নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

..........

শূন্য সারমর্ম

.........

শূন্য সারমর্ম › বিস্তারিত পোস্টঃ

সাহিত্য ও বিজ্ঞানের কথোপকথন

২৮ শে জুন, ২০২০ রাত ১১:৩২




রবীন্দ্রনাথ:
আপনি ইদানীং গণিত দিয়ে বিশ্বকে জানার প্রচেষ্টায় আছেন আর আমি এ দেশে চিরন্তন জগৎ ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমার ডিসকোর্সসমূহ দিয়ে চলেছি।

আইনস্টাইন:
হ্যাঁ। আপনি কি এ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন দৈবী সত্তায় বিশ্বাস করেন?

রবীন্দ্রনাথ: বিচ্ছিন্ন নয়, মানুষের অমেয় ব্যক্তিত্ব এ ব্রহ্মান্ডকে অনুভব করে। অর্থাৎ বিশ্বের কোনো কিছুই মানুষের বোধশক্তি বা চেতনার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। এভাবে বলা যেতে পারে, বিশ্বের সকল সত্য আদতে মানবসত্য।
বিষয়টির জটিলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি কিছু বৈজ্ঞানিক ধারণা ধার নিয়েছি। আমরা জানি যে পদার্থ প্রোটন ও ইলেকট্রন দ্বারা গঠিত, এবং তাদের মধ্যকার স্থানটি শূন্য। প্রতিটি প্রোটন বা ইলেকট্রন এক অদৃশ্য শক্তি বা বলের সান্নিধ্যে নির্দিষ্ট সীমার সাথে আবদ্ধ থাকে। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণে তা ধরতে পারি না বলে পদার্থটি আমাদের চেতনায় কঠিন হয়ে প্রকাশিত হয়।
একই অর্থে মহাজগতের এক মহোৎসবই মানুষের সংসার। বিভিন্ন ব্যক্তি-ভাবনার মধ্যে বিরাজ করে যে মানবিক সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের সুরেই বাঁধা পৃথিবীতে এই মানুষের ঐক্য। এভাবে সমগ্র বিশ্ব প্রতিটি মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে সত্য বলে আমরা যা জানি, তা একান্তই মানবসত্য। আমরা এই চিন্তাকেই এতকাল ধরে শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয়ভাবনার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে চলেছি।

আইনস্টাইন: বিশ্বের স্বরূপ হিসেবে দু’টি ধারণার আঁচ পাওয়া যায়- ১) মানব নির্ভর বাস্তবতা এবং ২) মানব নিরপেক্ষ বাস্তবতা।

রবীন্দ্রনাথ: বিশ্বব্রহ্মান্ড যখন মানবসত্তার চেতনার সঙ্গে একই সুরের সেতু বাঁধে, তখন তাকেই আমরা সত্যরূপে জ্ঞান করি এবং তা সুন্দর- এমনটা অনুভব করি।

আইনস্টাইন: এটিই হলো বিশ্ব সম্পর্কে একটি নিরেট মানবিক ধারণা।

রবীন্দ্রনাথ: এ ব্যতীত অন্য কোনো প্রকার ধারণা থাকা সম্ভব নয়। এ জগৎ মানবসত্য- এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও একই অর্থে মানবের বৈজ্ঞানিক ধারণার বাইরে নয়। অর্থাৎ আমাদের অনুপস্থিতির মানে জগতেরও না-থাকা। এই বাস্তবতা একান্তই আমাদের চেতনা নির্ভর। একটি যুক্তি ও অনুভূতির দাঁড়িপাল্লায় এর সত্যতা ব্যক্ত করা যায়, যা একটি অভিজ্ঞতার দাঁড়িপাল্লা- যা আমাদের চেতনার অন্তর্গত।

