নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আলহামদুলিল্লাহ। যা চাইনি তার চেয়ে বেশি দিয়েছেন প্রিয়তম রব। যা পাইনি তার জন্য আফসোস নেই। সিজদাবনত শুকরিয়া। প্রত্যাশার একটি ঘর এখনও ফাঁকা কি না জানা নেই, তাঁর কাছে নি:শর্ত ক্ষমা আশা করেছিলাম। তিনি দয়া করে যদি দিতেন, শুন্য সেই ঘরটিও পূর্নতা পেত!

নতুন নকিব

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।

নতুন নকিব › বিস্তারিত পোস্টঃ

ইসলামে যাকাত বিধান: ফাযাইল ও মাসাইল - রিপোস্ট

১৭ ই মে, ২০২০ সকাল ১০:০৪



কিছু কথাঃ
যাকাত বছরের যে কোনো মাসের যে কোনো সময়ে আদায় করা যায়। তবে রমজান মাস বিশেষ ফজিলতপূর্ণ হওয়ায় এই মাসেই অধিকাংশ ব্যক্তিবর্গ যাকাত আদায় করে থাকেন। এ মাসে যাকাত আদায় করা হলে অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি সাওয়াবের আশা করা যায়। কারণ, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

----- مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيهِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً -------

---- যে ব্যক্তি এই মাসে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য একটি নফল কাজ করবে, সে সেই ব্যক্তির সমান হয়ে যায়, যে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করে। আর যে ব্যক্তি এই মাসে একটি ফরজ কাজ করে, সে ঐ ব্যক্তির সমান হয়, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ কাজ করে। ----[শুয়াবল ঈমান, হাদীস নং-৩৩৩৬, সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৮৮৭]

আলহামদুলিল্লাহ, ২৭ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৩:১৭ মিনিটে প্রকাশিত এই লেখাটি পাঠে যাকাত বিষয়ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা-মাসায়েল জানতে এবং যাকাত রিলেটেড বিবিধ প্রশ্নের উত্তর পেতে সহায়ক হবে বিধায় পুনরায় পোস্ট করা হলো। আল্লাহ পাক আমাদের সকল নেক আমল কবুল করে নিন।

ইসলামে যাকাত বিধান: ফাযাইল ও মাসাইল

সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার জন্য:
আলহামদুলিল্লাহিল আকরামিল্লাজী খালাকাল ইনছা-না ওয়া কাররামাহু ওয়া আল্লামাহু মিনাল বায়ানি মা- লাম ইয়া'লাম। ফাসুবহানাহু লা ইউহসা- ইমতিনানুহু বিল্লিছানি ওয়ালা- বিল ক্কলাম। অচ্ছলাতু অচ্ছালামু আলা হাবিবিনাল মুসতাফা, আল্লাজী আ'তাহু খুলুকা আ'জাম, সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার আলীশান দরবারে সিজদাবনত শুকরিয়া যে, তিনি আমাদের জন্য যাকাতের মত উপকারী বিধানকে ফরজ করে দিয়েছেন।

যাকাত; প্রাককথন:
সাহিবে নিসাব অর্থাৎ যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত পরিমাণ ধন সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির জন্য যাকাত আদায় করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ফরজ। যাকাত ইসলামের একটি মৌলিক ও বুনিয়াদী রোকন। ঈমানের পর সালাতের সমস্তরের ফরয বিধান হল যাকাত। এ কারণেই পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ একত্রে এসেছে। তাই তো নিষ্ঠাবান মুমিনের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে কুরআনুল কারিমে এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:

وَأَقِيمُواْ الصَّلاَةَ وَآتُواْ الزَّكَاةَ وَمَا تُقَدِّمُواْ لأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللّهِ إِنَّ اللّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

'তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত দাও। তোমরা নিজের জন্যে পূর্বে যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। তোমরা যা কিছু কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা প্রত্যক্ষ করেন।' -সূরা বাকারা : ১১০

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

'নামায কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।' -সূরা নূর : ৫৬।

সূরা নিসার ১৬২ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য ‘আজরুন আযীম’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:

لَّـكِنِ الرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَالْمُؤْمِنُونَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَالْمُقِيمِينَ الصَّلاَةَ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالْمُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أُوْلَـئِكَ سَنُؤْتِيهِمْ أَجْرًا عَظِيمًا

'কিন্তু যারা তাদের মধ্যে জ্ঞানপক্ক ও ঈমানদার, তারা তাও মান্য করে যা আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আপনার পূর্বে। আর যারা নামাযে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী এবং যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে আস্থাশীল। বস্তুতঃ এমন লোকদেরকে আমি দান করবো মহাপুণ্য।'

যাকাত অস্বীকারকারী ঈমানহারা হয়ে যায়:
কেউ যাকাত অস্বীকার করলে তার ঈমান চলে যাবে। আর যাকাত ফরজ একথা স্বীকার করে ঠিকই কিন্তু যদি কেউ আদায় না করে থাকে, তবে তা হারাম ও কবীরা গুনাহ। যেমন, ইরশাদ হয়েছে-

الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُم بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ

যারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং পরকালে নিশ্চিত বিশ্বাস করে। (সূরাহ: আন নামল, আয়াত:৩)

যাকাতের সংজ্ঞা ও পরিচয়:
ইসলামী শরিয়ত কর্তৃক নিজের অধীনে থাকা নিসাব পরিমান সম্পদের একটি নির্ধারিত অংশ কোন ফকির বা গরিব মানুষকে মালিক বানিয়ে দেয়াকে যাকাত বলে। (ফাতওয়া শামী,৩য়, ১৭১ পৃষ্ঠা)

কুরআন-হাদীসের আলোকে যাকাতের ফযীলত:
যাকাত দেয়ার দ্বারা সম্পদ কমে না বরং তার মাঝে আরো বরকত হয়। যাকাত প্রদানের ফযীলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে অনেক বর্ণনা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:

وَمَا آَتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آَتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ

অনুবাদ:- 'মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলিয়া তোমরা যে সূদ দিয়া থাক, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে যাকাত তোমরা দিয়া থাক তাই বৃদ্ধি পায়, তারাই সমৃদ্ধিশালী।' (সূরা রূম, আয়াত:৩৯)

যাকাতের ফযীলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস:
এক. হযরত আনাস রা.থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: বনী তামীমের এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি অনেক সম্পদের মালিক এবং পরিবারে সন্তানও অনেক, সুতরাং আপনি বলে দিন, আমি আমার সম্পদ কিভাবে দান করব এবং তাদের সাথে কি ব্যবহার করবো?' তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তোমার সম্পদের যাকাত দাও। কেননা তা তোমাকে (তোমার সম্পদ) পবিত্র করে দিবে। আর নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ, ভিক্ষুক প্রতিবেশী এবং মিসকীনদের অধিকার পূরণ কর।' (মুসনাদে আহমদ: হাদীস নং ১২৩৯৪,)

দুই. হযরত আবু দারদা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: পাঁচটি আমল এমন রয়েছে, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে তা করবে, সে জান্নাত যাবে।
ক. দৈনিক পাঁচওয়াক্ত নামায অযু, রুকু ও সেজদাসহ সময়মত আদায় করার ব্যপারে যত্মবান হবে।
খ. রমজানে রোযা রাখবে।
গ. সক্ষম ব্যক্তিগন বায়তুল্লাহর হজ্জ করবে।
ঘ. স্বাচ্ছন্দে যাকাত দিবে। (তারগীব ও তারহিব-১মখন্ড পৃ: ৩৩৪,)

তিন. হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল যে, ব্যক্তি নিজ সম্পদের যাকাত প্রদান করে তার ব্যপারে আপনার রায় কি? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যে ব্যক্তি নিজ সম্পদের যাকাত প্রদান করে তার সম্পদে যত সমস্যা (বিপদ) আছে তা দুর হয়ে যাবে। (তারগীব ১ম,৩৩৫ পৃষ্ঠা,)

চার. হযরত আবু দারদা থেকে বর্ণিত : রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যাকাত হলো ইসলামের সেতুবন্ধন। (তারগীব ১ম,৩৩৪ পৃষ্ঠা,)

যাকাত দেয়ার সুফল:
যাকাত দেয়ার বিশেষ চারটি ফায়দা ও উপকারিতা রয়েছে। যথা:
১. সদকা-খয়রাতের দ্বারা সম্পদে বরকত হয়।
২. যাকাত দেয়ার দ্বারা আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয় এবং আল্লাহ তাআলার অসুন্তুষ্টি দূর হয়ে যায়।
৩. কৃপনতা ও লোভের ব্যপারে জাহান্নামের যেই আযাবের কথা বলা হয়েছে যাকাত দেয়ার দ্বারা তা দূর হয়ে যায়।
৪. আসমানের ফেরেস্তাগন যাকাত প্রদানকারীর জন্য দোয়া করে। (রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিয়া:১/৭৪৯)

যাকাত না দেয়ার কুফল:
যাকাত না দেয়ার কুফল সম্পর্কে পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে:

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ -يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ

অনুবাদ: 'যারা সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যন্ত্রনাময় শাস্তির সুসংবাদ দাও। যে দিন ধন-সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দ্বারা তাদের কপাল , তাদের পাজর ও পিঠে দাগ দেয়া হবে। ( এবং বলা হবে) এই হচ্ছে সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্চীভূত করতে, সুতরাং তোমরা যে সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে তার মজা ভোগ কর।' (সূরা তাওবা:আয়াত, ৩৪, ৩৫)

এমনিভাবে অনেক হাদিসেও যাকাত আদায় না করার কুফল বর্ণিত হয়েছে। যেমন, হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যারা মালের যাকাত দেয় না তাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কিয়ামতের দিন তাদের ধন-সম্পদ বিষাক্ত সাপের আকৃতি ধারণ করবে, যার থেকে সেসব সম্পদের মালিক পলায়ন করতে থাকবে। আর সেই সাপ তাকে খুঁজতে থাকবে। পরিশেষে তাকে ধরে ফেলবে। এমনকি এক পর্যায়ে তার হাতের আঙ্গুলসমূহ গিলে ফেলবে।' (মিশকাত শরীফ: ১ম, ১৫৭পৃষ্ঠা)

হযরত ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু হতে বর্ণিত- এক হাদীসে রাসূলে পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- 'যে ব্যক্তি তার মালের যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তার গলায় সেই মালকে সাপ বানিয়ে ঝুলিয়ে দিবেন।' (মিশকাত শরীফ: ১ম, ১৫৭পৃষ্ঠা,তিরমিজী শরীফ, নাসাঈ শরীফ)



যাকাতের মূল উদ্দেশ্য:
যাকাতের বিধান আরোপিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য তিনটি। যথা:-

