নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার চারপাশের মানুষ গুলো অনেক ভাল।

নিথর শ্রাবণ শিহাব

মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।

নিথর শ্রাবণ শিহাব › বিস্তারিত পোস্টঃ

উপান্ত - "ক"

০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ৯:৩৪

এক.

ছোট আয়নাটা বালিশের সাথে বাঁকা ভাবে হেলান দিয়ে রেখে বিছানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছে রোকসানা ইয়াসমিন। স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে। শাড়ীটা কোনোমতে এক প্যাঁচ দিয়ে পরে চুল আঁচড়াতে বসে গেছে। পরে কুচি টুচি ঠিক করে স্কুলের জন্য বের হবে। খাতা জমেছে বাসায় কয়েকটা ক্লাসের। আজ নিয়ে যাওয়ার কথা। কাছেই স্কুল, বাকুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। এ বছরই প্রথম ম্যাট্রিকের সেন্টার হয়েছে। আগে প্রতিবছর ম্যাট্রিকের ডিউটি দিতে আর পরীক্ষা দেয়াতে নিজের স্কুলের ছেলে মেয়েদের নিয়ে আরো দক্ষিণ দিকের প্রায় আঠারো মাইলের মত পাড়ি দিয়ে মুহুরি প্রজেক্টে গার্লস হাই স্কুলে যেতে হত। আশেপাশে সবচেয়ে কাছের সেন্টার ওখানেই পরতো। গত বছর বাকুলিয়ার থেকে সাত্তার হাওলাদার চেয়ারম্যান ইলেকশনে জেতায় সেন্টার এনে দিয়েছে এখানে। এখন আর আঠারো মাইল পার করে মুহুরি প্রজেক্ট গার্লস হাই স্কুলে যেতে হয় না। আগে তো ডিউটি দেয়ার জন্য এক্সটার্নাল হয়ে সেখানকার টিচার্স কোয়ার্টারে উঠতে হত। ছেলে মানুষ হলেও না হয় কথা ছিল, মেয়ে হয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হত রোকসানাকে। টিচার্স কোয়ার্টার কেবল নামেই রয়েছে- বাঁশের চাটাইয়ের দেয়াল ঘেরা টিন শেডের দুই রুমের ঘর। বাথরুম আবার আলাদা, পুকুর পাড়ের ধার ঘেষে বাঁশ ঝাড়ের একেবারে গোড়াতে বানানো। রাতে তো দূরের কথা- দিনের বেলাতেও যেতে গা ছম ছম করে। আর ধারে কাছে ঘর বাড়ী বলতে রয়েছে কেবল স্কুল ঘরটা। দিনের বেলা পরীক্ষা থাকলে ভরা থাকে, না হলে পরীক্ষার জন্য পুরো স্কুল ছুটি দেয়া থাকে এক মাসের মত। পরীক্ষার তিন ঘন্টা সময় ছাড়া স্কুলটাও সারাদিন ভূতের বাড়ী হয়ে থাকে। আর বাকি শিক্ষক শিক্ষিকারাও থাকে অন্য জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে কিম্বা নিজের বাড়ী আছে। সরকারী ভাবে বানানো এই দুই রুমের টিচার্স কোয়ার্টারে আর কত জনই বা আটবে? ভালোর মধ্যে যেটা হল- অন্যান্য স্কুল থেকে যেসব মহিলা টিচার আসতেন- প্রায় ছয় সাত জনের মত- সবাই এক সাথেই থাকতো। তাতে ভয় কিম্বা বিরক্তি একটু কম লাগে। আর পুরুষ শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোয়ার্টার আছে অন্য দিকে। মাঝে মাঝে পরীক্ষার ডিউটির পর অন্য জায়গা থেকে আসা কিম্বা ঐ স্কুলেরই পুরুষ শিক্ষক দু-একজন গায়ে পড়ে এসে আলাপ জমানোর চেষ্টা করতো। যেটা রোকসানার সবচেয়ে বেশি অপছন্দ। এত আলাপের কি আছে? সে কি আঠারো বছরের বাচ্চামেয়ে? সাইত্রিশ ছুঁই ছুঁই করছে বয়স- ঘরে বড় মেয়ে আছে, সাত বছরের একটা ছেলেও আছে। তারপরও এত বাড়তি কৌতূহল যে কেন দেখায় কে জানে? ইকবাল মারা গেছে প্রায় চার বছর হতে চলেছে। বিধবা ছাপটা কি এখনও মুখে সেঁটে বসেনি তার? ইকবালের মারা যাওয়ার পর পুরুষ লোকের অহেতুক আগ্রহতে প্রথম প্রথম অসহায় লাগতো রোকসানার, এখন সেটা বিরক্তিতে রূপ নিয়েছে। এজন্য প্রতি বছরই পরীক্ষার সময়টা এলে রোকসানা বিরক্ত হয়ে যায়। কারণ এই দুই তিন সপ্তাহের মত বিশাল একটা সময় ছেলে মেয়ে দুটোকে রেখে আরেক গণ্ডগ্রাম এলাকায় গিয়ে পরীক্ষার হলে ডিউটি দিতে হচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষ জনের তাকে ঘিরে অহেতুক কৌতূহল। তাছাড়া রুবাইয়াও বড় হয়েছে, একা রেখে যাওয়া যায় না। পাশের বাড়ীর নূরী ভাবীর কাছে ছেলে মেয়ে দুটোকে রেখে আসতে হয়। কিন্তু তাতেও শান্তি লাগে না। বড় হতে থাকা মেয়ে নিজের ঘরে ছাড়া কোনো ঘরেই নিরাপদ না। সব ঘরেই পুরুষ থাকে।

