নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার চারপাশের মানুষ গুলো অনেক ভাল।

নিথর শ্রাবণ শিহাব

মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।

নিথর শ্রাবণ শিহাব › বিস্তারিত পোস্টঃ

একটি বিবাহের আদী ইতিহাস (শঙ্খচূড় উপন্যাসের খণ্ডাংশ)

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১:৩৭

১৯ নভেম্বর, ১৯৮৩ সালের এই দিনটা শনিবার ছিল যতটা মনে পড়ে।
হাজী বাড়ীর মানচিত্র, নঁকশা অল্প বিস্তর বদলেছে খামির উদ্দিনের মৃত্যুর পর এত বছরে। আশে পাশের অনেক জলা-জংলাই ভরাট করে এখন গরুর গোয়াল ঘর, রান্না ঘর, গুদাম আর কাছারি ঘর বানানো হয়েছে। বাড়িটা জীবন্ত প্রাণির মত খানিকটা সরেও গেছে এদিক ওদিক। পুরনো কেউ বেড়াতে এলে একটু অবাক হয়ে বলতে বাধ্য হবে, “কি আশ্চর্য! বাড়িটার হাত পা আছে নাকি? নড়ে চড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটু সরে গিয়ে আবার মাটিতে বসে পড়েছে মনে হয়!”
কুয়া পাড়টা ঠিক আগের জায়গাতে থাকলেও নারিকেল গাছগুলোর বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেকেই বিদায় নিয়েছে এই ক’বছরে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে চৌদ্দ পনেরো বছর বয়সী দুটো নারিকেল গাছ। যুদ্ধের কিছুদিন আগে জন্ম নিয়েছিল কুয়ার ধারে। খায়রুল আনাম ঘরের নতুন সন্তানের মত আগলে রেখেছেন সেই নারিকেল গাছ দুটোকে। এখন পিতৃছায়া থেকে বেরিয়ে এসে সেই পিতার টিনের চালের বাড়িতে দিনে একবার করে হলেও দুম-ধড়াম শব্দে নারিকেল বিতরণ করে থাকে খায়রুল আনামের স্নেহের দুই বৃক্ষ বালক-বালিকা। বাড়ির অন্যান্যরা সেই শব্দের সাথে পরিচিত দেখে মাঝরাতে নারিকেল পতনের শব্দে লাফিয়ে বিছানায় কেউ উঠে বসে না। কেবল রহিমা খাতুন ছাড়া। হাজী খামির উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী আগের কালের মানুষ। সেই কালে প্রেসিডেন্ট সাহেবের ভয়ে এই নারিকেল গাছের আদী পুরুষেরাও নারিকেল ফেলত খুব হিসেব করে, টিপে টিপে। অভদ্র, অশৃংখল আর বেয়ারা ছিল না এখনকার দুটোর মত। দিনদিন গাছ পালাও মানুষের মত ভদ্রতা শিক্ষা হারিয়ে ফেলছে। রহিমা খাতুনের এই শেষ বয়সে এসে কিনা সারাক্ষণ কান খাড়া করে সতর্ক থাকতে হচ্ছে কখন না জানি দুম করে এই নারিকেল টিনের চালে পড়বে- আর তজবি টিপতে থাকা অবস্থাতেই চমকে উঠে শাড়ি নষ্ট করে ফেলবেন। ইদানীং সমস্যা হয়েছে তার, শাড়ি ভিজিয়ে ফেলছেন। নামায কালাম পড়ার জন্য পরিষ্কার থাক যাচ্ছে না সব সময়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার খুব শখ রহিমা খাতুনের। নাতি নাতনিদের হাতের নখও সামান্য বড় হতে দেখলেই ডেকে ডেকে ব্লেড দিয়ে নখ কেটে দেন জোর করে।
কড়া রোদ পড়েছে। স্কুল খোলা। পঞ্চগড় বিপি হাইস্কুলের ইংরেজীর শিক্ষক, খায়রুল আনাম সাহেব আজ স্কুলে যাননি। বিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে যিনি কোনোদিন লেট হননি- তিনি আজ ছুটি না নিয়েই স্কুল কামাই করেছেন। বারান্দায় লম্বা বেঞ্চটায় গম্ভীর মুখে বসে রয়েছেন। কথা বলছেন না কারো সাথে। গায়ে স্কুলে যাওয়ার পোশাক, শার্ট প্যান্ট পরেই আছেন। বেরোচ্ছিলেন ঠিকই। মাঝপথে থেমে যেতে হয়েছে। তাঁর স্ত্রী তাহমিনা বেগম নিষেধ করেছেন আজ স্কুলে যেতে।