১. গরীবের প্রয়োজন পূর্ণ করা। অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন করা, অর্থসম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার নিকৃষ্ট মানসিকতাকে খতম করা এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করা।
২. অর্থনৈতিক কল্যানের পথ প্রশস্ত করার জন্য নিজের কষ্টোপার্জিত সম্পদকে বিলিয়ে দেয়ার পবিত্র চেতনাকে অনুপ্রানিত করা।
৩. যাকাত আদায়ের দ্বারা শ্রমবিমুখতার আবসান ঘটানো, আত্মশক্তি অর্জন করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। (ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ন -৫১৮)

যে সব সম্পদের উপর যাকাত ফরজ:
সাধরণত এমন ধরনের সম্পদেরই যাকাত দিতে হয় যা বর্ধনশীল বা পরিবর্ধনের যোগ্যতা রাখে। এ হিসেবে নিম্নোল্লিখিত সম্পদে যাকাত ফরয হবে। যথা:-
১.নগদ মুদ্রা, সোনা-রূপা। এগুলো বর্ধনশীল না হলেও বর্ধনের যোগ্যতা রাখে, এ দ্বারা ব্যবসা বানিজ্য করে মূল ধন বর্ধিত করা যায়।
২. প্রাণী যা বংশ বিস্তারের মাধ্যমে বর্ধিত হয় তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো প্রাণীগুলো বংশ বিস্তারের জন্য লালন করা হবে এবং বৎসরের অধিকংশ সময় সরকারী চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করে এ রূপ হতে হবে। (আরো বিস্তারিত ফিকাহ কিতাব দ্রষ্টব্য)।
৩. কৃষি জাত উৎপাদনে। কেননা কৃষির মাধ্যমে সম্পদ বর্ধিত হয়। তবে কৃষি জাত উৎপাদনের যাকাত ওশর রুপে আদায় করতে হয়।
মৌলিক ভাবে যাকাত যোগ্য সম্পদ তিন ধরনের যথা: ১. স্বর্ণ রৌপ্য ২. নগদ মুদ্রা।
৩. বিক্রয়ের জন্য নির্ধারিত দ্রব্য বা ব্যবসায়ের পন্য।

যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শর্তসমূহ:
ব্যক্তি ও সম্পদের সাথে সম্পর্কিত কিছু শর্ত রয়েছে, যা পাওয়া গেলে যাকাত ফরজ হবে, অন্যথায় ফরজ হবে না।

ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত শর্ত হচ্ছে:
১. মুসলমান হওয়া সুতরাং অমুসলিমের উপর যাকাত ফরজ হবে না।
২. আযাদ তথা সাধীন হতে হবে, সুতরাং দাসের উপর যাকাত ফরজ হবে না।
৩. সাবালক হতে হবে, সুতরাং অপ্রাপ্ত বয়স্ক এর উপর যাকাত ফরজ হবে না।
৪. বিবেক সম্পন্ন হতে হবে সুতরাং মাজনুন-পাগলের উপর যাকাত ফরজ হবে না।
৫. সম্পদের পূর্ণ মালিকানা সত্য হতে হবে।

সম্পদ সম্পর্কিত শর্তসমূহ:
১.সম্পদ নিসাব পরিমান হওয়া। (নিসাবের বিবরণ সামনে আসবে)
২. সম্পদ নিত্য প্রয়োজন থেকে অতিরিক্ত হতে হবে।
৩. সম্পদ ঋনমুক্ত হওয়া।
৪. সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া। (তাতারখানিয়া ৩/১৩৩,১৩৫, হিন্দিয়া ১/১৭১,১৭২,১৭৪, বাযাযিয়া ১/৩৪০, বাদায়ে ২/৮৮, ফাতওয়া শামী ৩/১৮৪,১৮৯)

যাকাত আদায় করা কখন আবশ্যক হবে এবং কিভাবে বিশুদ্ধ হবে:
পূর্বোল্লোখিত শর্তসহ যখন ব্যক্তির মালিকানায় নিসাব পরিমান সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে তখন সেই সম্পদের যাকাত প্রদান করা আবশ্যক হবে। সুতরাং যে যখন নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হবে তখন থেকে চন্দ্র মাস হিসাবে এক বছর পূর্ণ হলেই তার জন্য যাকাত দেয়া ফরজ হবে। এটা রমজান মাসও হতে পারে আবার অন্য মাসও হতে পারে। রমজান মাসের সাথে যাকাত প্রদানের বিষয়ের কোন সম্পর্ক নেই। তবে কেউ যদি রমজান মাসে প্রদানের বিশেষ ফযীলত হাসিলের নিয়্যাতে রমজানে যাকাত প্রদান করে তখন তার জন্য উচিৎ রমজান মাসে সামনের অতিরিক্ত যাকাত প্রদান করা। বৎসর পূর্ণ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রমজান মাসের অপেক্ষায় যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাক উচিৎ নয়। (বাদায়ে ২য়, ১০০ পৃ:, হিন্দিয়া ১ম, ১৮৫ পৃ:, তাতারখানিয়া ৩য়, ১৩৪ পৃ.)



যাকাতের নিসাব:
স্বর্ণের নিসাব হলো বিশ মিছকাল তথা ৭.৫ ভরি/ তোলা = ৮৭.৫১৪ গ্রাম প্রায়। আর রূপার নিসাব হলো দুইশত দিরহাম তথা: ৫২.৫ ভরি/ তোলা, ৬১২.৬০২ গ্রাম প্রায়। এছাড়া বাকী অন্যান্য ব্যবসার সম্পদের নিসাবের ক্ষেত্রে নিসাব হলো স্বর্ণ বা রূপার উক্ত পরিমানের মূল্যের সাথে মিলানো, দুইশত দিরহাম রূপার যে বিক্রয় মূল্য সে পরিমাণ যদি কারো ব্যবসায়ী সম্পদ থাকে তাহলে সেই ব্যবসার মালের উপর যাকাত ফরজ হবে। (আল বাদায়ে ২/১০০, দুররুল মুখতার ৩/২২৪, ফাতওয়া শামী ৩/২২৪)

ব্যবহৃত অলংকারের উপর যাকাতের বিধান:

কারো মালিকানায় যদি সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের অলংকার থাকে আর সে ঋনী না হয় তাহলে ঐ অলংকারেরও যাকাত দিতে হবে, এই অলংকার চাই ব্যবহৃত হোক বা না হোক। এক্ষেত্রে স্ত্রীর উক্ত পরিমানের অলংকার থাকলে স্ত্রীর উপরই যাকাত ফরজ হবে। সাধারণতঃ অলংকার যারা ব্যবহার করেন, সেসব মা-বোনদের অধিকাংশই ঘর-গৃহস্থালীর কাজকর্মে ব্যাপৃত থাকায় তাদের ভিন্ন কোনো উপার্জন থাকে না। তাই তাদের অলংকারের যাকাত আদায়ের বিষয়ে সমাধান কি? অলংকার ছাড়া যদি তাদের নগদ অর্থ কিংবা আর কোন সম্পদ না থাকে তাহলে এক্ষেত্রে যাকাত আদায়ের দু'টি পদ্ধতি। যথা-

১। তার পক্ষ থেকে স্বামী অথবা তার অনুমতি স্বাপেক্ষে অন্য কেউ আদায় করে দিলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে।

২। স্বর্ণের আংশিক প্রদান করে যাকাত আদায় করা অথবা আংশিকের মূল্য বিক্রি করে হলেও যাকাত দিতে হবে। (ফাতওয়ায়ে শামী ২/২৯৮, খাইরুল ফাতওয়া ৩/৩৫৮, তাতারখানিয়া ৩/১৫৪, হিন্দিয়া ১/১৭৮, বাদায়ে ২/১০১)

কিছু স্বর্ণ-রূপা ও কিছু টাকার যাকাত:
কারো নিকট কিছু স্বর্ণ-আর কিছু রূপা অথবা স্বর্ণ আর নগদ টাকা রয়েছে কিন্তু কোনটাই নিসাব পরিমাণ নয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে দেখতে হবে, যে পরিমান স্বর্ণ আছে তা বিক্রি করলে স্বর্ণের বিক্রিত মূল্য ও নগদ টাকা যাকাতের নিসাব হয়ে যায় কি না, যদি হয় তাহলে ঐ ব্যক্তির উপর উক্ত মূল্য ধরেই যাকাত প্রদান করা আবশ্যক হয়ে যাবে। (ফাতওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ: ৬,৫০,১১৭,১২৭, রদ্দুল মুহতার: ২/২৯৬, তাতারখানিয়া ৩/১৫৮, হেদায়া ১/১৮৫,১৮৬

যে পরিমাণ যাকাত প্রদান করতে হবে:
নিসাব পরিমাণ সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যা শতকরা আড়াই ভাগ আসে। এই পরিমান ফকীরকে দেয়া আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, যাকাতের হিসাব ধারনামূলক নয় বরং সম্পদের পরিমান সঠিকভাবে হিসাব করে নিশ্চিত হয়ে উক্ত পরিমান যাকাত আদায় করে দিতে হবে। (বাদায়ে ২/১০৬, তাতারখানিয়া ৩/১৫৫, হিন্দিয়া ১/১৭৯)

স্বর্ণরূপা বিক্রয় মূল্য হিসাবে যাকাত দিতে হবে:
কারো নিকট যদি স্বর্ণ বা রূপার অলংকার থাকে তাহলে তা বর্তমান বাজারে বিক্রয় করতে গেলে যে মূল্য পাওয়া যাবে সেই মূল্যের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দেয়া আবশ্যক। এ ধরনের স্বর্ণ বা রূপা ক্রয় করতে গেলে কত মূল্য আসবে তার ধর্তব্য নেই। (ফাতওয়া মাহমুদীয়া: ১৩/৯৬, দারুল উলুম: ৬/১০৮বাদায়ে ২/১১০, তাতারখানিয়া ৩/১৬৫, হিন্দিয়া ১/১৮০)

ভূমি বা প্লট এর যাকাত:
ভূমি বা প্লট এর যাকাতের বিধান ক্রয়কারীর নিয়ত অনুপাতে হবে। যথা:-
১. যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রয় করে, তাহলে তাকে প্রতিবছর ভূমি বা প্লটের বাজার মূল্য বিবেচনা করে যাকাত দিতে হবে। উদাহরণত: কেউ যদি ৫ লাখ টাকায় ৫ টি প্লট ক্রয় করে। তারপর এক বছরের মাথায় উক্ত প্লটটির বাজার মূল্য ৭ লাখ হয়ে যায়, তাহলে তাকে ৭ লাখ টাকার যাকাত দিতে হবে।
২. যদি নিজের বসবাসের জন্য ক্রয় করে। তাহলে উক্ত প্লটের যাকাত দিতে হবে না। তাছাড়া ব্যবসা বা বসবাসের উদ্দেশ্য ছাড়া এমনিতে ক্রয় করলেও উক্ত জমি বা প্লটের যাকাত দিতে হবে না। (আপকে মাসায়েল আও উনকা হল, ৩য় খন্ড, ২৮৪ পৃষ্ঠা)

দোকানের পণ্যের যাকাত:
দোকান, ডেকোরেশন, আলমারী, তাক ইত্যাদি পন্যের মূল্যের উপর যাকাত ফরজ নয়, বরং সেলস বা বিক্রি করার জন্য যেসব পন্য মওজুদ আছে তার মূল্য যদি নিসাব পরিমান হয় তাহলে তাতে যাকাত ফরজ হবে। যাকাতের হিসাব করার পদ্ধতি হলো, বছরের একটা সময় দিন তারিখ নির্ধারণ করে দোকানে মজুদ পন্যের মুল্যের হিসাব করে দেখা গেল, দশ লাখ টাকার পন্য আছে। অতপর ঐ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আবার আনুমানিক পন্যের মূল্য ধরে দেখা গেল শুরুতেও যেই পরিমাণ সম্পদ ছিল তা নিসাব পরিমান আবার এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর যে পন্য আছে তাও নিসাব পরিমান, তাহলে সেই সম্পদের শতকরা আড়াই টাকা যাকাত দিতে হবে। (তাতারখানিয়া ৩য়, ১৬৯পৃ:, হিন্দিয়া ১ম, ১৮০পৃ:, দুররুল মুখতার ৩য়, ১৮২পৃ.)

