![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মাটির মানুষ ভিজলে কাদা হয় না কেন প্রশ্ন জাগে, মানুষ গড়া অন্যকিছুয় আমার শুধু এমন লাগে।
তেপান্তর "ক"
অথৈকে কাছে টেনে নিয়ে ছাদে রাখা বেতের ইজি চেয়ারটায় বসে বিস্তৃকা। সূর্য ডুবে গেছে। মাগরিবের আযান দিয়ে দেবে একটু পরেই। অন্যান্য দিন আযান দেয়ার পরে বাসায় ফেরত আসে অথৈ। আজ আগে ভাগেই চলে এসেছে জামা ময়লা হয়ে গেছে দেখে। যাতে নানীর বকুনি বেশি না খায়। রোখসানা খানম অবসর নেয়ার পর থেকে খিটখিটে মেজাজের হয়ে গেছেন। সবকিছুতেই তাঁর রাগ; অতিষ্ট তিনি সব বিষয় নিয়ে। ঘরের কর্তাব্যাক্তি যেমন রিয়ার্মেন্টের পর হয়ত একেবারে সাধাসিধা নরম মানুষ অথবা খুব বদরাগী মানুষে পরিণত হন, রোখসানা খানম ঠিক তেমনটাই হয়েছেন। মোশতাক আহাম্মেদ বেঁচে থাকলে হয়তো তেমনটাই হতেন। এ সংসার সাগরে ঢেউয়ের ফেনায় যার উঠানে প্রতিদিন লবণের চর পড়েছে- লবণের আধিক্যের তিক্ততা শেষ জীবনে এসে তাঁর থাকবেই। দোষের কিছু নয়।
তবে মাঝে মাঝে রোখসানা খানমের রাগা রাগীটা বাড়াবাড়ির মাত্রায় পৌছে যায়। কঠিন গলায় নির্দয়ের মত বলে বসেন অথৈকে, “এতসব ছোটলোকি, মারামারি বাপের বাড়িতে গিয়ে করতে পারিস না? তুই এই বাড়ির কে? এই বাড়িতে তোর মা ছিল কেবল। তুই না। তুই ঐ বাড়ির মানুষ। শওকতের মেয়ে। তুই যদি মৃত্তিকার মেয়ে হতি সে তোকে ফেলে মরতো না, তোকে নিয়ে যেত সাথে.....”
অথৈ বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে সেই সময়টা। বিস্তৃকা ঘরে না থাকলেই সাধারণত এমনটা বলেন রোখসানা। বিস্তৃকার সামনে বলেন না। ওর সামনে বললেই অথৈকে বুকে চেপে ধরে কোলে তুলে নিয়ে ছাদে চলে যায় মেয়েটা। কথা বন্ধ করে দেয় মাস খানেকের জন্য রোখসানার সাথে। বিস্তৃকা যে এতটা জেদি ধরণের মেয়ে হতে পারে রোখসানা খানমের ধারণা ছিল না কখনো। যদি শুরুতেই বুঝতে পারতেন, প্রথম মেয়ের মত শেষ মেয়ের জীবনেও নিজের ভুল সিদ্ধান্ত চাপানোর দুঃসাহস করতেন না।
মাস্টার্স পড়াকালীন সময়েই দীপ্ত একটা ব্যাংকে ভাল চাকরি পেয়ে গিয়েছিল। পায়ের প্রতিবন্ধকতা আটকাতে পারেনি তাকে। বিস্তৃকা তখন সকাল সন্ধ্যা টিউশনি করে। রোখসানা খানমের পেনশনের সময় হয়ে গেছে। বিস্তৃকার মাস্টার্স শেষ করতে করতে অবসরে চলে যাবেন তিনি। সংসার চালাতে যে মিশুক টাকা পাঠায় না, তা না। বিদেশে গিয়েছে মাত্র একবছর হচ্ছে ও। ঠিকমত সেখানে দাঁড়িয়েই প্রায় নিয়মিত টাকা পাঠাতো বিদেশ থেকে। হৃত্বিকাও সময়ে সময়ে টাকা পাঠাতো রোখসানা খানমের নামে। তিনজন মানুষের সংসার টেনে নেয়ার জন্য খুব অপ্রতুল কিছু ছিল না সেটা। তাও টিউশনি করে বিস্তৃকা ধীরে ধীরে দায়িত্বটুকু বুঝে নেয়া শুরু করেছিল তখন। এরমাঝে দীপ্তর চাকরি হয়ে যাওয়ার পর কেমন যেন দিনের আলোর মত ওর সম্পর্কটা স্পষ্ট একটা মাত্রা পেতে শুরু করে। এতদিনের খেলাচ্ছলে দীপ্তর বারংবার বলতে থাকা বিয়ের কথাগুলো যেন হঠাৎ করেই খুব অর্থবহ আর সত্যি হয়ে যায়। বিস্তৃকা হয়তো সেভাবে দীপ্তকে কখনো ভেবে দেখেনি, কিন্তু অন্য কাউকেও কোনোদিন সেই স্থানে চিন্তা করেনি। জায়গাটা সব সময়েই খালি ছিল। অথৈ কেজিতে পড়ছে তখন। তাকে নিয়েই সব চিন্তা বিস্তৃকার।
দীপ্ত চাকরি পেয়ে একদিন সন্ধ্যা নামার একটু আগে ছাদে এসেছিল। বিস্তৃকা দড়িতে দেয়া কাপড়গুলো নামাচ্ছে। বাতাস হচ্ছে অনেক। সূর্যটা প্রায় ঢেকেই গেছে মেঘের আড়ালে। বৃষ্টি আসবে মনে হয়। ক্রাচের মৃদু খট খট শব্দ তুলে সিঁড়ি ঘরের মুখে এসে দাঁড়ালো দীপ্ত। বিস্তৃকা কাপড় তোলায় ব্যস্ত। বাতাসে ছাদের ওপরেও গড়াচ্ছে কাপড়। দীপ্ত যে এসেছে দেখতে পায়নি। গলার ওড়নাটা মাফলারের মত প্যাঁচ দিয়ে ঝুঁকে কাপড় তুলছিল।
পেছন থেকে সামান্য কাঁশল দীপ্ত, “বিস্তৃকা?”
ফিরে তাকালো, “কি?”
“ব্যস্ত নাকি?”
“কাপড় নিচ্ছি দেখতেই তো পাচ্ছিস।” মুখ ফিরিয়ে আবার কাপড় তুলতে লাগলো। পাটিতে লাল মরিচ শুঁকাতে দিয়েছিল। বাতাসে ছাদের ওপরে ছড়িয়ে গেছে। ঝাড়ু এনে এক জায়গায় করা ছাড়া উপায় নেই।
গলা খাকারি দিল আবার দীপ্ত, “ইয়ে, একটু কথা ছিল। শুনবে?”
“বলতে থাক। কান খোলা আছে। চিলেকোঠা থেকে একটু ফুল ঝাড়ুটা এনে দিস তো।”
চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসালো দীপ্ত। ভারি ল্যান্সের চশমা। নাক ঘামলে কাঁচের ভারে চশমাও পিছলে নেমে আসে নিচে। ইতস্তত মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর চিলেকোঠার ঘরটার দিকে হাঁটতে লাগলো। ঝাড়ু এনে দেবে বিস্তৃকাকে। দরজা খোলাই আছে। ভেতরে খালি চৌকি আর একটা টেবিল রাখা। কোনো চেয়ার নেই। ময়লা জমে আছে। শলার ঝাড়ু, ফুল ঝাড়ু দুটোই রয়েছে। বালতিও আছে। অনেকদিন আগে এই ঘরটাতেই বিস্তৃকার বড় বোন গলায় ফাঁস খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। দীপ্ত ঝুঁকে ঝাড়ুটা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক এই সময়টাতেই লাশটা পেয়েছিল ওরা। অথচ এখন কোথাও সেই লাশ কিংবা মানুষটার বিন্দু মাত্র ছাপ নেই। যেন কেউ কখনো এখানে মারা যায়নি। স্থির, নীরব হয়ে পড়ে রয়েছে সব। জড় পদার্থের মত।
বাতাসের গতি বাড়তে আরম্ভ করেছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে বেশি দেরি নেই। তাড়াতাড়ি ঝাড়ুটা এনে বিস্তৃকার দিকে বাড়িয়ে দিল, “নেও।”
বিস্তৃকা কোনো কথা না বলে এক দৌড়ে কাপড়গুলো নিচে গিয়ে রেখে এলো। দীপ্ত দাঁড়িয়ে রয়েছে ছাদে। দড়িতে আর কাপড় নেই। কেবল মরিচগুলো নিচে পড়ে আছে। দীপ্তর অস্বস্তি লাগছে। বিস্তৃকাকে কথাগুলো কীভাবে বলতে ভেবে পাচ্ছে না। যতই গুছিয়ে নিচ্ছে, ততই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
খানিক বাদেই বিস্তৃকাকে দেখা গেল বড় একটা এলুমিনিয়ামের চারকোনা বিস্কিটের টিন হাতে করে নিয়ে এসেছে মরিচ তোলার জন্য। এসে কোনো কথা না বলেই ঝাড়ু দিয়ে দ্রুত মরিচগুলো এক জায়গায় করে ফেলতে লাগলো। এক জায়গায় করেই মরিচ তুলে ঢুকিয়ে রাখছে টিনের মধ্যে। পাটির ওপরে বেছানো মরিচগুলোও তুলে নিলো। পাটি উঠিয়ে ঝেড়ে টেরে গুটিয়েছে সবে, ঠিক তখনই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামা শুরু হয়ে গেল। আকাশ অন্ধকার হয়ে গেছে একদম। বিস্তৃকা তৎক্ষণাৎ মরিচের টিন, পাটি আর ঝাড়ু নিয়ে এক দৌড়ে চিলেকোঠার ঘরটায় ঢুকে গেল খোলা দরজা দিয়ে। দীপ্ত নড়েনি। জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তখনো। কয়েক মুহূর্তেই ভিজে নেয়ে গেল দীপ্ত। চিলেকোঠার ঘরটা থেকে বিস্তৃকা চেঁচিয়ে ডাকছে তাকে, “দীপ্ত? এই দীপ্ত? ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন খাম্বার মত! এখানে আয়। ভিজে গেলি তো। শিলা পড়ছে দেখছিস না? মাথা ফাটাবি নাকি?”
দীপ্ত যেন ঘোরের মধ্যে আছে। অন্ধকার হয়ে আসা ছাদটা জুড়ে কেমন যেন একটা ধূসর অলৌকিক আলো। তার মাঝে মুষলধারে বৃষ্টির সাথে সাদা সাদা পিং পং বলের মত শিলা পড়ছে সমস্ত ছাদে। শিলা পড়েছি বলের মত লাফিয়ে উঠছে, ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছে। ছিটকে উঠছে খণ্ড বিখণ্ড হয়ে। ওর গায়েও শিলার পড়ছে.... দীপ্ত মন্ত্রাবিষ্টের মত তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। হাজার হাজার শিলা যেন ঝাপিয়ে নেমে আসছে, আকাশ ভেঙে চুরে সব যেন কাঁচের সাদা টুকরো পড়ে যাচ্ছে। মঞ্চের বড় পর্দা যেন শতচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর ওপর আছড়ে পড়েছে......
“দীপ্ত? কি হল? শুনতে পাচ্ছিস না?” বিস্তৃকা ভয়ার্ত স্বরে ডাক দিল এবার। প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে মাথার খুব কাছ দিয়ে যেন। মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে বিস্তৃকার, “দীপ্ত?”
ঘোরের মাঝে যেন বিস্তৃকার ডাকটা শুনতে পেল ও। কেমন যেন বিহ্বল মনে হল তাকে। কিন্তু পা টেনে টেনে ক্রাচে করে ঠিকই এগিয়ে আসতে লাগলো চিলেকোঠার দরজাটার দিকে।
বিস্তৃকার মনে হচ্ছে যেন হাজার বছর লাগিয়ে ছেলেটা এগিয়ে আসছে। ওর পেছনে পুরো আকাশ চিড়ে বিদ্যুতের নীল শিখা ছুটে যাচ্ছে। অনেক দূরের মাঠের দিকের একটা আমগাছের ওপর বাজ পড়েছে এখান থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কালো ধোঁয়া মিশিয়ে লকলকে আগুণের শিখা উঠেছে। অস্ফুট একটা শব্দ করে বিস্তৃকা ভয়ে পিছিয়ে গেল। গাছটায় আগুন লেগে যাওয়াটা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে ও। টেবিলটার কিনার আঁকরে ধরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়েছে মেঝেতে। জীবনে এই প্রথম সে এভাবে বাজ পড়ে ভেজা গাছেই আগুন ধরে যেতে দেখল। দীপ্তর জন্য ভয়ে ভেতরটা শুঁকিয়ে গেছে মুহূর্তেই। সেই সাথে আরো একটা কারণ বুকের ভেতর ভয়টাকে আরো পাঁকা করে দিয়েছে তার। গাছটায় আগুণ ধরার ঠিক ঐ সময়টাতেই কেন যেন মনে হল ওর ঠিক পেছনে যেখানে বড় আপা ফাঁস খেয়েছিল, ওখানেই আগের মত লাশটা ঝুলছে পেন্ডুলামের মত!
দীপ্ত দরজাটা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্মিত মুখে তাকালো আবছা অন্ধকার টেবিলের নিচে বিমূঢ়ের মত গুটিয়ে গিয়ে বসে থাকা বিস্তৃকার দিকে। “কি হল? ভয় লাগছে নাকি তোমার? একটু বাজ পড়ার শব্দে এতো ভয় পেতে হয়? কি দারুণ শিলা বৃষ্টি হচ্ছে তাই না?” দীপ্ত খসখসে গলায় বলল। সে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে গেছে ঘটনার আকস্মিকতায়। দরজা দিয়ে ঢোকার শেষ মুহূর্তে খেয়াল করেছে মাঠের আম গাছটায় আগুন জ্বলছে বাজ পড়াতে। বিশাল ডালপালা নিমেষেই গায়েব হয়ে গেছে বাজ পড়ে।
বিস্তৃকা উত্তর দিল না। শক্ত হয়ে বসে আছে ওখানেই। দীপ্ত কয়েক মুহূর্ত বোকার মত দাঁড়িয়ে রইল। কি করবে বুঝতে পারল না। তারপর ক্রাচে ভর করে এগিয়ে এসে টেবিলটার কাছে দাঁড়ালো। ক্রাচ দুটো টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে ঝুঁকে টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ল। গিয়ে বসল বিস্তৃকার পাশে।
বিস্তৃকা ভীত চোখে সামনের খোলা দরজা দিয়ে ছাদটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রবল বর্ষণ আর শিলার আছড়ে পড়া দেখছে। আকাশটায় ধূসর কালো রঙের সাথে খানিকটা সবুজ-নীলাভ রঙও যেন মিশে রয়েছে। অদ্ভুত লাগছে দেখতে। যেন ঠিক পৃথিবী নয়। অন্য কোনো জায়গা। তীব্র কন কনে ঠাণ্ডা বাতাস হুড়মুড় করে ঢুকছে খোলা দরজা দিয়ে। বাতাসের ঝাপটায় দরজাটা খট খট শব্দে বাড়ি খাচ্ছে দেয়ালের সাথে।
“তোমার ভয় লাগছে বিস্তৃকা?” দীপ্ত হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল।
উত্তর দিল না সে।
“তোমার ভয় লাগলে আমার হাত ধরে বসে থাকতে পারো। মানুষ ভয় পেলে অন্য কারো হাত ধরে বসে থাকলে ভয় কেটে যায় আস্তে আস্তে।” দীপ্ত কিছু না ভেবেই কথাটা বলল। বাহিরের ঝড়ের তাণ্ডব দেখছে অবাক চোখে। আকাশ খুব দ্রুত বদলে যায়। কয়েক মিনিট আগেও বোঝা যায়নি এতটা ভয়ংকর রকমের ঝড় আসবে।
হঠাৎ টের পেল বিস্তৃকা খুব শক্ত করে ওর হাতটা চেপে ধরেছে। বড় বড় নখের তীব্র চাপে দাগ বসে যাচ্ছে হাতের ওপর। দীপ্ত কিছু একটা বলতে নেবে ওকে, তার আগেই ফিসফিস করে বিস্তৃকা বলে উঠল, “আমার খুব ভয় লাগছে দীপ্ত। আমার কেন যেন একটু আগেই মনে হয়েছিল বড় আপার লাশটা ঠিক আমার পিঠের পেছন দিকটায় ঝুলছে.....”
দীপ্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিস্তৃকার দিকে। মেয়েটা ভয়ে কুঁকড়ে গেছে নিজের ভেতরেই। দীপ্তর শার্টের হাতাটা খামচে ধরে কাঁপছে অপ্রকৃতস্থের মত। চোখে মুখে ভয়ের স্পষ্ট ছাপ ফুটে রয়েছে। দীপ্তর কাছে আশ্রয় চাইছে যেন ভীত হরিণীর মত মেয়েটা।
দীপ্তর ভেতর খুব বড় কিছু একটার ওলট পালট হয়ে গেল সেই সময়। জানেনা উচিত হচ্ছে কিনা, কেন করছে তাও জানে না- শুধু টের পেল সে টেবিলের নিচে বসে দুই হাতে বিস্তৃকার কাঁপতে থাকা শরীরটাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলো পরম মমতায়। মেয়েটা ঠিক পাঁচ বছর আগের দিনটার মত ওর বাহুতে মুখ চেপে ধরে কাঁপছে অসম্ভব একটা ভয়ে।
পৃথিবীতে অলৌকিক বলে কিছুই নেই, সমস্তটাই লৌকিকতায় ভরা। তবু দীপ্তর মনে হয়েছিল সেদিন অবাস্তব একটা পৃথিবীতে ছিল সে বিস্তৃকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটা পাগলের মত বিড়বিড় করে বলেছিল ওকে সেইদিন, “আ-আমার সাথে সাথে থাকিস দীপ্ত। আমার অনেক ভয় করে....”
দীপ্ত ফিসফিস করে উত্তর দিয়েছিল, “আমি কোথাও যাব না বিস্তৃকা.....”
“তুই সেদিন জানি কি বলতে চেয়েছিলি?” বিস্তৃকা রিক্সায় যেতে যেতে দীপ্তর দিকে তাকায়। “ঝড় বাদল এসে তো মাঝখান দিয়ে সব বন্ধ করে দিল। আর শোনা হল না কথাটা।”
সকালে ভার্সিটিতে যাচ্ছিল দুজনেই। দীপ্তর অফিস আছে। ভার্সিটিতে কিছু কাগজ সত্যায়িত করে নিয়ে অফিসে চলে যাবে। যাওয়ার সময় বিস্তৃকাকে ক্যাম্পাসে নামিয়ে দেবে।
“এ? কি?” কথাটায় প্রথমে কান দেয়নি দীপ্ত। যেতে যেতে রাস্তার পাশের নার্সারির দিকে তাকচ্ছিল বার বার। মানিপ্লান্টের চারা থাকলে নেয়া দরজা।
“ঐ যে, সেদিন বিকেলে ছাদে আমাকে কি যেন বলতে চেয়েছিল? পরে তো বললি না।” মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল বিস্তৃকা।
সাথে সাথে লাল হয়ে গেল মুখটা দীপ্তর। ফর্সা মুখ আর কানগুলো লাল হয়ে গেছে। আমতা আমতা করতে লাগল, “ন-না! ক-কিছু না তো!”
“কিছু তো বটেই। ঝেড়ে কেঁশে ফেল এখন।”
মাথা নাড়ল দীপ্ত, “আরে ধুর, কিছু না। এমনি কথা বলতে চেয়েছিলাম তোমার সাথে। আর কিছু না।”
“আশ্চর্য! এতো লুকাছাপার কি আছে! তুই তো স্কুলেই ভাল ছিলি। কথা বার্তা সব হতো স্ট্রেইট। যা বলার ঠাস করে বলে দিতি। এখন দিন দিন এরকম মেয়েলি টাইপের হয়ে যাচ্ছিস কেন? আমার সাথে তোর এত ফর্মালিটি কিসের?” বিরক্ত গলায় বলল বিস্তৃকা।
ঢোক গিলল দীপ্ত। “আ-আসলে সে রকম কোনো ব্যাপার না...”
“তো কি রকম ব্যাপার? আমাদের দীপ্ত সাহেব যিনি এক কালে মঞ্চ নাটক করে পাড়া কাঁপিয়েছেন, গান গেয়ে, আবৃত্তি করে হাজারো রমণীর রাতের ঘুম হারাম করেছেন, ইন্টার ডিপার্টম্যান্ট ডিবেটে শেষ্ঠ বক্তা হয়েছেন, কবিতা লিখে পুরষ্কারও পর্যন্ত জিতেছেন- তিনি কিনা আমার সাথেই কথা বলার সময় কথা খুঁজে পান না! একটা কথা বলতে গেলেও চৌদ্দবার চিন্তা করেন যে আমি ধোলাই টোলাই দেব কিনা!” হতাশার সুরে বলল বিস্তৃকা, “তুই অনেক বদলে গেছিস দীপ্ত!”
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত বিস্তৃকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল দীপ্ত। কোন কথা বলল না।
“কি হল? এরকম ছাগলের মত তাকিয়ে আছিস কেন আমার দিকে? আমি কাঁঠাল পাতা না!”
দীপ্ত হেসে ফেলল হঠাৎ। আপন মনেই মাথা নাড়তে নাড়তে হাসছে। বিস্তৃকা অবাক হয়ে বলল, “হাসছিস ক্যান! আশ্চর্য!”
দীপ্ত উত্তর না দিয়ে ওর ব্যাগটার চেইন খুলে ভেতরে হাতড়ে হাতড়ে একটা সবুজ বল পয়েন্ট কলম আর একটা বই বের করল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “ছবির দেশে, কবিতার দেশে”। মলাটের ওপর দেখা যাচ্ছে কোন লাল চুলের তরুণী চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। বিস্তৃকা সপ্রশ্ন চোখে তাকালো ওর দিকে। কিন্তু দীপ্ত কিছু না বলে বইটা খুলে এক মনে দ্রুত পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলো আর কি যেন দাগাতে লাগলো সবুজ কালিতে। বিস্তৃকা দেখার চেষ্ঠা করতে লাগলো উঁকি দিয়ে। কিন্তু রিক্সার ঝাঁকি আর এক হাত দিয়ে বইটাকে আড়াল করে রেখেছে বলে দেখতে পাচ্ছে না সে। “কি করছিস?”
উত্তর দিচ্ছে না দীপ্ত। কি যেন খুঁজছে পৃষ্ঠাগুলোয়। না পেলে দ্রুত উলটে চলে যাচ্ছে পরের পৃষ্ঠায়। আবার পাওয়ার সাথে সাথেই দাগিয়ে ফেলছে। দীপ্তকে যে বিস্তৃকা একটা প্রশ্ন করেছে বেমালুম ভুলে গেছে যেন। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল। ওদের রিক্সাটা ক্যাম্পাসে চলে এসেছে। দীপ্তর কাজ রেজিস্ট্রার ভবনে। বিস্তৃকাকে ওর ফ্যাকাল্টিতে আগে নামিয়ে দিতে এলো।
বিস্তৃকা কোলের ওপর ফেলে রাখা ব্যাগটা নিয়ে ওড়না ঠিক ঠাক করতে করে সাবধানে নেমে গেল রিক্সা থেকে। দীপ্ত তখনো বই দাগানোয় ডুবে আছে। ব্যস্ত গলায় বলল তাকে, “যা তাহলে। কাজ শেষ করে তো অফিস যাবি নাকি? মাস্টার্সের ক্লাস করবি কীভাবে? এরকম চাকরি করে করে ক্লাস করা যায়?”
ঠোঁট ওল্টালো দীপ্ত, “ম্যানেজ করে নেব। সমস্যা হবে না আশা করি।” ওর দিকে তাকালো না, এখনো চশমার আড়ালে চোখ দুটো ঘুরছে পৃষ্ঠার ওপর।
“ঠিক আছে। গেলাম।” ঘুরে চলে যেতে নিলো বিস্তৃকা, কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে নিয়েছে।
“দাঁড়াও! দাঁড়াও!!” পেছন থেকে ডেকে উঠল দীপ্ত। রীতিমত চিৎকার দিয়ে ফেলেছে। আশেপাশের বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী অবাক মুখে তাকাতে লাগলো।
রিক্সার কাছে ফিরে আসল আবার বিস্তৃকা, সামান্য কুঁচকে গেছে ভ্রূ দুটো বিরক্তিতে, “কি?”