তাঁদের নয় সন্তানের মাঝে শেষ থেকে তিন নাম্বারে অবস্থান ফাহিমা পারভীন রিতার। ক্লাস এইটের ছাত্রী। বিপি হাইস্কুলেই পড়ছে। তাকেও স্কুলে যেতে বারণ করা হয়েছে। বাদ বাকি সবাইকে স্কুলে পাঠানো হয়েছে। শুধু বাড়িতে আছে খায়রুল আনামের বড় ছেলে জুয়েল, জুয়েলের বৌ আর ছোট ছেলে মুকুল। মেজ ছেলে লায়ন রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে খানিক আগে।
লায়নের রাগ তাহমিনা বেগম আর বড় ভাই জুয়েলের ওপর। কোথাকার কে আয়ুব আলী নাম, জানা নেই শোনা নেই, চট্টগ্রাম না সীতাকুণ্ড বাড়ি- মিলিটারিতে চাকরি করে, সেদিনের চ্যাংড়া ছেলে, বিয়ে করতে চলে এসেছে রিতাকে! রিতার বয়সই বা কত? সবে মাত্র চৌদ্দ হল। এটা বিয়ের একটা সময় হল? মেয়ে কি গাঙ্গের জলে ভেসে এসেছে নাকি? বাপ খায়রুল মাস্টার বসে বসে কি করছে? দেখছে না বাল্য বিবাহ দেয়া হচ্ছে তাদের সবচেয়ে আদরের বোনটাকে? এটা কি ধরণের ফাজলামো!
বাড়ির উঠানে খানিকক্ষণ চিল্লাচিল্লি করে পা দাপিয়ে বেরিয়ে গেছে লায়ন। রাগটা যতটা না বিয়ে নিয়ে, তার চেয়েও বেশি মা, তাহমিনা বেগমের ওপর। এই ধীর স্থির, নিঃশব্দ মহিলাটাকে লায়ন কখনোই বুঝে উঠতে পারেনি। মানুষটা সম্পর্কে তার মা হওয়া সত্বেও অদ্ভুত অপরিচিত ধরণের একটা মানুষ। মায়া মমতা যতটা দিয়েছেন, শাসন আর শ্রদ্ধার দেয়ালের পুরুত্বটাও ঠিক একই ভাবে গাঢ় করে নিয়েছেন তিনি। এতো চেঁচানোর পরেও তাহমিনা বেগমের নামে একটা টু শব্দও তোলেনি লায়ন। শুধু আস্ফালন করেছে ফুঁসতে ফুঁসতে। তাহমিনা বেগম বারান্দাতে কেবল একটু বেরিয়ে এসে শান্ত গলায় বলেছিলেন, “লায়ন, বাসা বাড়িতে উঠানে দাঁড়িয়ে হৈ হট্টগোল করা আমার পছন্দ না। রিতার বিয়ে নিয়ে যা ভাবার সেটা আমাকে ভাবতে দিলেই ভাল হবে বোধহয়।”
কথা হারিয়ে ফেলেছে লায়ন। রিতার বিয়েটা আটকাতে পারবে না বোঝার পর ঝড়ের মত বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। তাহমিনা বেগম দ্বিতীয় সন্তানের ঔদ্ধত্যে বিন্দুমাত্র ভ্রূকুটি করলেন না। ঠাণ্ডা গলায় শুধু হাশেমকে ডাকলেন, “হাশেম মিয়াঁ? নারিকেল গাছদুইটাতে উঠে যাও তো। যত নারিকেল আছে সব পাড়ে ফেলবা একেবারে। মেহমানরা চলে আসবে একটু পরে। বিয়ে পড়ানোর সময় যেন একটাও নারিকেল পড়ার শব্দ না পাই আমি।” ঘুরে চলে গেছেন রান্না ঘরের দিকে।
ক্ষুদ্র এই ঘটনার পুরো সময়টা খায়রুল আনাম সাহেব নীরব দর্শক হয়ে বেঞ্চে বসে রইলেন। কোনো কথা বলেননি। আজ যে রিতার বিয়ে সেটা কেমন যেন ঘোর ঘোর মনে হচ্ছে তাঁর কাছে। তাঁর সবচেয়ে মেধাবী মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বাকি মেয়েগুলোর মত না কেন জানি এই মেয়েটা। পটাপট সব পড়া মুখে তুলে নিতে পারতো। ভীষণ ছটফটে স্বভাবের মেয়ে। তিনি চেয়েছিলেন মেজো জামাই বাবলু গত মাসে বাড়িতে বেড়াতে আসার সময় ওর অফিসের বন্ধু আয়ুব নামের যে ছেলেটাকে নিয়ে এসেছিল- রিতা না, রিতার বড়টা, মানে শিউলির সাথে বিয়ে দিতে। শিউলিটার মাথা একটু ময়দা ভরা। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যা হলেই সেই মেয়ে বই খুলে কেবল একটাই কবিতা বের করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে পড়তে থাকে-
