নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার চারপাশের মানুষ গুলো অনেক ভাল।

নিথর শ্রাবণ শিহাব

মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।

নিথর শ্রাবণ শিহাব › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাবাকোয়া র‍্যাভ্যুলুশন - খ

০১ লা জুন, ২০১৩ সকাল ৭:৫৭



ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া রিটার্নস 'ক'

ক্যাপ্টেন বাবাকোয়া রিটার্নস 'খ'

বাবাকোয়া রিলোডেড

বাবাকোয়া র‍্যাভ্যুলুশন - ক

বাবাইদের বিল্ডিঙটার সামনের রাস্তায় অন্ধকারের মাঝে একটা কালো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে রয়েছে নিঃশব্দে। লাইট নেভানো, জানালার কাঁচ তোলা। একটু আগে এসে থেমেছে গাড়িটা।

ভেতরে ড্রাইভিং সিটে বসে আছে শুঁকনো মতন, ছুঁচালো মুখো লিকপিকে এক লোক। রঙিন ফুলওয়ালা হাঁফ শার্ট গায়ে। চোখে কালো সানগ্লাস এই অন্ধকারেও। সবুজ একটা ক্যাট ক্যাটে লুঙ্গি পরে আছে। মাথার চুলগুলো তেল দিয়ে খুব সুন্দর করে মাঝখানে সিঁথি করা। নাকের নিচে সিরাজোদ্দৌলার মত সরু পাকানো মোচ। যদিও বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের কথা মনে পরার বদলে ইঁদুরের কথা বেশি মনে পড়ে যায়। কেরামত সুবহান নাম এই লোকের। জেল খাটা ঘাঘু আসামি। ছোট বাচ্চা কাচ্চা অপহরণের মামলায় বহুবার ধরা খেয়েছে।

পাশে বসে ছোট আয়নায় মুখে পাউডার লাগাতে থাকা বিলকিস বানুর দিকে বিরক্ত চোখে তাকালো কেরামত সুবহান, “তোমার আর কতক্ষণ লাগবো? বললাম না হাতে টাইম বড়ই কম। পোলাপান গুলারে গুম করার লাইগা আর ভাল চাঞ্ছ পাইবা না এর থেইক্যা!”

বিলকিস বানু বিষ দৃষ্টিতে তাকালো কেরামত সুবহানের দিকে। মুখে পাউডার ঘষতে ঘষতে বলল, “কিডন্যাপ করতে হলে গেট আপটা নিঁখুত হতে হয় কেরামত ভাই। না হলে লোকে সন্দেহ করবে। এই যে দেখেন আমি যে স্কুল টিচারের মত গেট আপ নিচ্ছি- কেউ সন্দেহ করতে পারবে আমাকে?”

আড় চোখে তাকালো কেরামত। সুন্দর করে চুল আঁচড়ানো, হালকা নীল জমিনে কাজ করা সাড়ি, হাই হিল, শাড়ির সাথে ম্যাচ করে নীল হ্যান্ড ব্যাগ, হাতে ঘড়ি, চোখে কালো ফ্রেমে ভারী লেন্সের চশমা- নাহ্‌, দেখে সত্যিই স্কুলের টিচার মনে হচ্ছে। সন্দেহ করবে না কেউ। পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের স্বল্প বয়স্কা স্কুল শিক্ষিকা মনে করবে সবাই। মনে মনে প্রশংসা না করে পারলো না কেরামত। যাত্রাদল থেকে এই মেয়েকে ধরে এনে ভুল করেনি। অনায়াসে বাচ্চা কিডন্যাপ করে ফেলতে পারে এই মেয়ে। হ্যান্ড ব্যাগে ক্লোরোফর্মে ভেজানো রূমাল রাখা থাকে। দরকার মত কাজে লাগায়। নিঁখুত কাজের হাত।

কেরামত ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাগদা দিল, “তাড়াতাড়ি যাও অন্যরা আসে পড়ার আগে। দবিরের কথা মতে বাড়ীতে গার্ড ছাড়া আর কেউ নাই। কাজ সারার উত্তম সময়।”

বিলকিস বানু আয়নাটা খটাস শব্দে বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দিল। অসহিষ্ণু গলায় বলল, “বাচ্চা তো তিনতা, আমি একা আনব কি করে? তুমি গার্ড সামলাবে। তারপর ওপরে এসে আমার সঙ্গে হাত লাগাবে। ঠিক আছে?”

