নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ আমার লেখার ও সাহসের ভিত্তি। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলাই সত্যিকারের দেশপ্রেম মনে করি। সত্যম ব্রুয়ৎ!

মনোয়ার রুবেল

ফ্রিল্যান্স লেখক ও প্রাবন্ধিক

মনোয়ার রুবেল › বিস্তারিত পোস্টঃ

জেনেভা । বার্ণার্ড ‘শ । অনুবাদ

১৯ শে জুন, ২০২২ রাত ৯:৫২




দৃশ্য- ১
মে মাসের এক সকাল। জেনেভা।

পুরাতন সেকেন্ড হ্যান্ড ফার্নিচারে সজ্জিত অফিস। যতটুকু খারাপ হলে খারাপ বলা যায়, এটি তার চেয়েও জঘন্য। একটি ছোট টেবিল রাখা হয়েছে রুমের ঠিক মাঝখানটায়। তার উপরে একটি পুরোনো টাইপ রাইটার। টেবিলের পাশে টাইপিস্টের বসার জন্য একটি রিভলবিং চেয়ার আছে। একটি পুরনো ছাপা মেশিন দেখা যাচ্ছে যেটা বহুবছর রং করা বা ধোয়া মোছা হয়নি।

এছাড়া পুরো কক্ষে ফার্ণিচার বলতে অতিথিদের জন্য দেয়ালের বিপরীতে তিনটি চেয়ার রয়েছে। টাইপিস্টের ডান পাশে একটি চুল্লী রয়েছে। ছাপা মেশিনটি টাইিপস্টের মুখ বরাবর সোজা বিপরীতে কিছুটা বাম পাশে এবং দরজার সাথে লাগোয়া। টাইপিস্টের পেছনে একটি জানালা রয়েছে।

এক ইংরেজী তরুনী টাইপিস্টের চেয়ারে বসে আছেন। টেবিল বরাবর তাকালে মনে হচ্ছে তিনি টেবিলে ছড়িয়ে থাকা কিছু ইনডেক্স কার্ড গুছাচ্ছেন। একটি কেসে সেগুলো ঢুকানোর চেষ্টা করছেন । ফুলস্কেপ কাগজের একটি স্তুপও দেখা যাচ্ছে, যেগুলো থেকে কিছুক্ষন আগে কার্ডের বৃত্তান্ত টুকে রাখছিলেন। কিন্তু কিন্তু এখন তিনি কাজ করছেন না। সিগারেট টানছেন। টেবিলে উপর পা তুলে দিয়ে একটি ছবিওয়ালা ম্যাগাজিন পড়ছেন।

টেবিলের বেরিয়ে আসা ড্রয়ারে কী আছে আমরা দেখে নিতে পারি। একটি থার্মোফ্লাস্ক, একটি কাপ, সসার এবং সিগারেটের একটি প্যাকেট ড্রয়ারে উঁকি দিচ্ছে।
এই ভদ্র মহিলাকে দেখে মনে হচ্ছে ইনি একজন আত্মতৃপ্ত তরুণী, নিঃসন্দেহে আকর্ষনীয় এবং রুপের বিষয়ে তিনি পুর্ন সচেতন। তার গায়ের জামা সুনিপুনভবে কাটা হয়েছে। সম্ভবত কারখানায় রেডিমেড তৈরি। চালচলন ও কথাবার্তায় লন্ডনের শহরতলির মানুষদের মতো টান রয়েছে ।

কেউ একজন দরজায় টোকা দিলো।

তরুণী তাড়াহুড়ো করে পা নামিয়ে রাখতে গিয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। ঠোঁটের সিগারেট স্টোভের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হেলানো তাকের জিনিসপত্র গোছগাছ করলেন। ছোঁ মেরে সব ছাপা মেশিনের নিচে লুকিয়ে ফেললেন। সবশেষে, চেয়ারে বসে যতটা সম্ভব ব্যস্ততার ভান করা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব; তিনি তা করলেন।