গাড়ী, লঞ্চ ইত্যাদি বস্তুর যাকাত:
গাড়ী, লঞ্চ, ইত্যাদি কয়েক ধরনের হতে পারে, যদি কেউ গাড়ী বা লঞ্চের ভাড়া দিয়ে বা লাইনে চালানোর অথবা রেন্ট-ই-কারের ব্যবসা করে তাহলে সেই গাড়ী বা লঞ্চের মূল্যের উপর যাকাত ফরজ হবে না। আর যদি কারো দোকান থাকে যেখানে গাড়ী বা লঞ্চ ইত্যাদি বিক্রি করা হয়, তাহলে ঐ গাড়ী বা দোকানের মূল্যের উপর যাকাত ফরজ হবে। (আদ্দুররুল মুখতার ৩য়, ১৯২পৃ:, তাতারখানিয়া ৩য়, ১৯৭পৃ:, কাযী খান ১য়, ১৫০পৃ.)

ব্যাংকে সঞ্চয়কৃত টাকার যাকাত:
কোন ব্যক্তি সঞ্চয়ের জন্য যদি ব্যাংকে টাকা জমা রাখে তাহলে ঋনমুক্ত অবস্থায় যে দিন তার জমাকৃত টাকা নিসাব পরিমান হবে, সে দিন থেকে এক বছর পূর্ণ হলে ঐ টাকার উপর যাকাত ফরজ হয়ে যাবে। (ফাতওয়া আলমগীরি:১ম, ২৭০ পৃ:, মাহমুদিয়া: ৩য়, ৫৭ পৃ.)

ব্যাংক লোনের টাকা দিয়ে তৈরী ফ্যাক্টরীর উপর যাকাত:
যদি কেউ হাজতে আসলিয়া অর্থাৎ নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু যথা বাসস্থান, পরিধেয় বস্ত্র, ঘরের আসবাবপত্র, যানবাহন ইত্যাদি বাবদ ঋণ নেয় তখন দেখতে হবে ঐ টাকা কোথায় লাগানো হয়েছে। যদি ঐ টাকা দিয়ে এমন কিছু করা হয় যার উপর যাকাত আসে না, যেমন-মিল-কারখানা, মেশিনারী বস্তু ইত্যাদি তাহলে ঐ ঋণ যাকাতের নিসাব হতে বাদ দেয়া যাবে না। কারণ, এ ঋণ নিয়ে যেহেতু সম্পদ তথা মিল-কারখানা করা হয়েছে, সুতরাং একদিকে ঋণ আছে অপরদিকে তার পরিবর্তে সম্পদও আছে। মালিক কখনও ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলে এ সম্পদ থেকে ব্যাংক তার প্রাপ্য ঋণ উসুল করে নিবে। সুতরাং এ ধরনের ঋন যাকাতের নিসাব হতে বাদ দেয়া হবে না। কাজেই এধরনের ঋন থাকা সত্ত্বেও কারো নিকট যদি নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ-রূপা বা নগদ ক্যাশ কিংবা ব্যবসার মাল থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ফরজ হবে। আর যদি উক্ত ঋণ দিয়ে ব্যবসার মালামাল ক্রয় করা হয়, তাহলে সেই ঋণ হতে চলতি বৎসরের পরিশোধ যোগ্য কিস্তি পরিমাণ যাকাতের নিসাব থেকে বাদ দেয়া হবে। এমনিভাবে প্রতি বছর যে পরিমাণ কিস্তি পরিশোধ করতে হবে সে পরিমাণ ঋণ বাদ দিয়ে বাকী সম্পদের উপর ঐ বছরের যাকাত দিতে হবে। (বাদায়ে ২য়, ৮৬পৃ:, ফাতয়ায়ে রাহমানী: ২য়, ৩৯ পৃ.)

দোকান/বাড়ী ভাড়ার জন্য প্রদত্ত এডভান্স টাকায় যাকাত:
বর্তমানে বাড়ী বা দোকান ভাড়া নেয়ার সময় মোটা অংকের টাকা এডভান্স রাখতে হয়, এডভান্সের এই টাকা বাড়ী বা দোকানের মালিকের হয়ে যায় না বরং যিনি ভাড়া নিচ্ছেন তার মালিকানায় এ টাকা রয়ে যায়। বিধায় নিসাবের পরিমাণ হলে ঐ টাকাসহ যাকাত দিতে হবে। দোকান বা বাড়ী ভাড়া গ্রহনকারী ব্যক্তির উক্ত টাকার যাকাত আদায় করা জরুরী। (আদদুররুল মুখতার: ৩য়, ১৮৪ পৃ:, দারুল উলুম দেওবন্দ: ৬ষ্ঠ,৭৭পৃ:, আহসানুল ফাতওয়া. ৪র্থ, ২৬১ পৃ:, ফাতওয়া শামী ৩য়, ১৭৫ পৃ.)

করয দেয়া টাকার উপর যাকাত:
করয দেয়া টাকা উসূল হওয়ার পর উক্ত টাকার যাকাত দিতে হবে এবং বিগত বছরসমূহে উক্ত টাকার যাকাত না দিয়ে থাকলে সেই যাকাতও দিতে হবে। তবে কেউ যদি করযের টাকা উসূল হওয়ার পূর্বে প্রতি বছর উক্ত টাকার যাকাত দিয়ে দেয় তাহলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। (আদদুররুল মুখতার:২য়, ২৬৬পৃ:, দারুল উলুম.৬ষ্ঠ, ৪৫, ৭৭ পৃ.)

যাকাত হিসাবে ঋণ মাফ করে দেয়া:
নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ব্যক্তি যদি কোন গরীবের নিকট করয হিসাবে টাকা পায় তাহলে যাকাতের নিয়তে ঐ করয আদায় করে দিলে যাকাত আদায় হবে না। বরং এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি হলো যাকাতের নিয়তে তাকে নগদ টাকা দিয়ে দিতে হবে, অত:পর তার থেকে করয হিসাবে ঐ টাকা আবার নিয়ে নেয়া হবে। (আদদুররুল মুখতার: ২য়, ২৭০পৃ:, আলমগীরী: ১ম, ১৭ পৃ:. রহিমিয়া: ২য়, ১২ পৃ.)

প্রভিডেন্ট ফান্ডের উপর যাকাতের বিধান:
সরকারী কর্মচারীদের বেতন থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য বাধ্যতামূলক যে পরিমাণ টাকা কর্তন করে রাখা হয় সে পরিমাণ অর্থ যেহেতু উত্তোলনের পূর্বে কর্মচারীর মালিকানায় আসে না, তাই সরকারী প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ থাকাকালীন তার উপর যাকাতও দিতে হবে না। এ কারণে উক্ত ফান্ডের টাকা পাওয়ার পর বিগত বছরের যাকাতও দিতে হবে না। তবে যদি কর্মচারী উক্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডের সঞ্চিত অর্থ অন্য কোন ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে স্থানান্তর করিয়ে নেয় সে ক্ষেত্রে উক্ত অর্থ স্বতন্ত্রভাবে বা অন্য যাকাতযোগ্য মালের সাথে যোগ হয়ে নিসাব পরিমাণ হলে যথানিয়মে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। (আহসানুল ফাতওয়া, ৪খন্ড, ২৬০পৃষ্ঠা, ফাতওয়া শামী, ২য় খন্ড, ৩০৬)

গরু,বকরী ও মুরগীর ফার্মের উপর যাকাত:
ব্যবসার জন্য গরু, বকরী এমনিভাবে পোল্ট্রি মুরগীর ফার্ম করা হয়। এই ফার্মে লালিত পালিত হয়ে এক পর্যায়ে এই সব প্রাণী বিক্রি করা হয়। এসব প্রাণীর বিক্রি মূল্য যদি নিসাব পরিমান হয় তাহলে উল্লেখিত শর্তসাপেক্ষে তার যাকাত দেয়া আবশ্যক। (ফাতওয়ায়ে উসমানী ২/৩৯)



বীমা কোম্পানীতে জমাকৃত টাকার যাকাত:
বীমাতে যে পরিমাণের টাকা কাজে লাগানো হয়েছে তার উপর যাকাত ওয়াজিব। প্রতি বছর যাকাত আদায় করার সময় নিজ সম্পদের হিসাব করতে হবে। (ফাতওয়ায়ে উসমানী ২য় খন্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা)

কোম্পানির শেয়ার এর উপর যাকাত ওয়াজিব:
কোম্পানির অংশ ক্রয় করা জায়েয আছে। এই শর্তে যে যদি তার লেনদেন জায়েয হয় এবং অংশের মূল্যের উপর জাকাত ও ওয়াজিব হবে। (ফাতওয়ায়ে উসমানী ২য় খন্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা)

যাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে:
কুরআন শরীফে আট শ্রেণীর লোকদেরকে যাকাত দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

অনুবাদ: 'যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের জন্য এবং দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্যে, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' (সূরা তাওবা,আয়াত:৫৯)

কুরআনে বর্ণিত যাকাত প্রদানের ৮ টি খাত:
মোট ৮ ধরণের ব্যক্তিকে যাকাত দেয়ার কথা কুরআনে বর্ণিত। যথা-

