নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার চারপাশের মানুষ গুলো অনেক ভাল।

নিথর শ্রাবণ শিহাব

মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।

নিথর শ্রাবণ শিহাব › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রতীক্ষা (ঝরা গল্প)

০৯ ই মার্চ, ২০১৬ ভোর ৬:১৮

রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মত বাজে বোধহয়। ঘড়িটাও অনেকটাই যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। কট কট কিংবা টিক টিক কাটার আওয়াজও কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে যাচ্ছে এমন ছিল সময়টা। গত সন্ধ্যার দমকা বৃষ্টির পর সমস্ত রাত ধরে অদ্ভুত একটা শীত নেমেছে শহর জুড়ে। কুয়াশার মত বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে, সেই সাথে মিহি একটা ঠাণ্ডা হাওয়া। ছয় ঋতুর পালা বদলের সময়টায় খুব বিচিত্র একটা দোটানায় যেন থাকে রাতের বিশাল প্রহরটা। আজকাল সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান দুটোই সমানে চালিয়ে দিয়ে ঘুমাতে হয়। দরজা জানালাও যতটা পারা যায় খুলে রাখতে হয় গরমের জন্য। এমন নিত্যদিনের অর্ধ সেদ্ধ রোজনামচার মাঝে গত সন্ধ্যাটা আচমকা এসে যেন সব গরমিল করে দিয়ে গেছে। পুরো শহরকে নিশ্চিন্ত মনে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে এক রাতের জন্য। কারেন্টও নেই। এক পশলা দুই পশলা তিন পশলা করে কয়েক দফায় বৃষ্টি হয়ে গেছে। লাইট পোস্টগুলো আজ জেগে নেই দেখে পিচ ঢালা রাস্তাগুলো চিক চিক করে নদীর মত কৃষ্ণকায় দেহের জানান দিচ্ছে না। শুধু শেষ রাতের দিকে এসে একটা একটা করে তারা জাগা শুরু করেছে বৃষ্টির অবসরে। ভাঙা চাঁদটাও উঠবে হয়তো যে কোনো সময়। ততক্ষণ পর্যন্ত আশ্চর্য একটা ঘুটঘটে অন্ধকারে পুরো শহর ডুবে আছে। মাতালের মত নেশাগ্রস্থ হয়ে ঝিমিয়ে গেছে। দূর বহুদূর কোনো রাস্তায় ছেলে ছোকরার পায়ের লাথিতে টিনের কৌটার ছিটকে যাওয়ার শব্দগুলোও বড় বিচ্ছিন্ন মনে হয়। এরকম রাতে কারো জেগে থাকার মত অপরাধ করা উচিত না পারত পক্ষে। কাঁথামুড়ি দিয়ে এই খণ্ডকালীন বর্ষার রাতের শীত আমুদে গায়ে মেখে ঘুমিয়ে থাকাই দরকার। মশারীর আবছা দেয়ালের ওপাশের খোলা জানালা দিয়ে শন শন করে একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, ঘুম পাড়ানি বাতাস। এই বাতাসে জেগে থাকা বড় কঠিন। চাইলেই চোখের পাতা টেনে আটকানো মুশকিল। কয়েক মণ ভার নিয়ে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। ফিসফিস করে কানের পাশে কেউ যেন মায়াবী কণ্ঠে বলতে থাকে, “ঘুমিয়ে পড়ো... ঘুমিয়ে পড়ো..... ঘুমিয়ে পড়ো.....” পায়ের পাতা কাঁথার সামান্য বাহিরে গেলেই শির শিরে একটা ঠাণ্ডা ভাব এসে নিচু স্বরে জানান দিয়ে যায়, এখন জেগে থাকার সময় নয়। পৃথিবী বিশ্রামে যায়নি, নিদ্রায় যায়নি, তন্দ্রায় গেছে বর্ষা কিংবা বৈশাখের আগমনী বার্তার একটা হীমেল রাত্রীতে।
হাতের জমা পেইন্টিংগুলোয় কয়েকটা ফাইনাল টাচ দিতে দিতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল ছেলেটার। তারওপরে সন্ধ্যা থেকেই কারেন্ট নেই। চার্জার জ্বালিয়ে কাজ করতে হয়েছে। চার্জের আলোই বা থাকে কতক্ষণ, ওটা শেষ হওয়ার পর মোমের আলোয় আরো কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে, রীতিমত চোখের ওপর অত্যাচার করে কাজগুলো পুরোপুরি শেষ করতে না পারলেও এগিয়ে নিতে হয়েছে। নাহলে পরে ঠেকে যাবে। সময় মত ক্লায়েন্টকে ছবি দিতে না পারার