“কুকুর আসিয়া কামড় দিলো পথিকের পায়.........”
খায়রুল আনাম ধমক দিলেই মেয়ে চুপ করে যায়। অন্য পড়া ধরে। ফাঁকিবাজ। পড়াশোনা একদমই করে না। মন নেই পড়ায়। তাহমিনা বেগম রান্না করতে গেলে শিউলি রান্না ঘরে গিয়ে বসে থাকে মায়ের সাথে। রান্না শেখার ভীষণ আগ্রহ মেয়ের। রিতার মত না। ক্লাসে পড়া ধরলে রিতা গড়গড়িয়ে পড়া বলে দেয়, অন্যদিকে শিউলি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। যেন জীবনে প্রথম শুনছে এই পড়া। কতবার যে ফরিদ ভাই, আসলাম ভাই তাঁদের অংক আর সমাজ ক্লাসে রিতাকে দিয়ে শিউলির কান টানিয়েছে! মেয়েটা আগে ওপরের ক্লাসে ছিল, ফেল করে রিতার সাথে এখন পড়ছে। খায়রুল আনাম চেয়েছিলেন শিউলির সাথে বিয়েটা হোক আয়ুবের।
কিসের কি! মেয়ে দেখে গেল ভাল ছেলের মত। কিন্তু বাড়ি গিয়ে বাবলুকে দিয়ে খবর পাঠালো শিউলিকে পছন্দ করে নি, করেছে শিউলির ছোটটাকে! মানে রিতাকে। বিয়ে করলে নাকি রিতাকেই করবে সে! আর তাহমিনারও যে কি হয়েছে সে’ই জানে! আয়ুবের সাথে রিতার বিয়ে দেয়ার জন্য এক মাসের ভেতরে শিউলির বিয়ে দিয়ে দিল। আর আজকে বিয়ে দেবে রিতার সাথে। ছেলে নাকি টানা দুই দিন বাস আর ট্রেন জার্নি করে তার বাবা জিএম হোসেন সাহেবকে নিয়ে এসেছেন আজ ভোরে। উঠেছে মাসুদের বাড়িতে। মাসুদও সম্পর্কে জামাই হয় খায়রুল আনামের। এই জামাইগুলোই যত নষ্টের গোঁড়া! মেয়েগুলোকে বাহিরে পাঠিয়ে দিচ্ছে ঘর থেকে! তাহমিনাও নাচা শুরু করেছে ওদের কথায়!
যদিও স্ত্রীকে টু শব্দটিও বলেননি খায়রুল আনাম। এই একটা মানুষ পুরো হাজী বাড়ি নামক বট গাছটার শেকড় হয়ে মাটির ভেতর ঢুকে রয়েছে। মৃত্তিকা রস কিংবা সংসার রসের খবর তাহমিনার চেয়ে ভাল আর কেউ জানবে না বলেই খায়রুল আনামের দৃঢ় বিশ্বাস। খায়রুল আনাম মগডালের মুকুল, পাখি আসতে দেখলেই ভাবেন ঠোকর মারতে এসেছে, পরাগায়ন করতে এসেছে কি না সেটা আর বোঝেন না।
অন্যদিকে সকাল বেলা ব্যাগ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরোতে গিয়ে পেছন থেকে তাহমিনা বেগম যখন রিতাকে ডাক দিয়ে বলে দিলেন, “শোন্‌, আজকে তোর আর স্কুলে যেতে হবে না। বাড়িতে থাক্‌। মেহমান আসবে আজকে। লিজি’রা যাক।”
রিতা তেমন কিছু বুঝতে পারেনি তখন। সুন্দর করে দুই বেণী করেছিল স্কুলে যাওয়ার জন্য। মেজ ভাইয়ের মেলা থেকে কিনে দেয়া নতুন অলিভ ওয়েলটা চুলে দিয়ে শক্ত করে বেণী করেছিল। চুল ঘন আর শক্ত হয় নাকি তাহলে। এখন বাড়িতে বসে বসে কি করবে? বেণী খুলে ফেলবে? ক্রস বেল্ট খুলে রাখবে? মেহমান আসলে তাকে দিয়ে কি? তার থাকতে হবে কেন? বাড়িতে তো আগেও কত মেহমান এসেছে- তাকে তো থাকতে হয়নি কখনো! আর থাকতেই যদি হবে, লিজি কি দোষ করলো? সেও থাকতো। ওকে আবার স্কুলে কেন পাঠিয়েছে?
ভীষণ বিরক্ত হয়ে দাদী রহিমা খাতুনের কাছে চলে গেল রিতা। রহিমা খাতুনের ঘরটায় তেমন একটা আলো বাতাস নেই। আবছা অন্ধকার অন্ধকার একটা ভাব। স্যাঁত স্যাঁতে একটা ব্যাপার রয়েছে। একটাই বিছানা। মশারী দেয়া থাকে। রহিমা খাতুন ভেতরে শুয়ে থাকেন। নামায পড়েন একা একা। মাঝে মাঝে নাতনিদের ক্লাস নেয়ার মত করে নানান পারিবারিক জ্ঞান দান করেন, ইসলামী শিক্ষা দান করেন। রিতা পায়ের স্যান্ডেল খুলে উঁচু বিছানায় উঠে গেল মশারী সরিয়ে। “দাদী? ও দাদী?”
