নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

তবে তাই হোক

মাধুকরী মৃণ্ময়

কিংকর্তব্যবিমুড়

মাধুকরী মৃণ্ময় › বিস্তারিত পোস্টঃ

নির্বাসন

১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:২৩



সকাল থেকে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। রাকিব সাহেবের টিনের চালের অসংখ ফুটো দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। পানি যাতে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেই জন্য প্রতিটা ফুটোর নিচে হাড়ি , পাতিল দেয়া হয়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাড়ি পানিতে উপচে পড়ছে। রাকিব সাহেব সেই পানি বাইরে ফেলে দিয়ে হাড়ি খালি করে আবার ফুটোর নিচে দিচ্ছে।
এখন বিকাল। বৃষ্টি থামার নাম নেই। হাড়ি পাতিল খালি করতে করতে রাকিব সাহেবের এখন ক্লান্ত লাগছে। ইদানিং মাজার ব্যাথাটা আবার বেড়েছে। নিচু হয়ে কোন কাজ করতে ডাক্তার নিষেধ করেছে। ডাক্তারের নিষেধ শুনতে গেলে ঘর পুকুর হতে সময় নিবে না। পুরো বাড়ির একটা মাত্র ঘর কোনরকম বসবাসের যোগ্য। অন্যান্য ঘরগুলোর অবস্থা এর চেয়েও খারাপ । রাকিব সাহেবের মা বেচে থাকতে এই ঘর , গাছপালা, বাড়ির প্রতিটা জায়গা সন্তানের মতো আগলে রাখতো। মা মারা গেছে দুই বছর হলো। রাকিব সাহেব তার ঢাকার পাট চুকিয়ে এই ছোট্ট মফস্বলে আস্তানা গেড়েছে। একা মানুষ, সবগুলো ঘর দেখাশুনা করা তার পক্ষে সম্ভব না। তার ইচ্ছাও নাই। সে একটি মাত্র ঘরে থাকে। সে ঘরের এমন বেহাল দশা।
রাকিব সাহেব মধ্য বয়সে এসে বিয়ে করে। প্রেমের বিয়ে। সে বিয়ে টেকে নাই। একটা মেয়ে আছে তার। সে এখন ঝলমলে তরুনী। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। রাকিব সাহেবের মাঝে মাঝে মনে হয় , সে গাছপালা ভালোবাসে বলে তার মেয়ে বোট্যানিতে পড়ে। অথচ সে ইচ্ছা করলেই আরো ভালো কোন সাবজেক্টে পড়তে পারতো। মনে হওয়া ভুলও হতে পারে। মাঝে মাঝে ভুল মনে হওয়া নিয়ে বাচতে সুখ লাগে।

মা মরে যাওয়ার পর রাকিব সাহেব আত্বিয়স্বজন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। কেউ কারো খোজ নেই না। মা ছিলো সেতুর মতো। সেতু ভেঙ্গে গেলে যেমন দুই পাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে , তেমন রাকিব সাহেব সবার থেকে বিচ্ছিন্ন। শুধুমাত্র মেয়েটা যোগাযোগ রাখে। এই চির বাউন্ডেলে বাপের সাথে কেন সে যোগাযোগ রাখে , সে কথা ভেবে রাকিব সাহেবের চোখে কোনা ভিজে যায়। মেয়েটাকে তো বড় করেছে তার মা। সে কোনদিন খোজ নেই নাই, মেয়েটার চুল কতো বড় হলো, কোন ক্লাসে পড়ছে, কোন যুবককে তার মেয়ের বুকের মধ্যে আনচান করছে কিনা অথবা আজ দুপুরে কি খেলো মেয়েটা, অসুখ বিসুখ হইছে কিনা। কিছুই খোজ নেই নি। মায়ার বাধনে আটকে যাওয়ার ভয়ে , সে সমস্ত মায়াকে পা দলে বুড়ো হয়ে গেছে।
মেয়েটা চিঠি লেখে। মুক্তার মতো তার হাতের লেখা। রাকিব সাহেবের মনে হয় , চিঠি খোলার সাথে সাথে এক ঝাক আলো তার চোখে, মুখে লাগে। মেয়েটা যে অনেক কিছু লেখে, তেমনও না। কোনদিন শুধু লিখলো, বাপজান। কোনদিন কিছুই না লিখে চিঠির পৃষ্টা জুড়ে টিপ দিয়ে দিলো। রাকিব সাহেবের দেখতে ইচ্ছা করে । খুব। মেয়েটাকি শাড়ি পড়ে ? কেমন লাগে দেখতে যখন লাল টুকটুকে টিপ পড়ে সে টি এস সি তে হেটে বেড়ায়? সে কি কোন ঝাকড়া চুলের যুবকের কাধে মাথা রেখে শান্তির নিঃস্বাশ নেই ? রাকিব সাহেবের এই সব জানতে ইচ্ছা করে। খুব ইচ্ছা করে মেয়েটা একটু ফোন করুক, বলুক বাপজান, আছো ক্যামন? তোমার একলা জীবন কাটছে ক্যামন? জিজ্ঞাসা করুক, বাপজান, আমার নাম তুমি ক্যান ইরাবতী রাখছো ? ক্যান মধুমতি বা পদ্মা , যমুনা রাখলা না। জিজ্ঞাসা করুক, আমাকে চিঠি লিখো না ক্যান তুমি? তোমার পত্র পড়ার আমার আজন্ম খায়েশ।
ইরাবতী ফোন করে না। সে চিঠি লেখে। এই জীবন সায়হ্নে এসে মেয়ের জন্য রাকিব সাহেবের বুকের ভেতর হাহাকার জাগে। বাপজান, ডাক শোনার জন্য ক্যামন পাগল পাগল লাগে। রাকিব সাহেব চাই, তার মেয়ে আসুক, পাশে বসুক, মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করুক, কেনো তোমার এই দ্বীর্ঘ নির্বাসন, কোন অভিমানে তুমি আমাকে , মাকে ছেড়ে এই জীবন ধারন করেছো ? ইরাবতী আসে না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। পাতিল উপছে পড়ছে পানি। ঘর ভেসে যাচ্ছে। রাকিব সাহেব সুইস টিপলো আলো বাতি জ্বালানোর জন্য । বিদ্যুৎ নেই। আবছা অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে রাকিব সাহেব পানি ভরা পাত্রে দিকে যাচ্ছে। বাইরে শনশন বাতাস, বাতাসে জানালা খুলে গেছে, সেই জানালা দিয়ে হুহু করে বাতাস আসছে ঘরের ভেতর। আজকের রাত কিভাবে কাটবে এই ভেবে সে শঙ্কিত। পানি ভরা পাত্র ধরে সে সাবধানে নিয়ে আসছে। বাইরে অপারাজিতা গাছের লতা নিচে পড়ে গেছে। সেই দিকে জানালা দিয়ে রাকিব সাহেবের চোখ গেলো , আর তক্ষুনি বিপত্তিটা ঘটলো। পা পিছলে সে পড়ে গেলো। একবার উঠার চেষ্টা করলো । পারলো না। মাজার নিচ থেকে অবস হয়ে গেছে। মাথার পিছনে প্রচন্ড ব্যাথা। রাকিব সাহেব হাত দিয়ে দেখলো , রক্ত। ঘরের ভেতরের পানি বাড়ছে। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রক্ত। রাকিব সাহেব মাথা উচু করা চেষ্টা করছে। পারছে। শরীরে এক বিন্দু শক্তি নেই। তাহলে কি সলিল সমাধি?
একা এবং একা?