কেরামত মাথা ঝাঁকালো, “তুমি ভিত্রে গেলেই আমি গার্ডটারে বেহুঁশ কইরা ফালামু। তারপর উপ্রে উইঠা যামু। তুমি বাচ্চাগুলারে সামলাইবা। বেহুঁশ করতে পারবা না সব কয়টারে?”

মাথা ঝাঁকালো বিলকিস। দরজা খুলে নেমে গেল অন্ধকারের মাঝে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেটে যেতে লাগল বাবাইদের বিল্ডিঙটার দিকে। চশমার আড়ালের ছোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য শ্বাপদের মত জ্বলে উঠল.....



গার্ড রুমে বসে থাকা মতি মিয়াঁ জেগে উঠেছে। মশার কামড়ে ঠিক মত ঘুমানো যায় না। খুচরা ঘুম হয় শুধু। জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেল স্বল্প বয়স্কা সুন্দরী এক শাড়ি পরা মেয়ে এগিয়ে আসছে গার্ড রুমের দিকে।

উঠে দাঁড়িয়ে খটাস করে স্যালুট ঠুকলো মতি মিয়াঁ, দাঁত বের করে হাসি দিল, “আপা কোন ফ্ল্যাটে যাইবেন?”

“জাহিদ সাহেবের ফ্ল্যাটে। আমি ওনার বাচ্চার স্কুলের টিচার। একটু দেখা করতে এসেছি।”

“জাহিদ স্যার তো বিয়া বাড়ীতে গেছে।”

“জানি। উনি ফোন দিয়ে বললেন বাসায় নাকি তার বাচ্চারা চলে এসেছে। আমাকে যেতে বললেন। তার আসতে একটু সময় লাগবে। মেয়ে তুলে দেয়ার জন্য আটকে গেছেন। এসে পরবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই।” স্মিত হাসি দিল বিলকিস।

মাথা চুলকালো মতি মিয়াঁ। একে সন্দেহ করা ঠিক হবে না। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাবাই সাহেবদের মাস্টারনী। আটকালে ধমক খেতে হবে।

দাঁত বের করে আবার হাসি দিল মতি মিয়াঁ, “অবশ্যই আপা। আপনি ভিতরে যান। স্যার আসলে আমি বলবো।.... লিফট নষ্ট আপা, সিঁড়ি দিয়া কষ্ট করে যাইতে হবে।”

মিষ্টি করে একটা হাসি দিল বিলকিস। সিঁড়ির দিকে হাটতে লাগলো কোনো রকম তাড়াহুড়ো না করে।

মতি মিয়াঁ লাঠি নিয়ে খুশি মনে বসে পড়ল। “আহা! কত ভালা মানুষ আপাটা! আজকাল তো কেউ হাইসাও কথা বলে না!”



সিঁড়িতে লাইট জ্বালানো নেই বেশ কয়েকটা ফ্লোরে। ভুল করে টর্চ আনেনি বিলকিস বানু। খুব সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। কয়টা ফ্লোর ওপরে উঠেছে হিসাব রাখছে ভাল মত। কোনো রকম ভুল ভাল হওয়া চলবে না। কেরামত সুবহান কঠিন মানুষ।

বাবাইদের ফ্লোরে উঠে দম নিতে লাগল ঘন ঘন। সব অন্ধকার। তবে জাহিদ হাসান সাহেবের ফ্ল্যাটটার দরজার একপাশে দিয়ে ক্ষীণ আলো আসছে। রেলিং ধরে খানিকটা ধতস্থ হয়ে নিল। তারপর বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে তৈরি হল। হ্যান্ড ব্যাগ খুলে ক্লোরোফর্ম দেয়া রুমালটা বের করে বাম হাতে নিল। পা টিপে টিপে অন্ধকারের মাঝে শ্বাপদের মত এগিয়ে যেতে লাগল দরজাটার দিকে।

