![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।
প্রত্যেক সন্ধ্যার আগে, ঠিক শেষ বিকেলটায় আকাশটাকে কেন জানি মেয়ে মেয়ে লাগে। গোধূলির মুহূর্তটায় সিঁদুরে রাঙিয়ে দিয়েছে যেন মেয়েটার কপাল। দিবস আর রজনীর বিবাহের ক্ষণে কেবল কণের মুখটাই পুরো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। বিস্তৃকা বিচিত্র একটা ব্যথা ভরা আনন্দ চোখে সেই নবোঢ়ার আনন্দিত, ম্লান, লাজুক কিংবা ক্রন্দনে আঁকা একেক দিনের একেক আকাশে তাকিয়ে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে মেয়েটার কেমন লাগছে তখন। বিস্তৃকা অনেক অনুভূতি দেখেছে আকাশে আকাশে। ঘন সিঁদুরের রক্তাক্ত লাল রঙটা সত্যি আনন্দেরও, বিষাদেরও।
সন্ধ্যা নামার এই আলোটাকে নাকি “কণে দেখা” আলো বলে। এই আলোতে কণে দেখা কীভাবে হয় বিস্তৃকার ঠিক জানা নেই। কিংবা বর পক্ষ এসে মেয়ে ঠিক এই সময়ে দেখবে সেটাও কীভাবে সম্ভব? ঘরের বাতি নিভিয়ে কণে দেখা হয় নাকি? ঘর ভর্তি একগাদা মানুষ আবছা অন্ধকারের মাঝে বসে কণে দেখছে? নাকি মেয়ে ট্রে তে করে চা নিয়ে ঢোকার সময় ঘরের বাতি নিভিয়ে কণে দেখা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়? এই আলোতে খুব সম্ভব সব মেয়েকেই সুন্দর লাগবে- হয়তো এটাই মূল কারণ! বিয়েতে যেমন কণের গায়ের রঙ যেটাই হোক না কেন, হলুদ মেখে ঘষে মেজে তাকে হলদে বানিয়ে দেয়া হয় যাতে একটা নির্দিষ্ট মাপ পর্যন্ত হলেও সুন্দর লাগে, এই কণে দেখা আলোটাও ঠিক তেমন একটা আলো। সব গায়ের রঙ কম বেশি একই লাগবে। যদিও সময়টাকে একেবারে অসময় বলা যায়। এই সময়ে বাসায় মেহমান এলেও তো মানুষ বিরক্ত হবে স্বাভাবিক ভাবেই। একটু পরেই সব বাসার বাচ্চা কাচ্চারা খেলা থেকে ফিরে এসে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে পড়তে বসবে, কিংবা বড়রা হাঁটতে বের হবে অথবা টিভি দেখবে, সাংসারিক আলাপে ব্যাস্ত হবে। কিন্তু আলো মিলিয়ে যাওয়ার পরে সেটা। এই মুহূর্তে সত্যিকার অর্থে সব বাসার চিত্রই থাকে স্থবির জলরঙে আঁকা পেইন্টিঙের মত। স্থির। সেই সময়ে কিনা কেউ মেয়ে দেখতে আসবে, মেয়ে একহাত ঘোমটা দিয়ে বরপক্ষের সামনে গিয়ে বসবে, টুকটুক করে প্রশ্নের উত্তর দেবে, নাস্তা পরিবেশন করবে, বরের সঙ্গে চোখাচোখি হবে লাজুক মুখে- এতকিছু হবে এই লাল লাল পৃথিবীর খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে?
নাকি এটার অন্য কোনো অর্থ আছে? যেমন বাড়ির ছাদে মেয়ে হয়তো অন্য বোনদের সাথে দাঁড়িয়ে বিকেলের এই সময়টা গল্প করছিল, অন্য বাড়ির ছাদ থেকে চুপি চুপি ছেলে সেই মেয়েকে দেখে প্রেমে পড়ে গেল? অথবা নিচের রাস্তা দিয়ে সাইকেলে করে যাওয়ার সময় মেয়েকে ছাদ থেকে দেখে মাথার ভেতর ওলট পালট লেগে গেল? দেখা গেল এই মেয়েকে বিয়ে না করে ছাড়বে না- কঠিন সিদ্ধান্ত তার!
বিস্তৃকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে ছাদের কার্নিসে হেলান দিয়ে দূরের লাল রঙা মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক মেঘও দেখছে না। শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। এই লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকলে কেন যেন কয়েকজন খুব কাছের মানুষের কথা ঘুরে ফিরে মনে পড়তে থাকে। বড় আপার ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিতে দিতে প্রায় সন্ধে গড়িয়েছিল। পড়ন্ত বিকেলের লালচে দিগন্তটার শেষ প্রান্ত থেকে আব্বা সাইকেলে টিন টিন বেল বাজিয়ে ছুটে এসেছিল আপার কলেজ থেকে রেজাল্ট নিয়ে। বড় আপা শুকনো মুখে জায়নামাজে বসে তজবী গুণছে তখনো। থেকে থেকে কাঁপছে অজানা আশঙ্কায়। আব্বা রেজাল্ট নিয়ে ফিরেছে কিনা দেখার জন্য ভেতরের ঘর থেকে বার বার উঁকি দিচ্ছিল ড্রইং রুমের দরজাটার দিকে। জায়নামায থেকেই দরজাটা দেখা যেত। আব্বা সেদিন ঘর না ঢুকে বাহিরের সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে গিয়েছিলেন কাউকে কিছু না বলে। মুখ গম্ভীর। আম্মাও কিছু জানে না। আব্বা যে এসেছে কেবল বিস্তৃকা দেখেছিল জানালা দিয়ে। কিছুদিন আগে বাথরুমে পড়ে গিয়ে বাম হাত ভেঙেছিল সে। হাতে বিশাল প্লাস্টার করা। গলা থেকে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঝোলানো থাকতো হাতটা। স্কুলে যাওয়া বন্ধ, প্রাইভেট পড়তে যাওয়াও বন্ধ- আনন্দেই থাকার কথা, কিন্তু সেই সাথে প্রত্যেক বিকেলে বাহিরে খেলতে যাওয়াটাও আব্বা আম্মা বন্ধ করে দেয়াতে বিস্তৃকার জন্য বাসায় বসে হাত ভাঙা উপলক্ষ্যে ছুটি কাটানোটা বিরাট সমস্যার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সারাদিন জানালার কাছে বসে থাকা করার কিছুই ছিল না সে সময়। বড় আপার রেজাল্টের দিনও আব্বা কখন ফিরবে সেই আশায় জানালার কাছে টুল নিয়ে বসেছিল বিস্তৃকার। দূর থেকে আব্বাকে সাইকেল চড়ে আসতে দেখা যাচ্ছিল। পশ্চিমে বিশাল একটা মাঠ রয়েছে। বিকেল বেলা পুরো এলাকার বাচ্চা কাচ্চা সবাই ওখানে গিয়ে খেলে। আব্বা খেলতে থাকা সে সব বাচ্চাদের মাঝ দিয়ে এঁকে বেঁকে সাইকেল চালিয়ে আসছিল সেদিন। ওপাশের লালচে সূর্যটা মাঝে আব্বাকে ছবিতে জলরঙে আঁকা কোনো দৃশ্য মনে হচ্ছিল বিস্তৃকার। সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে টিন টিন বেল বাজাতে বাজাতে খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোর মাঝ দিয়ে ছুটে আসছেন। সিঁড়ি দিয়ে সাইকেল তোলার শব্দ শুনে বুঝেছিল আব্বা ছাদে সাইকেল ওঠাবে, ওপরে সাইকেল রেখে ঘরে আসবে। কিন্তু দশ পনেরো মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পরেও আব্বা ঘরে না আসায় বিস্তৃকা এক দৌড়ে বড় আপাকে গিয়ে বলে দিয়েছিল, “আপা, আপা! আব্বা এসেছে। কিন্তু ছাদে গেছে। মনে হয় খবর ভাল না। ঘরে ঢুকেনি।”
ওর কথা শুনে জায়নামাযে বসে থাকা বড় আপার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল মুহূর্তেই। কাঁপা গলায় কেবল বলল, “আ-আব্বা ছাদে গ-গেছে?”
বিস্তৃকা অনেক ছোট তখন। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। বিষয়বস্তুর গুরুত্ব তখনো বোঝার মত বয়েস হয়নি। মাথা সামনে পেছনে ঝাঁকিয়ে ভাঙা হাতটাই তুলে দেখালো, “সিঁড়ি দিয়ে সাইকেল সহ ছাদে উঠেছে। নামেনি। আপা মনে হয় ফেল করেছো!”
অন্য সময় হয়ে বড় আপা বিস্তৃকাকে ঠাশ করে চড় লাগিয়ে দিত। কিন্তু বিস্তৃকার হাত ভাঙা থাকায় আর রেজাল্টের দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন বড় আপা প্রায় হিস্টোরিয়া রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে জায়নামায থেকে উঠে দেয়াল ধরে ধরে কোনমতে হেঁটে ছাদে উঠে গিয়েছিল। বিস্তৃকাকে চড় দেয়নি। কোনো কথাই বলেনি। আম্মার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না অনেকদিন ধরেই। হাই প্রেশার। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন সেই সময়। তাই বাসার বড় মেয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট সংক্রান্ত কোনো বিষয় তাকে ছুঁতে পারছিল না। বাসাতে বাকিরাও কেউ ছিল না। সবাই হয় বাহিরে প্রাইভেট পড়তে গেছে, নয়তো খেলতে। কেবল ওরা দুই বোন আর বাবা মা। বড় আপা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে গিয়ে বার কয়েক মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল। পেছন পেছন বিস্তৃকা থাকায় রক্ষা হয়েছে। ওকে আর দেয়াল ধরে ধরে ছাদের লাল পৃথিবীতে উঠে এসেছিল বড় আপা। খোলা ছাদ। অনেকগুলো তার আর দড়ি টানানো ছাদ জুড়ে। কাপড় শুকাতে দেয়া তার। একপাশে একটা বাঁশের ওপর টিভি এন্টেনা কাঁত হয়ে আছে একদিকে। মৃদু বাতাসে কাপড়গুলো দুলছে। ছাদের সিঁড়িঘরের ওপর কবুতরের খোপ। কবুতরের শব্দ শোনা যায়। আব্বার সাইকেলটা কবুতরের ঘরটার সাথেই নিচে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। ভয়ার্ত মুখে বড় আপা ছাদে উঠেই কাঁপা গলায় ডাকতে লাগল, “আ-আব্বা? আব্বা?”
কাপড়ের জন্য প্রথমে দেখা যাচ্ছিল না মোশতাক আহাম্মেদকে। কবুতরের ঘরটার দিকে খানিকটা ঘুরে এগোনোর পর সিঁড়ি ঘরের অন্য পাশে দেখা গেল তাঁকে। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী গায়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন পশ্চিমের পড়ন্ত রক্তিম সূর্যটার দিকে। হাতে একটা খয়েরি প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চুপচাপ। মেয়ের ডাকে সাড়া দিলেন না।
বিস্তৃকার স্পষ্ট সবটা মনে নেই। শুধু মনে আছে বড় আপা অসুস্থ রোগীর মত পা টেনে টেনে আব্বার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেদিন। ফ্যাঁকাসে মুখে কাতর গলায় আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আব্বা? আ-আমার রেজাল্ট দিয়েছে? কিছু বলছেন না কেন? আমার খুব ভয় লাগছে। যা হয় হোক, আপনি বলে দেন।”
বিস্তৃকা বড় আপার পেছন পেছন এসে দাঁড়িয়েছে। উৎসুক মুখে আব্বা আর বড় আপার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার খুব আনন্দ লাগছে। খুব গুরুতর বিষয় নিশ্চই। সবার মুখ গম্ভীর কেন এত? আর আব্বা রেজাল্ট নিয়ে এলে কথা বলছে না কেন? সেও জিজ্ঞেস করল বড় আপার কথার প্রতিধ্বনি করে, “আপনি বলে দেন আব্বা?”
সূর্যটার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বড় মেয়ের দিকে তাকালেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে। ছোট মেয়ের দিকে তাকালেন না। তারপর একটা নিঃশ্বাসফেলে কন্যাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার বদলে হাতের প্যাকেটটার মুখ খুলে সেটা থেকে একটা হালকা সবুজ জমিনের কুসিকাঁটার কাজ একটা শাড়ি বের করে এগিয়ে দিলেন বড় আপার দিকে।বড় আপা সেটা না নিয়ে বিস্মিত চোখে আব্বার দিকে তাকিয়ে রইল।
আব্বা শাড়িটা আবারো এগিয়ে ধরলেন বড় মেয়ের দিকে, ইতস্তত কণ্ঠে বললেন, “স্টার পেয়েছিস মৃত্তিকা, সাতশো চুরাশি নাম্বার হয়েছে। তিনটা সাবজেক্টে লেটারও পেয়েছিস। ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি আর হায়ার ম্যাথে। তোদের স্কুল থেকে তুই’ই প্রথম।”
বড় আপা তখনও শাড়িটা ছুঁয়েও দেখেনি। পলকহীন চোখে আব্বার দিকে চেয়ে আছে।
আব্বা বাড়িয়ে ধরা শাড়িটা অস্বস্তি ভরা মুখে আপার হাতে গুজে দিয়ে মলিন গলায় বললেন, “পকেটে বেশি টাকা ছিল না। মিষ্টি-ফিষ্টি কেনা জিনিসটা কেমন যেন সেকেলে লাগে। ভাবলাম একটা শাড়ি নিয়ে আসি তোর জন্য। গত বছর স্কুলের বার্ষিক সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য শাড়ি চেয়েছিল। দিতে পারিনি। এখন দিলাম। তোর আম্মাকে ডেকে দে, পায়েস রাঁধতে বল। পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে। আজকে সবাই পায়েস খাব। ওর প্রেশার ঠিক হলে রাঁধতে বলিস।”
মৃত্তিকা আপা শাড়িটা খামচে ধরে বিহ্বলের মত দাঁড়িয়ে আছে। আব্বা ঘুরে কবুতরের বাসাটায় দেখতে লাগলেন নতুন ডিম আছে কিনা। কদিন ধরেই টানা ডিম দিচ্ছে কয়েকটা কবুতর। খুব ছোট ছোট সাদা আর মেটে রঙের ডিম। দেখতে খুব সুন্দর। বিস্তৃকা ডিমগুলো মাটির হাঁড়িতে পানি দিয়ে ডুবিয়ে রাখে যত্ন করে। ফ্রিজ নেই ওদের। ডিম টিকিয়ে রাখার প্রাকৃতিক পদ্ধতি। মোশতাক আহাম্মদে খুব শখ করে ছোট মেয়েকে কবুতরের ডিম সংরক্ষণ প্রকৃয়া শেখান প্রতিদিন।
আজ বড় মেয়েকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে আবার কবুতরের ডিম খোঁজায় ব্যাস্ত হয়ে গেলেন। যেন বেমালুম ভুলে গেছেন একটু আগে বড় মেয়েকে শাড়ি দিয়েছেন পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য।
পেছনে বিস্তৃকা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে বড় আপার দিকে। শাড়িটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে। বড় আপা না পরলে সে পরবে। ওর শাড়ি পরার খুব শখ!
বড় আপা বার কয়েক চেষ্টা করল আব্বাকে পেছন থেকে ডেকে কিছু বলার। পারল না। বিস্ময়, আনন্দ, বিষাদ আর কান্নার একটা মিশ্রণ মুখের মাঝে তীব্র ভাবে ফুটে উঠে রয়েছে মৃত্তিকা আপার। শাড়িটা বুকের কাছটায় খামচে আকড়ে ধরে রেখেছে। যেন কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাবে ওর কাছ থেকে। বিস্তৃকার মনে আছে আপার চোখে সেদিন স্ফটিক স্বচ্ছ জল জমে উঠেছিল, কিন্তু কিনার উপচে আসেনি। শেষ বিকেলের এই লালচে আলোটায় আপার চোখগুলো চিকচিক করছিল কেবল। স্বর্ণ জলে তাকে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে।
পশ্চিমের ঢলতে থাকা রক্তিম সূর্যটার ঠিক সেই একই আলোতে বড় আপা বিদায়ও নিয়েছিল। সেদিনের বুকের কাছে খামচে ধরে রাখা পরম আরাধ্য শাড়িটা পরেই আপা গলায় ফাঁস নিয়েছিল পাঁচ বছর পরে। বিকেলের এই আলোতে বাহিরের খোলা জানালা দিয়ে সবাই দেখতে পেয়েছিল মৃত্তিকা আপার লাশটা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। বিস্তৃকার খেয়াল নেই সেদিনও আপার চোখে এরকম পানি জমে উঠেছিল কিনা। বন্ধ চোখেও অনেক পানি থাকে। দরজা ভাঙার পর মানুষের ভিড়ের কারণে আপাকে ঠিকমত দেখতে পায়নি। ওকে দেখতে দেয়া হয়নি।
বিস্তৃকার আজও কৌতূহল জাগে, বড় আপার চোখে সেদিন জল ছিল? কণে দেখা আলোর জল?
