নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শুণ্যতার নিচে পিয়ানো শুনি...

রাজসোহান

প্রিয় অন্ধকার, আমার পুরোনো বন্ধু তুমি...

রাজসোহান › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্পঃ ঢাকার হারানো গন্ধ

২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৯



নাজিরাবাজারের মোড় থেকে যে গলিটা ভেতরের দিকে সেঁধিয়ে গেছে, ঠিক তার মুখে শামসুর দোকান। দোকান বলতে সাড়ে চার হাত বাই সাত হাত কুঠুরি, সামনে কাচের শোকেস, শোকেসের ভেতরে সাজানো শিশি। শিশির গায়ে বিদেশি নামে ছাপানো কাগজ সাঁটা। কাগজগুলো বছরে দুবার বদলায়, ভেতরের মাল বদলায় না। ভেতরের মাল শামসু নিজের হাতে বানায়, রাত এগারোটার পর, ঝাঁপ নামিয়ে, একটা ষাট পাওয়ারের হলদে বাল্বের নিচে বসে। তিন রকমের স্পিরিট, চার রকমের তেল, আর সাতটা কাচের ড্রপার। এই নিয়েই তার কারবার। যারা কেনে তারা জানে এই মাল আসল না, কিন্তু সে কথা তারা মনে রাখতে চায় না, আর শামসুও তাদের মনে করিয়ে দেওয়ার মতো বোকা না।

শামসুর বাপ আতর বেচত। এখানেই, কিন্তু তখন শোকেস ছিল না, ছিল কাঠের নিচু টেবিল আর তার ওপর মখমলের টুকরো, টুকরোর ওপর গোটা আষ্টেক ছোট শিশি। বাপে বলত, আতর কেনে মানুষ শুক্রবারে আর কেনে মরার আগে। সপ্তাহে একদিন আর জীবনে একবার। এই দুইয়ের মাঝখানে যে হাজার হাজার দিন পড়ে থাকে, ওই দিনগুলোতে মানুষের গায়ে যে গন্ধ থাকে সেটাই আসল গন্ধ, সেইটা কেউ বেচতে পারে না। বাপ মরার পরে শামসু আতর ছেড়ে পারফিউম ধরেছিল, কারণ আতরে লাভ কম আর ধৈর্য বেশি লাগে। কিন্তু বাপের কথাটা মাথা থেকে যায়নি। থেকে থেকে ফিরে আসত, বিশেষ করে দুপুরবেলা, যখন গলির ভেতর কেউ থাকে না আর দেয়ালের গা বেয়ে নেমে আসে গরম।

শামসুর একটা ক্ষমতা ছিল যেটা এই তল্লাটে আর কারো ছিল না। তার নাক। এই নাক দিয়ে সে মানুষ চিনত। খদ্দের দোকানে ঢোকার আগেই সে বুঝে ফেলত লোকটা কী চায়। যে মানুষের গা থেকে সরষের তেল আর কাপড়ের মাড়ের গন্ধ আসে, সে সস্তা কিছু চায় আবার বোতলও ভারী চায়। যার গায়ে সিগারেটের ওপর দিয়ে আরেকটা সিগারেটের গন্ধ, সে দাম জিজ্ঞেস করবে না, নাম জিজ্ঞেস করবে। আর যে মেয়েটা মাসে একবার আসে, শুধু শুঁকে চলে যায়, কিছু কেনে না, তার শাড়ির ভাঁজে ন্যাপথলিনের গন্ধ থাকে, মানে শাড়ি তার নিজের না, মানে সে কারো বাসায় থাকে। এইসব শামসু কাউকে বলত না। বললে লোকে তাকে বদমাশ ভাববে।

গন্ধ নিয়ে তার নিজের কিছু থিওরি ছিল, যেটা সে কোনোদিন গুছিয়ে বলতে পারেনি। তার থিওরি হলো, চোখ মিথ্যা বলে, কান আরো বেশি বলে, কিন্তু নাক বলে না। নাকের কোনো ব্যাকরণ নাই বলে সে মিথ্যা বানাতে পারে না। গন্ধের কোনো ভালো-মন্দ নাই। গন্ধ শুধু পুরনো কোনো দরজা খুলে দেয়। ওপাশে কী আছে, সেইটা যার নাক সে-ই জানে। এইজন্যই মানুষ পারফিউম কেনে। পারফিউম আসলে কেউ নিজের জন্য কেনে না, কেনে দরজার জন্য।