টাইপিস্ট (ডাকছে)ঃ ইন্ট্রে সি’ল ভোয়াস প্লেইট।

একজন অভিজাত দর্শন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক কক্ষে ঢুকলেন। তার মুখে বাদামী দাড়ি, বাদামী গোঁফ, মাথায় লম্বা টুপি, লম্বা আলখাল্লা পরা এবং তার হাতে গ্লাভস পরা। তিনি ঢুকে তীক্ষ্ণভাবে পুরো ঘর ও তরুণীকে দেখলেন। সুস্পষ্টভাবে তিনি অবাক হলেন ।

”ক্ষমা করবেন ম্যাডাম। আমি আন্তার্জাতিক বুদ্ধিজীবী সমন্বয় পরিষদ এর অফিসটি খুঁজছিলাম।”

তরুণী: হ্যাঁ, আপনি ঠিক জায়গায় এসেছেন। বসুন, স্যার।

“ধন্যবাদ।”

ভদ্রলোককে বসতে বলায় তিনি খুশী নন, বরং কিছুটা বিব্রত মনে হচ্ছে।

“আমি বলছিলাম, আমার কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ন। আমি আপনাদের প্রধানের সাথে দেখা করতে চাই। কিন্তু এটা আপনাদের হেড অফিস বলে মনে হচ্ছে না। এটা কি আপনাদের হেড অফিস?”

তরুণী: না স্যার। আমাদের হেড অফিস প্যারিসে। তবে ওখানকার সব সেবাই আপনি এখানে পাবেন। এই যুগে স্থান কোন ব্যাপার নয়, কী বলেন স্যার?

- ভালো বলেছেন। আমাকে একটা কথা অবশ্যই বলতে হবে, ইন্টারন্যাশনাল লেবার অফিস এর চমৎকার ভবন এবং সচিবালয়ের নতুন ভবন দেখে আসার পর আমি আশা করেছিলাম বুদ্ধিজীবী সমন্বয় পরিষদ কোন জমকালো স্থাপত্য কাঠামোর উপর অবস্থিত হবে।

- ওহ! যদি আপনি এসব পত্রিকায় লিখতেন, কি লজ্জার ব্যাপার হতো। বসুন না..প্লিজ..

- ধন্যবাদ।

(বলতে বলতে ভদ্রলোক দেয়ালের পাশ থেকে একটি চেয়ার টেনে নিলেন)

- না, না, ওটা না। ওটার একটা পা ভাঙা! এটা বিপদজ্জনক। এটা শুধু প্রদর্শনী হিসেবে রাখা হয়েছে। যদি কিছু না মনে করেন আপনি অন্য একটি চেয়ার টেনে নিন ।

- আপনাদের পরিষদ একটি নতুন চেয়ারও জোগাড় করতে পারেনা !

- এটা কিছুই জোগাড় করতে পারেনা। সত্যি বলতে, এটার বাজেট প্রায় দুই মিলিয়ন ফ্রান্ক এর মতো। কিন্তু তিন পয়সাও খরচ করতে রাজী না। পারলে সেখানে দুই পয়সা দিয়ে বাঁচে। এসব কারণে ভাঙা পুরোনো একটি বিল্ডিংয়ের তিন তলায় ইদুরে ভর্তি পঁচা এই কক্ষে আমাকে বসতে হয়েছে। আর, আমার বেতন এত সামান্য, সেটা নিজেও লজ্জা পায়, আমার হাতে উঠে।

ভদ্রলোক: আমি আসলেই আশ্চর্য হচ্ছি!

[ তিনি দেয়ালের পাশ থেকে ভাল দেখে একটি চেয়ার টেনে নিলেন। টেবিলের পাশে নিয়ে তাতে বসলেন ]।

- ষাট জাতির বুদ্ধিজীবী সমন্বয় পরিষদ অবশ্যই খুব বড় পরিসরে কাজ করার কথা। এত ছোট একটি জায়গায় এসব কাজ পরিচালনা করছে, কিভাবে সম্ভব ?
তরুনী: ওহ, আমিই। আমি সব ঠিকঠাক করে নিচ্ছি। এখানে অবশ্যি কোন তাড়াহুড়ো নেই।

ভদ্রলোক: কিন্তু আসলে... ক্ষমা করবেন, আপনার খুব বেশী সময় আমি নষ্ট করছি মনে করেন যদি...

