকতার পার্থক্য। অনুরূপبَشير ও بُشير দু’টি শব্দ, প্রথম শব্দের উচ্চারণ বাশির, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ বুশাইর, লিখায় তফাৎ নেই, উচ্চারণে শুধু ফাতহা ও দাম্মার পার্থক্য। অনুরূপحَميد ও حُميد প্রথম শব্দের উচ্চারণ হামিদ, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ হুমাইদ, লিখায় পার্থক্য নেই, উচ্চারণে শুধু ফাতহা ও দাম্মার পার্থক্য। এ শব্দগুলোর লেখার আকৃতি এক, কিন্তু উচ্চারণ ভিন্ন, সচেতন না হলে ভুল হওয়া স্বাভাবিক।
‘মু’তালিফ ও মুখতালিফে’র কয়েকটি অবস্থা:
১. রাবিদের নামের বর্ণ এক, তবে হরকত ও উচ্চারণ পৃথক, যেমন سلام ও سلاَّم দু’টি শব্দ, প্রথম শব্দের উচ্চারণ সালাম, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ সাল্লাম। অনুরূপبَشير ও بُشير প্রথম শব্দের উচ্চারণ বাশির, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ বুশাইর। অনুরূপحَميد ও حُميد প্রথম শব্দের উচ্চারণ হামিদ, দ্বিতীয় শব্দের উচ্চারণ হুমাইদ ইত্যাদি। এসব নামের বর্ণ ও আকৃতিতে কোনো পরিবর্তন নেই, তবে হরকত ও উচ্চারণ ভিন্ন।
২. রাবিদের নামের বর্ণের আকৃতি এক, কিন্তু নোকতা পৃথক, যেমনخازم ও حازمদু’টি নামের আকৃতি এক, তবে প্রথমটিতে নোকতা আছে দ্বিতীয়টিতে নোকতা নেই। অনুরূপ حضين و حصين দু’টি নামের আকৃতি এক, তবে প্রথমটিতে নোকতা আছে, দ্বিতীয়টিতে নোকতা নেই। এসব বর্ণের আকৃতি এক, শুধু নোকতায় পার্থক্য।
৩. রাবিদের নামের বর্ণের লেখার আকৃতি এক, কিন্তু বর্ণ পৃথক, যেমনحِبَّان ও حَيَّان ‘হিব্বান ও হাইয়ান’। অনুরূপعباس ও عياش ‘আব্বাস ও ‘আইয়াশ’। অনুরূপ خياط ও حباط ‘খাইয়াত ও হাব্বাত’ ইত্যাদি দু’টি নামের বর্ণের আকৃতি এক, তবে বর্ণ দু’টি পৃথক, একটিতে ب অপরটিকে ي রয়েছে।
‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’ এবং ‘মুতালিফ ও মুখতালিফ’ প্রকারে রাবিগণ পৃথক সন্দেহ নেই, কিন্তু তাদের নাম এক তাই মুত্তাফিক বলা হয়। রাবিদের নাম ও নামের উচ্চারণ পৃথক হলে মু’তালিফ ও মুখতালিফ। রাবিদের নাম ও উচ্চারণ এক হলে মুত্তাফিক ও মুফতারিক।
এ প্রকার ইলমের উপকারিতা:
এ প্রকার ইলম জানা থাকলে রাবিদের চিহ্নিত করা সহজ হয়। উদাহরণত: দশজন মুহাদ্দিসের নাম ‘আব্বাস। রাবি যখন ‘আব্বাস নামক মুহাদ্দিস থেকে বর্ণনা করেন, তখন জানা উচিত কোন আব্বাস তার উস্তাদ। কারণ হাদিস শাস্ত্রে সকল ‘আব্বাস সমান পারদর্শী নয়। তাদের দীনদারি, স্মরণ শক্তি ও হাদিসে মগ্নতা বরাবর নয়। কেউ দুর্বল কেউ সবল, কেউ গ্রহণযোগ্য কেউ পরিত্যক্ত, তাই সহি ও দ্বা‘ঈফ নির্ণয় করার জন্য আব্বাসকে নির্ণয় করা জরুরি।
‘মু’তালিফ ও মুখতালিফ’ চেনা অপেক্ষাকৃত সহজ। তাদের নামের উচ্চারণ যেরূপ পৃথক, বাস্তবেও তারা পৃথক। আমরা যদি শব্দের হরকত ও নোকতা ত্যাগ করে পূর্ব যুগের পদ্ধতি অনুসরণ করি, তাহলে সমস্যা দেখা দিবে। যেমন পূর্বে عباس ও عيَّاش শব্দদ্বয় এক ছিল। কারণ পূর্বে হরকত ও নোকতা ব্যবহার করা হত না, পরবর্তী যুগে হরকত ও নোকতা ব্যবহার করার ফলে এসব ভুল কম হয়।
‘মুত্তাফিক ও মুফতারিক’ জানা কঠিন, পরবর্তী যুগেও কঠিন, কারণ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার জন্য গভীর পড়াশোনা ও রাবিদের অবস্থা জানা দরকার।
‘মু’তালিফ ও মুখতালিফ’ জানার পদ্ধতি দু’টি:
১. ‘মু’তালিফ ও মুখতালিফ’ থেকে যে নাম অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহার হয়, তা চিহ্নিত করা সহজ।
২. যেসব ‘মু’তালিফ ও মুখতালিফ’ কোনো নিয়মের অধীনে নেয়া সম্ভব নয়, সেগুলো শুনে মুখস্থ করা জরুরি।
নিয়মের অধীন নামগুলোকে ইব্নুস সালাহ প্রমুখ দু’ভাগে ভাগ করেছেন।