মৃত্তিকার বিয়েটা হয়েছিল ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে সবে যখন একটা সরকারী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছে, তখন। হুট করেই বিয়ে। মোশতাক আহাম্মেদের রিটায়ার্মেন্টের সময় হয়ে গেছে। মাস ছয়েকের মত হাতে আছে। এর মাঝেই বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ স্ট্রোক করলেন। সকাল বেলা ভাল মানুষটা প্রতিদিনকার মত মাঝারি টিফিন ক্যারিয়ারে করে স্ত্রী রোখসানা খানমের বানিয়ে দেয়া দুপুরের খাবার নিয়ে সাইকেলে করে অফিসের জন্য বেরিয়েছিলেন। ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরের অফিসে এসিস্টেন্টের চাকরি করতেন। খুব সহজ সরল জীবন যাপন। কারো সাতেও থাকতেন না, পাঁচেও থাকতেন না। মানুষ নানান ধরণের কাজ করে দেয়ার জন্য টাকা পয়সা সাধা সাধিও করেছে বহুবার। কিন্তু অদ্ভুত একটা ভয়ের কারণে তিনি এসব এড়িয়ে চলেছেন সারাজীবন। নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ ছিলেন। প্রত্যেক ওয়াক্তে নামাযে দাঁড়াবার সময় কাঁধে খুব দামী একটা শাল চাপিয়ে নিতেন, মাথায় আফগানী টুপি পরে একটা শিশি থেকে আতর নিয়ে গায়ে লাগাতেন। তাঁর কথা হল দিনে অফিসে এতো বড় বড় মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হয়, তাঁদের জন্য হলেও ভদ্র দামী পোশাক পরে আসতে হয় প্রতিদিন। আর পুরো বিশ্বজগৎ যিনি বানিয়ে বসে আছেন- তাঁর সাক্ষাতে যখন নামাযে দাঁড়াচ্ছেন পোশাকের অবস্থা আরো ভাল হওয়া উচিত। নিজের শ্রেষ্ঠ বাহ্যিক রূপে তাঁর সামনে যাওয়া উচিত, যাতে ভেতরটাও ঠিক তেমনই সুন্দর করে দেন তিনি। জীবনে খুব শখ করে নিজের জন্য তেমন কিছু কখনই কেনেননি, স্ত্রী রোখসানা খানম জমানো টাকা দিয়ে পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীতে কিনে দিয়েছিলেন কাশ্মীরী শাল আর আফগানী টুপিটা। সেই শাল আর টুপিই মোশতাক আহাম্মেদের সবচেয়ে দামি পোশাক। তাই এগুলোই গায়ে চড়িয়ে নামাযে দাঁড়াতেন।অফিসের ভেতরে বা বাহিরে তাই মোশতাক আহাম্মেদ নামের এই মানুষটাকে নিজের অজান্তেই কেন জানি সবাই ভক্তি ও শ্রদ্ধার চোখে দেখত সব সময়।
খুব সহজ সরল মানুষটা যে আচমকাই স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে যাবেন, কেউ ভাবতেও পারেনি। বাড়িতে শক্ত সামর্থ পুরুষ মানুষ বলতে কেবল তিনিই ছিলেন। মৃত্তিকার পর মিশুক হচ্ছে একমাত্র ছেলে। সেও পড়ে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার মত তখনও পা শক্ত হয়নি। বাকি দুটো, হৃত্বিকা আর বিস্তৃকা আরো ছোট। হৃত্বিকা পড়ে সেভেনে আর বিস্তৃকা সিক্সে উঠেছে। প্রথম দুজন পিঠাপিঠি ভাই বোন, পরের দুটোও একই রকম। এক বছর কি আট মাস ছোট বড়। কেউই উপযুক্ত না।
এর মাঝেই মোশতাক আহাম্মেদ খারাপ রকমের স্টোক করলেন। টানা তিন দিন আইসিইউ’তে ভর্তি ছিলেন। ডাক্তারেরা জানিয়ে দিলেন আরো একটা স্ট্রোকের খুব বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ওটা যদি হয় বাঁচবেন না তিনি। রোখসানা খানমের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। ধারে কাছে আত্মীয় স্বজন বলতে কেউই নেই। মোশতাক আহাম্মেদের কেবল একটা বড় বোন ছিল। সেও মারা গেছেন বছর খানেক হচ্ছে। রোখসানা খানমেরও কেউ নেই। বাবা মা মারা গেছেন অনেক বছর হয়ে গেছে। বড় ভাইয়েরা থাকে অস্ট্রেলিয়াতে। যোগাযোগ নেই বহুবছর ধরে।তাদেরকে যে এই বিপদের দিনে দেখবে- তেমন কেউ নেই। হঠাৎ করেই মোশতাক আহাম্মেদের সন্তানেরাও টের পেয়ে গেল এতো মানুষের ভিড়ে তাদের গুটি কয়েকজন মানুষের সংসারটা খুব একা, নির্বাসিত। নদীর তীরের বটগাছে ঝড়ের ঝাপ্টা লাগা দেখে রাত পোহানোর পর গ্রামের লোকে আন্দাজ করে- ঝড়টা কেমন ছিল। মোশতাক আহাম্মেদের পরিবারটা সেদিন বুঝতে পেরেছিল তারা কতটা অবলম্বনহীন।
রোখসানা খানম থেকে শুরু করে মৃত্তিকা, মিশুক, হৃত্বিকা, বিস্তৃকা সবাই নামায পড়ে বার বার দোয়া করছিল যাতে মোশতাক আহাম্মেদের দ্বিতীয় স্ট্রোকটা না হয়। যেন বেঁচে যান তিনি এই যাত্রা। অন্তরীক্ষের জনক সেদিন সে কাতর মিনতি শুনেছিলেন। মোশতাক আহাম্মেদ বেঁচে গেলেন। কিন্তু শরীরের অর্ধেক পাশ প্যারালাইজড হয়ে গেলেন চিরতরে।
সংসারে ভাল মানুষের দূর্দিন হয় দীর্ঘস্থায়ি। মোশতাক আহাম্মেদের পরিবারটার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হল। মানুষটা অর্ধেক অচল হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো সংসারটাও অর্ধেক অচল করে দিয়ে গেলেন। সরকারী চাকরি করতেন দেখে বেতন বন্ধ হল না। মাসে মাসে অল্প হলেও টাকা আসতো মোশতাক আহাম্মেদের নামে। সৎ মানুষ ছিলেন দেখে ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর ইমতিয়াজ সাহেব নিজে এসেছিলেন বাসায় তাঁকে দেখতে। শোবার ঘরে মোশতাক আহাম্মেদের বিছানার পাশে অনেকক্ষণ বসেছিলেন তাঁর ডান হাতটা ধরে। শরীর অর্ধেক অবশ হয়ে যাওয়ায় মোশতাক আহাম্মেদ কথা বলতে পারেননি। কেবল শিশুর মত কাঁদছিলেন অফিসের বড় সাহেব দেখতে এসেছে বলে।
রোখসানা খানম চোখে আঁচল চেপে রেখেছিলেন। বাহিরের মানুষের সামনে কাঁদাটা অসভোনীয় লাগে তাঁর। কেবল গলাটা খুব শান্ত রেখে ইমতিয়াজ সাহেবকে বলেছিলেন, “স্যার আপনি আসায় সত্যিই অনেক খুশি হয়েছি। ওনার অসুখের পর থেকে মনে হচ্ছিল আমরা সবাই খুব একা হয়ে গেছি। মাথার উপর থেকে ছাদ সরে গেছে।”
ইমতিয়াজ সাহেব দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। তারপর মুখে তুলে একে একে মোশতাক আহাম্মেদের ছেলে মেয়েগুলোর দিকে তাকালেন। দরজার পর্দা সরিয়ে সবাই এসে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খুব অল্পদিনেই ছেলে মেয়েগুলোর মাঝে হতদরিদ্র আর বিক্ষিপ্ত-বিপন্নতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
আড়ষ্ট গলায় বললেন, “ভাবী, মোশতাক সাহেব পোস্টে আমার জুনিয়ার হলেও বয়সে আমার বড় ভাইয়ের মত। আর অফিসের অন্য কারো প্রতি আমার অতটা আস্থা বা শ্রদ্ধা নেই যতটা তাঁর প্রতি ছিল, আছে। ভাল মানুষের মূল্য সবাই বোঝে। আমি বাড়তি কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাই না, আর কথা বলেও এ অবস্থায় আপনাদের সাহস দেয়াটাই কেবল হবে। কিন্তু কাজে আসবে কম। তাই কাজের কথাটাই বলে ফেলি।” এক মুহূর্তের জন্য থামলেন ইমতিয়াজ সাহেব। কাঁচা পাঁকা ভ্রুর নিচের বুদ্ধিদীপ্ত চোখগুলো ভারি কাঁচের চশমার আড়াল থেকে একে একে মোশতাক আহাম্মেদের চার সন্তানের ওপর ঘুরে এসে রোখসানা খানমের ওপর স্থির হল। “মাত্র ক’মাস আগেই বলা নেই কওয়া নেই দেখি অফিসে এক কেজি মিষ্টি নিয়ে হাজির মোশতাক সাহেব। আপনাদের বড় মেয়ে নাকি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েছে। আমি তো শুনে অবাক! বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করা মুখের কথা না ভাবী। আমার নিজেরও আছে, আমি জানি। রাইট ট্র্যাকে রাখাটা আসলেই অনেক কঠিন কাজ। সবে তো মাত্র বড়টা একটা ধাপ পার করেছে। বাকি তিনজনের সামনেই অনেকটা পথ। তাছাড়া আপনাদের বড় মেয়েটারও বিশাল সংগ্রামের জীবন শুরু হয়েছে। ঘরের অভিভাবকের এই অবস্থায় পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়াটা অনেক মুশকিল। আমি চাইলে প্রথমেই বলতে পারতাম আপনার মেয়েটাকে ওর বাবার চাকরিতে দাখিল করিয়ে দিতে। কিন্তু আরো ব্রাইট ফিউচার ওর জন্য অপেক্ষা করছে। আর ও.... কি নাম বললে যেন? মিশুক?”
মিশুক মাথা নাড়ালো ভীত মুখে।
“মিশুক মাত্র ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে। পাশ না করলে ওকে ওর বাবার চাকরিটা দেয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনাদের সংসারটা চালানোর জন্য কারো না কারো হাল অবশ্যই ধরা দরকার।” গম্ভীর গলায় বললেন ইমতিয়াজ সাহেব।
রোখসানা খানম অপেক্ষা করলেন। কিছু বললেন না কালেক্টর সাহেবের কথার জবাবে। কেবল দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্তিকার ইচ্ছে হয়েছিল মুখ ফুটে বলে ওঠে যে ডাক্তারি পড়বে না সে। এই পরিবারটার সবার জন্য সে চাকরিটা নেবে। তাঁর বাবার জায়গায় চাকরি করবে।
কিন্তু তাকে কিছু বলতে হল না। ইমতিয়াজ সাহেব বললেন, “ভাবী, আমি আগেই শুনেছি যে আপনি অনার্স করেছেন। সংসারের শুরুর দিকে আপনিও চাকরি করতেন। কিন্তু সন্তান মানুষ করতে হবে দেখে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।” থামলেন এক মুহূর্ত, রোখসানা খানমের দিকে তাকালেন, “আপনি চাইলে আমি মোশতাক সাহেবের চাকরিটা আপনাকে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। অনেকদিন হয়ে গেছে অফিস আদালত থেকে আপনি দূরে থেকেছেন। তবে সামলে নিতে পারবেন আশা করছি। যদি আপনি চান, আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। অন্তত আপনাদের পরিবারটার জন্য এইটুকুই সর্বোচ্চ আমি করতে পারি ভাবী। মোশতাক সাহেবের সামনেই বললাম কথাটা। উনি উত্তর দিতে না পারুক, অন্তত জানুক আমি ওনার এই খারাপ সময়ে সাহায্য করতে চেয়েছি। বাকিটা আপনার সিদ্ধান্ত।”
চোখ থেকে আঁচল সরিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা মোশতাক আহাম্মেদের দিকে তাকালেন রোখসানা খানম। কাঁদছে মানুষটা। স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না। গোঙ্গাচ্ছেন। কিন্তু এতদিনের চেনা মানুষটার অব্যক্ত বাক্যটুকু বুঝে নেয়ার মত অসামর্থ্য রোখসানা নন। এতকালের সংসারের অসুস্থ মানুষটা এতদিন ছিলেন রোখসানা খানম। অথচ সেদিন তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে অকপট দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি পারবো ভাই। আপনি ব্যবস্থা করে দিন।”
ইমতিয়াজ সাহেব সত্যি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ক’মাস আগের দৃশ্যটা বদলে গেল কয়েকটা সূর্যোদয়ের পরে। মোশতাক আহাম্মেদের মত রোখসানা খানমও প্রতিদিন সকালে উঠে অফিসে যাওয়া শুরু করলেন। বাকিরাও স্কুলে যায়। মৃত্তিকাও ময়মনসিংহ চলে গেছে। বাসায় কাউকে থাকা দরকার সবার অবর্তমানে মোশতাক আহাম্মেদের দেখা শোনার জন্য। একটা কাজের মেয়ে রেখে দেয়া হল তাই এই অভাবের মাঝেও। রোখসানার অফিস কিংবা বাকিদের স্কুল, কলেজের সময়টা দেখে রাখবে মোশতাক আহাম্মেদকে।
উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে স্থিরতা আসে না। কেবল বাড়ে, কমে। রোখসানা খানমের চাকরিতে যোগ দেয়াতে ঢেউ কমে এসেছিল। ঢেউ থামেনি। মোশতাক আহাম্মেদের সংসারে আরো অনেক ঢেউ বাকি ছিল তখনও।ছয় মাসের মাথায় মোশতাক আহাম্মেদের দ্বিতীয় স্ট্রোকে মৃত্যু কিংবা তার ঠিক পর পরই মৃত্তিকার বিয়েটা ছিল আরেকটা বড় ঢেউ বিস্তৃকাদের জীবনে।
রোখসানা ধীরে ধীরে যখন প্রায় অভ্যস্থ হয়ে এসেছেন তাঁর নতুন জীবন যাপনে, সন্তানেরাও যখন সামলে নিয়েছে সবটা- ঠিক তখনই যেন সবার অলক্ষে কাউকে না জানিয়ে এক বিকেলের লাল সে আলোয় বিদায় নিলেন মোশতাক আহাম্মেদ। ঠিক যেন ঘুমিয়ে গেলেন। ক্ষোভ নিয়ে ঘুমালেন, মাগরীবের সময় হয়ে যাচ্ছে, অথচ আগের মত উঠে ওজু করে কাঁধে শাল ফেলে টুপিটা মাথায় লাগিয়ে, আতর মেখে নামাযে দাঁড়ানো হল না আর তাঁর....... ঘরে কেউ ছিল না। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।
বিস্তৃকার গুনে গুনে মনে রেখেছে, আব্বার মৃত্যুতে বাড়ির ছাদের কবুতরের ঘরে ছয়টা কবুতর আর ফিরে আসেনি। কোথায় যেন চলে গেছে। কে জানে, পৃথিবীর লাল আলোয় তারাও কি আব্বার পেছন পেছন অনেকদূর উড়ে গিয়েছিল কিনা?
বিস্তৃকাদের পাশের বাসার দীপ্ত ওর থেকে এক ক্লাস নিচে পড়তো। আব্বা মারা যাওয়ার বেশ কিছুদিন পর দীপ্তর সাথে বিকেল বেলা ছাদে দেখা হয়েছিল বিস্তৃকার। ছেলেটার একটা পা নেই। ক্রাচে ভর করে করে ছাদে আসে। কিছুদিন হল গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল দেখে বিস্তৃকার বাবার মৃত্যুর খবর পায়নি। আসার পর জেনেছে। সেদিন সে দুঃখ করে বিস্তৃকাকে বলেছিল, “ভাল মানুষ কবুতর হয়ে যায় বিষ্ঠা আপা। চাচাও কবুতর হয়ে গেছে। কত জায়গায় উড়ে বেড়ায় নিশ্চই!”
বিস্তৃকার মন ভাল নেই। না হলে বিস্তৃকা উচ্চারণ করার বদলে সহজ করে বিষ্ঠা ডাকায় মাথায় চাটি লাগাতো দীপ্তকে। কঠিন গলায় বলে উঠতো, “আমার নাম বিষ্ঠা না! বিস্তৃকা! বিস্তীর্ণ মন যে মেয়ের! বুঝেছিস?”