১- গরীব। যার সম্পদ আছে কিন্তু নেসাব পরিমাণ মালের মালিক নয়।
২- মিসকিন। যার একদমই কোন সম্পদ নেই।
৩- ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য শরীয়ত নির্দিষ্ট যাকাত আদায়কারী আমেল। এটা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান দ্বারা নিযুক্ত হতে হবে। নিজে নিজে মনে করে নিলে হবে না। {জাওয়াহিরুল ফিক্বহ-৬/৬৯}
৪- নব মুসলিমদের ইসলামের প্রতি মোহাব্বত বাড়ানোর জন্য উৎসাহমূলক যাকাত প্রদান।
এ বিধানটি রহিত হয়ে গেছে। তাই বর্তমানে কোন ধনী নওমুসলিমকে যাকাত প্রদান জায়েজ নয়। {হিদায়া-১/১৮৪, মাআরিফুল কুরআন-৪/১৭১, তাফসীরে মাযহারী-৪/২৩৫}
৫- দাসমুক্তির জন্য। যেহেতু বর্তমানে দাসপ্রথা নেই। তাই এ খাতটি বাকি নেই।
৬- ঋণগ্রস্তের জন্য।
৭- ফী সাবিলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য। এখন প্রশ্ন হল আল্লাহর রাস্তায় কারা আছে? ফুক্বাহায়ে কেরাম বলেন এতে রয়েছেন-
জিহাদরত মুজাহিদরা। তাদের জিহাদের অস্ত্র ও পাথেয় ক্রয় করার জন্য যাকাতের টাকা গ্রহণ করবে। হজ্বের সফরে থাকা দারিদ্র ব্যক্তির জন্য। ইলমে দ্বীন অর্জনকারী দারিদ্র ব্যক্তির জন্য। {আদ দুররুল মুখতার-৩৪৩, হিদায়া-১/১৮৫, রূহুল মাআনী-৬/৩১৩}
৮- সফররত ব্যক্তিকে। যার টাকা পয়সা আছে বাড়িতে। কোন সফর অবস্থায় অসহায়। তাকে যাকাতের টাকা দেয়া জায়েজ। (তাতারখানিয়া ৩য়,১৯৮পৃ:, হিন্দিয়া ১ম,১৮৭পৃ:, বাদায়ে ২য়,১৫৭পৃ.)

যাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না:
১. কাফের।
২. নেসাব পরিমাণ মালের মালিক।
৩. নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের নাবালক সন্তান।
৪. বনু হাশেমের লোক।
৫. মা,বাবা, দাদা,দাদী,নানা,নানী এমনি যত উপরের দিকে যাওয়া হবে।
৬. নিজের মাধ্যমে যারা দুনিয়াতে এসেছে, অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে এবং তাদের সন্তানাদি এমনিভাবে যত নীচে যাওয়া যায়।
৭. স্ত্রী অথবা স্বামী
৮. মসজিদ-মাদ্রাসা, পুল, রাস্তা, হাসপাতাল বানানোর কাজে যাকাতের টাকা এমনিভাবে মৃত্যের দাফনের কাজে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না। (হিন্দিয়া ১ম, ১৮৮, ১৮৯পৃ:, তাতারখানিয়া ৩য়, ২০৬পৃ:, আদদুররুল মুখতার ৩য়, ২৯৪, ২৯৫ পৃ.)

ভাই-বোনকে যাকাত দেওয়া:
সহোদর ভাই-বোন যেহেতু উসূল বা ফুরু অর্থাৎ যাকাতদাতার মূল বা শাখা নয়, বিধায় তাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে। এমনিভাবে যাকাতের টাকা দিয়ে কাপড় কিনে দিলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। অন্তরে যাকাতের নিয়্যাত রেখে মুখে তা উল্লেখ না করে এমনিতে দিয়ে দিলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। অথবা হাদিয়া বলেও দিতে পারবে। এতে অসুবিধা নেই বরং এটাই উচিৎ। তবে যাদেরকে দেয়া হচ্ছে তারা গরীব বা যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হতে হবে। (হিদায়া: ১ম খন্ড ২০৬ পৃষ্ঠা, বাদায়ে: ২য় খন্ড ৪৯ পৃষ্ঠা)

নিজ মেয়ের জামাইকে যাকাত দেয়ার হুকুম:
মেয়েকে বিবাহ দেয়ার পরে তার খোরপোষ ইত্যাদি দেয়া তার স্বামীর দায়িত্ব। আর মেয়ের জামাই যেহেতু উসুল ও ফুরূর মধ্যে শামিল নয়, তাই জামাইকে যাকাত থেকে সাহায্য করা যাবে। নিজের গরীব আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেয়ার অধিক ফযীলতের কথা হাদীসে উল্লেখ আছে। তবে তাদেরকে যাকাতের মাল হাদিয়া বলে দেয়া নিয়ম, যাতে যাকাতের কথা শুনার কারণে তাদের মনে ব্যথা না লাগে। জামাইকে যাকাত প্রদান করার পর সে উক্ত টাকার মালিক হয়ে নিজের সংসারের যে কোন জরুরতে খরচ করতে পারবে। কিন্তু সরাসরি মেয়েকে বা মেয়ের সন্তানাদিকে যাকাত – ফিতরা দেয়া জায়িয হবে না। মেয়েকে বা তার সন্তানাদিগকে কিছু দিতে চাইলে, তা যাকাত থেকে নয়, বরং আসল মাল থেকে হাদিয়া হিসেবে দিতে হবে। আল বাহরুর রায়েক: ২য় খন্ড ৪২৫ পৃষ্ঠা, আহসানুল ফাতওয়া, ৪র্থ খন্ড ২৬৯ পৃষ্ঠা, মাআরিফুল কুরআন: ৪র্থ খন্ড ৪১২ পৃষ্ঠা।

যাকাতের মাল জনকল্যাণ মুলক কাজে ব্যয় করা:
যাকাতের মাল শুধু মাত্র গরীবদের ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দিলেই যাকাত আদায় হয়। সুতরাং মসজিদ, হাসপাতাল, রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট ইত্যাদি জনকল্যানমূলক প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে যাকাতের মাল খরচ করা যাবে না। কারণ এসব ক্ষেত্রে যাকাতের মাল খরচ করার দ্বারা সামাজিক কল্যান সাধিত হলেও ব্যক্তি বিশেষকে উক্ত সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়া হয় না। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয (রা.) কে বলেছেন, এ সম্পদ ধনীদের থেকে গ্রহণ কর এবং ফকীরদের মধ্যে বিতরণ কর। ধনীদের থেকে গ্রহণ করে ফকীরদের মধ্যে বিতরণ করার কথা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, তাদেরকে মালিক বানিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় যাকাত আদায় হবে না। (খাইরুল ফাতওয়া: ৩য় খন্ড ৩৮৮ পৃষ্ঠা, তাতারখানিয়া ৩য় খন্ড ১৯৮,২০৮ পৃষ্ঠা, দুররুল মুখতার ৩য় খন্ড ১৭১-১৭৩ পৃষ্ঠা, রদ্দুল মুহতার ৩য় খন্ড ১৭১ পৃষ্ঠা)

সুদ-ঘুষের টাকার যাকাত:
হারাম পন্থায় উপার্জিত সমস্ত টাকাই হারাম। এখন এই হারাম টাকা যদি বৈধ আমদানীর সাথে মিলিয়ে না ফেলে, তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। বরং তা প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি বৈধ আমদানীর সাথে সেই টাকাকে মিশ্রিত করে ফেলে এবং উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য করা সম্ভব না হয়, তাহলে সমুদয় টাকার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। আর কর্মচারীদের জন্য সেই হারাম টাকা যদি পৃথক থাকে তাহলে সেই হারাম টাকা বেতন হিসেবে নেয়া জায়েয হবে না। আর হালাল টাকার সাথে মিশ্রিত থাকা অবস্থায় তাদের জন্য বেতন নেয়া জায়েয হবে ইমাম আবু হানিফা (র.) এর মাযহাব অনুসারে। (আদদুররুল মুখতার: ২য় খন্ড ২৭ পৃষ্ঠা, ইমদাদুল আহকাম: ২য় খন্ড ৩, ৪ পৃষ্ঠা)

সদকা ও যাকাতের বেশী হকদার কারা:
সদকায়ে ওয়াজিব অর্থাৎ, যাকাত, ফিতরা বা কুরবানীর চামড়ার মূল্য এমনিভাবে নফল দানের সবচেয়ে বেশী হকদার গরীব তালিবে ইলম। তারপর গরীব আত্মীয়-স্বজন, অত:পর সাধারণ গরীব।

যেহেতু ফুকাহায়ে কিরামের বর্ণনা মতে ফযীলতের ক্ষেত্রেও তালিবে ইলমদেরকে দান করলে ৩ গুণ সাওয়াব (অর্থাৎ দান, দ্বীনের সহায়তা ও সদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব) পাওয়া যাবে।

পক্ষান্তরে গরীব আত্মীয়দের দান করলে ২ গুণ সাওয়াব (অর্থাৎ দান করা, ও আত্মীয়তা রক্ষা) এবং সাধারণ গরীবদের বেলায় শুধু যাকাত এর সওয়াব পাওয়া যাবে। (সূরা বাকারা, আয়াত, ২৭৩)

সদকাতুল ফিতর এর বিধান ও তা আদায় পদ্ধতি:
ঈদুল ফিতরের দিন যে ব্যক্তির মালিকানায় নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে আর তা নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারের অতিরিক্ত হবে তার উপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ হলো গম, আটা, ছাতু বা কিশমিশ দ্বারা প্রদান করলে পৌনে দুই সের আর খেজুর বা যব দ্বারা আদায় করলে সাড়ে তিন সের দিতে হবে। উক্ত বস্তু দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। আবার তার সমমূল্য দ্বারাও আদায় করা যাবে। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, সদকাতুল ফিতরের উক্ত পরিমাণের দান নিজ পক্ষ থেকে এমনকি, নিজের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকেও দিতে হবে। স্ত্রী বা ঘরের অন্যান্য সদস্যদের পক্ষ থেকে দেয়া ওয়াজিব নয়। গরীব মিসকিন লোককে উক্ত পরিমাণ সম্পদের মালিক বানিয়ে দিতে হবে। এ দেয়াটা ঈদের আগে বা পরের দিন দিলেও আদায় হবে। তবে উত্তম হল ঈদের দিন ঈদের নামাযে যাওয়ার আগে আদায় করা। ফাতাওয়া শামী, ৩য় খন্ড ৩০৯-৩২৬ পৃষ্ঠা, আলবাহরুর রায়েক, ২য় খন্ড, ৪৩৭-৪৪৬ পৃষ্ঠা।

বাংলাদেশে এ বছরের সদকাতুল ফিতরার পরিমান:
বাংলাদেশে প্রতিবছর রমজানে রাস্ট্রীয়ভাবে ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসাবে এবার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৭০ টাকা ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ফিতরার হার সর্বনিম্ন ৭০ টাকাই ছিল তবে সর্বোচ্চ ছিল ২ হাজার ৩১০ টাকা।

