| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

কাগজিটোলার লোকজন এখন আর ঠিক মনে করতে পারে না যে লোকটাকে তারা প্রথম কবে দেখেছিল। কেউ বলে ২০১১ সনের কার্তিক মাসের ঘটনা, কসাই জুম্মনের মেজো মেয়ের বিয়ের হপ্তাখানেক আগের কথা। কেউ বলে তারও আগে, যে বছর ধোলাইখালের মোড়ে ট্রান্সফরমার ফেটে দুইজন মানুষ মরে গিয়েছিল, সেই বছরের আশ্বিন মাসে। তবে এই বিষয়ে তারা সকলে একমত যে, লোকটাকে প্রথম দেখা গিয়েছিল গলির মুখে, নামফলকের নিচে। লোকটা তখন ইস্কুলের ব্যাগ কাঁধে ক্লাস থিরির এক ছেলেকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, বাজান, এই ফলকে কী লেখা।
ছেলেটা বানান করে পড়েছিল, শ-হী-দ আ-স-ম-ত আ-লী গ-লি।
লোকটা অনেকক্ষণ ফলকের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীল টিনের উপর সাদা এনামেলের হরফ, বৃষ্টিতে ধুয়ে ধুয়ে অক্ষরগুলির কিনারা ক্ষয়ে গেছে, তবু পড়া যায়। তারপর এমন গলায়, যেন সে ছেলেটাকে নয় ফলকটাকেই বলেছিল, "আমি আসমত আলী।"
ছেলেটা প্রথমে কিছু বোঝে নাই, তারপর হি হি করে হেসে দৌড় দিয়েছিল। সে বাসায় গিয়ে তার মাকে বলেছিল যে, গলির মুখে এক পাগলা বুড়া আসছে, কয় সে নাকি শহীদ আসমত আলী। ছেলের মা ভাতের মাড় গালতে গালতে বলেছিল, শহীদ মানুষ কি ফিরা আহেরে বলদ। এই কথার ভেতর দিয়েই সংবাদটা কাগজিটোলার এক উনুন থেকে আরেক উনুনে, এক কার্নিশ থেকে আরেক কার্নিশে ছড়িয়ে পড়ল। কারণ মহল্লায় কোনো কথা একবার এক মুখে উঠলে তা আর সেই মুখে থাকে না।
লোকটার পরনে খাকি রঙের ময়লা পাঞ্জাবি আর চেক লুঙ্গি, এক পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, আরেক পা খালি। কাঁধে পলিথিনে মোড়ানো একটা পুঁটলি, দড়ি দিয়ে বাঁধা। তার দাড়ি ছিল শনের মতো সাদা আর জট পাকানো। তার চোখের দিকে তাকালে কাগজিটোলার লোকজনের মনে হতো, লোকটা তাদের দেখছে না, তাদের পিছনে অন্য কিছু দেখছে, হয়তো চল্লিশ বছর আগের কোনো দেয়াল, যেই দেয়াল এখন আর নাই।
লোকটা সেদিন গলির ভেতরে ঢুকে সোজা হেঁটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল তিনতলা হাসমত মঞ্জিলের সামনে। যে দালানের নিচতলায় টাইলসের দোকান, দোতলায় ভাড়াটিয়া, তিনতলায় হাসমত আলী নিজে থাকে। দালানের দিকে তাকিয়ে থেকে সে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করেছিল, নিমগাছটা কই? উঠানের কুয়া কই? যখন জটলার ভেতর থেকে কেউ একজন বলেছিল, এইখানে কোনোদিন কোনো নিমগাছ ছিল না, তখন লোকটা মাথা নেড়ে বলে, ছিল। কুয়ার পাড়ে নিমগাছ ছিল, গাছের গোড়ায় শিল-পাটা ধোয়া হইতো, আষাঢ় মাসে নিমের পাতায় পানি জমলে টুপটুপ কইরা কুয়ার মইদ্যে পড়ত। কাগজিটোলার লোকজনের ভেতর যারা বয়স্ক ছিল, তারা তখন চুপ করেছিল। কারণ তাদের মনে পড়েছিল যে, সত্যিই নিমগাছ ছিল, এবং কাটা হয়েছিল আটাশি সনের বন্যার পরের বছর, দালানের ভিত খোঁড়ার সময়।
