| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

আমরা যারা কাজীপাড়ার পুকুরপাড়ের গলিতে থাকতাম, এখন শহরের নানান দিকে ছড়িয়ে গেছি। কিন্তু কেউ ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে আমরা আজও প্রথমে ওই গলির কথাই বলে ফেলি। তারপর সামলে নিয়ে বলি রূপনগর, কিংবা মিরপুর বারো, কিংবা দক্ষিণখান। গলি নাই, আমরা আছি। অথচ আমাদের বরাবরের ধারণা ছিল, জায়গা মানুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে।
গলির নাম ছিল পুকুরপাড়ের গলি, অথচ পুকুর আমাদের অনেকেই দেখে নাই। মুরুব্বিরা বলতেন, পুকুর ভরাট হয় আটাশি সালের বন্যার পরে, যখন শহরে মাটির দাম বাড়ল আর পানির দাম কমল। পুকুর গেল, নাম রয়ে গেল। নামের ভিতরে পুকুর এমনভাবে বেঁচে রইল যে গলির বাচ্চারা বড় হয়ে অন্য পাড়ায় গিয়ে বলত, আমাদের বাড়ির সামনে পুকুর আছে। সিটি কর্পোরেশনের খাতায় অবশ্য গলির অন্য নাম ছিল, শহীদ আনোয়ার সড়ক। আনোয়ার কে ছিলেন, কবে শহীদ হয়েছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের গলির কেউ দিতে পারত না, নামটা কেউ ব্যবহারও করত না। ফলে আনোয়ার সাহেব দুইবার হারিয়ে গিয়েছিলেন, একবার যুদ্ধে, একবার আমাদের মুখে। হারানো জিনিসের নাম পাহারা দেওয়ার অভ্যাস আমাদের গলির আগেই ছিল; আমরা তখনো জানতাম না, এই অভ্যাস আমাদের আরো কত কাজে লাগবে।
প্রথমে এসেছিল হলুদ যন্ত্রওয়ালা লোকগুলি। তারা তিন পায়ের উপর যন্ত্র দাঁড় করিয়ে এক চোখ বন্ধ করে আমাদের বাড়িগুলির দিকে তাকাত, যেন নিশানা করছে, আর খাতায় নম্বর লিখত। আমরা তাদের চা খাওয়াতাম, তারা চা খেত, নম্বর লেখা থামাত না। কয়েকদিন পরে বাড়ির গায়ে গায়ে লাল রঙে নম্বর পড়ল। নম্বরগুলি আমাদের হোল্ডিং নম্বরের সঙ্গে মিলত না; ওইগুলি ছিল অন্য কোনো খাতার নম্বর, যে খাতা আমরা কোনোদিন চোখে দেখি নাই, অথচ যে খাতায় আমাদের ভবিষ্যৎ লেখা হয়ে গিয়েছিল।
তারপর এল নোটিশ, তারপর ক্ষতিপূরণের ফাইল। ফাইলের ভিতরে ঢুকে আমাদের গলি এমন সব জটে জড়িয়ে গেল যার সঙ্গে ইট বা সিমেন্টের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সরদারদের তিন ভাইয়ের মামলা লাগল আপসনামা নিয়ে। কুদ্দুসদের দলিলে জমির পরিমাণ লেখা ছিল কাঠার হিসাবে, অফিস চাইল অযুতাংশের হিসাব। এই দুই হিসাবের মাঝখানে তাদের উঠানের এক কোনা এমনভাবে হারিয়ে গেল যে কাগজে সেই কোনা কোনোদিন ছিলই না। আর নূরজাহান মঞ্জিলের ব্যাপার দাঁড়াল সবচেয়ে অদ্ভুত। বাড়ির দলিল রিয়াজউদ্দিন মাস্টারের নামে, মাস্টার মারা গেছেন পঁচিশ বছর, ওয়ারিশান সনদ লাগবে, মৃত্যুসনদ লাগবে। মৃত্যুসনদ বের করে দেখা গেল তাতে নামের বানান লেখা রেয়াজউদ্দিন। ফলে কাগজপত্রে দাঁড়াল, যে লোক বাড়ি বানিয়েছিল সে মরে নাই, আর যে লোক মরেছে, বাড়িটা তার ছিল না। এই জট ছাড়াতে মাস্টারের নাতি ফয়সালকে সতেরোবার অফিসে যেতে হয়। সতেরো নম্বর বারে কাজ হয়ে যায়; কীভাবে হয় তা সে আমাদের বলে নাই, আমরাও জিজ্ঞেস করি নাই।