১. সাধারণ নিয়মের অধীন নাম, যেমন কতক রাবির ক্ষেত্রে বলা যায় তাদের নামের উচ্চারণ এভাবে, অবশিষ্টগুলো ওভাবে। যেমন سلاَّم ‘সাল্লাম’ নামগুলো তাশদীদ যুক্ত, পাঁচটি নাম ব্যতীত, যথা:
ক. আব্দুল্লাহ ইব্ন সালাম সাহাবি।
খ. মুহাম্মদ ইব্ন সালাম বুখারি।
গ. সালাম ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন নাহিদ।
ঘ. মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল ওয়াহহাব সালাম মুতাযেলি জুব্বায়ি।
ঙ. সালাম ইব্ন মিশকাম।
এ পাঁচটি নামের উচ্চারণ ‘সালাম’, এ ছাড়া সকল سلاَّم তাশদীদ যুক্ত, অর্থাৎ তাদের উচ্চারণ ‘সাল্লাম’।
২. নির্দিষ্ট কিতাব হিসেবে কতক নামের নিয়ম বলা যায়, যেমন বুখারি, মুসলিম ও মুয়াত্তায় এ নামে শুধু অমুকে আছেন, যার উচ্চারণ এভাবে।
জ্ঞাতব্য: হাদিস শাস্ত্রের এ প্রকার জানা খুব জরুরি, যেসব মুহাদ্দিস হাদিসের এ প্রকার জানে না, তারা অধিক ভুল করেন ও বরাবর লজ্জিত হন। এ জাতীয় নাম খুব বেশী, যার কোনো নিয়ম নেই, অনেক নাম দেখে বিভ্রাটে পড়তে হয়। সকল রাবিকে জানা ব্যতীত এ ইলম হাসিল হয় না।
এ বিষয়ে লিখিত কিতাব:
‘মুতালিফ ও মুখতালিফে’র উপর সর্বপ্রথম কিতাব লিখেন আবু জা‘ফর মুহাম্মদ ইব্ন হাবিব আল-বাগদাদি, তার কিতাবের নাম: (المؤتلف والمختلف) في أسماء القبائل তবে তার কিতাব ছিল ব্যাপক, সেখানে মুহাদ্দিস ও গায়রে মুহাদ্দিস সবার নাম ছিল। মুহাদ্দিসদের নামের উপর সর্বপ্রথম মুতালিফ ও মুখতালিফ লিখেন আব্দুল গনি ইব্ন সায়িদ, তার কিতাবের নামও (المؤتلف والمختلف)
মুতাশাবেহ
উসুলে হাদিসের কিতাবসমূহে এ অধ্যায়ে তৃতীয় একপ্রকার উল্লেখ করা হয় ‘মুতাশাবেহ’, যা পূর্বের দু’প্রকার থেকে গঠিত। যেমন রাবিদের নাম এক, যাদের পিতার নাম লেখায় সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে উচ্চারণ ভিন্ন যথা محمد بن عقيل মুহাম্মদ ইব্ন আকিল ও محمد بن عقيل মুহাম্মদ ইব্ন উকাইল। প্রথম ব্যক্তি নিশাপুরি, দ্বিতীয় ব্যক্তি ফিরইয়াবি। উভয়ে প্রসিদ্ধ ও এক যুগের ব্যক্তিত্ব।
রাবিদের নাম সাদৃশ্যপূর্ণ, উচ্চারণে ভিন্ন, তবে পিতাদের নাম এক, যেমন شريح بن النعمان শুরাই ইব্ন নুমান ও سريج بن النعمان সুরাইজ ইব্ন নুমান। প্রথম রাবি তাবে‘ঈ, আলি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদিস বর্ণনা করেন। দ্বিতীয় রাবি ইমাম বুখারির শায়খ। অনুরূপ একাধিক রাবি ও তাদের পিতার নাম এক, তবে বংশ পৃথক, তবুও এ প্রকার ভুক্ত।
এ জাতীয় নামের ভুল-ভ্রান্তি থেকে বাচার পদ্ধতি হচ্ছে এ বিষয়ে লিখিত কিতাব পাঠ করা, শায়খদের থেকে শ্রবণ করা এবং ভাল করে তাদের নামগুলো জেনে নেয়া ও স্মরণ রাখা।
মুনকার হাদিস
تَعْدِيْلُهُ لا يَحْمِلُ التَّفَرُّدَا
وَالْمُنْكَرُ الْفَرْدُ بِهِ رَاوٍ غَدَا
‘মুনকার’: একজন রাবির বর্ণিত ফার্দ, যার আদালত নিঃসঙ্গতা ধারণ করতে পারে না”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের ত্রিংশ প্রকার মুনকার। এ প্রকার যদি লেখক শাযের সাথে উল্লেখ করতেন, তাহলে ভালো হত, কারণ শায হাদিসে যেরূপ মুখালিফাত রয়েছে, এখানেও মুখালিফাত আছে। শায হাদিসে সেকাহ বা মাকবুল রাবি তাদের চেয়ে উত্তম রাবির মুখালিফাত করেন; আর মুনকার হাদিসে দ্বা‘ঈফ রাবি সেকাহ রাবির মুখালিফাত করে।
ُمنْكَرُ কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ প্রত্যাখ্যাত, অস্বীকৃত ও অপরিচিত।
‘মুনকার’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “মুনকার সে ফার্দ হাদিস, যা শুধু একজন রাবি বর্ণনা করেছে, যার একা আদালত গ্রহণযোগ্য নয়”। উদাহরণত ইব্ন মাজাহ বর্ণনা করেন:
قال ابن ماجة القزويني –رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو بِشْرٍ بَكْرُ بْنُ خَلَفٍ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ قَيْسٍ الْمَدَنِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " كُلُوا الْبَلَحَ بِالتَّمْرِ، كُلُوا الْخَلَقَ بِالْجَدِيدِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَغْضَب، وَيَقُولُ: بَقِيَ ابْنُ آدَمَ حَتَّى أَكَلَ الْخَلَقَ بِالْجَدِيدِ "
এ সনদে ইয়াহইয়া ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন কায়েস আল-মাদানি দুর্বল, যার একলা বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব মুনকার।
ইমাম মুসলিম সহি ‘মুসলিমে’র ভূমিকায় মুনকারের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন:
"وَعَلَامَةُ الْمُنْكَرِ فِي حَدِيثِ الْمُحَدِّثِ، إِذَا مَا عُرِضَتْ رِوَايَتُهُ لِلْحَدِيثِ عَلَى رِوَايَةِ غَيْرِهِ مِنْ أَهْلِ الْحِفْظِ وَالرِّضَا، خَالَفَتْ رِوَايَتُهُ رِوَايَتَهُمْ، أَوْ لَمْ تَكَدْ تُوَافِقُهَا، فَإِذَا كَانَ الأَغْلَبُ مِنْ حَدِيثِهِ كَذَلِكَ، كَانَ مَهْجُورَ الْحَدِيثِ غَيْرَ مَقْبُولِهِ وَلَا مُسْتَعْمَلِهِ".
“আর মুহাদ্দিসের হাদিসে মুনকারের নিদর্শন: যখন তার বর্ণিত হাদিসটি অধিক স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য মুহাদ্দিসের বর্ণিত হাদিসের সামনে রাখা হয়, তার বর্ণনা তাদের বর্ণনার বিপরীত সাব্যস্ত হয়, অথবা তাদের বর্ণনার সাদৃশ্য হয় না, যদি তার অধিকাংশ হাদিস এরূপ হয়, তাহলে হাদিসের ক্ষেত্রে সে পরিত্যক্ত, অগ্রহণযোগ্য ও তার হাদিস আমল যোগ্য নয়”।
ইব্নুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “মুনকার দু’প্রকার: ক. সেকাহ রাবির বিপরীত দুর্বল রাবির বর্ণনা। খ. এমন [দুর্বল] রাবির ফার্দ হাদিস, যার একলা বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়”।
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “দুর্বল রাবি যদি সেকাহ রাবির বিরোধিতা করে, তাহলে সেকাহ রাবির হাদিসকে মারূফ ও দুর্বল রাবির হাদিসকে মুনকার বলা হয়...” অতএব হাফেয মুনকারের জন্য দু’টি শর্তারোপ করেন: ১. রাবির দুর্বল হওয়া এবং ২. অধিক সেকাহ রাবির বিরোধিতা করা। এ দু’শর্ত যুক্ত হাদিস মুনকার।
হাফেয রাহিমাহুল্লাহ্ অন্যত্র বলেন: “মাজহুল রাবির একলা বর্ণনা, অথবা দুর্বল স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন রাবির একলা বর্ণনা, অথবা এক শায়খের ক্ষেত্রে দুর্বল অপর শায়খের ক্ষেত্রে দুর্বল নয় রাবির একলা বর্ণনা, যার পক্ষে মুতাবে‘ বা শাহেদ নেই, এ জাতীয় হাদিসও একপ্রকার মুনকার, যা অনেক মুহাদ্দিসের লিখনিতে পাওয়া যায়”।
সারাংশ: মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন অর্থে ‘মুনকার’ প্রয়োগ করেন, যেমন:
১. কেউ বলেন: মাতরুক রাবির মুফরাদ বর্ণনা মুনকার।
২. কেউ বলেন: সেকাহ রাবির বিপরীত দুর্বল রাবির হাদিস মুনকার।
৩. কেউ বলেন: দুর্বল রাবির একা বর্ণিত হাদিস মুনকার।
৪. কেউ বলেন: যারা হাফেযে হাদিস নয়, তাদের মুফরাদ বর্ণনা মুনকার।
৫. কেউ বলেন: শরীয়তের প্রসিদ্ধ বিধান কিংবা অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিষয়ের মুখালিফ বর্ণনা মুনকার।
৬. কেউ বলেন: জাল হাদিস মুনকার, ইত্যাদি।
মাতরুক হাদিস
وَأَجْمَعُوا لِضَعْفِهِ فَهْوَ كَرَدْ
مَتْرُوكُهُ مَا وَاحِدٌ بِهِ انْفَرَدْ
“যে হাদিস একলা কোনো রাবি বর্ণনা করেছেন, যার দুর্বলতার উপর সবাই একমত, তাই ‘মাতরুক’ বা পরিত্যক্ত”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের একত্রিংশ প্রকার মাতরুক।