তখন কলাপসিবল গেট খুলে হাসমত আলী নিচে নেমে আসে। হাসমত আলী, যার বয়স তখন পঁয়ষট্টি, মাথায় গোল টুপি, মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার। সে ভিড় ঠেলে সামনে এসে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। কাগজিটোলার লোকজন, যারা সেদিন খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা পরে বলাবলি করেছিল যে, তাকানোর পর মুহূর্তখানেকের জন্য হাসমত আলীর মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে শুকনা খড়ের মতো হয়ে গিয়েছিল। তবে সেটা মুহূর্তখানেকের জন্যই; তারপর হাসমত আলী গলা চড়িয়ে বলেছিল, "এই পাগলরে গলির মইদ্যে ঢুকতে দিছে ক্যাডা? এই, ওই, বাইর কর অরে।"
লোকটা নড়ে নাই। সে হাসমত আলীর চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিল, "হাসু, তর ঘাড়ের ফোঁড়ার দাগ আছেনি অহনো? ছোডোকালে বাজানে ফোঁড়া গালাইছিল জাম্বুরার কাঁটা দিয়া, তুই তিন দিন কানছিলি।"
হাসমত আলী এই কথার কোনো উত্তর দেয় নাই। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে গেটের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, এবং গেটে তালা লাগানোর শব্দ এত জোরে হয়েছিল যে, জটলার লোকজন কেঁপে উঠেছিল।
আসমত আলীর কথা কাগজিটোলার লোকজন জানত, যেভাবে মানুষ নিজের হাতের তালুর কথা জানে, না তাকিয়েই। একাত্তর সনে, বৈশাখ মাসের শেষে, ধোলাইখালের লেদ কারখানার মিস্ত্রি আসমত আলী একদিন সকালে কাজে গিয়ে আর ফেরে নাই। কেউ বলেছিল মিলিটারি তাকে সদরঘাটের দিকে ধরে নিয়ে গেছে, কেউ বলেছিল সে নিজেই নৌকায় উঠে ওপারে গেছে যুদ্ধে। কেউ কেউ নিচু গলায় অন্য কথাও বলেছিল, তবে নিচু গলার সেই কথাগুলি বড় গলার কথাগুলির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন সবাই ফিরল এবং আসমত আলী ফিরল না, তখন মহল্লা ধরে নিয়েছিল সে শহীদ। এই ধরে নেওয়া বছরে বছরে এমন শক্ত হয়ে জমেছিল যে, ছিয়ানব্বই সনে ওয়ার্ড কমিশনার মকবুল হোসেন যখন গলির নাম দরকার বলে ঠিক করল, তখন শহীদ আসমত আলীর নামই সবার আগে উঠে এসেছিল। কারণ প্রত্যেক মহল্লার একজন শহীদ লাগে, এবং কাগজিটোলার ভাগে ছিল ওই একজনই।
