| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

১.
ভাদ্র মাসের চার তারিখ, ভোর পাঁচটা বারো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, তবে ছাতা মাথায় দেওয়ার মতো কিছু নয়। বারান্দার রেলিং আর উঠানের ধুলো ভিজিয়ে দেওয়ার মতোই তার জোর। শিমুলতলী সড়কের দুই পাশের কড়ইগাছগুলো থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরছে। বৃষ্টির শব্দের চেয়ে পাতায় জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ার টুপটাপ শব্দই কানে আসছে বেশি।
আবদুল হাই সরকার চার নম্বর টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন।
প্রথম চেষ্টা করেছিলেন তোফাজ্জল সাহেবের বাসায়। রিং বেজেছে এগারোবার, কেউ তোলেনি। দ্বিতীয় চেষ্টা সেনানিবাসের এক্সচেঞ্জে, ওপাশে যে ছিল সে বলেছে লাইন এখন দেওয়া যাচ্ছে না, একটু পরে চেষ্টা করতে, এবং কথাটা বলার সময় তার গলায় এমন কোনো টান ছিল না যা থেকে কিছু বোঝা যায়। তৃতীয়বার ফোন করলেন থানায়। ওসি জহিরুল নেই, ডিউটিতে যে লোক ছিল সে নিজের নাম বলতে চায়নি। চতুর্থবার পাটগাতীতে, ভায়রা বজলু মিয়ার বাড়িতে। সেখানেও অনেকক্ষণ রিং বাজল, কেউ ধরল না।
খবর এসেছিল পৌনে পাঁচটায়। বজলু মিয়ার বাড়িতে রাত তিনটার দিকে কারা যেন ঢুকেছে। যে লোক খবর দিয়েছে সে তিন লাইন বলে ফোন রেখে দিয়েছে, এবং সে নিজেও কিছু জানে না, শুধু ঢুকেছে এইটুকু জানে। ওই ‘ঢোকা’ আর ‘কী হয়েছে’—এই দুইয়ের মাঝখানের যে শূন্যস্থান, গত সাতচল্লিশ মিনিট ধরে সরকার সাহেব সেই শূন্যতার ভেতরই কাটিয়েছেন।
তিনি চশমা মুছলেন শার্টের কোণা দিয়ে। গায়ে ধূসর হাফহাতা শার্ট, পরনে চেক লুঙ্গি। বুকপকেটে ক্লিপভাঙা একটা কলম। ডান হাতে পিতলের পানের বাটা, উনিশ বছরের পুরনো, ঢাকনার কবজা ঢিলা হয়ে গেছে বলে হাঁটার সময় খুট খুট শব্দ হয়।
করিডোরে দাঁড়িয়ে তিনি ভেতরের দিকে একবার তাকালেন। বাঁ দিকের ঘরে টুকু ঘুমাচ্ছে, বয়স সাত, ঘুমানোর সময় ডান পা কাঁথার বাইরে রাখে। জানালার গ্রিলে ঝোলানো খাঁচায় শালিক নড়ছে। পাখির নাম মন্টু, নাম রেখেছে টুকু নিজে, বাড়ির লোকজন সেই নাম মেনে নিয়েছে বিনা আপত্তিতে। ডান দিকের ঘরে ঘুমাচ্ছে সালেহা। এত ভোরে তার ওঠার কথা নয়। শেষের দুটো ঘরে বাদল আর রতন। চব্বিশ আর একুশ বছর বয়সের দুই ছেলে রাত তিনটার আগে ঘুমায় না, তাই ভোরে তাদের ঘরের দরজা বন্ধই থাকে।
জানালা দিয়ে গেট দেখা যায়। গেটের ডান পাশে সেন্ট্রি বক্স, টিনের, ভেতরে একটা টুল আর একটা কেরোসিনের বাতি। বাতি জ্বলছে। টুল খালি। যে লোকটার ওখানে বসে থাকার কথা তার নাম আবুল বাশার, বয়স তিরিশের কম, গত ঈদে ছুটি কাটিয়ে এখনও কাজে ফেরেনি। সরকার সাহেব জানালা থেকে সরে এলেন। খালি টুল দেখে মানুষের মনে যে সন্দেহ জাগার কথা, তার তা মনে হলো না।
সিঁড়িতে উনিশ ধাপ। বছর কয়েক আগে চোদ্দ নম্বর ধাপে পা পিছলে পড়ার পর থেকে তিনি নামার সময় ধাপ গোনেন। এটা ঠিক অভ্যাস নয়, এক ধরনের বাধ্যবাধকতা। আট নম্বর ধাপে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। দৃষ্টি নিচের দিকে।
নিচে সাতজন দাঁড়িয়ে।
খাকি পোশাকের চারজন, কালো পোশাকের তিনজন। সবার হাতে অস্ত্র, নল উপরের দিকে, অর্থাৎ তাঁর দিকে। সিঁড়িঘরের ছোট জানালা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে সামনের দুজনের কাঁধে, বাকিরা অন্ধকারে। তবে গায়ের গন্ধ তো আর অন্ধকার মানে না। বারুদের কটু গন্ধ, তার সঙ্গে ঘাম আর ভেজা কাপড়ের ভাপসা গন্ধ মিশে আছে। এরা বৃষ্টিতে ভিজে এসেছে, কিন্তু জুতো শুকনো। তার মানে গাড়ি থেকে নেমে সোজা ঘরের ভেতর ঢুকেছে।
সবার চোখ টকটকে লাল। রাত জাগলে মানুষের চোখ যেমন হয়, এ লাল তেমন নয়। এ অন্য রকম লাল।
সামনের তিনজনকে তিনি চেনেন।
একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে নায়েব সুবেদার মোজাম্মেল। বছর দুয়েক আগে ইউনিটের এক অনুষ্ঠানে এই ছেলেটাই তাকে ফুলের তোড়া দিয়েছিল। দেওয়ার সময় ওর হাত এত কাঁপছিল যে, দুটো ফুল খসে সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল। তার পেছনে সিপাহি নূরু। নূরুর বাবা সোনা মিয়া চব্বিশ বছর পাটের গুদামে কাজ করেছে। শেষ তিন বছর মজুরি পায়নি। সরকার সাহেব নিজে একবার তদবিরের কাগজে সই করে মজুরি পাইয়ে দিয়েছিলেন।