ভাঙার আগে গলি খালি হয়েছিল ধাপে ধাপে। খালি হওয়ার ওই মাসগুলিতে আমরা টের পেয়েছিলাম, একটা পাড়া একদিনে ভাঙে না, ভেঙে ভেঙে ভাঙে। প্রথমে গেল ভাড়াটিয়ারা; তাদের ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন ছিল না, নোটিশেরও দরকার ছিল না, তারা শুধু ট্রাক ডেকে উঠে গেল। যাওয়ার সময় কেউ কেউ বিদায়ও নিল না, কারণ যে পাড়া নিজেই থাকবে না, তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার কী আছে। আমরা, যাদের নামে দলিল ছিল, টাকা পেলাম; তারা, যাদের নামে কিছু ছিল না, কিছুই পেল না। এই ভাগাভাগি নিয়ে আমরা তখন বেশি ভাবি নাই, এখন মাঝে মাঝে ভাবি, এবং ভাবলে চুপ করে থাকি। তারপর এল ভাঙারিওয়ালারা। শেষ সপ্তাহে আমাদের দরজা জানালা গ্রিল চৌকাঠ সব খুলে খুলে ভ্যানে উঠল, কেজি দরে। যে দরজার খিল আটকে আমরা এতকাল ঘুমিয়েছি, সেই দরজা পাল্লায় উঠে ওজন হলো; কাঠের দাম উঠল, লোহার দাম উঠল, শুধু খিল আটকানোর অভ্যাসের কোনো দাম উঠল না। শেষ রাতগুলিতে আমরা দরজাহীন ঘরে মশারি টাঙিয়ে শুয়েছিলাম, এবং আশ্চর্য, চুরির ভয় তখন আর ছিল না, কারণ নেওয়ার মতো যা ছিল সব তো বেচাই হয়ে গেছে। শেষ শুক্রবারে মসজিদে একটা দোয়া হয়েছিল; দোয়ার পরের তবারক আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়েছিলাম, কারণ বসার চেয়ারগুলি তত দিনে বিক্রি হয়ে গেছে।
ভাঙার দিন আমরা অনেকে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক্সকাভেটরের হাত প্রথমে সরদারদের বাড়ির কার্নিশে টোকা দিল, যেন দরজায় শব্দ করছে, তারপর টান দিল। বাড়িগুলির সামনের অংশ ভাঙা হলো মাপমতো, লাল দাগ পর্যন্ত। ভাঙনের পরে যে খাড়া কাটা মুখগুলি দাঁড়িয়ে রইল, সেখানে আমাদের ঘরের ভিতরগুলি রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল। সরদারবাড়ির দোতলার গোসলখানার সবুজ ফুলতোলা টাইলস দেখা যেতে লাগল রাস্তা থেকে। কাদেরদের আলনায় তখনো দুইটা শার্ট ঝুলছিল, প্রথম কয়দিন কেউ নামায় নাই। একটা দেয়ালে আগের বছরের ক্যালেন্ডার, আরেকটা দেয়ালে খাটের মাথা ঘষা লাগতে লাগতে যে কালচে দাগ পড়ে, চল্লিশ বছরের সেই দাগ। কাটা মুখগুলি ইট দিয়ে বন্ধ করতে মিস্ত্রিদের সপ্তাহ তিনেক লেগেছিল। ওই তিন সপ্তাহ আমাদের গলির ভিতরবাড়ি রাস্তার লোকের চোখের সামনে খোলা পড়ে ছিল। আমরা টের পেলাম, দেয়াল আসলে কত পাতলা ছিল, আর ভিতরবাড়ি বলে আমরা এতদিন যা পাহারা দিয়েছি, তা দুই ইঞ্চি ইটের ওপাশেই ছিল।
সবচেয়ে উপরে, নূরজাহান মঞ্জিলের তিনতলার কাটা মুখে, দরজার চৌকাঠ দাঁড়িয়ে ছিল, আর সেই চৌকাঠের গায়ে পেনসিলের ছোট ছোট আড়াআড়ি দাগ। মাস্টারের ছেলে মনসুরের উচ্চতার দাগ, পাঁচ বছর বয়স থেকে তেরো বছর পর্যন্ত, পাশে তারিখ লেখা। দাগগুলি এতদিন ছিল ঘরের ভিতরের জিনিস; এখন সেগুলি আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল, আর কিছুদিন পরে, লাইন চালু হলে, ট্রেনের জানালার সমান উচ্চতায়।