নামফলকের নিজেরও ইতিহাস আছে। ফলক লেখার ভার পড়েছিল সাইনবোর্ড-মিস্ত্রি সোনা মিয়ার উপর। সোনা মিয়া প্রথমবার লিখেছিল "শহিদ", হ্রস্ব ই-কার দিয়ে। কমিশনারের লোক এসে বলেছিল, বানান ভুল, শহীদ হইব দীর্ঘ ঈ দিয়া। সোনা মিয়া তর্ক করেছিল যে, পত্রিকায় দুই রকমই লেখে; তারপরও তাকে রঙ ঘষে তুলে নতুন করে লিখতে হয়েছিল। লিখতে লিখতে সে বিড়বিড় করে বলেছিল যে, মরা মাইনষের বানান লইয়া জ্যান্ত মাইনষের এত টানাটানি ক্যান, সেইটা সে বোঝে না। মিস্ত্রি সোনা মিয়া বহু আগে মরে গেছে, কিন্তু তার দীর্ঘ ঈ-কার গলির মুখে থেকে গেছে, সেই ঈ-কারের নিচে বসেই সেই লোক তার সংসার পাতল।
সে অন্যকোথাও গেল না। কাগজিটোলার লোকজন দেখল, সে রাতে নামফলকের খুঁটির গোড়ায় চটের বস্তা বিছিয়ে শোয়, দিনে খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকে। কেউ জিজ্ঞেস করলে একই কথা বলে, যে কথা সে প্রথম দিন বলেছিল, "আমি আসমত আলী। আমি আমার বাইত যামু।" সে ভিক্ষা করত না; চায়ের দোকানের রশিদ মাঝে মাঝে তাকে বনরুটি আর চা দিত, সে খেত, এবং খাওয়ার পর হাত তুলে রশিদের জন্য দোয়া করত না, শুধু বলত, আসমানে একজন আছে, হে সব দেখতাছে। এই কথায় রশিদের কেমন লাগত, সে বলতে পারত না।
লোকটা কোত্থেকে এসেছে, এই প্রশ্নের উত্তরে কাগজিটোলার লোকজন সময়ে সময়ে বিভিন্ন কাহিনি শুনতে পেয়েছিল। কেউ শুনেছিল, এতকাল পাকিস্তানের জেলে ছিল, করাচি না মুলতান, সেইটা পরিষ্কার না। কেউ শুনেছিল, সে ভারতে ছিল, বসিরহাটের এক মাজারে, মাথা খারাপ অবস্থায়। চল্লিশ বছর পর এক শীতের রাতে মাজারের গাছতলায় ঘুম ভেঙে তার সব মনে পড়ে গেছে। আবার কেউ কেউ বলেছিল, এইসব কিছুই না, সে আসলে ফরিদপুরের এক ধান্দাবাজ, শহীদের ওয়ারিশ সেজে জমি খাওয়া তার পেশা, এর আগে মুন্সীগঞ্জে একবার ধরাও খেয়েছে। লোকটা নিজে এইসব কাহিনির কোনোটাই স্বীকার বা অস্বীকার করে নাই। তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকত, তারপর বলত, "মানুষ কই আছিলাম হেইডা দিয়া কী অইব। মানুষ কই ফিরছে হেইডা দ্যাখো।" এই উত্তরে কাগজিটোলার লোকজনের মেজাজ খারাপ হয়ে যেত, কারণ যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, মানুষ সেই প্রশ্নের প্রশ্নকারীকেই অপছন্দ করতে শুরু করে।
তবে আসল গোলমাল বাধল অন্য জায়গায়। কাগজিটোলার লোকজন হিসাব করে দেখল, লোকটা যদি সত্যি আসমত আলী হয়, তাহলে অনেকগুলি জিনিস আর জায়গামতো থাকে না। শহীদ পরিবারের ভাতার টাকা এতকাল তুলেছে হাসমত আলী, ভাইয়ের ওয়ারিশ হিসাবে, এবং সেই টাকায় অসুবিধার কিছু ছিল না, কারণ মরা ভাইয়ের টাকা জ্যান্ত ভাই খাবে, এইটাই নিয়ম; কিন্তু ভাই যদি জ্যান্ত হয়, তাহলে এতকালের টাকা কী হয়ে দাঁড়ায়, সেই হিসাব করতে গিয়ে মহল্লার লোকজনের মাথা গরম হয়ে যেত। তার উপর ছিল ভিটার ব্যাপার। বাপের আমলের টিনের ঘর ভেঙে হাসমত আলী তিনতলা দালান তুলেছে, দলিলে সবই তার নামে, এবং দলিল কাগজিটোলায় কোরআন শরিফের পরেই সবচেয়ে পবিত্র বস্তু। আর ছিল মেহেরুন্নেসা।