শেষের প্রার্থনা:
আল্লাহ পাক আমাদের যাকাত, সদকা ও ফিতরার পরিমান নির্ধারণ করে তা সঠিকভাবে আদায় করার মাধ্যমে আমাদের সম্পদকে পবিত্র করার তাওফিক দান করুন। এই পৃথিবীতে সম্পদের যাকাত আদায় না করার ফলে আমাদের গলায় যাতে আমাদের বহু কষ্টার্জিত মাল সম্পদ পরকালে অগ্নিস্বর্প বানিয়ে পেচিয়ে দেয়া না হয় এবং আমরা সেগুলোর নির্মম দংশনের শিকার না হই, সর্বোপরি আমাদের যাতে জাহান্নামের বিভীষিকাময় আজাবে নিপতিত হতে না হয়, আল্লাহ পাক আমাদের সেইভাবে পরিপূর্ণভাবে, বর্ণিত নিয়মে যাকাত আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের ফরজ হুকুম পালন করার শক্তি ও সাহস দান করুন।



ছবি: অন্তর্জাল।

মন্তব্য ৯ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৯) মন্তব্য লিখুন

১| ১৭ ই মে, ২০২০ সকাল ১১:৪০

এভো বলেছেন: ভাই জিজিয়া কর নিয়ে যদি কিছু বলেন তাহোলে এই ব্যপারে বিস্তারিত কিছু জানতে পারবো ।

জাকাত এক ধরনের কর বা টেক্স । অনেকে প্রশ্ন করেন , যখন আমরা সরকারকে টেক্স বা কর প্রদান করি, তখন জাকাত কেন আবার আলাদা করে দিতে হবে ? সেই আমলে ইসালমিক খেলাফত রাজশ্য আদায় কোরতো জাকাতের মাধ্যমে , এখন সরকার রেভিনিউ আয় করে টেক্সের মাধ্যমে । যদি তাই হয় তাহোলে আবার আলাদা করে কেন জাকাত দিতে হবে । ধন্যবাদ

১৮ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:০১

নতুন নকিব বলেছেন:



চমৎকার কিছু প্রশ্ন রেখে যাওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

যাকাত ও ট্যাক্সের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যেমন–

যাকাত ইসলামের একটি মৌলিক আর্থিক ফরয ইবাদত। তাই এতে নিয়ত আবশ্যক। আবশ্যক ইখলাস ও আল্লাহভীতি।যাকাতের রয়েছে নির্দিষ্ট খাত। যে খাতগুলোর বাইরে যাকাতের টাকা ব্যয় করা যায় না। অনুরূপভাবে যাকাতের পরিমাণ বা হারও নির্ধারিত। তা ওয়াজিব হওয়ার জন্যও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমারেখা। অতপর তা আদায় করার জন্য রয়েছে এক বছরের সীমারেখা। বিশেষ কিছু মালের মধ্যেই তা ওয়াজিব হয়ে থাকে। সব ধরণের মালের মধ্যে তা ওয়াজিব হয় না। এ সবই কোরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে প্রমাণিত। এতে কোনো ধরণের পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

পক্ষান্তরে ট্যাক্স ইবাদত নয়। বরং তা সরকার থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে নাগরিক কর্তৃক সরকার বা রাষ্ট্রকে প্রদান করতে হয়। কিংবা এটা এক প্রকার সরকারের প্রতি সহযোগিতাও বটে। এর জন্য কোনো পরিমাণ বা হার নির্ধারিত নেই। থাকলেও পরিবর্তনের সুযোগ থাকে। অনুরূপভাবে এর জন্য কোনো নিয়তের প্রয়োজন হয় না। তা ব্যয়ের জন্যও নির্দিষ্ট খাত নেই। আর না এর জন্য সেসব উপযোগী সীমারেখা রয়েছে যা শরিয়ত যাকাতের জন্য স্থির করে থাকে। -জাদিদ ফিকহি মাসায়িল, পৃষ্ঠা- ১৭৫

তবে কথা হচ্ছে, একটি রাষ্ট্র যদি আদর্শ ইসলামিক রাষ্ট্র হয় তাহলে আয়কর এবং যাকাত - এ দু'টো একসাথে দেবার প্রয়োজন হয় না। তখন শুধু যাকাত দিলেই হয়ে যায়।

আয়করকে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় সেক্যুলার ট্যাক্স। কিন্তু যাকাত হচ্ছে রিলিজিয়াস (ধর্মীয়) ট্যাক্স। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারটা প্রধান্য দিতে হলে তাকে যাকাত দিতেই হবে। কারণ, এটি আল্লাহ তাআ'লার অবশ্য পালনীয় ফরজ একটি হুকুম বা আদেশ।

এখানে বুঝার বিষয় হচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকলে আলাদা করে নাগরিকদের আয়কর দিতে হতো না। যাকাতই তখন আয়করের বিকল্প হতো। মূলতঃ সম্পদের 'শুদ্ধতার' জন্য যাকাত দেয়া অপরিহার্য। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনার চিন্তা থেকে ইসলামে যাকাত ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

যাকাত ব্যবস্থা ইসলামী রাষ্ট্রের আর্থিক এবং রাজস্ব সংক্রান্ত বিধান। ইসলামী রাষ্ট্রে আয়করের ব্যবস্থা নেই। ইসলামী রাষ্ট্রে যাকাত ব্যবস্থা।

ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, আয়কর এবং যাকাত- দুটোই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। তবে পার্থক্য হচ্ছে, যাকাত ইসলামী শরিয়া মোতাবেক পরিচালিত রাষ্ট্রের একটি অন্যতম অর্থবিষয়ক আইন এবং আয়করের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়ার বাধ্যবাধকতার কোন বিষয় নেই।

আয়কর দিতে হয় মোট আয়ের উপর এবং যাকাত দিতে হয় মোট আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত সম্পদের উপর।

১৮ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:১৯

নতুন নকিব বলেছেন:



ইসলাম আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যাবস্থা। তিনি এই জীবন বিধানকে পরিপূর্নতা দান করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا

'....আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম....।' -সূরাহ আল মা-য়িদাহ, আয়াত-৩

পূর্ণাঙ্গ এই জীবন বিধানে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সকল বিষয়ে যথার্থ এবং যথোপযুক্ত প্রয়োজনীয় সকল দিক-নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ‘জিজিয়া’। ইসলামের এই দিকটির ব্যাপারে অনেকেরই বেশ অজ্ঞতা রয়েছে। কেউ কেউ জিজিয়াকে একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা বলতেও দ্বিধাবোধ করেন না। এগুলো ঘটে থাকে মূলতঃ না জানার কারণে। জিজিয়ার ব্যাপারে আমরা এখানে অতি সংক্ষিপ্ত কিছু কথা আলোকপাত করবো ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা তাওফিক দান করুন।

জিজিয়া কী?:
জিজিয়া (جزية) শব্দটি جزاء শব্দ হতে উৎপন্ন। এর অর্থ হচ্ছে – মাথা পিছু ধার্য কর, অর্থকর। এটি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের (আহলুয যিম্মাহ বা যিম্মি) [1] উপর ধার্য কর। ‘জিজিয়া’ শব্দটির উৎপত্তি প্রসঙ্গে আলুসী(র.) আল খাওয়ারিজমীর মতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এটি ফার্সি ‘গিযইয়াত’ শব্দ হতে গৃহিত (রুহুল মাআনী ১০/৭৮) যার অর্থ খাজনা। [2] যিম্মি’ (ذمي) শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘সংরক্ষিত ব্যক্তি’। [3] শব্দটি দ্বারা তাদেরকে বোঝায় যাদের সাথে যিম্মা (ذمة) বা নিরাপত্তার চুক্তি করা হয়।

ইসলামী রাষ্ট্রে যুদ্ধ করতে সক্ষম অমুসলিমদের নিকট থেকে দেশ রক্ষার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেবার বিনিময়ে প্রতি বছর যে অর্থ আদায় করা হয়, তাকে জিজিয়া বলা হয়। [4] এর বদলে কেউ যাতে তাদের উপর আগ্রাসন না চালাতে পারে, সে জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেয় ইসলামী সরকার। [5]

জিজিয়ার অর্থ কারা দেবেন ও কেন দেবেন :
মুসলিম শাসককে জিজিয়ার অর্থ পরিশোধ করবেন আর্থিক সক্ষমতা আছে এমন পূর্ণবয়স্ক পুরুষরা। শিশু-কিশোর, নারী, পাগল, দাস-দাসী, প্রতিবন্ধী, উপাসনালয়ের সেবক, সন্যাসী, ভিক্ষু, অতি বয়োবৃদ্ধ এবং বছরের বেশির ভাগ সময়ে রোগে কেটে যায় এমন লোকদের জিজিয়া দিতে হবে না। [6]

অমুসলিমদের কেউ যদি দেশরক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে রাজি হন, তাহলে তার জিজিয়া মওকুফ হতে পারে। [7]

যদি ইসলামী সরকার অমুসলিম নাগরিকদের জান-মাল ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে তাদের থেকে কোনো প্রকারের জিজিয়া আদায় করা হয় না। বরং আদায়কৃত জিজিয়া ফেরত দেয়া হয়।

ইয়ারমুকের যুদ্ধে যখন রোমানরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটালো এবং মুসলিমরা শামের (বৃহত্তর সিরিয় অঞ্চল) বিস্তীর্ণ এলাকা পরিত্যাগ করে একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে নিজেদের শক্তি কেন্দ্রিভূত করতে বাধ্য হল, তখন আবু উবাইদাহ(রা.) নিজের অধীনস্ত সেনাপতিদের নির্দেশ দিলেন যে—তোমরা যে সব জিজিয়া ও খারাজ (ভূমি রাজস্ব) অমুসলিমদের নিকট থেকে আদায় করেছিলে তা তাদের ফিরিয়ে দাও এবং তাদের বলো যে, “এখন আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। তাই যে অর্থ তোমাদের রক্ষা করার বিনিময়ে আদায় করেছিলাম তা ফেরত দিচ্ছি।”

এই নির্দেশ মোতাবেক সকল সেনাপতি অমুসলিম নাগরিকদের তাদের থেকে আদায় করা জিজিয়া ও খারাজের অর্থ ফেরত দিলেন। [8]

এ সময়ে অমুসলিম নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করে ঐতিহাসিক বালাযুরী(র.) লিখেছেন, “মুসলিম সেনাপতিগণ যখন শামের হিমস নগরীতে জিজিয়ার অর্থ ফেরত দেন, তখন সেখানকার (খ্রিষ্টান) অধিবাসীরা সমস্বরে বলে ওঠে—

ইতোপূর্বে যে জুলুম-অত্যাচারে আমরা নিষ্পেষিত হচ্ছিলাম, তার তুলনায় তোমাদের শাসন ও ন্যায়বিচারকে আমরা পছন্দ করি। এখন আমরা তোমাদের গভর্নরের [আবু উবাইদাহ(রা.)] সাথে মিলে যুদ্ধ করে হিরাক্লিয়াসের বাহিনীকে দমন করব।”

সেখানকার ইহুদিরা সমস্বরে বলে ওঠে, “আমরা প্রাণপনে যুদ্ধ করে পরাজিত হওয়া ছাড়া কোনো অবস্থাতেই হিরাক্লিয়াসের কোনো প্রতিনিধি আমাদের শহরে ঢুকতেই পারবে না।” [9]

জিজিয়াতে কীভাবে অর্থ নেয়া হয়? :

জিজিয়াতে কি বিশাল পরিমাণ অর্থ নেয়া হয় যার ভারে অমুসলিম নাগরিকরা চিরেচ্যাপ্টা হয়ে যায়? এমন কিছু ধারণা ইসলামবিরোধী মহলে প্রচলিত আছে। চলুন বাস্তবতা দেখে নেয়া যাক!