আইনস্টাইন: এটি আদতে একটি মানুষের চেতনার উপলব্ধি।

রবীন্দ্রনাথ: অবশ্যই। তবে এক চিরায়ত সত্তার উপলব্ধি। আমাদের অশেষ আবেগ, কাজের মধ্য দিয়ে এর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে হয়। কোন প্রকার সীমাবদ্ধতায় এটি বাধা পড়ে না। বিজ্ঞান ব্যক্তি নিয়ে চিন্তিত নয়, তা বিজ্ঞানের কাজও নয়। বিজ্ঞান বিশ্বের ধর্ম নিয়ে ভাবে এবং এই ধর্মের সত্য ব্যক্তিগত সত্য নয়। ধর্ম এই সত্যকে জ্ঞান করে। আর এই সত্যই আমাদেরকে এক সুরে, এক কম্পনে, এক রাগায় অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যক্তির সত্তা তখন বিশ্বসত্তায় রূপান্তরিত হয়। ধর্ম ঐ সত্যের মধ্যে এক বিশেষ অর্থ যোগ করে। আমরা সত্যকে জানি কারণ আমরা এই সত্য থেকে আলাদা নই।

আইনস্টাইন: তবে সত্য ও সুন্দর কি মানুষের চেতনা অনির্ভর?

রবীন্দ্রনাথ: না।

আইনস্টাইন: মানুষের অনুপস্থিতিতে কি অ্যাপোলো ভেলভেদেরকে সুন্দর বলা যাবে না?

রবীন্দ্রনাথ: না।

আইনস্টাইন: আমি সুন্দরের ক্ষেত্রে মতবাদটি মানতে পারব। তবে সত্যের ক্ষেত্রে মানতে পারছি না।

রবীন্দ্রনাথ: কেন নয়? সত্যের উপলব্ধি তো মানুষের মধ্যেই বিরাজ করে।

আইনস্টাইন: আমি আমার বিশ্বাসটি সত্য বলে প্রমাণ করতে পারব না। এটাই আমার ধর্ম।

রবীন্দ্রনাথ: সুন্দর সবসময়ই বিশ্বসত্তার সঙ্গে এক হয়ে আছে, আলাদা নয়। আর বিশ্বের ধর্মকে সবদিক দিয়ে বোঝা গেলেই তা সুন্দর। আমরা সবাই আমাদের নিজস্ব ভুলভ্রান্তি, অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই সত্যকে জ্ঞান করতে পারি। সত্যকে জানার আর কী উপায় থাকতে পারে?

আইনস্টাইন: সত্যকে সবসময় মানব অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে হতে হবে। ধারণাটিকে আমি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারবো না। কিন্তু এটা আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি। একটা উদাহরণ দেয়া যাক- আমি বিশ্বাস করি পিথাগোরাসের সূত্র এমনিতেই সত্য। কোনো মানুষের চেতনা থাকুক বা না থাকুক। যদি মানব চৈতন্য ছাড়া আর কোন বাস্তবতা থাকে, তাহলে ঐ বাস্তবতার সাপেক্ষে আরেকটি বাস্তবতা থাকবে। একটিকে অস্বীকার কথার অর্থ অপরটিকেও অস্বীকার করা।

রবীন্দ্রনাথ: যে সত্তা বিশ্বসত্তার সাথে অদ্বৈতভাবে মিশে আছে, তাকেই সত্য বলা যায়। নইলে আমাদের নিজস্ব সত্য, যাকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলা হয়, যা যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে পাওয়া যায়, তা কখনো সত্য হতে পারে না। ভারতীয় দর্শনে ‘ব্রহ্ম’ বলে একটি ধারণা আছে যার অর্থ ‘পরম সত্য’। আমাদের ব্যক্তিগত মন থেকে তা কখনো পাওয়া যায় না। এ সত্যকে পেতে হলে চেতনাকে বিশ্বের সাথে বিলীন হয়ে যেতে হয়। তবে এই ধরণের সত্য বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না। এখানে যে সত্য নিয়ে আমরা কথা বলছি তা মানব মনের কাছে কীভাবে সত্য ‘সত্য’ হয়ে ওঠে তা নিয়ে। একে মায়া বা ভ্রমও বলা যেতে পারে।

আইনস্টাইন: তাহলে আপনার মতে, ভারতীয় দর্শনে এই মায়া বা ভ্রম ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।