মেহেরুন্নেসা, আসমত আলীর বউ, যার বয়স একাত্তর সনে ছিল উনিশ, যার পেটে তখন পাঁচ মাসের সন্তান। আসমত আলী নিখোঁজ হওয়ার চার মাস পরে, অঘ্রান মাসে, মনসুর জন্মেছিল, মনসুর তার বাপের মুখ কোনোদিন দেখে নাই। চুয়াত্তর সনে, দুর্ভিক্ষের বছর, মহল্লার মুরুব্বিরা মিলে মেহেরুন্নেসার নিকা দিয়ে দিয়েছিল হাসমত আলীর সঙ্গে, কারণ ভাবিকে দেবর বিয়ে করলে ধর্মেও আটকায় না, সমাজেও আটকায় না। তাতে এতিম পোলা চাচার ঘরে বাপ পায়। মনসুর বড় হয়েছিল, রেলে চাকরি পেয়েছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কোটায়, কমলাপুরে পোস্টিং, এবং এখন মনসুরের নিজের ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে সরকারি চাকরির ফরম কিনে রেখেছে, সেই ফরমেও দাদার শাহাদতের ঘর পূরণ করা আছে। অর্থাৎ কাগজিটোলার লোকজন দেখল, আসমত আলীর মৃত্যুর উপর দাঁড়িয়ে আছে একটা তিনতলা দালান, একটা সংসার, দুইটা চাকরি, একটা ভাতার বই, আর গলির মুখের একটা নীল ফলক; এবং লোকটা জ্যান্ত ফিরে এসে এই সবগুলির নিচ থেকে মাটি টান দিয়েছে।
তার উপর ছিল গেটের ব্যাপারটা। কমিশনার মকবুল হোসেন ততদিনে কাউন্সিলর হয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে বরাদ্দ পাশ করিয়ে এনেছে গলির মুখে একটা শহীদ স্মৃতি তোরণ বানানোর, উপরে লেখা থাকবে শহীদ আসমত আলীর নাম, উদ্বোধন করতে আসবেন স্বয়ং এমপি সাহেব, ডিসেম্বর মাসে, বিজয় দিবসের সপ্তাহে। মকবুল হোসেন লোকজনকে বুঝিয়ে বলেছিল, এই তোরণ হইল মহল্লার ইজ্জত; এবং সে বলে নাই যে, তোরণের ছবি তার পরের ইলেকশনের পোস্টারেও থাকবে, তবে না বললেও কাগজিটোলার লোকজন বুঝত, কারণ তারা সব বোঝে, শুধু বলাবলি করে না।
ফলে অঘ্রান মাসের এক সন্ধ্যায় মহল্লার ক্লাবঘরে বৈঠক বসল। লম্বা বেঞ্চে বসল কাউন্সিলর মকবুল হোসেন, থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার আফসার উদ্দিন, মসজিদের ইমাম সাহেব, হাসমত আলী। পিছনে দাঁড়াল মহল্লার যত উৎসুক লোক, দরজায়-জানালায় ঝুলে। লোকটাকে ধরে আনা হলো ফলকের গোড়া থেকে, তার পুঁটলিসহ। তাকে বেঞ্চে বসতে দেওয়া হলো না, সে মাটিতেই উবু হয়ে বসল।
কমান্ডার আফসার উদ্দিন, যে নিজে একাত্তরে কোথায় যুদ্ধ করেছিল তা নিয়ে মহল্লায় দুই-তিন রকম কথা চালু ছিল। কিন্তু যার সইয়ে গত পনেরো বছরে এই থানার বহু তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে, সে চশমা কপালে তুলে বলল, "তুমি কও তুমি আসমত আলী। ঠিক আছে। কাগজ দেখাও।"
"কিয়ের কাগজ?"