সুনীলের বইটা এগিয়ে দিল ওর দিকে, “এটা নাও।”
বইটা হাতে নিল অবাক মুখে, “আমি কি করবো এই বই দিয়ে? কম করে হলেও দশবার পড়েছি।”
“বিকেলে আমি অফিস থেকে ফেরার সময় আবার আসবো তোমাকে নিতে। তখন না হয় দিয়ে দিও। ততক্ষণে এগারোবারের মত একটা রিভিসন দিয়ে দিও।” সরল হাসি হাসল, “যাই?.... মামা, চলেন, রেজিস্ট্রার ভবনে যাব।” রিক্সাওয়ালার কাঁধে হাত দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে বলল।
বই হাতে নিয়ে বিস্তৃকা দাঁড়িয়ে আছে। রিক্সাটা চলে যাচ্ছে। ফিরে তাকাচ্ছে না ছেলেটা একবারও। মোড় ঘুরতেই হারিয়ে গেল রিক্সা।
বিস্তৃকা ঘুরে হাঁটতে লাগলো ক্লাসের দিকে। তিন তলায় ক্লাস। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সিঁড়ির জানালাগুলো দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশে মেঘ করেছে অনেক। বৃষ্টি আসবে। এমনিতেই ইদানীং বৃষ্টি হচ্ছে খুব। ছাতা ছাড়া চলাফেরা করা যায় না। সঙ্গে একটা ছাতা ভাঁজ করা থাকে সব সময়। ক্লাসে এসে দেখে কেউ নেই। আসেনি এখন ক্লাস করতে। আগে ওদের ক্লাসে অনেক মেয়ে ছিল। অনার্সের পর থেকে মেয়ের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমে গেছে। বিয়ের পর পড়াশোনা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে। খাঁটি ঘর গেরস্থি নিয়ে ব্যস্ত সবাই। বাচ্চাও হয়ে গেছে কয়েক জনের। হঠাৎ হঠাৎ কেউ ভার্সিটিতে আসে। চোখ মুখ শুকনো হয়ে থাকে। যেন বিয়ের পর কোনোমতে মাস্টার্স ডিগ্রীটা নিয়ে সাবধানে বেরিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে। তাদের দিতে- নিয়ে যেতে সব সময় সাদা কালো রঙের দামী গাড়ি আসে ক্যাম্পাসে। কখন শ্বশুরবাড়ীর ড্রাইভার, কখনো স্বামী নিজেই আসে সেই গাড়িতে।
বিস্তৃকা মাঝামাঝি একটা বেঞ্চে ব্যাগটা রেখে বসে পড়ল। হাতে দীপ্তর দেয়া সুনীলের “ছবির দেশে, কবিতার দেশে” বইটা। অলস দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল বইটার মলাটের ছবিটার দিকে। তারপর ওল্টালো। আগেও অনেকবার পড়েছে বইটা। কাহিনী প্রায় মুখস্ত। সুনীলের আমেরিকা আর ফ্রান্স ভ্রমণের কাহিনী নিয়ে লেখা ছিল। সেই সময় পরিচয় হওয়া মার্গারিট ম্যাতিউ নামের ফরাসী এক মেয়ের সাথে তার প্রেম ছিল। কাহিনীর অর্ধেক অংশ মার্গারিট ম্যাতিউকে নিয়ে। তার মৃত্যু বা রহস্যময় অন্তর্ধানের পর বিচ্ছিন্ন সুনীলকে নিয়ে বইটা আরো অনেকদূর এগিয়েছিল। কিন্তু পড়তে ভাল লাগেনি আর। হয়ত সুনীল আর মার্গারিটের ভালবাসার গল্পটা অতটুকেই শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে। আপন মনেই বইয়ের পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলো বিস্তৃকা। রিক্সায় বসে সবুজ কলম দিয়ে দীপ্ত কি দাগাচ্ছিল সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টেই যাচ্ছে। কোথাও কোনো সবুজ দাগ এখনো পায়নি। ক্লাসের ভেতর আলো কম। বাহিরে এর মাঝেই টিপ টিপ করে বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে। জানালার দিকে ঘেষে বসলো আলোর জন্য। কারেন্ট নেই।
জানালার কাছে এসে বসতেই প্রথম খেয়াল করল একটা পৃষ্ঠায় সবুজ কালিতে একটা শব্দে শুধু একটা অক্ষরের নিচে দাগ দেয়া। লাইনটা হচ্ছে, “যে কবিতা পড়ে না, তার বেঁচে থাকা উচিত না।” কবিতা শব্দটার ‘বি’এর নিচে আন্ডারলাইন করেছে দীপ্ত। লাইনের পাশে ১ লেখা।
এরপর অনেকগুলো পৃষ্ঠা বাদ গেছে। অনেকগুলো পাতা ওল্টানোর পর আবার একটা সবুজ দাগ পাওয়া গেল। “ত্রিস্তফ এর মধ্যে এত টাকা জমিয়ে ফেলেছে যে দেশ থেকে সে আনিয়েছে তার স্ত্রীকে।” স্ত্রী অক্ষরটার নিচে সবুজ দাগ দেখা। পাশেই লেখা ২।
এর দুয়েক পৃষ্ঠা বাদেই আবার একটা লাইন, “এক রেস্তোরাঁর মধ্যে দাঁড়িয়ে সিলিন চিৎকার করে বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি একজন কাওয়ার্ড!” কাওয়ার্ড শব্দের ‘কা’এর নিচে দাগ। পাশে ৩ লেখা।
সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে গেল পুরো ব্যাপারটা বিস্তৃকার কাছে। দীপ্ত অক্ষর বেছে বেছে ক্রমিক নাম্বার নিয়ে নিশ্চয় কোনো কথা লিখে গেছে তার জন্য। কারণ প্রথম তিনটা অক্ষর নিয়ে যা দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে- বিস্ত্রীকা, ভাল করে বানান লিখলে বিস্তৃকা নামটা হয়!
বিস্তৃকা সোজা হয়ে বসল, দ্রুত হাতে পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছে, তীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে দেখছে শব্দগুলো।
একে একে পাওয়া যাচ্ছে লাইন সব।
“.....এবং ছাপানো কাব্য আলকুল্স (৪) আমার পকেটে/ তার কণ্ঠস্বর মিউজিয়ামে (৫).....” থেকে ‘আমি’।
“মার্গারিট বললো, আমার বাড়িতে তোমাকেও (৬) কি নিয়ে যাওয়া উচিত নয়? বেশি দূরে নয়, ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা।” থেকে ‘তোমাকে’
“ভালোবাসি (৭) মেঘ, যে-সব মেঘেরা ভেসে যায়, ঐ ওখানে.... ঐ সেখানে..... বিস্ময়ময় মেঘেরা!”
লাইনটা দাঁড়ালো, “বিস্তৃকা আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
বিস্তৃকা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে বইটার পাতার দিকে। ধীরে ধীরে আরো কিছু লাইন পাওয়া গেল। যেগুলো থেকে শব্দ নিয়ে যোগ করলে মোটমাট যা দাঁড়ায়,
“বিস্তৃকা আমি তোমাকে ভালোবাসি! তুমি পাশে না থাকলে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। আমাকে গুছিয়ে দেয়ার জন্য হলেও তোমাকে লাগবে। তুমি আশাপাশে থাকলেই শুধু মনে হয় আমার চারপাশে হাজারটা চড়ুই পাখি উড়ছে কলকাকুলিতে পৃথিবী ভরিয়ে দিয়ে। আমি বিস্মিত হয়ে সেই আকাশটা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছি!”
বিস্তৃকা বইটা বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দিল। জানালার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে বাহিরে অঝোর ধারায় হতে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। ক্যাম্পাসের বাতাবি লেবুর গাছগুলোও সবুজ পাতায় বৃষ্টির পানি পড়ে চিক চিক করছে, দুলছে যেন ঢেউ তুলে। মিষ্টি কাঁচা একটা লেবু লেবু গন্ধ ক্লাসের ভেতর পর্যন্ত চলে আসছে। বিস্তৃকার গায়ে ভেজে বাতাস আর বৃষ্টির ছটা লাগছে। নড়ছে না তবুও। এক গ্রিলের সাথে মুখটাকে চেপে ধরে তাকিয়েই আছে বাহিরের রাস্তাঘাট আর গাছপালার দিকে। ছাতা নিয়ে দৌড়াচ্ছে দুয়েকজন ছাত্র ছাত্রী। পরতে পরতে যেন বাতাস ছিটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টিগুলোকে।
বিস্তৃকার চোখ হঠাৎ ঝাপসা হয়ে আসে।
বিকেলে রিক্সায় উঠে বসে অনেকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ ছিল। বৃষ্টি নেই। থেমে গেছে। মেঘ সরে গিয়ে শেষ বিকেলের লাল সূর্যটা বেরিয়ে এসেছে। গাছপালা থেকে শুরু করে ভেজা পথঘাট সব কেমন যেন হলদে কমলা রঙের হয়ে গেছে। পথ ঘাটে এতক্ষণে মানুষ বের হয়েছে। রিক্সাটা পানি জমে থাকা রাস্তার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। কথা বলছে না কেউ। না দীপ্ত, না বিস্তৃকা। দুজনেই নীরবে রাস্তার দুইপাশে তাকিয়েছে আছে, একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে না।
কতক্ষণ এভাবে নীরবে কেটেছে খেয়াল নেই কারো। একটা সময় দীপ্ত নীরবতা ভাঙল কাঁশি দিয়ে, “সব ক্লাস হয়েছে তোমার?”
বিস্তৃকা তাকালো না ওর দিকে। কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে “হু” জাতীয় শব্দ করল।
আবার চুপচাপ দুজনেই। সময় বয়ে যাচ্ছে। কেউ কথা বলছে না। রিক্সা ঘুরতে ঘুরতে ওদের কলোনিতে ঢুকে ওদের বাড়ির সামনে চলে এলো। বিস্তৃকা আর দীপ্ত নেমে ভাড়া দিয়ে হাঁটতে লাগলো বিল্ডিঙের দিকে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না এখনো পর্যন্ত। দীপ্ত ক্রাচ নিয়ে সামনে সামনে হাঁটছে। বিস্তৃকা পেছন পেছন। বাসার সামনের ফাঁকা জায়গাটায় অন্য বাসার ছেলে মেয়েগুলো সাত চারা খেলছে। সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে এলো ওরা। পাশাপাশি বাসা, মুখোমুখি দরজা। এই সময়ে বিস্তৃকাদের বাসায় কাজের নতুন মেয়েটা ছাড়া আর কেউ থাকে না। অথৈ ওর ক্লাসের ছেলে মেয়েদের সাথে খেলতে যায়। রোখসানা খানম ফেরেন অফিস থেকে। দরজার পাশের কলিং বেলে চাপ দিয়ে দুজনেই যার যার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। অস্বস্তি লাগছে দুজনেরই।
ভেতর থেকে পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে বিস্তৃকা। কাজের মেয়েটা দরজা খুলতে আসছে। আচমকা ঘুরে তাকালো দীপ্তর দিকে। ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল ছেলেটা। বিস্তৃকার চোখে চোখ পড়তেই সরিয়ে নিল দৃষ্টি। বিস্তৃকা জোরে একটা দম নিয়ে বেশ সহজ গলায় বলার চেষ্টা করল, “সারাদিন কি এই ছেঁড়া পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে অফিস করেছো তুমি? রিক্সা থেকে কীভাবে নামো যে দুদিন পর পরই শার্ট, পাঞ্জাবী ছিঁড়ে ফেলো?”
ক্রাচে ভর করে দেয়ালে পিঠে হেলান দিয়ে দীপ্ত মুখ ঝুঁকিয়ে রেখেছিল। বিস্তৃকার কথাটা কানে যাওয়া মাত্র জমে গেল যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। ছেঁড়া পাঞ্জাবীর দিকে একবারও তাকালো না দীপ্ত, খুব ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো বিস্তৃকার দিকে। চোখে অবিশ্বাসী একটা দৃষ্টি।
বিস্তৃকা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলেটার সামনে সহজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। কিন্তু পারছে না। রীতিমত জ্বরের কাঁপুনি এসে গেছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে মুখ ঘুরিয়ে নিল দরজার দিকে। দীপ্তর দিকে তাকাতে পারছে না।
দীপ্ত স্তম্ভিত মুখে তাকিয়ে আছে। সেই ছোটবেলা থেকে তুই তুই ডেকে আসা মেয়েটা আজ তুমি ডেকে ফেলায় যেন সব ওলট পালট হয়ে গেছে তার ভেতর। অস্পষ্ট গলায় কেবল ডাকল, “কি বললে আমাকে?”
বিস্তৃকা মুখ ঝুঁকিয়ে দরজাটার গায়ে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে। মেয়েটা এখনো দরজা খুলছে না কেন? পেছন দিকে তাকানোর সাহস হারিয়ে ফেলেছে বিস্তৃকা। মেয়েটা এসে দরজা খুলে দিলেই বেঁচে যায় যেন। মনের ভেতর যেন হাজারটা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে নিষ্ঠুরের মত আঘাত করে। বিস্তৃকার প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছে পেছনে তাকিয়ে দীপ্তর মুখটা একটু দেখে। কিন্তু সাহস হারিয়ে ফেলেছে হঠাৎ করেই। সম্বোধনের সীমারেখার দাগ টেনে আচমকাই যেন অন্য একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। আগের সেই মানুষটা নেই। নতুন কেউ।
দীপ্ত আবারো ডাকলো, “বিস্তৃকা?”
খুট করে শব্দ হল দরজা খোলার। বিস্তৃকাদের দরজাটা খুলেছে কাজের মেয়েটা। দরজা খোলামাত্রই বিস্তৃকা এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। দীপ্ত হতভম্ব হয়ে তখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো প্রশ্ন জমা নিয়ে।
বিস্তৃকার সঙ্গে সেই দিনের পর বহুদিন দীপ্তর কথা হয়নি। কেন হয়নি সেটা দীপ্তও জানে না, বিস্তৃকাও জানে না। অপরিচিত মানুষের পরিচয় হলে জড়তা কেটে যায়। কিন্তু পরিচিত মানুষের মাঝে যদি দ্বিতীয়বার পরিচয় ঘটে- সে জড়তা কাটতে বহু সময় লেগে যায়। আর সেটা যদি কোন মেয়ের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘসূত্রীতা বাড়বেই। বিস্তৃকারও বেড়েছিল। একসাথে ভার্সিটিতে আর যেত না। ছাদেও খুব কম উঠতো। দীপ্তকে ছাদে আসতে দেখলেই এক দৌড়ে নেমে চলে যেত বাসায়। সব কথা যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে ফেলেছিল।
যতই দিন যাচ্ছিল, দীপ্তর অস্থিরতা বাড়তেই থাকে। শেষে থাকতে না পেরে জহির রায়হানের “বরফ গলা নদী” উপন্যাসটা অথৈয়ের হাতে দিয়ে বিস্তৃকার কাছে পাঠায় দীপ্ত। গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে আছে, বিস্তৃকা জেগে জেগে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় সেই বইয়ে সবুজ কালিতে দাগানো অক্ষরগুলো জড়ো করে বাক্য তৈরি করতে থাকে। দীপ্ত আবারও চিঠি লিখেছে তাকে সেদিনের মত।
“বিস্তৃকা, কি হয়েছে তোমার, আমাকে কেন এড়িয়ে যাচ্ছো। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব।”
বিস্তৃকা টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে বসে ছিল জানালাটার কাছে। তারপর ভোরের দিকে আবার বাতি জ্বালিয়ে নীল কালিতে একই ভাবে সেই উপন্যাসে কিছু অক্ষর দাগিয়ে দেয়। অথৈয়ের হাতে করে ফেরত পাঠায় দীপ্তর কাছে পরের দিন।
“আমি জানি না আমার কি হয়েছে। আমারও অনেক ইচ্ছে করে তোমার সাথে কথা বলতে। কিন্তু কেন যেন পারি না। তুমি কষ্ট পেও না। আমাকে আরেকটু সময় দাও। আমার একদিনের হঠাৎ সাহস যে আমাকে এতোটা ভীরু বানিয়ে দেবে আমার জানা ছিল না।”
দুজন মানুষের স্থবির সম্পর্ক যখন এগোতে চায় না। তৃতীয় কারো সাহায্য সেখানে অবশ্যই লাগে। নৌকাকে ঘাট থেকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দেয়ার জন্য কারো থাকা লাগে। দীপ্ত-বিস্তৃকার সম্পর্কটাকে নিয়ে তাই পারিবারিক পর্যায়ে আলাপ তুলতে চাইলেন দীপ্তর মা শায়লা পারভিন। এক সন্ধ্যায় আগের দিনগুলোর মতই বেড়াতে এলেন রোখসানা খানমের ঘরে। গল্প করলেন দীর্ঘ সময় ধরে। নানান পারিবারিক আলাপ, সমস্যা নিয়ে কথা হতে থাকলো দুজনের মাঝেই।
রোখসানা খানমের অবসরের সময় হয়ে গেছে প্রায়, তিনি সামান্য চিন্তিত গলায় বললেন, “ স্বামীর চাকরিটা করে এতদিন সংসারটা টেনেছিলাম। এখন তো সেই চাকরির সময়ও ফুরিয়ে এলো। বাকি দিনগুলো কেমন করে কাটবে সেটাই ভাবি মাঝে মাঝে। অফিসের অভ্যাস করতে চাইনি কখনো। পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল। অথচ এখন প্রায়ই চিন্তা করি, অফিস ছাড়া থাকবো কেমন করে? ঘর গেরস্থির অভ্যাস তো সেই কবে হারিয়ে ফেলেছি।”
শায়লা পারভিন সমঝদারের মত মাথা ঝাঁকালেন, “তা ঠিক ভাবী। চাকরি বাকরি যারা করে, ঘরে থাকা আর হয় না তার। দীপ্তর আব্বাকেই দেখেন, গত বছর অবসর নেয়ার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে। সারাক্ষণ বাচ্চা মানুষের মত কিছু না কিছু একটা করার চেষ্টা করতেই থাকে। বেকারত্ব ভাল লাগে না। অফিস নেই দেখে অস্থির হয়ে যায় মানুষটা।”
রোখসানা চোখের চশমাটা খুলে বেড সাইড টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, “অফিসের কাজ করে করে মাথা আর চোখের অবস্থা খারাপ করে ফেলেছি। অবসরে আসলে এই দুটো একটু যা রেস্ট পাবে আরকি। সাইনোসাটিসের দোষ, অনিদ্রা, বাতের ব্যথা, হাজারটা সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছি বুঝলেন ভাবী? এত বছরে আসলে যা বুঝেছি, একা থাকাটা আসলেই অনেক কঠিন ব্যাপার। বিস্তৃকার আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারটার বোঝা যখন কাঁধে এসে পড়লো, ঠিক তখন যতটা অসহায় লেগেছিল, আজও লাগে। সব শক্ত হাতে সামাল দিয়েও কোথায় যেন একটা সুর কাটা পড়েছে বুঝলেন। আপনি তো সবই দেখেছেন এই এত বছর এক সাথে আছি। আমার বড় মেয়েটার মৃত্যুর পর থেকে সব আত্মবিশ্বাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে...... মাঝে মাঝে ভাবনা হয়, আসলে বেঁচে থাকা কাকে বলে? কতটুকু পেলে আমার বলা উচিত, আমি সন্তুষ্ট? আমার অবস্থান, আমার প্রাপ্তি নিয়ে আমি খুশি?” বালিশ সোজা করে পিঠে হেলান দিলেন বিছানার সাথে।
শায়লা পারভিন সব কথা বুঝতে পারছিলেন না রোখসানার। চাকরি বাকরি করা শিক্ষিত মহিলা তিনি। কথা বার্তা স্বাভাবিক ভাবেই উঁচু স্তরের হবে জানা কথা। শায়লা ইতস্তত গলায় বললেন, “ভাবী তো জানেন যে আমার ছেলেটা, মানে দীপ্ত রূপালী ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে?”
“হ্যাঁ। শুনলাম তো। অফিস কেমন লাগছে ওর? সময়ই তো পাই না যে ডেকে জিজ্ঞেস করবো?” কপালের দুপাশ আঙুল দিয়ে টিপে ধরে আছেন। মাথা ব্যথা করছে তাঁর। এর মাঝেই কথা বলে চলেছেন শায়লা পারভিনের সাথে। যদিও কথা বলতে তেমন একটা ভাল লাগছে না। সমান বুদ্ধির মানুষের সাথে কথা বলে আরাম পাওয়া যায়। শায়লা পারভিনের বুদ্ধি শুদ্ধি বা জ্ঞান রোখসানার ধারে কাছেও নেই। এ জন্য আলাপ করে আরাম পাচ্ছেন না। দীপ্তর কথা তোলাতে দায় সারা ভাবে তাই জিজ্ঞেস করলেন কথাটা। সারাদিন অফিসের অডিট নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় কদিন ধরে। ঘরে ফেরার পর থেকে প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন তিন ঘন্টার জন্য। পরে উঠে রাতের খাবার খান। কিন্তু আজকে আর ঘুমাতে পারেননি। শায়লা পারভিন আসার পর থেকে কথা চলছেই, থামার নাম নেই।
“ভালই তো লাগছে দীপ্ত বলে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ- এডজাস্ট হতে সময় লাগবে আরকি।”
“হুম, মন দিয়ে চাকরি করতে বলবেন ওকে। অফিসে লোকজনের আজে বাজে কথায় কান দিতে নিষেধ করে দেবেন। আজকাল এরকম ভাল চাকরি সবাই পায় না। তারওপর দীপ্তর এতবড় ল্যাকিংস থাকার পরেও যখন চাকরি পেয়েছে, লেগে থাকতে বলবেন। উন্নতি হবে।” চোখ বন্ধ করে বললেন রোখসানা।
শায়লা পারভিন মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। এভাবে স্পষ্ট ইঙ্গিতে যে দীপ্তর পায়ের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলে বসবেন রোখসানা- ভাবতে পারেননি তিনি। সামলে নেয়ার চেষ্টা করলেন দ্রুত, “অফিসের সবাই বেশ ইম্প্রেসড। ছেলেটা কাজের আছে আমার। পড়াশোনাতে সব সময় এক থেকে পাঁচের মধ্যে থাকতো।”
সায় দিলেন, “হ্যাঁ। আমার বড় মেয়েটার মতই। পড়াশোনায় বেশ ভাল। স্কলারশিপ পেয়েছিল মনে আছে। মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন আপনি।”
উৎসাহ পেলেন যেন শায়লা, “ডিবেটেও চ্যাম্পিয়ান হয়েছে তো! আপনি তো বাসায় যান না অনেকদিন। ক্রেস্টগুলো দেখাতে পারতাম।”
“তাই নাকি? হুম! ভাল তো।”
“ইয়ে, ভাবী?”
“হুম?”
“একটা কথা বলতে এসেছিলাম আসলে।”
“বলেন?”
“ছেলেটা তো চাকরি পেয়ে গেল। তাও যেন তেন না, সরকারী চাকরি। ভাবছি দেরি টেরি না করে ছেলেটাকে বিয়ে দিয়ে দেবো। কম বয়স থাকতে থাকতে বিয়ে শাদী করলে সংসার ভাল হয়। জীবনেও উন্নতি হবে। আপনার কি মনে হয়? ভাল চিন্তা না?” রোখসানার দিকে উজ্জ্বল মুখে তাকালেন জবাবের আশায়।
নড়ে চড়ে বসলেন রোখসানা, গম্ভীর মুখে বললেন, “চিন্তা তো খারাপ না ভাবী। কথা হচ্ছে আরেকজন মানুষের দায়িত্ব বুঝে নেয়া চাট্টিখানি কথা না। মাত্র তো চাকরি ধরেছে। আগে থিতু হতে দিতেন....”
“আমরা আছি না? আমরা সব দেখবো। যা লাগে তাই দেয়ার চেষ্টা করবো। একদিনেই তো ছেলে কখনো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে বিয়ে করতে যায় না। ধীরে ধীরে হয়। আপাতত আমরা মা বাবাই সব পুষিয়ে দেবো। তাও ছেলে একটু সংসারী হোক। কি বলেন?”
“আপনাদের যা ইচ্ছে। মা বাবার চিন্তা ভাবনাই আসল কথা। আর ছেলে যদি বিয়ের ইচ্ছে থাকে, তাহলে তো কথা থাকছে না। তাই না?” রোখসানা সামান্য বিরক্তি চেপে কথাটা বললেন। কথা বলতে মোটেও ভাল লাগছে না তাঁর। কিন্তু এই মহিলার ওঠার নামই নেই।
“মেয়ে তাহলে দেখা দরকার কি বলেন?” হাসি হাসি গলায় বললেন। “কাছাকাছি মেয়ের বাড়ি হলে খুব ভাল হয়। দূর দেশের মেয়ে এনে লাভ নেই।” সরাসরি বিস্তৃকার নামটা নিলেন না। চাচ্ছিলেন রোখসানাই যেন নিজে থেকে ইঙ্গিতটা বুঝে নেন।
রোখসানা খানক বুদ্ধিমতী নারী। তিনি ইঙ্গিতটা স্পষ্টই বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু সাবধানে পাশ কাটিয়ে গেলেন, “কাছাকাছি? আসলে তো ভাবী কাজটা বেশ মুশকিল বুঝলেন। কাছাকাছি বলেন আর দূরের অঞ্চলের মেয়েই বলেন, বিয়েতে রাজী করানোটা অনেক ঝামেলার কাজ হয়ে যাবে। দীপ্তর পায়ের সমস্যাটার জন্য কোন মেয়ে রাজী হবে বলেন? একটা পা নেই, ক্রাচে করে চলাফেরা করতে হয়, লিমিটেশনের ইয়ত্তা নেই। মেয়ে কিংবা মেয়ের ফ্যামেলিই তো রাজী হবে না......” রোখসানা চোখ বন্ধ করেই কথা বলছেন। না তাকিয়েও বুঝতে পারছেন তাঁর মুখের দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছেন শায়লা।
কিছু শোনার অপেক্ষা করলেন না শায়লার কাছ থেকে। রোখসানা একটু দম নিয়ে চোখ খুলে উপকারী গলায় বললেন, “তবু আমি চেষ্টা করে দেখবো খোঁজ লাগাতে। দেখি ভাল মেয়ে পাই কিনা। সন্ধানে তো ভাল মেয়ে নেই। পেলেই জানাবো আপনাকে।”
শায়লা পারভিন চুপ হয়ে গেছেন। অতি সাবধানে না বোধক মতামত দেয়ার পর সেটা না বুঝতে পারার মত অবুঝ নন তিনি। রোখসানা খানম ভদ্র উপায়ে না বলে দিয়েছেন তাঁকে। তবু কেন যেন বলে ফেললেন, “বিস্তৃকার বিয়ে শাদী নিয়ে কিছু ভাবছেন না?” বলেই বুঝলেন বোকার মত প্রশ্ন করেছেন।
রোখসানা অবুঝের কাণ্ড দেখে বড়দের মত হাসি দিয়ে বললেন, “চিন্তা তো আছেই। পাত্র দেখছি। হৃত্বিকা বেশ কয়েকটা ছেলের ছবিও পাঠিয়েছে বাহির থেকে। ওখানেই সেটেল্ড। ভাবছি একটু খোঁজ খবর লাগিয়ে দেখবো। তাছাড়া মিশুকেরও হাতে নাকি একটা ভাল ছেলে আছে ওদেরই অফিসের। খুব নাম করা আর্কিটেক্ট। ঝিনাইদহে বাড়ি। সেও বাহিরেই থাকছে সতেরো বছর ধরে। ভাল মনে হলে ওর সাথেই দিয়ে দেবো। শুনেছি ছেলে নাকি নিজেই আগ্রহ করে মিশুককে রিকোয়েস্ট করেছে বিস্তৃকার জন্য। মিশুকের কম্পিউটারে বিস্তৃকার ছবি দেখেই মনে ধরে গেছে বলে। এই মেয়েকে ছাড়া নাকি তার চলবে না! নাছোড়বান্দা ছেলে! আমাকেও বার কয়েক ফোন দিয়েছিল বাহির থেকে।” আনন্দেই হোক কি প্রদর্শনে- তৃপ্তির হাসি হেসে চোখ মুদলেন।
শায়লা পারভিন বোবা হয়ে গেলেন যেন কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ক্ষীণ গলায় বললেন, “অনেক গল্প করা হল ভাবী। আজ যাই। আপনি রেস্ট করেন। আপনার তো সাইনোসাইটিসের দোষ, মাথা ব্যথা করলে ঘুমিয়ে পড়েন। অযথা বক বক করে লাভ নেই।” ঘুরে বিছানা থেকে নেমে গেলেন শায়লা। রোখসানা খানম চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে আছেন। সামান্য সৌজন্যতাবোধ দেখিয়ে উঠে সোজা হয়ে বসলেন না। হতাশ মুখে শায়লা একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সেদিনের ঘটনাটার পর পরিস্থিতি বদলে গেলে। শায়লা পারভিন বেঁকে বসলেন দীপ্ত আর বিস্তৃকার সম্পর্কটা নিয়ে। নিজের ছেলেকে রোখসানা খানম খোঁড়া বলেছেন দেখে শায়লা ক্ষেপে গেছেন। তাঁর ছেলের জন্য মেয়ে পাওয়া যাবে কি যাবে না তিনি দেখিয়ে দেবেন। কিসের এত অহংকার ঐ মহিলার? কি আছে? দুটো ছেলে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছেন দেখে দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না? বড় একটা মেয়ে যে গলায় ফাঁস খেয়ে মরেছিল- সেটার জন্য কি সামান্যতম দ্বায়ী নয় সে? কি ভেবেছে নিজেকে?
