নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মিশু মিলন

মিশু মিলন

আমি বর্তমানে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগে লিখি। আমার সকল লেখা আমি এই দুটি ব্লগেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। এই দুটি ব্লগের বাইরে অনলাইন পোর্টাল, লিটল ম্যাগাজিন এবং অন্য দু-একটি ব্লগে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কিছু কিছু লেখা আমি আবার সম্পাদনা করেছি। ফলে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগের লেখাই আমার চূড়ান্ত সম্পাদিত লেখা। এমনকি আমার কম্পিউটারের লেখাও চূড়ান্ত সম্পাদিত নয়, কেননা এখন আমি ব্লগেই লেখা সম্পাদনা করি। এই দুটি ব্লগের বাইরে অন্যসব লেখা আমি প্রত্যাহার করছি। মিশু মিলন ঢাকা। ৯ এপ্রিল, ২০১৯।

মিশু মিলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

লৌকিক লোকলীলা (উপন্যাস: পর্ব-বারো)

০৩ রা মার্চ, ২০২০ বিকাল ৩:৩৩

সাত
শ্মশানযাত্রীরা কখন শ্মশানে এসেছে কিংবা কতক্ষণ আগে চিতা জ্বেলেছে তা জানে না ওরা তিনজন, মৃতদেহ পোড়ানো শেষে শ্মশানযাত্রীদের শ্মশান ছেড়ে যাবার অপেক্ষায় থাকে ওরা। মদ আর গাঁজার নেশার ঘোরে ওদের তিনজনের মনের আঙিনায় পায়চারি করে আশালতা! কিন্তু ওরা কেউই একবারের জন্যও আশালতার প্রসঙ্গ তোলে না, অথচ সেই সন্ধ্যা থেকেই আলাদাভাবে বারবার ওদের স্মৃতিতে ফিরে এসেছে আশালতা! একই আশালতা ওদের তিনজনের কাছে তিন ধরনের মানুষ, তিনজনের সঙ্গে আশালতার সম্পর্ক তিন রকমের, অনেক যৌথ স্মৃতির ভিড়েও আশালতার সঙ্গে তিনজনেরই রয়েছে কম-বেশি স্বতন্ত্র স্মৃতি। ফলে আশালতা সম্পর্কে ওদের ভাবনা কিংবা স্মৃতিকাতরতাও ভিন্ন ভিন্ন। ওরা আশালতার প্রসঙ্গ না তুললেও তিনজনই নেশার ঘোরে স্বতন্ত্রভাবে আশালতার স্মৃতির বৃত্তে ঘুরপাক খায়।
বিলাসের মনে হয়- ছাই চাপা আগুনের মত আশালতার চাপা অহংকার ছিল, স্বচ্ছল পরিবারের সুশ্রী কন্যা হওয়াই ওর এই অহংকারের মূল কারণ, ওর অহংকার সহজে সবার চোখে ধরা পড়ত না সুন্দর ব্যবহারের কারণে, কিন্তু অনেকের কাছে প্রকাশ না পেলেও সে ঠিকই আবিষ্কার করতে পেরেছে আশালতার হৃদয়ের এই খুঁত!
অমলের মনে হয়- আশালতার নিরহংকার আর উদারতা ওর হৃদয়ের মহামূল্যবান অলংকার! যারা ওর সঙ্গে গভীরভাবে না মিশেছে বা যারা হৃদয়ের অতলে ডুব দিয়ে কিছু দেখতে জানে না, তারা আশালতার এই মহামূল্য অলংকার দেখতে পায়নি কোনোদিন। আশালতা জীবনকে উপভোগ করতে জানত, নিজে আনন্দে থাকত, আবার অন্যদেরকেও আনন্দে রাখত; এ এক আশ্চর্য গুণ ছিল ওর! একই বয়সের হলেও আশালতা ছিল ওদের সকলের চেয়ে উৎফুল্ল, আবার সকলের চেয়ে তীক্ষ্ন বুদ্ধি সম্পন্ন এবং পরিণত। ওর ইগোর সমস্যা ছিল না, কিন্তু অনার্স শেষ করার পর থেকে, হতে পারে পরিবার এবং পারিপার্শ্বিক চাপে কিছুটা অভিমানী হয়ে উঠেছিল।
