![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।
উপান্ত - "ক"
পাঁচ.
কদিন থেকেই রুবাইয়াকে একটু অন্যরকম লাগছে রোকসানার। সারাক্ষণ পড়ার টেবিলে বসে কিছু একটা লেখা লেখি করে। মায়ের পায়ের আওয়াজ পেলেই তাড়াতাড়ি বই টেনে পড়তে বসে যায়। আসলেই কিছু লেখা লেখি করছে- নাকি শুধুই তার মনের ভুল বুঝতে পারছে না রোকসানা। মেয়ে গোসল করতে বাথরুমে গেলে ওর পড়ার টেবিলে এসে বইপত্র নেড়ে দেখেছে। কিছু পায়নি। এ বয়সে বাহির থেকে দু একটা চিঠি পত্র আসাটা স্বাভাবিক। সে রকম কিছু নেই বই খাতার মাঝে।
মেয়ে বড় হচ্ছে। ভাইয়ের সাথেই ঘুমায়। রোকসানার উচিত নিজের ঘরে এনে ঘুমাতে বলা মেয়েকে। রাতে ঘুমানোর আগে অনেক কথাই থাকে মেয়েরা মাকে বলতে চায়- বলা হয় না দুই ঘরের দূরত্বের কারণে। এক সাথে ঘুমানোটাও মাঝে মাঝে জড়তা কাটিয়ে দেয় মা-মেয়েতে। কারণ রোকসানা একাই অনেকটা বাবা হয়ে গেছে তিন জনের সংসারে। মা’টাকে চট করে খুঁজে বের করতে অনেক সময় লাগে ছেলে মেয়ে দুটোর।
এমনিতেই দুদিন হল বিকেল দিকে রোকসানাদের ছোট একতলা বাসাটার সামনের রাস্তার ওপাশের হাউজিং’এর দেয়ালটায় কয়েকটা ছেলে এসে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। মুখে সবে মাত্র ফিন ফিনে গোঁফ গজিয়েছে, এর মাঝেই বিড়ি সিগারেট খাওয়া শিখে গেছে। দেয়ালটায় বসে বিড়ি টানতে টানতে রোকসানাদের বাসাটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
রুবাইয়াকে স্কুলে যাওয়া ছাড়া এখন বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করেছে কিছুদিনের জন্য রোকসানা। বারান্দায় গেলে ছেলেগুলো আসতেই থাকবে। বের না হলে দু চার দিন ঘুর ঘুর করে চলে যাবে। তাছাড়া পথে ঘাটে যাতে বিরক্ত করতে না পারে- নিজের সাথেই মেয়েকে স্কুলে আনা নেয়া করে রোকসানা। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে নূরী ভাবীর স্বামী মোস্তাক ভাইকে বলে রেখেছে বিষয়টা। লোকটা চালের আড়তে ব্যবসা করে শেয়ারে। এলাকায় চেনা জানা খুব। চেয়ারম্যান সাহেবের ভাইপো। এজন্য ছেলে ছোকরারাও তেয়াজ করে চলে। সব শুনে উনি কেবল বলেছে, “ভাবী, আপনার মেয়ে মানে আমারও মেয়ে। এইসব ছাওয়াল পাওয়া নিয়া একদম ভাববেন না। মেয়েরে কয়দিন একটু কম বাইর হইতে বলবেন। বাকিটা আমি দেখমু। ঐগুলা যাতে আর না আসে সেই ব্যবস্থা করতেছি।”
রোকসানার তবুও খুঁত খুঁত লাগে সারাক্ষণ। গতকাল সন্ধ্যায় রুমী বাহির থেকে খেলে আসার সময় হাতে অনেকগুলো বার্মিজ আচারের প্যাকেট নিয়ে এসেছে। কে দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে শুধু বাহিরের দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বলে কোন ভাইয়া জানি দিয়েছে তাকে। রোকসানা ছেলেকে মারতে গিয়েও থেমে গেছে এবারে। কেবল ঠাণ্ডা গলায় বলেছে, “আচারগুলো যেখান থেকে এনেছিস- সেখানে দিয়ে আয়।”
রুমী গিয়ে আচারগুলো ফেরত দিয়ে এসেছে। মুখ কালো করে রেখেছে তখন থেকে। রোকসানা ছেলেকে ডেকে বলে দিয়েছে এর পর থেকে এরকম বাহির থেকে কেউ খাবার দিলে যদি নেয়- বাসায় ঢুকতে দেবে না ছেলেকে। ছেলেটা এরকম ফকির স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে কেন বুঝতে পারছে না রোকসানা। নাকি তার শিক্ষা দেয়াটাতেই বড় রকমের ত্রুটি রয়ে গেছে?