জিজিয়ার অর্থের পরিমাণ অমুসলিম নাগরিকদের আর্থিক সঙ্গতি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। যারা স্বচ্ছল তাদের কাছ থেকে বেশি, যারা মধ্যবিত্ত তাদের কাছ থেকে কিছু কম এবং যারা দরিদ্র তাদের কাছ থেকে অনেক কম নেয়া হয়। আর যার উপার্জনের কোনো ব্যবস্থা নেই অথবা যে অন্যের দান-দক্ষিণার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে, তার জিজিয়া ক্ষমা করে দেয়া হয়। অধিকাংশ ইমামের মতে, জিজিয়ার কোনো বিশেষ পরিমাণ নির্ধারিত নেই । [10] তবে জিজিয়ার কিছু মূলনীতি পাওয়া যায়। এর আলোকে ফকিহগণ জিজিয়ার বিভিন্ন মুদ্রামাণ উল্লেখ করেছেন। [11] এই মূলনীতি ও সাহাবীদের যুগের উদাহরণ এখন উল্লেখ করা হবে।

ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের উপর সাধ্যের অতীত জিজিয়া চাপানো যায় না। জিজিয়া অবশ্যই তাদের সাধ্যের মধ্যে হতে হবে।

রাসুলুল্লাহ(ﷺ) বলেন,

أَلَا مَنْظَلَمَ مُعَاهِدًا، أَوِ انْتَقَصَهُ، أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ، أَوْأَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ، فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَالْقِيَامَةِ

অর্থঃ ‘সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো মুআহিদ (চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিক) এর ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন করব।’ [12]

ইসলাম কি জিজিয়ার দিতে অক্ষম ব্যাক্তিকে নির্যাতন করতে বলে? এ সংক্রান্ত মূলনীতিও আমরা হাদিস থেকে পেয়ে যাই।

উরওয়া বিন যুবায়ের বিন আওয়াম থেকে হিশাম বিন উরওয়ার মাধ্যমে আবু ইউসুফ বর্ণনা করেছেন, উমার(রা.) সিরিয়া থেকে ফেরার পথে এক স্থানে দেখলেন, কয়েকজন লোককে প্রখর রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি বললেন, ব্যাপার কী? লোকেরা বললো, এদের উপর জিজিয়া অত্যাবশ্যক ছিলো। কিন্তু এরা জিজিয়া পরিশোধ করেনি। তাই তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তিনি বললেন, এরা জিযিয়া পরিশোধ করতে চায় না কেন? লোকেরা বললো, এরা বলছে, এরা কপর্দকহীন। উমার(রা.) বললেন, এদেরকে ছেড়ে দাও। সাধ্যবহির্ভূত বোঝা এদের উপর চাপিয়ো না। আমি রাসুল(ﷺ)কে বলতে শুনেছি, “মানুষকে শাস্তি দিয়ো না। পৃথিবীতে মানুষকে যারা (অন্যায়ভাবে) শাস্তি দেবে, আখিরাতে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন।” [13]

আমরা দেখলাম, কিছু লোক মূলনীতি না জেনে জিজিয়া দিতে অক্ষম কিছু যিম্মিকে কষ্ট দিচ্ছিলো। উমার(রা.) তা দেখতে পেয়ে তাদেরকে বিরত করেন এবং রাসুল(ﷺ) এর বাণী স্মরণ করিয়ে দেন।

খলিফা উমার(রা.) এর শাসনামলে একজন জিজিয়া সংগ্রহকারী সংগ্রহকৃত জিজিয়া উমার(রা.) এর নিকট অর্পণ করলেন। বিপুল পরিমাণ জিজিয়ার অর্থ দেখে উমার(রা.) বিচলিত হয়ে পড়লেন। উমার(রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি জনগণের এগুলো চাপিয়ে দেননি তো! তিনি উত্তর দিলেন, “মোটেও না। আমরা শুধুমাত্র উদ্বৃত্ত এবং বৈধ অংশই সংগ্রহ করেছি।” উমার(রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “কোনো প্রকারের চাপ কিংবা অত্যাচার ব্যতিরেকে?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ”। উমার(রা.) বললেন, “যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, আমার শাসনকালে অমুসলিম প্রজাদের উপর অত্যাচার হচ্ছে না। ” [14]

আমিরুল মু’মিনীন উমার(রা.) এর ওসিয়ত ছিল –

“…আমি তাঁকে এ ওয়াসিয়াতও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের আধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা তারাও ইসলামের হেফাযতকারী। এবং তারাই ধন-সম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের থেকে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের সহিত সদ্ব্যবহার করারও ওয়াসিয়ত করছি। কেননা তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের(ﷺ) যিম্মিদের বিষয়ে ওয়াসিয়াত করছি যে, তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। (তারা কোনো শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে) তাদের পক্ষাবিলম্বে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি সামর্থ্যের অধিক জিজিয়া যেন চাপানো না হয়।” [15]

১ম খলিফা আবু বকর(রা.) বলেন, “যদি কোনো অমুসলিম বৃদ্ধ অকর্মণ্য হয়ে পড়ে অথবা কোনো বিপদে পতিত হয় অথবা কোনো সম্পদশালী যদি এমনভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ে যে তার গোত্রের লোকেরা তাকে সাহায্য করে—এরূপ পরিস্থিতে তাকে জিজিয়া থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। উপরন্তু মুসলিমদের বাইতুল মাল (ইসলামে রাষ্ট্রের কোষাগার) থেকে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যতদিন সে মদীনায় বা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করে।” [16]

আলী(রা.) আদেশ প্রদান করেন,

“যখন তাঁদের কাছে [ভুমি রাজস্বের] জন্য যাও, তাদের শীত বা গ্রীষ্মের জন্য উদ্বৃত্ত পোশাক বিক্রি করে দিও না। তাদের আহারের খাদ্য, তাদের প্রয়োজনীয় পশু বিক্রী করো না। দিরহামের জন্য তাদের কাউকে কখনো চাবুক মেরো না। অথবা দিরহামের জন্য কখনো তাদের কাউকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখো না। তাদের গৃহস্থলী জিনিসপত্র বিক্রী করো না। কারণ আমরা তো সেটাই গ্রহণ করি যা তাঁদের হাতে আছে। যদি আমার এ আদেশ মেনে না চলো, তাহলে আমার অনুপস্থিতিতে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন। আর আমি যদি তোমাদের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ শুনি, তাহলে তোমরা বরখাস্ত হবে।” [17]

এই মূলনীতি অনুসরণ করে ইসলামী ফিকহ গ্রন্থগুলোতে জিজিয়া সংক্রান্ত বিধান আলোচনা করা হয়েছে। ইমাম ইবনু কুদামা মাকদিসী(র.) উল্লেখ করেছেনঃ

যে সকল অমুসলিম নাগরিক দারিদ্র্যের শিকার ও পরের উপর নির্ভর করে চলে, তাদের জিজিয়া মওকুফ তো করা হবেই উপরন্তু বাইতুল মাল থেকে তাদের জন্য নিয়মিত সাহায্য বরাদ্দ দিতে হবে। [18]

একবার খলিফা উমার(রা.) এক অন্ধ বৃদ্ধকে ভিক্ষা করতে দেখেন। এ সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে তিনি জানতে পারলেন যে সে ইহুদি।

উমার(রা.) জানতে চাইলেন, কেন সে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে।

জবাবে সে জানালোঃ জিজিয়া, প্রয়োজন এবং জীবনধারণের চাহিদা।

খলিফা উমার(রা.) হাত ধরে তাকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে আসেন, তৎক্ষণাৎ তার প্রয়োজন পূরণ করেন এবং বাইতুল মালের খাজাঞ্চীর কাছে বার্তা পাঠানঃ “এ ব্যক্তি এবং এর মতো অন্য ব্যক্তিদের প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি রাখবে। আল্লাহর কসম, আমরা যৌবনে (জিজিয়া) নিয়ে বার্ধক্যে তাকে কষ্ট দিলে তার প্রতি এটা আমাদের ইনসাফ করা হবে না। সদকা তো নিঃসন্দেহে অভাবগ্রস্ত ও নিঃস্ব ব্যক্তিদের জন্য। আর এ হচ্ছে আহলে কিতাবের নিঃস্ব ব্যক্তি। [19]

খলিফা উমার(রা.) দামেস্ক সফরকালে একস্থানে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত কিছু খ্রিষ্টানকে দেখতে পান। তিনি তাদেরকে সরকারী কোষাগার (বাইতুল মাল) থেকে সাহায্য দেবার নির্দেশ দেন। তাদের জীবন-জীবিকার উপায়-উপকরণ সরবরাহেরও নির্দেশ তিনি দেন। [20]

আবু বকর(রা.) এর সময়ে জিজিয়ার পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। সে সময়ে মুসলিমদের দ্বারা বিজিত হিরা অঞ্চলের অধিবাসীর কাছ থেকে বছরে মাত্র ১০ দিরহাম আদায় করা হতো। সংগ্রহ করতেন খালিদ বিন ওয়ালিদ(রা.)। [21]

আমরা দেখলাম যে, জিজিয়ার পরিমাণ যেমন অমুসলিম নাগরিকদের সাধ্যের মধ্যে থাকতে হবে, এ জন্য অন্যায়ভাবে কাউকে নির্যাতন করা যাবে না। তেমনি এটিও বলা হচ্ছে যে তারা যদি দারিদ্র্যের শিকার হয় কিংবা অর্থাভাবে থাকে – উল্টো ইসলামী সরকার তাদেরকে সাহায্য করবে! এমন বেশ কিছু উদাহরণ আমরা উত্তম যুগে ন্যায়পরায়ন খলিফাদের আমল থেকে পাচ্ছি। যারা জিজিয়াকে শোষণমূলক ব্যবস্থা বলতে চান বা ইসলামকে নিষ্পেষণকারী ধর্ম বলতে চান, এই তথ্যগুলো তাদের নিদারুণ ভ্রান্তিকেই পরিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে। লুটতরাজ আর বর্বরতায় ভরা সেই ৭ম শতাব্দীতে শক্তিশালী জাতিগোষ্ঠীগুলো ভিন্ন ধর্মীদের উপর জোর-জুলুম চালিয়ে যাচ্ছিলো। সেই অন্ধকার যুগে এভাবে অন্য ধর্মের লোকদের সাথে সদাচারণের বিধান দিয়েছিল নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) আনিত ইসলাম। চিন্তাশীলদের জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