مَتُروكُ এর আভিধানিক অর্থ পরিত্যক্ত, পরিত্যাজ্য ও বাতিল।
‘মাতরুক’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেন: “সবার নিকট দুর্বল রাবির একলা বর্ণিত হাদিস মাতরুক এবং তাই পরিত্যক্ত”।
এখানেأجمعوا ক্রিয়ার সর্বনাম দ্বারা উদ্দেশ্য মুহাদ্দিসগণ। অর্থাৎ মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট, অথবা সমাজে মিথ্যুক হিসেবে পরিচিত, অথবা বেদীন, অথবা অধিক ভুলকারী বা অন্যমনস্ক ইত্যাদি কারণে সকল মুহাদ্দিসের নিকট দুর্বল রাবির বর্ণিত হাদিস মাতরুক, যেমন ওমর ইব্ন হারুন। ইমাম তিরমিযি রহ. বলেন:
قال الإمام الترمذي -رحمه الله- حَدَّثَنَا هَنَّادٌ، حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ هَارُونَ، عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْخُذُ مِنْ لِحْيَتِهِ مِنْ عَرْضِهَا وَطُولِهَا»
আহলে ইলম এ হাদিসকে মাতরুকের উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন। কারণ এ সনদে ওমর ইব্ন হারুন মাতরুক। কতক মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট বলেছেন। শায়খ আলবানি রাহিমাহুল্লাহ্ এ হাদিসকে মাওদু‘ বলেছেন।
যে রাবি মানুষের সাথে মিথ্যা বলেছে প্রমাণ আছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা বলার প্রমাণ নেই, হাদিসের পরিভাষায় তাকে মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট বলা হয়। তার হাদিস জাল নয়, কারণ সে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা বলেছে প্রমাণিত হয়নি। এ ব্যক্তি সকল মুহাদ্দিসের নিকট মাতরুক, তার হাদিস ‘মারদুদ’ ও প্রত্যাখ্যাত। অতএব বিতর্কিত রাবি মাতরুক নয়।
কতক মুহাদ্দিস অধিক দুর্বল, অথবা অতিমাত্রায় ভুলকারী, অথবা অধিক অমনোযোগী, অথবা ফাসেকের একক বর্ণনা, অথবা বিদ‘আতের দিকে আহ্বানকারী, অথবা ইমামদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীর হাদিসকে মাতরুক বলেছেন। কেউ জাল ও মুনকার হাদিসকেও মাতরুক বলেছেন। কখনো মানসুখ হাদিসকে মাতরুক বলা হয়।
মাতরুক হাদিসের হুকুম:
মাওদু হাদিসের ন্যায় মাতরুক শাহেদ ও মুতাবে‘ হতে পারে না, তবে ‘মাওদু’ থেকে উত্তম, যদিও উভয়ের হুকুম এক। মাতরুকের দুর্বলতা কখনো দূর হয় না, তাই তার থাকা না-থাকা উভয় সমান।
মাওদু‘ হাদিস
عَلى النَّبيْ فَذَلِكَ الْمَوْضُوعُ
وَالْكَذِبُ الْمُخْتَلَقُ الْمَصْنُوعُ
“নবীর উপর সৃষ্ট ও বানোয়াট হাদিসই মিথ্যা এবং তাই মাওদু‘”। অত্র কবিতায় বর্ণিত ক্রমানুসারে হাদিসের দ্বাত্রিংশ প্রকার মাওদু‘।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ কবিতার শুরুতে হাদিসের সর্বোত্তম প্রকার ‘সহি’র আলোচনা করেছেন, সর্বশেষ করেছেন নিকৃষ্ট প্রকার ‘মাওদু‘র আলোচনা। সহি ও মাওদু‘র মাঝে হাদিসের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করেছেন।
موضوع কর্মবাচক বিশেষ্য وَضْع ক্রিয়া বিশেষ্য থেকে উদ্গত, অর্থ বানোয়াট, তৈরিকৃত ও নির্মিত। কবিতায় উল্লেখিত مختلق و مصنوع সামর্থবোধক শব্দ। ‘মাওদু’র আরেক অর্থ الشيء المحطوط অর্থাৎ জমিনে পতিত বস্তু।
‘মাওদু’র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর বানোয়াট ও রচনাকৃত কথাই মাওদু”। রাবির ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সকল রচনাকে মাওদু‘ বলা হয়।
মাওদু হাদিস বর্ণনাকারীগণ পাঁচ প্রকার:
ইব্নু জাওযি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যেসব রাবিদের হাদিসে মাওদু‘, মিথ্যা ও মাকলুব প্রবেশ করেছে তারা পাঁচ প্রকার:
