নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মিশু মিলন

মিশু মিলন

আমি বর্তমানে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগে লিখি। আমার সকল লেখা আমি এই দুটি ব্লগেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। এই দুটি ব্লগের বাইরে অনলাইন পোর্টাল, লিটল ম্যাগাজিন এবং অন্য দু-একটি ব্লগে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কিছু কিছু লেখা আমি আবার সম্পাদনা করেছি। ফলে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগের লেখাই আমার চূড়ান্ত সম্পাদিত লেখা। এই দুটি ব্লগের বাইরে অন্যসব লেখা আমি প্রত্যাহার করছি। মিশু মিলন ঢাকা। ৯ এপ্রিল, ২০১৯।

মিশু মিলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

লৌকিক লোকলীলা (উপন্যাস: পর্ব-চৌদ্দ)

০৫ ই মার্চ, ২০২০ বিকাল ৩:৫৭

এগারো

জামালপুর শ্মশানের বয়স কত, কে বা কারা কবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই ইতিহাস আজ আর এই অঞ্চলের কেউই যথাযথভাবে বলতে পারবে না; বহুকাল আগে থেকেই এই অঞ্চলের, অর্থাৎ আশপাশের অনেকগুলো গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে মৃতদেহ সৎকার করে আসছে। তবে এটুকু অনুমান করা যায় যে শ্মশানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল চন্দনা নদীর কূলে আর মৃতদেহ সৎকারের কাজে ব্যবহার করা হতো নদীর জল। কালে কালে চন্দনা এখান থেকে কিছুটা পশ্চিমে সরে গেছে আর চন্দনার পূর্ব দিকের শুকিয়ে যাওয়া চর রূপান্তরিত হয়েছে ফসলি জমিতে, চন্দনার পূর্ব পারে রাস্তা নির্মাণ করে জামালপুর বাজারের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে দূরের গ্রামগুলোর, রাস্তা অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে কয়েক ঘর নতুন বসতি। চন্দনা এখন রুগ্ন-মুমূর্ষু মৃতপ্রায় এক নদী; কিন্তু অতীতে চন্দনা এমন ছিল না, যৌবন-জৌলুস সবই ছিল তার। অতীতে খরস্রোতা চন্দনা নদীকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠে জনপদ, হাট-বাজার, শ্মশান। মৃতপ্রায় চন্দনার বুকের ওপর দিয়ে নৌকাযোগে গেলে এখনো কয়েক কিলোমিটার পর পর বাজার আর শ্মশান চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও শ্মশান এখনো চন্দনার পাড়েই আছে, আবার কোথাও কোথাও জামালপুর শ্মশানের মতোই আরো অনেক শ্মশানকে অনাথ করে কিছুটা দূরে সরে গেছে চন্দনা।

জামালপুর শ্মশানে কোনো বেতনভুক্ত ডোম নেই, নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে ছিল না কোনোকালেই। সাধারণত শ্মশানযাত্রীদের মধ্য থেকেই চার-পাঁচজন সাহসী মানুষ হাত-বদল করে মড়া পোড়ায়, এরা কেউই ডোম সম্প্রদায়ের নয়, মৃতের সম্প্রদায়ের মানুষ; পেশায় অধিকাংশই কৃষক, জেলে, কাঠমিস্ত্রি কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায়ী। এরা নিজেরাই মৃতদেহ স্নান করায়, কাঠ দিয়ে চিতা সাজিয়ে মৃতদেহ চিতায় তুলে আগুন দেয়, লম্বা বাঁশ হাতে নিয়ে চিতার জ্বলন্ত কাঠ খোঁচায়, আগুনের প্রভাবে মৃতদেহের রগে টান লেগে কখনো হাত-পা আগুনের বাইরে বেরিয়ে এলে কিংবা আধপোড়া মৃতদেহ বাঁকা হয়ে বসতে গেলে, এই ছদ্ম ডোমেরাই হাতের বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে অথবা আঘাত করে আধপোড়া হাত-পা চিতার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় বা কুঁজো হতে থাকা দেহ পুনরায় সোজা করে দেয়। আট-দশজনের একটি গায়েন দল অশ্বথ গাছের তলায় যে নতুন পাকা করা ছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে, তার নিচে বসে গান গায়, আর বাকিরা গালগল্প করে অথবা মৃতের স্মৃতিচারণায় মগ্ন থাকে। একটি মৃতদেহ পোড়াতে সাধারণত চার-পাঁচ ঘণ্টা লাগে। শরীরে চর্বি বেশি থাকলে সেই মৃতদেহটি তাড়াতাড়ি পোড়ে আর চর্বি কম থাকলে সময় একটু বেশি লাগে। মৃতদেহ পোড়ানোর পর মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী শ্মশানযাত্রীদের হাতে হাতে চিড়ে এবং সন্দেশ, রসগোল্লা কিংবা বাতাসা বিতরণ করা হয়; তারপর শ্মশানযাত্রীরা শ্মশান ছেড়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। এখনো এই চিরায়ত প্রথাতেই মৃতদেহ সৎকার করা হয় জামালপুর শ্মশানে।