তৃতীয় জনের নাম মনে পড়ছে না। বোয়ালমারীর ছেলে, চোখের নিচে বড় একটা তিল। যুদ্ধের সময় এই ছেলে একরাতে সাড়ে সাত মাইল হেঁটে একটা খবর পৌঁছে দিয়েছিল, খবর ছিল দুই লাইনের, এবং খবর দেওয়ার পর সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকেছিল অনেকক্ষণ, কারণ কেউ তাকে ভেতরে বসতে বলেনি। ছেলেটার পায়ে সেদিন জুতা ছিল না। এখন আছে, বুট, ফিতা টাইট করে বাঁধা, বাঁ পায়ের ফিতার আগা ছিঁড়ে গেছে বলে সেখানে গিঁট দেওয়া।
নাম মনে না পড়া আর নাম কোনোদিন না জানা এক জিনিস নয়। চেনা মানুষ দেখলে এমনিতে হাত ওঠে। কিন্তু আবদুল হাইয়ের হাত উঠল না। ডান হাতের আঙুলগুলো পানের বাটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল। কবজায় খুট করে একটা শব্দ হলো।
তার মনে হলো, যারা তাকে মারতে পারে, তারা তো তাকে চেনে না। আর যারা তাকে এত কাছ থেকে চেনে, তারা তো তাকে মারতে পারে না! উনিশ ধাপের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এই দুটো বাক্য একই সঙ্গে তার কাছে চরম সত্য আবার চরম মিথ্যা বলে মনে হলো।
তিনি ধীর পায়ে সাত নম্বর ধাপে পা রাখলেন।
২.
শব্দ হলো।
তবে সঙ্গে সঙ্গে কানে এল না। একটু দেরিতে এল, যেমন দূরের মাঠে কেউ হাতুড়ি মারলে শব্দ পৌঁছায় হাতুড়ি ওঠার পর। শব্দ যখন পৌঁছাল তখন সেটা আর শব্দ রইল না, বুকের পাঁজরের ওপর প্রচণ্ড ভারী চাপ হয়ে বসল।
ব্যথা হলো না।
তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। ব্যথার তো একটা নিয়ম আছে। দাঁত তোলার পর যেমন গোড়া থেকে চিনচিনে ব্যথা ওঠে, তেমন কিছু আসার কথা। কিন্তু এল না। তার বদলে এল কনকনে শীত।
এই শীত কামড়ায় না, বরং ভারী পাথরের মতো চেপে বসে। প্রথমে বসল কণ্ঠার হাড়ে, তারপর নামল নিচে। শেষে দুই পাঁজরের মাঝখানে এমনভাবে থিতু হয়ে বসল যেন ওখানে কেউ বরফজলে ভেজানো একটা বালিশ গুঁজে দিয়েছে। মাঘ মাসের ভোরে নদীর ঘাটে বসলে যে হাওয়া গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, এই শীত তেমন নয়। এ শীত ভেতর দিয়ে যায় না, ভেতরেই থেকে যায়।
চোখের চশমাটা বড্ড ভারী মনে হতে লাগল। শোলার ফ্রেম, ওজন বলতে গেলে কিছুই না, তবু নাকের ওপর এমন চাপ পড়ল যে তার মনে হলো কেউ বোধহয় রাতে ফ্রেম বদলে দিয়ে গেছে। বাঁ হাতটা অসাড়। ঠিক অসাড়ও নয়, মনে হচ্ছে হাতটা যেন তার নিজের নয়, পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কোনো মানুষের হাত এবং লোকটা ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলছে না।
শরীর থেকে একে একে কী কী যেন চলে যাচ্ছে, তিনি টের পাচ্ছিলেন।
ডান হাঁটুর সেই নয় বছরের পুরোনো ব্যথাটা, সিঁড়ি ভাঙার সময় যা প্রতিবার জানান দিত, সেটা আর নেই। মুখে পানের স্বাদ ছিল, চুন একটু বেশি পড়েছিল বলে জিভের ডগায় যে জ্বালাটা করছিল, তা-ও নেই। নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, যা বয়সের কারণে এমনিতে চুপ করে থাকলেও শোনা যায়, নেই। বাটার কবজার সেই খুট খুট শব্দও নেই। কোমরের নিচে গত সাতদিন ধরে যে টান ছিল, ডাক্তার বলেছিল শোয়ার দোষ, সেটাও নেই।
যা যা থেকে গেল তার তালিকা ছোট। শীত থাকল। চশমার ভার থাকল। আর থাকল ধোঁয়া।
সাতটা নলের মুখ থেকে ধোঁয়া বেরিয়েছিল। সিঁড়িঘরে ফ্যান নেই, তাই সেই ধোঁয়া ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ওঠার কথা। কিন্তু উঠল না। ছেঁড়া তুলোর মতো নলের মুখ থেকে ঠিক ছয় ইঞ্চি দূরে স্থির হয়ে রইল। সরকার সাহেব অনন্তকাল ধরে ওই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যদিও পরে হিসাব করে দেখলেন, ওই ‘অনন্তকাল’ আসলে এক সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশ।
সময় থেমে যায়নি। সময় শুধু তার কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া বন্ধ করেছে।
দোতলা থেকে একটা শব্দ এল। ভারী কিছু মেঝেতে পড়ার শব্দ, তারপর আরো কয়েকটা, অসমান তালে। সরকার সাহেব ভাবলেন, আলমারি সরানো হচ্ছে বুঝি। সালেহার অভ্যাস আছে ঘরের জিনিস এদিক ওদিক করার, বছরে তিন চারবার সে পুরো ঘর বদলে ফেলে এবং প্রতিবার বলে এইবার আর বদলাবে না। তিনি ভাবলেন, এত সকালে কেন। তারপর ভাবলেন, জিজ্ঞেস করা যাবে পরে।
এই ভাবনা তার শেষ ভাবনাগুলোর একটি যেখানে ভবিষ্যৎ কাল ছিল, এবং তিনি সেটা টের পাননি।