জন্য এরমাঝেই যথেষ্ট বদনাম হয়ে গেছে ছেলেটার। আজকাল কাজ খুব কম আসে। টাকাও তেমন পায় না। দুয়েকটা টিউশনি যাও বা ছিল, ছাত্র ছাত্রী ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সেগুলোর পাটও চুকিয়ে দিয়েছে। হাতে এখন আর কাজ বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। নতুন কোনো টিউশনিও নেই যে করবে, ক্লায়েন্টের অর্ডারের ওপরেই এখন ভরসা যা। মোড়ের কম্পিউটারের দোকান থেকে বেশ কয়েক কপি সাদা কালো বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছিল কয়দিন আগে। ছবি আঁকায় আগ্রহী ছাত্র ছাত্রী থাকলে শেখাবে, ইংরেজী আর অংকে পড়াতেও চায়। কয়েকটা পিলার আর দোকানের পাশের দেয়ালে আঁঠা দিয়ে সেগুলো লাগিয়েছিল। দুদিন যেতে না যেতেই কে বা কারা যেন ছিঁড়ে দিয়েছে। মোবাইল নাম্বার কিংবা বিজ্ঞপ্তির একটা লাইনও বোঝার আর উপায় নেই। উলটো কে যেন কলম দিয়ে যোগ করেছে, “সুন্দরী ছাত্রী থাকলে পড়াতে আগ্রহী। প্রেম করতে রাজী থাকলে বিনা বেতনে পড়াবো!”
মেসের ভাড়াও বকেয়া পড়েছে দুই মাসের। মেস ম্যানেজার আসতে যেতে এমন চোখে তাকায় যেন পারলে চোখ দিয়েই ছিঁড়ে ফুঁড়ে খেয়ে ফেলে। বাড়িতেও টাকা পাঠানো যাচ্ছে না। বাড়ির যে কি অবস্থা কে জানে। আব্বার পেনশনের টাকা দিয়ে আর কত যায়? আম্মাকেও শাড়ি টাড়ি শেষ কবে দেয়া হয়েছে ভুলতেও বসেছে। ফোন টোন দেয়া হচ্ছে না প্রায় সপ্তাহখানেক হল। কি কি যে বাজার করে খাচ্ছে আল্লাই জানে। আব্বার চোখের ছানির সমস্যাটা নিয়েও কিছু করা হয়নি। শহরে নিয়ে আসবে আসবে করেও কাজ এগোচ্ছে না। ভাল ডাক্তারের এপোয়েন্টমেন্ট দিয়ে রাখতে হয় একমাস আগে থেকে। সেই টাকাও আবার পেট মোটা অংকের। ছোটনের চলছে এসএসসি পরীক্ষা। তাও আবার গণিতে খারাপ পরীক্ষা দিয়েছে। এখন দুনিয়ার সব কিছু ফেলে দিয়ে বাসায় বসে আছে, সে নাকি আর পড়াশোনা করবে না। এটাই শেষ। পরীক্ষায় ফেল করলে সে নাকি বিদেশ চলে যাবে। কীভাবে যেন জানতে পেরেছে বিদেশে নাকি কাজের জন্য কম বয়সী ছেলে পেলেরাও যায়। সেও যাবে। বাড়িতে গিয়ে ওকেও বোঝানো দরকার। এখনই এসব বাউণ্ডুলেপণার সময় না, জীবন এত ছোট না, সহজ না যে বর্ডার পেরুলেই দুঃখ দুর্দশাকেও পেছনে ফেলে আসা হবে। ওখানে আরো কঠিন জীবন অপেক্ষা করে বসে আছে। একটা নিঃশ্বাস ফেলে ছেলেটা খুব সাবধানে। বহু কাজ জমে গেছে, অনেক কাজ।
শেষ ছবিটায় ওপর থেকে ওয়েল প্যাপার দিয়ে ঢেকে দিতে দিতে গলতে গলতে মৃতপ্রায় মোমবাতির আলোয় হাতঘড়িটার দিকে তাকায় ছেলেটা। তিনটা পয়ত্রিশ বাজে। দরজা জানালা সব খোলা। পিন পিন শব্দে সুর তুলে এক গাদা মশা উড়ছে যদিও, কিন্তু মিহি একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসতেই রয়েছে ক্রমাগত জানালা দিয়ে। একটানা ছবি আঁকার কারণে গায়ের পাঞ্জাবীটা ঘেমে পিঠের সাথে লেগে গেছে। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে নাকের ঘাম মুছল ছেলেটা। চোখের চশমাটা খুলে দুই আঙুল দিয়ে নাকের ওপর দিকটায় চোখের কোণ টিপে ধরলো খোলা দরজাটার দিকে এগিয়ে এসে। বাহিরে কেমন যেন ঘোলাটে একটা আলো ফোটা শুরু করেছে এতক্ষণে। শেষ রাত কিংবা ভাঙা চাঁদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে আলোটা। যদিও মিহি একটা কুয়াশা টাইপের বৃষ্টি থেকে থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে অনেকদূর পর্যন্ত।
