| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ’-এর প্রথম দৃশ্যে মার্টিন শিনের মুখে যে রক্ত দেখা যায়, ওটা মেকআপ নয়, একদম রিয়েল!
ঘটনাটা ঘটেছিলো ১৯৭৬ সালের ৩ আগস্ট রাতে, মানিলার একটা দোতলা দালানে। নিচতলায় তখন সত্যিকারের নাইট কোর্ট বসেছে, সত্যিকারের আসামি, সত্যিকারের বিচারক। আর দোতলার একটা কামরায় চলছে ক্যামেরা।
কামরার ভেতর ছিলেন শিন। সেদিন ছিল তাঁর ছত্রিশতম জন্মদিন, আর সকাল থেকে তিনি মদ খেয়েছেন। স্ক্রিপ্টে ওই দৃশ্যের কোনো সংলাপ লেখা ছিলো না, আসলে দৃশ্যটাই লেখা ছিলো না। কাপোলা সিনেমার স্টার্টিং নতুন করে লিখছিলেন আর অভিনেতাকে বলেছিলেন যা খুশি করতে। ক্যামেরার পেছন থেকে একটা নির্দেশ এলো, নিজেকে ভয় পাও, মার্টিন।
শিন আয়নায় ঘুষি মারলেন। আয়নাটা আসল কাচের। বুড়ো আঙুল কেটে রক্ত ঝরতে লাগলো। কাপোলা শুটিং থামিয়ে নার্স ডাকতে চাইলেন, কিন্তু শিন হাত জোড় করে বললেন, ক্যামেরা বন্ধ কোরো না। রক্তমাখা হাতে তিনি নিজের মুখে রক্ত মাখতে থাকলেন। কাপোলা ক্যামেরা বন্ধ করলেন না।
সেই রাতে শিনকে যখন ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নামানো হচ্ছিলো, নিচতলায় আদালত তখনো চলছিলো। তাঁর তেরো বছরের ছেলে এমিলিও এস্তেভেজ সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখেছিল।
একজন পরিচালকের সেটে যদি এই মাত্রার ঘটনা ঘটে, তাহলে সিনেমাটা শেষ হয় কীভাবে? কাপোলার প্রায় সব বিখ্যাত প্রোডাকশনের ইতিহাসে এই প্রশ্ন ফিরে আসে। উত্তর হিসেবে বলা হয়, লোকটা পাগল কিন্তু প্রতিভাবান। পাগলামি তো এলোমেলোই হয় কিন্তু পাগলামি কি পাঁচ দশক ধরে চলতে পারে?
উত্তরটা খুঁজতে হবে ১৯৭৬ সালের সেই কামরায় নয়, তারও তেরো বছর আগে আয়ারল্যান্ডের নয় দিনের এক শুটিংয়ে।
নয় দিন, নয়জন
১৯৬৩ সালে রজার করম্যান আয়ারল্যান্ডে ‘দ্য ইয়াং রেসার্স’ নামের একটা কম বাজেটের সিনেমা শেষ করলেন, আর কিছু টাকা বেঁচে গেলো। করম্যানের নিয়ম ছিলো, বেঁচে যাওয়া টাকা ফেরত যাবে না, ওটা দিয়ে আরেকটা সিনেমা হবে। ওই সিনেমায় সাউন্ড টেকনিশিয়ানের কাজ করছিলেন চব্বিশ বছরের ফ্রান্সিস কাপোলা। করম্যান তাঁকে সুযোগ দিলেন, একটাই শর্তে: ‘সাইকো’-র মতো কিছু বানাও, সস্তায়, দ্রুত!
কাপোলা স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললেন কয়েক দিনের ভেতর। শিডিউল পেলেন নয় দিন, ডাবলিনের আর্ডমোর স্টুডিয়োতে, আর ক্রু ছিলো নয়জন।
সিনেমার নাম ‘ডিমেনশিয়া থার্টিন’। রাফ কাট দেখে করম্যান বললেন, এটা মুক্তি দেওয়া যাবে না, আরও রক্তারক্তি লাগবে, অন্তত আরেকটা খুন। কাপোলা রাজি হননি। করম্যান তখন অন্য দুইজন পরিচালককে ভাড়া করে বাড়তি খুন আর একটা ভুয়া মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা জুড়ে দিলেন, যেখানে একজন অভিনেতা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দর্শককে জিজ্ঞেস করে, আপনি এই সিনেমা দেখার মতো মানসিক অবস্থায় আছেন তো?