শরীর আর বইছিল না। তিনি সাত নম্বর ধাপে বসে পড়লেন। বসে পড়ার পর তার বেশ আরাম লাগল। এই বয়সে উনিশ ধাপ নামা সত্যিই খুব কষ্টের।
৩
মোজাম্মেল বন্দুক নামাল।
নামানোর ভঙ্গি এমন যেন কাঁধ থেকে বস্তা নামাচ্ছে, ভারী কিছু নয়, তবু দুই হাত লাগে। নামিয়ে সে দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখল, নলের মুখ নিচে, যেভাবে বৃষ্টির দিনে ছাতা রাখে মানুষ। তারপর দুই হাত মুছল প্যান্টের পাশে। তার এই নির্লিপ্ততা দেখে পেছনের ছয়জনও যার যার অস্ত্র নামিয়ে ফেলল।
: স্যার, ভয় পাইয়েন না।
সরকার সাহেব উত্তর দিলেন না। উত্তর দেওয়ার জন্য গলার ভেতরে যে স্বরযন্ত্র দরকার, সেটা যেন তার শরীর থেকে খসে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই অবাক হয়ে দেখলেন, কথা ঠিকই বেরিয়ে আসছে, আর বলতে কোনো কষ্টও হচ্ছে না।
: তোরা কি আমারে মারতে আইছস?
: কী যে কন স্যার! আপনেরে মারুম ক্যান? আপনে তো আমাগো বাপের মতন। বাপরে কেউ গুলি করে?
যে ছেলেটা কথা বলছে, তার গলায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বাজারে চাল কেনার সময় দোকানির সঙ্গে মানুষ যেভাবে দরদাম করে, ঠিক সেই সুর। সরকার সাহেব খেয়াল করলেন, ছেলেটার ঠোঁটের কোণে শুকনা পানের ছোপ। ভোরবেলা পান খেয়েছে, অথবা রাত থেকেই মুখে ধরা ছিল।
: তাইলে এত সকালে আইছস ক্যান।
: সকালেই তো আসন লাগে স্যার। দিনের বেলা আপনের চাইর দিকে যা ভিড় থাকে! ভিড়ের মইধ্যে তো আর মনের কথা কওয়া যায় না। আমরা সাধারণ সিপাই, আমাগো কথা কেউ উপরে তোলে না।
কথাটা তার ভালো লাগল। বুকের ভেতর বসে থাকা ভেজা বালিশের ভার যেন একটু কমল। তিনি ভাবলেন, এই তো, এদের কেউ শোনেনি বলে এরা রাগ করেছে। রাগ করলে মানুষ ভোরে আসে, ভোরে এসে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়ায়, কারণ অস্ত্র ছাড়া নিজেদের দাবি জানানোর আর কোনো ভাষাই এদের জানা নেই। বুঝিয়ে বললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এদের বাপ-চাচাদের তিনি নিজের হাতে গড়েছেন, এদের অনেককেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন।
তিনি নূরুর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
: তোর বাপ কেমন আছে রে?
: বাপে তো মইরা গেছে স্যার। দুই বছর আগে।
: শুনি নাইতো!
: আপনেরে জানাইতে গেছিলাম। গেটে ঢুকতে দেয় নাই।
: গেটে কে আছিল?
নূরু উত্তর দিল না। মোজাম্মেল দিল না। সাতজনের কেউই দিল না। সরকার সাহেব দেখলেন সাতজোড়া চোখ একসঙ্গে এক দিকে ঘুরে গেছে, জানালার ওপারে, টিনের সেন্ট্রি বক্সের দিকে। বাতি এখনও জ্বলছে। টুল এখনও খালি।
উত্তরটা তাঁকে বলা হচ্ছে না। দেখানো হচ্ছে।
মোজাম্মেল সিঁড়ির তিন নম্বর ধাপে উঠে এল, বসার আগে জায়গাটা হাত দিয়ে ঝেড়ে নিল। তারপর বুকপকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। চার ভাঁজ করা, কোণা নরম হয়ে গেছে। বোঝা যায় কাগজটা বহুবার খোলা হয়েছে আর বহুবার ভাঁজ করা হয়েছে।
: স্যার, একটা জিনিস আপনেরে পইড়া শোনাই।
: শোনা।
মোজাম্মেল পড়তে শুরু করল। পড়ার সময় তার গলার সুর বদলে গেল। এতক্ষণ যে গলায় সে চাল কেনার মতো করে কথা বলছিল, সেই গলা এখন মাইকের সামনে বসা লোকের গলা হয়ে গেল।
: বিশেষ ঘোষণা। অদ্য ভোরে দেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরিয়া চলিয়া আসা এক গভীর ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটিয়াছে। উক্ত ষড়যন্ত্রের মূল হোতা আবদুল হাই সরকার বিদেশি শক্তির সহিত গোপন চুক্তি সম্পাদনপূর্বক দেশের তিনটি নদীবন্দর হস্তান্তরের পরিকল্পনা করিয়াছিলেন। তিনি সেনাবাহিনী ভাঙিয়া দিবার নীলনকশা প্রস্তুত করিয়াছিলেন। তিনি ধর্মপ্রাণ জনসাধারণের বিশ্বাসে বারংবার আঘাত হানিয়াছেন। তাঁহার নামে বিদেশে সাতটি গোপন হিসাব খোলা হইয়াছিল। দেশপ্রেমিক সৈনিকগণ জাতিকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার করিয়াছেন। উক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে…
মোজাম্মেল থামল।
কাগজে আরো এক লাইন আছে। সরকার সাহেব দেখতে পাচ্ছেন, ছাপা অক্ষর, ওই লাইনের পরে আর কিছু নাই। মোজাম্মেল কাগজ ভাঁজ করল না, নামালও না, শুধু চুপ করে রইল।
: শেষটা পড়।
: এইটুকুই স্যার।
: শেষে আরেক লাইন আছে। আমি দেখতাছি।
: ওইটা ঘোষণার লগে যায় না। ওইটা আলাদা।
: আলাদা মানে কী?
