নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

হারানো ঠিকানায়, খুজে ফিরি তোমার শেষ স্মৃতিচিহ্ন

আনিছুর রহমান সুজন

মানুষ হওয়ার চেষ্টা নিরন্তর।

আনিছুর রহমান সুজন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ক্রীতদাস থেকে রাজ সিংহাসনের অধিপতি ও রাজিয়া সুলতানার উপাখ্যান।

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:১৬



কুতুবউদ্দিন আইবেক, বিস্তারিত না জানলেও এই নামটা মোটামুটি আমাদের সবার কাছেই পরিচিত। দিল্লীর সিংহাসনের মামলুক (দাস বংশ) সাম্রাজ্যের এই সুলতান প্রথম জীবনে ছিলেন একজন ক্রীতদাস। যাদের বলা হত ‘গোলাম’। এই গোলামরা ছিল পন্যের মত। একেকবার একেকজন এর কাছে অর্থের বিনিময়ে হাতবদল হত। একবার কাজী ফখরুদ্দিন নামে ধনাঢ্য ও উদারমনের এক ব্যক্তি কিনে নিলেন কুতুবউদ্দিন আইবেক কে। কিছুদিনের মধ্যের ফখরুদ্দিন বুঝতে পারলেন এই ‘গোলাম’ এর রয়েছে দারুণ বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, সাহস। ফখরুদ্দিন কুতুবদ্দিনকে পড়ালেখা ও অস্ত্র চালনা শিখার ব্যবস্থা করে দিলেন। স্বল্প সময়ে কুতুবউদ্দিন হয়ে উঠলেন একজন জ্ঞানী ‘গোলাম’ ও দক্ষ যোদ্ধা। মনিব কাজী ফখরুদ্দিনের মৃত্যুর পর তার ছেলে কুতুবউদ্দিন কে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দেন ঘুরি সাম্রাজ্যের সুলতান মোহাম্মদ ঘুরির কাছে। মুহম্মদ ঘুরি জ্ঞান, বিচক্ষণতার কারনে কুতুবউদ্দিন কে তাঁর ‘গোলাম’ দের নেতা নির্বাচন করেন। আরও ভালোভাবে যুদ্ধবিদ্যা শেখার ব্যবস্থা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই কুতুবউদ্দিন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। আনুগত্যে সুলতানের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন।

১১৯৩ সালে দিল্লী জয় করে কিছুদিন পর মুহম্মদ ঘুরি খোরাসানে ফিরে যান। দিল্লীর শাসনভার দিয়ে যান কুতুবউদ্দিন আইবেক কে। ১১৯৫ থকে ১২০৩ সালের মধ্যে আইবেক আশেপাশের আরো কিছু অঞ্চল দখল করে নেন রাজপুত সেনাদের কাছ থেকে। আর তার সেনাপতি মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি দখল করে নেন বাংলা ও বিহার।

১২০৬ সালে মুহম্মদ ঘুরি আততায়ী কর্তৃক নিহত হলে ক্রীতদাসের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে যান কুতুব উদ্দিন আইবেক। মুহম্মদ ঘুরির কোন সন্তান না থাকায় নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি।

এর ৪ বছর পর ১২১০ সালে চৌগান (ঘোড়ার পিঠে বসে হাতে লাঠির সাহায্যে বল এ আঘাত করে খেলা) খেলার সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মৃত্যু হয় কুতুব উদ্দিন আইবেকের।

কিন্তু কুতুবউদ্দিন আইবেকেরও কোন পুত্র সন্তান ছিল না। সিংহাসনে বসেন আরাম শাহ। আরাম শাহ সম্পর্কে কুতুবুদ্দিনের কি হন এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না তবে অধিকাংশের মতে তারা সম্পর্কে ভাই বা চাচাতো ভাই। সিংহাসনের বসার পর আরাম শাহের অযোগ্যতায় রাজ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। সেসময় দিল্লির রাজসভায় ৪০ সদস্য নিয়ে একটি পরিষদ ছিল , যাকে বলা হত ‘চিহালগনি’। এই চিহালগনির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে ব্যাপক প্রভাব ছিল। এই পরিষদ আরাম শাহকে দিল্লীর সুলতান হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করে।