এইসব ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল আট বছর। বিয়ে হয়নি, হবে হবে করেও হয়নি, এখন আর হবে কি না সেই আলোচনাও বাড়ির লোকে তোলা বন্ধ করে দিয়েছে। শামসুর বয়স চৌত্রিশ, ভুঁড়ি হয়নি, চুল পাতলা হয়েছে সামনের দিকে। সকাল আটটায় দোকান খোলে, রাত এগারোটায় বন্ধ করে, তারপর এগারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত শিশি নিয়ে বসে থাকে। মাঝখানে দুপুরের ভাত খায় গলির ভেতরে ছবেদ আলীর হোটেলে, একই তরকারি, একই ডাল।

সেই দুপুরেই মেয়েটা প্রথম এল।

শ্রাবণের শেষ, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হয়ে থেমে গেছে, রাস্তার পানি নামছে না, নর্দমার ঢাকনার ফাঁক দিয়ে বুদবুদ উঠছে। শামসু শোকেসের ওপর কনুই রেখে ঝিমাচ্ছিল। দোকানের সামনে ছায়া পড়ল। সে মুখ তুলল না, কারণ সেতো নাক দিয়েই আগে দেখে।

আর তখনই তার ঝিমুনি ছুটে গেল।

এই গন্ধ সে চেনে না। এটা তার কাছে অসম্ভব একটা ব্যাপার! এই শহরে যত রকম গন্ধ আছে সব তার মুখস্থ। ভেজা ইটের গন্ধ, শুকনো ইটের গন্ধ, শ্যাওলা-ধরা ইটের গন্ধ, তিনটেই আলাদা, সে জানে। সে জানে কার্তিক মাসের ভোরে বাদামতলীর আড়তের গন্ধ আর চৈত্র মাসের দুপুরে সেই একই আড়তের গন্ধের মধ্যে ফারাক কতটুকু। অথচ এই মেয়ের গায়ের গন্ধের কোনো নাম তার মাথায় এল না!

সে চোখ তুলল। বছর তেইশ চব্বিশের একটা মেয়ে, শাড়ি পরা, রঙটা এমন কিছু না, চেহারাও এমন কিছু না। কপালের কাছে চুল ভিজে সেঁটে আছে। হাতে কিছু নেই, ব্যাগ নেই, ছাতা নেই, অথচ কাপড়ে কাদার ছিটা নেই একটুও। এই কাদার শহরে বৃষ্টির পরে হেঁটে এসে কারো কাপড়ে ছিটা থাকবে না, এমন তো হওয়ার কথা না । কিন্তু শামসুর তখন এসব হিসাব মেলানোর সময় নাই। তার নাক কাজ করছে না, মাথাও কাজ করছে না।

সে গন্ধের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল, যেভাবে সে সব গন্ধে ঢোকে। নিচের দিকে একটা ভারী আস্তরণ আছে, পুরনো চন্দনকাঠ, কিন্তু আসল চন্দন না, বহু বছর ধরে হাত পড়া চন্দন, চিরুনি বা সিঁদুরকৌটা বা এমন কিছুর। তার ওপরে ন্যাপথলিন, কিন্তু নতুন না, ফুরিয়ে আসা ন্যাপথলিন, যেটার তীব্রতা মরে গিয়ে শুধু আভাসটুকু আছে। তার ওপর কিছুটা মিষ্টি, এলাচ হতে পারে, বা মোরব্বার সিরা। তার ওপর ধাতব ভাব, পুরনো পিতলের কড়া, বা কলের পানি যেটা অনেকক্ষণ পাইপে বসে ছিল। আর সবচেয়ে ওপরে, সবচেয়ে হালকা করে, পুরোনো কাপড়ে লেগে থাকা মানুষের গন্ধ।

এতগুলো জিনিস একসঙ্গে থাকতে পারে না। ল্যাবরেটরিতে পারে না, প্রকৃতিতে পারে না। এইসব মেলাতে গেলে ভেঙেচুরে বিচ্ছিরি হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ এখন তো ভাঙেনি। এমনভাবে বসে আছে যেন এইভাবেই থাকার কথা ছিল।

মেয়েটা শোকেসের ওপর ঝুঁকে শিশিগুলো দেখছিল। শামসু গলা খাঁকারি দিল।

কী দেখামু আপনেরে? কোনটা?