সাত্তার সাহেব ইলেকশন জেতায় লাভ হয়েছে রোকসানার। পরীক্ষার সেন্টার বাকুলিয়া হাইস্কুলে এনে দেয়ায় বাসা থেকেই হেটে গিয়ে ডিউটি দিয়ে আসতে পারছে। স্কুলটা খুব কাছেই। যেতে দশ মিনিট লাগে বড় জোর। তবে আজকে খাতা নিয়ে যেতে হবে অনেকগুলো। রিক্সা ডাকতে হবে। একা একা তিন বাণ্ডিল খাতা নিয়ে কুলাতে পারবে না সে। দেয়াল ঘড়ির দিকে আড় চোখে তাকালো। চুন-প্লাস্টার খসা দেয়ালে বড় কষ্টে ঝুলে রয়েছে পুরনো ঘড়িটা। পেরেকটা খুলে আসবে আসবে করছে। সাড়ে আটটার মত বাজে।

ইকবালের মারা যাওয়ার পর বাড়ীটা অফিস থেকে দিয়েছে রোকসানাকে। অর্ধেক ভাড়া দিতে হয় প্রতি মাসে। সরকারী ইঞ্জিনিয়ার ছিল ইকবাল। অফিসের একটা কাজে নারায়নগঞ্জ গিয়েছিল। মিলের ভেতর বয়লার ব্লাস্ট করায় মারা যায়। হুট করেই সুস্থ্য একটা মানুষ চলে গেলে কেন জানি বিশ্বাস করা যায় না যে মানুষটা নেই। ইকবালের মারা যাওয়াটা অনেকটা সেরকমই ছিল রোকসানার কাছে। তরতাজা মানুষটা সকালেও ছিল- দুপুর বেলাতে নেই- এই ব্যাপারটা রোকসানাকে বুঝাতে ঘরের অনেক প্লাস্টার খসে পড়তে হয়েছে। ধীরে ধীরে ঘরের দেয়াল গুলোর মলিন হয়ে আসাটা এক সময় টের পেয়েছে সে। প্রতি ছয় মাসে দেয়াল রঙ করার বাতিক ছিল যে মানুষটার- সে নেই। মানুষের ধুঁকে ধুঁকে মরাটা অনেক জরুরী। জীবনের ছাপ মলিন হয়ে আসতে আসতে মিলিয়ে যায় তাহলে। নয়তো ভাতের প্লেটে খাবার বাড়তে গিয়ে একটা প্লেট বেশি বেড়ে ফেলতে হয় যত দিন পর্যন্ত না আলনায় রাখা কাপড় গুলো ন্যাপথলিন দিয়ে ট্রাঙ্কে সযত্নে রেখে দেয়া হচ্ছে না। হঠাৎ বিদায়ের ছাপ মেঝে বানানোর সিমেন্টের মশলার মত- ভুল করে পা ফেলে দিলে হুট করে- শুঁকিয়ে গেলে পায়ের ছাপ সেখানেই থেকে যায়। নড়তে চায় না অবস্থান থেকে। তারপর একদিন আস্তে আস্তে মিশে যেতে থাকে।

একটা নিঃশ্বাস ফেলে আয়নাটার দিকে আবার তাকালো রোকসানা। মাথার সীঁথিটা বড় হয়ে গেছে অনেক। গত বছর টাইফয়েডে চুল কমে গেছে হঠাৎ করেই। পাতলা হয়ে গেছে বেণী। আগে চুল সামলাতেই পারতো না সে। মোটা করে বেণী বেঁধে দিত ইকবাল। মেয়ে মানুষের মত পটাপট বেণী করে ফেলতে পারতো মানুষটা। রোকসানার মাথা ভর্তি চুল দেখেই নাকি সে রোকসানাকে বিয়ে করেছে। প্রত্যেকদিন দুপুর বেলা গোসলের পর বারান্দায় বসে রোদের মাঝে চুল আঁচড়ে দেয়ার খুব শখ ছিল ইকবালের। আর চুল খোঁপা করে রান্না ঘরে মাছ কুটতে বসলেই পেছন থেকে এসে দুষ্টুমী করে খোঁপা খুলে দিত মানুষটা। রোকসানা চুল সামলাবে না মাছ? রেগে যেত সব সময়, “উফ! কি শুরু করলে এখন! দেখছো না মাছ কুটছি?”

পল্লব আর তারিণের একটা টিভি এডের জিঙ্গেল সুর করে গেয়ে উঠতো তখন ইকবাল,

“বেশ করেছি, খোঁপা খুলেছি

চুল ছুঁয়েছি, ছোঁবোইতো।

তোমার ঐ রেশমি কালো চুল দেখে

পাগল আমি হবইতো!”


রোকসানা এলোমেলো চুলে চোখ লাল করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে মাছ হাতে। তারপর দেখা যেত হাসতে হাসতে মানুষটা নিজেই শার্টের হাত গুঁটিয়ে বটি নিয়ে মাছ কুটতে বসে গেছে রোকসানার সাথে। ওর দিকে তাকিয়ে মাছ কাটতে কাটতে সরল মুখে হেসে বলছে, “এভাবেই চুল ছেড়ে বসে থাকো। আমি মাছ কুটতে কুটতে এলোকেশী বৌটাকে দেখি একটু চোখ জুড়ায়ে।”

চুল আঁচড়ানো থামিয়ে রোকসানা চিরুনিটার দিকে তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। অনেক চুল উঠেছে। শাদা চিরুনির দাঁত গুলোতে আটকে আছে কালো হয়ে একগাদা চুল। আয়নাটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে এগিয়ে এলো নিজের অজান্তেই। অনেক কমে গেছে চুল। আলোতে বোঝা যায় চুলের ফাঁক দিয়ে বাদামী রেখার মত চলে গেছে কয়েকটা। ইকবালের খুব শখের চুলগুলো ঝড়ে গেছে অনেকটাই। আয়নাটার দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দীর্ঘ একটা মুহূর্ত। আচ্ছা, মানুষটা বেঁচে থাকলে কি বলতো এখন? “অনেক বুড়িয়ে গেছো রোকসানা?” নাকি অন্য কিছু?