মোশতাক আহাম্মেদের চাকরিটায় বহাল হয়ে যতটা শক্ত হয়েছিলেন রোখসানা, পরিবারের দূর্দিন কেটে যাবে বলে যতটুকু নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন; স্বামীর মৃত্যুতে ততটাই ভেঙে পড়লেন এবার। ছন্নছাড়া বিপন্ন একটা ভাব চোখে মুখে জায়গা করে নিল তাঁর। এত বড় পরিবারটাকে কীভাবে সামলে রাখবেন ভেবে কূল কিনারা পেলেন না। এতদিন মোশতাক আহাম্মেদ সবার অলক্ষ্যে বিছানায় পড়ে থেকেও ঘরটার একটা শক্ত খুঁটি হয়ে থেকেছিলেন। কিন্তু চলে যাওয়ার সাথে সাথে সেই খুঁটি উপ্রে নিয়ে গেলে যে গোটা ছাদটাই রোখসানার ওপর ভেঙে নেমে এলো। এত বড় সংসার, ছেলে মেয়েগুলোকে মানুষ কেমন করে করবেন ভেবে পেলেন না। সাহস অনেক বড় শব্দের নাম। বাবুই পাখির খড়ে বোনা ঘর আছে বলে ঝড় বাদলের দিনেও নিশ্চিন্তে খাবার আনতে বের হতে পারে, কারণে সে জানে বৃষ্টি শুরু হলেই এক দৌড়ে গিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারবে। রোখসানা খানমের খড়ের ঘর তিন হাত মাটির নিচে চলে গেছে মোশতাক আহাম্মেদের সাথে সাথে। ওপরের তাসের ঘরে দাঁড়িয়ে তিনি সন্তান মানুষ করার চিন্তায় বিপর্যস্ত। দমকা বাতাসেও এখন তাঁর ভীষণ ভয়। মেয়েগুলো বড় হচ্ছে। মৃত্তিকাও বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেছে। ডাক্তারি পড়ছে এটা বড় কথা না, কথা হচ্ছে মেয়েটার একটা মাথার ছাদ থাকা খুব জরুরি। মায়েরা মেয়েদের মাথার ছাদ হতে পারে না। বড় জোর বান্ধবি হতে পারে। বড় বোনের মত অভিভাবক হতে পারে। অধিকাংশ সময়েই একজন শক্ত সামর্থ পুরুষ মানুষের প্রয়োজন পড়ে অবলম্বন হিসেবে। হোক সে পিতা, স্বামী কি সন্তান। কথাটা নির্মম, কঠোর নারীবাদী নারীদের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানলেও উপেক্ষা করার উপায় নেই। প্রতিটা সৈন্য পিঁপড়ের পথ না হারানোর পেছনে একটা গন্ধ দায়ি থাকে, সামনের সিপাহীর ফেলে যাওয়া একটা গন্ধ, যেটা থাকে বলেই পথ চিনে ফিরতে অসুবিধা হয় না সৈন্য পিঁপড়ের। রোখসানা খানমের সেই পথ চেনা গন্ধ হারিয়ে গেছে। পেছনের বাহিনীকে টেনে নেয়ার সামর্থ্য তাঁর থাকলেও বহুকালের মজ্জাগত শিক্ষাই হয়তো দমিয়ে দিয়েছিল সেবার। অনাহূত বিপদের শঙ্কায় মৃত্তিকার বিয়ে দিলেন হঠাৎ করেই। ঝিনুকের অনুমতিতে মুক্তার জন্ম হয় না। মোশতাক আহাম্মেদের বড় মেয়ে ঝিনুকের জীবন নিয়ে জন্মেছিল। বাস্তব আয়ুটুকুই শুধু পায়নি। শত বৎসর বেঁচে থাকা ঝিনুকের ইতিহাস আছে। তেমনি ক্ষণজন্মা ঝিনুকের গল্পও দূর্লোভ নয়।
মোশতাক আহাম্মেদের মৃত্যুর মাত্র দু মাসের মাথায় রোখসানা খানম মৃত্তিকার বিয়ে দিয়ে দিলেন। ছেলে বেশ শিক্ষিত। সরকারী একটা অফিসের অনেক বড় কর্তাব্যাক্তি। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। দেখতে শুনতেও খুব ভাল। ভদ্র, বিনয়ী। পড়াশোনার মাঝে থাকা অবস্থায় বিয়ে দেয়াতে মৃত্তিকার আপত্তির অংশটুকু এতটাই ম্লান আর ক্ষীণ ছিল যে রোখসানা খানম মেয়ের কথায় কর্নপাত করলেন না। বা করতে চাননি। তাঁর একটাই চিন্তা ছিল কেবল। বাকি দুই মেয়ের জন্য তিনি কিংবা তাঁর অবর্তমানে মিশুক থাকবে বড় ভাই হিসেবে। কিন্তু বড়টার জন্য কেবল তিনিই রয়েছেন। তাঁর কিছু হয়ে গেলে পারত পক্ষে পুরো পরিবারটার দ্বায় এসে পড়বে মৃত্তিকার ওপরেই। পরিবারের অভিভাবক হয়ে যাওয়া মেয়েদের সংসার জীবন অনেক ক্ষেত্রেই আর হয়ে ওঠে না। এক সংসারের ঘানি টানতেই এক জীবন চলে যায়। ধাতস্ত আর হওয়া হয় না।
খুব অনাড়ম্বরে বিয়েটা হয়েছিল মৃত্তিকার। হৈ হুল্লোড় বলতে কিছুই হয়নি। হৃত্বিকা আর বিস্তৃকা যাও গায়ে হলুদ নিয়ে কিছু একটা যা করেছিল, মৃত্তিকার বিষণ্ণ মুখ আর অব্যক্ত “না”র তোড়ে ভেসে গিয়েছিল হলুদের রঙ। রোখসানা খানম অবশ্য ভেবে পাননি বিয়ে নিয়ে মৃত্তিকার এতো আপত্তির কি এমন থাকতে পারে? নতুন কলেজে গিয়ে কোনো ছেলে টেলেকে পছন্দ করে বসেছে? নাকি অন্য কিছু? যার সাথে বিয়ে হচ্ছে, শওকত ছেলেটা তো খারাপ না। মৃত্তিকার বিয়ের পরেও নিশ্চিন্তে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। অপরিচিত মানুষের জীবনে হঠাৎ করেই প্রবেশ করা, কিংবা নিজের জীবনে অপরিচিত কোনো মানুষের আচমকা আবির্ভাব তো নতুন কিছু নয় এদেশে। প্রথমে কিছুটা ধাক্কা সয়ে নিলেই সবটা খুব স্বাভাবিক হয়ে যায়।
রোখসানা খানমের সমীকরণে বড় ধরণের ভুল ছিল। মৃত্তিকা ঝিনুকের জীবন নিয়ে এসেছিল। এদেশের অভিভাবকদের অনেক ভাবে খুশি করা লাগে। শওকত নামের নতুন মানুষটা মৃত্তিকার জীবনে হয়তো সত্যিই একটা শক্ত ছাদ হয়ে দাঁড়াতে পারতো। অন্তত মৃত্তিকার সেটা মনে হয়েছিল কয়েক মাসের জন্য হলেও। নিজে গিয়ে মেডিক্যাল কলেজের হলে দিয়ে আসতো। কি লাগবে না লাগবে সারাক্ষণ চিঠি লিখে জিজ্ঞেস করতো। ছুটিতে এলে মৃত্তিকাকে নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবে- হাজারটা পরিকল্পনা করতো ছেলেটা। মৃত্তিকার খুব অবাক লাগতো, বিস্মিত হত, লজ্জাও পেত। সে কোথায় ছিল! আর এই শওকত কোথায় ছিল এতদিন। আচমকাই ঢেউ ঢেউসের গায়ে উড়তে উড়তে এসে শুকনো একটা পাতা মিশে গেল।
সবটা হয়তো স্বপ্নের মতই হতে পারতো মৃত্তিকার জীবনে। কিন্তু সে সব গল্প উপন্যাসের নায়িকাদের জীবনে রয়েছে। বাস্তবে মৃত্তিকাদের জীবন অন্যরকম। বিয়ের মাস ছয়েকের মধ্যে মৃত্তিকা টের পেল শওকতের মাঝে কিছু একটা পরিবর্তন এসেছে। খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন। সেটা কি তা হাজার জিজ্ঞেস করেও জানতে পারলো না সেবার বাসায় আসার পর। কিন্তু বুঝতে পারলো কিছু একটা হয়েছে। এমনকি শাশুড়ি ফিরোজা বেগমও মুখ খুললেন না। নতুন বৌ, তার ওপর পড়াশোনা জানা মেয়ে, ডাক্তারি পড়ছে- কিছু বলা মুশকিল। শিক্ষিত বৌকে কিছু বলতে গেলেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেন।
বলার যে চেষ্টা করেননি তা না। দিনের বেলা রান্না ঘরে তরকারি কাটাকুটির সময় হাসিমুখে বলতে নিয়েছিলেন, “তা বউমা, তোমাদের কেলাসে ছাত্র ছাত্রী কয়জন?”
শাক বাছতে বাছতে উত্তর দিয়েছিল মৃত্তিকা, “ষাটের মত।”
“আর মেয়ে নাই?”
“থাকবে না কেন? মেয়েই তো বেশি। ছেলে ছাব্বিশজনের মত।” হেসে উত্তর দিল মৃত্তিকা।
“পোলাপান পড়াশুনা কম করে নাকি আজকাল! আগের জামানায় তো সব ছেলেই আছিল। শওকতরেই দেখো। সে পাশ করছে সাত বছর হয়। তার কেলাসে সব ছেলে আছিল। মেয়ের বংশও নাই!”
মৃত্তিকা বলল, “এখন তো দিন বদলেছে আম্মা। সবাই পড়াশোনা করছে।”
“অ! তা তোমার কেলাসের ছেলে পেলেগুলা কেমন?” হালকা গলায় জিজ্ঞেস করলেন ফিরোজা বেগম।
“কেমন আবার হবে?” অবাক হয়ে তাকালো। প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি।
“মানে, তোমারে কেউ চিঠি পত্তর দেয় না? দেখতে তো মাশাল্লাহ সুন্দর আছো। গোরা বর্ণ! তোমার বোনগুলা কিন্তু তোমার মত না। মাঝেরটা যাও শ্যামলা আছে, ছোটটা তো মিশ কালা।” আপন মনেই যেন বলে গেলেন ফিরোজা বেগম।
মৃত্তিকা খেই হারিয়ে ফেলল কথার। তার শাশুড়ি মানুষটা অশিক্ষিত হতে পারেন, তাই বলে এ ধরণের একটা কথা যে বলে বসবেন এটা আশা করেনি।
অস্ফুট গলায় বলল, “আমাকে চিঠি দিতে যাবে কেন?”
“আহ্হা! দিতে পারে না? পড়াশুনার সময়, উঠতি বয়স। এই সময়ে সব ছেলেই দুয়েকটা পেরেম পত্র লেখে টেখে থাকে। আমাদের শওকত অবশ্য এই ধরণের ছিল না। সে তোমার শ্বশুরের কথায় চলা মানুষ। সোজা ইস্কুলে যাইতো, ছুটি হইলে সোজা ফেরত আসতো। কোনো বন্ধু বান্ধবের আড্ডা হইত না বাসায়। দেখতেছো না, সময় হওয়া মাত্র বিয়েও দিয়ে দিছে? শুনো, পড়াশুনার সময়ে কেউ এই সব চিঠি পত্তর দিলে নিবা না। জানায় দিবা যে তুমি বিবাহিত। অনেক মেয়েছেলেই আছে, বিয়ে শাদী করে পড়াশুনা করতেছে, কিন্তু কাউরে বলে না যে বিয়া করছে। সমানে পেরেম করে যায়। পরে গিয়ে ধরা খায়।”
মৃত্তিকা টের পেল তীব্র একটা অপমানে মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে তার। কানগুলো ঝাঁ ঝাঁ করছে। মুখ ঝুঁকিয়ে ফেলল। চোখে পানি এসে গেছে হঠাৎ। রান্নাঘরের কথা আর এগোলো না বাকি কটা দিন। শওকতকেও এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করল না মৃত্তিকা। মায়ের ব্যাপারে ছেলের কাছে প্রশ্ন করাটা অনেকটা নালিশের মত শোনাবে। কি দরকার এসব ঝামেলাতে যাওয়ার? সংসারে এরকম দু চারটে কথা শুনতে হবেই।
মৃত্তিকার শ্বশুর হোসেন সাহেব গম্ভীর মানুষ। তিনিই শেষ মেষ মুখ খুললেন এক সন্ধ্যায়। পরেরদিন মৃত্তিকার চলে যাওয়ার কথা। কলেজে ক্লাস শুরু হবে। সামনেই পরীক্ষা। এবারে গেলে টানা চার মাস থাকতে হবে। এই ছুটিতে কেবল শ্বশুড় বাড়িতেই থাকা হল তার। বাসায় যাওয়া হয়নি। মাঝে একদিনের জন্য কেবল হৃত্বিকা আর বিস্তৃকা বেড়াতে এসেছিল স্কুলে না গিয়ে। সারাদিন থেকে চলে গেছে। মিশুক এসে নিয়ে গেছে। ঐ পর্যন্তই, মা আসেননি। অফিস নিয়ে ব্যস্ত। মেয়েকে বিদায় করে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
হোসেন সাহেব খুব কম কথা বলা মানুষ। আগে কাপড়ের ব্যবসা ছিল। ছেলের চাকরির পর ব্যবসা অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। লোক আছে। তারাই দেখে। কাপড়ের ব্যবসা করেও একটা মানুষ এত স্বল্পভাষী কেমন করে হয় মৃত্তিকা বুঝতে পারে না। যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যার সময় এক রকম হঠাৎ করেই ডেকে পাঠালেন বৌমাকে। শওকত তখন বাসায় ছিল না। মৃত্তিকার জন্য কিছু জিনিসপত্র আনতে হবে, সেগুলোই কিনতে গেছে। এখন না গেলে কাল আর দিতে পারবে না। বাসের টিকেটও করা হয়নি।
সন্ধ্যা নামতে না নামতেই প্রত্যেকদিনের মত কারেন্ট চলে গেল। কিছুদিন হল শওকত একটা বড় দামী চার্জার লাইট কিনেছে। চায়না থেকে আনানো। এখনো লোকজন চেনে না। সবাই হারিকেন দিয়েই কাজ চালায়। কারেন্ট যাওয়ার সাথে সাথে লাইটটা জ্বলে ওঠে আপনা আপনি। মৃত্তিকা ব্যাগ গোছাচ্ছিল। কিন্তু কারেন্ট যাওয়াতে অন্ধকারেই বিছানাতে বসে পড়লো। লাইটটা ড্রইং রুমে। এখান পর্যন্ত আলো আসছে না খুব একটা। আবছা আলোতে কাপড় গুছিয়ে লাভ নেই। কি না কি বাদ পড়ে যাবে শেষে।
ড্রইং রুম থেকে ঠিক তখনই ভরাট স্বরে ডাক এলো হোসেন সাহেবের, “বৌমা? ঘরে আছো?”
তাড়াতাড়ি মাথায় ওড়না দিয়ে দরজায় চলে এলো মৃত্তিকা, “জ্বি আব্বা, ডেকেছেন আমাকে?”
হোসেন সাহেব সোফায় বসে আছেন। মাগরীবের নামায পড়তে বাহিরে গিয়েছিলেন। গায়ে পাঞ্জাবী পায়জামা। মাথায় টুপি। বাহির থেকে এসেছেন বলে ঘামছেন। একটা হাত পাখা নিয়ে বাতাস করছেন নিজেকে। টুপিটা খুলে রাখতে রাখতে বললেন, “কিছু জরুরি কথা ছিল তোমার সাথে। ভাল হল শওকত নাই। ওর সামনে কথাগুলো বলা যেত না।”
দরজার পর্দা একপাশে সরিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্তিকা, শ্বশুরের কথাটা ঠিক বুঝতে পারলো না, “জ্বি বলেন?”
নড়ে চড়ে বসলেন হোসেন সাহেব। স্ত্রী ফিরোজা বেগমও চুপচাপ এসে স্বামীর পাশে বসেছেন। তাঁর হাত থেকে পাখাটা নিয়ে বাতাস করছেন স্বামীকে। গলা খাকারি দিলেন হোসেন সাহেব, “একটা কথা অনেকদিন থেকেই বলবো বলবো ভাবছিলাম। কিন্তু সময় আর সুযোগও হচ্ছিল না...”