আজ রাতে শ্মশান অন্ধকার, অমলরা তিনজন ছাড়া আর কোনো মানুষ নেই, কোদাল দিয়ে মাটি খোঁড়ার শব্দ আর ঝিঁঝির ডাক ব্যতিত প্রায় সুনসান। কিন্তু আগামীকাল চৈত্র সংক্রান্তির রাতে শ্মশান থাকবে উৎসবমুখর, বিভিন্ন গ্রাম থেকে শিবপূজার সন্ন্যাসীদের দলগুলো শ্মশানপূজা দিতে আসবে আর তা দেখতে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে আসবে হাজার হাজার দর্শনার্থী। সন্ন্যাসীরা কাল দিনের বেলা এসে শ্মশানের ঘাস-লতাপাতা পরিষ্কার করে বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট কলাগাছ পুঁতে রেখে যাবে আর গভীর রাতে এসে সেই কলাগাছের গোড়ায় দেবে শ্মশানপূজা। শ্মশান কমিটির ভাড়া করা ডেকোরেটরের লোকেরা শ্মশানে ঢোকার রাস্তা এবং শ্মশানের বিভিন্ন জায়গায় পোঁতা খুঁটির মাথায় পাঁচশো-হাজার পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতি লাগাবে, গাছে গাছেও জ্বলবে অসংখ্য বাতি।

দূর্গাপূজার পরেই জামালপুর শ্মশানের শ্মশানপূজা এই অঞ্চলের হিন্দুদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসবে রূপ নিয়েছে; তবে শুধু হিন্দুরা নয়, অসংখ্য মুসলমানও এই উৎসব উপভোগ করতে গভীররাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে।

চল্লিশ-পঞ্চাশটি শিবপূজার দল শ্মশানপূজা দিতে আসে এখন, আগে এই সংখ্যা ছিল শতাধিক, জীবনের ব্যস্ততায়-বাস্তবতায় পূজার সংখ্যা কমে গেছে। কেবল জামালপুর বাজারের আশপাশের গ্রামগুলো থেকেই নয়, বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকেও সন্ন্যাসীরা পূজা দিতে আসে ট্রাক কিংবা নসিমন ভাড়া করে। যে-সব গ্রাম থেকে সন্ন্যাসীরা আসে, সেইসব গ্রামে কিংবা গ্রাম থেকে এক-দুই কিলোমিটারের মধ্যে শ্মশান আছে যেখানে তারা মৃতদেহ দাহ করে, তবু তারা সেখানে শ্মশান পূজা না দিয়ে জামালপুর শ্মশানে পূজা দিতে আসে মুলত এখানে শ্মশানপূজার উৎসবমুখর সংস্কৃতি গড়ে উঠায়। এইসব গ্রাম থেকে শুধু যে সন্ন্যাসীরাই পূজা দিতে আসে তা নয়, সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আসে গ্রামের অনেক সাধারণ নারী-পুরুষও, বিচিত্র সজ্জায় সজ্জিত হয়ে ঢাক-ঢোলসহ নানা প্রকার বাদ্য বাজিয়ে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তারাও নৃত্যনৈপূণ্য প্রদর্শন করে। দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়- কারা কত নান্দনিক ভোগের ঝুড়ি বানাতে পারে, কারা কত বৈচিত্র্যপূর্ণ সাজসজ্জা করতে পারে এবং কারা কত ভালো নৃত্যনৈপূণ্য দেখাতে পারে; এসবের ভিত্তিতেই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করে শ্মশান কমিটির পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রদান করা হয়, এছাড়া প্রত্যেক দলকেই নূন্যতম একটা সম্মানী প্রদান করা হয়।