১. এক শ্রেণির মুহাদ্দিসের উপর বৈরাগ্য ও দুনিয়ার প্রতি অনীহা প্রবল ছিল, ফলে তারা যত্নসহ হাদিস মুখস্থ করেনি, মানুষের কথা ও হাদিস পৃথক করার বিদ্যা অর্জন করেনি। তাদের কারো কিতাব হারিয়ে গিয়েছিল, অথবা কোনো অগ্নি দুর্ঘটনায় পুড়ে গিয়েছিল, অথবা তারা নিজেদের কিতাবসমূহ মাটিতে দাফন করেছিল, অতঃপর মুখস্থ হাদিস বলে অনেক ভুল করেছেন। কখনো মুরসালকে মারফূ‘ ও মাওকুফকে মুসনাদ বর্ণনা করেছেন। কখনো সনদ পাল্টেছেন, কখনো এক হাদিসের সাথে অপর হাদিস একত্র করেছেন।
২. এক শ্রেণির মুহাদ্দিস ইলমে হাদিসের জন্য কষ্ট স্বীকার করেনি, ফলে তারাও ভুল করেছে, কখনো কঠিন ভুল করেছে।
৩. কতক সেকাহ মুহাদ্দিস শেষ বয়সে স্মৃতি শক্তি হ্রাসের কারণে হাদিসে ভুল করেছেন।
৪. এক শ্রেণির মুহাদ্দিস ছিল গাফেল ও সরলমনা। তারা কয়েক প্রকার: কেউ হাদিস শুনেই গ্রহণ করতেন, যদি বলা হত বলুন, তারা বলতেন। তাদের কতক সন্তান অথবা মুন্সি তাদেরকে হাদিস রচনা করে দিত, তারা নিজেদের অজান্তে তা বর্ণনা করতেন। কেউ শায়খের অনুমতি ব্যতীত তার হাদিস বর্ণনা করত, তার ধারণায় এরূপ করা বৈধ ছিল। জনৈক গাফিলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: এটা কি তোমার শ্রবণকৃত খাতা? সে বলল: না, তবে যার শ্রবণকৃত সে মারা গেছে, আমি তার পরিবর্তে বর্ণনা করছি।
৫. এক শ্রেণির লোক ইচ্ছাকৃতভাবে হাদিস রচনা করেছে। তারা তিন প্রকার:
ক. কতক লোক প্রথম ভুল বর্ণনা করেছে, কিন্তু সঠিক হাদিস জানার পর মিথ্যার অপবাদ থেকে বাঁচার জন্য ভুল ত্যাগ করেনি।
খ. কতক লোক মিথ্যাবাদী ও দুর্বল রাবিদের নাম তাদলিস করে তাদের হাদিস বর্ণনা করেছে।
গ. কতক লোক জেনে-বুঝে মিথ্যা বলেছে, তারা ভুলে বলেনি, অপরের মিথ্যা হাদিসও বর্ণনা করেনি, বরং নিজেরা রচনা করেছে। তারা কখনো সনদে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে, কখনো অপরের হাদিস চুরি করেছে, কখনো নিজেরা জাল হাদিস রচনা করেছে।
হাদিস রচনার কারণ:
দীনের প্রতি বিদ্বেষ ও দ্বীনকে বিকৃত করার হীন উদ্দেশ্যে কেউ হাদিস রচনা করেছে। কেউ জাতি, ভাষা ও জাতীয়তাবাদের পক্ষে হাদিস রচনা করেছে। কেউ মতবাদ কিংবা মাযহাবের সমর্থনে হাদিস রচনা করেছে। কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য হাদিস রচনা করেছে। কেউ প্রসিদ্ধি পাওয়ার ইচ্ছায় হাদিস রচনা করেছে। কেউ সম্পদ অর্জন ও শাসকের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে হাদিস রচনা করেছে। কেউ সুন্দর বাণীর জন্য সনদ তৈরি করে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করেছে।
ইব্ন হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “কতক লোক অল্প জ্ঞান ও শয়তানের প্ররোচনার কারণে কল্যাণের প্রতি আহ্বান ও পাপ থেকে বিরত রাখার নিমিত্তে মনগড়া ফযিলত ও শাস্তির হাদিস রচনা করে সেকাহ রাবিদের সনদে প্রচার করেছে। তিনি বলেন: আব্দুর রহমান ইব্ন মাহদি রাহিমাহুল্লাহ্ ‘মায়সারাহ ইব্ন আব্দে রাব্বিহি’কে জিজ্ঞাসা করেন: ‘অমুক সূরা পাঠ করলে অমুক ফযিলত রয়েছে’। এ জাতীয় হাদিস তুমি কোথায় পেয়েছ? সে বলল: আমি মানুষদেরকে কুরআনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য এসব রচনা করেছি”।
জাল হাদিস চেনার পদ্ধতি:
সনদ ও মতন উভয় থেকে জাল হাদিস চেনা যায়। সনদ থেকে জাল হাদিস চেনার একাধিক পদ্ধতি রয়েছে, যেমন খোদ হাদিস রচনাকারীর স্বীকারোক্তি; কোনো রাবির জন্ম ও তার শায়খের মৃত্যু ব্যবধান প্রমাণ করে তাদের সাক্ষাত অসম্ভব; সনদে মিথ্যাবাদী রাবির উপস্থিতি; অথবা কোনো মুহাদ্দিস বলল যে, এ হাদিস অমুক মিথ্যাবাদী রাবি অমুক শায়খ থেকে একলা বর্ণনা করেছে, বিশেষ করে শায়খ যদি প্রসিদ্ধ ও তার ছাত্র সংখ্যা অনেক হয়, তাহলে এ ধারণা প্রবল হয়, কারণ অনেকের মাঝে সে একা সন্দেহের পাত্র।