মোমের শিখাটা গলে একপাশে উলটে পড়ে যেতেই দপ করে ঘরের ভেতরের আলোটা নিভে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশটা আবার কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল যেন মন হল ছেলেটার। যদিও জানে অন্ধকার আবার সয়ে যাবে চোখে। তারপর সেই মিহি আলোটা আরো স্পষ্ট দেহাবয়ব নিয়ে ফুটে উঠবে।
বহু দূর থেকে মালবাহী ট্রাকের চাকার তীব্র আর্তনাদ শোনা যায়। ভয়ংকর গতিতে বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। বিচ্ছিন্ন কোনো কুকুরের করুণ সুরে কান্নার আওয়ার পাওয়া যায়। তারপর আবার চুপ। সময় যেন অসম্ভব ধীর গতিতে গড়াচ্ছে।
একটা সিগারেট ধরাতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু প্যাকেটে কিছুই নেই। দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা খুঁজলেও সম্ভবত কাঠি পাওয়া যাবে না। মোম জ্বালানোর সময়েই শেষ কাঠিটা খরচ করে ফেলেছে। প্যাকেটে তিনটা বেনসন ছিল, ছবি আঁকার সময় মোমের শিখায় ধরিয়ে সবগুলোই টেনে শেষ করেছে। এই শেষ রাতে এসে যদি ফুসফুসটা নিকোটিনের ধোঁয়ার জন্য আকুপাকু করা শুরু করে, কেমন লাগে? সরকারের উচিত প্রতিটা বাসায় ইলেক্ট্রিকের লাইন দেয়ার মত করে একটা করে নিকোটিনের লাইন দেয়া। প্রয়োজনে মাস হিসাবে সেটার বিল করা হবে। কিন্তু যখন তখন নিকোটিন প্রেমিরা সেই লাইন নামিয়ে কলকেতে মুখ দেয়ার মত ধোঁয়া টেনে নিতে পারবে। সিঙ্গেল প্রিপেইড সিমের ইন্টারনেটের চেয়ে ব্রড ব্যাণ্ড যেমন শ্রেয়, সিঙ্গেল প্যাকেট সিগারেট ধোঁয়ার চেয়ে ক্যাবল লাইনের মত নিকোটিন লাইন চালু রাখা। ৫১২ কেবিপিএস, ১ এমবিপিএস এর মত সেই নিকোটিন লাইনেও ক্যাটাগরি আলাদা আলাদা ভাবে দেয়া থাকবে, আবুল বিড়ি কিংবা মেরিসের রেট সব চেয়ে কম থাকবে, লিফের লাইনের রেট সামান্য বেশি, বেনসন ব্লুর লাইনে রেট আরেকটু বেশি, গুদাংগারাম কিংবা ডানহিলের বেলায় রেট থাকবে সপ্তমে। ইলেকট্রিক বিল মাসে মাসে যেমন আসে, তেমন ভাবে বিল আসবে। মোবাইল ব্যাংকিঙের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করার ব্যাবস্থা থাকবে। ধুমপায়ী সমাজের জন্য জীবন হবে সহজ, সুখময়, নিশ্চিন্ত।
পানির তৃষ্ণাও লেগেছে। ময়লা আয়রন জমা একটা ট্যাপ খাওয়া পানির বোতল রয়েছে চৌকির পায়ের দিকটায়। পানি আছে কিনা কে জানে। দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে পানির বোতলটা অন্ধকারে হাতড়ে তুলে নিলো ছেলেটা। একেবারে তলানিতে সামান্য পানি রয়েছে। ঢাকনাটাও লাগানো হয়নি। কই পড়েছে কে জানে। মুখে লাগিয়ে ঢক ঢক করে পুরোটা খেয়ে নিয়ে সব দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে- এমন সময় ফোন্টা বেজে উঠল। রিং টোন অন করাই ছিল, নিস্তব্ধ রাতের মাঝেই সেই সামান্য শব্দে চারপাশের নীরবতা রীতিমত ঝনঝন করে ভেঙে পড়লো।
চৌকির ওপর একশো একটা কাপড় চোপড় দলামোচা করে ফেলে রাখা। আধখানা পেটিস, ভাতের প্লেট, ফিজিক্সের বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মোবাইলটা তার মাঝেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। দেখা যাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি হাতড়াতে থাকে ছেলেটা মোবাইলটার জন্য। ভাইব্রেশন দেয়া আছে। চৌকিটা থেকে থেকে মৃদু লয়ে কাঁপছে। শব্দ আর ভাইব্রেশন থাকা সর্ত্বেও অবশ্য খুঁজে বের করতে বেশ বেগ পেতে হল ছেলেটার। একেবারে কোণার দিকে খাতার নিচে ছিল। একবার রিং থেমে দ্বিতীয়বার রিং শুরু হয়েছে কেবল, তখন হাতে নিলো ফোনটা। যার ফোন এসেছে আন্দাজ করেছিল, সে’ই করেছে। সবুজ বোতামটা টিপে চট করে কানে লাগালো, “হ-হ্যালো?”। অনেকক্ষণ কথা না বলে থাকার পর কথা বলতে গিয়ে কেমন যেন আটকে গেল কথা।
