নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

https://kotharjhapi.blogspot.com/

রানার ব্লগ

দূরে থাকুন তারা যারা ধর্মকে পুঁজি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দূরে থাকুন তারা যারা ১৯৭১ থেকে অদ্যাবদি বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত এবং সকল পাকিস্তানী প্রেমী , রাজাকার ও তাদের ছানাপোনা ।

রানার ব্লগ › বিস্তারিত পোস্টঃ

শিউলি ফুল

১৫ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:২২

আমাদের স্কুলের পেছনে একটা শিউলি গাছ ছিল। খুব বড়ো কিছু নয়, তবে আশ্বিন এলেই ভোরবেলায় সাদা ফুলে চারপাশ ভরে যেত। আমরা স্কুলে ঢোকার আগে কেউ পা দিয়ে ফুল মাড়াতাম না। হেডমাস্টার বলতেন, ফুলেরও প্রাণ আছে রে।

আমাদের ক্লাসে পড়তো নিরুপমা। আমরা ডাকতাম নীরু। গায়ের রং শ্যামলা, মুখখানা সাধারণ, কিন্তু চোখ দুটো এমন শান্ত যে তাকালে মনে হতো গ্রামের পুকুরের জলে মেঘের ছায়া নেমে এসেছে।

নীরুর বাবা ছিলেন পোস্টম্যান। সারাদিন সাইকেলে ঘুরে ঘুরে চিঠি বিলি করতেন। মেয়ের জন্য ছিল তাঁর অদ্ভুত স্নেহ। স্কুল ছুটির সময় প্রায়ই দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। নীরু লজ্জা পেয়ে বলতো,বাবা, সবাই দেখে। লোকটা হেসে বলতেন,দেখুক না মা। তোকে না দেখে আমার দিন কাটে?

আমাদেরই ক্লাসে পড়তো হীরণ। গ্রামের জমিদারবাড়ির একমাত্র ছেলে। চঞ্চল, দুরন্ত, পড়াশোনায় কাঁচা। কিন্তু তার মতো বাঁশি বাজাতে আমি আর কাউকে দেখিনি। বিকেল হলেই নদীর ধারে বসে সে বাঁশি বাজাতো। দূর থেকে সেই সুর শুনে নীরুর চোখ কেমন যেন অন্যরকম হয়ে উঠতো। আমরা বুঝতাম। কিন্তু কেউ কিছু বলতাম না। শুধু শীতের এক বিকেলে শিউলিতলার কাছে দাঁড়িয়ে হীরণ বলেছিল,নীরু, আমি যদি খুব বড়ো মানুষ হতে না পারি, তবু কি তুই আমায় ভুলে যাবি ? মেয়েটা মাটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল। মানুষ বড়ো হলে ভালোবাসা বড়ো হয় না হীরণদা।

তারপর সময় কেটে গেল। আমরা কলেজে উঠলাম। আমি শহরে চলে এলাম। মাঝেমধ্যে বাড়ি গেলে শুনতাম নীরুর বাবা অসুস্থ। পোস্ট ম্যানের চাকরি করতে করতে শরীর ভেঙে গেছে। সেই বছর বৈশাখের শেষে খবর এল, পোস্টম্যান কাকু আর নেই। খবর শুনে বাড়ি গিয়েছিলাম। দেখলাম নীরু উঠোনের এক কোণে বসে আছে। কান্না নেই, অভিযোগ নেই। শুধু মাথার সিঁদুরে রোদ এসে পড়েছে। সিদুর দেখে খানিকটা চমকে গেলাম, জানতাম না যে পাশের গ্রামের এক কাপড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।

ভদ্রলোক ভালো ছিল না।পাড় মাতাল, মাঝরাতে বাড়ি ফিরতো। সন্দেহ করতো। মারধর করতো। গ্রামের লোক সব জানতো।
কিন্তু কেউ কিছু বলতো না। ব্যাটা টাকার কুমির ছিলো।