সে সময় উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের গভর্নর ছিলেন শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ। তাঁকে আলতামাশও বলা হয় (ইলতুৎমিশ তুর্কি শব্দ, আরবরা আলতামাশ উচ্চারণ করে)। মজার ব্যাপার হচ্ছে কুতুবদ্দিন আইবেক এর মত এই ইলতুৎমিশও ছিলেন একজন ক্রীতদাস বা গোলাম। জানা যায় ইলতুৎমিশ রূপ ও গুনে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার ভাইয়েরা তখনকার বিখ্যাত দাস বেচাকেনার বাজার বুখারায় এনে বিক্রি করে দেয়। এক ক্রেতা কিনে এনে আবার তাকে গজনীতে এনে বিক্রি করে দেয়। এরপর সেখান থেকে দিল্লীতে । দিল্লী থেকে ইলতুৎমিশকে কিনে নেন কুতুবউদ্দিন আইবেক। এই গোলামের মাঝে দারুণ প্রতিভা, বিচক্ষণতা দেখতে পান আইবেক। নিজের অতীতের কারনেই হোক বা যে কারনেই হোক ইলতুৎমিশকে জ্ঞানার্জন ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলেন আইবেক। এবং বাদাউনের গভর্ণর হিসেবে নিযুক্ত করেন। পরে কুতুবউদ্দিন নিজ কন্যার বিয়েও দেন ইলতুৎমিশের সাথে।

আরাম শাহ এর অযোগ্যতার কারনে ও আর কোন উত্তরাধিকার দাবীদার না থাকায় শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ নিজে দিল্লীর সিংহাসনে বসার দাবী করেন। কিন্তু কেউ কেউ আপত্তি তোলে কারন সে একজন ক্রীতদাস। ইলতুৎমিশ যুক্তি দেখায় তার মনিব কুতুবউদ্দিন আইবেক মৃত তাই সে ক্রীতদাসের শৃঙ্খল থেকেও মুক্ত। এছাড়া আইবেক তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে গেছেন বলেও দাবী করেন তিনি। তাছাড়া তাঁকে তার মনিব বাদাউনের গভর্ণরও নিয়োগ দিয়ে গিয়েছিলেন। তদুপরি তার মনিব নিজেও একজন ক্রীতদাস ছিলেন। ক্রীতদাস থেকেই তিনি দিল্লীর সুলতান হয়েছেন।

এসব যুক্তিতে এবং বাদাউনের গভর্নর হিসেবে ইতিমধ্যে যোগ্যতার প্রমাণ দেখানোতে শেষ পর্যন্ত ‘চিহালগনি’ পরিষদ শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ কে দিল্লীর সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে।

সিংহাসনে বসে নিজেকে যোগ্য, ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে প্রমাণ করেন ইলতুৎমিশ। তার ন্যায়পরয়ানতা ও প্রজাদের সেবায় নেয়া নানা পদক্ষেপের কারনে রাজ্যে সকলের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

কিন্তু এই ন্যায়পরায়ন সুলতানের পুত্ররা ছিল অযোগ্য। তারা দিনরাত মদ, নারী, আনন্দ- ফূর্তি নিয়ে মেতে থাকতো। অনেক চেষ্টা করেও ইলতুৎমিশ তাদের সুপথে আনতে পারেন নি। কিন্তু তার ঘরে আশার আলো হয়ে ও ইতিহাস রচনা করতে এসেছিলেন এক কন্যা! যার নাম রাজিয়া সুলতানা। কন্যা রাজিয়া ছিলেন মেধা, বুদ্ধি, বিদ্যা ও সাহসে অনন্য। এব গুণাবলীর কারনে ইলতুৎমিশ কন্যাকে বিদ্যা অর্জনে ও রাষ্ট্র পরিচালনাতে নানা বিষয় শিক্ষা দিতে থাকেন। বিভিন্ন সময় ইলতুৎমিশ রাজ্যের বাইরে অভিযানে গেলে সেসময় রাজ্য পরিচালনা করতেন রাজিয়া। এসব কারনে কন্যার যোগ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে ও পুত্রদের অযোগ্যতার কারনে রাজিয়াকে তার উত্তরাধিকার মনোনীত করে যান ইলতুৎমিশ ।

