নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মিশু মিলন

মিশু মিলন

আমি বর্তমানে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগে লিখি। আমার সকল লেখা আমি এই দুটি ব্লগেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। এই দুটি ব্লগের বাইরে অনলাইন পোর্টাল, লিটল ম্যাগাজিন এবং অন্য দু-একটি ব্লগে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কিছু কিছু লেখা আমি আবার সম্পাদনা করেছি। ফলে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগের লেখাই আমার চূড়ান্ত সম্পাদিত লেখা। এমনকি আমার কম্পিউটারের লেখাও চূড়ান্ত সম্পাদিত নয়, কেননা এখন আমি ব্লগেই লেখা সম্পাদনা করি। এই দুটি ব্লগের বাইরে অন্যসব লেখা আমি প্রত্যাহার করছি। মিশু মিলন ঢাকা। ৯ এপ্রিল, ২০১৯।

মিশু মিলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

লৌকিক লোকলীলা (উপন্যাস: পর্ব-এগারো)

০২ রা মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১৮

ছয়

রাস্তার ধারে মাত্র কয়েকটা বাড়ি, বাড়িগুলো পিছনে ফেলে রাস্তা থেকে নেমে ওরা মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে শ্মশানের দিকে এগোতে থাকে, এখান থেকে ওরা জ্বলন্ত চিতা স্পষ্ট দেখতে পায়, দাউ দাউ করে জ্বলছে চিতা। চিতার আগুনের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে, শ্মশানের পাশের সুবজ ধানক্ষেতে নাচচে আগুলের লাল আভা। ওরা কলাবাগানের ভেতর দিয়ে কিছুটা এগোনোর পর সোজা শ্মশানের দিকে না গিয়ে একটু বাম দিকে সরে গিয়ে একটা মেহগনি বাগানে প্রবেশ করে, বাগানের গাছগুলো খুব বেশি মোটা নয়। ওরা বাগানের মাঝখানে এসে হাতের রামদা, ছড়ি আর কোদাল মাটিতে রেখে বসে পড়ে গোল হয়ে। খোল-করতাল সহযোগে শ্মশানযাত্রীদের গানের সুর এখান থেকে স্পষ্ট শোনা যায়, একজন গাইছে আর অন্যরা দোহারকি করছে-

‘নিতাই আমার হাত ধরিয়ে লয়ে চলরে

কত দিনে ব্রজে যাব,

আমি বহুদিন হই ব্রজ ছাড়ারে

নিতাই আমার হাত ধরিয়ে লয়ে চলরে…।’

অমল কোমরের গামছা খুলে মুখের এবং শরীরের ঘাম মোছে, ওর গলার রুদ্রাক্ষের মালার দানায়-দানায় ঘর্ষনের মৃদু শব্দ হয়। বিলাস নিজের কোমরের ধুতির ভাঁজে কায়দা করে রাখা ছোট মদের বোতলটি বের করে মুখ খুলে চুমুক দিয়ে বোতলটি বাড়িয়ে দেয় অমলের দিকে। পরিমল আবার একটা গাঁজার স্টিক ঠোঁটে পুরে প্যাকেটটা তিনজনের মাঝখানে রাখে, দিয়াশলাই জ্বেলে গাঁজার স্টিকে আগুন ধরায়, ক্ষণিকের জন্য ওর মুখ আলোকিত হয়ে ওঠে, গাঁজায় টান দেবার সময় চোখ বোজে, দিয়াশলাইয়ের প্যাকেটটাও রেখে দেয় মাটিতে। গাঁজার মাদকতা ছড়িয়ে পড়ে ওর মস্তিষ্কে, দারুণ আরাম অনুভব করে! আরেকটি টান দিয়ে গাঁজার স্টিকটা দেয় বিলাসকে আর অমলের হাত থেকে মদের বোতলটি নিয়ে দুই ঢোক মদ গলাধঃগরণ করে। পরিমল আর বিলাস যেমনি প্রায়ই মদ আর গাঁজা খায়, অমল তা নয়। অমলের মদ কিংবা গাঁজা খাওয়া অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক, কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে খায়। মদের বোতল আর গাঁজার স্টিক ওদের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে, শ্মশানযাত্রীরা আবার ধ্বনি দেয়, একই সাথে চলতে থাকে গান।

