নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি আসল নাম ব্যবহার করিনি,যেটা দেয়া সেটা আমার ছদ্মনাম।আমার আসল নাম না হয় অজানাই থাকলো সবার কাছে।লেখালেখি করার একটা প্রবল ইচ্ছেই আমাকে ব্লগের পাতায় টেনে নিয়ে এসেছে।মূলত কবিতা লিখি,সাথে অন্যান্য বিষয়েও টুকটাক লেখার চেষ্টা করি।কবি বলেই অনেকে ডাকে চেনা-জানার

অমায়িক হাসি

অমায়িক হাসি › বিস্তারিত পোস্টঃ

কালো চকোলেট, কালো মানুষ, কালো মাটি!!

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ১০:০৭

চকোলেট?
সভ্যতার এই সময়ে আবেদনময়ী একটা বস্তুর নাম। ছেলেমেয়েদের জন্যে এক আদুরে উপহারের নাম, প্রেমিকার রাগ ভাঙানোর এক অব্যর্থ অস্ত্রের নাম, বাসর ঘরেও শুনেছি ইদানিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এটি। কিন্তু কোত্থেকে আসে এই চকোলেট? মনে প্রশ্ন জাগেনা আমাদের? উত্তরসহ আজ সবকিছু নিয়েই লিখছি এই লেখাটি।
আফ্রিকা মহাদেশ। আদর করে সাদা চামড়ার সাহেবরা নাম দিয়েছিলেন “অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ”। নেহায়েত মিথ্যে বা ব্যর্থ নাম দেননি তারা। কিন্তু এই পিছিয়ে পরা মহাদেশেই উৎপন্ন হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দামী কয়েকটি বস্তু যাদের মধ্যে একাধারে রয়েছে হিরা, প্রাকৃতিক তেল, খনিজ তেল, রাবার আর কোকো। সেই মহাদেশেরই পশ্চিম দিকের দুইটি পাশাপাশি দেশ। বিশ্বনন্দিত ফুটবল তারকা দিদিয়ের ড্রগবার দেশ আইভরি কোস্ট আর সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের দেশ ঘানা। আইভরিকোস্ট আর ঘানাতেই পৃথিবীর ৭০ শতাংশ কোকো চাষ হয়, চকোলেটের কাঁচামাল!!
আর এই বিশাল কোকো চাষের শ্রমিকের যোগান হয় পশ্চিম আফ্রিকারই দেশ মালি, বুরকিনা ফাসোর মত পিছিয়ে পরা দেশগুলোত থেকে। আফ্রিকার ১.৮ মিলিয়ন শিশু হয় এই কোকো বাগানের শ্রমিক যাদের বয়স ৫-১০ বছরের মধ্যে। এদের প্রায় সবাই পাচার হয়ে আসে আইভরি কোস্ট আর ঘানার এসব কোকো ফার্মগুলোতে। কাউকে স্কুলের লোভ, কাউকে কাজের কাউকে বা ডলারের লোভ দেখিয়ে আনা হয় এখানে। বুরকিনা ফাসোর অবস্থা আরো বেশি খারাপ। সে দেশে মায়েরা সামান্য বেখেয়াল হলেই তাদের ৫-১০ বছরের বাচ্চারা উধাও হয়ে যায় চোখের পলকে, এতটাই বেপরোয়া সে দেশের পাচারকারী চক্র। পাচার হয়ে তারা আসে ঘন কোকোর জঙ্গলে, যেখানে তাদের জন্যে অপেক্ষা করে সাপ, বিচ্ছু, বিষাক্ত পোকামাকড় আর অত্যাচারী ফার্মের মালিকেরা। ক্যাডবেরি ডেইরি সিল্ক হাতে-মুখে মাখিয়ে পড়ছেন এই লেখাটি? একটা নোনতা স্বাদ পান না চকোলেটে? কে জানে হয়তো সেই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর ঘামের স্বাদ পাচ্ছেন আপনি। হতেও পারে পাঠকসমাজ!! এরা সেইসব নিষ্পাপ শিশু যারা তাদের শৈশবকে বিকিয়ে দিচ্ছে এই চকোলেটের বেড়াজালে। যারা তাদের কচি বয়সে লেখাপড়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ভাগ্যের অপরিসীম লীলাখেলায়।
এসব চকোলেট ফার্মগুলোর কাছ থেকেই প্রতিবছর চকোলেট কিনছে বিশ্বের যত বড় বড় নামিদামী ব্র্যান্ড। তারাও চুপ, কেননা কোকো চাষের জন্যে যে পরিমাণ খাটুনি করতে হয় তা কোন পরিণত বয়সের কাউকে দিয়ে করালে দিন প্রতি ১০০ ডলার মজুরি দিতে হবে চোখ বন্ধ করে। সেক্ষেত্রে চকোলেটের পাইকারি মূল্যও বাড়বে হুড়হুড় করে। তাই এইসব ৫ থেকে ১০ বছরের ক্ষুদে বাচ্চাদের দিয়ে করানো হচ্ছে সেইসব অমানুষিক পরিশ্রম।