"যেকোনো কাগজ। আইডি কার্ড, জন্মের সনদ, জমির পর্চা, ইস্কুলের সার্টিফিকেট। একটা কাগজ, যেইখানে লেখা আছে তুমি আসমত আলী।"
লোকটা তখন তার পুঁটলি খুলল। পলিথিনের ভেতর থেকে বের হলো রঙচটা গামছা, পাকিস্তান আমলের দুইটা সিকি, ভাঙা টিনের বাঁশি। আর একটা ছবি, এত ভিজে-শুকিয়ে নষ্ট যে ছবির ভেতরে একটা মানুষের ছায়া ছাড়া কিছু বোঝার উপায় নাই। কমান্ডার আফসার ছবিটা দুই আঙুলে উল্টেপাল্টে দেখে বেঞ্চের উপর রেখে দিল এবং বলল, "এইটা কাগজ না।"
তারপর সে যা বলল, কাগজিটোলার লোকজন তা বহুদিন মনে রেখেছিল। সে বলল, "শোনো মিয়া। শহীদ আসমত আলীর নাম গেজেটে আছে। তালিকায় আছে। সনদ আছে, ভাতার বই আছে, গলির ফলকে আছে। মরা আসমত আলীর কাগজের কোনো অভাব নাই। আর তুমার কোনো কাগজ নাই। তাইলে হিসাব পরিষ্কার। যেই আসমত আলী মরছে, হেয় খাঁটি; আর তুমি, যেহেতু জ্যান্ত, তুমি ভুয়া।"
ক্লাবঘরে কেউ কেউ হেসে উঠল, কিন্তু হাসি জমল না। লোকটা মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ বসে রইল, তারপর মুখ তুলে বলল, "মরা মাইনষের কাগজ থাকে। জ্যান্ত মাইনষের থাকে শরীল।" এবং সে তার বাঁ হাত উঁচু করে দেখাল, তর্জনী আর মধ্যমা থেঁতলানো, বাঁকা হয়ে জোড়া লাগা। সে বলল, ঊনসত্তর সনে লেদ মেশিনে আঙুল দুইটা গেছিল, খালেক ওস্তাদের কারখানায়, খালেক ওস্তাদ তারে মিটফোর্ডে নিছিল রিকশায় কইরা, রিকশাওয়ালার নাম আছিল জব্বার। খালেক ওস্তাদ মরে গেছে, জব্বার রিকশাওয়ালার খোঁজ কেউ জানে না, ফলে আঙুলের সাক্ষী রইল শুধু আঙুল, আর আঙুল তো কাগজ না।
তখন পিছনের ভিড় ঠেলে সামনে এল রজব আলী, মহল্লার সবচেয়ে বুড়া নাপিত, যার হাত কাঁপে বলে সে এখন আর ক্ষুর ধরে না, শুধু দোকানে বসে থাকে। রজব আলী সামনে এসে বলল, "মাথাটা নোয়াও।" লোকটা মাথা নোয়াল, এবং রজব আলী তার কাঁপা কাঁপা আঙুলগুলি লোকটার জটপাকানো চুলের ভেতরে চালিয়ে দিয়ে খুলি টিপে টিপে দেখল, যেভাবে সে পঞ্চাশ বছর চুল কাটার আগে মাথার গড়ন দেখে নিত। ক্লাবঘর তখন এত চুপ যে ধোলাইখালের লেদ মেশিনের একটানা ঘষঘষ শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। রজব আলী হাত সরিয়ে নিল। তারপর সে কারো দিকে না তাকিয়ে, কোনো কথা না বলে, ভিড় ঠেলে ক্লাবঘর থেকে বের হয়ে গেল, এবং এই বিষয়ে তাকে পরে যত বারই জিজ্ঞেস করা হয়েছে, রজব আলী তত বারই বলেছে, তার মনে নাই।
মেহেরুন্নেসাকে আনা হয়েছিল সবার শেষে। সে এসেছিল কালো চাদরে মাথা ঢেকে, ছেলের বউয়ের হাত ধরে। সে সামনে দাঁড়িয়েছিল হাত তিনেক দূরে। লোকটা তাকে দেখে উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল, পারে নাই, হাঁটুতে ভর দিয়ে অর্ধেক উঠে সে বলেছিল, "মেরু!"