শ্মশানযাত্রার ধ্বনি শুনলে সেই ছেলেবেলা থেকেই অমলের বুকের ভেতর মোচড়ায়, বুকের তেপান্তরে হু হু করে হাওয়া বয়, ও উদাস হয়ে পড়ে। ও মৃত্যুকে ভয় পায় না, কিন্তু মৃত্যু ওকে ভাবায়, মৃত্যু-ভাবনা ওকে আচ্ছন্ন করে রাখে। দাদুর কথা মনে পড়ে, জ্যাঠার কথা মনে পড়ে, বাবার কথা মনে পড়ে, পরিচিত আরো অনেকের কখাই মনে পড়ে; যারা একদিন এই পৃথিবীতে ছিলেন, কিন্তু আজ নেই। তারা এখন কোথায়, স্বর্গে নাকি নরকে? বাবা তো সারাজীবন ভাল কাজ করেছেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন, মানুষের সেবা করেছেন, কোনোদিন কারো অন্বিষ্ট করেননি। বাবার তো স্বর্গেই যাবার কথা! আর পাশের বাড়ির রিনা কাকিমা, তার স্থান হয়েছে কোথায়? রিনা কাকিমার অনেক দূর্নাম ছিল, মানুষের টুকিটাকি জিনিসপত্র চুরি করার স্বভাব ছিল। রিনা কাকিমার আরও একটা ব্যাপার ও জানে, সেটা ওর বড়দির বিয়ের সময়ের ঘটনা। তখন রাত, বড়দির বিয়ে হচ্ছে, বাড়িতে অনেক আত্মীয়-স্বজন আর বরযাত্রী। শোবার জায়গার অভাবের কথা উঠতেই রিনা কাকিমা আগ বাড়িয়ে ওকে বলে, ‘অমল, শুয়ার জায়গা না থাকলি আমাগের বাড়ি দুই-তিনজন নিয়ে যাস।’

রাতে বিয়ের পাঠ চুকে গেলে দেখা যায় শোবার জায়গা অবশিষ্ট নেই, সব বিছানায় গাদাগাদি করে শুয়েছে আত্মীয়-স্বজনরা, তারপরও অনেকের শোবার জায়গা হয়নি দেখে প্রতিবেশীদের বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। অমল ওর নিকটাত্মীয় দুই দাদাকে নিয়ে শোবার উদ্দেশে যায় রিনা কাকিমাদের বাড়িতে। উঠোনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ডাকার পরও রিনা কাকিমা কোনো সাড়া দেন না, তবু অমল ডাকতেই থাকে, এক সময় রিনা কাকিমা সাড়া দেন, ‘অমল নাকি রে?’

অমল বলে, ‘হ কাকিমা, শুবার আসলাম।’

‘দাঁড়া, খুলতেছি।’

রিনা কাকিমার কণ্ঠ শুনে অমলের মনে হয় না যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, তবে তিনি সাড়া দিতে এতটা দেরি করলেন কেন? এই প্রশ্ন অমলের মনে জাগলেও বিশেষ পাত্তা দেয় না ও। রিনা কাকিমা দরজা খুলে দিলে ওরা তিন ভাই ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে পাশাপাশি দুটো চকি জোড়া লাগিয়ে বিছানা পাতা, বিছানার দক্ষিণদিকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শায়িত একজন, অমল বুঝতে পারে তিনি সুভাষ কাকা অর্থাৎ রিনা কাকিমার স্বামী, এজন্যই বোধ হয় স্বামী-স্ত্রীর একান্ত কোনো বিশেষ কারণে কাকিমা সাড়া দিতে দেরি করেছেন। সুভাষ কাকা ফরিদপুরের একটা পেট্রোলপাম্পের ম্যানেজার, সেখানেই থাকেন, কখনো সপ্তাহে কখনো পনের দিনে একবার বাড়িতে আসেন। রিনা কাকিমা ওদের তিনজনকে রেখে অন্য ঘরে শুতে চলে যান। অমল দরজা লাগিয়ে দেয়, তারপর ওরা তিন ভাই বিছানার অবশিষ্ট জায়গায় শুয়ে পড়ে।

অনেক রাতে শুলেও খুব সকালেই ঘুম ভেঙে যায় অমলের, মাথার কাছের ছোট্ট খোলা জানালা দিয়ে তখন মৃদু আলো প্রবেশ করেছে ঘরে, বামদিকে পাশ ফিরে শোবার সময় পাশের ঘুমন্ত মানুষটির মুখে হঠাৎ দৃষ্টি পড়ায় ও যেন চমকে যায়! ঠিক দেখছে তো? ডানহাতের আঙুলগুলো দিয়ে দু-চোখ রগড়ে আবার তাকায় ঘুমন্ত মানুষটির মুখের দিকে, ওই নিমীলিত চোখের মুখমণ্ডল যেন সূর্যের আলোর মত ওর মস্তিষ্কের পাতলা কুয়াশার সদৃশ ঘুম মুছে দেয়, বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত ওর চোখের পলক পড়ে না! রাতে শোবার সময় ও যাকে সুভাষ কাকা ভেবেছিল, তিনি তো সুভাষ কাকা নন, সুভাষ কাকার বড় ভগ্নীপতি দীপেন, রিনা কাকিমার বড় ননদের বর!