একা একা সন্তান মানুষ করলে বোধ হয় অপূর্ণতা বাঞ্ছনীয়। চাইলেও উপেক্ষা করা সম্ভব না। বাবার শাসনে অভিমানী সন্তানের মান ভাঙ্গাতে হয় মাকে। কিন্তু দুই অবস্থানেই যখন এক জনকে দাঁড়াতে হয়- তখন রূঢ় ভাবটাই প্রাধান্য পায় সব সময়। কোমলতাটুকু আড়ালেই থেকে যায়। প্রকাশ পেলেও খুব দুর্বোধ্য ঠেকে সন্তানের কাছে। কারণ একই মানুষের বৈপরিত্যে অভ্যস্থ নয় সন্তানেরা। অন্তত একটা বয়সের আগ পর্যন্ত তো অবশ্যই।
রুমীর শিশু সুলভ ভুলগুলোকে নিয়ে ব্যস্ত হতে পারছে না সে। রুবাইয়ার নিঃশব্দতার জন্য। নিঃশব্দতায় বড় গুপ্ত ক্ষত। প্রকাশ পেলে আর সবটা ছাপিয়ে যায়। রোকসানার ভয়টা সেখানেই। বদলাতে থাকা শরীরের চেয়ে বদলাতে থাকা মনটা থাকে খুব বিক্ষিপ্ত আর অসহায় অবস্থায়। এসময়ে মনের চারপাশে খুব দূর্জনের আনাগোনাও বুঝে উঠতে দেরি হয়ে যায় অনেক। রোকসানা সে ভয়টায় আক্রান্ত। নীরব ত্রোয়দশী কন্যা বড় খেয়ালী আর চাপা স্বভাবের হয়। পদস্খলনের বয়সের শুরু এটাই।
“কি ব্যাপার ম্যাডাম? কদিন ধরেই দেখছি সারাক্ষণ কিসের চিন্তায় যেন ডুবে আছেন? কোন সমস্যা নাকি?”
চমকে তাকালো কোনার টেবিলে বসে থাকা আসাদ সাহেবের দিকে। টিফিন শেষের ঘন্টা পরে গেছে। শিক্ষক শিক্ষিকারা যে যার ক্লাসে চলে গেছেন। কমন রুমে কেবল আসাদ সাহেব আর রোকসানা। ভদ্রলোক পত্রিকা পড়তে পড়তে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন।
“নাহ। কিছু না।” দায় সারা ভাবে মাথা নাড়ল রোকসানা।
“আমার স্ত্রী একটা কথা বলতো বুঝলেন। সে যখন এক্সপেক্ট করছে- সারাক্ষণ বলতো যে তার মেয়ে হবে এবং এই মেয়েকে সে দেখে যেতে পারবে না। তাকে নাকি আমাকেই মানুষ করতে হবে।” প্যাপার থেকে মুখ তুলে হাসলেন, “সে সময়ে আমাকে বলেছিল মেয়ে মানুষ করা বাপের পক্ষে খুব কঠিন। বড় হতে থাকলে দুর্বোধ্য হতে থাকবে মেয়ে বাবার কাছে। চিন্তায় চিন্তায় বয়সের বলি রেখা কপালে ভাল মতই পরে যাবে। কথাটা ঠিকই বলেছিল সে। এক মেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে হারে হারে টের পেয়েছি দুর্বোধ্যতা কি জিনিস। আপনার চেহারাতে আমি মা সুলভ চিন্তার বদলে বাবা সুলভ চিন্তা দেখতে পাচ্ছি। সমস্যাটা কি মেয়েকে নিয়ে?” চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন ভদ্রলোক।