ঘরের ভেতর এক হাটু পানি। একটা মোমের আলো রাকিব সাহেবের মুখের উপর। কে যেনো এক হাত দিয়ে রাকিব সাহেবের মাথা উচু করে ধরে আছে, আরেক হাত দিয়ে মোম ধরেছে। রাকিব সাহেব চোখ মেলে দেখলো, একটা দীঘল চোখের শ্যামলা মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার চোখে জলে টয়টম্বুর। রাকিব সাহেব বললেন, মাগো তুমি কে !? মেয়েটা বললো, বাপজান, আমি ইরাবতী।
রাকিব সাহেব বললেন, তুমি কি জানতে চাও কেনো তোমার নাম আমি ইরাবতী রেখেছি ?
মেয়েটা মাথা ঝাকালো। আর তক্ষুনি এক ফোটা চোখের জল রাকিব সাহেবের মুখের উপর পড়লো।

তুমি যাতে ইরাবতী নদীর মতো তীব্র স্রোতা হও। জীবনের ঠুনকো দুঃখ, কষ্ট তুমি যাতে অবলিলায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারো তোমার রুদ্র স্রোতে।

ইরাবতী চোখ মুছলো। রাকিব সাহেব দেখলো, ইরাবতী চোখে কাজল পড়েছে। সারা মুখে কাজল লেপ্টে গেছে।

মন্তব্য ১০ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:৩৭

খায়রুল আহসান বলেছেন: যথার্থ শিরোনামে একটি মনছোঁয়া গল্প পড়লাম। গল্পে প্রথম ভাললাগাটি রেখে গেলাম। + +

১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:৪০

মাধুকরী মৃণ্ময় বলেছেন: ধন্যবাদ।

২| ১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:৫৫

কামাল১৮ বলেছেন: নিম্ন বিত্তের এই ফুটো কি কোন দিন বন্ধ হবে না।কতো কাল আর হাড়ি পাতিল দিয়ে এই পানি ধরে রাখবে।তার থেকে নুহের প্লাবনের মতো প্লাবন হয়ে সব একাকার করে দিক।কবে আসবে সেই প্লাবন,আরো কতোয়াল অপেক্ষা করতে হবে।

১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:৪১

মাধুকরী মৃণ্ময় বলেছেন: খুব ভালো বলেছেন। অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হবে?

৩| ১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:০২

চাঁদগাজী বলেছেন:



ভালো, আমাদের জীবনের কাছাকাছি

১০ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:৪২

মাধুকরী মৃণ্ময় বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। হ্যা।

৪| ১০ ই জুন, ২০২১ রাত ১০:২৬

রাজীব নুর বলেছেন: সহজ সরল ভাষায় খুব সুন্দর লিখেছেন।
এটা কি রিপোষ্ট? কেন জানি মনে হচ্ছে এটা আগে একবার পড়েছি।

১০ ই জুন, ২০২১ রাত ১১:১১

মাধুকরী মৃণ্ময় বলেছেন: না। আজ সন্ধ্যায় লিখলাম

৫| ১১ ই জুন, ২০২১ রাত ২:২১

বিবাগী শাকিল বলেছেন: ভালো হয়েছে।

৬| ১১ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:৩০

আহমেদ জী এস বলেছেন: মাধুকরী মৃণ্ময়,





টিনের চালের ছিদ্রের মতো লেখার ছিদ্র দিয়েও এক নির্বাসিতের চোখে ক'ফোটা ইরাবতীর জল টুপটাপ করে ঝরিয়ে গেলেন।
দারুন লেখা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.