নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

মৃত্যুর গন্ধ

১৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০

শরীয়তপুর পিবিআই জোনাল অফিসের তৃতীয় তলার কক্ষে বসে ফাইল ঘাঁটছিলেন ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান। সকাল থেকেই আকাশ ভারী। জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা নেমে আসছে ধীর ছন্দে। টেবিলের পাশে ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফির কাপ। আরিয়ান অভ্যাসবশত কলমটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাচ্ছিলেন।

ঠিক তখন দরজায় নক পড়ল।

“ভিতরে আসুন।”

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন শরীয়তপুর সদর থানার এসআই মাহির। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চোখেমুখে টানা জেগে থাকার ক্লান্তি।

“স্যার, একটা কেসে আপনার সাহায্য দরকার।”

আরিয়ান চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। “বসুন। কী ধরনের কেস?”

মাহির টেবিলের ওপর কয়েকটি ছবি, ফরেনসিক রিপোর্ট আর একটা নীল ফাইল রাখলেন।

“চারদিন আগে চন্দ্রপুর এলাকায় রফিক মোল্লা নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হন। গতকাল রাতে স্থানীয় লোকজন দুর্গন্ধ পেয়ে ৯৯৯-এ কল দেয়। পরে একটা ভাড়া বাসা থেকে মানুষের দেহের অংশ উদ্ধার করা হয়।”

ঘরের ভেতর হালকা নীরবতা নেমে এল।

স্ত্রী নাসরিনকে আটক করেছি,” মাহির বললেন। “উনি বলছেন আত্মরক্ষার্থে হত্যা করেছেন। কিন্তু পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার লাগছে না।

আরিয়ান ছবিগুলো হাতে তুলে নিলেন। একটিতে ড্রামের ভেতর পলিথিনে মোড়ানো কিছু দেখা যাচ্ছে। আরেকটিতে রক্তমাখা রান্নাঘর।

“মরদেহের বাকি অংশ?”

“কিছু পদ্মা নদীতে ফেলা হয়েছে। কিছু রাস্তার পাশের ডোবায়। মাথা আর কয়েকটা হাড় উদ্ধার হয়েছে।”

“খুনের অস্ত্র?”

“একটা লোহার রড আর রান্নাঘরের মাংস কাটার ছুরি।”

আরিয়ান ধীরে কফিতে চুমুক দিলেন।

“স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল?”

“দুজনেরই আগের সংসার ছিল। কয়েক বছর আগে পরিচয়, তারপর আগের পরিবার ছেড়ে একসাথে থাকতে শুরু করেন। লোকটা বিদেশ ফেরত। কিছুদিন ধরে সংসারে ঝামেলা চলছিল।”

আরিয়ান এবার চেয়ার ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“মাহির, মানুষ যখন পরিকল্পিত খুন করে, তখন সে লাশ গোপন করতে চায়। কিন্তু এই কেসে খুনি মরদেহ টুকরো করেছে খুব অগোছালোভাবে। এর মানে কী জানো?”

মাহির দ্বিধায় বললেন, “রাগের মাথায় করেছে?”

শুধু রাগ নয়,” আরিয়ান শান্ত স্বরে বললেন। “ভয়ও ছিল। প্রচণ্ড ভয়।

তিনি আবার টেবিলে ফিরে এলেন।

রফিকের শরীরে প্রথম আঘাত কোথায় ছিল?

মাথায়। রড দিয়ে।

আর দ্বিতীয়?

গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত।

আরিয়ান মৃদু হাসলেন।

তাহলে ঘটনাটা রান্নাঘরের হঠাৎ ঝগড়ার ফল নয়। প্রথম আঘাত ছিল মানুষটাকে অচেতন করার জন্য। দ্বিতীয় আঘাত নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য।

মাহির চুপ করে শুনছিলেন।

“মৃত্যুর সময়?

রাত ১১টা থেকে ১টার মধ্যে।

প্রতিবেশীরা কোনো চিৎকার শুনেছে?

না স্যার।

আরিয়ানের চোখে তীক্ষ্ণ ঝিলিক দেখা দিল।

এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু। মাথায় রডের আঘাত পাওয়ার পরও কেউ চিৎকার করেনি। তার মানে রফিক হয় ঘুমিয়ে ছিল, নয়তো আগে থেকেই অচেতন অবস্থায় ছিল।

মাহির হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন।

স্যার! রান্নাঘর থেকে ঘুমের ওষুধের খালি স্ট্রিপ পেয়েছি!

ভালো।” আরিয়ান ধীরে মাথা নাড়লেন। “খুনি আগে খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছে।”

তিনি ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড।

এখন বলো, পাশের বাসার ফ্রিজের ব্যাপারটা কী?