পরিমলের কাছে আশালতার হৃদয় এক রহস্যময় প্রাসাদ; একের পর এক দরজা, সে-সব দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকাও যায়, কিন্তু দরজা যেন শেষ হয় না, প্রাসাদের শেষ প্রান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না! আশালতাকে কাছে পেয়েও যেন না পাওয়ার যন্ত্রণায় ছটফট করতে হয়, আশালতা পাশে বসে থাকলেও মনে হয়, তার চেয়ে ওই দূর আকাশের নক্ষত্র অনেক আপন!
ওদের তিনজনের থেকে কিছুটা দূরে একটা ব্যাঙ ককিয়ে ওঠে, নিশ্চয় সাপের মুখে পড়েছে, পরিমল বেতের ছড়ি দিয়ে মাটিতে শব্দ করে, ব্যাঙের ককানো থেমে যায়, কিছুক্ষণ পর পুনরায় ব্যাঙের ককানো শোনা যায় আরো কিছুটা দূর থেকে, অর্থাৎ ছড়ির শব্দ পেয়ে সাপটি ব্যাঙ মুখে নিয়ে দূরে সরে গেছে।
হঠাৎ আউলা বাতাসে গাঁজার গন্ধ ম্লান করে মৃতদেহ পোড়া কটু গন্ধ ভেসে আসে ওদের ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে। বিলাসের বিশ্রি লাগে, ও ক্ষণিকের জন্য শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে, তারপর প্রশ্বাস ছেড়ে পুনরায় শ্বাস নেবার সময় ওর ঘ্রাণেন্দ্রিয় আবারও মৃতদেহ পোড়া কটু গন্ধই পায়। মৃতদেহ পোড়া গন্ধ বিলাসের ভাল লাগে না, পারতপক্ষে ও মৃতদেহ পোড়াতে শ্মশানে যায় না। গ্রামের কোনো মানুষ কিংবা কোনো স্বজন মারা গেলে শ্মশানযাত্রী হয় ওর ছোটভাই পলাশ। ও যে এতক্ষণ আশালতার স্মৃতির নির্জন পথে বেভুলো পথিকের মত হাঁটছিল, সে পথ থেকে ওকে ছিটকে দেয় মৃতদেহ পোড়া কটু গন্ধের ঝাপটা। ও মনে করার চেষ্টা করে যে, শেষ কবে শ্মশানযাত্রী হয়েছিল, ওর মনের আকাশে উঁকি দেয় রবির মুখ, বছর তিনেক আগে ওদের গ্রামের রবি মারা গেলে শ্মশানযাত্রী হয়েছিল। মৃত রবির সেই নিথর নীলাভ মুখ ওর কাছে এখন কেমন ঝাপসা মনে হয়, মনে হয় ওই মুখ রবির নয়, অচেনা কারো। কিন্তু জীবন্ত রবির স্মৃতি এখনো সজীব। রবিকে নিয়ে অনেক স্মৃতির ভিড়ে কৈশোরের একটি দিনের কথা ওর বারবার মনে পড়ে।
ওরা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে, তখনও ওরা আদ্যনাথ বালার কাছ থেকে ব্রত গ্রহণ করে শিব পূজার বড় দলের সন্ন্যাসী হয়নি। ওদের গ্রামে ব্রত গ্রহণ করা বড় সন্ন্যাসীদের একটি শিবপূজার দল যেমনি আছে, তেমনি আছে ব্রত গ্রহণ না করা ছোটদের একটি শিবপূজার দল। এই ক্ষুদে সন্ন্যাসীদের পূজার আচারানুষ্ঠান বড়দের মত কঠিন নয়, অনেকটাই শিথিল; বড়দের মত উপবাস থাকতে হত না ওদের, তিনবেলা নিরামিষ ভাত খেত, ফল-জল খেত।
