![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
The woods are lovely, dark and deep, But I have promises to keep, And miles to go before I sleep, And miles to go before I sleep.---Robert Frost
দু'টি কাজ আমি কখনই করিনা। এক. তর্ক করা এবং দুই. বাজী ধরা। কেন যেন এই কাজগুলো আমার কাছে অর্থহীন বলে মনে হয়। তর্ক করা বা শোনাতো আমার কাছে পুরাই বিরক্তিকর বলে মনে হয়। আর 'বেট' বা বাজী ধরার ব্যাপারে আমার মতামত হলো, মানুষের মাথা নষ্ট না হলে কেউ বাজী ধরার মতো ফালতু কাজ করতে পারে?
কিন্তু তারপরেও জীবনে কোন এক সময় এই আমি-ই একবার বাজী ধরেছিলাম। কিভাবে সেই বাজী ধরলাম এবং তারপর কী ঘটলো সেই গল্প শোনার আগে একজন মহান মানুষের ব্যাপারে ছোট একটি ভূমিকা না দিলেই নয়। তিনি হলেন রুমী ভাই। দেখতে হ্যাংলা পাতলা লম্বাটে। সামনের পাটির দাঁতগুলো উঁচু। একটু বাঁচাল প্রকৃতির।
রুমি ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়টা ছিলএকটু অন্যরকম। ব্যাপারটা তাহলে সংক্ষেপে বিস্তারিতই বলি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকালবেলা আমি মগবাজার থেকে গুলশান বাসে করে যাচ্ছি। কানে হেডফোন লাগিয়ে একমনে গান শুনছিলাম। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি বাসের ভেতরে একজন শুকনা পাতলা লোকের সাথে বাসের কণ্ডাকটারের বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছে। কানের হেডফোন খুলে নিয়ে তাদের ঘটনাটা একটু বোঝার চেষ্টা করলাম।
"হেই মিঞা, মুখ শামলায় কথা কন! পাঁচশো টেকার জাল নোট দিছেন। এইডা বদলায় দ্যান। আর নাইলে দশ ট্যাকা ভাড়া দ্যান।"
কন্ডাকটরের জ্বালাময়ী এই বক্তব্যের উত্তরে শুকনা পাতলা লোকটা তাকে রীতিমতো মারতে উদ্যত হলো "ফাইজলামি পাইছস আমার লগে? এই ট্যাকায় কোন ভেজাল নাই। এক্কেরে আসল। এইহান থেইকা ভাড়া রাখলে রাখ্ ব্যাটা। আর নাইলে খবরদার কইলাম চিক্কুর পারবিনা। মাইরা এক্কেরে শোয়ায় ফেলামু।"
পরিস্থিতি যখন বেশ ঘোলাটে তখন আমি এগিয়ে গেলাম। পকেট থেকে দশ টাকার একটা নোট বের করে কণ্ডাকটারকে দিয়ে বললাম, "ভাড়া পেয়েছ? এখন এইখানে আর কোন কথা নাই।"
বাস ততক্ষণে আমার অফিসের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। আমিও টুক করে নেমে পড়লাম। এরপর হেঁটে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হবার সময় লক্ষ্য করলাম সেই শুকনা লোকটা আমার পিছ পিছ আসছে। আমি একটু হাসি মুখে তাকাতেই লোকটা আমার প্রায় গায়ে পড়ে বললো, "আরে ভাই কণ্ডাকটার শালার ব্যাটা বদমাইশের হাড্ডি। কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোটকে বলে জাল টাকা? কি দিন দুনিয়া পড়ছে দ্যাখছেন নাকি?"
আমি আড় চোখে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললাম, "এই পাঁচশো টাকার নোটটা আর কাউকে দিয়েননা। পারলে নষ্ট করে ফেলেন।" আমার কথায় লোকটা মোটেও বিব্রত হলোনা। জোরে শব্দ করে একটা কাশি দিয়ে বললো, "ভাইয়ের কাছে কী একটা সিগারেট হবে?"