হাতের বাউটি দুটোও ম্লান হয়ে এসেছে। রঙ জ্বলে গেছে। ইকবালের মৃত্যুর পর এই সংসারটা রোকসানার হাতের বাউটির মতই ম্লান হয়ে এসেছে। দরজায় কড়া নাড়িয়েছে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ছোট বড় অভাব। ফ্রিজের গ্যাস চলে গেছে প্রায় এক বছরের মত হচ্ছে। সারাবে সারাবে করেও হয়ে উঠছে না। হাতে টাকা থাকে না। রেশনের খরচ, রুবাইয়ার স্কুলের বেতন, রুমীর স্কুলের বেতন, বাসা ভাড়া, দোকানের টাকা, সহ হাজারটা খরচ। স্কুলের মাস্টারী করে বেতন যা পায়, তাতে কোন মতে টেনে টুনে চলে যায় তিনজনের সংসার। এর মাঝে বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল কিনতেও রোকসানার ব্যাগ ঘেটে দেখতে হয় কিছু টাকা বেঁচে গেছে কিনা গত মাসের? বাংলার টিচার দেখে কেউ পড়তেও চায় না প্রাইভেট। হাতে যে বাড়তি টাকা আসবে- তার উপায় নেই।

নয়টার সময় স্কুল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আয়নাটা রেখে তাড়াতাড়ি শাড়ীর কুচি ঠিক করতে করতে রুবাইয়াকে ডাক দিল রোকসানা, “রাবু? তোর হয়েছে? রুমীকে নিয়ে নাস্তা করেছিস? রেডি হয়ে গেলে একটা রিক্সা ডেকে দে তো রাস্তা থেকে।”

পাশের ঘর থেকে রুবাইয়ার গলা পাওয়া গেল, “হয়ে গেছে। রুমীকে রেডি করছি। পাঁচ মিনিট।”

কাঁধে আঁচল ফেলে সেফটি পিন লাগাতে লাগাতে পাশের ঘরে উঁকি দিল রোকসানা। স্কুলের নীল শাদা ইউনিফর্ম পরে তৈরি হয়ে গেছে রুবাইয়া। রুমীকে শার্ট পরিয়ে বোতাম লাগাচ্ছে। চুলগুলো একটা কালো পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে বেঁধে পিঠের ওপর ছেড়ে রেখেছে। বিরক্ত হল রোকসানা। একশো বার সে মেয়েকে বলেছে স্কুলে অথবা বাহিরে যাওয়ার সময় চুল এক বেণী করে যেতে, সাথে মাথায় স্কার্ফ। এইটে পড়ুয়া মেয়ের এভাবে চুল ছেড়ে রাখলে মানুষজন আড় চোখে তাকাবেই। এমনিতেই দেখতে সুন্দর হয়েছে মায়ের মত। তার ওপর বাপের গায়ের রঙ পেয়েছে। টক টকে ফর্সা। ক্লাসের ছেলে থেকে শুরু করে পাড়ার ছেলে- সবাই ঘুর ঘুর শুরু করেছে এই মেয়ের পেছনে। অভাবী ঘরে সুন্দরী মেয়ে থাকলে সমস্যা। লোকের সাহস বেশি থাকে তখন।

“চুল বেণী করিসনি কেন?”

ভাইয়ের শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিল রুবাইয়া। মাঝপথেই থেমে গেল হাত। অপরাধীর মত মুখ করে মায়ের দিকে তাকালো, “দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে পাঞ্চ ক্লিপ লাগিয়ে নিয়েছি।”

“এদিকে আয়। আমি বেণী করে দিচ্ছি। আর স্কার্ফ ছাড়া বের হবি না।” কাটা কাটা স্বরে বলল রোকসানা।

রুমীর শার্টের বোতাম লাগিয়ে উঠে এলো রুবাইয়া। রোকসানা ওদের বিছানাটায় বসে সামনে বেতের মোড়াটা টেনে মেয়েকে বসিয়ে চুল বেণী করে দিতে লাগল দ্রুত হাতে। রোকসানার চুল পেয়েছে মেয়ে। বেণী করতে করতেই সময় চলে যাচ্ছে। আগে থেকে একটা কাজ যদি এগিয়ে রাখতে পারে এরা। বিরক্ত হল রোকসানা। খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছে রুমী। ছেলের দিকে তাকিয়ে ধমক দিল, “কি হল? জুতা পরিসনি কেন? খালি পায়ে ছাগলের মত দাঁড়িয়ে না থেকে জুতা পর। সব কাজ তোর বোন করে দিবে নাকি? নিজের কাজ নিজে করতে শেখ্‌।”

রুমী মিন মিন করে বলল, “জুতা ছিঁড়ে গেছে আম্মা। আঙ্গুল বের হয়ে যায় খালি। অনেকদিন আগের বলে ছোট হয়ে গিয়েছিল। পরলেই আঙ্গুল ব্যথা করতো। কালকে ছিঁড়ে গেছে আঙ্গুলের দিকটা। ক্লাসের সবাই দেখে হাসে খালি। মুজা দেখা যায়।”

এক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেল রোকসানা। দেড় বছর ধরে একই জুতা পরে আসছে রুমী। বাড়ন্ত শরীর। এক জুতাতে বেশিদিন চলার কথাও না। নতুন জুতা কিনবে কিনবে করেও হয়ে উঠছে না। হিসাবের খাতায় টান পরে যায়। কিন্তু ছেলেকে এই কথা বলবে কেমন করে? কড়া গলায় বলল, “নবাবী না করে যা আছে সেটাই পরে নে আজকে। দেখি কাল পরশু আরেক জোড়া কিনে দিতে পারি নাকি।”

রুমী বিমর্ষ গলায় বলল, “সবাই হাসে আম্মা......”