ওই ছোট দলে পূজা করার সময় ভগবতী পূজার দিন অমল শিব আর বিলাস পার্বতী সেজে বেরিয়েছিল মাঙন মাঙতে। অমলের সারা গায়ে খড়িমাটির প্রলেপ, উদোম গা, নগ্ন পা, পরনে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত লালচি, মাথায় নকল চুলের লম্বা লম্বা জটা, গলায় এবং বাহুতে রুদ্রাক্ষের মালা, এক হাতে ত্রিশূল আর আরেক হাতে ডমরু। বিলাসের মুখে আর হাতে গোলাপী আভাময় রঙের প্রলেপ, পরনে লাল শাড়ি, গায়ে লাল ব্লাউজ আর ব্লাউজের ভেতরে নকল স্তন, ঘোমটা দেওয়া মাথার লম্বা কালো পরচুলার কয়েক গোছা বুকের দু-পাশে রাখা, সিঁথিতে সিঁদূর, কপালে সিঁদূরের ফোঁটা, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, চোখে-ভ্রুতে কাজল, পায়ে এবং হাতের তালুতে আলতা। হাতে ধরা ছোট্ট একটি পরাত, পরাতের ওপর একটা সিঁদুরের কৌটা, ধান-দূর্বা, ফুল আর টাকা। নগ্ন পায়ে ওরা গ্রামে গ্রামে আর বাজারে ঘুরে ঘুরে মাঙন মাঙত, লোকে টাকা দিত, চাল-ডাল-তেল দিত। চাল-ডাল-তেল বহন করার জন্য ওদের সঙ্গে আরো দুই-তিনজন থাকত।
সেদিন ওরা ঠিক করেছিল আগে বাজারে যাবে, বাজারের দোকানগুলো থেকে বেশ টাকা পাওয়া যায়, দুই-পাঁচ টাকা করে দিলেও অনেক টাকা হয়, বাজার ঘুরে তারপর অন্যান্য গ্রামে ঢুকবে। তখন সবে চন্দনা নদীর ওপর ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে, খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে ঢাল বেয়ে বাজারের ইট বিছানো রাস্তায় উঠতে হত। শিব-পার্বতীরূপী অমল-বিলাস আর ওদের দলের আরো কয়েকজন নৌকা থেকে নেমে নদীর ঢাল বেয়ে উঠার সময় রবির সঙ্গে দেখা, বাজার থেকে ফিরছিল রবি। রবি ওদের সমবয়সী, ক্লাস ফাইভেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিল। রবির স্বভাব অনেকটাই মেয়েলি ধরনের; কোমর দুলিয়ে হাঁটত, হাত নেড়ে চিকন সুরে টেনে টেনে কথা বলত। বাড়িতে মায়ের রান্না-বান্নার কাজে সাহায্য করা, থালা-বাসন ধোয়া, ঘর ঝাঁট দেওয়া, উঠোন লেপা, ঘাটে বসে কাপড় কাচা, ধান উড়ানোসহ যে-সব কাজকে সমাজের মানুষ সাধারণত মেয়েদের কাজ বলে গণ্য করে সেইসব কাজে যত আগ্রহ ছিল রবির। ওকে কোনোদিন মাঠে ধান-পাট কাটতে দেখা যায়নি বা মাঠ থেকে ধান বা গমের বোঝা বয়ে বাড়িতে আনতেও দেখা যায়নি। সেদিন রবি এক নজর দেখেই অমলকে চিনতে পারলেও শুরুতে বিলাসকে চিনতে না পেরে প্রায় সুর করে বলে, ‘এ কিডা লো তোর বউ সাজিছে অমল?’
রবির কথা বলার ধরন এমনই ছিল। কী লো, কিডা লো, অ্যা লো, মা লো, ও লো, কনে যাস লো, খাইছিস লো ইত্যাদি ধরনের ভাষা সে ব্যবহার করত। রবি কাছে এসে বিলাসের মুখোমুখি দাঁড়ায়, ভাল মত দেখে চিনতে পেরে মুখে হাত চাপা দিয়ে হি হি করে হেসে বলে, ‘ও লো লো মা লো মা, এ দেহি আমাগের বিলু, হি হি হি…!’
তারপর ফুলে থাকা বিলাসের নকল স্তনে আচমকা পাঁচ আঙুলের চাপ দিয়ে বলে, ‘এত বড় দুধ বানাইছিস কী দিয়ে লো বিলু!’
বলেই হি হি করে হাসতে হাসতে শরীর বাঁকিয়ে যেন ধুলোয় লুটিয়ে পড়তে চায় রবি! আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পিছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠের হাসির শব্দ কানে আসে বিলাসের, ঘাড় ফিরিয়ে দ্যাখে আশালতা, আরেকটি নৌকা থেকে নামার পর রবির কাণ্ড দেখে সে তখন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে ওদেরই আরেক সহপাঠী বাসন্তীর গায়ে! বিলাস লজ্জা পায়, কিন্তু আড়চোখে তাকিয়ে থাকে আশালতার দিকে, অমলও তাকিয়ে থাকে।