বালিয়াকান্দী-মধুখালী সড়ক থেকে একটি সরু রাস্তা সোজা পশ্চিমদিকে বাজারের ভেতরে ঢুকে কালীমন্দিরের পিছন দিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর ডানে বেঁকে উত্তরে শ্মশানের দিকে চলে গেছে, শ্মশানের পাশ ঘেঁষে রাস্তাটি পুনরায় মিলিত হয়েছে অল্প দূরের বালিয়াকান্দী-মধুখালী সড়কের সঙ্গে; রাত বারোটার পর থেকেই এই রাস্তার দুইপাশে অবস্থান নিয়ে দর্শনার্থীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে সন্ন্যাসীদের জন্য। দলগুলো আগে থেকেই বালিয়াকান্দী-মধুখালী সড়ক এবং রেললাইনের ওপাশের রাস্তায় প্রস্তুত থাকে, রাত দেড়টার পর দলগুলো সরু রাস্তায় প্রবেশ করে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বিপুল উদ্দামে-উচ্ছ্বাসে-উল্লাসে নৃত্যনৈপূণ্য প্রদর্শন করতে করতে এগিয়ে যায় শ্মশানের দিকে। প্রত্যেক দলের মাঝখানে নান্দনিক ভোগের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে নাচে একজন, খুব যত্ন সহকারে শৈল্পিকভাবে ভোগের ঝুড়িটি বানানোর চেষ্টা করে দলগুলি, ভেতরে থাকে শ্মশান পূজার জিনিসপত্র। কোনো কোনো দল ভোগের ঝুড়ি মঠের মতো বানায়, তাতে শিব-পার্বতীসহ নানা দেব-দেবীর ছবি টাঙিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়। কোনো কোনো দল ছোট-বড় নানা আকৃতির সোলার কিংবা মাটির মূর্তি বানিয়ে বর্ণিল ভোগের ঝুড়ি বানায়। মাথায় করে নাচতে হয় বিধায় ভোগের ঝুড়ির ওজন সাধারণত বিশ-ত্রিশ কেজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়। ভোগের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে যে নাচে তাকে কেন্দ্র করেই নৃত্যরত লম্বা মিছিলটি সামনে এগোয়। সন্ন্যাসীরা পরিধান করে সাদা, লাল, গেরুয়া, হলুদ ইত্যাদি বর্ণের ধুতি-গেঞ্জি; কারো কারো হাতে এবং গলায় থাকে রুদ্রাক্ষের মালা। উদোম গায়েও থাকে অনেকে, বিশেষত যে-সন্ন্যাসী চালানে মড়ার মাথার খুলি নেয়, সে রঙমাখা উদোম গায়েই কুলার উপর রাখা খুলি মাথায় নিয়ে উদ্দাম নাচে। আর যারা সন্ন্যাসী নয়, সাধারণ গ্রামবাসী, কেবল শ্মশানপূজার রাতে সখ করে নিজেদের দলের সঙ্গে নাচতে আসে, তাদের পরনে যেমনি থাকে ধুতি-গেঞ্জি, তেমনি অনেকেরই পরনে থাকে সাধারণ শার্ট-প্যান্ট, নারীরা পরে আসে শাড়ি কিংবা সালোয়ার কামিজ। পুরুষদের অনেকেই মদ আর গাঁজার নেশার ঘোরে থাকে; অনেকে রামদা কিংবা খড়গ হাতে একনাগাড়ে নেচে যায় যতক্ষণ না তাদের ভোগের ঝুড়িটি শ্মশানের মাটিতে নামিয়ে রাখা হয়, কয়েকজন প্রজ্জ্বলিত ধূপতি হাতে নেচে যায় ভোগের ঝুড়ির আগে আগে, কেউ কেউ ঢাক কিংবা কাঁসর বাজায় অনবরত, কেউ কেউ বাজায় শঙ্খ কিংবা বাঁশি, কেউ সাধু সেজে কিংবা কালো বা লাল পোশাকধারী সত্যিকার কোনো জটাধারী সাধু সিঙ্গা বাজায়, কোনো কোনো দলের সঙ্গে থাকে ব্যান্ডপার্টি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হয়েছে আফ্রিকান বাঁশি- ভুভুজেলা। খুব ছোট দলেও কমপক্ষে আট-দশজন ঢাকি থাকে, আবার কোনো কোনো দলে থাকে বিশ-ত্রিশজন, কয়েকটি দলে কেবল নারীরাই ঢাক বাজায়। সবগুলো দল মিলিয়ে কমপক্ষে হাজার খানেক ঢাকের বাদ্যে আর শত শত কাঁসর-করতাল-বাঁশি-শঙ্খধ্বনি এবং শিবের নামে সন্ন্যাসীদের জয়ধ্বনিতে বিদীর্ণ হয় রাত্রি। বৈদ্যুতিক আলোর বিচ্ছুরণ আর ধুনুচির ধোঁয়ায় ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশে নৃত্যরতদের মাথার ওপরে ঘোরে তাদেরই চঞ্চল হাতের শত-সহস্র চকচকে রামদা, খড়গ আর ত্রিশূল।

প্রত্যেক দলেই থাকে বিচিত্র সাজে সজ্জিত কিছু মানুষ। শিব, পার্বতী, কালী, দূর্গা, তরুণ বয়সের কৃষ্ণ কিংবা বাসুদেবের কাঁধে চড়া বালক কৃষ্ণ, নন্দী-ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, ডাকিনী-যোগীনি, পিশাচ-পিশাচিনী, বাঘ-সিংহ, বানর-হনুমান ছাড়াও আরো অদ্ভুত ধরনের সাজ দিয়ে আসে অনেকে। কেউ কেবল পাতার পোশাক পরে আসে, কেউ আসে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি পোশাক কিংবা ছেঁড়া ছালা পরে। অনেকের মুখে কেবল রঙ মাখা থাকে, আবার অনেকের মুখে থাকে মাটির কিংবা প্লাস্টিকের নানা ধরনের মুখোশ।

