| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কমিউনিজমের পতনের পর আমেরিকার তখনকার (১৯৮৮-১৯৯৩) প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়র ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। সে ব্যবস্থায় কমিউনিজমের পতনের পর ইসলামকে পাশ্চাত্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে তা প্রতিরোধের পরিকল্পনা ছিল মূল বিষয়। কিভাবে ইসলামকে প্রতিরোধ করা যায় এ বিষয়ে তারা যে পরিকল্পনায় উপনীত হল তা হচ্ছে : বিশ্বের মুসলিম জনগন তিনভাবে বিভক্ত। এক. যারা নামে মাত্র মুসলিম। মুসলমান হওয়ার জন্য তারা গর্ববোধ করে না। ইসলামী অনুশাসনের কোন ধার ধারে না। বরং ইসলামকে একটা অপ্রয়োজনীয় বোঝা মনে করে।
দুই. যারা মুসলিম হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। ইসলামের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে কিন্তু জীবনের সর্বেক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসন মানতে বা বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত নয়।
তিন. যারা ইসলামকে সকলের উপরে স্থান দেয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে নিজে মানা ও অন্যকে মানাতে চায়। সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েম করতে চায়।
তারা সিদ্ধান্তে আসে যে, তৃতীয় প্রকারের মুসলমানেরা আমাদের জন্য সমস্যা, তাদের কারণেই আমাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সাম্রাজ্যবাদী নীতির জন্য তারা ব্যতীত আর কাউকে হুমকি হিসাবে আমরা দেখি না।
প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকার মুসলমানেরা আমাদের জন্য তেমন হুমকি নয়। এই তৃতীয় প্রকার মুসলমানদের কিভাবে দমন করা যায় এ নিয় গবেষণা শুরু হল। আমেরিকার বিখ্যাত ও প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা র্যান্ড কর্পোরেশনকে দায়িত্ব দেয়া হল। তারা রিপোর্ট দিল প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকারের মুসলমানদেরকে তৃতীয় প্রকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হবে। কাটা দিয়ে কাটা তোলা যাকে বলা যায়। ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছর তারা এ প্রচেষ্টা চালিয়ে দেখল যে, এতে কাংখিত ও দ্রুত ফলাফর লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং এরা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুসংগঠিত হচ্ছে, প্রভাব বিস্তার করছে। দিনে দিনে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামি সালভেশন ফ্রন্টের উত্থান, তুরস্কে ইসলামপন্থীদের বিজয়, ফিলিস্তিনে হামাসের ইন্তফাদা ইত্যাদি ইঙ্গিত বহন করে যে, এ পরিকল্পনা সফল নাও হতে পারে।
এরপর ২০০১ সালে তাদের হাতে এসে যায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা। এর প্রতিক্রিয়ায় শুরু করে দেয় আল কায়েদা ও তালেবান বা সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ। বিশ্বের সর্বত্র এ অজুহাত তুলে ইসলাম অনুসারীদের দমন করা শুরু হল। সাথে পাওয়া গেল সংশ্লিষ্ট দেশের মুসলিম সরকার, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবি গোছের মানুষদের। যারা আমেরিকার হিসাবে প্রথম প্রকারের মুসলিম। আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালান হল। মিথ্যা অভিযোগে আক্রমণ করা হল ইরাক। রেহাই পেলনা সোমালিয়া। তালিকায় রাখা হল, সুদান, সিরিয়া, ইরানসহ কয়েকটি মুসলিম দেশকে। নিষিদ্ধ করা হল ও সন্ত্রাসী তালিকায় স্থান দেয়া হল বহু সেচ্ছাসেবী ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে। যুদ্ধ করে অভিজ্ঞাতা হল, ইসলাম অনুসারীদের যুদ্ধ করে কখনো পরাস্ত করা যায় না। ইতিহাসে এর নজীরও নেই। এ ঐতিহাসিক সত্যটাই এখন তিক্ত বাস্তবতা। যুদ্ধে পারজয়ের এ বাস্তবতা সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও তার দোসরদের যথেষ্ট দু:চিশ্চন্তায় ফেলে দিয়েছে। ইসলাম-কে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দিয়ে কলুষিত করে তার যাত্রা থামানো যাচ্ছে না। তারা রীতিমত হতবাক, হতাশ ও নিরাশ। কিন্তু বসে থাকলে তো চলবে না। একবিংশ শতাব্দীর শেষে নাকি পুরো পাশ্চাত্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলে পরিণত হবে। এমন আভাসই দিয়েছে তাদের বাঘা বাঘা গবেষকরা। তারা এখন ভাবছে যেভাবে ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মকে বিকৃত করে যেভাবে অকার্যকর করা হয়েছে, ইসলামকে তেমন করা যায় কিনা। ইহুদী ও খৃষ্টানেরা তাদের ধর্মকে বিকৃত করে বস্তুবাদী ও ভোগবাদী ধ্যান ধারনার সাথে ধর্মটাকে মানানসই করে নিয়েছে। ফলে নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে নিজেরা সংশয় ও সন্দেহে পতিত হয়েছে। মুসলিমরাও তাদের মত হয়ে যাক। এটাই তাদের খায়েশ। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
“তারা কামনা করে, যদি তোমরা কুফরী করতে যেভাবে তারা কুফরী করেছে। অতঃপর তোমরা সমান হয়ে যেতে।” (সূরা আন নিসা, আয়াত ৮৯)