: আলাদা মানে ওইটা পরে ঠিক হইব।
সরকার সাহেব কাগজের দিকে হাত বাড়াতে চাইলেন। হাত উঠল না। তিনি খেয়াল করলেন নিজের গলা শান্ত। কাগজে ভুল দেখলে মানুষের গলা যেমন থাকে, ঠিক তেমন। আজীবন তিনি ভুল কাগজ শুধরে এসেছেন। কাগজে ভুল থাকলে ভুল দেখিয়ে দিতে হয়, এইটাই নিয়ম, আর নিয়ম বদলে গেছে কি না তা তাঁকে কেউ জানায়নি।
: এইখানে যার কথা লেখা, ওই লোকটা কে?
: আপনে স্যার।
: আমার নাম লেখা?
: নাম লেখা। বানানও ঠিক আছে।
: তিনটা নদীবন্দর কইলি। দেশে নদীবন্দর ছাব্বিশটা। কোন তিনটা?
: নাম লেখা নাই স্যার। যেকোনো তিনটা।
: সংখ্যাটা কে বসাইছে?
: স্যার সংখ্যা কোনো বিষয় না।
: বিদেশে সাতটা হিসাব?
: জ্বি স্যার, সাতটা।
: সাতটা হিসাব থাকলে সাতটা ব্যাংকের নাম থাকন লাগে। নাম কই?
: নাম লেখা নাই।
: তাইলে সংখ্যা আইল কেমনে?
: সংখ্যা আগে বসে স্যার। নাম পরে বসানো যায়।
সরকার সাহেব আর প্রশ্ন করলেন না। তাঁর সামনে এখন আর কোনো অভিযোগ নেই, একটা ত্রুটিপূর্ণ নথি আছে, আর ত্রুটিপূর্ণ নথি নিয়ে কী করতে হয় সেটা তিনি জানেন।
: ঠিক কর।
: লাগব না স্যার।
: লাগব না মানে? মিথ্যা কথা কাগজে থাকলে ঠিক করন লাগে।
: এই কাগজ ঠিক করনের কাগজ না স্যার। এইটা পড়নের কাগজ।
সরকার সাহেব বুঝলেন না। বোঝার চেষ্টাও একরকম করলেন, কিন্তু চেষ্টাটা মাঝপথে থেমে গেল, কারণ মোজাম্মেল ততক্ষণে পকেট থেকে একটা পেন্সিল বের করেছে।
: তবে একটা জিনিস মিলতেছে না। আপনের বাপের নাম দুই জায়গায় দুই রকম লেখা। এক জায়গায় মৌলভি ইয়াকুব আলি, আরেক জায়গায় ইয়াকুব আলি সরকার। কোনটা ঠিক?
: দুইটাই ঠিক। কাগজে সরকার লেখা হইত, ডাকে মৌলভি।
: তাইলে কাগজেরটাই রাখি।
মোজাম্মেল একটা নাম কেটে দিল, ওপরে আরেকটা বসাল, তারপর পেন্সিল কামড়ে ধরে ভালো করে দেখে নিল লেখাটা পড়া যাচ্ছে কি না।
পুরো কাগজে ওই একটা জিনিসই তাঁকে শুধরাতে দেওয়া হলো।
: আর কী লেখা আছে?
: শেষে সময় লেখা।
: কীসের সময়?
: ভোর পাঁচটা তেইশ।
: কীসের সময় জিগাইলাম।
: সময় লেখা আছে স্যার। কীসের, ওইটা লেখা নাই।
সরকার সাহেব দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাতে চাইলেন। সিঁড়িঘর থেকে দেয়ালঘড়ি দেখা যায় না, ওটা উপরের করিডোরে ঝোলানো। তিনি মনে মনে হিসাব করলেন। চার নম্বর টেলিফোন নামিয়েছেন পাঁচটা বারোয়। তারপর করিডোর, তারপর জানালা, তারপর আট নম্বর ধাপ।
: কাগজ টাইপ হইছে কখন?
: রাইতে।
: রাইতে কয়টায়?
: বারোটার পরে।
সরকার সাহেবের বুকের ভেতর যে ভেজা বালিশ বসে ছিল, সেটা এই প্রথম নড়ল না, বাড়লও না। শুধু জায়গা বদলাল।
: কাগজ কে দিছে তোগো?
: যে দিছে সে বাইরে আছে।
: বাইরে মানে গেটের বাইরে?
: বাইরে মানে বাইরে স্যার।
সরকার সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁ দিকে তাকালেন।
বোয়ালমারীর ছেলেটা সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে নেই। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে, আর বাঁ পায়ের বুট মেঝেতে ঘষছে ধীরে ধীরে, ছেঁড়া ফিতার গিঁটওয়ালা পা। বছর কয়েক আগে এই ছেলে সাড়ে সাত মাইল হেঁটে রাতের ভেতর এই বাড়িতে দুই লাইনের একটা খবর পৌঁছে দিয়েছিল। আজ রাতেও বাইরে থেকে এই বাড়িতে একটা কাগজ এসেছে, এবং সেটাও এই ছেলেই বয়ে এনেছে।
সরকার সাহেবের এবার নামটা মনে পড়ল। মনে পড়ল, কিন্তু তাতে কিছু হলো না। তিনি নামটা বললেন না। বলার মতো কেউ ওই সিঁড়িঘরে ছিল না।
৪
: তোরা তো শপথ নিছিলি।
: নিছিলাম স্যার।
: শপথে কী লেখা আছিল, মনে আছে?