সবে দরজাটার কাছে এসে কলিং বেলে চাপ দিতে যাবে বলে পা পোষের ওপর পা রেখেছে- সাথে সাথে বিল্ডিং’এর ছাদ ফাটিয়ে ভয়ংকর শব্দে গর্জন করে উঠল বিশাল একটা কুকুর। পা পোষের ওপর ঝিমাচ্ছিল আরাম করে হাবিলদার ভোট্টুর বাবা কুকুরটা। হাই হিল দিয়ে ওর একটা থাবা মাড়িয়ে দিয়েছে অন্ধকারে বিলকিস বানু। আর যায় কোথায়! কোনো রকম কথা বার্তা ছাড়াই ঘোউক করে বিশাল হা করে বিলকিস বানুর পা’টায় কামড় বসিয়ে দিল। বাবাইয়ের মিলিটারি ট্রেনিং পাওয়া ভদ্র কামড় নাম স্বদেশী কামড়! এক কামড়ে বিলকিস বানু চোখে মুখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলো। চিলের মত একটা চিৎকার দিয়ে দড়াম করে ফ্লোরের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। দরজাটা ভেজানো ছিল, ওর ধাক্কা খেয়ে দরজা হা হয়ে খুলে যেতেই আলো এসে পড়ল কুকুর সাহেব আর বিলকিস বানুর ওপর। আতঙ্কিত চোখে সে তাকিয়ে আছে বিশালদেহী খয়েরি কুকুরটার দিকে। চশমাটা খুলে কান থেকে ঝুলছে তার।

বাবাকোয়া ক্লাস নিচ্ছিল, এর মাঝেই আচমকা দরজাটা দড়াম শব্দে খুলে গিয়ে ভেতরে এক মহিলা এসে পড়ল। অহিলার এক পায়ে হাবিলদার ভোট্টুর বাবা কামড় বসিয়ে রেখেছে! ছাড়ার নাম নেই।

বাবাই, বিন্তি কিংবা বিস্কুট চৌধুরী কিছু বলে ওঠার আগেই ভেতরে মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করতে থাকা ভোট্টুর ভাই বোনেরা ভাবলো -বাবা নতুন কোনো খেলা শুরু করেছে। তারাও গিয়ে যোগ দিল কামড়া কামড়ি খেলায়। বিলকিস বানু ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে রুমালটা কয়েকটা কুকুরের নাকের ওপর ধরেতেই সবগুলো মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে গেল।

বাবাকোয়া বোর্ডে সবে মাত্র লিখেছিল-

“অনেকে রুমালের মধ্যে ওষুধ দিয়ে বাচ্চাদের বেহুঁশ করে ফেলে। তাই রুমাল থেকে বাঁচতে হবে....”

বাবাই গম্ভীর মুখে কেবল বলল, “হুঁ। শিশু ধরা। রুমাল দিয়ে কুকুর অজ্ঞান করেছে। আমাদেরকেও করতে পারে।”

বিন্তি ভয়ার্ত মুখে তাকালো মহিলার দিকে। হাচড়ে পাঁচড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বিলকিস। হ্যান্ডব্যাগ খুলে ছোট একটা রিভলবার বের করল হিংস্র মুখে, “আর একটা কুত্তাও যদি সামনে আসছে- গুলি করি লাশ ফালায় দিমু!”