“উঁ? কি হইছে?” বিরক্ত হয়ে জবাব দিলেন রহিমা খাতুন। দোয়া পড়ছিলেন। সূরা হাশর।
“বাড়িতে কিসের মেহমান আসবে? আমারে যে স্কুলেই যাইতে দিলো না আম্মা?” গাল ফোলানো কিশোরীর মত তাকালো রিতা।
“অহ! ক্যান? বলে নাই?”
“কি বলবে? কিছু তো বলে নাই!”
“আজকে তো তোর বিয়া! ঐযে মিলিটারি ছেলেটা আসছিল? আয়ুব? ওর সাথে।”
বজ্রাহতের মত বসে রইল রিতা। মাত্র একমাস আগে আয়ুব নামের বাইশ তেইশ বছর বয়সী ছেলেটা এই বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল মেজ দুলাভাই আর মাসুদ দুলাভাইয়ের সাথে। শিউলি আপাকেও দেখেছিল বিয়ের জন্য। কিন্তু পছন্দ করেনি। অথচ বলা নেই কওয়া নেই- সেই লোকের সাথে কিনা আজ তাঁর বিয়ে!!!
মেজ ভাই কি তাহলে এতক্ষণ উঠানে দাঁড়িয়ে এ বিষয়েই চ্যাঁচামেচি করছিলেন! রিতা কিছুই বুঝতে পারে না। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে! রহিমা খাতুনের কোনো কথাই আর কানে আসছে না। কান দুটো শোঁ শোঁ করছে কেবল। ধীরে ধীরে ঘোরের মধ্যে যেন হেঁচড়ে বিছানা থেকে নামলো রিতা। টলছে। ঠিকমত দাঁড়াতে পারছে না। মনে হচ্ছে পড়ে যাবে যে কোনো সময়েই। কিন্তু এখন পড়ে গেলে হবে না! ঐ মোচওয়ালা মিলিটারির সাথে কিছুতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারবে না সে। প্রয়োজনে পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করবে! পালাতে হবে যে করেই হোক। কোনো ভাবে পালিয়ে মেজ ভাইয়ের কাছে একবার যেতে পারলেই হল! মেজ ভাই ঠিকই তাকে বাঁচিয়ে নেবে।
রিতা স্কুল ড্রেস পরেই ঘোরের মধ্যে পাগলের মত এক ছুটে দৌড়ে রহিমা খাতুনের ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলো বারান্দায়। বাবা পাশেই বেঞ্চে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তিনি কিছুই করবেন না রিতা জানে। খায়রুল আনাম নামের আত্মভোলা মানুষটা বড় সাধা সিধা আর নিরীহ। কিছুর প্রতিবাদ তাঁকে দিয়ে হবে না। ঘরের ব্যাপারে বড়ই দূর্বল মানুষ তিনি। বাহিরের অসম্ভব ক্ষমতাবান মানুষটা তাহমিনা বেগমের মমতার সামনে ভীষণ দূর্বল। পরিবারের যে কোনো সিদ্ধান্তের ভার তিনি চোখ বন্ধ করে এতকাল তাহমিনাকেই দিয়ে গেছেন ঠিক যেমনটা তাঁর পিতা খামির উদ্দিন করেছিলেন শেষ বয়সে। হাজী খামির উদ্দিন জহুরি মানুষ ছিলেন। তাহমিনা তাঁর খুঁজে বের করা এক রত্নের নাম।
রিতা তার মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না জানে। তাই বারান্দায় আর দাঁড়ালো না। খালি পায়েই এলোমেলো পায়ে দৌড় লাগালো পাগলের মত মেইন গেটের দিকে। যে করেই হোক পালাতে হবে। নাহলে অনর্থ হয়ে যাবে আজ!
রিতাকে পেছন থেকে পালিয়ে যেতে দেখলেন নীরবে খায়রুল আনাম। কিছু বললেন না। ফেরাতে চাইলেন না। কিছু পাখিকে মুক্ত করে দিয়ে দিতে হয়ে, খাঁচায় ফেরে কি ফেরা না, সেটা চেয়ে দেখতে নেই।
