| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমার স্ত্রী তনিমাকে নিয়ে গ্রামে চলে এলাম। গ্রামে অনেক বড় জায়গা পড়ে আছে। আমার ইচ্ছে সেখানে একটা সুন্দর বাড়ি করার। ২তলা বাড়ির সামনে ঘাসভর্তি অনেক খালি জায়গা থাকবে, সেখানে বাগান করব, খেলার জায়গা থাকবে, কিছু বড় গাছ ও থাকবে যার ছায়ায় বসে আড্ডা দেয়া যাবে। বাড়ির অনেকটা দূরে থাকবে গেইট।
নতুন বাড়ি বানানোর জন্য সব জিনিসপত্তর কিনা হচ্ছে। কাজ আরও মাস তিনেক বাদে শুরু হবে।
এখন যে ঘরে আমরা থাকছি এই ঘরটায় বাবা থাকতেন, ঘরের সব জায়গায় বাবার গন্ধ পাচ্ছি। বাবা স্কুল মাস্টার ছিলেন। এই ঘরটা বাবার অনেক কষ্টের টাকায় বানানো।
আগের কথা গুলো খুব মনে পড়ছে। বাবার গন্ধভরা ঘরে থাকছি বলে সেটা বেশি হচ্ছে।
বাবার কালো চুল আমার দেখা হয়নি, শুনেছি বিয়ের আগে থেকে চুলে পাক ধরেছে।
তখন আমি ছোট, রাতে কি সব স্বপ্ন দেখে ভয়ে কেঁদে উঠতাম, বাবা আমাকে কাঁধে করে নিয়ে সারা উঠুন হেঁটে বেড়াতেন রাত যতটাই হোক। একদিন হোঁচট খেয়ে সামনের গাছে লেগে যেতে যেতেই হাত বাড়িয়ে বেঁচে যান কিন্তু বাম হাতের কড়ে আঙুলটা ভেঙ্গে যায়।
তারও কিছুদিন পরের কথা,
আমি তখন ঢাকায় পড়াশুনার করি। মাঝে মাঝে বাড়ি আসি দু’তিন দিনের জন্য। আমি খেয়াল করতাম বাবার তরতাজা শরীর আস্তে আস্তে করে শুকিয়ে যাচ্ছে। আগের জামাগুলো গায়ে ঢিলে হয়। পুরনো জামাগুলোর দিকে তাকালে.........। আমি একটা খয়েরি পাঞ্জাবী কিনে আনলাম টিউশনির টাকায়। বাবা সেটা পরেই থাকতেন সারাদিন বোতাম খুলে। বোতাম লাগালে নাকি দম বন্ধ হয়ে আসে।
আমার ধারণা “পৃথিবীর সব বাবা তাঁদের ভালবাসাটা কখনো বুঝাতে পারেন না, মায়েরা সহজেই সেটা চোখের জলে বুঝিয়ে দেন”।
কিন্তু আমি কেমন করেই যেন বুঝতে পারছি বাবা আমায় খুব ভালবাসেন। অন্য সবার থেকে বেশি। সেটা আরও বুঝতে পারি বাবার মৃত্যুর দিন।
বাবার মৃত্যুর দিন আমায় দেখতে চেয়েছিলেন। আমি তখন ঢাকা, বাড়ি থেকে খবর এলো বাবার অবস্থা খুব খারাপ, আমি সাথে সাথে বাস এ উঠি। ৮৩ কিলোমিটার পথ আমার আমার পৌছাতে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে জ্যামের কারনে। মায়ের মুখে শুনেছি বাবা নাকি শেষ সময়ে আমাকে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। বার বার চোখ ঘুরিয়ে আমাকে খুব খুঁজেছিলেন। বাবার শেষ কথাটা আর শুনা হয়নি। আমি মনে মনে হাজারটা কথা ভেবেছি কি কথা বাবা আমায় বলতে চেয়েছিলেন? ভেবে পাই না।
এখন, আমি বাবার সেই ছোট স্কুলটায় মাস্টারি করি, বাবার চেয়ারে বসি, তাঁর ব্যবহার করা ডাস্টার, চক, আলমারি ব্যবহার করি।
যখন স্কুল থেকে বের হয়ে সামনের গাব গাছটার নিচে আসি তখন কিছুটা অন্যরকম লাগে, মনে হয় বাবা আমার সাথেই আছেন, একা একা বাড়ি ফিরতে কষ্ট হবে বলে আমার জন্যে এখানে অপেক্ষা করছেন।
ভাঙ্গা রাস্তা ধরে সরিষা ক্ষেতের পাশ দিয়ে যখন হাঁটি তখন বাবা আর আমার পাশে হাঁটতে পারেন না, পথটা খুব সরু বলে। আমার পিছন পিছন কাঁধে দু’হাত রেখে ছোট বাচ্চার মত হেঁটে চলে।
আমায় বলে,
-শেষ পর্যন্ত আমার ভাঙ্গা স্কুলেই আসতে হল? এর থেকে ভাল কোন চাকরিও তো করতে পারতি।
-ভাল কোন স্কুলে কি তুমি থাকতে?