বাবাকোয়া কেবল ভয় পাওয়া গলায় বলল, “বাবাকোয়া মিলিটারি প্লাটুন আপনাকে সব দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। আপনি আত্মসমর্পণ করুন। আমি আপনার শাস্তি কমানোর জন্য মহামান্য আদালতে সুপারিশ করবো।” বাবাই নিয়মিত ছবি দেখে। সেখান থেকে শিখেছে কথাগুলো। এখন সুযোগ পেয়ে বলে দিল।

চোখ গোল গোল করে তাকালো বিলকিস বানু। এই টুকুন ছেলের মুখে এই কথা আশা করেনি। কিছু একটা বলতে যাবার জন্য মুখ খুলতে গিয়েই হঠাৎ চোখে ভয় ফোঁটা শুরু করল। এবং মুহূর্তেই সেটা আতংকে রূপ নিল।

সবাই তাকিয়ে দেখল বাবলীর গাবদা গোবদা ইঁদুর ছানাগুলো খেলাচ্ছলে বিলকিস বানুর দিকে দৌড়ে আসছে মহা আনন্দিত ভঙ্গিতে! কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুড়ুৎ করে ওর পা বেয়ে পেটে উঠে এল দুটো, আরেকটা গেল পিঠে।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপরেই বিলকিস বানু স্প্রিঙের মত লাফাতে শুরু করল, উন্মাদ হয়ে গেছে যেন! শরীরের এখানে থাবা মারছে ওখানে থাবা মারছে। গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে শুরু করেছেম, “ওরে আল্লারে! আমারে খায়া ফালাইলো ইঁন্দুরের ছাঁ!”

এতক্ষণ হয়ত খেলতে উঠেছিল ছানাগুলো, কিন্তু থাবড়া খেয়ে ক্ষেপে গেল যেন তিনটাই। সমানে কামড় দেয়া শুরু করল এখানে সেখানে। নিমেষেই নীল জমিনের শাড়ি ছিদ্র করে ফেলল জায়গায় জায়গায়!

হাই হিল পড়ায় পেছাতে গিয়ে পা হড়কে সোজা গিয়ে পড়ল ডাইনিং টেবিলের নিচে- চোখ বন্ধ করে ধ্যান রত কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙের সামনে! বিলকিস বানু বিশাল সাইজের সবুজ ব্যাঙটাকে নাকের ঠিক সামনে ধ্যানি অবস্থায় দেখে ওখানেই ফিট হয়ে গেল।

ঠিক একই সময়ে মেজর মুগরীর ‘কঁক কঁওও কঁওউক’ শব্দ শুনে সবাই ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই জমে গেল। লিকপিকে এক লোক বড় সড় একটা পিস্তল হাতে ঢুকেছে ঘরের ভেতর। ঢুকেই একগাদা বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকা কুকুর আর বিলকিস বানুকে দেখলো হতভম্ভ হয়ে। তারপরেই সামলে নিল দ্রুত, ঘুরে পিস্তল তাক করলো বাবাইদের দিকে ভয়ংকর মুখ করে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “বিলকিস বানুর এই অবস্থা করছোস তোরা? উঁ? হালার পো! সবগুলারে গুল্লি কইরা মাইরা ফালামু আজকে!”

বিস্কুট চৌধুরী পিস্তল দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আচমকা, “আমরা কিছু করি নাই। এমনিতেই হইছে! আমাদের ছেড়ে দেন মোচ আংকেল!”

বিন্তি-বাবাই নাক কুঁচকালো। বিস্কুট চৌধুরী ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছে। গন্ধ আসছে।

বাবাইদের দিকে পিস্তল তাক করে ধীরে ধীরে বিলকিস বানুর কাছে গেল কেরামত। বাবাইদের ওপর চোখ রেখে পা দিয়ে ঠেলা দিল, “বিলকিস বানু? উঠো। সবগুলারে বাগে পাইছি!”

বাবাকোয়া আড় চোখে দেখলো কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙকে খেয়াল করেনি মোচ ওয়ালা লোকটা। কমান্ডো সাহেব ধ্যান ভেঙে হেলতে দুলতে বিলকিস বানুর ওপর উঠে এসেছে- কেরামত সাহেবের লুঙ্গির ঠিক নিচে।

বাবাকোয়া কেরামত সাহেবকেও আত্মসমর্পণ বাণী শোনালো শুঁকনো মুখে, “ইয়ে, মোচ আংকেল, বাবাকোয়া মিলিটারি প্লাটুন আপনাকে নিচের দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। আপনি অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করুন। আমি মহামান্য আদালতে আপনার শাস্তি.......”