অফিসে ঢোকার আগে প্রতিদিন সকালে পাশের হোটেলে নাস্তা করি। আজকেও ঢুকলাম। লোকটাও আমার পিছ পিছ ঢুকলো। আমি কিছু বলার আগেই দেখি সে চিৎকার করে দুইজনের জন্যে পরোটা, ডাল ভাজি আর ডিম অর্ডার করে দিল।
হোটেলে বসে শুকনা আর বাঁচাল প্রকৃতির লোকটার সাথে পরোটা ভাজি দিয়ে নাস্তা করে চা আর সিগারেট খেতে খেতে জানলাম যে, তার নাম রুমি। তিনি রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের সেলস ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। অফিসের কাজে আমার প্রায়ই ফ্লাইটে এদিক ওদিক যাওয়া পড়ে। রুমী ভাই জানালেন, একদম টেনশনের কিছু নেই। বাংলাদেশের কোথাও যেতে হলে যেন তাকে কল করি। তিনি ডিসকাউন্টে টিকিটের ব্যবস্থা করে দিবেন। আমার ফোন নম্বরটাও টুকে নিলেন।
কথায় কথায় অফিসে ঢোকার সময় পার হয়ে যাচ্ছে দেখে দুইজনের খাবার বিল পরিশোধ করে ওই দিনের মতো তার থেকে বিদায় নিয়ে কাজে চলে গেলাম।
সারাদিনের কাজের প্রেসারে সকালের ঘটনাটা আর সেই লোকের কথা মাথা থেকে পুরাই আউট হয়ে গেল।
পরদিন সকালে আবার অফিসে যাচ্ছি। আমার পাশের সিটটা খালি হতেই দেখি কোথা থেকে গতকালের সেই লোকটা হুড়মুড় করে আমার পাশে এসে বসে পড়লো। হাসি হাসি মুখে আমাকে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় কন্ডাকটর এসে ভাড়া চাইতেই লোকটা ব্যাস্ত একটা ভাব দেখিয়ে বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেল।
এভাবেই লোকটা মানে রুমী ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়।
একই এলাকায় থাকি বলে মাঝে মাঝেই দেখা হয়ে যায় এখন। একদিন অফিসে যেতে দেরী হয়ে গেল বলে সকালে যখন সিএনজি ভাড়া করছি, কোথা থেকে রুমী ভাই উড়ে এসে আমার সাথে সিএনজিতে বসে পড়লেন। "হে: হে:। আপনাকে কমপানি দেবার জন্যেই একসাথে যাচ্ছি।" বলেই উঁচু দাঁতগুলো বের করে একটা অট্টহাসি হাসলেন।
সিএনজিতে যেতে যেতে রুমী ভাই চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "মিঞা ভাইয়ের কী গার্লফ্রেণ্ড আছে?" আমি কড়াভাবে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ক্যান ভাই? গার্লফ্রেণ্ড ব্যবসা করেন নাকি আপনি?"
উত্তরে জিভ কেটে ডান কানে হাত দিয়ে তিনি বললেন, "না না, ছি: ছি:! কী যে সব বলেন! না, মানে আমার অফিসের একটা সুন্দর মেয়ে আছে। আমার খুব ভালো কলিগ। একেবারে যাকে বলে ডানাকাটা পরী। বিয়েশাদী করে নাই। সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি। আপনি চাইলে ..."
তাকে কথা শেষ করতে দিলাম না। বেশ কড়া গলাতেই বললাম "থ্যাংস, লাগবেনা।"
দু'দিন পর আমার কাছে একটা কল এলো। বেশ মিষ্টি কণ্ঠের এক ভদ্রমহিলা আমার নাম ধরে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কী সেই ব্যক্তি কি না। বললাম যে, হ্যাঁ, আমি-ই সেই ব্যক্তি বলছি।
মিষ্টি কণ্ঠের ভদ্রমহিলার সাথে আমার কথোপকথনের সারমর্ম দাঁড়ালো এই যে, তার নাম সামিয়া। তিনি রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সেলস ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার। সেই রুমী ভাই আমার নম্বর তাকে দিয়েছেন কারণ আমার নাকি ঢাকা-চট্রগ্রামের একটা টিকেট লাগবে।
আমিতো আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম যে, "আপনি বোধহয় কোথাও ভুল করছেন। আমার এরকম কোন টিকিট এই মুহূর্তে প্রয়োজন নেই। আর আমি যদি খুব ভুল করে না থাকি তাহলে রুমী ভাইয়ের ভাষায় আপনি-ই সেই ডানাকাটা পরী যাকে তিনি আমার সাথে ঝুলিয়ে দিতে চাইছেন।"
ফোনের ওইপ্রান্তে ভদ্রমহিলা হাসতে হাসতে শেষ। তিনি বললেন, "আপনিও তাহলে রুমী ভাইয়ের পাল্লায় পড়েছেন? আমাকেও তিনি বলেছেন যে, এক ছেলের নম্বর দিচ্ছি। সেই রকম হাই প্রোফাইল। আর দেখতে পুরাই শাহরুখ খান!"