রাজিয়া সুলতানা
রাজিয়া সুলতানা
কিন্তু একজন নারীকে সুলতান হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না ‘চিহালগনি’ ও তখনকার তুর্কি শাসকরা। ফলে ইলতুৎমিশ এর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসে ইলতুৎমিশ এর পুত্র রোকন উদ্দিন ফিরোজ শাহ। রোকন উদ্দিন তার ভাই কুতুব উদ্দিন কে হত্যা করে। মা কে দিয়ে রাজিয়াকেও হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে (রোকন উদ্দিনের মা ছিল রাজিয়ার সৎ মা)। কিন্তু সফল হয় নি।

রোকন উদ্দিন সিংহাসনের বসার পর স্বেচ্ছাচারিতা ও অযোগ্যতায় পুরো রাজ্যে পিতার প্রতিষ্ঠা করা ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। আনন্দ ফুর্তি, মদ ও নারী নিয়ে মেতে থাকা রোকন উদ্দিন রাজ্যের শাসনে চরম অযোগ্যতার প্রমাণ দিতে থাকে। প্রজাদের মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রজাদের মনোভাব বুঝতে পেরে ১২৩৬ সালের একদিন রাজিয়া হাজির হলেন মসজিদে। মুহুর্তেই সেখানে জড়ো হয়ে যায় অনেক জনতা। উপস্থিত জনতার সামনে রাজিয়া মদ,নারী নিয়ে মেতে থাকা রোকন উদ্দিন এর হাত থেকে তার পিতার প্রতিষ্ঠিত ন্যায়ভিত্তিক রাজ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার আহবান জানান। ক্ষুব্দ জনতা মুহুর্তেই তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে রাজপ্রাসাদ ঘেরাও করে রোকনউদ্দিন কে আটক করে ও রাজিয়াকে সুলতান হিসেবে মেনে নেয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মত দিল্লির সিংহাসনে বসলেন একজন নারী! এমনকি এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র নারী। তখন রাজিয়ার বয়স ৩১।

সিংহাসনের বসেই আপন ভাইকে হত্যার দায়ে রোকন উদ্দিন কে মৃত্যুদণ্ড দেন রাজিয়া। সুলতান হয়ে নিজেকে পিতার মতই যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে থাকলেন। রাজ্যে ফিরিয়ে আনলেন শৃঙ্খলা। সকল অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে নিলেন কঠোর ব্যবস্থা। যে সময়ে নারীদের অন্দরমহলের বাসিন্দা হিসেবেই কল্পনা করা হত সে সময়ে একজন নারী তার নেতৃত্বের দৃঢ়তায় মুগ্ধ করে ফেললেন রাজসভার সদস্য ও প্রজাদের। রাজিয়া রাজসভায় আসতেন পুরুষ সুলতানের মত রাজকীয় পোশাক পরে। মাথায় বাঁধতেন পাগড়ি। ঘোড়ায় চরে যুদ্ধ করতেন। তার সক্রিয় প্রচেষ্টা ছিল কেউ যেন তাঁকে অবলা নারী হিসেবে অযোগ্য বলার সুযোগ না পায়।

রাজিয়া তাঁকে সুলতানা না বলে সুলতান বলতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন সুলতানা বলা হয় সুলতান এর স্ত্রী কে। কিন্তু আমি কোন সুলতানের স্ত্রী নই। আমি নিজেই একজন স্বাধীন সুলতান!

সুলতান রাজিয়া
শিল্পীর আঁকা ঘোড়ার পিঠে সুলতান রাজিয়া
ইতিহাসে কারো সিংহাসনই ফুলের মত কোমল হয়নি। সুলতান রাজিয়াকেও সম্মুখীন হতে হল কঠিন বাস্তবতার!