কাপোলা পরে এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন: একসময় কাজটা অন্যদের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।
আর পঁচিশ বছর বয়সেই তিনি জেনে গেলেন, নিজের কাজের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কী হয়। এরপর থেকে সারাজীবন তিনি নিজের কাজের ওপর সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। আর প্রতিবারই তার মূল্য দিতে হয়েছে।
সাতশো পাতা
১৯৭০ সালে বত্রিশ বছরের এই লোককে প্যারামাউন্ট ‘দ্য গডফাদার’ বানানোর দায়িত্ব দিলো, কারণ তিনি ইতালীয় বংশোদ্ভূত, তিনি সস্তা, আর কারণ আরও অনেকে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো প্রথম পাঠে উপন্যাসটা তাঁর নিজের পছন্দ হয়নি। দ্বিতীয়বার পড়ার পর তাঁর মনে হলো, এটা মাফিয়ার গল্প নয়, এটা আমেরিকান পুঁজিবাদের গল্প, তিন ছেলেসহ এক রাজার গল্প। তারপর তিনি মারিও পুজোর উপন্যাসটা রেজর ব্লেড দিয়ে কেটে পাতাগুলো আলাদা করলেন। সাদা কাগজের মাঝখানে আয়তক্ষেত্র কেটে সেখানে পাতাগুলো এমনভাবে সেঁটে দিলেন, যাতে দুপাশই পড়া যায় আর চারপাশে লেখার মতো চওড়া জায়গা থাকে। সেই ফাঁকা জায়গাতেই তিনি লিখতে শুরু করলেন।
প্রতিটি দৃশ্যের জন্য চারটে ঘর। সারসংক্ষেপ। টেক্সচার ও টোন। দৃশ্যের মূল কাজ। আর শেষ ঘরটার নাম পিটফল।
পিটফলের ঘরে তিনি লিখতেন, এই দৃশ্যটা আমি কীভাবে নষ্ট করে ফেলতে পারি। একটা ঘরে তাঁর নিজের হাতে লেখা আছে, ইতালিয়ানরা যেন কার্টুনের ইতালিয়ানদের মতো কথা না বলে।
এই ঘরটার কথা মনে রাখা দরকার। বেশিরভাগ পরিচালক প্রস্তুতি নেন কীভাবে একটা দৃশ্য ঠিকঠাক করা যায়, কাপোলা ভাবতেন কীভাবে সেটা নষ্ট হতে পারে। প্রতিটি দৃশ্যের সামনে বসে আগে থেকেই ভেবে রাখতেন, কোথায় কীভাবে সমস্যা হতে পারে।
থিয়েটারে স্টেজ ম্যানেজারের যে খাতায় আলোর প্রতিটি কিউ লেখা থাকে, সেটাকে বলে প্রম্পট বুক। কাপোলা উপন্যাসটা থেকে নিজের জন্য সেরকমই একটা খাতা বানিয়েছিলেন। সাতশো পাতার খাতা তিনি শুটিংয়ের সময় সেটে নিয়ে যেতেন, স্ক্রিপ্ট নয়। তাঁর কাছে স্ক্রিপ্ট ছিল ওই খাতারই একটা অংশ।
সাতশো পাতা প্রস্তুতি নেওয়ার পরেও শুটিংয়ের প্রথম সপ্তাহেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো।
যে দিনটার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন
আল পাচিনোকে স্টুডিয়োর পছন্দ হয়নি। তারা রেডফোর্ড বা রায়ান ও’নিলকে চেয়েছিল। গর্ডন উইলিসের অন্ধকার ফ্রেম দেখে প্রযোজনাপ্রধান রবার্ট ইভান্সের অভিযোগ ছিল, পর্দায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ব্র্যান্ডোকে নেওয়ার ক্ষেত্রেও শর্ত ছিল, তাঁকে বিনা পারিশ্রমিকে স্ক্রিন টেস্ট দিতে হবে এবং প্রযোজনায় আর ঝামেলা করবেন না বলে বন্ড জমা দিতে হবে।
কাপোলা জানতেন, তাঁকে যেকোনো দিন সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। ইভান্স এলিয়া কাজানের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন, তিনি দায়িত্ব নেবেন কি না। কাপোলা পরে বলেছেন, কাজান হঠাৎ সেটে এসে তাঁকে বিদায় জানাচ্ছেন, এমন একটা দুঃস্বপ্ন তিনি বারবার দেখতেন।
তবে এডিটর অ্যারাম আভাকিয়ান ওই ষড়যন্ত্রে ছিলেন না। ‘দ্য অফার’ সিরিজে তাঁকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও কাপোলার নিজের বক্তব্য অন্যরকম। ২০২৩ সালে ইনস্টাগ্রামে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, আভাকিয়ান তাঁর আগের সিনেমার এডিটর ছিলেন, অনেকটা বড় ভাইয়ের মতো। তাঁকে যখন পরিচালকের চেয়ার নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, আভাকিয়ান নাকি বলেছিলেন, “ফ্রান্সিস আমার বন্ধু, আমি পারব না।”
ইতালীয়-আমেরিকান সিভিল রাইটস লিগের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, স্ক্রিপ্ট থেকে ‘মাফিয়া’ আর ‘কোজা নস্ত্রা’ শব্দ দুটো বাদ দিতে হয়েছিল। প্রযোজক আল রাডি তাতে রাজি হয়েছিলেন, কারণ তখন আপত্তি করার মতো অবস্থায় তিনি ছিলেন না। স্ক্রিপ্টে ‘মাফিয়া’ শব্দটা ছিল মাত্র একবার। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত মাফিয়া সিনেমার স্ক্রিপ্টে ‘মাফিয়া’ শব্দটা ছিল মাত্র একবার। শেষ পর্যন্ত সেটাও বাদ পড়ল।