: মনে আছে।
: তাইলে?
মোজাম্মেল কাগজ চার ভাঁজ করে বুকপকেটে ঢুকিয়ে রাখল। পকেটের বোতাম লাগাল। তারপর দুই হাত হাঁটুর ওপর রেখে সামনের দিকে ঝুঁকল, যেভাবে গ্রামের সালিশে বসা লোক ঝোঁকে যখন তারা জানে শেষ পর্যন্ত তাদের কথাই টিকবে।
: তাইলে আসল কথায় আসি স্যার। আমরা একটা ব্যবস্থা করছি।
: কী ব্যবস্থা।
সরকার সাহেব প্রশ্নটা করে ফেললেন। প্রশ্নটা করার পর তাঁর মনে হলো, তার আগের প্রশ্নটার উত্তর তিনি পাননি, এবং সেটা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে গেলেন যে কী প্রশ্ন করেছিলেন। কাঁধের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেল। যা মনে থাকে না তার ভার বইতে হয় না, এই সুবিধা তাঁকে কেউ দেয়নি, নিজের শরীর দিয়েছে।
: এইবার আমরা চালামু। দুর্নীতিবাজ একটাও থাকব না। প্রথম তিন মাসে চাইরশ জনরে ধরুম।
: নাম আছে?
: আছে স্যার।
: দেখা।
মোজাম্মেল ব্যাগে হাত ঢোকাল। হাত ভেতরে থাকল কয়েক মুহূর্ত, নড়ল, তারপর বেরিয়ে এল। খালি।
: লিস্ট গাড়িতে।
: গাড়ি কই।
: গেটের বাইরে।
সরকার সাহেব গেটের কথা আর তুললেন না।
: আপনের কিছু করন লাগব না স্যার। আপনে খালি ছায়া হইয়া থাকবেন।
: ছায়া মানে।
: মানে আপনে থাকবেন, কিন্তু সামনে থাকবেন না। কাঁঠালবাড়ি চিনেন? শিরিষা নদীর পাড়ে। ওইখানে টিনের ঘর তুলছি আমরা। চার চালা, বারান্দা পাকা, দুইটা কড়ইগাছের মাঝখানে। বর্ষায় পানি ঘরের সিঁড়ি পর্যন্ত আসে, তার উপরে ওঠে না, মাপ নিয়া দেখছি।
: ওইখানে কে থাকব।
: আপনে। ভাবি সাহেবা থাকবেন। ছোট বাবুও থাকব। রান্নার লোক দিমু, নাম শুকুরজান, বয়স পঞ্চান্ন, কাঁঠালবাড়িরই মানুষ, মাছ ভালো রান্ধে। আপনে খালি ইজিচেয়ারে বইবেন আর নদীর হাওয়া খাইবেন। সারা জীবন তো জেলেই কাটাইলেন।
সরকার সাহেবের চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। তিনি ভাবলেন সালেহা কতবার বলেছে শহর ছেড়ে দিতে। বলেছে, আমার একটা উঠান লাগবে, বেড়া লাগবে না, খালি উঠান। টুকুর হাঁপানি আছে, শহরের ধুলায় বাড়ে। কাঁঠালবাড়িতে ধুলা কম হওয়ার কথা।
: বাদল আর রতন?
: ওরা ঢাকায় থাকুক। পড়ালেখা করুক। ওগো আর এইসবে ঢোকার দরকার নাই।
: ওরা তো কোনোদিন ঢোকে নাই।
: ঢোকে নাই, কিন্তু নাম আছে। নাম থাকলেই ঢোকা হইয়া যায় স্যার।
: ছোট বাবু পাখি নিতে পারব?
: খাঁচাসহ নিয়া যান। ট্রাকে জায়গা আছে।
তিনি মাথা নাড়লেন। মাথা নাড়তে গিয়ে টের পেলেন ঘাড় একদম নড়ছে না। কিন্তু নাড়ার ইচ্ছাটা ঠিকঠাক মোজাম্মেল পর্যন্ত পৌঁছেছে, কারণ সে যেভাবে উত্তর দিল তাতে বোঝা গেল সে সম্মতি বুঝতে পেরেছে।
৫
মোজাম্মেল কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করল। পুরোনো হলুদ ফাইল, কোণা ছেঁড়া। ভেতরে দুটো কাগজ। ওপরের কাগজে ছাপা অক্ষরে লেখা:
‘ফরম এগারো (খ)। অস্থায়ী প্রত্যাহার ও নিরাপদ অবস্থান সংক্রান্ত সম্মতিপত্র। শাখা: পুনর্বিন্যাস। কার্যকর: স্বাক্ষরের তারিখ হইতে, তবে ঘটনার তারিখ হইতে গণ্য হইবে।’
নিচে ছোট ছোট ঘর করা। নাম, পিতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, প্রত্যাহারের কারণ। কারণের ঘরে আগেই টাইপ করা আছে: ‘জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত বিশ্রাম’।
পাতার নিচে ছোট হরফে চারটি শর্ত লেখা। সরকার সাহেব দুই নম্বর শর্তটা পড়লেন। ‘প্রত্যাহৃত ব্যক্তি নিজের প্রত্যাহার সম্পর্কে জনসমক্ষে কোনো বিবৃতি দিবেন না, তবে পরামর্শ চাহিলে পরামর্শ দিতে বাধ্য থাকিবেন।’ তিন নম্বরে লেখা, ‘পরামর্শ গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত।’ চার নম্বর শর্তটা পড়া গেল না, ওই জায়গাটাতে কালি লেপ্টে গেছে।
: চাইর নম্বরে কী লেখা।
: ওইটা নিয়া মাথা ঘামাইয়েন না। ওইটা আমাগো ভিতরের ব্যাপার।
: সই কই করুম।
: সই করন লাগব না। সইয়ের নিয়ম গত সপ্তাহে বাতিল হইছে। আপনে টিপসই দেন।
: কেন বাতিল হইল।
: সই মানুষে নকল করতে পারে। টিপ পারে না।
সরকার সাহেব ডান হাত তুলতে চাইলেন। হাত উঠল না। পিতলের বাটা তখনো আঙুলে ধরা। নূরু এগিয়ে এসে তার কনুইয়ের নিচে হাত দিল। আলতো করে হাতটা তুলল, বুড়ো আঙুল ধরে কালির প্যাডে চাপ দিল, তারপর কাগজের নির্দিষ্ট ঘরে। কাজটা সে খুব যত্ন নিয়েই করল। আঙুল কাগজে বসানোর পর একটু ঘুরিয়ে দিল, যাতে ছাপটা পরিষ্কার ওঠে। তারপর হাতটা ঠিক আগের জায়গায়, বাটার ওপরেই নামিয়ে দিল।