তরুনী: না, না, ঠিক আছে। কেউ একজনের সাথে অন্তত কথা বলতে পারছি এটাতেই আমি শান্তি পাচ্ছি। এখানে কেউ আসেনা। মনে হয় কেউ জানেই না যে এখানে একটা কমিটির অফিস আছে।

ভদ্রলোক: আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনার করার কোন কাজই নাই?

তরুনী: উহু। একেবারেই তা না। আমি আপনাকে কী বলি শোনেন, বুদ্ধিজীবি সমন্বয়- এর সব কাজ আমাকেই করতে হয়। আমাকে একা হাতেই সব করতে হয়। আমার একটি অফিস পিওনও নাই সাহায্য করার জন্য। আর, এখানে কাজের কোন শেষ নাই। আমার কোন তাড়াহুড়ো নেই, এর মানে আমার কখনো তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। সব কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ । আমাকে ধীরে ঠান্ডা মাথায় সব করতে হয়। শুধু এদিকে আমার ছোট চমৎকার কাজটার দিকে তাকান। আমাকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য কোষাধ্যক্ষদের নাম ঠিকানা সম্বলিত একটি কার্ড ইনডেক্স দেয়া হয়েছে। পেশাজীবীদের পদবীর ইজ্জতের দিকে ভালো করে খেয়াল করে করে পত্র লিখতে লিখতেই আমার অর্ধেক সময় চলে যায়।

ভদ্রলোক: তার মানে, ওনারা এই কাজকে বুদ্ধিজীবী সমন্বয় বলছে?

তরুনী: হু। আপনার কী মনে হয়, কী বলতে পারত?

ভদ্রলোক: এটাতো কেবলমাত্র সংকলন। আপনার কমিটির ইন্টেলেকচুয়াল জায়ান্টসরা যারা তাদের প্রকান্ড মগজের গতি শক্তি দিয়ে, তাদের ইজ্জত দিয়ে, তাদের ক্ষমতা দিয়ে জাতিসমূহের ভাগ্য নির্ধারণ করে চলে, তারা আসলে কেমন জানতে চাই। আমাদের মূর্খ রাজনীতিবিদদের ভুলগুলো তারা সংশোধন করতে তারা কী করে?

তরুনী: ভালো কথা মনে করিয়েছেন। তাদের নাম আমাদের নোট বইতে লেখা আছে, এটা আপনি জানেন। এর বেশী তারা আর কী করতে পারে? তারা এই ছোট গর্তে বসে মানুষের সাথে কথা বলবে? এটা আপনি আশা করতে পারেন না। আমিও তাদের কাউকে এখনো স্বচক্ষে দেখিনি!

ভদ্রলোক: তার মানে তারা সব আপনাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে ?

তরুনী: আমি সেটা বলিনি। প্যারিসে আমাদের হেড অফিস আছে, আপনি জানেন। এবং অন্যান্য দেশেও আমাদের কিছু অফিস আছে। আমরা বিশ্বাস, তারাও কিছু কিছু কাজ করছে। যাই হোক, আমরা সবাই একজন আরেকজনের কাছে প্রচুর চিঠি লিখি। কিন্তু আমি বলব, এটা খালের পানির ঘোলা করার মতো বিরক্তিকর। যখন আমি চাকুরীটা পেয়েছিলাম, আমি মনে করেছিলাম, এটা মজার। আমি সব গ্রেট মানুষদের দেখতে পাব। আমি সুখ-স্বপ্ন দেখছিলাম। আপনি হয়তো জানতে পারেন, আমি লন্ডন কাউন্টি কাউন্সিল এর বৃত্তি পেয়েছিলাম। হয়তো বুঝতে পেরেছেন, আমি আমার বিষয়ের বাইরে একটি চাকুরী খুজছিলাম। কিন্তু একজন সাধারণ টাইপিস্ট করতে পারেনা, এমন কোন কাজ এখানে নেই। কেউ এই জায়গার আশে পাশেও কখনো আসে না। খুবই বিরক্তিকর।

ভদ্রলোক: আমি কি আপনাকে একটি মজার চাকুরী দিতে পারি, ম্যাডাম? এমন একটা চাকুরী যেটা আপনাকে কিছু আনন্দ দিবে, আবার মানুষের সাথেও টুকটাক কথা বলতে পারবেন।

তরুনী: যদি হয় তো আমি এক পায়ে খাড়া, সব যদি ঠিকঠাক থাকে।

ভদ্রলোক: ঠিকঠাক বলতে কতটুকু ঠিকঠাক?