কাপোলা একের পর এক চাপ সামলে সিনেমাটা শেষ করলেন। সাতশো পাতার খাতাটাও কাজে লাগল। কিন্তু সিনেমার সবচেয়ে মনে রাখার মতো কিছু মুহূর্ত সেই খাতায় আগে থেকে লেখা ছিল না।
লুকা ব্রাসির চরিত্রে অভিনয় করা লেনি মন্টানা পেশাদার কুস্তিগির ছিলেন। তার আগে কলম্বো ক্রাইম ফ্যামিলির হয়েও কাজ করেছেন। ব্র্যান্ডোর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এতটাই নার্ভাস হয়ে যেতেন যে সংলাপ বারবার ভুল করতেন। কাপোলা সেই ভুলগুলোই রেখে দিলেন। তাই সিনেমায় মন্টানাকে দেখা যায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার মহড়া দিতে, তারপর ডন ভিটোর সামনে গিয়ে আটকে যেতে।
ডন ভিটোর কোলে যে বিড়ালটা ছিল, সেটাও স্ক্রিপ্টের ছিল না। কাপোলা স্টুডিয়োর চত্বর থেকে একটা বেওয়ারিশ বিড়াল ধরে এনে ব্র্যান্ডোর কোলে বসিয়ে দিয়েছিলেন।
দুটো ঘটনাই শুটিংয়ের সময় ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ব্যাপার। তখন কেউ জানত না, এরকম আরেকটা ঘটনাই দুই বছর পর সিনেমার শেষ দৃশ্যটা বদলে দেবে।
যে দৃশ্যে ব্র্যান্ডো আসেননি
‘দ্য গডফাদার পার্ট টু’-এর একদম শেষে একটা ফ্ল্যাশব্যাক আছে। পার্ল হারবারে বোমা পড়ার দিন, ভিটো কোলিয়নের জন্মদিন। ছেলেমেয়েরা টেবিলে বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। মাইকেল জানায়, সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। সনি রেগে যায়। তারপর বাইরের দরজায় শব্দ হয়। সবাই বাবাকে চমকে দিতে ছুটে যায়। টেবিলে একা বসে থাকে মাইকেল।
ওই দৃশ্যে ব্র্যান্ডোর থাকার কথা ছিল। এক দিনের শুটিং, তিনি রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম সিনেমার সময় প্যারামাউন্ট তাঁর সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করেছিল, স্ক্রিন টেস্ট দেওয়ানো থেকে বন্ড জমা নেওয়া পর্যন্ত, সেটা তিনি ভোলেননি। শুটিংয়ের দিন তিনি এলেন না। কোনো ব্যাখ্যাও দিলেন না।
কাপোলা সেদিনই দৃশ্যটা নতুন করে লিখলেন। ভিটোকে বাদ দিলেন। ফলে সিনেমার শেষটায় দেখা যায়, সবাই টেবিল ছেড়ে চলে গেছে। মাইকেল একা বসে আছে। যে বাবার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল, তিনি আর ফ্রেমে এলেন না।
মাইকেলের গল্প বারবার এই জায়গায় ফিরে আসে। সে বাবার কাছে যেতে চায়, অথচ শেষ পর্যন্ত বাবার কাছ থেকে আরও দূরে সরে যায়। আর সেই দূরত্বটা এত স্পষ্ট হয়ে উঠল একজন অভিনেতা শুটিংয়ে না আসায়।
একটা অনুপস্থিতি দিয়েই যদি একটা দৃশ্যের অর্থ বদলে যায়, সেটাকে কাকতাল বলা যায়। কিন্তু কাপোলার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা একবারই ঘটেনি। একই সময়ে, পাশের এডিটিং রুমে, আরেকটা সিনেমা নিয়েও একই রকম কিছু ঘটছিল।
আট শব্দ, যা সাতাত্তরটা দৃশ্যের কাজ করেছে
দুই গডফাদারের মাঝখানে কাপোলা একটা ছোট সিনেমা বানিয়েছিলেন, ‘দ্য কনভারসেশন’। জিন হ্যাকম্যান সেখানে হ্যারি কল, একজন আড়ি পাতার কারিগর। অন্যের কথা রেকর্ড করাই তাঁর কাজ, কিন্তু নিজের জীবন নিয়েই তিনি সব সময় ভয়ে থাকেন।
এই সিনেমাটাকে অনেক সময় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু কাপোলা এর খসড়া লিখেছিলেন ১৯৬৬ সালে, আর শুটিং শেষ হয়েছিল কেলেঙ্কারিটা প্রকাশ্যে আসার আগেই। অর্থাৎ ওয়াটারগেটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সিনেমাটা তৈরি হয়নি।
আসল ঘটনা ঘটেছে এডিটিং রুমে। শুটিং শেষ হওয়ার পর কাপোলাকে ‘পার্ট টু’-এর কাজে চলে যেতে হয়। এডিটর ওয়াল্টার মার্চ তখন একাই পড়ে রইলেন বিশাল এক ফুটেজের স্তূপ নিয়ে। চিত্রনাট্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ দৃশ্য শুটই করা হয়নি। সংখ্যাটা প্রায় সাতাত্তর। ওই দৃশ্যগুলোর কাজ ছিল ধীরে ধীরে দর্শককে বোঝানো, হ্যারি কল আসলে যা দেখেছে, তার অর্থ সে ভুল বুঝেছে।
মার্চ ওই দৃশ্যগুলো ছাড়াই কাজ চালালেন। ইউনিয়ন স্কয়ারের রেকর্ডিংয়ে একটা বাক্য বারবার ফিরে আসে, “He’d kill us if he got the chance.” সিনেমার বেশিরভাগ সময় জোর পড়ে ‘kill’ শব্দটার ওপর। তখন মনে হয়, দুইজন ভয় পাওয়া মানুষ নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। শেষে একই বাক্য আবার শোনা যায়, কিন্তু এবার জোর পড়ে ‘us’-এর ওপর। হঠাৎ করে কথাটার অর্থটাই বদলে যায়।