ব্যাপারটা শুধু শায়লা পারভিন কিংবা দীপ্তর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে ভাল হত। কিন্তু দীপ্তর বাবা ওসমান গণী সাহেব শোনার পর ভেবেছিলেন বিষয়টাকে অন্যভাবে ঠিক করতে। তিনি মিশুককে চিঠি লিখে পাঠালেন বিস্তৃকার সঙ্গে দীপ্তর বিয়ে নিয়ে। যেহেতু দীপ্তর সাথে মিশুকেরই সবচেয়ে বেশি খাতির ছিল, হয়ত সে বিষয়টা বুঝতে পারবে। দীপ্তকে বাহির থেকে দেখলে কেবল সীমাবদ্ধতাটাই চোখে আসে। যারা কাছ থেকে চেনে তারা শুধু জানে যে সে কতটা বিস্তৃতি নিয়ে বেঁচে আছে।
কিন্তু ওসমান গণী সাহেব ভুলে গিয়েছিলেন মিশুক রোখসানা খানমেরই ছেলে। চিঠির উত্তর আসতে পনেরো দিনের মত সময় লেগেছিল।
“শ্রদ্ধেয় খালুজান,
পত্রের শুরুতেই আমার সালাম নেবেন। পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে আশা করি কুশলেই আছেন সবাইকে নিয়ে। আমরাও ভাল আছি। জেনে খুশি হবেন আপনার বৌমা দ্বিতীয় বারের মত সন্তান সম্ভবা। ডাক্তারের দেয়া তারিখ ঠিক থাকলে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই শর্মীর বাচ্চাটা হবে। ভেবেছিলাম এবারে না হয় দেশে ফিরে আসবো। প্রথম বাচ্চাটাও তো বাহিরেই হয়েছে। পরেরটা দেশে হোক। কিন্তু অফিস থেকে ছাড়ছে না। প্রবাসে চাকরি জীবন অনেকটাই কারবন্দী কয়েদীর মত লাগে যখন ইচ্ছেগুলো পূরণ হয় না।
গত পরশুই আপনার চিঠি পেয়েছিলাম খালুজান। একটু ব্যস্ত ছিলাম দেখে একদিন পরে লিখতে বসলাম। দীপ্তর সঙ্গে আমাদের বিস্তৃকার বিয়ে নিয়ে আপনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন, পড়ে সত্যিই ভীষণ আনন্দ, একই সাথে লজ্জাতেও পড়ে গেছি। এক সাথেই তো ছিলাম। আমার থেকে আর দীপ্তকে কে ভাল চিনবে। যে কোনো বিষয়ে ওর সমৃদ্ধি বা একাগ্রতা আর দশটা ছেলে থেকে সব সময়েই আলাদা ছিল। আম্মার কাছেও শুনেছি খুব তাড়াতাড়ি সরকারী চাকরিও পেয়ে গেছে। কয়জন পায়? আমি নিজেই তো তিন বছর চেষ্টা করেও পাইনি। শেষে বেসরকারী একটা ফার্মে চাকরি নিয়ে বাহিরে চলে এলাম। পাত্র হিসেবে দীপ্ত যে একশোতে একশো সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু খালু, আমি অনেক বড় সমস্যাতে পড়ে গেলাম আপনার চিঠি পেয়ে। আগেই আম্মার মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল আমার। দেরি হয়ে গেছে বুঝতে পারছি। হয়তো খালাম্মাকে বলেছেনও আম্মা, আমার অফিসেরই এক জুনিয়র কলিগ, মেহেদী হাসান নাম। খুব ভাল আর্কিটেক্ট। বছর খানেক ধরেই ঘুর ঘুর করছিল বিস্তৃকাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু অনার্স পাশ করেনি দেখে গত বছর কিছু বলিনি। শুধু বলেছিলাম ভেবে দেখবো। এই বছর যখনই শুনেছে যে পাশ করেছে, তখনই পেয়ে বসেছে আমাকে। একেবারে জোরাজুরি অবস্থা তার। আমার কালো বোনটাকে তার এতই ভাল লেগেছে ছবি দেখে যে তাকেই বিয়ে করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রীতিমত ওর আব্বাকে দিয়ে ফোন করিয়ে আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়েছে। বেশিদিন আগের কথা না, এই চার মাস হচ্ছে মনে হয়। আমিও ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে হ্যাঁ বলে দিয়েছি তাঁকে। ছেলে হিসেবে মেহেদী খারাপ না। আব্বা আম্মার একমাত্র ছেলে। ঢাকায় বাড়িও আছে। দেশের বাড়ি ঝিনাইদহ। ছেলে ভাল। আমার তো সিগারেট খাওয়ার বাতিক আছে। তার সেটাও নাই। ভাবলাম ভাল ছেলে যখন পেয়েছি, দিয়ে দেই বিস্তৃকাকে। বোনটা আমার কালো দেখে যখন কথাই তুলেনি একবারও, এমন ঘরই তো দরকার। সারাজীবন গায়ের রঙ নিয়ে মেয়েটা কম কথা শোনেনি। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি- সব জায়গাতেই শুনেছে। এখন যখন এমন পাত্র পেয়েছি, ফেলে রেখে কি করবো আমি? রাজী হয়ে গেলাম। কথা দেয়া হয়ে গেছে।
এখন আপনার চিঠি পেয়ে লজ্জাও লাগছে, দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। এত বছর ধরে একসাথে ছিলাম। শুধু যে প্রতিবেশী হিসেবে দেখেছি, মোটেও না। সব সময় জানতাম পাশের বাসায় আমাদের অভিভাবক রয়েছেন। আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে কম তো করেননি আমাদের জন্য। আপন মানুষও করে না এমন যতটা না আপনি আর খালাম্মা করেছেন। তাই আপনার ছেলে হিসেবেই আবদার নিয়ে লিখছি খালু। বলতে পারেন আপনার চিঠি পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেছি। কি লিখবো উত্তরে? আমি চিঠি পেয়েই বুঝেছি খুব আশা করে লিখেছেন আমার কাছে। চাইলে তো আম্মার সাথেই কথা বলতে পারতেন আপনি। সেটা না করে আমাকে যখন লিখেছেন, খুব আস্থা রেখে লিখেছেন।
কিন্তু খালুজান, আমি প্রায় অসহায় বোধ করছি। আপনার মত এত আপন মানুষকেই যে না করতে হবে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। এখানে আমি কথা দিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। শর্মীর বাচ্চা হবে দেখে দেশেও ফেরা হচ্ছে না। নাহলে ফিরেই বিস্তৃকা আর মেহেদীর বিয়েটা পড়িয়ে দিতাম। আম্মাও এক বাক্যে রাজী এই বিয়েতে। বলা যায় প্রায় সবই ঠিক ঠাক। যেহেতু একই অফিসে চাকরি করছি, তাই ছেলের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানার বাকি নেই। তাই একরকম পাকা কথা দেয়া হয়ে গেছে আমাদের দিক থেকে। এই রকম অবস্থায় বিয়েটা বাতিল করে দেয়া রীতিমত অসম্ভব। খালু আপনি আমাদের গুরুজন, আপনি অন্তত আমাদের অবস্থাটা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়? আমি নিরুপায় হয়েই সবকিছু লিখছি আপনাকে। বাকিটা আপনার সিদ্ধান্ত। এরপরও যদি মনে করেন এত ভাল একটা ছেলেকে হাতছাড়া করা উচিত হবে- তাহলে সেটাই হবে। আমার কথা দেয়াটাকে মুখ্য হিসেবে দেখবো না।
আপনার সার্বিক সুস্থতা কামনা করছি।
আপনার স্নেহাস্পদ,
মিশুক আহাম্মেদ।”
ওসমান গণী বুদ্ধিমান মানুষ। মিশুকের কথা তিনি বুঝে নিয়েছেন শুরুতেই। ভদ্রভাবে না বলে দিয়েছে। সেই সাথে মেহেদী হাসান নামের ছেলেটা সম্পর্কেও ভাল করে বার বার লিখে দিয়েছে যাতে বুঝে নিতে পারেন দীপ্তর সঙ্গে ওর পার্থক্যটা কোথায়। সেই সঙ্গে এটাও বুঝে গেছেন জোর করে লাভ হবে না। যারা ইঙ্গিতে এড়িয়ে যেতে চায় প্রস্তাবের ব্যাপারটাকে, তাদের সামনে স্পষ্ট করে বিস্তৃকার হাত চাওয়ার কোনো মানে হয় না। উত্তর তখন আরো কঠিন, আরো নিষ্ঠুর ভাবে ছুটে আসবে তাঁদের দিকে। এতদিনের পরিচিত বলেই কেবল ভদ্রতা দেখিয়ে দীপ্তর পা নিয়ে সরাসরি কিছু বলছে না কেউ। কিন্তু দরকার পরলে বলতে যে পারবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হৃত্বিকাকেও জানানো যেতে পারতো সব। ওসমান সাহেবের ধারণা মেয়েটা জানেও সব। কিন্তু বড় ভাই আর মা যা বলবে, সেটাই তারও সিদ্ধান্ত। ছোট বোনের বিয়ে নিয়ে তার কাছে কিছু আবদার করা উচিত হবে না।
সবকিছু চোখের সামনেই ঘটছিল দীপ্তর। বিস্তৃকা হয়তো কিছুই জানে না। কিন্তু দীপ্ত প্রতিটা দিন দেখেছে সব। অফিসে যাওয়ার আগে, অফিস থেকে ফেরার পর- প্রতিটা দিন ঘরের নিচু স্বরের আলাপ তার কানেও পৌঁছেছে। কাঠের দুটো ক্রাচের ওপর ভর টিকিয়ে যাকে দাঁড়াতে হয়, বুক চাতিয়ে কাউকে কি সত্যিই চাওয়ার যোগ্যতা সে রাখে? তাঁর সীমানা বেঁধে দেয়া আছে। তাই বলে মুক্ত আকাশের পাখিটাকে খাঁচায় ভরে কাছে রেখে দেয়ার কোনো মানে নেই। এটাকে কেবল স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছু বলে না।
কথা ছিল মিশুকের স্ত্রীর দ্বিতীয় বাচ্চাটা হলেই দেশে এসে বিস্তৃকার বিয়ে নিয়ে কাজ শুরু করে দেবে। কিন্তু ওসমান গণীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে নিজেই আর নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারেনি মিশুক। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে সত্যি সত্যি দেশে ফিরে এসেছে মাত্র এক মাসের মাঝেই। এসে যে চুপচাপ বসে থেকেছে, তা না। মেহেদী হাসান নামের ছেলেটার বাবা মা আত্মীয় স্বজন ডাকিয়ে রীতিমত আংটি পরিয়ে দিয়েছে বিস্তৃকার। একদম আচমকাই ঘটেছে সব। বিস্তৃকা সামান্যতম কথা বলার সুযোগ পায়নি। তিন বোনের মাঝে সবচেয়ে চঞ্চল মেয়েটি যেন ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বাক হয়ে গেছে।
আংটি পরানোর রাতেই বিস্তৃকা মিশুকের ঘরে গিয়ে আংটিটা তার টেবিলের ওপর রেখে আসে নিঃশব্দে। মিশুক অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে, পেছন থেকে ডাক দিয়েছিল, “বিস্তৃকা? কি আশ্চর্য! আংটি খুলে রেখে যাচ্ছিস কেন? এটা তোর বিয়ের আংটি।”
বিস্তৃকা উত্তর দেয়নি।
তার খানিক বাদেই রোখসানা খানম বিস্তৃকার ঘরে চলে আসেন অসন্তুষ্ট মুখে। হাত বিস্তৃকার সেই আংটিটা। রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করেন, “আংটি খুলে রেখে আসার মানেটা কি বিস্তৃকা? কি ধরণের বেয়াদবী এটা?”
মশারী টানিয়ে বিস্তৃকা শুয়েছিল গায়ে কাঁথা জড়িয়ে। জ্বর এসে গেছে। ঘোর ঘোর লাগছে সব। বাতি নেভানোই ছিল। রোখসানা খানম এসেই লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
বিস্তৃকার মাথা কয়েক মণ ভারি হয়ে আছে। বালিশ থেকেই তুলতে পারছে না। তাও অনেক কষ্টে উঠে বসল। মায়ের কথার উত্তর দিল না।
“আমি একটা প্রশ্ন করেছি, উত্তর দে।”
“আংটিটা পরতে ভাল লাগছিল না আম্মা।” ক্ষীণ স্বরে জবাব দিল। কাঁপুনি এসে গেছে জ্বরের। শীত লাগছে খুব।
রোখসানার পেছন পেছন মিশুকও চলে এসেছে ঘরে। শর্মী ঘুমিয়ে আছে ভেতরের ঘরে। ও আসেনি।
“আংটি পরতে ভাল না লাগলে নিজের ঘরে খুলে নিজের কাছে রেখে দিতি, নাটক করে বড় ভাইয়ের ঘরে গিয়ে আংটি রেখে আসার মানে কি? কি ধরণের বেয়াদবী শুরু করেছিস এটা?” তীক্ষ্ম গলায় বলে উঠলেন রোখসানা।
মিশুক চাপা গলায় বলল, “আস্তে আম্মা! রাত বিরাতে কি শুরু করলেন এইসব?”
“তুই চুপ কর! বৌমার অবস্থা দেখার জন্য এখন তোর ঘরে না গেলে তো আংটিটাই দেখতাম না। জানাও হত না যে এই মেয়ে স্পর্ধাতিরিক্ত বেয়াদব হয়ে গেছে!” কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন ছেলের দিকে। চুপ হয়ে গেল মিশুক।
বিস্তৃকা জ্বর নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। চোখ লাল হয়ে আছে ঠিক জ্বরের কারণে নাকি কান্না আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করার জন্যে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
“তোকে কলেজ ভার্সিটিতে কি পড়িয়েছি এইসব দেখার জন্য? বড় ভাইয়ের সাথে বেয়াদবী করা দেখতে? আংটি খুলে রেখে আসা মানে কি? ওর ঘরে খুলে রেখে এসেছিস মানে তো আমার ঘরেও খুলে রেখে এসেছিস। বিয়েটা তো আমার সিদ্ধান্তে হচ্ছে। মিশুকের না। মত তো আমার দেয়া। তার মানে কি আমার সাথেও বেয়াদবী করছিস তুই? উত্তর দিচ্ছিস না কেন?” রোখসানা ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে।
বিস্তৃকা মুখ নিচু করে ফেলল, চোখে পানি চলে এসেছে তার।
রোখসানা থামছেন না, বলেই যাচ্ছেন, “এসব দেখার জন্য বড় করেছি তোকে? তোর আব্বা বেঁচে থাকলে এইসব বেয়াদবী দেখতো। ভাল হয়েছে মরে গেছে। শান্তিতে আছে...... কথা বলছিস না কেন? কথা বল?”
বিস্তৃকা কেঁপে কেঁপে কাঁদছে মুখ নিচু করে। আঙুল দিয়ে সাবধানে চোখের পানি মুছতে মুছতে মাথা নিচু করেই ভেজা স্বরে বলল, “কি বলবো আম্মা?”
“কি বলবি মানে? সোজা বাংলায় উত্তর দে। তোর কি ধারণা আমি বেঁচে থাকতে ঐ খোঁড়া, পঙ্গু ছেলেটার সাথে তোর বিয়ে দেবো? জীবনেও না! ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমার মেয়ে হয়ে তুই প্রেম করিস এটা ভাবতেই আমার লজ্জায় ঘেন্নায় মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোদের? তোর বড় বোন, মেজ বোন কি প্রেম করেছে? নাকি আমার সিদ্ধান্তে বিয়ে করেছে? কোনটা?”
বিস্তৃকা উত্তর দিল না। আকুল হয়ে কাঁদছে।
মিশুক থাকতে পারলো না, “আম্মা চলেন তো, এসব কথা রাতের বেলা বলে কি লাভ?”
“তো কি দিনের আলোয় মাইক নিয়ে রিক্সায় রিক্সায় ঘুরে বলে বেড়াবো? ঘরের কথা ঘরেই শেষ করছি। আমাকে শেখাতে আসবি না তুই।” ধমক দিলেন ছেলেকে।
“তোদের আব্বা মারা যাওয়ার পর এই আমি কেমন করে সংসারটা সামলেছিলাম সেটা শুধু ওপরে আল্লাহ্ আর নিচে আমি জানি। কতদিন শখ করে একটা নতুন শাড়ি কিনতে পারিনি। ছেলে মেয়েগুলার পরীক্ষার ফি জমাতে হবে দেখে। সব সময় তোদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করেছি। এত কিছু করেছি কেবল এসব দেখার জন্য? তোর অবাধ্যতা দেখার জন্য?” দৃঢ় কঠিন মানুষটার গলা হঠাৎ ভেঙে এলো। চুপ হয়ে গেলেন রোখসানা। কাছের টেবিলটা ধরে নিজেকে সামলে নিতে চাইলেন।
মিশুক পেছন থেকে এসে তাঁকে ধরল, “আম্মা, আপনার হাই প্রেশার আছে। প্লিজ এখন এরকম করবেন না। শান্ত হোন। রুমে গিয়ে রেস্ট নিন।”
ছেলের হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও পারলেন না রোখসানা। কেঁদে ফেলেছেন তিনিও, ভাঙা স্বরে মেয়েকে বললেন, “আমার চাওয়াটা তোর কাছে এতই ঠুকনো হয়ে গেলোরে? একটা বার আমার কথাও মাথায় আনলি না? দীপ্তর সাথে তোর বিয়ে আমি কোনোদিনই মেনে নেবো না। ..... মিশুক? ওকে বলে দিস, ঐ খোঁড়া ছেলেকে যদি আমার মেয়ে বিয়ে করে, সে যেন আমার লাশ না ছোঁয়!”
বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মত তাকিয়ে রইল বিস্তৃকা। কাঁদতেও ভুলে গেছে। অস্ফুট গলায় বলল, “মা....”
রোখসানা খানম আর কথা বললেন না। হাতের আংটিটা ছুঁড়ে মারলেন বিস্তৃকার মশারীর দিকে। ছুঁড়ে দিয়ে আর দাঁড়ালেন না। ঘুরে বেরিয়ে গেলেন ঘরটা থেকে। মিশুকও পেছন পেছন ছুটে গেল মায়ের।
বিমূঢ়ের মত বিছানায় কাঁথা জড়িয়ে বসে আছে বিস্তৃকা। মশারীর সাথে ধাক্কা লেগে আংটিটা টুন টান শব্দ করে মেঝেতে গিয়ে থেমেছে। অনেকক্ষণ মূর্তির মত বসে রইল সে। নড়ল না একটুও। পাশের ঘর থেকে রোখসানা খানমের চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সেই সাথে মিশুক ভাইয়ের গলার আওয়াজ। বিস্তৃকা বসেই রয়েছে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মেঝের মাঝখানে পড়ে থাকা সোনালী আংটিটার দিকে।
হঠাৎ মিশুক ভাইকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। বাসার কাজের মেয়েটাও বালতি মগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে। রোখসানা খানমের প্রেশার উঠে গেছে। মিশুক ভাই দেরি না করে দরজা খুলে ফার্মেসির ডাক্তার ডাকতে চলে গেল। রোখসানা খানম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
ধীরে ধীরে মশারী তুলে টলোমলো পায়ে নামলো বিস্তৃকা। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে লাইটটা নিভিয়ে দিল। খোলা দরজা দিয়ে আলো আসছে মেঝেতে। সেই আলোতে আংটিটা দেখা যাচ্ছে। জ্বলছে যেন। ওটার কাছে গিয়ে ঝুঁকে বসল। ভাবলেশহীন মুখে আংটিটা তুলে আঙুলে পরে নিল। কাঁদছে না আর সে।
দীপ্তর সঙ্গে বিস্তৃকার আর কথা হয়নি তেমন। দীপ্ত নিজের মত বুঝে নিয়েছিল সব। মিশুক ভাইয়ের সাথেও কথা হয়েছিল। তাই পুরো বিষয়টা বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি কোনো। একই সাথে সে এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল সে থাকলে বিস্তৃকার বিয়েটা হবে না। তীব্র চঞ্চল মেয়ে যখন নীরব হয়ে যায়, তার পেছনে অনেক বেশি দুঃখ লুকিয়ে থাকে। বিস্তৃকা সেই দুঃখ নিয়ে অন্য কারো ঘরে যেতে পারবে না দীপ্ত থাকলে। দীপ্ত তাই কথা বলার অপেক্ষা করেনি। অনুমতির জন্যও দাঁড়ায়নি। নতুন চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই শুনছিল ছয় মাসের মাথায় অন্য শহরে পোস্টিং দেয়া হবে তাকে। ছয় মাস পুরোতেই পোস্টিং অর্ডার এসে গেল। এক দিক দিয়ে ভালই হয়েছে। বিস্তৃকা থেকে দূরে চলে যাওয়া যাবে।
ওসমান গণী আর শায়লা পারভিনের ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘ সংসার জীবনের সেই বাসাটা অবশেষে ছেড়ে দেয়ার সময় হল। বাহির থেকে লোক এনে জিনিসপত্র সব বেঁধে ট্রাকে তুলে দেয়া হল। বিশাল এক ট্রাক বোঝাই মালপত্র রওনা হল দীপ্তর নতুন শহরের উদ্দেশ্যে। দীপ্তকে আগে থেকেই বাসা দিয়ে দেয়া হয়েছিল অফিস থেকে। তাই সমস্যা হবার কথা না। ওসমান গণী সাহেব ট্রাকের সাথে চলে গিয়েছিলেন। শায়লা পারভিন আর দীপ্ত বাসে করে যাবে বিকেলে।
বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের নিচে আবারও বাড়ির ছাদে অনেকদিন পর কেউ বিদায়ের জন্য এসে দাঁড়ালো বিস্তৃকার সামনে। দীপ্তরা যেদিন চলে যায়, সেই বিকেলে ছাদে গিয়েছিল বিস্তৃকা। ছাদে ওঠে না অনেকদিন হয়ে গেছে। কাপড় শুঁকাতে বা নিতেও আসা হয় না। কবুতরের খোপে খাবার দেয়ার জন্যও আসে না। অথৈ আর কাজের মেয়েটা এসে দিয়ে যায়। বহুদিন পর বিস্তৃকা পশ্চিমের কার্নিসে গিয়ে দাঁড়ায়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে দূরের মাঠটার দিকে। লালচে সূর্যটা মাঠের শেষ প্রান্তের গাছগুলোর ওপর নেমে আসছে দ্রুত। সাদাটে-ধূসর মেঘগুলোকে প্রতিদিনের মত লালচে রঙে কিনারগুলোর রাঙিয়ে দিয়েছে। বহুদূর আকাশে তাকিয়ে থাকলে পাখির ঝাঁক চোখে আসে। তারাও কোথাও যাচ্ছে। নতুন ঠিকানা অথবা পুরনো কোথাও।
হালকা মৃদু একটা হাওয়া বইছে। বিস্তৃকার খোলা চুলগুলো মুখের ওপর বার বার এনে ফেলছে। হাত দিয়ে সরিয়ে কানের পেছনে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ছাদে আর কেউ নেই। দড়িতে শুঁকাতে দেয়া কাপড়গুলো দুলছে। কবুতরের ঘরটার ওপর কয়েকটা কবুতর শব্দ করছে থেকে থেকে। বাকিগুলো নেই, বেড়াতে গেছে কোথাও। সন্ধ্যা নেমে এলে ফিরে আসবে।
বাসার নিচে একটা রিক্সা অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছে। দুটো স্যুটকেস তোলা হয়েছে। দীপ্ত আর খালাম্মা চলে যাচ্ছে একটু পর। বিল্ডিঙের বাকিদের থেকে হয়তো বিদায় নিচ্ছে খালাম্মা। বিস্তৃকাদের বাসায় কেউ নেই এখন কাজের মেয়েটা ছাড়া। অথৈ খেলতে গেছে। রোখসানা খানম অফিসে। রোখসানা থাকলেও তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার জন্য আসতেন কিনা কে জানে। ওসমান খালু চলে যাওয়ার সময় রীতিমত কাঠখোট্টা ব্যবহার করেছেন তাঁর সাথে রোখসানা খানম। হু হা উত্তর দিয়ে দ্বায় সেরেছেন। যেন এই পরিবারের কারো সঙ্গে কথা না বলে যতটা এড়িয়া যাওয়া যায় ততই ভাল তাঁর জন্য। শায়লা পারভিন এরপর আরো অসন্তুষ্ট হয়েছেন রোখসানা খানমের ওপর। এত বছরের সম্পর্ক তাঁদের। ছেলে মেয়ে দুটোর বিয়ে দেয়া গেল না ঠিক আছে, তাই বলে স্বভাবগত ভদ্র আচরনটুকুও যে তাঁদের বেলায় তুলে রাখবেন- এটা আশা করেননি।
পেছনে খট্ খট্ শব্দ হতেই ফিরে তাকালো বিস্তৃকা। দীপ্ত ক্রাচে করে ছাদে উঠে এসেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে যেন খুঁজছে। কাপড়ের জন্য প্রথমে বিস্তৃকাকে খেয়াল করেনি। বিস্তৃকাই প্রথমে দেখলো তাকে। গায়ে একটা মেটে রঙের পাঞ্জাবি। মুখে অনেকদিনের না কামানো দাঁড়িগোঁফ। মাথা ভর্তি উস্কো খুস্কো চুল। কতদিন যে চিরুনি পড়ে না কে জানে। কাঁধ থেকে একটা শান্তিনিকেতনী ব্যাগ ঝুলছে।
বিস্তৃকা সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দেখতে পেয়েছে তাকে দীপ্ত। এগিয়ে আসছে ওর দিকে। মুখে সেই আগের মত উদার হাসি। মাঝখান দিয়ে বহু দিন ধরে এই হাসিটা দেখেনি বিস্তৃকা। কেমন যেন লাজুক ধরণের হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা।
“তোমাকেই খুঁজছিলাম বিষ্ঠা..... বিস্তৃকা! চলে যাচ্ছি আজকে আম্মাকে নিয়ে। ভাবলাম দেখা করে যাই।” হেসে বলল দীপ্ত। চশমার ওপাশের চোখগুলোতেও হাসি।
বিস্তৃকা কথা খুঁজে পেল না, একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, “তোমার মাস্টার্সের ক্লাসের কি হবে?”