আশালতা আর বাসন্তীর হাসি রবিকে হয়ত আরো উৎসাহিত করে, রবি ওদের উদ্দেশে বলে, ‘ও লো আশা, দ্যাখ দ্যাখ তুরা, বিলুর এত্ত বড়...!’
দুই হাত দিয়ে স্তনের সঠিক আকৃতির চেয়েও অধিক বড় পরিমাপ বুঝিয়ে আবার হাসতে থাকে রবি।
রবির স্বভাব অমনই ছিল, ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সাথে তার সখ্যতা বেশি ছিল। পাড়ার যুবতী মেয়ে কিংবা পাড়াত সম্পর্কে বৌদি অথবা দিদিমারা ছিল তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, তাদের সঙ্গে যে-কোনো বিষয় নিয়ে সে অবলীলায় আলাপ করতে পারত, এমনকি নারীর মাসিক কিংবা শরীর বিষয়েও। পাড়ার নারীকুল রবিকে নিজেদের একজনই মনে করত, রবির সামনে মন খুলে কথা বলায় তাদের কোনো লজ্জা বা লুকোছাপা ছিল না।
তারপর শিব পূজার পর্ব শেষ হলে বিলাস যেদিন প্রথম স্কুলে যায়, সেদিন আশালতাসহ অন্যান্য মেয়েরা তাকে নিয়ে সে-কী হাসাহাসি! মেয়েরা হাসতে হাসতে বলে, ‘এই বিলু, তোর ইজ্জত নাকি নষ্ট করছে হাফ-লেডিস রবি!’
এই নিয়ে বেশ কিছুদিন স্কুলের সহপাঠীরা বিলাসের পিছনে লেগে ছিল। তারপর এসএসসি পরীক্ষার পর ব্রত গ্রহণ করে বড় দলের সন্ন্যাসী হয়েও অমল আর বিলাস শিব-পার্বতী সাজত, হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় মাঝে কয়েক বছর শিবপূজায় ছেদ পড়েছিল অমলের, তারপর গ্রামে ফিরে আবার পূজা শুরু করলে ওরা পুনরায় শিব-পার্বতী সাজতে শুরু করে।
শুধু ভগবতী পূজার দিনই নয়, শিবপূজা শুরুর দ্বিতীয় দিন থেকেই ওদের একটা দল কাঠের কালো শিবঠাকুর বা দেইল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মাঙন মাঙে, এই দলে থাকে পরিমল। আর আরেকটা দল শিব, দূর্গা, অসুর, কার্তিক, গণেশ, বাঘ ইত্যাদি সেজে মাঙন মাঙতে বের হয়। অমল শিব সাজে আর বিলাস দূর্গা; অন্যান্যরা সাজে কার্তিক, গণেশ, অসুর, বাঘ ইত্যাদি; বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঢাক আর ঝাঁজের তালে তালে নাচতে নাচতে দেবী দূর্গার নেতৃত্বে সম্মিলিতভাবে অসুরকে আক্রমণ করে, এক পর্যায়ে দেবী দূর্গার হাতে অসুর বধ হয়। গৃহস্থবাড়ির নারীরা উলুধ্বনি দেয়, ধান-দূর্বা দিয়ে প্রণাম করে। তারপর চাল-ডাল-তেল, টাকা, গাছের ডাব যে গৃহস্থ যেমন পারে দান করে।
