নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছায়ার খেলা

২১ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

মিরপুর–১১ নম্বরের সেই চারতলা বাড়ির তিনতলার সিঁড়িতে ক্রাইম সিনের হলুদ টেপটা ঝুলছিল। বাইরে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে একটানা একটা কান্নার শব্দ আসছিল। রাইমার মায়ের গলা বসে গেছে, এখন শুধু একটা গোঙানির মতো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান যখন জিপ থেকে নামলেন, তাঁর চোখ দুটো লাল। গত দুই রাত তিনি এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেননি। ইনসোমনিয়ার পুরনো সমস্যাটা আবার ফিরে এসেছে। চোখ বন্ধ করলেই একটা চেনা অন্ধকার তাকে তাড়া করে। আরিয়ানের এই শান্ত ভাবটা কোনো বুদ্ধিদীপ্ত নির্লিপ্ততা নয়, স্রেফ তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি।

তাঁর পেছনে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিল পরিদর্শক তানভীর। তানভীরের মুখ থমথমে, চোয়াল শক্ত। নিজের সাত বছরের একটা মেয়ে আছে তার। রাইমার লাশের অবস্থা দেখার পর থেকে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।

স্যার, লোকাল পুলিশ পুরো কেসটা ঘেঁটে ফেলেছে,” তানভীর নিচু কিন্তু ক্ষিপ্ত গলায় বলল। “ওরা লিখেছে সায়েদ রানা আজ সকালে জানালার গ্রিল কেটে পটিয়েছে। কিন্তু আমি চেক করেছি, গ্রিলের কাটার অংশে মরচে ধরা। এটা অন্তত এক সপ্তাহ আগে কাটা।

আরিয়ান তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দরজার পাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা একটা ছোট গোলাপি প্লাস্টিকের জুতো। এক পাটি।

আরিয়ান জুতোটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পকেট থেকে ড্রপ বের করে চোখে দিলেন। চোখ দুটো জ্বলে উঠছে।

ভেতরে ফরেনসিকের একজন অফিসার মেঝে থেকে রক্ত তোলার চেষ্টা করছিলেন। আরিয়ানকে দেখে বললেন, “স্যার, বাথরুম আর খাটের নিচের ব্লাড প্যাটার্ন দেখে মনে হচ্ছে মার্ডারটা আজ সকাল ৯টার দিকে হয়েছে।

আরিয়ান খাটের নিচের মেঝেতে বসে পড়লেন। আঙুল দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের একটা অংশ খুঁটে নিলেন। সায়েদের স্ত্রী রেহানা তখনো পাশের রুমে বসা।

না, তানভীর। ব্লাড প্যাটার্নটা স্টেজড,” আরিয়ান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন।

তানভীর তাকাল। “মানে?

রক্তটা ইচ্ছা করে মেঝেতে ছিটানো হয়েছে। খুনি আমাদের ভুল ক্লু খাওয়াচ্ছে। রেহানাকে ইন্টারোগেশন রুমে পাঠাও।

জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের টেবিলের ওপাশে বসে ছিলেন রেহানা আক্তার। ছাব্বিশ বছরের এই নারীর মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই। বরং তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা আলগা, আত্মবিশ্বাসী হাসি।

তানভীর টেবিলের ওপর ফাইলটা ছুড়ে মারল। “সায়েদ রানা ফতুল্লায় ধরা পড়েছে। সাড়ে চার লাখ টাকা আর গয়নাসহ। আর আপনি এখানে ঘুমের ওষুধের নাটক করছেন? দরজা খুলতে ১২ মিনিট দেরি করলেন কেন?

রেহানা শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়ালেন। আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্যার, আপনার এই অফিসার খুব চেঁচান। আমি তো বলেছি, আমি চড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম। সায়েদ টাকা চুরি করে পালিয়েছে, সেটার দায় আমার ওপর কেন আসবে? আমার স্বামী একটা সাইকো, আমি তো নিজেই ভিকটিম।

তানভীর আরও রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল, আরিয়ান হাত তুলে তাকে থামালেন। আরিয়ান রেহানার দিকে তাকালেন না। তিনি নিজের পকেট থেকে একটা ছোট রুপালী ক্লিপ বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বাথরুমের দরজার কোণ থেকে এটা পাওয়া গেছে।

রেহানা বেগম,” আরিয়ান চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো ক্লান্ত। “সায়েদ রানার একটা পুরোনো চুরির রেকর্ড আছে। কিন্তু ও সাইকোপ্যাথ না। অথচ পুরো ঘটনাটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন পুলিশ দেখামাত্রই সায়েদকে একজন বিকৃত রুচির খুনি ভেবে নেয়।

রেহানা চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখের মণি একবার আরিয়ানের দিকে গিয়েই চট করে চশমাটার ওপর আটকে গেল।

সায়েদ যখন জানালার গ্রিল দিয়ে নামছিল, তখন তার পিঠে একটা বড় ব্যাগ ছিল। তানভীর, সায়েদের ব্যাগে রাইমার কানের দুল বা গলার চেইন পাওয়া গেছে?