“আরে ধুর! পরীক্ষায় পাশ করতে কি ক্লাস করা লাগে নাকি!” হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল যেন দীপ্ত। “মাঝে মাঝে এসে পরীক্ষা দিয়ে যাব। আর পোলাপানের তো অভাব নেই। নোট পত্রের অভাব হবে না। আরামসে পাশ করে যাব দেখে নিও।”
“ও।” বিস্তৃকা চুপ হয়ে গেল। বাতাসে বার বার চুল মুখে এসে যাচ্ছে। হাত দিয়ে সরাচ্ছে। দীপ্তকে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
“বিয়েটা জানি কবে তোমার? এ মাসেই তো? তাই না?” খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল দীপ্ত।
“হ-হ্যাঁ।” আড়ষ্ট গলায় বলল বিস্তৃকা, “ছাব্বিশ তারিখে। শুক্রবার।”
“একেবারে তুলে নিয়ে যাবে? নাকি আকদ করে রাখবে শুধু?”
“এক সপ্তাহের জন্য তুলে নিয়ে যাবে। উনি বিদেশে চলে যাবেন আবার সাত দিনের মাথায়। আমি চলে আসবো তখন।” বিস্তৃকা অন্য দিকে তাকিয়ে বলল কথাগুলো।
“এরপর কি দেশে থাকা হবে নাকি সোজা বিদেশ? মাস্টার্স শেষ করবে না?” খুব স্বাভাবিক মুখে প্রশ্ন করছে দীপ্ত। যেন আর দশটা মানুষের মত সেও একজন।
“জ-জানি না।” বিস্তৃকা অস্বস্তি কাটানোর জন্য গলার ওড়নাটা মাফলারের মত আরেক পাক প্যাঁচালো। দীপ্তর দিকে তাকাতে পারছে না কেন জানি। কোনো কষ্টের বা বিষণ্নতার অনুভূতিও হচ্ছে না। সব স্বাভাবিক। তবু তাকাতে পারছে না।
দীপ্ত ওর কাঁধের ব্যাগটা হাতড়ে দুটো বই বের করে এগিয়ে দিল বিস্তৃকার দিকে। “নাও, এগুলো তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি।”
বিস্তৃকা হাত বাড়ালো না। সপ্রশ্ন চোখে তাকালো দীপ্তর দিকে, “চিঠি?”
“আরে নাহ! এখন আর চিঠি লেখার সময় আছে? বইগুলো সেইরকম লেগেছে দেখে তোমাকে দিলাম পড়ার জন্য।” হেসে ফেলল দীপ্ত।
বিস্তৃকা কৌতূহলী মুখে বইগুলো হাতে নিলো এবার। সমরেশ মজুমদারের “কথা হয়ে গেছে”, আর শীর্ষেন্দুর “দূরবীন”।
সামনের খোলা মাঠটার দিকে তাকালো দীপ্ত, একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “কত বছর থাকা হয়েছে এই জায়গাটায়, তাই না? এই বাড়িটাতেই জন্মেছিলাম। আমার দুই মাস পরে তুমি হয়েছিলে। কিন্তু নিউমনিয়া বাঁধানোয় এক বছর দেরিতে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম তোমার। আশ্চর্য একটা সময় কেটেছে। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা, আমি টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে হাঁড়ি ভর্তি মিষ্টি আর সন্দেশ এনে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। তুমি লাঠি দিয়ে আমাকে দৌড়াচ্ছো! হা হা হা!” হাসছে দীপ্ত। পড়ন্ত সূর্যটার কমলা আলোয় চশমার পাশের চোখদুটো চিক চিক করে উঠলো যেন।
বিস্তৃকা নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“এই আলোটার একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার আছে জানো?” বিস্তৃকার দিকে ফিরে তাকায় দীপ্ত।
বিস্তৃকা মাথা নাড়ায়, “কি?”
“এই আলোতে একটা বিদায়ের ব্যাপার আছে। সমস্ত পৃথিবী আজকের জন্য শেষ বারের মত সূর্যটাকে দেখে বিদায় নিচ্ছে। কাল হয়তো সূর্যের দেখা আর নাও পেতে পারে।”
“সূর্য তো কোথাও চলে যাচ্ছে না...” থেমে গেল বিস্তৃকা।
“কারো জীবন থেকে আলো তো চলেও যেতে পারে; তুমি আমি কি জানি এই রহস্যময় প্রকৃতির ডায়েরির কোন পাতায় কি লেখা রয়েছে?” দীপ্ত স্মিত হাসে। হাসিটা খুব অসহায়ের মত দেখায়।
বিস্তৃকা কার্নিসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দীপ্তর দিকে তাকিয়ে। দীপ্ত দূরের মাঠটার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বিস্তৃকার দিকে তাকায়। সূর্যের নিষ্পাপ আলোতে মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে শিল্পীর রঙ তুলিতে আঁকা ইজেল বোর্ডে থেকে মাত্র নেমে এসেছে। এলোমেলো দমকা বাতাসে উড়তে থাকা চুলগুলো কথা শুনছে না মেয়েটার, ছোটা ছুটি করে বেড়াচ্ছে মুখের সামনে। বিড়বিড় করে মৃদুস্বরে দীপ্ত বলল,
“ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে, সদাই ভাবনা।
যা-কিছু পায় হারায়ে যায়, না মানে সান্ত্বনা।
সুখ-আশে দিশে দিশে বেড়ায় কাতরে–
মরীচিকা ধরিতে চায় এ মরুপ্রান্তরে।
ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা হয়ে আসে–
কাঁদে তখন আকুল-মন, কাঁপে তরাসে।”
বিস্তৃকা অবাক হয়ে তাকালো, “কি বললে?”
মাথা নাড়ল দীপ্ত, “কিছু নাহ। খালাম্মার সাথে তো আর দেখা করা হল না যাওয়ার আগে। উনি আসলে বলে দিও যে আমরা চলে গেছি।”
বিস্তৃকা উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকে হাতের বই দুটোর দিকে।
দীপ্ত খুব সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বিস্তৃকাকে বলে, “কণে দেখা আলোতে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে বিস্তৃকা। আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। অনেক সুন্দর একটা মুহূর্তে বিদায় নেয়া হল। ভাল থেকো।” হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু হাসিটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো।
ঘুরে হাঁটতে লাগলো সিঁড়ি ঘরের দিকে। ক্রাচের খট্ খট্ শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে দীপ্ত। বিস্তৃকা বই হাতে দাঁড়িয়ে আছে কার্নিসের কাছেই। দীপ্ত দড়িতে ঝুলতে থাকা কাপড়গুলোর আড়ালে চলে যাচ্ছে। বাতাসে উড়ছে কাপড় সব। দীপ্তকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। শুধু শব্দ শোনা যাচ্ছে ক্রাচের।
বিস্তৃকার হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে ডেকে বসল, “দীপ্ত?”
ক্রাচের শব্দ থেমে গেছে। শোনা যাচ্ছে না। চলে গেছে নাকি সিঁড়ি দিয়ে নেমে? ডাকতে দেরি করে ফেলেছে? বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা মোচড় দিয়ে ওঠে বিস্তৃকার। সিঁড়িঘরের দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকে হাতের বইগুলো নিয়ে। দীপ্ত হয়তো নিচে নেমে গেছে। ওকে একটা কথা বলা হয়নি। বিস্তৃকার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে হাঁটতে হাঁটতে। ঠোঁট কামড়ে আবার ডাক দিলো, “দীপ্ত?”
উড়তে থাকা কাপড়গুলোর মাঝ থেকে আচমকা শক্ত একটা হাত এসে খামচে ধরল বিস্তৃকার ডান হাতটা। চমকে উঠতে গিয়ে হাত থেকে বইগুলো পড়ে গেল বিস্তৃকার। দীপ্ত কাপড় সরিয়ে বেরিয়ে এসেছে। চারপাশে বাতাসে কাপড়গুলো এতো উড়ছে যে ভেতরের মানুষ দুটোকে গিলে নিয়েছে যেন।
বিস্তৃকা কান্না আটকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে দীপ্তর দিকে। ছেলেটা যে চশমার ওপাশ থেকে কাঁদছে স্পষ্ট বোঝা যায়। বিস্তৃকা নিচের ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
দীপ্ত ক্রাচে ভর দিয়ে খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে ওর দিকে। বিস্তৃকার ধরে থাকা হাতটা ছাড়েনি তখনও। বিস্তৃকা কষ্ট আর ভয় মেশা চোখে তাকায় দীপ্তর দিকে। সে বুঝতে পারছে না ছেলেটা কেন এগিয়ে আসছে এভাবে?
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দীপ্তর দুপাশের ক্রাচগুলো ছেড়ে দিল, অনন্ত কাল সময় লাগিয়ে পড়তে লাগল মাটিতে। দু হাতে বিস্তৃকার শীর্ণকায় শরীরটাকে জাপ্টে ধরলো প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে। এক পায়ে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে মুহূর্তের মধ্যেই শিশুর মত আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো দীপ্ত। ঘটনার আকস্মিকতায় বোবা হয়ে গেছে বিস্তৃকা। বরফের মত জমে গেছে ও। শুধু টের পাচ্ছে ছেলেটার চোখের ঈষৎ উষ্ণ লোনা পানি তার শরীরেও স্পর্শ করছে। “আমার যেতে ইচ্ছে করছে না একদম বিস্তৃকা। আমার একটুও যেতে ইচ্ছে করছে না। সব যদি আগের মত হয়ে যেত? আমি আমার সব কথা আমার ভেতরেই নাহয় চেপে রেখে দিতাম। কোনোদিন যদি কিছুই না বলতাম? আমার চোখের সামনে হয়তো আরো কটা দিন তোমাকে দেখতে পেতাম..... আমার যেতে ইচ্ছে করছে না....” বাচ্চাদের মত কাঁদছে দীপ্ত। গলা ভেঙে গেছে। কাঁপছে থেকে থেকে।
বিস্তৃকা অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে। খানিক আগের কান্নাটুকু যেন এক ধাক্কায় আরো ভেতরে কোথাও চলে গেছে। কাঁদতে ভুলে গেছে। অনুভূতিহীন হয়ে গেছে হঠাৎ করেই। কতক্ষণ যে এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরে দীপ্ত কেঁদেছিল বিস্তৃকার মনে নেই।
কিন্তু আচমকা যেভাবে দীপ্ত ওকে আঁকড়ে ধরেছিল, আচমকাই ছেড়ে দিল হঠাৎ। এক পায়ে ঝটকা দিয়ে পেছনে সরে এলো বিস্তৃকাকে ছেড়ে দিয়ে। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যাওয়া মানুষের মত কথা হারিয়ে ফেলল, “স-স্যরি! আম স্যরি....” এক পায়ে লাফাতে লাফাতে মাটিতে পড়ে থাকা ক্রাচগুলো ঝুঁকে তুলতে লাগলো। খানিক আগের সমস্ত আবেগ জোর করে যেন হজম করে ফেলার চেষ্টা করছে। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চশমার নিচের চোখের পানি দ্রুত মুছে নিলো। ক্রাচ হাতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ভীষণ রকম তাড়াহুড়া আছে যেন দীপ্তর, এমন ভাব করে বিস্তৃকার চোখে চোখ না রেখে বলার চেষ্টা করল, “দেরি হয়ে যাচ্ছে অনেক। শেষে বাস মিস করবো। আমি যাই, ভাল থেকো বিস্তৃকা....” ওর চোখে চোখ রাখার সাহস যেন হারিয়ে ফেলেছে দীপ্ত।
বিস্তৃকার কোনো কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করল না। তাকে ওখানে রেখেই ঘুরে কাপড় সরিয়ে চলে গেল দীপ্ত। সিঁড়ি দিয়ে ওর নেমে যাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। খট্ খট্ খট্।
বিস্তৃকা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। টলছে ভীষণ। কোনোমতে ঝুঁকে হাত থেকে পড়ে যাওয়া বইদুটো তুলে নিয়ে কার্নিসের আগের জায়গায় ফিরে এলো। দূর্বল লাগছে খুব। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। নিজেকে অনুভূতি শূন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছে। কোনো রকম দুঃখ, কষ্ট যেন স্পর্শ করতে পারছে না তাকে।
নিচের রাস্তাটার সামনে ছোটখাট জটলা বেঁধে গেছে রিক্সাটাকে ঘিরে। দীপ্ত আর শায়লা পারভিন উঠে বসেছে রিক্সায়। আশেপাশের বাসার এতোদিনের পরিচিত মানুষেরা সবাই এসেছে বিদায় জানাতে। শায়লা কাঁদছেন শিশুর মত। খানিক আগে কাঁদতে থাকা দীপ্ত আর তাঁর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। টিন টিন বেল বাজিয়ে রিক্সাটা ঘুরে চলতে শুরু করেছে পশ্চিমের মাঠের দিকে। ওদিকে দিয়ে চলে যাবে বাস স্ট্যাণ্ড। বিস্তৃকা ধীরে ধীরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে কার্নিসের কাছটায়। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না। নিচু রেলিং দিয়ে তাকিয়ে রইল দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া রিক্সাটার দিকে। সূর্যটা রক্তাভ লাল হয়ে পৃথিবীর ছাদটাকেও লাল চাঁদরে ঢেকে দিয়েছে। রিক্সাটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে রিক্সার কালো একটা অবয়ব। যেন ঠিক সূর্যটার দিকেই যাত্রা করেছে ওরা।
প্রবল বাতাসে মুখের ওপর চুল এনে ফেলেছে বিস্তৃকার, চোখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই রিক্সার অবয়বটার দিকে। দীপ্তকে বোঝা যায় না, কেবল বেরিয়ে থাকা ওর ক্রাচগুলো বোঝা যায়। আচ্ছা সেও কি তাকিয়ে রয়েছে এই ছাদের দিকে? কাঁদছে?
বিস্তৃকা জড় পদার্থের মত হেলান দিল রেলিঙে। কাঁদছে না একটুও। হাতের বইদুটো আপনমনেই খুলে পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলো। কোথাও কোনো দাগ দেয়া নেই। দীপ্ত সত্যিই কিছু লিখে যায়নি যাওয়ার সময়? দ্রুত হাতে আবারও ওল্টাতে থাকে বইগুলোর পাতা। কিন্তু কোথাও সবুজ কলম বা অন্য রঙের কালিতে আন্ডারলাইন করে যায়নি দীপ্ত। শুধুই দুটো বই দেখে গেছে। কেবলই বই এগুলো। এর মাঝে কারো কোনো কথা লেখা নেই।
বিস্তৃকা খুব সাবধানে বইগুলো বন্ধ করে দুহাতে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে থাকে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বইগুলোকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে রাখে। বাতাস হচ্ছে খুব। বিস্তৃকার বড় বড় চুলে ঢেকে গেছে মুখ, কাঁধে। কাঁদেনি সে একবারও। কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের চোখে পানি চলে এসেও মিলিয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। এদের ভেতর অনেক শব্দ জমা থাকে। কিন্তু সেগুলো অশ্রু কিংবা বাক্য হয়ে কখনো প্রকাশ পায় না।
দীপ্তর সঙ্গে বিস্তৃকার ঐ দেখাটাই শেষ দেখা ছিল। সেদিন যাওয়ার সময় বাস এক্সিডেন্টে শায়লা পারভিনের সাথে দীপ্তও মারা যায়। এক্সিডেন্টটা মধ্যেরাতের দিকে হয়েছিল উলটো দিক থেকে আসা একটা মালবাহী ট্রাকের সাথে। দীপ্ত ঘটনাস্থলেই মারা যায়। শায়লাকে কাছের হাসপাতালে নেয়ার একদিন পর তিনিও মারা যান। ওসমান গণী সাহেব ছেলে আর স্ত্রীর মৃত্যুর পর একবার এসেছিলেন খবর দিতে। যাওয়ার জায়গা আর নেই তাঁর। নিজে অবসরে চলে গেছেন। ছেলে মৃত। ঘরবাড়িও করবো করবো বলে করা হয়নি। ভেবেছিলেন দীপ্ত চাকরিতে ঢুকলে বাড়ি বানানোর কাজে হাত দেবেন। কিন্তু সেটা আর হল না। ঘরের আর কি প্রয়োজন। যাদের দরকার ছিল তারাই চলে গেছে। অযথা ঘর তুলে লাভ নেই। দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন। বাকি জীবনটা সেখানেই থেকে যাবেন। বাড়ি বানানোর টাকাটা না হয় সেই ভাইয়ের ঘরেই খরচ করলেন।
ওসমান গণী রোখসানা খানম কিংবা বিস্তৃকার সঙ্গে দেখা করেননি। আশেপাশের বাসার মানুষদের সঙ্গে দেখা করে চলে গেছেন। রোখসানা খানম অফিসে ছিলেন, বিস্তৃকাও ভার্সিটি গিয়েছিল দেখে কেউ জানতে পারেনি ঘটনাটা ঐ মুহূর্তে। জেনেছিল পরে, কাজের মেয়েটার মাধ্যমে। সন্ধ্যায় একসাথে মায়ের সাথে বাসায় ফেরার পর দরজা দিয়ে ঢুকতেই বিস্তৃকাকে আর রোখসানাকে দেখে কাজের মেয়েটা হড়বড়িয়ে বলে উঠেছিল, “বিস্টিকা আপামণি! খালাম্মা! পাশের বাসার উসমান খালুজান আইছিলেন বিল্ডিঙে। কান্না কাটির শব্দ শুনে তো আমি ওবাক! কি হইছে দেখার জন্য নামছিলাম। যায়ে শুনি সেইদিন দীপ্ত ভাই আর খালাম্মা যে বাসে গেছিল? ঐ বাস এসকিডেন কইরা দীপ্ত ভাই, খালাম্মা দুইজনেই মইরা গেছে। খালুজান কবর দিয়াসছে তাদের। খুব কানতেছিল।”
বিস্তৃকা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল। রোখসানা খানম ধাক্কাটা চট করে কাটিয়ে নিলেন। জরুরি গলায় বললেন, “নুরী! কথা বলার আর জিনিস পাস না? একটা চড় দিয়ে দাঁত সব ফেলে দেবো! যা! তাড়াতাড়ি এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।”
অন্ধকার হয়ে গেছে সব। ধীরে ধীরে একটা দুটো করে হাজারটা তারা জ্বলতে শুরু করেছে। যেন কেউ এসে বিশাল একটা কালো চাঁদরে নক্ষত্র এঁকে বিছিয়ে দিয়ে গেল। আশেপাশের সব বাসাগুলো থেকে সন্ধ্যাকালীন পড়াশোনার রোল উঠেছে। গলা ফাটিয়ে প্রত্যেক বাসার ছেলে মেয়েগুলো পড়ছে। শব্দটা শুনতে ভালই লাগে বিস্তৃকার। একটা নিঃশ্বাস ফেলে কোলের অথৈকে বলল, “পড়তে বসবি না?”
“তুমি সাথে না গেলে তো নানী চিল্লাবে খালামণী।” অসহায় মুখে তাকায় মেয়েটা। “জামা ময়লা বললাম না?”
“তুই যা, আমি আসছি। চেঁচালে বলবি খালামণী আগেই বকে দিয়েছে। আর যাতে তোকে আজকে না বকে।”
“এহ্! তোমার আম্মা যে কুটনি বুড়ি!” মুখ ভেংচে বলল অথৈ। “আমার কথা শুনলেই মারার জন্য ঝাড়ু নিয়ে দৌড়াবে। কথায় কথায় যেভাবে আব্বা আম্মা তুলে ধমক দেয়!” শিউরে উঠার মত করল।
হেসে ফেলল বিস্তৃকা, “ঠিক আছে। তুই এগো, আমি আসছি তোর পেছন পেছন। আর দাঁড়া, এই কাপড়গুলো নিয়ে যা সাথে করে। বলবি আমার সাথে ছাদে ছিলি।”
জামার ময়লা দেখি বলল, “এগুলো লেগে পরিষ্কার কাপড়গুলো ময়লা হয়ে যাবে তো!”
“যাবে নারে বাবা! যাঃ না!” কোল থেকে নামিয়ে কাপড়গুলো ধরিয়ে দিল অথৈকে। নিজেও উঠে দাঁড়ালো। অথৈ কাপড় নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দার পা ফেলে নেমে গেল নিচে।
বিস্তৃকা ধীরে ধীরে রেলিঙের দিকে এগিয়ে যায়। মৃদু বাতাস আসছে পশ্চিম দিকটা থেকে। আবছা অন্ধকারেও মাঠটা বোঝা যায়। কদাচিৎ দু একটা সাইকেল আর রিক্সার অবয়ব চোখে পড়ে। এই কলোনির দিকে আসে সেগুলো। বিস্তৃকার খোলা চুল মুখের ওপর এসে পড়ে। আচ্ছা অনেক দূরের ওই অন্ধকার মাঠটা থেকে ক্রাচে করে কেউ হেঁটে আসছে না তো? নাকি চোখের ভুল? বিস্তৃকা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেই অন্ধকার দিগন্তে।
দীপ্তর দেয়া সেই বই দুটোয় কোনো অক্ষরে আন্ডারলাইন ছিল না। তবুও অনেক সময় লেগেছিল বিস্তৃকার কথাটা বুঝতে। বই দুটোর শিরোনামেই ছিল দীপ্তর শেষ কথাটুকু। “কথা হয়ে গেছে”, “দূরবীন”। বিস্তৃকা অনেক ভেবে ভেবে দুটো অর্থ বের করেছিল দীপ্তর দেয়া শেষ বাক্যের। বিস্তৃকার সাথে দীপ্তের সব কথা শেষ হয়ে গেছে, তার জন্য যেন আর পথ চেয়ে অপেক্ষা না করে সে। দূরবীন মানে সেই অপেক্ষা। পথের দিকে তাকিয়ে থাকা। অন্য অর্থটা হল, দীপ্তের সাথে সব কথা হয়ে গেলেও সে বিস্তৃকাকে অপেক্ষা করে থাকতে বলেছে পথ চেয়ে। একদিন সে ফিরে আসবে।
বিস্তৃকা দ্বিতীয় অর্থটাকে সাথে করে নিয়ে বেঁচে আছে। বিয়ে করেনি আর। বিস্তৃকা দীপ্তের অপেক্ষায় আছে। সে নিশ্চয় একদিন ফিরে আসবে। সে নিজেই তো বলে গিয়েছিল, “আমার যেতে ইচ্ছে করছে না!” তাহলে কেনই বা ফিরবে না?
এলোমেলো ঠাণ্ডা একটা বাতাস শুরু হয়েছে। সামান্য কেঁপে ওঠে বিস্তৃকা, এখনও তাকিয়ে রয়েছে অন্ধকার দিগন্তের দিকটায়। মাঠটার ওপর কুয়াশা নামতে আরম্ভ করেছে। সত্যিই কি ক্রাচে ভর করে কেউ আসছে?
(সমাপ্ত)
উৎসর্গঃ
মাহরীন ফেরদৌস আপা।
জানি এই নামে প্রায় কেউই তাকে চিনবে না প্রথমবার বলার পর। সমস্যা নেই। প্রায় বছর খানেক পর কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই দেখা আমার তার সাথে। অফিসের কোনো কাজে সম্ভবত চট্টগ্রামে এসেছিলেন কলিগদের সাথে। দেখা হয়ে গেল সেই সুযোগে। আমাকে দেখেই দুয়েক কথা গড়ানোর পর প্রশ্ন করলেন, “তোমার লেখালেখির কি খবর বাবাকোয়ার আব্বু?” যেন ছোট একটা বাচ্চাকে প্রশ্ন করছেন হাসি হাসি মুখে।
আমি উদাস মুখে উত্তর দিয়েছিলাম, “চাকরি আমাকে অলস বানিয়ে দিচ্ছে আপা। লেখা লেখি ছাদে উঠেছে। অফিস আগে একদিন ছুটি থাকতো, ভাবতাম ছুটির দিনে লিখবো। কিন্তু সেই দিনটা ঘুমিয়েই পার করতাম। লেখালেখি আর হতো না। দুইদিন ছুটি দেয়ার পর ভাবলাম একদিন ঘুমাবো আরেকদিন লিখবো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এখন দুইদিনই ঘুমিয়ে পার করছি!”
“এইভাবে তো চলবে না! লিখতে হবে!” মাথা নাড়লেন তিনি।
কি মনে করে যেন ব্যাগ থেকে আমার পাটের কভারের ডায়েরিটা এগিয়ে বের করে দেখালাম, “দেখেন, কিচ্ছু লেখি নাই, কিচ্ছু আঁকি নাই। ডিডি কিনে দিয়েছিল। মাত্র দুই লাইন লিখে থেমে গেছি। এক কাজ করেন আপনি। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় লিখে দেন যেন আমি লিখে লিখে ঐ পর্যন্ত গিয়ে থামি। তাহলে নিশ্চই আপনার লেখাটা দেখেও লেখবো।”
তিনি হাসিমুখে কথা বলতে বলতেই ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় সত্যি সত্যি লিখে দিয়েছিলেন কথাগুলো।
“প্রিয় বাবাকোয়ার আব্বু শিহাব,
এই ডায়েরির শেষ পাতা পর্যন্ত তোমাকে লিখে লিখে পৌছাতে হবে। প্রয়োজনে উড়তে উড়তে লিখো, ছুটতে ছুটতে কিংবা ঘুমাতে ঘুমাতে....
লিখো এবং লিখতে থাকো......
একুয়া রেজিয়া
৬/০৪/১৫”
আমি লেখার চেষ্টা করেছি আপা!