মৃত্তিকা তাকিয়ে আছে।
“আমার ছেলেটা ডিগ্রী কলেজ থেকে পাশ দিয়ে ভাল সরকারী চাকরিতে ঢুকা মানুষ। সচরাচর এই চাকরি কেউ পায় না। ছেলের মেধা ভাল ছিল দেখে এই চাকরি পেয়েছে। সোজা বাংলাতেই বলি, সে পড়াশোনায় এই মুহূর্তে হয়তো তোমার থেকে আগায় আছে। কিন্তু চার পাঁচ বছর পর দৃশ্য বদলায় যাবে। তখন তুমি হবা শওকতের থেকেও অনেক শিক্ষিত। ডাক্তার।” থামলেন তিনি।
মৃত্তিকা বিভ্রান্তের মত চেয়ে আছে। বুঝতে পারছে না শ্বশুর আব্বার কথাগুলো।
“ঘরের বৌ ডাক্তার হবে, এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কি হতে পারে? কিন্তু সেই সাথে যখন আরো অনেক কিছু ব্যাপার জড়ায় যায়- তখন প্রশ্ন আসে, আসলেই কি একজন ডাক্তার, একজন উচ্চ শিক্ষিত বৌ সত্যিই দরকার?” পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন, “কথাটা বিয়ের আগে থেকেই লোকে বলা বলি শুরু করেছিল। মেয়ে তো ছেলের চেয়ে শিক্ষিত হয়ে যাবে ভাই, এই রকম বৌ সামলাবেন কেমন করে? আমি উত্তর দেই নাই। হাসতাম কেবল।”
মৃত্তিকা ধীরে ধীরে টের পাচ্ছে দুর্বোধ্য কথাগুলো ক্রমশ আলোর মত স্পষ্ট হতে শুরু করেছে তার কাছে। ঘরটা আচমকাই কেন যেন গরম লাগছে খুব। চারপাশটা আগুনের মত উত্তপ্ত লাগছে।
“শওকত বোধ হয় তোমাকে বলে নাই। হয়তো বলার মত কিছু না ভেবে বলে নাই। কিন্তু পিতা মাতা হিসেবে আমাদের একটা কর্তব্য আছে তোমাকে জানানোর। কারণ সংসারটা তোমাদেরকে করতে হবে। বহুদূরের পথ। শুরুতেই যদি এই পথে নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে যাও, আর আগাবে কীভাবে?” থামলেন একটু। ঢোক গিললেন। গরমে ঘামছেন খুব, “শুনেছি শওকত যেখানে চাকরি করে, সেই অফিসে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব পদের লোকজনের মাঝেই নাকি কানা ঘুষা চলছে মেয়ে নাকি ছেলের চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়ে গেছে। ছেলেকে বাকি জীবন বৌয়ের গোলামী করে কাটাতে হবে! তুমি নিজে বলোতো বৌমা? এরকম একটা কথা শোনার পরেও আমাদের ছেলেটা সবকিছু কত সহজ স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে। কিছুই বলেনি। তুমি পারতা তার জায়গায় হলে?”
মৃত্তিকা আবছা অন্ধকারে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালো।
“আমি মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে যাই। মসজিদ হল এবাদতের জায়গা। সেই জায়গাতেই গিয়ে যদি আমাকে শুনতে হয়- হোসেন সাহেব কেমন আছেন ভাই? নতুন বৌমার ডাক্তারি কদ্দুর আগাইলো? এখনো ছেলের সাথে থাকে তো? আমি হতভম্ব গলায় বলি, কি সব বলতেছেন ভাই? মেয়ে থাকবে না কেন? সে কি পর নাকি?” কেমন যেন রাগান্বীত স্বর ফুটলো হোসেন সাহেবের, “এমনকি আমার দোকানের কর্মচারীরাও অন্য দোকানের লোকজনকে বলে বেড়াচ্ছে যে তুমি নাকি শওকতেও ঘরে বছর খানেকও টিকবে না। বাহিরে পড়াশোনা করছো, ক্লাসে বড়ঘরের ছেলে পেলে আছে। দেখা যাবে কোনদিন একটার হাত ধরে চলে গেছো শওকতের সংসারের মুখে লাথি মেরে। এই ধরণের কথা শোনার পর আর কি করার থাকতে পারে বলতে পারো বৌমা? আমরাও তো মানুষ। সমাজ নিয়ে থাকতে হয়। ছেলেটা বেশি সহজ সরল আর বোকা দেখে কিছু বলতে পারে না। তুমি একটা কঠিন সময় পার করে আসছো সংসারের। শক্ত মেয়ে। তাই বললাম কথাগুলা। আর বাচ্চা কাচ্চার ব্যাপারে তোমরা কি ভাবছো সেইটা তোমরাই জানো। লোকজনের মুখে তো আর তালা দিতে পারব না। তবে ভেবে দেখেছি একটা বাচ্চা যদি নিয়ে নেও, আপাতত মানুষ একটু থামবে। অন্তত বুঝবে যে বাচ্চার টানে হলেও তুমি শওকতের ঘর ছাড়বে না।”
মৃত্তিকার দাঁড়িয়ে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তখন। আবছা অন্ধকারে ওর মুখট দেখতে পায়নি কেউ। খুব সাবধানে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে নিয়েছিল।
“কিছু বলবা না বৌমা? একটানা তো আমিই কথা বলে গেলাম। পরের ঘর থেকে তোমাকে এনেছি। বাপ নাই তোমার। আমি হয়তো তোমার বাপ হতে পারবো না। কিন্তু আমার মেয়ে থাকলে আমিও বুঝতাম পুরো ব্যাপারটা। জিনিসটা তোমার জন্য অনেক বড় বোঝা চাপায় দেয়ার মত আমি জানি। কিন্তু সংসারটা তোমাদের। আমরা চিরদিন থাকব না। শওকতকে তুমি দেখবা, শওকত তোমাকে দেখে রাখবে। এটাই নিয়ম। একে অন্যের জন্য কত ত্যাগই তো মানুষ করে, করে না?” সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্তিকার দিকে।
মৃত্তিকার গলা পর্যন্ত কান্না উঠে এসেছিল, ঢোক গিলে ঠেকালো, “আ-আমি বুঝতে পেরেছি আব্বা। আপনি এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি শওকতের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবো।”
“তুমি ওকে বলিও না যে আমরা এইভাবে বলেছি তোমাকে। ছেলেটা কষ্ট পাবে তাইলে। সে নিজেই জানতে দিতে চায় নাই তোমাকে।” অপরাধী গলায় বললেন হোসেন সাহেব।
মৃত্তিকা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। ড্রইং রুমের দরজা চাপানোই ছিল, ওটা ঠেলে শওকতকে ঢুকতে দেখা গেল। দুই হাতেই বড় বড় দুটো বাজারের ব্যাগ। সবাইকে বসে থাকতে দেখে কৌতূহলী স্বরে মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বলল, “কি ব্যাপার? কারেন্ট নেই, সবাই দেখি গল্প করতে বসে গেছো!” ভেতরের ঘরের দরজায় দাঁড়ানো মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের গলায় বলে উঠলো, “তোমার হেন তেন জিনিসের লিস্ট কি আরো আগে ভাগে দিতে পারো না? একেবারে যাওয়ার আগের দিনেই দিতে হয়? সবগুলো জোগার করতে করতে খবর হয়ে গেছে আমার!”
মৃত্তিকা তাকিয়ে আছে শওকতের দিকে। ঘামে চক চক করছে মুখটা ওর। মুখ ভরা হাসি। কি সুন্দর লাগছে তাকে। ঠিক যেন একটা সুখী মানুষের মত!
মৃত্তিকার সে রাত অনেক দীর্ঘ কেটেছিল। পাশেই শওকত ঘুমাচ্ছে। খুব নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছে। কান পাতলে ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। ঘন ঘন তৃষ্ণা পাচ্ছিল পানির। কারেন্ট প্রায় থাকেই না। আধা ঘণ্টার জন্য এসে আবার চলে যায়। মশারীর ভেতর গরমে ঘামতে থাকে। শওকত গরমে ঘুমের মাঝেই এপাশ ওপাশ করছে। মৃত্তিকা উঠে বসে হাত পাখা নিয়ে বাতাস করার চেষ্টা করছে ওকে। একটু বাতাস পেলেই আবার ঘুমিয়ে যায় পরম শান্তিতে। মৃত্তিকার মায়া লাগে শওকতের জন্য। অদ্ভুত একটা মমতা জাগতে থাকে অল্পদিনের অচেনা মানুষটার ওপর। ঘেমে যাওয়া শওকতের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ে মৃত্তিকা। টের পায় ঘুমের মাঝেও শওকত একটা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। ভিজে উঠল মৃত্তিকার চোখের পাপড়ি। অনেক কথাই ভেতরে জমে গিয়েছিল মৃত্তিকার। কিন্তু গলার কাছটায় এসে যেন সবকিছু দলা পাকিয়ে গেছে। শওকতকে আর বলা হয়নি।
অনেক কিছুই সামলে নেয়ার থাকে, কিন্তু পৃথিবী স্থির চিত্র পছন্দ করে না। বৈচিত্র্যের অপেক্ষায় থাকে। পরদিন বাসে উঠে চলে আসার সময় শওকতকে জানালা দিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে চোখে পানি চলে এসেছিল মৃত্তিকার। মানুষটা ভিড়ের মাঝে একা একা দাঁড়িয়ে আছে মলিন মুখে। আবার না জানি কবে দেখা হয় তাদের। পাশ থেকে যাওয়া মানুষের ধাক্কা খেয়ে বারবার সরে যাচ্ছিল সামনে পেছনে। তার মাঝ দিয়েও মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে হাত নাড়তে ভোলেনি। বাস অনেকখানি চলে আসার পর শওকত চোখের আড়াল হয়েছিল। জানালা থেকে মুখ সরিয়ে ক্লান্তিভরে সিটে হেলান দিয়েছিল মৃত্তিকা। সেবার মনে মনে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সামনের পরীক্ষার পরেই সে বাচ্চা নেবে। প্রয়োজনে এক বছর গ্যাপ যাক ডাক্তারি পড়ায়, কিচ্ছু যায় আসে না। শওকতের জন্য অন্তত এটুকু সে করতেই পারে। থেকে থেকে তার ভেতরেও তো সাদা সিধে মানুষটা শেকড় গাড়তে শুরু করেছে। নাহলে চোখে পানি আসে কেন?
শওকত-মৃত্তিকার সংসারের দেড় বছরের মাথায় ফুটফুটে একটা মেয়ে হল। রোখসানাদের বাসাতেই হল মেয়েটা। দেখতে যেন ঠিক সূর্যমুখী ফুলের মত কেউ। কোলে নিলেই মনে একটুকরো আলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃত্তিকা মেয়ের নাম দিতে চেয়েছিল অথৈ। নামটা রোখসানারও পছন্দের ছিল, কিন্তু হোসেন সাহেবের নামটা মনে ধরেনি। তিনি নাতনি হওয়াতে সামান্য অসন্তুষ্ট হলেও নাম রাখার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়েছিলেন। তাঁর দেয়া নামটাই শেষ মেষ রাখা হল। শওকতের নামের সাথে মিলিয়ে শারমিন আখতার সুমি।
প্রথম সন্তান হবার পর সবকিছু বদলে যাবে বলে ধারণা ছিল মৃত্তিকার। এদেশে সন্তানের মত নিরাপদ আড়াল কিংবা অবলম্বন একটা নারীর জন্য আর নেই। শওকতের সাথে তার সংসার করা নিয়ে চারপাশে উড়তে থাকা কথার ঝড় বুঝি স্তিমিত হয়ে আসবে ভেবেছিল। কিন্তু ঝিনুকের জীবনের অনেক টুকুই বাকি থেকে গিয়েছিল তখনো। সন্তান হবার পর মৃত্তিকার জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ালো। মেয়েকে কোথায় রেখে পড়তে যাবে? কার কাছে? মেয়ে তো অনেক ছোট। সবে জন্মেছে মাস খানেক হচ্ছে। কে দেখবে? আর ময়মনসিংহও তো ধারে কাছে না। বাসে আট ঘণ্টার পথ। এত দূর চলে যাওয়া সম্ভব না মেয়েকে ফেলে। ওদিকে এক বছর এর মাঝেই পিছিয়ে পড়েছে মৃত্তিকা। এখনই যদি হাল না ধরে ডাক্তারি পড়া সামলে উঠতে পারবে না। পুরো ব্যাপারটা ঠিক কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। মৃত্তিকা বুঝে উঠতে পারে না সন্তান এখনই নেয়ার সিদ্ধান্তটা কি আদৌ ঠিক ছিল কিনা? সংসার যে দুজন করছে পুরো ব্যাপারটা তো শুধু তাদের ওপরেই সীমাবদ্ধ। বাহিরের লোকের কথায় কান দেয়ার তো কিছু নেই। শওকতকে সে ভালবাসে। সেটা তো মিথ্যে না। তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ মানুষ যতই টেনে আনুক, মৃত্তিকা তো মোটেও সেই দৃষ্টিতে দেখছে না শওকতকে। ঝোঁকের মাথায় সন্তান নিয়ে বসাটা নিয়ে ভেতরে সামান্য খুঁত খুঁত থাকলেও যখনই মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে মৃত্তিকা, তখনই কেন যেন মনে হয় এই ডাগর ডাগর চোখের সূর্যমুখীটার জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারবে সে।
মৃত্তিকা হয়তো মাটির মতই সব সয়ে নিতে পারতো একে একে। কিন্তু সে সময়টুকু বড় সংক্ষিপ্ত ছিল তার জন্য। শারমিনের বয়স ছয় মাস হতে না হতেই হোসেন সাহেব নাতনিকে দাদার বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য তোর জোর শুরু করে দিলেন। অথচ দীর্ঘ এই সময়ে কেবল নাতনির নাম রাখার জন্য বার দুয়েক এসেছিলেন তিনি। এছাড়া না ফিরোজা বেগম এসেছে, না অন্য কাউকে পাঠিয়েছে। পুরো সময়টা রোখসানা, হৃত্বিকা আর বিস্তৃকাই দেখে রেখেছিল মৃত্তিকা আর শারমিনকে। রীতিমত স্কুল, কলেজ বাদ দিয়ে। হোসেন সাহেব শুধু যে মৃত্তিকা বা শারমিনকে ফেরত নিয়ে আসলেন তাই নয়, কোনো রকম প্রসঙ্গের অবতারণা ছাড়াই প্রথমদিনই খাওয়ার টেবিলে বসে ঘোষণা দিলেন, “আমি ভাবছি বৌমাকে এই বছরটা রাখে দিবো। মেয়ে আরেকটু বড় হোক। এমনিতেই তো এক বছর লস গেছে। সন্তানের জন্য আরেক বছর গেলে কিছু হবে না।”
ভাত খেতে থাকা অবস্থায় হাত থেমে গেল মৃত্তিকার, রক্তশূন্য মুখে তাকালো শ্বশুরের দিকে, “আব্বা অনেকগুলো পরীক্ষা জমে গেছে, পড়াও। আগামী মাস থেকে গিয়ে ধরতে না পারলে সমস্যা হয়ে যাবে.....”
“সমস্যা তো সব জায়গাতেই আছে। সেটার সমাধাণও থাকে। দুনিয়া সমস্যার জায়গা। কিন্তু মা হয়ে সন্তানের চেয়ে যদি পড়াশোনাটাই বেশি কাছের মনে হয় তোমার কাছে, সেই ক্ষেত্রে আমি বলবো এই ধরণের পড়াশোনার কোনো প্রয়োজনই নাই!” তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে পুত্রবধুর দিকে তাকালেন হোসেন সাহেব।
মৃত্তিকা কিছু একটা বলতে গিয়েও চোখ নামিয়ে ফেলল। পাশেই শওকত বসে খাচ্ছে। হাত দিয়ে ভাত নাড়াচাড়া করছে কেবল। কিন্তু উত্তর দিলো না হোসেন সাহেবের কথার।
ফিরোজা বেগম টের পেলেন খাবার টেবিলের পরিবেশটা কেমন যেন থম থমে হয়ে গেছে। তাই সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেন, “বৌমা তো অনেক ভাল ছাত্রী। অসুবিধা নাই মা, তুমি একটু রয়ে সয়ে পড়া ধরলেও শেষ করতে পারবা। মেট্টিকে স্টার, ইন্টারে বোর্ড ইস্ট্যাণ্ড কি যেন তেন মানুষ করে নাকি?” হাসার মত করলেন মুখটা।
কিন্তু থমথমে ভাবটা কমার বদলে আরো ভারি হয়ে গেল কেন জানি। কেউ কোনো কথা বলছে না। হোসেন সাহেব ভাত খেয়ে উঠে গেলেন হাত ধোয়ার জন্য। ফিরোজা বেগমও চলে গেলেন রান্না ঘরে। নতুন কাজের মেয়েটা এসে এঁটো প্লেট নিতে লাগলো। শওকত-মৃত্তিকা তখনো বসে আছে খাবার টেবিলে। পাশের ঘর থেকে শারমিনের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।
“মৃত্তিকা?” শওকত নিচু স্বরে ডাকলো।
“হু?”
“শারমিন কাঁদছে। দুধ খায়নি?”
“খাইয়েছি খেতে বসার আগেই।” আনমনে জবাব দিল। খাচ্ছে না সে। হাত দিয়ে ভাত নাড়া চাড়া করছে।
শওকত আর কিছু বলল না। প্লেটেই হাত ধুয়ে উঠে গেল।
মৃত্তিকা শুনতে পাচ্ছে পাশের ঘর থেকে হোসেন সাহেব গজ গজ করছেন, “এতটুকুন বাচ্চা কীভাবে কাঁদছে! বাসায় মানুষ নাই নাকি?”
স্বামীর কথা শুনে ফিরোজা বেগম হন্ত দন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে আসতে নিলো শারমিনকে নেয়ার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে শওকত গিয়ে মেয়েকে দোলনা থেকে কোলে তুলে নিয়েছে। আদর করে মেয়েকে ছড়া কাটছে,
“টুন্নি সোনা চাঁদের কণা,
হাপুস গুপুস কাঁদে,
তাকায় দেখো কত্ত বড়
চাঁদ উঠেছে ছাদে!
ফোকলা হাসে চাঁদ মামাটাও
নাচ জুড়েছে ঐ,
টুন্নি সোনাও চাঁদে যাবে
কোথায় যে পাই মই?”