চৌকাঠের ওই দাগগুলির একটা ছবি কে যেন ট্রেন থেকে তুলে ফেসবুকে দিয়েছিল। ক্যাপশনে লেখা হয়েছিল, মেট্রোরেলের পাশে এক মায়ের হাতের দাগ, ছেলে আর ফেরে নাই। ছবিটা বারো হাজার বার শেয়ার হলো, নিচে হাজার হাজার লোক দোয়া লিখল, কেউ কেউ কাঁদল। আমরা যারা জানতাম দাগগুলি মনসুরের, এবং দাগগুলি টেনেছিলেন রিয়াজ মাস্টার নিজে, প্রতি জন্মদিনে ছেলেকে চৌকাঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে, আমরা কমেন্টে কিছু লিখি নাই। টেলিভিশন চ্যানেল পর্যন্ত এসেছিল; তারা পিলারের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের গল্পই বলল, কারণ গল্পটা ততদিনে ছবির চেয়ে বড় হয়ে গেছে। সালেহা বানুকে তারা ক্যামেরার সামনে ধরেছিল; তিনি শুধু বলেছিলেন, দাগগুলা আমার ঘরের। সেটা প্রচারে যায় নাই, কারণ ওই কথা দিয়ে গল্প হয় না।
নূরজাহান মঞ্জিলের বাড়ি রিয়াজউদ্দিন মাস্টার বানিয়েছিলেন তিয়াত্তর সালে। যুদ্ধের পরের বছরগুলিতে ভাঙা শহরের ইট সস্তায় বিক্রি হতো; মাস্টার সেই ইট কিনেছিলেন গাড়ি হিসাবে, এবং বাড়ির পুবের দেয়াল গাঁথা হয়েছিল সেই ইটে, রঙে একটু কালচে, হাত রাখলে অন্য দেয়ালের চেয়ে ঠান্ডা। অধিগ্রহণের লাল দাগ পড়েছিল ঠিক ওই দেয়ালের উপর দিয়ে। ফলে একাত্তরের ইটগুলি দ্বিতীয়বার ভাঙা পড়ল, ট্রাকে উঠল, এবং কোথায় গেল আমরা জানি না; হয়তো শহরের আরেক প্রান্তে তৃতীয় কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নিজের ইতিহাস নিজে বহন করে।
নূরজাহান কে, এই প্রশ্নের উত্তর রিয়াজ মাস্টার জীবিতকালে কাউকে দেন নাই। কেউ বলত তাঁর মায়ের নাম, কেউ বলত ছোটবেলায় মারা যাওয়া এক বোনের, আর গলির মহিলাদের মধ্যে চালু ছিল তৃতীয় একটা ভাষ্য, যেটা তারা সালেহা বানুর সামনে কোনোদিন উচ্চারণ করে নাই। সালেহা বানু নিজে পঞ্চাশ বছরের সংসারে প্রশ্নটা করেছিলেন কি না, করলে কী উত্তর পেয়েছিলেন, তা আমরা জানি না। শুধু বাড়ি ভাঙার বছরখানেক পরে, এনজিওর এক মেয়ে যখন জরিপের ফরম নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, বাড়ির নাম নূরজাহান মঞ্জিল, নূরজাহান আপনার কে হন, তখন সালেহা বানু বলেছিলেন, নূরজাহান আমি। মেয়েটা লিখে নিল। আমরা যারা পাশে ছিলাম এবং জানতাম তাঁর নাম সালেহা, তারা কিছু বলি নাই।
মনসুর মালয়েশিয়া গিয়েছিল চুরানব্বই সালে, দালালকে জমি বেচা টাকা দিয়ে। প্রথম দুই বছর চিঠি আসত, তারপর ফোনের দোকান থেকে মাঝে মাঝে ফোন, তারপর কিছুই না। আটানব্বই সালের পরে তার কোনো খবর আমাদের জানা নাই। সালেহা বানু বলতেন, ও ব্যস্ত। এই শব্দ দিয়ে তিনি বাইশ বছর পার করে দিয়েছিলেন, এবং এত শান্ত গলায় বলতেন যে আমাদের মধ্যে কেউ কোনোদিন দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সাহস পাই নাই।
