![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সকাল থেকেই অস্থির অনিমা। কি করবে বুঝতে পারছে না। কাল সারারত একফোঁটা ঘুমাতে পারেনি। শাহেদ মোবাইলে কলের পর কল করেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ফোনটা রিসিভ করল। সেই একই কথা। সারাটা রাত ফোনে,এসএমএস এ শুধু একটা কথা দেখা কর। দেখা করতে অনিমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু শাহেদের বাসায় যেতে তার যত আপত্তি। এ ব্যাপারটা নিয়েই তাদের কথা কাটাকাটি, ঝগড়া।আবার রিং হচ্ছে ফোনে। স্ক্রীনে শাহেদের নাম্বার।
অনিমা ফোন ধরেই বলল “ কি ব্যাপার? আবার ফোন দিয়েছ কেন? আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে”।
“চুলোয় যাক অফিস।বলেছি না আজকে তোর অফিসে যাওয়া বন্ধ। তুই সোজা সিএনজি নিয়ে আমার বাসায় আয় ছেমরী। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল কি করে বাঁকাতে হয় তা আমি জানি”।
শাহেদের কন্ঠ আর শব্দচয়নে স্তম্বিত অনিমা শুধু বলল “ আমি বাসা চিনি না”।
“চিনিস না মানে। তোকে কয়বার আমি আমার ঠিকানা এস এম এস করলাম কাল রাত থেকে? চাকরীর ইন্টারভিউ দেয়ার সময় তো ঠিকই সব কিছু চিনছ। যত্ত সব ন্যাকামী। আমি যা বললাম সেইমত কাজ কর নইলে তোর বাসায় গিয়া তোর বাপ মারে শিক্ষা দিয়া আসব। মেয়ের বিয়া ঠিক করা বাইর করতেছি”।
শাহেদের কথাগুলো যেন ওর কানে তপ্ত সীসা ঢেলে দিল।
এই ছেলেটা অনিমার প্রেমিক? যেমন স্নিগ্ধ সুন্দর মায়াকারা অনিমা তেমনি মেধাবী। আত্নীয়স্বজন,বন্ধুবান্ধব সব মহলে তার রুচির উচ্চ প্রসংসা। তারই প্রেমিক কিনা তার সাথে এই ভাষায় কথা বলছে! সে ভেবেছিল আজ অফিস থেকে ফিরে বাবা মাকে শাহেদের কথা বলবে। কিছুটা সময় চেয়ে নিবে ওনাদের কাছ থেকে। ততদিনে নিশ্চয় ওর কোথাও না কোথাও চাকরী হয়ে যাবে।“কি চুপ হয়া গেলি ক্যান? আসবি না? আচ্ছা না আইসা দ্যাখ আমি তোর আর তোর বাপ মার কি ব্যবস্থা করি”। “বার বার আম্মু আব্বু কে টেনে আনছো কেন? বিয়ের কথা হচ্ছে মানে কি বিয়ে হয়ে যাওয়া? আমি তো বলি নাই যে আমি রাজি হয়ে গেছি। কিন্তু তুমি আমার সাথে যা ব্যবহার করছ তাতে তোমাকে আমি ভালবাসতাম এ কথাটা কাউকে বলতে আমার রুচিতে বাঁধবে” বলেই লাইন কেটে দিল অনিমা।
“কিরে তোর আর কতক্ষণ? তাড়াতাড়ি আয়। এক্ষুনি তো আবার অফিসের গাড়ী চলে আসবে” মায়ের ডাক শুনে সম্বিত ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। গাড়িতে উঠার আগে ফোনের রিংটোন অফ করে নিল। সবার সামনে শাহেদের ফোন রিসিভ করতে ইচ্ছা করছে না। বাসা থেকে অফিসে পৌঁছতে আধঘন্টা লাগলো। এরমধ্যে পয়ত্রিশবার কল করেছে শাহেদ। করুক।