নন্দী-ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, ডাকিনী-যোগীনি, পিশাচ-পিশাচিনীর বেশধারীরা যখন শিবের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্য করে তখন মনে পড়ে যায় অন্নদামঙ্গল কাব্যে কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় বর্ণিত দক্ষালয়ে শিব এবং তার সহচরদের সেই তাণ্ডবলীলার কথা-
‘মহারুদ্ররূপে মহাদেব সাজে। ভভম্ভম ভভম্বম শিঙ্গা ঘোর বাজে।।
লটাপট জটাজুট সংঘট্ট গঙ্গা। ছলচ্ছল টলট্টল কলক্কল তরঙ্গা।।
ফণাফণ্ ফণাফণ্ ফণিফণ্ণ গাজে। দিনেশপ্রতাপে নিশানাথ সাজে।।
ধকধ্ধক্ ধকধ্ধক্ জ্বলে বহ্নি ভালে। ববম্বম্ ববম্বম্ মহাশব্দ গালে।।
দলমল দলমল গলে মুণ্ডমালা। কটি কট্ট সদ্যোমরা হস্তিছালা।।
পচা চর্ম্মঝুলি করে লোল ঝুলে। মহাঘোর আভা পিনাকে ত্রিশূলে।।
ধিয়া তাধিয়া তাধিয়া ভূত নাচে। উলঙ্গী উলঙ্গে পিশাচী পিশাচে।।
সহস্র সহস্র চলে ভূত দানা। হুহুঙ্কারে হাঁকে উড়ে সর্পবীণা।।
চলে ভৈরব ভৈরবী নন্দী ভৃঙ্গী। মহাকাল বেতাল তাল ত্রিশৃঙ্গী।।
চলে ডাকিনী যোগিনী ঘোর বেশে। চলে শাঁকিনী প্রেতিনী মুক্তকেশে।।
গিয়া দক্ষযজ্ঞে সবে যজ্ঞ নাশে। কথা না সরে দক্ষরাজে তরাসে।।
অদূরে মহারুদ্র ডাকে গভীরে। অরে রে অরে দক্ষ দে রে সতীরে।।
ভুজঙ্গপ্রয়াতে কহে ভারতী দে। সতী দে সতী দে সতী দে সতী দে।।’

ব্র‏হ্মা তার পুত্র দক্ষকে প্রজাপতিদের অধিপতি করায় দক্ষ ‘রাজসূয়’ যজ্ঞ করার পর ‘বৃহস্পতি’ নামের এক বিশেষ যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে তিনি দেবর্ষি, বহ্মর্ষি, দেবগণ, ঋষিগণ, গান্ধর্বগণ সকলকে আমন্ত্রণ জানালেও আপন আত্মজা সতী তার অবাধ্য হয়ে শিবকে পতিরূপে বরণ করায় আত্মজা ও জামাতাকে তিনি আমন্ত্রণ জানানো থেকে বিরত থাকেন। এতে সতী অপমানিত বোধ করে দক্ষালয়ে এসে পিতা দক্ষের মুখোমুখি হন, যজ্ঞস্থলে দক্ষ সকলের সম্মুখে সতীকে ভর্ৎসনা করেন, শ্মশানচারী শিবের নিন্দা করেন। পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে সতী যজ্ঞের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে যজ্ঞস্থলেই আত্মাহুতি দেন। সতীর মৃত্যু-সংবাদ শোনামাত্র বাঘের ছাল পরিহিত, গলায় ফণিহার, ললাটে অর্ধচন্দ্র, শিঙ্গা-ডমরু হাতে ক্ষুব্ধ শিব নন্দী-ভৃঙ্গীসহ তার অনুগত অসংখ্য সহচরদের সঙ্গে নিয়ে দক্ষালয়ে ছুটে আসেন, শিবভক্তরা দক্ষালয়ে রীতিমতো তাণ্ডব চালায় এবং প্রজাপতি দক্ষকে হত্যা করে!

সেই ঘটনার বহু শতাব্দী গত হবার পরে, এই শ্মশান পূজার রাতে শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা যেন সেই তাণ্ডবলীলার দৃশ্য মঞ্চায়ন করে!

সব দলের শেষে আসে জামালপুর বাজার সংলগ্ন রেললাইনের পূর্বপাশের আদিবাসী সর্দারদের দলটি, এই উৎসবে যত দল আসে তার মধ্যে সর্দারদের দলটিই সর্ববৃহৎ। শত শত নয়, দেড়-দুই হাজার কিংবা তারও বেশি মানুষের মিছিল নিয়ে আসে সর্দাররা। নেহাত কোলের শিশু আর ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি ব্যতিত এই রাতে সর্দারদের ঘরে খুব বেশি মানুষ থাকে না! বালক-বালিকা, শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এদিন সর্দাররা শ্মশান পূজায় যোগদান করে। কেবল স্থানীয় সর্দাররাই নয়, কালুখালী-বেলগাছী প্রভৃতি জায়গার রেলস্টেশনের আশপাশে আরো যে-সব সর্দার সম্প্রদায়ের মানুষ আছে, আত্মীয়দের আমন্ত্রণে তারাও আসে।