“হ্যালো? জেগে আছো টোনা সাহেব?” ওপাশ থেকে ফিসফিস একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“হু, জেগেই আছি। আরেকটু পর কল দিলে হয়তো ঘুমে পেতে। মাত্রই শোয়ার চিন্তা ভাবনা করছিলাম।” পাঞ্জাবীর বাহুর দিকটায় মুখ মুছে বলল ছেলেটা। খোলা দরজা দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। এখানে ঝিরঝিরে একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। জড়িয়ে যেতে লাগলো শরীরটা। একটা টুল রয়েছে বারান্দায়। ওটার ওপর দলামোচা করে একটা প্যান্ট ফেলে রাখা হয়েছিল, ওটা উঠিয়ে বারান্দার দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়ে টুলে গিয়ে বসল, “এখনো ঘুমাওনি তুমিও?”
“আমি তো ঘুমাইনি। কালকে পরীক্ষা আছে জানো না? ভুলে গেলে? এই মেডিক্যাল তো আমাকে কবরে পাঠায় দিলো। যে একেকটা পরীক্ষা দিচ্ছি আজকাল! মেডিসিন দিলাম ঐদিন, সারা রাত ঘ্যানর ঘ্যানর করে গলা ফাটায় পড়ে গেলাম। প্রশ্ন যেগুলা এলো- সেগুলো আমি কেন, আমার চৌদ্দগুষ্টিও কুনোদিন চোখে দেখে নাই! সওওওব আনসিন কোয়েশ্চান! আমি তো মেডিসিন স্লোগানও রেডি রেখেছি এরপর থেকে- “আসছে এবারে মেডিসিন, মোছিবতের সালাম নিন।” “আরাম রে তোর রক্ষা নাই, আসছে এবার মেডিসিন ভাই!” একদমে ফিসফিস করেই বলে গেল মেয়েটা।
একটা মানুষ কেবল ফিসফিস করেই এতোটা হরবড়িয়ে কীভাবে কথা বলে ছেলেটা ভেবে পায় না। একটু অবাক হয়ে বলল, “এতো ফিসফিস করছো কেন? আসে পাশে মানুষ আছে নাকি?”
“আছে তো! আম্মা আছে না! সন্ধ্যার সময়েই আম্মা আব্বার ঢিশুম ঢাশুম হয়ে গেছে একদফা। একজন আরেকজনের মুখ দেখে না। আজকে আম্মা আমার সাথেই ঘুমাবে। তাই ফিসফাস ছাড়া গতি নাই টোনা বাবু।”
“আমি তো ভেবেছিলাম তুমি পরীক্ষার জন্য হোস্টেলে থাকবে। বাসায় কখন এলে?”
“ডরমে পড়া হোতো না দেখেই তো বাসায় এলাম। কিন্তু বাসায় এসে দেখি কুরুক্ষেত্র খাঁড়া করে রেখেছে জামাই বৌ! পারলে কুস্তিও করে। শুধু আব্বার ডায়বেটিস আর আম্মার প্রেশারের জন্য দুজনেই দুবলা, মুখ খরচ করেই খান্ত দিয়েছে এইবেলা। হাতাহাতি পর্যন্ত আগায় নাই। আমি অবশ্য দুই বালতি ঠাণ্ডা পানি রেডি রেখেছিলাম। মারামারি করার মত অবস্থা দেখলেই পানি মেরে দিতাম দুটোকেই।” মহা উৎসাহের সাথে রণক্ষেত্রের বিরবণ দিল মেয়েটা। যেন বিশাল আনন্দে আছে।
ছেলেটা পিটপিট করে তাকালো, “পানি ঢেলে দিতে? তোমার আব্বা আম্মার উপরে?”
“দিতাম। আগেও দিয়েছি। এই বয়সে এসে বুড়োধারী দুটো জামাই বৌ খামচা খামচি করে- এইটা একটা দেখার বিষয় হল? তুমি হলে পানি ঢালতে না? বলো?” ফিসফাস কণ্ঠের মাঝেই যেন ধমক মেরে জিজ্ঞাস করল।
অপ্রস্তুত হয়ে গেল ছেলেটা। আমতা আমতা করতে লাগলো, “ন-না ম্মানে ইয়ে..... আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে কি.......”
“কোনো ব্যাপার ট্যাপার নাই। এই দুইটা একলা একলা থাকে তো, তাই ঠুশঠাশ লেগে যায়। আমি থাকলে এতো লাগতো না। আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। বুঝলে? এইজন্য বাচ্চা কাচ্চা কখনো একটা নিতে নাই, নিলে দুইটা নিবা। একটা বাহিরে থাকলেও আরেকটাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা যায়। আমি দুইটা বাচ্চা নিবো।”
“দ-দুইটা?”
“হু! তোমার কোনো সমস্যা আছে?” মোটামুটি ফিসফিস পর্যায়ের হুংকার দিল মেয়েটা।
“হ-নাআ! আমার আবার কি সমস্যা থাকবে।”