রোকসানার বিরক্ত হওয়া উচিত ছিল আসাদ সাহেবের অহেতুক কৌতূহলে। কিন্তু বিচিত্র কোনো কারণে হল না। বরং হালকা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। অনেকটা সেরকমই। মেয়েটাকে খুব দুর্বোধ্য লাগা শুরু করেছে কদিন যাবত। পাড়ার কিছু ছেলে এসে বাড়ীর সামনে ঘোরা ঘুরি করে। মেয়েকে বের হতে দেই না দেখে কিনা কে জানে- কেমন যেন গুঁটিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। বুঝতে পারছি না কি করবো।”
চায়ের কাপটা পিরিচে নামিয়ে রেখে পেছন দিকে হেলান দিলেন আসাদ সাহেব, “হুম। সমস্যাটা অনেক ক্ষেত্রেই এভোয়েড করা যায় না। আমার মেয়ের বেলাতেও তেমন একটা পারিনি। তবে একটা ব্যাপার কি জানেন? আমার কেন যেন মনে হয় মেয়ে হয়ে ওঠার বিষয়টা খুব কঠিন একটা নিয়মের নিচে চলে আসছে আমাদের সমাজে। মেয়েকে এখন এক রকম বাধ্য করা হচ্ছে ঘরে বসে থাকতে- তাতে ওর জগতটা ছোট করে দেয়ার পাশাপাশি তাকে এটা বোঝানো হচ্ছে যে সে ‘মেয়ে’ হয়ে জন্মেছে। সন্তান মানুষ হিসেবেই জন্ম নেয়। ছেলে মেয়েতে ভাগ করে দেয়া হয় এই বয়সে এসে। সমস্যা হচ্ছে এই বুঝিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা যে কারণ থেকে সৃষ্ট- সেটার চেয়েও বড় সমস্যা সৃষ্টি করে ফেলে পরে। অহেতুক শাস্তিতে যে ব্যাপারটা রয়েছে- মেয়ে হয়ে ওঠার ব্যাপারটাতেও ঠিক একই রকম স্বাদ। অনেকটা ম্যালেরিয়ার মত, ম্যালেরিয়া তো সারলো- ক্যুইনাইন সারাবে কে? আর এ বছর ও বছর ঘুরে ম্যালেরিয়া আবার আসবে- তাড়ানো সম্ভব না।”
রোকসানা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সামনে বসে থাকা মানুষটার দিকে, “তাহলে কি করতে বলছেন?”
“কিছুই না। যা বলেছেন সেটাও না হয় বললেন না। খাঁচা বানালে বাহিরের মানুষের অসুবিধা হয় না; বরং সুবিধা হয় এবং চোখে আসে বেশি। আর খাঁচার মানুষটা তখন নিজের অসহায়ত্ব আবিষ্কার করা শুরু করে সীমিত পরিসরে। দরকারটা কি? রাস্তা ঘাটে কেউ পিছু নিয়েছে বলে জগৎ থেমে যায় না। ঘরে জগৎ থামিয়ে দেয়া তাই যুক্তি সঙ্গত না। তাকে তার সামর্থগুলো সম্পর্কে বোঝার সুযোগ দিন। দেখবেন এক সময় সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে।”
রোকসানার ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের একটা হাসি ফুটেই মিলিয়ে গেল, “আর ছেলে ছোকরাগুলো? তারাও বদলে যাবে?”