এসব বাচ্চাদেরকে কোন পারিশ্রমিক দেয়া হয়না, দেয়া হয়না নূন্যতম কোন শ্রমিক সুযোগ সুবিধা। এদের বয়স অনুযায়ী এদের উচ্চতাটাও ভালোই আন্দাজ করতে পারছেন? হ্যাঁ কোকো জঙ্গলের ঝোপে ঢোকার জন্যে এই উচ্চতাই একেবারে পারফেক্ট। কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ঝোপে ঢুকতে পারবেনা অনায়াসে সেজন্যেই বাছাই করা হয় এসব বাচ্চাদেরকে। হাতে তুলে দেয়া ম্যাশেট্টি (এমন এক ধরণের ছুরি যার আকৃতি অনেকটা চাপাতির মত), তারা কেটে আনে কোকো বীজ আর তারপরে সেগুলো বাছাই করে পাঠিয়ে দেয় মূল ফার্মে।কাজ করতে গিয়ে কাটা পড়ে ওদের হাত, কাটা পরে হাতের আঙুল, পচন ধরে তাতে কিন্তু ওষুধ মেলেনা। ওদের পরিশ্রমের সময়টা শুনবেন? দৈনিক ১০-১২ ঘন্টা পরিশ্রম করতে হয় ওদেরকে, পিঠে তুলতে হয় ১০০ কেজির বস্তা আর যদি কাজের মধ্যে লুকিয়েও বিশ্রাম নিতে যায় তো কপালে জোটে চাবুকের আঘাত!! মধ্যযুগীয় গল্প মনে হচ্ছে? মোটেই না, ওই যে শুরুতেই বলেছি, সাদা চামড়ার সাহেবেরা নাম দিয়েছেন “অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ” সে তকমারই প্রায়শ্চিত্ত করছে এই শিশুরা প্রতিনিয়ত। আর দিনে দুইবেলা খেতে পায় বাচ্চাগুলো। না, কোন ভালো খাবার নয়, সামান্য সস্তা ভুট্টা সেদ্ধ আর পানি। সারাদিনের ক্লান্তির শেষে সামান্য বিছানাও জোটেনা ওদের, ঘুমাতে হয় ঘোড়ার আস্তাবলে, খড়ের গাদায়, দরজা জানালাবিহীন কুঠুরিতে।
এখানে কোন আন্তর্জাতিক শ্রম-আইন চলেনা, এখানে মানবতা কিংবা শিশুদের প্রতি ভালোবাসা স্লোগান চলেনা। এখানে চলে পাশবিকতা। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা নামিয়ে আনতে পারে মৃত্যু এমনকি খুব মর্মান্তিক মৃত্যু। এইসব শ্রমিক বাজারে আবার মেয়েদের চাহিদা অনেক বেশি। সেসব মেয়ে শিশুদের শৈশব ফুরায় এই কোকো জঙ্গলে, আবার বয়ঃসন্ধি আসেও এই জঙ্গলে। ফার্মের শ্রমিক-মালিকদের দেহের চাহিদা মেটায় এই অজস্র মেয়েরা, গর্ভবতী হয় মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সেই। মৃত্যুও আসে অনেক তাড়াতাড়ি, কখনো ধর্ষনের জ্বালা সইতে না পেরে কখনো যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে কখনোবা ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের কাছে মাথানত করে। হয়তো ওদেরই রক্ত আপনার ফ্রিজে জমে কালো হয়ে আছে, মোড়কের গায়ে ওদের রক্তের নামই হয়তো ক্যাডবেরি ডেইরি মিল্ক!!
বিংশ শতাব্দির গোড়া থেকে যেভাবে চকোলেটের চাহিদা বেড়েছে, সেভাবেই বেড়েছে এসব শিশুদের বলি হওয়ার ঘটনা। আর সেভাবেই বেড়েছে দামী চকচকে মোড়কে মোড়ানো চকোলেটের আবেদন। যে চকোলেট আপনি পাঁচশ টাকায় কিনে আহ্লাদে আপ্লুত হচ্ছেন, বিশ্বাস করুন সে চকোলেটের কোন না কোন জায়গায় একফোঁটা হলেও সেইসব শিশুদের রক্ত,ঘাম কিংবা চোখের পানি রয়েছে। যারা কোনদিনই জানেনা চকোলেটের স্বাদ কেমন, যারা আর কোনদিন তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবেনা, যাদের মৃত্যু হবে আপনার জন্যে চকোলেট বানিয়েই। আর আপনি, আমি, আমরা বসে বসে সেই চকোলেট নিয়েই আহ্লাদে ডগমগ হবো, প্রেমিকার ঠোঁটে চুমু খাবো।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.