আর নিজ থেকে ওকে কল করবেনা অনিমা। পেয়েছে কি? হুমকির পর হুমকি। আরে শুধু বিয়ের প্রস্তাব এসেছে ,ছেলেপক্ষ ওকে সামনাসামনি দেখতে চেয়েছে এটুকু জানাতেই এ অবস্থা। জানিয়েছে কি আর সাধে? বেকার ছেলের সাথে তার বাবা মা তাকে বিয়ে দিবে। তাও যদি একাডেমিক ক্যারিয়ার ভাল থাকত। তাহলে কবে জানিয়ে দিত বাসায়। শোনার পর থেকে শাহেদ যেন উন্মাদ। টিনেজার হলে অনিমা হয়তো ভাবতো বাব্বাহ ও তো আমাকে অনেক ভালবাসে। এ বয়েসে শাহেদের এই আচরণ ওর একটুও ভাল লাগছে না। এরকম সাতপাঁচ ভাবছে এমনসময় রিসেপশান থেকে কল, “ ম্যাম, আপনার একজন গেস্ট এসেছে। নাম বলেছেন শাহেদ আহমেদ। আপনার রুমে পাঠিয়ে দিব?” “ না উনাকে ওয়েটিংরুমে বসাও আমি আসছি” বলেই অনিমা তাড়াতাড়ি ওয়েটিং রুমের দিকে রওয়ানা হল। সর্বনাশ! কি চায় শাহেদ? রুমে ঢুকে দেখল মাথা নিচু করে বসে আছে সে। পায়ের শব্দ পেয়ে মাথা তুলতেই অনিমা দেখল কিরকম যেন অপ্রকৃতস্ত দেখাচ্ছে ওকে। “ সরি, অনিমা তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি” আস্তে আস্তে বলল শাহেদ।
“এটা বলার জন্য তুমি এখানে এসেছ?” অনিমার ভীতু কন্ঠের প্রশ্ন শুনে হেসে দিল শাহেদ। “ভয় পেয়ো না। কোন সিন ক্রিয়েট করবো না। কোন জব না পেলে কি হবে অফিস এটিকেট কিছু কিছু আমিও জানি” ।
ওর কথা শুনে কে বলবে এই শাহেদই সকাল বেলা ঐভাবে কথা বলেছে। “আমি বাইরে অপেক্ষা করব। অফিস ছুটির পর তুমি আমাকে ফোন করো” বলে হনহন করে বেরিয়ে গেল সে।
ভাগ্যিস আজ অফিসে কাজের চাপ বেশি ছিল না। কিছুতেই কাজে মন বসছে না অনিমার । তাড়াতাড়ি করে হাতের কাজগুলো সেরে ঠিক পাঁচটায় ফোন দিল শাহেদকে।“আমি বাইরে সিএনজি ঠিক করছি তুমি আস” শাহেদের স্বাভাবিক কন্ঠ। সিএনজিতে ওঠার আগে অনিমা জানতে চাইল কোথায় যাওয়া হচ্ছে। শাহেদের উত্তর “দেখি কই যাওয়া যায়?” এটা ওর কমন উত্তর। যতবার ওরা কোথাও খেতে কিংবা সিনেমা দেখতে গেছে এই একই উত্তর দিয়েছে ও। তবুও কেন যেন অজানা আশংকায় বুক কেঁপে উঠলো অনিমার।
সারাটা রাস্তা দুজনের মধ্যে কোন কথাই হল না। হঠাৎ করে অনিমার খেয়াল হল আরে সিএনজি তো শাহেদের বাসা যে এলাকায় সেদিকে যাচ্ছে। “ কি ব্যাপার? আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমি কিন্তু তোমার বাসায় যাব না। প্লিজ আমাকে নামিয়ে দাও” প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল সে। কিন্তু কে শুনে কার কথা? বারবার অনুরোধ করার পরও যখন শুনলো না তখন সে চিৎকার করে সিএনজি চালক কে বলল “ ভাই প্লিজ আমাকে নামিয়ে দেন”। সাথে সাথে সশব্দে চড় এসে পড়ল ওর গালে। অবাক হয়ে শাহেদের দিকে তাকাল অনিমা। এ কোন শাহেদ, একে চেনে না অনিমা। “ চুপচাপ বসে থাক, যতই চিৎকার করিস না কেন এ থামাবে না। আমি যা যা বলব তাই করবি নইলে দেখিস কি হয়” সাপ যদি কথা বলতে পারত তাহলে মনে হয় এরকমই শোনাত।