তারা ইসলামকে খৃষ্টান ধর্মের মত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করার জন্য বিরামহীন প্রচেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। কখনো উদারপন্থী ইসলাম, কখনো সহনশীল ইসলাম, কখনো মধ্যপন্থী ইসলাম আবার কখনো সুফীবাদী ইসলাম ইত্যাদি নামে বিভিন্ন তরীকায় ইসলামকে খন্ডিত ও বিকৃত করে তার মূল জীবনী শক্তিকে অকাযকর করতে চাচ্ছে তারা। উদ্দেশ্য একটাই, আমরা এমন ইসলাম চাই যা কখনো সাম্রাজ্যবাদ, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যবাদের জন্য হুমকি হবে না। আমরা এমন ইসলাম চাই, যার অনুসারীরা আমাদের কোন প্রশ্ন ছাড়াই প্রভূ ও কর্তা হিসাবে মেনে নেবে। কোন অবস্থায়ই আমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস হবে না তাদের। আমরা এমন ইসলাম চাই, যার অনুসারীরা ইসলামকে যেমন শ্রদ্ধা করে তেমনি অন্যসব ধর্মকেও শ্রদ্ধা করবে।
এ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে গত ৫ মার্চ থেকে ৭ মার্চ ২০০৭ পর্যন্ত আমেরিকার ফ্লোরিডায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের উদ্যোক্তা ছিল আমেরিকার র্যান্ড কর্পোরেশন নামের একটি প্রভাবশালী সংস্থা। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, ইসলামের সংস্কার।
এ সম্মেলেনে অনেক মুসলিম ধর্মীয় পন্ডিতসহ অন্যান্য ধর্মের পন্ডিতরাও অংশ গ্রহণ করেন। উক্ত সম্মেলনে ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভংগিতে আল কুরআনের তাফসীর রচনার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। আরো যে সকল বিষয় উক্ত সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে স্থান পেয়েছে তা হল:
এক. মুসলিম দেশের সরকারগুলোকে আহবান জানানো হবে তারা যেন সমাজে ইসলামী শরিয়াহ বাস্তবায়নের দাবীদারদের দমন করার ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করে। তাদের যেন কোন প্রকার ছাড় না দেয়া হয়। এবং ইসলামী শরিয়াহ বাস্তবায়নের বিষয়টি মুসলিম দেশের সরকারগুলো যেন কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
দুই. ইসলামি শরিয়াহর যে সকল বিষয় সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সেগুলো যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে বাতিল করে দেয়া হয়।
তিন. শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে সে শিক্ষা ব্যবস্থায় এক জনমুসলিম ও একজন অমুসলিমের মধ্যে কোন পার্থক্য সৃষ্টি না করে। এবং রাজনীতির সাথে ধর্মকে একত্র করার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয় এমন ধরনের শিক্ষানীতি চালু করতে হবে।
চার. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র অবাধ যৌন স্বাধীনতা দিতে হবে।
পাঁচ. বিভিন্নধর্মী গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি উম্মুক্ত করে দিতে হবে। এবং এ ধরনের কাজে উৎসাহ দিতে হবে যাতে মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটে। যাতে ইসলামী দৃষ্টিভংগি ও শরিয়াহর সমালোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এ সম্মেলনের মূলকথা হল, ইসলামী প্রতিটি বিষয় ব্যাখা করতে হবে ধর্ম নিরপে দৃষ্টিভংগিতে। বিশেষ করে কুরআনের তাফসীর ও রাসূলের হাদীসসমূহকে ব্যাখ্যা করতে হবে ধর্মনিরপে দৃষ্টিতে। উক্ত সম্মেলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ বক্তা মুহাম্মাদ আরকুন বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য মধ্যপন্থী ইসলাম। আর মধ্যপন্থী ইসলাম বলতে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ ইসলামকেই বুঝি।
দুর্ভাগ্যজনক সত্য হল, মুসলিম দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবি মহল, শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এমনকি অনেক বড় বড় ইসলামিক স্কলার আলেম উলামা ইতিমধ্যে তাদের ফাদে ফা দিয়েছেন।
সংক্ষেপে তারা বলতে চান, নাইন ইলেভেনের পরবর্তি সময়ে ইসলাম সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভংগিতে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে।
এভাবে মুসলিম দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও মিডিয়াগুলো ইহুদীবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। অনেক ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও দল ইদানীং এ উপলদ্ধি লাভ করেছেন যে, এ সময়ে জিহাদের কথা বলা যাবে না। মুসলিম স্বাধীনতাকামীদের সমর্থনে কিছু লেখা যাবে না। এগুলো বলে পথটা কন্টকাকীর্ণ না করে ইসলামের কথা বলে যেতে হবে। ভাবখানা এমন যে, তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, অথচ তোমরা চাও কোন কাঁটার আঘাত ছাড়াই তা তোমাদের সব হয়ে যাক, আর আল্লাহ চান সত্যকে তার বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফেরদের নির্মূল করবেন। (সূরা আল আনফাল, আয়াত ৭)
এ যদি হয় আমাদের অবস্থা তা হলে ইসলামের সত্যিকার অবিকৃত রূপ ও আদর্শ ধরে রাখবে কারা?
©somewhere in net ltd.