মাথা চালানের পরদিন খুব সকালে পুকুরঘাটে বানেশ্বরী পূজা করে সন্ন্যাসীরা, বানেশ্বরী পূজার আগে সকল সন্ন্যাসী পুকুরে স্নান করে, কাঠের শিবঠাকুর বা দেইলকেও স্নান করায়। এই স্নানের আগে পুকুরঘাটে একটা আনুষ্ঠানিকতা থাকে, আপাদমস্তক সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা একজন সন্ন্যাসী মৃত মানুষের ভুমিকায় ঘাটের সিঁড়িতে শুয়ে থাকে এবং আরেকজন শাড়ি পরে মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে ওই মৃত মানুষের সদ্য বিধবা স্ত্রীর বেশে পাশে বসে কাঁদে আর আহাজারি করে। এই কান্না দেখতে এদিন পুকুরঘাটে মানুষের ঢল নামে, পুকুরের চারপাশে মানুষের ভিড় জমে যায়, পথ চলতি ভ্যান কিংবা সাইকেলে যাত্রারত মানুষও দাঁড়িয়ে যায় কান্না শুনে। সদ্য বিধবার বেশধারীর কান্না জড়ানো সুরেলা বিলাপের ভাষা মোটামুটি এরকম- ‘ওরে আমার সাধের সোয়ামী রে...আমারে থুয়ে তুমি কনে চলে গিলে রে...কিডা দিবি আমার পান-সুপারি, কিডা দিবি পরনের শাড়ি, ও লো আমার সাধের সোয়ামী রে...; আমার মাথার সিঁদূর মুছে দিবি রে…হাতের শাখা ভাঙে ফেলবি রে…পরানের ভাতার তুমি ক্যান মরে গিলে রে….আমি কার গলা জড়ায়ে ধরে শুয়ে থাকপো রে…; ওরে আমার মা রে...বাবা...তুমাগের জামাই মরে গেছে রে..., জামাই ষষ্টিতি তুমরা কারে নেমতন্ন করবা রে..., কিডা তুমাগের পিন্নাম করে কাপড় দিবি রে..., আর কোনোদিন আদরের জামাই’র মুখ দ্যাকপা না রে বাবা…, ওরে আমার সাধের ভাতার রে…; ওলো বৌদি তুমার ঠাহুরজামাই আর নাই লো..., তুমারে ধলা বৌদি ক’য়ে ডাহার মত আর কেউ থাকল না লো..., কারে তুমি ভাল-মন্দ রান্ধে খাওয়াবা, কার পাতে দিবা মাছের বড় মাথাডা, ও লো বৌদি লো… আমার ভাতার নাই লো...; ওরে কার নাগি আমি পথের দিক চায়ে থাকপো রে…, আমার স্নো-পাউডার কিডা কিনে দিবি রে…, ওরে রাত্তিরবেলা গলা জড়ায়ে ধরে কিডা আমারে সুহাগ করবি রে...পরানের ভাতার রে বাবা…, আমার পাঁচ মাসের প্যাটের সন্তান কারে বাপ কয়ে ডাকপি রে…, শাউড়ি ক’বি ভাতারখাকি মাগী, মানষি ক’বি কলঙ্কিনী, ওরে আমার সাধের ভাতার রে বাবা…; ও ভাতার, ভাতাররে… তুমি আমারে ছাড়ে কনে গিলে রে...!’
সদ্য বিধবার বেশধারীর এই কান্না জড়ানো বিলাপ শুনে নেহাত দুধের শিশু ব্যতিত কোনো মানুষের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে না, কেউ আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ে না, কারো চোখ ছলছল করে না বা কারো চোখের জল ঝরে পড়ে না! বিলাপের ভাষা শুনে এবং তা প্রকাশের ধরন দেখে সবাই নির্মল আনন্দ পায়, হাসে, কেউ কেউ হাসতে হাসতে একে-অন্যের গায়ে ঢলে পড়ে! মানুষকে বিনোদন দিতেই বিধবার বেশধারী কান্না এবং বিলাপ দীর্ঘায়িত করে, একই কথা বারবার বলে। গলার স্বর কখনো উদারায় নেমে আসে, আবার কখনো এমনভাবে তারায় চড়ায় যে সহজে আর নামতেই চায় না। কান্না জড়ানো বিলাপের সঙ্গে একটু পর পর দুই হাত দিয়ে বুক চাপড়ায়, কপাল চাপড়ায়, সাধের সোয়ামীর বুকের ওপর আছড়ে পড়ে, হাত আর মাথা ঠোকে!
অনেকক্ষণ ধরে এই কান্না পর্ব চলে। তারপর শরীর-মাথা চাদরে ঢেকে একজন আগন্তুক এসে ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়ায় আর সদ্য বিধবাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুমি কাঁদতেছো ক্যান?’
