নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

ইন দ্যা শ্যাডোস অব ইল্যুশন

০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৮



রাজধানীর নিঝুম আবাসিক এলাকার তিনতলা ফ্ল্যাটের শোবার ঘরটি তখন ক্রাইম সিন টেপে ঘেরা। ধুলো জমে থাকা এয়ার কন্ডিশনারের শব্দের মাঝে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রক্তের হালকা সোঁদা গন্ধ।

পিবিআই ইনভেস্টিগেশন উইংয়ের প্রধান স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান আহমেদ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ রুমের প্রতিটা কোণ মেপে নিচ্ছে।

বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বিশিষ্ট দন্তচিকিৎসক ডা. সায়রা সুলতানা (৪১)-এর মরদেহ। তাঁর মুখের ওপর একটি সিল্কের বালিশ চাপা দেওয়া।

রুমের বেলকনির জানালার গ্রিলটি একটি নির্দিষ্ট কোণে কাটা। খোলা আলমারির কাপড়চোপড় মেঝেব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় ১৫-২০ লাখ টাকার গয়না উধাও।

"ক্রাইম সিন দৃশ্যত একদম ক্লাসিক ডাকাতি ও খুনের কেস, আরিয়ান ভাই," বললেন আরিয়ানের জুনিয়র অফিসার তানভীর। "ডাকাত দল বেলকনির গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকেছে। ডাক্তার সায়রা টের পেয়ে প্রতিরোধ করতে গেলে তাঁকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে মালপত্র লুট করে নিয়ে গেছে।"

আরিয়ান কোনো মন্তব্য করলেন না। তিনি বেলকনির সরু বারান্দাটার দিকে হেঁটে গেলেন। মেঝেতে ফরেনসিক ডাস্ট ছেটানো রয়েছে।

"তানভীর, একজন পেশাদার ডাকাত গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকার পর আলমারি ভাঙবে, কিন্তু ফাঁকা পুরোনো গয়নার ডজনখানেক প্লাস্টিকের বাক্সগুলো আলমারির ওপর একদম নিখুঁত সারিবদ্ধভাবে গুছিয়ে রেখে যাবে? দিস ইজ টু পারফেক্ট টু বি ট্রু," আরিয়ান ঠাণ্ডা গলায় বললেন।

ঠিক তখনই আরিয়ানের আরেক জুনিয়র অফিসার বর্ষা ঘরে প্রবেশ করল। তার হাতে একটি মেজারিং টেপ ও ক্যামেরা।

"আরিয়ান স্যার, তিনটি অদ্ভুত বিষয়," বর্ষা রিপোর্ট শুরু করল। "প্রথমত, বেলকনির বাইরের ছাদে বা বিপরীত দেয়ালে কোনো ওঠার প্রমাণ নেই। কিন্তু বেলকনির ভেতরের ভিজা টাইলসে একটি ক্লিয়ার ৪২ সাইজের জুতার ছাপ পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, নিহতের ১২ বছরের মেয়ে লিয়ানা জানিয়েছে—প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তার মা দরজা ভেতর থেকে লক করে দিতেন। কিন্তু আজ সকালে দরজা লক করা হয়নি। তৃতীয়ত, নিহত চিকিৎসকের স্বামী জাহেদ চৌধুরী দাবি করেছেন তিনি আগের রাতে বেলকনিতে গাছে পানি দেওয়ার সময় ওই জুতো পরেছিলেন।"

আরিয়ান ভিকটিমের স্বামী, পেশায় করপোরেট এক্সিকিউটিভ জাহেদ চৌধুরীর দিকে তাকালেন। জাহেদ ঘরের কোণে অত্যন্ত ধীরস্থির ও শোকার্ত ভঙ্গিতে বসে ছিলেন।

পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের প্রাইমারি মিটিং রুম। হোয়াইট বোর্ডে মার্কার দিয়ে সময় হিসেব করছেন আরিয়ান।