কর্ণেল বাবাকোয়া কথা শেষ করার আগেই কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ আচমকা গায়েব হয়ে গেলেন। রীতিমত ভোজবাজীর মত গায়েব!

এবং এক সেকেন্ড পরেই গগণ বিদারী চিৎকার দিলেন কেরামত সাহেব। উন্মাদের মত নিজের লুঙ্গিতেই গুলি করে বসলেন ভয়ংকর একটা চিৎকার দিয়ে! তারপর কাটা কলাগাছের মত পেছনের দিকে দড়াম করে পড়ে গেলেন।

কমান্ডো চিফ ক্যাপ্টেন গেছো ব্যাঙ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলেন লুঙ্গির ভেতর থেকে। সটাৎ করে জিভ ছুঁড়ে উড়ন্ত একটা মশা মুখের ভেতর পাঠিয়ে দিল।

ঘটনার আকস্মিকতায় বিন্তি-বিস্কুট চৌধুরী সহ বাকিরা জমে গেছে। শুধু বাবাকোয়া তার নীল হেলমেটটা খুলে বুকের ওপর রাখল সমবেদনার ভঙ্গিতে।



কেরামত সুবহানের পিস্তলের গুলির শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিল। বিয়ে বাড়ি থেকে জাহিদ নোভেরা সহ বাকিরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো এখানে। এসে দেখলো গার্ড মতি মিয়াঁ অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে গার্ড রুমে। তখনই বুঝে গেল খারাপ কিছু হয়েছে। পুলিশকে ফোন দিতে দিতে ওপরে এসে বাবাইদের ঘরের দৃশ্য দেখে ছোখ ছানা বাড়া হয়ে গেল সবার। তিন চারটা কুকুর বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। বাকিরা ঘুরঘুর করছে। মেঝেতে লিকপিকে একটা লোক আর শাড়ি পরা মেয়ে বেহুঁশ হয়ে আছে। দুটো পিস্তলও পড়ে রয়েছে একপাশে। কি ঘটেছে সেটা না বোঝার মত কিছু নয়। পুলিশ আর এম্বুলেন্সকে খবর দেয়া হল।



জাহিদ একটা চেয়ার টেনে বসে আছে। ওর দুই পায়ে বাবাই আর বিন্তি বসে রয়েছে। বিস্কুট চৌধুরীর পেট নড়ে গেছে ভয়ের চোটে। বাথরুমে গিয়ে বসে আছে অনেক্ষণ হল, বেরুবার নাম নেই। এম্বুলেন্সের লোকজন যখন কেরামত সাহেবকে স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে- জাহিদ দেখল একটা কুশনও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে কেরামত। তল পেটের নিচের দিকে চেপে ধরে আছে ফ্যাঁকাসে মুখে। কোঁ কোঁ করছে কেবল। কথা বলার মত অবস্থায় নেই। পুলিশ দেখে মুখ শুঁকিয়ে গেছে। বিলকিস বানুরও জ্ঞান ফিরেছে। পুলিশের লোকজন দেখে থমকে গেছে। প্রথম দিকে কান্না কাটি করছিল। কিন্তু বাবলীর ইঁদুরগুলোকে এদিক ওদিক দৌড়া দৌড়ি করতে দেখে চুপ হয়ে গেছে।

বিন্তির মা বিন্তিকে অনেক্ষণ ধামকি ধুমকি দিয়ে চলে গেছেন বাসায়। এভাবে কাউকে না বলে চলে আসার জন্য সবাই রেগে গেছে বাবাই, বিন্তি, বিস্কুট চৌধুরীর ওপর। কেবল জাহিদ কিছু বলেনি। চুপচাপ বাবাই বিন্তিকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।

এক সময় সবাই চলে গেল।

জাহিদ ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল, “কর্ণেল সাহেব?”

“হুঁ?” মুখ ঘুরিয়ে তাকায় বাবাই।

“কাউকে কিছু না বলে একা একা কোথাও যাওয়া কি ঠিক?”