সরকার সাহেব নূরুর মুখের দিকে তাকালেন। দেখলেন ছেলেটা দরদর করে ঘামছে। বৃষ্টির এই শীতল ভোরে সিঁড়িঘরে ঘামার কোনো কারণ নেই। ততক্ষণে মোজাম্মেল দ্বিতীয় কাগজ বের করেছে।
৬
দ্বিতীয় কাগজে কোনো ছাপা লেখা নেই। খালি সাদা কাগজ, উপরে হাতে লেখা একটা শব্দ, তালিকা।
: এইবার কয়টা নাম কন।
: কীসের নাম।
: কারা থাকব। নতুন ব্যবস্থায় কারা কাজ করব। আপনের পছন্দের লোক। আমরা রাখুম।
সরকার সাহেবের ভালো লাগল। এটাই তো তিনি চাইছিলেন সারা জীবন, যে কেউ একজন কাগজ আর কলম নিয়ে সামনে বসে জিজ্ঞেস করবে কাকে রাখা উচিত। তিনি বলতে শুরু করলেন। শুরুতে ধীরেসুস্থে, তারপর বেশ দ্রুত। তোফাজ্জল সাহেব, কারণ লোকটা সৎ এবং সৎ বলেই একা। কমরউদ্দিন, রেলের, কারণ সে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করতে পারে। পাটগাতীর নাদিম, বয়স কম কিন্তু জটিল হিসাব বোঝে। কুষ্টিয়ার একজন ডাক্তার, নাম মনে পড়ছে না, চেহারা মনে আছে, বাঁ গালে বসন্তের দাগ... ছয় নম্বর, সাত নম্বর, আট...
মোজাম্মেল লিখে যাচ্ছে। প্রতিটা নামের পাশে ছোট করে কিছু একটা লিখছে, সংখ্যা না অক্ষর দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
এগারোটা নাম হওয়ার পর সরকার সাহেব থামলেন। থামার কারণ ক্লান্তি নয়। কারণ, তিনি টের পেলেন প্রতিটা নাম বলার পর সেই নাম তার মাথা থেকে মুছে যাচ্ছে। তোফাজ্জল সাহেবের চেহারা তিনি আর মনে করতে পারছেন না। কমরউদ্দিন কোন লাইনে কাজ করে, ভুলে গেছেন। যেন কাগজে নাম ওঠা আর মগজ থেকে নাম মুছে যাওয়া একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
: আরো কন।
: থাক।
: থাকব ক্যান। আরেকটা লিস্ট আছে। এইটা সোজা।
: কী লিস্ট।
: আপনের আপনজনের নাম। কে কে আপন। প্রয়োজন হইলে জানানো হইব।
সরকার সাহেব বললেন, সালেহা।
মোজাম্মেল লিখল।
তিনি বললেন, টুকু। বাদল। রতন।
মোজাম্মেল তিনটা নাম লিখল, তিনটার পাশে তিনটা আলাদা চিহ্ন দিল।
তিনি বললেন, বড় বোন হাসনা বানু, থাকে গোপালদি।
মোজাম্মেল লিখল, তারপর মুখ তুলল।
: আর।
সরকার সাহেব ভাবতে চাইলেন। নামগুলো আসছে না। যে ঘরটায় নাম রাখা থাকত সেই ঘর খালি হয়ে গেছে, দরজা খোলা, ভেতরে আসবাব নেই। তিনি বুঝতে পারলেন প্রথম তালিকা যা করেছে দ্বিতীয় তালিকাও তাই করছে, শুধু দ্রুত। তিনি সালেহার মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন এবং মনে পড়ল একটা শাড়ির পাড়, সবুজ, তাও ঝাপসা। মুখ হারিয়ে ফেলেছেন।
: শেষ একটা লিস্ট স্যার। লগে কী কী নিবেন।
এটা সহজ প্রশ্ন এবং সরকার সাহেব স্বস্তি বোধ করলেন। তিনি বলতে শুরু করলেন। বইয়ের আলমারির তিন নম্বর তাক, পুরোটা। ইজিচেয়ার, বেতের, হাতলে সুতা খুলে গেছে, ঠিক করে নেওয়া যাবে। সালেহার সেলাই মেশিন। টুকুর ইনহেলার, দুইটা, একটা ব্যাগে একটা পকেটে। আর পাখির খাঁচা।
তারপর হঠাৎ তার একটা খুব প্রিয় জিনিসের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ার পর তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
খাতা। তিনটা বাঁধাই করা খাতা। প্রথমটার মলাটে জলের দাগ। একশ চোদ্দ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লেখা হয়েছে, তারপর বন্ধ। সালেহা খাতাগুলো আলমারির নিচের তাকে শীতের কাঁথার ভাঁজে লুকিয়ে রাখে, কারণ একবার একটা খাতা হারিয়ে গিয়েছিল, আর পাওয়া যায়নি। ওই একশ চোদ্দ পৃষ্ঠার পর যা যা লেখার কথা ছিল, সেই অসম্পূর্ণ অংশটুকু কখনো মিথ্যা হওয়ার সুযোগ পায়নি বলেই তিনি ওটাকে চিরকাল সত্য ধরে রেখেছেন। কাঁঠালবাড়িতে বসে বাকিটা লিখে ফেলা যাবে। নদীর পাড়ে সকালবেলায় লেখার জন্য দারুণ আলো থাকে।
: খাতা। তিনটা।
: খাতা লিখলাম।
: আর।
তিনি ভাবলেন। পাঁচ নম্বরের পর ছয় নম্বর জিনিস মনে পড়ল না। বইয়ের তাকে কী কী বই ছিল, সেটাও আর মনে পড়ছে না। ইজিচেয়ারের হাতলের সুতা কোন পাশে খুলেছিল, ডান না বাঁ, সেটা নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন, কিন্তু কোনো কূলকিনারা পেলেন না।
: পাঁচটাই থাক।
: পাঁচটাই লিখলাম। যা বলবেন সব লিখুম, না বলা জিনিস তো আর লেখা যায় না।
সরকার সাহেব বললেন:
: উপরে খবর দিছস?