"তানভীর, জাহেদ চৌধুরী দাবি করেছেন তিনি সকাল ১০টা ৫০ এ বাসায় ছিলেন, ১১টা ২০ এ মেয়েকে স্কুলে ড্রপ করে ১১টা ৪৫ এ অফিসে পৌঁছান। প্রশ্ন হচ্ছে—যদি জাহেদ খুন করে থাকেন, তবে মাত্র ৩০ মিনিটের উইন্ডোতে ১. সায়রাকে বালিশচাপা দেওয়া, ২. গ্রিল কাটা, ৩. আলমারি লণ্ডভণ্ড করা, ৪. গয়না সরানো এবং ৫. স্বাভাবিক সেজে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া—সব করা কি বাস্তবে সম্ভব?"

তানভীর বলল, "স্যার, সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব। কিন্তু যদি গ্রিল কাটার কাজটা আগের রাতেই অর্ধেক করে রাখা হয়ে থাকে?"

"একজ্যাক্টলি!" আরিয়ান চক দিয়ে বোর্ডে মার্ক করলেন। "আজ সকালে কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি কারণ গ্রিল কাটা হয়েছিল আগেই। জাহেদ আগের দিন রাত ৩টায় যখন সবাই ঘুমে, তখন নিঃশব্দে জানালার গ্রিলের তিন পাশ কেটে রেখে সামান্য একটু সুপারগ্লু ও কালো গ্রিজ দিয়ে জোড়া দিয়ে রেখেছিলেন! সকালে সায়রাকে হত্যা করার পর শুধু এক চাপ দিয়ে কেটে রাখা অংশটা সরাতে তার সময় লেগেছে মাত্র ১০ সেকেন্ড।"

বর্ষা ল্যাপটপ অন করল। "আরিয়ান স্যার, আপনার নির্দেশে বেলকনির জুতার ছাপের সয়েল কম্পোজিশন ও ফুট-প্রেসার অ্যানালিসিস করা হয়েছে। জাহেদের দাবি—তিনি আগের রাতে গাছে পানি দেওয়ার সময় ওই ছাপ ফেলেছেন। কিন্তু ফরেনসিক সয়েল ময়েশ্চার রিপোর্ট বলছে—ছাপটি ফেলার সময় মাটিতে আর্দ্রতা ছিল ৯২% এবং রক্তের অ্যানালগ ট্রেস ছিল। অর্থাৎ ঘটনাটি আজ সকালেই ঘটেছে, আগের রাতে নয়! তাছাড়া পদছাপের হিল-প্রেসারের গভীরতা বলে দিচ্ছে, লোকটির হাতে বা শরীরে তখন ভারী কোনো কিছুর ওজন ছিল।"

"গয়নাগুলো কোথায় গেল?" তানভীর প্রশ্ন করল। "জাহেদ তো অফিসে গেছেন, তার গাড়ি বা অফিসে কোনো তল্লাশি চালিয়ে গয়না পাওয়া যায়নি।"

আরিয়ান শান্ত ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিলেন। "একজন করপোরেট এক্সিকিউটিভ কখনো রক্তমাখা গয়না ড্রেন বা ডাস্টবিনে ফেলবে না। সে এমন কোনো জায়গা বেছে নেবে যেখানে আইন পৌঁছাতে সময় নেয়।"

আরিয়ান এবং তার টিম এবার তলিয়ে যেতে লাগলেন জাহেদ চৌধুরীর ডিজিটাল জীবনে।

"স্যার, চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে," বর্ষা স্ক্রিন শেয়ার করল। "জাহেদ চৌধুরীর দুই মাস আগে একটি মাল্টিন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে সায়রা সুলতানার নামে দুই কোটি টাকার মেয়াদি জীবনবীমা করা হয়েছে, যেখানে একমাত্র নমিনি জাহেদ নিজে! আর মৃত্যুর কিছুদিন আগে সায়রা তাঁর বোনকে মেসেজে জানিয়েছিলেন যে জাহেদ তাঁর সই জাল করে কিছু নথিতে সই নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।"