মাহির ফাইল উল্টালেন।

হ্যাঁ স্যার। প্রতিবেশীরা বলেছে, নাসরিন একটা বড় পলিথিন ওদের ফ্রিজে রাখতে চেয়েছিল। বলেছিল মাছ। কিন্তু দুর্গন্ধ বের হওয়ায় সন্দেহ হয়।”

আরিয়ান নিচু স্বরে বললেন, “কারণ নিজের ফ্রিজে জায়গা ছিল না।”

ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

মাহির, খুনের পর মানুষ সাধারণত ভেঙে পড়ে। কিন্তু এখানে খুনি ধাপে ধাপে evidence disposal করেছে। মরদেহ কেটেছে, সরিয়েছে, লুকিয়েছে। এর মানে খুনের পরও তার মাথা ঠান্ডা ছিল।

তাহলে মোটিভ?” মাহির জিজ্ঞেস করলেন।

বিদেশ ফেরত স্বামী। কিছু টাকা। সম্পর্কের ভেতরে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস। সম্ভবত লোকটা আবার বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

জি স্যার,” মাহির বললেন। “প্রতিবেশীরাও তাই বলেছে।

আরিয়ান কফির কাপটা নামিয়ে রাখলেন।

নাসরিন ভয় পেয়েছিল। মানুষ যখন কাউকে হারানোর ভয় পায়, তখন সে অনেক সময় ভালোবাসা আর মালিকানার পার্থক্য ভুলে যায়।”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর মাহির ধীরে বললেন, “কিন্তু স্যার… একজন নারী একা এত বড় কাজ করল কীভাবে?

আরিয়ানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।

ভুল প্রশ্ন।

মানে?

প্রশ্ন হওয়া উচিত—সে কি সত্যিই একা ছিল?

মাহির থমকে গেলেন।

আরিয়ান একটা ছবি সামনে টেনে আনলেন। সেখানে ভারী ড্রামটা সিঁড়ি দিয়ে টেনে নামানোর দাগ।

এই ড্রামটার ওজন আশি কেজির কম না। একজন মানুষের পক্ষে একা এটা নামানো কঠিন। আর ডোবায় যেসব অংশ ফেলা হয়েছে, সেগুলোও একবারে ফেলা হয়নি।

মানে একজন সহযোগী আছে?

অবশ্যই আছে।

ঠিক তখনই মাহিরের ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন রিসিভ করলেন।

“জি… আচ্ছা… ঠিক আছে।”

ফোন কেটে মাহির বিস্মিত চোখে তাকালেন।

স্যার, নাসরিনের কল লিস্টে একটা নাম্বার পাওয়া গেছে। ঘটনার রাতে বহুবার কথা হয়েছে। লোকটা নাকি ওর দূর সম্পর্কের ভাই।

আরিয়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।

ভাই নয় মাহির,” তিনি শান্ত গলায় বললেন, “সহযোগী। ওকে এক্ষুনি আটক করো। ওর জামাকাপড় আর নখ পরীক্ষা করলেই প্রমাণ পেয়ে যাবে।

মাহির স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

আরিয়ান এবার ধীরে ধীরে পুরো ঘটনাটা সাজিয়ে বললেন—

নাসরিন আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রফিককে সরাবে।

রাতে খাবারে মেশানো হলো ঘুমের ওষুধ।

রফিক অচেতন হতেই মাথায় প্রথম আঘাত। তারপর নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য গলার ছুরি।

কিন্তু খুনের চেয়েও কঠিন ছিল প্রমাণ লোপাট করা।

একা সম্ভব ছিল না, তাই ডাকা হলো সেই সহযোগীকে।

দুজনে মিলে টুকরো করল শরীরটা। কিছু নদীতে, কিছু ডোবায়। আর শেষ অংশটা লুকাতে গিয়ে তারা সবচেয়ে বড় ভুলটা করল—ফ্রিজ।

মানুষ শরীর কাটতে পারে, মাহির। কিন্তু নিজের ভেতরের ভয়কে কাটতে পারে না। সেই ভয়ই শেষ পর্যন্ত ওদের ধরিয়ে দিল।


ঘরে নেমে এল ভারী নীরবতা।

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।

মাহির ধীরে ধীরে বললেন, “স্যার… আপনি যেন পুরো ঘটনাটা চোখের সামনে দেখলেন।

আরিয়ান মৃদু হাসলেন।

অপরাধ সমাধান করতে হলে মানুষের মাথার ভেতর ঢুকতে হয়। রক্ত আর অস্ত্র পরে আসে।

তিনি কফির শেষ চুমুক দিলেন।

জানালার ওপাশে ধূসর আকাশের নিচে শহরটা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। অথচ কোথাও একটা পরিবার চিরতরে ভেঙে গেছে।

আরিয়ান ফাইলটা বন্ধ করলেন।

মানুষ ভাবে খুন মানে শুধু মৃত্যু,” তিনি ধীর স্বরে বললেন, “আসলে খুন শুরু হয় বিশ্বাস মরার পর।

মন্তব্য ৫ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৫) মন্তব্য লিখুন

১| ১৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: “মানুষ ভাবে খুন মানে শুধু মৃত্যু,”
..........................................................
দেহের মৃত্যুর আগে,
বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটলে তা
অত্যন্ত দু:খজনক !

১৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ

২| ১৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:২২

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: খুনের পিছনে মোটিভ কি পরকিয়া নাকি টাকা পয়সা ?

১৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৮

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: "বিদেশ ফেরত স্বামী। কিছু টাকা। সম্পর্কের ভেতরে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস। সম্ভবত লোকটা আবার বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নাসরিন ভয় পেয়েছিল। মানুষ যখন কাউকে হারানোর ভয় পায়, তখন সে অনেক সময় ভালোবাসা আর মালিকানার পার্থক্য ভুলে যায়।" খুনের মোটিভ মূলত ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাস।

৩| ১৬ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৪

রাজীব নুর বলেছেন: পড়লাম।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.