“হাসলে হাসবে। কারো হাসিতে মানুষের কিছু হয় না।” তীক্ষ্ম স্বরে ছেলেকে কথাটা বলতেই চুপ হয়ে মাটির দিকে মুখ ঝুঁকিয়ে ফেলল রুমী। মাকে প্রচণ্ড ভয় পায় ছেলেটা। রোকসানা কড়া গলায় আরো কিছু বলতে চেয়েছিল- কিন্তু কেন যেন পারল না। প্রয়োজনের কথাটা বলতে গিয়ে মাটির দিকে সাত বছরের একটা বাচ্চা ছেলে কখনও তাকিয়ে থাকে না। কেবল মাত্র তখনই এভাবে তাকায় যখন সাত বছরের শরীরের ভেতর সতেরো বছরের কোন মানুষ বসবাস করতে শুরু করে। রোকসানা কেমন যেন বিষণ্ন একটা দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে। রুমী কি অভাব শব্দটার মানে বুঝে ফেলেছে? না হলে শক্ত, ছোট হয়ে আসা জুতা নিয়ে এতদিন টুঁ শব্দটিও করেনি কেন? জুতা ছিঁড়ে আঙ্গুল বের হওয়ার পর ক্ষীণ স্বরে শুধু বলেছে নতুন জুতা লাগবে তার। খুব ছোট বয়সে অভাব জিনিসটা বুঝে ফেলাটা কি ভাল লক্ষণ?

মেয়েটার বেণী করে দেয়া হয়েছে। চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “মাথায় স্কার্ফ দিয়ে বাহিরে গিয়ে একটা রিক্সা ডেকে আনতো।” বলে দাঁড়ালো না আর। রান্না ঘরে চলে এলো। স্কুল থেকে ফেরার পথে কিছু বাজার করে আনতে হবে কিনা রোজ একবার করে দেখে যেতে হয়। ফ্রিজটা ঠিক থাকলে ঘন ঘন বাজারের ঝামেলাটা থাকতো না। নষ্ট যেহেতু- কি আর করা।

রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মিট সেফের দিকে তাকাতেই বিরক্ত হল। স্টার শীপ কন্ডেন্সড মিল্কের পটটা পিঁপড়ায় ধরবে বলে বড় একটা প্লেটে পানি ঢেলে তার মাঝে রেখে দিয়েছিল। এভাবে রাখলে পিঁপড়া ধরতে পারে না। কিন্তু রুমী নিশ্চয় টুলে এসে দুধের পটটা সরিয়েছে প্লেট থেকে। প্লেটের পাশেই রাখা। হাজারে হাজারে কালো পিঁপড়া এসে ছঁকে ধরেছে দুধের কৌটা’টা। ছেলেটা মুড়ি দিয়ে কন্ডেন্সড মিল্ক মাখিয়ে খেতে পছন্দ করে। সবাই ঘুমিয়ে থাকলে বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে পা টিপে টিপে এসে দুধের টিন নামিয়ে হাত দিয়ে খাবলা মেরে খেতে থাকে। লম্বা হয়নি দেখে অত উঁচুতে ঠিকমত প্লেটের ওপর বসিয়ে রাখতে পারে না। রোকসানা তাড়াতাড়ি হিটারের লাইন দিয়ে পিঁপড়া ধরা দুধের টিনটা এসে হিটারের কাছে রাখলো। এই এলাকায় গ্যাস কিম্বা সিলিন্ডার নেই। হিটার নয়তো স্টোভেই কাজ চালাতে হয় রান্না বান্নার। হিটারের কয়েলগুলো লাল হয়ে জ্বলে উঠতেই ওটার তাপে পিঁপড়ার দল ছত্র ভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে দিল দুধের টিন ফেলে। আরো মিনিট খানেক লাগবে সব ছুটতে।

রোকসানা আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে সকালের নাস্তার এঁটো প্লেটগুলো ধুয়ে ফেলতে লাগলো। রুমীর প্লেটে রুটি গোল করে পাঁকিয়ে দেয়া হয়েছিল ভেতরে চিনি দিয়ে- অর্ধেক খেয়েছে। বাকিটা রেখে দিয়েছে। ছেলেটা খাবার নষ্ট করা শিখেছে। মারধোর খাচ্ছে না সপ্তাখানেক হল। মার লাগানোর সময় হয়েছে। খাবার নষ্ট করা রোকসানার খুবই অপছন্দ। ভাত খাওয়ার পর হাত ধোয়ার পর যদি প্লেটে কোনো ভাত দেখা যায়- ডেকে এনে সেটা তুলে ধুইয়ে খাওয়াবে সে। ইকবাল খাবার একদমই নষ্ট করতো না। একদানা খাবার নষ্ট করলেই ঘরের খাবারে বরকত কমে যায়। ওর ছেলেটা যে কেন এমন হচ্ছে দিন দিন......



দুই.