“হুম। না থাকলে ভাল। আর থাকলেও সমস্যা নাই, ডাক্তার হচ্ছি, ওষুধ পত্র দিয়ে একেবারে সোজা লাইনে এনে দেবো। তোমাদের ছেলেছোকরাদের তো আবার হাজার পদের সমস্যা থাকে। বিয়ের আগে শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি...” একটানা বলেই যাচ্ছে সে।
ছেলেটা টের পাচ্ছে কান টান গরম হয়ে যাচ্ছে লজ্জায়। প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য তাড়াতাড়ি বলল, “তুমি যে এতো জোড়ে সোড়ে ফিসফিস করে কথা বলছো তোমার আম্মা শুনতে পাচ্ছে না? এক সাথে না শুয়েছো?”
“আরে নাহ! আম্মাই না শুয়েছে। আমি তো বিছানাতেই যাই নাই। আমি পাশের ঘরে এসে বক বক করছি। পাছে আব্বা শুনে ফেলতে পারে, তাই বাড়তি সাবধানতা।” বেশ নিশ্চিন্ত সুরে বলল মেয়েটা।
“অ।” কথা না পেয়ে চুপ হয়ে যায় ছেলেটা।
ওপাশে থেকে থেকে শব্দ হচ্ছে। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হেডফোন লাগিয়ে কি করছে মেয়েটা বোঝার উপায় নেই। তারমাঝেই কথা চালিয়ে যাচ্ছে অনর্গল। তবে ফিসফিস।
“কি হল টোনা বাবু? কথা বলো না ক্যান? হু?”
“কি বলবো?”
“কথা নাই?”
“ন-না ঠিক তা না.....”
“তাহলে? আমি তো মুখ খুললেই রেলগাড়ির মত চলতে থাকি। তোমার কথা বলায় এতো সমস্যা কেন?”
নড়েচড়ে বসে ছেলেটা। উত্তর খুঁজে পায় না।
“আচ্ছা বাদ দাও। আমিই জিজ্ঞাস করি। কি করছিলে এতোক্ষণ?”
“কয়েকটা ছবি বাকি ছিল। ওগুলো এঁকে শেষ করলাম আরকি। ঘুমও আসছিল না। তাই। তোমাদের ওদিকে বৃষ্টি হয়নি? আমাদের এদিক তো রীতিমত ভেসে গেছে। চারপাশে এখন বর্ষাকালের ঠাণ্ডা।”
“বৃষ্টি! এদিকে ঠাঠা রোদ.... থুক্কু রাতের বেলায় আবার রোদ কোত্থেকে আসবে, মানে ঠাঠা গরম পরেছে। অবস্থা একেবারে খারাপ। একেতো গরম, তারওপর আবার কারেন্ট গেছে। তারও উপর পরেছি শাড়ি..... গরমে প্রায় সেদ্ধ হওয়া দশা আমার!”
ভীষণ অবাক হয়ে বলল ছেলেটা, “শাড়ি? এই রাতের বেলা হঠাৎ শাড়ি.....”
“ওহহ! বলতে তো ভুলেই গিয়েছিলাম টোনা বাবু, আমাকে দেখতে এসেছিল সন্ধ্যায়। তখন শাড়ি পরেছিলাম। আর খুলিনি।” সরল গলায় বলে মেয়েটা।
সাথে সাথে জমে যায় ছেলেটা। মেরুদণ্ড সোজা করে বসে টুলটায়। প্রথম কয়েক মুহূর্ত কথা খুঁজে পায় না ছেলেটা। পিনপতন নীরবতা।
“হ্যালো? টোনা বাবু?” ফিসফিস ডাকটা শোনা যায় ওপাশ থেকে। সাথে কাঁচের চুড়ির টুনটান শব্দ।
জিভ দিয়ে শুঁকনো ঠোঁট ভেজালো ছেলেটা, “ত-তোমাকে দেখতে এসেছিল?”
“হ্যাঁ! সে জন্যই তো বাসায় এলাম পরীক্ষার মাঝেও!” খুব সহজ গলায় বলতে থাকে, “ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় সেটেল্ড। সেও ডাক্তার। নিজের গাড়ি, বাড়ি সব আছে। বড় কথা হল বাপ মায়ের একমাত্র ছেলে। আমার মত। চাচ্ছিল এ মাসেই পরীক্ষা শেষ হলে বিয়ে করে ফেলতে। বরের নাকি খুব মনে ধরেছে আমাকে।”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে খস খসে গলায় ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “ত-তাহলে কি ঠিক হল? বিয়ে কখন করছে সেই ছেলে?”
“আজব! তার বিয়ে কবে আমি কি জানবো? আমি কি তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি নাকি? একটু আগে দুই বাচ্চার ফ্যামেলি প্ল্যানিং করলাম তোমার সাথে, সেটা কি?” চোখ মটকে বলে মেয়েটা।
থমকে যায় ছেলেটা। কথা হারিয়ে ফেলে আবার।
“আচ্ছা তোমরা ছেলেরা এরকম কেন? গার্লফ্রেণ্ডকে ছেলে দেখতে এসেছে শুনলেই এরকম কেঁচো মেরে যাও কেন? একটুও কি ভরসা করা যায় না? আমাদের উপর”
“ন-না! তা কেন যাবে না? আমি কি স-সেটা বলেছি নাকি?”
“তাহলে তোতলাচ্ছো কেন? ঠিক ভাবেই না কথা বলবে। তোমার ওখানে তো আর কেউ ঘুমিয়ে নেই এখানকার মত। যে ফিসফাস করতে হবে, তোতলাতে হবে ভয়ে!”