তবে বছরে একবার, অগ্রহায়ণের দিকে, নূরজাহান মঞ্জিলের ঠিকানায় একটা খাম আসত। প্রাপকের ঘরে রিয়াজউদ্দিন মাস্টারের নাম, পুরা ঠিকানা, হোল্ডিং নম্বর পর্যন্ত, টানা হাতের লেখা; প্রেরকের ঘর খালি। মাস্টার মারা যাওয়ার পরেও খাম আসা থামে নাই, বছরের পর বছর, একই হাতের লেখা, শুধু অক্ষরগুলি আস্তে আস্তে কাঁপা হয়ে আসছিল। খামগুলি সালেহা বানু খুলতেন কি না, খুললে কী পেতেন, তা আমরা কোনোদিন জানতে পারি নাই। ডাকপিয়ন সিরাজ শুধু জানত, খামগুলি কোনোদিন ফেরত যায় নাই।
বাড়ি ভাঙার পরের বছর সিটি কর্পোরেশন থেকে নূরজাহান মঞ্জিলের হোল্ডিং ট্যাক্সের নোটিশ এল। যে বাড়ির সামনের অর্ধেক তখন বাতাস, সেই বাড়ির খাজনা, বকেয়াসহ। ফয়সাল রাগ করে বলল, যে বাড়ি নাই তার খাজনা কিসের, আমি অফিসে গিয়া কাগজ ঠিক করামু। সালেহা বানু বললেন, কিছু ঠিক করা লাগব না। খাজনা যতদিন আসে, বাড়ি ততদিন আছে। তিনি নিজে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিলেন এবং রসিদ রাখলেন টিনের বিস্কুটের কৌটায়, যেখানে আগের পঁয়ত্রিশ বছরের রসিদ রাখা ছিল। তারপর থেকে প্রতি বছর নোটিশ আসত, প্রতি বছর তিনি খাজনা দিতেন, এবং সরকারের খাতায় নূরজাহান মঞ্জিল বেঁচে থাকল, যদিও সরকারের অন্য খাতায় বাড়িটা তত দিনে অধিগ্রহণ হয়ে মুছে গেছে। দুই খাতায় দুই রকম সত্য; আমরা কোনটা বিশ্বাস করব জিজ্ঞেস করলে সালেহা বানু বলতেন, যেই খাতায় টেকা নেয়, সেই খাতা মিছা কথা কয় না।
মাঝখানের বছরগুলিতে গলির উপর দিয়ে গেল নির্মাণ। পাইলিংয়ের মেশিন দিনরাত মাটিতে ঘা দিত, ধুপ, ধুপ, ধুপ, এবং সেই ঘায়ের তালে আমাদের যারা তখনো আশেপাশে ছিলাম, তাদের ঘুম আসত আর ভাঙত। দেয়ালের ফাটল মাপার জন্য অফিসের লোক এসে ফাটলের মুখে কাচের স্লাইড আঠা দিয়ে লাগিয়ে যেত; ফাটল বাড়লে কাচ ভাঙবে এবং আমরা প্রতিদিন সকালে উঠে কাচগুলি দেখতাম, যেন বাড়ির জ্বর মাপছি। তারপর পিলার উঠল, পিলারের মাথায় বসল লম্বা লম্বা গার্ডার, ক্রেন রাতভর হলুদ আলো জ্বালিয়ে কাজ করত, আর ধুলা। সেই দুই বছরে আমাদের রান্নাঘরের তাকে, কোরআন শরিফের গিলাফে, বাচ্চাদের বইয়ের ভাঁজে যে ধুলা জমেছে, তার ভিতরে আমাদের ভাঙা বাড়িগুলির গুঁড়াও মিশে ছিল; এই কথা আমরা তখন ভাবি নাই, ভাবলে খাওয়াদাওয়া মুশকিল হয়ে যেত। পাইলিং যেদিন শেষ হলো, সেদিন রাতে নাকি অনেকের ঘুম আসে নাই; শব্দ থামার পরের নীরবতা অচেনা লাগছিল।