মেয়েটা তাকাল না। বলল, দেখতেই আসছি। কিনুম না।

কণ্ঠস্বরে কী সুন্দর টান! মনে হয় এই শহরের, কিন্তু এই সময়ের না। শামসুর দাদির গলায় ওই টান ছিল, তার মায়ের গলায় ছিল না। শামসুর হিসাব আবার গোলমাল হয়ে গেল। 

সে বলল, দেখেন, দেখতেতো পয়সা লাগে না।

মেয়েটা তিনটে শিশি তুলে শুঁকল। তিনবারই তার মুখ এমন হল যেন কেউ পানিতে চিনির বদলে লবণ দিয়েছে। শেষে সে শিশিগুলো নামিয়ে রেখে বলল, এইগুলার ভেতরে কিছু নাই।

শামসুর মেজাজ খারাপ হওয়ার কথা ছিল। হল না। সে বলল, কী থাকব?

মেয়েটা এইবার তার দিকে তাকাল। খুব সাধারণ চোখ, কিছু নাই তাতে, তবু শামসুর মনে হল সে বহুদিন কারো চোখের দিকে ভালো করে তাকায়নি।

মেয়েটা বলল, যেইটা আসলে আছিল, সেইটা।

তারপর সে বেরিয়ে গলির ভেতরে ঢুকে গেল। শামসু শোকেস খোলা রেখেই পেছন পেছন গেল, দশ পা গিয়ে থমকে দাঁড়াল, কারণ সে দেখল গলিটা খালি। সোজা গলি, একষট্টি পা লম্বা, শামসু বহুবার গুনেছে, দুই পাশে কোনো দরজা নাই প্রথম চল্লিশ পায়ে। মেয়েটা দশ পায়ের মধ্যে কোথাও যেতে পারে না।

কিন্তু গন্ধ ছিল। গলি ভরে ছিল সেই গন্ধে!

গলির ভেতরে হাকিম মিয়ার পানের দোকান। হাকিম মিয়ার বয়স সত্তরের ওপরে, চোখে ছানি, দিনে তিনশো টাকার পান বেচে, রাতে ছেলের বউয়ের গালাগাল খায়। শামসু দেখল হাকিম মিয়া পানের বাটা সামনে নিয়ে বসে আছে। হাতে চুনের কাঠি। আর তার দুই গাল বেয়ে পানি পড়ছে। শব্দ নাই, মুখ বিকৃত হয়নি, শুধু পানি পড়ছে।

কী হইছে চাচা?

হাকিম মিয়া হাত তুলে জবাব দিতে গেল, পারল না। অনেকক্ষণ পর বলল, বদরুন্নেসা।

শামসু জীবনে এ নাম শোনেনি। সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না, কারণ ততক্ষণে সে গলির বাকি অংশ দেখতে পাচ্ছে।

তিন নম্বর বাড়ির দোতলার জানালায় নওয়াব আলীর বউ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে খুন্তি, নিচে চুলায় ভাত পুড়ছে, পোড়া ভাতের গন্ধ বেরোচ্ছে, সে নামছে না। সিঁড়ির নিচে বসে থাকা রিকশাওয়ালা মজিদ তার রিকশার সিটে মাথা রেখে বসে আছে, ভাড়ার লোক ডাকছে, সে সাড়া দিচ্ছে না। ছবেদ আলীর হোটেলের ভেতরে দুইটা লোক পাশাপাশি বসে ভাত খাচ্ছিল, দুজনেই থেমে গেছে, একজনের হাত ভাতের ওপর, আরেকজনের গ্রাস মুখের কাছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত, চার নম্বরের বারান্দায় বছর দশেকের একটা ছেলে, যার এখনো কিছুই হয়নি, কিছু হওয়ার কথাও না, সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

দুপুর একটা থেকে দেড়টা, এই আধা ঘণ্টা সেই গলির প্রত্যেকটা মানুষ তার জীবনের প্রথম প্রেমের কথা মনে করে ফেলল।

সবাই কাঁদল না। এইটা শামসু পরে বুঝেছিল, আর তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছিল। কান্না তো সহজ জিনিস। কিন্তু সাত নম্বর বাড়ির দলিল লেখক আফসার সাহেব সেদিন বিকালে তার স্ত্রীকে চুলের মুঠি ধরে দেয়ালে ঠুকেছিলেন, তিরিশ বছরের সংসারে যা তিনি আগে করেননি। কেন করেছিলেন, তিনি নিজেও জানেন না। ছবেদ আলী সেদিন রাতে হোটেল বন্ধ করে দিয়ে বসে বসে হিসাবের খাতা ছিঁড়েছিল। আর ওই দশ বছরের ছেলেটা, যার নাম রুবেল, সে তিনদিন ভাত খায়নি।

শামসু নিজে কী মনে করেছিল?