অমল রিনা কাকিমার সম্বন্ধে অনেক বাজে কথা শুনেছে অন্য প্রতিবেশীদের মুখে কিংবা বন্ধু-মহলে, কিন্ত সে-সব কথা বিশ্বাস করতে চায়নি, কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও প্রতিবেশী কাকিমা সম্বন্ধে ওই সব কথা শুনে ওর অস্বস্তি হত। কিন্তু আধো আলো-আধো ছায়া ঘরের বিছানায় ঘুমন্ত মধ্যবয়সী দীপেনের মুখের দিকে তাকিয়ে রিনা কাকিমা সম্বন্ধে মানুষের বলা বাজে কথাগুলোই ওর কানে বাজতে থাকে। একদিন যে রিনা কাকিমা সম্বন্ধে মানুষের বলা কথা বিশ্বাস করতে চায়নি, দীপেনকে দেখার পর সে-ই রিনা কাকিমা সম্বন্ধেই ওর মাথায় প্রশ্নের জন্ম হয়, আর নিজেই আত্ম-প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বিব্রতবোধ করে- দীপেন এসেছেন জেনেও রিনা কাকিমা কেন তাকে শুতে আসতে বললেন? নাকি দীপেন তখনও আসেনি আর আসবেন কি না তা তিনি জানতেন না? তিনি বাড়ি ফেরার পর দীপেন এসেছেন? রিনা কাকিমাদের তো আরো ঘর আছে, যে ঘরে তার মেয়ে শোয়, মেয়ের কাছে না শুয়ে তিনি কেন রাতেরবেলা ননদের বরের সঙ্গে একই বিছানায় শুয়েছিলেন? অমলের ভেতরে শুরু হয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস বিপরীতমুখী দড়ি টানাটানি।

অমলের বন্ধুরা মানুষের সম্পর্ক নিয়ে কিংবা কার সঙ্গে কে শোয় এই ধরনের সত্য অথবা বানোয়াট বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত, কিন্তু রিনা কাকিমা আর তার ননদের বর দীপেনের রাতে এক বিছানায় শোবার কথা সে কোনোদিন কাউকে বলেনি, ওর মনে হয়েছিল এমনিতেই তো মানুষ রিনা কাকিমাকে কত কলঙ্ক দেয়, সেই কলঙ্কের ডালা আর নাইবা ভারি করল সে!

সেদিন ভোরবেলায় ঘুম ভাঙলে বিছানায় নিজের পাশে দীপেনকে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখার পর অমল যখন চুপ করে শুয়ে ছিল, রাত্রি জাগরণের কারণে চোখ জ্বালা করলেও ঘুম আর আসছিল না, তখন ঘরের বেড়ায় টাঙানো রিনা কাকিমার স্বামী সুভাষ কাকার যৌবনকালের সাদাকালো বাঁধানো একটি ছবির দিকে চোখ পড়ে আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওর কল্পনায় ভেসে ওঠে একটি দৃশ্য। দৃশ্যটি ঠিক এই রকম-গুমোট গন্ধময় দরজা-বন্ধ ঘরের পাতলা অন্ধকারে বিছানায় নগ্ন শরীরের রিনা কাকিমা আর দীপেন জাপটাজাপটি করছে, দীপেন রিনা কাকিমার ঠোঁট কামড়াচ্ছে, গাল-গলা-স্তন চাটছে, ঊরুতে মুখ গুঁজছে; তারপর নানান কৌশলে দুজনে সঙ্গম করছে, প্রবল সঙ্গমসুখে অস্থির স্বাস্থ্যবতী রিনা কাকিমা দুই হাতে জাপটে ধরে ছিপছিপে গড়নের দীপেনকে নিজের শরীরের সঙ্গে পিষে ফেলতে চাইছে যেন! অল্প দূরেই বেড়ায় ঝোলানো কাঠের ফ্রেমের মাঝখানে স্থির সুভাষ কাকার দুটি চোখ।

এই দৃশ্যটি কল্পনায় ভেসে উঠলে অমল এতটাই বিব্রতবোধ করে যে সকালের আলোয় দীপেন কিংবা রিনা কাকিমার মুখোমুখি হতে চায় না, অন্য কেউ উঠার আগেই ও বিছানা ছেড়ে আলগোছে দরজা খুলে চুপি চুপি বাড়ি চলে যায়।

এই ঘটনার পর থেকেই অমল রিনা কাকিমাদের বাড়িতে যাওয়া ছেড়ে দেয়, কোথাও রিনা কাকিমাকে দেখলেই ও সরে পড়ত, পারতপক্ষে রিনা কাকিমার সামনে পড়তে চাইত না। রিনা কাকিমার দিকে তাকাতে লজ্জা লাগত, তাকালে মনে হত ও যেন রিনা কাকিমার পরনের কাপড় ভেদ করে শরীরটা দেখতে পাচ্ছে আর রিনা কাকিমার সঙ্গে দীপেনের সঙ্গমের ওই কল্পিত দৃশ্যটা মনশ্চক্ষে ভেসে উঠত! এই দৃশ্যটাকে ও ভুলে যেতে চাইত, ভুলে যেতে চাইত দীপেনের চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা সেই ঘুমন্ত মুখ, কিন্তু পারত না। রিনা কাকিমা আর দীপেন তো বটেই, এমনকি সুভাষ কাকাকে দেখলেও দৃশ্যটা তার মনশ্চক্ষে ভেসে উঠত! এছাড়াও সিনেমায় নারী-পুরুষের মিলনের দৃশ্য দেখলে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যৌনতা বিষয়ক আলোচনার সময়েও ওই দৃশ্যটা ওকে তাড়া করত। কখনো কখনো একান্তে বসে কিংবা শুয়ে থাকলেও ওই দৃশ্যটার কথা মনে পড়ত ওর, বহুদিন ওই দৃশ্যটার কথা মনে পড়ায় ওর শরীরে কাম জেগে উঠেছে, নিরলে বন্ধ ঘরে কিংবা অতীশদের বাগানে গিয়ে হস্তমৈথুন করেছে!