: উপরে খবর দেওয়া হইছে স্যার।
: কে দিল।
: আমরাই দিছি। আগে দিছি।
শীত তখন তখন কণ্ঠনালী বেয়ে গলার দিকে উঠছে। ধীরে, জোয়ারের পানি যেভাবে খাল বেয়ে একটু একটু করে ওপরে ওঠে, কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়া, নিখুঁত নিয়মে। তিনি ভাবলেন উঠে দাঁড়াই। কাঁঠালবাড়ির ট্রাক নিশ্চয় গেটে দাঁড়িয়ে আছে। সালেহাকে ডেকে বলতে হবে টুকুর ইনহেলার যেন ব্যাগে থাকে, আর খাঁচার নিচের ট্রে যেন খুলে আলাদা করে নেওয়া হয়, নইলে ট্রাকের ঝাঁকুনিতে ময়লা পড়বে।
তিনি উঠতে গেলেন।
৭
শরীরটা বড্ড হালকা লাগছে। এত হালকা যে প্রথমে তিনি ভাবলেন উঠে দাঁড়িয়েছেন। তারপর দেখলেন চোখের সামনে সিঁড়ির রেলিং। রেলিং যদি চোখের সামনে থাকে, তবে তো তিনি দাঁড়াননি।
তিনি নিচের দিকে তাকালেন।
তাঁর পরনের ধূসর শার্টটা আর ধূসর নেই। বুকের ডান পাশ থেকে শুরু করে নিচের দিকে কাপড়ের রং পুরোপুরি বদলে গেছে। সেই গাঢ় লাল রং নামতে নামতে লুঙ্গির কোমর পর্যন্ত ভিজে চপচপে হয়ে গেছে। রক্ত কেবল কাপড় বেয়ে নামছে না, কাপড় চুঁইয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় সিঁড়িতে পড়ছে। আর ধাপগুলো পাথরের বলে সেই রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে যাচ্ছে ছয় নম্বরে, পাঁচ নম্বরে, চার নম্বরে...
যেটাকে তিনি এতক্ষণ মাঘ মাসের নদীর হাওয়া ভেবেছিলেন, সেটা আসলে হাওয়া ছিল না।
তিনি মুখ তুললেন।
সামনে দাঁড়ানো মোজাম্মেলের মুখে আর সেই বিনীত শান্ত ভাবটা নেই। মুখ বলতে যা বোঝায় তা-ও নেই, আছে কেবল দাঁত, শক্ত হয়ে ওঠা চোয়ালের হাড় আর দুটো চোখ। চোখ দুটো এত লাল যে সাদা অংশ খুঁজে পাওয়াই দায়। সে তিন নম্বর ধাপে বসে নেই, দুই পা ফাঁক করে সোজা দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতের অস্ত্রটা দেয়ালে ঠেস দেওয়া নেই, বরং কাঁধের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরা। নূরু তার কনুই ধরে নেই। নূরু দাঁড়িয়ে আছে সাত হাত দূরে, অস্ত্রের নল ওপরের দিকে তাক করা।
কোথাও কোনো হলুদ ফাইল নেই। কালির প্যাড নেই। কোনো তালিকা কোথাও লেখা হয়নি। কথাও হয়নি। কোনো কথাই হয়নি।
এতক্ষণ সিঁড়িঘরে বসে যে ভদ্র, গোছানো বাক্যগুলো তিনি শুনেছিলেন, সেগুলো এখন হুড়মুড় করে ভেঙে গিয়ে নিজেদের আসল চেহারায় ফিরে যাচ্ছে। ফিরে গিয়ে পরিণত হচ্ছে একটানা বিকট ধাতব শব্দে, ব্রাশফায়ারের শব্দ। এমন শব্দ যার শুরু আছে কিন্তু ভেতরে দম নেওয়ার কোনো ফাঁক নেই। ‘বাপের মতন’, ‘গেটে ঢুকতে দেয় নাই’, ‘বানানও ঠিক আছে’, ‘এইটা পড়নের কাগজ’, ‘বাইরে মানে বাইরে’, ‘নাম থাকলেই ঢোকা হইয়া যায়’, সব কটা মায়াবী বিভ্রম একসঙ্গে গলে গিয়ে ওই বারুদের গর্জনে পরিণত হলো।
তার চশমাটা নাক থেকে খসে এসে ঠোঁটের ওপর আটকে আছে। এক ডাঁটি কানে, আরেক ডাঁটি শূন্যে ঝুলছে। কাঁচের বাঁ দিকের অংশে একটা ফাটল, এই ফাটল আগে ছিল না। ফাটলের এপাশ আর ওপাশ দিয়ে সিঁড়িঘর দুই ভাগ হয়ে গেছে, আর দুই ভাগে দাঁড়ানো ঘাতকের সংখ্যা মিলছে না। এক পাশে চারজন, অন্য পাশে চারজন। তিনি দুইবার গুনলেন। আটজন কোথা থেকে এল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি মাঝপথেই ভুলে গেলেন যে তিনি আসলে কী খুঁজছিলেন।
মোজাম্মেলের বুকপকেটে কোনো কাগজ নেই। কোথাও কোনো কাগজ নেই। কিন্তু কাগজের শেষ লাইনটা এখন পড়া যাচ্ছে, কারণ ওই লাইন কাগজে লেখা থাকার আর দরকার পড়ে না। উক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে।