ওই দ্বিতীয় উচ্চারণটা আসলে ফ্রেডেরিক ফরেস্টের একটা ভুল টেক ছিল। শুটিংয়ের দিন টেকটাকে খারাপ বলে চিহ্নিত করে বাদ দিয়ে রাখা হয়েছিল। মার্চ পরে সেই টেকটা খুঁজে বের করেন এবং সিনেমার শেষে বসিয়ে দেন। ফলে যে সাতাত্তরটা দৃশ্য শুট করা হয়নি, সেগুলোর অনেকটাই আর দরকার পড়ল না।
এখানে এসে আমার মনে হয় প্যাটার্নটা আর কাকতালীয় থাকে না। সবচেয়ে মনে রাখার মতো মুহূর্তগুলোর কোনোটাই আগে থেকে ঠিক করা ছিল না। একটা বেওয়ারিশ বিড়াল, একজন অভিনেতা শুটিংয়ে এলেন না, আর একটা ভুল টেক শেষ পর্যন্ত থেকে গেল।
তখন ওই পিটফলের ঘরটার কথাও আবার মনে পড়ে। প্রতিটি দৃশ্যের পাশে আগে থেকেই লিখে রাখা, কোথায় কীভাবে সমস্যা হতে পারে। হয়তো এই কারণেই সেটে হঠাৎ কিছু গণ্ডগোল হলে কাপোলা সেটা অন্যভাবে দেখতে পারতেন। যেখানে অন্য কেউ ভুল দেখছে, তিনি হয়তো সেখানে একটা সম্ভাবনা দেখতেন। সাতশো পাতার খাতাটা শুধু দৃশ্য তৈরি করার জন্য ছিল না। কী রেখে দিতে হবে, সেটাও বোঝার জন্য ছিল।
কাপোলার কাজে দুর্ঘটনার ভূমিকা তাই কম নয়। তবে দুর্ঘটনাও সব সময় তাঁর পক্ষে যায়নি। পরের সিনেমায় এর দাম তাঁকে চড়া মূল্যও দিতে হয়েছিল।
ল্যাবিরিন্থ
গ্রিক পুরাণে কারিগর ডেডালাস ক্রিটের রাজার জন্য একটা গোলকধাঁধা বানিয়েছিলেন, আর ধাঁধাটা এতটাই নিখুঁত হয়েছিলো যে বানানোর পর তিনি নিজেই বেরোনোর পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কারিগর তাঁর নিজের দক্ষতার হাতে বন্দি হন।
১৯৭৬ সালের ১ মার্চ কাপোলা পরিবারসহ মানিলায় নামলেন। শুটিং হওয়ার কথা পাঁচ মাস। শেষ পর্যন্ত মূল চিত্রগ্রহণ চললো ২৩৮ দিন।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ উইলার্ডের চরিত্রে হার্ভি কাইটেলকে নিয়ে শুটিং হলো। ফুটেজ দেখে কাপোলার মনে হলো, চরিত্রটা যেভাবে চেয়েছিলেন, কাইটেল সেভাবে করছেন না। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাদ দিয়ে মার্টিন শিনকে নেওয়া হলো। আগের শুটিংও আবার করতে হলো। এরপর ২৬ মে টাইফুন ওলগা এসে ইবার সেটটা ধ্বংস করে দিল। প্রযোজনা বন্ধ রইল আরও কয়েক সপ্তাহ।
হেলিকপ্টারগুলো ফিলিপাইন সরকারের কাছ থেকে ধার নেওয়া হয়েছিল। মহড়া চলার মাঝখানেও কখনো কখনো পাইলটদের ডেকে পাঠানো হতো। তাঁরা হেলিকপ্টার নিয়ে দেশের অন্য প্রান্তে চলে যেতেন, কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে। কাজ শেষ হলে আবার ফিরে এসে শুটিং শুরু হতো।
সেপ্টেম্বরে ব্র্যান্ডো এলেন। কর্নেল কার্টজের চরিত্রটা স্ক্রিপ্টে ছিল ছিপছিপে এক যোদ্ধার। তখন ব্র্যান্ডোর ওজন প্রায় তিনশো পাউন্ড। তিনি জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’ পড়েননি, স্ক্রিপ্টও না। কাপোলা আর চিত্রগ্রাহক ভিত্তোরিও স্তোরারো তখন কার্টজকে কীভাবে দেখানো যায়, সেটা নিয়ে ভাবলেন। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, তাঁকে বেশিরভাগ সময় অন্ধকারে রাখা হবে, আধা আলোয় দেখা যাবে শুধু মুখের একটা অংশ। ব্র্যান্ডোর শরীর আর পুরোপুরি দেখানো হলো না।
তারপর ১৯৭৭ সালের মার্চে মার্টিন শিনের হার্ট অ্যাটাক হলো। তখন তিনি জঙ্গলের ভেতর একা ছিলেন। বুকে প্রচণ্ড চাপ নিয়েও হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছান, তারপর একটা বাসে করে হাসপাতালে যান। সেখানে পৌঁছে একজন ধর্মযাজককে ডেকে শেষকৃত্যের প্রার্থনাও করিয়ে নিয়েছিলেন।
এসবের অনেকটাই ক্যামেরায় ধরে রাখছিলেন ফ্রান্সিসের স্ত্রী এলিনর কাপোলা। ষোল মিলিমিটারের একটা ক্যামেরা নিয়ে তিনি সেটে ঘুরতেন। শুরুতে কাজটা ছিল প্রচারের জন্য। পরিবেশক চেয়েছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের কিছু ফুটেজ। এলিনর শেষ পর্যন্ত ক্যামেরা চালিয়েছেন প্রায় তিন বছর। ফ্রান্সিসের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও হয়েছিল একটা সিনেমার সেটেই, ‘ডিমেনশিয়া থার্টিন’-এ। সেখানে তিনি সহকারী শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করছিলেন।
ওই ফুটেজে একটা টেপ আছে, যেখানে কাপোলা তাঁর টিমকে বলছেন, মার্টি যদি মারা যান, তাহলে তিনি নিজে না বলা পর্যন্ত যেন কেউ বাইরে কিছু না বলে। আরেকটা টেপে তিনি বলছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জঘন্য, আত্মম্ভরী সিনেমা বানিয়ে ফেলা। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি সেদিকেই এগোচ্ছেন।