আর পিছনের আধখানা বাড়িতে সালেহা বানুর সংসার দাঁড়িয়েছিল আশ্চর্য এক হিসাবে। সামনের ঘরগুলির আসবাব পিছনের ঘরে ধরে নাই; পুরানা আলমারি জায়গা না পেয়ে এক বছর উঠানের কোনায় পলিথিন মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, বর্ষায় ভিতরে পানি ঢুকে পাল্লা বেঁকে গেল, তারপর একদিন সেটাও ভাঙারির ভ্যানে উঠল। রান্না চলে গেল পিছনের বারান্দায়। সন্ধ্যাবেলা সালেহা বানু উঠানের পিঁড়িতে বসতেন নতুন গাঁথা ইটের দেয়ালের দিকে মুখ করে, যে দেয়ালের ওপাশে এক সময় তাঁর ঘরদুয়ার ছিল, এবং হাত তুলে দেখাতেন, ওইখানে আছিল বসার ঘরের জানালা, ওর পাশে মেহমানের খাট, উপরে মনসুরের ঘর। আমরা দেয়াল ছাড়া কিছু দেখতাম না, তিনি দেখতেন। তাঁর শরীরের ভিতরে বাড়ির নকশা এমনভাবে বসে গিয়েছিল যে হাঁটার সময় তিনি এখনো এক জায়গায় এসে পা উঁচু করতেন, যেখানে আগে চৌকাঠ ছিল, আর উঠানের যে কোনায় এখন পিলারের ছায়া পড়ে, সেই কোনা তিনি ঘুরে যেতেন, কারণ ওইখানে এক সময় রিয়াজ মাস্টারের খাট ছিল, এবং খাট যেখানে থাকে সেখান দিয়ে মানুষ হাঁটে না।
লাইন চালু হওয়ার পর আমাদের নতুন ঠিকানা হলো পিলারের নম্বর। ভাঙা গলির যেটুকু রইল, সেখানে কাউকে কিছু পাঠাতে হলে লোকে এখন বলে, চারশো সাঁইত্রিশ নম্বর পিলারের পিছনে, টিনের গেট। ঠিকানা লেখার এই নতুন নিয়ম কেউ বানায় নাই; নিয়ম পিলারের গায়ে স্টেনসিল করা কালো নম্বরের সঙ্গে এমনি এমনি চলে এসেছে। খাবার পৌঁছে দেওয়ার ছেলেরা মোটরসাইকেল থামিয়ে ফোনে বলে, পিলার কত নম্বর বললেন; আমাদের বুড়ারা প্রথম প্রথম রাগ করত, বাড়ির একটা নাম আছে না; এখন আর রাগ করে না, কারণ নাম দিয়ে এখন কেউ কিছু খুঁজে পায় না, নম্বর দিয়ে পায়।
চিঠিপত্র যা আসে, সিরাজ পিয়ন সেগুলি রেখে যেত হারুনের দোকানে। দোকানের ক্যাশবাক্সের নিচের ড্রয়ারে মরা ঠিকানার চিঠিরা জমা হতো: ব্যাংকের চিঠি, যে মানুষ নাই তার নামে; ভোটের সময় ভোটার স্লিপ, যে বাড়ি নাই সেই বাড়ির নম্বরে; একবার একটা বিয়ের কার্ড, যে পরিবার বিশ বছর আগে গলি ছেড়ে গেছে তাদের নামে। হারুন চিঠিগুলি ফেলে না। বছরে একবার, রোজার আগে দোকান ঝাড়ামোছার দিন, সে ড্রয়ার টেনে চিঠিগুলি বের করে, ঝেড়ে, তারিখ মিলিয়ে আবার সাজিয়ে রাখে। চকলেট কিনতে আসা বাচ্চারা কখনো জিজ্ঞেস করে, চাচা, ড্রয়ারে কী; হারুন বলে, চিঠি। বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে, কার; হারুন বলে, আছে মানুষ। উত্তর মিথ্যা না, আবার পুরা সত্যও না। পোস্টাপিস থেকে সিরাজকে বলা হয়েছিল, এইসব চিঠির গায়ে লিখে দিতে, প্রাপকের ঠিকানা বিদ্যমান নাই। সে লেখে নাই। সে বলত, ঠিকানা তো আর মানুষ না যে মইরা যাইব। রিটায়ারের আগের শেষ দিনটায় তাকে দেখা গিয়েছিল খালি ব্যাগ কাঁধে গলির ভাঙা মাথা থেকে হাঁটতে হাঁটতে পিলারগুলির গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে, যেন দরজায় দরজায় টোকা দিচ্ছে।