কাগজিটোলার লোকজন এই নাম আগে শোনে নাই। তারা জানত মেহেরুন্নেসা, জানত মনসুরের মা, জানত হাসমত সাহেবের বিবি; মেরু নাম এই মহল্লায় চল্লিশ বছরে কেউ উচ্চারণ করে নাই। লোকটা বলল, "মেরু, তোমার ডাইন হাতের কব্জিতে পোড়া দাগ আছেনি? বিয়ার পরথম শীতে ডাইলের কড়াই উল্টায়া পড়ছিল, আমি হলুদ বাটা লাগায়া দিছিলাম, তুমি কানতে কানতে হাসছিলা।"
মেহেরুন্নেসা তার ডান হাত চাদরের ভেতরে টেনে নিল। সে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, কতক্ষণ? সেই হিসাব কাগজিটোলার লোকজন পরে কেউ দশ সেকেন্ড কেউ দশ মিনিট বলেছে। তারপর সে যখন কথা বলল, তার গলা এমন সমান ছিল যেন সে দোকানে ডালের দর জিজ্ঞেস করছে। সে বলল, "আমি এনারে চিনি না।" এরপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে, ছেলের বউয়ের হাত ধরে, যেভাবে এসেছিল সেভাবে চলে গেল।
তখন মনসুর, যে এতক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, চিৎকার করে উঠল যে, আর কী লাগে, মায় কইছে চিনে না, এই ভুয়া বুইড়া শহীদের নাম ভাঙায়া খাইতে আইছে, এরে পুলিশে দেন। মনসুরের গলার রগ ফুলে উঠেছিল। লোকটা মাটিতে বসে অনেকক্ষণ মনসুরের সেই ফোলা রগ, চোয়ালের হাড়, কপালের ভাঁজ দেখল, যেভাবে মানুষ পুরানা আয়নায় নিজের চেহারা দেখে। তারপর সে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল, "বাজান, আমগো বংশের পোলাগো পিঠের বাঁ দিকে জন্ম থিকা একটা জরুল থাকে; তুমার পিঠে..."
কথা শেষ হলো না। মনসুর দুই পা এগিয়ে এসে লোকটার গালে একটা চড় বসাল, এবং চড়ের শব্দ ক্লাবঘরের টিনের চালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। লোকটা পড়ে গেল না, শুধু তার মাথা একদিকে হেলে গিয়ে আবার সোজা হলো, এবং সে আর কোনো কথা বলল না। বৈঠকের রায় হলো, লোকটা ভুয়া, প্রতারক, শহীদের মানহানিকারী; কাউন্সিলর মকবুল হোসেন বলল, মহল্লার ইজ্জতের দিকে চেয়ে এইবারের মতো পুলিশ-কেস দেওয়া হলো না, তবে কালকে সকালের মধ্যে এই লোক যেন কাগজিটোলা ছেড়ে চলে যায়।
লোকটা কাগজিটোলা ছেড়ে গেল না। সে গেল ফলকের নিচে।
সেই ডিসেম্বরে তোরণ হলো না। বরাদ্দের টাকা ছাড়তে দেরি হলো, ঠিকাদার বদল হলো, তারপর ইট-বালুর দাম বাড়ল। বিজয় দিবস চলে গেল, গলির মুখে দুইটা বাঁশের খুঁটি পোঁতা হয়েই পড়ে রইল, আর কাউন্সিলর মকবুল হোসেন যাকে সামনে পেত তাকেই বলত, আগামী বছর, ইনশাআল্লাহ, আগামী বছর।
কাগজিটোলার লোকজন ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে গেল। মানুষ সব কিছুতে অভ্যস্ত হয়, নর্দমার গন্ধে, লেদ মেশিনের শব্দে, লোডশেডিংয়ে; ফলকের নিচের বুড়োতেও তারা অভ্যস্ত হয়ে গেল। শীত গেল, বৈশাখের ঝড়ে ফলকের টিন বাজল ঝনঝন করে, আষাঢ়ে খুঁটির গোড়ায় পানি জমল আর লোকটা রশিদের দোকানের বেঞ্চির তলায় রাত কাটাল, আবার শীত এল। মহল্লার পোলাপান তাকে খ্যাপাত, আসমইত্তা পাগলা, ও আসমইত্তা পাগলা, তর গলির নাম ক দেহি! এইভাবে কাগজিটোলার লোকজন তাকে শেষ পর্যন্ত সেই নামেই ডাকতে শুরু করল, যেই নাম তারা তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল; তবে ফেরত দিল পাগলের নাম হিসাবে, কারণ পাগলের মুখে সব নাম মানায়, পাগলের কোনো কাগজ লাগে না।