সর্বশেষ সর্দারদের দলটির অগ্রভাগ যতক্ষণে শ্মশানে প্রবেশ করে শ্মশান পূজা দিতে, ততক্ষণে প্রথমদিকে আসা দলগুলি পূজা শেষ করে শ্মশান থেকে বেরিয়ে যায়, নইলে স্থান সংকুলান হয় না। তবু শেষের দিকের কিছু দল তখনও শ্মশানে পূজায় ব্যস্ত থাকে। সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আসা গ্রামবাসী এবং দর্শনার্থীর ভিড়ে তখন গিজগিজ করে শ্মশান এবং আশপাশের রাস্তা, আবার অনেক দর্শনার্থীই তখন বাড়ির পথে পা বাড়ায়। তখন শ্মশানের আশপাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দেখা যায় অন্ধকারে অথবা আধো আলো-ছায়ায় কোনো দোকানের সামনের চাঙায় নয়ত রাস্তার পাশে মাটিতে বসে সিগারেট কিংবা গাঁজা টানছে কালী অথবা প্রেতিনী, নেশায় বুঁদ হয়ে চন্দনা নদীর ব্রিজের ওপর হয়ত শুয়ে আছে মহাদেব কিংবা নন্দী-ভৃঙ্গী, নেশায় টলতে টলতে স’মিলের সামনের কাঠের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে কিংবা হয়ত গুঁড়ির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে ডাকিনী-যোগিনী, হয়ত বাবা কিংবা কাকার কোলে ঘুমে অচেতন বালক কৃষ্ণ, কোথাও অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে ওয়াক তুলে বমি করছে দূর্গা কিংবা পিশাচ, ভিড়ের মধ্যে যত্র-তত্র হেঁটে বেড়াচ্ছে কিশোর বয়সী কৃষ্ণ কিংবা বানর-হনুমানেরা। দর্শনার্থীদের অনুরোধে মাঝে মাঝে ক্যামেরার সামনে পোচ দেয় তারা, তাদের সঙ্গে হাসিমুখে সেলফি তোলে দর্শনার্থীরা!

যখন পাখ-পাখালি ডেকে ওঠে, ভোরের আলোয় অন্ধকার উবে গিয়ে গাছের পাতার শিরাগুলো ক্রমশ প্রচ্ছন্ন হতে থাকে, তখন সন্ন্যাসীদের শ্মশান পূজা শেষ হয়, ঢাক-কাঁসরের বাদ্য থেমে যায় আর পরিশ্রান্ত পায়ে সবাই বাড়ির পথ ধরে; সারারাতের উৎসব মুখর, বাদ্যযন্ত্রে মুখরিত শ্মশান সুনসান হয়ে যায়। কিন্তু তখনও শ্মশানের বাতাসে ভাসে সদ্য সমাপ্ত পূজার নানা উপকরণের ঘ্রাণ- ধূপের, কর্পূরের, নৈবদ্য’র এবং জল ঢেলে নেভানো যজ্ঞস্থল থেকে ওঠা মৃদুমন্দ ধোঁয়ার।

সেই প্রাচীনকালের সমাজে শিব পদে যে-সব যোগীপুরুষ অধিষ্টিত হতেন, তাঁরা কবেই মরে গেছেন, কবে কৈলাসের এবং নানা পর্বতের শ্মশানে ভস্মীভূত হয়ে গেছেন, তবু শিবভক্তরা আজও বিশ্বাস করে যে ঐশ্বরিক বা অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন শিব স্বর্গে বসে তাদের এইসব আচারানুষ্ঠান দেখছেন অথবা হাজারো ভক্তের ভিড়ে তিনিও ভক্ত সেজে আসবেন পূজা গ্রহণ করতে এবং ভক্তদের মঙ্গল করবেন! শিবের সম্পর্কে প্রাচীন অলৌকিক গল্পগুলো বিশ্বাস করে ভক্তরা লৌকিক লোকাচার পালন করে; কিন্তু যার জন্য আজও এতসব আয়োজন, এত বড় উৎসব, এত প্রাণের সমাবেশ, এত অর্ঘ্য উৎসর্গ, হই-হুল্লোর, সেই শিবের ঐশ্বরিক কিংবা অলৌকিক শক্তির ছিটেফোঁটা নমুনা কোথাও দেখা না গেলেও সকালের মায়াবী আলোয় শ্মশানের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা বা কলাপাতায় লেগে থাকা প্রসাদের উচ্ছ্বিষ্ট চাটতে এবং নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে দেখা যায় আশপাশের গৃহস্থবাড়ির পোষা কিংবা বাজারের কতকগুলো বেওয়ারিশ কুকুরকে!