“হুম। কঠিন প্রশ্ন।” চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন আসাদ সাহেব, “ছেলে গুলোও আসলে একটা খাঁচায় বড় হচ্ছে বুঝলেন। সবার থেকে আলাদা হয়ে আছে, পরিবার থেকেও। যদি ওদের পরিবার থেকেও ঠিক উল্টো ভাবে কিছু সীমাবদ্ধতা আর প্রয়োজনীয় শাসন বারণ থাকতো- সমাজটাই বদলে যেত।”
রোকসানা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বই হাতে উঠে দাঁড়ালো। দার্শনিক কথা বার্তা এই বয়সে এসে শুনতে ভাল লাগে না। কার্যকরী কথা হলে শোনা যায়। যার মেয়ে এখন বেকার জামাইয়ের সংসারে পিষ্ট হচ্ছে- তার জীবন ভর উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান শুনে লাভ নেই। ব্যর্থ মানুষের কাছ থেকে শিক্ষার কিছু থাকে না। তারা সহানুভূতি জানাতে পারে সর্বোচ্চ, নয়তো বুলি ঝাড়ে।
ছয়.
চিঠিটা হাতে নিয়ে মূর্তির মত বিছানায় বসে রয়েছে রোকসানা। বাহিরে মাগরীবের আযান ছাড়া ছাড়া ভাবে শোনা যাচ্ছে। বৃষ্টি হচ্ছে দুপুর থেকেই। মুশল ধারে বৃষ্টি। ছেলেটার জ্বল এসেছে প্রচণ্ড। ঘরে থার্মোমিটার নেই দেখে বোঝা যাচ্ছে না জ্বর কত। কেবল থেকে থেকে কাঁপছে কাঁথা জড়িয়ে। মাথায় পানি ঢেলেছে বিকেল পর্যন্ত। জ্বর কমার নাম নেই। বৃষ্টি ধরে এলে কাছাকাছি ফার্মেসিটাতে নিয়ে যতে হবে। ডাক্তার আছে কিনা কে জানে।
বিছানার সামনে মেঝেতে বসে রয়েছে রুবাইয়া। মুখ নিচু করে রেখেছে। ছাড়া চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে। কিন্তু মেঝেতে টপ টপ করে যে পানি পড়ছে দেখা যায়।
রোকসানা হাতের কাগজটার দিকে আরেকবার তাকাল। শওকত নামের কাউকে চিঠি লিখছিল রুবাইয়া। শেষ করেনি পুরোটা। টেবিলের কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। আজকে টেবিলের কভার বদলাতে এসে চিঠিটা পেয়েছে রোকসানা। চিঠি পেয়ে কোনো কথা বলেনি। মেয়েকে খানিক আগে ডেকে থমথমে গলায় শুধু জিজ্ঞেস করেছে, “শওকত ছেলেটা কে?”
রুবাইয়ার মুখ সাথে সাথে ছাই বর্ণ হয়ে গেল। কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করল, “আ-আমাদের দুই ক্লাস উপরে পড়ে মা....”
আর কিছু বলতে পারেনি। রোকসানা রুমীর সামনেই প্রচণ্ড জোরে চড় মেরেছে মেয়েকে। চড় খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেছে রুবাইয়া। এখনও সেখানেই বসে আছে মুখ ঝুঁকিয়ে, ওঠেনি।
রোকসানা অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছে কিছু কঠিন কথা মনে মনে গুছিয়ে নেয়ার। মেয়েকে বলা প্রয়োজন। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অসহায় লাগছে খুব। ঘরটা অপরিচিত মনে হচ্ছে। মানুষগুলোও। বিচিত্র একটা অপমান আর লজ্জায় রোকসানার ইচ্ছে করছে বৃষ্টির মাঝে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে কোথাও চলে যেতে। শুদ্ধ শাসনের ফাঁক গলে যখন সন্তানেরা অশুদ্ধ কিছু করে বসে- বড় লজ্জার সেই মুহূর্তটা। একটা চড় দিয়ে নিজের ভুল শাসনের ক্লেশটুকু ঝেড়ে ফেলার মাঝে নিজের অক্ষমতা আর অসামর্থের দিকটাই প্রকাশ পায়।