জিজিয়া নেবার সময়ে অমুসলিম নাগরিকদেরকে অপমান বা অপদস্থ করার মতো কোনো কথা কি কুরআন বা সুন্নাহতে পাওয়া যায়? এ ব্যাপারে এ আলোচনাটি শোনা যেতে পারেঃ

"জিজিয়া নেবার সময়ে অমুসলিম নাগরিকদের (যিম্মি) কি অপমান করতে হবে_শায়খ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া"

যাকাত-জিজিয়া ও শরিয়ানির্ভর ব্যবস্থার ফল :

আমরা এতক্ষন তাত্ত্বিক আলোচনা করেছি। এবার আমরা আমাদের দেশ ও নিকট অঞ্চলগুলোতে ইসলামী শরিয়ানির্ভর শাসনব্যাবস্থার ফলাফলের ব্যাপারে আলোচনা করব, যেখানে যাকাত, জিজিয়া এই জিনিসগুলো প্রচলিত ছিল। এতে আমাদের পক্ষে এই ব্যবস্থার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে কীরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা বোঝা সহজ হবে। আমরা অনুধাবন করতে পারব ইসলামী বিধান কি কল্যাণকর নাকি শোষণমূলক অথবা এখানে ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হলে তা কীরকম প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতবর্ষ সর্বপ্রথম ইসলামী শাসন দেখে মুহাম্মাদ বিন কাসিম(র.) এর সিন্ধু বিজয়ের সময়ে। তিনি বিজিত অঞ্চলগুলোতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী শাসন কায়েম করেন। এই সময়ের আলোচনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কেননা সেটি ছিল সালাফে সলিহীনদের (Early righteous Muslims) যুগ। সাহাবীদের যুগ ছিল ১১০ হিজরী পর্যন্ত। [22] মুসলিমরা সিন্ধু বিজয় করে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে বা ৯৩ হিজরীতে। [23] অর্থাৎ সেই সময়টি ছিল সাহাবীদের যুগের অন্তর্ভুক্ত, দ্বীন ইসলাম তখন নববী আদর্শ অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে পালিত হচ্ছিল। মুহাম্মাদ বিন কাসিম(র.) যখন সিন্ধু বিজয় করেন, তখন তিনি বিজিত অংশে স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের থেকে জিজিয়া গ্রহণ করেন ও তাদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে জোর করা হয়নি বা শোষণও করা হয়নি। মুসলিমরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করে। [24] জাত-বর্ণহীন ইসলামের মহান আদর্শে মুগ্ধ হয়ে বরং স্থানীয় অধিবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করছিল। [25]

আমাদের দেশ এবং গোটা ভারতবর্ষ সর্বশেষ ইসলামী শাসন দেখেছিল মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব(র.) {আলমগীর} এর সময়ে। সম্রাট আওরঙ্গজেব(র.) ভারতবর্ষে ইসলামী শরিয়া কায়েম করেন। জিজিয়া আরোপের জন্য তাঁকে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা সমালোচনার বাণে বিদ্ধ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সম্রাট আওরঙ্গজেব(র.) এর গৃহিত ব্যবস্থার ফল কীরূপ ছিল? চলুন দেখে নেয়া যাক।

সম্রাট আওরঙ্গজেব(র.) এর সময়ে মুসলিমদের উপরে যাকাত এবং অমুসলিমদের উপর জিজিয়া আরোপ করা হয়, সেই সাথে অন্য সব কর উঠিয়ে দেয়া হয়। ইসলামের সাধারণ নিয়ম হচ্ছেঃ জনগণের উপর কর আরোপ করা যায় না। [26] আওরঙ্গজেব(র.) ইসলামী বিধান অনুসরণ করে আগের শাসকদের আরোপিত ৮০টি কর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। এবং শুধু যাকাত ও জিজিয়া চালু করেছিলেন। এতগুলো কর উঠিয়ে দেয়ার ফলে সে সময়ের হিসাবে ৫০ লক্ষ স্টার্লিং (এক প্রকার ব্রিটিশ মুদ্রা) সমমানের অর্থমূল্যের কর থেকে রাজকোষ বঞ্চিত হয়। রাজকোষের দিকে লক্ষ্য না করে তিনি আল্লাহর বিধান পালনের দিকে জোর দিয়েছিলেন। [27] এভাবে কর উঠিয়ে দিলে স্বভাবিকভাবেই দ্রব্যমূল্যের দাম কমে যাবে এবং জনগণের আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো হয়ে যাবে। আল্লাহর বিধান আরোপের ফলে দেশের উপর বারাকাহ আসবে। এবং হয়েছেও ঠিক তাই। সম্রাট আওরঙ্গজেব(র.) এর সময়ে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনকে পিছনে ফেলে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতিতে (World’s Largest Economy) পরিনত হয়, যার মূল্যমান ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। এর জিডিপি ছিল সে সময়ের সমগ্র বিশ্বের ৪ ভাগের ১ ভাগ। [28] অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন এমনই প্রাচুর্যশালী হয়ে গিয়েছিল। জিজিয়া দিয়ে কেউ ‘শোষিত’ হয়নি। জনগণ কোন অবস্থায় শোষিত হয় – ৮০ টি কর থাকাকালে, নাকি মাত্র ১টি জিজিয়া কর থাকাকালে?

সে সময়ে ইসলামী শাসনের সুফল ও সমৃদ্ধির ছোঁয়া বাংলাতেও লেগেছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেব(র.) নিযুক্ত মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলে বাংলায় ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেতো। সে সময়ে বাংলা সমৃদ্ধি ও স্বচ্ছলতার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যা আজও প্রবাদ হয়ে আছে। [29] দুঃখের বিষয় হল মানুষ শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার সমৃদ্ধির কথা ঠিকই মনে রেখেছে, কিন্তু ইসলামী শাসনকে মনে রাখেনি।

পরিশেষে বলব, জিজিয়াকে শোষণমূলক ব্যবস্থা আখ্যায়িত করে যে প্রচার চালানো হয় তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। আল্লাহর দেয়া জীবনব্যাবস্থা ইসলামের মাঝে সকল যুগের সকল মানুষের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে। তবে একটা কথা না বললেই নয় – জিজিয়া প্রদান করে অমুসলিমগণ হয়তো পার্থিব কিছু সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারবে, কিন্তু পরকালে তাদের কোনো অংশ থাকবে না। আল্লাহর নিকট গ্রহনযোগ্য দ্বীন তো একটাই, আর তা হল ইসলাম। পরকালে মুক্তি লাভের জন্য সকলকে সত্য দ্বীন গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ সকলকে সত্য অনুধাবন করার তৌফিক দান করুন।

নিঃসন্দেহে হিদায়াত কেবল আল্লাহ আযযা ওয়া যাল এর পক্ষ থেকেই আসে।

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বাসী কিন্তু তাদের অধিকাংশই তো ফাসিক।” [30]

তথ্যসূত্র
[1] ‘যিম্মি’র আওতাভুক্ত কারা অর্থাৎ জিজিয়া কি শুধুমাত্র আহলে কিতাবদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) জন্য নাকি মুশরিক (পৌত্তলিক)রাও এর অন্তর্ভুক্ত – এ নিয়ে উলামাদের মধ্যে কিছু ফিকহী ইখতিলাফ আছে। তবে হাদিস থেকে প্রতিষ্ঠিত যে, মুশরিকরাও এর আওতাভুক্ত।

وَإِذَا أَنْتَ لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَادْعُهُمْ إِلَى إِحْدَى ثَلاَثِ خِلاَلٍ...

فَإِنْ هُمْ أَبَوْا أَنْ يَدْخُلُوا فِي الإِسْلاَمِ فَسَلْهُمْ إِعْطَاءَ الْجِزْيَةِ فَإِنْ فَعَلُوا فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ...

“... ...যখন তুমি শত্রুপক্ষের মুশরিকদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে, তখন তাদেরকে তিনটি বিষয়ের প্রতি আহবান জানাবে। ... ... তারা যদি ইসলামে দাখিল হতে অস্বীকার করে তবে তাদেরকে জিজিয়া দিতে বলো। তার যদি তা দেয় তবে তাদের নিকট থেকে তা গ্রহণ করো এবং তাদেরকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকো। ... ...”

[সহীহ মুসলিম ১৭৩১, সুনান ইবন মাজাহ ২৮৫৮, তিরমিযী ১৩০৮, ১৬১৭, আবু দাউদ ২৬১২, ২৬১৩, মুসনাদ আহমাদ ২২৪৬৯, ২২৫২১, দারিমী ২৪৩৯, ২৪৪২, ইরওয়া ১২৪৭, ৭/২৯২, রাওদুন নাদীর ১৬৭। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।]

وقال الأوزاعي : تؤخذ الجزية من كل عابد وثن أو نار أو جاحد أو مكذب .

وكذلك مذهب مالك , فإنه رأى الجزية تؤخذ من جميع أجناس الشرك والجحد , عربيا أو عجميا , تغلبيا أو قرشيا , كائنا من كان , إلا المرتد

ইমাম কুরতুবী(র.) আওযায়ী(র.) থেকে উল্লেখ করেছেনঃ জিজিয়া সকল মূর্তিপুজক, অগ্নিপুজক, নাস্তিক কিংবা (ধর্ম) অস্বীকারকারীদের কাছ থেকে নেয়া হবে।

ইমাম মালিক(র.) এর অভিমত হচ্ছে, সকল প্রকার মুশরিক (মুর্তিপুজারী), ধর্মহীন নাস্তিক, আরব, অনারব, তাগলিবি (একটি খ্রিষ্টান গোত্র), কুরাঈশ – সবার কাছ থেকে নেয়া হবে। শুধুমাত্র মুর্তাদ ব্যতিত।

[ জামিউল আহকাম আল কুরআন (তাফসির কুরতুবী) ১১০/৮ ]

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল(র.) এর একটি অভিমত অনুযায়ীঃ

يَجُوزُ عَقْدُهَا لجَمِيِع الْكُفَّارِ، إِلَّا عَبَدَةَ الْأَوْثَانِ مِنَ الْعَرَبِ

অর্থঃ শুধুমাত্র আরবের মূর্তিপূজক ব্যতিত যিম্মার চুক্তি সকল কাফিরের সাথে হতে পারে।

[আল মুক্বনী, ইবনু কুদামা(র.), অধ্যায়: জিহাদ, পরিচ্ছেদ: যিম্মার চুক্তি; আব্দুল কাদির আল আরনাউতের তাহকীক, ১৪৬ পৃষ্ঠা]