আর এই সময়েই কাগজিটোলার লোকজন ভোরবেলার দৃশ্য দেখতে শুরু করেছিল। ফজরের আজানের পর, যখন কুয়াশায় গলির ওই মাথা থেকে এই মাথা দেখা যায় না, তখন হাসমত মঞ্জিলের ছোট গেট খুলে যেত। কালো চাদরে মাথা ঢাকা এক স্ত্রীলোক ঢাকনা-দেওয়া থালা হাতে গলির মুখ পর্যন্ত হেঁটে যেত। ফলকের খুঁটির গোড়ায় থালা নামিয়ে রেখে, একটা কথাও না বলে, ফিরে আসত। থালায় থাকত ভাত, ডাল, কোনোদিন এক টুকরা মাছ। মহল্লার যারা ফজরের নামাজে যেত, তারা এই দৃশ্য দেখত, এবং দেখত না। অর্থাৎ তারা দেখত ঠিকই, কিন্তু বাসায় ফিরে বউকে বলত না, দোকানে বসে আলাপ করত না, কারণ কাগজিটোলার লোকজন জানত, কিছু কিছু দৃশ্যের কথা মুখে আনলে মহল্লায় আর বাস করা যায় না। শুধু ইমাম সাহেব একদিন ফজরের পর হাসমত আলীকে আলগোছে জিজ্ঞেস করেছিল, ভাবিসাব ভোরবেলা কই যায়; হাসমত আলী চোখ নামিয়ে বলেছিল, ফকির-মিসকিনরে খাওয়াইলে বালা-মুসিবত কাটে, হুজুর, আপনেই তো ওয়াজে কইছিলেন।
পরের ডিসেম্বর যত এগিয়ে এল, তোরণের কাজে তত গতি এল, এইবার আর টাকা আটকাল না। বাঁশের ভারা উঠল, ইট গাঁথা হলো, মিস্ত্রিরা সিমেন্টের উপর রঙ চড়াল। কাউন্সিলরের লোকজন এসে হিসেব করে দেখল, এমপি সাহেবের গাড়ি যেখানে থামবে, ফিতা যেখানে কাটা হবে, ঠিক সেইখানে, ফলকের গোড়ায়, বুড়োটা বসে থাকে। উদ্বোধনের তিন দিন আগে তাই পুলিশের পিকআপ এসে তাকে তুলে নিয়ে গেল; মারধর করল না, শুধু তুলে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর ওদিকে কোথাও নামিয়ে দিয়ে এল, যেভাবে মানুষ বিড়াল ফেলে আসে। এবং বিড়াল যেভাবে ফেরে, লোকটা সেভাবে ফিরল দুই দিন পর, উদ্বোধনের আগের রাতে, খালি পায়ে, কুয়াশা মাথায় নিয়ে, এবং ভোরবেলা কাগজিটোলার লোকজন তাকে আবার ফলকের নিচে দেখতে পেল।
তবে সেই ভোরে লোকটা আর উঠে বসল না।
সে খুঁটি দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কাত হয়ে পড়ে ছিল, যেভাবে ছোট পোলাপান ঘুমের মধ্যে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, এবং তার গায়ে পৌষের কুয়াশা শিশির হয়ে জমে ছিল। তার পাশে ঢাকনা-দেওয়া থালা রাখা ছিল, ভাত ছোঁয়া হয় নাই। একটা কাক থালার কিনারে বসে ঢাকনা ঠোকরাচ্ছিল। রশিদ দোকান খুলতে এসে প্রথম দেখল, তারপর ভিড় জমল, ভিড় পাতলাও হয়ে গেল, কারণ মরা মানুষের কাছে জ্যান্ত মানুষের বেশিক্ষণ কাজ থাকে না। পুলিশ এল, সুরতহাল হলো। যেহেতু লাশের কোনো দাবিদার পাওয়া গেল না, সন্ধ্যার আগে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের গাড়ি এসে লাশ তুলে নিল। খাতায় লেখা হলো: অজ্ঞাত পুরুষ, বয়স আনুমানিক সত্তর। যে মানুষের নামে আস্ত এক গলি, তাকে জুরাইনে দাফন করা হলো নম্বর-লেখা কবরে, নামহীন। কবরের নম্বর কাগজিটোলার কেউ কোনোদিন জানতে চায় নাই। হাসমত মঞ্জিলের গেট সেদিন সারাদিন বন্ধ ছিল।