মতন থেকে কয়েকভাবে জাল হাদিস জানা যায়। মতনে অনেক আলামত থাকে, যে কারণে সহজে বলা যায় যে, হাদিসটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী নয়। ইব্ন দাকিকুল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘হাদিস বিশারদগণ অনেক সময় শব্দ ও অর্থ দেখে জাল ও মাওদু‘ হাদিস নির্ণয় করেন।
কখনো হাদিসের ভুল ও অবাস্তব অর্থ প্রমাণ করে হাদিসটি মাওদু‘। রাবি‘ ইব্ন খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন:
"إن للحديث ضوءا كضوء النهار، وظلمة كظلمة الليل تنكر"
“নিশ্চয় হাদিসের রয়েছে আলো, দিনের আলোর ন্যায়, আবার রয়েছে কিছু অন্ধকার, রাতের অন্ধকারের ন্যায়, যার মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়”।
ইব্ন জাওযি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “তুমি চিন্তা করেছ কি, যদি একদল সেকাহ রাবি একত্র হয়ে বলে: উট সূচের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করেছে, তাহলে আমাদের কি ফায়দা হল? কারণ তারা অসম্ভব সংবাদ দিয়েছে। অতএব বিবেক বিরোধী অথবা কোনো স্বীকৃত নীতি বিরোধী হওয়া মাওদু‘ হাদিসের আলামত। সেটা গ্রহণ করার জন্য কষ্ট স্বীকার করা নিষ্প্রয়োজন”।
কুরআন মাজিদ কিংবা মুতাওয়াতির হাদিস অথবা ইজমা বিরোধী হওয়া মাওদু‘ হাদিসের আলামত। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিপরীত, সামান্য আমলে অধিক সাওয়াব ও ছোট পাপে কঠিন শাস্তির হুশিয়ারি সম্বলিত হাদিস মাওদু‘।
মিথ্যা ও মাওদু‘ হাদিস বলার বিধান:
হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “নির্ভরযোগ্য সকল মুহাদ্দিসের মতে হাদিস রচনা করা হারাম। কাররামিয়া সম্প্রদায়ের কতক লোক ও একশ্রেণির সূফী আমলের প্রতি উৎসাহ দান ও পাপ থেকে সতর্ক করার জন্য হাদিস রচনা করা বৈধ বলেছে। এটা তাদের মূর্খতা, কারণ আমলের প্রতি উৎসাহ প্রদান ও পাপ থেকে সতর্ক করা শরয়ীতের বিধান, শরীয়তের বিধান তৈরি করা সবার নিকট কবিরা গুনাহ্। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
" مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ "
“যে আমার উপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”। মাওদু‘ হাদিস বর্ণনা করা হারাম। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ حَدَّثَ عَنِّى، بِحَدِيثٍ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ»
“যে আমার পক্ষ থেকে কোন হাদিস বর্ণনা করল, যা সে মিথ্যা মনে করছে, সেও একজন মিথ্যুক”।
হাদিস রচনাকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য নয়:
হাদিস রচনাকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য নয় কয়েকটি কারণে, যেমন:
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কেউ যেন মিথ্যা বলার সাহস না হয়, তবে তার তাওবা আল্লাহ ও তার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে।
২. মিথ্যা তওবা প্রকাশ করে কেউ যেন জাল হাদিস প্রচলন করার সুযোগ না পায়।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা বলা অন্য কারো উপর মিথ্যা বলা সমান নয়, কারণ তার উপর মিথ্যা বলার অর্থ মানুষের জন্য দীন তৈরি করা, যার স্বপক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি।
৪. জাল হাদিস রচনাকারী তওবার ক্ষেত্রেও মিথ্যা বলতে পারে, বিশেষ করে এতে যদি তার স্বার্থ থাকে। কেউ বলেছেন: তার তওবা শুদ্ধ হবে না, যদিও সে তওবা করে, কারণ তার জাল হাদিস মানুষের মাঝে ছড়িয়ে গেছে।