চুপ হয়ে যায় ছেলেটা আবার। কথা খুঁজে পায় না। অস্থির লাগতে থাকে খুব। বাহিরের আবছা অন্ধকারের এক ফাঁক গলে একচিলতে চাঁদ বেরিয়ে এসেছে। যদিও খুবই ম্লান আলো, সেই সাথে অসম্ভব ঠাণ্ডা ভেজা বাতাস। ঘাম শুঁকিয়ে গিয়ে পাঞ্জাবীর গায়ে শীত কামড় বসাচ্ছে। একদৃষ্টে সামনের সেই ঘোলাটে আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকে উদাস ভঙ্গিতে। অস্থিরতাটুকু কেন যেন বাড়ছে। কথা বলতে না পারলে কেন যেন এরকম লাগে। ভেতরে অসংখ্য কথা পাগলের মত দৌড়াতে থাকে, অথচ বের হতে পারে না একটা শব্দও।
“কি হল? একদম চুপ হয়ে গেলে যেন? মন খারাপ হয়ে গেছে? এই? এই? এএএএএইইই......” জবাব না পেয়ে আরো জোরে ফিসফিস করে উঠল মেয়েটা, “উফরে! এই ছেলেটাকে নিয়ে আমি আর পারবো না। একটু ফাজলামোও করা যায় না! আশ্চর্য! এই এত গাল ফুলাও কেন তুমি? আমার আব্বার মত ঝগড়া করতে পারো না? তুমি তো দেখছি আমার লাইফে এন্টার্টেইনমেন্ট বলেই কিছু রাখবে না! আচ্ছা যাও, আমি দুষ্টুমী করছিলাম তোমার সাথে। আমাকে দেখতে আসনি কেউ। একদম সত্যি। ফার্মা সত্যি, মেডিসিন সত্যি, তুমি সত্যি! তিন সত্যি! প্লিজ এবার তো কিছু বলো টোনাবাবুউউউ?” করুণ সুরে বলে ওঠে মেয়েটা।
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত চুপ থেকে নীরবতা ভাঙল ছেলেটা অবশেষে, “ত-তাহলে যে বললে শাড়ি পরেছো? চুড়ির শব্দও তো পাচ্ছি মনে হল?”
“হ্যাঁ, শাড়ি পরেছি।” হাল ছেড়ে দেয়ার মত করে বলে মেয়েটা, “তুমি তো জানো যে শাড়ি পরার জন্য মাঝে মাঝে মাথা আউলা ঝাউলা হয়ে যায়। বাসায় এসেছি কেন জানো? ভাবলাম বাসায় এসে একেবারে শেষ রাতে উঠে শাড়ি পরে বসে থাকবো বারান্দায়। তোমার সাথে কথা বলবো অনেকক্ষণ। তারপরও যখন তুমি ঘুমিয়ে যাবে, আমি বারান্দায় বসে বসে ভোর হওয়া দেখবো।”
ছেলেটা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে।
“খুব বেশি পাগলামী করি, তাই না?” হঠাৎ কেমন যেন অপরাধীর মত গলায় বলে মেয়েটা। আগের সেই উচ্ছ্বাসটা নেই। “জানো, আমার এরকম প্রায়ই হয়। প্রচণ্ড রকমের পড়াশোনার চাপ, এর মাঝে মাথা বিগড়ে যায়। মনে হতে থাকে একটা সবুজ জমিনের শাড়ি পরে মাঝরাতে ঢাকা শহরের সুনসান নীরব রাস্তাগুলোর মাঝে হেঁটে বেড়াই। পায়ে থাকবে নুপূর, আর হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। খুব দূরে কোথাও মাত্র একটা টং দোকান খোলা থাকবে, ঐযে রিক্সাওয়ারা দাঁড়িয়ে চাকায় হাওয়া দেয় না যে সব টং দোকানের সামনে, সেরকম কোথাও। সেখানে গিয়ে আদা দেয়া রঙ চা খাবো। খালি পায়ে একা একা দৌড়ে বেড়াবো পুরো শহরটার অলিতে গলিতে। কিন্তু সকাল হওয়া যাবে না। যতক্ষণ আমার মন ভরবে না, আমি হাঁটবো, দৌড়াবো, হাসবো খিলখিল করে, চিৎকার করে গান গাইবো, দেয়ালে দেয়ালে আমার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হবে, শহরের আকাশ জুড়ে একটা বিশাল চাঁদ ঝুলে রইবে সেদিন, আমার প্রতিটা রাস্তায় টন কে টন জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়ে বন্যা বানিয়ে দেবে, আমি শুধু দৌড়াবো.... আমার খুব ইচ্ছে হয় তুমি বুঝতে পারো?”
ছেলেটা মুগ্ধ হয়ে মোবাইল ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরে শক্ত করে। দৃষ্টি ঠিক কতদূর চলে গেছে বুঝতে পারে না। কিন্তু প্রচণ্ড ইচ্ছে হয় মেয়েটাকে একটু দেখার জন্য। ওর হাতটা একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য।
“টুনি?” ফিসফিস করে কথা বলে এবার ছেলেটা।
“হুম?”
“তুমি জানো তুমি আসলে কতটা পাগল?”