গাড়ি যখন লাশ নিয়ে গলির মুখ ঘুরছিল, তখন হাসমত মঞ্জিলের তিনতলার বারান্দায় কালো চাদরের স্ত্রীলোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। সে নামে নাই, ডাকে নাই, শুধু গাড়িটা ধোলাইখালের মোড় পার হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর ভেতরে চলে গিয়েছিল। আর হাসমত আলী সেই বৃহস্পতিবার মসজিদে মিলাদ দিয়েছিল, জিলাপি বিতরণ হয়েছিল, এবং মুসল্লিদের কেউ একজন যখন জিজ্ঞেস করেছিল, মিলাদ কার নামে, হাসমত আলী তসবি টিপতে টিপতে বলেছিল, আল্লায় জানে।
তোরণের উদ্বোধন হলো যথাসময়ে। মরিচবাতি জ্বলল, মাইকে কোরআন তেলাওয়াত হলো, এমপি সাহেব ফিতা কেটে বললেন যে, শহীদ আসমত আলীর রক্তের ঋণ এই জাতি কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। কাউন্সিলর মকবুল হোসেন ফুলের মালা গলায় ছবি তুলল। পরের বছর মনসুরের ছেলের চাকরিও হয়ে গেল, দাদার কোটায়, খাদ্য অধিদপ্তরে। উদ্বোধনের আগে নামফলকেও নতুন করে রঙ করানো হয়েছিল; নীল আরো গাঢ় নীল, সাদা হরফ ঝকঝকে, সোনা মিয়ার সেই দীর্ঘ ঈ-কার রোদ লাগলে চকচক করে।
কাগজিটোলার লোকজন এখন আর ঠিক মনে করতে পারে না, লোকটা কবে এসেছিল আর কবে গেল। কেউ বলে লোকটা আসলেই ফরিদপুরের ধান্দাবাজ ছিল, শেষে ভয়ে মরে গেছে। কেউ বলে সে করাচির জেল-খাটা পাগল, নিজেরে নিজে আসমত আলী ভাবত। আবার দুই-একজন, খুব নিচু গলায়, রাত বেশি হলে, বলে যে লোকটা আসলেই আসমত আলী ছিল, এবং মরাই তার ভুল হয়ে গিয়েছিল। প্রথমবার না, দ্বিতীয়বার! কারণ প্রথমবারের মরায় তার কাগজ ছিল। তবে এই তর্কের কোনো মীমাংসা কাগজিটোলায় হয় নাই, হবেও না। কারণ তারা সকলে একমত যে, লোকটা যে-ই হোক, তার কোনো কাগজ ছিল না, আর কাগজ ছাড়া মানুষের কিছুই প্রমাণ হয় না, এমনকি মানুষও না।
শুধু কিছুদিন, ফজরের আজানের পর, নামফলকের নিচের জায়গাটা মহল্লার লোকজনের কেমন খালি খালি লাগত। তারপর একদিন সেই অনুভূতিও মিলিয়ে গেলো।
২|
২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:৪৯
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: শহীদ আসমত আলীর রক্তের ঋণ এই জাতি কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।
...................................................................................................................
জাতি হিসাবে আমরা মিথ্যাবাদী এই বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠিত হলো ।
আল্লাহপাক আমাদের যেন ক্ষমা করে জাতিকে অভিশাপ মুক্ত করে ।
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৬
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পড়লাম ।