ইমাম নববি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘বিশুদ্ধ মতে তার তওবা গ্রহণযোগ্য ও তার হাদিস বর্ণনা করা দূরস্ত আছে, যেমন কাফের ব্যক্তির ইসলামের পর সাক্ষ্য গ্রহণ করা দুরস্ত আছে’।
জাল হাদিসের উপর লিখিত কয়েকটি গ্রন্থ:
মাওদু হাদিসের সংখ্যা অনেক। অনেক আলেম এ বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেমন: ১. ‘আল-লাআলিল মাসনু‘আহ ফিল আহাদিসিল মাওদু‘আহ’। ২. ‘আল-ফাওয়েদুল মাজমু‘আহ ফিল আহাদিসিল মাওদু‘আহ’ লিশ শাওকানি। ৩. ‘আল-মাওদু‘আত’ লি ইব্নিল জাওযি।
মানযুমাতুল বাইকুনিয়াহ
سَمَّيْتُهَا مَنْظُوْمَةَ الْبَيْقُوني
وَقَدْ أَتَتْ كَالْجَوْهَرِ الْمَكْنُونِ
أَبْيَاتُهَا ثُمَّ بِخَيْرٍ خُتِمَتْ
فَوْقَ الثَّلاثِينَ بِأَرْبَعٍ أَتَتْ
“আর এ কবিতা সুরক্ষিত মুতির মত লিপিবদ্ধ হয়েছে, আমি যার নাম রেখেছি ‘মানযুমাতুল বাইকুনি’। চৌত্রিশটি পঙক্তিতে তার প্রকারগুলো বিধৃত হয়েছে, অতঃপর কল্যাণের সাথে তার সমাপ্তি হল”।
লেখক রাহিমাহুল্লাহ কবিতার শুরুতে সহি হাদিসের বর্ণনা দিয়েছেন, যা হাদিসের মধ্যে সর্বোত্তম প্রকার। তিনি বলেছেন:
إسْنادُه ولمْ يَشُذَّ أو يُعَلْ
أَوَّلُها الصَّحِيحُ وَهْوَ ما اتَّصَلْ
আর সর্বশেষ বর্ণনা করেছেন মাওদু‘ হাদিস, যা হাদিসের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকার, যেমন তিনি বলেছেন:
عَلى النَّبيْ فَذَلِكَ الْمَوْضُوعُ
وَالْكَذِبُ الْمُخْتَلَقُ الْمَصْنُوعُ
এভাবে তিনি সুন্দর সমাপ্তি করেছেন।
جوْهَرِ অর্থ মাণিক্য ও জহরত مكْنُونِ অর্থ আচ্ছাদিত ও সুরক্ষিত। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ ইলমে হাদিস তথা হাদিসের পরিভাষার উপর লিখিত তার গ্রন্থকে আচ্ছাদিত মাণিক্যের সাথে তুলনা করেছেন, কারণ এতে সর্বোত্তম ইলমের অনেক প্রকার অত্যন্ত সংক্ষেপে বিধৃত হয়েছে। কবিতার প্রত্যেক পঙক্তির অন্ত্যমিল, মাত্রাজ্ঞান ও শব্দ চয়ন খুব সুন্দর হয়েছে, তাই তিনি এ গ্রন্থকে আচ্ছাদিত মাণিক্যের সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাকে মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।
তিনি বলেন: আমি তার নাম রেখেছি ‘মানযূমাতুল বাইকুনি’। নাম বস্তুর নিদর্শন, নামের কল্যাণে একবস্তু অপরবস্তু থেকে পৃথক হয়, এ জন্য তিনি নাম রেখেছেন। نظم শব্দের আভিধানিক অর্থ জমা করা, যেমন অনেকগুলো মুতি ক্রম বিন্যাস করে এক সুতোয় গাথার পর বলা হয়: نظمت الدر ‘আমি মুতিগুলো সুন্দরভাবে গেঁথেছি’।
পরিভাষায় কাব্য শিল্পের বিশেষ নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মিত কবিতাকে مَنْظُومَةَ বলা হয়। البَيْقُوني শব্দ দ্বারা লেখক নিজেকে বুঝিয়েছেন। ‘মানযুমাহ বাইকুনিয়া’র ব্যাখ্যাকার শায়খ হামাবি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: ‘বাইকুন লেখকের শহরের নাম, বা গ্রামের নাম, বা তার পিতার নাম, বা তার দাদার নাম কিছুই জানি না’। শায়খ বদরুদ্দিন হাসানি রাহিমাহুল্লাহ্ (মৃ.১৩৫৪হি.) ‘মানযুমাহ বাইকুনিয়া’র উপর লিখিত «الدرر البهية» গ্রন্থে বলেন: “যারা বাইকুনি সম্পর্কে লিখেছেন, তাদের অধিকাংশ ‘বাইকুনি’ উপাধির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তাদের কারো লেখায় আমি দেখেছি যে, ‘বাইকুন’ আজার বাইজান অঞ্চলের একটি গ্রাম, যা কুর্দিদের সন্নিকটে অবস্থিত”।
আমরা ভূমিকায় বলেছি তার নাম ওমর ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন ফুত্তুহ আদ-দিমাস্কি, আশ-শাফে‘ঈ। মৃত: (১০৮০হি.), মোতাবেক (১৬৬৯খৃ.), তবে তার জন্ম তারিখ ও মৃত্যুর দিন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আমাদের ধারণা লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ নিখাদ ইখলাস থেকে বিস্তারিত পরিচয় দেননি। তাই তার গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব তার মানযূমার ব্যাখ্যা ও টিকা লিখেছেন, যেমন হামাবি, দিমইয়াতি ও যারকানি রাহিমাহুল্লাহ্ প্রমুখগণ। তার মানযুমাহ ইরাকি রাহিমাহুল্লাহ্ রচিত الألفية এর নির্যাস।