"মেডিকেল ফরেনসিক আর মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের কী খবর?" আরিয়ান শুধালেন।

তানভীর স্পেকট্রাম রিপোর্ট তুলে ধরল। "স্যার, অটোপসি রিপোর্ট নিশ্চিত করেছে সায়রা সুলতানাকে স্যাডেটিভ ডায়াজিপাম খাইয়ে অর্ধ-সচেতন অবস্থায় শ্বাসরোধ করা হয়েছিল। আর জাহেদের ফোনের আইপি ট্র্যাকিং বলছে—ঘটনার দিন দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে, অর্থাৎ অফিসে থাকার সময়, জাহেদ গুলশানের একটি প্রাইভেট ব্যাংকের প্রিমিয়াম ব্র্যাঞ্চে ১০ মিনিটের জন্য গিয়েছিলেন।"

আরিয়ান তৎক্ষণাৎ কোর্ট অর্ডার নিয়ে টিমসহ গুলশানের সেই ব্যাংকে পৌঁছালেন।

ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে জাহেদ চৌধুরীর নামে থাকা সেফ ডিপোজিট ভল্ট বা ব্যাংক লকার খোলা হলো। সিলভার রঙের স্টিলের বক্সটি টান দিতেই ভেতরে পাওয়া গেল সায়রা সুলতানার খোয়া যাওয়া সমস্ত হীরা ও সোনার গয়না, একটি বিশেষ কাটিং টুলস এবং ডায়াজিপামের খালি পাতা!

"শিকার এখন ফাঁদে," আরিয়ান বরফশীতল গলায় বললেন।

পিবিআই-এর বিশেষ ইন্টারোগেশন সেল। ঘরটি সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ। টেবিলের ওপাশে বসে আছেন জাহেদ চৌধুরী। তার পরনে স্যুট, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। তার সাথে আছেন তার অভিজ্ঞ আইনজীবী।

"মিস্টার আরিয়ান," আইনজীবী চড়া গলায় বললেন, "আমার মক্কেলকে অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে। তিনি একজন সম্মানিত করপোরেট অফিসার। সায়রার মৃত্যুর সময় তিনি অফিসে ছিলেন। আপনার জুতার ছাপের থিওরি আদালতে টিকবে না।"

আরিয়ান কোনো কথা বললেন না। তিনি চেয়ারে শান্ত হয়ে বসলেন।

ঘরে নেমে এলো এক ভারী, দীর্ঘ নীরবতা। পাঁচ মিনিট... দশ মিনিট... আরিয়ান শুধু একদৃষ্টিতে জাহেদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়ে আরিয়ানের এই বরফশীতল নীরবতায় জাহেদের কপালে ধীরে ধীরে অস্বস্তির ঘাম জমতে শুরু করল। তিনি হাত দুটি টেবিলের নিচে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।

"আপনি খুব নিখুঁত প্ল্যান করেছিলেন, জাহেদ সাহেব," আরিয়ান অবশেষে ধীর ও শান্ত গলায় নীরবতা ভাঙলেন। "রাতের অন্ধকারে গ্রিল কেটে রাখা, সকালে স্ত্রীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিঃশব্দে শ্বাসরোধ করা, তারপর মেয়েকে স্বাভাবিকভাবে স্কুলে রেখে অফিসে যাওয়া... একদম নিখুঁত।"

জাহেদ শুকনো ঢোক গিলে বললেন, "অনুমান দিয়ে পুলিশ চলে না, অফিসার।"