টিফিনের সময় বাকুলিয়া হাইস্কুলের দপ্তরী জসীম মিয়াঁ প্রতিদিন স্কুলের সামনের বদি উল্লাহের দোকান থেকে সিঙ্গারা আর জিলাপি নিয়ে আসে শিক্ষক শিক্ষিকাদের জন্য। একটা করে সিঙ্গারা, দুই পিস জিলাপি আর সব শেষে এক কাপ চা। বৃহস্পতিবার হাফ ডে থাকে বলে টিফিন বন্ধ থাকে সেদিন। আজকে বুধবার। একটু আগে টিফিনের ঘন্টা পরার খানিক বাদেই টিচার্স কমন রুমে সিঙ্গারা, জিলাপি আর বড় একটা ফ্লাক্সে চা নিয়ে হাজির হয়েছে জসীম। কম্বাইন্ড কমন রুম। পুরুষ টিচার মিহিলা টিচারদের জন্য আলাদা আলাদা কমন রুম নেই। বড় একটা লম্বাটে রুমেই সবার যার যার টেবিল ফেলা হয়েছে। পত্রিকা টত্রিকাও এখানেই দিয়ে যায়। যে যার মত পড়ে নেয়। প্রতিদিন দুটো বাংলা, দুটো ইংরেজী পত্রিকা দিয়ে যায় পত্রিকা অফিস থেকে। সাধারণত টিফিনের এই সময়টাতে প্রায় সব শিক্ষকেরাই চা খেতে খেতে প্যাপার হাতে রাজনৈতিক আলাপ জুড়ে দেয় অন্য কলিগের সাথে। আর শিক্ষিকারা একপাশে বসে নানান সাংসারিক আলাপ শুরু করে। কোন দোকানে কি শাড়ী দেখেছে থেকে আরাম্ভ করে কোন বিয়েতে কাকে কত ভরী স্বর্ণ দিল- তা নিয়ে আলাপ সবার। দু একজন আধুনিক মনা শিক্ষিকা হঠাৎ হঠাৎ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা তোলার চেষ্টা করেন- কিন্তু তেমন একটা সায় না পেয়ে চুপ হয়ে যান।

টিফিনের এই পুরো সময়টা রোকসানা সিঙ্গারাটা খেয়ে জিলাপি দুটো সামনে নিয়ে বসে থাকে মূর্তির মত। কোনো দিন খায় না। শুধু তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে প্লাস্টিকের প্লেটটার দিকে। মাছি এসে বসার চেষ্টা করে জিলাপি গুলোর ওপর। রোকসানা তবুও তাকিয়ে থাকে। হাত নেড়ে মাছি তাড়াবার চেষ্টা করেনি কখনও। দপ্তরী চা দিয়ে গেলেও খেয়াল করে না সেটা। ক্লাসের ঘন্টা পরার আগ পর্যন্ত স্থির চোখে জিলাপি দুটো দেখতে থাকে সে।

ইকবালের খুব পছন্দের খাবার ছিল জিলাপি। দিন নেই রাত নেই হুট হাট করে গরম গরম জিলাপি নিয়ে এসে হাজির হয়ে যেত। অল্প আনলেও না হয় শেষ করা যায়- সে আনতো দেড় দুই কেজি। এত মিষ্টি জিনিস খাওয়া সম্ভব? কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন পুরোটাই খেয়ে শেষ করে দিত ইকবাল। খাওয়া শেষে শব্দ করে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বলতো, “রোকসানা বানু, রাতের মিল অফ করে দেও আমার। গোডাউন ইজ লোডেড!”

আজও জিলাপি দুটো সামনে নিয়ে বসে রয়েছে রোকসানা। পাশের টেবিলে শায়লা আপা, বিলকিস বানু, ফরিদা আর নতুন আসা মেয়েটা কার বিয়ে নিয়ে নিয়ে যেন গল্প করছে। কান নেই সেদিকে ওর। ভাসা ভাসা ভাবে দু একটা কথা কানে আসছে কেবল।

“জিলাপি খেতে ভাল লাগে না আপনার?”

বাস্তবে ফিরে এলো রোকসানা। ওর কোনাকুনি টেবিলটায় বসে বাড়ীর কাজের খাতা দেখছেন আসাদ সাহেব। এই স্কুলে নতুন পোস্টিং হয়ে এসেছেন। অংকের টিচার। প্রায় পঞ্চাশের মত বয়স। লম্বাটে ধরণের মানুষ। মাথার চুল প্রায় সব পেঁকে গেছে। কালো মোটা ফ্রেমের ভারী লেন্সের চশমা পরে থাকেন সারাক্ষণ। ডান পাশের চোখের পাতাটায় সমস্যা আছে তাঁর। বেশি বড় হয় না। দেখে মনে হয় ঘুমিয়ে আছে ঐ চোখটা। কেবল ভাল করে তাকালে বোঝা যায় অল্প খুলে রয়েছে পাতাটা। দ্রুত চোখে খাতার অংক দেখে সাইন করে যাচ্ছেন। কথাটা যে উনিই বলেছেন বোঝা গেল না প্রথমে। রোকসানা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “জী?”

খাতার দিকে তাকিয়ে আবার বললেন তিনি, “জিলাপি খেতে ভাল লাগে না মনে হয় আপনার? তাই না?”

রোকসানা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, “নাহ্‌। তা না। আসলে মিষ্টি জিনিস একটু কম খাই আমি।”

খাতা থেকে মুখ তুললেন আসাদ সাহেব, “প্রায়ই দেখি জিলাপি না খেয়ে রেখে দিয়েছেন। একভাবে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন। অবশ্য আমিও এ ধরণেরই।”

“মানে?”