বছর খানেক আগে রিনা কাকিমা সেই একই বিছানায় রাত্রিবেলা মরে পড়ে ছিল, পাশে কেউ ছিল না, না দীপেন না সুভাষ কাকা কিংবা অন্য কেউ। মৃত্যুর পর রিনা কাকিমা কোথায় গেছে, স্বর্গে না কি নরকে? ভাগবত পুরাণ, দেবী-ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ এবং গড়ুর পুরানে যে আটাশ প্রকার নরকের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একপ্রকার নরকের নাম-তপ্তসুর্মি বা তপ্তমূর্তি। ওদের গ্রামের ভাগবত পাঠক দেবু গোস্বামীর মুখে অনেকবার শুনেছে- যে পুরুষ বা নারী নিজ স্ত্রী বা স্বামী ব্যতিত লালসার বশবর্তী হয়ে অন্য নারী বা পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, মৃত্যুর পর তার ঠাঁই হয় নরকে, আর শাস্তিস্বরূপ তাকে কষাঘাত করা হয় এবং বিপরীত লিঙ্গের তপ্ত লালাভ একটি লৌহমূর্তি আলিঙ্গন করতে বাধ্য করা হয়। রিনা কাকিমাও কি এখন সেই শাস্তি ভোগ করছে? না কি স্বর্গ-নরক বলে সত্যিই কিছু নেই? এই যে ওরা সারা বছর এত সব পূজা-পার্বণ করে, আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, এতে কি সত্যিই কোনো ফল হয়? মানুষের কিংবা জগতের কোনো মঙ্গল হয়? নাকি অয়নের বিশ্বাস মত এসবই মিথ্যা, সত্য কেবল মৃত্যু, আর মৃত্যুর পর জীবের পুনর্জন্ম হয় না; কোনো স্রষ্টা জগত সৃষ্টি করেনি, জগত তার আপন নিয়মে চলে, জরা-ব্যাধি-বার্ধক্যে জীবদেহের যেমনি মৃত্যু হয়, তেমনি এই অজস্র গ্রহ-নক্ষত্রের মহাবিশ্ব থেকে পৃথিবীও বিলুপ্ত হবে!

অয়নকে অনেকেই দেখতে পারে না, বলে যে নিজের জাত ত্যাগ করা আর গরুর মাংস খাওয়া উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে! কিন্তু অয়ন ছেলেটাকে অমলের ভাল লাগে, পরিচ্ছন্ন চিন্তার ছেলে, নিজের যা ভাল লাগে বা নিজে যা বিশ্বাস করে, তাই-ই করে; কোনোদিন কারো কোনো ক্ষতি করেনি, কারো পিছে লাগেনি। বাড়িতে এলে মাঝে মাঝে ওর চেম্বারে আসে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক কথা হয়। অমল ওর কথা শোনে, এতদিনকার লালিত বিশ্বাস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে না পারলেও, অয়নের কথা ও উড়িয়ে দিতে পারে না অন্য সবার মত। বরং লেখাপড়া এবং সুন্দর চিন্তা-ভাবনার কারণে অয়নের প্রতি স্নেহ ছাড়াও এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ আছে ওর।

মদ শেষ হলে শূন্য বোতলটি পিছনদিকে ছুড়ে ফেলে দেয় অমল, তিনজনই নেশায় বুঁদ হয়ে যায়। অমল শ্মশানের দিকে তাকায়, শ্মশানের উত্তর-পশ্চিমদিকে দাউ দাউ করে জ্বলছে চিতার আগুন, বাঁশ দিয়ে মাঝে মাঝে চিতার কাঠ খুঁচিয়ে দেওয়ায় ফলকি উঠছে ঊর্ধ্বমুখে। শ্মশানের মাঝখানে শ্মশানযাত্রীদের জন্য বানানো পাকা করা ছাউনির নিচে যেখানে বসে গান গাইছে শ্মশানযাত্রীরা, সেখানে জ্বলছে বৈদ্যুতিক চার্জার লাইটের সাদা আলো, হয়ত একাধিক তাই আলোর ঔজ্বল্য অনেক বেশি। আজকের এই বৈদ্যুতিক বাতির জায়গায় এক সময় জ্বলত হ্যাজাকবাতি। অমলের মনে পড়ে ওর জ্যাঠা তারাপদ দাসের কথা, অদ্ভুত খেয়াল আর বিচিত্র স্বভাবের মানুষটি তিনটে হ্যাজাকবাতির মালিক ছিলেন। তিনি জীবনে প্রথম হ্যাজাকবাতি দ্যাখেন ১৯৭১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের করিমপুর শরণার্থী শিবিরে থাকার সময়, তখন তার বয়স ছিল পঁচিশ বছর। ১৯৭১ সালের জুন মাসের এক রাতে তিনি বাবা-মা আর ছোট দুই ভাই-বোনের সঙ্গে দেশ ছেড়েছিলেন, তার খুব ইচ্ছে ছিল মুক্তিযুদ্ধ করার, কিন্তু মা নিষেধ করেছিলেন যুদ্ধে যেতে। জুলাই মাসে মা মারা যান কলেরায় আর অক্টোবর মাসে বাবা আবার বিয়ে করেন শরণার্থী শিবিরের আশ্রিত এক অনাথ মেয়েকে। মা মারা যাবার পর এমনিতেই তার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, তার ওপর বিবাহযোগ্য ছেলের বিয়ে না দিয়ে বাবা এক যুবতীকে বিয়ে করায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধে যাবেন। কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে যান বালুরঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে, ক্যাম্পে ভর্তি হয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ই ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে যায়, তার আর দেশে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হয় না, গুলি করে পাকিস্থানী সৈন্য মারা হয় না, এটা ছিল তার সারা জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস।