কিছুই না। গলির একষট্টি পায়ের ভেতরে সবাই যখন তাদের হারানো জিনিস ফিরে পাচ্ছে, তখন সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু নাক দিয়ে হিসাব করছিল, চন্দন কত ভাগ, ন্যাপথলিন কত ভাগ। সে স্মৃতির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, দরজা তার জন্য খোলেনি।

সেই রাতে সে রাত এগারোটার অপেক্ষা করল না। আটটা বাজতেই ঝাঁপ নামিয়ে বসল।

কাজটা তার কাছে খুব সহজ মনে হয়েছিল প্রথমে। সে তো এই কাজই করে। মানুষ চায় বিদেশি ঘ্রাণ, সে বানিয়ে দেয়। কেউ ধরতে পারে না। এইবার তাকে একটা গলির ঘ্রাণ বানাতে হবে, এইটুকুই। উপাদান তার সব জানা।

সে চন্দন দিয়ে শুরু করল। চন্দনের তেল আছে দোকানে, বাপের আমলের, ছোট শিশিতে, দাম আকাশছোঁয়া বলে সে ছুঁয়েও দেখত না। ছয় ফোঁটা নিল। তার সঙ্গে দিল ভেটিভার, মানে খসখস, ভেজা মাটির ভাব আনার জন্য। ন্যাপথলিনের বদলে দিল সামান্য কর্পূর, তারপর ভাবল কর্পূরে হবে না, কর্পূর বড় সাধু জিনিস, ন্যাপথলিনের ভেতরে একটু নোংরা ভাব আছে যেটা কর্পূরে নাই। এলাচের তেল দিল দুই ফোঁটা। পিতলের গন্ধের কোনো তেল তার জানা ছিল না। তাই এক টুকরা তামার তার স্পিরিটে ডুবিয়ে রাখল সারা রাত।

ভোরের দিকে সে যা পেল সেটা শুঁকে তার গা গুলিয়ে উঠল।

ঘ্রাণ মিলেছে। প্রায় মিলেছে। এতই মিলেছে যে, যে কেউ শুঁকে বলবে, হ্যাঁ, এইটাই। কিন্তু শামসু জানে, এইটা না। পার্থক্যটা এমন জায়গায়, যা সে দেখাতে পারবে না, নামও দিতে পারবে না। মেয়েটার গন্ধের ভেতরে সময় মিশে আছে, যা তার শিশিতে নাই। ন্যাপথলিনটা তার শিশিতে থাকা ন্যাপথলিন। কিন্তু মেয়েটার গায়ে যে ন্যাপথলিনের গন্ধ, সেটা পুরোনো। মনে হয়, উনিশশো একাত্তরে কেনা কোনো ন্যাপথলিনের বল বহু বছর কাঠের সিন্দুকে পড়ে ছিল। 

সে সেই শিশি ফেলে দিল না। তাকের পেছনে লুকিয়ে রাখল। মাসখানেক পরে এক খদ্দের সেটা শুঁকে হঠাৎ চুপ হয়েছিল, তারপর তিন হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে গিয়েছিল, আর যাওয়ার সময় শামসুর হাত ধরে বলেছিল, ভাই, এইটা আর বানাইয়েন না। শামসু বানায়নি। ওই একবারই বানিয়েছিল।

আশ্বিনের শুরুতে শামসু বাজারের হিসাবের লাল খাতাটার পেছনের দিক থেকে লেখা শুরু করল। খোঁজাখুঁজিটা গোছানো না থাকলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, এই তার ধারণা। তারিখ, জায়গা, লোকের নাম, লোকে কী বলেছে। প্রথম পাতায় লিখল: ৩ শ্রাবণ, নাজিরাবাজার, আমার গলি। 

মেয়েটা যেসব গলিতে গেছে, সেসব গলির মানুষ ওই দিনের কথা ভুলে নাই। বংশালের এক তালা-চাবির মিস্ত্রি তাকে বলেছিল, ওই দিনটার কথা কইয়েন না ভাই, ওই দিন আমাগো পুরা লাইন পাগল হইয়া গেছিল। কে পাগল হইছিল? সবাই। সবাই মানে? সবাই মানে সবাই। বুড়া রশিদ মিয়া পঞ্চাশ বছর পরে হুইলচেয়ারে কইরা আরমানিটোলা গেছিল একটা বাড়ি খুঁজতে, বাড়ি নাই, বাড়ির জায়গায় সাত তলা বিল্ডিং।