“আমি ঝাল জিনিস খেতে পারি না। মিষ্টি জিনিস খেতে ভাল লাগে।” মৃদু হাসলেন। পুরু গোঁফের আড়াল থেকে হাসিটা তেমন বেরিয়ে আসতে পারলো না। গম্ভীর হয়ে রইল মুখটা হাসার পরেও।

আড় চোখে তাকিয়ে দেখল রোকসানা ভদ্রলোকের সামনের প্লেটে সিঙ্গারাটাই রয়েছে কেবল। জিলাপি নেই।

রোকসানা ভেবেছিল কথা হয়ত আরো বলবেন আসাদ সাহেব। স্বল্পভাষী মানুষেরও যেচে পড়ে কথা বলার অভ্যাস থাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু তিনি আর কোনো কথা বললেন না। খাতা দেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলেন আগের মত।

টিফিন শেষে ক্লাসের ঘন্টা পড়ে গেছে। ক্লাস আছে রোকসানার। চুপচাপ উঠে বই নিয়ে রওনা হল ক্লাসের দিকে। আসাদ সাহেব তখনো একমনে খাতা কাটছেন। তাঁর ঝাল সিঙ্গারাটার ওপরে দুটো মাছি এসে বসেছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই ভদ্রলোকের। খাতায় ডুবে আছেন।



তিন.

রুমীর স্কুল ছুটি হয় বেশ আগেই। ক্লাস থ্রীর বাকি ছেলে মেয়েরা যার যার বাসায় চলে যায় ছুটির সাথে সাথেই। কিন্তু রুমীকে অপেক্ষা করতে হয় দুপুর পর্যন্ত। রুবাইয়া কিম্বা রোকসানার ছুটি হতে হতে দুটো বেজে যায়। ওদের জন্য স্কুলের কমন রুমে বসে থাকে এই সময়টা। চুপচাপ বসে থাকাও যায় না। ব্যাগ রেখে প্রায়ই বাজারের দিকে হাটতে চলে যায় ওর মাকে না জানিয়ে। আজকেও গিয়েছিল। মিষ্টির দোকানগুলো এক লাইনে থাকে। বেশির ভাগ সময় দোকান গুলোর সামনে দিয়েই হাটাহাটি করতে থাকে সে। মায়ের ক্লাস কখন কখন থাকে আন্দাজ আছে মোটামুটি। সেই সময়টাতেই বের হয় কমন রুম থেকে। কারণ রোকসানা ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে কমন রুমে প্রায়ই উঁকি মেরে যায় রুমী আছে কি না। ক্লাস শেষ করার আগেই কমন রুমে ফেরত আসে রুমী।

আজকেও একটা ক্লাস শেষ করে টিচার্স রুমে ফেরার পথে রুমীকে দেখার জন্য কমন রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই রোকসানা খুব অবাক হয়ে দেখল রুমী বেঞ্চে পা ঝুলিয়ে বসে ডান হাতে একটা শাদা মিষ্টি নিয়ে চেঁটে চেঁটে খাচ্ছে।

দরজায় মায়ের ছায়া পরতেই হাত পেছনে নিয়ে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল রুমী। মুখ ফ্যাঁকাসে হয়ে গেছে।

রোকসানা স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে ছেলের দিকে। টের পাচ্ছে ওর বিস্ময়টা কেটে গিয়ে ক্রমশ তীব্র একটা রাগ দানা বাঁধতে শুরু করেছে ভেতরে।

“হাতটা সামনে আন্‌।” ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালো রোকসানা। কাগজের মত শাদা হয়ে গেছে রুমীর মুখটা। বড় বড় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। হাত সামনে আনতে ভুলে গেছে।

রোকসানা নিজেই ছেলের ডান হাতটা টেনে সামনে আনলো। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে মিষ্টিটা। চাপে রস গড়িয়ে পরছে আঙ্গুলের ফাঁক গলে।

“কোথায় পেয়েছিস এটা?” শীতল স্বরে জিজ্ঞেস করল রোকসানা।

রুমী বিড়বিড় করে বলল কেবল, “মিষ্টির দোকানের চাচা দিয়েছে।”

“কেন দিল?” তীক্ষ্ম গলায় জিজ্ঞেস করল রোকসানা।

“আমি চাই নাই। এমনি দিয়েছে খেতে.....” ভয়ার্ত চোখে মায়ের দিকে তাকালো রুমী।

রোকসানা দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কোন কথা না বলে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে। রুমী মায়ের দিক থেকে চোখ নামিয়ে ফেলল। মুখ নিচু করে মাটির দিকে তাকাতেই রোকসানা ঠাস করে ছেলেকে চড় মারলো। থাপ্পরটা এতটাই জোরে ছিল যে ছোট মানুষ্টার শরীরটা ছিটকে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে ধাক্কা খেল শব্দ করে। হাত থেকে মিষ্টিটা পড়ে গেছে মেঝেতে।

রুমি গালে হাত দিয়ে হতবিহ্বলের মত বসে রয়েছে বেঞ্চে। চোখে পানি নেই। সে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে মিষ্টিটা মাটিতে পড়ে গেছে ধূলোর মাঝে। ছেঁড়া জুতা গুলোর ফাঁক দিয়ে মোঝা বের হয়ে থাকা আঙুলগুলো অস্থির ভঙ্গিতে নড়ছে রুমীর। মিষ্টিটার দিকে ক্ষুধার্ত একটা চোখে চেয়ে আছে ছোট মানুষটা; কাঁদছে না একটুও।

রোকসানার চোখে পানি জমে উঠছে। সে প্রাণ পণে চাইছে যেন চোখে পানি না আসে। কিন্তু আটকাতে পারছে না। মিষ্টিটার দিকে ছেলের মত সেও তাকিয়ে আছে। কিন্তু ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি ক্রমশ। স্বচ্ছল একটা পরিবার থেকে হঠাৎ করেই নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রত্তাবর্তনটাকে চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিচ্ছে বালু মাখা মিষ্টিটা। যেখানে অনবরত নিজের অস্বচ্ছলতাকে দাম্ভিক ভাবে ঢেকে রাখার ব্যর্থ প্রয়াসের মিথ্যা সাহিত্য রচনা করা হয় সন্তানদের কাছে। বড় অগৌরবের সে সাহিত্য। সে সাহিত্যের অর্থানুধাবন ভয়ঙ্কর অপমানের যখন তা নিজের সন্তানের কাছে প্রকাশ পেয়ে যায়।

রোকসানার চোখে সেই অপমানের পানি জমেছে। কতটা লজ্জায় এই পানি আসে?