বাবাকোয়া মুখ কালো করে ফেলল, “ঠিক না।”

“এরপর থেকে কাউকে না বলে কোথাও যাবি না। মিলিটারিরা সব বিষয়ে সতর্ক থাকে। না বলে কোথাও যায় না।” ছেলের হেলমেটে হাত বুলিয়ে দিল জাহিদ।

বাবাই ঘাড় কাঁত করলো, “আচ্ছা।”

“বিন্তি বেগম?” বিন্তির ঝুটি ধরে টানলো জাহিদ।

“হুঁ চাচা?” কাঁচুমাচু মুখে তাকালো।

“মাথা মোটা কর্ণেলের উপরে বর্তিত সব উপদেশ তোমার উপরেও দেয়া হল। ঠিক আছে?”

বিন্তি জোরে জোরে মাথা ঝাঁকালো।

“গুড।” সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে জাহিদ আলুবতী আনন্দময়ীর দিকে তাকালো। সে এখন ভোট্টুর অজ্ঞান ভাই বোন আর বাবার আশে পাশে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে ওর আলুর বাটি নিয়ে। সবার নাকের সামনে একটা করে আলু রেখে দিচ্ছে করুণ মুখে। বাসার নিরাপত্তার জন্য আহত হয়েছে বেচারা কুকুরগুলো।

নোভেরার দিকে বিস্মিত চোখে তাকালো জাহিদ, “বেগাম?”

পাশেই দাঁড়িয়েছিল নোভেরা, ক্লান্ত গলায় বলল, “কি?”

“আলুবতী আনন্দময়ীর কান্ড দেখেছো?”

“হুম দেখছি। তোমার মেয়ে তো ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল আর মাদার তেরেসার ঝাঁকুনি ভাজা হবে মনে হয়।” হেসে ফেলল নোভেরা।

হাসল জাহিদও, ভারী গলায় আবৃতির সুরে বলল, -



“যাহা কিছু মোর

দিয়ে যেতে চাই

‘জীবনের আওভানে’।

এক টুকু ব্যথা

ভুলুক না হয়

বাঁধিয়াছি যাহা প্রাণে.....”



বাবাকোয়া অবাক হয়ে তাকায় জাহিদের দিকে। বাবা এত সুন্দর করে কবিতা বানায় কীভাবে? বাবাকোয়া পারে না। মন খারাপ হয়ে যায় বাবাইয়ের। বাবাকোয়া এখনো ছোট। কবিতা বানাতে বোধ হয় বড় হতে হবে; বাবার মত বড়।





“১৮২ নং মিশনঃ

কর্ণেল বাবাকোয়া আজকে বাথরুমের লাইটটা সুইচ টিপে বিয়ে বাড়ীর লাইটের মত জ্বালাতে নেভাতে গিয়েছিল। কিন্তু হয় নাই। উল্টো লাইটটা ফেটে গেছে। আম্মা টের পায় নাই এখনো। বাবাকোয়া ঝাড়ু দিয়ে ভাঙা কাঁচ সরিয়ে ফেলেছে বাথরুম থেকে। কিন্তু বেশিক্ষণ বোধ হয় লুকাতে পারবো না। আম্মা সবকিছু কীভাবে জানি টের পেয়ে যায়। বাবাকোয়াকে মাইর দেয় তখন। বাবাকোয়া চিন্তিত খুব......



মিশন নাইঃ

বাবাকোয়ার মন খারাপ কয়দিন ধরে। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবাকোয়া রাস্তার পাশে বড় রিং এর মত কতগুলো পাইপের ভেতর একটা পরিবারকে দেখে। কেবল একটা মা আর দুটো ছেলে মেয়ে আছে। মেয়েটা বাবাকোয়ার সমান বড়, ছেলেটা আরেকটু ছোট। অনেক শুঁকনো ওরা। বাবাকোয়ার মত পুষ্টি সমৃদ্ধ খাওয়ার পায় না ওরা। আমি প্রতিদিন আসার সময় শুনতে পাই ওরা ওদের মাকে খিচুড়ি আর গরুর মাংস রেঁধে দিতে বলে। কিন্তু বাবাকোয়া দেখেছে ওদের মা কখনও দিতে পারে নাই। রান্না হয় না কিছুই। মাঝে মাঝে হোটেল থেকে ফেলে দেয়া খাবার এনে খেতে দেয় ছেলে মেয়েগুলোকে। ওরা খেতে পারে না ঠিক মত। অনেকদিন না খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে যায় ওরা। কিন্তু মা’টা তখন মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে। বাবাকোয়ার কষ্ট হয় অনেক। কেন?