কান্না থামিয়ে বড় বড় চোখ করে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। শওকত হাসতে হাসতে মৃত্তিকার পাশে এসে আবার বসলো মেয়েকে কোলে নিয়ে, “দেখেছো দেখেছো? কেমন বাপ চিনে মেয়েটা!”
মৃত্তিকা মুখ তুলে তাকালো বাপ মেয়ের দিকে। মাড়ি বের করে হাসছে শারমিন। কি সুন্দর লাগছে সেই হাসিটা! মৃত্তিকার বুকের ভেতর বড় কিছু একটা নড়ে চড়ে গেল। হাসিটার সাথে কোথায় যেন মোশতাক আহাম্মেদের হাসির খুব মিল রয়েছে।
মৃত্তিকা গভীর রাতে শওকতকে ডেকে তোলে ঘুম থেকে, “এই শুনছো?”
“উঁ?” জড়ানো কণ্ঠ শওকতের, “কি? সকাল হয়ে গেছে নাকি?”
“না। একটা কথা ছিল তোমার সাথে।”
“এত রাতে? আগে বা পরে বললে হতো না?” চোখ কচলে তাকালো শওকত, “কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ।”
“কি?”
“আচ্ছা এক কাজ করলে কেমন হয়? আমাদের মেডিক্যাল কলেজের কাছেই একটা ছোট্ট দেখে বাসা ভাড়া করে তুমি আর আমি থাকলাম? শারমিন তখন আমাকেও পেলো, তোমাকেও।”
“কীভাবে সম্ভব? আমার চাকরি বাকরি সব তো এখানে! ময়মনসিংহ কি ধারে কাছে নাকি যে আমি যেয়ে এসে অফিস করবো সকাল সন্ধ্যা? কিসব যে বলো না তুমি!” বিরক্ত গলায় বলল শওকত।
মৃত্তিকা বোঝানোর চেষ্টা করল, “ধরো বাসা নিলাম। সেখানে হৃত্বিকা বা বিস্তৃকাকেও এনে রাখলাম। এক মাস বা দু মাস করে থাকলো আমার সাথে। এখনো তো একজন স্কুলেই আছে। তেমন সমস্যা হবে না। ওদের পড়া দেখিয়ে দিতে পারবো। তুমিও ধরো প্রতি সপ্তাহে না হোক, দশ পনেরো দিনে একবার করে গিয়ে দেখে আসলে আমাদের? আম্মাও গিয়ে থাকলো মাঝে মাঝে?”
“কীভাবে সম্ভব? বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ থাকবে না, অথচ তোমরা সব মেয়েমানুষ কিনা বাসা ভাড়া করে থাকবে? কত রকম বিপদ আপন আছে! অপরিচিত জায়গা। চেনা শোনা কেউ নেই।” শওকত খানিকটা উষ্ণ কণ্ঠে বলল, “এসব বাচ্চাদের মত কথা বন্ধ করে ঘুমাও তো! সকালে উঠে আলাপ করা যাবে।”
মৃত্তিকা দমলো না, “ঠিক আছে। মিশুক গিয়ে থাকবে মাঝে মাঝে। ভার্সিটি তো এমনিতেই যায় না ঠিক মত। এসে না হয় কদিন আমার সাথে থাকলো?”
“নিজের পড়াশোনাটা ঠিক রাখার জন্য বাকি ভাইবোনগুলোর পড়াশোনা বিগড়াবার কোনো মানে হয় না মৃত্তিকা। তুমি ঘুমাও তো প্লিজ!” পাশ ফিরে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল শওকত।
মৃত্তিকা আবছা অন্ধকারের মাঝে মশারীর ভেতর বসে থাকে মূর্তির মত। ঘরের ভেতর ফ্যানটা ফুল স্পিডে ঘুরছে। কিন্তু গরম বাতাস। মশারী দুলছে, ঢেউ খেলছে মশারীর গায়ে। দোলনাতে ছোট মশারী টানিয়ে শারমিনকে ঘুম পারিয়ে রাখা হয়েছে। একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থাকে মৃত্তিকা।
হোসেন সাহেবের সেদিনের ঘোষণা যে সত্যি সত্যি মাথার ওপর রাষ্ট্রনীতি হিসেবে নেমে আসবে মৃত্তিকা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। সন্তানের কাছেই বন্দী করে দেয়ার ব্যাপারটা আদৌ আছে কিনা জানা নেই তার, কিন্তু সন্তানের অযুহাতে যে তার পরিধির ব্যাপ্তি খুব সংক্ষিপ্ত করে দেয়া হয়েছে জেনে গিয়েছিল অল্প সময়েই। যে শওকতের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে শারমিনের জন্ম দিয়েছিল মৃত্তিকা, তাকেই হঠাৎ খুব অপরিচিত লাগতে শুরু করে।
মাঝে একবার বিস্তৃকা বেড়াতে এসেছিল হৃত্বিকা আপার সাথে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে। সেবারেই কেন যেন মনে হয়েছে পুতুলের সংসারে আছে আপা। চোখ ঢুকে গেছে, চোখের নিচে কালসিটে। শুকিয়ে গেছে অনেকখানি। কেমন যেন রোগা রোগা হয়ে গেছে মৃত্তিকা আপা।
হৃত্বিকা বড় আপাকে দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিল সেদিন, “আপা! তোর এই অবস্থা হয়েছে কেন? অসুখ করেছে নাকি? এত শুকিয়ে গেছিস কেন!”
ম্লান হাসি হেসেছিল মৃত্তিকা, “এমনি। শারমিনটা খুব জ্বালাচ্ছে তো। ঘুমাতেই পারি না ওর জন্য। সারাদিন ঘুমিয়ে কাঁদা মেরে থাকে। রাতে যখন সবাই ঘুমাতে যাব, ঠিক তখনই তার গুড মর্নিং দেয়ার সময় হয়। চিল্লা পাল্লা করে কান ঝালাপালা! আর একটু কিছু হলেই সে মাড়ি দিয়ে তোর কান কামড়ে দেবে। দাঁত গজানোর পর যে কি করে আল্লাই জানে! বই খাতা সব কেটে কুটি কুটি করবে দেখিস!”
বিস্তৃকার কোলেই ছিল শারমিন। ঘুম ভেঙে গেছে। পিট পিট করে তাকাচ্ছে। বিস্তৃকা অবাক গলায় বলল, “এই অথৈ? আপাকে বুঝি খুব জ্বালাস?”
গলা খাকারি দিতে দিতে ঘরে ঢুকলেন সেই সময় হোসেন সাহেব, “অথৈটা আবার কে?” বাজারের ব্যাগটা একপাশে রাখতে রাখতে বলে উঠলেন। ড্রইং রুমে বসেছিল ওর। তিনি আসাতে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল, “আসসালামুয়ালাইকুম চাচা....” ইতস্তত গলায় বলল বিস্তৃকা, “শারমিনের কথা বলছিলাম।”
“তার যেই নাম, সেই নামেই না ডাকবা। সে এখনো ছোট, চৌদ্দ রকম নামে ডাকলে নিজের নাম আর চিনবে না।” গম্ভীর মুখে বললেন, “তা কখন আসছো? বৌমা? খেতে টেতে দেও এদের। দূর থেকে আসছে... শওকত দুপুরের খেতে এসেছিল?”
“না আব্বা। আসেনি।” মৃত্তিকা তাড়াতাড়ি জবাব দিল।
“ছেলেটাও দিন দিন ব্যাস্ত হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন খাটুনি আর খাটুনি। ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো বৌমা। জণ্ডিস আছে ছেলেটার। কি খায় না খায়। স্কুলে আর কলেজে থাকতে দুইবার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। স্যালাইন দিয়ে রাখতে হয়েছিল অনেকদিন। বিছানার সাথেই মিশে গিয়েছিল শওকত।” মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে গেলেন হোসেন সাহেব।
হৃত্বিকা কৌতূহলী মুখে তাকালো বড় আপার দিকে, “তোর মেয়েকে অথৈ নামেও ডাকতে দেয় না নাকি?”
একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো মৃত্তিকা, “বাদ দে। হাতমুখ ধুয়ে নে, আমি খেতে দিচ্ছি...”
“আপা, আমরা কিন্তু বিকেলেই চলে যাব। স্কুল আজকে আগে ছুটি দিয়ে দিয়েছে দেখে ভাবলাম বাসে উঠে পড়ি। কতক্ষণই বা লাগবে। দুই ঘণ্টা জার্নিতে সমস্যা নেই। বিকেলে বের না হলে রাতের আগে বাসায় পৌছাতে পারবো না। বাসায় ভাইয়া নেই। ও হলে গেছে। সেমিস্টার চলছে। বাসায় আম্মা একা।”
ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ালো মৃত্তিকা, তারপর একটু থেমে উত্তর দিল, “ঠিক আছে। খেয়ে রেস্ট করে তারপর যাবি। আটকাচ্ছি না।”
আপার গলায় কিছু একটা ছিল যেটা হৃত্বিকা, বিস্তৃকা দুজনেই ধরতে পরেছিল। কিন্তু কি সেটা বুঝতে পারেনি সেদিন।
বিস্তৃকারা চলে যাওয়ার খানিক আগে বাসায় ফিরেছিল শওকত। গম্ভীর হয়ে আছে মুখ। শ্যালিকাদের দেখে মুখের ভাবটা সামান্য তম পরিবর্তন হল না। ভাবলেশহীন গলায় জিজ্ঞেস করল কেবল, “কি খবর তোমাদের? কেমন আছো?”
হৃত্বিকা জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল, “ভাল, আপনি কেমন আছেন দুলাভাই?”
“এই আর থাকা! যেমন থাকি সব সময়। ঘরে বাহিরের সব দিকেই হাজারটা ঝামেলার উপরে আছি।”
হৃত্বিকা উত্তরটা ঠিক বুঝতে পারলো না। বিভ্রান্তের মত তাকিয়ে রইল। বিস্তৃকা শুধু বলল, “দুলাভাইয়ের মাথার চুল তো সব পড়ে যাচ্ছে। সামনের দিকের অবস্থা তো খারাপ!”
আগের মত বিস্তৃকার এই কথাতে হাসলো না শওকত, রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, “বয়স হচ্ছে। আগের মত থাকা সম্ভব নাকি? তোমরা কি বের হচ্ছিলে নাকি? আসো, আমি বাসে তুলে দিয়ে আসি।” যদিও গলার স্বরে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আছে বলে মনে হল না। ভদ্রতা করে বলল কথাটা।
পাশেই মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে ছিল শারমিনকে কোলে নিয়ে। অন্যরা কিছু বলে বসার আগেই সে বলে উঠল, “কিসের আবার এগিয়ে দেয়া! তুমি সারাদিনে এতক্ষণে বাহির থেকে এলে, লাঞ্চেও আসোনি। যাও, গিয়ে গোসল সেরে একটু ধাতস্ত হও। এরা বাচ্চা মেয়ে নাকি? বাসায় কি এই প্রথম যাচ্ছে এখানে থেকে? বাস ঠিকই ধরে নেবে।”
শওকত দ্বিরুক্তি করল না। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল। হৃত্বিকা আর বিস্তৃকা হতচকিত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। “আপা....” হৃত্বিকা কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেল।
“দেরি করার দরকার নেই। এখনই রওনা দে। আলো থাকতে থাকতে।” এগিয়ে এসে কয়েকটা একশো টাকার নোট গুজে দিলো হৃত্বিকা আর বিস্তৃকার হাতে। সাথে একটা রুলটানা ভাঁজ করা কাগজ ধরিয়ে দিল বিস্তৃকাকে, “এটা আম্মাকে দিস। কেমন?” ওর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে হাসল মৃত্তিকা, “আমাদের বিস্তৃকা অনেক সুন্দর হয়ে যাচ্ছে, তাই নারে হৃত্বিকা?”
হৃত্বিকা সরু চোখে তাকিয়ে ষড়যন্ত্রের গলায় বলল, “জানিস না তো আপা, পাশের বাসার দীপ্ত বিস্তৃকাকে প্রপোজ করেছে!”
চোখ বড় বড় করে তাকালো মৃত্তিকা, অবিশ্বাসীর সুরে বলল, “কি বলিস! সত্যি নাকি?” বিস্তৃকার দিকে তাকালো।
বিস্তৃকা মুখ কালো করে ফেলল, “আমার দোষ নাই আপা। ঐ ছেলের মাথায় সমস্যা আছে!”
হৃত্বিকা হাসি চেপে বলল, “ক্লাস এইটে টেলেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছিল। ওটার টাকা এসেছে গত মাসে। দীপ্ত কি করেছে জানিস? পুরো এক হাড়ি মিষ্টি আর সন্দেশ কিনে এনে বিকেলে বেলা ছাদে হাজির। আমি আর বিস্তৃকা কবুতরের ঘর ঠিক করছিলাম। কাঠ ভেঙে গেছে দেখে। আমি নিচে আর মৃত্তিকা একটা মই নিয়ে উঠে গেছে ওপর। দীপ্ত এসে বলা নেই কওয়া নেই, ক্রাচ দুটো আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে মইয়ের অর্ধেক উঠে গেল। হাতের হাড়িটা বাড়িয়ে দিয়ে ওপর দিকে ডাক দিল, বিষ্ঠা আপা? ইয়ে, বিস্তৃকা? আছো?”
মৃত্তিকা মিটিমিটি হাসছে, “তারপর?” আড়চোখে বিস্তৃকার দিকে তাকালো। মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে ওর।
“বিস্তৃকা তো হকচকিয়ে গেছে, ছেলে পাঞ্জাবী পাজামা পরে হাড়ি হাতে মইয়ের অর্ধেকে উঠে দাঁড়িয়ে আছে। জামাই জামাই ভাব। সে বলল, কি হয়েছে? অর্ধেকে উঠে বাঁদরের মত ঝুলছিস কেন? দীপ্ত দাঁত বের করে হেসে উত্তর দিল, বৃত্তির টাকা হাতে পাইছি। চিন্তা করলাম শুভ কাজে দেরি করতে নাই। চল বিয়ে করে ফেলি? খালাম্মাকে ম্যানেজ করে নিতে পারবো আমি। শাড়ি আছে না? ফটাফট শাড়ি পরে রেডি হয়ে যাও। চিন্তার কিছু নাই, এক ক্লাস ছোট হতে পারি, কিন্তু বয়সে আমি তোমার বড়ই হবো। কেজিতে দেরিতে ভর্তি হয়েছিলাম।”
“এরপর? বিস্তৃকা কি করলো?”
“মিষ্টির হাঁড়ি জামাইয়ের মাথাতেই ভেঙেছে সে। লাঠি নিয়ে দৌড়ানি দিয়েছিল বেচারাকে। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে দীপ্ত বাবাজীর নাকাল অবস্থা!” হৃত্বিকা দৃশ্যটা মনে করে হাসতে লাগলো।
হাসছে মৃত্তিকাও। কেবল বিস্তৃকা গম্ভীর। মেঘস্বরে বলল, “ঐ ছ্যামরাকে তিন বেলা নিয়ম করে ধোলাই লাগানো উচিত। গাধা একটা!”
“উঁহু, গাধা না, ছেলে চালাক ঠিকই আছে। বেচারার কেবল একটাই দোষ, সিনিয়র বোনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। হাঁড়ি মাথায় ভাঙার পর তো বিরহে কবিতাও লিখেছে দীপ্ত।” হৃত্বিকা জানালো।
“কবিতা? ছেলে কবিতাও লেখে!” আপা অবাক গলায় বলল।
“লেখা না মানে, সেই কবিতা লেখে-
বুকের ওপর শঙ্কা কেবল আসল আমার নেমে,
যখন প্রলয় গেছে থেমে।
সে কথা বন্ধ করে খিড়কি তুলে
ঘরের ভেতর রইল বসে একা একা,
ভাবে কেউ নাড়বে কড়া, স্বয়ম্ভরা
দিন দুপুরে হঠাৎ এসে
বলবে ডেকে বাহির থেকে-
আমিই ছিলাম তোমার অতীত,
তোমার সকল ভাগ্যরেখা.........”
সেই অবস্থা বুঝেছিস আপা? এখনই ছেলে মিনি রবীন্দ্রনাথ!”
বিস্তৃকা গর্জন করে বলল, “ঐ রবীন্দ্রনাথের বাকি ঠ্যাঙটাও ভেঙে লুলা করে দেবো আমি!”
“থাক, বাবা! মারামারি করতে যাসনে....... কথায় কথায় দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি রওনা দেতো এখন। সন্ধ্যা হয়ে যাবে।” মৃত্তিকা দ্রুত উপসংহার টানলো কথার।
কথায় কথায় যে কখন ঘরের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে টের পায়নি কেউ। যাওয়ার কথা উঠতেই কেন যেন কেউ কোনো কথা বলল না। আসলেই দেরি হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অন্য প্রসঙ্গ আবার মাথায় আনতে চায়নি এখানে। হৃত্বিকা-বিস্তৃকা দুজনেই বিদায় নিলো বড় আপার।
বিকেলের সেই লালচে কণে দেখা আলোয় দিগন্তের দিকে হাঁটতে থাকা দুই বোনের দিকে তাকিয়ে রইল মৃত্তিকা দরজায় হেলান দিয়ে। কোলের ওপর শারমিন খেলছে। হাত পা ছুড়ছে আপন মনে আনন্দে।
বাথরুম থেকে শওকত বেরিয়েছিল তখন, মৃত্তিকাকে ডাকছে রুক্ষ স্বরে, “কোথায় গেলে? খেতে দেবে না নাকি? বাহির থেকে আসলাম মানুষটা, একটু সামনে সামনে থাকা যায় না? ঘরেই তো আছো, নাকি?”