দেশে ফিরে এসে বিয়ে করেন তারাপদ; স্ত্রী, বাবা, সৎ মা আর ছোট ভাই-বোনদেরকে নিয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় তাকে। মূলত কৃষিকাজই ছিল তার পেশা, পৈত্রিক সামান্য যে জমিজমা ছিল তাই চাষ করতেন। তাতে সংসারের অভাব ঘুচত না। করিমপুরে শরণার্থী শিবিরে তিনি যখন হ্যাজাকবাতি দেখেছিলেন, তখন এই হ্যাজাক বাতি তার মনে বিস্ময় জাগিয়েছিল, ভাল লেগেছিল। একসময় কিছু টাকা-পয়সা গুছিয়ে ফরিদপুর থেকে দুটো হ্যাজাকবাতি কিনে এনে নিজ গ্রামে এবং আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের বিয়ে, অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া, শ্রাদ্ধ, যাত্রাপালা, রামায়ণ পালা, ভাগবত পাঠ, নানা ধরনের পূজা-পার্বণ প্রভৃতি অনুষ্ঠানে ভাড়া দিতেন। নিজেই হ্যাজাকবাতি নিয়ে সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন, কেননা তাকেই হ্যাজাকবাতি জ্বালাতে হত, বায়ুর চাপ কমে গেলে মাঝে মাঝে পাম্প করে চাপ বাড়াতে হত। গ্রামের কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে ঠিক হলেই তার ডাক পড়ত। ছেলের বিয়ে হলে তিনি একটি হ্যাজাকবাতি বহন করে বরযাত্রী দলের আগে আগে হেঁটে যেতেন, অন্য কেউ আরেকটি বহন করত। তেমনি কেউ মারা গেলে শ্মশানযাত্রীদের আগে আগে তিনি হ্যাজাক বাতি নিয়ে হেঁটে যেতেন। হ্যাজাকবাতিকে কে এই অঞ্চলের মানুষ হ্যাচাক উচ্চারণ করায় লোকে তাকে ডাকত ‘হ্যাচাক মাস্টার’ বলে। কোনো বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানে বায়ুর চাপ কমার ফলে মেন্টেল একটু নিভু নিভু হতেই লোকে হাঁক ছাড়ত, ‘ও হ্যাচাক মাস্টার কনে গিলে?’

হ্যাজাকবাতি দুটো ছিল যেন তারাপদ’র প্রাণ! খুব যত্ন করতেন, নষ্ট হলে পার্টস কিনে এনে নিজেই মেরামত করতে শিখেছিলেন, পরে আরো একটি কিনেছিলেন। তিনটি হ্যাজাকবাতি ভাড়া দিয়ে ভালোই রোজগার হত তার। হ্যাজাকবাতি সম্পর্কে তার জ্ঞানও ছিল বেশ, জার্মানির Max Graetz ১৯১০ সালে হ্যাজাকবাতি আবিষ্কার করেন, তাও তিনি জানতেন। Max Graetz কে তিনি এতটাই শ্রদ্ধা করতেন যে তার ছবি পেলে হয়ত বাঁধিয়ে ঘরে টাঙিয়ে রাখতেন ফুলের মালা দিয়ে!

যখন কোথাও কোনো অনুষ্ঠান থাকত না, তখন হ্যাজাকবাতি তিনটে ঘরে পড়ে থাকত, এ সময়ই তার মাথায় আরেক খেয়াল চাপে। একদিন ফরিদপুর থেকে একটা এয়ারগান কিনে আনেন, নিজেই একটা বোর্ড বানিয়ে তাতে ছোট ছোট বেলুনের বল সাজিয়ে নলিয়া হরিঠাকুরের মেলায় গিয়ে বসেন। দড়ি দিয়ে ঘেরা ছোট্ট জায়গায় বেলুনের বোর্ড দাঁড় করিয়ে বোর্ডের সামনে এয়ারগান হাতে নিয়ে তারাপদ হাঁক ছাড়তে শুরু করেন-

‘আয়রে আয় ছুটে আয় দূরন্ত সব ছেলে-মেয়ের দল

দেখে যা পাকিস্থানী হায়েনা মারার আজব এক কল

হাতে নিয়ে বন্দুক চটজলদি কর গুলি

উড়িয়ে দে ইয়াহিয়া আর নিয়াজির মাথার খুলি।’

ছেলে-মেয়েরা পয়সা দিয়ে গুলি করে বেলুন ফাটাত। আর তিনি বলতেন, ‘শোন, গুলি করার সময় মনে করবি তোরা বেলুন ফাটাতেছিসনে, ফাটাতেছিস ইয়াহিয়া-নিয়াজির মাথার খুলি, জেনারেল জানজুয়ার মাথার খুলি, রাজাকার গোলাম আজমের মাথার খুলি। কর গুলি কর; মার রাজাকার, আল-বদর আর পাকিস্তানী সৈন্য!’