বাবাকোয়া ঠিক করেছে ওদেরকে খিচুড়ি আর মাংস রান্না করে খাওয়াবে। বাবাকোয়া রান্নার বই যোগার করেছে। আম্মা রান্না ঘর থেকে সরে গেলেই বাবাকোয়া রান্না করবে.....”



কর্ণেল বাবাকোয়াকে অবশ্য রান্না করতে হয়নি। মিথিলা ডায়েরী পড়ে বাবাইকে একটা বড় টিফিন ক্যারিয়ারে নিজেই খিচুড়ি আর মাংস রান্না করে দিয়েছিল। রিক্সায় করে বাবাইকে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে সেই বাচ্চা দুটো থাকে। মিথিলা নামেনি রিক্সা থেকে, বাবাইকে নামিয়ে দিয়ে অনেক দূরে গিয়ে চুপচাপ বসেছিল।

বাবাই টিফিন নিয়ে সেই পাইপ গুলোর ভেতর গিয়ে খুঁজে বের করেছিল বাচ্চাগুলো আর ওদের মাকে। বাবাইয়ের সমান মেয়েটার নাম নাকি পারুল, আর ছেলেটার নাম পুতুল।

সেদিন সন্ধ্যা নামা ঢাকা শহরে যখন পাখিরা মেঘে ছাওয়া আকাশটাকে ঢেকে দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল যার যার ঠিকানায়- টিপ টিপ করে বৃষ্টি নামা শুরু হয় তখন। বাবাই খুব অবাক হয়ে পাইপের ভেতর বসে সেই বৃষ্টি দেখছিল। ওর পাশে বসে পারুল আর পুতুল বহুদিনের অভুক্তের মত খেয়ে যাচ্ছিল খিচুড়ি আর মাংস। তাদের মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ছেলে মেয়ের খাওয়া দেখছেন আজও। সন্তানের আহার আর অনাহারে কোনো মা কেন কাঁদে বাবাই সেটা বুঝতে পারে না। খুব রহস্যময় লাগে তার কাছে ব্যাপারটা। তাই বাবাই সেদিকে না তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিল মুগ্ধ হয়ে।

পারুলের মা হঠাৎ কান্না ভেজা গলায় বললেন, “বাজান?”

“হুঁ?” ফিরে তাকায় বাবাই।

“দুনিয়ার সব মানুষ কি তোমার মতন হবে?” চোখ গড়িয়ে পানি নামছে আধো অন্ধকারে বসে থাকা মানুষটার। কেবল চিকচিক করতে থাকা চোখগুলো দেখা যায়।

জবাব দেয়নি বাবাই। পাইপের ভেতর বসে বাহিরের পৃথিবীটাকে অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকে সে। কি বিচিত্র, কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মাটির কাছে বসে বৃষ্টি নামা জগৎটাকে দেখতে! বাবাই বড় মানুষের মত করে হঠাৎ বলে উঠল, “মাটির খুব কাছে পৃথিবীটা অনেক সুন্দর, তাই না চাচী?”

মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকা সেই মা গভীর বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বাবাকোয়ার দিকে। ছোট্ট মানুষটা পাইপের শেষ প্রান্তে, মাটির খুব কাছে বসে পৃথিবীটাকে দেখছে।

আহারে! কত নিষ্পাপ সেই দৃশ্য!



(সমাপ্ত)

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৩ শে জুন, ২০১৩ রাত ১০:৪৯

নীল ত্রিস্তান বলেছেন: ভাইয়া , একই জিনিস দুইবার পেস্ট হয়ে গেছে ।
বাবাকোয়া রক্স :D

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.