একদিন বহু বছর পরে হীরণ ফিরে এল। শুনলাম ঢাকায় গিয়ে থিয়েটারের দলে কাজ করেছে। চেহারাটা শুকিয়ে গেছে। একদিন সন্ধ্যায় নদীর ধারে ওর সঙ্গে দেখা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, নীরুর কথা জানিস? সে একটু হেসে বললো, সব খবরই মানুষ পায় রে। শুধু সব কষ্টের কাছে যাওয়া যায় না। থিয়েটারে যাবার পর থেকে হীরনের কথা মাথার উপর দিয়ে চিল হয়ে উড়ে যায়, মাথা মুন্ডু কিছুই বোঝা যায় না। হা করে আমাকে চেয়ে থাকতে দেখে, ওপাড়ার যিশুদার মত খটখটিয়ে হেসে উঠলো। যিশুদা চৈত মাসেই তার পাগলামি বাড়ে।

তারপর থেকে প্রায়ই দেখতাম, দূরে দাঁড়িয়ে নীরুর বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে হীরণ। কাছে যেত না। কথা বলতো না। শুধু দূর থেকে দেখতো। সম্ভবত ভালোবাসারও একটা লজ্জা থাকে।

এক বর্ষার রাতে খবর এল, নীরুকে খুব মেরেছে তার স্বামী। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হীরণ ছুটে গিয়েছিল। আমি সঙ্গে ছিলাম। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে নীরু তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। মারের চোটে সমস্ত শরীরে কালসিটে পরে গেছে। আক্ষম আক্রশে আমাদের দুজনের রাগে শরীর কাপছে। ইচ্ছে করছে ব্যাটাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়ে আসি।

টানা দুইদিন পর নীরু চোখ খুললো, ওর ওমন মেঘ ছোয়া চোখে যেন আজ ঘোর আমাবস্যা, হীরণকে দেখে মৃদু হেসে বললো, এতদিন পরে এলি? হীরণ কাঁপা গলায় বললো, আর একটু আগে আসা উচিত ছিল নীরু। নীরু মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে চেয়ে রইলো। হয়তো চোখের বাদ ভাংগা জল ঢাকতে। তারপর নিজের কাঁপা হাত দিয়ে বালিশের তলা থেকে একটা পুরোনো কাপড়ের থলি বের করলো। ভেতরে শুকিয়ে যাওয়া কয়েকটা শিউলি ফুল আর একটা ভাঙা বাঁশির টুকরো। হীরণ থরথর করে কাঁপছিল। নীরু মৃদু স্বরে বললো, যেদিন তুই চলে গেলি, সেদিন শিউলিতলার নিচে পড়ে ছিল। ফেলে দিতে পারিনি।

আমি দেখলাম, জীবনে প্রথমবার হীরণ শিশুর মতো কাঁদছে। ভোর হওয়ার একটু আগে নীরু চলে গেল। বাইরে তখন ঝড় বইছে, হাসপাতালের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে হীরণ অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। কেউ কথা বলছিল না। হঠাৎ সে আমাকে বললো,জানিস তমাল , কিছু মানুষকে পাওয়া যায় না বলেই তারা সারাজীবন থেকে যায়। আমার কেনো জানি দুঃখ পাবার থেকে হিংসে হলো। মনে হলো হীরনের জায়গায় আমি কেনো হলাম না।

সেদিনই ছিল আষাঢ়ের প্রথম দিন। গ্রামে ফিরে আমরা নীরুকে শ্মশানে নিয়ে গেলাম। নীরুর স্বামী টা এসেছিলো, হীরন মেরে তাড়িয়ে দিলো, আমি কিছুই করতে পারলাম না। লোকলজ্জার ভয়ে নাকি অন্যকিছু ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। নীরুর স্বামী দেখে নেবার হুমকি দিয়ে পালালো।

সবাই চলে যাওয়ার পর দেখি হীরণ একা বসে আছে শিউলি গাছটার নিচে। কোলের ওপর তার পুরোনো বাঁশি। আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো বাজাবে। কিন্তু সে বাজালো না। সাথে করে বাড়ি নিতে চাইলাম, গেলো না। শুধু শুকনো ফুলগুলো মুঠোয় নিয়ে বসে রইলো।

পরদিন সকালে খবর এল, নদীর ঘাটে হীরণের দেহ পাওয়া গেছে। বুকে জড়িয়ে রাখা সেই ভাঙা বাঁশি। আর মুঠোভর্তি শুকিয়ে যাওয়া শিউলি ফুল।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.