তার মুখের ছড়া আর এইসব কথা শুনতে ভিড় লেগে যেত, ছেলে-মেয়েরা খুব মজা পেত, দারুণ উৎসাহে তারা পয়সা দিয়ে গুলি করে বেলুন ফাটাত। সন্ধ্যার পর হ্যাজাকবাতির আলোয় চলত বেলুন ফাটানো। শুধু নলিয়ার মেলা নয়, যেখানেই মেলা হত সেখানেই বোর্ড বসাতে চলে যেতেন তারাপদ। মেলা ছাড়াও জামালপুর বাজারে তিনি বোর্ড বসাতেন কেবল হাটের দিনে, সন্ধ্যার সময় হ্যাজাকবাতি জ্বালিয়ে দিতেন। যতক্ষণ না মেলা কিংবা হাট ভাঙত ততক্ষণ তিনিও বোর্ড গুটাতেন না, এই খাত থেকেও বেশ রোজগার হত তার।

তারাপদ’র বৃদ্ধ বয়সে গ্রামে জেনারেটরের ব্যবহার শুরু হয়, বড় কোনো অনুষ্ঠান হলেই মানুষ তখন জামালপুর বাজার থেকে জেনারেটর ভাড়া করে আনত, জেনারেটরের আলোয় ঝকঝক করত অনুষ্ঠানবাড়ি। তখন থেকেই হ্যাজাকবাতির কদর একটু একটু করে কমতে শুরু করে। পরবর্তীতে যখন গ্রামে বিদ্যুৎ আসে, তখন বাড়িতে ছোট কোনো অনুষ্ঠান হলেও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মানুষেরা বাজার থেকে টিউবলাইট ভাড়া করে এনে সারা বাড়িতে লাগিয়ে অনুষ্ঠানের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে আরম্ভ করে। আর বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে তো কথাই ছিল না, সারা বাড়ি যেন হয়ে উঠত আলোর ফোয়ারা! বিয়ে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানের আসর থেকে শুরু করে এঁটো থালা-বাসন ধোয়ার জায়গা পর্যন্ত সবখানেই বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি, এখনকার মতই তখন জেনারেটর থাকত ব্যাকআপ হিসেবে, বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু হত। বৈদ্যুতিক বাতির ঝলকানিতে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বাড়িগুলোর দরজা হ্যাজাকবাতির জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তখন আার্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের ছোট-খাটো কোনো অনুষ্ঠানে তারাপদ’র ডাক পড়ত, তাও বিকল্প হিসেবে, বিদ্যুৎ চলে গেলে তখন হ্যাজাকবাতি জ্বালাত। তখন থেকেই বৈদ্যুতিক চার্জার-লাইটের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়, ফলে দিনদিন অবস্থা এমন হয় যে হ্যাজাক মাস্টার তারাপদকে কেউ আর ডাকে না। এই ব্যাপারটা তারাপদকে খুব হতাশ করে, তখন তিনি কেবল মেলায় আর হাটে বোর্ড বসিয়ে সন্ধ্যার সময় হ্যাজাক বাতি জ্বালাতেন। তার ছেলেরাও তখন আয় রোজগার করছিল, সংসারে তেমন অভাব ছিল না। কিন্তু ওই যে বিভিন্ন সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হ্যাজাক বাতির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারও কদর কমে যায়, লোকে তাকে আর আগের মত ‘হ্যাচাক মাস্টার’ বলে সম্বোধন করে না, এই ব্যাপারটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তার রাগ গিয়ে পড়ে বৈদ্যুতিক বাতির ওপর, রাতেরবেলা মানুষের বাড়ির বারান্দায় বা বাহির বাড়িতে যেসব বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলত, গভীর রাতে দূর থেকে এয়ারগান দিয়ে গুলি করে তিনি সে-সব বাতি ভেঙে ফেলতেন। সারা গ্রামের মানুষের ঘরের বাইরের বৈদ্যুতিক বাতি তিনি এভাবে গুলি করে ভাঙতে শুরু করেন, প্রথম প্রথম মানুষ ভাবত এটা দুষ্টু ছেলেদের কাজ, কেউ কেউ তক্কে তক্কে থাকত ধরার জন্য, কিন্তু সহজে ধরতে পারত না। শেষ পর্যন্ত একদিন