শামসু লিখে রাখত। মাসখানেক পরে খাতায় নয়টা নাম হল। বংশাল, আগামসি লেন, আবুল হাসনাত রোডের একটা গলি, মালিটোলা, তাঁতীবাজারের পেছনের একটা গলি যার নাম কেউ বলতে পারে না, সূত্রাপুর, নারিন্দা, ফরাশগঞ্জের নদীর দিকের একটা লেন, আর দয়াগঞ্জ।

মেয়েটা একই গলিতে দুইবার যায় না। আর যে গলিতে সে একবার যায়, সেই গলিতে কিছু একটা ঘটে যায় তার পরের এক বছরের মধ্যে। আগামসি লেনের ওই দোতলা বাড়ি, যেটার কার্নিশে লতাপাতার কাজ ছিল, সেটা ভেঙে ফেলা হল ফাল্গুনে। মালিটোলার পুকুর বুজিয়ে ফেলা হল। তাঁতীবাজারের নাম-না-জানা গলির মুখে শাটার নামল, ভেতরে এখন গুদাম।

শামসু ঠিক বুঝতে পারল না, মেয়েটা আগে আসে, নাকি পরে। গলিতে কিছু একটা ঘটবে বলেই কি সে আসে, নাকি তার আসার পরই জায়গাগুলোর কপালে ওইসব জোটে, সেটা নিয়ে সে অনেক ভেবেছে। কোনো উত্তর পায়নি। সে একবার ভাবল, কাকের কথা তো মানুষ বলে। মানুষ মরার আগে কাক ডাকে। কিন্তু কাক তো মানুষ মারে না। তাহলে এই মেয়েটা কী করে? 

কার্তিকের এক সন্ধ্যায় ফরাশগঞ্জে আবার গন্ধটা পেল শামসু।

সে তখন প্রায় দুই মাস ধরে ঘুরছে। দোকানে বাচ্চুকে বসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে, বাচ্চু চোদ্দ বছরের ছেলে, বিক্রি করতে পারে না, বসে থাকতে পারে। শামসু হাঁটে আর শোঁকে। নদীর দিক থেকে হাওয়া আসছিল, সেই হাওয়ায় পাটের গন্ধ, আর তেলের গন্ধ, আর কাঠ পচার গন্ধ। এইসবের ভেতর দিয়ে একটা সরু সুতার মতো সেই গন্ধ আবার এল।

মেয়েটা একটা বন্ধ কাঠের গুদামের সিঁড়িতে বসে ছিল। সেই একই শাড়ি। শামসু দূরে দাঁড়িয়ে রইল, কাছে যেতে সাহস হল না, তারপর কাছে গেল, কারণ ভয় তার আর তখন কাজ করছিল না।

চিনতে পারছেন?

মেয়েটা মাথা নাড়ল। পারছি। আপনে নাক দিয়া দেখেন।

শামসু বসল, একটু দূরে। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। নদীতে একটা নৌকা যাচ্ছিল, তার হ্যারিকেন দুলছিল।

শেষে শামসু বলল, আপনের নাম কী?

নাম দিয়া কী করবেন? মেয়েটা হাসল না, কিন্তু গলা নরম শোনাল। নাম তো গন্ধ না।

আপনের গায়ে যেই গন্ধ, ওইটা কই থিকা আসে?

মেয়েটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, আপনে ভুল জিনিস জিগান। কই থিকা আসে জাইনা কী হইব। জিগান কই যায়।

কই যায়?