যে-সব অনার্য যোগীপুরুষ শিব পদে অধিষ্টিত হতেন, তারা সমাজের উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ না করে সকল স্তরের মানুষের সঙ্গেই মিশতেন। অন্য অনেক আর্য দেবতার মতো শিবের চরিত্রে অহংকার, শঠতা, প্রতারণা, ধর্ষকামিতা ছিল না। যদিও উচ্চ স্তরের মানুষেরা শিবকে অবজ্ঞা করত, বিশেষত আর্যরা। শিব যোগ সাধনা, তন্ত্র সাধনা, নৃত্যগীত, আযুর্বেদ ইত্যাদি চর্চায় মগ্ন থাকতেন নিজের মতো। শিব অনার্য বলেই প্রথমদিকে বৈদিক যাগযজ্ঞে তার হবির্ভাগ ছিল না, এজন্য নিজ জামাতা হওয়া সত্ত্বেও দক্ষ শিবকে আমন্ত্রণ জানান নি। মূলতঃ অনুচরবর্গকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষের যজ্ঞ পণ্ড করার পরই শিব আর্য সমাজের কাছে দেবতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে শিবকে স্বীকৃতি দিলেও আর্যরা শিবকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন, শিবের অনুসারী নৃপতি কিংবা শিবভক্তদেরকে ভয়ভীতি দেখাতেন এবং তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন শিবের আরাধনা ত্যাগ করে নানাবিধ যজ্ঞ করার জন্য। শিবের মনোনীত বিদ্যাধর সিংহাসনের অধিপতিকে সরিয়ে আর্যরা তাদের মনোনীত ব্যক্তিকে বিদ্যাধর সিংহাসনে বসানোর চেষ্টা করেছে, এ বিষয়ে নারদ আর্যদের পক্ষে কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেছেন। বিদ্যাধর সিংহাসন নিয়ে আর্য এবং অনার্যদের মধ্যে সংঘাত হয়েছে।

আর্যদের গায়ের রঙ ছিল ফর্সা, শরীর ছিল দীর্ঘকায় এবং সুঠাম, অশ্ব চালনা এবং যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষ, ধূর্ত বুদ্ধি সম্পন্ন। অন্যদিকে অনার্যরা ছিল কালো, খর্বকায়, যুদ্ধে অদক্ষ, সরল ভূমিপুত্র, কর্মে সৎ, পরিশ্রমী এবং নির্মাণে নিপুণ। আর্যরা মনে করত অনার্যরা হলো- কুৎসিত, অসভ্য, বর্বর! শিব পদাধিকারী ব্যক্তি ছিলেন ভারতের আদিবাসী অসুর, পণি, বানর, রাক্ষস, পিশাচ প্রভৃতি অনার্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। শিব পদাধিকারীরা হয়ত এতটাই বুদ্ধিমান ছিলেন এবং এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে আর্যদের মতো দাম্ভিক জাতি, যারা অনার্যদেরকে সভ্য মানুষ বলে গণ্য করত না, তারাও শিবকে দেবতা হিসেবে মেনে নিয়েছিল। নিশ্চয় প্রাচীন সেই অনার্য সমাজের কল্যাণে শিবের অনেক অবদান ছিল, হয়ত শিব প্রতিবাদী ছিলেন, যেহেতু তিনি সমাজের নিন্মবর্গের মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তিনি নিপীড়িত-শোষিত মানুষের জন্য কাজ করতেন এবং প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নিতেন। যদিও পরবর্তীকালে কয়েকজন আর্য ব্যক্তিও শিবপদে অধিষ্ঠিত হন।