মৃত্তিকা একটা সূক্ষ্ম দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ঘুরে দাঁড়ালো। দরজার ওপার আর এই পারে কেন যেন একই রকম মিল রয়েছে। অনেক দূর লাগে সব কিছু।
বিস্তৃকার হাতে গুজে দেয়া ভাঁজ করা কাগজটা রোখসানা খানম খুলেছিলেন। দুই বোনের কেউ খোলেনি। খুললে হয়তো সেদিনই অনেক কিছু জেনে যেত। হয়তো বা বোনের কাছে আরো কিছু সময় থাকার চেষ্টা করতো।
“আম্মা,
আমার সালাম নিবেন। অনেকদিন দেখা হয় না আপনার সাথে। হৃত্বিকাদের মুখে শুনলাম আপনার প্রেশারের সমস্যাটা আবারও শুরু হয়েছে। এর মাঝেও অফিস করছেন। কদিনের জন্য ছুটি নিয়ে একটু বিশ্রাম নিলেই তো পারতেন। এখন তো সংসারের খুব একটা সমস্যা নেই। আমাকে বিয়ে দেয়া নিয়ে আপনার যে দুশ্চিন্তা ছিল, সেটা তো কবেই শেষ হয়েছে। মিশুকও কদিন পরে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। শুনলাম পার্ট টাইম চাকরিও নাকি শুরু করেছে সে। এখন থেকেই দায়িত্ববোধ চলে আসলে আপনার কাঁধ থেকে অনেক বড় একটা ভার নেমে যাবে আশা করি।
হুট করেই চিঠি লিখছি আপনাকে। হৃত্বিকারা এসেছে দেখে ভাবলাম হাতে হাতে কিছু লিখে দেই। আপনার হয়তো জানা নেই, বাসা থেকে এখন আমাকে আর কলেজে যেতে দেয়া হচ্ছে না। শারমিনের দেখা শোনার কারণ দেখিয়ে শওকতের আব্বা আম্মা একরকম জোর করেই সিদ্ধান্তটা চাপিয়ে দিয়েছে। বছর খানেক আগে হলেও হয়তো কান্না কাটি করতাম। করেছিও সেই সময়। কিন্তু এখন শারমিন হওয়ার পর কেমন যেন সয়ে গেছে ব্যাপারগুলো। শওকতের কাছ থেকে যতটা সাপোর্ট আশা করেছিলাম, তেমনটা পাইনি। সব মানুষই আসলে বদলে যায়। কিংবা পরিস্থিতি বদলে দেয়। আপনি যেমন আব্বার মৃত্যুর পর বদলে গেছেন, শওকতও হয়তো নিজের মেয়ের জন্য বদলে গেছে আমার প্রতি। নিজের দিক থেকে ভাবলে খারাপ লাগে। মনে হয় যেন সবাই খুব বড় ষড়যন্ত্র করে আমাকে একঘরে করে ফেলেছে। কিন্তু একা একা বসে যখন সেই মানুষগুলোর জায়গায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করি, তখন খুব অবাক হয়ে দেখি- তারা কেউই কারো জায়গায় ভুল নেই। সবাই যার যার জায়গায় ঠিকই আছে। কেবল অবস্থানের সাংঘর্ষিকতাই নিজেকে বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত ভাবাচ্ছে। আর কিছুই না। মেনে নিলে সবটাই খুব স্বাভাবিক।
আর সংসার করতে গেলে নাকি মেয়েদের হালকা পাতলা ত্যাগ তিতিক্ষার মাঝ দিয়ে যেতেই হয়। উপেক্ষা করার অবকাশ নেই। আমিও মেনে নিয়েছি। ধীরে ধীরে ভেতরের খচ খচে ভাবটাও এক সময় চলে যাবে। পাখির মত উড়ে তো লাভ নেই আমার, পায়ে দড়ি বেঁধে দেয়া হয়ে গেছে।
শওকতের জন্যও মায়া লাগে। শুনেছি অফিসে নাকি এমন কথাও তাকে পরক্ষ ভাবে শুনতে হয়েছে, শারমিন তার ঘরের মেয়ে তো? শিক্ষিত মেয়ে বিয়ের বছর খানেকের মধ্যেই বাচ্চা নিয়ে নিচ্ছে- ব্যাপারটা কেমন ঘোলাটে। তাও আবার দূরের কলেজে পড়ে। ছেলে মেয়ে এক সাথে। কত কি হতে পারে। তারওপর আবার ডাক্তারি। ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের আবার লজ্জা শরম কম।
আগে অবাক হতাম মানুষের কথায়। এখন আর হই না। এই অল্প সময়ের সংসারে বুঝে গেছি, মানুষ আমাকে নিয়ে আলোচনা করতে খুব পছন্দ করে। শুধু দুঃখ লাগে এটা ভেবেই যে এখানে যাকে সবচেয়ে কাছের আর মাথার ছাদ বলে ভাবতে শুরু করেছিলাম, সেই মানুষটাও কেমন অচেনা হয়ে গেছে। দেরি করে ঘরে ফেরে, আগের মত কথা বলে না। দশটা প্রশ্ন করলে একটা উত্তর দেয়। যাও কথা বলে সেটাও ধমকের সুরে। যেন খুব অন্যায় করে ফেলেছি তাকে বিয়ে করে। প্রায় রাতেই রাগ করে ড্রইং রুমে গিয়ে শুয়ে থাকে। আমার সাথে ঘুমায় না।
প্রায়ই ভাবি আপনাদের কাছে যাব। গিয়ে কদিন থেকে আসবো। কিন্তু আব্বা বা শওকত কেউই যেতে দিতে চায় না এখন। তাদের একটাই কথা, শারমিনের দেখা শোনা এখানেই ভাল হচ্ছে। আপনাদের ওখানে গেলে ঠিকমত দেখাশোনা হবে না। মেয়েটা যে জন্মের পর থেকে ছয় মাস নানী বাড়িতেই বড় হল- সে কথা যেন সবাই ভুলে বসে আছে। এখন তারাই সব শারমিনের জন্য।
আম্মা আমি কাউকে দোষারোপ করি না। শওকতকেও না, সমাজকেও না। আক্ষেপ কেবল একটাই, আমি মানুষকে যতটা বোঝার চেষ্টা করেছি, যতটুকু করার চেষ্টা করেছি। আমার জন্য কেউ করল না।
ভাল থাকবেন।
আপনার স্নেহাস্পদ
মৃত্তিকা।”
মৃত্তিকার সেই চিঠির এক মাস পর রোখসানা খানম মৃত্তিকার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে হোসেন সাহেবের কাছে একরকম অনুনয় বিনয় করে মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন কদিনের জন্য। শারমিনকেও নিয়ে এলেন। প্রথম দিকে তো হোসেন সাহেব নাতনিকে দেবেনই না। গম্ভীর গলায় বলেই দিলেন, “বেয়াইন সাহেবা, শারমিন তো একটু বড় হয়েছে। ওর আম্মাই যাক। সে থাকুক। বাসা নয়তো খালি খালি লাগবে।”
রোখসানা খানম বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “সেও আসুক না ভাই সাহেব? নানী বাড়ি যাবে না মায়ের সাথে? তা কি হয়? অল্প কদিনের জন্যই তো যাচ্ছে।”
হোসেন সাহেব অসন্তুষ্ট মুখে “ঠিক আছে” বলে উঠে চলে গেছেন। এমনকি রোখসানা খানম, মৃত্তিকা যাওয়ার সময়েও দেখা করেননি। বাজারের দোকানে কাজ আছে বলে এড়িয়ে গেছেন। শওকতও কোনরকম ভদ্রতা রক্ষা করে কথা বার্তা চালিয়ে গেছে। তেমন আগ্রহ ছিল না কথা বলায় রোখসানা খেয়াল করেছেন। ফিরোজা বেগম কিংবা ঘরের কাজের মেয়েটা যখন ছিল না, সেই সময় সুযোগ বুঝে জামাইকে ডেকে মৃত্তিকার পড়াশোনার ব্যাপারে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, “বাবা, তুমি তো জানোই মৃত্তিকা পড়াশোনায় অনেক ভাল ছিল। ওর আব্বার অনেক স্বপ্ন ছিল মেয়েটাকে ডাক্তার বানাবে। সংসারের জন্য তো আমার মেয়েটা কম করছে না। মানুষ তো কত কথাই বলে। মানুষের স্বভাব হল অন্যের ভাল সহ্য করতে পারে না। তুমি বুঝতেছো পারতেছো আমার কথা?”
শওকত কোনোমতে হু জাতীয় শব্দ করল অনিচ্ছা শর্ত্বেও।
“মৃত্তিকা কারো কথা ভাবে নাই, সে কেবল তোমার কথা ভেবে শুরুতেই বাচ্চা নিয়ে নিয়েছে। যাতে তোমাকে কেউ আড়ালে এই কথা শোনাতে না পারে যে শিক্ষিত ডাক্তার বৌ পালছে ছেলে- মেয়ে তো পাশ দিলেই জামাইকে ছেড়ে চলে যাবে।”
শওকত উত্তর দিলো না। পা দিয়ে মেঝের ওপর নখ খুঁটতে লাগলো আপন মনেই। রোখসানা খানমের কথা শুনছে না যেন ঠিক।
“মেয়েটা ভেতরে ভেতরে অনেকটাই ভেঙে পড়ছে বাবা। তুমি ছাড়া তাকে বোঝার কে আছে বলো? স্বামী স্ত্রী একে অন্যের জন্য যদি না করে, বাহিরের কেউ এসে কিছুই ঠিক করতে পারবে না।”
“সে কি আমার নামে আপনাকে এখন বিচার দিয়ে বেড়াচ্ছে?” আচমকা বলে বসল শওকত।
রোখসানা খানম থমকে গেলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। মৃত্তিকা আশেপাশে নেই। পাশের ঘর শারমিনকে ঘুম পাড়াতে গেছে। সামলে নিলেন দ্রুত, “নাহ, সে কিছু বলেনি। যা বোঝার আমি বুঝেই বলছি।”
“আপনার বোঝাতে ভুলও তো থাকতে পারে? তাই না?” শওকত ঠাণ্ডা গলায় বলল।
রোখসানা খানম চুপ হয়ে গেলেন। টের পেলেন সূক্ষ্ম একটা অপমানবোধে মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে তাঁর। জামাইয়ের কাছে আর যাই হোক, এরকম উত্তর আশা করেননি।
“আপনি রেস্ট করেন আম্মা। আমার কিছু কাজ আছে, বাজারে যেতে হবে। এখন উঠি?” শওকত অনুমতির অপেক্ষা করল না। উঠে দাঁড়ালো। স্পষ্ট ইঙ্গিত। আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।
রোখসানা খানম একটা কথাও বললেন না আর।
সেই রাতে মেয়ের সাথে ঘুমানোর সময় মৃত্তিকা টের পেল রোখসানা খানম ঘুমাতে পারছেন না। এপাশ ওপাশ করছেন কেবল। মৃদু স্বরে ডাকলো মৃত্তিকা, “আম্মা? ঘুমাননি?”
“ঘুম আসছে না কেন জানি।”
“কিছু নিয়ে টেনশন করছেন?”
ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন রোখসানা, “নারে, একটা কথা ভাবছি কেবল।”
“কি কথা?” অন্ধকারেই মায়ের মুখটা দেখার চেষ্টা করল মৃত্তিকা।
“আমার গাছ ছিল। নৌকা বানিয়ে নদীতে ভাসাতে পারতাম। কিন্তু নৌকা বানানোর শ্রমটা দিতে কার্পণ্য করে ফেলেছি। কাঠ দিয়ে সস্তা ভেলা বানিয়ে নদীতে নামিয়েছিলাম। ডুবে গেছে।” বিষণ্ন কণ্ঠে উত্তর দিলেন।
মৃত্তিকা কিছু বললো না। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো। কাল ভোরে উঠে বাস জার্নি আছে। এখন না ঘুমালে দেরি হয়ে যাবে।
মৃত্তিকা বহুদিন পর যেন বাড়ি ফিরেছিল সেবার। দীপ নেভার আগে যেমন সব আলোকিত করে জ্বলে ওঠে, মৃত্তিকা বাড়িতে ফিরে ঠিক তেমন করেই জ্বলেছিল। ম্লান মুখটায় রাজ্যের কলকলা স্রোতের মত হাসি আর দুচোখ জুড়ে জীবনের সমস্ত সজীবতা যেন ছবির মত ফুটে রয়েছিল। মিশুকও ফিরেছিল বড় আপার বাড়ি আসা উপলক্ষ্যে। বাড়ির সামনের মেহেদী গাছ থেকে অনেকদিন পর তিন বোন মিলে মেহেদী পেড়েছিল। শখ করে শেষ কবে হাতে মেহেদী দিয়েছে তিন বোন মিলে, ভুলেও গেছে যেন। শিল পাটায় ঘষাঘষি করে মেহেদী বাটা, হাতে লাগানো, প্রাণ খোলা হাসিতে ভেঙে পড়া, সব যেন নতুন করে জেগেছিল বাড়িটায়। গভীর রাতে বাড়ির ছাদে বসে চাঁদের আলোয় গলা ছেড়ে গান গাওয়া, মিশুকের বাঁশিতে রবীন্দ্রনাথের চাঁদের হাসি গানটার সুর তুলে রাতের আঁধার আর জ্যোছনায় মিশে যাওয়া কণ্ঠগুলোর তার অনেককাল এ বাড়ির ছাদে আসেনি। গানের আওয়াজ পেয়ে দীপ্তও চলে এসেছিল ছাদে। গিয়ে বসে পড়েছে মিশুক ভাইয়ের সাথে। ছেলেটাও যে চমৎকার বাঁশি বাজাতে পারে, জানা ছিল না মৃত্তিকার। সেদিন দেখলো মিশুক আর দীপ্ত পালা করে দারুণ সব সুর তুলছে বাঁশিতে। মৃত্তিকা অবাক হয়ে নিচু স্বরে হৃত্বিকাকে খোঁচা দিয়ে বলল, “বাঃ বাঃ বালক তো দেখি মিশুকের মত বাঁশিও ধরে বসে আছে এই বয়সে!”
হৃত্বিকা চোখ মোটকে বলল, “মিশুক ভাইয়ের কাছে শিখেছে। শুধু যে গুরুর কাছে বাঁশি শেখে তাই না, সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে, দুই গুরু শিষ্য মিলে ছাদে বসে বিড়ি টানে। ভাবের কবিতাও আবৃতি করতে থাকে দুইটা!”
শিস দেয়ার মত করে উঠল মৃত্তিকা, বিস্তৃকার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালো, “সত্যি নাকিরে?”
বিস্তৃকা বার কয়েক চোখ পাকালো কেবল। কিন্তু কিছু বলল না।
মিশুক ভাই গান ধরেছে লালনের,
“আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়
পারে লয়ে যাও আমায়।
আমি একা রইলাম ঘাটে ভানু সে বসিলো পাটে
আমি তোমা বিনে ঘোর সংকটে না দেখি উপায়।
পারে লয়ে যাও আমায়...”
সবাই মুগ্ধ হয়ে গান শুনছে। কেউ ভাল করে তাকালে দেখতে পেত, মৃত্তিকা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে চাঁদের আলোয় রাঙিয়ে যাওয়া বিষণ্ন দিগন্তটার দিকে।
মৃত্তিকা চারদিনের জন্যই এসেছিল। শওকত আর হোসেন সাহেবের কড়া নির্দেশ ছিল চতুর্থ দিনের বিকেলেই যেন বাসে উঠে ফেরত চলে আসে। শওকত গিয়ে নিয়ে আসতে পারবে না। অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকবে। শারমিনকে নিয়ে যেন রাত হবার আগেই বাড়িতে হাজির হয় মৃত্তিকা।
কিন্তু ঝিনুকের জীবন শেষ দৃশ্যের মঞ্চায়ন তখন বাকি ছিল শুধু। অথচ কেউ জানতেও পারেনি। বাসার আলমারী থেকে মোশতাক আহাম্মেদের কিনে দেয়া পুরনো সেই সবুজ শাড়িটা বের করে পরেছিল খুব ভোরবেলা মৃত্তিকা। ন্যাপথলিনের কড়া গন্ধে ভারি হয়ে ছিল শাড়িটা। সিঁড়িঘরের পাশের চিলেকোঠাটার সামনে গিয়ে ভোরের সূর্যোদয় দেখেছিল নয়ন ভরে। বিস্তৃকার মনে আছে সেদিন দাঁত ব্রাশ করতে করতে ছাদে উঠে আপাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল, মুখ ভর্তি পেস্টের ফেনা নিয়ে বলেছিল, “কিরে আপা? তুই দেখি একেবারে শাড়ি পরে ছাদে হাজির? যাবি তো বিকেলে? তাই না? এখনই শাড়ি...... ওমা! এই পুরনো শাড়ি কোত্থেকে বের করলি?” চোখ গোল গোল করে তাকায় বিস্তৃকা।
কার্নিসে হেলান দিয়ে ওর দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে ছিল মৃত্তিকা। দূরের আকাশটা খুব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বিস্তৃকার কথার উত্তর দিল না মৃত্তিকা।
“কি হল? আপা? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছিস নাকি?” বিস্তৃকা পাশে এসে দাঁড়ালো।
ফিরে না তাকিয়ে অদ্ভুত স্বরে বড় আপা বলল, “জানিস, খুব ভোরের এই আলোটা দেখলে রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কথা মনে পড়ে। স্কুলে থাকতে গাইতাম আমি। কলেজেও গেয়েছি। এমনকি প্রথম বছর মেডিক্যালের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানটা গাওয়ার পর আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার অনেক হয়ে ডেকে বলেছিলেন, তোমার নাম কি মা? এত সুন্দর করে গাও কেমন করে?”