না স্যার। শুধু ক্যাশ টাকা আর রেহানা বেগমের গয়না,” তানভীর বলল।

আরিয়ান টেবিলের ক্লিপটা রেহানার দিকে একটু এগিয়ে দিলেন। “এই ক্লিপটা রাইমার চুলে ছিল। আমাদের কুইক ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে, এটার ওপর আপনার বাম হাতের আঙুলের ছাপ আছে।

রেহানা এবার একটু হাসলেন। “পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চার ক্লিপ আমি কুড়িয়ে পেতেই পারি, স্যার। এতে কিচ্ছু প্রমাণ হয় না। আপনারা কোর্টে টিকতে পারবেন না।

আরিয়ান কোনো পাল্টা যুক্তি দিলেন না। তিনি চুপ করে রইলেন। ঘরের ভেতর একটা ভারী নীরবতা। রেহানা আরিয়ানের এই চুপ করে থাকাটা নিতে পারছিলেন না, তাঁর হাতের আঙুলগুলো কাঁপতে শুরু করল।

ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। ফতুল্লা থেকে পাঠানো সায়েদের একটা অডিও রেকর্ড। আরিয়ান স্পিকার অন করলেন।

সায়েদের ভয়ার্ত গলা শোনা গেল—“স্যার, আমি টাকা চুরি করে পালাচ্ছিলাম। রেহানাই আমাকে বলেছিল গ্রিল দিয়ে নেমে যেতে। ও সকাল ৮টায় আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলে—পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটা বাথরুমে মরে পড়ে আছে, পুলিশ আসার আগে আমি যেন টাকা নিয়ে পালাই। আমি রাইমার গায়ে হাত দিইনি স্যার! রেহানা ওই মেয়ের মায়ের ওপর...

আরিয়ান ফোনটা বন্ধ করে দিলেন।

রেহানা এবার চুপ করে গেলেন। তাঁর মুখের আত্মবিশ্বাসী ভাবটা এক সেকেন্ডে উবে গেল।

সায়েদ একা পালাচ্ছিল না, আপনারা দুজনেই পালাচ্ছিলেন,” আরিয়ানের গলা এবার খুব নিচু। “পরিকল্পনা ছিল, ও টাকা নিয়ে ফতুল্লায় যাবে, আর আপনি এখানে পুলিশকে ঘুমের ওষুধের গল্প বলে পার পেয়ে দুদিন পর ওর সাথে যোগ দেবেন। রাইমার মায়ের আকস্মিক উপস্থিতি আপনাদের প্ল্যানটা নষ্ট করে দিল। আপনি সায়েদকে বাঁচানোর জন্য ১২ মিনিট সময় নেননি রেহানা, আপনি নিজের টাকার ভাগটা বাঁচাতে সময় নষ্ট করেছিলেন।

রেহানা আর কোনো ম্যানিপুলেশন করার চেষ্টা করলেন না। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর গলার স্বর বদলে গেল, কেমন যেন একটা শুকনো শোনাল।

ওই পারভীন... রাইমার মা, পাড়ার সবার সামনে আমাকে বাঁজা বলেছিল। ও খুব অহংকার করত ওর ছোট মেয়েটাকে নিয়ে। আমি জাস্ট ওর অহংকারটা খাটের নিচে টুকরো করে রেখে দিয়েছি। সায়েদ একটা কাপুরুষ, রক্ত দেখে কাঁপছিল। বাকি কাজটা আমি নিজের হাতে করেছি।

তানভীর তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। সে দ্রুত জবানবন্দিটা লিখতে শুরু করল।

আরিয়ান আর বসলেন না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।

রাত একটা।

পল্লবী থানার করিডোর ধরে আরিয়ান যখন হেঁটে বের হচ্ছেন, তানভীর পেছনে এসে দাঁড়াল।

স্যার, রেহানা আর সায়েদ দুটোরই অফিশিয়াল কনফেশন নেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্যার... একটা মানুষ কীভাবে এতটা ঠাণ্ডা মাথায় এই কাজ করতে পারে? আপনি এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আরিয়ান করিডোরের শেষ মাথায় এসে থামলেন। তিনি তানভীরের দিকে তাকালেন। কোনো দার্শনিক তত্ত্ব বা রূপক ব্যবহার করলেন না। নিজের পকেট থেকে ইনসোমনিয়ার ওষুধের পাতাটা বের করতে করতে খুব সাধারণ গলায় বললেন:

সবকিছুর ব্যাখ্যা হয় না, তানভীর। কিছু মানুষ স্রেফ খারাপ হয়। জবানবন্দিটা সাবমিট করে আজ রাতে বাড়ি যাও। তোমার মেয়েটার পাশে গিয়ে বোসো।

আরিয়ান আর দাঁড়ালেন না। পার্কিং লটের অন্ধকারে তাঁর অবয়বটা মিলিয়ে গেল।



বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই গল্পটি একটি ক্রাইম ফিকশন বা অপরাধমূলক কল্পকাহিনী। সমাজের কিছু বাস্তব চিত্র বা সংবাদকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিলেও, গল্পের সমস্ত চরিত্র ও নাটকীয়তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব জগতের কোনো ব্যক্তি, জীবিত বা মৃত কারও জীবনকাহিনী অথবা কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনার সাথে এই গল্পের কোনো রূপ সাদৃশ্য থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.