অথৈকে কাছে টেনে নিয়ে ছাদে রাখা বেতের ইজি চেয়ারটায় বসে বিস্তৃকা। সূর্য ডুবে গেছে। মাগরিবের আযান দিয়ে দেবে একটু পরেই। অন্যান্য দিন আযান দেয়ার পরে বাসায় ফেরত আসে অথৈ। আজ আগে ভাগেই চলে এসেছে জামা ময়লা হয়ে গেছে দেখে। যাতে নানীর বকুনি বেশি না খায়। রোখসানা খানম অবসর নেয়ার পর থেকে খিটখিটে মেজাজের হয়ে গেছেন। সবকিছুতেই তাঁর রাগ; অতিষ্ট তিনি সব বিষয় নিয়ে। ঘরের কর্তাব্যাক্তি যেমন রিয়ার্মেন্টের পর হয়ত একেবারে সাধাসিধা নরম মানুষ অথবা খুব বদরাগী মানুষে পরিণত হন, রোখসানা খানম ঠিক তেমনটাই হয়েছেন। মোশতাক আহাম্মেদ বেঁচে থাকলে হয়তো তেমনটাই হতেন। এ সংসার সাগরে ঢেউয়ের ফেনায় যার উঠানে প্রতিদিন লবণের চর পড়েছে- লবণের আধিক্যের তিক্ততা শেষ জীবনে এসে তাঁর থাকবেই। দোষের কিছু নয়।
তবে মাঝে মাঝে রোখসানা খানমের রাগা রাগীটা বাড়াবাড়ির মাত্রায় পৌছে যায়। কঠিন গলায় নির্দয়ের মত বলে বসেন অথৈকে, “এতসব ছোটলোকি, মারামারি বাপের বাড়িতে গিয়ে করতে পারিস না? তুই এই বাড়ির কে? এই বাড়িতে তোর মা ছিল কেবল। তুই না। তুই ঐ বাড়ির মানুষ। শওকতের মেয়ে। তুই যদি মৃত্তিকার মেয়ে হতি সে তোকে ফেলে মরতো না, তোকে নিয়ে যেত সাথে.....”
অথৈ বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে সেই সময়টা। বিস্তৃকা ঘরে না থাকলেই সাধারণত এমনটা বলেন রোখসানা। বিস্তৃকার সামনে বলেন না। ওর সামনে বললেই অথৈকে বুকে চেপে ধরে কোলে তুলে নিয়ে ছাদে চলে যায় মেয়েটা। কথা বন্ধ করে দেয় মাস খানেকের জন্য রোখসানার সাথে। বিস্তৃকা যে এতটা জেদি ধরণের মেয়ে হতে পারে রোখসানা খানমের ধারণা ছিল না কখনো। যদি শুরুতেই বুঝতে পারতেন, প্রথম মেয়ের মত শেষ মেয়ের জীবনেও নিজের ভুল সিদ্ধান্ত চাপানোর দুঃসাহস করতেন না।
মাস্টার্স পড়াকালীন সময়েই দীপ্ত একটা ব্যাংকে ভাল চাকরি পেয়ে গিয়েছিল। পায়ের প্রতিবন্ধকতা আটকাতে পারেনি তাকে। বিস্তৃকা তখন সকাল সন্ধ্যা টিউশনি করে। রোখসানা খানমের পেনশনের সময় হয়ে গেছে। বিস্তৃকার মাস্টার্স শেষ করতে করতে অবসরে চলে যাবেন তিনি। সংসার চালাতে যে মিশুক টাকা পাঠায় না, তা না। বিদেশে গিয়েছে মাত্র একবছর হচ্ছে ও। ঠিকমত সেখানে দাঁড়িয়েই প্রায় নিয়মিত টাকা পাঠাতো বিদেশ থেকে। হৃত্বিকাও সময়ে সময়ে টাকা পাঠাতো রোখসানা খানমের নামে। তিনজন মানুষের সংসার টেনে নেয়ার জন্য খুব অপ্রতুল কিছু ছিল না সেটা। তাও টিউশনি করে বিস্তৃকা ধীরে ধীরে দায়িত্বটুকু বুঝে নেয়া শুরু করেছিল তখন। এরমাঝে দীপ্তর চাকরি হয়ে যাওয়ার পর কেমন যেন দিনের আলোর মত ওর সম্পর্কটা স্পষ্ট একটা মাত্রা পেতে শুরু করে। এতদিনের খেলাচ্ছলে দীপ্তর বারংবার বলতে থাকা বিয়ের কথাগুলো যেন হঠাৎ করেই খুব অর্থবহ আর সত্যি হয়ে যায়। বিস্তৃকা হয়তো সেভাবে দীপ্তকে কখনো ভেবে দেখেনি, কিন্তু অন্য কাউকেও কোনোদিন সেই স্থানে চিন্তা করেনি। জায়গাটা সব সময়েই খালি ছিল। অথৈ কেজিতে পড়ছে তখন। তাকে নিয়েই সব চিন্তা বিস্তৃকার।
দীপ্ত চাকরি পেয়ে একদিন সন্ধ্যা নামার একটু আগে ছাদে এসেছিল। বিস্তৃকা দড়িতে দেয়া কাপড়গুলো নামাচ্ছে। বাতাস হচ্ছে অনেক। সূর্যটা প্রায় ঢেকেই গেছে মেঘের আড়ালে। বৃষ্টি আসবে মনে হয়। ক্রাচের মৃদু খট খট শব্দ তুলে সিঁড়ি ঘরের মুখে এসে দাঁড়ালো দীপ্ত। বিস্তৃকা কাপড় তোলায় ব্যস্ত। বাতাসে ছাদের ওপরেও গড়াচ্ছে কাপড়। দীপ্ত যে এসেছে দেখতে পায়নি। গলার ওড়নাটা মাফলারের মত প্যাঁচ দিয়ে ঝুঁকে কাপড় তুলছিল।
পেছন থেকে সামান্য কাঁশল দীপ্ত, “বিস্তৃকা?”
ফিরে তাকালো, “কি?”
“ব্যস্ত নাকি?”
“কাপড় নিচ্ছি দেখতেই তো পাচ্ছিস।” মুখ ফিরিয়ে আবার কাপড় তুলতে লাগলো। পাটিতে লাল মরিচ শুঁকাতে দিয়েছিল। বাতাসে ছাদের ওপরে ছড়িয়ে গেছে। ঝাড়ু এনে এক জায়গায় করা ছাড়া উপায় নেই।
গলা খাকারি দিল আবার দীপ্ত, “ইয়ে, একটু কথা ছিল। শুনবে?”
“বলতে থাক। কান খোলা আছে। চিলেকোঠা থেকে একটু ফুল ঝাড়ুটা এনে দিস তো।”
চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসালো দীপ্ত। ভারি ল্যান্সের চশমা। নাক ঘামলে কাঁচের ভারে চশমাও পিছলে নেমে আসে নিচে। ইতস্তত মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর চিলেকোঠার ঘরটার দিকে হাঁটতে লাগলো। ঝাড়ু এনে দেবে বিস্তৃকাকে। দরজা খোলাই আছে। ভেতরে খালি চৌকি আর একটা টেবিল রাখা। কোনো চেয়ার নেই। ময়লা জমে আছে। শলার ঝাড়ু, ফুল ঝাড়ু দুটোই রয়েছে। বালতিও আছে। অনেকদিন আগে এই ঘরটাতেই বিস্তৃকার বড় বোন গলায় ফাঁস খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। দীপ্ত ঝুঁকে ঝাড়ুটা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক এই সময়টাতেই লাশটা পেয়েছিল ওরা। অথচ এখন কোথাও সেই লাশ কিংবা মানুষটার বিন্দু মাত্র ছাপ নেই। যেন কেউ কখনো এখানে মারা যায়নি। স্থির, নীরব হয়ে পড়ে রয়েছে সব। জড় পদার্থের মত।
বাতাসের গতি বাড়তে আরম্ভ করেছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে বেশি দেরি নেই। তাড়াতাড়ি ঝাড়ুটা এনে বিস্তৃকার দিকে বাড়িয়ে দিল, “নেও।”
বিস্তৃকা কোনো কথা না বলে এক দৌড়ে কাপড়গুলো নিচে গিয়ে রেখে এলো। দীপ্ত দাঁড়িয়ে রয়েছে ছাদে। দড়িতে আর কাপড় নেই। কেবল মরিচগুলো নিচে পড়ে আছে। দীপ্তর অস্বস্তি লাগছে। বিস্তৃকাকে কথাগুলো কীভাবে বলতে ভেবে পাচ্ছে না। যতই গুছিয়ে নিচ্ছে, ততই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
খানিক বাদেই বিস্তৃকাকে দেখা গেল বড় একটা এলুমিনিয়ামের চারকোনা বিস্কিটের টিন হাতে করে নিয়ে এসেছে মরিচ তোলার জন্য। এসে কোনো কথা না বলেই ঝাড়ু দিয়ে দ্রুত মরিচগুলো এক জায়গায় করে ফেলতে লাগলো। এক জায়গায় করেই মরিচ তুলে ঢুকিয়ে রাখছে টিনের মধ্যে। পাটির ওপরে বেছানো মরিচগুলোও তুলে নিলো। পাটি উঠিয়ে ঝেড়ে টেরে গুটিয়েছে সবে, ঠিক তখনই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামা শুরু হয়ে গেল। আকাশ অন্ধকার হয়ে গেছে একদম। বিস্তৃকা তৎক্ষণাৎ মরিচের টিন, পাটি আর ঝাড়ু নিয়ে এক দৌড়ে চিলেকোঠার ঘরটায় ঢুকে গেল খোলা দরজা দিয়ে। দীপ্ত নড়েনি। জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তখনো। কয়েক মুহূর্তেই ভিজে নেয়ে গেল দীপ্ত। চিলেকোঠার ঘরটা থেকে বিস্তৃকা চেঁচিয়ে ডাকছে তাকে, “দীপ্ত? এই দীপ্ত? ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন খাম্বার মত! এখানে আয়। ভিজে গেলি তো। শিলা পড়ছে দেখছিস না? মাথা ফাটাবি নাকি?”
দীপ্ত যেন ঘোরের মধ্যে আছে। অন্ধকার হয়ে আসা ছাদটা জুড়ে কেমন যেন একটা ধূসর অলৌকিক আলো। তার মাঝে মুষলধারে বৃষ্টির সাথে সাদা সাদা পিং পং বলের মত শিলা পড়ছে সমস্ত ছাদে। শিলা পড়েছি বলের মত লাফিয়ে উঠছে, ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছে। ছিটকে উঠছে খণ্ড বিখণ্ড হয়ে। ওর গায়েও শিলার পড়ছে.... দীপ্ত মন্ত্রাবিষ্টের মত তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। হাজার হাজার শিলা যেন ঝাপিয়ে নেমে আসছে, আকাশ ভেঙে চুরে সব যেন কাঁচের সাদা টুকরো পড়ে যাচ্ছে। মঞ্চের বড় পর্দা যেন শতচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর ওপর আছড়ে পড়েছে......
“দীপ্ত? কি হল? শুনতে পাচ্ছিস না?” বিস্তৃকা ভয়ার্ত স্বরে ডাক দিল এবার। প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে মাথার খুব কাছ দিয়ে যেন। মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে বিস্তৃকার, “দীপ্ত?”
ঘোরের মাঝে যেন বিস্তৃকার ডাকটা শুনতে পেল ও। কেমন যেন বিহ্বল মনে হল তাকে। কিন্তু পা টেনে টেনে ক্রাচে করে ঠিকই এগিয়ে আসতে লাগলো চিলেকোঠার দরজাটার দিকে।
বিস্তৃকার মনে হচ্ছে যেন হাজার বছর লাগিয়ে ছেলেটা এগিয়ে আসছে। ওর পেছনে পুরো আকাশ চিড়ে বিদ্যুতের নীল শিখা ছুটে যাচ্ছে। অনেক দূরের মাঠের দিকের একটা আমগাছের ওপর বাজ পড়েছে এখান থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কালো ধোঁয়া মিশিয়ে লকলকে আগুণের শিখা উঠেছে। অস্ফুট একটা শব্দ করে বিস্তৃকা ভয়ে পিছিয়ে গেল। গাছটায় আগুন লেগে যাওয়াটা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে ও। টেবিলটার কিনার আঁকরে ধরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়েছে মেঝেতে। জীবনে এই প্রথম সে এভাবে বাজ পড়ে ভেজা গাছেই আগুন ধরে যেতে দেখল। দীপ্তর জন্য ভয়ে ভেতরটা শুঁকিয়ে গেছে মুহূর্তেই। সেই সাথে আরো একটা কারণ বুকের ভেতর ভয়টাকে আরো পাঁকা করে দিয়েছে তার। গাছটায় আগুণ ধরার ঠিক ঐ সময়টাতেই কেন যেন মনে হল ওর ঠিক পেছনে যেখানে বড় আপা ফাঁস খেয়েছিল, ওখানেই আগের মত লাশটা ঝুলছে পেন্ডুলামের মত!
দীপ্ত দরজাটা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্মিত মুখে তাকালো আবছা অন্ধকার টেবিলের নিচে বিমূঢ়ের মত গুটিয়ে গিয়ে বসে থাকা বিস্তৃকার দিকে। “কি হল? ভয় লাগছে নাকি তোমার? একটু বাজ পড়ার শব্দে এতো ভয় পেতে হয়? কি দারুণ শিলা বৃষ্টি হচ্ছে তাই না?” দীপ্ত খসখসে গলায় বলল। সে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে গেছে ঘটনার আকস্মিকতায়। দরজা দিয়ে ঢোকার শেষ মুহূর্তে খেয়াল করেছে মাঠের আম গাছটায় আগুন জ্বলছে বাজ পড়াতে। বিশাল ডালপালা নিমেষেই গায়েব হয়ে গেছে বাজ পড়ে।
বিস্তৃকা উত্তর দিল না। শক্ত হয়ে বসে আছে ওখানেই। দীপ্ত কয়েক মুহূর্ত বোকার মত দাঁড়িয়ে রইল। কি করবে বুঝতে পারল না। তারপর ক্রাচে ভর করে এগিয়ে এসে টেবিলটার কাছে দাঁড়ালো। ক্রাচ দুটো টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে ঝুঁকে টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ল। গিয়ে বসল বিস্তৃকার পাশে।
বিস্তৃকা ভীত চোখে সামনের খোলা দরজা দিয়ে ছাদটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রবল বর্ষণ আর শিলার আছড়ে পড়া দেখছে। আকাশটায় ধূসর কালো রঙের সাথে খানিকটা সবুজ-নীলাভ রঙও যেন মিশে রয়েছে। অদ্ভুত লাগছে দেখতে। যেন ঠিক পৃথিবী নয়। অন্য কোনো জায়গা। তীব্র কন কনে ঠাণ্ডা বাতাস হুড়মুড় করে ঢুকছে খোলা দরজা দিয়ে। বাতাসের ঝাপটায় দরজাটা খট খট শব্দে বাড়ি খাচ্ছে দেয়ালের সাথে।
“তোমার ভয় লাগছে বিস্তৃকা?” দীপ্ত হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল।
উত্তর দিল না সে।
“তোমার ভয় লাগলে আমার হাত ধরে বসে থাকতে পারো। মানুষ ভয় পেলে অন্য কারো হাত ধরে বসে থাকলে ভয় কেটে যায় আস্তে আস্তে।” দীপ্ত কিছু না ভেবেই কথাটা বলল। বাহিরের ঝড়ের তাণ্ডব দেখছে অবাক চোখে। আকাশ খুব দ্রুত বদলে যায়। কয়েক মিনিট আগেও বোঝা যায়নি এতটা ভয়ংকর রকমের ঝড় আসবে।
হঠাৎ টের পেল বিস্তৃকা খুব শক্ত করে ওর হাতটা চেপে ধরেছে। বড় বড় নখের তীব্র চাপে দাগ বসে যাচ্ছে হাতের ওপর। দীপ্ত কিছু একটা বলতে নেবে ওকে, তার আগেই ফিসফিস করে বিস্তৃকা বলে উঠল, “আমার খুব ভয় লাগছে দীপ্ত। আমার কেন যেন একটু আগেই মনে হয়েছিল বড় আপার লাশটা ঠিক আমার পিঠের পেছন দিকটায় ঝুলছে.....”
দীপ্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিস্তৃকার দিকে। মেয়েটা ভয়ে কুঁকড়ে গেছে নিজের ভেতরেই। দীপ্তর শার্টের হাতাটা খামচে ধরে কাঁপছে অপ্রকৃতস্থের মত। চোখে মুখে ভয়ের স্পষ্ট ছাপ ফুটে রয়েছে। দীপ্তর কাছে আশ্রয় চাইছে যেন ভীত হরিণীর মত মেয়েটা।
দীপ্তর ভেতর খুব বড় কিছু একটার ওলট পালট হয়ে গেল সেই সময়। জানেনা উচিত হচ্ছে কিনা, কেন করছে তাও জানে না- শুধু টের পেল সে টেবিলের নিচে বসে দুই হাতে বিস্তৃকার কাঁপতে থাকা শরীরটাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলো পরম মমতায়। মেয়েটা ঠিক পাঁচ বছর আগের দিনটার মত ওর বাহুতে মুখ চেপে ধরে কাঁপছে অসম্ভব একটা ভয়ে।
পৃথিবীতে অলৌকিক বলে কিছুই নেই, সমস্তটাই লৌকিকতায় ভরা। তবু দীপ্তর মনে হয়েছিল সেদিন অবাস্তব একটা পৃথিবীতে ছিল সে বিস্তৃকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটা পাগলের মত বিড়বিড় করে বলেছিল ওকে সেইদিন, “আ-আমার সাথে সাথে থাকিস দীপ্ত। আমার অনেক ভয় করে....”
দীপ্ত ফিসফিস করে উত্তর দিয়েছিল, “আমি কোথাও যাব না বিস্তৃকা.....”
“তুই সেদিন জানি কি বলতে চেয়েছিলি?” বিস্তৃকা রিক্সায় যেতে যেতে দীপ্তর দিকে তাকায়। “ঝড় বাদল এসে তো মাঝখান দিয়ে সব বন্ধ করে দিল। আর শোনা হল না কথাটা।”
সকালে ভার্সিটিতে যাচ্ছিল দুজনেই। দীপ্তর অফিস আছে। ভার্সিটিতে কিছু কাগজ সত্যায়িত করে নিয়ে অফিসে চলে যাবে। যাওয়ার সময় বিস্তৃকাকে ক্যাম্পাসে নামিয়ে দেবে।
“এ? কি?” কথাটায় প্রথমে কান দেয়নি দীপ্ত। যেতে যেতে রাস্তার পাশের নার্সারির দিকে তাকচ্ছিল বার বার। মানিপ্লান্টের চারা থাকলে নেয়া দরজা।
“ঐ যে, সেদিন বিকেলে ছাদে আমাকে কি যেন বলতে চেয়েছিল? পরে তো বললি না।” মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল বিস্তৃকা।
সাথে সাথে লাল হয়ে গেল মুখটা দীপ্তর। ফর্সা মুখ আর কানগুলো লাল হয়ে গেছে। আমতা আমতা করতে লাগল, “ন-না! ক-কিছু না তো!”
“কিছু তো বটেই। ঝেড়ে কেঁশে ফেল এখন।”
মাথা নাড়ল দীপ্ত, “আরে ধুর, কিছু না। এমনি কথা বলতে চেয়েছিলাম তোমার সাথে। আর কিছু না।”
“আশ্চর্য! এতো লুকাছাপার কি আছে! তুই তো স্কুলেই ভাল ছিলি। কথা বার্তা সব হতো স্ট্রেইট। যা বলার ঠাস করে বলে দিতি। এখন দিন দিন এরকম মেয়েলি টাইপের হয়ে যাচ্ছিস কেন? আমার সাথে তোর এত ফর্মালিটি কিসের?” বিরক্ত গলায় বলল বিস্তৃকা।
ঢোক গিলল দীপ্ত। “আ-আসলে সে রকম কোনো ব্যাপার না...”
“তো কি রকম ব্যাপার? আমাদের দীপ্ত সাহেব যিনি এক কালে মঞ্চ নাটক করে পাড়া কাঁপিয়েছেন, গান গেয়ে, আবৃত্তি করে হাজারো রমণীর রাতের ঘুম হারাম করেছেন, ইন্টার ডিপার্টম্যান্ট ডিবেটে শেষ্ঠ বক্তা হয়েছেন, কবিতা লিখে পুরষ্কারও পর্যন্ত জিতেছেন- তিনি কিনা আমার সাথেই কথা বলার সময় কথা খুঁজে পান না! একটা কথা বলতে গেলেও চৌদ্দবার চিন্তা করেন যে আমি ধোলাই টোলাই দেব কিনা!” হতাশার সুরে বলল বিস্তৃকা, “তুই অনেক বদলে গেছিস দীপ্ত!”
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত বিস্তৃকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল দীপ্ত। কোন কথা বলল না।
“কি হল? এরকম ছাগলের মত তাকিয়ে আছিস কেন আমার দিকে? আমি কাঁঠাল পাতা না!”
দীপ্ত হেসে ফেলল হঠাৎ। আপন মনেই মাথা নাড়তে নাড়তে হাসছে। বিস্তৃকা অবাক হয়ে বলল, “হাসছিস ক্যান! আশ্চর্য!”
দীপ্ত উত্তর না দিয়ে ওর ব্যাগটার চেইন খুলে ভেতরে হাতড়ে হাতড়ে একটা সবুজ বল পয়েন্ট কলম আর একটা বই বের করল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “ছবির দেশে, কবিতার দেশে”। মলাটের ওপর দেখা যাচ্ছে কোন লাল চুলের তরুণী চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। বিস্তৃকা সপ্রশ্ন চোখে তাকালো ওর দিকে। কিন্তু দীপ্ত কিছু না বলে বইটা খুলে এক মনে দ্রুত পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলো আর কি যেন দাগাতে লাগলো সবুজ কালিতে। বিস্তৃকা দেখার চেষ্ঠা করতে লাগলো উঁকি দিয়ে। কিন্তু রিক্সার ঝাঁকি আর এক হাত দিয়ে বইটাকে আড়াল করে রেখেছে বলে দেখতে পাচ্ছে না সে। “কি করছিস?”
উত্তর দিচ্ছে না দীপ্ত। কি যেন খুঁজছে পৃষ্ঠাগুলোয়। না পেলে দ্রুত উলটে চলে যাচ্ছে পরের পৃষ্ঠায়। আবার পাওয়ার সাথে সাথেই দাগিয়ে ফেলছে। দীপ্তকে যে বিস্তৃকা একটা প্রশ্ন করেছে বেমালুম ভুলে গেছে যেন। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল। ওদের রিক্সাটা ক্যাম্পাসে চলে এসেছে। দীপ্তর কাজ রেজিস্ট্রার ভবনে। বিস্তৃকাকে ওর ফ্যাকাল্টিতে আগে নামিয়ে দিতে এলো।
বিস্তৃকা কোলের ওপর ফেলে রাখা ব্যাগটা নিয়ে ওড়না ঠিক ঠাক করতে করে সাবধানে নেমে গেল রিক্সা থেকে। দীপ্ত তখনো বই দাগানোয় ডুবে আছে। ব্যস্ত গলায় বলল তাকে, “যা তাহলে। কাজ শেষ করে তো অফিস যাবি নাকি? মাস্টার্সের ক্লাস করবি কীভাবে? এরকম চাকরি করে করে ক্লাস করা যায়?”
ঠোঁট ওল্টালো দীপ্ত, “ম্যানেজ করে নেব। সমস্যা হবে না আশা করি।” ওর দিকে তাকালো না, এখনো চশমার আড়ালে চোখ দুটো ঘুরছে পৃষ্ঠার ওপর।
“ঠিক আছে। গেলাম।” ঘুরে চলে যেতে নিলো বিস্তৃকা, কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে নিয়েছে।
“দাঁড়াও! দাঁড়াও!!” পেছন থেকে ডেকে উঠল দীপ্ত। রীতিমত চিৎকার দিয়ে ফেলেছে। আশেপাশের বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী অবাক মুখে তাকাতে লাগলো।
রিক্সার কাছে ফিরে আসল আবার বিস্তৃকা, সামান্য কুঁচকে গেছে ভ্রূ দুটো বিরক্তিতে, “কি?”