বিস্তৃকা সপ্রশ্ন চোখে তাকালো, “কোন গানটা?”
মৃত্তিকা জবাব দেয়ার বললে মৃদু সুরে গাইলো কয়েক ছত্র-
“আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও।
যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।
বিশ্বহৃদয়-হতে-ধাওয়া আলোয়-পাগল প্রভাত হাওয়া,
সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও।”
বিস্তৃকা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আপার দিকে। একটা মানুষ এত সুন্দর করে কীভাবে গাইতে পারে ঠিক বিশ্বাস হয় না তার। দীর্ঘ কয়েকটা মিনিট দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। সূর্য ওঠার সাথে সাথে চারপাশে কত শত রঙ ছড়িয়ে যাচ্ছে। যেন মৃত্তিকার আহ্বানেই সূর্যটা জেগে উঠেছে আজ।
“তোকে এই শাড়িটায় কেমন লাগে জানিস?”
“কেমন?”
“নদীর মত। মনে হয় যেন অনেক অনেক কথা নিয়ে বয়ে যাচ্ছে একটা নদী। শান্ত, শুভ্র, মৌন।”
“দীপ্তর আছড় লেগেছে নাকি তোরও? কবি হয়ে যাচ্ছিস দেখি, মহিলা কবি!”
“ধ্যাত! আপা কি সব বলিস! ঐ ছাগলটার সাথে আমাকে কেন মেলাতে যাস সব সময়?”
“কই মেলালাম? আজকেই তো প্রথম বললাম!” স্মিত হাসল মৃত্তিকা।
বিস্তৃকা আর কথা বাড়ালো না, মুখের পেস্টের ফেনা খানিকটা ফেলে আপার দিকে তাকিয়ে বলল, “বিকেলে কয়টার দিকে বের হবি? আমি স্কুল থেকে চলে আসব আগে আগে।”
“অসুবিধা নেই তো। আমি নিজে নিজে চলে যেতে পারবো। তুই স্কুল শেষ করে যেমন আসিস, তেমন আসলেই হবে। আমার জন্য তাড়াহুড়া করিস না।”
“না! তাও বল্ কখন আসবো?”
“সন্ধ্যার আগে আসলেই হবে...” আপন মনেই বলল মৃত্তিকা। দূরের মাঠটার দিকে তাকিয়ে আছে। সবুজ ঘাসগুলোর শিশিরে সূর্যের আলো লেগে চিক চিক করছে। এতদূর থেকেও সব যেন খুব কাছে লাগছে।
“ঠিক আছে। আমি চলে আসবো সন্ধ্যার আগে। ছাতার প্রাইভেট পড়া যে কুনদিন ছেড়ে দেই। সারাদিনটাই পড়াশুনা করতে করতে চলে গেল! স্কুল শেষে আরো দুই ঘণ্টা পড়ো! ধুর!” বিরক্ত মুখে গজ গজ করতে করতে ঘুরে নেমে আসে ছাদ থেকে বিস্তৃকা।
অথচ তখনও জানা ছিল না, বড় আপার সাথে এটাই তার শেষ আলাপ ছিল.....
মৃত্তিকা খুব স্বাভাবিক নিয়মে বিকেল দিকে শারমিনকে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। বাসায় মিশুক ছাড়া কেউ নেই। ঘুমাচ্ছে তখন সে। রোখসানা অফিস থেকে ফেরেননি। হৃত্বিকা কিংবা বিস্তৃকার স্কুল বা প্রাইভেট শেষ হতে দেরি অনেক। বাসায় কেবল সজাগ প্রাণি বলতে শুধু মৃত্তিকাই ছিল। মেয়েটাকে বিছানায় শুইয়ে রেখে ধীর পায়ে দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গিয়েছিল। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ক্রমশ টকটকে লাল হয়ে মেঘগুলোকেও রাঙিয়ে দিয়ে আকাশটাকে ঘন আবীর মাখিয়ে দিয়েছে যেন। তার মাঝে বহুদূর ওপরে ক্ষুদ্র কালোর ছটা। শিল্পী খুব যত্ন করে দুয়েকটা শঙ্খচিল আঁকতে ভোলেননি। মৃত্তিকা খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে চারপাশের পৃথিবীটাকে স্বপ্নিল চোখে দেখলো দীর্ঘ কয়েকটা মুহূর্ত ধরে। তারপর চিলেকোঠার ঘরটায় ঢুকে দরজা দিলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে।
মৃত্তিকার চোখে সেদিন জল ছিল না।
বিস্তৃকারা স্কুল থেকে ফিরে এসে মৃত্তিকাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে ছাদে দেখতে এসেছিল। রোখসানা খানম তখনো আসেননি। সন্ধ্যা হতে আর অল্প বাকি। ছাদে উঠে এদিক ওদিক খুঁজতে গিয়ে চিলেকোঠার ঘরটার একপাট খোলা জানালায় চোখ পড়ে প্রথম বিস্তৃকার। ম্রিয়মাণ সূর্যটার শেষ রক্তাভ আলোকচ্ছটা জানালা ভেদ করে ভেতরে গিয়ে পড়েছে। বিস্তৃকা ছাদ থেকেই দেখতে পাচ্ছিলো, বড় আপার ঝুলন্ত লাশটা মৃদু পেন্ডুলামের মত দুলছে একপাশ থেকে অন্য পাশে। সূর্যের আলোটা গিয়ে মোশতাক আহাম্মেদের কিনে দেয়া সবুজ শাড়িটার গায়ে অদ্ভুত নঁকশা তুলে দিয়েছে।
বিস্তৃকা ফ্যাঁকাসে মুখে হৃত্বিকাকে হাত নেড়ে ডেকে ওখানেই বসে পড়েছিল। মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছিলো না ওর। কথা আটকে গেছে। শুধু শুনতে পাচ্ছে হৃত্বিকা গলা ফাটিয়ে পাগলের মত চিৎকার করে মিশুক ভাইকে ডাকছে, দীপ্তকে ডাকছে। পাগলের মত কাঁদতে শুরু করেছে মেজ আপা। বিস্তৃকা কাঁদতে পারছে না। বুকের কাছে দম আটকে গেছে। ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছে ওর। মনে হচ্ছে মরে যাবে এখন। দলা পাকিয়ে ছাদেই শুয়ে পড়েছে সে। হৃত্বিকা ছুটে গিয়ে দরজাটা ধাক্কাচ্ছে, “আপা, ও আপারে! এটা তুই কি করলি! আপা......” গলা ভেঙে গেছে কান্নার চোটে।
ছাদে উঠে এসেছে হতভম্ব মিশুক আর দীপ্ত।
হৃত্বিকা দরজা ধরে তখনো ধাক্কাচ্ছে, “ভাইয়া দ্যাখ, আপা কাউকে কিছু না বলে চলে গেছে! ও ভাইয়া, আপাকে এনে দেনা?”
মিশুক ছুটে গিয়ে জানালায় দাঁড়াতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মত গ্রিল ধরে ওখানেই বসে পড়লো। নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। যা করার দীপ্তই করল। নিচে গিয়ে দ্রুত লোকজন ডেকে এনে দরজা ভাঙালও। দড়ি কেটে মৃত্তিকার লাশ নামানো হল নিচে। গলার চামড়া কেটে চিকন নাইলনের দড়ি অনেকটা বসে গেছে। রক্তে ভিজে গেছে গলার কাছটা। হৃত্বিকা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসতে চেয়েছিল বড় বোনের কাছে। কিন্তু দীপ্তর আম্মা তাকে ধরে আটকে ফেলেছে। বড় যারা ছিল, সবাই ওদের ভাই বোনগুলোকে সরিয়ে রেখেছিল লাশ থেকে। রোখসানা খানমের তখনো কোনো খবর নেই। তিনি অফিসে। তাঁকে ডাকতে লোক পাঠানো হয়েছে।
বিস্তৃকার গায়ে শক্তি অবশিষ্ট নেই। ছাদেই পড়ে রয়েছে কুন্ডুলি পাকিয়ে। তার দিকে কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে প্রচণ্ড। বুকে ব্যথা হচ্ছে খুব। কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। কাঁপছে হিস্টোরিয়া গ্রস্থের মত। কাঁদতে পারছে না। অথচ গলার কাছটাই তীব্র কান্না ফুঁসে উঠেছে পাগলের মত।
ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলো দীপ্ত। বিক্ষিপ্ত দেখাচ্ছে তাকে। ক্রাচে করে ইতস্তত ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে পেছনের ভিড়টার দিকে। মিশুক ভাই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাচ্চার মত হাউমাউ করে কাঁদছে কাউকে জড়িয়ে ধরে। শারমিনকে কে যেন কোলে নিয়ে ছাদের একপাশে সরে গেছে। মেয়েটা ঘুম ভেঙে উঠে মাকে কাছে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাহিল হয়ে গেছে। কান্না থামানো যাচ্ছে না মেয়েটার।
বিস্তৃকার দিকে দীপ্তর চোখ পড়তেই দ্রুত ক্রাচে খট খট শব্দ তুলে এগিয়ে এলো। হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো ওর পাশে ক্রাচ ফেলে দিয়ে। বিস্তৃকার একটা হাত ধরে বিড়বিড় করে বলল, “খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
বিস্তৃকা দীপ্তর খুব কাছ ঘেষে সরে আসে। অসহ্য একটা কষ্টে ভেতরটা দুমরে মুচরে যাচ্ছে তার। কিন্তু সামান্যতম টু শব্দটিও করতে পারছে না। কথা আসছে না মুখে।
“কিছু বলতে চাও?” দীপ্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কিছু। বোকার মত বিস্তৃকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
বিস্তৃকা ওর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দীপ্তর বাহুতে মুখ গুজে দিয়ে এবারে ভয়ংকর ভাবে মুখ ঘষতে থাকে অসহায়ের মত। দীপ্তর চোখে পানি চলে আসে মুহূর্তের মধ্যেই। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় সে। সান্ত্বনা দেয়ার মত কোনো কথা মনে আসছে না ওর।
বিস্তৃকা শান্ত হতে পারছে না। অস্থিরতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে তার। জমাট কথা আর কান্নাগুলো বুকের কাছটায় অসহ্য একটা ব্যথার মত সৃষ্টি করছে খুব দ্রুত। ফিসফিস করে শব্দহীন কণ্ঠে কেবল বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে, “ও আপা! আমিও মরে যাব! তুই চলে আয়। ও আপা! আমাকে অংক কে দেখিয়ে দেবে? তুই আয়। আমি এখনে অপেক্ষা করছি, তুই আয়...... ও আপারে.....”
দীপ্তর বুকেই যে কখন বিস্তৃকা জ্ঞান হারিয়েছে দীপ্তও টের পায়নি।
রোখসানা খানম মেয়ের আত্মহত্যার কথা শুনে সিঁড়ি দিয়ে উঠেই চিলেকোঠার দরজার কাছে এসে লাশ দেখা মাত্র মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন। লোকজনের ছোটাছুটি, ডাক্তার ডাকা, রোখসানা খানমকে স্যালাইন লাগানোর মাঝে বিস্তৃকার কথা সবাই ভুলে গেছে যেন। দীপ্ত বিমূঢ়ের মত বিস্তৃকার অজ্ঞান শরীরটা আঁকড়ে ধরে ছাদে বসে রয়েছে এত মানুষের ভিড়েও, অলক্ষ্যে.....
মৃত্তিকার বাচ্চাটা তখনও কাঁদছে।
কিছু আত্মহত্যায় পত্র থাকে। অব্যক্ত কথা থাকে। মৃত্তিকার ছিল না। অনেক কথা ভেতরে নিয়েই চলে গিয়েছিল। হয়তো চেয়েছিল বলে বলে একদিন হালকা হবে কারো কাছে। কিন্তু বলে যেতে পারেনি কিছুই। অনেক সময়েই মানুষ কথা বলার কাউকে খুঁজে পায় না হাজার ডেকেও। সমস্ত কথা সাথে নিয়েই মাটির নিচে নামের সাথে মিলিয়ে গেছে মৃত্তিকা। যেন কোথাও ছিল না সে। হারিয়ে গেছে হঠাৎ করেই।
রোখসানা খানমের পরিবারটা মৃত্তিকার মৃত্যুর শোক সামলে উঠতে অনেক সময় নিয়েছিল। কিন্তু শওকত কিংবা তার পরিবারের হাতে অতটা সময় ছিল না। মৃত্তিকার বাচ্চাটাকে রোখনাসার হাতে তুলে দিয়ে এক বছরের মাথায় আবার বিয়ে করে সংসারি হয়েছে শওকত। মৃত্তিকার কোনো ছাপ সেই বাড়িতে ফেলে রাখতে চায়নি। তাই হয়তো মেয়েকে গোছিয়ে দিয়ে গেছে মৃত্তিকার মায়ের হাতেই। রোখসানা কিংবা বিস্তৃকারা কেউ অবাক বা বিস্মিত হয়নি এ ঘটনায়। এটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। ন্যাড়া ক্ষেতে পুরনো ধান গাছের গোঁড়া থাকলেও প্রথম বৃষ্টিতে হাল চালাতে সেই গাছই সার দেয় নতুন ধান গাছে। ধান দিয়ে মরে যাওয়া গাছও তার শেষ দায়িত্ব পালন করে যায় নতুন ধান গাছের জন্য। মৃত্তিকা কোনো সোনা দানা নিয়ে আসেনি সেই ঘর থেকে। শারমিনের জন্যেও রেখে যায়নি কিছু। বিয়ের সমস্ত গহনা, রোখসানার দেয়া হাতের বালা, কানের দুল সব শওকতের ঘরেই রেখে এসেছিল। নতুন ঘর বাঁধতে শওকতকে পরিশ্রম করতে হয়নি। মৃত্তিকা হয়তো কোথাও বেঁচে থাকলে ম্লান হাসি হাসতো। শওকত তার ধারণাটাই সযত্নে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। মৃত্তিকার বিশ্বাসকে বিন্দু মাত্র ভুল প্রমাণ করেনি। ক্ষুদ্র কয়েক বছরের সংসারে এই প্রথম হয়তো শওকত মৃত্তিকার প্রত্যাশার মূল্য দিয়েছিল। মানুষ একা থাকতে পারে না। কিংবা পুরুষ একা থাকতে পারে না। এমন সাধু থেকে জগৎ অজ্ঞাত যার বাহ্য-অন্দরে বৈধ বা অবৈধ আশ্রমের সেবিকা জোটে না। শওকত কেবল সাধারণ মানুষ ছিল।
মোশতাক আহাম্মেদের পরিবার হয়ত সেই বিচারে শওকতকে ক্ষমাও করে দিতে পারতো। কিন্তু শওকতের সঙ্গে তাদের পার্থক্য ছিল না। তাই ক্ষমা করতে পারেনি কোনোদিন।
চোখ বন্ধ করে একে একে কবুতরের ঘরটায় ঝাপটে নেমে এসে পায়চারি করতে থাকা কবুতরগুলো শব্দ শুনতে লাগলো বিস্তৃকা। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে। খানিক আগের সেই আলোটা মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। লালের মাঝে ধূসর আর বেগুনির মিশেলে একটা বিচিত্র পর্দা আকাশটায় টানিয়ে দেয়া হয়েছে যেন মঞ্চের মত করে। একটা পরেই পর্দার ওপাশ থেকে নাটক শুরু হবে দর্শককে বিমোহিত করে দিয়ে। মেঘগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ঘন পানির মাঝে হঠাৎ করে অনেকটুকু কাঁচা দুধ পড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে, সেই ছড়ানোর মাঝে কেউ পানিতে রঙ তুলির ব্রাশ ডুবিয়ে দিয়েছে আচমকা। লাল রঙ আর দুধের মেঘ চড়ে বেড়াচ্ছে আকাশের খুব নিচ দিয়ে। যেন সামান্য হাত বাড়িয়ে দিলেই নেমে এসে ছুঁয়ে যাবে বিস্তৃকার হাত।
হৃত্বিকার বিয়ে হয়েছে ছয় বছর হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়াতে থাকে স্বামী আর বাচ্চা নিয়ে। দুটো জমজ ছেলে আছে ওর। সুখেই আছে। প্রায়ই মাসে দুই মাসে চিঠি পাঠায়। সাথে সাথে অনেক অনেক ছবি। ফোনে কথা বলে অতদূর থেকে সব যেন বলে বোঝাতে পারে না হৃত্বিকা। তাই কাগজে কলমেও লেখে অনেক কথা। অনেক দেশেই ঘুরতে যায় সবাই মিলে। চিঠির সাথে পাঠানো ছবিগুলোতে কখনো দেখা যায় অনেক উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে বাসে চড়ার মুহূর্তে ছবি তুলেছে। অথবা সাগরের ওপর সাদা হাঁসের মত জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ছবি নিয়েছে। সেই ছবিতে পেছনের পাহাড় কিংবা বিস্তীর্ণ নীল সাগর আর আকাশ এসেছে। দুধের মত মেঘ আর সোনালী কিংবা লাল আভা সেই ছবিতেও দেখেছে বিস্তৃকা। পৃথিবীর সব আকাশই বোধহয় এক। কিংবা মেঘগুলো। পাখির মত উড়ে উড়ে ঘুড়ে বেড়ায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অতিথি পাখির মত। কে জানে, হৃত্বিকার মাথার ওপর যে মেঘগুলো দেখা যায়, হয়তো কদিন আগে বিস্তৃকাদের বাড়ির ছাদের কাছে এসে যাত্রা বিরতি দিয়েছিল। মেঘেরাও তো জাহাজের মত নোঙ্গর ফেলে একেক ডাঙায়।
মিশুক ভাইও বিয়ে করেছে আট নয় বছরের মত হচ্ছে। বেসরকারী একটা ফার্মে চাকরি করে দেখে প্রতি বছরই একদেশ থেকে অন্যদেশে পোস্টিং হয়। ভাবীকে নিয়ে বার বার বাসা বদল করতে করতে অস্থির। তারচেয়ে বড় সমস্যা হল তাদের ছেলে মেয়ে দুটোর পড়াশোনার ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে ঘন ঘন স্কুল বদল হওয়াতে। ফোন দিয়ে প্রায়ই বিস্তৃকার কাছে বিরক্ত গলায় মিশুক বলে, “ছাতার চাকরির মুখে ঝাঁটা মেরে একদিন চলে আসব দেখিস। ছেলে মেয়ে দুটো যে একটু স্থির হয়ে পড়াশোনা করবে, বন্ধু বান্ধব বানাবে সে উপায় নেই। লোটা কম্বল নিয়ে মুসাফিরের মত ঘুরছি ফুল ফ্যামেলি!”