রবীন্দ্রনাথ: এই পুরো প্রজাতিই একটি মূলের অন্তর্গত। তাই সব মানব মন একসাথে সত্যকে অনুভব করে। আর সেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য একই বিন্দুতে মিলিত হয়। কোনো পার্থক্য নেই।

আইনস্টাইন: জার্মান ভাষায় ‘প্রজাতি’ বলতে পুরো মানবজাতিকে বোঝায়, সাথে বনমানুষ, ব্যাঙও প্রজাতির অন্তর্গত।

রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞানের আদলে আমরা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে সত্যের এমন রূপে পৌঁছি যা পুরো বিশ্ব মানবের মনে বিদ্যমান।

আইনস্টাইন: প্রশ্ন এখনও সত্য মানব চেতনা নির্ভর নাকি অনির্ভর, ওটা নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথ: আমরা যাকে সত্য বলি, তা সাবজেকটিভ ও অবজেকটিভ উভয় বোধের এক যৌক্তিক মিশ্রণ। যা শুধুমাত্র এক সুপারহিউমান দ্বারাই সম্ভব।

আইনস্টাইন: আমরা আমাদের ব্যক্তি জীবনেও মানুষ থেকে এক স্বাধীন সত্যকে অনুভব করি। সেই অনুভূতিগুলোকে ঠিকভাবে কাজ করানোর জন্য এটা করি। উদাহরণ দিই- যদি এই ঘরে কেউ না থাকে, তবুও টেবিলটি তার স্থানেই থাকবে।

রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, এটা ব্যক্তির চেতনার বাইরে থাকবে, কিন্তু বিশ্বমনের বাইরে তো নয়। আমার যে চেতনা দিয়ে আমি টেবিলের অস্তিত্ব জ্ঞান করি, সে একই চেতনা দিয়ে টেবিলের অস্তিত্ব বোঝা সম্ভব।আইনস্টাইন: রুমে কেউ না থাকলেও টেবিলের অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আপনার মতে এই ধারণাটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমাদের অস্তিত্ব ছাড়া টেবিলের অস্তিত্ব কী তা আমাদের ধারণার বাইরে।

রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞান প্রমাণ করছে যে টেবিল একটি কঠিন পদার্থ- তা একটি দৃশ্যমান অনুভূতি। তাই মানব চেতনা বলে কিছু না থাকলে টেবিলের প্রসঙ্গেরও কোনো মূল্য নেই। তাই এটা মেনে নিতেই হয়, যে আমাদের বস্তুজগৎ অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘূর্ণায়মান তড়িৎ শক্তির আবহ দ্বারা তৈরি।
আর যতদূর ব্যাপারটা সত্য নিয়ে, সত্যকে বোঝার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো এই, যে বিশ্বচেতনা ও আমাদের ব্যক্তি চেতনা আদতে এক, এগুলো যে আলাদা নয় তা মানব উপলব্ধি করতে পেরেছে। তবুও এই দুইয়ের মধ্যে মিলের প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে বিজ্ঞান, দর্শন ও আমাদের মূল্যবোধ। মানুষের বাইরে কোনও বাস্তবতা থাকলে তবে মানুষের জন্য সেই বাস্তবতার কোনও মূল্য নেই।
যদি এমন কোনও চেতনা থাকে যার সাথে ঘটনা কোনও নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে না, অথচ সঙ্গীতের স্বরের মতো সময়ের সাথে ঘটে, এ ধরণের চেতনার সামনে পিথাগোরাসের সূত্রের কোনো মানে নেই। একটি মথের ধর্ম কাগজ খাওয়া, তার কাছে সাহিত্যের কোনো মানে নেই। কিন্তু মানবজাতির জন্য কাগজের চেয়ে সাহিত্যের মূল্য অনেক বেশি। তাই এমন সত্য যদি থাকে যা মানুষের বোধ ও যুক্তির বাইরে, ঐ সত্যের একক কোনো মূল্য নেই যতক্ষণ না আমরা মানুষ এবং মানুষের চেতনা নিয়ে ঘোরাফেরা করছি।