চার.

সোমবার স্কুলের ক্লাসের এক ফাঁকে পোস্ট অফিসে যেতে হল রোকসানাকে। স্কুল ছুটির পর গেলে পোস্ট অফিস বন্ধ হয়ে যায় প্রায়ই। তাই আগেই যাওয়া। মাসের দুই তারিখ আজ। বেতন পেয়েছে। ইকবালের বাবাকে মানি অর্ডার করতে হবে। দুই পাশের পরিবার গুলোয় বেঁচে থাকা মানুষ বলতে কেবল রোকসানার শ্বশুড় হায়দার মাহমুদই রয়েছেন। ইকবালের মৃত্যুর পর রোকসানা অনেক চেষ্টা করেছে শ্বশুড়কে এখানে নিয়ে আসার। কিন্তু রাজী হননি তিনি। স্ত্রীকে নিয়ে যে বাড়ীতে বায়ান্ন বছর সংসার করেছেন- সেই বাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে চাননি। তাছাড়া এখানে এলে মৃত ছেলের কথা বার বার মনে পরবে তাঁর- দূরে থাকলে তাও তো মনে হবে বেঁচে আছে ছেলেটা কোথাও। তাই আর রোকসানার বাড়ীতে আসেননি হায়দার সাহেব। চাকরী থেকে রিটায়ার্ড আর স্ত্রী পুত্রের মৃত্যুর পর নিজেকে পৈত্রিক ভিটাতেই আবদ্ধ করে রেখেছেন। বাকি জীবনটা স্ত্রী পুত্রের কথা মনে করেই কাটিয়ে দিতে চান।

রোকসানাও আর জোর করেনি। হয়ত নিজের মত আরো কেউ থাকুক এমনটা চেয়েছে- যার কাছে ইকবাল বেঁচে আছে। কিছু কিছু মানুষের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখাতেও বিচিত্র একটা তৃপ্তি কাজ করে। হোক না সেটা দেয়াল তুলে বাস্তব হতে নিজের জগৎ আলাদা করে, অবস্থান আলাদা করে- বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা কোনো মানুষের স্মৃতিতে। বিভ্রান্তিই এখানে সুখের সৃষ্টি করে। হায়দার মাহমুদ সাহেবের ভ্রান্তির জগতে ইকবালকে বেঁচে থাকতে দেখে রোকসানা বিচিত্র একটা সান্ত্বনা পায়। বিছানায় পাশ ফিরতেই চেনা মানুষটাকে দেখতে না পাওয়ার যে ভয়ঙ্কর শূণ্যতা রয়েছে- জগতে এর চেয়ে বড় শূণ্যতা আর কিছু নেই। রোকসানা পাশ না ফিরে ইকবালের অস্তিত্বটাকে অনেক দূরের কোনো বৃদ্ধ পিতার স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। জীবন্ত রক্ত মাংসের মানুষ হিসেবে। তাকে এখানের সংসারে আনা যাবে না। কারণ ইকবালের বেঁচে থাকাটা অনেক দরকার কোথাও না কোথাও। বড় অদ্ভুত এই বৃদ্ধ শ্বশুড় আর গৃহবধূর সন্তান ও স্বামী বাঁচিয়ে রাখার বৈপরিত্যের ভ্রান্তি। দুই জনের কাছেই একই মানুষ বেঁচে থাকে অন্য মানুষ গুলোর জগতে।

মানি অর্ডারের রিসিট নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল রোকসানা। ছড়ার ধারেই একটা উঁচু জায়গায় পোস্ট অফিসটা। সিঁড়ির পাশেই সাড়ি সাড়ি সাইকেল তালা মেরে রাখা। মাঝারি একটা কাঁঠাল গাছ ঝুঁকে রয়েছে সিঁড়ির ওপর দিকে ডাল পালা ছড়িয়ে। সিঁড়ির একপাশে দাঁড়িয়ে রিসিটের কাগজটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল রোকসানা- কোনো ভুল হয়েছে কিনা দেখার জন্য। ইদানীং পোস্ট অফিসে চুরি দারি বেড়েছে। মানি অর্ডারের টাকা গায়েব হয়ে যায় যখন তখন। বিরানব্বইয়ের পর থেকে পোস্ট অফিসের অবস্থা খারাপ হওয়া শুরু করেছে। এরশাদের আমলে বছর খানেক আগেও সরকারী সব সার্ভিসে গতি ছিল- এখন চিঠি পাঠালেও দুই সপ্তাহ পর ধুঁকতে ধুঁকতে আসে।

বাহিরে কাঠ ফাটা রোদ। কাঁঠাল গাছের ছায়াতে দাঁড়িয়ে রিসিটটা দেখছিল রোকসানা। পেছনে ছড়াটার পানি যাওয়ার মৃদু শব্দ।

“কি খবর ম্যাডাম? আপনিও দেখি পোস্ট অফিসে আসেন মাসের দুই তারিখে! হা হা!”

রোকসানা সামান্য অবাক হয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকালো। তার মতই বোধ হয় সবে মাত্র পোস্ট অফিস থেকে বের হয়েছেন আসাদ সাহেব। সিঁড়ির নিচে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে চাবি বের করে কাঁঠাল গাছের পাশে রাখা সাইকেলের তালা খুলছেন।

“হ-হ্যাঁ।....... আপনি এখানে?” কথা খুঁজে পেল না রোকসানা।

তালা খুলে সাইকেলটা বের করে রোকসানার দিকে ফিরলেন, “মানি অর্ডার করতে এলাম। আপনিও সেজন্য নাকি?”