কোথাও যায় না। সেই যে যায় না, এইটাই তো মুশকিল।

শামসু বুঝল না, আবার বুঝল। সে বলল, আমি এইটা বানাইতে চাই।

মেয়েটা এইবার তার দিকে ঘুরে তাকাল, আর শামসুর মনে হল সে যেন প্রথমবারের মতো মেয়েটার মুখ দেখছে, অথচ পরদিন সকালে উঠে সে মুখটা মনে করতে পারেনি।

মেয়েটা বলল, আপনে বেচেন। বানান না, বেচেন। যেই মানুষ বেচে, হে নাগাল পায় না।

কথাটা অপমানের মতো শোনানোর কথা। কিন্তু শোনাল না। শামসুর মনে হল কেউ তার বুকের ভেতর থেকে একটা পুরনো কাঁটা টেনে বের করে দেখাল, এই দেখো, এইটা এতদিন এইখানে ছিল।

এরপরও তিনবার দেখা হয়েছিল। তিনবারই আলাদা জায়গায়, তিনবারই আচমকা।

একবার নারিন্দায়, দুপুরে, কবরস্থানের দেয়ালের পাশে। ওইদিন শামসু একটা সাদা রুমাল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। কথা বলতে বলতে সে সেই রুমাল মেয়েটার কাঁধের কাছে রেখেছিল, খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন ঘাম মুছছে। মেয়েটা কিছু বলেনি। শামসু বাসায় ফিরে রুমালটা একটা কাচের বয়ামে ভরে মুখ আটকে দিয়েছিল।

পরদিন ভোরে বয়াম খুলে সে যে গন্ধ পেল সেটা তার মায়ের গন্ধ। মা মরেছে উনিশ বছর আগে। ভাতের ফ্যানের গন্ধ, আর মাথার তেলের গন্ধ, আর অসুখের শেষদিকে ওই ঘরের ভেতরের গন্ধ। শামসু বয়াম হাতে নিয়ে দোকানের মেঝেতে বসে পড়েছিল। বাচ্চু ঝাঁপ তুলতে এসে দেখেছিল তার ওস্তাদ মেঝেতে বসে আছে, আর ওস্তাদের গাল ভেজা।

দ্বিতীয়বার সূত্রাপুরে। ওইদিন সে চর্বি নিয়ে গিয়েছিল, ছাগলের চর্বি, পাতলা করে কাচের প্লেটে মাখানো। বইয়ে পড়েছিল ফুলের ঘ্রাণ ধরার এই পদ্ধতি, ফরাসিরা করত। প্লেটটা সে মেয়েটার পাশে রেখে দিয়েছিল ঘণ্টাখানেক।

চর্বিতে কিছু ধরা পড়েনি। একদম কিছু না। পরিষ্কার, নিরেট, বোকার মতো সাদা চর্বি।

তৃতীয়বার দয়াগঞ্জে। সেদিন সে কিছুই নিয়ে যায়নি। মেয়েটা দুই হাত পেছনে রেখে হাঁটছিল, শামসুও তার পাশে হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, আজ কিছু ধরার দরকার নেই।

দয়াগঞ্জের সেই বিকালে মেয়েটা একটা কথা বলেছিল যেটা শামসু খাতায় লিখে রেখেছিল হুবহু।

মানুষ ভাবে শহর হইল ইট আর রাস্তা। কিন্তু শহর হইল গন্ধ। ইট ভাঙলে ইট থাকে, গুঁড়া হয়, তাও থাকে। গন্ধ ভাঙলে কিচ্ছু থাকে না। আপনেরা রোজ একটু একটু কইরা শহরটারে ধুইয়া ফালাইতাছেন। ধুইয়া কী বানাইবেন, ভাইবা রাখছেন?

শামসু বলেছিল, আমি তো কিছু ধুই না।

মেয়েটা বলেছিল, আপনে যেইটা বেচেন, ওইটা মানুষ ধোয়ার পরে গায়ে দেয়।

শীতের শেষে খাতাটা ভরে গেল। তেইশটা জায়গা। শামসু একদিন রাতে ঝাঁপ নামিয়ে কাগজে শহরের একটা আঁকাবাঁকা ছবি আঁকল, তারপর তেইশটা জায়গায় কলম দিয়ে ফুটকি দিল। ফুটকিগুলো কোনো লাইন হল না। বৃত্তও না। শামসু অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝল, এগুলো কোনো নকশা না। একেকটা ফুটকি একেকটা জায়গা। আর ওই জায়গাগুলোর কী হয়েছে, সেটা খুঁজে দেখতে হবে। 

পরের সপ্তাহে সিটি করপোরেশনে খোঁজ নিয়ে সে জানতে পারল, তেইশটার মধ্যে উনিশটা জায়গা ইতিমধ্যে ভাঙা পড়েছে বা ভাঙার নোটিশ পেয়েছে বা রাস্তা চওড়া করার তালিকায় ঢুকে গেছে। বাকি চারটার একটা তার নিজের গলি।