আইনস্টাইন: তাহলে তো বলা যায় আমি আপনার চেয়ে বেশি ধার্মিক।

রবীন্দ্রনাথ: আমার ধর্ম হলো মানব চেতনা ও বিশ্বচেতনার মধ্যে এক মিলন ঘটানো। এটাই আমার সদ্য হিবার্ট লেকচারের বিষয়, যাকে আমি ‘মানবধর্ম’ বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

এখানেই দুই নোবেল বিজয়ীর দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক আলাপের শেষ। এতগুলো ভাবিয়ে তোলার মতো বিষয় দিয়ে ভরপুর এই সংলাপে যেমন ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের আদর্শিক ভিন্নতার আঁচ পাওয়া যায়, তেমনি তাঁদের মধ্যে ধর্মীয় ভাবনার মিলও পরিলক্ষিত হয়। রেকর্ড অনুযায়ী তাঁদের ৩০-এর দশকে চারবার সাক্ষাৎ হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত বাকি সময়কার কোনো সংলাপ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ডায়েরি কিংবা প্রবন্ধে উল্লেখ করেননি- সম্ভবত আলাপগুলো ব্যক্তিগত হবার কারণে। তবে জানা যায়, উভয়ের মধ্যে মত বিনিময় ছাড়াও সংগীতের রাগও বিনিময় হয়। আইনস্টাইন রবীন্দ্রনাথকে বেহালা বাজিয়ে যেমন তাক লাগিয়ে দেন, তেমনি আইনস্টাইন প্রবল অনুরাগের সঙ্গে অনুভব করেন এই বাউল মানুষটির অসংখ্য ঘর-ঘরানার ম্যহফিল।

মন্তব্য ৮ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৮) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে জুন, ২০২০ রাত ১২:০৭

কল্পদ্রুম বলেছেন: আইনেস্টাইন নামের লোকটার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন দিচ্ছি। :) ধর্ম অন্তত ইসলামিক দর্শন ওনার বক্তব্যকে সমর্থন দেয় বলে আমার অল্প জ্ঞানের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে।রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য একজন সর‍্যিকারের মানব দরদী মানুষের বক্তব্য।
আইনেস্টাইনের ছবি দেখলে মনে হয় উনি একটু আগে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে এসেছেন।

২৯ শে জুন, ২০২০ রাত ১২:৫১

শূন্য সারমর্ম বলেছেন: মানবদরদী হয়তো দুজনেই ছিল। তবে পারমাণবিক বোমা বানানোর জ্ঞানের অপপ্রয়োগের জন্য আইনস্টাইনের মানবদরদ কিন্চিত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।

২| ২৯ শে জুন, ২০২০ রাত ১২:২৯

নেওয়াজ আলি বলেছেন: দুই জগতের দুইজন মানুষ নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন

২৯ শে জুন, ২০২০ রাত ১২:৫৪

শূন্য সারমর্ম বলেছেন: ভাই আমি বিশ্লেষণ করিনি। এ দুজনের কথোপকথন ভাবতে শেখায়।

৩| ২৯ শে জুন, ২০২০ রাত ১:২৯

নুরুলইসলা০৬০৪ বলেছেন: এই দুই মনীষী সমস্ত বিশ্বকে(বস্তুএবং ভাবনা)দুই ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।একজন করেছেন বস্তুবাদ দিয়ে অন্যা জন করেছেন ভাববাদ দিয়ে।পৃথীবির সকল মানুষ এই দুই ভাবেই ব্যাখ্যা করেন।তাদের ভাবনার গভীরতা আছে তাই তারা সমস্যাটির গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছে।

২৯ শে জুন, ২০২০ সকাল ১১:০৭

শূন্য সারমর্ম বলেছেন: সঠিক বলেছেন

৪| ২৯ শে জুন, ২০২০ রাত ১:৪১

রাজীব নুর বলেছেন: বিষয়টা আমার কাছে খনও স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে।
যপদি তারা মিটিং শেষ করে বলেছেন, দুইজন দুজনের সম্পর্কে চমকপদ কথা বলেছেন।

২৯ শে জুন, ২০২০ সকাল ১১:৫১

শূন্য সারমর্ম বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.