কাজীপাড়া আর শেওড়াপাড়ার মাঝখানে ট্রেন যখন আমাদের গলির উপর দিয়ে যায়, তখন বাঁ দিকের জানালায় দুই সেকেন্ডের জন্য কাটা বাড়িগুলির মুখ দেখা যায়। এই দুই সেকেন্ড নিয়ে নিয়মিত যাত্রীদের মধ্যে নানান কথা চালু হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। সরদারদের সিঁড়ি, যেটা তিনতলা পর্যন্ত উঠে শূন্যে শেষ হয়ে গেছে, সেইটা নাকি কেউ কেউ খোঁজে; কারো মতে সকালের ট্রেনে সিঁড়ি চোখে পড়লে দিন ভালো যায়, কারো মতে খারাপ, এবং দুই দলই জানালার কাচে মুখ লাগিয়ে সিঁড়িই খোঁজে। শীতের ভোরে কুয়াশার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো কোনো যাত্রী নাকি পুরা বাড়িগুলিই দেখেছে, আস্ত, না ভাঙা, জানালায় জানালায় কাপড় মেলা। এই কথা যারা বলে তারা কেউ আমাদের গলির লোক না; ফলে আমরা কথাটা বিশ্বাসও করি না, আবার ফেলতেও পারি না, কারণ আমাদের নিজেদেরই মাঝে মাঝে মনে হয়, কুয়াশার একটা নিজস্ব খাতা আছে, সেই খাতায় অধিগ্রহণ পৌঁছায় নাই।
মাঝে মাঝে অচেনা তরুণ তরুণীরা আসে, পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে, ভাঙা সিঁড়িটাকে পিছনে রেখে মোবাইলে নিজেদের ভিডিও করে। কী গান বাজে আমরা বুঝি না, তবে তারা যত্ন করে দাঁড়ায়, আলো দেখে দেখে সময় ঠিক করে; জায়গাটা তাদের কাছে সুন্দর। আমরা বারণ করি না। ভাঙা জিনিস যে সুন্দর, এই আবিষ্কার তাদের, আমাদের না; আমাদের কাছে ওইটা সিঁড়ি, ওই সিঁড়ি দিয়ে ছাদে আচারের বয়াম আর শুকনা কাপড় তুলতে যাওয়া হতো।
আর রাতের বেলা সরদারদের সিঁড়ির মাথায় মাঝে মাঝে কাউকে বসে থাকতে দেখা যায়। সিঁড়ির গোড়ায় কমিটির লাগানো গ্রিল, গ্রিলে তালা, তবু উপরে কেউ বসে থাকে। কেউ বলে পাগলা কুদ্দুস, যে ক্ষতিপূরণের টাকা ভাইদের কাছে খুইয়ে এখন পিলারে পিলারে ঘোরে; কেউ বলে কোনো জোড়া, যাদের বসার আর জায়গা নাই; আর কেউ কেউ কিছুই বলে না, শুধু জানালার পর্দা টেনে দেয়।
মেট্রো চালু হওয়ার মাস ছয়েক পরে সালেহা বানু একদিন একা স্টেশনে গেলেন। ভাড়ার মেশিন তিনি বুঝলেন না, কাউন্টারের ছেলেটা টিকিট কেটে হাতে ধরিয়ে দিল, চলন্ত সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে তিনি একবার রেলিং চেপে ধরলেন, তারপর উঠে গেলেন। সেদিন তিনি শেওড়াপাড়া থেকে কাজীপাড়া গেলেন, ফিরলেন, আবার গেলেন, আবার ফিরলেন; এইভাবে সাতবার। প্রতিবার তিনি বাঁ দিকের জানালার ধারে দাঁড়াতেন, ফেরার পথে ডান দিকের। শেষবারে প্ল্যাটফর্মের গার্ড ছেলেটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, চাচি, আপনে কই নামবেন। তিনি বললেন, নামুম না, বাড়িটা দেখতেছি। ছেলেটা আর কিছু বলে নাই, শুধু পরের ট্রেনে ওঠার সময় তাঁকে হাত ধরে তুলে দিয়েছিল।
ওই দিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে তিনি ফয়সালের মাকে বলেছিলেন, উপরের ঘরের দরজা খোলা। উপরের ঘর বলতে যে ঘর বোঝায়, মনসুরের ঘর, সেই ঘর তত দিনে দেড় বছর হয় বাতাস। কথাটা আমাদের কানে কানে ঘুরেছিল কিছুদিন; কেউ বলল বুড়া মানুষ, চোখে ভুল দেখছে; কেউ বলল ট্রেনের গতিতে সবই তো দুই সেকেন্ডের দেখা, দুই সেকেন্ডে খোলা আর ভাঙার তফাত কে করতে পারে; আর নুরুন্নেসার মা শুধু বলেছিলেন, দরজা যদি খোলাই থাকে, তাইলে তো ভালা, ঘরে বাতাস খেলে। এর বেশি আমরা আর আগাই নাই, কারণ কোনো কোনো কথার সামনে দাঁড়িয়ে বেশিক্ষণ থাকা যায় না।