কিন্তু রিতা বেশিদূর যেতে পারলো না। গেটের কাছা কাছি গিয়েছে সবে- সাথে সাথে গেট ঠেলে পুরনো খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা হালকা পাতলা শ্যামলা ধরণের মোচওয়ালা সেই ছেলেটা ঢুকলো বাড়ির উঠানে! হাতে বাজারের ব্যাগ। তার পেছনে বয়স্ক এক বৃদ্ধ, মাথায় জালের টুপি। দেখতে প্রায় ছেলেটার মতই। রিতা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল দীর্ঘ এক মুহূর্ত। দরজা ঠেলে বড় ভাই জুয়েল, মসজিদের ইমাম সেতার চাচাও ঢুকেছেন।
রিতাকে দরজার সামনে দেখে সেই মোচওয়ালা মিলিটারি ছেলেটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল খানিকের জন্য। অবশ্য কেউ কিছু বলার বা করার আগেই রিতা ঠিক যেভাবে ভোঁ দৌড় দিয়ে ছুটে এসেছিল- ঠিক একই ভাবে উলটো দিকে পালিয়ে গেল! এক দৌড়ে রহিমা খাতুনের ঘরে, দরজায় ছিটকিনিও তুলে দিয়েছে। শুধু ছিটকিনি তুলেই ক্ষান্ত হয়নি, রহিমা খাতুনের বিছানার নিচে গিয়ে লুকিয়েছে!
বাহিরের উঠানে অপ্রস্তুত নতুন জামাই আর জামাইয়ের বাবা জিএম হোসেন সাহেবকে তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দিতে সেতার সাহেব বলে উঠলেন, “যারে পালাইতে দেখলেন হোসেন সাব? ওইটাই কিন্তু আপনার হবু বৌমা। রিতা। খুব চঞ্চল আর সরল মেয়ে। বড় আদরের। যেই ঘরে যাবে, ঘর নূরের মত আলো করে রাখবে ইনশাআল্লাহ্‌!”
হোসেন সাহেব কেবল খুক খুক করে কাঁশলেন। কিছু বললেন না। আড় চোখে চেয়ে দেখলেন দাওয়ায় বেঞ্চে কেউ বসে রয়েছে, গম্ভীর মুখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ঠিক তাঁর দিকেই। কিন্তু সৌজন্য দেখিয়ে উঠে আসছে না কথা বলার জন্য। কেন যেন চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে এই মাত্র পালায় যাওয়া মেয়েটার বাপ লোকটা। অভদ্র নাকি? আগায় আসে কথা বলবে না?
আয়ুব কেবল এলোমেলো হয়ে গেছে। হাতে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে এখনো মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাতে বেশি টাকা ছিল না, বেনারসি লাল শাড়ি কিনতে পারেনি। একটা কালো বাসকাতান শাড়ি কিনে এনেছে। লজ্জা লাগছে। এই শাড়ি রিতাকে পরতে দিতে বলে কেমন করে? দেখেই তো সবাই হাসা হাসি শুরু করে দেবে। দু পয়সাও বুঝি রোজগার নেই নতুন জামাইয়ের যে বৌকে লাল শাড়ি কিনে দিতে পারেনি, শোকের মত কালো শাড়ি দিয়েছে! রিনরিনে শুকনো দুটো সোনার চুড়ি দিয়ে আর কিই বা হবে? অস্বস্তিতে আয়ুবের পায়ের দুই বুড়ো আঙুল উঠানের মাটি কুটতে থাকে নিঃশব্দে......... বাড়ির ভেতর থেকে রিতার ভয়ার্ত গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মেয়েটা কান্না আটকাতে আটকাতে কাউকে বলার চেষ্টা করছে, “আমি বিয়ে করবো না! আমি ঐ মোচওয়ালা বেটারে বিয়ে করবো না! আমি কোথাও যাব না! মেজ ভাই কই গেলা তুমি আমারে ফালাইয়া?” ডুকরে কাঁদছে মেয়েটা।
হাশেম মিয়াঁ নারিকেল পাড়ছে গাছের আগায় উঠে। দড়াম শব্দে দুই মিনিট পর পর ডাব খসে পড়ছে হাজী বাড়ির টিনের চালে। সেই টিনের নিচে কাঁঠের অবাক্ষ মূর্তির মত বসে রয়েছেন ডিএম খায়রুল আনাম। চশমাহীন সরু চোখে তাকিয়ে রয়েছেন সরাসরি উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা হবু জামাতার দিকে।
আয়ুবের বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে অজানা আশঙ্কায়.........