এই সময়ে তিনি নিজের বাড়ি আর আঙুরখেত বন্ধক রেখেছিলেন। ওজনও অনেক কমে গিয়েছিল। মৃগীরোগের খিঁচুনিও হয়েছিল। এলিনরের ডায়েরিতে আছে, একদিন হতাশ হয়ে কাপোলা তাঁর অস্কারগুলো জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলেছিলেন। বাচ্চারা পরে উঠোন থেকে সেগুলো কুড়িয়ে আনে। পাঁচটার মধ্যে চারটিই ভেঙে গিয়েছিল।
১৯৭৯ সালে কান-এ সিনেমাটা দেখানো হলো। তখনও শেষ হয়নি, তাই ছবির সঙ্গে ‘ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস’ লেখা ছিল। সাংবাদিকদের সামনে কাপোলা বলেছিলেন, “আমার সিনেমা ভিয়েতনাম নিয়ে নয়, আমার সিনেমাই ভিয়েতনাম।” জঙ্গলে তাঁদের হাতে লোক, টাকা আর সরঞ্জাম ছিল প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। কাজ যত এগিয়েছে, পরিস্থিতিও তত খারাপ হয়েছে। ওই অসমাপ্ত অবস্থাতেই সিনেমাটা সে বছর পাম দ’অর জিতে নিলো।
আঙুরখেতটা শেষ পর্যন্ত তিনি ছাড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু পঁয়তাল্লিশ বছর পর সেই জমিই আবার বিক্রি করতে হবে। এবার আর বন্ধক রাখার জন্য নয়।
সিলভারফিশ
‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ’-এর পর কাপোলা প্রযুক্তির দিকে গেলেন। হলিউড জেনারেল স্টুডিয়োর জমি কিনে নিজের স্টুডিয়ো বানালেন। শুটিং হবে সাউন্ডস্টেজে, পুরনো স্টুডিয়ো ব্যবস্থার মতোই, তবে সেখানে নতুন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। কাপোলা এই পদ্ধতিকে বলতেন ‘ইলেকট্রনিক সিনেমা’।
‘ওয়ান ফ্রম দ্য হার্ট’-এর গল্প লাস ভেগাসে। কিন্তু সিনেমার জন্য কাপোলা সেখানে যাননি। সাউন্ডস্টেজে ফ্রিমন্ট স্ট্রিটের একটা বড় সেট বানানো হলো, নিয়ন সাইন থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত।
শুটিংয়ের সময় তিনি সেটে থাকতেন না। স্টুডিয়োর বাইরে একটা এয়ারস্ট্রিম ট্রেইলার দাঁড় করানো ছিল, নাম সিলভারফিশ। পাঁচটা স্টেজ থেকে সেখানে ভিডিও আসত। ভেতরে ছিল এডিটিংয়ের যন্ত্রপাতি, সুইচার আর স্টিল স্টোর। কাপোলা সেখান থেকেই মনিটরে সব দেখে শুটিং পরিচালনা করতেন। একই সঙ্গে শুট করা অংশ জোড়া দিয়ে সিনেমার একটা খসড়াও বানানো হচ্ছিল। শুটিং শুরুর আগেই স্টোরিবোর্ড আর মহড়ার ভিডিও দিয়ে সিনেমাটার একটা পুরো সংস্করণ বানিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
সিলভারফিশের একটা কাজ ছিল শুটিংয়ের আগে যতটা সম্ভব সবকিছু দেখে নেওয়া। কোথায় কী সমস্যা হতে পারে, সেটাও তখন বোঝা যেত। এতদিন যে মানুষটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে সিনেমার ভালো মুহূর্ত খুঁজে পেয়েছেন, এবার তিনি উল্টোভাবে কাজ করছিলেন। যতটা সম্ভব অনিশ্চয়তা কমিয়ে ফেলতে চাইছিলেন।
কিন্তু ‘ওয়ান ফ্রম দ্য হার্ট’ মুক্তির পর দর্শক হলে গেল না। কাপোলার স্টুডিয়ো আর টিকল না। তাঁকে একে একে সব বিক্রি করে দিতে হলো। পরের এক দশক তাঁকে ঋণ শোধ করার জন্য এমন সিনেমা করতে হয়েছে, যেগুলো নিজের পছন্দে বানানোর সুযোগ তাঁর খুব বেশি ছিল না।
স্টুডিয়ো ডুবে যাওয়ার পরপরই যে সিনেমাটা তিনি বানালেন, সেটার প্রস্তাব এসেছিল একজন স্কুলের লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে।
টুলসার জিমনেসিয়াম
১৯৮০ সালের মার্চে ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেজনোর লোন স্টার স্কুলের লাইব্রেরিয়ান জো এলেন মিসাকিয়ান কাপোলাকে একটা খাম পাঠালেন। তাঁর ঠিকানা জানা ছিল না, তাই খামটা পাঠিয়েছিলেন প্যারামাউন্টের নিউ ইয়র্ক অফিসে। ভেতরে ছিল এস. ই. হিন্টনের ‘দ্য আউটসাইডার্স’ উপন্যাসের একটা পেপারব্যাক কপি, একটা চিঠি আর সপ্তম-অষ্টম শ্রেণির ১১০ জন শিক্ষার্থীর সই করা একটা আবেদন।
মিসাকিয়ান দেখেছিলেন, স্কুলের ছেলেরা বই পড়তে চায় না। তাঁর নিজের ছেলেও না। কিন্তু ‘দ্য আউটসাইডার্স’ তারা পড়েছিল। তাই তিনি চেয়েছিলেন, কাপোলা বইটা নিয়ে একটা সিনেমা বানান।
তিন মাস পর প্রযোজক ফ্রেড রুসের কাছ থেকে উত্তর এলো। দুই বছর পর টুলসায় সিনেমাটার শুটিং শুরু হলো। শেষে যে উৎসর্গপত্রটা আসে, সেখানে জো এলেন মিসাকিয়ান আর লোন স্টার স্কুলের শিক্ষার্থীদের নাম ছিল।