রিসিটটা ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে রোকসানা। দায় সাড়া ভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল, “হ্যাঁ। শ্বশুড় বাড়ীতে পাঠালাম। শ্বশুড় একা থাকে। তাই।...... আপনি?”

সাইকেল নিয়ে পাশাপাশি হাটতে লাগলেন আসাদ সাহেব, “ঐ একই রকম। মেয়ে বিয়ে দিয়েও শান্তি নেই। দুদিন যেতে না যেতেই বেকার জামাইয়ের নানান ফুট ফর্মায়েশ পূরণ করতে টাকা ঢালতে হয়। না হলে মেয়েকে ধরে মারধোর শুরু করে। বাপ হয়ে তো আর সেটা হতে দিতে পারি না। একটাই মেয়ে। সেই একটাতেই যত অমাবস্যা!” নিষ্প্রাণ একটা হাসি হাসলেন। রোকসানা অবাক হয়ে দেখল হাসিটা কেমন যেন অসহায়ের মত দেখাচ্ছে লোকটার।

“বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিলেন কেন?”

“বেকার ছিল না। ভাল ব্যবসা করে দেখেই মেয়ে দিয়েছিলাম। পরে দেনা কার্জে সব খুইয়েছে। এখন বৌয়ের হাতে পায়ে ধরে টাকা নিচ্ছে। না দিলেই দেবী থেকে দাসী বানিয়ে যাচ্ছে তাই ভাবে মারধর করে। মেয়েকে চেয়েছিলাম নিজের কাছে নিয়ে আসতে। মেয়ে আবার আসবে না। বাপের বাড়ীতে এসে বসে থাকার চেয়ে স্বামীর লাথি খাওয়া নাকি ভাল তার কাছে।” বিষণ্ন চোখে সাইকেলটার হাতলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“আপনার স্ত্রী?” রোকসানা ভদ্রলোকের দিকে তাকালো সপ্রশ্ন চোখে।

লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন, “মেয়ের জন্মের সময়ই মারা গেছে। এ্যাকলামসিয়া হয়েছিল। হয় মা নয় বাচ্চাকে বাঁচাতে হবে। আমি চেয়েছিলাম গাছ বাঁচুক। গাছ থাকলে ফলও আসবে। কিন্তু কেন জানি সুলতানাই মারা গেল, সারাক্ষণ আঁকুপাঁকু করতে থাকা মেয়েটাকে রেখে গেল।”

রোকসানা আর কোন প্রশ্ন করল না। রোদ চর চড়িয়ে বাড়ছে। মফস্যলের খোয়া বেছানো রাস্তাতেও বালু গরম করে চারপাশটায় আগুন ঢালছে সূর্যটা। রাস্তার দুপাশে বিস্তির্ন ধান ক্ষেত আর ছাড়া ছাড়া ভাবে কাঁঠাল, জারুল আর শিল কড়ইয়ের দেয়াল। ছায়ার নিচ থেকে বের হলেই ভাদ্র মাসের আগুন রোদ। পিঠ পুড়িয়ে দেয়।

বাকি রাস্তায় আর কোনো কথা হল না।

স্কুলের কাছাকাছি আসলে বদি উল্লাহের দোকানটা দেখা যায়। বিরাট একটা আম গাছের নিচে দোকানটা। কাঁচা রাস্তাটার ওপরেই দোকানটা। বেঞ্চ পাতা আছে কয়েকটা। একপাশে বড় কড়াইয়ে গরম গরম জিলাপি ভেজে পাশে চিনির সিরাতে ছেড়ে দিয়ে তুলে রাখছে বড় একটা টিনের চালুনিতে, তেল ঝাড়ছে।

আসাদ সাহেব স্কুলের দিকে যাওয়ার বদলে সাইকেল নিয়ে হাটতে হাটতে দোকানটায় চলে গেলেন কোন কথা না বলে। রোকসানা দূর থেকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল লোকটা ঠিক ইকবালের মত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েই চালুনি থেকে গরম গরম জিলাপি তুলে খাওয়া শুরু করেছে। হাতে নিয়ে ফুঁকিয়ে ফুঁকিয়ে খাচ্ছে।

জোর করে চোখ সরিয়ে নিল রোকসানা। আসাদ সাহেব লোকটা একটু বিচিত্র স্বভাবের। নয়তো এতক্ষণ কারো সঙ্গে হেটে আসার পর কোনো কথা না বলে জিলাপি খেতে দোকানে চলে যায় কেমন করে? স্বাভাবিক ভদ্রতা বশত হলেও তো তাকে কিছু বলে আসা উচিত ছিল।

রোকসানা স্কুল মাঠের বিশাল বট গাছটার নিচ দিয়ে টিচার্স কমন রুমের দিকে যেতে যেতে নিজের অজান্তেই ফিরে তাকালো আসাদ সাহেবের দিকে। এখনও ফুঁকিয়ে ফুঁকিয়ে জিলাপি খাচ্ছেন। অবিকল ইকবালের মত...... ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা তাঁকে ঘিরে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে খাওয়া দেখছে তাঁর।

ইকবালও ঠিক এরকম করত। বাচ্চা কাচ্চা জড়ো করে ফেলতো তার খাওয়া দেখার জন্য...... ক্লাসের ঘন্টার শব্দে বাস্তবে ফিরে এলো রোকসানা। হাটতে লাগলো। গরমটা সহ্য হচ্ছে না আজকের।

উপান্ত - "খ"

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১:৪৩

ভবঘুরে ছেলেটি বলেছেন: অসাধারণ... কেমন যেন হঠাৎ করে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল :((

০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৪:৫৩

নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ :)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.