“আমি না। আসলে সব মেয়েরাই পাগল। কেউ মনের ইচ্ছের কথাটা বলে, আর কেউ বলতে পারে না। কিন্তু স্বপ্ন আসলে সবাই দেখে। একই রকম স্বপ্ন দেখে। হয়তো রঙের বর্ণগুলো সামান্য এদিক সেদিক হতে পারে। কিন্তু সবাই অনেক স্বপ্ন পোষে। কিন্তু শোনার মানুষ কোথায়? তাদের পুরো জীবনটাই তো অন্যের স্বপ্ন পুরন করতে করতেই কেটে যায়।” একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে মেয়েটা। “আমার কেন যেন কিছুই পুষে রাখতে ইচ্ছে হয় না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে সবটা উগড়ে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ও টোনাবাবুউউউ, তুমি আমার রাজপুত্তুর হয়ো না, তুমি আমার সেই বন্ধুটা হও যে আমাকে আমার স্বপ্নের মত বাঁচতে চাওয়াটাকে একদিনের জন্য হলেও পুরন করে দেবে। আমার মন খারাপের সময়গুলোতে আগডুম বাগডুম ভাঙা গলায় গান শুনিয়ে মন ভাল করে দেবে। আমার মেয়ে জীবনটা মেয়ে জীবনে আটকে দেবে না, আমাকে ঠিক তোমার মত কত বাঁচতে দেবে, ঠিক তুমি যেভাবে প্রতিটা দিনের জীবনকে উপভোগ করো, সহ্য করো- আমিও করবো?” ভারী অদ্ভুত শোনায় মেয়েটার আকুতিটুকু।
ভেজা চাঁদটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছেলেটা সূক্ষ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস গোপণ করে। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়।
দীর্ঘ নীরবতা। কোন পাশ থেকেই কেউ কথা বলছে না।
অবশেষে মেয়েটাই বাধ্য হয়ে যেন প্রথম কথা বলল, “আচ্ছা তুমি কথা বলতে পারো না কেন? আমার সব সময় কি মনে হয় জানো? মনে হয় আমি যখন এক নাগাড়ে বক বক করে অনেক কথা বলতে থাকি, তুমিও মনে মনে আমার সাথে অনেক কথা বল। কিন্তু আমাকেই কেবল বলো না কখনো। প্রায়ই মনে হয়, অসম্ভব অসম্ভব কষ্টে তুমি তোমার কথাগুলো জমিয়ে রাখো, বলতে পারো না। এরকম কেন মনে হয় আমার বলতে পারবে? সত্যিই কি তুমি অনেক কিছু বলতে চাও?”
“ক-কি জানি! আমার তো ওরকম কিছু মনে হয় না। চারদিকের হাজারটা টেনশন নিয়ে থাকি, বরং তুমি কথা বললে তোমার কথা শুনে একটু রিলিফ পাই আমি। মনে হয়, এইতো বেশ আছি।” কি বলবে বুঝতে পারে না ছেলেটা।
ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটা, “মাঝে মাঝে তোমাকে আমার রোবট মনে হয় টোনাবাবু। এতো কথা যদি জমিয়েই রাখবে, আমার ভালবাসা আমি পাবো কই বলো?”
“সমস্যা নেই, তোমার আঁঠা আঁঠা হাত আছে না? হাত ধরে চুপ চাপ বসে থাকবো আমি। আমার কথা বলতে হবে না।”
“আমি কি পিকে নাকি যে হাত ধরে বসে থাকবে আর আমি তোমার মাথায় কি কি ভালবাসাময় চিন্তা ভাবনা উদয় হচ্ছে সব জেনে যাব? আর এই আঁঠা আঁঠা হাত ধরে কি এত পাও বল দেখি? তুমি যতবার এই আঁঠার কথা বলো না, আমার ততবারই মন ছোট হয়ে যায়, কি বিদঘুটে একটা ব্যাপার! হাত হবে হাতের মত, সেটা কিনা ফেবিকলের মত আঁঠালো!” আপন মনেই গজ গজ করতে থাকে মেয়েটা।
এই প্রথম হাসে ছেলেটা। “অর্নবের একটা গান মনে পড়ছে ঘোলাটে ঠাণ্ডা এই চাঁদটা দেখে। শাড়ি পরে আছো শুনে গানটা আরো বেশি মাথায় ঘুরছে কিছুক্ষণ হল। শুনবে?”
হাসি ফোটে মেয়েটার চোখেও, “শুনবো! তবে তার আগে বলো, আমাকে বিয়ে করবে?”
“করবো।”
“দুইটা বাবু নিবো হু? একটা ছেলে বাবু, একটা মেয়ে বাবু?”
“এমন ভাবে বলছো যেন জাফর ইকবালের সায়েন্সফিকশনের মত। জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করাই থাকবে, শুধু অর্ডার দিবে, ছেলে মেয়ে দিয়ে দেবে!”
“ওই হল একটা। সমস্যা তো নাই! আর সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবে?”