মেয়েটা এখনও মুখ ঝুঁকিয়ে বসে রয়েছে মায়ের পায়ের কাছে। ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝড়ছে চোখ থেকে- সেটার হালকা ছিটে এসে পরছে রোকসানার পায়ের আঙুলে। কারেন্ট চলে গেছে। মোম জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু খোলা জানালা দিয়ে আসতে থাকা বৃষ্টির ঝাপটায় মোমের শিখা নাচছে পাগলের মত। বৃষ্টির ফোঁটা উড়িয়ে নিয়ে আসছে ভেতরের দিকে।
মোমের আলোয় মেয়ের দিকে এক নজর তাকালো সে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, তবে ওপরের ঠোঁটটা ফুলে উঠেছে ভীষন ভাবে। হাতের কাগজটা মুঠো করে উঠে দাঁড়ালো রোকসানা ক্লান্ত ভঙ্গিতে। জানালা দিয়ে পানি আসছে। ছেলেটা এমনিতেই জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারছে না। জানালাটা বন্ধ করার জন্য এগিয়ে গেল। ডাল পালা মেলে থাকা বেলি ফুলের গাছটা প্রচণ্ড বাতাসে দুলছে বিশাল একটা জীবন্ত প্রাণির মত। বাতাসের ঝাপটায় শত শত সাদাটে ফুল উড়িয়ে এনে ফেলছে ঘরের ভেতর। যেন তুষারপাত শুরু হয়েছে বাহিরে। বজ্রপাতের ছাড়া ছাড়া আলোতে দেখা যাচ্ছে উঠান জুড়ে চাদর পেতে দিয়েছে বেলি ফুলের গাছটা। বাতাসের মাঝে মিষ্টি একটা গন্ধ। জানালার গ্রিল ধরে কপাটগুলো টানতে গিয়ে থেমে গেল রোকসানা।
সামনের রাস্তায় জারুল গাছটার নিচে রিক্সা সাইকেল মেরামতের ছোট ঝুপড়িটার সামনে হারিকেনের আলোয় ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আসাদ সাহেব। সাইকেলের চাকা বসে গেছে সম্ভবত। দোকানের লোক পাম্পার দিয়ে সাইকেলের চাকায় পাম দিচ্ছে। তিনি খুঁটি থেকে ঝুলিয়ে রাখা হারিকেনটার কাছাকাছি ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে এক হাতে একটা কাগজের প্যাকেট থেকে জিলাপি বের করে খুব শখ করে খাচ্ছেন। দোকানী ছোট ছেলেটার হাতেও দিলেন একটা। খেতে খেতে কথা বলছেন আর বৃষ্টি দেখছেন।
রোকসানা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে লোকটার দিকে। ঝড়ের টানে বেলি ফুলের ছোট ছোট তুষার কণা যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ছোট ঝুপড়িটাতেও। ভদ্রলোক গভীর বিস্ময়ে হাত পেতে ধরার চেষ্টা করছেন সেই ফুল। থেকে থেকে চমকে ওঠা বিদ্যুতের সাদাটে আলোয় খুব সহজ সরল একটা শিশুর মত দেখাচ্ছে মানুষটাকে।
রোকসানা ক্ষণিকের জন্য জানালা বন্ধ করার কথা বুলে গিয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আসাদ সাহেবের দিকে। ঠিক ইকবালের মত নয়, আরেকটা অন্যরকম যেন মানুষটা। আলাদা। মন্ত্রমুগ্ধের মত মুক্ত মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। মাসে মাসে মেয়ের বাড়ীতে টাকা পাঠানো ছাড়া যে মানুষটার আর কোনো পিছু টান নেই। কাউকে নিয়ে নতুন করে ভাবার কিছু নেই। ইচ্ছে হলেই বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে জিলাপি নিয়ে খেতে পারে।
প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়তেই সম্বিত ফিরে পেল রোকসানা। জোর করে চোখ ফিরিয়ে নিল আসাদ সাহেবের ওপর থেকে। জানালার কপাট লাগাতে লাগাতেও নিজের অজান্তেই চেয়ে দেখল- লোকটা তখনো অবাক চোখে বৃষ্টি দেখছে জিলাপি খেতে খেতে। ডান চোখটা খোলা না বন্ধ এত দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