তেইশটা জায়গার হিসাব মিলিয়ে শামসুর মনে হল, মেয়েটা বুঝি ভাঙনের আগেই আসে। কথাটা ঠিক কি না, সেটা দেখতে ফাল্গুনের এক সকালে সে আগামসি লেনে গেল। বাড়িটা ততদিনে ভেঙে গেছে। ইটের স্তূপ, ধুলা, রড, দুইটা কুকুর। সে স্তূপের কাছে গিয়ে বসল, একটা ভাঙা দেয়ালের টুকরা হাতে নিয়ে নাকের কাছে ধরল।

কিছু নাই।

ইটের গন্ধ আছে। চুন-সুরকির গন্ধ আছে। কিন্তু ওই বাড়ির গন্ধ নাই। যে বাড়িতে আশি বছর ধরে মানুষ ভাত রেঁধেছে, বাচ্চা পেচ্ছাব করেছে, মানুষ মরেছে, বিয়ে হয়েছে, ওই সব কিছুর যে জমাট চিহ্ন দেয়ালের গায়ে সেঁটে থাকার কথা, সেইটা নাই। ধুলার সঙ্গে উড়ে গেছে। শামসুর মনে হল, মানুষ মরলে লাশ থাকে, কবর থাকে, কবরের ওপর নাম থাকে। বাড়ি মরলে কিছুই থাকে না। বাড়ির কোনো লাশ নাই।

সে সেই সকালে হাঁটু গেড়ে ধুলার মধ্যে বসে ছিল অনেকক্ষণ। কে একজন এসে জিজ্ঞেস করেছিল, ভাই, কিছু হারাইছেন? সে বলেছিল, না।

শেষ দেখা হয়েছিল চৈত্র মাসে, তার নিজের গলিতে।

সেদিন দুপুরে সে দোকানেই ছিল। ঠিক আগের বারের মতো ঝিমুচ্ছিল না, বরং একটা খদ্দেরের সঙ্গে দরদাম করছিল, লোকটা আটশো টাকার জিনিসকে ছয়শোতে নিতে চাইছিল। তখন গন্ধটা এল।

সে দরদাম ফেলে বেরিয়ে এল। মেয়েটা গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, ভেতরে ঢোকেনি।

শামসু বলল, আপনে তো এইখানে একবার আইছিলেন।

মেয়েটা বলল, হ। আইজ যামু।

শামসু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর কী মনে করে যেন বলল, আমার কিছু মনে পড়ে না ক্যান? সবার পড়ে, আমার পড়ে না।

মেয়েটা বলল, আপনের কি আছিল কেউ?

শামসু জবাব দিল না। কারণ ছিল। আঠারো বছর আগে এই গলির পাঁচ নম্বর বাড়ির দোতলায় একটা মেয়ে থাকত। তার নাম শামসুর মনে আছে, মুখ মনে নাই। মেয়েটার বাবা উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে বাড়ি বেচে চলে গেছিল। বাড়িটাও আর নাই, ভেঙে এখন সাততলা। নিচতলায় মোবাইলের দোকান। 

মেয়েটা বলল, আপনে হারান নাই। আপনে যেই জায়গায় রাখছিলেন, সেই জায়গাটা নাই। কোনো কিছু রাখার জায়গাই যদি না থাকে, ওইটা আর কোথায় থাকে?

তাইলে আমি কী করুম।

কিছু করতে হয় না, মেয়েটা বলল। এই প্রথম শামসু তার গলায় ক্লান্তির মতো কিছু শুনল। কিছু করতে গেলেই মানুষ শিশির ভিতরে ভইরা ফালাইতে চায়। কিন্তু শিশিতে ভরার পর ওইটা আর আগের মতো থাকে না। তখন শুধু তার গন্ধ থাকে। 

তারপর সে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল, নাজিরাবাজারের মোড়ের দিকে, বেলা তিনটার রোদের মধ্যে, আর শামসু দাঁড়িয়ে রইল কারণ তার পা ওঠেনি। মোড়ে গিয়ে মেয়েটা বাঁয়ে ঘুরল আর তারপর আর দেখা গেল না, কিন্তু মোড় পর্যন্ত পুরোটা রাস্তা তার পেছনে গন্ধ পড়ে রইল, একটা ফিতার মতো, আর সেই ফিতা মিলিয়ে যেতে সময় নিল প্রায় দশ মিনিট।