ইমাম আবু হানিফা(র.), ইমাম আবু ইউসুফ(র.) ও হানাফী ইমামদের থেকেও অনুরূপ অভিমত পাওয়া যায়।

[‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ’ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ‘জিযয়া’ অংশ, পৃষ্ঠা ৪০১]

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাঈমিন(র.) এর অভিমত অনুযায়ীও আহলে কিতাব ছাড়াও মুশরিকদের থেকে জিজিয়া নেয়া হবে। [শারহুল মুমতি ৮/৫৮] এবং এটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের অভিমত।

[2] ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ’ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ‘জিযয়া’ অংশ, পৃষ্ঠা ৪০১

[3] “Dhimmi - New World Encyclopedia”

http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Dhimmi

[4] ■ ‘খলিফাতু রাসূলিল্লাহ আবু বাকর আছছিদ্দীক (রা.)’ – ড. আহমদ আলী – ড. আহমদ আলী, পৃষ্ঠা ৩৫৬

■ “…it is paid in exchange for providing protection for the lives and possessions of the Thimmis who refuse to embrace Islam and choose to retain their unbelief, while awarding them freedom to practice their religion and live in peace among Muslims. Therefore, whenever the Companions may Allaah be pleased with them feared inability to protect the lives and possessions of the Thimmis - from external aggression - they used to pay them back the Jizyah (for non-satisfaction of its pre-condition, namely, protection).”

http://www.islamweb.net/emainpage/index.php?page=showfatwa&Option=FatwaId&Id=268732

[5] “…in return for their being allowed to settle in Muslim lands, and in return for protecting them against those who would commit aggression against them. ”

https://web.archive.org/web/20160718183959/http://islamqa.info/en/214074

[6] ■ ‘আল মুগনী’ - ইবনু কুদামা মাকদিসী(র.), খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৭০-২৭৩;

■ বাদা’ই, আল কাসানী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১১১

[7] ■ ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ’ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ‘জিযয়া’ অংশ, পৃষ্ঠা ৪০১

■ ‘আহকামুয যিম্মিয়িন ওয়াল মুসতা’মিমীন ফি দারি ইসলাম’ – আব্দুর কারিম যায়দান, পৃষ্ঠা ১৫৭

[8] ‘কিতাবুল খারাজ’ – ইমাম আবু ইউসুফ(র.), পৃষ্ঠা ১১১

[9] ‘ফুতুহুল বুলদান’ -আল বালাযুরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২

[10] ‘খলিফাতু রাসূলিল্লাহ আবু বাকর আছছিদ্দীক (রা.)’ – ড. আহমদ আলী, পৃষ্ঠা ৩৫৭

[11] বিস্তারিত এখান থেকে দেখা যেতে পারে -

“Definition of jizyah, its rate and who has to pay it – islamqa (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)”

Click This Link

Click This Link

[12] সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং : ৩০৫২

[13] ■ তাফসির মাযহারী – কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী(র.), ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৬

■ আরো দেখুনঃ সুনান আবু দাউদ, অনুচ্ছেদঃ (১৭০) জিযিয়া কর আদায়ের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ সম্পর্কে; হাদিস নং : ৩০৩৪ (সহীহ)

[14] ■ ‘আল আমওয়াল’ – ইমাম আবু উবায়দ আল কাসিম(র.), পৃষ্ঠা ৪৩

■ ‘আল মুগনী’ - ইবনু কুদামা মাকদিসী(র.), খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৯০

■ ‘আহকাম আহলুয যিম্মাহ’ – ইবনু কাইয়িম জাওযিয়্যাহ(র.), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৯

[15] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩৪৩৫

[16] ‘কিতাবুল খারাজ’ – ইমাম আবু ইউসুফ(র.), পৃষ্ঠা ১৪৪

[17] ‘কিতাবুল খারাজ’ – ইমাম আবু ইউসুফ(র.), পৃষ্ঠা ১৫-১৬

[18] ‘আল মুগনী’ - ইবনু কুদামা মাকদিসী(র.), খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৭২

[19] ■ ‘কিতাবুল খারাজ’ – ইমাম আবু ইউসুফ(র.), পৃষ্ঠা ১২৬

■ ‘বিশ্বশান্তি ও ইসলাম’ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) - সাইয়িদ কুতুব শহীদ, পৃষ্ঠা ১৭৭-১৭৮

[20] ■ ‘ফুতুহুল বুলদান’ -আল বালাযুরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৭

■ ‘বিশ্বশান্তি ও ইসলাম’ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) - সাইয়িদ কুতুব শহীদ, পৃষ্ঠা ১৭৮

[21] ‘কিতাবুল আমওয়াল’ - আবু উবাইদাহ পৃষ্ঠা ২৭

[22] ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা’ – মুহাম্মদ আব্দুল মা’বুদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮

[23] “History of Sindh” (Government Of Sindh, Pakistan)

http://www.sindh.gov.pk/dpt/history of sindh/history.htm

[24] ■ Nicholas F. Gier, FROM MONGOLS TO MUGHALS: RELIGIOUS VIOLENCE IN INDIA 9TH-18TH CENTURIES, Presented at the Pacific Northwest Regional Meeting American Academy of Religion, Gonzaga University, May, 2006

■ আরো দেখুনঃ Click This Link

[25] “ইসলাম যেভাবে হিন্দুস্তানে আসে _ ইসলামের হারানো ইতিহাস”

https://lostislamichistorybangla.wordpress.com/2014/11/17/হিন্দুস্তানে-ইসলাম-আগমন/

[26] “Ruling on working as a tax adviser – islamqa (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)”

https://islamqa.info/en/243867

[27] “A Vindication of Aurangzeb” - Sadiq Ali, Page 128-130

বইটি এখান থেকে পড়া ও ডাউনলোড করা যাবেঃ

https://archive.org/details/AVindicationOfAurangzebBySadiqAli/page/n137

[28] Maddison, Angus (2003): Development Centre Studies The World Economy Historical Statistics: Historical Statistics, OECD Publishing, ISBN 9264104143, pages 259–261

[29] “শায়েস্তা খান - বাংলাপিডিয়া”

http://bn.banglapedia.org/index.php?title=শায়েস্তা_খান

[30] আল কুরআন, আলি ইমরান ৩ : ১১০

লেখাটির জন্য কৃতজ্ঞতা, জনাব মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার সাহেবের প্রতি। ইষৎ সংশোধিত ও সংযোজিত।

২| ১৭ ই মে, ২০২০ দুপুর ১:১২

রাজীব নুর বলেছেন: যাকাত ফেতরা কি অসৎ ভাবে ইনকাম করা হলেও দিতে হবে?

১৮ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:৩০

নতুন নকিব বলেছেন:

.

হারাম মালের যাকাত

হারাম মাল কাকে বলে?
যে সম্পদ অর্জন করা অথবা যে সম্পদ থেকে উপকার লাভ শরীয়তে নিষিদ্ধ তাই হলো হারাম মাল, যেমন মদের ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত অর্থ অথবা সুদ বা চুরিকৃত সম্পত্তি ইত্যাদি।

হারাম মালের যাকাতের হুকুমঃ
যে সম্পদ মূলে হারাম - যেমন মদ অথবা শূকর- ইত্যাদির ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থে যাকাত নেই। তদ্রূপভাবে যে সম্পদ মূলে হারাম নয়, তবে অন্যকোনো কারণে, শরীয়তের বিধান বিগ্নিত হওয়ার দরুন হারাম হয়েছে, যেমন চুরিকৃত সম্পদ, এরূপ সম্পদেও যাকাত নেই; কেননা এ ধরনের সম্পদে ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা প্রতিষ্টিত হয় না, যা যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত।

হারাম মালের ক্ষেত্রে যা করণীয়ঃ
ক. উপার্জন-পদ্ধতিতে সমস্যা থাকায় এ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি কখনো তার মালিক হবে না, সময় যতোই গড়িয়ে যাক না কেন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির ওপর আবশ্যক হবে মূল মালিক অথবা তার উত্তারাধিকারীকে - যদি জানা থাকে - সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া। আর যদি মূল মালিক অথবা তার উত্তারাধিকারীকে চেনার বিষয়ে ব্যক্তি নিরাশ হয়ে পড়ে, তবে হারাম মাল থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য মালিকের পক্ষ থেকে সদকা হিসেবে কল্যাণমূলক কাজে তা ব্যয় করে দিতে হবে।

খ. যদি হারাম কাজের মজুরি হিসেবে সম্পদ অর্জন করে থাকে তাহলে অর্জনকারী তা কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে দেবে। যার কাছ থেকে তা নিয়েছে তাকে ফেরত দেবে না; কেননা সে তা আবারও গুনাহের কাজে ব্যয় করবে।

গ. যার কাছ থেকে হারাম মাল নেয়া হয়েছে সে যদি অবৈধ লেনদেন পরিত্যাগ না করার ব্যাপারে অনড় থাকে, যা তার সম্পদ হারাম হওয়ার কারণ হয়েছে, যেমন সূদী লেনেদেনের টাকা, তাহলে তার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে না, বরং তা কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হবে।

ঘ. যদি হারাম মাল হস্তগতকারী ব্যক্তি মূল হারাম মাল ফিরিয়ে দিতে অপারগ হয়, তাহলে তার স্থলে সমপরিমাণ মাল অথবা তার মূল্য মালিককে ফিরিয়ে দেবে, যদি তাকে খুঁজে বের করতে পারে, অন্যথায় সমপরিমান মাল বা তার মূল্য, মূল মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করার নিয়তে কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করে দেবে।(ড. সালাহ আস্সাওয়ী, আধুনিক ফিক্হী বিষয়, পৃ:৬১ ও তৎপরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ)

সুন্দর প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ।

৩| ১৭ ই মে, ২০২০ দুপুর ১:৪৮

নেওয়াজ আলি বলেছেন: এইবার শাড়ি নিতে মরবে না

১৮ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:৩৪

নতুন নকিব বলেছেন:



ঠিক। শাড়িদাতারা নিজেরাই এবার অন্তরালে। জীবনের ভয় কার না আছে!

গরিব মারার এই পদ্ধতি যাকাত আদায়ের জন্য কোনো পথ নয়। এগুলো স্রেফ আই ওয়াশ, শো-ডাউন আর ফটো সেশন। নিজেদের ঢাউস পেটে আরও নিত্য নতুন সম্পদের পাহাড় উদরীকরণের পথ ও উপকরণ মাত্র!

৪| ১৮ ই মে, ২০২০ সকাল ৮:১৮

জাফরুল মবীন বলেছেন: বাৎসরিক বিষয় হওয়ায় অনেকেরই মনে থাকে না।ভালো একটা সংকলন।ধন্যবাদ উপস্থাপনের জন্য।

১৮ ই মে, ২০২০ দুপুর ২:৩৫

নতুন নকিব বলেছেন:



স্বাগত। আপনাকে পেয়ে আনন্দিত। অনেক ভালো থাকবেন, প্রার্থনা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.