সেমময় ভারতবর্ষ ও এর আশেপাশে রাজ্যে তুর্কি শাসকদের রাজত্ব। রাজিয়া নিজেও তুর্কি।

এসব শাসক ও রাজ্যের অভিজাত ব্যক্তিরা একজন নারী শাসককে মেনে নিতে পারছিলেন না। একজন নারী পুরুষের মত করে রাজসভায় আসছে, ঘোড়ায় চরে যুদ্ধ করছে , পুরুষের মত ঘরে বাইরে সবজায়গায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে এসব মেনে নেয়ার মত মানসিকতা তখন তাদের ছিলনা। পুরুষ শাসক ও গভর্ণরদের অহংবোধে আঘাত লাগে। ফলে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে।

প্রজাদের মাঝে জনপ্রিয়তা থাকায় ক্ষমতাচ্যুত করার উপায় হিসেবে চরিত্রে কালিমা লেপন করতে রটানো হয় এক কুৎসা। জামাল উদ্দিন ইয়াকুত নামে আবিসিনিয়ার এক দাসকে রাজিয়া ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। আনুগত্যে ইয়াকুত রাজিয়ার আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। আবিসিনিয়ার একজন দাসকে এত বড় সম্মান দেয়ার কারনে অনেক তুর্কিই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। অবিবাহিত যুবতী নারীর কাছাকাছি একজন পুরুষের উপস্থিতি নিয়ে রটানো হয় অবৈধ সম্পর্কের কথা। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বিভিন্ন রাজ্যের তুর্কি শাসক ও অভিজাত ব্যক্তিরা। এমনকি যে প্রজারা তাঁকে পছন্দ করতো তাদের অনেকের মাঝেও এই অবৈধ সম্পর্কের রটনা নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রথমে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে লাহোরের গভর্ণর কিন্তু রাজিয়া সে বিদ্রোহ দমন করতে সফল হয়।

এদিকে বাথিনডার (পাঞ্জাব) গভর্ণর ছিলেন ইখতিয়ার উদ্দিন আলতুনিয়া। আলতুনিয়া আবার ছিলেন রাজিয়ার সমবয়সী ও শৈশবের খেলার সাথী। আলতুনিয়া রাজিয়াকে পছন্দ করতো। অনেক ইতিহাসবিদ এর মতে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার মাঝে প্রণয়ের সম্পর্কও ছিল। যদিও এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে আলতুনিয়া যে রাজিয়াকে পছন্দ করতো এ নিয়ে সবাই একমত। রাজিয়ার সাথে তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা ইয়াকুতকে রটানো কুৎসায় চরম ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন আলতুনিয়া। নিজের পছন্দের নারীর এইসব ব্যাপার মেনে নিতে না পেরে রাজিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন আলতুনিয়া। যুদ্ধে পরাজয় হয় রাজিয়ার। নিহত হয় ইয়াকুত। রাজিয়াকে বন্দি করে নিজের রাজ্যে নিয়ে যায় আলতুনিয়া।

‘চিহলগানি’ রাজিয়ার সৎ ভাই মইজ উদ্দিন বাহরাম শাহকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে। যদিও এর কিছুদিন পরেই অযোগ্যতার কারনে মইজ উদ্দিন কেও ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়।

এদিকে বন্দি অবস্থায় থেকে মুক্তি পেতে হোক অথবা আলতুনিয়ার প্রেমের কারনেই হোক কিংবা হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার বাসনা থেকেই হোক রাজিয়া আলতুনিয়া কে বিয়ে করতে রাজি হন। ইতিহাসবিদদের মতে রাজিয়া প্রকৃতপক্ষে রাজ্য ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আলতুনিয়াকে বিয়ে করেছিলেন।

বিয়ে করেই রাজিয়া আলতুনিয়াকে উৎসাহ দিতে থাকেন দিল্লি আক্রমণ করে মইজ উদ্দিন বাহরাম শাহকে উৎখাত করে সিংহাসন দখল করতে। যুদ্ধে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার বাহিনীর সাথে যোগ দেয় রাজিয়ার অনুগত কয়েকটি রাজ্যের গভর্ণর ও সেনা। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে যুদ্ধের ময়দান থেকে তারা পালিয়ে যায়। মইজ উদ্দিন এর বাহিনীর কাছে পরাজিত হয় রাজিয়া ও আলতুনিয়ার বাহিনী।