একটা তিন তলা বাড়ির সামনে এসে থামল সিএনজি। আবাসিক এলাকা বলে কিংবা সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলেই চারদিক শুনশান। গেট খুলে ভেতরে ঢুকলো ওরা। কাউকে দেখতে পেল না অনিমা। দেখতে পেলেও কিছু বলতে পারত বলে মনে হয় না ওর। আপন মনে বিড়বিড় করে যাচ্ছিল। অর্থহীন প্রলাপ। তাদের সুসময়ের কথপকথন। শাহেদ যদি একটু শুনতে চেষ্টা করত তাহলে ও শুনতে পেত কতই না স্বপ্ন বুনেছিল ওরা দুজন মিলে।
দোতালায় উঠে কলিং বেল বাজাল শাহেদ। বুয়া দরজা খুলে দিল। ওকে দেখে ও না দেখার ভান করে বলল “ ভাইজান আমার দেরি হইয়া যাইতাছে। আপনের খাবার দেয়া আছে টেবিলে। খালাম্মায় কইছে আপনেরে খাইয়া লইতে। উনার আইতে দেরি হইব।
আমি যাই”।
বুয়া তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল।
শাহেদের মা চাকরি করেন এটা ও জানতো। বেছে বেছে আজকের দিনেই উনাকে দেরি করে আসতে হবে? ও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর শাহেদ ওকে হ্যাঁচকা টানে ভিতরে নিয়ে গেল। আর থাকতে না পেরে ও চিৎকার করে কেঁদে উঠল “আমাকে যেতে দাও”।
আবার সেই হিসহিসানি “ যতই চিৎকার করিস কোন লাভ নাই। কেউ আসবে না”।
বলে টানতে টানতে একটা রুমের দিকে নিয়ে গেল। কখন যেন হাতে একটা ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে নিল সেটা দিয়ে ওকে ভয় দেখাতে লাগল কান্না বন্ধ নইলে এটা দিয়ে একটা বাড়ি দিব। বাবা মায়ের খুব লক্ষী মেয়ে ছিল অনিমা। তারা যখন যা বলতেন সেরকমই চলত সে। কোনদিন তাকে উঁচুগলায় কিছু বলতে হয়নি তাঁদের। আজ তাঁদের মেয়েকে কিনা এভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল সে। “এখন আয় তোর বিয়ে করার সাধ মিটিয়ে দেই” বলে একটানে তার ওড়না খুলে ফেলল সে। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল। কে এসেছে দেখতে গেল শাহেদ। যাওয়ার আগে ওকে বলে গেল “একদম চুপ করে থাকবি। চালাকি করলে দেখিস কি করি?” একটু পরেই ফিরে এসে বলল “ আম্মু চলে আসছে। তুই সোজা তিনতলায় চলে যা। আম্মু বাসায় ঢুকে গেলে আমি তোকে বাসায় দিয়ে আসব”।
অনিমা এক সেকেন্ড ও দেরি করল না। সোজা তিনতলায় চলে গেল। শাহেদ নিচে ওর মাকে গেট খুলে দিল। অনিমা কান খাঁড়া করে ছিল। যেইমাত্র দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেল দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে নিচে নেমে এক ছুটে রাস্তার মোড়ে পৌঁছে গেল। রাস্তায় দুএকজন লোক ছিল তারা খুব অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে একটা খালি সিএনজিতে উঠে বলল “ভাই,তাড়াতাড়ি চলেন”।
ওর বাসার ঠিকানা বলতেই ছুটলো সিএনজি। একবারও পিছনে ফিরে তাকাল না অনিমা।
বাসায় কলিংবেল দিতেই মা এসে দরজা খুলে দিল। “কিরে এত দেরি করলি যে? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?” মায়ের এতগুলো প্রশ্নের কোন জবাব দিল না। “ আম্মু, তোমরা বিয়ের প্রস্তাব টা নিয়ে এগোতে পার। আমার কোন সমস্যা নেই” একথা বলে মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
©somewhere in net ltd.