রুমী ভাইয়ের কেরামতিতে হোক আর যেভাবেই হোক, সামিয়ার সাথে আমার ফ্রেণ্ডশীপ হয়ে গেল। দেখাও হলো। কিন্তু দেখা হবার পর আমিও বুঝলাম যে, সামিয়া ডানা কাটা পরী নয়। আর সামিয়াও বুঝেলো যে, আমি শাহরুখ খান নই। কাজেই অন্য কোন চিন্তা বাদ দিয়ে দু'জনেই দু'জনের ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম।
একদিন সামিয়ার সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে রুমী ভাইয়ের কথা এলো। আমি বললাম, "লোকটাকে সহজ সরল বলেই মনে হয়। তুই কী বলিস?"
উত্তরে সামিয়া হাসতে হাসতে খুন। বললো, "তুই তাহলে রুমী ভাইরে চিনিস নাই। পুরাই একটা মাল।"
"মাল মানে?" আমি সত্যিই অবাক হলাম। এরপর সামিয়া রুমী ভাইয়ের পুরা বায়োডাটা আমার সামনে তুলে ধরলো।
রুমী ভাই প্রতিদিন মগবাজার থেকে গুলশান বাসে যান। ম্যাক্সিমাম টাইম তিনি ভীড়ের মধ্যে বাসে ঝুলে ঝুলেই যান। কণ্ডাকটর ভাড়া চাইতে আসলেই টুক করে চলন্ত বাস থেকে নেমে পড়েন। আর যখন কণ্ডাকটারের সামনা-সামনি পড়ে যান, তখন একটা পুরনো নকল পাঁচশো টাকার নোট বের করে সেটা দিয়ে ভাড়া দিতে চান।
রিজেন্ট এয়ারের অফিসে পৌঁছাবার পর অফিসের কলিগদের কারও ঘাড়ে চেপেই চা-পরোটা-ডালভাজি আর ডিম দিয়ে সকালের নাস্তাটা মেরে দ্যান। এরপর যেসব যাত্রী টিকিট কিনতে আসেন, তাদেরকে ভাঙতি নাই বলে যাত্রী প্রতি পাঁচ-দশ টাকা তার প্রতিদিনের এক্সট্রা ইনকাম। সেটা দিয়েই তিনি লাঞ্চ পর্বটা সেরে নেন।
বিকালের নাস্তার সময় সামিয়া কিংবা অন্য কোন ফিমেল কলিগের পাশের সীটে বসে তার থেকে খাবারের কিছুটা ভাগ গল্প করতে করতেই নিয়ে নেন। এরপর অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পালা। যথারীতি কন্ডাকটারের চোখ এড়িয়ে বাসে ঝুলে ঝুলে যতটা পথ আসা যায় আরকি।
এতটুকু শোনার পরেই আমি সামিয়াকে থামিয়ে দিলাম। বললাম, "থাক, আর বলিসনা। বদহজম হয়ে যাবে আমার।"
সামিয়া কৌতুকের ভঙ্গিতে বললো, "থাকবে কেন রে? এই হাড় কিপটা লোকটার থেকে একটা টাকাও কেউ কোনদিন বের করতে পারে নাই। পারবি তুই তার থেকে খেতে? যদি পারিস, তোকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা দিব। আর না পারলে তুই আমাকে দিবি। রাজী?"