রাত দুটোর মত বাজে। রুবাইয়া ঘুমিয়ে গেছে। একটু আগে ছেলের জ্বর দেখে এসেছে থার্মোমিটারে। নূরী ভাবীর কাছ থেকে চেয়ে এনেছিল ওটা সন্ধ্যায়। জ্বর নেমে গেছে আপাতত। নিরানব্বইয়ের ঘরে পারদের দাগ।
কারেন্ট আসেনি এখনও। বাহিরে ঝড় আরো বেড়েছে। নিজের ঘরে অন্ধকারের মাঝে রোকসানা জেগে রয়েছে। ইকবালের কাপড় চোপড়ের ট্রাঙ্কটা আজ বহুদিন পর খুলে চুপচাপ বসে রয়েছে ওটার সামনে। বোধসক্তিহীন মানুশের মত ন্যাপথলিনের গন্ধে ভরা কাপড়্গুলো নেড়ে চেড়ে দেখছে অনেকক্ষণ হল। ভাবলেশহীন মুখে অন্ধকারের মাঝে তাকিয়ে রয়েছে ইকবালের শাদা উলের হাঁফ সোয়েটারটা হাতে নিয়ে। ধীরে ধীরে সোয়েটারটা নিজের গায়ে পরলো রোকসানা যন্ত্রের মত। ইকবালের কাশ্মীরী উলের মাফলারটা নিয়ে গলায় জড়ালো নিঃশব্দে। অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে ওর খুব প্রিয় বেসবল ক্যাপটা টেনে বের করল। ওদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে দিয়েছিল রোকসানা তাকে। সারাক্ষণ মাথায় পরে থাকতো সেটা, শীত-গরম নেই। বারো মাস।
রোকসানা ক্যাপটা কাঁপা হাতে মাথায় বসিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। গুঁটি গুঁটি পায়ে রুবাইয়া আর রুমীর ঘরে এসে দাঁড়ালো। অন্ধকারের মাঝেই হাতড়ে হাতড়ে গিয়ে ছেলে মেয়ে দুটোর শরীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে এলো শান্ত মুখে। ইকবাল ঠিক এরকম মাঝরাতে বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠলে পরে ছেলে মেয়ে দুটোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে আসত রুমের আসার সময়।
অন্ধকারেই আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো রোকসানা। ঘোর লাগা পায়ে জানালার কাছে এসে কপাট খুলে দিয়ে বাহিরের দিকে তাকালো। হাজার হাজার বেলি ফুল উড়ছে বাতাসে.... বড় বড় ফোঁটায় সূঁচের মত বৃষ্টির পানি এসে বিঁধছে ওর গায়ে....
গ্রিলটা খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল রোকসানা। ফিসফিস করে প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বলতে লাগলো, “ইকবাল, এখানে একা বেঁচে থাকাটা অনেক কঠিন..... অনেক কঠিন। তোমার প্রয়োজন আর অভাবে আমি আজও অভ্যস্থ হতে পারিনি। আমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে নতুন একটা সংসারে ঢুকে পরি.... কিন্তু আমার জীবনে তোমার ছাপ এতটা গাঢ় আর স্পষ্ট করে ফেলে দিয়েছো যে এখানে তোমার অভাবে তোমার কাপড়গুলো জড়িয়ে তোমাকে বোঝার চেষ্টা করতে হয় আমাকে..... ইকবাল একা বেঁচে থাকাটা যে কত কঠিন তুমি টের পাও তো? তোমার শখের বেলি ফুল গাছটা থেকে যখন হাজার হাজার বেলি ফুলের তুষার ঝড় শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টির রাতে- তোমার আসতে ইচ্ছে করে না এখানে?.... ইকবাল মানুষের একা হয়ে যাওয়াটায় যে কত বৃষ্টি মিশে আছে- তুমি বুঝতে পারো তো?.....”