সুনীলের বইটা এগিয়ে দিল ওর দিকে, “এটা নাও।”
বইটা হাতে নিল অবাক মুখে, “আমি কি করবো এই বই দিয়ে? কম করে হলেও দশবার পড়েছি।”
“বিকেলে আমি অফিস থেকে ফেরার সময় আবার আসবো তোমাকে নিতে। তখন না হয় দিয়ে দিও। ততক্ষণে এগারোবারের মত একটা রিভিসন দিয়ে দিও।” সরল হাসি হাসল, “যাই?.... মামা, চলেন, রেজিস্ট্রার ভবনে যাব।” রিক্সাওয়ালার কাঁধে হাত দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে বলল।
বই হাতে নিয়ে বিস্তৃকা দাঁড়িয়ে আছে। রিক্সাটা চলে যাচ্ছে। ফিরে তাকাচ্ছে না ছেলেটা একবারও। মোড় ঘুরতেই হারিয়ে গেল রিক্সা।
বিস্তৃকা ঘুরে হাঁটতে লাগলো ক্লাসের দিকে। তিন তলায় ক্লাস। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সিঁড়ির জানালাগুলো দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশে মেঘ করেছে অনেক। বৃষ্টি আসবে। এমনিতেই ইদানীং বৃষ্টি হচ্ছে খুব। ছাতা ছাড়া চলাফেরা করা যায় না। সঙ্গে একটা ছাতা ভাঁজ করা থাকে সব সময়। ক্লাসে এসে দেখে কেউ নেই। আসেনি এখন ক্লাস করতে। আগে ওদের ক্লাসে অনেক মেয়ে ছিল। অনার্সের পর থেকে মেয়ের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমে গেছে। বিয়ের পর পড়াশোনা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে। খাঁটি ঘর গেরস্থি নিয়ে ব্যস্ত সবাই। বাচ্চাও হয়ে গেছে কয়েক জনের। হঠাৎ হঠাৎ কেউ ভার্সিটিতে আসে। চোখ মুখ শুকনো হয়ে থাকে। যেন বিয়ের পর কোনোমতে মাস্টার্স ডিগ্রীটা নিয়ে সাবধানে বেরিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে। তাদের দিতে- নিয়ে যেতে সব সময় সাদা কালো রঙের দামী গাড়ি আসে ক্যাম্পাসে। কখন শ্বশুরবাড়ীর ড্রাইভার, কখনো স্বামী নিজেই আসে সেই গাড়িতে।
বিস্তৃকা মাঝামাঝি একটা বেঞ্চে ব্যাগটা রেখে বসে পড়ল। হাতে দীপ্তর দেয়া সুনীলের “ছবির দেশে, কবিতার দেশে” বইটা। অলস দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল বইটার মলাটের ছবিটার দিকে। তারপর ওল্টালো। আগেও অনেকবার পড়েছে বইটা। কাহিনী প্রায় মুখস্ত। সুনীলের আমেরিকা আর ফ্রান্স ভ্রমণের কাহিনী নিয়ে লেখা ছিল। সেই সময় পরিচয় হওয়া মার্গারিট ম্যাতিউ নামের ফরাসী এক মেয়ের সাথে তার প্রেম ছিল। কাহিনীর অর্ধেক অংশ মার্গারিট ম্যাতিউকে নিয়ে। তার মৃত্যু বা রহস্যময় অন্তর্ধানের পর বিচ্ছিন্ন সুনীলকে নিয়ে বইটা আরো অনেকদূর এগিয়েছিল। কিন্তু পড়তে ভাল লাগেনি আর। হয়ত সুনীল আর মার্গারিটের ভালবাসার গল্পটা অতটুকেই শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে। আপন মনেই বইয়ের পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলো বিস্তৃকা। রিক্সায় বসে সবুজ কলম দিয়ে দীপ্ত কি দাগাচ্ছিল সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টেই যাচ্ছে। কোথাও কোনো সবুজ দাগ এখনো পায়নি। ক্লাসের ভেতর আলো কম। বাহিরে এর মাঝেই টিপ টিপ করে বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে। জানালার দিকে ঘেষে বসলো আলোর জন্য। কারেন্ট নেই।
জানালার কাছে এসে বসতেই প্রথম খেয়াল করল একটা পৃষ্ঠায় সবুজ কালিতে একটা শব্দে শুধু একটা অক্ষরের নিচে দাগ দেয়া। লাইনটা হচ্ছে, “যে কবিতা পড়ে না, তার বেঁচে থাকা উচিত না।” কবিতা শব্দটার ‘বি’এর নিচে আন্ডারলাইন করেছে দীপ্ত। লাইনের পাশে ১ লেখা।
এরপর অনেকগুলো পৃষ্ঠা বাদ গেছে। অনেকগুলো পাতা ওল্টানোর পর আবার একটা সবুজ দাগ পাওয়া গেল। “ত্রিস্তফ এর মধ্যে এত টাকা জমিয়ে ফেলেছে যে দেশ থেকে সে আনিয়েছে তার স্ত্রীকে।” স্ত্রী অক্ষরটার নিচে সবুজ দাগ দেখা। পাশেই লেখা ২।
এর দুয়েক পৃষ্ঠা বাদেই আবার একটা লাইন, “এক রেস্তোরাঁর মধ্যে দাঁড়িয়ে সিলিন চিৎকার করে বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি একজন কাওয়ার্ড!” কাওয়ার্ড শব্দের ‘কা’এর নিচে দাগ। পাশে ৩ লেখা।
সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে গেল পুরো ব্যাপারটা বিস্তৃকার কাছে। দীপ্ত অক্ষর বেছে বেছে ক্রমিক নাম্বার নিয়ে নিশ্চয় কোনো কথা লিখে গেছে তার জন্য। কারণ প্রথম তিনটা অক্ষর নিয়ে যা দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে- বিস্ত্রীকা, ভাল করে বানান লিখলে বিস্তৃকা নামটা হয়!
বিস্তৃকা সোজা হয়ে বসল, দ্রুত হাতে পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছে, তীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে দেখছে শব্দগুলো।
একে একে পাওয়া যাচ্ছে লাইন সব।
“.....এবং ছাপানো কাব্য আলকুল্স (৪) আমার পকেটে/ তার কণ্ঠস্বর মিউজিয়ামে (৫).....” থেকে ‘আমি’।
“মার্গারিট বললো, আমার বাড়িতে তোমাকেও (৬) কি নিয়ে যাওয়া উচিত নয়? বেশি দূরে নয়, ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা।” থেকে ‘তোমাকে’
“ভালোবাসি (৭) মেঘ, যে-সব মেঘেরা ভেসে যায়, ঐ ওখানে.... ঐ সেখানে..... বিস্ময়ময় মেঘেরা!”
লাইনটা দাঁড়ালো, “বিস্তৃকা আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
বিস্তৃকা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে বইটার পাতার দিকে। ধীরে ধীরে আরো কিছু লাইন পাওয়া গেল। যেগুলো থেকে শব্দ নিয়ে যোগ করলে মোটমাট যা দাঁড়ায়,
“বিস্তৃকা আমি তোমাকে ভালোবাসি! তুমি পাশে না থাকলে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। আমাকে গুছিয়ে দেয়ার জন্য হলেও তোমাকে লাগবে। তুমি আশাপাশে থাকলেই শুধু মনে হয় আমার চারপাশে হাজারটা চড়ুই পাখি উড়ছে কলকাকুলিতে পৃথিবী ভরিয়ে দিয়ে। আমি বিস্মিত হয়ে সেই আকাশটা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছি!”
বিস্তৃকা বইটা বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দিল। জানালার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে বাহিরে অঝোর ধারায় হতে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। ক্যাম্পাসের বাতাবি লেবুর গাছগুলোও সবুজ পাতায় বৃষ্টির পানি পড়ে চিক চিক করছে, দুলছে যেন ঢেউ তুলে। মিষ্টি কাঁচা একটা লেবু লেবু গন্ধ ক্লাসের ভেতর পর্যন্ত চলে আসছে। বিস্তৃকার গায়ে ভেজে বাতাস আর বৃষ্টির ছটা লাগছে। নড়ছে না তবুও। এক গ্রিলের সাথে মুখটাকে চেপে ধরে তাকিয়েই আছে বাহিরের রাস্তাঘাট আর গাছপালার দিকে। ছাতা নিয়ে দৌড়াচ্ছে দুয়েকজন ছাত্র ছাত্রী। পরতে পরতে যেন বাতাস ছিটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টিগুলোকে।
বিস্তৃকার চোখ হঠাৎ ঝাপসা হয়ে আসে।
বিকেলে রিক্সায় উঠে বসে অনেকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ ছিল। বৃষ্টি নেই। থেমে গেছে। মেঘ সরে গিয়ে শেষ বিকেলের লাল সূর্যটা বেরিয়ে এসেছে। গাছপালা থেকে শুরু করে ভেজা পথঘাট সব কেমন যেন হলদে কমলা রঙের হয়ে গেছে। পথ ঘাটে এতক্ষণে মানুষ বের হয়েছে। রিক্সাটা পানি জমে থাকা রাস্তার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। কথা বলছে না কেউ। না দীপ্ত, না বিস্তৃকা। দুজনেই নীরবে রাস্তার দুইপাশে তাকিয়েছে আছে, একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে না।
কতক্ষণ এভাবে নীরবে কেটেছে খেয়াল নেই কারো। একটা সময় দীপ্ত নীরবতা ভাঙল কাঁশি দিয়ে, “সব ক্লাস হয়েছে তোমার?”
বিস্তৃকা তাকালো না ওর দিকে। কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে “হু” জাতীয় শব্দ করল।
আবার চুপচাপ দুজনেই। সময় বয়ে যাচ্ছে। কেউ কথা বলছে না। রিক্সা ঘুরতে ঘুরতে ওদের কলোনিতে ঢুকে ওদের বাড়ির সামনে চলে এলো। বিস্তৃকা আর দীপ্ত নেমে ভাড়া দিয়ে হাঁটতে লাগলো বিল্ডিঙের দিকে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না এখনো পর্যন্ত। দীপ্ত ক্রাচ নিয়ে সামনে সামনে হাঁটছে। বিস্তৃকা পেছন পেছন। বাসার সামনের ফাঁকা জায়গাটায় অন্য বাসার ছেলে মেয়েগুলো সাত চারা খেলছে। সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে এলো ওরা। পাশাপাশি বাসা, মুখোমুখি দরজা। এই সময়ে বিস্তৃকাদের বাসায় কাজের নতুন মেয়েটা ছাড়া আর কেউ থাকে না। অথৈ ওর ক্লাসের ছেলে মেয়েদের সাথে খেলতে যায়। রোখসানা খানম ফেরেন অফিস থেকে। দরজার পাশের কলিং বেলে চাপ দিয়ে দুজনেই যার যার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। অস্বস্তি লাগছে দুজনেরই।
ভেতর থেকে পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে বিস্তৃকা। কাজের মেয়েটা দরজা খুলতে আসছে। আচমকা ঘুরে তাকালো দীপ্তর দিকে। ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল ছেলেটা। বিস্তৃকার চোখে চোখ পড়তেই সরিয়ে নিল দৃষ্টি। বিস্তৃকা জোরে একটা দম নিয়ে বেশ সহজ গলায় বলার চেষ্টা করল, “সারাদিন কি এই ছেঁড়া পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে অফিস করেছো তুমি? রিক্সা থেকে কীভাবে নামো যে দুদিন পর পরই শার্ট, পাঞ্জাবী ছিঁড়ে ফেলো?”
ক্রাচে ভর করে দেয়ালে পিঠে হেলান দিয়ে দীপ্ত মুখ ঝুঁকিয়ে রেখেছিল। বিস্তৃকার কথাটা কানে যাওয়া মাত্র জমে গেল যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। ছেঁড়া পাঞ্জাবীর দিকে একবারও তাকালো না দীপ্ত, খুব ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো বিস্তৃকার দিকে। চোখে অবিশ্বাসী একটা দৃষ্টি।
বিস্তৃকা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলেটার সামনে সহজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। কিন্তু পারছে না। রীতিমত জ্বরের কাঁপুনি এসে গেছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে মুখ ঘুরিয়ে নিল দরজার দিকে। দীপ্তর দিকে তাকাতে পারছে না।
দীপ্ত স্তম্ভিত মুখে তাকিয়ে আছে। সেই ছোটবেলা থেকে তুই তুই ডেকে আসা মেয়েটা আজ তুমি ডেকে ফেলায় যেন সব ওলট পালট হয়ে গেছে তার ভেতর। অস্পষ্ট গলায় কেবল ডাকল, “কি বললে আমাকে?”
বিস্তৃকা মুখ ঝুঁকিয়ে দরজাটার গায়ে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে। মেয়েটা এখনো দরজা খুলছে না কেন? পেছন দিকে তাকানোর সাহস হারিয়ে ফেলেছে বিস্তৃকা। মেয়েটা এসে দরজা খুলে দিলেই বেঁচে যায় যেন। মনের ভেতর যেন হাজারটা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে নিষ্ঠুরের মত আঘাত করে। বিস্তৃকার প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছে পেছনে তাকিয়ে দীপ্তর মুখটা একটু দেখে। কিন্তু সাহস হারিয়ে ফেলেছে হঠাৎ করেই। সম্বোধনের সীমারেখার দাগ টেনে আচমকাই যেন অন্য একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। আগের সেই মানুষটা নেই। নতুন কেউ।
দীপ্ত আবারো ডাকলো, “বিস্তৃকা?”
খুট করে শব্দ হল দরজা খোলার। বিস্তৃকাদের দরজাটা খুলেছে কাজের মেয়েটা। দরজা খোলামাত্রই বিস্তৃকা এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। দীপ্ত হতভম্ব হয়ে তখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো প্রশ্ন জমা নিয়ে।
বিস্তৃকার সঙ্গে সেই দিনের পর বহুদিন দীপ্তর কথা হয়নি। কেন হয়নি সেটা দীপ্তও জানে না, বিস্তৃকাও জানে না। অপরিচিত মানুষের পরিচয় হলে জড়তা কেটে যায়। কিন্তু পরিচিত মানুষের মাঝে যদি দ্বিতীয়বার পরিচয় ঘটে- সে জড়তা কাটতে বহু সময় লেগে যায়। আর সেটা যদি কোন মেয়ের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘসূত্রীতা বাড়বেই। বিস্তৃকারও বেড়েছিল। একসাথে ভার্সিটিতে আর যেত না। ছাদেও খুব কম উঠতো। দীপ্তকে ছাদে আসতে দেখলেই এক দৌড়ে নেমে চলে যেত বাসায়। সব কথা যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে ফেলেছিল।
যতই দিন যাচ্ছিল, দীপ্তর অস্থিরতা বাড়তেই থাকে। শেষে থাকতে না পেরে জহির রায়হানের “বরফ গলা নদী” উপন্যাসটা অথৈয়ের হাতে দিয়ে বিস্তৃকার কাছে পাঠায় দীপ্ত। গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে আছে, বিস্তৃকা জেগে জেগে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় সেই বইয়ে সবুজ কালিতে দাগানো অক্ষরগুলো জড়ো করে বাক্য তৈরি করতে থাকে। দীপ্ত আবারও চিঠি লিখেছে তাকে সেদিনের মত।
“বিস্তৃকা, কি হয়েছে তোমার, আমাকে কেন এড়িয়ে যাচ্ছো। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব।”
বিস্তৃকা টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে বসে ছিল জানালাটার কাছে। তারপর ভোরের দিকে আবার বাতি জ্বালিয়ে নীল কালিতে একই ভাবে সেই উপন্যাসে কিছু অক্ষর দাগিয়ে দেয়। অথৈয়ের হাতে করে ফেরত পাঠায় দীপ্তর কাছে পরের দিন।
“আমি জানি না আমার কি হয়েছে। আমারও অনেক ইচ্ছে করে তোমার সাথে কথা বলতে। কিন্তু কেন যেন পারি না। তুমি কষ্ট পেও না। আমাকে আরেকটু সময় দাও। আমার একদিনের হঠাৎ সাহস যে আমাকে এতোটা ভীরু বানিয়ে দেবে আমার জানা ছিল না।”
দুজন মানুষের স্থবির সম্পর্ক যখন এগোতে চায় না। তৃতীয় কারো সাহায্য সেখানে অবশ্যই লাগে। নৌকাকে ঘাট থেকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দেয়ার জন্য কারো থাকা লাগে। দীপ্ত-বিস্তৃকার সম্পর্কটাকে নিয়ে তাই পারিবারিক পর্যায়ে আলাপ তুলতে চাইলেন দীপ্তর মা শায়লা পারভিন। এক সন্ধ্যায় আগের দিনগুলোর মতই বেড়াতে এলেন রোখসানা খানমের ঘরে। গল্প করলেন দীর্ঘ সময় ধরে। নানান পারিবারিক আলাপ, সমস্যা নিয়ে কথা হতে থাকলো দুজনের মাঝেই।
রোখসানা খানমের অবসরের সময় হয়ে গেছে প্রায়, তিনি সামান্য চিন্তিত গলায় বললেন, “ স্বামীর চাকরিটা করে এতদিন সংসারটা টেনেছিলাম। এখন তো সেই চাকরির সময়ও ফুরিয়ে এলো। বাকি দিনগুলো কেমন করে কাটবে সেটাই ভাবি মাঝে মাঝে। অফিসের অভ্যাস করতে চাইনি কখনো। পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল। অথচ এখন প্রায়ই চিন্তা করি, অফিস ছাড়া থাকবো কেমন করে? ঘর গেরস্থির অভ্যাস তো সেই কবে হারিয়ে ফেলেছি।”
শায়লা পারভিন সমঝদারের মত মাথা ঝাঁকালেন, “তা ঠিক ভাবী। চাকরি বাকরি যারা করে, ঘরে থাকা আর হয় না তার। দীপ্তর আব্বাকেই দেখেন, গত বছর অবসর নেয়ার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে। সারাক্ষণ বাচ্চা মানুষের মত কিছু না কিছু একটা করার চেষ্টা করতেই থাকে। বেকারত্ব ভাল লাগে না। অফিস নেই দেখে অস্থির হয়ে যায় মানুষটা।”
রোখসানা চোখের চশমাটা খুলে বেড সাইড টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, “অফিসের কাজ করে করে মাথা আর চোখের অবস্থা খারাপ করে ফেলেছি। অবসরে আসলে এই দুটো একটু যা রেস্ট পাবে আরকি। সাইনোসাটিসের দোষ, অনিদ্রা, বাতের ব্যথা, হাজারটা সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছি বুঝলেন ভাবী? এত বছরে আসলে যা বুঝেছি, একা থাকাটা আসলেই অনেক কঠিন ব্যাপার। বিস্তৃকার আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারটার বোঝা যখন কাঁধে এসে পড়লো, ঠিক তখন যতটা অসহায় লেগেছিল, আজও লাগে। সব শক্ত হাতে সামাল দিয়েও কোথায় যেন একটা সুর কাটা পড়েছে বুঝলেন। আপনি তো সবই দেখেছেন এই এত বছর এক সাথে আছি। আমার বড় মেয়েটার মৃত্যুর পর থেকে সব আত্মবিশ্বাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে...... মাঝে মাঝে ভাবনা হয়, আসলে বেঁচে থাকা কাকে বলে? কতটুকু পেলে আমার বলা উচিত, আমি সন্তুষ্ট? আমার অবস্থান, আমার প্রাপ্তি নিয়ে আমি খুশি?” বালিশ সোজা করে পিঠে হেলান দিলেন বিছানার সাথে।
শায়লা পারভিন সব কথা বুঝতে পারছিলেন না রোখসানার। চাকরি বাকরি করা শিক্ষিত মহিলা তিনি। কথা বার্তা স্বাভাবিক ভাবেই উঁচু স্তরের হবে জানা কথা। শায়লা ইতস্তত গলায় বললেন, “ভাবী তো জানেন যে আমার ছেলেটা, মানে দীপ্ত রূপালী ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে?”
“হ্যাঁ। শুনলাম তো। অফিস কেমন লাগছে ওর? সময়ই তো পাই না যে ডেকে জিজ্ঞেস করবো?” কপালের দুপাশ আঙুল দিয়ে টিপে ধরে আছেন। মাথা ব্যথা করছে তাঁর। এর মাঝেই কথা বলে চলেছেন শায়লা পারভিনের সাথে। যদিও কথা বলতে তেমন একটা ভাল লাগছে না। সমান বুদ্ধির মানুষের সাথে কথা বলে আরাম পাওয়া যায়। শায়লা পারভিনের বুদ্ধি শুদ্ধি বা জ্ঞান রোখসানার ধারে কাছেও নেই। এ জন্য আলাপ করে আরাম পাচ্ছেন না। দীপ্তর কথা তোলাতে দায় সারা ভাবে তাই জিজ্ঞেস করলেন কথাটা। সারাদিন অফিসের অডিট নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় কদিন ধরে। ঘরে ফেরার পর থেকে প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন তিন ঘন্টার জন্য। পরে উঠে রাতের খাবার খান। কিন্তু আজকে আর ঘুমাতে পারেননি। শায়লা পারভিন আসার পর থেকে কথা চলছেই, থামার নাম নেই।
“ভালই তো লাগছে দীপ্ত বলে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ- এডজাস্ট হতে সময় লাগবে আরকি।”
“হুম, মন দিয়ে চাকরি করতে বলবেন ওকে। অফিসে লোকজনের আজে বাজে কথায় কান দিতে নিষেধ করে দেবেন। আজকাল এরকম ভাল চাকরি সবাই পায় না। তারওপর দীপ্তর এতবড় ল্যাকিংস থাকার পরেও যখন চাকরি পেয়েছে, লেগে থাকতে বলবেন। উন্নতি হবে।” চোখ বন্ধ করে বললেন রোখসানা।
শায়লা পারভিন মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। এভাবে স্পষ্ট ইঙ্গিতে যে দীপ্তর পায়ের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলে বসবেন রোখসানা- ভাবতে পারেননি তিনি। সামলে নেয়ার চেষ্টা করলেন দ্রুত, “অফিসের সবাই বেশ ইম্প্রেসড। ছেলেটা কাজের আছে আমার। পড়াশোনাতে সব সময় এক থেকে পাঁচের মধ্যে থাকতো।”
সায় দিলেন, “হ্যাঁ। আমার বড় মেয়েটার মতই। পড়াশোনায় বেশ ভাল। স্কলারশিপ পেয়েছিল মনে আছে। মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন আপনি।”
উৎসাহ পেলেন যেন শায়লা, “ডিবেটেও চ্যাম্পিয়ান হয়েছে তো! আপনি তো বাসায় যান না অনেকদিন। ক্রেস্টগুলো দেখাতে পারতাম।”
“তাই নাকি? হুম! ভাল তো।”
“ইয়ে, ভাবী?”
“হুম?”
“একটা কথা বলতে এসেছিলাম আসলে।”
“বলেন?”
“ছেলেটা তো চাকরি পেয়ে গেল। তাও যেন তেন না, সরকারী চাকরি। ভাবছি দেরি টেরি না করে ছেলেটাকে বিয়ে দিয়ে দেবো। কম বয়স থাকতে থাকতে বিয়ে শাদী করলে সংসার ভাল হয়। জীবনেও উন্নতি হবে। আপনার কি মনে হয়? ভাল চিন্তা না?” রোখসানার দিকে উজ্জ্বল মুখে তাকালেন জবাবের আশায়।
নড়ে চড়ে বসলেন রোখসানা, গম্ভীর মুখে বললেন, “চিন্তা তো খারাপ না ভাবী। কথা হচ্ছে আরেকজন মানুষের দায়িত্ব বুঝে নেয়া চাট্টিখানি কথা না। মাত্র তো চাকরি ধরেছে। আগে থিতু হতে দিতেন....”
“আমরা আছি না? আমরা সব দেখবো। যা লাগে তাই দেয়ার চেষ্টা করবো। একদিনেই তো ছেলে কখনো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে বিয়ে করতে যায় না। ধীরে ধীরে হয়। আপাতত আমরা মা বাবাই সব পুষিয়ে দেবো। তাও ছেলে একটু সংসারী হোক। কি বলেন?”
“আপনাদের যা ইচ্ছে। মা বাবার চিন্তা ভাবনাই আসল কথা। আর ছেলে যদি বিয়ের ইচ্ছে থাকে, তাহলে তো কথা থাকছে না। তাই না?” রোখসানা সামান্য বিরক্তি চেপে কথাটা বললেন। কথা বলতে মোটেও ভাল লাগছে না তাঁর। কিন্তু এই মহিলার ওঠার নামই নেই।
“মেয়ে তাহলে দেখা দরকার কি বলেন?” হাসি হাসি গলায় বললেন। “কাছাকাছি মেয়ের বাড়ি হলে খুব ভাল হয়। দূর দেশের মেয়ে এনে লাভ নেই।” সরাসরি বিস্তৃকার নামটা নিলেন না। চাচ্ছিলেন রোখসানাই যেন নিজে থেকে ইঙ্গিতটা বুঝে নেন।
রোখসানা খানক বুদ্ধিমতী নারী। তিনি ইঙ্গিতটা স্পষ্টই বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু সাবধানে পাশ কাটিয়ে গেলেন, “কাছাকাছি? আসলে তো ভাবী কাজটা বেশ মুশকিল বুঝলেন। কাছাকাছি বলেন আর দূরের অঞ্চলের মেয়েই বলেন, বিয়েতে রাজী করানোটা অনেক ঝামেলার কাজ হয়ে যাবে। দীপ্তর পায়ের সমস্যাটার জন্য কোন মেয়ে রাজী হবে বলেন? একটা পা নেই, ক্রাচে করে চলাফেরা করতে হয়, লিমিটেশনের ইয়ত্তা নেই। মেয়ে কিংবা মেয়ের ফ্যামেলিই তো রাজী হবে না......” রোখসানা চোখ বন্ধ করেই কথা বলছেন। না তাকিয়েও বুঝতে পারছেন তাঁর মুখের দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছেন শায়লা।
কিছু শোনার অপেক্ষা করলেন না শায়লার কাছ থেকে। রোখসানা একটু দম নিয়ে চোখ খুলে উপকারী গলায় বললেন, “তবু আমি চেষ্টা করে দেখবো খোঁজ লাগাতে। দেখি ভাল মেয়ে পাই কিনা। সন্ধানে তো ভাল মেয়ে নেই। পেলেই জানাবো আপনাকে।”
শায়লা পারভিন চুপ হয়ে গেছেন। অতি সাবধানে না বোধক মতামত দেয়ার পর সেটা না বুঝতে পারার মত অবুঝ নন তিনি। রোখসানা খানম ভদ্র উপায়ে না বলে দিয়েছেন তাঁকে। তবু কেন যেন বলে ফেললেন, “বিস্তৃকার বিয়ে শাদী নিয়ে কিছু ভাবছেন না?” বলেই বুঝলেন বোকার মত প্রশ্ন করেছেন।
রোখসানা অবুঝের কাণ্ড দেখে বড়দের মত হাসি দিয়ে বললেন, “চিন্তা তো আছেই। পাত্র দেখছি। হৃত্বিকা বেশ কয়েকটা ছেলের ছবিও পাঠিয়েছে বাহির থেকে। ওখানেই সেটেল্ড। ভাবছি একটু খোঁজ খবর লাগিয়ে দেখবো। তাছাড়া মিশুকেরও হাতে নাকি একটা ভাল ছেলে আছে ওদেরই অফিসের। খুব নাম করা আর্কিটেক্ট। ঝিনাইদহে বাড়ি। সেও বাহিরেই থাকছে সতেরো বছর ধরে। ভাল মনে হলে ওর সাথেই দিয়ে দেবো। শুনেছি ছেলে নাকি নিজেই আগ্রহ করে মিশুককে রিকোয়েস্ট করেছে বিস্তৃকার জন্য। মিশুকের কম্পিউটারে বিস্তৃকার ছবি দেখেই মনে ধরে গেছে বলে। এই মেয়েকে ছাড়া নাকি তার চলবে না! নাছোড়বান্দা ছেলে! আমাকেও বার কয়েক ফোন দিয়েছিল বাহির থেকে।” আনন্দেই হোক কি প্রদর্শনে- তৃপ্তির হাসি হেসে চোখ মুদলেন।
শায়লা পারভিন বোবা হয়ে গেলেন যেন কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ক্ষীণ গলায় বললেন, “অনেক গল্প করা হল ভাবী। আজ যাই। আপনি রেস্ট করেন। আপনার তো সাইনোসাইটিসের দোষ, মাথা ব্যথা করলে ঘুমিয়ে পড়েন। অযথা বক বক করে লাভ নেই।” ঘুরে বিছানা থেকে নেমে গেলেন শায়লা। রোখসানা খানম চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে আছেন। সামান্য সৌজন্যতাবোধ দেখিয়ে উঠে সোজা হয়ে বসলেন না। হতাশ মুখে শায়লা একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সেদিনের ঘটনাটার পর পরিস্থিতি বদলে গেলে। শায়লা পারভিন বেঁকে বসলেন দীপ্ত আর বিস্তৃকার সম্পর্কটা নিয়ে। নিজের ছেলেকে রোখসানা খানম খোঁড়া বলেছেন দেখে শায়লা ক্ষেপে গেছেন। তাঁর ছেলের জন্য মেয়ে পাওয়া যাবে কি যাবে না তিনি দেখিয়ে দেবেন। কিসের এত অহংকার ঐ মহিলার? কি আছে? দুটো ছেলে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছেন দেখে দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না? বড় একটা মেয়ে যে গলায় ফাঁস খেয়ে মরেছিল- সেটার জন্য কি সামান্যতম দ্বায়ী নয় সে? কি ভেবেছে নিজেকে?