সেই দশ মিনিটে গলিটা আবার একবার তার প্রথম প্রেমের কথা মনে করল।

হাকিম মিয়া এইবার কাঁদল না। পানের বাটাটা বন্ধ করে দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিল। সেই ঝাঁপ আর ওঠেনি। তিন সপ্তাহ পরে সে মরে গেল। নওয়াব আলীর বউ এইবার ভাত পোড়ায়নি। সে সেদিন চুলা নিভিয়ে জানালা বন্ধ করে দিয়েছিল। রুবেল, যার তখন বারো বছর, বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল, তারপর ফিরে গিয়েছিল। এই বয়সে ছেলেরা কান্না লুকাতে শিখে যায়। 

আর শামসুর মনে পড়েছিল।

সে ভেবেছিল একটা মুখ মনে পড়বে। নাম মনে পড়বে। আঠারো বছর আগের সেই দুপুরগুলা। কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। শুধু একটা গন্ধ পেল। পাঁচ নম্বর বাড়ির সিঁড়িঘরের গন্ধ। স্যাঁতসেঁতে, একটু টক, চুনকামের গায়ে ভেজা বৃষ্টির গন্ধ, আর কার্নিশে বসা কবুতরের গন্ধ। সেই সিঁড়ি দিয়ে সে টিউশনি পড়তে যাওয়ার নাম করে উঠত। দোতলার ল্যান্ডিংয়ে মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকত। শামসু উঠত, মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকত। এইটুকুই মনে আছে তার।

মুখটা এল না। আঠারো বছর ধরে সে যেটাকে স্মৃতি বলে জেনে এসেছে, সেটা আসলে একটা সিঁড়িঘরের গন্ধ ছাড়া আর কিছু না। সিঁড়িঘরও নাই। গন্ধও নাই। এতদিন যেটাকে নিজের স্মৃতি ভেবেছে, সেটা আসলে ওই সিঁড়িঘর, তার দেয়াল, চুনকাম, কবুতর আর আঠারো বছর মিলে তৈরি করেছিল। 

আর তেমন কিছু হয়নি।

লোকে ভাবতে পারে শামসু দোকান ছেড়ে দিয়েছিল, বা পাগল হয়ে গিয়েছিল, বা মেয়েটাকে খুঁজতে খুঁজতে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছিল। কিছুই হয়নি। মানুষ এইসব করে না। শামসু পরের দিন সকাল আটটায় দোকান খুলেছিল, বাচ্চুকে দিয়ে শোকেস মুছিয়েছিল, আর আটশো টাকার পারফিউম সাতশোতে বেচেছিল একটা ছেলেকে, যে সেটা একটা মেয়েকে দেবে বলে কিনেছিল।

খাতা সে রেখে দিয়েছে। মাঝে মাঝে বের করে দেখে। তেইশটা নামের মধ্যে এখন উনিশটার জায়গায় বাইশটা কাটা। আর তাকের পেছনে একটা শিশি আছে, খালি। ওইটাতে সে কিছু ভরেনি কোনোদিন। বাচ্চু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ওস্তাদ, খালি বোতল রাখছেন ক্যান? শামসু বলেছিল, রাখছি।

এইটুকুই। তবে ইদানীং মাঝে মাঝে এমন হয়। খদ্দের যখন শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ভাই, কোনটা ভালো, কোনটা বেশিদিন থাকে? তখন শামসুর ইচ্ছা করে জিজ্ঞেস করতে, বেশিদিন মানে কতদিন। আপনে কি চান আজকে বিকাল পর্যন্ত থাকুক, না চান তিরিশ বছর পরে কেউ একটা সিঁড়িতে উঠতে গিয়া হঠাৎ থাইমা যাক। 

জিজ্ঞেস করে না। খদ্দের ভড়কে যাবে, আর ভড়কানো খদ্দের কিছু কেনে না। সে হাসে, যেটা দাম বেশি সেইটা এগিয়ে দেয়, আর বলে, এইটা নেন ভাই, এইটা থাকে।

তারপর ঝাঁপ নামানোর সময় হলে সে একবার গলির দিকে তাকায়, একষট্টি পা, দুই পাশে প্রথম চল্লিশ পায়ে কোনো দরজা নাই। গলি এখনো আছে। কতদিন থাকবে সেটা সিটি করপোরেশনের ফাইলে লেখা আছে, শামসুর নাকে লেখা নাই। এই একটা জায়গায় তার নাক কোনো কাজে লাগে না। এইজন্যই বোধহয় সে রাতে ঘুমাতে পারে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.