টুলসায় গিয়ে কাপোলা একটা হাই স্কুলের জিমনেসিয়ামে অস্থায়ী স্টুডিয়ো বানালেন। সেখানেই একটার বদলে দুইটা সিনেমা বানিয়ে ফেললেন। ‘দ্য আউটসাইডার্স’-এর শুটিং শেষ হওয়ার পর একই লোকেশন আর প্রায় একই তরুণ অভিনেতাদের নিয়ে শুরু করলেন ‘রাম্বল ফিশ’, এস. ই. হিন্টনের আরেকটা উপন্যাস থেকে। প্রথম সিনেমাটা রঙিন এবং অনেকটাই রোমান্টিক। দ্বিতীয়টা সাদাকালো, জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের প্রভাব আছে। কাপোলা নিজেই এটাকে কিশোরদের জন্য একটা আর্ট ফিল্ম বলেছিলেন।
‘রাম্বল ফিশ’-এর মহড়ার সময় তিনি দ্য পুলিশের ড্রামার স্টুয়ার্ট কোপল্যান্ডকে নিয়ে এলেন। তাঁর কাজ ছিল দৃশ্যের ছন্দ নিয়ে কাজ করা। অর্থাৎ শুটিংয়ের আগেই ঠিক করা হতো, একটা দৃশ্য কতটা দ্রুত যাবে, কোথায় থামবে।
সিনেমাজুড়ে ঘড়ি দেখা যায়। দেয়ালে, রাস্তায়, ফ্রেমের কোণে। কোপল্যান্ডের স্কোরেও ড্রামের সঙ্গে ধাতব টিকটিক শব্দ আছে। সময় ফুরিয়ে আসছে, এই ব্যাপারটা শুধু গল্পে নয়, শব্দেও বোঝা যায়।
কাপোলার পঞ্চাশ বছরের ক্যারিয়ারে ‘দ্য আউটসাইডার্স’ ছিল ব্যতিক্রম। অন্য কেউ তাঁকে সিনেমাটা বানাতে বলেছিল। আর এর পরের সিনেমার প্রস্তাব এসেছিল এমন একজনের কাছ থেকে, যার সঙ্গে তাঁর পুরনো বিরোধ ছিল।
যে সিনেমার অর্থায়নে একটা খুন
‘দ্য কটন ক্লাব’ প্রযোজনা করছিলেন রবার্ট ইভান্স, ‘দ্য গডফাদার’-এর সময়কার কাপোলার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী। প্যারামাউন্ট সরে যাওয়ার পর ইভান্সকে বাইরের লোকের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। মারিও পুজোর স্ক্রিপ্ট তখন ষাটবারের মতো বদলানো হয়েছে, তবু ঠিক হচ্ছিল না। ইভান্স কাপোলাকে প্রথমে শুধু স্ক্রিপ্ট ঠিক করার জন্য ডাকলেন। কাপোলার নিজের স্টুডিয়ো তখন বন্ধ হয়ে গেছে, টাকারও দরকার ছিল। তিনি কাজ শুরু করলেন, পরে পরিচালনার দায়িত্বও নিলেন।
শুটিং শুরুর আগেই একজন লগ্নিকারী নিখোঁজ হয়ে গেলেন। ভডেভিল প্রযোজক রয় র্যাডিনকে ১৯৮৩ সালের ১৩ মে বেভারলি হিলসে শেষবার দেখা যায়। এক মাস পর লস অ্যাঞ্জেলেসের বাইরে তাঁর দেহাবশেষ পাওয়া যায়। পরে এই হত্যার মামলায় এক নারী দোষী সাব্যস্ত হন। র্যাডিনকে তিনিই ইভান্সের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
আর সেই সময় কাপোলা হারলেমের একটা নাইটক্লাবের সেটে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন নাচের দৃশ্য শুট করছিলেন।
এতদিন তাঁর সিনেমায় সমস্যা হয়েছে টাকা, সময় বা স্বাস্থ্য নিয়ে। এবার ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল।
বাবার শেয়ার
কাপোলার জন্ম ১৯৩৯ সালে ডেট্রয়টে। তাঁর বাবা কারমাইন কাপোলা ফোর্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা একটা রেডিও অনুষ্ঠানে বাজাতেন। সেই সময় তিনি প্রেস্টন টাকারের গাড়ি কোম্পানিতেও বিনিয়োগ করেছিলেন। টাকার এমন একটা গাড়ি বানাচ্ছিলেন, যেটা তখনকার সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু মামলা আর আর্থিক সমস্যায় কোম্পানিটা বন্ধ হয়ে যায়। মোট পঞ্চাশটা গাড়ি তৈরি হয়েছিল, আর কারমাইন তার একটার জন্য টাকা জমা দিয়েছিলেন।
১৯৮৬ সালের ২৬ মে, ‘গার্ডেনস অফ স্টোন’-এর শুটিং শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই কাপোলার বড় ছেলে জিয়ান-কার্লো মেরিল্যান্ডের সাউথ রিভারে এক নৌ-দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর বয়স ছিল বাইশ। তিনি বাবার সেটে সেকেন্ড ইউনিটের কাজ শিখছিলেন। স্টুডিয়ো কাপোলাকে সিনেমা থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। তিনি সরে যাননি, শুটিং শেষ করেন। সিনেমাটার গল্পও ছিল আর্লিংটন জাতীয় কবরস্থানে সৈনিকদের কফিন বহন করা একদল মানুষের জীবন নিয়ে।
ওই বছরই জর্জ লুকাস, কাপোলার পুরনো সহকারী, ‘টাকার: দ্য ম্যান অ্যান্ড হিজ ড্রিম’ প্রকল্পটা আবার শুরু করেন। নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে তিনি কাপোলাকে বলেছিলেন, সিনেমাটা যেন ফ্র্যাঙ্ক কাপ্রার ছবির মতো উজ্জ্বল আর আশাবাদী হয়।