أبيات বহুবচন, একবচন بيت অর্থ নির্দিষ্ট নিয়মে নির্মিত কবিতা। লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ فوق الثلاثين বলে পঙক্তির সংখ্যা ৩৪-টি বলে দিয়েছেন, যেন তার কোনো পঙক্তি বিলুপ্ত না হয়, কিংবা কেউ এতে বৃদ্ধি করতে না পারে। কবিতার বিশুদ্ধ পাণ্ডুলিপিতে أبيات শব্দ রয়েছে, যার ভিত্তিতে শায়খ দিমইয়াতি ও শায়খ হামাবি প্রমুখ মানযুমার ব্যাখ্যা লিখেছেন।
কতক পাণ্ডুলিপিতে أبياتهاশব্দের পরিবর্তে أقسامها রয়েছে, যার অর্থ ‘মানযুমায় বর্ণিত প্রকার সংখ্যা চৌত্রিশটি’। এ অর্থও সঠিক, কারণ লেখক ‘মুদাল্লাস’ ও ‘মাকলুব’-কে দুই দুই ভাগে ভাগ করেছেন, যা অবশিষ্ট ত্রিশ প্রকারসহ চৌত্রিশ প্রকার হয়, যদিও সাধারণ অর্থ থেকে বহুদূর।
ثم بخير ختمت অর্থাৎ মানযুমাহ লেখার উদ্দেশ্য কল্যাণের সাথে সমাপ্ত হল। এ বাক্যে তিনি ختمت শব্দ ব্যবহার করে অলঙ্কার শাস্ত্রের সুন্দর প্রয়োগ করেছেন, যার থেকে কবিতার সমাপ্তি বুঝে আসে। হে আল্লাহ তুমি আমাদের সমাপ্তি সুন্দর করুন।
ওমর ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন ফাত্তুহ আল-বাইকুনি রাহিমাহুল্লাহ্ রচিত مَنْظُومَةَ البَيْقُوني হাদিস শাস্ত্রের প্রাথমিক কিতাব। হিম্মত কম হলে এ কিতাব মুখস্থ করে অন্যান্য কিতাব বুঝে পড়া যথেষ্ট। আরেকটু হিম্মত হলে আল্লামা সানআনি রচিত قصب السكر মুখস্থ করা শ্রেয়, যাতে তিনি হাফেয ইব্ন হাজার রচিত نخبة الفكر গ্রন্থের পুরো বিষয়কে কবিতার আকৃতিতে পেশ করেছেন। তাতে বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি অনুসারে সর্বমোট দুইশত দুই, পাঁচ বা ছয়টি কবিতা রয়েছে। হিম্মত আরো উন্নত হলে হাফেয ইরাকি রচিত الألفية মুখস্থ করা সবচেয়ে উত্তম। ইরাকি এক হাজার কবিতায় ইব্নুস সালাহ রচিত مقدمة ابن الصلاح এর পুরো বিষয়কে সাবলীল ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মূল বা মতন হিসেবে একটি কিতাব মুখস্থ করে অন্যান্য কিতাব বুঝে পড়া যথেষ্ট। যারা ইলমে হাদিসের বুনিয়াদি ও মৌলিক বিষয়গুলো জানতে চান, তারা বাইকুনিয়ার মানযুমাহ মুখস্থ করে পদ্যে লিখিত অন্যান্য ব্যাখ্যা ও মৌলিক গ্রন্থগুলো পড়ুন এবং বাস্তব অনুশীলন করুন। অতঃপর অন্যান্য বিষয়ের উপর লিখিত বুনিয়াদি কিতাবগুলো পড়ুন।
এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে প্রাথমিকভাবে সংক্ষিপ্ত মতনগুলো পড়ে নিন, কারণ তা বুঝা সহজ ও দ্রুত শেষ হয়, যেমন: المنظومة اليقونية، الموقظة، الكافية ونخبة الفكر গ্রন্থগুলো। অতঃপর দ্বিতীয় পর্যায়ে পড়ুন হাফেয ইব্ন কাসির রাহিমাহুল্লাহ্ রচিত اختصار علوم الحديث অতঃপর তৃতীয় পর্যায়ে পড়ুন হাফেয ইরাকি রাহিমাহুল্লাহ্ রচিত الألفية এবং তার উপর লিখিত ব্যাখ্যা ও সহায়ক গ্রন্থসমূহ। অতঃপর পড়ুন مقدمة ابن الصلاح ও তার উপর লিখিত النكت সমূহ, হোক হাফেয ইরাকি রচিত, কিংবা ইব্ন হাজার রচিত কিংবা অন্য কারো রচিত।
এখানে আমরা মানযুমাহ বাইকুনিয়ার ব্যাখ্যা শেষ করছি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে ইলমে নাফে ও নেক আমল দান করুন। দরূদ ও সালাম নাযিল হোক সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, তার বংশধর ও সকল সাহাবির উপর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরণ করবে, তাদের সবার উপর। 
©somewhere in net ltd.