ব্যাপারটা শুধু শায়লা পারভিন কিংবা দীপ্তর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে ভাল হত। কিন্তু দীপ্তর বাবা ওসমান গণী সাহেব শোনার পর ভেবেছিলেন বিষয়টাকে অন্যভাবে ঠিক করতে। তিনি মিশুককে চিঠি লিখে পাঠালেন বিস্তৃকার সঙ্গে দীপ্তর বিয়ে নিয়ে। যেহেতু দীপ্তর সাথে মিশুকেরই সবচেয়ে বেশি খাতির ছিল, হয়ত সে বিষয়টা বুঝতে পারবে। দীপ্তকে বাহির থেকে দেখলে কেবল সীমাবদ্ধতাটাই চোখে আসে। যারা কাছ থেকে চেনে তারা শুধু জানে যে সে কতটা বিস্তৃতি নিয়ে বেঁচে আছে।
কিন্তু ওসমান গণী সাহেব ভুলে গিয়েছিলেন মিশুক রোখসানা খানমেরই ছেলে। চিঠির উত্তর আসতে পনেরো দিনের মত সময় লেগেছিল।
“শ্রদ্ধেয় খালুজান,
পত্রের শুরুতেই আমার সালাম নেবেন। পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে আশা করি কুশলেই আছেন সবাইকে নিয়ে। আমরাও ভাল আছি। জেনে খুশি হবেন আপনার বৌমা দ্বিতীয় বারের মত সন্তান সম্ভবা। ডাক্তারের দেয়া তারিখ ঠিক থাকলে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই শর্মীর বাচ্চাটা হবে। ভেবেছিলাম এবারে না হয় দেশে ফিরে আসবো। প্রথম বাচ্চাটাও তো বাহিরেই হয়েছে। পরেরটা দেশে হোক। কিন্তু অফিস থেকে ছাড়ছে না। প্রবাসে চাকরি জীবন অনেকটাই কারবন্দী কয়েদীর মত লাগে যখন ইচ্ছেগুলো পূরণ হয় না।
গত পরশুই আপনার চিঠি পেয়েছিলাম খালুজান। একটু ব্যস্ত ছিলাম দেখে একদিন পরে লিখতে বসলাম। দীপ্তর সঙ্গে আমাদের বিস্তৃকার বিয়ে নিয়ে আপনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন, পড়ে সত্যিই ভীষণ আনন্দ, একই সাথে লজ্জাতেও পড়ে গেছি। এক সাথেই তো ছিলাম। আমার থেকে আর দীপ্তকে কে ভাল চিনবে। যে কোনো বিষয়ে ওর সমৃদ্ধি বা একাগ্রতা আর দশটা ছেলে থেকে সব সময়েই আলাদা ছিল। আম্মার কাছেও শুনেছি খুব তাড়াতাড়ি সরকারী চাকরিও পেয়ে গেছে। কয়জন পায়? আমি নিজেই তো তিন বছর চেষ্টা করেও পাইনি। শেষে বেসরকারী একটা ফার্মে চাকরি নিয়ে বাহিরে চলে এলাম। পাত্র হিসেবে দীপ্ত যে একশোতে একশো সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু খালু, আমি অনেক বড় সমস্যাতে পড়ে গেলাম আপনার চিঠি পেয়ে। আগেই আম্মার মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল আমার। দেরি হয়ে গেছে বুঝতে পারছি। হয়তো খালাম্মাকে বলেছেনও আম্মা, আমার অফিসেরই এক জুনিয়র কলিগ, মেহেদী হাসান নাম। খুব ভাল আর্কিটেক্ট। বছর খানেক ধরেই ঘুর ঘুর করছিল বিস্তৃকাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু অনার্স পাশ করেনি দেখে গত বছর কিছু বলিনি। শুধু বলেছিলাম ভেবে দেখবো। এই বছর যখনই শুনেছে যে পাশ করেছে, তখনই পেয়ে বসেছে আমাকে। একেবারে জোরাজুরি অবস্থা তার। আমার কালো বোনটাকে তার এতই ভাল লেগেছে ছবি দেখে যে তাকেই বিয়ে করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রীতিমত ওর আব্বাকে দিয়ে ফোন করিয়ে আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়েছে। বেশিদিন আগের কথা না, এই চার মাস হচ্ছে মনে হয়। আমিও ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে হ্যাঁ বলে দিয়েছি তাঁকে। ছেলে হিসেবে মেহেদী খারাপ না। আব্বা আম্মার একমাত্র ছেলে। ঢাকায় বাড়িও আছে। দেশের বাড়ি ঝিনাইদহ। ছেলে ভাল। আমার তো সিগারেট খাওয়ার বাতিক আছে। তার সেটাও নাই। ভাবলাম ভাল ছেলে যখন পেয়েছি, দিয়ে দেই বিস্তৃকাকে। বোনটা আমার কালো দেখে যখন কথাই তুলেনি একবারও, এমন ঘরই তো দরকার। সারাজীবন গায়ের রঙ নিয়ে মেয়েটা কম কথা শোনেনি। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি- সব জায়গাতেই শুনেছে। এখন যখন এমন পাত্র পেয়েছি, ফেলে রেখে কি করবো আমি? রাজী হয়ে গেলাম। কথা দেয়া হয়ে গেছে।
এখন আপনার চিঠি পেয়ে লজ্জাও লাগছে, দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। এত বছর ধরে একসাথে ছিলাম। শুধু যে প্রতিবেশী হিসেবে দেখেছি, মোটেও না। সব সময় জানতাম পাশের বাসায় আমাদের অভিভাবক রয়েছেন। আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে কম তো করেননি আমাদের জন্য। আপন মানুষও করে না এমন যতটা না আপনি আর খালাম্মা করেছেন। তাই আপনার ছেলে হিসেবেই আবদার নিয়ে লিখছি খালু। বলতে পারেন আপনার চিঠি পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেছি। কি লিখবো উত্তরে? আমি চিঠি পেয়েই বুঝেছি খুব আশা করে লিখেছেন আমার কাছে। চাইলে তো আম্মার সাথেই কথা বলতে পারতেন আপনি। সেটা না করে আমাকে যখন লিখেছেন, খুব আস্থা রেখে লিখেছেন।
কিন্তু খালুজান, আমি প্রায় অসহায় বোধ করছি। আপনার মত এত আপন মানুষকেই যে না করতে হবে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। এখানে আমি কথা দিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। শর্মীর বাচ্চা হবে দেখে দেশেও ফেরা হচ্ছে না। নাহলে ফিরেই বিস্তৃকা আর মেহেদীর বিয়েটা পড়িয়ে দিতাম। আম্মাও এক বাক্যে রাজী এই বিয়েতে। বলা যায় প্রায় সবই ঠিক ঠাক। যেহেতু একই অফিসে চাকরি করছি, তাই ছেলের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানার বাকি নেই। তাই একরকম পাকা কথা দেয়া হয়ে গেছে আমাদের দিক থেকে। এই রকম অবস্থায় বিয়েটা বাতিল করে দেয়া রীতিমত অসম্ভব। খালু আপনি আমাদের গুরুজন, আপনি অন্তত আমাদের অবস্থাটা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়? আমি নিরুপায় হয়েই সবকিছু লিখছি আপনাকে। বাকিটা আপনার সিদ্ধান্ত। এরপরও যদি মনে করেন এত ভাল একটা ছেলেকে হাতছাড়া করা উচিত হবে- তাহলে সেটাই হবে। আমার কথা দেয়াটাকে মুখ্য হিসেবে দেখবো না।
আপনার সার্বিক সুস্থতা কামনা করছি।
আপনার স্নেহাস্পদ,
মিশুক আহাম্মেদ।”
ওসমান গণী বুদ্ধিমান মানুষ। মিশুকের কথা তিনি বুঝে নিয়েছেন শুরুতেই। ভদ্রভাবে না বলে দিয়েছে। সেই সাথে মেহেদী হাসান নামের ছেলেটা সম্পর্কেও ভাল করে বার বার লিখে দিয়েছে যাতে বুঝে নিতে পারেন দীপ্তর সঙ্গে ওর পার্থক্যটা কোথায়। সেই সঙ্গে এটাও বুঝে গেছেন জোর করে লাভ হবে না। যারা ইঙ্গিতে এড়িয়ে যেতে চায় প্রস্তাবের ব্যাপারটাকে, তাদের সামনে স্পষ্ট করে বিস্তৃকার হাত চাওয়ার কোনো মানে হয় না। উত্তর তখন আরো কঠিন, আরো নিষ্ঠুর ভাবে ছুটে আসবে তাঁদের দিকে। এতদিনের পরিচিত বলেই কেবল ভদ্রতা দেখিয়ে দীপ্তর পা নিয়ে সরাসরি কিছু বলছে না কেউ। কিন্তু দরকার পরলে বলতে যে পারবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হৃত্বিকাকেও জানানো যেতে পারতো সব। ওসমান সাহেবের ধারণা মেয়েটা জানেও সব। কিন্তু বড় ভাই আর মা যা বলবে, সেটাই তারও সিদ্ধান্ত। ছোট বোনের বিয়ে নিয়ে তার কাছে কিছু আবদার করা উচিত হবে না।
সবকিছু চোখের সামনেই ঘটছিল দীপ্তর। বিস্তৃকা হয়তো কিছুই জানে না। কিন্তু দীপ্ত প্রতিটা দিন দেখেছে সব। অফিসে যাওয়ার আগে, অফিস থেকে ফেরার পর- প্রতিটা দিন ঘরের নিচু স্বরের আলাপ তার কানেও পৌঁছেছে। কাঠের দুটো ক্রাচের ওপর ভর টিকিয়ে যাকে দাঁড়াতে হয়, বুক চাতিয়ে কাউকে কি সত্যিই চাওয়ার যোগ্যতা সে রাখে? তাঁর সীমানা বেঁধে দেয়া আছে। তাই বলে মুক্ত আকাশের পাখিটাকে খাঁচায় ভরে কাছে রেখে দেয়ার কোনো মানে নেই। এটাকে কেবল স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছু বলে না।
কথা ছিল মিশুকের স্ত্রীর দ্বিতীয় বাচ্চাটা হলেই দেশে এসে বিস্তৃকার বিয়ে নিয়ে কাজ শুরু করে দেবে। কিন্তু ওসমান গণীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে নিজেই আর নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারেনি মিশুক। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে সত্যি সত্যি দেশে ফিরে এসেছে মাত্র এক মাসের মাঝেই। এসে যে চুপচাপ বসে থেকেছে, তা না। মেহেদী হাসান নামের ছেলেটার বাবা মা আত্মীয় স্বজন ডাকিয়ে রীতিমত আংটি পরিয়ে দিয়েছে বিস্তৃকার। একদম আচমকাই ঘটেছে সব। বিস্তৃকা সামান্যতম কথা বলার সুযোগ পায়নি। তিন বোনের মাঝে সবচেয়ে চঞ্চল মেয়েটি যেন ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বাক হয়ে গেছে।
আংটি পরানোর রাতেই বিস্তৃকা মিশুকের ঘরে গিয়ে আংটিটা তার টেবিলের ওপর রেখে আসে নিঃশব্দে। মিশুক অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে, পেছন থেকে ডাক দিয়েছিল, “বিস্তৃকা? কি আশ্চর্য! আংটি খুলে রেখে যাচ্ছিস কেন? এটা তোর বিয়ের আংটি।”
বিস্তৃকা উত্তর দেয়নি।
তার খানিক বাদেই রোখসানা খানম বিস্তৃকার ঘরে চলে আসেন অসন্তুষ্ট মুখে। হাত বিস্তৃকার সেই আংটিটা। রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করেন, “আংটি খুলে রেখে আসার মানেটা কি বিস্তৃকা? কি ধরণের বেয়াদবী এটা?”
মশারী টানিয়ে বিস্তৃকা শুয়েছিল গায়ে কাঁথা জড়িয়ে। জ্বর এসে গেছে। ঘোর ঘোর লাগছে সব। বাতি নেভানোই ছিল। রোখসানা খানম এসেই লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
বিস্তৃকার মাথা কয়েক মণ ভারি হয়ে আছে। বালিশ থেকেই তুলতে পারছে না। তাও অনেক কষ্টে উঠে বসল। মায়ের কথার উত্তর দিল না।
“আমি একটা প্রশ্ন করেছি, উত্তর দে।”
“আংটিটা পরতে ভাল লাগছিল না আম্মা।” ক্ষীণ স্বরে জবাব দিল। কাঁপুনি এসে গেছে জ্বরের। শীত লাগছে খুব।
রোখসানার পেছন পেছন মিশুকও চলে এসেছে ঘরে। শর্মী ঘুমিয়ে আছে ভেতরের ঘরে। ও আসেনি।
“আংটি পরতে ভাল না লাগলে নিজের ঘরে খুলে নিজের কাছে রেখে দিতি, নাটক করে বড় ভাইয়ের ঘরে গিয়ে আংটি রেখে আসার মানে কি? কি ধরণের বেয়াদবী শুরু করেছিস এটা?” তীক্ষ্ম গলায় বলে উঠলেন রোখসানা।
মিশুক চাপা গলায় বলল, “আস্তে আম্মা! রাত বিরাতে কি শুরু করলেন এইসব?”
“তুই চুপ কর! বৌমার অবস্থা দেখার জন্য এখন তোর ঘরে না গেলে তো আংটিটাই দেখতাম না। জানাও হত না যে এই মেয়ে স্পর্ধাতিরিক্ত বেয়াদব হয়ে গেছে!” কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন ছেলের দিকে। চুপ হয়ে গেল মিশুক।
বিস্তৃকা জ্বর নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। চোখ লাল হয়ে আছে ঠিক জ্বরের কারণে নাকি কান্না আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করার জন্যে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
“তোকে কলেজ ভার্সিটিতে কি পড়িয়েছি এইসব দেখার জন্য? বড় ভাইয়ের সাথে বেয়াদবী করা দেখতে? আংটি খুলে রেখে আসা মানে কি? ওর ঘরে খুলে রেখে এসেছিস মানে তো আমার ঘরেও খুলে রেখে এসেছিস। বিয়েটা তো আমার সিদ্ধান্তে হচ্ছে। মিশুকের না। মত তো আমার দেয়া। তার মানে কি আমার সাথেও বেয়াদবী করছিস তুই? উত্তর দিচ্ছিস না কেন?” রোখসানা ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে।
বিস্তৃকা মুখ নিচু করে ফেলল, চোখে পানি চলে এসেছে তার।
রোখসানা থামছেন না, বলেই যাচ্ছেন, “এসব দেখার জন্য বড় করেছি তোকে? তোর আব্বা বেঁচে থাকলে এইসব বেয়াদবী দেখতো। ভাল হয়েছে মরে গেছে। শান্তিতে আছে...... কথা বলছিস না কেন? কথা বল?”
বিস্তৃকা কেঁপে কেঁপে কাঁদছে মুখ নিচু করে। আঙুল দিয়ে সাবধানে চোখের পানি মুছতে মুছতে মাথা নিচু করেই ভেজা স্বরে বলল, “কি বলবো আম্মা?”
“কি বলবি মানে? সোজা বাংলায় উত্তর দে। তোর কি ধারণা আমি বেঁচে থাকতে ঐ খোঁড়া, পঙ্গু ছেলেটার সাথে তোর বিয়ে দেবো? জীবনেও না! ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমার মেয়ে হয়ে তুই প্রেম করিস এটা ভাবতেই আমার লজ্জায় ঘেন্নায় মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোদের? তোর বড় বোন, মেজ বোন কি প্রেম করেছে? নাকি আমার সিদ্ধান্তে বিয়ে করেছে? কোনটা?”
বিস্তৃকা উত্তর দিল না। আকুল হয়ে কাঁদছে।
মিশুক থাকতে পারলো না, “আম্মা চলেন তো, এসব কথা রাতের বেলা বলে কি লাভ?”
“তো কি দিনের আলোয় মাইক নিয়ে রিক্সায় রিক্সায় ঘুরে বলে বেড়াবো? ঘরের কথা ঘরেই শেষ করছি। আমাকে শেখাতে আসবি না তুই।” ধমক দিলেন ছেলেকে।
“তোদের আব্বা মারা যাওয়ার পর এই আমি কেমন করে সংসারটা সামলেছিলাম সেটা শুধু ওপরে আল্লাহ্ আর নিচে আমি জানি। কতদিন শখ করে একটা নতুন শাড়ি কিনতে পারিনি। ছেলে মেয়েগুলার পরীক্ষার ফি জমাতে হবে দেখে। সব সময় তোদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করেছি। এত কিছু করেছি কেবল এসব দেখার জন্য? তোর অবাধ্যতা দেখার জন্য?” দৃঢ় কঠিন মানুষটার গলা হঠাৎ ভেঙে এলো। চুপ হয়ে গেলেন রোখসানা। কাছের টেবিলটা ধরে নিজেকে সামলে নিতে চাইলেন।
মিশুক পেছন থেকে এসে তাঁকে ধরল, “আম্মা, আপনার হাই প্রেশার আছে। প্লিজ এখন এরকম করবেন না। শান্ত হোন। রুমে গিয়ে রেস্ট নিন।”
ছেলের হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও পারলেন না রোখসানা। কেঁদে ফেলেছেন তিনিও, ভাঙা স্বরে মেয়েকে বললেন, “আমার চাওয়াটা তোর কাছে এতই ঠুকনো হয়ে গেলোরে? একটা বার আমার কথাও মাথায় আনলি না? দীপ্তর সাথে তোর বিয়ে আমি কোনোদিনই মেনে নেবো না। ..... মিশুক? ওকে বলে দিস, ঐ খোঁড়া ছেলেকে যদি আমার মেয়ে বিয়ে করে, সে যেন আমার লাশ না ছোঁয়!”
বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মত তাকিয়ে রইল বিস্তৃকা। কাঁদতেও ভুলে গেছে। অস্ফুট গলায় বলল, “মা....”
রোখসানা খানম আর কথা বললেন না। হাতের আংটিটা ছুঁড়ে মারলেন বিস্তৃকার মশারীর দিকে। ছুঁড়ে দিয়ে আর দাঁড়ালেন না। ঘুরে বেরিয়ে গেলেন ঘরটা থেকে। মিশুকও পেছন পেছন ছুটে গেল মায়ের।
বিমূঢ়ের মত বিছানায় কাঁথা জড়িয়ে বসে আছে বিস্তৃকা। মশারীর সাথে ধাক্কা লেগে আংটিটা টুন টান শব্দ করে মেঝেতে গিয়ে থেমেছে। অনেকক্ষণ মূর্তির মত বসে রইল সে। নড়ল না একটুও। পাশের ঘর থেকে রোখসানা খানমের চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সেই সাথে মিশুক ভাইয়ের গলার আওয়াজ। বিস্তৃকা বসেই রয়েছে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মেঝের মাঝখানে পড়ে থাকা সোনালী আংটিটার দিকে।
হঠাৎ মিশুক ভাইকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। বাসার কাজের মেয়েটাও বালতি মগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে। রোখসানা খানমের প্রেশার উঠে গেছে। মিশুক ভাই দেরি না করে দরজা খুলে ফার্মেসির ডাক্তার ডাকতে চলে গেল। রোখসানা খানম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
ধীরে ধীরে মশারী তুলে টলোমলো পায়ে নামলো বিস্তৃকা। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে লাইটটা নিভিয়ে দিল। খোলা দরজা দিয়ে আলো আসছে মেঝেতে। সেই আলোতে আংটিটা দেখা যাচ্ছে। জ্বলছে যেন। ওটার কাছে গিয়ে ঝুঁকে বসল। ভাবলেশহীন মুখে আংটিটা তুলে আঙুলে পরে নিল। কাঁদছে না আর সে।
দীপ্তর সঙ্গে বিস্তৃকার আর কথা হয়নি তেমন। দীপ্ত নিজের মত বুঝে নিয়েছিল সব। মিশুক ভাইয়ের সাথেও কথা হয়েছিল। তাই পুরো বিষয়টা বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি কোনো। একই সাথে সে এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল সে থাকলে বিস্তৃকার বিয়েটা হবে না। তীব্র চঞ্চল মেয়ে যখন নীরব হয়ে যায়, তার পেছনে অনেক বেশি দুঃখ লুকিয়ে থাকে। বিস্তৃকা সেই দুঃখ নিয়ে অন্য কারো ঘরে যেতে পারবে না দীপ্ত থাকলে। দীপ্ত তাই কথা বলার অপেক্ষা করেনি। অনুমতির জন্যও দাঁড়ায়নি। নতুন চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই শুনছিল ছয় মাসের মাথায় অন্য শহরে পোস্টিং দেয়া হবে তাকে। ছয় মাস পুরোতেই পোস্টিং অর্ডার এসে গেল। এক দিক দিয়ে ভালই হয়েছে। বিস্তৃকা থেকে দূরে চলে যাওয়া যাবে।
ওসমান গণী আর শায়লা পারভিনের ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘ সংসার জীবনের সেই বাসাটা অবশেষে ছেড়ে দেয়ার সময় হল। বাহির থেকে লোক এনে জিনিসপত্র সব বেঁধে ট্রাকে তুলে দেয়া হল। বিশাল এক ট্রাক বোঝাই মালপত্র রওনা হল দীপ্তর নতুন শহরের উদ্দেশ্যে। দীপ্তকে আগে থেকেই বাসা দিয়ে দেয়া হয়েছিল অফিস থেকে। তাই সমস্যা হবার কথা না। ওসমান গণী সাহেব ট্রাকের সাথে চলে গিয়েছিলেন। শায়লা পারভিন আর দীপ্ত বাসে করে যাবে বিকেলে।
বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের নিচে আবারও বাড়ির ছাদে অনেকদিন পর কেউ বিদায়ের জন্য এসে দাঁড়ালো বিস্তৃকার সামনে। দীপ্তরা যেদিন চলে যায়, সেই বিকেলে ছাদে গিয়েছিল বিস্তৃকা। ছাদে ওঠে না অনেকদিন হয়ে গেছে। কাপড় শুঁকাতে বা নিতেও আসা হয় না। কবুতরের খোপে খাবার দেয়ার জন্যও আসে না। অথৈ আর কাজের মেয়েটা এসে দিয়ে যায়। বহুদিন পর বিস্তৃকা পশ্চিমের কার্নিসে গিয়ে দাঁড়ায়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে দূরের মাঠটার দিকে। লালচে সূর্যটা মাঠের শেষ প্রান্তের গাছগুলোর ওপর নেমে আসছে দ্রুত। সাদাটে-ধূসর মেঘগুলোকে প্রতিদিনের মত লালচে রঙে কিনারগুলোর রাঙিয়ে দিয়েছে। বহুদূর আকাশে তাকিয়ে থাকলে পাখির ঝাঁক চোখে আসে। তারাও কোথাও যাচ্ছে। নতুন ঠিকানা অথবা পুরনো কোথাও।
হালকা মৃদু একটা হাওয়া বইছে। বিস্তৃকার খোলা চুলগুলো মুখের ওপর বার বার এনে ফেলছে। হাত দিয়ে সরিয়ে কানের পেছনে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ছাদে আর কেউ নেই। দড়িতে শুঁকাতে দেয়া কাপড়গুলো দুলছে। কবুতরের ঘরটার ওপর কয়েকটা কবুতর শব্দ করছে থেকে থেকে। বাকিগুলো নেই, বেড়াতে গেছে কোথাও। সন্ধ্যা নেমে এলে ফিরে আসবে।
বাসার নিচে একটা রিক্সা অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছে। দুটো স্যুটকেস তোলা হয়েছে। দীপ্ত আর খালাম্মা চলে যাচ্ছে একটু পর। বিল্ডিঙের বাকিদের থেকে হয়তো বিদায় নিচ্ছে খালাম্মা। বিস্তৃকাদের বাসায় কেউ নেই এখন কাজের মেয়েটা ছাড়া। অথৈ খেলতে গেছে। রোখসানা খানম অফিসে। রোখসানা থাকলেও তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার জন্য আসতেন কিনা কে জানে। ওসমান খালু চলে যাওয়ার সময় রীতিমত কাঠখোট্টা ব্যবহার করেছেন তাঁর সাথে রোখসানা খানম। হু হা উত্তর দিয়ে দ্বায় সেরেছেন। যেন এই পরিবারের কারো সঙ্গে কথা না বলে যতটা এড়িয়া যাওয়া যায় ততই ভাল তাঁর জন্য। শায়লা পারভিন এরপর আরো অসন্তুষ্ট হয়েছেন রোখসানা খানমের ওপর। এত বছরের সম্পর্ক তাঁদের। ছেলে মেয়ে দুটোর বিয়ে দেয়া গেল না ঠিক আছে, তাই বলে স্বভাবগত ভদ্র আচরনটুকুও যে তাঁদের বেলায় তুলে রাখবেন- এটা আশা করেননি।
পেছনে খট্ খট্ শব্দ হতেই ফিরে তাকালো বিস্তৃকা। দীপ্ত ক্রাচে করে ছাদে উঠে এসেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে যেন খুঁজছে। কাপড়ের জন্য প্রথমে বিস্তৃকাকে খেয়াল করেনি। বিস্তৃকাই প্রথমে দেখলো তাকে। গায়ে একটা মেটে রঙের পাঞ্জাবি। মুখে অনেকদিনের না কামানো দাঁড়িগোঁফ। মাথা ভর্তি উস্কো খুস্কো চুল। কতদিন যে চিরুনি পড়ে না কে জানে। কাঁধ থেকে একটা শান্তিনিকেতনী ব্যাগ ঝুলছে।
বিস্তৃকা সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দেখতে পেয়েছে তাকে দীপ্ত। এগিয়ে আসছে ওর দিকে। মুখে সেই আগের মত উদার হাসি। মাঝখান দিয়ে বহু দিন ধরে এই হাসিটা দেখেনি বিস্তৃকা। কেমন যেন লাজুক ধরণের হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা।
“তোমাকেই খুঁজছিলাম বিষ্ঠা..... বিস্তৃকা! চলে যাচ্ছি আজকে আম্মাকে নিয়ে। ভাবলাম দেখা করে যাই।” হেসে বলল দীপ্ত। চশমার ওপাশের চোখগুলোতেও হাসি।
বিস্তৃকা কথা খুঁজে পেল না, একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, “তোমার মাস্টার্সের ক্লাসের কি হবে?”