দোতলা থেকে আওয়াজ আসছে। আওয়াজ আগেও আসছিল, তিনি ঘোরের মধ্যে শুনতে পাননি। সালেহার গলা একবার শোনা গেল, তারপর সব চুপ।
বাদলের ঘরের দরজা ভাঙার শব্দ। দরজাটা পুরোনো সেগুন কাঠের, ভাঙতে একটু সময় লাগছে। টুকুর গলা শোনা গেল। ছেলেটা ভয়ে মন্টুর নাম ধরে ডাকছে। একবার, দুইবার, তিনবার। ডাকের ভেতর ঠিক ভয় নেই, একটা বিরক্তি আছে। পাখি খাঁচার ভেতর অকারণে ডানা ঝাপটালে আর কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে যেমন বিরক্তি লাগে, তেমন। তারপর ওই ডাকও থেমে গেল।
লোকগুলো বুট জুতো বাজিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ওঠার সময় কেউ কেউ তাঁর পা ডিঙিয়ে গেল। একজন ডিঙাল না, পায়ের ওপর দিয়েই বুট চেপে চলে গেল। ইচ্ছে করে নয়, বীভৎস তাড়াহুড়োয়।
সরকার সাহেব বুঝতে পারলেন, তিনি আসলে কোথাও যাচ্ছেন না। কাঁঠালবাড়ির কোনো ট্রাক গেটে দাঁড়িয়ে নেই। কারণ কাঁঠালবাড়ি বলে পৃথিবীতে কোনো জায়গা নেই, শিরিষা নদীও নেই, আর শুকুরজান নামে পঞ্চান্ন বছরের যে মহিলা মাছ ভালো রাঁধে, সে কোনোদিন জন্মায়নি। তাঁর বুড়ো আঙুলে কালির কোনো ছাপ নেই।
শেষ যে কথাটা তাঁর মাথায় এল, সেটা কোনো দর্শন বা স্মৃতি নয়, স্রেফ একটা হিসাব। উনিশ ধাপের সিঁড়ি, তিনি নেমেছিলেন বারো ধাপ। বাকি সাত ধাপ কেউ একজন নামবে, আজ হোক কি কাল হোক। এবং সেই নাম না জানা লোকটা ধাপগুলো গুনবে কি না, তা নিয়ে তাঁর আর মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
পিতলের পানের বাটাটা তাঁর অসাড় হাত থেকে খসে পড়ে চার নম্বর ধাপে গিয়ে থেমেছে। কবজা ঢিলা বলে ধাক্কা লেগে ঢাকনাটা খুলে গেছে। ভেতরের সাদা চুন ছড়িয়ে পড়েছে পাথরের ওপর। সেই ছড়ানো চুনের ওপর দিয়ে গড়িয়ে আসছে তাজা রক্তের ধারা। চুনের ওপর পড়ে রক্তের লাল রংটা একটু যেন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। চুনের কিনারা ধরে একটা পিঁপড়ে ওপরের দিকে উঠছিল। রক্তের ধারা তাকে ভাসিয়ে দিয়ে নিচের ধাপে নামিয়ে দিল। পিঁপড়েটা কিছুক্ষণ মরাটের মতো পড়ে থাকল, তারপর আবার লড়াকু ভঙ্গিতে উঠতে শুরু করল, ঠিক একই পথে।
দোতলার জানালার গ্রিলে খাঁচা ঝুলছে। খাঁচার দরজা বন্ধ। ভেতরে শালিক পাখিটা দাঁড়ের এক কোণে সরে গিয়ে সিঁটিয়ে আছে। তার ঠোঁট পালকের নিচে গোঁজা নয়, বাইরে। বাইরে তখনো টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, আর গাছ থেকে টুপটাপ পানি পড়ার শব্দ বৃষ্টির শব্দের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
৮
ফরম এগারো (খ), ক্রমিক ৪১৯।
প্রাপ্তির সময় লেখা হয়নি। প্রত্যাহৃত ব্যক্তির নাম ও পিতার নাম টাইপ করা, ঠিকানার দুই ঘরই খালি। প্রত্যাহারের কারণের ঘরে ছাপা লেখা অপরিবর্তিত। টিপসইয়ের ঘর খালি। সাক্ষী স্বাক্ষরের ঘর খালি।
সংযুক্তি হিসেবে দুটি তালিকার কথা বলা আছে, তালিকা দুটি ফাইলে পাওয়া যায়নি। তৃতীয় তালিকার উল্লেখ কোথাও নেই।
চার নম্বর শর্তের জায়গায় কালি ছড়ানো। ওই শর্ত কী ছিল, সেই তথ্য সংরক্ষিত নয়।
মন্তব্য কলামে বাঁকা হাতের লেখায় শুধু লেখা: ফাইল রাখিতে হইবে।
তারিখের ঘর খালি, কারণ যিনি তারিখ বসাইবেন তিনি তখনো ঠিক হন নাই।
©somewhere in net ltd.
১|
১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০১
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: সরকার সাহেব আজকের দিনের জন্য কি উত্তর দেবেন ?