তারপর এক শীতে, মাঘ মাসের শেষে, সালেহা বানু মারা গেলেন। ঘুমের ভিতরে, পিছনের আধখানা বাড়ির একমাত্র ঘরটায়, মাথার কাছে টিনের বিস্কুটের কৌটা, কৌটার ভিতরে ছত্রিশ বছরের খাজনার রসিদ। মসজিদের মাইকে এলান হলো, একটি শোক সংবাদ, একটি শোক সংবাদ, পুকুরপাড়ের গলি নিবাসী মরহুম রিয়াজউদ্দিন মাস্টারের স্ত্রী নূরজাহান বেগম ইন্তেকাল করিয়াছেন। নামটা মাইকে কে দিয়েছিল, ফয়সাল, না মসজিদের খাদেম, না অন্য কেউ, তা আমরা জানি না। আমরা প্রথমে চিনতে পারি নাই কে মারা গেছে; তারপর গলির নাম শুনে বুঝলাম, এবং বুঝে কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। এলানের ভিতর দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত নাম নিয়ে গেলেন, যেভাবে এনজিওর ফরমে নিয়েছিলেন, এবং আমাদের মনে হলো, বাড়ি যখন থাকে না, তখন মানুষ বাড়ির নাম গায়ে জড়িয়ে নেয়, চাদরের মতো।
জানাজা হলো পিলারের নিচে, ভাঙা গলির খোলা জায়গায়, যেখানে এক সময় সরদারদের বৈঠকখানা ছিল। আমরা যারা রূপনগর, মিরপুর বারো, দক্ষিণখানে ছড়িয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন সবাই ফিরে এসেছিলাম; আমাদের গলি এখন জানাজায় জানাজায় জোড়া লাগে, আবার জানাজা শেষে খুলে খুলে যায়। জানাজায় দাঁড়িয়ে আমরা একে অন্যকে গুনি; প্রতিবার সংখ্যাটা একটু কমে। যাদের চিনতে দেরি হয়, তাদের আমরা বাপের নাম ধরে চিনি; মানুষ বদলে গেছে, বাপের নাম বদলায় নাই। আমাদের ছেলেমেয়েরা আসে না, তারা মৃত মানুষকে চেনে না, আর যে গলির টানে আসতে হতো, সেই গলিই তো তারা পায় নাই। ফলে আমাদের হিসাবে গলিটা দুইবার মরছে; একবার মরেছে এক্সকাভেটরের হাতে, আর এখন মরছে আস্তে আস্তে, জানাজায় জানাজায়, মানুষ ধরে ধরে। কাতার দাঁড়িয়েছিল পুব পশ্চিমে, চারশো সাঁইত্রিশ নম্বর পিলারকে মাঝখানে রেখে দুই পাশে। নিয়তের পরপরই মাথার উপর দিয়ে ট্রেন গেল; ইমাম সাহেব থামলেন না, শুধু তকবিরের শব্দ দুই সেকেন্ডের জন্য ট্রেনের শব্দের নিচে চাপা পড়ল, তারপর আবার ভেসে উঠল। ট্রেনের জানালা থেকে সেই দুই সেকেন্ডে যারা নিচে তাকিয়েছিল, তারা জানাজা দেখেছে; কার জানাজা, তারা জানে না, যেমন আমরা জানি না তারা কারা। দেখাদেখির এই ব্যবস্থাই এখন আমাদের গলির নিয়ম।
পিছনের আধখানা বাড়ি এতই সরু যে ডেভেলপাররা দেখে চলে গেছে। শেষে ভাড়া নিয়েছে টায়ার আর সিলিন্ডারের দোকান। উঠানের যে অর্ধেক রয়ে গেছে, সেখানে শিউলি গাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে; ভায়াডাক্টের ছায়ায় সে এখন রোদ পায় না, তবু আশ্বিন এলে ফুল দেয়, এবং ফুলগুলি ঝরে পড়ে টায়ারের স্তূপের উপর। দোকানের ছেলেটা সকালবেলা ঝাঁট দিয়ে ফুল ফেলে দেয়। তার কোনো দোষ নাই; ফুল তার দোকানের মালামাল না।