“আচ্ছা গেলাম। পুরো আরাকান রাজ্য তোমার শ্বশুরবাড়ী, নো টেনশন। আর কিছু?”
“আর? আর?..... আচ্ছা নাহ থাক, পরের জন্য তুলে রাখলাম। আজকে বলবো না ওটা। গান শুরু করো।”
“টুনি?”
“আবার কি?”
“টিপ পরেছো?”
“না তো।”
“কেন! আমার টিপ খুব পছন্দের! টিপ লাগিয়ে ফেল। তারপর গান ধরবো।”
“তুমি তো আর দেখতে আসছো না এখন। এই অন্ধকারে আমি টিপ কোথায় খুঁজবো?” চিন্তিত গলায় ফিসফিস করে মেয়েটা।
“আমি কি জানি? তুমি জানো। খুঁজে দেখো। না থাকলে কলম দিয়ে টিপ এঁকে নেও। আর ঠিক মাঝ বরাবর হয় যেন। ডানে বায়ে সরলে শেষে দুই জামাই পাবে।”
“এই শেষ রাতে লোডশেডিঙের মাঝে আমি কাঁটা কম্পাস আর চাঁদা নিয়ে বসবো টিপ সেন্টারে বসাতে? তোমাকে আসলে বলেই ভুল হয়েছে যে আমি শাড়ি, চুড়ি পরেছি!” গলায় যদিও বিরক্তির লেশ মাত্র নেই। প্রশ্রয় আর অনুরাগের মিশেল একটা কণ্ঠ।
“আমি অপেক্ষা করছি.....” হাসতে থাকে ছেলেটা এবার শব্দ করে। টুলে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে বারান্দার গ্রিলে দুই পা তুলে দেয়। ঠাণ্ডা বাতাসটা বাড়ছে ক্রমশ। বৃষ্টি আসবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। চাঁদটা একবার বের হচ্ছে, আরেকবার লুকিয়ে পড়ছে ঘন মেঘের আড়ালে।
“যাচ্ছি বাবা!” ফোনটা লাইনে রেখে উঠে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল মেয়েটার।
কানে মোবাইলে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে রয়েছে ছেলেটা। অপেক্ষা করছে মেয়েটার ফিরে আসার। আশ্চর্য রকম একটা শান্তি লাগছে কেন যেন বুকের ভেতরটায়। মনে হচ্ছে মরে গেলেও কষ্ট লাগবে না। কি ছেলেমানুষি ভাবনা!
খানিক বাদেই ফিরে এলো মেয়েটা, “নাও। টিপ দিয়েছি টোনাবাবু। একেবারে মাঝ বরাবর। খুশি? এখন আর দেরি না করে গান শুরু করো তো! শেষে না রাত ফুরিয়ে যায় গান ধরার আগেই।”
মৃদু হাসে ছেলেটা। গলা খাকারি দেয়, “তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসা টুনি, তুমি আছো বলেই হয়তো পৃথিবীটা এখনো দূর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি.....” খুব নিচু সুর থেকে গাইতে শুরু করে ধীরে ধীরে.......

“কষ্টগুলো শেকড় ছড়িয়ে
ঐ ভয়ানক একা চাঁদটার সাথে
স্বপ্নের আলোতে যাব বলে
যখন চোখ ভিজে যায় রাতে....
ভালবাসা তারপর দিতে পারে গত বর্ষার সুবাস
বহুদিন আগে তারাদের আলো শূন্য আঁধার আকাশ.....”


(সমাপ্ত)

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ৭:১৩

শায়মা বলেছেন: ভাইয়া
দুনিয়াতে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আর্টিস্টরা।আর তাদের একজনের এই লাভস্টোরি অনেক ভালো লাগলো ভাইয়া।আর টুনিকে বেশি ভালো লাগলো।

০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ১১:০৪

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক অনেক ধন্যবাদ আপা :)

২| ০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ৮:০০

বিজন রয় বলেছেন: সুন্দর গল্প।
++++

০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ১১:০৪

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ :)

৩| ০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ১০:২৭

সানজিদা হোসেন বলেছেন: কি সুন্দর ! কতদিন পর আপনার লেখা পড়ছি !

০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ১১:০৫

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপা। ভাল থাকবেন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.