রাতে যখন লোকের হাতে ধরা পড়ে যান তারাপদ, তখন সকলের জেরার মুখে তিনি ফাঁস করেন তার এই বৈদ্যুতিক বাতি ভাঙার রহস্য। বৃদ্ধ মানুষ, তার ওপর অনেকদিন তিনি তার হ্যাজাকবাতির আলোয় মানুষের বাড়ির অনুষ্ঠানের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়েছেন, ফলে কেউ তার ওপর রাগ করে না, সবাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে দিন বদলেছে, হ্যাজাকবাতির দিন ফুরিয়েছে, এই পরিবর্তন তার মেনে নেওয়াই উচিত। তবু মাঝে মাঝে যখন কোনো বাড়িতে অনুষ্ঠান হত, সেই বাড়ি থেকে ব্যান্ডপার্টির বাদ্য ভেসে আসত কানে, বৈদ্যুতিক বাতির ঔজ্জ্বল্য চোখে পড়ত, তখন অস্থির হয়ে পড়তেন তিনি, চুপি চুপি এয়ারগান নিয়ে অন্য কোনো বাড়ির বারান্দা কিংবা উঠোনের বৈদ্যুতিক বাতি ভেঙে ফেলতেন। বাতি ভাঙার পরই তার অস্থিরতা কমে যেত, চুপি চুপি বাড়িতে গিয়ে শুয়ে পড়তেন। তাকে কেউ দেখতে না পেলেও ভুক্তভোগীরা বুঝে যেত যে কে এই কাজ করেছে। প্রথম দু-একবার তারা বিষয়টি মেনে নিলেও পরে অভিযোগ করতে শুরু করে তারাপদ’র ছোট ভাই অর্থাৎ অমলের বাবা অবিনাশ ডাক্তার আর তারাপদ’র ছেলেদের কাছে। বাবার জন্য লোকের কথা শুনতে হয় দেখে তারাপদ’র ছেলেরা তাকে বকাঝকা করত। যাদের বাতি ভাঙত, ছেলেরা তাদের বাতির দাম দিতে চাইত, কেউ নিত, আবার কেউ নিত না। একদিন সন্ধ্যায় অমলের বাবা অবিনাশ ডাক্তার তার দাদাকে নিয়ে বসেন, বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘দাদা, তুমি এট্টু বোঝার চেষ্টা কর। হ্যাজাকবাতি বিজ্ঞানের অবদান, আবার বৈদ্যুতিক বাতিও বিজ্ঞানের অবদান। সমাজে এখন হ্যাজাকবাতির আবেদন শ্যাষ হয়ে গেছে, আবার ভবিষ্যতে কোনোদিন হয়ত আজকের এই বৈদ্যুতিক বাতির আবেদনও শ্যাষ হয়ে যাবি। শ্যাষ না হলেও হয়ত বৈদ্যুতিক বাতির বিবর্তন ঘটপি, নতুন নতুন বৈদ্যুতিক বাতি তৈরি হবি, নয়ত এমন কিছু হবি যা আমরা এখন ভাবতেও পারিনে। এই যে তুমি পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে আছো, বিজ্ঞানের নতুন অবদানকে মাইনে নিতে পারতেছ না, তাতে তুমি নিজে যেমনি কষ্ট পাতেছ, তেমনি তোমার জন্য অন্যদের অন্বিষ্ট হতেছে। ধরো এখন যদি কোনো কুপি বা হারিকেন ওয়ালা তোমার হ্যাজাকবাতি ভাঙে দিয়ে যদি কয় যে কুপি বা হারিকেনই জ্বালাতি হবি, তুমি কি মাইনে নিবা? মানুষের উদ্ভাবন ক্ষমতা কুপি বাতিতে থামে নাই, বৈদ্যুতিক বাতিতে পৌঁছে গেছে। মানুষ পুরাতনকে পিছনে ফেলে নতুনের সন্ধ্যানে ক্রমশ সামনে আগাইছে, এখনো আগাতেছে। মানুষ একসময় গুহায় বাস করত, এখনো কি আমরা তাই করব? আমাগের ছেলেবেলার কথাই ধরো, বাবার আর্থিক সামর্থ্য কম ছিল বলে আমরা ছনের ঘরে বাস করতাম, এখন আমরা মেঝে পাকা করা টিনের ঘরে বাস করতেছি, ভবিষ্যতে আমাগের ছেলে-মেয়েরা যদি উন্নতি করবার পারে তাইলে ওরা হয়ত একদিন দালানে বসবাস করবি। ছোটবেলায় আমরা কোনো আত্মীয়বাড়ি যাবার সময় গরুর গাড়িতে যাতাম, এই বাস-ট্রেন-বিমানের যুগে এখনো কি তাই যাব? যাব না। এইটা মহাকালের স্রোতধারা, এই স্রোতধারায় বাঁধ দিতে চাওয়া বোকামী। মানুষের এই এগোয়ে চলার স্রোতে তোমারেও সামিল হতি হবি, নইলে তুমি কেবল কষ্টই পাবা। এমন কোরো না দাদা। নতুনকে মাইনে নাও, বিজ্ঞানের যে নতুন সৃষ্টি মানুষকে সুবিধা দেয় কিংবা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে তা মাইনে নিতি হয়।’