নূরজাহান মঞ্জিল লেখা শ্বেতপাথরের ফলক ফয়সাল খুলে নিয়ে গেছে রূপনগরের ফ্ল্যাটে। কোথায় লাগাবে ঠিক করতে না পেরে ফলক এখন তার খাটের নিচে, কাপড়ে মোড়ানো। তার ছোট ছেলে একদিন খাটের নিচ থেকে ওটা টেনে বের করে জিজ্ঞেস করেছিল, আব্বু, নূরজাহান কে। ফয়সাল বলেছিল, জানি না, বাবা। প্রশ্নটা এইভাবে ফলকের সঙ্গে সঙ্গে হাতবদল হয়ে গেল, এবং আমাদের ধারণা, ফলক যত দিন থাকবে, প্রশ্নও তত দিন থাকবে, উত্তর ছাড়াই, যেমন থাকে।
টিনের ট্রাংক গোছাতে গিয়ে ফয়সাল পেয়েছিল নয়টা না খোলা খাম, সেই টানা হাতের লেখা, প্রেরকের ঘর খালি। সে খামগুলি খুলেছে কি না আমরা জানি না; খুললে কী পেয়েছে, তা-ও না। আমরা শুধু হিসাব করে দেখেছি, যে বছর মেট্রো চালু হলো, সেই বছর থেকে খাম আসা বন্ধ। কেন বন্ধ, কে লিখত, লেখা কেন থামল, এই তিন প্রশ্নের একটারও উত্তর আমাদের কাছে নাই। আমাদের একজন শুধু একবার বলেছিল, যে লিখত, সে হয়তো এখন ট্রেনে কইরা উপর দিয়া যায়। কথাটা আমরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, এবং উড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে কথাটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে।
সালেহা বানু মারা যাওয়ার পরের বছরও নূরজাহান মঞ্জিলের খাজনার নোটিশ এসেছিল, বকেয়া আর জরিমানাসহ। সিরাজ তত দিনে রিটায়ার করেছে; নতুন পিয়ন ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে নোটিশটা হারুনের দোকানে রেখে গেছে, ক্যাশবাক্সের নিচের ড্রয়ারে, মরা ঠিকানার অন্য চিঠিগুলির সঙ্গে। সরকারের খাতায় বাড়িটা এখনো আছে, খাজনা বাকি পড়ছে, জরিমানা বাড়ছে, এবং এই হিসাব প্রতি বছর একটু একটু করে বড় হচ্ছে, যেন চৌকাঠের দাগের মতো কেউ ওটারও উচ্চতা মাপছে।
কাটা মুখের বড় দেয়ালটা গত বছর ভাড়া নিয়েছে একটা ডেভেলপার কোম্পানি। বিরাট বিলবোর্ড উঠেছে, তাতে হাসিমুখ পরিবারের ছবি, নিচে লেখা, আপনার নতুন ঠিকানা এখানেই। বিলবোর্ডের কাঠামো আর দেয়ালের মাঝখানে যে অন্ধকার ফাঁকটুকু আছে, সেইখানে মনসুরের উচ্চতার দাগগুলি এখনো আছে বলে আমাদের বিশ্বাস; ট্রেন থেকে এখন আর দাগ দেখা যায় না, বিজ্ঞাপন দেখা যায়।
আমরা এখন নিজেরাই মেট্রোতে চড়ি, অফিসে যাই, ফিরি। কাজীপাড়া ছাড়ার পর আমাদের কেউ কেউ বাঁ দিকের জানালার কাচে মুখ রাখি, কেউ ইচ্ছা করেই রাখি না। দুই সেকেন্ড খুব বেশি সময় না, আবার খুব কমও না; দুই সেকেন্ডে একটা বিলবোর্ড, আধখানা উঠান, টায়ারের স্তূপে ঝরে থাকা শিউলি আর শূন্যে উঠে যাওয়া একটা সিঁড়ি দেখে ফেলা যায়। তারপর ট্রেন চলে যায়। ট্রেন শুধু স্টেশনে থামে, আর আমাদের গলি কোনোদিন স্টেশন ছিল না।
©somewhere in net ltd.