তরুনী: নীতিগতভাবে, আপনি জানেন, কোন হাংকিপাংকি মেয়ে না। আমি সম্মানিত মানুষ; আমি বোঝাতে চাচ্ছি আমি সম্মানের সাথে বাঁচতে চাই।
ভদ্রলোক: আমি আপনাকে কথা দিয়েছি, আমার নিয়ত সম্পূর্ন সম্মানজনক।

তরুনী: তাহলে তো ভালো! কত টাকা দেবে সেখানে? এবং চাকুরী স্থায়িত্ব কতদিন হবে? যদিও এখানে কাজ খুবই নিরানন্দের, এখানকার সম্মানি শুধু মাত্র ক্ষুধা নিবারনের জন্য। কিন্ত আমি এখানে সুনির্দিষ্টভাবে ২৫ বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছি ।

ভদ্রলোক: আমি আপনাকে বলব না আপনি এখানকার পদটি ছেড়ে দেন। উল্টোভাবে বললে, এই চাকুরীটিই টিকিয়ে রাখা আপনার জন্য জরুরী। আমি বলছি, আমি আপনার এই চাকুরীটাকে আরো মজার করে দিতে পারি। আপনি এখানে আপনার বেতন যদি যথেষ্ট মনে না হয় অবশ্যই আপনাকে ন্যায্য কিছু উপহার দেয়া আমার উচিত।

তরুনী: হু। আপনি বোধহয় জেনে থাকবেন, আমি ঘুষ নেই না।

ভদ্রলোক: আপনার সেটা করার দরকার নেই। যে কোন বন্ধুত্বপুর্ন দান প্রতিদান হোক না কেন আপনার কাজ করার স্বাধীনতা সম্পূর্নই আপনার থাকবে।
তরুনী: আমি অর্ধেক কথা পছন্দ করি না। খুলে বলেন।তরুনী কিছুটা কঠোর গলায় বললেন।

[চলবে]

[[ জর্জ বার্ণার্ড শ আমার অন্যতম প্রিয় লেখক। তার রাজনৈতিক স্যাটায়ার অনবদ্য হয়। জেনেভা তার একটি নাটক। অসাধারণ কথপোকথনে ভরা৷ আজও এই নাটক সমভাবে প্রযোজ্য। [অনুবাদ করার জ্ঞান আমার নাই৷ যা পড়ে বুঝেছি, তা সরল ভাবে লিখে গেসি। মন্তব্য আশা করছি। আপনাদের ভালো লাগলে, এই প্রজেক্ট নিয়ে এগুবো।

অনুবাদের পরে পর্বগুলো আমার ফেসবুকে পেজে পাবেন, লাইক দিয়ে পাশে থাকলে প্রীত হবো

- মনোয়ার রুবেল]

ফেসবুক পেজ লিংক: মনোয়ার রুবেলের লেখা

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে জুন, ২০২২ রাত ১০:৩৬

ভার্চুয়াল তাসনিম বলেছেন: ভালো লেখা।

২| ১৯ শে জুন, ২০২২ রাত ১১:৩৭

নূর মোহাম্মদ নূরু বলেছেন:
আমার ভালো লেগেছে।
কোন জড়তা নাই লেখায়।
পরের পবে'র আপক্ষায়
থাকবো।

৩| ২০ শে জুন, ২০২২ রাত ১:৩৬

রাজীব নুর বলেছেন: সহজ সরল সুন্দর অনুবাদ করেছেন।

৪| ২০ শে জুন, ২০২২ সকাল ১০:০৪

সৈয়দ মশিউর রহমান বলেছেন: দারুণ হয়েছে।

৫| ২০ শে জুন, ২০২২ সকাল ১০:৪৯

মনোয়ার রুবেল বলেছেন: এই প্রজেক্ট এগুনো যায়?

৬| ২০ শে জুন, ২০২২ সকাল ১১:০৪

আহমেদ জী এস বলেছেন: মনোয়ার রুবেল,




আনুবাদ সাবলীল । ভালো হচ্ছে । এগিয়ে যান ...................

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.