সুলতান রাজিয়ার মৃত্যুঃ

১২৪০ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় দিল্লির প্রথম ও শেষ নারী সুলতানের।

রাজিয়ার মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু মতবাদ আছে।

একটি মতে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কোনরকমে প্রাণ নিয়ে দিল্লির উত্তর দিকে কাইথাল এলাকায় পালিয়ে যান রাজিয়া। ক্লান্ত রাজিয়া পরিচয় গোপন করে এক কৃষক পরিবারে আশ্রয় নেন। ঘুমিয়ে গেলে কৃষকের স্ত্রী রাজিয়ার শরীরের মূল্যবান রত্ন দেখে। রত্নের লোভে রাজিয়াকে হত্যা করে কৃষক পরিবারটি। পরে এসব রত্ন বাজারে বিক্রি করতে গেলে ধরা পড়ে যায় কৃষক। এবং জানাজানি হয়ে যায় রাজিয়ার হত্যার ব্যাপার।

অপর মতে যুদ্ধের ময়দান থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায় রাজিয়া ও তার স্বামী আলতুনিয়া। পথে ডাকাতদের কবলে পড়ে তাঁরা। রত্ন-অলংকারের লোভে ডাকাতরা দুজনকেই হত্যা করে।

অন্য এক মতে যুদ্ধে প্রতিপক্ষের সেনারা গ্রেফতার করে রাজিয়া ও তার স্বামী আলতুনিয়াকে। পরে তাদের হত্যা করা হয়।

এছাড়া অন্য আরেকমত প্রচলিত আছে। এ মত অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানেই তীরের আঘাতে মৃত্যু হয় সুলতান রাজিয়ার।

সমাধিঃ

রাজিয়ার মৃতু নিয়ে মতভেদের মত তাঁর সমাধি নিয়েও রয়েছে মতভেদ। একটি মতে রাজিয়ার সমাধি হচ্ছে পুরাতন দিল্লির শাহজাহানাবাদের তুর্কি গেটের বুলবুল-ই-খানাতে। সেখানে রাজিয়া ও তাঁর স্বামী আলতুনিয়ার সমাধি পাশাপাশি বলে অনুমান করা হয়।

বুলবুল-ই-খানাতে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার সমাধি
পুরাতন দিল্লির শাহজাহানাবাদের তুর্কি গেটের বুলবুল-ই-খানাতে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার সমাধি
আরেক মতে কাইথাল এলাকায় একটি মসজিদ প্রাঙ্গনে রাজিয়ার সমাধি

রাজিয়ার সমাধি

দিল্লির সিংহাসনের প্রথম ও একমাত্র এই নারী সুলতান সেসময়কার গভর্ণর ও অভিজাত ব্যক্তিদের বিরোধিতার কারনে ৪ বছরেরও কম সময় সিংহাসনে ছিলেন। কিন্তু তার এ স্বল্প শাসনামলে সমাজের প্রচলিত সংস্কার ভেঙে, নারীদের বিষয়ে সকলের ধারনা ভুল প্রমাণ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন একজন বীর যোদ্ধা, বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ন সুলতান হিসেবে। আজও এই মহিয়সী নারীর বীরত্বের কথা কিংবদন্তী হয়ে আছে। অনেক শিশুই গল্পের মত করে শুনেছে তাঁর কথা।

তাঁকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমা, মেগা সিরিয়াল।

একজন ক্রীতদাস পিতা যে ভাগ্যক্রমে দিল্লির সুলতান হয়ে গেল তারই কন্যা হয়ে, ১২ শতকের একজন নারী হয়ে বিদ্যার্জন ও সমরকৌশন শিখে, ভাইদের অযোগ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জনতাকে সাথে নিয়ে সিংহাসনে আরোহন, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া, তলোয়াড় হাতে যুদ্ধ করা- সত্যি রোমাঞ্চকর!

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.