শর্তটা কঠিন শোনায়। কিন্তু লুকাসের কথাটা বোঝা যায়। কাপোলার নিজের জীবন তখন অনেকটা প্রেস্টন টাকারের মতো হয়ে উঠেছিল। নিজের মতো করে কিছু করতে গিয়ে তিনি বারবার বড় স্টুডিয়ো আর ব্যবসায়িক ব্যবস্থার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন। ছেলে মারা যাওয়ার কয়েক মাস পর তাঁকে যদি আরেকটা অন্ধকার সিনেমা বানাতে দেওয়া হতো, সেটাও হয়তো তাঁর নিজের কষ্টের গল্প হয়ে যেত।
সিনেমার একটা কাল্পনিক রেডিও বিজ্ঞাপনের জন্য জিঙ্গল লিখেছিলেন কাপোলার বাবা কারমাইন। শুটিংয়ের আগের রাতেই সুরটা লিখেছিলেন তিনি। শেষ দৃশ্যে সেই সুরই বাজে, যখন টাকারের গাড়িগুলো একসঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে যায়।
ফ্রিজে রাখা ফিল্ম
১৯৯২ সালে ‘ব্রাম স্টোকার্স ড্রাকুলা’ বানানোর সময় কাপোলা তাঁর ভিজ্যুয়াল এফেক্টস টিমকে বললেন, তিনি কোনো কম্পিউটার-তৈরি এফেক্ট চান না। পর্দায় যা ঘটবে, সবকিছু ক্যামেরার সামনেই করতে হবে।
কাপোলার ভাবনাটা ছিল সিনেমার শুরুর দিকের কৌশলগুলো ফিরিয়ে আনা। ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল ১৮৯৭ সালে। সিনেমার শুরুর দিকের অনেক কৌশলও এসেছিল ম্যাজিক শো থেকে। কাপোলা চেয়েছিলেন ছবিটা যেন পুরনো দিনের জাদুর মতো লাগে, জর্জ মেলিয়েসের সিনেমার মতো।
ভিজ্যুয়াল এফেক্টস টিম এতে রাজি ছিল না। তারা বারবার আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলছিল। শেষ পর্যন্ত কাপোলা টিমটাকে সরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব দিলেন তাঁর ছেলে রোমান কাপোলাকে। তখন রোমানের বয়স বিশের কোঠায়, আর স্টেজ ম্যাজিকের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল।
উনত্রিশ বছর আগে করম্যান তাঁর সিনেমায় বাইরের পরিচালক এনে কাজ করিয়েছিলেন। এবার কাপোলা ভিজ্যুয়াল এফেক্টসের কাজটা নিজের পরিবারকেই দিলেন।
বাবা-ছেলে মিলে পুরনো দিনের অনেক কৌশল ব্যবহার করলেন। ফিল্ম উল্টো করে চালানো, ফোর্সড পার্সপেক্টিভ, ছায়ার পুতুল, মিনিয়েচার আর ডাবল এক্সপোজার। ডাবল এক্সপোজারের জন্য একটা দৃশ্য শুট করার পর ফিল্মের খুঁটিনাটি নোট করে সেটা ফ্রিজে রেখে দেওয়া হতো। এক সপ্তাহ পর সেই একই ফিল্ম আবার ক্যামেরায় ঢুকিয়ে তার ওপর পরের দৃশ্যটা শুট করা হতো।
এভাবে পোস্ট প্রোডাকশনে আলাদা করে এফেক্ট জোড়ার দরকার পড়ত না। সবকিছু ক্যামেরার সামনেই তৈরি হচ্ছিল।
উইনোনা রাইডারের শোবার ঘরে যে সবুজ কুয়াশা ঢুকে পড়ে, সেটাও ক্যামেরার সামনেই তৈরি করা হয়েছিল। ক্যামেরার সামনে একটা ফিফটি-ফিফটি আয়না বসানো হয়েছিল, যেটা জাদুকরদের দোকানে পাওয়া যেত এবং হলিউডে বহু বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি। নব্বই ডিগ্রি দূরে আরেকটা সেটে শুকনো বরফের ধোঁয়া ছেড়ে সবুজ আলো ফেলা হয়েছিল। আয়নায় সেই ধোঁয়া প্রতিফলিত হয়ে রাইডারের ঘরে দেখা যায়। সিনেমাটায় কম্পিউটার-তৈরি এফেক্ট আছে মাত্র একটা, একেবারে শেষে।
ওই সময়কার কম্পিউটারে বানানো ইমেজগুলো আজ দেখলে খেলনা মনে হয়। কিন্তু ‘ড্রাকুলা’-র আলো আর ছায়ার কাজটা এখনও আলাদা করে চোখে পড়ে। কারণ সেগুলো সত্যি আলো আর ক্যামেরার সামনে তৈরি করা হয়েছিল।
তিরিশ বছর পর কাপোলা আবার একই পথে হাঁটবেন। এবার অবশ্য সিনেমার শুটিং চলার মাঝখানে।
আঙুরখেত
‘মেগালোপলিস’-এর ভাবনা কাপোলার মাথায় এসেছিল সত্তরের দশকের শেষে। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি এ নিয়ে নিয়মিত নোট করতে শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে রোমের চিনেচিত্তা স্টুডিয়োতে অফিসও খোলা হয়েছিল। কিন্তু ঋণ শোধ করার চাপের কারণে কাজ থেমে যায়।
২০০১ সালে তিনি আবার সিনেমাটা নিয়ে কাজ শুরু করেন। নিউ ইয়র্কে বড় অভিনেতাদের নিয়ে টেবিল রিড হয়। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ত্রিশ ঘণ্টারও বেশি ফুটেজও তোলা হয়। গল্পটা ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটা মহানগরকে নতুন করে গড়ে তোলার। কিন্তু নিউ ইয়র্কে শুটিং চলার সময়ই ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা হয়। প্রকল্পটা আবার বন্ধ হয়ে যায়। এবার প্রায় দুই দশকের জন্য।
শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা বানানো সম্ভব হয় কাপোলার নিজের টাকায়। কোনো স্টুডিয়ো অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি তাঁর আঙুরখেতের একটা বড় অংশ বিক্রি করে দেন। যে জমি তিনি ‘দ্য গডফাদার’-এর আয় দিয়ে কিনেছিলেন এবং ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ’-এর সময় বন্ধক রেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই জমিই তাঁর শেষ সিনেমার খরচ জোগাল। তখন তাঁর বয়স পঁচাশি।
শুটিংয়ের মাঝপথে তিনি আবার তাঁর ভিজ্যুয়াল এফেক্টস টিমকে বাদ দিলেন, ঠিক যেভাবে ‘ড্রাকুলা’-র সময় দিয়েছিলেন। প্রোডাকশন ডিজাইনারও চলে গেলেন, আর সংবাদমাধ্যমে খবর বেরোলো, সেটে বিশৃঙ্খলা।
কান-এ প্রথম প্রদর্শনীর পর দর্শক সাত মিনিট দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিলো, আর সমালোচকেরা দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। কেউ বলেছেন মাস্টারওয়ার্ক, কেউ বলেছেন বিরাট বোকামি।
আয়ারল্যান্ডে নয় দিনের শুটিংয়ে যে লোক অন্যের বেঁচে যাওয়া টাকায় প্রথম সিনেমা বানিয়েছিলেন, একষট্টি বছর পর সেই লোকই নিজের সব টাকা দিয়ে শেষ সিনেমাটা বানালেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি বারবার নিজের কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর প্রতিবারই তার জন্য আগের চেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে।
প্রস্তুতি আর দুর্ঘটনা
কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি করেছেন কী?
যতবার নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়েছেন, ততবার এমন ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটতে পারে। ফিলিপাইনের জঙ্গলে তিনি এমন এক দেশের সেনাবাহিনী ধার করেছিলেন, যেখানে সত্যিই যুদ্ধ চলছিল। লাস ভেগাসের বদলে বানিয়েছিলেন প্লাইউডের লাস ভেগাস, ডিজিটালের বদলে ব্যবহার করেছিলেন ফ্রিজে রাখা ফিল্ম। শেষ সিনেমার খরচ জোগাতে নিজের আঙুরখেতের একটা বড় অংশও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ডেডালাস গোলকধাঁধা বানিয়ে ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। কাপোলা বারবার নিজেই সেই গোলকধাঁধায় ঢুকেছেন।
কেন? নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে তাঁর কাজের দিকে তাকালে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
করম্যান তাঁকে শিখিয়েছিলেন, বাইরের লোক কাজে হাত দিলে সমস্যা হয়। পরে কাপোলা এর আরেকটা দিক খুঁজে নেন। সিনেমায় সবকিছু আগে থেকে ঠিক করেও কিছু জায়গা খোলা রাখতে হয়। তিনি এমন একটা জায়গা চেয়েছিলেন, যেখানে বাইরের কেউ হস্তক্ষেপ করবে না, কিন্তু ভেতরে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটতে পারবে। সেই স্বাধীনতার জন্যই তিনি বারবার টাকা খরচ করেছেন।
তাই তাঁর অনেক বিখ্যাত মুহূর্ত আগে থেকে লেখা ছিল না। ‘দ্য গডফাদার পার্ট টু’-এর শেষ দৃশ্যে ব্র্যান্ডো আসেননি। ‘দ্য কনভারসেশন’-এর শেষে একজন অভিনেতার ভুল টেক বদলে দিয়েছে দৃশ্যের অর্থ। ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ’-এর প্রথম দৃশ্যে মার্টিন শিন সত্যিই আহত হয়েছিলেন।
এইসব পদ্ধতির কারণে শুধু পরিচালক নন, আশপাশের মানুষকেও সেই মূল্য দিতে হয়েছে। মার্টিন শিন ওই দৃশ্যটা বহু বছর দেখতে চাননি। এলিনর কাপোলা তিন বছর ধরে ক্যামেরায় ঘটনাগুলো ধরে রেখেছেন। আর ‘দ্য কটন ক্লাব’-এর অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত একজন মানুষ খুন হয়েছেন। সবকিছুর হিসাব মেলানো যায় না।
তবু সেই সাতশো পাতার খাতার পিটফল ঘরটার কথা মনে থাকে। প্রতিটি দৃশ্যের পাশে কাপোলা লিখেছিলেন, এটা কীভাবে নষ্ট হতে পারে। এত বছরের কাজের পর মনে হয়, প্রস্তুতির একটা বড় অংশ ছিল অপ্রত্যাশিত জিনিস চিনতে শেখা।
সবকিছু আগে থেকে ঠিক করে রাখাই তাঁর কাজ ছিল না। কিছু হঠাৎ ঘটে গেলে সেটা রেখে দেওয়ার মতো চোখ তৈরি করাও তাঁর কাজের অংশ ছিল। আর কখনো কখনো, তার জন্য ক্যামেরা বন্ধ না করাটাই যথেষ্ট ছিল।
©somewhere in net ltd.
১|
২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬
হাসান মাহবুব বলেছেন: কপোলা আউটসাইডারস নিয়ে ছবি বানাইছে, তা জানতাম না। দেখতে হবে। ড্রাকুলা দেখতে ইচ্ছে করে নাই আগে। এখন তো দেখতেই হবে। মেগালোপোলিস দেখি নাই। এটা কেমন লাগছে তোমার কাছে?
দুর্দান্ত আর্টিকেল!