| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে তছনছ হয়ে যায় সুন্দরবন ঘেঁষা শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চল। তলিয়ে যায় বসতবাড়ি, লাখ লাখ হেক্টর চিংড়ি ও ফসলের ক্ষেত। সাতক্ষীরায় নিহত হয় ৭৩ জন ও আহত হয় সহস্রাধিক। ধ্বংস হয় উপকূল রক্ষা বাঁধ এবং ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এরপর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও থামেনি লাখো মানুষের হাহাকার। অনেক পরিবার এখনও বেড়িবাঁধে খুপড়ি ঘরে বাস করছেন। নেই কর্মসংস্থান, সংস্কার হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তীব্র হয়েছে সুপেয় পানিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এ এলাকার মানুষ।
গৃহহীন অসংখ্য পরিবার : আইলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নসহ অনেক অঞ্চল। ওইদিন স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় মানুষ, গবাদি পশু ও ঘরবাড়ি। ক্ষণিকের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়ে অসংখ্য পরিবার।
এরপর থেকে অনেক মানুষ বেড়িবাঁধে বাস করছেন। খলষেবুনিয়া এলাকায় ক্লোজার বেড়িবাঁধের উপর শতাধিক মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন। তারা অর্থাভাবে ভিটায় ফিরতে পারছেন না। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাসুদুর আলম জানান, পয়সার অভাবে ঘর বাঁধতে না পারায় অনেকেই এখনও বাঁধের উপর বসবাস করছেন। এলাকায় ফসল উৎপাদন ও মৎস্য চাষ বন্ধ থাকায় কারও কোনো আয় উপার্জন নেই।
কর্মসংস্থানে আঘাত : আইলার আঘাতের পর থেকে গোটা এলাকা উদ্ভিদশূন্য হয়ে পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে অনাবাদী হয়ে পড়েছে প্রায় দশ হাজার হেক্টর জমি। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের অভাব-অনটন বেড়েই চলেছে। ক্রমে বাড়ছে দরিদ্র ও অতি দরিদ্রের সংখ্যা। কর্মহীন অনেকে এলাকা ছেড়ে বাইরে চলে গেছেন।
এ এলাকার মানুষের বড় অংশ সুন্দরবন এবং কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বনদস্যুদের অত্যাচারে সুন্দরবন নির্ভর মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অপহরণের ভয়ে সুন্দরবনে মধু আহরণ ও কাঁকড়া সংগ্রহে যেতে পারছেন না। এ ছাড়া আইলার পর নদীর ভাঙন বেড়েছে।
শ্যামনগরের গাবুরা গ্রামের আবিদুর রহমান জানান, আইলাদুর্গত এলাকায় ১৯৮০ এর দশক থেকে লবণ পানির চিংড়ি চাষ ছাড়া আর কিছুই হয় না। আইলার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ কেটে নদীর পানি চিংড়ি ঘেরে উঠাতে দিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন। ফলে এলাকায় না হচ্ছে চিংড়ি চাষ, না হচ্ছে ফসল। কাজ না থাকায় বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মাসুদুর আলম বলেন, ‘আইলার পর জলদস্যুদের অত্যাচারে জেলে-বাওয়ালীরা সুন্দরবনে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।’
চকবারা ক্লোজার সংলগ্ন নদীতে জাল দিয়ে রেণু সংগ্রহ করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে ২০১৩ সালে কোস্টগার্ড জাল দিয়ে রেণু-পোনা সংগ্রহ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন।
পানির উৎস : গাবুরা ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মধ্যে ১৩টি গ্রামের মানুষদের খাবার পানির একমাত্র উৎস ‘পুকুর’। কিন্তু আইলার কারণে এসব উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নোংরা পানি পান করে রোগাক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। অনেক নারী ২/৩ কিমি পাঁয়ে হেটে এক কলস পানি আনেন। সচ্ছল লোকেরা ২০ টাকা দরে পানির ড্রাম পাশের উপজেলা কয়রা থেকে কিনে আনেন। এ বিষয়ে সাতক্ষীরার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আহমেদ বলেন, ইউনিসেপের কয়েকটি প্রকল্প চালু হওয়ার আগে সবার জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
বেড়িবাঁধ : ঝুঁকিতে রয়েছে পাউবোর বেড়িবাঁধ। পদ্মপুকুর ইউনিয়নের কামালকাটিতে বেড়িবাঁধ ভেঙে জনবসতি গ্রাস করছে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কিছু অংশ সংস্কার হলেও বুড়িগোয়ালিনী, হরিণগরসহ প্রায় ১০০ কিমি বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে। অর্থাভাবে এক্ষুণি কোনো প্রকল্প গ্রহণ সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম।
এভাবে নানা দুর্বিপাকে জীবনযাপন করছেন আইলা উপদ্রুত অঞ্চলের ভুক্তভোগীরা। দুর্গত এসব মানুষ সরকারের সুদৃষ্টি চান।
©somewhere in net ltd.