বিস্তৃকা হেসে সান্ত্বনা দেয়, “কিছু তো করার নেই ভাইয়া। শানু-অন্তুর জন্য মায়াই লাগছে। তুই বাংলাদেশে পোস্টিং নিচ্ছিস না কেন? ওরা এখানে এসে ভর্তি হলে এটলিস্ট যদি তোর পোস্টিংও হয়ে যায় আরো এক বছরের জন্য, আমি রেখে দেবো ওদের। এখানে থেকে একটু থিতু হোক। দেশটা দেখুক। তোর বেদুইন মার্কা চাকরির জন্য তো নিজের দেশটাও দেখতে পেল না ঠিকমত।”
ম্লান মুখে উত্তর দেয় মিশুক, “সেটা অবশ্য মন্দ বলিস নি, কিন্তু অথৈকে মানুষ করতে গিয়ে তো তুই নিজেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিস। ভার্সিটির চাকরি করে কীভাবে পোষায় তোর? গোয়ারের মত বিয়ে থা পর্যন্ত করলি না মেয়েটাকে মানুষ করবি বলে। হৃত্বিকা কি বিয়ে করেনি? বিয়ের আগে সেও তো অথৈকে দেখেছে। তোর এত অনিহা কিসে বিয়ের জন্য?”
“আমি কি একবারও বলেছি অথৈয়ের জন্য আমি বিয়ে করছি না?” শান্ত গলায় বলে বিস্তৃকা।
মিশুক চুপ হয়ে যায়। দীর্ঘ কিছু মুহূর্ত বয়ে যায় এভাবে। তারপর আস্তে আস্তে টেলিফোনের ওপাশ থেকে মিশুক বলে, “আমরা অনেক সময়েই নিজের জন্য পারফেক্ট মানুষটাকে চিনতে দেরি করে ফেলি বিস্তৃকা। আর যখন চেনা হয়, তখন পৃথিবীই চায় না তারা কাছে থাকুক.....” একটু থেমে যোগ করে, “আমি জানি দীপ্তকে তুই পাগলের মত ভালবাসতি। বাট, সাম হাউ, হি হ্যাজ টু গো... আর প্র্যাক্টিকেল সেন্সে চিন্তা করতে গেলে একটা সীমাবদ্ধ মানুষের সাথে সংসার করার চিন্তা করাটা যতটা আবেগের মত লাগে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কঠিন। আম্মার কিংবা আমার সিদ্ধান্তের কারণে.....”
“ভাইয়া!” থামিয়ে দেয় বিস্তৃকা, “আমি তো কাউকে দোষ দিচ্ছি না। আম্মা কিংবা তুই কেন নিজেদেরকে অপরাধী ভাবছিস? নিজের মেয়ে কিংবা ছোটবোনের সব রকম ভাল দেখার অধিকার তোদের আছে। আমি থাকলেও হয়ত সেটাই করতাম যেটা আম্মা কিংবা তুই করেছিস। দীপ্তর পা নেই। এমন ছেলের সীমাবদ্ধতা হাজারটা থাকবে। ওর জীবনের সাথে নিজের জীবন জড়ানোর চিন্তাটা এক অর্থ সত্যিই খুব বড় পাগলামো হতে পারে আমার জন্য। কিন্তু তোরা আমার ভালই তো চেয়েছিলি। সেজন্যই তো বিয়েটা হয়নি আমাদের। আমি তোর ওপর রাগ করে নেই, না আম্মার ওপর।”
“তাহলে বিয়ে কেন করছিস না?” মিশুক অসহায়ের মত প্রশ্ন করে।
“ঐ যে একদিন বলেছিলাম, দীপ্ত চলে যাওয়ার সাথে সাথে আমার সূর্যটাও নিয়ে চলে গেছে। এখন আর খুব একটা আলোর প্রয়োজন নেই আমার। অথৈকে মানুষ করে যেতে পারলেই শান্তি। আর আম্মাকে তো দেখে রাখছিই। ব্যস, আমার ষোলআনা হিসেব কষা হয়ে গেছে।” বিস্তৃকা জোর করে হাসি ফোটায় মুখে।
মিশুক ফোন রেখে দেয় রাগ করে।
বিস্তৃকা মনে মনে গোণার চেষ্টা করে গত পাঁচ বছরে মিশুক ভাই কতবার ফোন করে এই কথাগুলো বলেছে। হিসেব এলোমেলো হয়ে আসে ওর। চোখ খুলে তাকায়, কবুতরের খোপটায় অন্ধকার নেমে আসছে। সূর্য ডুবে গেছে। কবুতরগুলো ঘরের ভেতর ঢুকে মৃদু স্বরে গর গর করছে। সন্ধ্যা নামা আলোতে ঘরটার নিচেই জবুথবু মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল অথৈকে। সাদা একটা ফ্রক পরেছে। কিন্তু জামার সামনের দিকে লাল ইটের মাটি আর ময়লা লেগে আছে। ক্লাস ফাইভে পড়ছে এখন মৃত্তিকার মেয়েটা। সারাক্ষণ খেলাধুলা করে বেড়াচ্ছে। তাও মেয়েদের সাথে না। তার সব খেলাধুলা ছেলেদের সাথে। রীতিমত মারামারিও শিখে গেছে। এলাকার সমবয়েসী ছেলেদের সাথে খেলার সময় ঝগড়া লাগলেই ইচ্ছে মত কেঁচে দিতে পারে ঐটুকুন মেয়ে। মারামারি করে এসে সরাসরি ঘরে ঢুকতে পারে না। নানী দেখে ফেললেই চিৎকার চেঁচামেরি শুরু করে দেবে। এরচেয়ে ভাল ছোট খালার কাছে এসে বসে থাকা।
“কিরে? আজকেও মারামারি করে এসেছিস?” ভ্রু কুঁচকে তাকালো বিস্তৃকা।
মাথা ওপরে নিচে করলো মুখ কালো করে, “হু। কিন্তু আমার দোষ নাই। রাব্বির দোষ। ও বৌ ছি খেলার সময় আমাকে ধাক্কা দিয়ে ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছে।”
“তারপর? উঠে গিয়ে মার লাগিয়ে এসেছিস?”
আবারও একই কথা তার, “হু। আমার দোষ নাই খালামণি। রাব্বির একটুও সাহস নাই। মারতে গেলেই কান্না কাটি শুরু করে দেয়! ঠিকমত ঘুষিও দিতে জানে না! মারতে গেছি, হাউ মাউ করে কান্না শুরু। বেশি মারি নাই এইজন্য। দুই তিনটা কিল দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছি। তুমি সাথে আসো। নাইলে নানী ঘরে ঢুকতে দিবে না। জামা দেখছো না? কি ময়লা হয়ে গেছে? রাব্বির দোষ সব। ও না ফেলে দিলে এরকম ময়লা হতো না!” মুখ ভার করে বলে অথৈ।
ফিক করে হেসে ফেলে বিস্তৃকা। অথৈয়ের কথা শুনে দীপ্তর কথা মনে পড়ে যায়।
ভার্সিটিতে ভর্তির সময় এক বছর বাদ গিয়েছিল বিস্তৃকার। পরীক্ষা দিতে পারেনি সেবার অসুখ হওয়াতে। পরের বছর দীপ্তর সাথেই পরীক্ষা দিয়ে টিকেছিল। ডিপার্টমেন্ট আলাদা। রিক্সায় করে এক সাথেই ভার্সিটিতে যাওয়া হতো। দেখা যেত একসাথে রিক্সাতে উঠলেই দীপ্তর ফর্সা মুখটা কেমন যেন লাল হয়ে যাচ্ছে। বিস্তৃকা থেকে সামান্য সরে বসত রিক্সায়। কাঠ হয়ে থাকতো যতক্ষণ না রিক্সা ভার্সিটিতে যাচ্ছে। পুরো রাস্তা নতুন জামাইয়ের মত বসে থাকে বিস্তৃকার পাশে।
বিস্তৃকা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে বলে, “তোর চেহারার এই অবস্থা কেন? মনে হচ্ছে মেয়ে মানুষের মত লজ্জায় মরে যাচ্ছিস?”
আমতা আমতা গলায় উত্তর দেয় দীপ্ত, “ন-না! মানে তুমি সাথে আছো, তাই আরকি। কে না কে আবার দেখে ফেলে!”
“আশ্চর্য! পালিয়ে প্রেম করতে যাচ্ছি নাকি তোর সাথে? নাকি বিয়ে? ক্লাস করতে ভার্সিটিতেই না যাচ্ছি! এতে এতো লজ্জা পাওয়ার কি আছে? জীবনে কি এই প্রথম আমাকে দেখছিস নাকি?”
“আ-আরে ন-না, সেটা না। তুমি পাশে উঠলেই কেমন জানি লাগতে থাকে...” লাজুক মুখে বলে দীপ্ত।
সরু চোখে তাকায় বিস্তৃকা, “কি রকম লাগতে থাকে শুনি?”
“বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগে।” দীপ্ত লাল হয়ে যায়।
“থাপ্পর চিনিস?” চোখ পাকিয়ে বলে বিস্তৃকা।
“ক-কেন? থাপ্পরের কথা কেন আসছে?” শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকায় দীপ্ত। বিস্তৃকার হাতে আগেও অনেক মারধোর খেয়েছে। তাই এ মেয়ের ওপর ভরসা করা যায় না। ক্রাচ দুটো শক্ত করে হাতে ধরে রাখে। অবস্থা বেগতিক দেখলেই লাফ দেবে রিক্সা থেকে।
“এক থাপ্পরে তোর জামাইগিরি ছাড়িয়ে দেবো! চুপচাপ ভাল ছেলের মত মুখটা ঠিক করে সোজা হয়ে বসে থাক।” বিস্তৃকা কঠিন মুখে বলল।
দীপ্ত মুখে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চরিত্র করে যেতে থাকে সাধ্যমত। কিন্তু ব্যাপারটা কেন যেন সম্ভব হয় না।
ভার্সিটির কাছাকাছি আসা মাত্র দীপ্ত রিক্সা থামিয়ে বিস্তৃকাকে গম্ভীর মুখে বলত, “তুমি এখন নেমে যাও। আর সামনে একসাথে গেলে সবাই তোমার আমার নামে কানাকানি শুরু করে দেবে।”
বিস্তৃকা হা হয়ে বলল, “কেন! কি বলবে?”
“বলবে যে আমরা প্রেম করে বেড়াচ্ছি। ওটা ঘরের বিষয়। লোক দেখাতে ইচ্ছে করে না।” সরল মুখে উত্তর দেয় দীপ্ত।
“কিহ্!” বিস্তৃকা ভ্রূ কুঁচকে তাকায়, “আমি তোর সাথে প্রেম করি?”
“নাহলে রিক্সায় আসো কেন আমার সাথে? আমার জন্য টান আছে দেখেই তো। যাহোক, কথা সেটা না, কথা হচ্ছে আজ হোক কাল হোক বিয়ে হবে, তাই এখন লোক দেখানোর দরকার নাই। তাই নেমে যাও। বিয়ের আগেই জামাইয়ের সাথে ঘুরঘুর করো, ভার্সিটিতে রিক্সায় একসাথে যাও- এসব কথা শোনার প্রয়োজন নাই।”
বিস্তৃকা ধমকে ওঠে, “তাহলে তুই নামিস না ক্যান হতভাগা! তুই নেমে যা! তোর চৌদ্দপুরুষের ভাগ্য যে আমি তোর সাথে রিক্সায় চড়ি। নাম তুই। রিক্সায় উঠে জামাইয়ের মত মুখে রুমাল দিয়ে বসে থাকবেন তিনি, আবার ক্যাম্পাস এসে গেলে আমাকে নামিয়েও দেবেন। তোকে আসলে আমার তিনবেলা রুটিন করে থাপ্পর দেয়া উচিত।”
দীপ্ত আহত দৃষ্টিতে তাকায়, “এইভাবে বলতে নাই বিষ্ঠা... বিস্তৃকা। আমি এত ভাল একটা ছেলে, তোমার জামাই হবো- তোমার তো এই আনন্দেও আমার সাথে ভাল ব্যবহার করা উচিত। তোমার ভালর জন্যই তো রিক্সা থেকে নামতে বলেছি।”
“আমিও তোর ভালর জন্য রিক্সা থেকে নামতে বলেছি। এখনই যদি না নামিস, তোর বাকি ঠ্যাঙটাও ভেঙে লুলা করে দেবো!” থমথম মুখে বলে বিস্তৃকা।
তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে রিক্সায় লোহায় গেলে প্রায় সময়েই পাঞ্জাবি কিংবা শার্ট ছিঁড়ে যায় দীপ্তর। সেই ছেঁড়া শার্ট নিয়ে কোনোরকম ক্লাস করে বিকেলে বাসায় ফিরলেই পাশের বাসা থেকে খালাম্মার হুংকার শোনা যায়, “বলি প্রত্যেক দিন ভার্সিটিতে পড়তে যাস, নাকি মারামারি করতে যাস? শার্ট এতো ছিঁড়ে কেন? হ্যাঁ?”
অনুচ্চ স্বরে দীপ্তকে কিছু বলতে শোনা যায়। কিন্তু খালাম্মা তাতে কানও দেন না। চেঁচাতে থাকেন আরো জোরে, “আমার কি কপাল! কি ছেলে পেটে ধরেছি। সারাদিন রাত লাফাঙ্গামি করে বেড়ায়, মারামারি করে। কোনদিন শুনবো মিছিল মিটিং করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে জেল হাজতে বসে আছে!”
দীপ্ত এবারে গলা চড়িয়ে বলে, “কি সব বলেন আম্মা! আমি এসব করতে যাবো কেন!”
খালাম্মা আরো তিনগুণ চেঁচিয়ে প্রায় গলা ভেঙে ফেলেন, “কি ছেলেরে বাবা! মুখে মুখে তর্ক করে! ক্যাম্পাসে গিয়ে এইসব শিখেছিস তাহলে? বেয়াদবি? হ্যাঁ? কোনোদিন দেখবো ক্যাম্পাসের মেয়েদের সাথেও বেয়াদবি করে বেড়াচ্ছিস......”
বিস্তৃকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তখন। দীপ্তর জন্য মায়া লাগে। বেচারাকে ওভাবে রিক্সা থেকে নামিয়ে না দিলেও পারতো। অন্তত শার্ট ছিঁড়তো না। ক্রাচ সামলাবে না শার্ট?
(পরের পর্বে সমাপ্ত)
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১০:৫৮
বদিউজ্জামান মিলন বলেছেন: লেখাটা পড়ার ধৈর্য্য পেলাম না..। গল্প না উপন্যাস এটা? পাঠককে পড়ানোর জন্য আরেকটু কৌশলী হতে হবে লেখককে