-আমার থেকেও ভাল মাস্টার হতে হবে তোকে।
-তোমার থেকে ভাল মাস্টার আর কখনো হবে না বাবা।
-আমায় পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, বেশ কথা শিখেছিস। তোর বউ এর রান্না খাবার খুব ইচ্ছে ছিল কথাটা বলেই বলল, যা এবার ঘরে যা, বাড়ি এসে গেছিস।
প্রতিদিন বাড়ি এসেই মনে পড়ে, বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি আমাকে তিনি শেষ দিন কি বলতে চেয়েছিলেন। আমার অনেক কথাই মনে থাকে না তাই একটা কাগজে লিখে পাঞ্জাবীর পকেটে রেখে দিলাম যেন কাল ভুলে গেলেও মনে করতে পারি, কারন আমি অভ্যাসবশত একটু পর পরেই পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকাই ।
পরদিন স্কুলে যাবার সময় বাবার জন্য তাঁর প্রিয় খাবার নিয়ে নিলাম। তনিমা খুব যত্ন করে পুঁটি মাছ দিয়ে সজনে রান্না করে এক বাটি ভাত দিয়ে দিলো। আমি স্কুলে পৌঁছে দেখি গাব গাছটা কেটে ফেলা হচ্ছে, আমি কাউকে কিছু বললাম না। ক্লাস শেষে সব দিনের মত গাব গাছটার গোঁড়ায় এসে দাঁড়ালাম। বাবা আসছে না কেন? সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে আমি বাবাকে খুঁজছি কিন্তু কোথাও বাবার আসার লক্ষন না দেখে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
সেই সরিষা ক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে বড় রাস্তায় উঠতেই চাদর জড়ানো একটা লোক এসে আমার হাতে খাবার দেখে বলল, অনেক দিন ধরে নাকি কিছু খাওয়া হয় না। আমি বাবার জন্য আনা খাবারটা তাকে দিয়ে দিলাম। আমি খেয়াল করলাম উনার বাম হাতের কড়ে আঙুলটা ভাঙ্গা। সে হাসি মুখে চলে যাচ্ছে, কিছুটা দূরে যেতেই দমকা বাতাসে চাঁদর খুলে গেল আর আমি দেখতে পেলাম লোকটার মাথার সবগুলো চুল সাদা আর গায়ে খয়েরি পাঞ্জাবী, সবগুলো বোতাম খুলা।
ততক্ষণে ধুলো এসে সব মিলিয়ে গেল।
আজ আর শেষ কথাটা জিজ্ঞেস করার কথা ভুলিনি। তবু...........বাবার শেষ কথাটা আমার আর জানা হল না।
সন্ধায় বাড়ি আসতেই যখন আমার মেয়ে বীনা এসে আমাকে বাবা বলে জড়িয়ে ধরল তখন ভেতরে হাজার সুখের পায়রার মাঝে একটা ডানা ভাঙ্গা পায়রা অনেক কষ্টে উড়ে যাচ্ছে, আমি এই বাবা ডাকটা ডাকতে পারি না।
(২৩ জুন ২০১৪)
©somewhere in net ltd.