একটু চুপ করে থেকে কী ভেবে যেন বলেই ফেললাম, "ঠিক হ্যায় দোস্ত। আমি রাজী।"
এর কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন রাস্তায় রুমী ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। সামিয়ার সাথে ধরা বাজীর কথাটা মাথায় ঝিলিক মারলো। হাসি মুখে রুমী ভাইকে বললাম, "চলেন, মগবাজার মোড়ের বিএফসিতে বসি।"
বিএফসিতে ঢোকার পর খাবার অর্ডার করার জন্যে কাউণ্টারে দাঁড়াতেই আমি রুমী ভাইকে হেসে বললাম, "আজকে কিন্তু বিলটা আপনি দিবেন! কী আপত্তি আছে নাকি?"
রুমী ভাইও তার উঁচু দাঁতগুলো বের করে বিগলিত ভাবে হেসে বললেন, "আরে আজকে বিলতো আমিই দিবো ভাই! এইটা আবার বলার কি আছে?"
আমি টয়লেটে যাবার ভান করে আস্তে করে কাউন্টার থেকে সরে এলাম। ফাঁকে দিয়ে সামিয়াকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম কিভাবে আজকে রুমী ভাইকে সীল মারা হচ্ছে। এরপর টয়লেট শেষ করে যখন টেবিলে বসতে যাবো, তখন দেখি কাউন্টারে একটা হাউকাউ চিৎকার চেঁচামেচি চলছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি, রুমী ভাই কাউন্টারের ক্যাশিয়ারের সাথে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছেন। তার হাতে ছাল ওঠা ডেবিট কার্ডের মতো একটা প্লাস্টিকের কার্ড। তিনি চিৎকার করে বলছেন যে, "এই ডেবিট কার্ড দিয়ে আমি সব যায়গায় লক্ষ লক্ষ টাকার বিল দিয়া আসতেছি। আর তুই শালার ভূগোল পড়াস আমারে? এই কার্ড তোর মেশিন নেয়না? তোর এই ডেবিট মেশিন ভূয়া। এইডা এখুনি ফালায় দে।"
এদিকে যে একগাদা খাবারের তিনি অর্ডার করেছেন, সব খাবার কাউন্টারে চলে এসেছে। সেখান থেকে তিনি আবার একটা বার্গারে কামড়ও বসিয়ে দিয়েছেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি এগিয়ে গেলাম। মুখ ভর্তি বার্গার নিয়ে রুমী ভাই আমাকে সবার সামনে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, তার ডেবিট কার্ড কাজ করছেনা। এই ডেবিট মেশিন পুরাই নষ্ট। আর তার মানিব্যাগের ভেতরে ওই এক ডেবিট কার্ড ছাড়া আর একটা সুতাও নেই।
ক্যাশ কাউন্টারের ছেলেটা আমার পূর্ব পরিচিত। অগত্যা কি আর করা। মান সম্মান বাঁচাতে পকেট থেকে হাজার দু'য়েক টাকা বের করে বিল পরিশোধ করলাম।
এরপর সামিয়া'র পাঁচ হাজার টাকাও গুণতে হলো।
সেই থেকে আমি ভুলেও আর কোনদিন বাজী ধরিনা।
২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৫:৫৯
পয়গম্বর বলেছেন: ধন্যবাদ।
২| ০৬ ই এপ্রিল, ২০১৮ রাত ৯:২৫
সফেদ বিহঙ্গ বলেছেন: পড়ে ভালো লেগেছে...............।
২৬ শে এপ্রিল, ২০১৮ সকাল ৭:৪০
পয়গম্বর বলেছেন: ধন্যবাদ।
৩| ২৬ শে এপ্রিল, ২০১৮ সকাল ১০:৫১
টারজান০০০০৭ বলেছেন: হে হে হে ! রুমিতো সেইরাম চিজ!
তারে সামিয়ার লগে ঝুলাইয়া দিলেইতো পারতেন ! দুইদিনেই হাতেম তাই বানাইয়া দিতো !
০৪ ঠা মে, ২০১৮ সকাল ৮:৪৪
পয়গম্বর বলেছেন: তাকে ছাই দিয়েও ধরতে পারবেননা।
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ভোর ৬:২৬
অক্পটে বলেছেন: দারুণ মজা পেলাম যাকে বলে সত্যিকার বিনোদন। ভালো লিখেছেন।