শিব পদাধিকারীর শক্তি ও প্রভাব মেনে নিয়ে আর্যরা তাঁকে দেবতার মর্যাদা দিলেও তাঁর জন্ম, আবাসস্থল, সমাজ, কর্মকাণ্ড, যৌনজীবন এবং সহচরদেরকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে কৌতুক করতে ছাড়ে নি। দেবতারা নেশা জাতীয় পানীয় সোমরস পান করলে, এমনকি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত সোমরসের জন্য দৌড় প্রতিযোগিতায় নামলে কিংবা সোমরস আসক্তির জন্য তার সোমরস রাখার পাত্র ‘ইন্দ্রোদর’ নামে বিখ্যাত হলেও, তার দেবত্বের মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হয় নি; কিন্তু শিব একটু গাঁজা কিংবা ভাঙ খেয়ে শ্মশানে রাত্রিযাপন করলেই আর্যরা তা মর্যাদা হানিকর এবং কৌতুকের বিষয় মনে করে ব্যঙ্গ এবং হাসি-তামাশা করেছে। দেবরাজ ইন্দ্র গৌতম মুনির অনুপস্থিতিতে তার বেশ ধরে তারই স্ত্রীকে ধর্ষণ করলে এবং গৌতমের অভিশাপে অথবা আক্রমণে ইন্দ্রের অণ্ডকোষ খসে পড়লে বা অণ্ডকোষে ক্ষত হলে অশ্বিনীকুমারদ্বয় মেষের অণ্ডকোষ সংযোজন করলে বা চিকিৎসায় সুস্থ করে তুললেও ইন্দ্রের দেবরাজের সিংহাসন অটুট থেকেছে এবং তার দেবত্বের মর্যাদা এতটুকুও ম্লান হয় নি; কিন্তু সতীর সঙ্গে শিবের প্রেমকে আর্যরা ঘৃণার চোখে দেখেছে, শিব আর সতীর পাশে না দাঁড়িয়ে তারা নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে দক্ষের ‘বৃহস্পতি’ যজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছেন, দক্ষ আপন আত্মজা সতীকে তীব্র ভাষায় অপমান করলেও আগত আর্য অতিথিরা সতীর পক্ষে একটি কথাও না বলে সতীর অপমান উপভোগ করেছেন! এ যেন আজকালকার সমাজেরই প্রতিবিম্ব সেই প্রাচীন সমাজ! শহরের আলো-আঁধারি বার এ বসে কিংবা দামী হোটেলের পার্টিরুমের বর্ণিল আলোয় সঙ্গী বা সঙ্গীনির সঙ্গে মদ কিংবা সিসা পান করলে তা আভিজাত্যের পরিচায়ক, সেখানে তাদের বাঁধা দেবার কেউ নেই। কিন্তু নিন্মবর্গের কেউ খোলা আকাশের নিচে বসে গাঁজা খেলে কিংবা সস্তা মদ পান করলে লোকে তাকে উচ্ছন্নে যাওয়া বখাটে কিংবা মাতাল বলে গালি দেয় আর রাষ্ট্রের পুলিশ করে হেনস্তা! জামালপুরের আদিবাসী সর্দারদের কথাই ধরা যাক, সর্দারদের অনেকেই গাঁজা খায় কিংবা নিজেদের ঘরে তৈরি মদ পান করে বলে উঁচু বর্ণের কিংবা বিত্তশালী মানুষের মধ্যে তাদের দুর্নাম আছে, সর্দারদেরকে তারা ঘৃণা করে। সর্দাররা শূকর পোষে এবং খায় বলে উঁচু বর্ণের অধিকাংশ মানুষ তাদের ভাবে নোংরা জাতি। অথচ এই উঁচু বর্ণের অনেকেই আবার বিদেশে গিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে শূকরের মাংস খায় আর দেশে এসে বলে, ‘এবার লন্ডনের একটা রেস্তোরায় পর্ক খেয়েছি, অসাম!’ কিংবা ধরা যাক সমাজের উচ্চবর্গের মানুষ একাধিক রক্ষিতা রাখলে বা দামী হোটেলের অন্দরে লাস্যময়ী কলগার্লের সঙ্গে রাত্রিযাপন করলেও তা আভিজাত্য হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু নিন্মবর্গের কোনো কালু আর অকাল বিধবা কোনো কৃষ্ণকলি দুজনে স্বেচ্ছায় বিবাহবহির্ভূত যৌনসংসর্গ করলে তাকে ব্যভিচার বলে আখ্যা দেওয়া হয় আর দুজনের নামেই কলঙ্ক রটে যায়!

প্রভাবশালী দেবতাদের মধ্যে শিব ছিলেন যোগীপুরুষ, নেতৃস্থানীয় যোগীপুরুষেরাই শিব পদে অধিষ্ঠিত হতেন। কোনো শিবই ব্যভিচারী ছিলেন না। ইন্দ্র, ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত আর্য দেবতাদের অনেকেই ছিলেন ব্যভিচারী। শিব কামাসক্ত ছিলেন না, শিবের যৌন জীবন ছিল সংযত; বরং অন্য দেবতারা চাইতেন শিব কামাসক্ত হোন, একবার তারা শিবের কাম জাগানোর জন্য উস্কানি দিতে মদনদেবকে পাঠিয়েছিলেন।

অনার্যরা তাদের ইতিহাস লিখে না রাখায় তা সংরক্ষিত হয়নি, বা লিখলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে তা সংরক্ষিত থাকেনি। আর্যদের সাহিত্য পড়ে অনার্যদের সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তা বড় একপেশে। সেখানে আর্যদের শৌর্য-বীর্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হলেও, পরাজিত অনার্যদেরকে লঘু এবং কদর্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে আর্যদের সাহিত্য পড়ে অনার্যদের সম্পর্কে অনেক কিছুই অনুমান করে নিতে হয়।

শিবকে দেবতার মর্যাদা দিলেও আর্য বা ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে শিবের আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি যেমনি কৌতুকপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; তেমনি শিবের সহচরদেরকেও উপস্থাপন করা হয়েছে কদর্যভাবে। শিবের প্রধান সহচর নন্দী সম্পর্কে কূর্মপুরাণে বলা হয়েছে-নন্দী করালদর্শন, বামন, বিকটাকার, মুণ্ডিতমস্তক, ক্ষুদ্রবাহু, মহাবল। পরবর্তীতে নন্দীকে ষাঁড়রূপে শিবের বাহন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে!