সদ্য বিধবা বলে, ‘আমার সোয়ামী মরে গেছে গো বাবা।’
‘তোমার সোয়ামী মরে গেছে তাহলে তুমি তাকে শ্মশানে নিয়ে না গিয়ে ঘাটে বসে কাঁদতেছো ক্যান?’
‘আমি শুনছি, এই ঘাটে মহাদেব ছিনান করবার আসে। তাই আমি আমার সোয়ামীর দেহ নিয়ে ঘাটে বসে আছি।’
‘ভুল শুনছো তুমি, মহাদেব থাকেন কৈলাসে, তিনি এই ঘাটে কী করবার আসপেন! তুমি মানুষজন ডাহে নিয়ে তোমার সোয়ামীর লাশ নিয়ে শ্মশানে যাও, দাহ করো।’
‘না, যতক্ষণ মহাদেব না আসপি, ততক্ষণ আমি এই ঘাটের তে সরব না।’
‘আচ্ছা বিপদ তো, আমরা ঘাটে ছিনান করব আর তুমি ঘাট জুড়ে বসে আছো! যাও, ঘাট ছাড়ো।’
‘না, আগে মহাদেব আসপি, আমার মরা সোয়াসীরে তাজা করবি, তারপর আমি ঘাট ছাড়ব।’
‘কেউ তোমারে মিথ্যে কতা কইছে। মরা মানুষ আবার তাজা করা যায় নাকি?’
‘বাবা ভোলানাথ সব পারে গো বাবা।’
এমনিভাবে আগন্তুকের সঙ্গে তর্ক করতে থাকে সদ্য বিধবা। তারপর আগন্তুক তার গা-মাথা থেকে চাদর খুলে ফেললে দেখা যায় তার মহাদেবের বেশ, হাতে তার শঙ্খ। মহাদেব বলে, ‘আমি তোমার পতিনিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হইছি। তোমার সোয়ামীরে আমি এহনই তাজা করে দিতেছি।’
এরপর মহাদেব ঘাটের নিচের ধাপে এসে শঙ্খের মধ্যে জল ভরে সেই জল মৃতের ভুমিকায় থাকা মানুষটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢালে তিনবার আর মুখে বলে, ‘ঘাটের মরা ঘাটে যাবি, মরারে তুই তাজা হবি।’
সঙ্গে সঙ্গে মৃতের বেশে শুয়ে থাকা মানুষটি তাজা হয়ে পুকুরে নেমে সাঁতার কাটতে থাকে। এরপর সদ্য বিধবা, বেশধারী মহাদেব এবং অন্যান্য সকল সন্ন্যাসী পুকুরের জলে ঝাপিয়ে পড়ে।
গত পাঁচ বছর ধরে মহাদেবের ভূমিকায় অমল আর সদ্য বিধবার ভূমিকায় বিলাস অভিনয় করে। এই যে বিলাস সদ্য বিধবার ভুমিকায় এমনিভাবে কাঁদে আর বিলাপ করে, এটা সে শিখেছে রবির কাছ থেকে। বিলাসের আশ্চর্য এক গুণ, সে সহজেই মানুষকে অনুকরণ করতে পারে। রবির ঠাকুমা মারা গেলে রবি ওর দুই পিসির সঙ্গে সমানতালে কেঁদেছিল আর বিলাপ করেছিল। রবির সেই কান্না জড়ানো বিলাপ অনুকরণ করে বিলাস, আর সেই অনুকরণের সঙ্গে নিজের ইচ্ছে মত ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে আরো অতিরঞ্জিত করে বানেশ্বরী পূজার দিনে তা পরিবেশন করে।
বেচারা রবি, বিয়ে করতে চায়নি, কিন্তু ওর বাড়ির মানুষ জোর করে ওকে বিয়ে দিয়েছিল, বিয়ের মাস দুয়েক পর বউ ওকে ছেড়ে চলে যায়। বউ চলে যাওয়ায় নানাজনে নানা কথা বলত ওকে। কেউ কেউ ঠাট্টার ছলে বলত-‘রবি তো এট্টা মাগি, মাগির কাছে বউ থাহে নাকি!’ কেউ বলত- ‘রবি পারে না, তাই বউ চলে গেছে!’ তারপর থেকেই হাসি-খুশি রবি কেমন যেন হয়ে যায়, মন মরা হয়ে থাকত। এরপর একদিন বিষ পান করে আত্মহত্যা করে, হয়ত হতাশায়, হয়ত গোপন কোনো কষ্টে।