- শঙ্খচূড় (উপন্যাস)

হ্যাঁ, আজ ১৯ই নভেম্বর আমার আব্বা আম্মার বিবাহবার্ষিকী। একত্রিশতম বিবাহবার্ষিকী। বহু বছর আগে এই দিনটাতে ফাহিমা পারভীন রিতা নামের সেই চৌদ্দ বছরের কিশোরী বালিকা মোচওয়ালা জনৈক মিলিটারি যুবকের কিনে আনা কালো বাসকাতান শাড়ি পরে সেদিন কবুল বলেছিল।

মন্তব্য ১৪ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (১৪) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:১৭

জানা বলেছেন:

দারুণ লেখেন আপনি। পড়ে খুব ভাল লাগলো। আপনার পুরো উপন্যাসটি কি আমরা (ব্লগাররা) পড়ার সুযোগ পাবো এখানে?


মা-বাবাকে অভিনন্দন এবং সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা।

ধন্যবাদ।

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:৫৫

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: ইনশাআল্লাহ্‌। শেষ হোক। পাবেন অবশ্যই। তাছাড়া শুরু থেকে চার পর্ব তো ব্লগে দিয়েছিলাম আমি। বেশ আগে দিয়েছি। পেছন দিকে গেলে পাবেন। :) শুভ কামনা। ভাল থাকবেন।

২| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:৫২

কাল্পনিক_ভালোবাসা বলেছেন: দারুণ! আপনার লেখাটা খুবই ভালো লেগেছ। পুরো লেখাটি পড়তে পারলে খুব ভালো লাগত।

আর আপনার বাবা মাকে অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:৫৯

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন সব সময় :)

৩| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:০৬

ল্যাটিচুড বলেছেন: আপনিতো জানেন - শঙ্খচূড় (উপন্যাস) এর জন্য বহুদিন থেকে অপেক্ষায় আছি।

মাঝে মাঝে পুরনো পর্ব গুলোয় ঢু দিয়ে কমেন্ট করে আসি।

অপেক্ষার পালা কবে শেষ হবে ... ?

আপনার মা-বাবার জন্য বিবাহ বার্ষিকীর শুভেচ্ছা রইল।


১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:৫৮

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: হা হা হা! জানি। আপনি পুরানা মানুষ!

৪| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:৩৫

মামুন রশিদ বলেছেন: মুগ্ধ হয়ে পড়লাম ।

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:৫৭

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ :) ভাল থাকবেন সব সময়

৫| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:৫৩

তিথীডোর বলেছেন: মনটা ভরে গেল আপনার নিখুঁত লেখা পরে! ---আপনার রোমান্টিক বাবা মায়ের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল।

২০ শে নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:৫৫

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ :) ভাল থাকবেন সব সময়

৬| ২৭ শে নভেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:২৪

সানজিদা হোসেন বলেছেন: চমৎকার

৩০ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:১৫

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপা :) ভাল থাকবেন সব সময়

৭| ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:০৮

জলমেঘ বলেছেন: আপনার বাবা-মায়ের জন্য শুভকামনা রইলো

৩০ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:১৫

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপা :) ভাল থাকবেন সব সময়

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.