শুধু নন্দী নয়; ভূত, পিশাচ, ডাকিনী-যোগিনী, শাঁকিনী, প্রেতিনী প্রভৃতি সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে; এগুলো হয়ত কোনো ব্যক্তি বিশেষের নাম অথবা কোনো সম্প্রদায়ের নাম ছিল। হয়ত এরা সংঘবদ্ধ এবং শক্তিশালী ছিল, প্রতিবাদ এবং লড়াই করতে জানত। আর্যরা তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে চাইলে তারা হয়ত সহজে পায়ের নিচের জমি ছেড়ে দিত না, জোর লড়াই করত। আর্যদের কাছে পরাজিত হলেও হয়ত আর্যদের যথেষ্ট ক্ষতিসাধান করতে পারত তারা, স্ব-ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে হয়ত কখনো কখনো দিনে কিংবা রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা হামলা চালাত আর্যদের ওপর। এ কারণেই হয়তবা আর্যরা বিজয় অর্জন করলেও এই ভয়ে থাকত যে কখন আবার অনার্যরা হামলা চালায়। আর্যরা হয়ত নিজেদের দুষ্টু বাচ্চাকে ভয় দেখাত এই বলে যে, ‘বাবু খেয়ে নাও নইলে তোমাকে ভূতের কাছে রেখে আসব।’ কিংবা অনার্যরা কালো বলে নিজেদের মধ্যে ঠাট্টাচ্ছলে হয়ত বলত, ‘তোকে তো ভূত বা প্রেতিনীর মতো লাগছে!’ এভাবেই হয়ত ভূত-পিশাচরা কালক্রমে মানুষ থেকে অশুভ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে!

আর কালের আবর্তে ইতিহাসের গায়ে নানা রঙ লাগে; ভূত, পিশাচ, প্রেতিনীদের সম্পর্কে মানুষের মুখে হাজারো গল্প-গাঁথা চালু হয়। আর্য ব্রা‏হ্মণরা চালু করে ভূত তাড়ানো অনুষ্ঠান বা যজ্ঞের মতো লোকাচার। কালক্রমে বিভিন্ন অনার্য গোষ্ঠীর মধ্যে বহিরাগত রক্ত ঢুকে শংকরায়ণ হয় আর আর্যরা তাদের এইসব লোকাচার ছড়িয়ে দেয় শংকরায়িত অনার্য জাতির মধ্যে, আর তারা মানুষের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয় যে ভূত-পিশাচ বলে সত্যিই কোনো অশুভ শক্তি আছে। সেই প্রাচীন ভূত, পিশাচ, প্রেতিনী ইত্যাদি নামের মানুষ বা সম্প্রদায়ের বংশধররাই একটা সময় হয়ত এইসব অলৌকিক গল্পগাঁথা বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং না জেনে ব্রাহ্মণদের প্ররোচণায় নিজের পূর্ব-পুরুষদেরকেই ভয় এবং ঘৃণা করতে শেখে। আর্য ব্রা‏হ্মণ্য দর্শন ও সংস্কৃতি গ্রাস করে তাদের মনোজগৎ আর নিজস্ব বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং লোকাচারের কিছু কিছু টিকে থাকলেও নিশ্চিতভাবেই অনেক কিছু হারিয়ে যায় চিরতরে।

ভারতবর্ষের প্রাচীন অনার্য ভূমিপুত্রদের গায়ের রঙ কালো হলেও ক্রমাগত শংকরায়নের ফলে ভূমিপুত্রদের সকল গোষ্ঠীর গায়ের রঙ আর নিখাঁদ কালো থাকে নি, গৌরবর্ণের মানুষের ছোঁয়ায়-সংসর্গে মিশ্র সংস্কৃতির মতোই জন্ম হয় মিশ্র বর্ণের মানুষের। নিজেদের গায়ের রঙের এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আর্যদের দ্বারা অনার্যদের মধ্যে এই বিশ্বাসও ঢুকে যায় যে গৌর বর্ণ হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট, গৌর বর্ণের মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ; আর কালো হলো কদাকার-নিকৃষ্ট! ক্রমশ সমাজে কালো মানুষের কদর কমতে থাকে আর হীনমন্যতায় ভুগতে থাকা কালো মানুষ ফর্সা হবার জন্য প্রসাধন মাখতে শুরু করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সবচেয়ে বড় ক্ষতি আর অপমানের সম্মুখীন হয় কালো নারীরা। কালো পিতা-মাতাও তাদের কালো ছেলের বিয়ের জন্য খুঁজতে শুরু করে অপেক্ষাকৃত গৌর বর্ণের পাত্রী। কালো মেয়ে হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের বোঝা! আর্যদের মতোই ক্রমশ অনার্যদের মধ্যে সংক্রামিত হয় এবং দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় কালো মানুষ দেখে নাক সিঁটকানো কিংবা ঘৃণা করার অপসংস্কৃতি। আর্য দ্বারা নিপীড়িত অনার্যরা আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে মানসিকভাবে হয়ে ওঠে আর্য!




(চলবে.....)

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০৫ ই মার্চ, ২০২০ বিকাল ৪:৫৮

নেওয়াজ আলি বলেছেন: সুপাঠ্য, সুশোভন লেখা ।

০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ৯:৪৮

মিশু মিলন বলেছেন: ধন্যবাদ।

২| ০৫ ই মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০০

রাজীব নুর বলেছেন: আকর্ষন আছে।

০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ৯:৪৮

মিশু মিলন বলেছেন: ধন্যবাদ।

৩| ০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ৮:২৪

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: আর্য অনার্যের তুলনামূলক ভাবনায় ভাললাগা :)

++++++

০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ৯:৪৯

মিশু মিলন বলেছেন: ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.