আরিয়ান টেবিলের ওপর একে একে চারটা ফাইল রাখলেন।

১. প্রজেক্টরে ভেসে উঠল বেলকনির মেটালের ফরেনসিক ক্র্যাক অ্যানালিসিস, যা প্রমাণ করে গ্রিলটি আগের রাতে কাটা হয়েছিল।
২. স্ক্রিনে ভেসে উঠল ৯২% ময়েশ্চার এবং সয়েল-প্রেসার রিপোর্ট, যা প্রমাণ করে পদছাপটি আগের রাতের নয়, খুনের সময়ের।
৩. প্রজেক্টরে ভেসে উঠলো জাহেদের ইমেইল ও ২ কোটি টাকার ইনস্যুরেন্সের নথি।
৪. এবং সবশেষে—টেবিলে রাখা হলো গুলশানের ব্যাংক লকার থেকে উদ্ধার করা রক্তের দাগ লাগা গয়নার থলি ও কাটিং টুলসের সিলগালাকৃত ফরেনসিক ব্যাগ।

আরিয়ান ল্যাপটপের আলো জাহেদের মুখে ফেলে একদম কাছাকাছি এলেন।

"ব্যাংক লকারের মাস্টার কি-তে আপনার আঙুলের যে ডিজিটাল বায়োমেট্রিক প্রিন্ট পড়েছে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে, আর গয়নার ওপর ডা. সায়রার শুকিয়ে যাওয়া রক্তের যে ডিএনএ মিলেছে... এর জবাব আদালতে কীভাবে দেবেন, মিস্টার জাহেদ?"

জাহেদের আইনজীবী ফাইলের প্রমাণগুলোর দিকে তাকিয়ে আস্তে করে তার ফাইল বন্ধ করলেন। তিনি বুঝে গেছেন, এই মামলার আর কোনো ডিফেন্স বাকি নেই।

ইন্টারোগেশন রুমে আবার এক গভীর নীরবতা নেমে এলো।

জাহেদ চৌধুরীর চোখের ভেতরের সেই ধূর্ত আত্মবিশ্বাস ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তার হাত দুটো কাঁপতে লাগল। তিনি ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর মাথা নামিয়ে আনলেন।

"সায়রা আমাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিল..." জাহেদ ভাঙা গলায়, অত্যন্ত নিচু স্বরে বলতে শুরু করলেন। "ডিভোর্স দিলে আমার ব্যাংকের চাকরি, সামাজিক সম্মান, সম্পত্তি—সব চলে যেত। আর ওই জীবনবীমার টাকাটা আমার দরকার ছিল... আমি ভেবেছিলাম ব্যাংক লকারে গয়না রেখে দিলে পুলিশ কোনদিন সেখানে পৌঁছাতে পারবে না..."

আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। কভার ফাইলটি সজোড়ে বন্ধ করার শব্দে ঘরে প্রতিধ্বনি হলো।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জাহেদ চৌধুরীকে সোপর্দ করা হলো। বিজ্ঞানের নিরেট প্রমাণ ও ডিজিটাল ট্রেইলের সামনে জাহেদের জামিন আবেদন বাতিল করে তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিলেন বিচারক।

আদালত ভবনের বাইরে বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে।

সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পিবিআই স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান আহমেদ শান্ত ভঙ্গিতে বললেন—

"অপরাধী নিজেকে যত বড় চতুর ভাবুক না কেন, সে ভুলে যায় যে বিজ্ঞান এবং ফরেনসিকের কোনো অনুভূতি নেই। একটি নিখুঁত অপরাধের নাটক সাজাতে গিয়ে অপরাধী যে ডিজিটাল ও বায়োলজিক্যাল ছাপ রেখে যায়, তা শেষ পর্যন্ত সত্যকে আলোর মুখ দেখাবেই।"

আরিয়ান তার টিম নিয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে গেলেন। একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের ফাইল বন্ধ হলো, আর ডা. সায়রা সুলতানার আত্মার সাথে জড়িয়ে থাকা সুবিচারের অধ্যায় লিখিত হলো পিবিআই-এর নথিতে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.