সেইদিনের পর আর একটা বৈদ্যুতিক বাতিও ভাঙেননি তারাপদ, আর কোনোদিন হ্যাজাকবাতিও জ্বালাননি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মেলায় কিংবা বাজারে শুটিং বোর্ড বসানো আরো আগেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখন মাঝে মাঝে হ্যাজাকবাতি তিনটি বের করে ধুলো মুছতেন, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন হ্যাজাকবাতিরগুলির দিকে। তারাপদ মারা গেলে অবিনাশ তার দাদার সম্মানে শ্মশানযাত্রায় হ্যাজাকবাতি ব্যবহার করেছিলেন, অমল নিজে একটা হ্যাজাক বয়ে নিয়ে এনেছিল শ্মশানে, রাতেরবেলা হ্যাজাকবাতির আলোয় এই শ্মশানেই তারাপদকে দাহ করা হয়েছিল।

হ্যাজাকবাতি তিনটি অমলের জ্যাঠাত দাদাদের ঘরে অনেকটা অবহেলায় পড়ে ছিল, বছর কয়েক আগে চেয়ে নিয়ে এখন সেগুলো নিজের কাছে রেখেছে যত্ন করে। ও বিশ্বাস করে হ্যাজাকবাতিগুলোর বাস্তব মূল্য ফুরিয়েছে, কিন্তু এর ঐতিহাসিক মূল্য আছে। অমলের মধ্যে ইতিহাস সংরক্ষণের এই বিশ্বাস ঢুকেছে অয়নের মাধ্যমে, একদিন অমলের চেম্বারে বসে অনেক কথা হচ্ছিল অমল আর অয়নের মধ্যে, অয়ন তখন বলছিল, ‘দ্যাখো অমলদা, এই যে একবিংশ শতাব্দীতে তোমরা ধর্ম পালন করো, এখন আর এর কোনো প্রয়োজন নেই। আদিম মানুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে পারত না, প্রকৃতিকে ভয় পেত, তখনই মানুষের মনের মধ্যে ঈশ্বর-দেবতার সৃষ্টি হয়েছে। সূর্যের তেজ থেকে কিংবা দাবানল থেকে বাঁচার জন্য মানুষ সূর্য পূজা করত, ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য বরুণ দেবতার পূজা করত, তীব্র তুষারপাত হত বলে পৃথিবীর কোথাও কোথাও মানুষ বরফের পূজা করত। এভাবেই মানুষের নানা ধরনের দূর্বলতা থেকে বিভিন্ন দেবতার সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কল্পনা থেকে, আবার কেউ কেউ কখনো কখনো একটু যাদুবিদ্যা দেখিয়ে নিজেকে দেবতা বলে ঘোষণা করেছে। কালে কালে মানুষ এইসব দেবতার নামে বিশাল বিশাল মন্দির বানিয়েছে, এইসব দেবতাকে পূজা করেছে, প্রকৃতির শক্তির কাছে অসহায় মানুষ এইসব দেবতাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার ফলে আমরা জেনে গেছি যে মহাবিশ্ব তার আপন গতিতে চলছে, কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ঈশ্বর নামক কোনো কিছুর হাত নেই, আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিপদও অনেকটাই এখন সামলে উঠতে শিখেছে মানুষ। মানুষের জীবনে এইসব দেবতা বা মন্দিরের কোনো প্রভাব আগেও যেমনি ছিল না, তেমনি এখনো নেই। কিন্তু তাই বলে হাজার বছর আগের কোনো পুরাকীর্তি বা মন্দির কি আমরা ধ্বংস করে ফেলবো? তা নিশ্চয় নয়। এইসব মন্দিরের নৃতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক মূল্য আছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা যা যা বিশ্বাস করত, আমরা এখন হয়ত তার অনেক কিছুই বিশ্বাস করি না, কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতির যে বিবর্তনের ভেতর দিয়ে মানুষকে আজ এখানে আসতে হয়েছে, সেই ইতিহাস জানা এবং সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।’

অয়নের এই কথাগুলো ভাল লাগে অমলের। ঐতিহ্য সংরক্ষণের তাগিদ থেকেই সে জ্যাঠাতুত দাদাদের কাছ থেকে হ্যাজাকবাতিগুলো চেয়ে নিয়ে নিজের কাছে যত্ন করে রেখেছে। এই হ্যাজাকবাতিগুলো তাদের বংশের অনাগত প্রজন্মের কোনো কাজে লাগবে না, কিন্তু তারা জানবে হ্যাজাকবাতি নামে এক প্রকার বাতি ছিল, তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ এই বাতির ব্যবহার জানতেন।



(চলবে……….)

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৪

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: বরাবরের মতোই ভাল লাগা রইলো!

+++

০২ রা মার্চ, ২০২০ রাত ১১:৩০

মিশু মিলন বলেছেন: ধন্যবাদ।

২| ০২ রা মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৩৮

রাজীব নুর বলেছেন: আমি একবার গ্রামে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছি, সেখানে রাতে আমাকে অন্য বাসায় ঘুমাতে হয়েছে।

০২ রা মার্চ, ২০২০ রাত ১১:৩৩

মিশু মিলন বলেছেন: হ্যাঁ, সব গ্রামেই সাধারণত একরম হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.