![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ওরে ও তরুণ ঈশান! বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ। ধ্বংস-নিশান উঠুক প্রাচী-র প্রাচীর ভেদি’॥
রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথা বলে স্বদেশি আন্দোলনের যাত্রা শুরু হলেও, আন্দোলনকারীদের মূল দায়বদ্ধতা ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতি। বাস্তবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে তেমন কিছু নেই; আছে দুটি পৃথক জাতীয়তাবাদ। সেকালের মতো একালেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে কিছু নেই। যা আছে-তা হলো দুটি ভিন্ন জাতীয়তাবাদ, হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ পূর্ববঙ্গের কোনো অর্গানিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়; এটা পূর্ব বাংলার মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাস মিলিয়ে তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে কলকাতার সংজ্ঞা ধরে। এ কারণেই এখনকার বাঙালি জাতীয়তাবাদ কোনো জাতীয় ঐক্য তৈরি করতে পারেনি। আমাদের জাতি ও সংস্কৃতির পরিচয়ের যে সংকট, তা এভাবেই শুরু হয়েছে।
তখনকার বাংলার রেনেসাঁ মানে হিন্দু রেনেসাঁ। বাঙালির জাতীয়তাবাদ মানে হিন্দুর জাতীয়তাবাদ। ইতিহাসের এই ছেদবিন্দুগুলোকে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গের পণ্ডিত পার্থ চ্যাটার্জী দেখিয়েছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ।
ইতিহাসের দিক দিয়ে বিচার করলে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ গ্রহণের মানে দাঁড়ায়-এ দেশের গণমানুষের সংস্কৃতি থেকে ইসলাম, মুসলমান এবং এর সমস্ত ঐতিহ্য মুছে ফেলে বাঙালিত্বের নামে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারার সাথে মিশে যাওয়া। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকে রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে এ দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে উত্থান দেখি, তারও পরিণতি হয়েছে উপমহাদেশের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারাটির সাথে মিত্রতা, কতক ক্ষেত্রে বশ্যতা অর্জন।
এ দেশের বামপন্থিদের একটা গভীর অসুখ সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অষ্টপ্রহর নিন্দামন্দ করার পরও সামন্ত জমিদার রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাদের থরো থরো আবেগের শেষ নেই। এ কারণেই এ দেশের বামপন্থিরা দু-একটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো কালেও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদী হতে পারেননি। হয়েছেন কলকাতার সংজ্ঞায়িত বাঙালি জাতীয়তাবাদী।
রবীন্দ্রনাথের কাছে বাঙালি ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কখনো দুটি পৃথক সত্তা হিসেবে হাজির হয়নি। তার কাছে যা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, তা-ই ভিন্ন মাত্রায় হয়ে উঠেছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। তিনিও দুটি পরিচয়ে কখনো পরিচিত হতে চাননি এবং সেটা সম্ভবও ছিল না; বরং ক্ষেত্রেবিশেষে, বিশেষ করে রাষ্ট্র ও জাতি পরিচয়ের জায়গায় তার ভারতীয় পরিচয় বাঙালি পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে। আবার এই ভারতীয় পরিচয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার হিন্দু পরিচয়ের সাথে সংলগ্ন হয়ে আছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পরিপূরক বস্তু। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভারতীয় জাতীয়তবাদের প্রক্সিও বলা যায়। এই দুই জাতীয়তাবাদপন্থিদের চিন্তাগত ও মতাদর্শিক অভিন্নতা দেখবার মতো। এরা কেউ দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করে না বা ভারতীয় ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসা মুসলিম জাতীয়তাবাদকে উভয়ই 'অপর' বানায়। এরা উভয়ই বাংলাদেশের মুসলিম চরিত্রকে ধারণ করে না। এদের আস্থা সেকুলারিজমে। আর সেকুলারিজমকে ব্যবহার করে ইসলামোফোবিয়া চর্চায় এরা খুবই দক্ষ। আস্ত মুসলিম সংস্কৃতি ও তার বিভিন্ন প্রতীকগুলোকে ডেমিনাইজ করা, অপর করা এদের একটা বৈশিষ্ট্য
এভাবে বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠেছে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার খুঁটি। রবীন্দ্রনাথের গানটি এখন শুধু গান নয়। এটি এ দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বড়ো প্রতীক। জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বার্থে এ প্রতীক বিনাশ ছাড়া উপায় নেই।
এ কারণেই আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের মতো পণ্ডিতরা ১৯৪০-এর দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক আজাদির পাশাপাশি তামুদ্দুনিক আজাদির কথা বলেছিলেন
©somewhere in net ltd.