“আরে ধুর! পরীক্ষায় পাশ করতে কি ক্লাস করা লাগে নাকি!” হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল যেন দীপ্ত। “মাঝে মাঝে এসে পরীক্ষা দিয়ে যাব। আর পোলাপানের তো অভাব নেই। নোট পত্রের অভাব হবে না। আরামসে পাশ করে যাব দেখে নিও।”
“ও।” বিস্তৃকা চুপ হয়ে গেল। বাতাসে বার বার চুল মুখে এসে যাচ্ছে। হাত দিয়ে সরাচ্ছে। দীপ্তকে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
“বিয়েটা জানি কবে তোমার? এ মাসেই তো? তাই না?” খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল দীপ্ত।
“হ-হ্যাঁ।” আড়ষ্ট গলায় বলল বিস্তৃকা, “ছাব্বিশ তারিখে। শুক্রবার।”
“একেবারে তুলে নিয়ে যাবে? নাকি আকদ করে রাখবে শুধু?”
“এক সপ্তাহের জন্য তুলে নিয়ে যাবে। উনি বিদেশে চলে যাবেন আবার সাত দিনের মাথায়। আমি চলে আসবো তখন।” বিস্তৃকা অন্য দিকে তাকিয়ে বলল কথাগুলো।
“এরপর কি দেশে থাকা হবে নাকি সোজা বিদেশ? মাস্টার্স শেষ করবে না?” খুব স্বাভাবিক মুখে প্রশ্ন করছে দীপ্ত। যেন আর দশটা মানুষের মত সেও একজন।
“জ-জানি না।” বিস্তৃকা অস্বস্তি কাটানোর জন্য গলার ওড়নাটা মাফলারের মত আরেক পাক প্যাঁচালো। দীপ্তর দিকে তাকাতে পারছে না কেন জানি। কোনো কষ্টের বা বিষণ্নতার অনুভূতিও হচ্ছে না। সব স্বাভাবিক। তবু তাকাতে পারছে না।
দীপ্ত ওর কাঁধের ব্যাগটা হাতড়ে দুটো বই বের করে এগিয়ে দিল বিস্তৃকার দিকে। “নাও, এগুলো তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি।”
বিস্তৃকা হাত বাড়ালো না। সপ্রশ্ন চোখে তাকালো দীপ্তর দিকে, “চিঠি?”
“আরে নাহ! এখন আর চিঠি লেখার সময় আছে? বইগুলো সেইরকম লেগেছে দেখে তোমাকে দিলাম পড়ার জন্য।” হেসে ফেলল দীপ্ত।
বিস্তৃকা কৌতূহলী মুখে বইগুলো হাতে নিলো এবার। সমরেশ মজুমদারের “কথা হয়ে গেছে”, আর শীর্ষেন্দুর “দূরবীন”।
সামনের খোলা মাঠটার দিকে তাকালো দীপ্ত, একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “কত বছর থাকা হয়েছে এই জায়গাটায়, তাই না? এই বাড়িটাতেই জন্মেছিলাম। আমার দুই মাস পরে তুমি হয়েছিলে। কিন্তু নিউমনিয়া বাঁধানোয় এক বছর দেরিতে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম তোমার। আশ্চর্য একটা সময় কেটেছে। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা, আমি টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে হাঁড়ি ভর্তি মিষ্টি আর সন্দেশ এনে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। তুমি লাঠি দিয়ে আমাকে দৌড়াচ্ছো! হা হা হা!” হাসছে দীপ্ত। পড়ন্ত সূর্যটার কমলা আলোয় চশমার পাশের চোখদুটো চিক চিক করে উঠলো যেন।
বিস্তৃকা নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“এই আলোটার একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার আছে জানো?” বিস্তৃকার দিকে ফিরে তাকায় দীপ্ত।
বিস্তৃকা মাথা নাড়ায়, “কি?”
“এই আলোতে একটা বিদায়ের ব্যাপার আছে। সমস্ত পৃথিবী আজকের জন্য শেষ বারের মত সূর্যটাকে দেখে বিদায় নিচ্ছে। কাল হয়তো সূর্যের দেখা আর নাও পেতে পারে।”
“সূর্য তো কোথাও চলে যাচ্ছে না...” থেমে গেল বিস্তৃকা।
“কারো জীবন থেকে আলো তো চলেও যেতে পারে; তুমি আমি কি জানি এই রহস্যময় প্রকৃতির ডায়েরির কোন পাতায় কি লেখা রয়েছে?” দীপ্ত স্মিত হাসে। হাসিটা খুব অসহায়ের মত দেখায়।
বিস্তৃকা কার্নিসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দীপ্তর দিকে তাকিয়ে। দীপ্ত দূরের মাঠটার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বিস্তৃকার দিকে তাকায়। সূর্যের নিষ্পাপ আলোতে মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে শিল্পীর রঙ তুলিতে আঁকা ইজেল বোর্ডে থেকে মাত্র নেমে এসেছে। এলোমেলো দমকা বাতাসে উড়তে থাকা চুলগুলো কথা শুনছে না মেয়েটার, ছোটা ছুটি করে বেড়াচ্ছে মুখের সামনে। বিড়বিড় করে মৃদুস্বরে দীপ্ত বলল,
“ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে, সদাই ভাবনা।
যা-কিছু পায় হারায়ে যায়, না মানে সান্ত্বনা।
সুখ-আশে দিশে দিশে বেড়ায় কাতরে–
মরীচিকা ধরিতে চায় এ মরুপ্রান্তরে।
ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা হয়ে আসে–
কাঁদে তখন আকুল-মন, কাঁপে তরাসে।”
বিস্তৃকা অবাক হয়ে তাকালো, “কি বললে?”
মাথা নাড়ল দীপ্ত, “কিছু নাহ। খালাম্মার সাথে তো আর দেখা করা হল না যাওয়ার আগে। উনি আসলে বলে দিও যে আমরা চলে গেছি।”
বিস্তৃকা উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকে হাতের বই দুটোর দিকে।
দীপ্ত খুব সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বিস্তৃকাকে বলে, “কণে দেখা আলোতে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে বিস্তৃকা। আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। অনেক সুন্দর একটা মুহূর্তে বিদায় নেয়া হল। ভাল থেকো।” হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু হাসিটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো।
ঘুরে হাঁটতে লাগলো সিঁড়ি ঘরের দিকে। ক্রাচের খট্ খট্ শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে দীপ্ত। বিস্তৃকা বই হাতে দাঁড়িয়ে আছে কার্নিসের কাছেই। দীপ্ত দড়িতে ঝুলতে থাকা কাপড়গুলোর আড়ালে চলে যাচ্ছে। বাতাসে উড়ছে কাপড় সব। দীপ্তকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। শুধু শব্দ শোনা যাচ্ছে ক্রাচের।
বিস্তৃকার হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে ডেকে বসল, “দীপ্ত?”
ক্রাচের শব্দ থেমে গেছে। শোনা যাচ্ছে না। চলে গেছে নাকি সিঁড়ি দিয়ে নেমে? ডাকতে দেরি করে ফেলেছে? বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা মোচড় দিয়ে ওঠে বিস্তৃকার। সিঁড়িঘরের দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকে হাতের বইগুলো নিয়ে। দীপ্ত হয়তো নিচে নেমে গেছে। ওকে একটা কথা বলা হয়নি। বিস্তৃকার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে হাঁটতে হাঁটতে। ঠোঁট কামড়ে আবার ডাক দিলো, “দীপ্ত?”
উড়তে থাকা কাপড়গুলোর মাঝ থেকে আচমকা শক্ত একটা হাত এসে খামচে ধরল বিস্তৃকার ডান হাতটা। চমকে উঠতে গিয়ে হাত থেকে বইগুলো পড়ে গেল বিস্তৃকার। দীপ্ত কাপড় সরিয়ে বেরিয়ে এসেছে। চারপাশে বাতাসে কাপড়গুলো এতো উড়ছে যে ভেতরের মানুষ দুটোকে গিলে নিয়েছে যেন।
বিস্তৃকা কান্না আটকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে দীপ্তর দিকে। ছেলেটা যে চশমার ওপাশ থেকে কাঁদছে স্পষ্ট বোঝা যায়। বিস্তৃকা নিচের ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
দীপ্ত ক্রাচে ভর দিয়ে খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে ওর দিকে। বিস্তৃকার ধরে থাকা হাতটা ছাড়েনি তখনও। বিস্তৃকা কষ্ট আর ভয় মেশা চোখে তাকায় দীপ্তর দিকে। সে বুঝতে পারছে না ছেলেটা কেন এগিয়ে আসছে এভাবে?
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দীপ্তর দুপাশের ক্রাচগুলো ছেড়ে দিল, অনন্ত কাল সময় লাগিয়ে পড়তে লাগল মাটিতে। দু হাতে বিস্তৃকার শীর্ণকায় শরীরটাকে জাপ্টে ধরলো প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে। এক পায়ে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে মুহূর্তের মধ্যেই শিশুর মত আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো দীপ্ত। ঘটনার আকস্মিকতায় বোবা হয়ে গেছে বিস্তৃকা। বরফের মত জমে গেছে ও। শুধু টের পাচ্ছে ছেলেটার চোখের ঈষৎ উষ্ণ লোনা পানি তার শরীরেও স্পর্শ করছে। “আমার যেতে ইচ্ছে করছে না একদম বিস্তৃকা। আমার একটুও যেতে ইচ্ছে করছে না। সব যদি আগের মত হয়ে যেত? আমি আমার সব কথা আমার ভেতরেই নাহয় চেপে রেখে দিতাম। কোনোদিন যদি কিছুই না বলতাম? আমার চোখের সামনে হয়তো আরো কটা দিন তোমাকে দেখতে পেতাম..... আমার যেতে ইচ্ছে করছে না....” বাচ্চাদের মত কাঁদছে দীপ্ত। গলা ভেঙে গেছে। কাঁপছে থেকে থেকে।
বিস্তৃকা অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে। খানিক আগের কান্নাটুকু যেন এক ধাক্কায় আরো ভেতরে কোথাও চলে গেছে। কাঁদতে ভুলে গেছে। অনুভূতিহীন হয়ে গেছে হঠাৎ করেই। কতক্ষণ যে এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরে দীপ্ত কেঁদেছিল বিস্তৃকার মনে নেই।
কিন্তু আচমকা যেভাবে দীপ্ত ওকে আঁকড়ে ধরেছিল, আচমকাই ছেড়ে দিল হঠাৎ। এক পায়ে ঝটকা দিয়ে পেছনে সরে এলো বিস্তৃকাকে ছেড়ে দিয়ে। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যাওয়া মানুষের মত কথা হারিয়ে ফেলল, “স-স্যরি! আম স্যরি....” এক পায়ে লাফাতে লাফাতে মাটিতে পড়ে থাকা ক্রাচগুলো ঝুঁকে তুলতে লাগলো। খানিক আগের সমস্ত আবেগ জোর করে যেন হজম করে ফেলার চেষ্টা করছে। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চশমার নিচের চোখের পানি দ্রুত মুছে নিলো। ক্রাচ হাতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ভীষণ রকম তাড়াহুড়া আছে যেন দীপ্তর, এমন ভাব করে বিস্তৃকার চোখে চোখ না রেখে বলার চেষ্টা করল, “দেরি হয়ে যাচ্ছে অনেক। শেষে বাস মিস করবো। আমি যাই, ভাল থেকো বিস্তৃকা....” ওর চোখে চোখ রাখার সাহস যেন হারিয়ে ফেলেছে দীপ্ত।
বিস্তৃকার কোনো কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করল না। তাকে ওখানে রেখেই ঘুরে কাপড় সরিয়ে চলে গেল দীপ্ত। সিঁড়ি দিয়ে ওর নেমে যাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। খট্ খট্ খট্।
বিস্তৃকা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। টলছে ভীষণ। কোনোমতে ঝুঁকে হাত থেকে পড়ে যাওয়া বইদুটো তুলে নিয়ে কার্নিসের আগের জায়গায় ফিরে এলো। দূর্বল লাগছে খুব। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। নিজেকে অনুভূতি শূন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছে। কোনো রকম দুঃখ, কষ্ট যেন স্পর্শ করতে পারছে না তাকে।
নিচের রাস্তাটার সামনে ছোটখাট জটলা বেঁধে গেছে রিক্সাটাকে ঘিরে। দীপ্ত আর শায়লা পারভিন উঠে বসেছে রিক্সায়। আশেপাশের বাসার এতোদিনের পরিচিত মানুষেরা সবাই এসেছে বিদায় জানাতে। শায়লা কাঁদছেন শিশুর মত। খানিক আগে কাঁদতে থাকা দীপ্ত আর তাঁর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। টিন টিন বেল বাজিয়ে রিক্সাটা ঘুরে চলতে শুরু করেছে পশ্চিমের মাঠের দিকে। ওদিকে দিয়ে চলে যাবে বাস স্ট্যাণ্ড। বিস্তৃকা ধীরে ধীরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে কার্নিসের কাছটায়। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না। নিচু রেলিং দিয়ে তাকিয়ে রইল দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া রিক্সাটার দিকে। সূর্যটা রক্তাভ লাল হয়ে পৃথিবীর ছাদটাকেও লাল চাঁদরে ঢেকে দিয়েছে। রিক্সাটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে রিক্সার কালো একটা অবয়ব। যেন ঠিক সূর্যটার দিকেই যাত্রা করেছে ওরা।
প্রবল বাতাসে মুখের ওপর চুল এনে ফেলেছে বিস্তৃকার, চোখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই রিক্সার অবয়বটার দিকে। দীপ্তকে বোঝা যায় না, কেবল বেরিয়ে থাকা ওর ক্রাচগুলো বোঝা যায়। আচ্ছা সেও কি তাকিয়ে রয়েছে এই ছাদের দিকে? কাঁদছে?
বিস্তৃকা জড় পদার্থের মত হেলান দিল রেলিঙে। কাঁদছে না একটুও। হাতের বইদুটো আপনমনেই খুলে পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলো। কোথাও কোনো দাগ দেয়া নেই। দীপ্ত সত্যিই কিছু লিখে যায়নি যাওয়ার সময়? দ্রুত হাতে আবারও ওল্টাতে থাকে বইগুলোর পাতা। কিন্তু কোথাও সবুজ কলম বা অন্য রঙের কালিতে আন্ডারলাইন করে যায়নি দীপ্ত। শুধুই দুটো বই দেখে গেছে। কেবলই বই এগুলো। এর মাঝে কারো কোনো কথা লেখা নেই।
বিস্তৃকা খুব সাবধানে বইগুলো বন্ধ করে দুহাতে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে থাকে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বইগুলোকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে রাখে। বাতাস হচ্ছে খুব। বিস্তৃকার বড় বড় চুলে ঢেকে গেছে মুখ, কাঁধে। কাঁদেনি সে একবারও। কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের চোখে পানি চলে এসেও মিলিয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। এদের ভেতর অনেক শব্দ জমা থাকে। কিন্তু সেগুলো অশ্রু কিংবা বাক্য হয়ে কখনো প্রকাশ পায় না।
দীপ্তর সঙ্গে বিস্তৃকার ঐ দেখাটাই শেষ দেখা ছিল। সেদিন যাওয়ার সময় বাস এক্সিডেন্টে শায়লা পারভিনের সাথে দীপ্তও মারা যায়। এক্সিডেন্টটা মধ্যেরাতের দিকে হয়েছিল উলটো দিক থেকে আসা একটা মালবাহী ট্রাকের সাথে। দীপ্ত ঘটনাস্থলেই মারা যায়। শায়লাকে কাছের হাসপাতালে নেয়ার একদিন পর তিনিও মারা যান। ওসমান গণী সাহেব ছেলে আর স্ত্রীর মৃত্যুর পর একবার এসেছিলেন খবর দিতে। যাওয়ার জায়গা আর নেই তাঁর। নিজে অবসরে চলে গেছেন। ছেলে মৃত। ঘরবাড়িও করবো করবো বলে করা হয়নি। ভেবেছিলেন দীপ্ত চাকরিতে ঢুকলে বাড়ি বানানোর কাজে হাত দেবেন। কিন্তু সেটা আর হল না। ঘরের আর কি প্রয়োজন। যাদের দরকার ছিল তারাই চলে গেছে। অযথা ঘর তুলে লাভ নেই। দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন। বাকি জীবনটা সেখানেই থেকে যাবেন। বাড়ি বানানোর টাকাটা না হয় সেই ভাইয়ের ঘরেই খরচ করলেন।
ওসমান গণী রোখসানা খানম কিংবা বিস্তৃকার সঙ্গে দেখা করেননি। আশেপাশের বাসার মানুষদের সঙ্গে দেখা করে চলে গেছেন। রোখসানা খানম অফিসে ছিলেন, বিস্তৃকাও ভার্সিটি গিয়েছিল দেখে কেউ জানতে পারেনি ঘটনাটা ঐ মুহূর্তে। জেনেছিল পরে, কাজের মেয়েটার মাধ্যমে। সন্ধ্যায় একসাথে মায়ের সাথে বাসায় ফেরার পর দরজা দিয়ে ঢুকতেই বিস্তৃকাকে আর রোখসানাকে দেখে কাজের মেয়েটা হড়বড়িয়ে বলে উঠেছিল, “বিস্টিকা আপামণি! খালাম্মা! পাশের বাসার উসমান খালুজান আইছিলেন বিল্ডিঙে। কান্না কাটির শব্দ শুনে তো আমি ওবাক! কি হইছে দেখার জন্য নামছিলাম। যায়ে শুনি সেইদিন দীপ্ত ভাই আর খালাম্মা যে বাসে গেছিল? ঐ বাস এসকিডেন কইরা দীপ্ত ভাই, খালাম্মা দুইজনেই মইরা গেছে। খালুজান কবর দিয়াসছে তাদের। খুব কানতেছিল।”
বিস্তৃকা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল। রোখসানা খানম ধাক্কাটা চট করে কাটিয়ে নিলেন। জরুরি গলায় বললেন, “নুরী! কথা বলার আর জিনিস পাস না? একটা চড় দিয়ে দাঁত সব ফেলে দেবো! যা! তাড়াতাড়ি এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।”
অন্ধকার হয়ে গেছে সব। ধীরে ধীরে একটা দুটো করে হাজারটা তারা জ্বলতে শুরু করেছে। যেন কেউ এসে বিশাল একটা কালো চাঁদরে নক্ষত্র এঁকে বিছিয়ে দিয়ে গেল। আশেপাশের সব বাসাগুলো থেকে সন্ধ্যাকালীন পড়াশোনার রোল উঠেছে। গলা ফাটিয়ে প্রত্যেক বাসার ছেলে মেয়েগুলো পড়ছে। শব্দটা শুনতে ভালই লাগে বিস্তৃকার। একটা নিঃশ্বাস ফেলে কোলের অথৈকে বলল, “পড়তে বসবি না?”
“তুমি সাথে না গেলে তো নানী চিল্লাবে খালামণী।” অসহায় মুখে তাকায় মেয়েটা। “জামা ময়লা বললাম না?”
“তুই যা, আমি আসছি। চেঁচালে বলবি খালামণী আগেই বকে দিয়েছে। আর যাতে তোকে আজকে না বকে।”
“এহ্! তোমার আম্মা যে কুটনি বুড়ি!” মুখ ভেংচে বলল অথৈ। “আমার কথা শুনলেই মারার জন্য ঝাড়ু নিয়ে দৌড়াবে। কথায় কথায় যেভাবে আব্বা আম্মা তুলে ধমক দেয়!” শিউরে উঠার মত করল।
হেসে ফেলল বিস্তৃকা, “ঠিক আছে। তুই এগো, আমি আসছি তোর পেছন পেছন। আর দাঁড়া, এই কাপড়গুলো নিয়ে যা সাথে করে। বলবি আমার সাথে ছাদে ছিলি।”
জামার ময়লা দেখি বলল, “এগুলো লেগে পরিষ্কার কাপড়গুলো ময়লা হয়ে যাবে তো!”
“যাবে নারে বাবা! যাঃ না!” কোল থেকে নামিয়ে কাপড়গুলো ধরিয়ে দিল অথৈকে। নিজেও উঠে দাঁড়ালো। অথৈ কাপড় নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দার পা ফেলে নেমে গেল নিচে।
বিস্তৃকা ধীরে ধীরে রেলিঙের দিকে এগিয়ে যায়। মৃদু বাতাস আসছে পশ্চিম দিকটা থেকে। আবছা অন্ধকারেও মাঠটা বোঝা যায়। কদাচিৎ দু একটা সাইকেল আর রিক্সার অবয়ব চোখে পড়ে। এই কলোনির দিকে আসে সেগুলো। বিস্তৃকার খোলা চুল মুখের ওপর এসে পড়ে। আচ্ছা অনেক দূরের ওই অন্ধকার মাঠটা থেকে ক্রাচে করে কেউ হেঁটে আসছে না তো? নাকি চোখের ভুল? বিস্তৃকা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেই অন্ধকার দিগন্তে।
দীপ্তর দেয়া সেই বই দুটোয় কোনো অক্ষরে আন্ডারলাইন ছিল না। তবুও অনেক সময় লেগেছিল বিস্তৃকার কথাটা বুঝতে। বই দুটোর শিরোনামেই ছিল দীপ্তর শেষ কথাটুকু। “কথা হয়ে গেছে”, “দূরবীন”। বিস্তৃকা অনেক ভেবে ভেবে দুটো অর্থ বের করেছিল দীপ্তর দেয়া শেষ বাক্যের। বিস্তৃকার সাথে দীপ্তের সব কথা শেষ হয়ে গেছে, তার জন্য যেন আর পথ চেয়ে অপেক্ষা না করে সে। দূরবীন মানে সেই অপেক্ষা। পথের দিকে তাকিয়ে থাকা। অন্য অর্থটা হল, দীপ্তের সাথে সব কথা হয়ে গেলেও সে বিস্তৃকাকে অপেক্ষা করে থাকতে বলেছে পথ চেয়ে। একদিন সে ফিরে আসবে।
বিস্তৃকা দ্বিতীয় অর্থটাকে সাথে করে নিয়ে বেঁচে আছে। বিয়ে করেনি আর। বিস্তৃকা দীপ্তের অপেক্ষায় আছে। সে নিশ্চয় একদিন ফিরে আসবে। সে নিজেই তো বলে গিয়েছিল, “আমার যেতে ইচ্ছে করছে না!” তাহলে কেনই বা ফিরবে না?
এলোমেলো ঠাণ্ডা একটা বাতাস শুরু হয়েছে। সামান্য কেঁপে ওঠে বিস্তৃকা, এখনও তাকিয়ে রয়েছে অন্ধকার দিগন্তের দিকটায়। মাঠটার ওপর কুয়াশা নামতে আরম্ভ করেছে। সত্যিই কি ক্রাচে ভর করে কেউ আসছে?
(সমাপ্ত)
উৎসর্গঃ
মাহরীন ফেরদৌস আপা।
জানি এই নামে প্রায় কেউই তাকে চিনবে না প্রথমবার বলার পর। সমস্যা নেই। প্রায় বছর খানেক পর কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই দেখা আমার তার সাথে। অফিসের কোনো কাজে সম্ভবত চট্টগ্রামে এসেছিলেন কলিগদের সাথে। দেখা হয়ে গেল সেই সুযোগে। আমাকে দেখেই দুয়েক কথা গড়ানোর পর প্রশ্ন করলেন, “তোমার লেখালেখির কি খবর বাবাকোয়ার আব্বু?” যেন ছোট একটা বাচ্চাকে প্রশ্ন করছেন হাসি হাসি মুখে।
আমি উদাস মুখে উত্তর দিয়েছিলাম, “চাকরি আমাকে অলস বানিয়ে দিচ্ছে আপা। লেখা লেখি ছাদে উঠেছে। অফিস আগে একদিন ছুটি থাকতো, ভাবতাম ছুটির দিনে লিখবো। কিন্তু সেই দিনটা ঘুমিয়েই পার করতাম। লেখালেখি আর হতো না। দুইদিন ছুটি দেয়ার পর ভাবলাম একদিন ঘুমাবো আরেকদিন লিখবো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এখন দুইদিনই ঘুমিয়ে পার করছি!”
“এইভাবে তো চলবে না! লিখতে হবে!” মাথা নাড়লেন তিনি।
কি মনে করে যেন ব্যাগ থেকে আমার পাটের কভারের ডায়েরিটা এগিয়ে বের করে দেখালাম, “দেখেন, কিচ্ছু লেখি নাই, কিচ্ছু আঁকি নাই। ডিডি কিনে দিয়েছিল। মাত্র দুই লাইন লিখে থেমে গেছি। এক কাজ করেন আপনি। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় লিখে দেন যেন আমি লিখে লিখে ঐ পর্যন্ত গিয়ে থামি। তাহলে নিশ্চই আপনার লেখাটা দেখেও লেখবো।”
তিনি হাসিমুখে কথা বলতে বলতেই ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় সত্যি সত্যি লিখে দিয়েছিলেন কথাগুলো।
“প্রিয় বাবাকোয়ার আব্বু শিহাব,
এই ডায়েরির শেষ পাতা পর্যন্ত তোমাকে লিখে লিখে পৌছাতে হবে। প্রয়োজনে উড়তে উড়তে লিখো, ছুটতে ছুটতে কিংবা ঘুমাতে ঘুমাতে....
লিখো এবং লিখতে থাকো......
একুয়া রেজিয়া
৬/০৪/১৫”
আমি লেখার চেষ্টা করেছি আপা!
২| ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:১৯
বিজন রয় বলেছেন: বড় গল্প।
++
৩| ০৯ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ১১:০৬
নিথর শ্রাবণ শিহাব বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ সবাইকে
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে এপ্রিল, ২০১৫ বিকাল ৩:১৪
সানজিদা হোসেন বলেছেন: আপনার লেখা আর পড়বোনা। মন খারাপ হয়ে যায়