রবি মরে গেছে, কিন্তু বছরে একটি দিন, ওই বানেশ্বরী পূজার দিন সকালে রবি যেন ফিরে আসে বিলাসের মধ্যে, রবির অনুকরণে বিলাস কাঁদে আর বিলাপ করে। হয়ত কোনো কোনো মানুষের ভেতরে রবির স্মৃতি চাগাড় দিয়ে ওঠে; বিলাসের কান্না জড়ানো বিলাপ শুনে মানুষ হাসে, আনন্দ পায়, তবু ওই হাসি-আনন্দের ভেতরেই হয়ত কারো কারো বুকের কন্দরে রবির জন্য একটু ব্যথা চিন চিন করে ওঠে!


(চলবে.....)

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০৩ রা মার্চ, ২০২০ বিকাল ৩:৫৬

রাজীব নুর বলেছেন: আশালতা ভালো থাকুক।
পড়ে ভালো লাগলো।

আমি প্রথম থেকেই আপনার এই ধারাবাহিকের সাথে আছি। শেষ পর্যন্ত থাকবো।

০৩ রা মার্চ, ২০২০ রাত ১১:০১

মিশু মিলন বলেছেন: সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

২| ০৩ রা মার্চ, ২০২০ বিকাল ৩:৫৭

নেওয়াজ আলি বলেছেন: চমৎকার উপস্থাপন , পাঠে মুগ্ধতা রেখে গেলাম।

০৩ রা মার্চ, ২০২০ রাত ১১:০২

মিশু মিলন বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ।

৩| ০৪ ঠা মার্চ, ২০২০ রাত ৯:০০

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: সনাতনী যাপিত জীবনের খুঁটিনাটি দারুন মুন্সিয়ানায় তুলে ধরছেন উপন্যাসের পর্বে পর্বে...

তবে বেশ কিছূ নতুন নতুন ঠেকে আমার কাছে। আমাদের প্রতিবেশি সনাতনীদের মাঝে এসবের প্রচলন খূব একটা ছিল না।
শুধু দূর্গাপূজা আর লক্ষী পূজায় বেশ আড়ম্বর হতো। আর স্বরস্বতি পূজারতো কথাই নেই! স্কুল ছুটি থাকতো আর স্কুল মাঠে সারাদিন পূজার অনুষ্ঠান চলতো...

+++

০৪ ঠা মার্চ, ২০২০ রাত ৯:৫২

মিশু মিলন বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই। একই পূজার কিছু কিছু রীতি-পদ্ধতি অঞ্চলভেদে ভিন্নতর হয়ে থাকে। চৈত্র মাসে শিবপূজার এই রীতি প্রচলিত আছে আমাদের রাজবাড়ী-ফরিদপুর অঞ্চলে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.