বজ্রপাতের খনিক জাগা সাদাটে আলোয় দেখা গেল রোকসানা রোকসানার বন্ধ দু চোখের কিনার বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে নামছে হীরার কণার মত চিকচিকে অশ্রু বিন্দু.....
বৈধব্যের একাকীত্বে দ্বিতীয় সংসারের সময় ফুঁড়াতে থাকা দ্বিধায় বাঁধা নারীর চোখের জলে জগতের সব অপ্রাপ্তি, শূণ্যতা আর পেছনের মানুষের দম আটকানো অভাব মিশে থেকে নোনা স্বাদ সৃষ্টি করে। এই অশ্রু জলের অর্থ কেউ জানে না। বড় দুর্বোধ্য এই চোখের জল।
প্রয়াত স্বামীর সোয়েটার পরে প্রৌঢ়ত্বের দিকে হাটতে থাকা মেয়েটি এখনও গ্রিল খামচে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝড়ের মাঝে, আঁধারের সাথে মিশে। স্থির। বিষণ্ন।
কত কষ্ট যে মিশে আছে সেই দাঁড়িয়ে থাকায়......
(সমাপ্ত)
উৎসর্গঃ
জান্নাতুল ইসলাম বীথি। একজন সাধারণ, গুণহীন মানুষ। যার মধ্যে চারপাশের মানুষগুলোকে অসাধারণ বানিয়ে দেয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে। আপনি ভাল থাকবেন বেগাম। আপনার মত খুব সাধারণ কিছু মানুষের বড় প্রয়োজন এই পৃথিবীতে।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাল থাকবেন।
২| ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:৩০
আজমান আন্দালিব বলেছেন: ভালো লেগেছে। প্লাস।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাল থাকবেন।
৩| ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১১:৩৭
পরিবেশ বন্ধু বলেছেন: অনেক সুন্দর
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাল থাকবেন।
৪| ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১:১৫
ইনকগনিটো বলেছেন: খুব ভালভাবে কিছু বাস্তবতা উঠে এসেছে লেখাটার মাঝে। যেটা ভালো লাগলো সবচেয়ে বেশি।
ভালো থাকবেন।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাল থাকবেন।
৫| ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৩ সকাল ১১:৩৮
অর্ক হাসনাত কুয়েটিয়ান বলেছেন: দুর্দান্ত।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাল থাকবেন।
৬| ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:৪৯
সানজিদা হোসেন বলেছেন: বরাবরের মতই চমৎকার।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাল থাকবেন।
৭| ১২ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১:২২
সপ্নাতুর আহসান বলেছেন: অসাধারণ একটি লেখা, আপনার লেখনী পাঠককে খুব গভীরে নিয়ে যায়, আগ্রহ জাগায়। বুঝতে পারলাম আমার একজন প্রিয় ব্লগার শায়মা আপু কেন আপনার প্রশংসা করে। ক্যারি অন।
১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৩ সন্ধ্যা ৭:৫৪
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাই
৮| ২২ শে জানুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৩:৫৮
ইলুসন বলেছেন: অনেক সুন্দরভাবে আবেগটাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৪:৫৩
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ
৯| ১০ ই এপ্রিল, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬:৩০
রওনক বলেছেন: কঠিন একটা বিষয়ের জীবন্ত প্রতিরূপ। +
১০| ১৬ ই এপ্রিল, ২০১৪ সকাল ১১:০৯
সানজিদা হোসেন বলেছেন: এতদিন ধরে আপনার লেখা পড়ি আর আজ এসে জানতে পারলাম আপনি শারমিন স্যারের ভাই। পৃথীবিটা আসলেই ছোট।
১৬ ই এপ্রিল, ২০১৪ রাত ১০:৩০
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: হা হা হা! সেরকমই তো মনে হচ্ছে!
©somewhere in net ltd.
১|
০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ৯:৫৫
অদ্ভুত_আমি বলেছেন: অনেক সুন্দর হয়েছে ...